Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শ্মশানের শেষ ট্রেন (প্রথম পর্ব: যে ট্রেনের যাত্রী মৃতেরা)।

রাত তখন ১টা ১৩ মিনিট।

শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। দিনের বেলায় যেখানে মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না, সেখানে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকজন যাত্রী, দু-একজন ঘুমন্ত ভবঘুরে আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চায়ের দোকানের বৃদ্ধ মালিক।

স্টেশনের ঘড়িতে মিনিটের কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে।

ঠিক তখনই মাইকে একটি ঘোষণা ভেসে এল।

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, প্ল্যাটফর্ম নম্বর সাত থেকে রাত ১টা ১৭ মিনিটে ছেড়ে যাবে শেষ ট্রেন। গন্তব্য—শ্মশানঘাট।”

ঘোষণাটি শুনে বেঞ্চে শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধ উঠে বসলেন।

তারপর চারদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “আবার শুরু হলো!”

চায়ের দোকানের মালিকও কথাটা শুনেছিলেন। তিনি তাড়াতাড়ি দোকানের শাটার নামাতে শুরু করলেন।

প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণী অবশ্য কোনও ভয় পেল না। তার নাম ঈশিতা মুখার্জি। বয়স ছাব্বিশ। পেশায় সাংবাদিক। হাতে ক্যামেরা, কাঁধে ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি।

গত তিন মাস ধরে কলকাতার বিভিন্ন পুরোনো রেলস্টেশনে অদ্ভুত কিছু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে সে অনুসন্ধান করছিল। নিখোঁজ হওয়া মানুষদের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল ছিল—প্রত্যেকেই শেষবার ফোনে কাউকে বলেছিলেন, তাঁরা একটি বিশেষ ট্রেনে উঠতে যাচ্ছেন।

সেই ট্রেনের কোনও সময়সূচি নেই।

কোনও সরকারি নথি নেই।

কোনও চালক বা গার্ডের নাম নেই।

তবু প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, রাত ১টা ১৭ মিনিটে কালো রঙের একটি ট্রেন এসে দাঁড়ায় প্ল্যাটফর্মে। জানালার কাচ কালো, দরজার পাশে সাদা অক্ষরে লেখা—‘শেষ যাত্রা’।

আর ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর যাত্রীদের আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায় না।

ঈশিতা এই গল্প বিশ্বাস করেনি।

কিন্তু আজ তার নিজের ফোনে একটি বার্তা এসেছে।

‘আপনার বাবা এখনও অপেক্ষা করছেন। রাত ১টা ১৭ মিনিটে প্ল্যাটফর্ম সাত।’

বার্তাটি পাঠানো হয়েছে এমন একটি নম্বর থেকে, যা পনেরো বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তার বাবার নম্বর।

অরুণাভ মুখার্জি।

যিনি পনেরো বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন।

ঈশিতা তখন মাত্র এগারো বছরের মেয়ে। বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ অনেক খোঁজ করেছিল, কিন্তু কোনও সূত্র পায়নি। বাড়ির লোকেরা ধরে নিয়েছিল, তিনি আর ফিরবেন না। মা কখনও বাবার কথা বলতে চাইতেন না। শুধু প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর রাতে জানালার পাশে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতেন।

ঈশিতা জানত না, কেন সেই দিনটি এত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বার্তাটি পাওয়ার পর সে আর বাড়িতে থাকতে পারেনি।

এখন প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে ১টা ১৫ মিনিট।

তার মোবাইলে আবার বার্তা এল।

‘এবারও যদি দেরি করো, তোমার বাবাকে আর দেখতে পাবে না।’

ঈশিতার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে দ্রুত চারদিকে তাকাল।

প্ল্যাটফর্মে অন্য কেউ যেন নেই। কয়েক মিনিট আগেও যে বৃদ্ধটি বেঞ্চে বসেছিলেন, তিনিও উধাও।

শুধু দূরের অন্ধকারে একটা হলুদ আলো জ্বলছে।

তারপর শোনা গেল ট্রেনের হুইসেল।

দূর থেকে কালো রঙের একটি ট্রেন এগিয়ে আসছে। কোনও ইঞ্জিনের শব্দ নেই, চাকার ঘর্ষণ নেই। তবু ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল।

দরজা খুলে গেল।

ভেতরে বসে থাকা যাত্রীদের দেখে ঈশিতা শিউরে উঠল।

কেউ মাথা নিচু করে বসে আছে। কারও মুখ জানালার দিকে। একজন বৃদ্ধের কোলে সাদা কাপড়ে মোড়া কিছু একটা। এক কোণে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটি বারবার জানালার কাচে আঙুল দিয়ে লিখছে—

‘ফিরে যাও।’

ঈশিতা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ট্রেনের ভেতর থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

“ঈশু?”

এই নামে তাকে শেষবার ডেকেছিলেন তার বাবা।

ঈশিতা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ। মুখে দাড়ি, চোখের নিচে গভীর কালি, গায়ে পুরোনো নীল শার্ট।

অরুণাভ মুখার্জি।

তার বাবা।

পনেরো বছর আগের সেই একই মুখ, যেন সময় তাঁকে একটুও স্পর্শ করেনি।

“বাবা!” ঈশিতা কেঁদে উঠল।

অরুণাভ হাত বাড়ালেন।

“এদিকে আয়, মা। অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

ঈশিতা এক পা এগোল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে কেউ তার হাত শক্ত করে ধরে টেনে সরিয়ে দিল।

“ওই ট্রেনে উঠবেন না!”

ঈশিতা ঘুরে তাকাল।

একজন পুলিশ অফিসার। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে আতঙ্ক, কপালে ঘাম।

“আপনি কে?” ঈশিতা চিৎকার করল। “আমার বাবাকে ছাড়ুন!”

পুলিশ অফিসার তার হাত আরও শক্ত করে ধরলেন।

“আপনার বাবা পনেরো বছর আগে মারা গেছেন।”

“মিথ্যে! উনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে!”

অফিসার ট্রেনের দিকে তাকালেন।

তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “ওটা আপনার বাবা নয়।”

ঈশিতা আবার দরজার দিকে তাকাল।

অরুণাভ তখনও হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

কিন্তু এবার তাঁর মুখে হাসি নেই।

চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। ঠোঁট নড়ছে, অথচ কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না।

তারপর ট্রেনের জানালায় বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটি হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

সে কাচের ওপর হাত রেখে চিৎকার করল—

“দিদি, আমাকে বাঁচাও!”

ঈশিতা স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার কোনও বোন নেই।

অন্তত সে এতদিন তাই জানত।

কিন্তু মেয়েটির মুখ দেখে তার মনে হলো, সে এই মুখ আগে কোথাও দেখেছে।

নিজের ছোটবেলার কোনও ছবিতে?

নাকি এমন কোনও স্বপ্নে, যার কথা সকালে উঠলে আর মনে থাকে না?

পুলিশ অফিসার ঈশিতাকে টেনে প্ল্যাটফর্মের অন্য দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন।

“চলুন। ট্রেন ছাড়ার আগে এখান থেকে যেতে হবে।”

ঈশিতা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।

“আমাকে ছাড়ুন! আমার বাবা ওই ট্রেনে!”

অফিসার এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার বাবাকে যদি সত্যিই খুঁজতে চান, তাহলে ট্রেনে উঠবেন না। কারণ ওই ট্রেন একবার কাউকে নিয়ে গেলে, তার স্মৃতিও সঙ্গে নিয়ে যায়।”

“আপনি কী জানেন?”

“আমি জানি, এই ট্রেনে আমার স্ত্রী উঠেছিলেন।”

অফিসারের গলা কেঁপে উঠল।

“বিশ বছর আগে। তারপর থেকে আমি প্রতিদিন রাত ১টা ১৭ মিনিটে এখানে আসি। যদি কোনওদিন তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারি।”

ঈশিতা থমকে গেল।

“তাহলে আপনি আমাকে বাধা দিচ্ছেন কেন?”

অফিসার উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই ট্রেনের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল।

অরুণাভ মুখার্জি শেষবারের মতো ঈশিতার দিকে তাকালেন।

তাঁর ঠোঁট নড়ল।

এবার ঈশিতা স্পষ্ট শুনতে পেল—

“তোর মা-কে বিশ্বাস করিস না।”

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল তার শেষ কামরাটিও।

ঈশিতা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার বাবাকে সে নিজের চোখে দেখেছে।

কিন্তু তিনি বললেন, মাকে বিশ্বাস না করতে।

কেন?

তার মা কি বাবার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য জানেন?

নাকি এই ট্রেনের সঙ্গে তাঁরও কোনও সম্পর্ক আছে?

পুলিশ অফিসার তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজের পরিচয় দিলেন।

“আমার নাম দেবাশিস রায়। রেল পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক।”

ঈশিতা চোখ মুছে বলল, “আপনি কীভাবে জানলেন, আমি আজ এখানে আসব?”

দেবাশিস পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে একটি রেলস্টেশন। প্ল্যাটফর্মের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণী, কোলে একটি শিশু। পাশে অরুণাভ মুখার্জি।

ছবির পেছনে লেখা—

‘১৮ অক্টোবর, ২০১১। শেষ যাত্রার প্রথম দিন।’

ঈশিতা ছবিটি হাতে নিয়ে দেখল।

কোলের শিশুটির মুখ তার নিজের মতো।

কিন্তু তরুণীটি তার মা নন।

ছবির মহিলার চোখ, নাক, মুখ—সবকিছু ঈশিতার মতো। যেন তারই আরেকটি সংস্করণ।

“এই মহিলাটি কে?” সে প্রশ্ন করল।

দেবাশিস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ওই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমি পনেরো বছর ধরে বেঁচে আছি।”

“আপনি কি তাঁকে চেনেন?”

“চিনি। তিনি আপনার জন্মদাত্রী মা।”

ঈশিতা উঠে দাঁড়াল।

“কী বললেন?”

“আপনাকে যিনি বড় করেছেন, তিনি আপনার মা নন।”

ঈশিতা ছবিটি মুঠোয় চেপে ধরল।

“এটা অসম্ভব!”

দেবাশিস শান্ত গলায় বললেন, “অসম্ভব বলে কিছু নেই, যখন মানুষ নিজের অতীত লুকিয়ে রাখে।”

“তাহলে আমার আসল মা কোথায়?”

দেবাশিস স্টেশনের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।

“শেষ ট্রেনে।”

ঈশিতা মাথা নাড়ল।

“না। আমি আমার বাবাকে দেখেছি। তিনি জীবিত।”

“হয়তো। কিন্তু ওই ট্রেনের যাত্রীরা জীবিত আর মৃতের মাঝখানে আটকে থাকে। তারা নিজেদের জীবনের শেষ মুহূর্ত বারবার দেখতে বাধ্য হয়।”

“কেন?”

“কারণ তাদের মধ্যে কেউ একজন সেই রাতের সত্যিটা বদলে দিয়েছিল।”

ঈশিতা কিছু বলতে পারল না।

দেবাশিস তার হাতে একটি চাবি দিলেন।

“এটা আপনার বাবার বাড়ির চাবি। তিনি নিখোঁজ হওয়ার আগে আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন।”

“আপনি এতদিন এটা লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?”

“কারণ আপনার বয়স যখন এগারো, তখন আপনার বাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আপনার মা আপনাকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। যাওয়ার আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আপনার স্মৃতি থেকে ওই রাতের ঘটনা মুছে দিতে হবে।”

“আমার স্মৃতি থেকে?”

“আপনি তখন অনেক কিছু দেখেছিলেন।”

ঈশিতা নিজের মাথায় হাত রাখল।

তার ছোটবেলার স্মৃতিতে একটি ঘর ভেসে উঠল। ঘরের মেঝেতে ভাঙা কাচ। জানালার বাইরে বৃষ্টি। মা কাঁদছেন। বাবা কাউকে বলছেন, “ট্রেনটা থামাতে হবে!”

তারপর একটি লাল আলো।

একটি চিৎকার।

আর তার নিজের কণ্ঠ—

“মা, দরজা খুলবে না!”

ঈশিতা চোখ বন্ধ করল।

স্মৃতিটা মিলিয়ে গেল।

দেবাশিস বললেন, “আপনি যদি সত্যিটা জানতে চান, তাহলে আজ রাতেই আপনার বাবার পুরোনো বাড়িতে যান। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন।”

“কী কথা?”

“রাত ১টা ১৭ মিনিটে যদি আবার সেই ট্রেনের হুইসেল শুনতে পান, জানালা খুলবেন না।”

ঈশিতা চাবিটা হাতে নিল।

“কেন?”

দেবাশিসের মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যা দেখে ঈশিতার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কারণ ট্রেনটা এবার শুধু আপনার বাবাকে নিতে আসবে না।”

তিনি একটু থামলেন।

“এবার ট্রেনটা আপনাকেও নিতে আসবে।”


২. বন্ধ বাড়ির ভিতরে

পরদিন সন্ধ্যায় ঈশিতা পৌঁছল উত্তর কলকাতার এক পুরোনো পাড়ায়।

বাড়িটি গলির একেবারে শেষ প্রান্তে। উঁচু লোহার গেট, ভাঙা বারান্দা, দেওয়ালে শ্যাওলা। বাড়ির সামনে একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়া গাছ। গেটের ওপর মরচে ধরা ফলকে লেখা—

‘মুখার্জি ভবন’

এই বাড়িতেই তার জন্ম হয়েছিল বলে মা একবার বলেছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছর বয়সের পর আর কখনও এখানে আসেনি সে।

চাবি দিয়ে গেট খুলতেই একটা দীর্ঘ কড়মড় শব্দ হলো।

বাড়ির ভেতরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ঈশিতার মনে হলো, কেউ যেন তাকে লক্ষ্য করছে।

বারান্দার এক কোণে একটি পুরোনো দোলনা। বাতাস না থাকা সত্ত্বেও দোলনাটি আস্তে আস্তে দুলছে।

ঘরের দরজা খুলতেই ধুলো আর পুরোনো কাঠের গন্ধ নাকে এল।

বসার ঘরে বাবার একটি বড় ছবি ঝুলছে। ছবিতে অরুণাভ হাসছেন। পাশে মা, আর মায়ের কোলে ছোট্ট ঈশিতা।

কিন্তু ছবির কাচের ওপর কালো কালি দিয়ে একটি মুখ মুছে দেওয়া হয়েছে।

ঈশিতা কাছে গিয়ে দেখল, মুখটি তার মায়ের।

কেউ ইচ্ছা করে মায়ের মুখ মুছে দিয়েছে।

ছবির নিচে রাখা টেবিলে একটি চিঠি।

খামের ওপর লেখা—‘ঈশিতার জন্য। যখন সে ফিরে আসবে।’

সে খাম খুলল।

‘ঈশিতা,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব, শেষ ট্রেন তোকে খুঁজে পেয়েছে।

তুই ছোটবেলায় যে ঘটনাটা দেখেছিলি, সেটা তোর মনে নেই। কিন্তু তুই সেই ঘটনার একমাত্র জীবিত সাক্ষী।

তোর জন্মের পর হাসপাতাল থেকে তোকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু সেই রাতেই আরেকটি শিশু আমাদের বাড়িতে আসে। সেই শিশুর নাম ছিল অনন্যা।

অনন্যা তোর যমজ বোন।

তোর মা জানতেন, তোদের দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে। কারণ ট্রেনটি প্রতি পনেরো বছরে একবার ফিরে আসে। আর যেদিন ট্রেন আসে, সেদিন যে পরিবার তার গোপন সত্যি লুকিয়ে রাখে, তাদের একজনকে ট্রেনের যাত্রী হতে হয়।

আমি এই নিয়ম বিশ্বাস করিনি।

তাই আমি ট্রেন থামানোর চেষ্টা করেছিলাম।

কিন্তু সেই রাতে আমি ব্যর্থ হই।

অনন্যা ট্রেনে উঠে যায়।

তুই বেঁচে থাকিস।

কিন্তু আমি জানি, এই কাহিনি এখানেই শেষ নয়। ট্রেন আবার ফিরবে। আর এবার ওরা তোকে খুঁজবে।

তুই যদি অনন্যাকে ফিরিয়ে আনতে চাস, তাহলে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করিস।

প্রথম প্রশ্ন: তোর জন্মের সময় হাসপাতালের রেজিস্টারে কার নাম ছিল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: তোর মা প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর রাতে কেন প্রদীপ জ্বালান?

তৃতীয় প্রশ্ন: যে ট্রেনে মৃতেরা যাত্রা করে, সেই ট্রেনের চালক কে?

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর পেলে তুই বুঝতে পারবি, কেন আমি এখনও ফিরে আসতে পারিনি।

মনে রাখিস, ঈশিতা—মৃত মানুষ সব সময় মৃত থাকে না। কখনও কখনও জীবিত মানুষই নিজের মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকে।

— তোর বাবা।’

চিঠি পড়ে ঈশিতার হাত কাঁপতে লাগল।

অনন্যা।

তার যমজ বোন।

যাকে সে কখনও দেখেনি, অথচ হয়তো নিজের শৈশবের প্রতিটি স্মৃতিতে যার ছায়া লুকিয়ে আছে।

সে ঘরের আলমারি খুলতে লাগল। পুরোনো কাপড়, বই, কিছু ছবি, কয়েকটি খাতা। একেবারে নিচের তাকে একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স।

বাক্সের ভিতরে দুটো রুপোর নূপুর।

একটির গায়ে খোদাই করা ‘ঈ’।

অন্যটির গায়ে ‘অ’।

তার পাশে একটি হাসপাতালের কাগজ।

‘জন্মের তারিখ: ১৮ অক্টোবর, ২০০০।’

রোগীর নামের জায়গায় লেখা—‘ঈশিতা ও অনন্যা মুখার্জি’।

কিন্তু কাগজের নিচে লাল কালিতে একটি মন্তব্য—

‘একটি শিশু মৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছে।’

ঈশিতা চেয়ারে বসে পড়ল।

যদি অনন্যা জন্মের সময়ই মারা যায়, তাহলে সে কীভাবে এগারো বছর বয়সে ট্রেনে উঠল?

আর যদি সে সত্যিই ট্রেনে উঠে থাকে, তাহলে হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর কথা লেখা হলো কেন?

হঠাৎ ঘরের ভিতর ফোন বেজে উঠল।

বাড়ির পুরোনো ল্যান্ডলাইন।

পনেরো বছর ধরে যার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কথা।

ঈশিতা ধীরে ধীরে ফোনের কাছে গেল।

রিসিভার তুলতেই একটি শিশুর কণ্ঠ শোনা গেল।

“দিদি?”

ঈশিতার গলা শুকিয়ে গেল।

“অনন্যা?”

“তুমি বাড়িতে এসেছ?”

“হ্যাঁ। তুমি কোথায়?”

“আমি তোমার ঘরে।”

ঈশিতা চারদিকে তাকাল।

“আমার ঘরে?”

“হ্যাঁ। জানালার পাশে। তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ না?”

ঈশিতা ঘুরে দাঁড়াল।

ঘরের জানালার পাশে একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা ফ্রক, পায়ে রুপোর নূপুর। তার মুখ ঈশিতার ছোটবেলার মুখের মতোই।

মেয়েটি হাসল।

“দিদি, এতদিন পরে তুমি এলে?”

ঈশিতা এগিয়ে যেতে গিয়েও থেমে গেল।

দেবাশিসের সতর্কবাণী মনে পড়ল—রাত ১টা ১৭ মিনিটে জানালা খুলবে না।

কিন্তু এখন তো সন্ধ্যা।

সে এক পা এগোল।

মেয়েটি হাত বাড়াল।

“চলো, তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”

“কোথায়?”

“যেখানে বাবা অপেক্ষা করছেন।”

ঈশিতা চোখের জল মুছে বলল, “তুমি কি সত্যিই আমার বোন?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, দিদি—তুমি যে ঈশিতা, সেটা সত্যি নয়।”

ঈশিতার বুকের মধ্যে যেন বজ্রপাত হলো।

“তাহলে আমি কে?”

মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বলল—

“তুমি সেই মেয়ে, যার জন্য শেষ ট্রেন প্রথমবার থেমে গিয়েছিল।”

তারপর ঘরের সব আলো নিভে গেল।

অন্ধকারে শুধু রুপোর নূপুরের শব্দ।

ঝুনঝুন।

ঝুনঝুন।

আর দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল।

রাত ১টা ১৭ মিনিট।

কিন্তু ঘড়িতে তখনও সন্ধ্যা সাতটা।

ঈশিতা বুঝতে পারল, এই বাড়িতে সময় আর স্বাভাবিক নিয়মে চলছে না।

তার সামনে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, সে হয়তো তার বোন।

আবার হয়তো সেই ট্রেনের প্রথম যাত্রী।

আর এই বাড়ির ভিতরে এমন এক সত্যি লুকিয়ে আছে, যা জানলে ঈশিতা নিজের নামটুকুও আর বিশ্বাস করতে পারবে না।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *