Categories
উপন্যাস বিবিধ

ঘড়ির কাঁটা যখন থেমে যায় (তৃতীয় পর্ব: শেষ সময়ের ওপারে)।

সন্ধ্যা ছয়টা বেজে সাত মিনিট।

উত্তর কলকাতার পুরোনো গলির ওপর তখন অন্ধকার নেমে আসছে। দোকানের শাটার নামছে একের পর এক। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে, অথচ নীলাঞ্জনা সেনের মনে হচ্ছে, গোটা শহর যেন কোনও অজানা বিপদের অপেক্ষায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।

তার হাতে মীরার ফোন থেকে পাওয়া শেষ কথাগুলো।

দাদু বেঁচে আছেন।

দ্বিতীয় ঘড়িটা খুঁজে বের করতে হবে।

আর রাত বারোটা সতেরো মিনিটে কোনও দরজা খোলা যাবে না।

কিন্তু কোন দরজা?

সময়ঘরের বেসমেন্টের দরজা? আয়নার ওপারের দরজা? নাকি এমন কোনও দরজা, যার অস্তিত্ব এখনও তার জানা নেই?

নীলা হাঁটতে হাঁটতে নিজের ব্যাগের মধ্যে হাত দিল। পুরোনো নার্সিংহোম থেকে পাওয়া রেকর্ডার, দুটি পরিচয়-ফিতে, দাদুর চিঠি আর পকেট ঘড়িটা এখনও রয়েছে। এগুলোই তার একমাত্র প্রমাণ।

সে অয়নকে ফোন করল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

কেউ ফোন ধরল না।

নীলা জানত, অয়নের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু এত বছরের বন্ধুত্বকে এক মুহূর্তে মিথ্যে বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার মনে হচ্ছিল, অয়ন নিজেও কোনও ভয়ংকর সত্যির মধ্যে আটকে পড়েছে।

হঠাৎ মোবাইলে একটি বার্তা এল।

প্রেরকের নাম নেই।

বার্তায় লেখা—

‘সময়ঘরে ফিরে যাও। কিন্তু একা নয়।’

নীলা সঙ্গে সঙ্গে লিখল, ‘কে আপনি?’

উত্তর এল—

‘যাকে তুই এতক্ষণ ধরে খুঁজছিস।’

পরের বার্তায় একটি ছবি।

ছবিটি দেখে নীলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

একটি পুরোনো ঘর। দেওয়ালে কাঠের তাক। জানালার পাশে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। সাদা চুল, কাঁধে ধূসর চাদর, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

হরিহর সেন।

নীলার দাদু।

ছবির নিচে লেখা—

‘সময় শেষ হওয়ার আগে আমাকে খুঁজে নে।’


১. যে মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছিল

নীলা প্রথমে ছবিটা অয়নকে পাঠাতে চাইল। তারপর থেমে গেল। অয়নের সঙ্গে যোগাযোগের আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে, সে কাকে বিশ্বাস করতে পারে।

দাদুর মৃত্যুর স্মৃতি তার কাছে স্পষ্ট ছিল না। ছোটবেলায় তাকে বলা হয়েছিল, হরিহর সেন অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। শেষকৃত্যের দিন তাকে দূরে রাখা হয়েছিল। পরিবারের বড়রা বলেছিলেন, ছোটদের মৃতদেহ দেখা উচিত নয়।

কিন্তু সে কি সত্যিই দাদুর শেষকৃত্য দেখেছিল?

না।

তার মনে পড়ল, সেদিন বাড়ির এক কোণে বসে সে কাঁদছিল। মা তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিলেন। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে সবাই বলেছিল, দাদু আর ফিরবেন না।

কিন্তু কোনও মৃতদেহ না দেখেই সে কীভাবে নিশ্চিত হয়েছিল যে দাদু মারা গেছেন?

নীলা ‘সময়ঘর’-এর দিকে হাঁটা বাড়াল।

দোকানের সামনে পৌঁছে সে দেখল, শাটারের নিচ দিয়ে সরু আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে। অথচ যাওয়ার সময় সে নিজেই দোকানের আলো নিভিয়ে এসেছিল।

পিতলের চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা হাওয়া তার মুখে এসে লাগল।

দোকানের সব ঘড়ি বন্ধ।

শুধু কাউন্টারের ওপর রাখা ছোট্ট পকেট ঘড়িটা টিকটিক করছে।

নীলা ঘড়িটা হাতে নিল। কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে উল্টো দিকে।

বারোটা সতেরো থেকে বারোটা ষোলো।

তারপর বারোটা পনেরো।

এক মিনিট করে পিছিয়ে যাচ্ছে সময়।

ঘড়ির পেছনে ছোট্ট একটি চিহ্ন দেখতে পেল সে। দুটি বৃত্তের মাঝখানে একটি সরু রেখা—ঠিক যেন দুটো ঘড়ি একে অপরের প্রতিবিম্ব।

দাদুর চিঠির কথা মনে পড়ল।

প্রথম ঘড়ি অতীত দেখাবে। দ্বিতীয় ঘড়ি দেখাবে, অতীত থেকে কে ফিরে এসেছে।

নীলা দোকানের প্রতিটি ঘড়ি পরীক্ষা করতে শুরু করল। দেওয়ালের ঘড়ি, টেবিল ঘড়ি, পকেট ঘড়ি, এমনকি ভাঙা অ্যালার্ম ঘড়িও। কোথাও দ্বিতীয় ঘড়ির সন্ধান নেই।

শেষে তার চোখ পড়ল দোকানের পিছনের দেওয়ালে ঝোলানো একটি বড় কাঠের ফ্রেমের দিকে। সেখানে দাদুর পুরোনো ছবি। ছবির পেছনে দেওয়ালের কাঠে অস্বাভাবিক একটি দাগ।

ফ্রেমটি নামাতেই দেখা গেল, তার পিছনে ছোট্ট একটি গোলাকার গর্ত।

নীলা হাত ঢুকিয়ে একটি লোহার চাকা অনুভব করল। চাকাটা ঘোরাতেই দেওয়ালের একটা অংশ সরে গেল।

ভেতরে সরু সিঁড়ি।

সিঁড়ির শেষ মাথায় ছোট্ট একটি ঘর।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কালো কাঠের তৈরি বিশাল এক ঘড়ি। তার কাচের ভেতরে সোনালি কাঁটা, নিচে রুপোর পেন্ডুলাম। ঘড়িটির গায়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র চিহ্ন খোদাই করা।

সবচেয়ে ওপরে লেখা—

‘দ্বিতীয় সময়।’

নীলা ধীরে ধীরে ঘড়িটির কাছে গেল।

কাঁটা চলছে না।

কিন্তু পেন্ডুলাম দুলছে।

ডান দিকে।

বাঁ দিকে।

ডান দিকে।

বাঁ দিকে।

প্রতিটি দোলের সঙ্গে ঘরের তাপমাত্রা যেন কমে যাচ্ছে।

ঘড়ির নিচে একটি ছোট্ট ড্রয়ার। ড্রয়ার খুলতেই পাওয়া গেল তিনটি জিনিস—একটি পুরোনো চাবি, একটি সাদা খাম এবং একটি শিশুর আঁকা ছবি।

ছবিতে চারজন মানুষ হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন পুরুষ, একজন মহিলা, আর দুটো ছোট্ট মেয়ে।

ছবির ওপরে কাঁপা হাতে লেখা—

‘আমাদের পরিবার—অরিন্দম, সুদেষ্ণা, নীলা ও মীরা।’

ছবির নীচে আরও একটি বাক্য।

‘যে দিন আমরা আলাদা হলাম, সেই দিনই সময় থেমে গেল।’

নীলা খাম খুলল।

ভেতরে একটি চিঠি।

‘নীলা,

যদি তুই এই ঘর খুঁজে পেয়ে থাকিস, তাহলে বুঝব, আমার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। তারা আবার সময়ের দরজা খোলার চেষ্টা করছে।

তোর বাবা কোনও সাধারণ ঘড়ি মেরামত করতেন না। তিনি এমন একটি যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করছিলেন, যার সাহায্যে কোনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত স্মৃতির চিহ্ন পুনরায় দেখা সম্ভব। এটি সময়কে বদলাতে পারে না, মৃতকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু মানুষ নিজের স্মৃতির যে অংশ ভুলে যায়, তার কিছু চিহ্ন এতে ধরা পড়তে পারে।

তোর বাবা বুঝেছিলেন, এই যন্ত্র ভুল মানুষের হাতে পড়লে স্মৃতি বদলে দেওয়ার ভান করে মানুষকে প্রতারণা করা সম্ভব। তাই তিনি যন্ত্রটি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু কেউ একজন তাঁকে থামিয়ে দেয়।

সেই রাতে আমি সেখানে ছিলাম। আমি সব দেখেছিলাম। তোর বাবাকে বাঁচাতে পারিনি।

তারপর থেকে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। কারণ যারা তোর বাবাকে সরিয়ে দিয়েছিল, তারা জানে আমি এখনও সত্যিটা জানি।

তুই যদি আমাকে খুঁজতে আসিস, মনে রাখবি—দ্বিতীয় ঘড়ি তোকে সত্যি দেখাবে না। এটি তোকে দেখাবে, তোর স্মৃতিতে কী লুকিয়ে আছে। সেই দৃশ্য সত্যি কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব তোর।

আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর মা যে মানুষটিকে অয়ন বলে চিনেছে, তার সঙ্গে অয়নের কোনও সম্পর্ক নেই। সে অয়নের মুখোশ পরে আছে।

আমি কোথায় আছি, তার ঠিকানা এই চিঠিতে লিখলাম না। কারণ চিঠি পড়ার আগেই যদি তারা তোকে অনুসরণ করে, তাহলে আমার অবস্থান জেনে যাবে।

শুধু একটা সূত্র দিলাম।

কলকাতার যে পুরোনো ঘড়িঘরে কোনও ঘণ্টা বাজে না, সেখানেই আমি অপেক্ষা করছি।

— তোর দাদু।’

চিঠিটা পড়ে নীলার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

অয়নের মুখোশ পরে থাকা মানুষ!

তাহলে হাসপাতালে যে অয়ন এসেছিল, সে কি সত্যিই অয়ন ছিল?

মা কেন তাকে দেখে ভয় পেয়েছিলেন, তার উত্তর এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

কিন্তু আসল অয়ন কোথায়?

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির দিকে তাকাল।

হঠাৎ ঘড়ির ভেতরে একটি ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।

কাচের ওপর ভেসে উঠল একটি দৃশ্য।

একটি গাড়ি।

প্রচণ্ড বৃষ্টি।

সামনের আসনে অরিন্দম সেন।

পিছনের আসনে দুটি শিশু।

আর গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি।

নীলা চোখ বড় করে তাকাল।

লোকটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার ডান হাতে রুপোর মাথাওয়ালা একটি লাঠি।

ঠিক সেই লাঠি, যা নিয়ে অচেনা লোকটি বেসমেন্টে এসেছিল।

দৃশ্যের মধ্যে অরিন্দম গাড়ি থেকে নেমে লোকটির দিকে এগিয়ে গেলেন।

লোকটি বলল, “যন্ত্রটা দিয়ে দাও।”

অরিন্দম উত্তর দিলেন, “তোমাকে এটা দেব না।”

“তাহলে তোমার মেয়েদের বাঁচাতে পারবে না।”

অরিন্দম পিছনের আসনের দিকে তাকালেন।

তারপর বললেন, “ওদের কিছু হলে আমি তোমাকে ছাড়ব না।”

লোকটি হাসল।

“তুমি তো জানো, সময়ের কাছে কেউ কাউকে বাঁচাতে পারে না।”

হঠাৎ দৃশ্যের মধ্যে প্রচণ্ড আলো।

একটি ধাক্কা।

গাড়ি রাস্তার পাশে উল্টে গেল।

দুটি শিশুর চিৎকার।

তারপর সব অন্ধকার।

নীলা পিছিয়ে এল।

ঘড়ির কাচে আবার তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু এবার কাচের ওপর একটি নতুন বাক্য ফুটে উঠেছে—

‘তোমার বাবাকে হত্যা করা হয়নি। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

নীলা বুঝতে পারল না, এর অর্থ কী।

কাউকে সরিয়ে দেওয়া মানে কি তাকে বাঁচিয়ে কোথাও লুকিয়ে রাখা?

তাহলে বাবার মৃতদেহ কার ছিল?

আর কেন তাঁর মৃত্যুর শংসাপত্র তৈরি করা হয়েছিল?

ঠিক তখনই উপরের দোকানে দরজা খোলার শব্দ হলো।

কেউ একজন ভেতরে ঢুকেছে।

তারপর পরিচিত কণ্ঠ—

“নীলা! তুমি কোথায়?”

অয়ন।

নীলা সিঁড়ির দিকে এগোতেই দ্বিতীয় ঘড়ির পেন্ডুলাম হঠাৎ থেমে গেল।

তার কাচের ভেতর ভেসে উঠল একটি সতর্কবার্তা—

‘ওকে দরজা খুলতে দিও না।’


২. বন্ধুর মুখে অপরিচিত চোখ

নীলা সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।

উপর থেকে অয়নের কণ্ঠ আবার এল।

“নীলা, আমি জানি তুমি ভেতরে আছ। তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”

কণ্ঠটি অয়নেরই। তার কথা বলার ধরন, শব্দের শেষে সামান্য থেমে যাওয়া—সবকিছু পরিচিত। অথচ মায়ের সতর্কবাণী এবং দাদুর চিঠি তাকে থামিয়ে দিল।

সে মোবাইল বের করে অয়নের নম্বরে ফোন করল।

উপরে দাঁড়ানো মানুষটির পকেটে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বেজে উঠল।

নীলা নিঃশব্দে শুনল।

লোকটি ফোন ধরল।

“হ্যালো?”

নীলা নিজের ফোনের স্পিকার বন্ধ রেখে বলল, “অয়ন, তুমি কোথায়?”

উপরে দাঁড়ানো লোকটি উত্তর দিল, “তোমার ঠিক পিছনেই।”

নীলার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

সে তো সিঁড়ির নীচে একা!

ফোনের ওপাশ থেকে অন্য একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“নীলা, আমি আসল অয়ন। আমাকে শুনতে পাচ্ছ?”

নীলা স্তব্ধ।

একই সময়ে দুটি অয়ন।

একজন দোকানের ওপরতলায়।

অন্যজন ফোনের ওপাশে।

“অয়ন, তুমি কোথায়?”

“পুলিশ স্টেশনে। আমি তোমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে আটকে রাখা হয়েছে। কেউ আমার পরিচয় ব্যবহার করে তোমার কাছে যাচ্ছে।”

উপরের লোকটি এবার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এল।

“নীলা, ফোনটা রেখে বেরিয়ে এসো। যা দেখেছ, সব ব্যাখ্যা করে দেব।”

নীলা ফোনে ফিসফিস করে বলল, “তোমার কাকার নাম শশাঙ্ক রায়। তোমার বাবার নাম অনিরুদ্ধ রায়। তুমি কি সত্যিই আমাকে সব বলেছ?”

ওপাশে অয়ন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

“হ্যাঁ। কিন্তু আমার কাকা শুধু পরিবারের সদস্য নন। তিনি বহু বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন। পুলিশ তাঁকে মৃত বলেও ঘোষণা করেনি। আমি গতকাল তাঁর একটি ছবি পেয়েছি।”

“ছবিতে কী ছিল?”

“তিনি একজন লোকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লোকটির মুখ… তোমার বাবার মতো।”

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির দিকে তাকাল।

তার কাচে আবার দৃশ্য ভেসে উঠছে।

এবার দেখা গেল, একটি হাসপাতালের করিডর। এক ব্যক্তি শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন। মুখ স্পষ্ট নয়। পাশে দাঁড়িয়ে আরেকজন, হাতে রুপোর মাথাওয়ালা লাঠি।

তারপর শিশুটিকে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।

দরজায় লেখা—‘১৭’।

নীলা ফোনে বলল, “অয়ন, তুমি কি ঘর নম্বর সতেরো সম্পর্কে জানো?”

“জানি। সেখানে এক চিকিৎসক কাজ করতেন, দেবব্রত মুখার্জি। তিনি নিখোঁজ হওয়ার আগে আমার বাবাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।”

“চিঠিতে কী লেখা ছিল?”

“শুধু একটা লাইন—‘যে শিশুটিকে মৃত বলা হয়েছে, সে-ই আসল সাক্ষী।’”

নীলা চোখ বন্ধ করল।

মীরা বেঁচে আছে।

কিন্তু সে-ই কি একমাত্র সাক্ষী?

তাহলে নীলা নিজে কী দেখেছিল?

তার স্মৃতিতে যে গাড়ি দুর্ঘটনার দৃশ্য ফিরে এসেছে, সেটা কি বাস্তব স্মৃতি, নাকি দ্বিতীয় ঘড়ির দেখানো কোনও অসম্পূর্ণ ছবি?

উপরের লোকটির পায়ের শব্দ আরও কাছে আসছে।

নীলা তাড়াতাড়ি ফোনে বলল, “অয়ন, আমি এখন সময়ঘরের বেসমেন্টে। তুমি যদি সত্যিই আমাকে সাহায্য করতে চাও, তাহলে পুলিশের সঙ্গে এখানে এসো। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস কোরো না, যতক্ষণ না তার পরিচয় যাচাই করছ।”

“আমি আসছি। আর নীলা—”

“বলো।”

“তোমার বাবার পুরোনো কণ্ঠের একটি রেকর্ডিং পেয়েছি। তাতে তিনি বলেছেন, ‘নীলাকে সত্যিটা বলো না। সে জানে না, সে কোন শিশুটিকে বাঁচিয়েছে।’”

ফোন কেটে গেল।

নীলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

‘সে জানে না, সে কোন শিশুটিকে বাঁচিয়েছে।’

তার মানে কী?

সে কি মীরাকে বাঁচিয়েছিল?

নাকি অন্য কোনও শিশুকে?

উপর থেকে এবার একটি ধাতব শব্দ হলো। কেউ বেসমেন্টের দরজার হাতল ঘোরাচ্ছে।

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির পিছনে হাতড়ে একটি ছোট্ট সুইচ পেল। সুইচটি চাপতেই ঘড়ির নীচে একটি গোপন খোপ খুলে গেল।

তার মধ্যে রাখা ছিল একটি কালো ফিতা।

ফিতার সঙ্গে বাঁধা ছোট্ট কাগজে লেখা—

‘নীলা—বাঁ হাত। মীরা—ডান কাঁধ।’

নীলা নিজের বাঁ হাতের কবজির দিকে তাকাল। কালো তিলটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

তারপর সে ডান কাঁধে হাত রাখল।

জামার ভিতরে, কাঁধের কাছে ছোট্ট একটি জন্মদাগ।

তাহলে তার শরীরে দুই শিশুর চিহ্নই রয়েছে!

এটা কীভাবে সম্ভব?

হঠাৎ তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় একবার মা বলেছিলেন, তার জন্মের পর দীর্ঘদিন চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। সে ভেবেছিল, সেটা সাধারণ অসুস্থতার কারণে।

কিন্তু যদি তার শরীরে দুই শিশুর পরিচয়চিহ্নই থাকে, তাহলে কি তার পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল? নাকি কেউ ইচ্ছা করে তার স্মৃতির সঙ্গে খেলা করেছে?

দরজার বাইরে থেকে কণ্ঠ এল—

“নীলা, দরজা খোলো। তোমার দাদু অপেক্ষা করছেন।”

নীলা শিউরে উঠল।

দাদু?

লোকটি কি জানে দাদু বেঁচে আছেন?

“তুমি কে?” নীলা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল।

“আমি সেই মানুষ, যে তোমার বাবাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল।”

“তাহলে তুমি তাঁকে কোথায় রেখেছ?”

উত্তর এল না।

কয়েক সেকেন্ড পরে লোকটি বলল, “তোর বাবা বেঁচে আছে, নীলা। কিন্তু তিনি আর আগের মানুষটি নন।”

নীলার চোখে জল এসে গেল।

“আমি বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

“তাহলে ঘড়ির কাঁটা বারোটা সতেরো মিনিটে পৌঁছনোর আগে দ্বিতীয় সময়ের দরজা খুলে দে।”

“দাদু তো বলেছেন, ওই সময়ে কোনও দরজা খোলা যাবে না!”

বাইরের লোকটি হেসে উঠল।

“তোর দাদু তোকে বাঁচাতে চান। আমি চাই, তুই সত্যিটা জানিস।”

“সত্যি জানার জন্য দরজা খুলতেই হবে কেন?”

“কারণ তোর বাবা দরজার ওপারে আটকে আছে।”

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির দিকে তাকাল।

কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

রাত এগারোটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট।

আর মাত্র বাইশ মিনিট।


৩. যে দরজা খোলা উচিত নয়

নীলা বুঝতে পারছিল না, কাকে বিশ্বাস করবে।

দাদু বলেছেন, দরজা খোলা যাবে না।

মীরা বলেছে, বারোটা সতেরো মিনিটে কেউ ডাকলেও দরজা খোলা যাবে না।

কিন্তু বাইরে দাঁড়ানো লোকটি বলছে, তার বাবা দরজার ওপারে আটকে আছেন।

সে যদি সত্যিই অরিন্দম সেনকে বাঁচিয়ে রাখে, তবে এই সুযোগ হারালে হয়তো আর কখনও বাবাকে খুঁজে পাবে না।

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির নিচে রাখা পিতলের চাবিটা হাতে নিল।

চাবির গায়ে খোদাই করা—‘১৮’।

ঘড়ির পিছনের দেওয়ালে আঠারোটি ছোট্ট বৃত্ত। প্রতিটি বৃত্তের মধ্যে আলাদা আলাদা সংখ্যা। প্রথম সতেরোটি বৃত্তে সংখ্যা স্পষ্ট, কিন্তু আঠারো নম্বর বৃত্তটি কালো রঙে ঢাকা।

নীলা চাবিটা সেখানে ঢোকাল।

ঘড়ির ভিতর থেকে ভারী শব্দ হলো।

কাচের ওপরে একটি বাক্য ফুটে উঠল—

‘যে নিজের পরিচয় জানে না, সে দরজার ওপারে কী আছে তা দেখতে পাবে না।’

নীলা ধীরে বলল, “আমি নীলাঞ্জনা সেন। অরিন্দম সেন ও সুদেষ্ণা সেনের মেয়ে।”

ঘড়ির কাঁটা নড়ল না।

সে আবার বলল, “আমি মীরা সেনের যমজ বোন।”

এবার পেন্ডুলাম দ্রুত দুলতে শুরু করল।

ঘড়ির কাচে আলো জ্বলে উঠল। ভেতরে একটি ছোট্ট দরজার ছবি ফুটে উঠল।

দরজার ওপারে একটি ঘর।

ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ার।

চেয়ারে বসে আছেন একজন পুরুষ।

তার মুখ নীলার দিকে।

অরিন্দম সেন।

নীলা কেঁদে ফেলল।

“বাবা!”

লোকটি মাথা তুললেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি, মুখে দাড়ি, চুলে পাক। কিন্তু মুখটি বাবারই।

তিনি যেন কাচের ওপার থেকে নীলাকে দেখতে পাচ্ছেন।

“নীলা?” তাঁর ঠোঁট নড়ল।

নীলা ঘড়ির দিকে ঝুঁকে পড়ল।

“বাবা, তুমি কোথায়? তোমাকে কীভাবে বের করব?”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

তারপর হাত তুলে কাচের দিকে দেখালেন।

সেখানে ধীরে ধীরে কয়েকটি শব্দ ফুটে উঠল—

‘দরজা খুলো না।’

নীলা পিছিয়ে এল।

বাইরের লোকটি এবার প্রচণ্ড জোরে দরজায় আঘাত করল।

“খোল! এখনই খোল!”

ঘড়ির ভেতরে অরিন্দম আবার হাত তুললেন। এবার তিনি আঙুল দিয়ে একটি সংখ্যা দেখালেন।

সতেরো।

তারপর নিজের বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

তারপর মাথা নাড়লেন।

নীলা বুঝতে পারল না।

হঠাৎ ঘড়ির কাচে অন্য একটি মুখ ভেসে উঠল।

মীরার মুখ।

সে কাঁদছে।

তার ঠোঁট নড়ছে—‘দিদি, মনে করো!’

নীলার মাথার মধ্যে অসংখ্য ছবি ঝড়ের মতো ছুটে এল।

বৃষ্টির রাত।

গাড়ির ভেতরে দুটো শিশু।

বাবা বলছেন, “নীলা, মীরার হাত ধর!”

তারপর গাড়ির বাইরে একজন লোক।

একটি ধাতব যন্ত্র।

বাবা সেই যন্ত্রটি লুকিয়ে ফেলছেন।

আর নীলা—সে কাঁদছে, কিন্তু তার হাতে রয়েছে মীরার হাত নয়, অন্য একটি শিশুর হাত।

সেই শিশুটির মুখ সে কখনও দেখেনি।

তারপর বিস্ফোরণের মতো শব্দ।

অন্ধকার।

নীলা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“আমি… আমি কাকে বাঁচিয়েছিলাম?”

দ্বিতীয় ঘড়ি থেকে একটি ক্ষীণ শব্দ এল।

টিক।

তারপর টিক।

তারপর—

ঢং!

রাত বারোটা বেজে গেল।

আর সতেরো মিনিট বাকি।

দরজার বাইরে দাঁড়ানো লোকটি হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।

“নীলা,” সে নরম গলায় বলল, “আমি জানি, তুই সব মনে করতে পারছিস না। তোর দাদু তোর স্মৃতি মুছে দিয়েছিলেন। কিন্তু তোর বাবা সেটা করতে চাননি। তিনি তোকে সত্যিটা জানাতে চেয়েছিলেন।”

নীলা কোনও উত্তর দিল না।

“দরজা খুলে দে। আমি তোকে তোর বাবার কাছে নিয়ে যাব।”

“তুমি কে?”

“আমি তোর বাবার ভাই।”

নীলা চমকে উঠল।

অরিন্দম সেনের ভাই?

সে কখনও কোনও কাকার কথা শোনেনি।

লোকটি বলল, “আমার নাম অমিতাভ সেন। তোর বাবা আমাকে বিশ্বাস করত। কিন্তু তোর দাদু আমাদের আলাদা করে দিয়েছিলেন।”

নীলার মাথার মধ্যে নতুন প্রশ্নের ঝড় উঠল।

যদি অমিতাভ সেন সত্যিই তার বাবার ভাই হন, তাহলে তাঁর অস্তিত্ব এত বছর গোপন রাখা হলো কেন?

আর যদি তিনি মিথ্যে বলেন, তবে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে পারবেন কীভাবে?

নীলা দরজার কাছে গেল না।

“আপনার কাছে প্রমাণ আছে?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর দরজার নিচ দিয়ে একটি পুরোনো ছবি ঠেলে দিল।

নীলা ছবিটা তুলে নিল।

ছবিতে দুই যুবক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজন অরিন্দম সেন। অন্যজনের মুখ অচেনা, কিন্তু চোখ ও চোয়ালের গঠন অরিন্দমের মতোই।

ছবির পেছনে লেখা—

‘অরিন্দম ও অমিতাভ, ১৯৯৮।’

নীলার হাত কাঁপতে লাগল।

এটা সত্যিও হতে পারে।

আবার সাজানো ছবিও হতে পারে।

দ্বিতীয় ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে।

বারোটা আট মিনিট।

বারোটা নয়।

বারোটা দশ।

বাইরের লোকটি এবার বলল, “আর সময় নেই। দরজা না খুললে তোর বাবাকে চিরদিনের জন্য হারাবি।”

ঘড়ির কাচে অরিন্দমের মুখ দেখা গেল। তিনি মরিয়া হয়ে মাথা নাড়ছেন।

‘না।’

নীলা পিছিয়ে গেল।

তারপর নিজের ফোন বের করে অয়নকে কল করল।

“আমি তোমার সাহায্য চাই,” সে বলল।

অয়নের কণ্ঠ ভেসে এল, “আমি সময়ঘরের বাইরে পৌঁছে গেছি। সঙ্গে দুজন পুলিশকর্মী আছে। দরজা খুলবে না।”

“তুমি কি আসল অয়ন?”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অয়ন বলল, “তুমি আমার ডান হাতের কবজিতে কী আছে জানো?”

নীলা মনে করার চেষ্টা করল। ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে অয়নের হাতে কাচ ঢুকে গিয়েছিল। তার ডান কবজিতে ছোট্ট সাদা দাগ রয়েছে।

“একটা সাদা দাগ।”

“ঠিক। আর তোমার বাবার দুর্ঘটনার ফাইলের শেষ পাতায় কী লেখা আছে?”

“সাক্ষী শশাঙ্ক রায়।”

“ভুল। শেষ পাতায় একটি নাম মুছে ফেলা হয়েছে। তুমি সেটা এখনও জানো না। কারণ আমি তোমাকে বলিনি।”

নীলা চুপ করে গেল।

অয়ন বলল, “ওই নামটা আমার বাবার। অনিরুদ্ধ রায়। আমার বাবা দুর্ঘটনার রাতে গাড়িতে ছিলেন না। তিনি পরে হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বাক্ষর দিয়ে যে বিবৃতি জমা হয়েছিল, সেটা তিনি কখনও দেননি।”

নীলার চোখের সামনে সবকিছু স্পষ্ট হতে শুরু করল।

“তাহলে তোমার বাবার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। আর সেটা করেছিলেন এমন একজন, যিনি আমার বাবার হাতের লেখা হুবহু নকল করতে পারতেন।”

“কে?”

অয়ন উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।

“অয়ন, ফোনটা রাখো।”

নীলা জমে গেল।

কারণ বাইরে দাঁড়ানো লোকটির কণ্ঠ আর ফোনের ওপাশে থাকা অয়নের কণ্ঠ একসঙ্গে শোনা যাচ্ছে।

দুজনেই একই কথা বলল।

“দরজা খোলো।”

নীলা ফোনটা নামিয়ে নিল।

তার সামনে দ্বিতীয় ঘড়ির কাঁটা বারোটা ষোলো মিনিটে পৌঁছেছে।

আর ঠিক তখনই দোকানের সব ঘড়ি একসঙ্গে বেজে উঠল।

ঢং!

ঢং!

ঢং!

ঘরের দেওয়াল কেঁপে উঠল। দ্বিতীয় ঘড়ির কাচে ফাটল ধরল। পেন্ডুলাম থেমে গেল।

তারপর ঘড়ির ভেতরের ছোট্ট দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।

কিন্তু দরজার ওপারে কোনও ঘর নেই।

শুধু অন্ধকার।

সেই অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি শিশুর কণ্ঠ ভেসে এল—

“দিদি, এবার আমাকে বেছে নাও।”

নীলা চিৎকার করে উঠল।

কারণ সে বুঝতে পারল, এই কণ্ঠ মীরার নয়।

এটি সেই অচেনা শিশুটির কণ্ঠ, যার হাত সে দুর্ঘটনার রাতে ধরে রেখেছিল।

দরজার বাইরে থেকে অমিতাভ সেন চিৎকার করল—

“দরজা বন্ধ কর! ওটা তোর বাবা নয়!”

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

ঘড়ির কাঁটা বারোটা সতেরো মিনিটে পৌঁছে গেল।

দ্বিতীয় সময়ের দরজা পুরোপুরি খুলে গেল।

অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে এল।

নীলার দিকে বাড়ানো সেই হাতের কবজিতে বাঁধা নীল ফিতে।

আর হাতটির মালিক যখন ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল, নীলা দেখল—

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেই।

একই মুখ।

একই চোখ।

একই জন্মদাগ।

শুধু সেই মেয়েটির ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি।

সে নীলার দিকে তাকিয়ে বলল—

“এত বছর পরে দেখা হলো, নীলাঞ্জনা। এবার বলো, আমাদের মধ্যে কে সত্যি?”

তারপর একসঙ্গে সমস্ত ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল।

নীলা চোখ বন্ধ করল।

একটি বিস্ফোরণের শব্দ।

একটি শিশুর কান্না।

আর অন্ধকার।


৪. শেষ সত্যি

যখন নীলার জ্ঞান ফিরল, তখন ভোর হয়ে গেছে।

সে শুয়ে আছে সময়ঘরের মেঝেতে। দ্বিতীয় ঘড়ির কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। পেন্ডুলাম স্থির। দরজার ওপারে সেই অন্ধকার আর নেই।

দোকানের উপরের অংশে মানুষের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।

“নীলা!”

অয়ন ছুটে এসে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

“তুমি ঠিক আছ?”

নীলা উঠে বসার চেষ্টা করল। মাথা ঘুরছে। গলায় কথা আটকে যাচ্ছে।

“দরজা… দরজাটা কোথায়?”

অয়ন চারদিকে তাকাল।

“কোন দরজা?”

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির দিকে আঙুল দেখাল।

“ওই দরজা। আমি নিজের মতো দেখতে একজনকে দেখেছি।”

অয়ন তার হাত ধরল।

“তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে। আমরা তোমাকে এখানে পেয়েছি। আর কেউ ছিল না।”

“অমিতাভ সেন?”

“কেউ নেই। দোকানের বাইরে শুধু একটা ভাঙা লাঠি পড়ে ছিল।”

নীলা ব্যাগের কথা মনে করল। রেকর্ডার, পরিচয়-ফিতে, দাদুর চিঠি—সব রয়েছে কি না দেখতে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল।

ব্যাগে শুধু একটি জিনিস।

একটি পুরোনো ছবি।

ছবিতে নীলা, মীরা, সুদেষ্ণা এবং অরিন্দম দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে হরিহর সেন।

কিন্তু ছবির ডান দিকে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

অমিতাভ সেন।

ছবির পেছনে লেখা—

‘আমাদের পরিবারের শেষ দিন—১৮ অক্টোবর, ২০১১।’

নীলা ছবিটা অয়নের হাতে দিল।

“এবার বলো, এটা কী?”

অয়ন ছবিটা দেখে চুপ করে গেল।

“আমি এই মানুষটিকে চিনি,” সে বলল।

“কে?”

“আমার বাবা।”

নীলা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

“তোমার বাবা তো অনিরুদ্ধ রায়!”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“আমার বাবা আমাকে দত্তক নিয়েছিলেন। ছোটবেলায় বলেছিলেন, আমার জন্মদাতা বাবা-মা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। কিন্তু তিনি কখনও তাঁদের নাম বলেননি।”

“তাহলে অমিতাভ সেন তোমার জন্মদাতা বাবা?”

“হয়তো। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।”

“কী সমস্যা?”

অয়ন ছবির পেছনের লেখাটার দিকে তাকাল।

“এই ছবিটা তোলা হয়েছে ২০১১ সালে। অথচ আমার জন্মসনদে জন্মতারিখ ২০০৮।”

নীলা কোনও কথা বলতে পারল না।

অয়ন বলল, “যদি আমি অমিতাভ সেনের ছেলে হই, তাহলে আমার বয়স নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু আমার জন্মসনদে যে হাসপাতালের নাম লেখা আছে, সেই হাসপাতাল ২০০৯ সালে তৈরি হয়েছে।”

একটি দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।

তাদের দুজনের কাছেই এখন এমন সব প্রমাণ রয়েছে, যা পরস্পরের সঙ্গে মেলে না।

নীলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“আমাকে মীরাকে খুঁজে বের করতে হবে।”

অয়ন বলল, “আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

“কিন্তু তুমি আমাকে একটা কথা বলো, অয়ন। তুমি কি সত্যিই আমার বন্ধু?”

অয়ন তার দিকে তাকাল।

“আমি জানি না, আমার জন্মের সত্যি কী। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব মিথ্যে নয়।”

নীলা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে। এবার আমাদের প্রথম কাজ—মাকে সুস্থ করে তোলা। তারপর দাদুকে খুঁজে বের করা।”

“আর তোমার বাবা?”

নীলা দ্বিতীয় ঘড়ির ভাঙা কাচের দিকে তাকাল।

“আমি জানি না, তিনি বেঁচে আছেন কি না। কিন্তু আমি তাঁকে খুঁজব।”

ঠিক তখনই দোকানের সামনের দরজা খুলে গেল।

একজন নার্স দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “আপনাদের মধ্যে নীলাঞ্জনা সেন কে?”

নীলা এগিয়ে গেল।

“আমি।”

নার্সের হাতে একটি হাসপাতালের ফাইল।

“আপনার মায়ের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি আপনাকে দেখতে চাইছেন।”

নীলার চোখে জল এসে গেল।

“মা কথা বলতে পারছেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু উনি একটি অদ্ভুত কথা বলছেন। বারবার বলছেন, আপনার সঙ্গে আরেকজন মেয়ে আছে। আপনাদের দুজনকেই নাকি তিনি ছোটবেলায় একই নামে ডাকতেন।”

নীলা অয়নের দিকে তাকাল।

তারপর নার্সের হাত থেকে ফাইলটা নিল।

ফাইলের প্রথম পাতায় রোগীর নাম—সুদেষ্ণা সেন।

দ্বিতীয় পাতায় জরুরি যোগাযোগের নাম—নীলাঞ্জনা সেন।

তৃতীয় পাতায় একটি পুরোনো নথি সংযুক্ত করা হয়েছে।

সেখানে লেখা—

‘জরুরি যোগাযোগ: মীরা সেন।’

নীলা ফাইলটা বন্ধ করল।

মীরা বেঁচে আছে।

দাদু বেঁচে থাকতে পারেন।

তার বাবা হয়তো বেঁচে আছেন, হয়তো নেই।

কিন্তু একটি সত্যি সে বুঝে গেছে—সময়ঘরের ঘড়িগুলো কেবল সময় দেখানোর জন্য তৈরি হয়নি। এগুলো মানুষের স্মৃতি, পরিচয় আর অতীতের এমন সব দরজা খুলে দেয়, যেগুলো একবার খুললে আর সহজে বন্ধ করা যায় না।

হাসপাতালে যাওয়ার আগে নীলা শেষবারের মতো দ্বিতীয় ঘড়ির দিকে তাকাল।

ঘড়ির কাচ ভাঙা, কাঁটা থেমে আছে বারোটা সতেরো মিনিটে।

কিন্তু ভাঙা কাচের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটি বাক্য ফুটে উঠেছে।

‘প্রথম সত্যি জানা হয়েছে। দ্বিতীয় সত্যি তোমার জন্মের আগের।’

নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

হয়তো এই রহস্যের সব উত্তর সে কোনওদিন পাবে না। হয়তো তার পরিচয় নিয়ে আরও অনেক প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু সে আর ভয় পাবে না।

কারণ এবার সে জানে, মিথ্যে যত দীর্ঘই হোক, সত্যির খোঁজ থামিয়ে দেওয়া যায় না।

সে অয়নের সঙ্গে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।

সকালের আলো গলির ওপর পড়েছে। চায়ের দোকানে মানুষের ভিড়, রাস্তায় বাসের শব্দ, পাড়ার ছেলেদের ক্রিকেট খেলা—কলকাতা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছে।

কিন্তু সময়ঘরের ভিতরে, বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি ছোট্ট ঘড়ি নিজে থেকেই চলতে শুরু করল।

টিক।

টিক।

টিক।

তার কাঁটা বারোটা সতেরো মিনিট থেকে এগিয়ে গেল বারোটা আঠারোর দিকে।

আর ঘড়ির পিছনে খোদাই করা অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল—

‘মীরা নয়। নীলাও নয়। আসল নাম অন্য।’

তারপর ঘড়িটা আবার থেমে গেল।

নীলা তখন অনেক দূরে।

সে সেই লেখা দেখতে পেল না।

আর সেই কারণেই, তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের শেষ দরজাটি এখনও বন্ধ রয়ে গেল।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *