Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি নিজের মৃত্যুর খবর পড়েছিল (প্রথম পর্ব: সংবাদপত্রের প্রথম পাতায়)।

সকালের চায়ে প্রথম চুমুকটা দিয়েই নিজের মৃত্যুর খবর পড়ল অনন্যা।

খবরটা ছাপা হয়েছে মালদার একটি জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের প্রথম পাতায়। মোটা কালো অক্ষরে শিরোনাম—

“তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর নদী থেকে উদ্ধার তরুণীর দেহ, পরিবারের দাবি—মেয়েটি অনন্যা সেন।”

খবরের নিচে যে ছবিটা ছাপা হয়েছে, সেটি অনন্যার নিজের।

ছবিতে সে হাসছে। পরনে নীল শাড়ি, কপালে ছোট্ট কালো টিপ। ছবিটা গত বছর তার জন্মদিনে তোলা। ছবির নিচে বয়স লেখা সাতাশ বছর। পেশা—স্কুলশিক্ষিকা। ঠিকানা—পুরোনো মালদার একটি পাড়া।

সবই ঠিক।

শুধু একটা সমস্যা।

অনন্যা সেন তখন নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল।

তার হাতে ধরা খবরের কাগজটা কাঁপছিল। প্রথমে সে ভেবেছিল, কেউ হয়তো তার ছবি ব্যবহার করে মিথ্যে খবর ছড়িয়েছে। কিন্তু খবরের ভেতরে এমন কিছু তথ্য লেখা ছিল, যা তার পরিবারের বাইরে আর কারও জানার কথা নয়।

যেমন, তার বাঁ কাঁধের কাছে ছোট্ট একটি পোড়া দাগ আছে।

যেমন, ছোটবেলায় সে জলে পড়ে যাওয়ার পর থেকে নদীর গভীর জল ভয় পায়।

আর যেমন, তার ডান হাতের কবজিতে একটা রুপোর ব্রেসলেট থাকে, যার ভেতরের দিকে খোদাই করা আছে—‘মা, আমি ফিরব।’

অনন্যা ধীরে ধীরে নিজের কবজির দিকে তাকাল।

ব্রেসলেটটা সেখানে আছে।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে একজন পুরুষের গলা ভেসে এল।

“খবরটা পড়েছ?”

অনন্যা উঠে দাঁড়াল। “কে বলছেন?”

“তোমার মৃত্যু হয়েছে বলে সবাই জানে। কিন্তু তুমি বেঁচে আছ—এটা জানে মাত্র তিনজন।”

“আপনি কে?”

“আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে মরতে দেখেছিল।”

অনন্যার হাত থেকে খবরের কাগজটা মেঝেতে পড়ে গেল।

“আপনি কী বলছেন? আমি তো—”

“আজ দুপুর বারোটার আগে পুরোনো ইংলিশ বাজারের ডাকবাংলোয় এসো। একা আসবে। আর যাওয়ার আগে তোমার মাকে জিজ্ঞাসা করবে, ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর রাতে তিনি কাকে কবর দিয়েছিলেন।”

কল কেটে গেল।

অনন্যা কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ছুটে গেল মায়ের ঘরে।


অনন্যার মা মৃণালিনী সেন তখন ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালাচ্ছিলেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা। শান্ত স্বভাব, অল্প কথায় অভ্যস্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পর মেয়েকে নিয়েই তাঁর পৃথিবী।

অনন্যা ঘরে ঢুকে খবরের কাগজটা মায়ের সামনে ছুড়ে দিল।

“এটা কী?”

মৃণালিনী প্রথমে খবরের কাগজের দিকে তাকালেন। তারপর ছবিটা দেখে তাঁর হাত থেকে প্রদীপের থালা পড়ে গেল।

কাঁসার থালাটা মেঝেতে পড়ে ঝনঝন শব্দ করল।

অনন্যা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, তিনি খবরটা আগে থেকেই জানেন।

“তুমি জানো, মা?”

মৃণালিনী ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করলেন।

“তুই কোথায় পেয়েছিস এটা?”

“সেটা বড় কথা নয়। এই খবর ছাপল কীভাবে? আমি তো বেঁচে আছি!”

মা কোনো উত্তর দিলেন না।

অনন্যা এবার আরও কাছে এগিয়ে গেল।

“ফোনে একজন বলেছে, ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর রাতে তুমি কাউকে কবর দিয়েছিলে। কাকে, মা?”

মৃণালিনী এমনভাবে মেয়ের দিকে তাকালেন, যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সত্যিই তার মেয়ে নয়।

তারপর তিনি ফিসফিস করে বললেন, “তুই এই প্রশ্নটা করবি, জানতাম।”

অনন্যার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

“মানে?”

মা ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। তারপর জানালার পর্দা টেনে দিলেন। বাড়ির বাইরের রাস্তায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না, সেটাও একবার দেখে নিলেন।

“তুই আজ কোথাও যাবি না।”

“কেন?”

“কারণ যারা তোকে মৃত বলে ঘোষণা করেছে, তারা এবার নিশ্চিত হতে চাইবে যে তুই সত্যিই বেঁচে আছিস কি না।”

“কারা তারা?”

মৃণালিনী চোখ বন্ধ করলেন।

“যাদের জন্য তোর বাবা মারা গিয়েছিলেন।”

অনন্যা চমকে উঠল।

তার বাবা অরুণাভ সেন মারা গিয়েছিলেন বারো বছর আগে। সরকারি নথিতে লেখা ছিল, রাতে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। অনন্যার বয়স তখন পনেরো। বাবার মৃত্যুর পর মা আর কখনও সেই রাতের কথা বলেননি।

“বাবার মৃত্যু কি দুর্ঘটনা ছিল না?”

মৃণালিনী কাঁদতে শুরু করলেন।

“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, অনু। তোর বাবাও চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দুজনেই একটা ভুল করেছিলাম।”

“কী ভুল?”

“আমরা ভেবেছিলাম, সত্যিটা লুকিয়ে রাখলে তুই নিরাপদে থাকবি।”

অনন্যা মায়ের হাত ধরল।

“কী সত্যি?”

মৃণালিনী তার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন—

“তুই আমার মেয়ে। কিন্তু তুই আমার গর্ভে জন্মাসনি।”

ঘরের মধ্যে যেন সমস্ত শব্দ থেমে গেল।

অনন্যা হাত সরিয়ে নিল।

“কী বললে?”

“তুই আমার মেয়ে। আমি তোকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছি। কিন্তু তোর জন্মের সময়—”

“থামো!”

অনন্যার গলা কেঁপে উঠল।

“এত বছর ধরে তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ?”

“আমি তোকে মিথ্যে বলতে চাইনি।”

“তাহলে সত্যিটা বলোনি কেন?”

মৃণালিনী উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

“মৃণালিনী দেবী, দরজা খুলুন। পুলিশ থেকে এসেছি।”

মা মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “যা-ই হোক, তুই বলবি না যে তুই খবরের কাগজটা দেখেছিস।”

“কেন?”

“কারণ পুলিশ তোকে খুঁজছে না, অনু। ওরা খুঁজছে সেই মেয়েটাকে, যে তোর মুখ নিয়ে এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে।”


দুপুর এগারোটা চল্লিশ।

অনন্যা শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

মাকে কথা দিয়েছিল, সে কোথাও যাবে না। কিন্তু ঘরে বসে থাকার মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না। আর ফোনের লোকটির কথা তার মাথা থেকে সরছিল না।

পুরোনো ইংলিশ বাজারের ডাকবাংলোটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে একটু দূরে। বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সামনে বড় বড় গাছ, পেছনে আগাছায় ঢাকা বাগান। স্থানীয় মানুষজন বলে, সন্ধ্যার পর ওই বাড়ির আশেপাশে কেউ যায় না।

অনন্যা যখন পৌঁছল, তখন ঘড়িতে এগারোটা আটান্ন।

প্রধান দরজাটা আধখোলা।

ভেতরে ঢুকে সে দেখল, লম্বা বারান্দার শেষে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। গায়ে ধূসর শার্ট, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

লোকটি তাকে দেখে বলল, “তুমি ঠিক সময়ে এসেছ।”

“আপনি আমাকে ফোন করেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি কে?”

লোকটি পকেট থেকে একটা পরিচয়পত্র বের করল।

নাম—সৌম্যদীপ বসু।

পেশা—সাংবাদিক।

অনন্যা নামটা চিনতে পারল। সৌম্যদীপ একসময় একটি সংবাদপত্রে অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদন লিখতেন। কয়েক বছর আগে হঠাৎ তাঁর চাকরি চলে যায়। তারপর থেকে তাঁকে আর কোথাও দেখা যায়নি।

“আপনি আমার মৃত্যুর খবর কীভাবে জানলেন?”

সৌম্যদীপ উত্তর না দিয়ে একটা পুরোনো ফাইল তার হাতে দিলেন।

“এটা পড়ো।”

ফাইলের প্রথম পাতায় একটি হাসপাতালের নথি। তারিখ—১২ নভেম্বর, ২০০৫।

রোগীর নাম—অনন্যা সেন।

বয়স—সাত বছর।

অবস্থা—গুরুতর।

পরের পাতায় মৃত্যুর শংসাপত্র।

মৃত্যুর সময়—রাত ১১টা ৪৫ মিনিট।

অনন্যা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।

“এটা অসম্ভব। ২০০৫ সালে আমার বয়স ছিল সাত বছর? আমি তো ১৯৯৮ সালে জন্মেছি। কিন্তু আমার জন্মদিন ২১ মার্চ।”

সৌম্যদীপ শান্ত গলায় বললেন, “তোমার জন্মদিন ২১ মার্চ নয়।”

“আপনি পাগল?”

“তোমার স্কুলের নথি, আধার-সংক্রান্ত পুরোনো তথ্য, জন্মের শংসাপত্র—সব জায়গায় ২১ মার্চ লেখা। কিন্তু হাসপাতালের নথিতে অন্য তারিখ রয়েছে। ১২ নভেম্বর, ১৯৯৮।”

অনন্যা ফাইলটা বন্ধ করে দিল।

“এগুলো জাল।”

“হতে পারে। তাই তোমাকে আরেকটা জিনিস দেখাতে চাই।”

সৌম্যদীপ পকেট থেকে একটি ছোট্ট ছবি বের করলেন।

ছবিতে দুটো ছোট্ট মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজনের পরনে হলুদ ফ্রক, অন্যজনের লাল। দুজনের মুখ একেবারে এক।

শুধু একজনের বাঁ কাঁধে ছোট্ট পোড়া দাগ।

অনন্যার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

“এটা কে?”

“ছবির পেছনে লেখা নামটা পড়ো।”

অনন্যা ছবিটা উল্টে দিল।

‘অনন্যা ও অনামিকা। প্রথম জন্মদিন।’

তারিখ—১২ নভেম্বর, ১৯৯৯।

অনন্যার মাথা ঘুরতে লাগল।

“আমার তো কোনো যমজ বোন নেই!”

সৌম্যদীপ এবার প্রথমবারের মতো গম্ভীর হলেন।

“ছিল।”

“কোথায় সে?”

“২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়েছিল।”

অনন্যা ছবিটা মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল।

“তাহলে মৃতদেহটা আমার নামে কেন?”

সৌম্যদীপ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ সেই রাতে তোমার বোনের মৃত্যু হয়েছিল, আর তোমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, যে শিশুটিকে মৃত বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আর তোমার পরিবার সেই প্রশ্নের উত্তর কখনও দেয়নি।”

“আমার মা সব জানেন?”

“হ্যাঁ।”

“আমার বাবা?”

সৌম্যদীপ এবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

“তোমার বাবা শুধু জানতেন না, তিনি সেই রাতের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।”

অনন্যা এক পা পিছিয়ে গেল।

“আমার বাবা মারা গেছেন।”

“আমি জানি।”

“তাহলে তিনি কীভাবে জড়িত ছিলেন?”

সৌম্যদীপ উত্তর দেওয়ার আগে বারান্দার বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।

একজন মহিলা গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ডাকবাংলোর দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর পরনে সাদা শাড়ি, কাঁধে কালো ব্যাগ। মুখটা অনন্যার অচেনা, কিন্তু চোখ দুটো দেখে বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

মহিলা ঘরে ঢুকেই সৌম্যদীপকে বললেন, “আপনি ওকে সব বলে দিয়েছেন?”

“সবটা নয়।”

মহিলা অনন্যার দিকে তাকালেন।

তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি আমাকে চিনবে না। কিন্তু আমি তোমাকে জন্মের পর কোলে নিয়েছিলাম।”

অনন্যা স্তব্ধ।

“আপনি কে?”

মহিলা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করলেন।

নাম—ডা. নন্দিতা রায়।

পেশা—স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ।

অনন্যা নামটা শুনে চমকে উঠল। তার মায়ের পুরোনো ডায়েরিতে এই নাম একাধিকবার লেখা ছিল। কিন্তু প্রতিবারই মা নামটার ওপর কালো কালি টেনে দিয়েছিলেন।

ডা. নন্দিতা বললেন, “তোমার জন্মের রাতে আমি হাসপাতালে ছিলাম। তোমার মা তখন খুব অসুস্থ ছিলেন। তুমি আর তোমার বোন—দুজনেই বেঁচে জন্মেছিলে। কিন্তু তোমাদের জন্মের কয়েক মাস পর এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার পর থেকে তোমাদের দুজনের পরিচয় বদলে যায়।”

“কেন?”

“কারণ তোমাদের একজনের বাবা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার বিরুদ্ধে বড় অপরাধের অভিযোগ ছিল।”

অনন্যা চিৎকার করে উঠল, “আমার বাবা কোনো অপরাধী ছিলেন না!”

নন্দিতা চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “তোমার বাবা একজন সৎ মানুষ ছিলেন। কিন্তু তিনি এমন একজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, যে নিজের অপরাধ ঢাকতে তোমাদের দুজনের জীবন নিয়ে খেলেছিল।”

“কে সেই মানুষ?”

নন্দিতা উত্তর দিলেন না।

সৌম্যদীপ টেবিলের ওপর আরেকটি কাগজ রাখলেন।

সেটা ছিল ২০০৫ সালের একটি পুলিশি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে লেখা, শহরের উপকণ্ঠে একটি বাড়িতে আগুন লাগে। আগুনে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটির পরিচয় অনন্যা সেন বলে দাবি করেন তার পরিবার।

কিন্তু তদন্তকারী অফিসারের হাতে লেখা একটি নোটে ছিল—

‘মৃত শিশুটির বাঁ কাঁধে কোনো পোড়া দাগ নেই। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, অনন্যা সেনের বাঁ কাঁধে জন্মের পর থেকেই পোড়া দাগ ছিল।’

অনন্যা নিজের বাঁ কাঁধের দিকে হাত নিয়ে গেল।

তার দাগটা জন্মের নয়। সে ছোটবেলায় গরম জলের পাত্রে পড়ে গিয়ে দগ্ধ হয়েছিল বলে মা বলতেন।

তাহলে সেই দাগের গল্পও মিথ্যে?

নন্দিতা ধীরে বললেন, “তোমার আসল পরিচয় জানার জন্য তোমাকে একটি জায়গায় যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“পুরোনো জেলা হাসপাতালের মর্গে।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বোনের মৃতদেহের যে নথি তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে একটি চিঠি জমা পড়েছিল। সেই চিঠি আজও সিল করা অবস্থায় রাখা আছে।”

অনন্যা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“একটা মৃতদেহের সঙ্গে চিঠি?”

“হ্যাঁ। চিঠির ওপরে লেখা ছিল—‘যে বেঁচে আছে, তার জন্য।’”


বিকেল পাঁচটা।

পুরোনো জেলা হাসপাতালের পিছনের ভবনটা বহু বছর ধরে বন্ধ। মর্গের দেওয়ালে শ্যাওলা, লোহার দরজায় মরচে। নন্দিতা নিজের পুরোনো পরিচয় ব্যবহার করে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করলেন।

অনন্যার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনের এমন একটা ঘরে ঢুকছে, যার দরজা এত বছর ধরে বাইরে থেকে বন্ধ ছিল।

একজন বৃদ্ধ কর্মচারী তাদের একটা ধাতব আলমারির সামনে নিয়ে গেলেন।

“এই ফাইলটা বহুবার খোলা হয়েছে,” তিনি বললেন। “কিন্তু চিঠিটা কেউ পড়েনি। নির্দেশ ছিল, মেয়েটি নিজে এলে তবেই দেওয়া হবে।”

“কোন মেয়েটি?” অনন্যা জিজ্ঞাসা করল।

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।

“আপনি।”

আলমারি খুলে তিনি একটি সিল করা খাম বের করলেন।

খামের ওপরে লেখা—‘অনন্যা সেনের জন্য। ১২ নভেম্বর, ২০০৫।’

অনন্যা কাঁপা হাতে খামটা খুলল।

ভেতরে ছোট্ট একটি চিঠি।

হাতের লেখা শিশুর মতো, অক্ষরগুলো বাঁকা।

‘দিদি,

তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝবে, আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না।

মা বলেছে, তুমি আমার মতো দেখতে। সবাই নাকি আমাদের আলাদা করতে পারে না। কিন্তু তুমি জানো, আমরা আলাদা। তুমি গান গাইতে ভালোবাসো, আর আমি গল্প লিখতে। তুমি নদীকে ভয় পাও, আর আমি নদীর ধারে বসে থাকতে ভালোবাসি।

আজ রাতে আমাকে অন্য একটা বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে মা বলেছে। কেন, তা বলেনি। আমি ভয় পাচ্ছি।

দিদি, যদি কেউ তোমাকে বলে আমি মরে গেছি, তুমি বিশ্বাস কোরো না। আমি যদি না-ও ফিরি, তুমি আমাকে খুঁজবে।

আর একটা কথা—বাবা তোমাকে যে নাম দিয়েছেন, সেটা তোমার আসল নাম নয়।

তোমার বোন, অনামিকা।’

অনন্যার চোখ থেকে জল পড়তে লাগল।

চিঠির শেষ লাইনে আরও একটি বাক্য ছিল, যা অন্য কালিতে পরে লেখা হয়েছে।

‘দিদি, আমাদের মধ্যে একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে মরতে হবে—এ কথা মা বলেছে।’

অনন্যা মুখ তুলে নন্দিতার দিকে তাকাল।

“আমার বোন কি সত্যিই মারা গিয়েছিল?”

নন্দিতা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়লেন।

“আমি জানি না।”

“আপনি জানেন না?”

“সেই রাতে হাসপাতাল থেকে দুটি শিশুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একটি শিশুকে মৃত বলে নথিভুক্ত করা হয়। অন্যটিকে তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে জানতে পারি, পরিবারের হাতে যে শিশুটি গিয়েছিল, সে সেই শিশুটি নয়, যাকে তারা নিতে এসেছিল।”

অনন্যা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

“তাহলে আমি কে?”

নন্দিতা এবার তার চোখের দিকে তাকালেন।

“তুমি অনন্যা কি না, সেটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। কিন্তু তোমার জন্মের নথিতে একটি নাম ছিল—অনামিকা সেন।”

অনন্যার মনে হলো, চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে।

“আমার নাম অনামিকা?”

“সম্ভবত।”

“তাহলে অনন্যা কে?”

নন্দিতা উত্তর দেওয়ার আগেই হাসপাতালের করিডরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

বৃদ্ধ কর্মচারী দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “কেউ এসেছে।”

সৌম্যদীপ জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন। তারপর তাঁর মুখের রং বদলে গেল।

“আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

“কেন?” অনন্যা জিজ্ঞাসা করল।

সৌম্যদীপ উত্তর দিলেন না। তিনি চিঠিটা অনন্যার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলেন।

“যে মানুষটা তোমার মৃত্যুর খবর ছাপিয়েছে, সে এখন এখানেও এসেছে।”

দরজায় ধাক্কা পড়ল।

তারপর বাইরে থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

“অনু, দরজা খোল। আমি মা।”

অনন্যা জমে গেল।

এটা তার মায়ের গলা।

কিন্তু মা তো বাড়িতে থাকার কথা।

দরজার ওপাশ থেকে আবার ডাক এল।

“অনু, তুই কি ভেতরে আছিস? আমি জানি, তুই সব জেনে গেছিস। দরজা খোল। আর সময় নেই।”

অনন্যা দরজার দিকে এগোতেই নন্দিতা তার হাত ধরে ফেললেন।

“দাঁড়াও!”

“কেন? ও আমার মা!”

নন্দিতা ফিসফিস করে বললেন, “যে মহিলা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোমার মা নয়।”

অনন্যা পেছনে সরে গেল।

“কিন্তু গলাটা তো—”

“তোমার মায়ের গলা নকল করা যায়। কিন্তু তাঁর ডান হাতের আঙুলে একটা আংটি আছে। বাইরে দাঁড়ানো মহিলার হাতে সেই আংটি নেই।”

অনন্যা দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে তাকাল।

একজোড়া পা দেখা যাচ্ছে।

সাদা শাড়ি।

আর ডান হাতে একটি কালো দস্তানা।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে মহিলাটি ধীরে ধীরে বললেন—

“তুমি যদি এখন দরজা না খোলো, তাহলে তোমার বোনকে দ্বিতীয়বার মরতে হবে।”

অনন্যা চিৎকার করে উঠল, “আমার বোন কোথায়?”

কোনো উত্তর এল না।

শুধু দরজার নিচ দিয়ে একটি খাম ভেতরে ঢুকে এল।

খামের ওপরে লেখা—

‘অনন্যা সেনের মৃত্যুর শংসাপত্র—দ্বিতীয় কপি।’

অনন্যা খামটা খুলল।

ভেতরে যে ছবিটা ছিল, তা দেখে তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

ছবিতে একটি মেয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। মুখ অনন্যার মতো। বাঁ কাঁধে সেই পরিচিত পোড়া দাগ।

ছবির নিচে লেখা—

‘মৃত্যুর তারিখ: আজ।’

তার ঠিক নিচে আরও একটি লাইন—

‘পরিচয়: অনামিকা সেন।’

অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে ছবিটা নামিয়ে রাখল।

তারপর তার ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

সে কল ধরতেই ওপাশ থেকে একটি মেয়ের গলা ভেসে এল।

“দিদি?”

অনন্যার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“অনামিকা?”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—

“দিদি, আমি বেঁচে আছি। কিন্তু তুমি যদি জানতে পারো, মা আসলে কে, তাহলে তুমি নিজেই চাইবে আমি মরে যাই।”

ফোন কেটে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে থেকে গুলির শব্দ শোনা গেল।

আর মর্গের আলো নিভে গেল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *