Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : কুয়াশার ওপারে শেষ চিঠি (দ্বিতীয় পর্ব: নদী যাকে ফিরিয়ে দিল)।

১. মৃত মানুষের ডাক

‘মা!’

শব্দটা আবার ভেসে এল।

পুরোনো ডাকঘরের জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এবার আরও কাছে চলে এসেছে। চারপাশে জল, অথচ তার হাতে ধরা কালো ছাতাটিতে একফোঁটা জলও জমেনি।

ঋতুপর্ণা কাচের গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, বুকের ভিতরটা কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে।

তার বাবা মারা গিয়েছিলেন তার জন্মের আগেই—এ কথা সে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে। মায়ের মুখে বাবার গল্প খুব কম শুনেছে। শুধু জানত, তাঁর নাম ছিল সৌম্য দত্ত। তিনি নাকি রেল দপ্তরে কাজ করতেন। এক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, আর সেই ঘটনার পরেই ঋতুপর্ণার মা মীরা দত্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কিন্তু বাবার মৃত্যুর কোনও ছবি নেই। কোনও মৃত্যুসনদ সে কখনও দেখেনি। এমনকী তাঁর শেষকৃত্যের কথাও মা কখনও বলেননি।

আজ সেই মানুষই নদীর জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছেন!

‘বাবা?’ ঋতুপর্ণার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

পিছন থেকে অয়নের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

‘জানালার কাছে যাবেন না।’

ঋতুপর্ণা ঘুরে দাঁড়াল।

‘আপনি জানতেন?’

‘কী?’

‘ওখানে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার বাবার মতো দেখতে!’

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি শুধু এটুকু জানি, এই ডাকঘরে রাত বারোটার পর যা দেখা যায়, তা সব সময় বাস্তব নয়।’

‘তাহলে আপনি আমাকে এখানে আনলেন কেন?’

‘কারণ আপনাকে একটা চিঠি পড়তে হবে।’

অয়ন কাউন্টারের নীচ থেকে একটি লোহার বাক্স বের করল। বাক্সের গায়ে মরচে পড়েছে। তালার পাশে ছোট্ট অক্ষরে লেখা—‘সৌম্য দত্ত, ব্যক্তিগত নথি।’

ঋতুপর্ণার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

‘এটা আমার বাবার বাক্স?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি পেলেন কোথায়?’

‘হরিপদ মাইতির কাছ থেকে।’

‘কিন্তু উনি তো মারা গেছেন।’

‘মৃত্যুর আগে তিনি বাক্সটা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনার হাতে পৌঁছে দিতে।’

ঋতুপর্ণা চাবিটা বের করল। দেওয়ালঘড়ির পিছনে পাওয়া সেই চাবি। তালায় ঢোকাতেই বাক্সটা খুলে গেল।

ভিতরে কয়েকটি পুরোনো ছবি, রেল দপ্তরের পরিচয়পত্র, কিছু সরকারি কাগজ এবং একটি নীল খাম।

নীল খামের ওপরে লেখা—

‘আমার মেয়ে ঋতুর জন্য। যখন সে জানতে চাইবে, আমি কেন ফিরে আসিনি।’

ঋতুপর্ণার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

সে খামটা খুলল।

চিঠিতে লেখা—

‘ঋতু,

তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার কাছে আর থাকব না। কিন্তু আমি চাই না, তুমি কোনও দিন ভাবো যে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।

তোমার জন্মের সময় আমি একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রেল দপ্তরের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং এমন একটি দুর্ঘটনা, যার খবর কোনও দিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি।

আমি প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু প্রমাণগুলো নিয়ে বাড়ি ফেরার আগেই বুঝতে পারি, আমাকে অনুসরণ করা হচ্ছে।

তোমার মা আমাকে বলেছিল, সবকিছু ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। আমি পারিনি। কারণ যাদের জীবন ওই ঘটনার জন্য শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাদের সত্যিটা প্রকাশ করা আমার দায়িত্ব ছিল।

যদি কোনও দিন অর্ক সেনের নাম তোমার সামনে আসে, তাকে ঘৃণা কোরো না। সে আমার কাছে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

কিন্তু যদি অয়ন নামের কাউকে দেখো, তাকে আমার কথা বিশ্বাস করতে বলবে না। সে যা বলে, তার অর্ধেক সত্য আর অর্ধেক মিথ্যে।

আর সবচেয়ে বড় কথা—নদীর ধারে যে মানুষটিকে দেখবে, তাকে কখনও নিজের হাতে ছোঁয়ার চেষ্টা কোরো না।

জল সব সময় মৃত মানুষকে ফেরত দেয় না। কখনও কখনও সে শুধু আমাদের অপরাধবোধ ফিরিয়ে দেয়।

— তোমার বাবা, সৌম্য।’

চিঠিটা পড়ে ঋতুপর্ণা মাথা তুলল।

‘অর্ক আমার বাবাকে চিনত?’

অয়ন বলল, ‘চিনত।’

‘কীভাবে?’

‘কারণ আপনার বাবা অর্কের বাবার সহকর্মী ছিলেন।’

‘অর্কের বাবা কে ছিলেন?’

অয়ন উত্তর দিল না।

ঋতুপর্ণা আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আর আপনি? আপনি কে?’

অয়ন জানালার দিকে তাকাল।

বাইরের মানুষটি আর নেই। শুধু জল, কুয়াশা আর অন্ধকার।

অয়ন ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি এমন একজন মানুষ, যে বারো বছর আগে একটি ভুল করেছিল। সেই ভুলের জন্য একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল, একজন মানুষ মারা গিয়েছিল, আর একটি মেয়ের জীবন অপেক্ষার মধ্যে আটকে গিয়েছিল।’

‘আপনি কি অর্ককে মেরেছিলেন?’

অয়ন মুখ ফিরিয়ে তাকাল।

‘আমি জানি না অর্ক মারা গিয়েছিল কি না।’

ঋতুপর্ণা হতভম্ব হয়ে গেল।

‘আপনি কী বলছেন?’

অয়ন উত্তর দেওয়ার আগেই ডাকঘরের পুরোনো টেলিফোনটা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

টেলিফোনের তার বহু বছর আগে কেটে দেওয়া হয়েছিল। তবু ঘণ্টা বাজছে।

অয়ন রিসিভার তুলল।

ওপাশ থেকে একটা কর্কশ পুরুষকণ্ঠ বলল, ‘চিঠিটা কি ও পড়েছে?’

অয়ন বলল, ‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে এবার তাকে নদীর কাছে নিয়ে যাও।’

‘কিন্তু—’

‘কোনও কিন্তু নয়। বারো বছর আগে যে কাজ শেষ করতে পারোনি, আজ সেটা শেষ করো।’

লাইন কেটে গেল।

অয়ন ধীরে ধীরে রিসিভার নামিয়ে রাখল।

ঋতুপর্ণা বলল, ‘কে ফোন করেছিল?’

অয়ন কোনও উত্তর দিল না।

তারপর কাউন্টারের নীচ থেকে একটি টর্চ বের করে বলল, ‘আমাদের এখনই বেরোতে হবে।’

‘কোথায়?’

‘যেখানে অর্ক শেষবার দাঁড়িয়েছিল।’

২. নদীর ধারে তৃতীয় মানুষ

পুরোনো ডাকঘরের দরজা খুলতেই দেখা গেল, বাইরের রাস্তায় একফোঁটা জল নেই।

কিছুক্ষণ আগেও জানালার ওপারে যে জল উঠছিল, তার কোনও চিহ্ন নেই। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে, দূরে একটি কুকুর ঘুমোচ্ছে, আর বাতাসে ভেসে আসছে রাতের মাটির গন্ধ।

ঋতুপর্ণা একবার পিছনে তাকাল।

‘আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম?’

অয়ন বলল, ‘স্বপ্ন হলে ভালো হত।’

দুজন হাঁটতে শুরু করল।

শহরের শেষ প্রান্ত পেরিয়ে তারা পৌঁছল নদীর পুরোনো ঘাটে। বারো বছর আগে এখানেই অর্ক নিখোঁজ হয়েছিল।

ঘাটের পাশে একটি ভাঙা শিবমন্দির। তার পিছনে কাশবন। দূরে নদীর কালো জল বয়ে চলেছে। পূর্ণিমা না হলেও চাঁদের আলোয় জলের ওপর একটা সরু রুপোলি পথ তৈরি হয়েছে।

ঋতুপর্ণা থেমে গেল।

‘এখানে অর্ক নিখোঁজ হয়েছিল?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি সেদিন এখানে ছিলেন?’

অয়ন মাথা নাড়ল।

‘ছিলাম।’

‘তাহলে সব বলুন। সেদিন কী হয়েছিল?’

অয়ন ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়ল।

‘বারো বছর আগে অর্ক একটা নথি পেয়েছিল। সেই নথিতে রেল দপ্তরের একটি দুর্ঘটনার কথা ছিল। সরকারি নথিতে লেখা হয়েছিল, একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়েছিল। কিন্তু আসলে ওই রাতে যাত্রীবাহী একটি ছোট ট্রেনও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। কয়েকজন যাত্রী মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একজন সরকারি কর্মী, যিনি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতেন।’

ঋতুপর্ণা বলল, ‘আমার বাবা?’

‘হ্যাঁ। আপনার বাবা ওই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি কিছু নথি সংগ্রহ করেছিলেন। অর্ক সেই নথিগুলো খুঁজে পায়।’

‘কিন্তু আমার বাবা তো রেল দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন বলে শুনেছি।’

‘ওটাই ছিল সরকারি বক্তব্য।’

ঋতুপর্ণা শিউরে উঠল।

‘তাহলে সত্যিটা কী?’

অয়ন নদীর দিকে তাকাল।

‘আপনার বাবা নিখোঁজ হননি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।’

ঋতুপর্ণার চোখে জল এসে গেল।

‘কে করেছিল?’

‘আমি জানি না। কিন্তু অর্ক জানত।’

‘তাহলে অর্ক কেন আমাকে কিছু বলেনি?’

‘কারণ সে আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিল।’

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল, ‘সবাই আমাকে বাঁচানোর কথা বলে! অথচ কেউ আমাকে সত্যিটা বলে না!’

অয়ন চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, ‘সেদিন রাতে অর্ক আমাকে ফোন করেছিল। বলেছিল, তার কাছে প্রমাণ আছে। সে চেয়েছিল আমি ঘাটে আসি। আমি এসেছিলাম। কিন্তু আমার সঙ্গে আরেকজন ছিল।’

‘কে?’

‘একজন লোক, যার মুখ আমি কোনও দিন ভুলতে পারিনি।’

‘নাম?’

অয়ন পকেট থেকে একটি ছবি বের করল।

ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে অর্ক। একপাশে অয়ন। অন্য পাশে সেই সাদা শার্ট পরা লোকটি, যার হাতে কালো ছাতা।

লোকটির মুখ এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ঋতুপর্ণা ছবিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘এ তো…’

‘চিনতে পেরেছেন?’

ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।

লোকটি তাদের শহরের পুরোনো ডাকঘরের প্রধান কর্মী ছিলেন। নাম ছিল নিবারণ পাল। ছোটবেলায় ঋতুপর্ণা তাঁকে দেখেছে। তিনি তার বাবার বন্ধু ছিলেন বলে মা বলতেন।

কিন্তু নিবারণ পাল তো মারা গিয়েছিলেন দশ বছর আগে।

অয়ন বলল, ‘সেদিন তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। অর্ক বলেছিল, নিবারণবাবু তাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু ঘাটে পৌঁছনোর পর সবকিছু বদলে গেল।’

‘কী হয়েছিল?’

‘আমরা তর্ক করছিলাম। অর্ক বলছিল, নথি পুলিশের হাতে তুলে দেবে। নিবারণবাবু বলছিলেন, তাতে অনেক নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি হবে। আমি মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলাম।’

‘তারপর?’

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

‘একটা ধাক্কা। একটা চিৎকার। তারপর অর্ক নদীতে পড়ে গেল।’

ঋতুপর্ণা নিশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

‘আপনি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি?’

‘করেছিলাম। কিন্তু নদীর স্রোত খুব বেশি ছিল। আমি জলে নেমেছিলাম। অর্ককে আর খুঁজে পাইনি।’

‘আর নিবারণবাবু?’

‘তিনি চলে গিয়েছিলেন।’

ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে বলল, ‘তাহলে অর্ককে ধাক্কা দিয়েছিল কে?’

অয়ন তার দিকে তাকাল।

‘আমি জানি না।’

‘আপনি জানেন!’

‘আমি শপথ করে বলছি, আমি জানি না!’

ঋতুপর্ণা ছবিটা মুঠোয় চেপে ধরল।

‘আপনি এত বছর চুপ করে ছিলেন কেন?’

অয়ন মাথা নীচু করল।

‘কারণ আমার হাতেও রক্ত লেগেছিল।’

‘আপনি কি অর্ককে ধাক্কা দিয়েছিলেন?’

অয়ন উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই নদীর ওপার থেকে একটা আলো দেখা গেল।

একটি নৌকা ধীরে ধীরে এদিকে এগিয়ে আসছে। নৌকায় একজন মানুষ বসে আছেন। পরনে সাদা শার্ট, হাতে কালো ছাতা।

ঋতুপর্ণা উঠে দাঁড়াল।

‘নিবারণ পাল!’

অয়ন তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল।

‘চুপ!’

নৌকাটি ঘাটে এসে থামল।

লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। মুখে বয়সের ছাপ নেই। যেন বারো বছর আগের সেই ছবির মানুষটি।

তিনি ঘাটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অয়ন, তুমি অবশেষে তাকে নিয়ে এসেছ।’

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, ‘আপনি তো মারা গেছেন।’

লোকটি হাসলেন।

‘মানুষের মৃত্যু হয়, অয়ন। কিন্তু তার কাজের শেষ হয় না।’

ঋতুপর্ণা সামনে এগিয়ে গেল।

‘আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?’

নিবারণ পাল তার দিকে তাকালেন।

‘তোমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম সেই রাতে, যখন অর্ক নদীতে পড়েছিল।’

‘আপনি জানেন, আমার বাবার কী হয়েছিল?’

‘জানি।’

‘তাহলে বলুন!’

নিবারণ পাল ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোমার বাবা নদীতে মারা যাননি। তাঁকে এই নদীর ধারেই মাটির নীচে পুঁতে রাখা হয়েছিল।’

ঋতুপর্ণার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।

‘কোথায়?’

নিবারণ পাল ঘাটের পিছনের কাশবনের দিকে আঙুল তুললেন।

‘ওখানে।’

৩. মাটির নীচে লুকোনো নাম

রাত তখন প্রায় দুটো।

নিবারণ পাল নৌকা থেকে একটি কোদাল বের করলেন। অয়ন তাঁকে বাধা দিল।

‘আপনি যা করছেন, তা বন্ধ করুন।’

নিবারণ পাল বললেন, ‘বারো বছর আগে তুমি যা করতে পারোনি, আজ সেটা শেষ করতে হবে।’

‘আপনি বলেছিলেন, কেউ কোনও দিন জানতে পারবে না।’

‘আমি অনেক কথা বলেছিলাম। তার সবটাই মিথ্যে ছিল।’

ঋতুপর্ণা তাঁদের কথোপকথন শুনছিল। তার মাথার ভিতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—তার বাবা কি সত্যিই নদীর ধারে পুঁতে রাখা হয়েছিলেন?

নিবারণ পাল কাশবনের এক জায়গায় মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন।

কয়েক মিনিট পর কোদাল শক্ত কিছুতে আঘাত করল।

ঠক।

তিনি মাটি সরিয়ে একটি পুরোনো লোহার বাক্স বের করলেন।

বাক্সটি খুলতেই ভিতরে দেখা গেল কয়েকটি কাগজ, একটি পরিচয়পত্র এবং একটি ছোট্ট ডায়েরি।

পরিচয়পত্রে লেখা—সৌম্য দত্ত।

ঋতুপর্ণা বাক্সের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

‘এটা আমার বাবার?’

নিবারণ পাল মাথা নাড়লেন।

‘হ্যাঁ।’

‘তাঁর দেহ কোথায়?’

‘সেটা আমি জানি না।’

‘আপনি মিথ্যে বলছেন!’

নিবারণ পাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘তোমার বাবাকে সেদিন মেরে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু দেহটা কে সরিয়েছিল, তা আমি জানি না। আমি শুধু এই বাক্সটা লুকিয়ে রেখেছিলাম।’

ঋতুপর্ণা ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘যদি কেউ এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে বুঝবে আমি সত্যিটা বলতে পারিনি।’

পরের পাতায় কয়েকটি তারিখ। রেল দুর্ঘটনার বিবরণ। কিছু নাম। কিছু গোপন লেনদেনের হিসাব।

শেষের দিকে একটি পাতা ছেঁড়া।

তার ঠিক আগের পাতায় লেখা—

‘অর্ককে বাঁচাতে হলে ঋতুপর্ণাকে সবকিছু ভুলিয়ে দিতে হবে। কারণ সে ইতিমধ্যেই সত্যিটা জেনে গেছে।’

ঋতুপর্ণা থমকে গেল।

‘আমি সত্যিটা জেনেছিলাম?’

নিবারণ পাল বললেন, ‘হ্যাঁ।’

‘কখন?’

‘বারো বছর আগে।’

ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।

‘অসম্ভব। আমার কিছুই মনে নেই।’

নিবারণ পাল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার মনে নেই, কারণ তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

‘কীভাবে?’

‘তোমাকে কোনও ওষুধ খাইয়ে নয়। তোমাকে বারবার এমন একটি গল্প শোনানো হয়েছিল, যাতে তুমি নিজের স্মৃতিকেই সন্দেহ করতে শুরু করো। তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলে, তোমার বাবা জন্মের আগেই মারা গেছেন। তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলে, অর্ক তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর একসময় তুমি নিজের দেখা ঘটনাগুলোকে স্বপ্ন বলে ভাবতে শুরু করেছিলে।’

ঋতুপর্ণা মাথায় হাত দিল।

তার স্মৃতির ভিতরে হঠাৎ কয়েকটি দৃশ্য ঝলসে উঠল।

বারো বছর আগের রাত।

অর্কের সঙ্গে তর্ক।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নিবারণ পাল।

একটি গাড়ির হেডলাইট।

তার বাবার কণ্ঠস্বর—‘ঋতু, বাড়ি চলে যা।’

তারপর একটা শব্দ।

ধপ!

আর নদীর জলে ছিটকে পড়া একটি মানুষ।

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল।

‘আমি দেখেছিলাম! আমি সব দেখেছিলাম!’

অয়ন তার দিকে এগিয়ে এল।

‘কী দেখেছিলেন?’

ঋতুপর্ণা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘সেদিন নদীতে অর্ক পড়েনি।’

অয়ন স্থির হয়ে গেল।

‘তাহলে?’

ঋতুপর্ণা চোখ তুলে তাকাল।

‘নদীতে পড়েছিল আমার বাবা।’

কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।

নিবারণ পাল কোদালটা মাটিতে রেখে দিলেন।

অয়ন ফিসফিস করে বলল, ‘না। এটা সম্ভব নয়।’

ঋতুপর্ণা ডায়েরির শেষ পাতাটা আবার পড়ল। তার মনে হচ্ছিল, মাথার ভিতর বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটা দরজা খুলে যাচ্ছে।

‘অর্ক আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। বাবা নদীতে পড়ে যাওয়ার পর অর্ক ঝাঁপ দিয়েছিল। কিন্তু আমি…’

তার গলা আটকে গেল।

‘আমি অর্ককে ধরে রাখতে পারিনি।’

নিবারণ পাল বললেন, ‘তোমাকে কেউ দোষ দেয়নি।’

ঋতুপর্ণা তাঁর দিকে তাকাল।

‘কিন্তু আপনি আমাকে সত্যিটা জানতে দেননি।’

নিবারণ পাল মাথা নীচু করলেন।

‘আমি ভয় পেয়েছিলাম।’

‘কাকে?’

‘যে মানুষটা তোমার বাবাকে হত্যা করেছিল, তাকে।’

ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

‘কে সে?’

নিবারণ পাল উত্তর দেওয়ার আগেই নদীর ওপার থেকে গুলির শব্দ এল।

একবার।

তারপর দ্বিতীয়বার।

নিবারণ পাল বুক চেপে মাটিতে পড়ে গেলেন।

অয়ন চিৎকার করে উঠল।

ঋতুপর্ণা তাঁর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নিবারণের জামায় রক্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে।

তিনি কষ্ট করে ঋতুপর্ণার হাত ধরলেন।

‘বাক্সের নীচে… একটা ছবি আছে।’

ঋতুপর্ণা বাক্সের ভিতর হাত ঢোকাল।

সত্যিই একটি ছবি রয়েছে।

ছবিতে চারজন মানুষ—সৌম্য দত্ত, নিবারণ পাল, অর্ক এবং অয়ন।

কিন্তু ছবির একেবারে পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন আরও একজন।

মুখটা স্পষ্ট।

ঋতুপর্ণা তাঁকে চিনতে পারল।

তিনি তাদের স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।

যিনি তিন বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

নিবারণ পাল শেষবারের মতো বললেন, ‘তিনি মারা যাননি, ঋতুপর্ণা। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। আর তিনিই জানেন, অর্ক কোথায়।’

তারপর তাঁর হাত ঢিলে হয়ে গেল।

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল।

অয়ন দ্রুত চারদিকে তাকাল। নদীর ওপারের কুয়াশার মধ্যে একটি ছায়া সরে যাচ্ছে।

‘আমাদের এখান থেকে যেতে হবে!’

ঋতুপর্ণা বাক্সটা তুলে নিল।

‘না। এবার আর পালাব না।’

অয়ন বলল, ‘আপনি বুঝতে পারছেন না, তারা আপনাকে মেরে ফেলবে।’

ঋতুপর্ণা শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘তাহলে এত বছর ধরে তারা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কেন?’

অয়ন কোনও উত্তর দিতে পারল না।

৪. স্কুলের শেষ ঘণ্টা

পরদিন সকালেই ঋতুপর্ণা স্কুলে গেল।

শহরের পুরোনো উচ্চবিদ্যালয়টি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। লাল ইটের ভবন, সামনে বড় মাঠ, মাঝখানে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। এই স্কুলেই শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায় প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ঋতুপর্ণার বাবা নাকি এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন—এ কথা সে ছোটবেলায় শুনেছিল।

কিন্তু শশাঙ্কবাবুর মৃত্যুর পর স্কুলের পুরোনো নথি গুদামঘরে সরিয়ে রাখা হয়। কেউ সেগুলো আর খুঁজে দেখেনি।

ঋতুপর্ণা সরাসরি প্রধান শিক্ষকের ঘরে গেল।

বর্তমান প্রধান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু তাকে দেখে অবাক হলেন।

‘কী ব্যাপার, ঋতুপর্ণা? আজ তো তোমার ক্লাস নেই।’

ঋতুপর্ণা বলল, ‘পুরোনো ভর্তি রেজিস্টারগুলো দেখতে চাই।’

‘কেন?’

‘শশাঙ্কবাবুর সময়কার।’

অনিরুদ্ধবাবু একটু থমকালেন।

‘সেগুলো তো গুদামঘরে আছে। অনেক পুরোনো কাগজ। কেন দরকার?’

‘একটা ব্যক্তিগত তদন্তের জন্য।’

অনিরুদ্ধবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চাবি বের করলেন।

‘চলো।’

গুদামঘরটা স্কুলের পিছনের দিকে। ধুলোমাখা আলমারি, ভাঙা বেঞ্চ, পুরোনো মানচিত্র আর কাগজের স্তূপ। অনিরুদ্ধবাবু একটি বড় কাঠের আলমারি খুলে দিলেন।

‘যা দরকার দেখে নাও।’

ঋতুপর্ণা একের পর এক রেজিস্টার খুলতে লাগল।

১৯৯৮।

১৯৯৯।

২০০০।

তারপর ২০১৪ সালের একটি পুরোনো ফাইল।

ফাইলের ভিতরে শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত নোটবুক। প্রথম কয়েকটি পাতা সাধারণ স্কুলের হিসাব। তারপর কিছু নাম, তারিখ এবং সংক্ষিপ্ত বাক্য।

একটি পাতায় লেখা—

‘সৌম্য দত্তের মেয়ে ঋতুপর্ণা। স্মৃতির সমস্যা এখনও আছে। তাকে পুরোনো ঘটনার কথা মনে করানো যাবে না।’

পরের পাতায়—

‘অর্ক সেনকে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। কিন্তু অয়নকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।’

তারপরের পাতায়—

‘যদি কখনও ঋতুপর্ণা সত্যিটা জানতে চায়, তাকে নদীর কাছে যেতে দিও না।’

ঋতুপর্ণা পাতাটা শক্ত করে ধরে রইল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

সে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ বলল, ‘ঋতুপর্ণা দত্ত?’

‘কে বলছেন?’

‘আমি শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।’

ঋতুপর্ণার হাত থেকে ফাইলটা পড়ে গেল।

‘কিন্তু আপনি তো মারা গেছেন!’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর কণ্ঠস্বর বলল, ‘সবাই তাই জানে।’

‘আপনি কোথায়?’

‘তোমার সামনে যে রেজিস্টারটা খোলা আছে, তার শেষ পাতাটা দেখো।’

ঋতুপর্ণা তাড়াতাড়ি পাতাগুলো উল্টে শেষ পাতায় পৌঁছল।

সেখানে একটি ঠিকানা লেখা।

চন্দ্রকোণা শহরের বাইরে, পরিত্যক্ত একটি রেলকোয়ার্টার।

শশাঙ্কবাবু বললেন, ‘সেখানে অর্ক আছে।’

ঋতুপর্ণার চোখে জল এসে গেল।

‘সে বেঁচে আছে?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু আর বেশি সময় নেই।’

‘কী হয়েছে তার?’

‘সেটা তোমাকে তার কাছ থেকেই শুনতে হবে।’

ঋতুপর্ণা কাঁপা গলায় বলল, ‘আমি এখনই আসছি।’

ফোনের ওপাশ থেকে শশাঙ্কবাবুর শেষ কথাটা ভেসে এল—

‘একটা কথা মনে রেখো। অর্ককে তুমি খুঁজে পাবে। কিন্তু যাকে তুমি এত দিন অর্ক বলে জেনে এসেছ, সে আসলে কে—সেই প্রশ্নের উত্তর তোমাকে নিজের কাছেই খুঁজতে হবে।’

লাইন কেটে গেল।

ঋতুপর্ণা ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার সামনে খোলা রেজিস্টারের শেষ পাতায় আরেকটি বাক্য লেখা ছিল—

‘এই তদন্তের আসল সাক্ষী ঋতুপর্ণা নয়। আসল সাক্ষী সেই মানুষ, যে বারো বছর ধরে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বেঁচে আছে।’

বাইরে স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল।

ঋতুপর্ণা জানালার দিকে তাকাল।

মাঠের ওপারে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা শার্ট। হাতে কালো ছাতা।

সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

মুখটা এবার স্পষ্ট দেখা গেল।

অর্ক সেন।

বারো বছর আগে যে মানুষটিকে সে হারিয়েছিল, সে-ই দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের মাঠে।

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়ল।

‘ঋতু, এবার বাড়ি চলো।’

ঋতুপর্ণা দৌড়ে দরজার দিকে গেল।

কিন্তু মাঠে পৌঁছে দেখল, সেখানে কেউ নেই।

শুধু কৃষ্ণচূড়ার নীচে পড়ে আছে একটি ভেজা চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

‘শেষ চিঠি পড়ার আগে কাউকে বিশ্বাস কোরো না।’

ঋতুপর্ণা খামটা খুলল।

ভিতরে মাত্র একটি লাইন—

‘তুমি যাকে অর্ক বলে ভালোবেসেছিলে, সে তোমার বাবা ছিল।’

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল।

তারপর চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল।

দূরে, পরিত্যক্ত রেলকোয়ার্টারের দিকে একটি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

অথচ ওই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছে পনেরো বছর আগে।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *