শহরের পুরোনো ডাকঘরটির দোতলায় একটি ছোট ঘর ছিল। ঘরটির নম্বর একশো। সেখানে কোনও চিঠি বিলি হতো না, কোনও পার্সেলও রাখা থাকত না। ঘরটি ব্যবহার করা হতো হারিয়ে যাওয়া সরকারি নথি, পুরোনো মানচিত্র এবং অব্যবহৃত দপ্তরের সরঞ্জাম রাখার জন্য।
একদিন সেই ঘর পরিষ্কার করার দায়িত্ব পেল সাতাশ বছরের কৌশিক। সে ডাক বিভাগের অস্থায়ী কর্মী। চাকরিটা স্থায়ী করার জন্য তাকে প্রতিদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হতো। তাই অন্যদের মতো সে কাজ ফেলে রাখত না।
ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে সে একটি বড় কাঠের বাক্স খুঁজে পেল। বাক্সের মধ্যে ছিল বহু পুরোনো কাগজ, কিছু ধাতব সিল এবং হাতে আঁকা কয়েকটি মানচিত্র। সবকিছুর নিচে চাপা পড়েছিল একটি মোটা খাতা।
খাতাটির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—‘বিলি না হওয়া সরকারি বিজ্ঞপ্তির হিসাব, ১৯৮৯।’
কৌতূহলী হয়ে কৌশিক পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। সে দেখল, বিভিন্ন গ্রামের নামের পাশে নথিভুক্ত রয়েছে এমন কিছু বিজ্ঞপ্তির বিবরণ, যেগুলো বহু বছর আগে পাঠানো হয়েছিল। কিছু বিজ্ঞপ্তির পাশে লেখা, ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথাও লেখা, রাস্তা পরিবর্তিত হয়েছে। আবার কয়েকটি ক্ষেত্রে নথিতে উল্লেখ ছিল, সংশ্লিষ্ট গ্রাম পর্যন্ত যাওয়ার নির্ভরযোগ্য পথের বিবরণ নেই।
কৌশিক প্রথমে ভেবেছিল, এগুলো পুরোনো দাপ্তরিক কাগজ ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু শেষের দিকে একটি পাতায় তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে লেখা ছিল, পাহাড়ঘেরা তিনটি প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে একটি সরকারি পানীয় জল প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা হলেও পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ তাঁদের কাছে পৌঁছেছিল কি না, তার প্রমাণ নথিতে ছিল না।
কৌশিক বুঝতে পারল, কাগজগুলো শুধুই অতীতের হিসাব নয়। এগুলোর মধ্যে হয়তো এমন তথ্য রয়েছে, যা বর্তমানের কোনও সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
পরদিন সে বিষয়টি ডাকঘরের প্রবীণ কর্মী জগদীশবাবুকে জানাল।
জগদীশবাবু খাতা দেখে বললেন, “এগুলো বহু পুরোনো নথি। এখনই কিছু ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব কোন দপ্তরের ছিল, সেটাও আগে জানতে হবে।”
কৌশিক বলল, “আমি কিছু ধরে নিচ্ছি না। শুধু জানতে চাইছি, এই গ্রামগুলোর বর্তমান অবস্থার সঙ্গে পুরোনো নথির কোনও সম্পর্ক আছে কি না।”
জগদীশবাবু তাকে নথিগুলো নিয়ম মেনে যাচাই করার পরামর্শ দিলেন। কৌশিক সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করল। কয়েকটি গ্রামের নাম বদলে গেছে, কিছু গ্রাম অন্য প্রশাসনিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পুরোনো মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান মানচিত্র মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করাও সহজ ছিল না।
কয়েক সপ্তাহ ধরে খোঁজখবর চালানোর পরে জানা গেল, তিনটি গ্রামের মধ্যে একটির জল সরবরাহ প্রকল্প বহু আগেই সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রামের জন্য পরে বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় গ্রামের একটি অংশে পাইপলাইনের সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছিল।
কৌশিকের পাওয়া খাতাটি অবশ্য প্রমাণ করল না যে পুরোনো বিজ্ঞপ্তি না পৌঁছনোর কারণেই প্রকল্পে দেরি হয়েছিল। তবে নথিটি দেখাল, অতীতে যোগাযোগের সমস্যার কথা সরকারি রেকর্ডে ছিল। বর্তমান সমস্যার কারণ জানতে নতুন করে সমীক্ষা করা দরকার।
কৌশিক সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নথির অনুলিপি পাঠিয়ে বিষয়টি যাচাই করার অনুরোধ করল। সে গ্রামের বাসিন্দাদের হয়ে কোনও সিদ্ধান্ত দিল না, কোনও কর্মকর্তাকে দোষীও করল না। শুধু পুরোনো তথ্য এবং বর্তমান অভিযোগের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্রটি তুলে ধরল।
কিছুদিন পরে ওই অঞ্চলে একটি প্রশাসনিক সমীক্ষা শুরু হলো। কর্মীরা গ্রামে গিয়ে পাইপলাইনের অবস্থা, জলের উৎস এবং সরবরাহের সমস্যাগুলো পরীক্ষা করলেন। দেখা গেল, পুরোনো পাইপের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত এবং সম্প্রসারণের জন্য নতুন পরিকল্পনা দরকার।
প্রশাসন মেরামতি ও সম্প্রসারণের প্রস্তাব তৈরি করল। কাজ শেষ হতে সময় লাগবে, কিন্তু অন্তত সমস্যাটি আর শুধু অভিযোগের স্তরে রইল না; তার কারণ ও সমাধানের পথ নথিভুক্ত হলো।
এদিকে ডাকঘরে কৌশিকের অস্থায়ী চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এল। সে চিন্তিত ছিল, কারণ এত পরিশ্রমের পরও তার চাকরি স্থায়ী হবে কি না, তা নিশ্চিত ছিল না।
একদিন ডাকঘরের প্রধান তাকে ডেকে বললেন, “তুমি পুরোনো নথি খুঁজে পেয়েছিলে বলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন নয়। কিন্তু তুমি নথিটিকে গুরুত্ব দিয়েছ, যাচাই করেছ এবং সঠিক দপ্তরে পাঠিয়েছ। দায়িত্বশীল কর্মীর কাছে আমরা এই মনোভাবটাই চাই।”
কৌশিকের চাকরি স্থায়ী করার সুপারিশ করা হলো। খবরটি শুনে সে আনন্দিত হলেও তার মনে পড়ল একশো নম্বর ঘরটির কথা।
কয়েক মাস পরে ঘরটিকে নতুন করে সাজানো হলো। পুরোনো নথিগুলো তালিকাভুক্ত করা হলো, ক্ষতিগ্রস্ত কাগজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো এবং কোন নথি কত দিন রাখা দরকার, তার নিয়ম অনুসরণ করা হলো। কৌশিকও সেই কাজে সাহায্য করল।
একদিন জগদীশবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “তুমি না থাকলে ওই খাতাটা হয়তো আরও কয়েক বছর বাক্সের নিচেই পড়ে থাকত।”
কৌশিক উত্তর দিল, “খাতাটা খুঁজে পাওয়াই আসল কাজ ছিল না। আসল কাজ ছিল, তার মধ্যে থাকা তথ্যের কতটা সত্যিই কাজে লাগতে পারে, সেটা যাচাই করা।”
জগদীশবাবু মাথা নাড়লেন।
সন্ধ্যায় ডাকঘর বন্ধ হওয়ার আগে কৌশিক একশো নম্বর ঘরের দরজায় তালা লাগাল। দরজাটি আগের মতোই সাধারণ ছিল। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, তার ওপারে কত বছরের ইতিহাস জমে আছে।
কৌশিক জানত, প্রতিটি পুরোনো কাগজ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব অসম্পূর্ণ নথির পেছনেও কোনও রহস্য থাকে না। কিন্তু কোনও তথ্যকে শুধু পুরোনো বলে অবহেলা করার আগে তার মূল্য যাচাই করা দরকার।
কারণ, কখনও কখনও অতীতের একটি অসম্পূর্ণ হিসাব বর্তমানের সমস্যাকে বুঝতে সাহায্য করে। আর সেই সূত্র কাজে লাগে তখনই, যখন কেউ কৌতূহলের সঙ্গে সততা, ধৈর্য এবং দায়িত্ববোধও নিয়ে এগিয়ে আসে।
শিক্ষা: পুরোনো তথ্যকে অন্ধভাবে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনই তাকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে দেওয়াও ঠিক নয়। তথ্য যাচাই করে, সীমাবদ্ধতা বুঝে এবং সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারলেই জ্ঞান বাস্তব সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে।