শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল বহু বছরের পুরনো একটি গ্রন্থাগার। একসময় সেখানে প্রতিদিন ভিড় জমত। কেউ খবরের কাগজ পড়তে আসত, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিত, আবার কেউ নিছক গল্পের বইয়ের টানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভ্যাস বদলেছিল। মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেটের ভিড়ে গ্রন্থাগারটি ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়েছিল।
গ্রন্থাগারের দেখাশোনা করতেন ষাটোর্ধ্ব নলিনীকান্তবাবু। বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। প্রতিদিন সকালে তিনি ধুলো ঝাড়তেন, বইয়ের তাক গুছিয়ে রাখতেন এবং জানালাগুলো খুলে ঘরে আলো-বাতাস ঢুকতে দিতেন। অথচ সারাদিনে কখনও কখনও একজন পাঠকও আসত না।
একদিন শহরের একটি কাচের কারখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করা তরুণী মেঘা গ্রন্থাগারে এল। সে পুরনো ভবনের নকশা দেখতে ভালোবাসত। গ্রন্থাগারের বড় জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে তার চোখ আটকে গেল। জানালার কাচগুলো ছিল সাদামাটা, কয়েকটি আবার ফেটে গিয়েছিল।
মেঘা নলিনীকান্তবাবুকে বলল, “এই জানালাগুলো যদি রঙিন কাচ দিয়ে সাজানো যায়, তাহলে ঘরের ভেতর আলো পড়লে অসাধারণ দেখাবে।”
নলিনীকান্তবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ভাবনাটা সুন্দর, মা। কিন্তু গ্রন্থাগারের মেরামতির টাকাই জোটে না। সাজানোর খরচ বহন করবে কে?”
মেঘা আর কিছু বলল না। তবে তার মাথায় একটি পরিকল্পনা জন্ম নিল।
পরদিন থেকে সে কারখানায় কাজের ফাঁকে ফেলে দেওয়া ছোট ছোট রঙিন কাচের টুকরো সংগ্রহ করতে লাগল। সেগুলোর মধ্যে কোনওটি নীল, কোনওটি সবুজ, কোনওটি আবার সূর্যের মতো হলুদ। ভাঙা কাচ নিয়ে কাজ করা বিপজ্জনক বলে সে যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করত এবং অভিজ্ঞ কারিগরের অনুমতি নিয়ে নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য টুকরোগুলো বেছে নিত।
কয়েক সপ্তাহ পরে তার কাছে বেশ কিছু কাচ জমল। কিন্তু শুধু কাচ থাকলেই তো জানালা তৈরি হয় না। দরকার ছিল নকশা, দক্ষতা আর সহযোগিতা।
মেঘা শহরের শিল্পবিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবব্রতবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করল। তিনি তার পরিকল্পনা শুনে আগ্রহী হলেন। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে তিনি গ্রন্থাগারে এলেন। সবাই মিলে জানালার মাপ নিল, নকশা তৈরি করল এবং নিরাপদভাবে বসানো যায় এমন রঙিন কাচের প্যানেল বানানোর কাজ শুরু করল।
প্রথম দিন কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হলো। নকশায় আলো পড়ার দিক ঠিকভাবে হিসাব করা হয়নি। ফলে কাচের রং দিনের বেশির ভাগ সময়েই স্পষ্ট হচ্ছিল না। কেউ কেউ হতাশ হয়ে বলল, “এত পরিশ্রম করে লাভ কী? সাধারণ জানালা থাকলেই তো হয়।”
মেঘা হাল ছাড়ল না। সে কয়েক দিন ধরে সকাল, দুপুর ও বিকেলের আলো পর্যবেক্ষণ করল। তারপর নকশায় পরিবর্তন আনা হলো। নীল ও সবুজ কাচগুলো এমনভাবে বসানো হলো, যাতে আলো ঘরের মেঝেতে পাতার মতো নকশা তৈরি করে। হলুদ ও কমলা কাচের অংশগুলো পড়ার টেবিলের পাশের দেয়ালে উষ্ণ আলোর ছায়া ফেলতে লাগল।
অবশেষে কাজ শেষ হলো।
পরদিন সকালে গ্রন্থাগারের দরজা খুলতেই এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। সূর্যের আলো রঙিন কাচ ভেদ করে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও নীল, কোথাও সবুজ, কোথাও সোনালি আভা। পুরনো ঘরটিকে যেন নতুন করে প্রাণ দেওয়া হয়েছে।
সেই দৃশ্য দেখতে শহরের বহু মানুষ গ্রন্থাগারে এল। কেউ ছবি তুলল, কেউ বই হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসে পড়ল। স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসতে শুরু করলেন। রঙিন জানালাগুলো দেখতে এসে অনেকে বই পড়ার আনন্দও নতুন করে আবিষ্কার করল।
নলিনীকান্তবাবুর চোখে আনন্দের জল এসে গেল। তিনি মেঘাকে বললেন, “তুমি শুধু জানালা সাজাওনি, এই গ্রন্থাগারের দিকে মানুষের দৃষ্টিও ফিরিয়ে এনেছ।”
মেঘা হেসে উত্তর দিল, “আমি একা কিছুই করিনি। ফেলে দেওয়া কাচগুলো ছিল, আপনি জায়গা দিয়েছেন, দেবব্রতবাবু পথ দেখিয়েছেন, আর সবাই মিলে কাজ করেছি। এই আলো আমাদের সকলের।”
কয়েক মাসের মধ্যে গ্রন্থাগারে নতুন পাঠচক্র শুরু হলো। শিশুরা গল্প পড়তে আসত, তরুণেরা আলোচনা করত, বয়স্ক মানুষও আবার বইয়ের পাতায় ফিরে গেলেন। রঙিন জানালাগুলো শুধু ভবনটিকে সুন্দর করেনি; মানুষকে এক জায়গায় মিলিত হওয়ার নতুন কারণ দিয়েছিল।
মেঘা পরে আরও অনেক নকশা তৈরি করেছিল। কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজটি ছিল সেই পুরনো গ্রন্থাগারের জানালা। কারণ সেখানে সে বুঝেছিল, সৌন্দর্য শুধু দামি জিনিসে থাকে না। যত্ন, সৃজনশীলতা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফেলে দেওয়া উপকরণও নতুন অর্থ পেতে পারে।
শিক্ষা: কোনও কিছুকে অবহেলায় ফেলে দেওয়ার আগে তার নতুন ব্যবহার নিয়ে ভাবা উচিত। সৃজনশীল চিন্তা, ধৈর্য এবং মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ পুরনো ও অবহেলিত জিনিসের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনার আলো জ্বালাতে পারে।