Categories
উপন্যাস বিবিধ

নীল খামের শেষ চিঠি (দ্বিতীয় পর্ব: শোভাবাজারের সেই অচেনা মানুষ)।

পরদিন বিকেল চারটে পঞ্চাশ।

শোভাবাজারের পুরোনো ঘাটে গঙ্গার জল ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা। মাঝেমধ্যে ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগছে। ঘাটের সিঁড়িতে বসে কয়েকজন বৃদ্ধ গল্প করছেন, দূরে দু-একটি নৌকা ভেসে যাচ্ছে। অথচ অনির্বাণের মনে হচ্ছে, এই পরিচিত কলকাতার মধ্যেই সে যেন অচেনা কোনো জগতে এসে দাঁড়িয়েছে।

তার হাতে মায়ের পাঠানো সাদা খামটি।

গত রাতে বাবার সঙ্গে দীর্ঘ কথা হয়েছে। অরুণাভ তাকে একা যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু অনির্বাণের মনে একটাই প্রশ্ন—মা যদি সত্যিই মারা গিয়ে থাকেন, তবে তাঁর নামে চিঠি পাঠাচ্ছে কে?

আর সৌম্যই বা কে?

তার জন্মের সঙ্গে এমন কী রহস্য জড়িয়ে আছে, যার কথা বাবা এত বছরেও বলতে পারেননি?

বিকেল পাঁচটা বাজতেই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।

“অনির্বাণ?”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরনে ধূসর পাঞ্জাবি, কাঁধে পুরোনো চামড়ার ব্যাগ। মুখে কয়েক দিনের না-কামানো দাড়ি। চোখ দুটো ক্লান্ত, অথচ সেই চোখের গভীরে এমন কিছু রয়েছে, যা অনির্বাণকে অস্বস্তিতে ফেলল।

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার মায়ের চোখ দুটো পেয়েছ।”

অনির্বাণের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“আপনি সৌম্য?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। আমিই সৌম্য।”

“আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?”

সৌম্য গঙ্গার দিকে তাকালেন।

“সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তোমাকে একটা কথা জানতে হবে। তোমার মা আমাকে কখনও ভুলে যাননি। কিন্তু তিনি তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।”

“কেন?”

“কারণ তিনি জানতেন, আমার জীবনে এমন কিছু ঘটেছিল, যার ছায়া তোমার ওপর পড়ুক, সেটা তিনি চাননি।”

অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে উঠল।

“সবাই শুধু রহস্যের কথা বলছে! কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলছে না। আমার মা মারা গেছেন বিশ বছর আগে। তাঁর নামে চিঠি আসছে। আমার বাবা জানেন না আমি কার সন্তান। আর আপনি বলছেন, আমার জীবনে এমন কিছু ঘটেছিল, যা আমি জানি না। আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। সব সত্যি বলুন।”

সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ঠিক আছে। তবে এখানে নয়। চলো, তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাই।”

“কোথায়?”

“যেখানে তোমার জন্মের প্রথম নথিটি তৈরি হয়েছিল।”


১. হারিয়ে যাওয়া হাসপাতাল

শোভাবাজার থেকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে তারা উত্তর কলকাতার একটি পুরোনো গলিতে পৌঁছল। গলির শেষ মাথায় একটি ভাঙাচোরা বাড়ি। বাড়িটির সামনে মরচে ধরা ফলকে লেখা—‘মাতৃসেবা সদন’। একসময় এটি ছিল ছোট একটি নার্সিংহোম। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।

অনির্বাণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে আমার জন্ম হয়েছিল?”

“না,” সৌম্য বললেন। “তোমার জন্ম হয়েছিল অন্য একটি হাসপাতালে। কিন্তু তোমার জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরে তোমার মা এখানে এসেছিলেন।”

“কেন?”

সৌম্য দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। অনির্বাণও তাঁর পিছু নিল।

ভেতরে ভাঙা চেয়ার, ছেঁড়া পর্দা, ধুলোমাখা আলমারি। এক কোণে পুরোনো রেজিস্টার রাখার কাঠের তাক। সৌম্য ব্যাগ থেকে একটি ছোট চাবি বের করে আলমারি খুললেন।

ভেতরে মোটা একটি রেজিস্টার।

তিনি নির্দিষ্ট একটি পাতা খুলে অনির্বাণের সামনে ধরলেন।

তারিখ—১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬।

রোগীর নাম—মধুমিতা মুখোপাধ্যায়।

আগমনের সময়—রাত ১১টা ৪০ মিনিট।

সঙ্গে আনা শিশু—একটি পুত্রসন্তান।

নথির পাশে হাতে লেখা একটি মন্তব্য—

“শিশুটির পরিচয় সংক্রান্ত নথি অসম্পূর্ণ। অভিভাবক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন স্থগিত।”

অনির্বাণের জন্ম ১৯৯৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।

তার মা তাকে নিয়ে রাতেই এই নার্সিংহোমে এসেছিলেন?

“এখানে কী হয়েছিল?” সে প্রশ্ন করল।

সৌম্য একটি চেয়ারে বসে পড়লেন।

“তোমার জন্মের সময় তোমার মা একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে আমি ছিলাম। কিন্তু আমরা বিবাহিত ছিলাম না। তোমার মা তখন আমার সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন—এমনটাই আমরা দুজনেই বিশ্বাস করতাম।”

অনির্বাণের মাথা ঘুরে উঠল।

“তাহলে আপনি আমার বাবা?”

“আমি জানি না।”

“আপনি আবার জানেন না!”

সৌম্য চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি তোমাকে মিথ্যে বলতে চাই না। সেই সময় তোমার মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। আমরা একসঙ্গে সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু তোমার জন্মের আগে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। আমি কয়েক মাসের জন্য কলকাতার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হই। ফিরে এসে জানতে পারি, মধুমিতার বিয়ে হয়ে গেছে। তার কোলে একটি শিশু। সে আমাকে জানায়, শিশুটির জীবনে আমার কোনো ভূমিকা নেই।”

“আপনি কি মাকে বিশ্বাস করেছিলেন?”

“না। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম। সে বলেছিল, তোমার বাবা অরুণাভ। আমি তখন রাগে, অভিমানে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে যাই। কিন্তু কয়েক মাস পরে একটি চিঠি পাই। তাতে মধুমিতা লিখেছিল, ‘অনির্বাণের জন্মের সত্যিটা একদিন জানতে হবে। কিন্তু এখন নয়।’”

“চিঠিটা কোথায়?”

সৌম্য ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

খামের কাগজ হলদে হয়ে গেছে। মায়ের হাতের লেখা স্পষ্ট।

“সৌম্য,

আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তবু একটা কথা বলছি—অনির্বাণকে কখনও খুঁজতে এসো না। ওর জীবন শান্তিতে কাটুক। সময় হলে ও নিজেই তোমাকে খুঁজে নেবে।

আমি ওকে জন্ম দিয়েছি, কিন্তু ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধু আমার নয়। অরুণাভ ওকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসে। আমি চাই না, আমার অতীতের কারণে ওর জীবন ভেঙে যাক।

কোনো দিন যদি আমার নামে নীল খাম পাও, বুঝবে সময় এসে গেছে।

মধুমিতা।”

অনির্বাণ চিঠিটি পড়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

“নীল খামের কথা মা আপনাকে বলেছিলেন?”

“হ্যাঁ। তিনি বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরে নির্দিষ্ট সময়ে একটি চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু আমি জানতাম না, সেটা কবে পৌঁছবে। আজ সকালে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য একটি বার্তা পেয়েছি। বার্তাটি এমন একটি ঠিকানা থেকে এসেছে, যা বিশ বছর ধরে বন্ধ।”

“কোন ঠিকানা?”

সৌম্য কাগজটি এগিয়ে দিলেন।

অনির্বাণের মায়ের পুরোনো ঠিকানা।

কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কাগজের নিচে একটি নতুন বাক্য লেখা—

“দুজন বাবার মধ্যে একজন সত্যি জানেন, অন্যজন সত্যিটাকে লুকিয়ে রেখেছেন।”


২. মায়ের গোপন ডায়েরি

অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, প্রতিটি নতুন উত্তর আরও দশটি প্রশ্ন তৈরি করছে।

“আপনি কি জানেন, মা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?”

সৌম্য মাথা নিচু করলেন।

“আমাকে বলা হয়েছিল, দীর্ঘ অসুস্থতার পরে তিনি মারা গেছেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে শেষবার একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠি আমার কাছে পৌঁছয়নি। কয়েক বছর আগে এক পুরোনো পরিচিতের কাছ থেকে জানতে পারি, চিঠিটি তোমাদের বাড়িতে আছে।”

“আমার বাড়িতে?”

“হ্যাঁ। তোমার মায়ের ঘরে।”

অনির্বাণের মনে পড়ল, কাঠের বাক্সে রাখা ডায়েরির কথা। সেখানে শেষ পাতাগুলো সে তখনও পড়েনি।

সৌম্য বললেন, “চলো, তোমার বাড়িতে যাই। এবার সত্যিটা একসঙ্গে পড়ব।”


বাড়িতে ফিরে অনির্বাণ দেখল, তার বাবা বসার ঘরে অপেক্ষা করছেন। সৌম্যকে দেখে অরুণাভ উঠে দাঁড়ালেন। দুজনের চোখাচোখি হতেই ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

“তুমি?” অরুণাভের গলায় বিস্ময়।

সৌম্য শান্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ, অরুণাভ। এত বছর পর দেখা হল।”

“তুমি এখানে কেন এসেছ?”

“অনির্বাণের সত্যিটা জানাতে।”

অরুণাভ ছেলের দিকে তাকালেন।

“তুই ওকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিস?”

অনির্বাণ দৃঢ় গলায় বলল, “হ্যাঁ। কারণ আমি আর অর্ধেক সত্যি শুনতে চাই না।”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

“তাহলে চলো। যে কথা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছি, আজ সেটা বলতেই হবে।”

তিনজন ঘরে ঢুকে কাঠের বাক্সটি খুললেন। ডায়েরির শেষ পাতাগুলো এত দিন কাপড়ের নিচে চাপা ছিল। সেখানে একটি ছোট্ট খাম লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

খামের ওপর লেখা—

“অনির্বাণের আঠারো বছর বয়সে খোলা হবে।”

কিন্তু অনির্বাণের বয়স এখন তিরিশ।

অরুণাভ খামটি খুললেন। ভেতরে ছিল একটি চিঠি এবং হাসপাতালের একটি নথির ফটোকপি।

চিঠিতে মধুমিতা লিখেছিলেন—

“আমার অনু,

তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো আমার ওপর অনেক রাগ হবে। হয়তো ভাববি, আমি তোকে সত্যি থেকে দূরে রেখেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি তোকে কোনো দিন মিথ্যে ভালোবাসিনি।

তোর জন্মের সময় আমি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই সিদ্ধান্তের ফলে তোর জীবনে দুজন মানুষ বাবা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে—একজন তোকে জন্মের আগে থেকে ভালোবেসেছিল, আর একজন তোকে জন্মের পর থেকে নিজের জীবন দিয়ে আগলে রেখেছে।

আমি জানি, তুই একদিন জানতে চাইবি, তোর রক্তের সম্পর্ক কার সঙ্গে। সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমি একটি নথি রেখে গেলাম। কিন্তু তার আগে তোর কাছে আমার একটাই অনুরোধ—তুই যেন কখনও কাউকে শুধু তার রক্তের সম্পর্ক দিয়ে বিচার না করিস।

মানুষের ভালোবাসা কোনো পরীক্ষাগারের রিপোর্ট নয়। তবু তোর জানার অধিকার আছে।

মধুমিতা।”

নথিটি খুলতেই অনির্বাণ দেখল, সেটি একটি জেনেটিক পরীক্ষার প্রতিবেদন।

প্রতিবেদনের তারিখ—১২ জানুয়ারি, ২০০৬।

পরীক্ষার উদ্দেশ্য—পিতৃত্ব নির্ধারণ।

পরীক্ষাধীন ব্যক্তি—অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় এবং অরুণাভ মুখোপাধ্যায়।

ফলাফল—অরুণাভ মুখোপাধ্যায় জৈবিক পিতা হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

নিচে আরেকটি নাম—সৌম্য সেন।

কিন্তু সেই পরীক্ষার ফলাফল অসম্পূর্ণ। শেষ পাতাটি নেই।

অনির্বাণ হতভম্ব হয়ে গেল।

“বাকি পাতাটা কোথায়?”

অরুণাভ ধীরে ধীরে বললেন, “আমার কাছে।”

তিনি নিজের পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন।

“আমি এত বছর এটা লুকিয়ে রেখেছি। ভেবেছিলাম, তুই কোনো দিন জানতে পারবি না।”

অনির্বাণ কাগজটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে খুলল।

শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“উপলব্ধ নমুনার ভিত্তিতে সৌম্য সেনকে জৈবিক পিতা হিসেবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা অসম্পূর্ণ হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।”

অনির্বাণ অবাক হয়ে তাকাল।

“তাহলে কেউই জানে না, আমার জৈবিক বাবা কে?”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“না।”

সৌম্যও চুপ করে রইলেন।

অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে এত বছর ধরে আপনারা দুজনেই কীসের জন্য লড়াই করছিলেন? কে আমার বাবা, সেটা নিয়েই তো সব রহস্য!”

অরুণাভ ছেলের দিকে এগিয়ে এলেন।

“আমি তোর বাবা হওয়ার জন্য কোনো পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষা করিনি। তুই যখন ছোট ছিলি, রাতে জ্বর হলে আমি তোকে কোলে নিয়ে বসে থাকতাম। তুই প্রথম হাঁটতে শিখেছিলি, আমার হাত ধরে। তোর প্রথম স্কুলের দিন, প্রথম পুরস্কার, প্রথম ব্যর্থতা—সবকিছুর পাশে আমি ছিলাম। তোর জন্মের সত্যিটা আমি জানতাম না। কিন্তু তোকে ভালোবাসার সত্যিটা আমি জানতাম।”

সৌম্য ধীরে ধীরে বললেন, “আমি তোমার জীবনে অনুপস্থিত ছিলাম। সেই অনুপস্থিতির জন্য কোনো অজুহাত নেই। আমি তোমাকে খুঁজিনি, কারণ তোমার মা আমাকে থামতে বলেছিলেন। আজ যদি তুমি আমাকে বাবা বলে গ্রহণ না করো, আমি তোমাকে দোষ দেব না।”

অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।”

দুজনেই মাথা নাড়লেন।

ঠিক তখনই বাড়ির পুরোনো টেলিফোন বেজে উঠল।

ক্রিং… ক্রিং… ক্রিং…

অনির্বাণ ফোন তুলল।

ওপাশ থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।

“অনু?”

অনির্বাণের শরীর জমে গেল।

“কে বলছেন?”

“আমি তোর মা।”

তার হাত থেকে রিসিভার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল।

“মা?”

“শোন, সময় খুব কম। ওদের দুজনের কথাই পুরোপুরি বিশ্বাস করিস না। তোর জন্মের রাতে এমন কিছু ঘটেছিল, যা কেউ তোকে বলেনি।”

“মা, তুমি কোথায়? তুমি কি বেঁচে আছ?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর কণ্ঠটি বলল—

“আগামীকাল সকালে পুরোনো বাড়ির ছাদে যাবি। সেখানে একটা লাল বাক্স আছে। বাক্সের ভেতরে তোর জন্মের আসল নথি। কিন্তু সাবধান—সেটা খোলার আগে তোর বাবাকে জিজ্ঞাসা করবি, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬-এর রাতে সে কোথায় ছিল।”

“কিন্তু আমার বাবা তো এখানেই—”

কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল।

অনির্বাণ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

অরুণাভ ও সৌম্য দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

তার বাবা অরুণাভের মুখে এমন আতঙ্ক, যেন তিনি বহু বছর ধরে যে সত্যিটাকে কবর দিয়ে রেখেছিলেন, সেটি অবশেষে ফিরে এসেছে।

“বাবা,” অনির্বাণ বলল, “১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬-এর রাতে তুমি কোথায় ছিলে?”

অরুণাভ উত্তর দিলেন না।

সৌম্য হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।

“অরুণাভ, তুমি কি ওকে সত্যিটা বলোনি?”

অরুণাভ কাঁপা গলায় বললেন, “আমি যা করেছি, ওকে রক্ষা করার জন্যই করেছি।”

“কী করেছ?” অনির্বাণ চিৎকার করে উঠল।

অরুণাভ চোখ বন্ধ করলেন।

তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে অনির্বাণের সমস্ত পৃথিবী বদলে গেল।

“তোর জন্মের রাতে, অনির্বাণ… তুই এই পৃথিবীতে একা আসিসনি।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

“তোর সঙ্গে আরেকটি শিশুর জন্ম হয়েছিল।”

অনির্বাণের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।

“আমার যমজ ভাই বা বোন ছিল?”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু জন্মের পরপরই শিশুটি নিখোঁজ হয়ে যায়।”

সৌম্য যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

“কিন্তু মধুমিতা আমাকে বলেছিল, তার একটি সন্তান হয়েছে!”

অরুণাভ তাঁর দিকে তাকালেন।

“কারণ সে জানত না, দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

অনির্বাণের মাথার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।

দ্বিতীয় শিশুটি কোথায়?

কে তাকে নিয়ে গিয়েছিল?

আর তার মায়ের কণ্ঠ যদি সত্যিই ফোনের ওপাশে থেকে থাকে, তবে তিনি কি জীবিত?

সে কিছু বলার আগেই মায়ের ঘরের জানালাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।

ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে উড়ে এসে মেঝেতে পড়ল একটি পুরোনো ছবি।

ছবিতে মধুমিতা মুখোপাধ্যায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর পাশে দুটি নবজাতক শিশু।

একটির গলায় নীল সুতো বাঁধা।

অন্যটির গলায় লাল সুতো।

ছবির পেছনে কাঁপা হাতে লেখা—

“একজনকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্যজনকে রাখা হয়েছিল সেই ঘরে, যেখানে কেউ কখনও ফিরে আসে না।”

অনির্বাণ ছবিটা বুকে চেপে ধরল।

এবার তাকে শুধু নিজের জন্মের সত্যিটাই খুঁজতে হবে না।

খুঁজে বের করতে হবে সেই হারিয়ে যাওয়া শিশুটিকে—যে হয়তো তার যমজ, হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি তখনও অমীমাংসিত—

মায়ের কণ্ঠ যদি সত্যিই ফোনের ওপাশে থেকে থাকে, তবে বিশ বছর আগে তাঁর মৃত্যুর খবরটি কে দিয়েছিল?

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *