Categories
প্রবন্ধ বিবিধ

ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কর্তব্য: সচেতন নাগরিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি।

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অন্যতম। এই দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য সংবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সংবিধান নাগরিকদের অধিকার প্রদান করে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করে এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ করে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য শুধু অধিকার থাকাই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

এই প্রয়োজন থেকেই ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক কর্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দেশের স্বাধীনতা, ঐক্য, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বের অংশ। রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকার দাবি করার পাশাপাশি দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও একটি সুস্থ নাগরিক জীবনের পরিচয়।

ভারতীয় সংবিধান ও মৌলিক কর্তব্যের ধারণা

ভারতীয় সংবিধান ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হয়। এই দিনটি প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়। সংবিধানের মাধ্যমে ভারত একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে তার সাংবিধানিক যাত্রা শুরু করে।

সংবিধানের মূল কাঠামোতে মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি এবং অন্যান্য সাংবিধানিক বিধান থাকলেও প্রথম থেকেই মৌলিক কর্তব্যের পৃথক তালিকা ছিল না। পরবর্তীকালে নাগরিকদের দায়িত্বের বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৭৬ সালে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ-ক অংশে ৫১ক অনুচ্ছেদ যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য দশটি মৌলিক কর্তব্য নির্ধারিত হয়। পরে ২০০২ সালের ৮৬তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আরও একটি কর্তব্য যুক্ত হয়। বর্তমানে ভারতীয় সংবিধানে মোট এগারোটি মৌলিক কর্তব্য রয়েছে।

এই কর্তব্যগুলি দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করে এবং সমাজের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

মৌলিক কর্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের ভূমিকা শুধু ভোট দেওয়া বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের আইন মেনে চলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, জনসম্পত্তি রক্ষা করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মৌলিক কর্তব্যের প্রধান গুরুত্ব হলো, এগুলি নাগরিকদের ব্যক্তিগত আচরণকে বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে। একজন ব্যক্তি নিজের স্বাধীনতা ভোগ করার সময় যেন অন্যের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না করেন, সেই বোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই কর্তব্যগুলি সহায়ক।

যেমন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। নাগরিকেরা জল অপচয় কমাতে পারেন, গাছ লাগাতে পারেন এবং বর্জ্য যথাযথভাবে ফেলতে পারেন। একইভাবে, জাতীয় ঐক্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়; সাধারণ মানুষও ধর্ম, ভাষা বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থেকে এই কাজে অবদান রাখতে পারেন।

মৌলিক কর্তব্য তাই ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করে।

ভারতীয় সংবিধানের এগারোটি মৌলিক কর্তব্য

ভারতীয় সংবিধানের ৫১ক অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জন্য এগারোটি মৌলিক কর্তব্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রতিটি কর্তব্যের নিজস্ব তাৎপর্য রয়েছে।

১. সংবিধান, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে সম্মান করা

প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য হলো সংবিধানকে মেনে চলা, তার আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্মান করা এবং জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের মর্যাদা রক্ষা করা।

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইনগত কাঠামোর ভিত্তি। এটি নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং প্রশাসনের দায়িত্ব নির্ধারণ করে। তাই সংবিধানকে সম্মান করার অর্থ শুধু আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে পতাকাকে সম্মান জানানো নয়; সংবিধানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেও শ্রদ্ধা করা।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচারের মতো মূল্যবোধ রক্ষার মধ্য দিয়েও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়।

২. স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান আদর্শ অনুসরণ করা

ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে বহু মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শের মধ্যে ছিল স্বাধীনতা, সাম্য, আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

নাগরিকদের কর্তব্য হলো এই আদর্শগুলিকে সম্মান করা এবং নিজেদের জীবনেও সেগুলির প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে স্বাধীনতা সহজে অর্জিত হয়নি। তাই স্বাধীনতার মূল্য উপলব্ধি করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষা করা

ভারত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য।

ভারত বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার মানুষের দেশ। এই বৈচিত্র্য ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভিন্নতার কারণে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে।

জাতীয় ঐক্য রক্ষার অর্থ মানুষের যুক্তিসংগত মতভেদকে অস্বীকার করা নয়। বরং সাংবিধানিক পদ্ধতিতে মত প্রকাশ করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং দেশের ঐক্যের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বিভাজন এড়িয়ে চলা এর গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৪. দেশকে রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে জাতীয় সেবা প্রদান করা

সংবিধানের মৌলিক কর্তব্য অনুযায়ী, দেশের প্রতিরক্ষা করা এবং আহ্বান করা হলে জাতীয় সেবা প্রদান করা নাগরিকের দায়িত্ব।

দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা কর্মী এবং বিভিন্ন জরুরি পরিষেবার সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের কাজের প্রতি সম্মান জানানো নাগরিকের দায়িত্বের একটি অংশ।

সাধারণ নাগরিকেরাও আইন মেনে চলা, দুর্যোগের সময় সহযোগিতা করা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে পারেন। তবে জাতীয় সেবার নির্দিষ্ট আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলে তা প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

৫. সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের মনোভাব গড়ে তোলা

ভারতীয় সংবিধান নাগরিকদের মধ্যে ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল কিংবা গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের মনোভাব গড়ে তোলার কথা বলে। একই সঙ্গে নারীর মর্যাদার পরিপন্থী প্রথা পরিত্যাগ করার কর্তব্যও এই ধারার অন্তর্ভুক্ত।

একটি সমাজে বিভিন্ন মত, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন। প্রত্যেকের বিশ্বাস এক হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু মতের অমিল থাকলেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা সম্ভব।

ধর্মীয় বা ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপমান করা, নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করা কিংবা সামাজিক বিদ্বেষ ছড়ানো সম্প্রীতির পরিপন্থী। পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখা জরুরি।

৬. ভারতের সমন্বিত সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষা করা

ভারতের সংস্কৃতি বহু শতাব্দীর ইতিহাস, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অবদান এবং নানা ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, স্থাপত্য, লোকশিল্প, উৎসব এবং জীবনযাত্রার মধ্যে এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

নাগরিকদের কর্তব্য হলো এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে মূল্য দেওয়া এবং সংরক্ষণে সহায়তা করা।

স্থানীয় লোকসংগীত, প্রাচীন স্থাপত্য, আঞ্চলিক ভাষা, হস্তশিল্প এবং লোকজ উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলির ইতিহাস তুলে ধরা এবং সাংস্কৃতিক সম্পদের প্রতি সম্মান গড়ে তোলা দরকার।

সংস্কৃতি রক্ষা করার অর্থ অতীতের সব রীতিকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া নয়। মানবিক মর্যাদা, সাম্য এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও বিকশিত করাই যুক্তিসংগত পথ।

৭. প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা

পরিবেশ রক্ষার কর্তব্য বর্তমান সময়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান নাগরিকদের বন, হ্রদ, নদী, বন্যপ্রাণীসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা ও উন্নত করার কথা বলে। জীবজগতের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের কথাও এই কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

দূষণ, বনভূমি ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি, জলসম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের ওপর পড়ে।

প্রত্যেক নাগরিক নিজের দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। যেমন, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, জল অপচয় রোধ করা, গাছ লাগানো, বর্জ্য আলাদা করে ফেলা এবং নদী বা জলাশয়ে আবর্জনা না ফেলা।

পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব ব্যক্তির পাশাপাশি সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনেরও। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

৮. বৈজ্ঞানিক মনোভাব ও মানবতাবাদ গড়ে তোলা

ভারতীয় সংবিধান নাগরিকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব, মানবতাবাদ, অনুসন্ধিৎসা এবং সংস্কারমুখী চিন্তাভাবনা বিকাশের কথা বলে।

বৈজ্ঞানিক মনোভাবের অর্থ হলো কোনো তথ্য বা দাবিকে শুধু প্রচলিত বিশ্বাসের কারণে সত্য বলে ধরে না নেওয়া। পর্যবেক্ষণ, প্রমাণ, যুক্তি এবং যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা।

সমাজে নানা ধরনের গুজব, কুসংস্কার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর দেখলেই তা সত্য বলে প্রচার করা উচিত নয়। তথ্যের উৎস যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

মানবতাবাদ মানুষকে মানুষের মর্যাদা, দুঃখ-কষ্ট এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবোধ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে থাকলে সমাজ আরও সচেতন ও ন্যায়সংগত হয়ে উঠতে পারে।

৯. সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা ও হিংসা পরিহার করা

সরকারি সম্পত্তি জনগণের অর্থে তৈরি হয় এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য পরিচালিত হয়। রাস্তা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বাস, সরকারি ভবন এবং গ্রন্থাগার তার উদাহরণ।

সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা হলে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরই হয়। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা জনপরিষেবা ধ্বংসের ফলে বহু মানুষ প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রতিবাদ করার সময় জনসম্পত্তি ধ্বংস বা হিংসার আশ্রয় না নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।

জনসম্পত্তি রক্ষা করা মানে জনগণের নিজের সম্পদ রক্ষা করা। এই বোধ গড়ে উঠলে সরকারি সম্পদের অপচয় কমানো এবং পরিষেবার মান উন্নত করা সহজ হয়।

১০. ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত কাজে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করা

সংবিধানের মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করতে উৎসাহিত করে। এর উদ্দেশ্য হলো, দেশ যেন ক্রমাগত উন্নতির উচ্চতর স্তরে পৌঁছাতে পারে।

একজন শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করলে, একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে পড়ালে, একজন কৃষক আধুনিক ও উপযুক্ত পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলে এবং একজন কর্মী দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সমাজের সামগ্রিক উন্নতি হয়।

উৎকর্ষ অর্জন মানে সব সময় প্রথম হওয়া নয়। এর অর্থ হলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উন্নতি করার চেষ্টা করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং কাজের মান বাড়ানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে পরিশ্রম করা।

ব্যক্তিগত উৎকর্ষ যখন সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার সুফল বৃহত্তর সমাজ পায়।

১১. ছয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সি সন্তানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা

২০০২ সালের ৮৬তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া একাদশ মৌলিক কর্তব্য অনুযায়ী, পিতা-মাতা বা অভিভাবকের কর্তব্য হলো তাঁদের সন্তান বা অভিভাব্যকে ছয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ প্রদান করা।

শিক্ষা শিশুর ব্যক্তিত্ব, চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানোই শুধু যথেষ্ট নয়; তার শেখার পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতার প্রতিও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক অসুবিধা, সামাজিক বাধা কিংবা পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেক শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ এবং প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগে এই বাধাগুলি কমানো দরকার।

শিক্ষা সম্পর্কে অভিভাবকের সচেতনতা বাড়লে শিশুর ভবিষ্যৎ উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং সমাজেও শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

মৌলিক অধিকার ও মৌলিক কর্তব্যের সম্পর্ক

মৌলিক অধিকার এবং মৌলিক কর্তব্য ভারতীয় সংবিধানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মৌলিক অধিকার নাগরিকদের স্বাধীনতা, সমতা এবং মর্যাদা রক্ষার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেয়। অন্যদিকে, মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি সমাজ এবং দেশের প্রতিও তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে।

যেমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একজন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো বা বিদ্বেষমূলক আচরণ করা সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একইভাবে, পরিবেশ রক্ষার কর্তব্য পালন করার জন্য নাগরিকদের সচেতনতা দরকার, আবার পরিবেশ দূষণ থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য কার্যকর আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৌলিক কর্তব্যের সবকটি সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়। তবে সংসদ ও রাজ্য আইনসভা সাংবিধানিক সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন করতে পারে, এবং কিছু কর্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আইনগত বিধান আগে থেকেই রয়েছে। তাই মৌলিক কর্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক উপদেশ হিসেবে দেখলে তার সাংবিধানিক গুরুত্ব সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না।

শিক্ষার্থীদের জীবনে মৌলিক কর্তব্যের গুরুত্ব

শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের নাগরিক। ছোটবেলা থেকে মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে উঠতে পারে।

বিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও সংবিধানের প্রতি সম্মান, পরিবেশ রক্ষা, জনসম্পত্তি সংরক্ষণ এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধার মতো বিষয়গুলি বাস্তব কাজের মাধ্যমে শেখানো যায়।

যেমন, বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সহপাঠীদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক আচরণ করা, গাছের যত্ন নেওয়া এবং গুজব না ছড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এসব কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে যে নাগরিক দায়িত্ব শুধু বড়দের বিষয় নয়।

শিক্ষকেরা সংবিধানের মৌলিক কর্তব্যকে দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণের সঙ্গে যুক্ত করে পড়ালে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি আরও সহজে বুঝতে পারবে। এতে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বাস্তব জীবনে সাংবিধানিক মূল্যবোধ প্রয়োগের অভ্যাস তৈরি হবে।

মৌলিক কর্তব্য পালনে গণমাধ্যমের ভূমিকা

গণমাধ্যম নাগরিকদের তথ্য প্রদান এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে সংবিধানের মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

গণমাধ্যম পরিবেশ সংরক্ষণ, জনসম্পত্তি রক্ষা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব, নারীসম্মান এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। বাস্তব উদাহরণ ও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করলে মানুষ বুঝতে পারেন, দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে মৌলিক কর্তব্য পালন করা যায়।

তবে গণমাধ্যমের নিজেরও দায়িত্ব রয়েছে। তথ্য যাচাই করা, ভুল তথ্য সংশোধন করা এবং বিভেদমূলক বক্তব্যের প্রচারে সতর্ক থাকা জরুরি। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন নাগরিকদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও উচিত তথ্য যাচাই না করে কোনো বার্তা বা ভিডিও ছড়িয়ে না দেওয়া। ডিজিটাল নাগরিকত্বের সঙ্গে সংবিধানসম্মত মূল্যবোধের সম্পর্ক ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মৌলিক কর্তব্য পালনের পথে বাধা

মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সব নাগরিক সমানভাবে সচেতন নন। অনেকের কাছে সংবিধানের এই অংশ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। আবার অনেকে কর্তব্যকে শুধু জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন।

পরিবেশ দূষণ, জনসম্পত্তির ক্ষতি, সামাজিক বিদ্বেষ, গুজব এবং অসহিষ্ণু আচরণের মতো সমস্যাগুলি দেখায় যে নাগরিক দায়িত্ববোধকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

কখনও কখনও মানুষ মনে করেন, দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করা শুধু সরকার বা প্রশাসনের কাজ। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, নাগরিকদের কর্তব্যের কথা বলে রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব বা নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে উপেক্ষা করাও সঠিক নয়।

তাই অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নাগরিক শিক্ষা বিস্তার করা দরকার। পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান—সবাই এই কাজে ভূমিকা রাখতে পারে।

কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে মৌলিক কর্তব্য পালন করা যায়?

মৌলিক কর্তব্য পালন করার জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমেও এর বাস্তবায়ন সম্ভব।

  • সংবিধান, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের মর্যাদা রক্ষা করা।
  • ধর্ম, ভাষা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্যকে অপমান না করা।
  • গাছ লাগানো, জল অপচয় কমানো এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখা।
  • সরকারি বাস, রাস্তা, বিদ্যালয় ও অন্যান্য জনসম্পত্তি যত্নে ব্যবহার করা।
  • কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা।
  • নারী ও পুরুষের মর্যাদা ও সমানাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো।
  • নিজের কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা।
  • সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হওয়া।
  • শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে মতপ্রকাশ করা।
  • সামাজিক সমস্যার সমাধানে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করা।

এই অভ্যাসগুলি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

উপসংহার

ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের সামনে একটি দায়িত্বশীল ও সচেতন সমাজ গঠনের পথ তুলে ধরে। এগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দেশকে ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দৈনন্দিন আচরণ, সামাজিক দায়িত্ব, পরিবেশের প্রতি যত্ন এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা।

একজন নাগরিক যখন অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন, জনসম্পত্তি রক্ষা করেন, বৈজ্ঞানিক মনোভাব গ্রহণ করেন এবং নিজের কাজের উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করেন, তখন তিনি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখেন। একইভাবে, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, নারীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও একটি উন্নত সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে মৌলিক কর্তব্যের গুরুত্ব বোঝার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, নাগরিকের কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পরস্পরের পরিপূরক। নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ যেমন প্রয়োজন, তেমনই অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থে কাজ করার জন্য রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।

তাই প্রত্যেকের উচিত সংবিধানকে শুধু পরীক্ষার বিষয় হিসেবে না দেখে জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে বোঝার চেষ্টা করা। মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং সেগুলিকে দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আরও সচেতন, মানবিক, ঐক্যবদ্ধ ও দায়িত্বশীল ভারত।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় মানুষের জীবন: সংকট, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ।

প্রকৃতি মানুষের জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন। নদী, সমুদ্র, বনভূমি, পাহাড়, মাটি ও জলবায়ুকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতা। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতি, নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, বন ধ্বংস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পৃথিবীর জলবায়ুতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবীর সর্বত্র অনুভূত হলেও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

ভারতের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন ও পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে সমুদ্র, নদী, মাছ, কৃষি ও পর্যটনের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততার বিস্তার এবং নদীভাঙনের মতো সমস্যা তাঁদের জীবনকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে।

জলবায়ু পরিবর্তন তাই কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সংকট।

জলবায়ু পরিবর্তন বলতে কী বোঝায়?

দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের ধরন এবং আবহাওয়ার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে, তাকে জলবায়ু পরিবর্তন বলা হয়। প্রাকৃতিক কারণেও জলবায়ুর পরিবর্তন হতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।

কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি, শিল্প, পরিবহণ ও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড থেকেও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। এই গ্যাসগুলি পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলে আটকে রাখে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।

এর প্রভাব পড়ে সমুদ্র, নদী, হিমবাহ, বনভূমি এবং মানুষের বসবাসের পরিবেশের ওপর। বিশেষ করে সমুদ্রের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় বিপদ

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়লে সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়ে প্রসারিত হয়। পাশাপাশি হিমবাহ ও বরফের স্তর গলে সমুদ্রে অতিরিক্ত জল যুক্ত হয়। এই দুই প্রক্রিয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের নিচু এলাকাগুলিতে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। সমুদ্রের জল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভেতরে প্রবেশ করলে কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং পানীয় জলের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জোয়ারের জল অনেক সময় নদী ও খাল উপচে গ্রামে ঢুকে পড়ে।

সুন্দরবনের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে নদীভাঙন ও লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। কোথাও কোথাও মানুষকে বসতভিটে ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন জায়গায় বসবাস শুরু করা সহজ নয়। সেখানে কাজের সুযোগ, বাসস্থান, শিক্ষা এবং সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুই নতুন করে গড়ে তুলতে হয়।

ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাড়তি ঝুঁকি

উপকূলীয় মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় নতুন কোনো ঘটনা নয়। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বহু বছর ধরেই ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। তবে উষ্ণ সমুদ্র ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারী বৃষ্টিপাত, সমুদ্রের উচ্চ জলস্তর এবং ঝড়ের সঙ্গে যুক্ত জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়লে শুধু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ভেঙে যায় বিদ্যুতের খুঁটি, নষ্ট হয় রাস্তাঘাট, ডুবে যায় কৃষিজমি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাছ ধরার নৌকা। অনেক সময় পানীয় জলের উৎস নোনা জলে দূষিত হয়ে পড়ে।

একটি দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে উপকূলের দরিদ্র পরিবারগুলির দীর্ঘ সময় লাগে। যাঁদের সঞ্চয় কম, তাঁদের পক্ষে নতুন ঘর তৈরি করা বা জীবিকা পুনরায় শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে। ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেকে আরও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে পড়েন।

তাই দুর্যোগের আগে সতর্কবার্তা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধারব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

উপকূলীয় এলাকার বহু মানুষের জীবিকা কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিকাজ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত ঋতুচক্র কৃষি উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে সমুদ্রের নোনা জল কৃষিজমিতে প্রবেশ করলে মাটির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সাধারণ ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং উৎপাদন কমে যেতে পারে। জমি দীর্ঘদিন লবণাক্ত থাকলে তা পুনরায় চাষযোগ্য করে তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে।

কৃষকেরা অনেক সময় আবহাওয়ার পুরোনো অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চাষের সময় নির্ধারণ করেন। কিন্তু বৃষ্টিপাতের ধরন অনিয়মিত হলে সেই অভিজ্ঞতা সব সময় কাজে আসে না। বীজ বোনা, সার প্রয়োগ, সেচ এবং ফসল কাটার সময়ে ভুল হলে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, উন্নত বীজ, জল সংরক্ষণ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কৃষকদের আবহাওয়া-সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও তাঁদের ঝুঁকি কমাতে পারে।

মৎস্যজীবীদের জীবন ও জীবিকার সংকট

সমুদ্র ও নদী উপকূলের মৎস্যজীবীদের কাছে শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি তাঁদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির অংশ। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাছ ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাঁদের জীবিকাও নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

সমুদ্রের তাপমাত্রা, স্রোত, বৃষ্টিপাত এবং জলজ পরিবেশের পরিবর্তন মাছের বিস্তার ও প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আগের পরিচিত মাছ ধরার এলাকায় পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে দূরে মাছ ধরতে যাওয়াও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, ঝড়ের সতর্কবার্তা জারি হলে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। নিরাপত্তার জন্য এই সিদ্ধান্ত জরুরি হলেও মাছ ধরতে না পারলে দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক পরিবারকে তখন ধার করে সংসার চালাতে হয়।

মৎস্যজীবীদের জন্য আবহাওয়ার আগাম তথ্য, নিরাপদ নৌযান, জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম, বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত বিমা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পাশাপাশি মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ ও নিয়ম মেনে মাছ ধরার ব্যবস্থাও জোরদার করা দরকার।

সুন্দরবন: প্রকৃতির রক্ষাকবচ

সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এই বনভূমি অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, মাছ এবং অসংখ্য জলজ প্রাণী সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড় নদীর পাড়ের মাটি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই বন ঝড়ের বাতাস ও ঢেউয়ের শক্তি কিছুটা কমাতে পারে এবং উপকূলীয় পরিবেশকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বন থেকে মধু, মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য সম্পদের মাধ্যমে বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে।

কিন্তু লবণাক্ততার পরিবর্তন, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিভিন্ন চাপ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু বন্যপ্রাণী নয়, মানুষের নিরাপত্তাও বিপন্ন হয়।

তাই সুন্দরবন সংরক্ষণকে কেবল বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। পরিকল্পিত ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, অবৈধ বন ধ্বংস রোধ এবং স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণকাজে যুক্ত করা জরুরি।

পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব হলো নিরাপদ পানীয় জলের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের নোনা জল নদী, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ জলে প্রবেশ করলে পানীয় জলের সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশুদ্ধ জলের অভাবে মানুষকে দূরের উৎস থেকে জল সংগ্রহ করতে হয়। এতে বিশেষত নারী, শিশু এবং প্রবীণদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। গৃহস্থালির কাজ, রান্না ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে যায়।

দূষিত জল ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়া ও অন্যান্য জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তীব্র গরমে পানিশূন্যতা, ক্লান্তি এবং তাপজনিত অসুস্থতার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। দুর্যোগের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

এই সমস্যা মোকাবিলায় বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, জল পরিশোধন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নতি এবং দুর্যোগের সময় চিকিৎসা পরিষেবা সচল রাখা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে জলবাহিত রোগ ও তাপজনিত অসুস্থতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

নারী ও শিশুদের ওপর বিশেষ প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমাজের সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। দরিদ্র পরিবার, নারী, শিশু, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক সময় বেশি সমস্যার মুখে পড়েন।

দুর্যোগের সময় নারীদের নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, পানীয় জল এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবারের পুরুষ সদস্য জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে নারীদের ওপর সংসার পরিচালনা ও শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব বেড়ে যেতে পারে।

শিশুদের শিক্ষা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাহত হয়। স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হলে পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি তৈরি হতে পারে। অপুষ্টি, মানসিক চাপ এবং নিরাপদ পরিবেশের অভাবও তাদের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনায় নারী ও শিশুদের বিশেষ প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুলে দুর্যোগ-সচেতনতা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে শিশু-বান্ধব ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিক্ষাসহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।

জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও মানুষের মানসিক চাপ

যখন নদীভাঙন, লবণাক্ততা বা ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ নিজের বাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হন, তখন তাঁদের জীবনে গভীর পরিবর্তন ঘটে। এই স্থানান্তর কখনও সাময়িক, কখনও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।

নিজের জমি, বাড়ি, পুকুর, গাছপালা এবং পরিচিত প্রতিবেশীদের ছেড়ে চলে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টের। অনেক পরিবারের কাছে পৈতৃক ভিটে শুধু বসবাসের জায়গা নয়; তা তাঁদের স্মৃতি, পরিচয় এবং সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্র।

অন্যত্র গিয়ে কাজ পাওয়া, বাড়ি ভাড়া নেওয়া, সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করা এবং নতুন সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে। শহরের প্রান্তে অস্থায়ী বা অনিরাপদ বসতিতে থাকতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সমস্যাও বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বাস্তুচ্যুত মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং তাঁদের অধিকারকে সম্মান করা জরুরি। পুনর্বাসনের পরিকল্পনায় তাঁদের মতামত নিতে হবে। নিরাপদ বাসস্থান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে শুধু স্থান পরিবর্তন করিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব

দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুর ও শঙ্করপুরের মতো উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহণ, দোকান, মাছের ব্যবসা এবং স্থানীয় পরিষেবার মাধ্যমে বহু পরিবার জীবিকা অর্জন করে।

কিন্তু সমুদ্রতটের ক্ষয়, প্রবল ঢেউ, ঘূর্ণিঝড় এবং অবকাঠামোর ক্ষতি পর্যটনশিল্পকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনও বড় দুর্যোগের পর হোটেল ও দোকান বন্ধ থাকলে কর্মীদের আয় কমে যায়। রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পর্যটকদের যাতায়াতও ব্যাহত হয়।

এই সমস্যা মোকাবিলায় উপকূলীয় নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত নিয়ম মানা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিকল্পনাহীন নির্মাণ রোধ এবং দুর্যোগ-সহনশীল পরিকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। পর্যটনকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হয় কিন্তু প্রকৃতির ক্ষতি না হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় সমস্যার সমাধান শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব নয়। এর জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পঞ্চায়েত, বিজ্ঞানী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

প্রথমত, উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কোথায় নদীভাঙনের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় লবণাক্ততার সমস্যা গুরুতর এবং কোন এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সময় দ্রুত উদ্ধার প্রয়োজন—এই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, মজবুত রাস্তা, নিরাপদ পানীয় জল, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সতর্কবার্তা এমন ভাষায় ও মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও তা বুঝতে পারেন।

তৃতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিপূরণ ও সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে যুক্ত করতে হবে। শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি সামলানো নয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোও প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব।

সাধারণ মানুষের করণীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় সাধারণ মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও ব্যক্তিগত উদ্যোগ একা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থামাতে পারে না, তবু সম্মিলিত সচেতনতা পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।

আমাদের অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে হবে, সম্ভব হলে শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে এবং গণপরিবহণ বা পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা এবং স্থানীয় জলাভূমি ও জলাশয় সংরক্ষণও জরুরি।

প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নদী, খাল বা সমুদ্রে ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে।

গ্রাম ও শহরের স্কুলে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশ সংরক্ষণ, জল সাশ্রয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো কাজে অংশ নিতে পারে। তবে সচেতনতার পাশাপাশি সরকারের কাছে কার্যকর নীতি ও জবাবদিহি দাবি করাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

জলবায়ু ন্যায়বিচার: দায় ও অধিকারের প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু ন্যায়বিচার। পৃথিবীর সব মানুষ সমানভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করেন না, আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিও সবাই সমানভাবে বহন করেন না।

যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য কম, যাঁদের বাসস্থান ঝুঁকিপূর্ণ এবং যাঁদের জীবিকা সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের পক্ষে দুর্যোগের ক্ষতি সামলে ওঠা সবচেয়ে কঠিন। উপকূলের একজন ক্ষুদ্র কৃষক বা মৎস্যজীবীর কাছে একটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে।

তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধানে শুধু নির্গমন কমানোর কথা বললে চলবে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা, নিরাপদ জীবিকা এবং উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত দেশ ও বেশি নির্গমনকারী অর্থনীতিগুলিরও জলবায়ু মোকাবিলায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল কথা হলো—যাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের কথা শুনতে হবে এবং তাঁদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

উপসংহার

জলবায়ু পরিবর্তন আজ মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলীয় মানুষের জীবন এই সংকটের বাস্তব চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, কৃষির ক্ষতি এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা তাঁদের প্রতিদিনের সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলছে।

তবে এই সংকট মোকাবিলার পথও রয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি, উন্নত পরিকাঠামো, বিকল্প জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিশ্বজুড়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপকূলীয় মানুষকে শুধু দুর্যোগের শিকার হিসেবে দেখা যাবে না। তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা জলবায়ু মোকাবিলার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে মানুষের জীবনকে রক্ষা করা। উপকূলের মানুষ নিরাপদ থাকলে, তাঁদের জীবিকা সুরক্ষিত হলে এবং প্রকৃতি তার ভারসাম্য ফিরে পেলে তবেই উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়তে হলে আজ থেকেই আমাদের দায়িত্বশীল ও সচেতন পদক্ষেপ নিতে হবে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: মানবসভ্যতার নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার পথ।

পৃথিবী মানুষের একমাত্র পরিচিত বাসস্থান। এই পৃথিবীতে নানা ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতি ও ঐতিহ্যের মানুষ বসবাস করেন। প্রত্যেক দেশের ইতিহাস আলাদা, মানুষের জীবনযাত্রা আলাদা এবং জাতীয় স্বার্থও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও মানুষের মৌলিক চাহিদা প্রায় একই—নিরাপদে বেঁচে থাকা, পরিবারকে ভালো রাখা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করা।

দুঃখের বিষয়, মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে যুদ্ধ, হিংসা, দখলদারি, জাতিগত সংঘাত এবং রাজনৈতিক বিরোধ বারবার মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনকে বিপন্ন করেছে। যুদ্ধের ফলে শুধু সৈনিকদের মৃত্যু হয় না; সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি হারান, শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ভয়াবহতা এই বিপদকে আরও গভীর করেছে।

বর্তমান বিশ্বে কোনও দেশই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে না। খাদ্য, জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি এক দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশের জীবনকেও প্রভাবিত করে। তাই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি আজ মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।

বিশ্বশান্তি মানে শুধু যুদ্ধ না হওয়া নয়; এর অর্থ হলো ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবাধিকার, সহযোগিতা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবেশ গড়ে তোলা।

বিশ্বশান্তি বলতে কী বোঝায়?

বিশ্বশান্তি বলতে এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে দেশগুলির মধ্যে বিরোধ থাকলেও তা সমাধানের জন্য যুদ্ধ বা হিংসার পরিবর্তে আলোচনা, কূটনীতি, আইন এবং সহযোগিতার পথ অনুসরণ করা হয়।

বিশ্বশান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। কোনও দেশ যেন অন্য দেশের উপর অন্যায়ভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে, সেই নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিশ্বশান্তি কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের অনুপস্থিতি দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি দেশে যদি দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলে, কোনও জনগোষ্ঠী যদি নিপীড়নের শিকার হয় কিংবা লক্ষ লক্ষ মানুষ যদি খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ভোগেন, তাহলে সেখানে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা যায় না।

শান্তির সঙ্গে ন্যায়বিচার, মানুষের মর্যাদা এবং সমান সুযোগের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যায় ও বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে সমাজে ক্ষোভ জমে এবং সংঘাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

তাই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একদিকে যেমন সামরিক সংঘাত প্রতিরোধ করতে হবে, অন্যদিকে দারিদ্র্য, বৈষম্য, বৈরিতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো সমস্যার সমাধানেও গুরুত্ব দিতে হবে।

যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয়

যুদ্ধ মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়গুলির মধ্যে অন্যতম। যুদ্ধের সময় একটি দেশের সামরিক শক্তি যত বড়ই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এড়ানো অত্যন্ত কঠিন।

বোমাবর্ষণ, গোলাগুলি এবং অন্যান্য সামরিক অভিযানে ঘরবাড়ি, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হতে পারে। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। অনেক পরিবার বছরের পর বছর শরণার্থীশিবিরে বসবাস করে।

যুদ্ধের প্রভাব শিশুদের উপর বিশেষভাবে গুরুতর। তারা বাবা-মাকে হারাতে পারে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাতের শিকার হতে পারে। যুদ্ধের স্মৃতি বহু মানুষের জীবনে দীর্ঘকাল ধরে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য দেশেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব কেবল সংঘাতে জড়িত দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

যুদ্ধের ক্ষতি পূরণ করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, কর্মসংস্থান এবং জনকল্যাণে ব্যবহার করা যেত। তাই যুদ্ধ প্রতিরোধ করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বলতে বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টাকে বোঝায়।

বর্তমান পৃথিবীর বহু সমস্যা একক দেশের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক রোগ, সমুদ্রদূষণ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সাইবার অপরাধ এবং খাদ্যসংকটের মতো বিষয়গুলিতে দেশগুলির সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি দেশের শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষণ অন্য দেশের পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে কোনও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক রোগ আন্তর্জাতিক যাতায়াতের মাধ্যমে দ্রুত অন্য দেশে পৌঁছে যেতে পারে। তাই তথ্য বিনিময়, গবেষণা, সম্পদ ভাগ করে নেওয়া এবং যৌথ পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শুধু সংকট মোকাবিলার জন্য নয়; এটি শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির উন্নয়নেও সাহায্য করে। এক দেশের গবেষণার ফল অন্য দেশের মানুষের জীবনকে উন্নত করতে পারে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করলে নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান ঘটে।

সহযোগিতার মাধ্যমে দেশগুলি নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি বৃহত্তর মানবিক স্বার্থের প্রতিও দায়িত্ব পালন করতে পারে।

জাতিসংঘের ভূমিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠা করা।

জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশের মধ্যে আলোচনা ও কূটনীতির ক্ষেত্র তৈরি করে। নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিস্থিতি অনুযায়ী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযান পরিচালনা করতে পারে, যাতে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালানো যায়।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু কল্যাণ, খাদ্য সহায়তা এবং শরণার্থীদের সুরক্ষার মতো বিষয়েও কাজ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে, ইউনিসেফ শিশুদের অধিকার ও কল্যাণে ভূমিকা রাখে এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সংকটাপন্ন অঞ্চলে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে।

তবে জাতিসংঘের কাজ সব সময় সহজ হয় না। সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা অনেক সময় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।

তাই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীল করে তোলা প্রয়োজন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের স্বাধীন উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনীতি ও আলোচনার গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক বিরোধ সমাধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলির একটি হলো কূটনীতি। কূটনীতির মাধ্যমে দেশগুলি নিজেদের স্বার্থ, উদ্বেগ ও দাবিদাওয়া অন্য দেশের সামনে তুলে ধরে এবং পারস্পরিক সমঝোতার পথ খোঁজে।

দুটি দেশের মধ্যে সীমান্ত, জলবণ্টন, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে আলোচনা শুরু করা উচিত। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা তৃতীয় কোনও দেশের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

কূটনীতির সাফল্যের জন্য ধৈর্য, বাস্তববোধ এবং পারস্পরিক আস্থা প্রয়োজন। আলোচনার টেবিলে বসা মানেই সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। বরং মতভেদ থাকা সত্ত্বেও এমন সমাধান খোঁজা, যাতে সংঘাতের ঝুঁকি কমে এবং উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য স্বার্থ রক্ষা পায়।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতার শর্তগুলি যথাযথভাবে পালন করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও দেশ যদি বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তাহলে পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল হয় এবং ভবিষ্যৎ আলোচনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই কূটনীতিকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে নয়, বরং বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় হিসেবে দেখা উচিত।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিশ্বশান্তি

অর্থনৈতিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং যৌথ উন্নয়নমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়।

যখন দেশগুলি একে অপরের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকে, তখন সংঘাতের ফলে উভয় পক্ষের ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর বাস্তব প্রণোদনা তৈরি হয়।

তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেই যুদ্ধ বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইতিহাসে দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দেশগুলির মধ্যে সংঘাত ঘটেছে। তাই অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ন্যায়সঙ্গত সম্পর্ক, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসের উপর। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।

এ ছাড়া বাণিজ্যের সুবিধা যেন শুধু বড় প্রতিষ্ঠান বা শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। ক্ষুদ্র উৎপাদক, কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুফল আরও বিস্তৃত হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি সমস্যা, যার প্রভাব কোনও দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া, চরম আবহাওয়ার ঘটনা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে প্রভাবিত করছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। অন্যদিকে খরাপ্রবণ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং পানীয় জলের সংকট বাড়তে পারে।

এই সমস্যার সমাধানে দেশগুলিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

উন্নত দেশগুলির ঐতিহাসিক নির্গমন, উন্নয়নশীল দেশগুলির উন্নয়নের প্রয়োজন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি বিবেচনা করে ন্যায্য সমাধান খুঁজতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য ভাগ করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই বৈশ্বিক সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।

বিজ্ঞান, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন মানবসভ্যতাকে নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু গবেষণার অনেক ক্ষেত্র এতটাই জটিল ও ব্যয়বহুল যে একক দেশের পক্ষে সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন।

মহাকাশ গবেষণা, নতুন ওষুধ আবিষ্কার, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, সমুদ্রবিজ্ঞান, কৃষি গবেষণা এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা তথ্য বিনিময় করলে গবেষণার গতি বাড়ে এবং নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অন্য দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রগুলিতে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও নৈতিকতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল কিছু শক্তিশালী দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা দরকার।

জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ায়। এর মাধ্যমে দেশগুলি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পাশাপাশি অভিন্ন সমস্যার সমাধানে সহযোগী হিসেবেও কাজ করতে পারে।

সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা

দেশগুলির মধ্যে সংঘাতের একটি কারণ হতে পারে ভুল ধারণা, বিদ্বেষ এবং অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা। সাংস্কৃতিক বিনিময় এই দূরত্ব কমাতে সাহায্য করে।

সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা, শিল্পকলা এবং পর্যটনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মানুষ একে অপরের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হন। এতে বোঝা যায়, ভাষা বা সংস্কৃতি আলাদা হলেও মানুষের আনন্দ, দুঃখ, ভালোবাসা এবং নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বহু মিল রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং যৌথ শিল্পকর্ম মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়াতে পারে। খেলাধুলার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও বিভিন্ন দেশের মানুষকে একই মঞ্চে নিয়ে আসে।

তবে সাংস্কৃতিক বিনিময় মানে নিজের সংস্কৃতি ত্যাগ করা নয়। বরং নিজের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে অন্যের সংস্কৃতিকেও সম্মান করা।

জাতি, ধর্ম, ভাষা কিংবা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্য মানুষকে হেয় করার প্রবণতা কমাতে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংলাপের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও মানবিক ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

শরণার্থী ও মানবিক সংকটে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব

যুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যান্য সংকটের কারণে বহু মানুষ নিজের দেশ বা বাসস্থান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসা, আশ্রয় এবং শিক্ষার অভাবে ভোগেন।

শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যা কোনও এক দেশের পক্ষে সব সময় একা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মানবিক সাহায্য প্রদানের সময় মানুষের ধর্ম, জাতীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করা উচিত নয়। বিপদের সময় মানুষের জীবন রক্ষা করাই প্রধান বিবেচনা হওয়া প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও শরণার্থী সুরক্ষার নীতিগুলি সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ, চিকিৎসাকর্মী এবং মানবিক সহায়তাকারীদের নিরাপত্তার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানের জন্য শুধু ত্রাণ দিলেই যথেষ্ট নয়। নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, স্থানীয় সমাজে অন্তর্ভুক্তি অথবা অন্যত্র স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ—পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে।

মানবিক সহযোগিতা বিশ্বশান্তির একটি অপরিহার্য অংশ, কারণ মানুষের দুর্দশার প্রতি উদাসীনতা আন্তর্জাতিক সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।

পারমাণবিক অস্ত্র ও নিরস্ত্রীকরণের প্রয়োজন

আধুনিক পৃথিবীতে পারমাণবিক অস্ত্র মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার হলে বিপুল প্রাণহানি, দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত ক্ষতি এবং বহু প্রজন্ম ধরে স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। দেশগুলির মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি, সামরিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ভুল বোঝাবুঝি প্রতিরোধের ব্যবস্থা সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে পারে।

অনেক দেশ নিজেদের নিরাপত্তার যুক্তিতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। কিন্তু অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে অন্য দেশও পাল্টা অস্ত্র বাড়াতে পারে। এতে নিরাপত্তার পরিবর্তে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়।

তাই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বাস্তব প্রয়োজনের পাশাপাশি নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সব দেশের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কোনও দেশ নিজেকে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে বলে মনে না করে এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কমে।

ভারত ও বিশ্বশান্তির আদর্শ

ভারতের ইতিহাসে শান্তি, সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে। স্বাধীনতার পর ভারত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং উপনিবেশবাদের বিরোধিতার মতো নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারতের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শীতল যুদ্ধের সময় বৃহৎ শক্তিগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা।

ভারত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণ করে আসছে। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগিতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সহযোগিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, নদী, বাণিজ্য এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ রয়েছে। তাই সীমান্ত, জলবণ্টন, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে মতভেদ দেখা দিলেও আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি।

ভারতসহ বিশ্বের সব দেশেরই উচিত আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা, মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা এবং অভিন্ন সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা করা।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সাধারণ মানুষের ভূমিকা

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার নয়। সাধারণ মানুষও নিজেদের আচরণ, চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গঠনে অবদান রাখতে পারেন।

প্রথমত, অন্য দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি করতে হবে। অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ভুল ধারণা ও বিদ্বেষ কমাতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়ো খবর কিংবা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনও আন্তর্জাতিক ঘটনা সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা উচিত।

তৃতীয়ত, ধর্ম, ভাষা, জাতি বা জাতীয় পরিচয়ের কারণে কোনও মানুষকে হেয় করা উচিত নয়। নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদার প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে।

চতুর্থত, শান্তি, মানবাধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলির উদ্যোগে অংশ নেওয়া যেতে পারে।

পঞ্চমত, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহমর্মিতা, সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের শিক্ষা দিতে হবে।

পরিবারে, বিদ্যালয়ে এবং সমাজে শান্তিপূর্ণ আচরণের অভ্যাস তৈরি হলে তার ইতিবাচক প্রভাব বৃহত্তর সমাজেও পড়ে। বিশ্বশান্তির সূচনা তাই অনেক সময় মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকেই হয়।

উপসংহার

বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মানবসভ্যতার নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য অপরিহার্য। যুদ্ধ ও সংঘাত মানুষের জীবন, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করে। অন্যদিকে আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহযোগিতা দেশগুলির মধ্যে আস্থা গড়ে তোলে এবং অভিন্ন সমস্যার সমাধানের পথ খুলে দেয়।

বর্তমান পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, মহামারি, খাদ্যসংকট, শরণার্থী সমস্যা এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকির মতো বিষয়গুলি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন। তাই দেশগুলিকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বৃহত্তর মানবিক স্বার্থের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু অস্ত্র কমানো বা যুদ্ধ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ, সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধা এবং দুর্বল মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রকৃত শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন মানুষ ভয় ও বৈষম্যের মধ্যে নয়, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

পৃথিবীর সব দেশ ও মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকবেই। কিন্তু সেই মতভেদকে যুদ্ধের কারণ না করে আলোচনার সুযোগে পরিণত করাই মানবসভ্যতার পরিণত পরিচয়। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে এমন এক পৃথিবী, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের আতঙ্ক নয়, শান্তি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে বড় হবে।

বিশ্বশান্তি কোনও একক দেশের সাফল্য নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত অর্জন। তাই শান্তির পক্ষে দাঁড়ানো, সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়া এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

গণতন্ত্রে নাগরিক অংশগ্রহণ: সচেতন মানুষের হাতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি।

গণতন্ত্র শুধু একটি শাসনব্যবস্থার নাম নয়; এটি মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ। গণতন্ত্রে জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির উৎস। জনগণের মতামত, ভোটাধিকার এবং অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয় ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। কিন্তু গণতন্ত্রের সার্থকতা কেবল নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে নাগরিকদের প্রতিদিনের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

একটি দেশের নাগরিকেরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, প্রশাসনের কাজকর্ম সম্পর্কে খোঁজ রাখেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন এবং সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নেন, তাহলে সেই দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে, নাগরিকেরা যদি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েন, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন কিংবা জনজীবনের সমস্যা নিয়ে কোনও আগ্রহ না দেখান, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে নয়, বরং সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিকদের মধ্যেও নিহিত। নাগরিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব বোঝা এবং সেই অংশগ্রহণকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করা আধুনিক সমাজের অন্যতম প্রধান প্রয়োজন।

গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ

গণতন্ত্রের সাধারণ অর্থ হলো জনগণের শাসন। এই ব্যবস্থায় জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রে সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনকল্যাণমূলক নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমান নাগরিক মর্যাদা, মানবাধিকার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সরকার কী কাজ করছে, সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং জনসাধারণের সমস্যার সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে নাগরিকদের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে।

গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে এমন একটি পরিবেশের উপর, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন, ভিন্নমতকে সম্মান করা হয় এবং আইন মেনে সকলের অধিকার রক্ষা করা হয়।

নাগরিক অংশগ্রহণ বলতে কী বোঝায়?

নাগরিক অংশগ্রহণ বলতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা পালনকে বোঝায়। ভোট দেওয়া এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত।

নাগরিকেরা স্থানীয় এলাকার রাস্তা, পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁরা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাতে পারেন, জনশুনানিতে অংশ নিতে পারেন, আইনসম্মতভাবে প্রতিবাদ করতে পারেন এবং সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হতে পারেন।

কোনও এলাকায় বিদ্যালয়ের অবস্থা খারাপ হলে, পানীয় জলের সমস্যা দেখা দিলে কিংবা সরকারি পরিষেবা পেতে অসুবিধা হলে নাগরিকেরা সম্মিলিতভাবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেন। এর ফলে প্রশাসন সমস্যার প্রকৃত চিত্র বুঝতে পারে এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে।

নাগরিক অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অন্য মানুষের অধিকার ও প্রয়োজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। নিজের সুবিধার পাশাপাশি সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের কথাও বিবেচনা করা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

ভোটাধিকার ও সচেতন নির্বাচন

গণতন্ত্রে ভোটাধিকার নাগরিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ তাঁদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশ নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।

তবে শুধু ভোট দেওয়াই যথেষ্ট নয়; সচেতনভাবে ভোট দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থীর কাজ, যোগ্যতা, জনসেবার মানসিকতা এবং তাঁর ঘোষিত কর্মসূচি সম্পর্কে জানা উচিত। কোনও প্রার্থী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অতীতে কী কাজ করেছেন এবং জনস্বার্থের বিষয়ে তাঁর অবস্থান কী—এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ধর্ম, জাতি, ভাষা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে জনস্বার্থ, সততা, যোগ্যতা এবং উন্নয়নের বাস্তব পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

নির্বাচনের সময় গুজব, ভুয়ো খবর, প্রলোভন কিংবা ভয় দেখানোর মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। নাগরিকদের উচিত এ ধরনের প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

একটি সচেতন ভোট শুধু একজন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রশাসন, উন্নয়ন এবং জননীতির উপরও প্রভাব ফেলে। তাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করা নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সংবিধান ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রের কাঠামো এবং শাসনব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলি নির্ধারণ করে। ভারতের সংবিধান নাগরিকদের বিভিন্ন মৌলিক অধিকার প্রদান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার।

এই অধিকারগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিজের অধিকার না জানলে অনেক সময় মানুষ অন্যায়, বৈষম্য বা প্রশাসনিক অবহেলার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন না।

তবে অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি নাগরিকদের কর্তব্য সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। সংবিধান ও আইনকে সম্মান করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, জনসম্পত্তির যত্ন নেওয়া এবং দেশের ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা নাগরিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অধিকার ও কর্তব্য পরস্পরের পরিপূরক। নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করার সময় অন্য মানুষের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অন্যতম ভিত্তি।

স্থানীয় প্রশাসনে নাগরিকদের ভূমিকা

গণতন্ত্রের কার্যকারিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষেত্রে। গ্রামের পঞ্চায়েত, পৌরসভা কিংবা অন্যান্য স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বহু সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

রাস্তা মেরামত, নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জল, রাস্তার আলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা রয়েছে।

নাগরিকেরা যদি নিজেদের এলাকার সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেন, তাহলে উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা সহজ হয়। এলাকার মানুষ জানেন কোথায় রাস্তা ভাঙা, কোথায় জল জমে থাকে, কোন বিদ্যালয়ে পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে কিংবা কোন অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা দুর্বল।

স্থানীয় সভা, জনশুনানি এবং নাগরিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে মানুষ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনের কথা জানাতে পারেন। সরকারি প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা নিয়ম মেনে পর্যবেক্ষণ করাও নাগরিক অংশগ্রহণের অংশ।

তবে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার সময় তথ্যভিত্তিক বক্তব্য, শালীন ভাষা এবং আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। সমস্যা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাধান খুঁজে বের করা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছড়ানো নয়।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সচেতনতা

গণমাধ্যম গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে নাগরিকেরা সরকারি সিদ্ধান্ত, সামাজিক সমস্যা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন।

স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রশাসনের কাজকর্ম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করে এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলি সামনে আনে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতি, অনিয়ম এবং জনসাধারণের সমস্যার বিষয়ে আলোকপাত করতে পারে।

কিন্তু গণমাধ্যম থেকে পাওয়া প্রতিটি তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস করাও ঠিক নয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়ো খবর, পুরোনো ছবি, বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং সম্পাদিত বক্তব্য মানুষের মতামতকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।

সচেতন নাগরিকের উচিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস যাচাই করা, একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রের সঙ্গে তুলনা করা এবং প্রমাণ ছাড়া কোনও অভিযোগ প্রচার না করা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও তথ্যের যথার্থতা বজায় রাখাও জরুরি। কারণ ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক আলোচনাকে দুর্বল করে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন ধরনের নাগরিক অংশগ্রহণ

ডিজিটাল প্রযুক্তি নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল জনমত সংগ্রহ এবং সরকারি অনলাইন পরিষেবার মাধ্যমে মানুষ দ্রুত নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।

কোনও এলাকার রাস্তার সমস্যা, পানীয় জলের সংকট কিংবা জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার কথা ছবি ও তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন অনেক ক্ষেত্রে সহজ হয়েছে। অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের প্রচার করে মানুষকে একত্রিত করাও সম্ভব।

তবে ডিজিটাল অংশগ্রহণের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সকলের কাছে স্মার্টফোন, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট বা ডিজিটাল দক্ষতা সমানভাবে নেই। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরাসরি সভা, লিখিত আবেদন এবং স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনার ব্যবস্থাও বজায় রাখা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। সমস্যার তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানানো, প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপের খোঁজ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল মাধ্যমকে তাই শুধু মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত।

ভিন্নমত, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি

গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এখানে বিভিন্ন মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকে। সমাজের সকল মানুষ একই রাজনৈতিক মত, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা বা জীবনদর্শনে বিশ্বাস করবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

ভিন্নমত গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়; বরং সঠিক আলোচনার মাধ্যমে ভিন্নমত থেকে নতুন চিন্তা ও সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একজন নাগরিক নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু অন্যের মতপ্রকাশের অধিকারও সম্মান করা উচিত। রাজনৈতিক মতভেদের কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট করা, হুমকি দেওয়া কিংবা হিংসার আশ্রয় নেওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

আলোচনা ও বিতর্কের ক্ষেত্রে যুক্তি, তথ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভুল তথ্যের প্রতিবাদ করা প্রয়োজন, কিন্তু তা করতে গিয়ে অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়।

পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক সংগঠনে ভিন্নমতকে সম্মান করার অভ্যাস গড়ে উঠলে সমাজে সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে।

যুবসমাজ ও নাগরিক অংশগ্রহণ

যুবসমাজ একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তরুণদের শক্তি, উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা গণতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যুবকেরা ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষার উন্নয়ন, রক্তদান, দুর্যোগ মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগে অংশ নিতে পারেন।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক, আলোচনা, স্বেচ্ছাসেবা এবং নাগরিক শিক্ষার কর্মসূচি তরুণদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করতে পারে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁরা যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ, তথ্য যাচাই এবং সম্মিলিতভাবে সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

তবে যুবসমাজকে রাজনৈতিক বা সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে। অন্ধ অনুসরণ, গুজবের ভিত্তিতে উত্তেজিত হওয়া কিংবা হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।

তরুণদের উচিত প্রশ্ন করা, যুক্তি খোঁজা, নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করা এবং জনস্বার্থে কাজ করা। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের গণতন্ত্রকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

নারী ও প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ

একটি গণতন্ত্র তখনই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন সমাজের সব অংশের মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।

নারী, তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ মানুষ এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন অনেক সময় নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

এই বৈষম্য দূর করতে সমান সুযোগ, নিরাপদ অংশগ্রহণের পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় সভাস্থল প্রতিবন্ধীবান্ধব করা, সভার তথ্য সহজ ভাষায় প্রকাশ করা এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের মতামত শোনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং পরিবারকল্যাণের মতো বিষয়গুলিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসে।

প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া মানে শুধু তাঁদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নয়; বরং নীতি ও পরিষেবাকে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করা।

দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা

দুর্নীতি গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে। সরকারি অর্থের অপব্যবহার, অনিয়ম, স্বজনপোষণ এবং পরিষেবা প্রদানে অসততা জনসাধারণের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও জনস্বার্থের বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

কোনও সরকারি প্রকল্পের কাজ বা অর্থব্যয়ের বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিলে অনুমান বা গুজব ছড়ানোর পরিবর্তে তথ্য সংগ্রহ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো উচিত। ভারতে তথ্যের অধিকার আইন, ২০০৫ নির্দিষ্ট নিয়ম ও ব্যতিক্রম সাপেক্ষে সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য চাওয়ার সুযোগ দেয়।

সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া বা নেওয়া কোনওভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়। তবে দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার সম্পর্কেও সচেতন থাকা দরকার।

জবাবদিহি নিশ্চিত হলে প্রশাসনের কাজের মান উন্নত হয় এবং নাগরিকদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই—ক্ষমতা জনগণের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকা।

নাগরিক অংশগ্রহণের পথে বাধা

নাগরিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনেক হলেও বাস্তবে নানা বাধা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, তাঁদের একার মতামতে কিছুই পরিবর্তন হবে না। কেউ রাজনৈতিক বিভাজন বা সামাজিক চাপের ভয়ে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে চান না। আবার অনেক মানুষ সরকারি পরিষেবা, আইন কিংবা অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না।

দারিদ্র্য, কর্মব্যস্ততা, শিক্ষার অভাব, ডিজিটাল বৈষম্য এবং তথ্যের অপ্রতুলতাও অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কোথাও কোথাও ভয় দেখানো বা হয়রানির আশঙ্কা মানুষকে নীরব করে রাখে।

এই সমস্যাগুলি সমাধানে নাগরিক শিক্ষা, সহজলভ্য সরকারি তথ্য, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং নিরাপদ মতপ্রকাশের পরিবেশ প্রয়োজন। বিদ্যালয় থেকেই সংবিধান, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া উচিত।

মানুষকে বোঝাতে হবে যে নাগরিক অংশগ্রহণ মানেই সব সময় বড় আন্দোলনে যোগ দেওয়া নয়। নিজের ভোট দেওয়া, স্থানীয় সমস্যার কথা জানানো, ভুয়ো খবর প্রতিরোধ করা কিংবা প্রতিবেশীর সমস্যায় সহযোগিতা করাও গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ।

একজন সচেতন নাগরিকের দৈনন্দিন দায়িত্ব

গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে প্রত্যেক মানুষ নিজের দৈনন্দিন জীবন থেকেই উদ্যোগ নিতে পারেন।

প্রথমত, ভোটার হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং নির্বাচনের আগে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় এলাকার সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনের কাছে আইনসম্মতভাবে অভিযোগ জানাতে হবে।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে।

চতুর্থত, ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হবে।

পঞ্চমত, সরকারি সম্পত্তি, পরিবেশ ও জনসাধারণের ব্যবহারের পরিষেবাগুলির প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

ষষ্ঠত, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করতে হবে।

সপ্তমত, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সময় আইন ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

এই ছোট ছোট উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাব সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে জনগণের সক্রিয়, সচেতন এবং দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের উপর। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও তার পাশাপাশি প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনের জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে নাগরিকেরা শুধু সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে থাকেন না; তাঁরা প্রশ্ন করেন, তথ্য যাচাই করেন, সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং সমাধানের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তাঁরা আইন মেনে চলেন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন এবং সমাজের দুর্বল অংশের পাশে দাঁড়ান।

গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখার দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসনের নয়। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী এবং সমাজের প্রতিটি অংশের মানুষের ভূমিকা রয়েছে। প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হয়।

মনে রাখতে হবে, সচেতন নাগরিক ছাড়া গণতন্ত্রের কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে না। মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, যুক্তিবোধ, সহনশীলতা এবং জবাবদিহির দাবি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত করে। তাই গণতন্ত্রকে শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে চর্চা করার মতো একটি মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

সচেতন নাগরিকই গণতন্ত্রের প্রাণ, আর দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণই একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি: সুস্থ জাতি গঠনের অপরিহার্য ভিত্তি।।

মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান মৌলিক চাহিদা হলো খাদ্য। খাদ্য ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু শুধু পেট ভরানোর জন্য খাবার খেলেই মানুষের শরীর সুস্থ থাকে না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত, নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য। একটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা, শিক্ষার মান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

পৃথিবীতে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, অন্যদিকে বহু মানুষ এখনও পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না। কেউ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, কেউ অপুষ্টিতে ভুগছেন, আবার কেউ খাদ্যের অভাব না থাকলেও সঠিক পুষ্টির অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই বৈপরীত্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেই কি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির সমস্যা সমাধান হয়ে যায়? বাস্তবে উত্তর হলো, না। খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি তার ন্যায্য বণ্টন, সহজলভ্যতা, নিরাপত্তা এবং পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

তাই খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত।

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কী বোঝায়?

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে প্রত্যেক মানুষ সব সময় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগ পান এবং সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন।

খাদ্য নিরাপত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

প্রথমত, খাদ্যের পর্যাপ্ততা। মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ থাকা দরকার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের ক্ষতি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যায় খাদ্যের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, খাদ্যের সহজলভ্যতা। বাজারে খাদ্য থাকলেই প্রত্যেক মানুষ তা কিনতে পারবেন, এমন নয়। খাদ্যের দাম যদি মানুষের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে দরিদ্র পরিবারের কাছে খাদ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, পুষ্টিগুণ ও নিরাপত্তা। খাদ্য এমন হতে হবে, যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায় এবং তাতে ক্ষতিকর জীবাণু, দূষণ বা ভেজালের ঝুঁকি না থাকে।

চতুর্থত, নিয়মিত প্রাপ্যতা। কোনও পরিবার একদিন পর্যাপ্ত খাবার পেলেও পরের দিন খাদ্যের অভাবে পড়তে পারে। প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সারা বছর ধারাবাহিকভাবে খাদ্যের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এই চারটি দিকের সমন্বয় ছাড়া একটি সমাজে প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

পুষ্টি কেন মানুষের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ?

পুষ্টি হলো খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ ও সেগুলিকে শরীরের বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদন, কোষের মেরামত এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য ব্যবহার করার প্রক্রিয়া। মানুষের শরীর সুস্থ রাখতে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন।

শর্করা শরীরকে শক্তি জোগায়। প্রোটিন বা আমিষ শরীরের বৃদ্ধি, পেশি গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোষের মেরামতে সাহায্য করে। চর্বি শক্তির উৎস হওয়ার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজেও ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ শরীরের নানা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। জল শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি পরিবহণ এবং বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এ ছাড়া খাদ্যে পর্যাপ্ত আঁশ থাকা হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান সুষম খাদ্যাভ্যাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ।

কোনও একটি পুষ্টি উপাদান বেশি খেলেই শরীর সুস্থ থাকবে, এমন ধারণা ভুল। সুস্থতার জন্য বয়স, শারীরিক অবস্থা, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

অপুষ্টির বিভিন্ন রূপ

অপুষ্টি বলতে শুধু খাবারের অভাব বোঝায় না। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত পুষ্টি গ্রহণ কিংবা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যহীনতাও অপুষ্টির অন্তর্ভুক্ত।

১. অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা

দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবার না পেলে শরীরের ওজন কমে যেতে পারে, পেশি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে, কারণ এই সময় শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়।

২. ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি

খাদ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন, আয়রনের ঘাটতিতে রক্তাল্পতা হতে পারে। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি দৃষ্টিশক্তির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আয়োডিনের অভাব থাইরয়েডের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

৩. অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা

অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ, অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৪. শিশুদের অপুষ্টি

শিশুদের অপুষ্টি তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত পুষ্টির বিশেষ যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যে পুষ্টির ভূমিকা

একটি সুস্থ জাতি গঠনের ভিত্তি তৈরি হয় মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুপুষ্টির মাধ্যমে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকলে মা ও শিশুর উভয়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই গর্ভবতী নারীর জন্য সুষম খাদ্য, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টি-সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।

জন্মের পর শিশুর জন্য মায়ের দুধ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস। উপযুক্ত সময়ে পরিপূরক খাবার শুরু করা এবং শিশুর বয়স অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় ও নিরাপদ খাদ্য দেওয়া প্রয়োজন। শিশুর খাবারে ডাল, শাকসবজি, ফল, শস্য এবং উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে।

শিশুদের খাবার দেওয়ার সময় শুধু পরিমাণ নয়, খাবারের বৈচিত্র্য এবং পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দিতে হবে। শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর বদলে তার বয়স, ক্ষুধা এবং বিকাশের প্রয়োজন বুঝে খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত।

বিদ্যালয়েও শিশুদের পুষ্টি সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, হাত ধোয়ার অভ্যাস এবং নিরাপদ পানীয় জলের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা শিশুদের সুস্থ জীবন গঠনে সাহায্য করে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যের সম্পর্ক

দারিদ্র্য খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম বড় বাধা। পরিবারের আয় কম হলে অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবার কেনা সম্ভব হয় না। তখন পরিবারগুলি তুলনামূলক সস্তা কিন্তু কম পুষ্টিকর খাবারের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।

এ ছাড়া বেকারত্ব, অনিয়মিত কাজ, কৃষিজ আয়ের অনিশ্চয়তা এবং খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র পরিবারগুলির খাদ্য নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি বা জীবিকা হারালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না। মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য বাজারব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। খাদ্য পাওয়ার সুযোগ যেন মানুষের আর্থিক অবস্থার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, সেই লক্ষ্যেই সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও জলবায়ুর প্রভাব

খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষকরা ধান, গম, ডাল, শাকসবজি, ফল এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দেন। কিন্তু কৃষি নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস ফসল উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে কৃষকদের পক্ষে লাভজনকভাবে চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, উন্নত বীজ, সঠিক সেচব্যবস্থা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কৃষি-পরামর্শ পরিষেবার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলভিত্তিক আবহাওয়ার তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলে তাঁরা চাষের সময় ও পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ ছাড়া ফসলের বৈচিত্র্য বজায় রাখা দরকার। শুধু একটি বা দুটি ফসলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা খাদ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। ডাল, তৈলবীজ, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন বাড়ানো খাদ্যের বৈচিত্র্য এবং পুষ্টি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

খাদ্যের দাম ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলি। আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য অর্থ কমে যায়।

দামের কারণে অনেক পরিবার মাছ, ডিম, দুধ, ফল কিংবা বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার কম কিনতে বাধ্য হয়। ফলে পেট ভরলেও শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণ হয় না।

খাদ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহণ, বাজারে সরবরাহ এবং মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তারা যাতে যুক্তিসংগত দামে খাদ্য কিনতে পারেন, তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

সরকারি খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারগুলিকে সহায়তা করতে পারে। তবে সেই সুবিধা প্রকৃত উপভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্যে ভেজালের সমস্যা

খাদ্য পর্যাপ্ত হলেও তা নিরাপদ না হলে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহণ, সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

দূষিত জল, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ভুলভাবে সংরক্ষিত খাবার এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনুপযুক্ত ব্যবহার খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। খাদ্যে ভেজালও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সমস্যা।

কাঁচা খাবার ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, পরিষ্কার জল ব্যবহার করা, খাবার যথাযথ তাপমাত্রায় রান্না করা এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা দরকার। পচনশীল খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়।

খাদ্যপণ্যের প্যাকেট কেনার সময় উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, উপাদান এবং সংরক্ষণের নির্দেশ পড়ে নেওয়া ভালো। অস্বাভাবিক রং, গন্ধ বা স্বাদের খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি, পরীক্ষাগারের ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে অনিরাপদ খাদ্যের চাহিদা কমে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

খাদ্যের অপচয় ও তার সামাজিক প্রভাব

খাদ্য নিরাপত্তার পথে খাদ্যের অপচয় একটি বড় বাধা। বাড়ি, অনুষ্ঠান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাজার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়। অথচ সমাজের বহু মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পান না।

খাদ্য অপচয়ের ফলে শুধু খাবার নষ্ট হয় না; সেই খাবার উৎপাদনে ব্যবহৃত জল, জমি, শ্রম, জ্বালানি এবং অর্থও অপচয় হয়। পচে যাওয়া খাদ্য বর্জ্য পরিবেশের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

খাদ্যের অপচয় কমাতে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করা, খাবারের পরিমাণ পরিকল্পনা করা এবং সঠিকভাবে খাদ্য সংরক্ষণ করা দরকার। অনুষ্ঠান বা সামাজিক আয়োজনে অতিথির সংখ্যা অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করা যেতে পারে।

নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য উদ্বৃত্ত খাবার দায়িত্বশীলভাবে সংগ্রহ করে প্রয়োজনমতো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে খাবারের পরিচ্ছন্নতা, সংরক্ষণ এবং পরিবহণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সরকারি উদ্যোগ ও সামাজিক দায়িত্ব

খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য সরকারি উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। খাদ্যশস্যের সংগ্রহ ও বণ্টন, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং পুষ্টি-সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে।

ভারতে গণবণ্টন ব্যবস্থা, বিদ্যালয়ের খাবারের কর্মসূচি এবং অঙ্গনওয়াড়িভিত্তিক পরিষেবার মতো উদ্যোগ খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা বজায় রাখতে স্বচ্ছতা, সঠিক উপভোক্তা নির্বাচন এবং নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সামাজিক সংগঠনও খাদ্য ও পুষ্টি সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দুর্বল পরিবারগুলিকে সহায়তা করা এই উদ্যোগের অংশ হতে পারে।

স্থানীয় পর্যায়ে রান্নাঘর-বাগান, পুষ্টিবাগান এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক খাদ্য উদ্যোগ গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে মানুষ তাজা শাকসবজি উৎপাদনের সুযোগ পাবেন এবং পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হবেন।

ব্যক্তিগত জীবনে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানেই দামি খাবার খাওয়া নয়। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এবং ঋতুভিত্তিক খাদ্য থেকেও পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা সম্ভব।

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, ডাল, শস্য এবং উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে। অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করা ভালো। পর্যাপ্ত জল পান এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

খাবারের ক্ষেত্রে একেকজনের প্রয়োজন একেক রকম। শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং বিশেষ স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের খাদ্যতালিকা আলাদা হতে পারে। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুষ্টিকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা যাবে না। পুষ্টিকর খাবার সুস্থ জীবন, শেখার ক্ষমতা এবং কাজ করার শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

উপসংহার

খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি একটি সুস্থ, কর্মক্ষম এবং উন্নত সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন, ন্যায্য বণ্টন, নিরাপদ সংরক্ষণ, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বয়েই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

কোনও সমাজের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বড় বড় পরিকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই সমাজের শিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না, দরিদ্র পরিবারগুলি নিরাপদ খাদ্য কিনতে পারছে কি না এবং প্রবীণ মানুষগুলি সম্মানজনকভাবে খাবার পাচ্ছেন কি না, সেগুলিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

খাদ্য অপচয় রোধ, কৃষকদের সহায়তা, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে প্রত্যেকে এই কাজে অবদান রাখতে পারেন। সরকার, কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, খাদ্য শুধু বেঁচে থাকার উপকরণ নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে উঠবে সুস্থ প্রজন্ম এবং মানবিক সমাজ।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

সাইবার নিরাপত্তা: ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য ও অনলাইন জীবনের সুরক্ষা।

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। একসময় যে কাজগুলি সম্পন্ন করতে দিনের পর দিন সময় লাগত, আজ সেগুলি কয়েক মিনিটের মধ্যেই করা সম্ভব হচ্ছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাঙ্কিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, যোগাযোগ, সংবাদ পরিবেশন থেকে শুরু করে সরকারি পরিষেবা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নানা ধরনের বিপদও। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা, ভুয়ো পরিচয়ে অর্থ আদায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা, ক্ষতিকর সফটওয়্যারের আক্রমণ এবং গোপন তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনা এখন উদ্বেগের কারণ। প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনই অসতর্ক ব্যবহারের ফলে তা বিপদেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

সাইবার নিরাপত্তা কী?

কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, নেটওয়ার্ক, অনলাইন অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল তথ্য এবং ইন্টারনেটভিত্তিক পরিষেবাকে অননুমোদিত প্রবেশ, চুরি, ক্ষতি ও প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থাকে সাধারণভাবে সাইবার নিরাপত্তা বলা হয়।

সাইবার নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখা, তথ্যের সঠিকতা রক্ষা করা এবং প্রয়োজনের সময় পরিষেবাগুলি সচল রাখা। একজন সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীর কাছে যেমন নিজের ব্যাঙ্কের তথ্য ও ব্যক্তিগত ছবি সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই একটি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম কিংবা সরকারি দপ্তরের কাছে তাদের সংরক্ষিত তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের আচরণ, সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও গভীরভাবে জড়িত। অনেক সময় উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীর সামান্য অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেয়।

সাইবার অপরাধের বিভিন্ন ধরন

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১. অনলাইন আর্থিক প্রতারণা: ভুয়ো ফোনকল, বার্তা, ওয়েবসাইট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রতারকেরা মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। কখনও ব্যাঙ্ককর্মী, কখনও সরকারি আধিকারিক, আবার কখনও পরিচিত ব্যক্তি সেজে তারা বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে।

২. ফিশিং: ফিশিং হলো এমন একটি প্রতারণামূলক কৌশল, যেখানে ভুয়ো ই-মেল, বার্তা বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, ব্যাঙ্কের তথ্য কিংবা অন্যান্য গোপন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আসল প্রতিষ্ঠানের মতো দেখতে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এর একটি পরিচিত পদ্ধতি।

৩. পরিচয় চুরি: অন্যের নাম, ছবি, ফোন নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি করা কিংবা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ঘটনাকে পরিচয় চুরির অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এর ফলে নির্দোষ মানুষ সামাজিক ও আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।

৪. অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং: দুর্বল পাসওয়ার্ড, চুরি হওয়া লগইন তথ্য কিংবা নিরাপত্তার ত্রুটি কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা অনলাইন অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারে। ই-মেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আর্থিক পরিষেবার অ্যাকাউন্ট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৫. ক্ষতিকর সফটওয়্যার: ভাইরাস, স্পাইওয়্যার, ট্রোজান এবং র‍্যানসমওয়্যারের মতো ক্ষতিকর সফটওয়্যার কম্পিউটার বা মোবাইলের তথ্য চুরি করতে পারে, কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করতে পারে কিংবা ফাইল আটকে রেখে অর্থ দাবি করতে পারে।

৬. অনলাইন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেল: ব্যক্তিগত ছবি বা বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, অপমানজনক মন্তব্য, ভুয়ো তথ্য প্রচার এবং বারবার অনলাইন হয়রানি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

দুর্বল পাসওয়ার্ড কেন বিপজ্জনক?

অনলাইন নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো শক্তিশালী পাসওয়ার্ড। অনেকে নিজের নাম, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর কিংবা সহজে অনুমান করা যায় এমন শব্দ পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে অপরাধীদের পক্ষে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা সহজ হতে পারে।

একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড দীর্ঘ হওয়া উচিত এবং সহজে অনুমান করা যায় এমন ব্যক্তিগত তথ্যের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করাও জরুরি। একই পাসওয়ার্ড বহু জায়গায় ব্যবহার করলে একটি পরিষেবার তথ্য ফাঁস হওয়ার ফলে অন্য অ্যাকাউন্টগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

পাসওয়ার্ড মনে রাখতে অসুবিধা হলে বিশ্বস্ত পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেটির নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে নিজের পাসওয়ার্ড জানানো উচিত নয় এবং অচেনা ব্যক্তির অনুরোধে তা পরিবর্তন বা প্রকাশ করা উচিত নয়।

ওটিপি ও ডিজিটাল পেমেন্টে সতর্কতা

ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা আজ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। দোকানে কেনাকাটা, বিদ্যুতের বিল দেওয়া, টাকা পাঠানো কিংবা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্য পরিশোধ—সবই এখন মোবাইলের মাধ্যমে করা যায়। কিন্তু এই সুবিধার অপব্যবহার করে প্রতারকেরাও সক্রিয় রয়েছে।

ওটিপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড অনেক পরিষেবায় পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রতারকেরা ফোন করে নিজেদের ব্যাঙ্ককর্মী বা পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে এই গোপন নম্বর জানতে চাইতে পারে। তাই কোনও অবস্থাতেই অচেনা ব্যক্তিকে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা গোপন ব্যাঙ্কিং তথ্য জানানো উচিত নয়।

ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—টাকা গ্রহণ করার জন্য সাধারণত নিজের ইউপিআই পিন প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয় না। টাকা পাঠানো বা নির্দিষ্ট লেনদেন অনুমোদনের সময় পিন লাগতে পারে। কোনও ব্যক্তি টাকা পাওয়ার অজুহাতে পিন দিতে বললে সতর্ক হতে হবে।

লেনদেন সম্পন্ন করার আগে প্রাপকের নাম এবং টাকার পরিমাণ যাচাই করা উচিত। অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো পেমেন্ট অনুরোধ, কিউআর কোড কিংবা সন্দেহজনক লিঙ্ক ব্যবহার করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, সংবাদ প্রচার ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করলে তা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

নিজের বাড়ির ঠিকানা, ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, পরিচয়পত্রের ছবি, আর্থিক তথ্য কিংবা প্রতিদিনের চলাফেরার বিস্তারিত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। শিশুদের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপনীয়তার সেটিংস পরীক্ষা করা উচিত। কে নিজের পোস্ট দেখতে পারবে, কে যোগাযোগ করতে পারবে এবং কে ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে পারবে—এসব নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অনেক প্ল্যাটফর্মেই রয়েছে।

কোনও অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করার আগে তাঁর পরিচয় যাচাই করা ভালো। পরিচিত কারও নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়ো অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রতারণা হতে পারে। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সরাসরি পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করা উচিত।

শিশু ও কিশোরদের সাইবার নিরাপত্তা

বর্তমান সময়ে শিশুরা অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ডিজিটাল জগতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার তাদের জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু ইন্টারনেটের সব বিষয়বস্তু শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়।

অনলাইন অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, সাইবার বুলিং, অনুপযুক্ত বিষয়বস্তু এবং অনলাইন গেমের মাধ্যমে প্রতারণা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা। শুধু মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি না করে কীভাবে নিরাপদে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, তা শেখানো প্রয়োজন। কোনও অস্বস্তিকর বার্তা, হুমকি কিংবা সন্দেহজনক যোগাযোগের সম্মুখীন হলে যেন তারা নির্ভয়ে অভিভাবক বা শিক্ষকের কাছে জানাতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে পাঠ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল দায়িত্ববোধ গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি হবে।

সংবাদমাধ্যম ও সাইবার নিরাপত্তা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু খবর সংগ্রহ ও পরিবেশন নয়; অনলাইন তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং পাঠকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংবাদপোর্টাল, ডিজিটাল সাংবাদিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংবাদ পরিবেশকদের নানা ধরনের সাইবার ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়।

সংবাদপোর্টালের ওয়েবসাইট হ্যাক হলে প্রকাশিত সংবাদ পরিবর্তন করা, পাঠকদের বিভ্রান্ত করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করা সম্ভব হতে পারে। সাংবাদিকদের ই-মেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট এবং সংবাদ সংগ্রহের নথিও সুরক্ষিত রাখা দরকার।

একটি সংবাদপোর্টালের নিরাপত্তা বজায় রাখতে নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই, নিরাপদ হোস্টিং এবং নিয়মিত ব্যাকআপের ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রশাসনিক অ্যাকাউন্টে কাদের প্রবেশাধিকার রয়েছে, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের অচেনা ই-মেলের সংযুক্তি কিংবা সন্দেহজনক লিঙ্ক খোলার আগে সতর্ক থাকতে হবে। কোনও সংবাদসূত্রের পাঠানো ফাইলের মাধ্যমে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সাইবার নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ভূমিকা

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার, ফায়ারওয়াল, এনক্রিপশন, দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই এবং নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষায় সহায়তা করে।

দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি যাচাই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ফলে শুধু পাসওয়ার্ড জানা থাকলেই অনেক ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা সম্ভব হয় না। যেখানে সুবিধাটি রয়েছে, সেখানে এটি চালু রাখা ভালো। সম্ভব হলে আরও নিরাপদ যাচাই পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত।

এনক্রিপশন তথ্যকে এমনভাবে রূপান্তরিত করে, যাতে অনুমোদনহীন ব্যক্তি সহজে তার অর্থ বুঝতে না পারে। অনলাইন যোগাযোগ ও তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনও প্রযুক্তিই শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। তাই প্রযুক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি নিয়মিত সতর্কতা, সফটওয়্যার আপডেট এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা অপরিহার্য।

সাইবার অপরাধের শিকার হলে কী করবেন?

সব সতর্কতা অবলম্বন করার পরেও কখনও কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রথমত, ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত প্রতারণা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক বা পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারীকে দ্রুত জানাতে হবে। ভারতে আর্থিক সাইবার প্রতারণার ক্ষেত্রে ১৯৩০ নম্বরে যোগাযোগ করা যায় এবং সরকারি জাতীয় সাইবার অপরাধ রিপোর্টিং পোর্টাল cybercrime.gov.in-এ অভিযোগ জানানো যায়। যত দ্রুত অভিযোগ জানানো যায়, অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা তত বাড়তে পারে; তবে অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হবে এবং সম্ভব হলে সব সক্রিয় সেশন থেকে লগ আউট করতে হবে। একই পাসওয়ার্ড অন্য কোথাও ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সেখানেও তা পরিবর্তন করা জরুরি।

তৃতীয়ত, প্রতারণার বার্তা, ফোন নম্বর, ই-মেল, লেনদেনের বিবরণ, স্ক্রিনশট এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। এগুলি অভিযোগের সময় কাজে লাগতে পারে।

চতুর্থত, কেউ ব্ল্যাকমেল বা অনলাইন হয়রানির শিকার হলে লজ্জা বা ভয়ের কারণে চুপ থাকা উচিত নয়। বিশ্বস্ত ব্যক্তি, অভিভাবক কিংবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্য নেওয়া জরুরি। পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তায় সরকারের ও সমাজের ভূমিকা

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়। সরকার, প্রযুক্তি সংস্থা, ব্যাঙ্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারি স্তরে সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা উন্নত করা, আইন প্রয়োগ এবং ডিজিটাল পরিষেবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি সংস্থাগুলিরও উচিত ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং নিরাপত্তার ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করা।

ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে গ্রাহকদের নিয়মিত সতর্কবার্তা দেওয়া এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সমাজের প্রতিটি মানুষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। কোনও ভুয়ো বার্তা বা সন্দেহজনক লিঙ্ক অন্যদের কাছে পাঠানোর আগে তার সত্যতা যাচাই করা উচিত। অনলাইন প্রতারণার শিকার কাউকে দোষারোপ না করে তাঁকে সাহায্য করা এবং সঠিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করা দরকার।

নিরাপদ ডিজিটাল জীবনের জন্য কয়েকটি জরুরি অভ্যাস

সাইবার নিরাপত্তা বজায় রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা বিশেষভাবে জরুরি।

১. প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।

২. যেখানে সম্ভব, দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই চালু রাখুন।

৩. ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড ও গোপন আর্থিক তথ্য কারও সঙ্গে ভাগ করবেন না।

৪. অচেনা লিঙ্ক, ই-মেলের সংযুক্তি এবং সন্দেহজনক অ্যাপ ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকুন।

৫. মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এবং অ্যাপ নিয়মিত আপডেট করুন।

৬. পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করার সময় সংবেদনশীল লেনদেনে বিশেষ সতর্ক থাকুন।

৭. গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইলের নিরাপদ ব্যাকআপ রাখুন।

৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আগে ভেবে দেখুন।

৯. অনলাইনে কোনও তথ্য, খবর বা আর্থিক প্রস্তাব পাওয়ার পর তার সত্যতা যাচাই করুন।

১০. প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত ব্যাঙ্ক, সংশ্লিষ্ট পরিষেবা প্রদানকারী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশের সাহায্য নিন।

উপসংহার

ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের সামনে অসংখ্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, সংবাদ পরিবেশন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে তার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সাইবার নিরাপত্তা কোনও একদিনের কাজ নয়; এটি প্রতিদিনের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, সন্দেহজনক বার্তা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত অভিযোগ জানানোর মতো ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ইন্টারনেটের জগতে যেমন জ্ঞান ও সুযোগ রয়েছে, তেমনই রয়েছে প্রতারণার আশঙ্কা। তাই অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে যাচাই করা, আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভেবে কাজ করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে নিজেকে নিয়মিত শিক্ষিত করে তোলা জরুরি।

একটি নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়তে সরকার, প্রযুক্তি সংস্থা ও সাধারণ নাগরিক—সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সঠিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সমন্বয়েই সাইবার অপরাধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। নিরাপদ ইন্টারনেট শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি একটি উন্নত, বিশ্বাসযোগ্য ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার ওপারে – (তৃতীয় পর্ব: যে নাম জন্মের আগে হারিয়ে গিয়েছিল)।

রাত তখন প্রায় তিনটে। বেলঘরিয়ার পুরোনো বাড়িটির নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধিমান দত্ত বুঝতে পারছিল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর হয়তো আর কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে। কিন্তু সেই উত্তরের কাছে পৌঁছনোর জন্য তাকে এমন এক অতীতের মুখোমুখি হতে হবে, যে অতীতকে সে এত বছর ধরে নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে এসেছে।

জানলার ওপারে চার আঙুলের ছেলেটি আর নেই।

অদিতি সেন টর্চের আলো ফেলে জানলার দিকে তাকাল। বাইরে ভেজা গাছের পাতা বাতাসে নড়ছে। রাস্তার আলোয় দেখা যাচ্ছে ফাঁকা উঠোন, ভাঙা সিঁড়ি আর শ্যাওলা ধরা দেওয়াল।

“ও কি সত্যিই ছিল?” অদিতি ফিসফিস করে বলল।

ঋদ্ধিমান উত্তর দিল না। তার ডান হাতের তালুতে তখনও অদ্ভুত একটা অনুভূতি। যেন কিছুক্ষণ আগে কেউ তার হাত ধরে বলেছিল, ‘তোমার নামটা মনে করো।’

কিন্তু তার নাম তো ঋদ্ধিমান দত্ত। জন্মের শংসাপত্রে এই নাম, স্কুলের নথিতে এই নাম, বাবার লেখা চিঠিতেও এই নাম।

তাহলে অরিন্দম দত্ত কেন লিখেছিলেন—জন্মের আগে তোমার নাম কী ছিল, তা জানতে চাইলে পুরোনো শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রে যাও?

“আমাদের কাল সকাল দশটায় সেখানে যেতে হবে,” ঋদ্ধিমান বলল।

অদিতি তার দিকে তাকাল।

“তুমি কি নিশ্চিত, এটা ফাঁদ নয়?”

“না। আমি কিছুতেই নিশ্চিত নই। কিন্তু এত বছর ধরে যে মানুষটা আমাকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিয়েছে, তার পরিচয় নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আর কোনও সূত্র উপেক্ষা করতে পারব না।”

দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

বেরোনোর সময় ঋদ্ধিমান একবার ফিরে তাকিয়েছিল। নীল দরজাটি বন্ধ। অথচ দরজার নিচ দিয়ে সরু নীল আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।

সে এবার আর দরজার কাছে গেল না।

কারণ অয়নের খাতায় লেখা কথাটা তার মনে পড়ল—ঋদ্ধিমানকে নীল দরজার সামনে আসতে দিও না। সে যদি নিজের নাম বলে, তাহলে দরজাটি খুলে যাবে।

সে নিজের নাম বলেছিল কি না, তা মনে করতে পারছিল না।

কিন্তু দরজাটি খুলেছিল।


পরদিন সকাল দশটার পাঁচ মিনিট আগে তারা পৌঁছল উত্তর কলকাতার এক পুরোনো শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রে।

বাড়িটির নাম ছিল ‘শিশুমঙ্গল ক্লিনিক’। একসময় সেখানে শিশুদের সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক বিকাশ ও স্মৃতিসংক্রান্ত কিছু গবেষণাও করা হতো। এখন সেটি প্রায় পরিত্যক্ত। সামনের গেটের অর্ধেক রং উঠে গেছে। দেওয়ালে ঝোলানো বোর্ডে নামের কিছু অক্ষর মুছে গিয়েছে।

গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ নিরাপত্তারক্ষী তাদের দেখে এগিয়ে এলেন।

“কাকে চাই?”

ঋদ্ধিমান পকেট থেকে একটি খাম বের করল। আগের রাতে নীল দরজার নিচে খামটি পড়ে থাকতে দেখেছিল সে। খামের ওপরে লেখা ছিল—‘শিশুমঙ্গল ক্লিনিকের রেকর্ড বিভাগে পৌঁছে দেবে।’

ভেতরে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র এবং হাতে লেখা কয়েকটি লাইন।

বৃদ্ধ পরিচয়পত্রটি দেখে থমকে গেলেন।

“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

“একটা পুরোনো বাড়িতে। আমরা ডক্টর অনির্বাণ দত্তের সম্পর্কে জানতে এসেছি।”

নামটি শুনে বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।

“অনেক বছর কেউ এই নাম উচ্চারণ করে না।”

“তিনি কি এখানে কাজ করতেন?”

“কাজ করতেন। তবে শুধু চিকিৎসক হিসেবে নয়। তিনি শিশুদের স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করতেন। পরে কী হয়েছিল, সেটা আমি পুরো জানি না।”

“তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে তাকালেন।

“আপনারা ভেতরে আসুন।”

ক্লিনিকের পেছনের দিকে একটি ছোট ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের। ঘরটিতে পুরোনো আলমারি, ভাঙা টেবিল এবং কাগজে ভর্তি কয়েকটি বাক্স। জানলার ধারে বসে ছিলেন সত্তরের কাছাকাছি বয়সের এক মহিলা। চুল সম্পূর্ণ সাদা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

বৃদ্ধ বললেন, “এঁর নাম ডক্টর মৃণালিনী বসু। একসময় এখানে শিশু মনোবিজ্ঞানের বিভাগ দেখতেন।”

মহিলাটি ঋদ্ধিমানের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“তুমি ফিরে এসেছ?”

ঋদ্ধিমান চমকে উঠল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

“চিনি। আবার চিনি না-ও। তোমার মুখটা বদলেছে, কিন্তু চোখ দুটো বদলায়নি।”

“আমার নাম ঋদ্ধিমান দত্ত।”

মৃণালিনী দেবী চোখ বন্ধ করলেন।

“তোমার বর্তমান নামটা জানি। আমি জানতে চাই, তোমার আগের নামটা তুমি মনে করতে পারো কি না।”

ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল।

“না।”

“তাহলে বসো। তোমাদের দু’জনকেই সবটা জানতে হবে।”


মৃণালিনী দেবী আলমারি খুলে একটি ধূসর রঙের ফাইল বের করলেন। ফাইলের ওপর লেখা—‘প্রকল্প নীলপ্রহর: শিশু অংশগ্রহণকারী ও স্মৃতি পুনর্গঠন’।

“প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে,” তিনি বলতে শুরু করলেন, “কিছু শিশুদের নিয়ে একটি গবেষণা শুরু হয়েছিল। প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ। শিশুদের ভয়, দুঃস্বপ্ন, মানসিক আঘাত এবং স্মৃতির পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, তা বোঝা। তখনও আমরা জানতাম, স্মৃতি কোনও ক্যামেরার মতো নিখুঁতভাবে অতীতকে ধরে রাখে না। মানুষ প্রতিবার মনে করার সময় স্মৃতিকে কিছুটা নতুন করে গড়ে তোলে।”

অদিতি মন দিয়ে শুনছিল।

মৃণালিনী দেবী বললেন, “কিন্তু গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ডক্টর অনির্বাণ দত্ত ধীরে ধীরে অন্য পথে এগিয়ে গেলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও শিশুর মনে যদি ভয়ংকর স্মৃতি তৈরি করা যায়, আবার সেই স্মৃতি বদলে দেওয়া যায়, তাহলে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত শিশুদের সাহায্য করা সম্ভব হবে।”

“এটা কি চিকিৎসার অংশ ছিল?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।

“শুরুতে তাই বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে শিশুদের সম্মতি ছাড়াই তাদের সামনে সাজানো ঘটনা দেখানো হতো। কিছু সত্য ঘটনা গোপন করা হতো, কিছু মিথ্যা ঘটনা বারবার বলা হতো। আলো, শব্দ, ছবি, ঘুমের আগে শোনানো কথোপকথন—সব মিলিয়ে তাদের স্মৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলত। কোনও শিশুকে বোঝানো হতো যে সে কিছু করেছে, অন্য কাউকে বোঝানো হতো যে ঘটনাটি সে দেখেনি।”

“অর্থাৎ মিথ্যা স্মৃতি তৈরি করা?” ঋদ্ধিমান প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ। তবে একটা কথা মনে রেখো—মানুষের স্মৃতি প্রভাবিত করা সম্ভব হলেও ইচ্ছেমতো সম্পূর্ণ নতুন পরিচয় তৈরি করে দেওয়া কোনও সহজ বা নিশ্চিত প্রক্রিয়া নয়। এখানে যা ঘটেছিল, তা ছিল দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বারবার বলা গল্প, ভয় এবং কিছু বাস্তব ঘটনা গোপন রাখার এক বিপজ্জনক মিশ্রণ।”

মৃণালিনী দেবী ফাইল খুললেন।

প্রথম পাতায় ছয়টি নাম।

অয়ন মুখোপাধ্যায়।

সৌম্যজিৎ পাল।

মধুরিমা দে।

ঋদ্ধিমান দত্ত।

শর্মিষ্ঠা পাল।

এবং ষষ্ঠ নামের জায়গায় লেখা—‘অংশগ্রহণকারী এন-৬’।

ঋদ্ধিমান ফাইলটির দিকে ঝুঁকে পড়ল।

“এই ষষ্ঠ শিশুটির নাম লেখা নেই কেন?”

“কারণ সে এখানে নিজের নাম নিয়ে আসেনি।”

“তার মানে?”

মৃণালিনী দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“শিশুটিকে এক দুর্ঘটনার পর এখানে আনা হয়েছিল। তার পরিবার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছিল না। সে নিজের নাম বলতে পারত না। কয়েকটি শব্দ মনে করতে পারত, কিন্তু কোনও সম্পূর্ণ পরিচয় দিতে পারত না। ডান হাতে জন্মগতভাবে একটি আঙুল কম ছিল। তাকে প্রথমে চিকিৎসার জন্য রাখা হয়েছিল। পরে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।”

অদিতি বলল, “কিন্তু একটা শিশুর নাম জানা না থাকলে তাকে গবেষণায় নেওয়ার অনুমতি কে দিয়েছিল?”

মৃণালিনী দেবী মুখ নামিয়ে নিলেন।

“সেই প্রশ্নের উত্তরই এই প্রকল্পের সবচেয়ে অন্ধকার দিক। কিছু নথিতে অভিভাবকের সম্মতির কথা লেখা আছে। কিন্তু সেই সম্মতি সত্যিই নেওয়া হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ নেই।”

ঋদ্ধিমান ফাইলের পরের পাতা উল্টে দেখল।

একটি পুরোনো ছবি।

ছয়টি শিশু একটি টেবিলের সামনে বসে আছে। পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ অনির্বাণ দত্ত। তাঁর পাশে আরেকজন পুরুষ—চেহারায় ঋদ্ধিমানের বাবার সঙ্গে অদ্ভুত মিল।

ছবির এক কোণে পেন্সিলে লেখা—‘প্রথম পর্যায়, ২০০০’।

ঋদ্ধিমান ছবিটি হাতে তুলে নিল।

“এই লোকটি কে?”

মৃণালিনী দেবী ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, “অরিন্দম দত্ত।”

“তাহলে অনির্বাণ দত্ত আর অরিন্দম দত্ত—দু’জন আলাদা মানুষ?”

“হ্যাঁ। অনির্বাণ ছিলেন চিকিৎসক ও গবেষণার প্রধান। অরিন্দম ছিলেন স্থপতি। নীলপ্রহর সাংস্কৃতিক সংস্থার ভবনটি তিনিই তৈরি করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিশুদের জন্য শিল্প, গান, নাটক ও ছবি আঁকার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা দরকার। প্রথম দিকে তিনি ভেবেছিলেন, এই গবেষণা শিশুদের সাহায্য করবে।”

“পরে?”

“পরে তিনি বুঝতে পারেন, শিশুদের ওপর যা করা হচ্ছে, তা চিকিৎসা নয়। তিনি প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসতে চান। কিন্তু তার আগেই একটি ঘটনা ঘটে যায়।”

“অয়নের ঘটনা?”

মৃণালিনী দেবী মাথা নাড়লেন।

“অয়নই প্রথম বুঝেছিল যে তাদের স্মৃতির সঙ্গে খেলা হচ্ছে। সে অন্যদের বলেছিল, গবেষণার ঘরে যা ঘটছে, তার সবটা সত্য নয়। সে কিছু নথি লুকিয়ে রাখে। এক রাতে সে পালানোর চেষ্টা করে।”

“তারপর তাকে পুকুরে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়,” ঋদ্ধিমান বলল।

মৃণালিনী দেবী তার দিকে তাকালেন।

“না। তাকে পুকুর থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা নথি আমি দেখিনি।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

“তাহলে অয়ন মারা যায়নি?”

“আমি তা বলছি না। আমি বলছি, তার মৃত্যুর যে গল্প তোমরা শুনেছ, তার সমর্থনে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ঘটনার পর কিছু নথি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। একটি সংবাদপত্রে দুর্ঘটনার খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু দেহ শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত কিংবা পরিবারের আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি এই ফাইলে নেই।”

ঋদ্ধিমানের বুকের মধ্যে চাপা ব্যথা জমতে লাগল।

“আমি অয়নকে আমার বন্ধু বলে মনে করি। তার সঙ্গে পুকুরের ধারে খেলা, স্কুল থেকে ফেরার পথে ঝগড়া—সব মনে আছে।”

“তোমার মনে থাকা মানেই সেই প্রতিটি ঘটনা ঠিক সেইভাবেই ঘটেছিল, এমন নয়,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “আবার সবটাই মিথ্যা, সেটাও বলা যায় না। সত্য, ভুল স্মৃতি এবং অন্যের বলা গল্প—তিনটিই একসঙ্গে মিশে থাকতে পারে।”


ফাইলের শেষ দিকে একটি হাতে লেখা প্রতিবেদন ছিল।

প্রতিবেদনটি অরিন্দম দত্তের।

“আমি আর এই কাজের অংশ থাকতে পারি না। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। অনির্বাণ বলছে, তাদের স্মৃতিকে সংশোধন করলে তারা ভবিষ্যতের মানসিক আঘাত থেকে মুক্ত থাকবে। কিন্তু আমরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার ওপর বিশ্বাস হারাতে শেখাচ্ছি। কোনও শিশুকে নিজের দেখা ঘটনাকে অস্বীকার করতে বাধ্য করা অপরাধ।”

এর পরের লাইনটি কাঁপা হাতে লেখা।

“এন-৬-কে প্রকল্প থেকে সরিয়ে নিতে হবে। শিশুটির প্রকৃত পরিচয় খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু অনির্বাণ মনে করছে, শিশুটিই সমস্ত পরীক্ষার শেষ উত্তর।”

ঋদ্ধিমান কাগজটি শক্ত করে ধরে রইল।

“এন-৬-কে কেন দরকার ছিল?”

মৃণালিনী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ ওই শিশুটি অন্যদের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাত না। তাকে একটি ঘটনা বারবার মনে করাতে চাইলেও সে একই উত্তর দিত না। কখনও বলত, সে সেখানে ছিল না। কখনও বলত, সে সব দেখেছে। গবেষকেরা বুঝতে পারছিলেন না, শিশুটি সত্যিই কিছু মনে করতে পারছে না, নাকি নিজের মতো করে তথ্য সাজাচ্ছে।”

“তাই বলে তাকে বন্দি করে রাখা হবে?”

“সেই কারণেই অরিন্দম প্রতিবাদ করেছিলেন।”

অদিতি বলল, “আপনি তখন সব জানতেন। আপনি কেন কাউকে জানাননি?”

প্রশ্নটি শুনে বৃদ্ধা মাথা নিচু করলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাবে। আমি কিছু নথি সরিয়ে রেখেছিলাম, যাতে পরে প্রমাণ করা যায় কী ঘটেছিল। কিন্তু যখন অয়নের ঘটনাটি ঘটে, তখন সবাই ভয় পেয়ে যায়। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে চুপ করে থাকে, কেউ ভাবে বিষয়টি প্রকাশ পেলে শিশুদের আরও ক্ষতি হবে। আমি নিজেও ভুল করেছিলাম। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি।”

“তারপর প্রকল্প বন্ধ হয়?”

“আনুষ্ঠানিকভাবে। নীলপ্রহর সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। কিছু শিশু অন্যত্র চলে যায়। কিছু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এন-৬ কোথায় গেল, তার কোনও পরিষ্কার নথি নেই।”

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে বলল, “আমি কি সেই ষষ্ঠ শিশু?”

মৃণালিনী দেবী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।

তিনি অন্য একটি ছোট খাম বের করলেন। খামের ভেতরে ছিল একটি জন্মনিবন্ধনের পুরোনো প্রতিলিপি, একটি হাসপাতালের কাগজ এবং একটি সাদা-কালো ছবি।

জন্মনিবন্ধনের কাগজে নাম লেখা—‘ঋদ্ধিমান দত্ত’।

জন্মতারিখের পাশে একটি লাল দাগ। নীচে হাতে লেখা—‘সংশোধিত নথি’।

হাসপাতালের কাগজে লেখা—‘পুরুষ শিশু, পরিচয় অজ্ঞাত, আনুমানিক বয়স চার বছর। ডান হাতে চারটি আঙুল। পুরোনো আঘাতের চিহ্ন। কথা বলার ক্ষমতা আছে, কিন্তু নিজের পরিচয় জানাতে অক্ষম।’

কাগজের তারিখটি ছিল ২০০০ সালের ১৭ অক্টোবর।

ঋদ্ধিমান ফিসফিস করে বলল, “আমার জন্ম তো ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে।”

“এই নথিতে তোমার নাম নেই,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “তোমার বর্তমান পরিচয়ের সঙ্গে এটিকে সরাসরি যুক্ত করার প্রমাণও নেই। কিন্তু নথিটি দেখায়, ওই সময়ে একটি অজ্ঞাতপরিচয় শিশুকে এখানে আনা হয়েছিল। পরে তার চিকিৎসা ও স্থানান্তরের কাগজপত্র অসম্পূর্ণ।”

ছবিটি ছিল সেই শিশুটির।

চার বছরের একটি ছেলে, যার ডান হাতে চারটি আঙুল। চোখ দুটি বড়, মুখে অস্বস্তি আর ভয়। ছবির পেছনে লেখা—‘এন-৬, অস্থায়ী নাম: নীল।’

ঋদ্ধিমান ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।

‘নীল’।

তাহলে জন্মের আগে তার নাম ছিল নীল?

“এটা কি আমার ছবি?” সে জিজ্ঞাসা করল।

“আমি নিশ্চিত নই,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “তোমার মুখের সঙ্গে কিছু মিল আছে। কিন্তু এত বছর পর শুধু মুখ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তোমার বর্তমান জন্মনিবন্ধনের সংশোধনের নথি কোথায়, সেটাও খুঁজতে হবে।”

ঋদ্ধিমান ছবিটি অদিতির হাতে দিল।

“তুমি কি মনে করো, আমি এই শিশুটি?”

অদিতি কিছুক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।

“আমি মনে করি, তুমি এমন কিছু জানার কাছাকাছি পৌঁছেছ, যা তোমার জীবন বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তোমার পরিচয় সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।”

এই উত্তরটাই ঋদ্ধিমানের দরকার ছিল। এতদিন ধরে সে অন্যদের কথায় নিজের স্মৃতির সত্যতা বিচার করেছে। এবার সে চেয়েছিল, অন্তত কেউ একজন তাকে তাড়াহুড়ো করে কোনও পরিচয় না দিক।


মৃণালিনী দেবী তাদের আরও একটি নথি দেখালেন।

এটি ছিল অরিন্দম দত্তের ব্যক্তিগত চিঠি। তারিখ—২০০১ সালের ৩ জানুয়ারি।

“মৃণালিনী,

আমি ছেলেটিকে নিয়ে যাচ্ছি। তার নাম এখন নীল। সে নিজের অতীত মনে করতে পারে না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার কোনও অতীত নেই। আমি তাকে এমন পরিবেশে বড় করতে চাই, যেখানে তাকে কোনও নির্দিষ্ট স্মৃতি বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হবে না।

অনির্বাণ আমাকে বলেছে, ছেলেটিকে নিজের পরিবারের পরিচয় দেওয়া যাবে না। তার মতে, এতে পরীক্ষার ফল নষ্ট হবে। আমি তাকে বলেছি, কোনও শিশুর জীবন কোনও গবেষণার ফল নয়।

আমি তাকে নিজের কাছে রাখব। কিন্তু আমার পরিচয়ও তার সামনে সহজভাবে প্রকাশ করতে পারব না। কারণ অনির্বাণ এখনও আমাদের খুঁজছে। আমি যদি তাকে জানাই যে সে কোথা থেকে এসেছে, সে হয়তো আবার সেই বাড়িতে ফিরে যেতে চাইবে। আর আমি ভয় পাচ্ছি, সেখানে ফিরে গেলে তাকে আর রক্ষা করতে পারব না।

আমি জানি, একদিন সে প্রশ্ন করবে। সেদিন তাকে সত্যিটা জানাতে হবে।

— অরিন্দম।”

চিঠিটি পড়ে ঋদ্ধিমান চেয়ারে হেলান দিল।

“তাহলে অরিন্দম দত্ত আমার বাবা ছিলেন না?”

“আইনগতভাবে তুমি তাঁর ছেলে ছিলে,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “তিনি তোমাকে নিজের কাছে রেখেছিলেন, তোমার পরিচয় তৈরি করেছিলেন, তোমাকে বড় করেছিলেন। কিন্তু তোমার জন্মদাতা কে, কিংবা তুমি কোথা থেকে এসেছিলে, তা এই নথিগুলি নিশ্চিত করে না।”

“আর অনির্বাণ?”

“তিনি ছিলেন সেই গবেষক, যিনি তোমার জীবনের প্রথম অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তোমার জন্মদাতা—এমন কোনও প্রমাণ এখানে নেই।”

ঋদ্ধিমান চোখ বন্ধ করল।

তার মনে পড়ল বাবার সঙ্গে কাটানো শৈশব। রবিবার সকালে বইয়ের দোকানে যাওয়া, ছাদের ওপর ঘুড়ি ওড়ানো, পরীক্ষার আগে বাবার পাশে বসে পড়া, অসুখ হলে রাত জেগে থাকা। সেই স্মৃতিগুলির কোনওটিই এখন তার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছিল না।

সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, পরিচয় এবং সম্পর্ক একই জিনিস নয়।

কেউ তাকে জন্ম দিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানা থাকতে পারে। কিন্তু যে মানুষ তাকে মানুষ করেছেন, তার ভালোবাসা কেবল একটি নথি দিয়ে মুছে যায় না।

তবু অরিন্দম কেন নিজের নাম নিয়ে বিভ্রান্তিকর সূত্র রেখে গিয়েছিলেন?

মৃণালিনী দেবী যেন তার মনের প্রশ্ন বুঝতে পারলেন।

“অরিন্দম দত্ত তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অনির্বাণ দত্তের নাম ব্যবহার করে তিনি কিছু নথি তৈরি করেছিলেন, যাতে প্রকল্পের লোকেরা মনে করে, ছেলেটি এখনও গবেষণার অধীনে আছে। আবার নিজের নামেও কিছু নথি রেখেছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে সত্যিটা উদ্ধার করা যায়। এই দ্বৈত পরিচয়ের ফলে পরবর্তী সময়ে নথিগুলি একে অপরের সঙ্গে মেলেনি। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।”

“কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর আমাকে এই চিঠি পাঠালেন কে?”

মৃণালিনী দেবী চুপ করে গেলেন।

অদিতি বলল, “হয়তো চিঠিগুলি আগে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা ছিল। আবার কেউ তাঁর নথি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আমরা নিশ্চিত নই।”

ঋদ্ধিমান বলল, “আমাকে জানতে হবে অরিন্দম সত্যিই মারা গিয়েছিলেন কি না।”


ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে তারা শর্মিষ্ঠা পালকে ফোন করল। আগের রাতে অদিতি তাকে সবকিছু জানিয়েছিল। শর্মিষ্ঠা তখন থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল।

ফোনে ঋদ্ধিমান বলল, “তোমার কাছে অয়নের খাতা ছাড়া আর কিছু আছে?”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর শর্মিষ্ঠা বলল, “একটা পুরোনো অডিও ক্যাসেট। এত বছর কাউকে দেখাইনি। অয়ন আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, একদিন যদি কেউ সত্যিটা জানতে চায়, তাহলে যেন সেটা শোনাই।”

“তুমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলে কেন?”

“কারণ আমিও জানতাম না, কী সত্যি আর কী মিথ্যে। ছোটবেলায় আমাদের এমনভাবে প্রশ্ন করা হতো যে, নিজেদের চোখে দেখা ঘটনাকেও সন্দেহ করতে শুরু করেছিলাম। আমি ভয় পেতাম, ক্যাসেটটা শুনলে আবার সব মনে পড়বে।”

“আমরা কি তোমার বাড়িতে আসতে পারি?”

“এসো।”


শর্মিষ্ঠার বাড়িতে পৌঁছে দেখা গেল, সে টেবিলের ওপর একটি ছোট ক্যাসেট প্লেয়ার রেখে অপেক্ষা করছে। ক্যাসেটের গায়ে অয়নের হাতের লেখা—‘শেষ রাত’।

অদিতি রেকর্ড বোতাম চালু করল, যাতে কথাগুলি ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যায়।

ক্যাসেট চলতে শুরু করল।

প্রথমে কিছু অস্পষ্ট শব্দ। তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ।

“আমার নাম অয়ন। আজ যদি কেউ এই রেকর্ডিং শোনে, তাহলে জেনে রেখো, আমি যা বলছি, তার সবটা তোমাদের মনে থাকবে না। তোমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—আমরা ছয়জন এখানে এসেছিলাম। আমাদের মধ্যে একজনকে বলা হয়েছিল, সে অন্যদের বাঁচাতে পারবে। আরেকজনকে বলা হয়েছিল, সে সবাইকে বিপদে ফেলেছে।”

কিছুক্ষণ বিরতি।

তারপর অন্য একটি কণ্ঠ।

“আমি নীল। আমি জানি না, আমার আসল নাম কী। কিন্তু আমি জানি, ওই ঘরে যা ঘটেছে, সেটা দুর্ঘটনা ছিল না।”

ঋদ্ধিমান নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

ক্যাসেটে নীলের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

“অয়ন পালাতে চেয়েছিল। সে বলেছিল, আমাদের মধ্যে একজনকে মিথ্যে ঘটনার জন্য দোষী বানানো হবে। সে বলেছিল, যদি কেউ আমাদের জিজ্ঞাসা করে, কে দরজাটা খুলেছিল, তাহলে কেউ যেন নিজের স্মৃতির ওপর একা নির্ভর না করে। কারণ আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা গল্প বলা হয়েছে।”

এরপর হঠাৎ একটি দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

“রেকর্ডিং বন্ধ করো।”

তারপর ধস্তাধস্তির শব্দ। একটি শিশুর কান্না।

অয়নের কণ্ঠ আবার ফিরে এল।

“ঋদ্ধি, যদি তুমি এটা শোনো, তাহলে আমাকে মনে করার চেষ্টা কোরো না। আমি তোমার বন্ধু ছিলাম কি না, তার চেয়েও বড় কথা—তুমি নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচতে পারো কি না। তারা তোমাকে বলেছে, তুমি কী দেখেছ। তারা তোমাকে বলেছে, তুমি কী ভুলে গেছ। কিন্তু তোমার সামনে এখনও একটা সুযোগ আছে। তুমি সবকিছু না জেনেও ভালো মানুষ হতে পারো।”

ক্যাসেটটি হঠাৎ থেমে গেল।

ঘরে কেউ কথা বলল না।

শর্মিষ্ঠার চোখে জল এসে গিয়েছিল।

“আমি এত বছর ভেবেছি, অয়ন আমাকে দোষ দিয়েছিল। কারণ ঘটনার পর আমাকে বারবার বলা হয়েছিল, আমি নাকি দরজা খুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, হয়তো সেই স্মৃতিটাই আমাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।”

অদিতি তার হাত ধরল।

“তুমি তখন শিশু ছিলে। তোমাকে যা বিশ্বাস করানো হয়েছিল, তার দায় তোমার নয়।”

ঋদ্ধিমান ক্যাসেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “অয়ন জানত, আমাদের স্মৃতি বদলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে নিজেও কি সব জানত?”

“হয়তো না,” অদিতি বলল। “সে যা জানত, সেটুকুই আমাদের বলতে চেয়েছিল।”

ঋদ্ধিমান হঠাৎ একটি কথা মনে করল।

“ক্যাসেটের শুরুতে অয়ন বলল, আমরা ছয়জন এসেছিলাম। কিন্তু শেষে নীল বলল, অয়ন পালাতে চেয়েছিল। তাহলে নীল আর অয়ন আলাদা মানুষ।”

শর্মিষ্ঠা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আমি দু’জনকেই চিনতাম। অয়ন ছিল চঞ্চল, সবসময় প্রশ্ন করত। নীল ছিল চুপচাপ। তার ডান হাতে চারটি আঙুল ছিল। কিন্তু একটা কথা আমি কখনও বুঝতে পারিনি—অয়ন কেন তোমাকে এত গুরুত্ব দিত।”

ঋদ্ধিমান বলল, “হয়তো কারণ আমি কিছু দেখেছিলাম।”

“কী দেখেছিলে?”

“মনে নেই।”

অদিতি বলল, “তাহলে সেই স্মৃতি জোর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব না। আগে নথি খুঁজব। ঘটনাগুলি মিলিয়ে দেখব।”


সেদিন বিকেলে তারা আবার নীলপ্রহর বাড়িতে ফিরে গেল। এবার তাদের উদ্দেশ্য ছিল নীল দরজার রহস্যের সমাধান করা, কোনও অজানা কণ্ঠের নির্দেশ মানা নয়।

অদিতি সঙ্গে এনেছিল বাড়ির পুরোনো নকশা, মৃণালিনী দেবীর দেওয়া নথির অনুলিপি এবং ক্যাসেটের রেকর্ডিং।

বাড়ির নিচতলার ঘরগুলিতে খোঁজ করতে করতে তারা একটি ছোট বৈদ্যুতিক বাক্স খুঁজে পেল। বাক্সটি বহু বছর আগে দেয়ালের ভেতরে বসানো হয়েছিল। বাইরে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও ভেতরে একটি স্বল্পক্ষমতার ব্যাটারি এবং পুরোনো টাইমার সার্কিটের অবশিষ্টাংশ ছিল।

অদিতি বলল, “এই বাড়ির আলো জ্বলার একটা প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা আছে। কেউ হয়তো ব্যাটারি বদলেছে, কিংবা অন্য কোনও গোপন সংযোগ রেখেছিল।”

“কিন্তু ঠিক রাত ২টা ১৭ মিনিটে কেন?”

অদিতি সার্কিটের পাশে লেখা একটি সংখ্যা দেখাল।

‘২:১৭ — সেশন ট্রিগার।’

“এটা কোনও সময়সূচির অংশ ছিল। সম্ভবত গবেষণার সময় শিশুদের নির্দিষ্ট আলো বা শব্দ দেখানো হতো। একই সময়ে বারবার ঘটানো হলে সেই সময়টা তাদের মনে ভয়ের সংকেত হয়ে দাঁড়াতে পারে।”

ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “তাহলে নীল আলো কোনও অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়।”

“এখন পর্যন্ত তার প্রমাণ নেই,” অদিতি উত্তর দিল। “কিন্তু কে এত বছর ধরে এই ব্যবস্থা চালু রেখেছে, সেটাই প্রশ্ন।”

তারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। নীল দরজার সামনে এসে ঋদ্ধিমান থামল।

দরজার গায়ে কোনও তালা নেই। তবু দরজাটি ঠেলে খুলতে গেলে মনে হচ্ছিল, অন্য দিক থেকে কেউ ঠেকিয়ে রেখেছে।

অদিতি নকশার সঙ্গে দরজার অবস্থান মিলিয়ে দেখল।

“ঘর ছয়ের দরজা এটা নয়,” সে বলল। “ঘর ছয়ের প্রবেশপথ এই দেওয়ালের পেছনে।”

তারা দেওয়ালের কাঠের প্যানেল সরিয়ে একটি সরু ফাঁক খুঁজে পেল। ভেতরে ছোট একটি সুইচবোর্ড, পুরোনো তার এবং একটি যান্ত্রিক লক। লকটির পাশে লেখা—‘পর্যবেক্ষণ কক্ষ—প্রবেশের আগে রেকর্ড চালু করুন।’

অদিতি লকটি পরীক্ষা করে বলল, “এটা সাধারণ যান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় আটকে আছে।”

কিছু চেষ্টা করার পর দরজাটি খুলে গেল।

ঘরটি ছোট, জানলাহীন। মাঝখানে একটি চেয়ার। সামনে আয়না, পাশে পুরোনো রেকর্ডিং যন্ত্র। দেওয়ালে ছয়টি ছোট বাতি বসানো। পাঁচটি নিভে আছে। ষষ্ঠটির ওপর নীল রঙের কাচ।

ঋদ্ধিমান ঘরে ঢুকতেই একটি স্বয়ংক্রিয় রেকর্ডার চালু হয়ে গেল। স্পিকারে ভেসে এল অরিন্দম দত্তের কণ্ঠ।

“যদি তুমি এই ঘরে এসে থাকো, তার মানে তুমি নিজের অতীতের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছ। আমি জানি না, তুমি সবটা মনে করতে পারবে কি না। আমি এটাও জানি না, আমার রেখে যাওয়া নথিগুলি তোমার হাতে পৌঁছবে কি না। তাই আমি এই রেকর্ডিং রেখে যাচ্ছি।”

ঋদ্ধিমানের চোখ ভিজে উঠল।

বাবার কণ্ঠ এত বছর পর শুনছে সে।

রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“তুমি যখন এখানে এসেছিলে, তখন তোমার নাম ছিল নীল। তুমি চার বছরের একটি শিশু ছিলে। তোমার ডান হাতে চারটি আঙুল ছিল। তুমি খুব কম কথা বলতে, কিন্তু তোমার স্মৃতির প্রতিক্রিয়া অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ছিল। তুমি কিছু ঘটনা ভুলে যেতে, আবার কিছু ঘটনা এমনভাবে মনে রাখতে, যা অন্যরা অস্বীকার করত।

“আমি তোমাকে এই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাই। তোমার নিরাপত্তার জন্য তোমাকে নতুন পরিচয় দেওয়া হয়। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমি তোমার বাবা। আইনগতভাবে তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। তোমাকে কোনও মিথ্যা স্মৃতি জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইনি। কিন্তু তোমার আগের জীবনের সব তথ্যও জানাতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, তুমি বড় হলে সব বলব।

“তার আগেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনির্বাণের লোকেরা আবার তোমার খোঁজ শুরু করে। আমি তোমাকে নীলপ্রহর থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম। আমি ভুল করেছিলাম—কারণ সত্যিটা গোপন রাখতে গিয়ে তোমাকে এমন এক জীবনে রেখে গেলাম, যেখানে তোমার নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ ছিল না।

“তোমার মনে যদি অয়নের স্মৃতি ফিরে আসে, তাহলে মনে রেখো, অয়ন তোমার বন্ধু ছিল। কিন্তু তোমার সব স্মৃতি নির্ভুল নয়। ঘটনার রাতে সে তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। তোমরা দু’জন ঘর থেকে বেরোতে চেয়েছিলে। দরজার সামনে ধস্তাধস্তির সময় সে আহত হয়। তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে কোথায় সরিয়ে নেওয়া হয়, আমি জানতে পারিনি।

“তোমাদের বলা হয়েছিল, সে পুকুরে ডুবে মারা গেছে। সেই খবরের সত্যতা আমি কখনও যাচাই করতে পারিনি। আমি শুধু জানি, তাকে জীবিত অবস্থায় শেষবার দেখেছিলাম ক্লিনিকের পেছনের ঘরে।

“তুমি যদি তাকে খুঁজতে যাও, তাহলে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবো। আর একটা কথা—তুমি নীল ছিলে বলে আজও তোমাকে নীল হয়ে থাকতে হবে না। তুমি যে মানুষ হয়েছ, সেই মানুষটিও সত্যি।”

রেকর্ডিং শেষ হলো।

ঘরে কেবল যন্ত্রের ক্ষীণ গুঞ্জন।

ঋদ্ধিমান চোখ মুছে নিল।

“তাহলে অয়নকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?”

অদিতি বলল, “এই রেকর্ডিংয়ের তারিখ খুঁজতে হবে। তারপর ক্লিনিকের স্থানান্তর নথি। হয়তো সেখানেই উত্তর আছে।”

ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়াল থেকে ক্ষীণ শব্দ এল।

তিনবার টোকা।

তারপর একটি পুরুষ কণ্ঠ।

“ঋদ্ধি?”

ঋদ্ধিমান স্থির হয়ে গেল।

এই কণ্ঠ সে চেনে।

অথচ এত বছর ধরে যে স্মৃতির সঙ্গে এই কণ্ঠকে মিলিয়ে এসেছে, তা হয়তো সম্পূর্ণ সত্য ছিল না।

দেওয়ালের সরু দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ মানুষ। সাদা চুল, কাঁপা হাত, চোখে ক্লান্তি। তাঁর মুখে সময়ের গভীর রেখা। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত পরিচিতি।

লোকটি বললেন, “আমাকে চিনতে পারছ?”

ঋদ্ধিমান কোনও উত্তর দিল না।

লোকটি নিজেই বললেন, “আমি অনির্বাণ দত্ত।”

অদিতি সঙ্গে সঙ্গে সামনে এগিয়ে এল।

“আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?”

“যেখানে থাকা উচিত ছিল না,” বৃদ্ধ বললেন। “আমি নিজের কাজের পরিণতি থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছি।”

ঋদ্ধিমান কঠিন গলায় বলল, “আপনি কি আমার স্মৃতি বদলে দিয়েছিলেন?”

অনির্বাণ দত্ত চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আমি সেই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমি শিশুদের ওপর এমন পরীক্ষা চালাতে দিয়েছিলাম, যার নৈতিক সীমা বহু আগেই অতিক্রম করা হয়েছিল। তোমার স্মৃতির ওপরও প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু তোমার প্রতিটি স্মৃতি আমি তৈরি করিনি। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারিনি, কোথায় সত্য শেষ হচ্ছে আর আমাদের ব্যাখ্যা শুরু হচ্ছে।”

“অয়নের কী হয়েছিল?”

অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“অয়ন পালানোর রাতে আহত হয়েছিল। তাকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার চিকিৎসা হয়েছিল। সে বেঁচে ছিল। কিন্তু তার পরিবার তাকে অন্যত্র নিয়ে যায়। প্রকল্পের অনিয়ম প্রকাশ্যে এলে তাদের ওপরও চাপ পড়বে—এই ভয়ে তারা পরিচয় গোপন করে চলে যায়। আমি তাদের খুঁজিনি। আমার খোঁজ করা উচিত ছিল।”

“তাহলে পুকুরে ডুবে মৃত্যুর খবর?”

“সেটা ছিল একটি সাজানো খবর। প্রকল্পের ব্যর্থতা এবং শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে আড়াল করতে কয়েকজন মিলে দুর্ঘটনার গল্প ছড়িয়ে দেয়। আমি তা থামাইনি। সেটাই আমার অপরাধগুলির একটি।”

“আপনি জানতেন, আমি অয়নকে মৃত মনে করে বড় হচ্ছি?”

“জানতাম।”

“তাহলে আমাকে সত্যিটা জানাননি কেন?”

অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল।

“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। প্রথমে নিজের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার ভয়, পরে তোমাকে আবার সেই অতীতের মুখোমুখি করার ভয়। শেষ পর্যন্ত আমি বুঝেছি, আমার নীরবতা তোমাকে রক্ষা করেনি। বরং তোমাকে প্রশ্নহীন একটি মিথ্যার মধ্যে আটকে রেখেছে।”

ঋদ্ধিমান চুপ করে রইল।

অনির্বাণ বললেন, “তোমার আগের নাম ছিল নীল। কিন্তু তোমাকে সেই নামেই বাঁচতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। অরিন্দম তোমাকে যে নাম দিয়েছিলেন, তা তিনি ভালোবাসা থেকে দিয়েছিলেন। তিনি তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তোমার জীবনের সত্যিটা অসম্পূর্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর স্নেহ মিথ্যা ছিল না।”

“অরিন্দম কোথায় মারা গিয়েছিলেন?”

“তিনি বহু বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর শেষ দিনগুলিতে আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম। তিনি চেয়েছিলেন, তুমি প্রাপ্তবয়স্ক হলে সত্যিটা জানো। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন, সত্যি জানার সঙ্গে সঙ্গে তুমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারো। তাই তিনি নথি রেখে গিয়েছিলেন, কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি।”

ঋদ্ধিমান বলল, “আপনি আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন?”

অনির্বাণ মাথা নাড়লেন।

“কিছু বার্তা আমি পাঠিয়েছি। কিছু পুরোনো নথিতে আগে থেকে লেখা ছিল। সব বার্তা আমার নয়। অরিন্দম একটি নির্দিষ্ট সময়ে চিঠিগুলি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আর নীল দরজার আলো—সেটি আমি কয়েক বছর আগে আবার চালু করি। ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু আমি ভুল করেছি। তোমাকে কোনও সংকেত দিয়ে এখানে টেনে আনার অধিকার আমার ছিল না।”

“আপনি কেন ২টা ১৭ মিনিট বেছে নিয়েছিলেন?”

অনির্বাণ বললেন, “সেই রাতে প্রথম বড় ঘটনাটি ঘটে রাত ২টা ১৭ মিনিটে। দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিশুরা ঘরের মধ্যে আটকে পড়েছিল। সেই সময় থেকেই ওই আলো ও শব্দের সংকেত ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে সেটিকে পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময় হিসেবে রাখা হয়। আমরা ভেবেছিলাম, একই সংকেতের মাধ্যমে শিশুদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যাবে। কিন্তু সেটি তাদের মধ্যে আতঙ্কের স্মৃতি তৈরি করেছিল।”

অদিতি প্রশ্ন করল, “আপনি কি জানতেন, এই বাড়িতে এখনও যন্ত্র কাজ করছে?”

“হ্যাঁ। আমি মাঝেমধ্যে এসে পরীক্ষা করতাম। কিছু নথি এখানে রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কোনও দিন সাহস করে সব প্রকাশ করব। কিন্তু সাহস আসেনি।”

ঋদ্ধিমান বৃদ্ধের দিকে তাকাল।

“এখন আপনি কী চান?”

“আমি চাই, সব নথি প্রকাশ্যে আসুক। শিশুদের নাম, তাদের ওপর করা অন্যায়, প্রকল্পের সত্য—সবকিছু। আমি নিজের দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত।”

ঋদ্ধিমান বলল, “শুধু দুঃখ প্রকাশ করলে হবে না। যারা বেঁচে আছে, তাদের বক্তব্যও সামনে আনতে হবে। শর্মিষ্ঠা, সৌম্যজিৎ, মধুরিমা—সবাইকে খুঁজতে হবে। অয়নকে খুঁজতে হবে। আর আমার পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।”

অনির্বাণ মাথা নাড়লেন।

“তুমি ঠিক বলেছ।”


পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ছিল দীর্ঘ অনুসন্ধানের সময়।

অদিতি পুরোনো সংবাদপত্রের আর্কাইভ খুঁজল। মৃণালিনী দেবী ক্লিনিকের সংরক্ষিত রেজিস্টার থেকে কিছু স্থানান্তর নথি উদ্ধার করলেন। শর্মিষ্ঠা এবং অন্য প্রাক্তন অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। প্রত্যেকের স্মৃতি আলাদা ছিল, কিন্তু নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল।

অয়নকে ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে আহত অবস্থায় একটি অন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে তার এক আত্মীয়ের কাছে পাঠানো হয়। পরিবারটি অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিল। নথিতে তার পূর্ণ পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ প্রকল্পের লোকেরা তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল।

আরও অনুসন্ধানের পর একটি পুরোনো ঠিকানা পাওয়া গেল।

সেখানে গিয়ে ঋদ্ধিমান জানতে পারল, অয়ন বহু বছর আগে নিজের নাম বদলেছে। সে এখন জীবিত, তবে দীর্ঘদিন ধরে নিজের অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে না। তাকে খুঁজে পাওয়ার পর প্রথমে সে দেখা করতে রাজি হয়নি। পরে অরিন্দমের চিঠি এবং পুরোনো ক্যাসেটের রেকর্ডিং শোনানো হলে সে সম্মতি দেয়।

তাদের দেখা হয়েছিল একটি ছোট বইয়ের দোকানের পেছনের ঘরে।

ঋদ্ধিমান দরজা খুলে ঢুকতেই দেখল, জানলার পাশে বসে আছে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ। মুখে দাড়ি, চোখে চশমা, চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে সেই পুরোনো চঞ্চলতার ছায়া রয়ে গেছে।

লোকটি উঠে দাঁড়াল।

“ঋদ্ধি?”

ঋদ্ধিমান থমকে গেল।

এই সম্বোধনটি সে এত বছর পর শুনল।

“অয়ন?”

লোকটি মৃদু হাসল।

“এই নামটা অনেক দিন কেউ ডাকেনি।”

ঋদ্ধিমান কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে হচ্ছিল, এত প্রশ্ন করবে যে কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু মুখ থেকে প্রথমে বেরোল অন্য কথা।

“তুমি বেঁচে আছ।”

অয়ন দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“হ্যাঁ। কিন্তু আমি জানতাম না, তুমি কোনও দিন সত্যিটা জানতে পারবে কি না।”

“আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি পুকুরে ডুবে মারা গেছ।”

“আমাকে বলা হয়েছিল, তোমার স্মৃতি এতটাই বদলে গেছে যে তুমি আমাকে চিনতেই পারবে না। আমাদের দু’জনকেই আলাদা গল্প বলা হয়েছিল।”

“তুমি কেন যোগাযোগ করোনি?”

“আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তখন আমার পরিবার ভয় পেয়েছিল। আমি নিজেও দীর্ঘদিন চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম। পরে যখন স্বাভাবিক জীবন শুরু করি, তখন মনে হয়েছিল, তোমাকে খুঁজে বের করে আবার সেই অতীতের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি জানতাম না, তুমি কতটা মনে রেখেছ।”

ঋদ্ধিমান চেয়ারে বসে পড়ল।

“আমার মনে আছে, আমরা বন্ধু ছিলাম। আবার এমন অনেক কিছু মনে আছে, যা হয়তো সত্যি নয়। আমি আর বুঝতে পারি না, কোনটা আমার নিজের স্মৃতি।”

অয়ন শান্ত গলায় বলল, “সব স্মৃতির নিখুঁত প্রমাণ পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যা জানি, তা দিয়ে সত্যের কাছাকাছি যেতে পারি। আমার মনে আছে, তুমি আমাকে ঘর থেকে বেরোতে সাহায্য করেছিলে। তোমার মনে না থাকলেও ঘটনাটি মুছে যায় না।”

“তারপর কী হয়েছিল?”

“সেই রাতে আমরা ঘর ছয় থেকে বেরোতে চেয়েছিলাম। নীল আমাদের পথ দেখিয়েছিল। দরজার কাছে একজন গবেষক আমাদের থামায়। ধস্তাধস্তির সময় আমি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাই। আমাকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমার পরিবার আমাকে নিয়ে চলে যায়। নীলকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আমি জানতাম না।”

“নীল ছিলাম আমি।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি শুধু নীল নও। তুমি সেই ঋদ্ধিমানও, যে অরিন্দমের কাছে বড় হয়েছে। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নিতে হবে না।”

ঋদ্ধিমান চুপ করে রইল।

অয়ন বলল, “তুমি কি জানো, আমি তোমার নাম কেন লিখেছিলাম?”

“কেন?”

“কারণ তুমি অন্যদের মতো সবকিছু মেনে নিতে না। আমাদের বলা হতো, কোনও ঘটনা ঘটেনি, অথচ তুমি প্রশ্ন করতে—তাহলে আমাদের ভয় লাগছে কেন? আমরা জানতাম না, তুমি কতটা মনে রেখেছ। কিন্তু তুমি প্রশ্ন করা বন্ধ করোনি।”

ঋদ্ধিমান মৃদু হেসে ফেলল।

“আমি এখন স্থপতি। পুরোনো বাড়ি আর নকশা নিয়ে কাজ করি। হয়তো সেই জন্যই পুরোনো দরজাগুলির পেছনে কী আছে, তা জানতে ইচ্ছে হয়।”

“তাহলে এবার একটা কাজ করো,” অয়ন বলল। “আমাদের স্মৃতি নিয়ে যে বাড়িতে পরীক্ষা হয়েছিল, সেই বাড়িটাকে আর গোপন রহস্যের জায়গা করে রেখো না। ওটাকে এমন জায়গা করো, যেখানে কেউ নিজের স্মৃতি হারানোর ভয় পাবে না।”


কয়েক মাস পরে নীলপ্রহর বাড়ির সামনে একটি নতুন ফলক বসানো হলো।

নীলপ্রহর স্মৃতি ও শিশু-অধিকার কেন্দ্র

নীচে লেখা—

“এই বাড়িতে একসময় শিশুদের স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনৈতিক গবেষণা চালানো হয়েছিল। এখানে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের অভিজ্ঞতা, সাহস এবং নীরবতার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। কোনও শিশুর স্মৃতি, পরিচয় বা সম্মতিকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।”

অরিন্দম দত্তের রেখে যাওয়া নথি, মৃণালিনী দেবীর সাক্ষ্য, অয়নের রেকর্ডিং এবং প্রাক্তন অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য নিয়ে একটি সংরক্ষণাগার তৈরি করা হলো। অনির্বাণ দত্ত নিজের ভূমিকার কথা লিখিতভাবে স্বীকার করলেন। তদন্ত শুরু হলো। বহু প্রশ্নের উত্তর আর কখনও পাওয়া যাবে না—কিছু নথি হারিয়ে গেছে, কিছু মানুষের স্মৃতি অসম্পূর্ণ, কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আর বেঁচে নেই।

তবু নীরবতার দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরেছিল।

ঋদ্ধিমান নিজের জন্মপরিচয় সম্পর্কে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে গেল। তার জন্মদাতা কে, সে কোথায় জন্মেছিল, তার প্রথম পরিবারের কী হয়েছিল—এসব প্রশ্নের সব উত্তর পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাকেন্দ্রের নথি থেকে জানা গেল, তাকে চার বছর বয়সে অজ্ঞাতপরিচয় শিশু হিসেবে আনা হয়েছিল। তার আগের জীবনের কোনও নির্ভরযোগ্য নথি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

আইনগতভাবে নিজের পরিচয় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করল সে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে নিজের নাম বদলানোর সিদ্ধান্ত নিল না।

সে রইল ঋদ্ধিমান দত্ত।

কারণ এই নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল তার বাবার হাত ধরে হাঁটতে শেখা, প্রথম স্কুলে যাওয়া, প্রথম ব্যর্থতার পর সাহস ফিরে পাওয়া, এবং অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত। সেই স্মৃতিগুলি অসম্পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেগুলি তার জীবনের অংশ।

একদিন বিকেলে অদিতি তাকে নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।

দরজাটি এখন খোলা। ঘরের ভেতরে কোনও নীল আলো নেই। পুরোনো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা খুলে ফেলা হয়েছে। দেয়ালে শিশুদের আঁকা নতুন ছবি ঝুলছে।

অদিতি পাশে এসে দাঁড়াল।

“কী ভাবছ?”

ঋদ্ধিমান বলল, “ভাবছি, একটা দরজা এত বছর ধরে আমার কাছে প্রশ্ন হয়ে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, ওটার ওপারে এমন একটা সত্য আছে, যা জানলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।”

“এখন কী মনে হচ্ছে?”

“সত্যি জানার পরও সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু অন্তত কোন প্রশ্নগুলো আমার নিজের, সেটা বুঝতে পারছি।”

অদিতি হাসল।

“তাহলে তুমি কি এখন অতীতকে ভয় পাও না?”

ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ভয় পাই। কিন্তু আর নিজের স্মৃতিকে শত্রু ভাবি না। আমি জানি, স্মৃতি ভুল করতে পারে। মানুষও পারে। তাই স্মৃতির পাশাপাশি প্রমাণ, অন্যের অভিজ্ঞতা আর নিজের বিবেককে গুরুত্ব দিতে হবে।”

ঠিক তখনই অয়ন এসে পৌঁছল। তার হাতে একটি ছোট বাক্স।

“তোমাদের জন্য কিছু এনেছি।”

বাক্স খুলে দেখা গেল, একটি পুরোনো কাঠের খেলনা। ছয়টি ছোট কাঠের ঘর একসঙ্গে জোড়া লাগানো। প্রতিটি ঘরের ওপর একটি করে নাম খোদাই করা—অয়ন, সৌম্যজিৎ, মধুরিমা, শর্মিষ্ঠা, নীল এবং ঋদ্ধিমান।

“এটা আমরা ছোটবেলায় বানিয়েছিলাম,” অয়ন বলল। “আমাদের মনে ছিল, একদিন এমন একটা বাড়ি তৈরি করব, যেখানে কেউ কাউকে আটকে রাখতে পারবে না। পরে খেলনাটা হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক বছর পর আমার পরিবারের পুরোনো বাক্সে পেলাম।”

ঋদ্ধিমান খেলনাটির ওপর আঙুল বোলাল।

“তাহলে আমাদের স্বপ্নটা পুরো হারিয়ে যায়নি।”

“না,” অয়ন বলল। “শুধু অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

তারা তিনজন বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। দূরে রাস্তার ওপর দিয়ে মানুষ চলেছে, দোকানের শাটার উঠছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। পৃথিবী তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাচ্ছে।

ঋদ্ধিমান একবার নীল দরজার দিকে তাকাল।

এখন দরজাটি আর কোনও গোপন সংকেত নয়। আর কোনও অজানা কণ্ঠের উৎস নয়। এটি কেবল একটি পুরোনো দরজা, যার ওপারে একসময় অন্যায় ঘটেছিল, আর যার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ সেই অন্যায়ের কথা বলতে শিখেছে।

সে বুঝতে পারল, নিজের অতীতকে জানা মানে অতীতের কাছে বন্দি হয়ে থাকা নয়। বরং অতীতের সত্য যতটুকু জানা যায়, তা স্বীকার করে ভবিষ্যতের জন্য নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া।

তার জন্মের আগে কী নাম ছিল, সে কোথা থেকে এসেছিল, তার প্রথম পরিবার কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল—এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর হয়তো চিরকাল অজানা থেকে যাবে।

কিন্তু এখন সে জানে, কোনও অজানা পরিচয় তাকে অসম্পূর্ণ মানুষ করে দেয় না।

তার নাম ঋদ্ধিমান দত্ত।

তার স্মৃতিতে আলো আছে, অন্ধকার আছে, ভুল আছে, সত্যের টুকরো আছে। তার জীবনে অরিন্দমের ভালোবাসা আছে, অয়নের বন্ধুত্ব আছে, শর্মিষ্ঠার সাহস আছে, অদিতির প্রশ্ন করার ক্ষমতা আছে। আর আছে নিজের ভুল স্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব।

নীল দরজার ওপারে কোনও অলৌকিক উত্তর অপেক্ষা করছিল না।

অপেক্ষা করছিল কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠ, কিছু অসমাপ্ত সত্য, আর নিজের জীবনকে নতুন করে বোঝার সুযোগ।

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে দরজাটি বন্ধ করল।

এবার দরজার ওপার থেকে কোনও আলো বেরোল না।

কারণ আর কিছু গোপন রাখার প্রয়োজন ছিল না।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

নীল দরজার ওপারে (দ্বিতীয় পর্ব: স্মৃতির ভিতরে বন্দি)।

১. অন্ধকারের মধ্যে যে নামটি ভেসে এল

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধিমান বুঝতে পারছিল না, সে বাড়ির ভিতরে আছে, নাকি এমন কোনও ঘরে আটকে পড়েছে যার অস্তিত্ব কোনও নকশায় নেই।

কয়েক মুহূর্ত আগে দেওয়ালের ওপারে সে তার বাবাকে দেখেছে। অরিন্দম দত্তের মুখ, চোখ, হাতের ভঙ্গি—সবই পরিচিত। অথচ কাচের ওপার থেকে তাঁর ঠোঁটের নড়াচড়ায় যে কথাটি সে পড়েছিল, তা তার সমস্ত বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

‘আমাকে বিশ্বাস করিস না।’

কেন?

বাবা যদি সত্যিই বেঁচে থাকেন, তাহলে এত বছর কোথায় ছিলেন? আর যদি তিনি বন্দি থাকেন, তাহলে কে তাঁকে বন্দি করে রেখেছে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তিনি নিজেকেই বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন কেন?

হঠাৎ ঘরের কোণে নীল আলোটি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দেওয়ালে একটি ছোট পর্দা জ্বলে উঠল। পর্দায় কয়েকটি সংখ্যা ফুটে উঠল।

পরীক্ষা নম্বর ৪। বিষয়: ঋদ্ধিমান দত্ত।

তার নীচে লেখা—

স্মৃতি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তুত হোন।

ঋদ্ধিমান পিছিয়ে গেল।

“আমি কোনও পরীক্ষায় অংশ নিতে চাই না!” সে চিৎকার করল।

কোনও উত্তর এল না।

তারপর একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য নির্ধারিত শব্দটি বলুন।”

“কী শব্দ?”

“আপনার শৈশবের স্মৃতিতে সংরক্ষিত শব্দটি।”

ঋদ্ধিমান স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার শৈশবের এমন কোনও শব্দের কথা মনে পড়ছে না।

পর্দায় একটি ছবি ফুটে উঠল। একটি ছোট পুকুর। পুকুরের পাশে শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি শিশু।

অয়ন।

ঋদ্ধিমান ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।

শিশুটির মুখে কোনও হাসি নেই। সে যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে।

তারপর ছবিটি বদলে গেল।

একটি ঘর। ছয়টি চেয়ার। পাঁচটি চেয়ারে শিশু বসে আছে। ষষ্ঠ চেয়ারটি খালি।

খালি চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ বলছেন, “যে নিজের নাম ভুলে যাবে, সে আর কোনও দিন বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না।”

ঋদ্ধিমান নিজের মাথা চেপে ধরল।

তার মনে হল, বহু বছর আগে সে এই দৃশ্য দেখেছে। শুধু দেখেনি, এই ঘরের ভিতরেও সে ছিল।

“বন্ধ করুন!” সে চিৎকার করে উঠল।

পর্দায় নতুন একটি শব্দ দেখা গেল।

অয়ন।

তারপর আরেকটি।

ফিরে এসো।

ঋদ্ধিমান কাঁপা গলায় বলল, “ফিরে এসো।”

সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভিতরে একটি যন্ত্রের শব্দ হল। দেওয়ালের একপাশ সরে গেল। একটি সরু পথ দেখা গেল, যার শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলো।

ঋদ্ধিমান সেই পথ দিয়ে বেরিয়ে এল।

পিছনে তাকিয়ে দেখল, দরজাটি আবার বন্ধ হয়ে গেছে।

সে এমন একটি ঘরে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি টেবিল, কয়েকটি পুরোনো ফাইল এবং একটি ছোট কম্পিউটার রয়েছে। মেঝেতে ধুলো নেই। দেওয়ালের ঘড়িতে সময় থেমে আছে রাত দুটো সতেরো মিনিটে।

অদিতি কোথায়?

সে যে ঘরে ছিল, সেখানে তো অদিতিও ছিল। অন্ধকার নামার আগে সে অদিতির হাত ধরেছিল। তারপর?

কিছুই মনে পড়ছে না।

ঋদ্ধিমান কম্পিউটারের সামনে বসল। পর্দায় একটি ফোল্ডার খোলা।

প্রকল্প নীলপ্রহর।

ফোল্ডারের ভিতরে ছয়টি নাম।

অয়ন মুখোপাধ্যায়।

সৌম্যজিৎ পাল।

মধুরিমা দে।

ঋদ্ধিমান দত্ত।

শর্মিষ্ঠা পাল।

অনির্বাণ দত্ত।

প্রতিটি নামের পাশে একটি করে তারিখ। নামগুলির মধ্যে চারটির পাশে লেখা—‘পর্যবেক্ষণ সমাপ্ত’। একটি নামের পাশে—‘পর্যবেক্ষণ অসম্পূর্ণ’।

ঋদ্ধিমান নিজের নামের পাশে তাকাল।

সেখানে লেখা—

পর্যবেক্ষণ অসম্পূর্ণ। স্মৃতির প্রতিরোধ সক্রিয়।

কিন্তু অনির্বাণ দত্তের নামের পাশে যে কথাটি লেখা ছিল, তা পড়ে তার বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

পর্যবেক্ষণকারী।

অর্থাৎ অনির্বাণ দত্ত শুধু এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি শিশুদের পর্যবেক্ষণও করতেন।

ঋদ্ধিমান ফাইলের একটি নথি খুলল।

সেখানে লেখা ছিল—

‘প্রকল্পের উদ্দেশ্য: শিশুদের স্মৃতি, পরিচয় এবং মানসিক প্রতিক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা। নির্দিষ্ট পরিবেশ, শব্দ, আলো এবং পুনরাবৃত্ত দৃশ্যের মাধ্যমে পূর্ববর্তী স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হবে।’

ঋদ্ধিমান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

এটা কোনও সাধারণ সাংস্কৃতিক পাঠাগার ছিল না।

এখানে শিশুদের নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

কিন্তু কেন?

আর তার বাবা কীভাবে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হলেন?

সে কম্পিউটারের পরের নথিটি খুলল।

নথির শিরোনাম—

অংশগ্রহণকারী নম্বর ৪: ঋদ্ধিমান দত্ত।

তার নীচে লেখা ছিল—

‘বিষয়টির বয়স দশ বছর। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতি সে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। শিশুটি মনে করে, অয়ন মুখোপাধ্যায় একটি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কিন্তু সংরক্ষিত সাক্ষ্যে দেখা যায়, শিশুটি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল।’

ঋদ্ধিমান পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে উপস্থিত ছিল?

অয়নের মৃত্যুর সময়?

কিন্তু সে তো কিছুই দেখেনি বলে মনে করত।

নথির শেষে একটি মন্তব্য।

‘স্মৃতি সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়নি। বিষয়টি নিজের মনে একটি বিকল্প ঘটনা নির্মাণ করেছে। প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে সত্যিকারের স্মৃতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।’

ঋদ্ধিমান আর পড়তে পারল না।

তার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের এত বছরের স্মৃতি যেন অন্য কেউ লিখে দিয়েছে। যে ঘটনাকে সে সত্য বলে মেনে নিয়েছে, সেটিই হয়তো তার মনের তৈরি একটি গল্প।

ঠিক তখনই ঘরের কোণে রাখা একটি পুরোনো ফোন বেজে উঠল।

ঋদ্ধিমান ফোনটি তুলল।

ওপাশ থেকে অদিতির কণ্ঠস্বর।

“ঋদ্ধিমান, তুমি কোথায়?”

সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

“আমি বাড়ির ভিতরে আছি। একটা গোপন ঘরে। তুমি কোথায়?”

“আমি বাইরে। বাড়ির পিছনের উঠোনে। তুমি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলে। আমি প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে তোমাকে খুঁজছি।”

ঋদ্ধিমান ঘড়ির দিকে তাকাল।

তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের মধ্যে কয়েক মিনিট কেটেছে। কিন্তু ঘড়ি বলছে, আধ ঘণ্টা।

“আমি বেরিয়ে আসছি,” সে বলল।

অদিতি তাড়াতাড়ি বলল, “শোনো, নীল দরজার কাছে যেও না। আমি বাইরে থেকে দরজাটা খুলতে পেরেছি। ভিতরে একটা সিঁড়ি আছে। আর সেই সিঁড়ির নীচে এমন একটি ঘর পেয়েছি, যেখানে তোমার বাবার নাম লেখা।”

“তুমি কি তাঁকে দেখেছ?”

“না। কিন্তু একটা ভিডিও পেয়েছি। সেটা তোমাকে দেখাতেই হবে।”

ফোন কেটে গেল।

ঋদ্ধিমান কম্পিউটারের নথিগুলি একটি বহনযোগ্য ড্রাইভে সংরক্ষণ করল। তারপর ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।

কিন্তু বাড়ির প্রধান দরজায় পৌঁছনোর আগেই সে বুঝতে পারল, এই বাড়িতে তার প্রবেশের উদ্দেশ্য আর শুধু নীল দরজার রহস্য জানা নয়।

তাকে জানতে হবে, তার শৈশবের স্মৃতিতে কী ঘটেছিল।

আর অয়নের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য কী।

২. অদিতির আবিষ্কার

বাড়ির পিছনের উঠোনে অদিতি দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটি ছোট ক্যামেরা এবং কয়েকটি কাগজ।

ঋদ্ধিমানকে দেখেই সে বলল, “তুমি ঠিক আছ তো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু এখানে যা দেখলাম, সেটা কোনও সাধারণ বাড়ির রহস্য নয়। এই বাড়িতে শিশুদের নিয়ে পরীক্ষা চালানো হত।”

অদিতি বলল, “আমি সেই প্রমাণ পেয়েছি।”

সে ক্যামেরাটি চালু করল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বাড়ির পিছনের ঘরে একটি ছোট টেবিল। তার উপর পুরোনো কাগজপত্র। দেওয়ালে একটি সাদা বোর্ড, যেখানে কয়েকটি নাম এবং তীরচিহ্ন আঁকা।

বোর্ডের মাঝখানে লেখা—

স্মৃতি সব সময় সত্যের সমান নয়।

তার নীচে একটি বাক্য—

মানুষ যা মনে রাখে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সে কী ভুলে যায়।

অদিতি ভিডিও থামিয়ে বলল, “এই কথাগুলো দেখে আমার মনে হচ্ছে, প্রকল্পটি স্মৃতির চিকিৎসা বা পুনর্বাসন নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে তার উদ্দেশ্য বদলে গিয়েছিল।”

“কীভাবে?”

“এখানে কিছু নথি পেয়েছি। কয়েকজন শিশুর পরিবার মানসিক আঘাতের কারণে তাদের স্মৃতির সমস্যা নিয়ে সাহায্য চেয়েছিল। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকরা দাবি করেছিলেন, নির্দিষ্ট পরিবেশে পুরোনো স্মৃতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু পরে দেখা যায়, শিশুদের কিছু ঘটনা মনে করানোর বদলে তাদের অন্য ঘটনা বিশ্বাস করতে শেখানো হচ্ছিল।”

ঋদ্ধিমান বলল, “অর্থাৎ মিথ্যা স্মৃতি তৈরি করা হচ্ছিল?”

“সম্ভাবনা আছে। তবে শুধু নথি দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। আর একটা বিষয়—এই প্রকল্পের অনুমোদনপত্রে তোমার বাবার স্বাক্ষর আছে।”

ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল।

“আমি কম্পিউটারে তাঁর নাম দেখেছি। কিন্তু আমি জানি না, তিনি কী ভূমিকা পালন করেছিলেন।”

অদিতি একটি ফাইল এগিয়ে দিল।

ফাইলের ভিতরে ছয়টি শিশুর ছবি। প্রতিটি ছবির নীচে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

অয়ন মুখোপাধ্যায়—বয়স দশ।

সৌম্যজিৎ পাল—বয়স এগারো।

মধুরিমা দে—বয়স নয়।

ঋদ্ধিমান দত্ত—বয়স দশ।

শর্মিষ্ঠা পাল—বয়স দশ।

ষষ্ঠ ছবির নীচে লেখা—‘পরিচয় গোপন।’

অদিতি বলল, “ছয়জন শিশুর মধ্যে পাঁচজনের নাম আমরা জানি। কিন্তু ষষ্ঠ শিশুর নাম নেই। আরও অদ্ভুত বিষয়, ওই শিশুর ছবি অন্যদের মতো নয়। মুখটি ক্যামেরার দিকে নয়, পাশের দিকে ঘোরানো।”

ঋদ্ধিমান ছবিটি হাতে নিল।

শিশুটির মুখ স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার ডান হাতটি দেখা যাচ্ছে।

একটি আঙুল নেই।

ঋদ্ধিমান থমকে গেল।

সে আগের রাতে ভিডিওতে এমনই একটি হাত দেখেছিল।

“এই শিশুটি কে?” সে জিজ্ঞাসা করল।

অদিতি বলল, “আমি জানি না। তবে ছবির পিছনে একটি নম্বর আছে—০৬।”

“ঘর ছয়।”

“হতে পারে।”

ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “অয়নের মৃত্যুর সময় আমি সেখানে ছিলাম—এমন কথা নথিতে লেখা। কিন্তু আমার মনে পড়ে না।”

অদিতি তার দিকে তাকাল।

“তোমার বাবা কি কখনও বলেছিলেন, অয়নের মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে নেই?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“তিনি বলতেন, ঘটনাটি নিয়ে বেশি ভাবলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ব।”

অদিতি বলল, “তোমার বাবার উদ্দেশ্য তোমাকে রক্ষা করা হতে পারে। আবার তিনি কোনও সত্য গোপনও করে থাকতে পারেন। আমাদের প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।”

ঋদ্ধিমান বলল, “আমার মনে হচ্ছে, অয়নের মৃত্যু আর এই প্রকল্পের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে।”

“আমারও তাই মনে হচ্ছে।”

অদিতি ব্যাগ থেকে আরেকটি কাগজ বের করল।

এটি ছিল একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।

শিরোনাম—

বেলঘরিয়ায় কিশোরের মৃত্যু, পুকুর থেকে দেহ উদ্ধার।

প্রকাশের তারিখ আঠারো বছর আগের।

সংবাদে বলা হয়েছে, দশ বছরের অয়ন মুখোপাধ্যায় একটি পুকুরে পড়ে মারা যায়। ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।

কিন্তু প্রতিবেদনের শেষ অংশে একটি অদ্ভুত তথ্য ছিল।

‘স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার আগের কয়েক মাসে মৃত কিশোরকে একটি ব্যক্তিগত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যেতে দেখা যেত। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বন্ধ।’

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে কাগজটি নামিয়ে রাখল।

“ওই প্রতিষ্ঠানটাই নীলপ্রহর।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আর এখন আমাদের জানতে হবে, অয়ন কী জানত, যা তাকে বিপদের মধ্যে ফেলেছিল।”

৩. শর্মিষ্ঠার ফিরে আসা

বিকেল চারটের কিছু পরে বাড়ির সামনের গেটে একটি গাড়ি এসে থামল।

গাড়ি থেকে একজন মহিলা নামলেন। বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। পরনে সাধারণ শাড়ি, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। মুখে উদ্বেগের ছাপ।

তিনি বাড়ির দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “আপনারা কি ঋদ্ধিমান দত্ত?”

ঋদ্ধিমান এগিয়ে গেল।

“হ্যাঁ। আপনি?”

“আমার নাম শর্মিষ্ঠা পাল।”

ঋদ্ধিমান বুঝল, রাতের ফোনে কথা বলা সেই মহিলা।

শর্মিষ্ঠা বাড়ির নীল দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনারা কি দরজাটা খুলেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“ভিতরে কী দেখেছেন?”

ঋদ্ধিমান উত্তর দেওয়ার আগে অদিতি বলল, “আপনি আগে বলুন, আপনি কী জানেন।”

শর্মিষ্ঠা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“আমি যখন দশ বছরের ছিলাম, তখন এই বাড়িতে আসতাম। আমার বাবা-মা ভেবেছিলেন, এখানে ছবি আঁকা ও পড়াশোনার ভালো ব্যবস্থা আছে। প্রথম দিকে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। আমরা আঁকতাম, গান শিখতাম, গল্প শুনতাম। কিন্তু কয়েক মাস পরে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে।”

“কী ধরনের ঘটনা?” ঋদ্ধিমান জিজ্ঞাসা করল।

“আমাদের আলাদা ঘরে নিয়ে যাওয়া হত। সেখানে আলো নিভিয়ে বিভিন্ন শব্দ শোনানো হত। কখনও আমাদের এমন ছবি দেখানো হত, যা আমরা আগে দেখেছি বলে মনে করতাম। কখনও এমন ঘটনার কথা জিজ্ঞাসা করা হত, যা আমাদের জীবনে ঘটেইনি।”

অদিতি বলল, “আপনাদের কি বলা হত, এগুলো চিকিৎসার অংশ?”

“হ্যাঁ। বলা হত, আমাদের স্মৃতি আরও পরিষ্কার করার জন্য পরীক্ষা চলছে। কিন্তু একদিন অয়ন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, তাকে এমন একটি ঘটনা স্বীকার করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সে করেনি।”

ঋদ্ধিমান দ্রুত জিজ্ঞাসা করল, “কী ঘটনা?”

শর্মিষ্ঠা মাথা নাড়লেন।

“সেটা আমি জানি না। অয়ন কাউকে বলতে চাইত না। শুধু বলত, সে এমন কিছু দেখেছে, যা তার দেখা উচিত ছিল না।”

“তারপর?”

“একদিন অয়ন আর বাড়িতে এল না। আমাদের বলা হল, সে অসুস্থ। কয়েক দিন পরে খবর এল, সে মারা গেছে।”

ঋদ্ধিমান বলল, “তুমি কি তার মৃতদেহ দেখেছিলে?”

“না। আমাদের কাউকে তার বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি।”

“তাহলে তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে, সে মারা গেছে?”

শর্মিষ্ঠা এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।

“আমি কখনও নিশ্চিত হইনি।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

শর্মিষ্ঠা ব্যাগ থেকে একটি ছোট খাতা বের করলেন। খাতার পাতা হলুদ হয়ে গেছে। মলাটে কোনও নাম নেই।

“এটা অয়নের খাতা। তার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে সে আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, আমি যেন এটা কাউকে না দেখাই। কিন্তু যদি কোনও দিন ঋদ্ধিমান দত্ত ফিরে আসে, তাহলে খাতাটি তাকে দিতে।”

ঋদ্ধিমান খাতাটি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেল।

“আমার নাম সে জানত?”

“হ্যাঁ। অয়ন বলেছিল, তোমাকে সে অনেক দিন ধরে চেনে। কিন্তু তুমি নাকি তাকে চিনতে পারবে না।”

“কেন?”

শর্মিষ্ঠা বললেন, “সেই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না।”

ঋদ্ধিমান খাতাটি খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতা শিশুদের আঁকায় ভরা। বাড়ি, গাছ, পুকুর, জানালা, দরজা। একটি পাতায় ছয়টি শিশু হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ষষ্ঠ শিশুটির মুখ কালো করে দেওয়া।

পরের পাতায় একটি বাক্য।

‘আমাদের মধ্যে একজন আসলে আমাদের কেউ নয়।’

তার নীচে লেখা—

‘সে আমাদের মতো দেখতে। আমাদের মতো কথা বলে। কিন্তু সে আমাদের কোনও স্মৃতি ভাগ করে না।’

ঋদ্ধিমান পাতাটি উল্টাল।

আরেকটি বাক্য।

‘যে ছেলেটি নিজের নাম জানে না, সে-ই আমাদের সবাইকে বাঁচাতে পারবে।’

শর্মিষ্ঠা বললেন, “এই কথাগুলোর অর্থ আমি কোনও দিন বুঝতে পারিনি।”

ঋদ্ধিমান খাতার শেষ পাতায় পৌঁছল।

সেখানে একটি তারিখ এবং একটি সময় লেখা।

১৯ নভেম্বর, রাত ২টা ১৭ মিনিট।

তার নীচে অয়নের হাতের লেখা—

ঋদ্ধিমানকে নীল দরজার সামনে আসতে দিও না। সে যদি নিজের নাম বলে, তাহলে দরজাটি খুলে যাবে।

ঋদ্ধিমান খাতাটি বন্ধ করে ফেলল।

“এটা অসম্ভব,” সে বলল।

শর্মিষ্ঠা শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, “অসম্ভব বলেই তো এত বছর কেউ এই বাড়ির কাছে আসেনি।”

“আপনি এত রাতে আমাকে ফোন করেছিলেন কেন?”

শর্মিষ্ঠা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ গতকাল রাত দুটো সতেরো মিনিটে আমি আবার অয়নের কণ্ঠস্বর শুনেছি।”

“কী বলেছিল?”

শর্মিষ্ঠার চোখ ভিজে উঠল।

“সে বলেছিল, ‘শর্মিষ্ঠা, এবার ওকে সত্যিটা জানাও। আমি আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না।’”

৪. ষষ্ঠ শিশুর পরিচয়

সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।

তিনজন বাড়ির দোতলার ঘরে বসে অয়নের খাতা পরীক্ষা করছিলেন। অদিতি প্রতিটি পাতার ছবি তুলে রাখছিল। শর্মিষ্ঠা মাঝেমধ্যে কোনও কোনও আঁকার অর্থ ব্যাখ্যা করছিলেন।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বড় ঘরের মাঝখানে একটি আয়না। আয়নার সামনে পাঁচটি শিশু দাঁড়িয়ে। কিন্তু আয়নায় দেখা যাচ্ছে ছয়টি শিশু।

অদিতি ছবিটি হাতে নিয়ে বলল, “এটা হয়তো ষষ্ঠ শিশুর প্রতীক।”

শর্মিষ্ঠা বললেন, “অয়ন প্রায়ই বলত, আয়নার ভিতরে একজন অতিরিক্ত মানুষ আছে। আমরা ভেবেছিলাম, সে কল্পনা করছে।”

ঋদ্ধিমান বলল, “যদি ষষ্ঠ শিশুটি সত্যিই থাকে, তাহলে তার পরিচয় লুকোনোর কারণ কী?”

“হয়তো তার পরিচয় গোপন রাখার জন্যই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছিল,” অদিতি বলল। “কিন্তু তার প্রমাণ আমাদের নেই।”

ঋদ্ধিমান নিজের ফাইল থেকে বহনযোগ্য ড্রাইভটি বের করল। সেখানে সংরক্ষিত নথির একটি অংশ খুলে দেখাল।

“এখানে লেখা আছে, ষষ্ঠ অংশগ্রহণকারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু তার পর্যবেক্ষণকারী হিসেবে অনির্বাণ দত্তের নাম আছে।”

শর্মিষ্ঠা নামটি শুনে চমকে উঠলেন।

“অনির্বাণ দত্ত?”

“আপনি তাঁকে চিনতেন?”

“আমি তাঁকে কখনও ওই নামে চিনিনি। তিনি আমাদের কাছে অরিন্দম স্যার নামে পরিচিত ছিলেন।”

ঋদ্ধিমান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

“কী বললেন?”

শর্মিষ্ঠা পুনরায় বললেন, “যিনি আমাদের ছবি আঁকা শেখাতেন, গল্প বলতেন, আমাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন—তাঁকেই আমরা অরিন্দম স্যার বলে ডাকতাম।”

“আমার বাবা?”

“আমি জানতাম না, তিনি আপনার বাবা। তখন তাঁর বয়স কম ছিল। কিন্তু মুখের মিল রয়েছে।”

ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল।

“আমার বাবা কখনও এই বাড়ির কথা বলেননি।”

শর্মিষ্ঠা বললেন, “তিনি একদিন আমাদের বলেছিলেন, এই বাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে কেউ যেন এখানে ফিরে না আসে। তিনি বলেছিলেন, কিছু স্মৃতি মানুষকে রক্ষা করে, আবার কিছু স্মৃতি মানুষকে ধ্বংসও করতে পারে।”

ঋদ্ধিমান বুঝতে পারছিল, তার বাবার জীবনের একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় তার অজানা ছিল।

কিন্তু আরও একটি প্রশ্ন তার মনে ঘুরছিল।

“ষষ্ঠ শিশুটিকে কি আপনি দেখেছিলেন?”

শর্মিষ্ঠা মাথা নাড়লেন।

“একবার। শুধু একবার। সে আমাদের সঙ্গে একই ঘরে বসত। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলার অনুমতি ছিল না। তার মুখ সব সময় অন্যদিকে ঘোরানো থাকত। একদিন সে আমার কাছে এসে একটি কাগজ দিয়েছিল।”

“কী লেখা ছিল?”

“আমি কাগজটি এত বছর ধরে রেখেছি।”

শর্মিষ্ঠা ব্যাগ থেকে একটি ছোট ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন।

কাগজটি খুলতেই দেখা গেল, শিশুর হাতের লেখায় একটি নাম লেখা—

অয়ন মুখোপাধ্যায়।

তার নীচে আরও একটি নাম।

ঋদ্ধিমান দত্ত।

আর শেষে একটি বাক্য—

আমাদের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে।

অদিতি বলল, “কী বেছে নিতে হবে?”

শর্মিষ্ঠা উত্তর দিলেন, “সেটা আমি জানি না।”

ঋদ্ধিমান কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের কোনও এক পর্যায়ে তাকে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়েছিল, যার ফল সে এখনও বহন করছে।

কিন্তু সে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

কাকে বেছে নিয়েছিল?

অয়নকে, নাকি নিজেকে?

হঠাৎ বাড়ির নীচের তলা থেকে একটি ঘণ্টার শব্দ ভেসে এল।

টিং।

টিং।

টিং।

তিনজনেই থমকে গেলেন।

শর্মিষ্ঠার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“এই ঘণ্টাটা,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে বাজানো হত।”

অদিতি দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

“কেউ বাড়িতে ঢুকেছে?”

ঋদ্ধিমান সিঁড়ির দিকে তাকাল।

নীল দরজার নীচ দিয়ে নীল আলো বেরিয়ে আসছে।

তারপর দরজার ওপার থেকে একটি কণ্ঠস্বর।

“ঋদ্ধিমান, তুমি কি এখনও নিজের নাম মনে রেখেছ?”

ঋদ্ধিমান উত্তর দিল না।

কণ্ঠস্বরটি আবার বলল, “যদি মনে থাকে, তাহলে বলো—অয়ন কে?”

ঋদ্ধিমান চোখ বন্ধ করল।

তার মনে পড়তে লাগল ছোটবেলার কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য।

একটি ঘর।

একটি আয়না।

একটি শিশু কাঁদছে।

কেউ বলছে, “একজনকে বাইরে যেতে হবে।”

আরেকজন বলছে, “না, দুজনেই থাকবে।”

তারপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

ঋদ্ধিমান হঠাৎ চোখ খুলে বলল, “অয়ন আমার বন্ধু ছিল।”

নীল দরজার ওপার থেকে উত্তর এল—

“এটাই কি পুরো সত্য?”

ঋদ্ধিমান চুপ করে গেল।

কণ্ঠস্বরটি এবার আরও কাছে এল।

“তুমি কি মনে করতে পারো, অয়ন তোমার নাম ধরে শেষবার কী বলেছিল?”

ঋদ্ধিমান মাথা চেপে ধরল।

তারপর স্মৃতির গভীর থেকে একটি বাক্য ভেসে উঠল।

‘ঋদ্ধিমান, যদি আমি বেরোতে না পারি, তাহলে আমার জায়গায় তুই বাইরে যাবি।’

সে কেঁপে উঠল।

শর্মিষ্ঠা তার হাত ধরলেন।

“আপনি কী মনে করলেন?”

ঋদ্ধিমান উত্তর দিল না।

কারণ তার মনে হচ্ছিল, সে শুধু অয়নের শেষ কথা মনে করেনি। সে এমন একটি সত্যের সামনে দাঁড়িয়েছে, যা এত বছর ধরে নিজের মন থেকেই লুকিয়ে রেখেছিল।

নীল দরজাটি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।

কিন্তু দরজার ওপারে কোনও ঘর দেখা গেল না।

দেখা গেল একটি আয়না।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন শিশু।

একজন ঋদ্ধিমান।

অন্যজন অয়ন।

দুজনের মুখ এক।

দুজনের চোখ এক।

শুধু একজনের ডান হাতে একটি আঙুল নেই।

আর আয়নার নীচে লেখা—

পরীক্ষা নম্বর ৪ সম্পূর্ণ।

পরীক্ষা নম্বর ৬ শুরু।

৫. যে স্মৃতি ফিরে এল

ঋদ্ধিমান নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

আয়নার ভিতরের দুটি শিশুর মুখ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তার নিজের শৈশবের মুখটি সে চিনতে পারছে। অন্য শিশুটির মুখও অচেনা নয়।

কিন্তু সে অয়ন নয়।

অয়নের ডান হাতে পাঁচটি আঙুল ছিল।

আয়নার ভিতরের শিশুটির ডান হাতে চারটি।

ঋদ্ধিমান হঠাৎ বুঝতে পারল, সে আগের রাতে যে ছবিটি দেখেছিল, সেটি শুধু ষষ্ঠ শিশুর ছবি ছিল না। ছবির ছেলেটির হাতের চিহ্নই তার পরিচয়ের একমাত্র সূত্র।

শর্মিষ্ঠা পিছন থেকে বললেন, “দরজার ভিতরে যাবেন না!”

অদিতি যোগ করল, “আমাদের আগে বুঝতে হবে, ওটা আসলে কী।”

কিন্তু ঋদ্ধিমান আর কোনও কথা শুনতে পাচ্ছিল না।

তার চোখ আয়নার উপর স্থির।

শৈশবের একটি দৃশ্য ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।

সেদিন বাড়ির ভিতরে ছয়টি শিশু ছিল। একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক তাকে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাকি শিশুদের বলা হয়েছিল, তারা যেন কাউকে কিছু না বলে।

ঋদ্ধিমান প্রতিবাদ করেছিল।

অয়ন তাকে বলেছিল, “চুপ কর। ওরা আমাদের কাউকে বিশ্বাস করবে না।”

তারপর একটি দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ঘরের ভিতরে আটকে পড়েছিল একটি শিশু।

আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য শিশুটি চিৎকার করেছিল, “আমাকে ওর জায়গায় যেতে দাও!”

ঋদ্ধিমান হঠাৎ পিছিয়ে এল।

সে বুঝতে পারছিল, এই স্মৃতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা সে এত বছর ভুলে ছিল।

কিন্তু স্মৃতিটি সম্পূর্ণ নয়।

আয়নার ভিতরের শিশুটি ঠোঁট নাড়ল।

ঋদ্ধিমান শব্দ শুনতে পেল না।

তবু ঠোঁটের ভাষা পড়তে পারল।

‘আমি অয়ন নই।’

তারপর আলো নিভে গেল।

নীল দরজা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল।

বাড়ির ভিতরে আবার নিস্তব্ধতা।

অদিতি দ্রুত ঋদ্ধিমানের কাছে এগিয়ে এল।

“তুমি ঠিক আছ?”

ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল।

“আমাকে এখান থেকে বেরোতে হবে।”

শর্মিষ্ঠা বললেন, “আপনি কি কিছু মনে করতে পেরেছেন?”

ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু আমি এখনও জানি না, সেই স্মৃতি সত্যি কি না।”

সে অয়নের খাতাটি ব্যাগে রাখল। তারপর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

রাত নেমে এসেছে।

গলির মাথায় পৌঁছে অদিতি বলল, “আমাদের এখন পুলিশে জানানো উচিত।”

ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল।

“আমাদের কাছে এখনও কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই। পুলিশকে বললে বাড়িটি সিল করে দেওয়া হতে পারে। তখন ভিতরের নথি উদ্ধার করা কঠিন হবে।”

“তাহলে তুমি কী করবে?”

ঋদ্ধিমান উত্তর দিল, “প্রথমে আমার বাবাকে খুঁজব। তারপর ষষ্ঠ শিশুটির পরিচয় জানব।”

শর্মিষ্ঠা বললেন, “আমি আপনাদের সাহায্য করব। এত বছর ধরে আমি এই বাড়ির স্মৃতি থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছি। এবার আর পালাতে চাই না।”

তিনজন গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

ঠিক তখনই ঋদ্ধিমানের ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।

প্রেরকের নাম—অরিন্দম দত্ত।

বার্তাটি মাত্র দুটি বাক্যের।

তুমি দরজা খুলেছ। এবার ওরা তোমাকে খুঁজবে।

অয়নকে খুঁজো না। সে কখনও তোমার বন্ধু ছিল না।

ঋদ্ধিমান বার্তাটি পড়ে স্থির হয়ে গেল।

তার বাবা কি সত্যিই জীবিত?

যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে তিনি কোথা থেকে এই বার্তা পাঠালেন?

আর অয়ন যদি তার বন্ধু না হয়ে থাকে, তাহলে শৈশবের সেই সমস্ত স্মৃতি কার?

সে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল।

তারপর আরও একটি বার্তা এল।

আগামীকাল সকাল দশটায় পুরোনো শিশু-চিকিৎসা কেন্দ্রে এসো। সেখানে তুমি জানতে পারবে, তোমার জন্মের আগে তোমার নাম কী ছিল।

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে ফোনটি নামিয়ে রাখল।

তার নিজের নাম।

তার জন্ম।

তার শৈশব।

সবকিছু যেন প্রশ্নের মুখে।

আর এখন প্রশ্ন উঠছে—তার জন্মের আগে তার নাম কী ছিল?

গাড়ির জানালা দিয়ে সে শেষবারের মতো বাড়িটির দিকে তাকাল।

দোতলার একটি জানালায় নীল আলো জ্বলছে।

সেই আলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি শিশু।

শিশুটি হাত তুলল।

তার ডান হাতে চারটি আঙুল।

তারপর জানালার পর্দা বন্ধ হয়ে গেল।

ঋদ্ধিমান বুঝতে পারল, পরের দিন সে যে সত্যের মুখোমুখি হবে, তা শুধু অয়নের পরিচয় বদলে দেবে না।

সম্ভবত বদলে দেবে তার নিজের পরিচয়ও।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

নীল দরজার ওপারে (প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে কেউ থাকে না)।

১. মধ্যরাতের ফোন

রাত তখন দুটো সতেরো মিনিট।

শহরের অধিকাংশ বাড়ির জানালায় আলো নিভে গিয়েছে। দূরের রেললাইনে মাঝেমধ্যে মালগাড়ির শব্দ ভেসে আসছে। শীতের হালকা কুয়াশা ধীরে ধীরে ঢেকে দিচ্ছে কলকাতার উত্তর প্রান্তের পুরোনো পাড়াগুলোকে।

ঋদ্ধিমান দত্ত তখনও জেগে।

পেশায় সে একজন স্থপতি। পুরোনো বাড়ির নকশা পুনরুদ্ধার করা, ভেঙে পড়তে থাকা জমিদারবাড়ি কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপত্যের গঠন পরীক্ষা করাই তার কাজ। পেশাগত কারণে বহু পরিত্যক্ত বাড়িতে রাত কাটিয়েছে সে। কোথাও ইঁদুরের শব্দ, কোথাও ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে দরজা নড়েছে, কোথাও কাঠের মেঝে পায়ের চাপে কেঁপে উঠেছে।

তাই ভূতের গল্পে তার কোনও আগ্রহ ছিল না।

কিন্তু সেই রাতে ফোনের ওপাশ থেকে যে কথাটি শুনেছিল, সেটি তার সমস্ত যুক্তিবোধকে এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল।

“আপনি কি ঋদ্ধিমান দত্ত বলছেন?”

“হ্যাঁ। কে বলছেন?”

“আমি শর্মিষ্ঠা পাল। একটা বাড়ির ব্যাপারে আপনার সাহায্য দরকার।”

ঋদ্ধিমান ঘড়ির দিকে তাকাল।

“এত রাতে?”

“দুঃখিত। সকালে যোগাযোগ করার উপায় থাকবে না।”

“কী ধরনের বাড়ি?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মহিলা বললেন, “একটি বাড়ি আছে, যেখানে গত পঁচিশ বছর ধরে কেউ থাকে না। অথচ প্রতি রাত ঠিক দুটো সতেরো মিনিটে বাড়িটির নীল দরজার ভিতর থেকে আলো জ্বলে ওঠে।”

ঋদ্ধিমান হালকা হেসে বলল, “কোনও টাইমার লাগানো থাকতে পারে।”

“আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ পঁচিশ বছর আগে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।”

“তাহলে আলো দেখছেন কীভাবে?”

“বাইরের আলো নয়। দরজার নীচ দিয়ে আলো বেরিয়ে আসে।”

“ভিতরে কেউ আছে কি না, দেখেছেন?”

“দেখেছি।”

“কীভাবে?”

মহিলার কণ্ঠস্বর এবার নিচু হয়ে গেল।

“কারণ গতকাল রাতে আমি দরজার ভিতর থেকে নিজের কণ্ঠস্বর শুনেছি।”

ঋদ্ধিমান চুপ করে গেল।

“আপনি কী বললেন?”

“আমি যে কথাগুলো বহু বছর আগে বলেছিলাম, ঠিক সেই কথাগুলো। অথচ সেগুলো বলার সময় আমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর।”

ঋদ্ধিমান এবার আর হাসল না।

“আপনি কোথায় থাকেন?”

“বেলঘরিয়ায়। বাড়িটির ঠিকানা আমি আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি কি কাল সকালে আসতে পারবেন?”

“পারব। তবে একটা কথা—বাড়ির মালিক কে?”

“সেটা জানি না।”

“তাহলে বাড়িটি পরীক্ষা করার অনুমতি পাব কীভাবে?”

মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “বাড়িটির মালিক আপনি।”

ঋদ্ধিমান ফোনটি কানের কাছ থেকে সরিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

“আপনি কী বলছেন?”

“আজ বিকেলে আপনার নামে একটি রেজিস্ট্রি চিঠি এসেছে। তাতে বাড়িটির দলিল রয়েছে। পঁচিশ বছর আগে যিনি বাড়িটি কিনেছিলেন, তিনি আপনার বাবা।”

ঋদ্ধিমানের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

তার বাবা অরিন্দম দত্ত মারা গিয়েছেন আঠারো বছর আগে।

মৃত্যুর আগে তিনি কখনও বেলঘরিয়ার কোনও বাড়ির কথা বলেননি।

“আপনি আমার বাবার নাম জানলেন কীভাবে?” ঋদ্ধিমান জিজ্ঞাসা করল।

“দলিলে নাম লেখা আছে।”

“আর আমার ফোন নম্বর?”

“চিঠির ভিতরে আপনার নম্বরও লেখা ছিল। সঙ্গে একটি নির্দেশ।”

“কী নির্দেশ?”

মহিলার গলা প্রায় ফিসফিসে।

“বাড়ির নীল দরজাটি যেন রাত দুটো সতেরোর আগে খোলা না হয়।”

ফোন কেটে গেল।

ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

তারপর উঠে পড়ল।

টেবিলের উপর রাখা বাবার পুরোনো ছবিটি হাতে নিল সে। ছবিতে অরিন্দম দত্তের মুখে পরিচিত শান্ত হাসি। মৃত্যুর আগে তিনি একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থা চালাতেন। সাহিত্য, ইতিহাস এবং পুরোনো কলকাতার স্থাপত্য নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

কিন্তু তিনি কি সত্যিই কোনও বাড়ির মালিক ছিলেন, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর পরিবার কিছুই জানত না?

ঋদ্ধিমান জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে তখনও রাত।

দূরের কোনও বাড়ির ছাদে একটি আলো জ্বলছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোনে একটি ছবি এল।

একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি।

সামনের দেওয়ালে শ্যাওলা। লোহার গেট মরচে ধরা। বারান্দার রেলিং ভাঙা। আর বাড়ির মাঝখানে একটি নীল রঙের দরজা।

ছবির নীচে লেখা—

বাড়ি নম্বর ১৭/বি, শ্যামাপদ লেন, বেলঘরিয়া।

তার নীচে আরও একটি বাক্য।

দরজাটি খুললে প্রথমে নিজের নাম শুনবেন না।

ঋদ্ধিমান বুঝতে পারল না, এই সতর্কবার্তার অর্থ কী।

কিন্তু সে জানত, পরদিন সকালে তাকে ওই বাড়িতে যেতেই হবে।

২. দলিলের ভিতরে লুকিয়ে থাকা নাম

পরদিন সকাল সাড়ে আটটা।

ঋদ্ধিমান তার অফিসে বসে রেজিস্ট্রি চিঠির খামটি পরীক্ষা করছিল। চিঠিটি সত্যিই তার নামে পাঠানো হয়েছে। প্রেরকের ঠিকানা নেই। ডাকঘরের সিল থেকে বোঝা যায়, চিঠিটি কলকাতারই কোনও ডাকঘর থেকে পাঠানো।

খামের ভিতরে তিনটি কাগজ।

প্রথমটি বাড়িটির দলিল।

দ্বিতীয়টি একটি পুরোনো নকশা।

তৃতীয়টি হাতে লেখা একটি চিঠি।

চিঠিতে লেখা—

‘ঋদ্ধিমান,

তুমি যখন এই চিঠি পাবে, তখন হয়তো আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় থাকব না। তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ—শ্যামাপদ লেনের বাড়িটি বিক্রি করবে না, ভাঙবে না এবং তার নীল দরজাটি কোনও অবস্থাতেই রাত দুটো সতেরোর আগে খুলবে না।

বাড়িটি তোমার কাছে অচেনা মনে হবে। কিন্তু বাড়ির প্রতিটি ঘর তোমাকে চিনবে।

মনে রেখো, বাড়ির ভিতরে যা দেখবে, তার সবটাই সত্যি নয়। আবার যা দেখতে পাবে না, তার সবটাই মিথ্যাও নয়।

— বাবা।’

চিঠির নীচে তারিখ লেখা ছিল পঁচিশ বছর আগের।

ঋদ্ধিমান চিঠিটি আবার পড়ল।

তার বাবা তখন জীবিত। ঋদ্ধিমানের বয়স মাত্র দশ বছর। অথচ এই চিঠি তাকে দেওয়া হয়নি। কেন?

দলিল অনুযায়ী, বাড়িটি কেনা হয়েছিল একটি ব্যক্তিগত ট্রাস্টের মাধ্যমে। ট্রাস্টের নাম—‘নীলপ্রহর সাংস্কৃতিক সংস্থা’।

ঋদ্ধিমান আগে কখনও এই নাম শোনেনি।

সে কম্পিউটারে সংস্থাটির নাম খুঁজল। কোনও সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া গেল না। পুরোনো একটি সংবাদপত্রের ডিজিটাল আর্কাইভে একটি ছোট খবর দেখা গেল।

পঁচিশ বছর আগে উত্তর কলকাতার একটি বাড়িতে শিশুদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক পাঠাগার চালু হয়েছিল। সেখানে ছবি আঁকা, গান, আবৃত্তি এবং নাটকের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অরিন্দম দত্ত।

খবরটির পরের অংশে লেখা ছিল, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল—‘প্রশাসনিক জটিলতা’।

কিন্তু সংবাদটির শেষ বাক্যটি অদ্ভুত।

‘সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।’

কয়েকজন শিশু।

কতজন?

তাদের কী হয়েছিল?

ঋদ্ধিমান পুরোনো নকশাটি খুলল।

বাড়িটির সামনের অংশে একটি বড় ঘর, দুটি শোবার ঘর, রান্নাঘর এবং সিঁড়ি দেখানো হয়েছে। কিন্তু নকশার পিছনের দিকে একটি সরু করিডর আছে, যার কোনও প্রবেশপথ চিহ্নিত করা হয়নি।

আর বাড়ির মাঝখানে নীল দরজাটি।

নকশায় দরজাটির পাশে ছোট অক্ষরে লেখা—

ঘর ৬।

ঋদ্ধিমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

সামনের অংশে মোট পাঁচটি ঘর। তা হলে ষষ্ঠ ঘর কোথায়?

সে নকশাটি আলোয় ধরে দেখল। পিছনের অংশে পেন্সিলের হালকা দাগ। মনে হচ্ছে, সেখানে আগে আরও একটি ঘর আঁকা ছিল। পরে মুছে ফেলা হয়েছে।

ঋদ্ধিমান নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারল, এটি সাধারণ বাড়ির নকশা নয়। কোনও অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ঠিক তখনই তার অফিসের দরজায় টোকা পড়ল।

ভিতরে এল তার সহকর্মী এবং বন্ধু, অদিতি সেন।

অদিতি একজন স্থাপত্য-ইতিহাস গবেষক। পুরোনো বাড়ির কাঠামো, নির্মাণকাল এবং ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণে তার বিশেষ দক্ষতা।

ঋদ্ধিমান তাকে সব কথা বলল।

অদিতি দলিল, চিঠি এবং নকশা মন দিয়ে পরীক্ষা করল।

তারপর বলল, “একটা বিষয় খেয়াল করেছ?”

“কী?”

“দলিলের তারিখ আর সংস্থার প্রতিষ্ঠার তারিখের মধ্যে মাত্র এগারো দিনের ব্যবধান। অথচ বাড়িটির নকশা তারও ছয় মাস আগে তৈরি।”

“তার মানে?”

“বাড়িটি কেনার আগেই এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সম্ভবত বাড়িটির ভিতরে এমন কিছু তৈরি করা হয়েছিল, যা সাধারণ আবাসিক নকশার অংশ নয়।”

ঋদ্ধিমান বলল, “ষষ্ঠ ঘর?”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“আরও একটা বিষয় আছে। এই নকশায় ব্যবহৃত মাপের পদ্ধতি পঁচিশ বছর আগের হলেও, দেয়ালের পুরুত্বের হিসাব অস্বাভাবিক। এখানে একটি দেওয়াল বাইরে থেকে যতটা মোটা দেখানো হয়েছে, ভিতরে তার চেয়ে কম জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে।”

“মানে দেওয়ালের মধ্যে ফাঁকা অংশ আছে?”

“সম্ভবত। সেখানে সরু পথ বা লুকানো ঘর থাকতে পারে।”

ঋদ্ধিমান চিঠিটি অদিতির হাতে দিল।

চিঠি পড়ে অদিতি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তোমার বাবার সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্ক শুধু সম্পত্তির ছিল না। তিনি জানতেন, সেখানে কী আছে। আর তিনি চাননি, তুমি খুব তাড়াতাড়ি সেটা আবিষ্কার করো।”

“কিন্তু এত বছর পরে আমাকে কেন বাড়িটির মালিক করা হল?”

অদিতি উত্তর দিল না।

বরং সে পুরোনো নকশার কোণে আঙুল রাখল।

সেখানে একটি ক্ষুদ্র প্রতীক আঁকা—একটি বৃত্তের মধ্যে ছয়টি বিন্দু।

প্রতীকটির পাশে লেখা—

‘যে ছয়জন একসঙ্গে এসেছিল, তাদের মধ্যে একজন কখনও বেরোয়নি।’

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“এটার অর্থ কী?”

অদিতি বলল, “এখনই বলা যাবে না। কিন্তু আমাদের আজই বাড়িটা দেখতে যেতে হবে।”

৩. শ্যামাপদ লেনের বাড়ি

সকাল দশটা চল্লিশ মিনিটে তারা বেলঘরিয়ায় পৌঁছল।

শ্যামাপদ লেনের প্রবেশপথটি প্রধান রাস্তা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু ভিতরে ঢুকতেই শহরের পরিচিত ব্যস্ততা যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। পুরোনো বাড়ি, সরু গলি, মাথার উপর জড়িয়ে থাকা বৈদ্যুতিক তার এবং জানালার পাশে শুকোতে দেওয়া কাপড়—সব মিলিয়ে এলাকাটির মধ্যে এক ধরনের স্থিরতা।

বাড়ি নম্বর ১৭/বি গলির শেষ প্রান্তে।

লোহার গেটের উপর কোনও নামফলক নেই। গেটের একপাশে ভাঙা ঘণ্টা। দেওয়ালের উপর বুনো লতা উঠে গেছে। সামনের উঠোনে শুকনো পাতা জমে আছে।

অদিতি গেট ঠেলে খুলতেই কড়কড় শব্দ হল।

বাড়িটির প্রধান দরজা কাঠের। তার মাঝখানে নীল রঙের একটি সরু দরজা, যা সাধারণ দরজার তুলনায় কিছুটা নিচু। যেন বাড়ির মূল দরজার ভিতরেই আরেকটি দরজা বসানো হয়েছে।

ঋদ্ধিমান হাত বাড়িয়ে নীল দরজাটি ছুঁয়ে দেখল।

রং পুরোনো। কিন্তু কাঠে কোনও পচন নেই।

দরজার হাতলের কাছে ছোট একটি ধাতব ফলক।

তাতে খোদাই করা—

৬

অদিতি বলল, “এই দরজাটাই নকশায় দেখানো হয়েছে।”

ঋদ্ধিমান প্রধান দরজা খুলল।

ভিতরে প্রবেশ করতেই ধুলোর গন্ধ নাকে এল। বসার ঘরে একটি ভাঙা সোফা, দেওয়ালে কয়েকটি পেরেক এবং কোণে উল্টে পড়ে থাকা কাঠের আলমারি। ছাদের পাখাটি বহু বছর ধরে বন্ধ।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঘরের মেঝেতে ধুলো জমলেও নীল দরজার সামনে মেঝে তুলনামূলক পরিষ্কার।

যেন কেউ নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করে।

ঋদ্ধিমান নিচু হয়ে মেঝে পরীক্ষা করল।

“এখানে জুতোর দাগ আছে।”

অদিতি বলল, “কত দিনের?”

“নিশ্চিত বলা যাবে না। কিন্তু এগুলো খুব পুরোনো নয়।”

দুজনেই বাড়ির বাকি ঘরগুলি পরীক্ষা করল। কোথাও কেউ নেই। রান্নাঘরের কল শুকনো। বাথরুমে জল নেই। জানালাগুলির অধিকাংশ বাইরে থেকে বন্ধ।

তবু বাড়িটির ভিতরে এমন একটা অনুভূতি ছিল, যেন কেউ তাদের আসার খবর জানে।

দোতলায় উঠে তারা একটি ছোট ঘর পেল। ঘরের দেওয়ালে শিশুদের আঁকা কয়েকটি ছবি। রং ফিকে হয়ে গেছে। কোথাও বাড়ি, কোথাও গাছ, কোথাও নদী। একটি ছবিতে ছয়টি শিশু হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবিটির নীচে লেখা—

‘আমরা ছয়জন।’

অদিতি ছবিটি নামিয়ে আলোয় ধরল।

“এই ছবিটা দেখো।”

ছবির ছয়টি শিশুর মুখের মধ্যে পাঁচটি স্পষ্ট। কিন্তু ষষ্ঠ শিশুটির মুখের উপর কালো রং দিয়ে মোটা দাগ টানা।

ঋদ্ধিমান বলল, “কেউ ইচ্ছা করে মুখটা মুছে দিয়েছে।”

অদিতি ছবির পিছনে তাকাল।

সেখানে পেন্সিলে লেখা একটি তারিখ।

ঋদ্ধিমান তারিখটি পড়ে থমকে গেল।

সেটি ছিল তার নিজের জন্মদিন।

“এটা কাকতালীয় হতে পারে,” অদিতি বলল।

কিন্তু তার গলায় আত্মবিশ্বাস ছিল না।

ঋদ্ধিমান ছবিটি আবার দেওয়ালে রেখে দিল।

তারপর পাশের ঘরে ঢুকল।

ঘরটি খালি। মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল। টেবিলের উপর একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার। পাশে কয়েকটি ক্যাসেট। আশ্চর্যের বিষয়, অন্য সব জিনিসে ধুলো জমলেও টেপ রেকর্ডারটির উপর ধুলোর স্তর খুব পাতলা।

ঋদ্ধিমান একটি ক্যাসেট হাতে নিল।

লেবেলে লেখা—‘প্রথম দিন’।

অদিতি বলল, “এটা চালানো যাবে?”

“বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তবে ব্যাটারি থাকলে চেষ্টা করা যেতে পারে।”

টেপ রেকর্ডারের পিছনের ঢাকনা খুলতেই দেখা গেল, ভিতরে ব্যাটারি নেই। কিন্তু একটি ছোট ব্যাটারি সংযোগের তার রাখা আছে।

অদিতি নিজের ব্যাগ থেকে একটি বহনযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের যন্ত্র বের করল। তারা সংযোগ পরীক্ষা করে যন্ত্রটি চালু করল।

প্রথমে ঘড়ঘড় শব্দ।

তারপর একটি শিশুর কণ্ঠস্বর।

“আজ আমাদের প্রথম দিন। বাবা বলেছেন, এখানে আমরা যা শিখব, তা অন্য কাউকে বলতে নেই।”

আরেকটি কণ্ঠস্বর বলল, “কেন?”

প্রথম শিশুটি উত্তর দিল, “কারণ আমরা এখানে শুধু ছবি আঁকতে আসিনি।”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর তৃতীয় একটি কণ্ঠস্বর।

“আমাদের মধ্যে একজনকে বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হবে না।”

টেপে হঠাৎ বিকট শব্দ হল।

তারপর সম্পূর্ণ নীরবতা।

ঋদ্ধিমান টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দিল।

অদিতি তার দিকে তাকাল।

“তোমার কি মনে হয়, এটা কোনও নাটকের রেকর্ডিং?”

ঋদ্ধিমান বলল, “হতে পারে। কিন্তু ছয়জন শিশুর কথা, ষষ্ঠ ঘর এবং বাড়ির মালিকানা—সবকিছু একসঙ্গে মিলে যাচ্ছে।”

“তাহলে পরের ক্যাসেটগুলো শুনতে হবে।”

ঋদ্ধিমান ক্যাসেটের বাক্স খুলল।

প্রথম পাঁচটি ক্যাসেটের লেবেলে লেখা—‘প্রথম দিন’, ‘দ্বিতীয় দিন’, ‘তৃতীয় দিন’, ‘চতুর্থ দিন’ এবং ‘পঞ্চম দিন’।

ষষ্ঠ ক্যাসেটটি সম্পূর্ণ সাদা।

কোনও নাম নেই।

ঋদ্ধিমান ক্যাসেটটি হাতে নিতেই পিছনের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।

দুজনেই ঘুরে তাকাল।

ঘরের দরজা বন্ধ।

অথচ কয়েক মুহূর্ত আগেও সেটি খোলা ছিল।

অদিতি দরজার হাতল ঘোরাল।

দরজা খুলল না।

“এটা আটকে গেছে,” সে বলল।

ঋদ্ধিমান এগিয়ে গিয়ে হাতল পরীক্ষা করল। ভিতর থেকে তালা লাগানো নেই। তবু দরজা নড়ছে না।

ঠিক তখনই নীচের তলা থেকে একটি শব্দ ভেসে এল।

টক।

টক।

টক।

কেউ যেন নীল দরজায় ধীরে ধীরে আঘাত করছে।

তারপর একটি শিশুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

“ঋদ্ধিমান, তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ?”

অদিতি তার হাত চেপে ধরল।

“তুমি কি এই কণ্ঠস্বর চেনো?”

ঋদ্ধিমান উত্তর দিতে পারল না।

কারণ কণ্ঠস্বরটি তার কাছে অপরিচিত নয়।

সে ছোটবেলায় যে ছেলেটির সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন খেলত, সেই ছেলেটির কণ্ঠস্বরের সঙ্গে এর অদ্ভুত মিল।

কিন্তু সেই ছেলেটি আঠারো বছর আগে মারা গিয়েছিল।

তার নাম ছিল অয়ন।

আর মৃত্যুর আগে সে ঋদ্ধিমানকে একটি কথা বলেছিল—

‘তুই যদি কখনও নীল দরজার সামনে আসিস, আমাকে ডাকিস না।’

নীচের তলা থেকে আবার ডাক এল।

“ঋদ্ধিমান, দরজাটা খোল। আমি এখনও ভিতরে আছি।”

৪. অয়নের মৃত্যু

ঋদ্ধিমান কোনও উত্তর দিল না।

অদিতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কে ওখানে?”

কোনও উত্তর নেই।

তারপর আবার সেই কণ্ঠস্বর।

“আমাকে বেরোতে দাও।”

ঋদ্ধিমান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“অয়ন?”

শব্দটি মুখ থেকে বেরিয়ে যেতেই বাড়ির ভিতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।

তারপর নীচের তলা থেকে হাসির শব্দ।

একটি শিশুর হাসি।

ধীরে ধীরে সেই হাসি বদলে গেল কান্নায়।

ঋদ্ধিমান দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। অদিতি তাকে থামানোর চেষ্টা করল।

“তুমি নিজেকে সামলাও। এটা কোনও রেকর্ডিংও হতে পারে।”

“রেকর্ডিং হলে আমাদের নাম ধরে ডাকছে কীভাবে?”

“তোমার নাম বাড়ির ভিতরে কোথাও লেখা থাকতে পারে।”

“অয়নের কণ্ঠস্বর?”

অদিতি উত্তর দিতে পারল না।

হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা আলমারির পিছন থেকে একটি ক্লিক শব্দ হল।

তারপর দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।

ঋদ্ধিমান আর অপেক্ষা করল না। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল। কিন্তু বসার ঘরে কেউ নেই।

নীল দরজাটি বন্ধ।

সে দরজার কাছে গিয়ে হাতল ধরল।

দরজাটি ঠান্ডা।

অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

সে কানে কান লাগিয়ে শুনল।

ভিতরে যেন কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

“অয়ন?”

কোনও উত্তর নেই।

অদিতি নীচে নেমে এসে বলল, “এখন আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনো উচিত।”

ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল না।

“আমি জানতে চাই, অয়নের সঙ্গে এখানে কী ঘটেছিল।”

অদিতি বলল, “তুমি তো বলেছিলে, অয়ন দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল।”

“হ্যাঁ। অন্তত আমাকে সেটাই বলা হয়েছিল।”

“তুমি নিজে কী দেখেছিলে?”

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে বলল, “সেদিন আমরা দুজন একটি পুরোনো পুকুরের ধারে খেলছিলাম। অয়ন বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে পিছন ফিরে আমাকে বলেছিল, যদি কোনও দিন তাকে খুঁজতে আসি, তাহলে যেন নীল দরজার সামনে না দাঁড়াই।”

“তারপর?”

“পরদিন সকালে শুনলাম, অয়ন পুকুরে পড়ে মারা গেছে। আমি তার মৃতদেহ দেখিনি। তার পরিবারের লোকেরা আমাদের পাড়া ছেড়ে চলে যায়। বাবা আমাকে বলেছিলেন, এই ঘটনা নিয়ে আর কোনও কথা বলতে নেই।”

“অয়ন কি এই বাড়িতে আসত?”

ঋদ্ধিমান চোখ বন্ধ করল।

একটি অস্পষ্ট স্মৃতি মনে পড়ল।

ছোটবেলায় সে একবার বাবার সঙ্গে বেলঘরিয়ার এই পাড়ায় এসেছিল। একটি বাড়ির উঠোনে কয়েকজন শিশু বসে ছবি আঁকছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল অয়ন।

কিন্তু তার বাবা তাকে সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।

তখন সে ভেবেছিল, বাবা হয়তো কোনও কাজে এসেছিলেন।

আজ বুঝতে পারছে, সেই বাড়িটিই ছিল শ্যামাপদ লেনের ১৭/বি।

আর অয়ন সেই ছয় শিশুর একজন।

“আমাদের আরও কিছু খুঁজতে হবে,” ঋদ্ধিমান বলল।

অদিতি বলল, “কিন্তু আমরা কী খুঁজছি?”

ঋদ্ধিমান নীল দরজার ধাতব ফলকের দিকে তাকাল।

“ঘর ছয়।”

৫. দেওয়ালের ভিতরে

দুপুর গড়িয়ে বিকেল।

ঋদ্ধিমান বাড়িটির নকশা আবার পরীক্ষা করল। দোতলার ঘরগুলির মাপ বাইরে থেকে দেওয়ালের মাপের সঙ্গে মিলছে না। বাড়ির উত্তর দিকের দেওয়ালটি প্রায় দেড় ফুট বেশি মোটা।

অদিতি দেওয়ালের উপর আলতো করে টোকা দিল।

এক জায়গায় শব্দ ফাঁপা।

“এখানে ফাঁকা জায়গা আছে,” সে বলল।

দুজনেই দেওয়ালের গায়ে জমে থাকা পুরোনো রং সরাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর কাঠের একটি সরু ফ্রেম দেখা গেল। ফ্রেমের পাশে ছোট লোহার চাবির ছিদ্র।

ঋদ্ধিমান নিজের চাবির গোছা থেকে কয়েকটি পুরোনো চাবি বের করল। তার বাবার জিনিসপত্রের মধ্যে এই চাবিগুলো পাওয়া গিয়েছিল। এত দিন সে জানত না, কোনটি কীসের।

তৃতীয় চাবিটি তালায় ঢুকে গেল।

একটি ক্ষীণ শব্দ।

দেওয়ালের অংশটি সামান্য সরে গেল।

তার পিছনে সরু একটি পথ।

অদিতি মোবাইলের আলো জ্বালল।

পথের শেষে একটি ছোট ঘর।

ঘরটির মেঝে পরিষ্কার। দেওয়ালে কোনও জানালা নেই। মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ার। চেয়ারের সামনে একটি টেবিল। টেবিলের উপর ছয়টি ফাইল।

প্রতিটি ফাইলের মলাটে একটি করে নাম।

ঋদ্ধিমান প্রথম ফাইলটি খুলল।

অয়ন মুখোপাধ্যায়।

দ্বিতীয়টি—সৌম্যজিৎ পাল।

তৃতীয়টি—মধুরিমা দে।

চতুর্থটি—ঋদ্ধিমান দত্ত।

পঞ্চমটি—শর্মিষ্ঠা পাল।

ষষ্ঠটি—ফাইলের মলাটে কোনও নাম নেই।

ঋদ্ধিমান নিজের ফাইল খুলল।

ভিতরে তার শৈশবের কয়েকটি ছবি, স্কুলের নথির অনুলিপি এবং একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজ। কাগজের শিরোনাম—

স্মৃতি-প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ।

তার নীচে লেখা, ‘পরীক্ষার বিষয়: ঋদ্ধিমান দত্ত। বয়স: ১০ বছর। পর্যবেক্ষণ: নির্দিষ্ট শব্দ, দরজা এবং ব্যক্তির নামের সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ভীতি।’

ঋদ্ধিমান কাগজটি পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমার শৈশবের চিকিৎসা-পরীক্ষা কে করেছিল?”

অদিতি ফাইলের অন্য কাগজগুলি দেখতে লাগল।

“এখানে তোমার বাবার স্বাক্ষর আছে।”

ঋদ্ধিমান কাগজটি কেড়ে নিয়ে দেখল।

সত্যিই তার বাবার স্বাক্ষর।

কিন্তু কাগজের নীচে আরও একটি নাম।

ডক্টর অনির্বাণ দত্ত।

ঋদ্ধিমান বলল, “আমার বাবার নাম অরিন্দম দত্ত। অনির্বাণ দত্ত কে?”

অদিতি উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের পিছনের দেওয়ালে একটি ছোট লাল আলো জ্বলে উঠল।

তারপর স্পিকারের মতো কোথাও থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“পরীক্ষা নম্বর চার সম্পূর্ণ হয়েছে।”

ঋদ্ধিমান চারদিকে তাকাল।

“কে বলছেন?”

কণ্ঠস্বরটি বলল, “দরজার সামনে দাঁড়ান।”

অদিতি ফিসফিস করে বলল, “কোনওভাবেই দাঁড়াবে না।”

কিন্তু ঋদ্ধিমান ইতিমধ্যে দেওয়ালের অন্য প্রান্তে একটি ছোট দরজা দেখতে পেয়েছে।

দরজার উপর কোনও হাতল নেই।

শুধু একটি কাচের ছোট জানালা।

সে জানালার কাছে এগিয়ে গেল।

কাচের ওপারে অন্ধকার।

তারপর ধীরে ধীরে একটি মুখ দেখা গেল।

একজন বৃদ্ধ।

চুল সাদা। মুখে গভীর বলিরেখা।

কিন্তু চোখ দুটি চিনতে ভুল হল না।

সেই চোখ তার বাবার।

অরিন্দম দত্ত।

ঋদ্ধিমান পিছিয়ে গেল।

“বাবা?”

বৃদ্ধ কাচের ওপার থেকে হাত তুললেন।

তারপর ঠোঁট নাড়লেন।

শব্দ শোনা গেল না।

কিন্তু ঋদ্ধিমান তাঁর ঠোঁটের ভাষা পড়তে পারল।

‘আমাকে বিশ্বাস করিস না।’

পরের মুহূর্তে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

তারপর একটি অচেনা কণ্ঠস্বর বলল—

“প্রথম পর্ব শেষ। এবার আসল পরীক্ষার সময়।”

ঋদ্ধিমান অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল, এই বাড়ির রহস্য কোনও পরিত্যক্ত ঘর বা অদ্ভুত দরজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এখানে বহু বছর ধরে কিছু মানুষকে নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

তাদের স্মৃতি, তাদের ভয়, তাদের পরিচয়—সবকিছু নথিভুক্ত করা হয়েছে।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, সেই পরীক্ষার বিষয়গুলির একজন সে নিজেই।

কিন্তু তার বাবা কি সত্যিই ঘরের ওপারে বন্দি?

নাকি সে যা দেখেছে, তা তার নিজের স্মৃতিরই কোনও বিকৃত প্রতিচ্ছবি?

অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ একটি শিশুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“ঋদ্ধিমান, এবার আমাকে মনে পড়ছে?”

সে চোখ বন্ধ করল।

অয়নের মুখ ভেসে উঠল।

পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটি।

তার কণ্ঠস্বর।

তার শেষ সতর্কবার্তা।

আর সেই নীল দরজা।

ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

অন্ধকারের মধ্যে কোথাও একটি নীল আলো জ্বলছে।

আলোর নীচে লেখা—

ঘর ৬: প্রবেশ নিষিদ্ধ।

তার নীচে আরও একটি বাক্য।

যে ভিতরে প্রবেশ করবে, তাকে নিজের অতীতের সাক্ষ্য দিতে হবে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত মানুষের সাক্ষ্য (তৃতীয় পর্ব: শেষ সাক্ষীর পরিচয়)।

১. যে মানুষটি মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়েছিল

রাত দশটা।

পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণাগারের দরজা খুলে যেতেই অনিরুদ্ধ সেনের মনে হল, সে যেন কোনও পরিত্যক্ত আদালতের ভিতরে প্রবেশ করছে। লম্বা করিডর, দেওয়ালে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে দাগ, ছাদের কোণে মাকড়সার জাল আর দূরে কোথাও একটানা টুপটাপ জলের শব্দ।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ প্রথমে অন্ধকারে ঢাকা ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি এগিয়ে এলেন। করিডরের হলুদ আলো তাঁর মুখে পড়তেই অনিরুদ্ধের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

সেই মুখ সে দেখেছে।

তিন বছর আগে হাসপাতালের মর্গে, কাচের ঘেরা শীতল কক্ষে, সাদা চাদরে ঢাকা একটি মৃতদেহের মুখ হিসেবে।

সেই মুখের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল।

বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।

“আপনি!” অনিরুদ্ধের গলা শুকিয়ে গেল।

বিচারপতি কোনও উত্তর দিলেন না। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখের নীচে গভীর কালি। তিনি যেন বহু রাত ঘুমোননি।

মৈত্রী বসু পিছন থেকে বললেন, “আপনি এত দিন কোথায় ছিলেন?”

অরুণাভ তাঁদের দুজনকে ভিতরে আসতে ইঙ্গিত করলেন।

“এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় নেই। যে খবর তোমাদের কাছে পৌঁছেছে, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। আজ রাতেই একটি নতুন মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার আগেই আমাদের আসল নথিটি উদ্ধার করতে হবে।”

অনিরুদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়েই বলল, “আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। তিন বছর আগে আপনার মৃতদেহ দেখেছিলাম আমি। তাহলে সেটি কার ছিল?”

বিচারপতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“একজন মানুষের।”

“নাম?”

“এই মুহূর্তে নাম বললে তোমার সামনে থাকা রহস্যের অর্ধেকও বুঝতে পারবে না।”

“আপনি আমাকে তিন বছর ধরে খুনের অভিযুক্ত হতে দিয়েছেন। আমার পেশা, সম্মান, জীবন—সবকিছু তছনছ হয়ে গিয়েছে। আর এখন আপনি বলছেন, নাম বলার সময় হয়নি?”

অরুণাভ মজুমদার মাথা নিচু করলেন।

“তোমার প্রতি যা হয়েছে, তার জন্য আমি দায় এড়াতে পারি না।”

“তাহলে সত্যি বলুন।”

বিচারপতি ধীরে ধীরে বললেন, “যে মৃতদেহটিকে আমার বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি এমন একজনের, যিনি নিজের পরিচয় হারিয়েছিলেন। তাঁর মুখের গঠন আমার সঙ্গে কিছুটা মিলত। দাঁতের চিকিৎসার পুরোনো নথিও বদলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শরীরে এমন একটি চিহ্ন ছিল, যা আমার শরীরে কখনও ছিল না।”

“তাহলে পোস্টমর্টেমে সেটা ধরা পড়েনি কেন?”

“ধরা পড়েছিল। রিপোর্টে লেখা হয়েছিল। পরে সেই অংশ পরিবর্তন করা হয়।”

মৈত্রী বললেন, “আপনি কি জানতেন, অনিরুদ্ধকে ওই মামলায় ফাঁসানো হবে?”

“আমি জানতাম, তাকে সন্দেহভাজন করা হতে পারে। কিন্তু তদন্ত কোন দিকে যাবে, সেটা পুরোপুরি আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না।”

অনিরুদ্ধ তিক্ত স্বরে বলল, “আপনি বিচারপতি ছিলেন। আদালতের মানুষ। তবু আমাকে রক্ষা করতে পারলেন না?”

“আমি তখন আর প্রকাশ্যে বিচারপতি হিসেবে কাজ করছিলাম না।”

“কেন?”

অরুণাভ একটি পুরোনো কাঠের টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“কারণ ২০০৯ সালের মামলায় আমি এমন কিছু নথি দেখেছিলাম, যেগুলোর অস্তিত্ব সরকারি রেকর্ড থেকে মুছে ফেলা হচ্ছিল। সেই মামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় বদলানো হচ্ছিল। কিছু মানুষকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা ব্যবস্থা পরে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে অপরাধের সাক্ষীকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায়। আমি বিষয়টি আদালতে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই আমার নিজের পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়।”

“আপনার পরিচয়?”

“একটি সরকারি নথিতে লেখা হয়েছিল, আমি বহু বছর আগেই মারা গিয়েছি। অন্য একটি নথিতে আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন নামে শনাক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম, এগুলো নিছক প্রশাসনিক ভুল। পরে বুঝলাম, ভুল নয়—পরিকল্পিত ব্যবস্থা।”

অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, বাবার পরিচয়পত্র, অনির্বাণ দত্তের নাম এবং তার নিজের স্বাক্ষরযুক্ত সেই অদ্ভুত কাগজ।

“আপনি কি আমার বাবাকে এই ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন?”

বিচারপতি সরাসরি উত্তর দিলেন, “তোমার বাবা নিজেই তদন্ত শুরু করেছিলেন। আমি তাঁকে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু তাঁকে যে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলাম, তার দায় আমারও।”

“তাহলে তিনি কেন নিজের ছেলের কাছ থেকে পালিয়ে থাকলেন?”

“কারণ তোমাকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।”

“কারা আমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল?”

বিচারপতি টেবিলের নীচের ড্রয়ার খুলে একটি পাতলা ফাইল বের করলেন।

“এই প্রশ্নের উত্তর এই ফাইলে আছে। তবে ফাইলটি পড়ার আগে তোমাকে একটা বিষয় বুঝতে হবে। তোমার বাবার পরিচয় নিয়ে যে নথি তৈরি হয়েছিল, সেটি শুধু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত নয়। সেটি তোমার নিজের পরিচয় সম্পর্কেও একটি মিথ্যা তৈরি করেছিল।”

অনিরুদ্ধ ফাইলটির দিকে হাত বাড়াল।

ঠিক সেই সময় ভবনের পিছনের দিক থেকে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হল।

মৈত্রী দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেন।

অরুণাভ ফাইলটি বন্ধ করে বললেন, “ওরা এসে গেছে।”

“কারা?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল।

“যারা চায়, এই নথি আর কখনও আদালতে না পৌঁছয়।”

২. ফাইল নম্বর ৪৭/২০০৯

তিনজন দ্রুত করিডরের শেষ প্রান্তে এগিয়ে গেলেন। সেখানে একটি ছোট ঘর। দেওয়ালজুড়ে লোহার আলমারি, পুরোনো নথির বাক্স এবং ধুলো জমে থাকা রেজিস্টার।

অরুণাভ দরজা বন্ধ করে চাবি ঘুরিয়ে দিলেন।

“এই ঘরটি সরকারি নকশায় নেই,” তিনি বললেন। “বহু বছর আগে রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। পরে মূল সংরক্ষণাগারের সম্প্রসারণের সময় ঘরটিকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু নথি এখানে রেখে দেওয়া হয়েছিল।”

অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, “আপনি জানতেন ফাইলটি এখানে আছে?”

“আমি জানতাম, ২০০৯ সালে মামলার একটি মূল কপি এখানে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেটি এখনও আছে কি না, তা জানতাম না।”

মৈত্রী আলমারির গায়ে লাগানো নম্বরগুলি পরীক্ষা করতে লাগলেন।

একটি আলমারিতে লেখা—‘বিশেষ আদালত: ২০০৮–২০১০’।

তার নীচে কয়েকটি বাক্স।

অনিরুদ্ধ একটি বাক্স টেনে বের করল। ভিতরে ফাইলের স্তূপ। বেশিরভাগ ফাইলের মলাটে তারিখ ও মামলা নম্বর লেখা। সে দ্রুত খুঁজতে লাগল।

হঠাৎ একটি কালো মলাটের ফাইল চোখে পড়ল।

মামলা নম্বর ৪৭/২০০৯।

ফাইলের নীচে লাল কালিতে লেখা—‘সীমিত প্রবেশাধিকার’।

অরুণাভ ফাইলটি হাতে নিয়ে বললেন, “এটাই।”

কিন্তু ফাইল খুলতেই দেখা গেল, অধিকাংশ পাতা ফাঁকা। কিছু পাতার কোণা ছেঁড়া। সাক্ষীদের তালিকার জায়গায় শুধু একটি সিল—‘পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ’।

মৈত্রী বললেন, “এখানে তো কিছুই নেই!”

অরুণাভ পাতা উল্টে যেতে যেতে থামলেন।

শেষের দিকে একটি ভাঁজ করা কাগজ।

তিনি সেটি সাবধানে খুললেন।

কাগজে তিনটি কলাম।

প্রথম কলামে নাম, দ্বিতীয় কলামে পুরোনো পরিচয়, তৃতীয় কলামে নতুন পরিচয়।

প্রথম নাম—অমিতাভ সেন।

দ্বিতীয় নাম—অনির্বাণ দত্ত।

তৃতীয় নামের জায়গাটি ফাঁকা।

কিন্তু পাশে লেখা ছিল একটি সংখ্যা—০৩।

অনিরুদ্ধ বলল, “তৃতীয় ব্যক্তির নাম নেই কেন?”

অরুণাভ উত্তর দিলেন, “কারণ এই নথি তৈরি হওয়ার সময় তৃতীয় ব্যক্তি নিজের পরিচয় জানাতে অস্বীকার করেছিলেন।”

“কে ছিলেন তিনি?”

“এখনও জানি না।”

অনিরুদ্ধ অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“আপনি এই মামলার বিচারপতি ছিলেন। আর আপনি জানেন না, আপনার সামনে থাকা তৃতীয় ব্যক্তি কে?”

“আমি বিচারপতি হিসেবে এই মামলার সব শুনানি পরিচালনা করিনি। এক পর্যায়ে আমাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে যে নথিগুলো আমার হাতে আসে, সেগুলো অসম্পূর্ণ ছিল।”

“কেন আপনাকে সরানো হয়েছিল?”

“কারণ আমি এমন একটি নির্দেশে সই করতে অস্বীকার করেছিলাম, যার মাধ্যমে একজন জীবিত মানুষকে আইনিভাবে মৃত বলে ঘোষণা করা সম্ভব হত।”

মৈত্রী কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন, “তাহলে আপনার মৃত্যুর নথি কি সেই একই পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছিল?”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“আমার মৃত্যুর নথি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগে আমাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল, যেখানে প্রকাশ্যে বেঁচে থাকার অর্থ ছিল অন্যদের বিপদে ফেলে দেওয়া।”

অনিরুদ্ধ বলল, “আপনি নিজেই নিজের মৃত্যু মেনে নিয়েছিলেন?”

“আমি প্রকাশ্যে মৃত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার হয়ে যে দেহটি শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি আমার ছিল না। সেই ব্যবস্থা কীভাবে সম্পন্ন হল, তা নিয়ে আমারও প্রশ্ন আছে।”

“তাহলে আপনি জানতেন না, আপনার নামে অন্য একজনের দেহ দেখানো হবে?”

“আমি জানতাম, আমার পরিচয় গোপন করা হবে। কিন্তু দেহ শনাক্তকরণের ঘটনাটি আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না।”

অনিরুদ্ধের সন্দেহ আরও বাড়ল।

“আপনি কি নিশ্চিত, আপনি পুরো সত্য বলছেন?”

বিচারপতি কোনও উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন বলল, “ঘরটা দেখো। ফাইল এখানে থাকার কথা।”

আরেকজন বলল, “কেউ বেরোতে পারবে না।”

মৈত্রী অনিরুদ্ধের দিকে তাকালেন।

অরুণাভ দ্রুত ফাইলের ভিতর থেকে কাগজটি বের করে তাঁর হাতে দিলেন।

“এটা লুকিয়ে রাখো।”

“আর আপনি?”

“আমি ওদের আটকানোর চেষ্টা করব।”

অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল।

“না। এবার আর কাউকে একা রেখে যাব না।”

অরুণাভ তার দিকে তাকালেন। তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন, “তোমার বাবা ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন। আর সেই কারণেই তিনি আজও বিপদে।”

৩. পরিচয় বদলের কারিগর

দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

“দরজা খুলুন!”

অরুণাভ টেবিলের পাশের দেওয়ালে হাত রাখলেন। একটি সরু কাঠের প্যানেল সামান্য সরে গেল। তার পিছনে অন্ধকার পথ।

“এই পথটি পুরোনো নথি পরিবহণের জন্য তৈরি হয়েছিল,” তিনি বললেন। “মৈত্রী, তুমি অনিরুদ্ধকে নিয়ে বেরিয়ে যাও।”

মৈত্রী প্রতিবাদ করলেন, “আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন।”

“আমি অন্য পথে যাব। যদি আমরা তিনজন একসঙ্গে ধরা পড়ি, তাহলে কাগজটি আর বাইরে যাবে না।”

অনিরুদ্ধ বলল, “আপনি আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলে থাকলে?”

অরুণাভ স্থির চোখে তার দিকে তাকালেন।

“তাহলে এই মুহূর্তে তোমাকে পালানোর পথ দেখাতাম না।”

দরজায় আবার আঘাত পড়ল। কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ।

অনিরুদ্ধ ও মৈত্রী সরু পথ দিয়ে এগিয়ে গেলেন। পথটি নিচের দিকে নেমেছে। কিছু দূর গিয়ে একটি লোহার সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে তাঁরা ভবনের পিছনের একটি পরিত্যক্ত ঘরে পৌঁছলেন।

মৈত্রী দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিলেন।

চারপাশে কেউ নেই।

দুজনেই দ্রুত গাড়ির দিকে এগোলেন।

গাড়িতে বসেই অনিরুদ্ধ কাগজটি বের করল। তার চোখ বারবার তৃতীয় নামের ফাঁকা জায়গায় চলে যাচ্ছিল।

“আমাদের অনির্বাণ দত্তকে খুঁজতে হবে,” সে বলল।

মৈত্রী মাথা নাড়লেন।

“গবেষণাগারের নথি অনুযায়ী, তিনি ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।”

“তারপর?”

“তাঁর নামে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।”

অনিরুদ্ধ বলল, “কিন্তু আমার বাবার পরিচয়পত্রে তাঁর কর্মী নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। তার মানে তাঁদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক ছিল।”

মৈত্রী ফোন বের করে পুরোনো নথিতে থাকা নম্বরগুলি মিলিয়ে দেখতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, “একটা তথ্য পেয়েছি। ২০০৯ সালের শেষ দিকে অনির্বাণ দত্তের নামে একটি গবেষণাপত্র জমা পড়েছিল। বিষয় ছিল—মৃতদেহ শনাক্তকরণে পরিচয়গত অসংগতি।”

“কোথায় জমা পড়েছিল?”

“একটি চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু গবেষণাপত্রটি পরে প্রত্যাহার করা হয়।”

“কেন?”

“প্রকাশিত রেকর্ডে বলা হয়েছে, তথ্য যাচাই করা যায়নি।”

অনিরুদ্ধ বলল, “সেটি সত্যি নয়। কেউ গবেষণাটি চাপা দিয়েছে।”

মৈত্রী বললেন, “সম্ভব। কিন্তু এখন আমাদের কাছে প্রমাণ নেই।”

অনিরুদ্ধ ফোনের দিকে তাকাল। অচেনা নম্বর থেকে আরেকটি বার্তা এসেছে।

আপনি ভুল মানুষকে খুঁজছেন। অনির্বাণ দত্ত কখনও আপনার বাবার পরিচয় নেননি। আপনার বাবা তাঁর পরিচয় নিয়েছিলেন।

অনিরুদ্ধ বার্তাটি মৈত্রীকে দেখাল।

“এর মানে কী?”

মৈত্রী বললেন, “যদি বার্তাটি সত্যি হয়, তাহলে আপনার বাবা কোনও সময়ে অনির্বাণ দত্তের পরিচয়ে ছিলেন।”

“কিন্তু কেন?”

“সম্ভবত নিজের পরিচয় আড়াল করার জন্য। অথবা অন্য কাউকে রক্ষা করার জন্য।”

অনিরুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “আমার বাবার পরিচয়পত্র, বিচারপতির মৃত্যু এবং তৃতীয় সাক্ষী—সবকিছুর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু আমরা এখনও সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে পৌঁছতে পারিনি।”

মৈত্রী বললেন, “আমাদের এমন কাউকে খুঁজতে হবে, যিনি অনির্বাণ দত্তকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।”

অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, তার বাবা হাসপাতালে শুয়ে বলেছিলেন—সেই লোকটি পরে সরকারি নথিতে মৃত বলে চিহ্নিত হয়েছিল।

হয়তো সেই লোকটি অনির্বাণ দত্ত।

হয়তো নয়।

কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার: ২০০৯ সালের নভেম্বরে এমন কিছু ঘটেছিল, যার পর তিনজন মানুষের পরিচয় আর আগের মতো থাকেনি।

আর সেই ঘটনার সঙ্গে তার নিজের নাম জড়িয়ে গিয়েছিল, যখন সে ছিল মাত্র সাত বছরের শিশু।

৪. দ্বিতীয় মৃত্যুসংবাদ

রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।

অনিরুদ্ধ ও মৈত্রী একটি নিরাপদ বাড়িতে পৌঁছলেন। বাড়িটি মৈত্রীর এক পরিচিত চিকিৎসকের। সেখানে ফোনের সংযোগ বন্ধ রেখে তাঁরা কাগজপত্র পরীক্ষা করতে লাগলেন।

হঠাৎ মৈত্রীর ফোনে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এল।

তিনি পড়ে স্থির হয়ে গেলেন।

“অনিরুদ্ধ, এটা দেখুন।”

বিজ্ঞপ্তিটি একটি সংবাদ সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। শিরোনাম—

তিন বছর আগে মৃত ঘোষিত বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমিতাভ সেনের মৃত্যু।

বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি অমিতাভ সেন রাত এগারোটা দশ মিনিটে মারা গিয়েছেন। তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে পুরোনো সরকারি নথির ভিত্তিতে।

অনিরুদ্ধ চিৎকার করে উঠল, “এটা মিথ্যা! আমি কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি!”

মৈত্রী বললেন, “আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে।”

“না। আগে খবরটা যাচাই করতে হবে।”

অনিরুদ্ধ হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে ফোন করল। বহুবার চেষ্টা করার পর যোগাযোগ হল।

চিকিৎসক বললেন, “রোগী এখনও জীবিত। তবে তাঁকে অন্য একটি কক্ষে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিছু লোক নিজেদের সরকারি তদন্তকারী বলে পরিচয় দিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমরা বাধা দিয়েছি।”

“তাঁর নিরাপত্তা আছে?”

“এই মুহূর্তে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন। কিন্তু আপনাকে একটা কথা বলি—যে পরিচয়পত্র দিয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল, সেটি যাচাই করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, ওই নম্বরের কোনও বৈধ রেকর্ড নেই।”

অনিরুদ্ধ ফোন নামিয়ে রাখল।

মৈত্রী বললেন, “তার মানে, আপনার বাবাকে আবারও অন্য পরিচয়ে নথিভুক্ত করা হয়েছে।”

“আর তাঁর মৃত্যুর খবরও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ তাঁকে খুঁজতে গেলে ধরে নেয়, তিনি আর নেই।”

অনিরুদ্ধ জানালার দিকে তাকাল।

“এটা শুধু আমার বাবাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা নয়। কেউ চাইছে, আমরা যেন তাঁর কাছ থেকে কোনও তথ্য না পাই।”

ঠিক তখনই দরজায় ঘণ্টা বাজল।

দুজনেই স্থির হয়ে গেলেন।

মৈত্রী ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেলেন। চোখের সমান ছোট ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকালেন।

তারপর ফিরে এসে বললেন, “একজন লোক এসেছে। বলছে, সে বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের পাঠানো।”

অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, “তার কাছে কোনও প্রমাণ আছে?”

“একটি খাম।”

অনিরুদ্ধ দরজার কাছে গিয়ে বলল, “খামটা দরজার নীচ দিয়ে দিন।”

বাইরে থেকে খামটি ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। লোকটি আর কোনও কথা না বলে চলে গেল।

খামের মধ্যে একটি ছোট মেমোরি কার্ড এবং হাতে লেখা একটি বার্তা।

‘তোমার বাবা জীবিত। কিন্তু তুমি যে মানুষটিকে আজ হাসপাতালে দেখেছ, তিনি তোমার বাবার পরিচয় ব্যবহার করছেন। আসল অমিতাভ সেনকে খুঁজে পেতে হলে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বরের হাসপাতাল রেজিস্টার খুঁজে বের করো।’

নিচে স্বাক্ষর—অরুণাভ মজুমদার।

অনিরুদ্ধের মাথা ঘুরে গেল।

“তাহলে হাসপাতালে যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করেছি, তিনি কে?”

মৈত্রী বললেন, “হয়তো একজন প্রতারক।”

“কিন্তু তিনি আমার শৈশবের কথা জানতেন। আমার মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে কেঁদেছিলেন।”

“সেই কারণেই ব্যাপারটা আরও জটিল।”

অনিরুদ্ধ মেমোরি কার্ডটি কম্পিউটারে চালাল।

ভিডিওতে একটি ছোট ঘর। টেবিলের সামনে বসে আছেন একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর উদ্বেগ।

তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার নাম অনির্বাণ দত্ত। অন্তত এই পরিচয়ে আমাকে তোমরা চিনতে পারো। কিন্তু এই নামটিও আমার আসল নাম নয়।”

অনিরুদ্ধ শ্বাস আটকে ভিডিও দেখতে লাগল।

লোকটি বললেন, “২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর একটি সরকারি হাসপাতালে তিনজন মানুষকে আনা হয়েছিল। তাঁদের প্রত্যেকের পরিচয় নিয়ে সমস্যা ছিল। একজনের পরিচয় ছিল অমিতাভ সেন। দ্বিতীয়জনের পরিচয় ছিল অরুণাভ মজুমদার। তৃতীয়জনের পরিচয় নথিভুক্ত করা হয়নি।”

“সেদিন একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল,” তিনি বললেন। “একজন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃতদেহের পরিচয় ভুলভাবে নথিভুক্ত করা হয়। সেই ভুল সংশোধন করার বদলে পরের দুই দিনে আরও দুটি মিথ্যা পরিচয় তৈরি করা হয়।”

ভিডিওর লোকটি সামনের দিকে ঝুঁকলেন।

“অনিরুদ্ধ, তুমি যদি এই ভিডিও দেখো, তাহলে জেনে রেখো—তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে যাননি। তিনি তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটিই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।”

অনিরুদ্ধের চোখে জল এসে গেল।

“তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় আমি জানি,” লোকটি বললেন। “কিন্তু নামটি বলার আগে তোমাকে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর তোমার নামে যে সম্মতিপত্র তৈরি হয়েছিল, তাতে তোমার স্বাক্ষর কে করেছিল?”

ভিডিও থেমে গেল।

স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।

অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না।

তারপর মৈত্রী বললেন, “এখন আমাদের বুঝতে হবে, সেই দিন হাসপাতালের রেজিস্টারে কী লেখা ছিল।”

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“না। তার আগে আমাকে আমার বাবার সঙ্গে আবার দেখা করতে হবে।”

“আপনি তো তাঁকে আজই দেখেছেন।”

“আমি যাঁকে দেখেছি, তিনি হয়তো আমার বাবা নন। কিন্তু তাঁর চোখে যে যন্ত্রণা দেখেছি, তা অভিনয়ও হতে পারে, আবার সত্যিও হতে পারে। আমি আর অনুমানের ওপর নির্ভর করব না।”

সে টেবিল থেকে নোটবুকটি তুলে নিল।

“আগামীকাল প্রথম কাজ—২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বরের হাসপাতাল রেজিস্টার উদ্ধার করা। দ্বিতীয় কাজ—অমিতাভ সেনের পরিচয় নিশ্চিত করা। আর তৃতীয় কাজ—অনির্বাণ দত্তকে খুঁজে বের করা।”

মৈত্রী বললেন, “তৃতীয় ব্যক্তি কে, সেটা না জানা পর্যন্ত কি আমরা এগোতে পারব?”

অনিরুদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমরা এত দিন ভুল প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। কে মারা গিয়েছিল, কে বেঁচে আছে—সেটা নয়। আসল প্রশ্ন হল, কে কাকে নিজের পরিচয় দিয়েছিল, আর কেন?”

৫. যে সাক্ষী নিজের নাম জানে না

রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে।

অনিরুদ্ধের ফোনে আবার একটি বার্তা এল।

এবার কোনও অচেনা নম্বর নয়। প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা—‘অমিতাভ সেন’।

বার্তাটি ছোট।

আমাকে খুঁজিস না। হাসপাতালের লোকটি তোর বাবা নয়। কিন্তু সে শত্রুও নয়। কাল সকাল ন’টায় পুরোনো ফরেনসিক গবেষণাগারের পিছনের প্রবেশদ্বারে আসিস। একা। সঙ্গে কোনও নথি আনবি না।

অনিরুদ্ধ বার্তাটি পড়ে মৈত্রীকে দেখাল।

“এটা কি সত্যিই আপনার বাবার নম্বর?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

“না। নম্বরটি নতুন। কিন্তু তিনি এমন একটি কথা লিখেছেন, যা শুধু আমার বাবা জানতেন।”

“কী কথা?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিল না।

শৈশবে তার বাবা তাকে একটি খেলা শেখাতেন। যখনই বাবা বাইরে থেকে বাড়ি ফিরতেন, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতেন—যার উত্তর শুধু অনিরুদ্ধ জানত। সেই প্রশ্নের উত্তর ভুল হলে দরজা খোলা হত না।

বার্তায় সেই প্রশ্নের প্রথম অংশ লেখা ছিল।

এটি কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তবু অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছিল, তাকে একা যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানেই সেটি নিরাপদ নয়।

মৈত্রী বললেন, “আপনি একা যাবেন না।”

“বার্তায় একা যেতে বলা হয়েছে।”

“যে আপনাকে ডাকছে, সে আপনার বাবা কি না, আমরা নিশ্চিত নই। আপনি একা গেলে বিপদ হতে পারে।”

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “আপনি দূর থেকে নজর রাখবেন। আমি ভিতরে যাব। যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে না আসি, তাহলে দেবাশিস রায়কে খবর দেবেন।”

মৈত্রী সম্মতি দিলেন।

কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনিরুদ্ধ আর একবার মেমোরি কার্ডের ভিডিওটি চালাল। এবার সে লোকটির মুখের দিকে নয়, পিছনের দেওয়ালের দিকে তাকাল।

দেওয়ালে একটি ক্যালেন্ডার ঝুলছে।

তারিখ—১৯ নভেম্বর, ২০০৯।

ক্যালেন্ডারের নীচে একটি হাসপাতালের নাম। তার পাশেই ছোট অক্ষরে লেখা—‘সাক্ষী ০৩’।

অনিরুদ্ধ ভিডিও থামিয়ে ছবিটি বড় করল।

ক্যালেন্ডারের পাশে একটি ফ্রেমে রাখা ছবি। ছবিতে তিনজন মানুষ—অমিতাভ সেন, অরুণাভ মজুমদার এবং আরেকজন অচেনা ব্যক্তি।

অচেনা মানুষটির মুখে কোনও বিশেষ চিহ্ন নেই। কিন্তু তাঁর ডান হাতে একটি আঙুল অনুপস্থিত।

অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, পুরোনো আদালতের করিডরে সে একবার এমন একজন মানুষকে দেখেছিল। সেই মানুষটি বিচারপতির মৃত্যুর মামলার শুনানির দিন আদালতে এসেছিলেন। তিনি কোনও সাক্ষী ছিলেন না, কোনও আইনজীবীও নন। কিন্তু বিচারপতির মৃতদেহ শনাক্ত করার সময় তিনি মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তখন অনিরুদ্ধ ভেবেছিল, তিনি মৃতের আত্মীয়।

আজ বুঝতে পারল, লোকটি হয়তো এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

আর আশ্চর্যের বিষয়, তার নাম কোনও সরকারি নথিতে নেই।

অনিরুদ্ধ কম্পিউটার বন্ধ করে দিল।

তার সামনে এখন তিনটি প্রশ্ন।

হাসপাতালে শুয়ে থাকা মানুষটি কে?

তার বাবা কোথায়?

আর সেই তৃতীয় সাক্ষী—যার নাম কোনও নথিতে নেই—তিনি কি এখনও জীবিত?

সকালে সে উত্তর খুঁজতে যাবে।

কিন্তু সে জানত না, পরদিন সকাল ন’টার আগেই তার নিজের নামের পাশে সরকারি নথিতে একটি নতুন শব্দ লেখা হয়ে যাবে।

‘নিখোঁজ।’

আর যে ব্যক্তি সেই নথিতে সই করবেন, তাঁর নাম হবে—

অমিতাভ সেন।

— সমাপ্ত —

Share This