১. যে মানুষটি ফিরে এসেছিল
পরিত্যক্ত রেলকোয়ার্টারের নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঋতুপর্ণার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের সমস্ত পরিচিত সত্য একে একে ভেঙে পড়ছে।
দরজার ওপারে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে সে চেনে। অন্তত তার মুখ, তার চোখ, তার হাসি—সবই পরিচিত। বারো বছর আগে কলেজের করিডরে যে ছেলেটির সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল, নদীর ধারে যার সঙ্গে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, যার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরেও সে প্রতিটি বর্ষায় ফিরে আসার অপেক্ষা করেছে—সেই অর্ক সেন।
কিন্তু মানুষটি নিজেকে অর্ক দত্ত বলে পরিচয় দিয়েছে। দাবি করেছে, সে ঋতুপর্ণার বাবা সৌম্য দত্তের ছেলে। অর্থাৎ, ঋতুপর্ণার নিজের সৎভাই।
আর কয়েক মিনিট আগে পাওয়া চিঠিতে লেখা—‘তুমি যাকে অর্ক বলে ভালোবেসেছিলে, সে তোমার বাবা ছিল।’
ঋতুপর্ণা দেওয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
‘আমাকে আর একবার বলো,’ সে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি আসলে কে?’
অর্কের চোখে জল জমে উঠল।
‘আমি অর্ক দত্ত। সৌম্য দত্তের ছেলে। তোমার সৎভাই।’
‘তাহলে এত বছর ধরে আমার সঙ্গে যা যা হয়েছে, সবই কি মিথ্যে?’
‘না, ঋতু। তোমার অনুভূতিগুলো মিথ্যে ছিল না। কিন্তু তোমাকে যে পরিচয় দিয়ে আমার কাছে আনা হয়েছিল, সেই পরিচয় মিথ্যে ছিল।’
ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।
‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
অর্ক তাকে ঘরের ভিতরে বসতে বলল। সে নিজেও টেবিলের সামনে বসে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। জানালার বাইরে শুকনো পাতার ওপর বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।
‘বারো বছর আগে,’ অর্ক বলতে শুরু করল, ‘তোমার বাবা সৌম্য দত্ত রেল দপ্তরের একটি বড় দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। একটি দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা গিয়েছিল। কিন্তু সরকারি নথিতে মৃতের সংখ্যা কম দেখানো হয়। ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করা হয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ লুকিয়ে রাখা হয়। তোমার বাবা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।’
‘তুমি তখন কোথায় ছিলে?’
‘আমি অন্য শহরে থাকতাম। আমার মা ছিলেন সৌম্যর প্রথম স্ত্রী। তাঁদের বিচ্ছেদের পর আমি মায়ের কাছেই বড় হই। পরে বাবার সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। তিনি আমাকে কিছু নথি খুঁজে পেতে সাহায্য করতে বলেন।’
‘আর আমার মা?’
‘মীরা কাকিমা সব জানতেন। তোমার বাবা যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর জীবন বিপদের মধ্যে, তখন তিনি তোমার মাকে অনুরোধ করেছিলেন তোমাকে নিরাপদে রাখতে।’
ঋতুপর্ণা চমকে উঠল।
‘কিন্তু আমার মা তো বলেছিলেন, আমার বাবা আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন!’
‘তোমাকে রক্ষা করার জন্যই সেই মিথ্যে বলা হয়েছিল। কিন্তু একসময় সেই মিথ্যেই তোমার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।’
ঋতুপর্ণা টেবিলে রাখা পুরোনো ছবিটা তুলে নিল। ছবিতে সৌম্য দত্ত, অর্ক, অয়ন এবং নিবারণ পাল দাঁড়িয়ে আছেন।
‘তাহলে কলেজে আমাদের দেখা হওয়ার পর তুমি আমাকে চিনতে পেরেছিলে?’
অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘প্রথম দিনেই।’
‘তবু তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি?’
‘আমি ভেবেছিলাম, সঠিক সময়ে বলব। কিন্তু তোমার সঙ্গে যত বেশি সময় কাটিয়েছি, ততই ভয় পেয়েছি। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে। আমি জানতাম, সত্যিটা বললে তোমার পৃথিবী ভেঙে যাবে।’
ঋতুপর্ণা তিক্ত হাসল।
‘তাই তুমি আমার পৃথিবীটাকে মিথ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখলে?’
অর্ক কোনও উত্তর দিল না।
‘নদীর ধারে সেদিন কী ঘটেছিল?’ ঋতুপর্ণা জিজ্ঞাসা করল। ‘আমার বাবার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?’
অর্কের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
‘সেদিন রাতে বাবা আমাদের দুজনকে নদীর ধারে ডেকেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল দুর্নীতির সমস্ত প্রমাণ। তিনি চেয়েছিলেন, নথিগুলো পুলিশের কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন নিবারণ পাল এবং আরও একজন।’
‘কে?’
‘শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।’
ঋতুপর্ণার বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।
‘আমাদের স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষক?’
‘হ্যাঁ। তিনিই ছিলেন পুরো ঘটনার মূল ষড়যন্ত্রকারী।’
‘তারপর?’
অর্ক চোখ বন্ধ করল।
‘বাবা নথিগুলো দিতে অস্বীকার করেন। তাঁদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। আমি বাবার পাশে দাঁড়াই। তখন পিছন থেকে কেউ আমাকে আঘাত করে। আমি নদীতে পড়ে যাই। জ্ঞান হারানোর আগে শুধু দেখেছিলাম, বাবা আমার দিকে ছুটে আসছেন।’
‘তুমি বেঁচে গেলে কীভাবে?’
‘নদীর স্রোতে ভেসে আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। একজন জেলে আমাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু আমার স্মৃতি তখন প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। পরে যখন সব মনে পড়ে, তখন জানতে পারি, বাবার কোনও খোঁজ নেই।’
‘তাহলে সবাই ভেবেছিল তুমি মারা গেছ?’
‘হ্যাঁ। আর শশাঙ্ক সেই সুযোগে আমার পরিচয় মুছে দেয়। সে চেয়েছিল, আমি যেন আর কোনও দিন ফিরে না আসি।’
ঋতুপর্ণা চুপ করে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, এত দিন ধরে সে যে মানুষটিকে খুঁজেছে, সে শুধু নিখোঁজ হয়নি। তার নিজের পরিচয়, তার পরিবারের ইতিহাস, তার বাবার মৃত্যুর সত্য—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র।
কিন্তু এখনও একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
‘আমার বাবার দেহ কোথায়?’
অর্ক মাথা নাড়ল।
‘আমি জানি না।’
‘তাহলে শশাঙ্ক জানে?’
‘সম্ভবত।’
অর্ক উঠে জানালার কাছে গেল।
‘ঋতু, তোমাকে একটা কথা বলতে হবে। শশাঙ্ক এখনও বেঁচে আছে। আর সে জানে, তুমি সত্যিটা জানতে শুরু করেছ।’
ঠিক তখনই বাইরে একটি গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
অর্ক জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থমকে গেল।
‘সে এসে গেছে।’
২. মুখোশের আড়ালে
গাড়ি থেকে নামলেন অনিরুদ্ধবাবু—ঋতুপর্ণাদের স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক।
তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। হাতে একটি কালো ব্যাগ। বাইরে থেকে তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি এমন কোনও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, দুর্নীতি এবং বারো বছরের পুরোনো রহস্য।
দরজায় টোকা পড়ল।
‘অর্ক, দরজা খোলো। আমি জানি তুমি ভিতরে আছ।’
অর্ক ঋতুপর্ণাকে পিছনে থাকতে ইশারা করল।
‘আপনি এখানে কেন এসেছেন?’
বাইরে থেকে শান্ত কণ্ঠে উত্তর এল, ‘শেষবারের মতো কথা বলতে।’
অর্ক দরজা খুলল না।
অনিরুদ্ধবাবু আবার বললেন, ‘তোমার বাবার মতো তুমিও ভুল করছ। সত্যি প্রকাশ করে তুমি কারও উপকার করতে পারবে না।’
অর্ক বলল, ‘সত্যি প্রকাশের অধিকার আমার আছে।’
‘তুমি কি ভেবেছ, শুধু কয়েকটা কাগজ দিয়ে এত বড় অপরাধ প্রমাণ করা যায়? অনেক আগেই সব নথি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।’
ঋতুপর্ণা এবার সামনে এসে দাঁড়াল।
‘আপনি কি শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়?’
বাইরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর দরজার ওপাশ থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
‘হ্যাঁ।’
ঋতুপর্ণা দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
অনিরুদ্ধবাবু ঘরে ঢুকে চারপাশে তাকালেন। তাঁর চোখে বিস্ময়ের কোনও চিহ্ন নেই। যেন তিনি জানতেন, এই দিন একদিন আসবেই।
‘তুমি অনেক কিছু জেনে গেছ, ঋতুপর্ণা,’ তিনি বললেন।
‘আমার বাবাকে কেন হত্যা করেছিলেন?’
শশাঙ্ক চেয়ারে বসে ব্যাগটা টেবিলে রাখলেন।
‘তোমার বাবা নিজের সীমা ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি এমন কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন নষ্ট হয়ে যেত।’
‘অপরাধীদের জীবন?’
শশাঙ্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না। পৃথিবীটা এত সরল নয়। অনেক সময় বড় স্বার্থ রক্ষা করতে কিছু ছোট অন্যায় মেনে নিতে হয়।’
ঋতুপর্ণা বলল, ‘আমার বাবার জীবন আপনার কাছে ছোট অন্যায় ছিল?’
শশাঙ্ক উত্তর দিলেন না।
অর্ক সামনে এগিয়ে এল।
‘সৌম্য দত্তকে আপনি নদীর ধারে ডেকেছিলেন। আপনি জানতেন, তিনি নথিগুলো পুলিশের হাতে তুলে দিতে চলেছেন। আপনি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলেন।’
‘আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম, কারণ তিনি নিজেই বিপদে পড়তেন।’
‘তারপর তাঁকে হত্যা করলেন?’
শশাঙ্কের চোখে এক মুহূর্তের জন্য ক্রোধ ঝলসে উঠল।
‘আমি তাঁকে হত্যা করিনি!’
‘তাহলে কে করেছিল?’
‘যে মানুষটি সেদিন নদীর ধারে ছিল, সে-ই জানে।’
ঋতুপর্ণা চমকে উঠল।
‘আর কে ছিল সেখানে?’
শশাঙ্ক ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে নদীর ধারে চারজন মানুষ। সৌম্য, অর্ক, নিবারণ এবং অয়ন। কিন্তু ছবির পেছনে আরেকজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
‘এই ছবিটা দেখো,’ তিনি বললেন।
ঋতুপর্ণা ছবিটা হাতে নিল।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার ডান হাতে একটি বিশেষ আংটি দেখা যাচ্ছে—রুপোর ওপর কালো পাথর বসানো।
ঋতুপর্ণার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার মা একটি পুরোনো আংটি লুকিয়ে রাখতেন। সেই আংটির নকশাও একই রকম ছিল।
‘এই আংটি কার?’ সে জিজ্ঞাসা করল।
শশাঙ্ক বললেন, ‘তোমার বাবার নয়। আমারও নয়।’
‘তাহলে কার?’
শশাঙ্ক ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোমার মায়ের।’
ঋতুপর্ণার মাথার ভিতর যেন বজ্রপাত হল।
‘আপনি কী বলছেন?’
‘সেদিন নদীর ধারে তোমার মা-ও ছিলেন।’
অর্ক অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
‘অসম্ভব! মীরা কাকিমা তো বলেছিলেন, তিনি বাড়িতে ছিলেন।’
শশাঙ্ক মৃদু হেসে বললেন, ‘মানুষের স্মৃতি দিয়ে সব সত্যি মাপা যায় না। তোমার মা অনেক কিছু জানতেন। তিনি শুধু তোমাকে নয়, আমাদের সবাইকে একটি গল্প বিশ্বাস করিয়েছিলেন।’
ঋতুপর্ণা কাঁপা গলায় বলল, ‘আমার মা কি আমার বাবাকে হত্যা করেছিলেন?’
‘আমি তা বলিনি।’
‘তাহলে আংটি তাঁর কাছে ছিল কেন?’
শশাঙ্ক উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা গেল।
অয়ন ঘরে ঢুকে পড়ল। তার মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক।
‘আপনারা কেউ এখান থেকে বেরোবেন না,’ সে বলল। ‘পুলিশ আসছে।’
শশাঙ্ক উঠে দাঁড়ালেন।
‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, অয়ন। তুমি যে সত্যিটা জানো, সেটা সত্যির অর্ধেক।’
অয়ন বলল, ‘আমি জানি, আপনি সৌম্য দত্তের নথি চুরি করেছিলেন।’
‘আর তুমি জানো না, সেই নথিগুলো চুরি করতে আমাকে কে সাহায্য করেছিল।’
অয়ন চুপ করে গেল।
শশাঙ্ক এবার ঋতুপর্ণার দিকে তাকালেন।
‘তোমার মাকে দোষ দেওয়ার আগে তাঁর শেষ চিঠিটা পড়ো। সেটা তোমার বাড়ির পুরোনো কাঠের বাক্সে আছে।’
ঋতুপর্ণা আর অপেক্ষা করল না। সে অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে বাড়ি যেতে হবে।’
অর্ক মাথা নাড়ল।
‘আমি তোমার সঙ্গে যাব।’
শশাঙ্ক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যাও। তবে মনে রেখো, সত্যি সব সময় মানুষকে মুক্তি দেয় না। কখনও কখনও সত্যিই মানুষকে নিজের প্রিয়জনের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।’
৩. মায়ের শেষ স্বীকারোক্তি
বাড়িতে ফিরে ঋতুপর্ণা সরাসরি মায়ের ঘরে গেল।
কাঠের বাক্সটি আলমারির নীচে রাখা ছিল। সে বাক্সটা টেনে বের করল। ভিতরে পুরোনো শাড়ির নীচে একটি খাম। খামের ওপরে লেখা—
‘ঋতুর জন্য। যখন সে আর আমাকে প্রশ্ন করতে পারবে না।’
চিঠিটা খুলতে তার হাত কাঁপছিল।
‘আমার ঋতু,
যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে তুমি সেই সত্যির কাছে পৌঁছে গেছ, যেটা আমি সারা জীবন তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম।
আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তবু আজ সব বলতে চাই।
সৌম্য শুধু তোমার বাবা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। কিন্তু তাঁর একটি দুর্বলতা ছিল—তিনি ভাবতেন, সত্যি প্রকাশ করলেই অন্যায়ের অবসান হবে। তিনি বুঝতে পারেননি, অন্যায়ের শিকড় অনেক গভীরে।
সেদিন রাতে আমি নদীর ধারে গিয়েছিলাম। সৌম্য আমাকে বলেছিলেন, তিনি এমন কিছু প্রমাণ পেয়েছেন, যা দিয়ে বহু মানুষের অপরাধ প্রকাশ করা সম্ভব। আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম, শশাঙ্ক তাঁকে ছেড়ে দেবে না।
কিন্তু সৌম্য আমার কথা শোনেননি।
আমি যখন সেখানে পৌঁছই, তখন তর্ক শুরু হয়ে গেছে। শশাঙ্ক সৌম্যর হাত থেকে নথি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। অর্ক তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল। অয়নও সেখানে ছিল।
তারপর হঠাৎ ধস্তাধস্তি শুরু হয়। সৌম্য পিছিয়ে গিয়ে নদীর ধারে পড়ে যান। আমি তাঁর দিকে ছুটে গিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ আমাকে ধরে পিছনে টেনে নেয়।
আমি সৌম্যকে আর বাঁচাতে পারিনি।
আমি দেখেছিলাম, তিনি নদীর জলে তলিয়ে যাচ্ছেন। আমি চিৎকার করেছিলাম। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।
এরপর কী হয়েছিল, তার সবটা আমি জানি না। অর্কও নিখোঁজ হয়ে যায়। শশাঙ্ক আমাকে হুমকি দেয়—আমি যদি কাউকে কিছু বলি, তাহলে তোমার জীবনও বিপন্ন হবে।
আমি ভয়ে চুপ করে যাই।
আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল, আমি তোমাকে সত্যিটা বলিনি। তোমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়ার বদলে আমি তোমাকে সেই শহরেই রেখেছিলাম, যেখানে তোমার বাবার মৃত্যুর স্মৃতি প্রতিদিন তোমাকে ঘিরে থাকত।
অর্ক যখন তোমার জীবনে ফিরে আসে, তখন আমি বুঝেছিলাম, তোমার সামনে আবার সেই অতীত ফিরে এসেছে। আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম, যেন তোমাকে সত্যিটা না বলে। আমি ভেবেছিলাম, এভাবে তোমাকে রক্ষা করতে পারব।
আমি ভুল করেছিলাম।
সৌম্যকে কে নদীতে ফেলে দিয়েছিল, তা আমি নিজের চোখে স্পষ্ট দেখতে পাইনি। কিন্তু শশাঙ্কের হাতে আমি রক্ত দেখেছিলাম। আমি জানি না, সেই রক্ত কার ছিল।
ঋতু, তুমি যদি সত্যি জানতে চাও, শশাঙ্কের কথা শুনে থেমে যেয়ো না। অয়নের কথাও অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরো না। অর্ককেও প্রশ্ন করতে ভয় পেয়ো না।
তোমার জীবনের সত্যি তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে।
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
— তোমার মা, মীরা।’
চিঠি পড়ে ঋতুপর্ণা দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
তার মা সত্যিই নদীর ধারে ছিলেন। তিনি সব জানতেন, কিন্তু ভয়ের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। তবু চিঠিতে তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি। নিজের ভুল স্বীকার করেছেন।
ঋতুপর্ণা চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল।
অর্ক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
‘তুমি কি মাকে ঘৃণা করো?’ সে জিজ্ঞাসা করল।
ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।
‘না। আমি কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, ভয় মানুষকে এমন কিছু করায়, যা সে নিজেও কোনও দিন করতে চায়নি।’
‘তাহলে এখন কী করবে?’
ঋতুপর্ণা জানালার বাইরে তাকাল।
‘আমি সত্যিটা শেষ পর্যন্ত জানব।’
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
ঋতুপর্ণা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে অয়নের কণ্ঠস্বর এল।
‘ঋতুপর্ণা, আমি হাসপাতালে।’
‘আপনার কী হয়েছে?’
‘আমি ঠিক আছি। কিন্তু একটা খবর আছে। শশাঙ্ককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সে জেরার সময় একটা নাম বলেছে।’
‘কার নাম?’
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘সৌম্য দত্তের মৃত্যুর আসল সাক্ষী এখনও বেঁচে আছে। আর সেই সাক্ষী আপনার পরিবারেরই একজন।’
ঋতুপর্ণার গলা শুকিয়ে গেল।
‘কে?’
অয়ন বলল, ‘আপনার বাবা নিজে।’
ফোন কেটে গেল।
ঋতুপর্ণা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বাবা কি সত্যিই বেঁচে আছেন?
৪. নদী যা ফিরিয়ে দেয়
সেদিন রাতেই ঋতুপর্ণা ও অর্ক আবার নদীর ধারে গেল।
কুয়াশা ঘন হয়ে এসেছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। পুরোনো ঘাটের সিঁড়িতে জল জমে আছে। দূরে একটি নৌকার আলো দেখা যাচ্ছে।
ঋতুপর্ণা বলল, ‘অয়ন বলেছে, বাবা বেঁচে আছেন।’
অর্ক দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
‘আমি জানি না, এটা সত্যি কি না।’
‘তুমি কি কখনও ভেবেছ, বাবা বেঁচে থাকতে পারেন?’
‘প্রথম কয়েক বছর ভেবেছিলাম। পরে সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’
‘তাহলে এখন?’
অর্ক নদীর দিকে তাকাল।
‘এখন মনে হচ্ছে, আমাদের জানা সত্যির বাইরেও কিছু আছে।’
হঠাৎ নদীর ওপার থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
‘ঋতু!’
ঋতুপর্ণা স্থির হয়ে গেল।
এই কণ্ঠস্বর তার কাছে অপরিচিত নয়। ছোটবেলায় মায়ের কাছে যে কণ্ঠস্বরের গল্প শুনেছিল, যে কণ্ঠস্বরকে সে কখনও বাস্তবে শোনেনি, সেই কণ্ঠস্বর।
‘বাবা?’ তার ঠোঁট থেকে শব্দটা বেরিয়ে এল।
কুয়াশার মধ্যে একটি মানুষ এগিয়ে আসছে। পরনে সাদা শার্ট। হাতে কালো ছাতা। ধীরে ধীরে সে ঘাটের কাছে এসে দাঁড়াল।
তার মুখে বয়সের ছাপ। চুলে পাক ধরেছে। চোখের কোণে গভীর ক্লান্তি। কিন্তু মুখের গড়ন, চোখের দৃষ্টি—ঋতুপর্ণা জানে, এই মানুষটিকে সে কোথাও দেখেছে।
তার বাবার পুরোনো ছবিতে।
মানুষটি বললেন, ‘ঋতু, তুমি বড় হয়ে গেছ।’
ঋতুপর্ণা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে গেল।
‘আপনি কি আমার বাবা?’
মানুষটি উত্তর দিলেন না। শুধু পকেট থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করে তার হাতে দিলেন।
সৌম্য দত্ত।
ছবির মানুষটির সঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখের মিল স্পষ্ট।
অর্কও এগিয়ে এল।
‘বাবা!’
সৌম্য দত্ত তার দিকে তাকালেন। চোখে জল জমে উঠল।
‘অর্ক, আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
অর্ক বাবার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে রাগ, কষ্ট, অবিশ্বাস—সব একসঙ্গে।
‘আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?’
সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘যেখানে মৃত মানুষদের বেঁচে থাকতে হয়, কিন্তু নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে নেই।’
ঋতুপর্ণা বলল, ‘আপনি কি জানতেন, সবাই আপনাকে মৃত বলে বিশ্বাস করে?’
‘জানতাম।’
‘তাহলে ফিরে আসেননি কেন?’
সৌম্য মাথা নীচু করলেন।
‘আমি ফিরে এলে তোমাদের জীবন বিপন্ন হত। শশাঙ্ক আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। নদীর ধারে সেই রাতে আমি জলে পড়ে গিয়েছিলাম। একজন জেলে আমাকে উদ্ধার করে। পরে বুঝতে পারি, শশাঙ্ক আমাকে মৃত ভেবেছে। আমি সেই ভুলকে কাজে লাগিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করি।’
অর্ক বলল, ‘আপনি আমাদের জানাতে পারতেন।’
‘পারতাম। কিন্তু তখন তোমাদের খুঁজে বের করলেই শশাঙ্কের লোকেরা তোমাদের কাছে পৌঁছে যেত। আমি ভেবেছিলাম, সময় হলে ফিরে আসব।’
ঋতুপর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘সময় কখনও আসেনি, বাবা?’
সৌম্য তার দিকে তাকালেন।
‘আমি ভুল করেছি, ঋতু। তোমাকে রক্ষা করতে গিয়ে তোমার কাছ থেকে তোমার বাবাকেই কেড়ে নিয়েছিলাম।’
ঋতুপর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‘আমি জানি না, আপনাকে কীভাবে ক্ষমা করব। আমি জানি না, এত বছর হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট কীভাবে ভুলব। কিন্তু আজ আমি আপনাকে আর হারাতে চাই না।’
সৌম্য মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
অর্কও তাদের পাশে এসে দাঁড়াল।
দীর্ঘ বারো বছরের বিচ্ছেদ, মিথ্যে পরিচয় আর গোপন অপরাধের অন্ধকারের মধ্যে এই প্রথম তিনজন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াল।
কিন্তু গল্পের শেষ এখনও হয়নি।
সৌম্য পকেট থেকে একটি ছোট খাম বের করলেন।
‘এটাই সেই শেষ চিঠি, যার জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছি।’
ঋতুপর্ণা খামটা খুলল।
ভিতরে একটি পুরোনো কাগজ। তাতে কয়েকটি নাম, কিছু তারিখ এবং একটি বাক্য লেখা—
‘শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায় একা ছিল না। তার সঙ্গে ছিল এমন একজন, যাকে এই পরিবার আজও বিশ্বাস করে।’
ঋতুপর্ণা বাবার দিকে তাকাল।
‘কে?’
সৌম্য নদীর ওপারের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।
‘যে মানুষটি এতক্ষণ আমাদের দেখছিল।’
তিনজন একসঙ্গে পিছন ফিরে তাকাল।
কুয়াশার মধ্যে একটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কালো ছাতা। মুখ দেখা যাচ্ছে না।
সৌম্য ফিসফিস করে বললেন, ‘সে এখনও আমাদের অনুসরণ করছে।’
অর্ক ঋতুপর্ণার হাত ধরে বলল, ‘চলো। এবার আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।’
তারা ঘাট ছেড়ে এগিয়ে গেল।
পিছনে নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে। কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে। দূরে কোথাও একটি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
ঋতুপর্ণা একবার পিছনে তাকাল।
ছায়ামূর্তিটি আর নেই।
শুধু নদীর ধারে পড়ে আছে একটি কালো ছাতা।
ছাতার হাতলে সাদা অক্ষরে লেখা—
‘সব চিঠির উত্তর থাকে না। কিছু চিঠি নতুন রহস্যের জন্ম দেয়।’
ঋতুপর্ণা ছাতাটির দিকে আর তাকাল না।
সে জানত, তার জীবনে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। কিন্তু এবার সে আর অতীতের বন্দি নয়। সে নিজের চোখে সত্যি দেখেছে, নিজের কানে স্বীকারোক্তি শুনেছে, আর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখেছে।
কুয়াশার ওপারে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।
নদী তার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা বহু বছরের গোপন কথা ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কিছু রহস্য এখনও জলের নীচে ঘুমিয়ে আছে।
ঋতুপর্ণা জানত না, পরের চিঠিটা কখন আসবে।
তবে এবার সে অপেক্ষা করতে ভয় পায় না।
কারণ সে শিখেছে—সত্যি যত গভীরেই লুকিয়ে থাকুক, একদিন না একদিন তার পথ খুঁজে নেয়।
আর সেই পথের নামই জীবন।
— সমাপ্ত —