Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব সিভিল ডিফেন্স দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় ও গুরুত্ব।।।

“যতদিন আমরা সবচেয়ে খারাপের জন্য সন্তোষজনকভাবে প্রস্তুত থাকি ততক্ষণ আমরা কেবলমাত্র সেরাটির জন্য আশা করতে পারি।”  বিশ্ব বেসামরিক প্রতিরক্ষা দিবসটি তার বার্তা সম্পর্কে উপরে উল্লিখিত উদ্ধৃতিটির লক্ষ্য কী তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কথা বলে।  এই দিবসের একটি দিক প্রতিরক্ষা এবং সিভিল সার্ভিসে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্মান করা, তাদের সম্মান এবং নিঃস্বার্থ সেবা নিঃসন্দেহে।  বিশ্ব বেসামরিক প্রতিরক্ষা দিবস ২০২৫-এর আরেকটি প্রধান উদ্দেশ্য হল নাগরিক প্রস্তুতি এবং নাগরিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।  আমরা এই ব্লগে এই দিনের বিস্তারিত মধ্যে যান.  আরও জানতে পড়া চালিয়ে যান।

বিশ্ব বেসামরিক প্রতিরক্ষা দিবস ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য

বিশ্ব বেসামরিক প্রতিরক্ষা দিবস ২০২৫-এর আনুষ্ঠানিক প্রতিপাদ্য হল:

“বেসামরিক প্রতিরক্ষা, জনগণের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা”
এই প্রতিপাদ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উপর জোর দেয়। এটি কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এবং সম্ভাব্য বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য সক্রিয় প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। এই প্রতিপাদ্য সরকার এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে উৎসাহিত করে।

 

তাৎপর্য——-

এই দিনটি নাগরিক প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় দুর্যোগ-প্রতিরোধ পরিষেবাগুলির কৃতিত্বকে সম্মান করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।  একই বিষয়ে আলোকপাত করে, আমরা এই দিনটিকে গুরুত্বপূর্ণ করার কিছু কারণও শেয়ার করেছি।
দিনটি অপ্রত্যাশিতভাবে উদ্ভূত জরুরী পরিস্থিতি প্রতিরোধ, পরিচালনা এবং পরিচালনা করার জন্য প্রস্তুত থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।  অধিকন্তু, এটি বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষায় নাগরিক প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির ভূমিকাও তুলে ধরে।
আরও, এই দিনটি জরুরী ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রধান স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতামূলক সম্ভাবনার প্রচার করে।  সম্প্রদায়, সরকার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা এবং স্টেকহোল্ডারদের একত্রিত করা যেমন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিল্প, যথাযথ স্থাপনা এবং সম্পদের ব্যবহার সম্ভব হয়।
সিভিল ডিফেন্স সংস্থাগুলি জরুরী পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার এবং নাগরিক সুরক্ষা প্রদানের দায়িত্ব পালনে যে চ্যালেঞ্জগুলি এবং সমস্যাগুলির মুখোমুখি হতে পারে তা তুলে ধরার জন্যও দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ।
এছাড়াও, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল যে দিনটি বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির অনেক অর্জন উদযাপনের জন্য সময় নেয়।

বিশ্ব নাগরিক প্রতিরক্ষা দিবস কিভাবে পালন করবেন?—

নিচের পরামর্শগুলো অনুসরণ করে কেউ এই দিবসটি পালনে অংশ নিতে পারেন।
জরুরী পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসার মূল বিষয়গুলি যেমন C.P.R. সম্পর্কে জানতে মানুষ এই দিবসটির উপলক্ষ্য ব্যবহার করতে পারে।  যাদের প্রয়োজন তাদের জরুরী প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা।
আপনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের স্যালুট দিতে বা তাদের নিঃস্বার্থ সেবার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করতে পারেন।
উপরন্তু, কেউ এমনকি তাদের স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় নাগরিক প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বেছে নিতে পারে।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ জাতীয় বিজ্ঞান দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় ও গুরুত্ব।।।।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫: এটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ডক্টর সিভিকে শ্রদ্ধা জানাতে পালিত হয়।  রামন তার রামন প্রভাব আবিষ্কারের জন্য।  আসুন আমরা জাতীয় বিজ্ঞান দিবস, এর ২৯২৪ সালের থিম, ইতিহাস, কীভাবে এটি উদযাপন করা হয় এবং এর তাত্পর্য সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে দেখি।
জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫: ‘রমন প্রভাব’ আবিষ্কারের স্মরণে ২৮ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয়।  ১৯৮৬ সালে, ভারত সরকার ২৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস (NSD) হিসাবে মনোনীত করেছিল।  এই দিনে, স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটা রমন, যিনি সিভি রমন নামেও পরিচিত, ‘রমন প্রভাব’ আবিষ্কারের ঘোষণা দেন যার জন্য তিনি ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন মানুষের জীবনকে নানাভাবে বদলে দিয়েছে।  বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে উন্নত ও সহজ করেছে।  রোবট, কম্পিউটার, মোবাইল ডিভাইস ইত্যাদি শুধুমাত্র বিজ্ঞানের সাহায্যেই উদ্ভাবিত হয়েছে।  তাই আমাদের জীবনে বিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম।  বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ভারত অনেক অবদান রেখেছে।  অনেক মহান বিজ্ঞানী ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং ভারতকে একটি পৃথক স্থানও তৈরি করেছেন।
১৯২৮ সালে, একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী, স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটা রমন রমন প্রভাব নামে পরিচিত একটি ঘটনা আবিষ্কার করেন।  ১৯৩০ সালে তার অসাধারণ আবিষ্কারের জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, যা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতের প্রথম নোবেল পুরস্কার ছিল।  এই আবিষ্কারের জন্য প্রতি বছর জাতীয় বিজ্ঞান দিবস পালিত হয়।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫: থিম—

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ এর থিম

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস প্রতি বছর একটি নতুন অনন্য প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য হল “VIKSIT ভারতের জন্য বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের জন্য ভারতীয় যুবদের ক্ষমতায়ন।” এই প্রতিপাদ্য বিজ্ঞান ভবনে অনুষ্ঠিতব্য সেমিনার এবং আলোচনার কর্মপদ্ধতির রূপরেখা প্রদান করে।

এই দিনটিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় কবে?
স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটা রমন ছিলেন একজন তামিল ব্রাহ্মণ যিনি ১৯০৭ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গে কাজ করেছিলেন।  এখানে, তিনি পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, যার মধ্যে একটি হল রামন প্রভাব, যা ভারতীয় ইতিহাসে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হিসেবে চিহ্নিত।
১৯৮৬ সালে, ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কমিউনিকেশন (এনসিএসটিসি) ভারত সরকারকে ২৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসাবে মনোনীত করতে বলেছিল।  সরকার এটি গ্রহণ করেছিল এবং ২৮ ফেব্রুয়ারিকে ১৯৮৬ সালে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছিল। প্রথম জাতীয় বিজ্ঞান দিবস 28 ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭-এ পালিত হয়েছিল।
এটি এমন একটি ঘটনা যেখানে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ঘটে যখন আলোর রশ্মি অণু দ্বারা বিচ্যুত হয়।  রাসায়নিক যৌগের ধুলো-মুক্ত, স্বচ্ছ নমুনা থেকে আলোর একটি রশ্মি ভ্রমণ করে, তখন আলোর একটি ছোট ভগ্নাংশ আপতিত আলো ছাড়া অন্য দিকে আবির্ভূত হয়।  বিক্ষিপ্ত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেশিরভাগই অপরিবর্তিত থাকে, এবং ছোট অংশে, যদি তরঙ্গদৈর্ঘ্য ঘটনা আলোর থেকে আলাদা হয় তবে তা রমন প্রভাবের কারণে হয়।
জাতীয় বিজ্ঞান দিবস কীভাবে পালিত হয়?
কর্মশালা, বিজ্ঞান চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী, থিম এবং ধারণার উপর ভিত্তি করে একটি প্রদর্শনী, লাইভ প্রজেক্ট, বিতর্ক, কুইজ প্রতিযোগিতা, সেমিনার ইত্যাদির আয়োজন করে সমগ্র জাতি এটিকে একটি বিজ্ঞান উত্সব হিসাবে উদযাপন করে। এর মূল লক্ষ্য হল মানুষের মনে বৈজ্ঞানিক মেজাজ প্রদান করা।  সব বয়সের মানুষ।  বিপুল সংখ্যক লোক একত্রিত হয় এবং জাতীয় বিজ্ঞান দিবস উদযাপনে প্রচুর উত্সাহের সাথে যোগ দেয় এবং কুইজ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক, প্রকল্প ইত্যাদির মতো কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করে।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫, সংক্ষিপ্তসার, থিম, দিবস।।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ প্রতি বছর ২৮শে ফেব্রুয়ারী ২০২৫ তারিখে পালিত হয়। এই বছর এর প্রতিপাদ্য হল “বিকশিত ভারতের জন্য বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের জন্য ভারতীয় যুবদের ক্ষমতায়ন”। এই দিবসের লক্ষ্য “রমন প্রভাব” এর মতো বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে সম্মান জানানো এবং তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনকে অনুপ্রাণিত করা। এই প্রবন্ধে, আমরা এই দিবসের তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং অবদানের দিকে নজর দেব।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ সংক্ষিপ্ত বিবরণ

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ হল সেই দিন যেদিন স্যার সিভি রমন ১৯২৮ সালে রমন প্রভাব আবিষ্কার করেছিলেন। এর লক্ষ্য হল বিতর্ক, প্রদর্শনী, কুইজ এবং সেমিনারের মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা দক্ষতা প্রচার করা। এই দিনটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তুলে ধরে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গড়তে অনুপ্রাণিত করে।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ সংক্ষিপ্ত বিবরণ
তারিখ—

শুক্রবার, ২৮শে ফেব্রুয়ারী ২০২৫
ইতিহাস

১৯৮৬ সালে, NCSTC ২৮শে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব করে।

উদ্দেশ্য—

বৈজ্ঞানিক মেজাজ, সচেতনতা এবং দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের গুরুত্ব প্রচার করে।

থিম—

ভিকসিত ভারতের জন্য বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের জন্য ভারতীয় যুবদের ক্ষমতায়ন।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ এর থিম —

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস প্রতি বছর একটি নতুন অনন্য প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য হল “VIKSIT ভারতের জন্য বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের জন্য ভারতীয় যুবদের ক্ষমতায়ন।” এই প্রতিপাদ্য বিজ্ঞান ভবনে অনুষ্ঠিতব্য সেমিনার এবং আলোচনার কর্মপদ্ধতির রূপরেখা প্রদান করে।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের ইতিহাস —

১৯৮৭ সালে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও যোগাযোগ পরিষদ কর্তৃক প্রস্তাবিত জাতীয় বিজ্ঞান দিবস প্রথমবারের মতো পালিত হয়। সরকার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং রমন প্রভাবের আবিষ্কারকে তুলে ধরার জন্য ২৮শে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের গুরুত্বকে সম্মান জানাতে এবং ভারতীয় বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য এবং বৈশ্বিক জ্ঞানে বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত প্রতি বছর এই দিবসটি উদযাপন করে।

রমন প্রভাব কী?

১৯২৮ সালে সিভি রমন এবং কেএস কৃষ্ণন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, রমন এফেক্টের অধীনে, পদার্থের অণুগুলির সাথে মিথস্ক্রিয়া করার সময় আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ঘটে। এই আবিষ্কারে, প্রভাবটি প্রমাণ করে যে আলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে, যা আণবিক কম্পন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য বহন করে। আবিষ্কারের পর থেকে, এই আবিষ্কার চিকিৎসা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা এবং পদার্থের গঠন এবং বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এই আবিষ্কার তাকে ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার জিতে নিতে সাহায্য করেছিল।

সিভি রমন কে ছিলেন?

স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন, যাকে সিভি রমন নামেও স্মরণ করা হয়, তিনি একজন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন যিনি বর্ণালী এবং আলোকবিদ্যায় বিরাট অবদান রেখেছিলেন। রমন প্রভাব আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯৩০ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী যিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন এবং আধুনিক বর্ণালীবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। রমন গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তিনি ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সিভি রমনের অবদান

স্যার সিভি রমন পদার্থবিদ্যা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন:

রমন এফেক্ট (১৯২৮): আলোর বিচ্ছুরণ এবং অণুর সাথে এর মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার (১৯৩০) অর্জন করেন।

ধ্বনিবিদ্যা: বাদ্যযন্ত্র এবং তরঙ্গ প্রচারের উপর গভীর গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

আণবিক গঠন: স্ফটিক এবং তরল গঠন সম্পর্কে উন্নত ধারণা।

হীরা এবং ইরিডিসেন্ট পদার্থ: হীরার গঠন এবং ইরিডিসেন্ট পদার্থের আলোকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করেছেন।

সাহিত্য অবদান: আলোর আণবিক বিবর্তন, শাব্দিক স্মৃতিকথা এবং কেন আকাশ নীল (সহ-লেখক) সহ গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলি রচনা করেছেন।

প্রতিষ্ঠান নির্মাণ: ভারতে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি বৃদ্ধির জন্য রমন গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ এর তাৎপর্য

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৫ ভারতে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা এবং উদ্ভাবন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ তা এখানে দেওয়া হল:

বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতা সম্মান: ভারতীয় বিজ্ঞানীদের, বিশেষ করে সিভি রমনের অবদান উদযাপন করে।

বৈজ্ঞানিক কৌতূহলকে অনুপ্রাণিত করা: শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান এবং গবেষণা অন্বেষণ করতে উৎসাহিত করে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি: বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য প্রদর্শন করে।

বিজ্ঞান ও সমাজের সংযোগ: বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণা বৃদ্ধি করে।

গবেষণা ও শিক্ষা জোরদার করা: তরুণদের STEM ক্যারিয়ার গড়তে অনুপ্রাণিত করে।

এই বছরের উদযাপন ভারতের বৈজ্ঞানিক সাফল্য এবং রমন প্রভাবের স্থায়ী প্রভাব তুলে ধরবে। জাতীয় বিজ্ঞান দিবস পালনের মাধ্যমে, ভারত বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা এবং উদ্ভাবনের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।

জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন ১. কেন ২৮শে ফেব্রুয়ারীকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল?
উত্তর. ১৯২৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী সিভি রমনের রমন প্রভাব আবিষ্কারের স্মরণে।
প্রশ্ন ২. জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৪ এর থিম কী?
উত্তর. ভিকসিত ভারতের জন্য আদিবাসী প্রযুক্তি।
প্রশ্ন ৩. বিশ্ব বিজ্ঞান দিবস কেন পালিত হয়?
উত্তর. সমাজে বিজ্ঞানের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে জনসাধারণের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা।
প্রশ্ন ৪. জাতীয় বিজ্ঞান দিবস কে চালু করেছিলেন?
উত্তর. ১৯৮৬ সালে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যোগাযোগ পরিষদ (NCSTC)।
প্রশ্ন ৫. জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের জনক কে?
উত্তর: সিভি রমন, কারণ এই দিনটি রমন প্রভাব আবিষ্কারের সম্মানে পালিত হয়।
প্রশ্ন ৬. বিজ্ঞানের জনক কে ছিলেন?
উত্তর. গ্যালিলিও গ্যালিলি, আধুনিক বিজ্ঞানে তাঁর মৌলিক অবদানের জন্য।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

চন্দ্রশেখর আজাদ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিপ্লবী – প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি।।।

সাল ১৯১৪, সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বেজে উঠলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা!
ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তখন আংশিক নয়, বরং প্রায় সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হতাশা’র গহীন অন্ধকারে!
ব্রিটিশ অধীনতা’র দাসত্ব শৃঙ্খল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার একান্ত উদ্দ্যেশ্যে এমত পরিস্থিতিতে, বিশ্বযুদ্ধের এই সুযোগকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় বিপ্লবীরা নিরন্তর ও নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিভাবে ভারতে একটি সুসংবদ্ধ ও জোরালো বিপ্লব করা সম্ভবপর হয়।

১৯০৭ সালে সুরাট অধিবেশনে জাতীয় কংগ্রেসের মতাদর্শ নরমপন্থী ও চরমপন্থী নাম ধারণ করে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পৌঁছে যায় যথাক্রমে সুমেরু ও কুমেরু বিন্দুতে।
যেহেতু জাতীয় কংগ্রেস নামক সু-বৃহত্‍ বৃক্ষটির বীজ নিহিত ছিল নরমপন্থীতে, তাই চরমপন্থীরা কংগ্রেস থেকে হয়ে যান বিতাড়িত!
ফলস্বরূপ, রীতিমতন দুর্বল হয়ে পড়ে নরমপন্থী পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেস।
এদিকে বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপত্‍ রায়, অরবিন্দ ঘোষ, কৃষ্ণকুমার মিত্র ও অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রমুখ নেতৃবৃন্দের অভাবজনিত কারণে চরমপন্থীরাও নেতৃত্বহীনতার অভাবে হয়ে পড়েন দুর্বল ও হতাশাগ্রস্থ!
একদিকে সরকারের দমননীতি, অপরদিকে নেতৃত্বাভাব ও বার্ধক্যজনিত কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া, সব মিলিয়ে চরমপন্থী আন্দোলন যেন অসহায়ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে ধূলিধূসর রাজপথে!
পরবর্তীকালে, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ, লক্ষ্মৌ চুক্তি, হোমরুল লীগ ও রাওলাট আইন বিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস এসে পৌঁছায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত এক গণনিধন ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড’-এর
দোড়গোড়ায়!
এখানে বলে রাখা ভালো, রাওলাট আইনের প্রতিবাদের উপরে ভিত্তি করে যে আন্দোলন সূচিত হয়, তারই চরম পরিণতি’র জীবন্ত দৃষ্টান্ত কিন্তু এই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড!
লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ ডায়ার এর স্বৈরাচারী শাসনের ফলস্বরূপ পাঞ্জাবের অমৃতসর সেসময় যথার্থই পরিণত হয় জ্বলন্ত এক অগ্নিকুন্ডে!
শুধু অমৃতসরেই তা কিন্তু থাকেনি সীমাবদ্ধ, এরপর পাঞ্জাবের আরো পাঁচ-পাঁচটি জেলাকে বন্দী করা হয় সামরিক আইন বলের ঘেরাটোপে।
এ পরিস্থিতিতে, খিলাফত্‍ আন্দোলন চিত্রে মহাত্মা গান্ধী’র রেটিনায় গঠিত হয় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সম্ভাবনার এক স্বচ্ছ
প্রতিবিম্ব, যা তিনি আগামী ১০০ বছরেও আর আসবেনা মনে করে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ইংরেজ সরকারের বিরূদ্ধে কর্মসূচি গ্রহণ করেন অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের।
সে বছরেই অর্থাত্‍ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রতিষ্ঠিত হন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে।
একদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নির্মম আঘাতে দেশবাসীর বিশেষত অর্থনৈতিক সংকট চরমে!
ওষুধ, চাল, ডাল, চিনি, কাপড় প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যের সূচক চুড়ান্ত ঊর্ধ্বমুখী। কৃষিজাত দ্রব্যও অতি স্বল্প মূল্যে মহাজনদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয় কৃষকরা। বৃদ্ধি পায় শিল্পদ্রব্যের মূল্য কিন্তু শ্রমিকের মজুরী সেখানেই হয়ে থাকে স্ট্যাচু!
অন্যথায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে ভারতে ব্রিটিশদের বিভিন্ন পণ্যের আমদানী বন্ধ হওয়ায় সরকার ভারতীয়দের শিল্পবিস্তারের ক্ষেত্রে উত্‍সাহী হলেও, যুদ্ধ শেষে নানান বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে, সেগুলির উপরে এবং নতুন শিল্প স্থাপনে সৃষ্টি করা হয় যথাসাধ্য বাধা’র! ফলতঃ, জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে ঘৃতাহুতি চিত্তে ভারতীবাসী হয়ে ওঠেন আরো বেশি ক্ষুব্ধ!
সব মিলিয়ে, সমকালীন আন্তর্জাতিক এ হেন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি যেন হয়েই যায় তৈরি।
এমনই এক ক্রান্তিকালীন মুহুর্তে, মধ্যপ্রদেশের আলিরাজপুর জেলার ভাওরা গ্রামের এক ১৫ বছরের এক অকুতোভয় তরুণ বিপ্লবী জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে অংশগ্রহণ করেন অসহযোগ আন্দোলনে।
সংস্কৃত ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দ্যেশ্যে তাঁকে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে, সেই বছরই অর্থাত্‍ ১৯২১ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এই আন্দোলনে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মবিসর্জনকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে যুদ্ধে দক্ষতা বৃদ্ধি’র প্রশিক্ষণের জন্যে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ঝাঁসি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের একটি গোপন ও নিরাপদ স্থানকে। ঝাঁসিতে থাকাকালীন পণ্ডিত হরিশঙ্কর ব্রহ্মচারী ছদ্মনাম গ্রহণ করে গোপনে প্রশিক্ষণ চালানোর মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর গোষ্ঠীর সদস্যদের এ প্রকারেই বৃদ্ধি করেছিলেন রণকৌশল।
ব্রিটিশ রাজত্বকালে তিনি কখনই পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে জীবিত ধরা পড়বেন না, এমন দৃঢ়সংকল্পের দুর্ভেদ্য পোশাক পরিহিত এই সিংহপুরুষকে গ্রেপ্তার করে একবার এক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আনা হলে ম্যাজিস্ট্রেট চন্দ্রশেখরকে প্রশ্ন করে বসেন, ‘কি তোমার পরিচয়?’
সগর্বে ‘আজাদ’ হিসেবে তিনি নিজেকে
পরিচয় দেন, যার অর্থ ‘মুক্ত’ আর সেইদিন থেকেই তিনি পরিচিতি অর্জন করেন ‘চন্দ্রশেখর আজাদ’ নামে।
অবশেষে, এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে পুলিশবাহিনী’র চক্রব্যূহকে মূল্যহীন ও তুচ্ছ প্রমাণিত এবং আত্মসম্মানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেই ১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, বিপ্লবী ভগত্‍ সিংয়ের আদর্শ গুরু হিসেবে পরিচিত এই বীর স্বাধীনতা সৈনিক নিজের শেষ বুলেটটি দিয়ে নিজেকে উত্‍সর্গ করে লুটিয়ে পড়েন অবিভক্ত ভারত মায়ের বুকে।
ফ্লিপ কার্ড অথবা অ্যামাজন-এ অর্ডারের মাধ্যমে স্বাধীনতা আসেনি, এসেছে দীর্ঘ এক কঠিন সংগ্রাম ও রক্তবন্যায় ভেসে, এ আমরা সবাই কম-বেশি জানি কিন্তু ওইটুকুই ব্যাস!
এরপর জানা’র অ্যাপ্লিকেশন’টা অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে এক সময় স্থান পায় শশ্মান কিংবা কবরে!
রাজমিস্ত্রি আজও গেঁথে চলেছে দেওয়াল কিন্তু, বোধকরি সিংহভাগ অভিভাবকই তাঁদের ভবিষ্যত্‍ প্রজন্মের দেওয়ালে এনাদের আদর্শ আজ আর গাঁথেন না, আজ শুধুই মুখস্থ করা হয় এনাদের, ফলে ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক ও শান্তিপ্রিয় সন্তান!
বিস্মৃতি’র অতল গহ্বরে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছেন এ সমস্ত গর্বিত বঙ্গ মায়ের বীর সন্তানরা! ইতিহাসও যেন আজ আর চাইছে না এনাদের সাথে কোনপ্রকার সম্পর্ক রাখতে!
কেমন যেন লন্ড-ভন্ড ও অগোছালো এ সময়!
মাঝে মধ্যেই মনে হয় মনুষ্যত্ব’টা তর্জনী উঁচিয়ে প্রশ্ন করে বসে, এ হেন হোমোস্যাপিয়েন্স-এর চেয়ে আমার ইজিপ্টোপিথেকাস ছিল অনেক ভালো!

কলমে : তন্ময় সিংহ রায়।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

কবি ও শিশু সাহিত্যিক সুনির্মল বসু – লেখার পাশাপাশি চিত্রকলায়ও দক্ষ ছিলেন।।।।।

সুনির্মল বসু একজন বাঙালি কবি ও শিশুসাহিত্যিক।  সুনির্মল বসু ২০ জুলাই, ১৯০২ সালে ভারতের বিহারের গিরিডিতে তার পিতার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন।  তার পৈতৃক নিবাস ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের মালখানগর।  পিতার নাম পশুপতি বসু।  সাংবাদিক ও লেখক গিরিশ চন্দ্র বসু ছিলেন তাঁর পিতামহ এবং বিপ্লবী ও সাহিত্যিক মনোরঞ্জন গুঠাকুরতা তাঁর মাতামহ।  ছোটবেলায় সাঁওতাল পরগণার সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল।  লেখা প্রথম কবিতা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।  প্রধানত সরস শিশুসাহিত্যকে সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিল।  কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি কৈশোর থেকেই চিত্রকলায়ও দক্ষ ছিলেন।

শিক্ষাজীবন—-

সুনির্মল বোস ১৯২০ সালে পাটনার গিরিডি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন যেখানে তার বাবা কাজ করতেন।  পরে তিনি কলকাতার সেন্ট পলস কলেজে যোগদান করেন, কিন্তু গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের জন্য ১৯২১ সালে কলেজ ত্যাগ করেন।  এরপর অবনীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত আর্ট কলেজে ভর্তি হন।

সাহিত্যসৃষ্টি—-

ছড়া, কবিতা, গল্প, কাহিনি, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি,রূপকথা, কৌতুকনাট্য প্রভৃতি শিশু ও কিশোরদের উপযোগী বিভিন্ন বিষয়ক রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। আর তার জনপ্রিয়তার মূলে ছিল ছন্দের চমৎকারিত্ব ও মিলপ্রয়োগের কুশলতা।

গ্রন্থতালিকা—–

কিপটে ঠাকুরদা, টুনটুনির গান,  পাততাড়ি, ছন্দের টুংটাং,  হাওয়ার দোলা, ছানাবড়া, বেড়ে মজা, হৈ চৈ, হুলুস্থূল, কথাশেখা, আনন্দ নাড়ু, শহুরে মামা, পাতাবাহার, ইন্তিবিন্তির আসর, পাহাড়ে জঙ্গলে, গুজবের জন্ম, বীর শিকারী, লালন ফকিরের ভিটে।
আত্মজীবনী –  “জীবনখাতার কয়েক পাতা”।

পুরস্কার—-

1956 সালে তিনি ভুবনেশ্বরী পদক লাভ করেন।

মৃত্যু—-

১৯৫৭ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ ১৯ ফেব্রুয়ারী, ইতিহাসের দিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নেব ইতিহাসের এই দিনে বিশিষ্টজনদের জন্ম-মৃত্যু, দিনসহ ঘটে যাওয়া ঘটনা।।।।

আজ ১৯ ফেব্রুয়ারী । এক নজরে দেখে নিই ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশিষ্টজনদের জন্ম-মৃত্যু দিনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু বিষয়।
দিবস—–
(ক) শিবাজী জয়ন্তী (মহারাষ্ট্র, ভারত)।
আজ যাদের জন্মদিন—-

১৪৭৩ – নিকোলাউস কোপার্নিকাস, বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন।

১৬৩০ – ভারতের মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা যোদ্ধা রাজা ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জন্ম গ্রহণ করেন ।

১৭৩২ – ইংরেজ নাট্যকার রিচার্ড কাম্বারল্যান্ড জন্মগ্রহণ করেন।
ইতিহাসের পাতায় আজকের দিনের ঘটনাবলী—-

১৩৮৯ – সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (দ্বিতীয়) দিল্লীতে নিহত হন।
১৬১৮ – ডেনিস-অস্ট্রেলিয়া যুদ্ধের অবসান। মাদ্রিদ শান্তি চুক্তি অনুমোদন।
১৮০৩ – সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতা আইন পাস (যে আইনের অধীনে ক্যান্টনস পুনরায় স্বাধীনতা অর্জন করে)।
১৮৫৫ – লিভারপুলে খাদ্যা দাঙ্গা শুরু।
১৮৭৮ – টমাস আলভা এডিসন ফনোগ্রাফ পেটেন্ট করেন।
১৮৯১ – ‘অমৃত বাজার পত্রিকা’ দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়।
১৯০৪ – ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকাতে কার্জন হলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
১৯২৪ – জেনেভায় আন্তর্জাতিক মাদক কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৪১ – কেনিয়ায় অবস্থানরত ব্রিটিশ বাহিনী ইতালীয় সোমালিল্যান্ড দখল করে নেয়।
১৯৪২ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখন্ডে জাপানের প্রথম বিমান হামলা। ২৪৩ কর্মকর্তা নিহত। ২৩ টি বিমান বিধ্বস্ত ৮টি জাহাজডুবি।
১৯৫১ – নেপালে গণঅভ্যুত্থানে ১০৪ বছরের পুরনো রানা শাসনামলের পতন এবং রাজ পরিবারের ক্ষমতায় পুনঃঅধিষ্ঠিত।
১৯৫১ – বিখ্যাত ফরাসি লেখক, নৈতিকতাবাদী, দার্শনিক আন্দ্রে জিঁদ পরলোকগমন করেন।
১৯৬৩ – সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মত হয়।
১৯৭৪ – বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রমনা থানার সেগুনবাগিচায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮০ – ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী ইরানের প্রথম অভিভাবক পরিষদের জন্য ইসলাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বা ফকিহদের মনোনয়ন দান করেন।
১৯৮৮ – ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমানের উপর ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসকের সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হোজ্জাতুল ইসলাম ফাজল্লাহ মাহলাদী শহীদ হন।
১৯৯৩ – হাইতিতে ১৫শ যাত্রীবাহী ফেরীডুবি। জীবিত উদ্ধার মাত্র ২৮৫ জন।
২০১৮ – বাংলাদেশে ফোরজি সেবা চালু হয়।

এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন যারা—-

১৮৬১ – কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ও জন হিতৈষী লোকমাতা রাণী রাসমণি প্রয়াত হন ।

১৯১৫ – গোপালকৃষ্ণ গোখলে, ভারতীয় রাজনীতিবিদ।

১৯৪৭ – সমাজসেবক স্যার আজিজুল হক মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৭৮ – পঙ্কজ কুমার মল্লিক, ভারতীয় বাঙালি কণ্ঠশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও অভিনেতা।

১৯৯০ – মাইকেল পাওয়েল, ইংরেজ চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার।

১৯৯৭ – চীনের শীর্ষ নেতা দেন শিয়াও পিং মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৯৯ – ভারতের বাঙালি সাহিত্যিক ও বাংলা সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’ র প্রখ্যাত সম্পাদক সাগরময় ঘোষ প্রয়াত হন ।

২০১৭ – বনশ্রী সেনগুপ্ত, প্রবাদপ্রতিম ভারতীয় বাঙালি গায়িকা।

২০১৯ – (ক) মুহম্মদ খসরু, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।

(খ) প্রতীক চৌধুরী, ভারতীয় বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী।
২০২৩ – সাবেক যোগাযোগ ও তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

আজ ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তী, জানুন দিনটি কেন পালিত হয়- দিনটির ইতিহাস এবং তাৎপর্য।।।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তী, যা শিব জয়ন্তী নামেও পরিচিত, একটি উৎসব যা মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে।  এটি প্রতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় এবং মহারাষ্ট্র রাজ্যে এটি একটি সরকারি ছুটির দিন।
ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ পালন যা শ্রদ্ধেয় মারাঠা সম্রাট, ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের জন্মবার্ষিকীকে সম্মান করে।  ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তী প্রতি বছর দুবার পালিত হয় কারণ, সম্বত হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুসারে, শিবাজি ফাল্গুনের তৃতীয় দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হিন্দু সম্বত ক্যালেন্ডার অনুসারে, এই তাৎপর্যপূর্ণ দিনটি ১০ ​​মার্চ, ২০২৪-এ পড়ে, যখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে, এটি ১৯ ফেব্রুয়ারী পালিত হয়।

এই উপলক্ষটি মহান মারাঠা রাজার ৩৯৪ তম জন্মদিনকে চিহ্নিত করে অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে।

ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ, তাঁর বীরত্ব, নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত, ভারতীয় ইতিহাসে একজন বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসাবে পালিত হয়।  তিনি মারাঠা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিশেষ করে তাঁর সামরিক দক্ষতা, উদ্ভাবনী কৌশল এবং হিন্দবী স্বরাজ্য, যার অর্থ ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের জন্য স্ব-শাসনের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য স্মরণীয়।
শিবাজী জয়ন্তী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাথে স্মরণ করা হয়, যার মধ্যে মিছিল, নাটক এবং বক্তৃতা রয়েছে যা তার জীবন এবং কৃতিত্বকে তুলে ধরে।  এটি তার উত্তরাধিকার এবং তিনি যে মূল্যবোধের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, যেমন সাহসিকতা, ন্যায়বিচার এবং তার লোকেদের সুরক্ষার অনুস্মারক হিসাবে কাজ করে।

এই পালনটি শুধুমাত্র ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে না বরং মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে, তাদের মহৎ গুণাবলী অনুকরণ করতে এবং সমাজে ইতিবাচকভাবে অবদান রাখতে উৎসাহিত করে।

কেন আমরা ছত্রপতি শিবাজী জয়ন্তী উদযাপন করি?

মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে পুনে থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে ১৮৬৯ সালে রায়গড়ে শিবাজি মহারাজের সমাধি আবিষ্কার করার পর ১৮৭০ সালে শিবাজি জয়ন্তী উদযাপনের সূচনা করেন।  ১৮৯৪ সালে বাল গঙ্গাধর তিলক এই উদযাপনগুলিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। মহারাষ্ট্র, গোয়া এবং কর্ণাটকে শিবাজী জয়ন্তী অত্যন্ত গর্বের সাথে পালিত হয়।  মারাঠা সম্প্রদায় এই দিনে মহান মারাঠা সম্রাটকে প্রশাসনে তার ব্যতিক্রমী দক্ষতা, সামরিক বীরত্ব এবং সামরিক কৌশলের জন্য সম্মান জানাতে অসংখ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।  শিবাজি মহারাজের সাহস ও বুদ্ধিমত্তা কিংবদন্তি এবং প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ তার দরবারে এবং প্রশাসনে মারাঠি এবং সংস্কৃতের মতো আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারকে প্রচার করেছিলেন, প্রচলিত মান ভাষা ফার্সিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।  শিবাজি মধ্যযুগে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নৌ শাখার বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য “ভারতীয় নৌবাহিনীর পিতা” হিসাবেও বিখ্যাত।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তীর তাৎপর্য ২০২৪।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তী মহারাষ্ট্র এবং ভারত জুড়ে পালিত হয়, এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য স্মরণ করে।  ২০২৪ সালে, ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সেমিনার আয়োজন করা হয়।  স্কুল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ছাত্রদের তার জীবন সম্পর্কে শিক্ষিত করার জন্য বিশেষ প্রোগ্রাম পরিচালনা করে, তাদের ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব জাগিয়ে তোলে। ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ জয়ন্তী ভারতের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্বের জীবন ও অর্জন উদযাপন করে, তার বীরত্ব, নেতৃত্ব এবং ইতিহাসে অবদান তুলে ধরে।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

“মিলেট” হচ্ছে পুষ্টিকর খাদ্য-শস্য — একটি পর্যালোচনা :: দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।।

প্রথমেই আমাদের জানা দরকার “মিলেট” কী ? জোয়ার, বাজরা, রাগি, ইত্যাদি কয়েকটি ক্ষুদ্র দানাশস্যকে একত্রে মিলেট বলে । পৃথিবীর মধ্যে ভারতেই সবচেয়ে বেশী মিলেট উৎপন্ন হয় । সাধারণত দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের গরীব অধিবাসীরা খাদ্যশস্য হিসেবে এই ফসলগুলি বেশী ব্যবহার করে । মিলেট শস্য বেশী পরিমানে লক্ষ্য করা যায় মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে ।
এটা ঘটনা — কৃষি ও সহযোগী ক্ষেত্রগুলি যেমন দুগ্ধ, পশুপালন, মৎস্য, হাঁস-মুরগি, রেশম চাষ, ইত্যাদি ভারতীয় অর্থনীতির স্তম্ভ ! কৃষি যেমন অর্থনীতির স্তম্ভ তেমনি স্বাস্থ্য হলো সমৃদ্ধ সমাজের এক অপরিহার্য অঙ্গ । স্বাস্থ্য সম্বন্ধে মানুষ কম-বেশী ওয়াকিবহাল । তাই স্বাস্থ্য দেখ-ভালের নিরিখে মিলেট খাদ্য-শস্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রেক্ষাপটে মিলেট দানাশস্যকে বলা চলে অধিক পুষ্টিকর ।
সেই কথা মাথায় রেখে ও মিলেট শস্যের উপকারিতার কথা বিবেচনা করে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভা ২০২৩ সালকে “আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ” হিসেবে ঘোষণা করেছে । সকলের ধারণা, কৃষি ও খাদ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে মিলেট বড় ভূমিকা নিতে পারে । মিলেটের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার অতীতে খুব শোনা যায় । মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীর পছন্দ করতেন “লাজিজা” –এক ধরনের মটর মিশ্রিত মিলেটের খিচুড়ি । শোনা যায় এর প্রচলন ছিল গুজরাটে । কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে নানান ধরনের মিলেট ভেজানো কিংবা সেদ্ধ করে নেওয়ার পর তাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ পাওয়া যায় ।
জীবিকা ও কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এমনকি বিশ্বের খাদ্য ও পুষ্টিগত চাহিদা মেটাতে মিলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ দানাশস্য । তাই শস্যটির চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ঘোষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ, ২০২৩ । যার জন্য ভারত সরকার জোয়ার, বাজরা, রাগি ইত্যাদি শস্যের ফলন বাড়াতে ও স্বাস্থ্যে এদের উপকারিতা বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে । ইতিমধ্যে এই দানাশস্যে পুষ্টির অনুপাত বেশী থাকার জন্য “পুষ্টিকর দানাশস্য” হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । অন্যদিকে সরকারের মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবার পরিপুরক পুষ্টি কর্মসূচিতে খাবারের পুষ্টিগত মান বাড়াতে জোয়ার, বাজরার কথা উল্লেখ করেছে । শোনা যায় ওড়িশা, তেলেঙ্গানা, চন্ডিগড়, ইত্যাদি রাজ্য ও কেন্দ্রিয় শাসিত অঞ্চলে পরিপুরক পুষ্টিতে জোয়ার-বাজরা ঠাঁই পাচ্ছে ।
মিলেট হলো এক ধরনের দানাশস্য যেগুলির বীজ ছোট এবং যেগুলিকে সহজে চাষ করা যায় । এগুলি চাষের জন্য বাইরে থেকে দামী রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদি ক্রয় করতে হয় না । মিলেট পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ এবং এগুলি খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা বজায় রাখে । মিলেট চাষের দু-রকমের উপযোগিতা রয়েছে । মিলেট চাষ করলে মানুষের জন্য খাদ্যশস্য এবং সেইসঙ্গে গবাদি পশুর জন্য খড়ও পাওয়া যায় । আবার কিছু অঞ্চলে মিলেটই মানুষের প্রধান খাদ্য । মিলেটের ফসল – বৈচিত্র ও চাষব্যবস্থা সেই ফসলগুলির বাস্তুতন্ত্রের কৃষিবৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করে । কেদো মিলেটও অত্যন্ত পুষ্টিকর । এর মধ্যে গ্লুটেন নেই, এটা সহজপাচ্য, সেইসঙ্গে এটি ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এবং ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ । পোলাও, খিচুড়ি, উপমা, পরোটা, দোসা ও চাপাটি তৈরীতে শস্য হিসাবে মিলেট ব্যবহার করা যায় । মিলেট থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরী করা যায় যেমন মাল্টিগ্রেন পাস্তা, মাল্টিগ্রেন সুইট মিক্স, মাফিন, পুষ্টিকর মিলেট আটা, রাগি ফ্লেক্স, রাগি পাপড়, পাউরুটি, কুকিজ, রাগি স্নাক্স, ফ্লেকড জোয়ার, মিলেটের আটা, ইত্যাদি ।
( ২ )
এবার আসছি মিলেট শস্য মানুষের কী উপকারে আসতে পারে । প্রথমত এটি একটি বিকল্প প্রধান খাদ্য হয়ে উঠতে পারে । মিলেটে কার্বোহাইড্রেট-ফাইবার অনুপাত কম থাকার কারণে, জীবনযাত্রাগত বিভিন্ন রোগের মোকাবিলায় এটা কাজে আসে । মিলেট হলো “পুষ্টির পরিপূরক” যাতে রয়েছে ফাইটোকেমিক্যাল এবং অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট, যা সুস্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার চিকিৎসায় বিশেষ কার্যকর । গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য তথা পুষ্টির উপর মিলেটভিত্তিক খাদ্যের একটা ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে । গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্যতালিকায় পরিপূরক খাদ্য হিসাবে মিলেট-ভিত্তিক খাদ্যকে যাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেই দিকে ধ্যান দেওয়া সময়োপযোগী । কারণ গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য মিলেটভিত্তিক পরিপূরক খাদ্যদ্রব্যগুলি খুবই পুষ্টিকর । আমরা জানি, খাদ্য-তালিকায় ফাইবার থাকা বিশেষ প্রয়োজন । এই ফাইবার গ্লোকোজ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । মিলেট, লিউসিনের একটি চমৎকার উৎস, এটা ধীরে ধীরে কার্বোহাড্রেট (এবং খনিজ পদার্থ) হজম করায়, যা পোস্ট-প্রান্ডিয়াল গ্লুকোজের মাত্রার আকস্মিক বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে । ফলে এটি ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য একটি পুষ্টিকর খাবার । চাল ও গমের মতো অধিক পরিচিত খাদ্যশস্যের তুলনায় মিলেটে অধিক পুষ্টিকর খাদ্যগুণ রয়েছে । মিলেট ক্যালশিয়াম, আয়রন এবং ফাইবারে ভরপুর যা একটি শিশুর বেড়ে উঠতে সাহায্য করে । আশার কথা, ছোটদের খাবারে মিলেটের ব্যবহারও ক্রমশ বাড়ছে ।
জোয়ার-বাজরা পুষ্টির এক ভাঁড়ার বলে সুবিদিত । দেশে অপুষ্টিকর সমস্যা ঘোচানোর জন্য ইদানীং জোয়ার-বাজরা খাওয়ার প্রচলনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে । এটা ঘটনা, আজকালকার মানুষ বেশি স্বাস্থ্য সচেতন । যার জন্য পুষ্টিকর জোয়ার-বাজরার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান । এককালে “গরীব মানুষের খাদ্যশস্য” বলে পরিচিত জোয়ার-বাজরার দাম ছিল খুব কম । তা ছাড়া চাল, ডাল, গম উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব আরোপ হওয়ায় দানাশস্যের উৎপাদনও কম ছিল । কিন্তু বর্তমানে দানাশস্যের ব্যবহারও ক্রমশ বাড়ছে । চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখি । তামিলনাড়ুতে দানাশস্য ব্যবহার করে তৈরী হচ্ছে দোসা, পোঙ্গল, রাভা দোসা, প্রভূতি । সাধারণত চাল থেকে দোসা তৈরী হয় । তবে দানাশস্য চাল ও গমের চেয়ে অধিক পুষ্টিসম্পন্ন । রুটি পরোটার ক্ষেত্রে আটা বা ময়দার বদলে মিলেটের পরোটা অনেক পুষ্টিকর । মিলেটের খাওয়ায় অনেক উপকার । মিলেটে প্রচুর ফাইবার থাকায় এটা ডায়াবিটিকদের জন্য ভীষণ উপকারী । এতে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিওক্সিডেন্টস রয়েছে । তাই এটাও কিন্তু ক্যানসারের মতো মারণ রোগ প্রতিরোধ করতে পারে ।
( ৩ )
বাংলাদেশেও মিলেটের চাষ দেখা যায় । বাংলাদেশের জীবনধারায় খাদ্য হিসেবে মিলেটের ব্যবহার নাকি খুব প্রাচীন কাল থেকে । সেই দেশের মানুষের খাদ্যাভাস বা নানান প্রথার সঙ্গে এই দানাশস্যের অনুষঙ্গ জড়িয়ে রয়েছে । তবে সেই দেশে ধান, গম ও ভুট্টার পরে চার নম্বরে স্থান দেওয়া হয়েছে মিলেট চাষকে । বাংলাদেশে মিলেটকে জোয়ার, বাজরা ছাড়াও চিনা বা কাউন বলে । মিলেটকে বাংলাদেশে জোয়ার বা সরগাম (Jower or Sorghum) , যব (Oat), চিনা (Proso millet), কাউন (Foxtail millet), ইত্যাদি নামে মানুষে জানে । বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সরগামের অপর নাম জোয়ার জানে । শুষ্ক এলাকার জন্য মানুষ ও পশুপাখির খাদ্য হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ । চিনা সাধারণত গরুর ঘাসের জন্য ব্যবহৃত হয় । যদিও বাংলাদেশের চিনার চাষ প্রাচীন কাল থেকে । বিশেষ করে পাবনা, টাঙাইল, জামালপুর, ফরিদপুর, জেলায় বেশী চাষ হয় । কাউন চাষ তুলনামূলক কম । কাউনের জাউ বা খিচুড়ি খুব জনপ্রিয় । তা ছাড়া গ্রামাঞ্চলে চাউনের ভাতও খেতে দেখা যায় ।
সবশেষে যেটা আমাদের জীবনধারা ও খাদ্যাভাস নিয়ে ভাববার বিষয়, সেটা হচ্ছে প্রয়োজনে জীবনধারা ও খাদ্যাভাস পর্যালোচনা করে তার পরিমার্জন করাটাও স্বাস্থ্যের নিরিখে অত্যন্ত জরুরি, বলা চলে সময়োপযোগী । সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম, পুষ্টিগুণসম্পন্ন, জল সাশ্রয়ী এই ফসলকে আরও উৎপাদনমুখি করে তুলতে উদ্যোগী হওয়া বাঞ্ছনীয় । যাতে মানুষ এই দানাশস্যের পুষ্টির সুফল অধিকমাত্রায় পেতে পারে । আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষকে মাথায় রেখে দেশের সুশীল নাগরিক সমাজ জোয়ার-বাজরা-রাগি ইত্যাদি শস্যের প্রতি নজর দিলে দানাশস্য পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে আবার ঘরে ঘরে মানুষের পাতে ফিরে আসবে । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত ও যোজনা-০১/২০২৩)
———০———–
লেখকঃ কথা সাহিত্যিক (ভারত)

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

কৃষ্ণ-ভক্ত বিরহ বিনা দুঃখ নাহি আর :::: রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।।।।।

গোদাবরী তটে শ্রীমন্ মহাপ্রভু রায় রামানন্দকে প্রশ্ন করেছিলেন, “দুঃখ মধ্যে কোন্ দুঃখ হয় গুরুতর ?’ রায় রামানন্দ তদুত্তরে বলেছিলেন- “কৃষ্ণ-ভক্ত বিরহ বিনা দুঃখ নাহি আর।।” নিরন্তর ভক্তসঙ্গে ভজনের যে পরিপাটী লাভ করা যায় তা যে কোন একজন সাধকের ঈপ্সিত লক্ষ্য। একজন পথচারী যখন দুর্গম বনপথ দিয়ে একা গমন না করে অনেকের সঙ্গে আলাপচারিতা, কথোপকথন বা হাস্য পরিহাসের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন, তখন তাঁর দস্যুভয় বা হিংস্র পশু আক্রমণের বিপদের সম্ভাবনা বহুলাংশে হ্রাস পায়।

তেমনই, সাধক যদি নিত্য উপযুক্ত ভক্তসঙ্গ করেন তখন সংসারের দস্যুতুল্য, পশুতুল্য কামনা-বাসনা, বিষয়-বাসনা বা কোন প্রকার ভজন অহংকার তাঁর মনে অযথা উপদ্রব হয়ে তাঁকে সাধন-পথভ্রষ্ট করতে পারে না। তাইতো শ্রীল নরোত্তম ঠাকুর মহাশয় বলেছেন- “করহ ভকত সঙ্গ, প্রেমকথা রসরঙ্গ, তবে হয় বিপদ বিনাশ।” ভক্তসঙ্গ করার দরুণ ভক্তে-ভক্তে হয় বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্ব আমাদের প্রাকৃত জগতের বন্ধুত্ব নয়। দিব্য অপ্রাকৃত বন্ধুত্ব হল তা। প্রাকৃত বন্ধুত্ব নশ্বর, ক্ষণিক। তা স্বার্থ সম্বন্ধের সুক্ষ্ম আবেশ মিশ্রিত হলেও হতে পারে। কিন্তু দুই ভক্তের ভিতর ভক্তিকে কেন্দ্র করে যে বন্ধুত্ব, তা নিত্য, সত্য, স্বার্থগন্ধহীন। কারণ, এই বন্ধুত্বে কৃষ্ণেতর বস্তুতে কোন কৌতূহল থাকে না। এই বন্ধুত্বের একমাত্র লক্ষ্য পরস্পরের নিকট হতে কৃষ্ণপ্রেমরস আস্বাদন, নিরন্তর একে অপরের সঙ্গে কৃষ্ণকথা আলাপন ও একত্রে নাম-সংকীৰ্ত্তন রূপ আনন্দ সমুদ্রে অবগাহন। কৃষ্ণ মাধুর্য আস্বাদনের লোভে এক ভক্ত যখন অপর ভক্তের সঙ্গ-সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে, তখন অচিরেই অমলিন, নিষ্পাপ, অপ্রাকৃত বন্ধুত্বের রূপ পায় তাদের উভয়ের অন্তরের টান। এরূপ বন্ধুত্ব সাধনের পরিপুষ্টি আনে। আর তাই সাধক এমন বন্ধুত্ব সঙ্গ প্রত্যাশা করে। তাই তো রামানন্দ রায় যখন মহাপ্রভুকে দশদিন গোদাবরী তীরে বাস করে তাঁকে সঙ্গ দিতে অনুরোধ করেন, তখন মহাপ্রভু বলেন- “দশদিনের কা কথা যাবত্‍ আমি জীব। তাবত্‍ তোমার সঙ্গ ছাড়িতে নারিব।। নীলাচলে তুমি আমি থাকিব এক সঙ্গে। সুখে গোঙাইৰ কাল কৃষ্ণকথা রঙ্গে।।” (চৈ. চ. / মধ্য/ ৮ম পরিঃ)।

কৃষ্ণকথা তো এ জগতে শুদ্ধকথা সার। সে অমৃত যতই পান করা যায় ততই তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায় আরও পানের। অদ্ভূত, অলৌকিক, অবিশ্বাস্য প্রভাব কৃষ্ণকথামৃতের। ভক্তমনকে জড়ীয় প্রপঞ্চের ভাবনা থেকে অপসারিত করে আনন্দলোকের মঙ্গলালোকে উদ্ভাসিত করে। পার্থিব লোক হতে হৃদয়কে উত্‍পাটিত করে কৃষ্ণলোকে রোপণ করে, যেখানে মাধুর্য্য-লাবণ্য বলতে যা , সব কিছুই কৃষ্ণকেন্দ্রিক। আর যা কৃষ্ণকেন্দ্রিক তা মায়াগন্ধহীন, কামকলুষমুক্ত। “কৃষ্ণ সূৰ্য্য সম মায়া হয় অন্ধকার। যাঁহা কৃষ্ণ তাঁহা নাহি মায়া অধিকার।। (চৈ. চ./মধ্য/২২পরিঃ)। তা সদানন্দময়, চিদানন্দময়। কৃষ্ণকথা শুরু হলে তা ভক্তমনকে এমন বিবশ করে যে, “সময় বহিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়” -তাও ভক্ত টের পায় না। এ কথার আবেশে ভক্ত কখনো হাসে কখনো কাঁদে, কখনো গায় আবার কখনো আনন্দের আতিশয্যে নৃত্যও করে ফেলে। ঠিক যেমন মহাপ্রভু আর রামানন্দ রায় টের পান নি। “এইমত দুইজনে কৃষ্ণকথা রসে। নৃত্য-গীত-রোদন হৈল রাত্রি শেষে।।” (চৈ .চ/মধ্য/৮ম পরিঃ)। তাইতো, এমন দিব্য আনন্দদানকারী বন্ধুত্বে যখন বিচ্ছেদ আসে তখন ভক্তের কাছে তা এক অপূরণীয় বিরাট ক্ষতি।
যখন ঠাকুর হরিদাস মহাপ্রভুকে জানান যে, তিনি এবার মৃত্যুবরণ করতে চান, যাতে মহাপ্রভুর অপ্রকটলীলার বেদনা তাঁকে সহ্য করতে না হয়। তখন মহাপ্রভু বলেন তিনিও ঠাকুর হরিদাসের মতো ভক্তসঙ্গের বিরহ বহন করতে কষ্ট পাবেন। “কিন্তু আমার যা কিছু সুখ সব তোমা লঞা। তোমা যোগ্য নহে, যাবে আমারে ছাড়িয়া।।” (চৈ. চ./ অন্ত্য/১২ পরিঃ)। কৃষ্ণভক্ত-বন্ধুর বিরহবেদনার জ্বালার উপশম হয় না সহজে। সেই দুঃখানুভূতির কোন তুলনা হয় না কোন কিছুর সাথে। সে অভাবের কোন পূরণ হয় না। এমনটা তো হয়েছিল শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামীর ক্ষেত্রেও। তাঁর এবং শ্রীল রূপগোস্বামীর ভিতর ছিল এমনই অপ্রাকৃত কৃষ্ণপ্রেমময় বন্ধুত্ব। মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পর যখন তিনি বৃন্দাবনে এসেছিলেন তখন তাঁর মনে মনে সংকল্প ছিল যে, বৃন্দাবনের লীলাস্থলী দর্শন করার পর গিরিরাজ গোবর্দ্ধন হতে ভৃগুপাতে জীবন বিসর্জন দেবেন। কারণ, তাছাড়া অন্য কোন উপায়ে মহাপ্রভুর কৃপা সঙ্গহীনতার মনোবেদনা নাশের পথ ছিল না তাঁর। কিন্তু ব্রজেতে আগমন করে যখন তিনি শ্রীরূপ-সনাতনের সান্নিধ্যে শ্রীব্রজধাম, গিরিরাজ শ্রীগোবর্ধন এবং শ্রীরাধাকুণ্ড দর্শন করলেন তখন তাঁর অন্তরের গৌরসুন্দর-বিরহের কিছুটা লাঘব হয়েছিল, উপশম হয়েছিল। তিনি শ্রীরাধাকুণ্ডের আশ্রয়তটে ভজনে নিমগ্ন হয়েছিলেন। শান্তি পেয়েছিলেন। অথচ, এই ব্রজধাম, এই গেবর্দ্ধন ,এই রাধাকুণ্ডই তাঁর কাছে ভয়াশ্রয়া, ভয়াল, অসহ্য মনে হয়েছিল শ্রীরূপ গোস্বামীর অপ্রকট হবার পর। তাঁর বিরহবেদনায় তিনি লিখেছিলেন-“শূন্যায়তে মহাগোষ্ঠং গিরীন্দ্রোহজগরায়তে। ব্যাঘ্রতুণ্ডায়তে কুণ্ডং জীবাতু রহিতস্য মে।।” অর্থাত্‍, শ্রীরূপ গোস্বামীপাদের বিরহে জীবন ধারণের উপায় স্বরূপ এই মহাগোষ্ঠভূমি আমার নিকট শূণ্য-শূণ্য প্রতিভাত হচ্ছে। শ্রীগোবর্দ্ধন যেন অজগরের ন্যায়। শ্রীরাধাকুণ্ড যেন ব্যাঘ্রের ন্যায় মুখব্যাদান করে বসে আছে, মনে হচ্ছে। মহাবিরহে চরম বিচ্ছেদে মর্মাহত হয়ে, অধীর হয়ে খেদ করে বলেছেন- “গৌরাঙ্গচন্দ্রমিহ রূপযুগং ন পশ্যান হা বেদনাঃ কহি সহে স্ফুটরে ললাটে।”-হায়! শ্রীগৌরাঙ্গচন্দ্র ও শ্রীরূপ-সনাতনকে না দেখে আর কত বিরহ সহ্য করবো ! ওরে ললাট, তুই শতধা বিদীর্ণ হয়ে যা!

ঠিক এমনই বন্ধুপ্রীতি ছিল ঠাকুর নরোত্তম এবং শ্রীনিবাস আচার্য্য ঠাকুরের শিষ্য শ্রীরামচন্দ্র কবিরাজের ভিতর। রামচন্দ্র কবিরাজ শ্রীমন্ মহাপ্রভুর পার্ষদ শ্রীচিরঞ্জীব সেনের পুত্র। পদকর্তা শ্রীগোবিন্দ কবিরাজের জ্যেষ্ঠ সহোদরও। তিনি মহাপণ্ডিত মহাকবি ছিলেন। আর মহাভক্ত তো বটেই। তাঁর সঙ্গে ঠাকুর মহাশয়ের বন্ধুপ্রীতি সম্পর্কে ‘ভক্তিরত্নাকরে’ ঠাকুর নরহরি চক্রবর্তী লিখেছেন- “রামচন্দ্র নরোত্তম দোঁহার যে রীত। আগে জানাইব এথা কহি সে কিঞ্চিত্‍।। তনু মন প্রাণ নাম একই দোঁহার। কবিরাজ নরোত্তম নাম-এ প্রচার।। নরোত্তম কবিরাজ কহে সৰ্ব্বজন। কথাদ্বয় মাত্র যৈছে নর-নারায়ণ।। রামচন্দ্র নরোত্তম বিদিত জগতে। হৈল যুগল নাম সবে সুখ দিতে।।”
নরোত্তম-কবিরাজের তনু-মন-প্রাণ অভিন্নতার একটি চিত্তহারী লীলা আছে। রামচন্দ্র কবিরাজ তখন খেতুরীতে ঠাকুর মহাশয়ের সান্নিধ্যে অবস্থনারত। তাঁর পত্নী রত্নমালাদেবী রামচন্দ্রকে একাধিকবার পত্রমারফত অনুরোধ করেন যে একটি বার অন্ততঃ দর্শনদান করে ধন্য করেন তিনি রত্নমালাদেবীকে। কিন্তু সংসারত্যাগী রামচন্দ্র কবিরাজের মন একটিবারের জন্যও সে অনুরোধে উচাটন হয়নি। তিনি নরোত্তম সঙ্গ ছাড়তে নারাজ। পরিশেষে রত্নমালাদেবী পত্র মারফত অনুরোধ করলেন ঠাকুর মহাশয়কে যাতে তিনি অন্ততঃ একটি বারের জন্য রামচন্দ্র কবিরাজকে গৃহে প্রেরণ করেন বুঝিয়ে। নরোত্তম ঠাকুর কবিরাজ মহাশয়কে বললেন-তিনি যেন সে দিনই দুপুরে প্রসাদ পেয়ে কুমারনগরে নিজের গৃহে যান আর পরদিন প্রভাতে ফিরে আসেন। বললেন , “আমার শপথ ইহা না করিহ অন্যথা। না করিলে, মনে আমি পাব বড় ব্যথা।।’ (গৌরভক্তামৃতলহরী-৮ম খণ্ড, শ্রীকিশোরী দাস বাবাজী)
রামন্দ্র কবিরাজ বেজায় দুর্বিপাকে পড়লেন। বন্ধু নরোত্তমের শপথ অন্যথা করতে পারবেন না আবার সংসারের মোহভরা ঘেরাটোপে এক মুহুর্তের জন্যও যেতে চান না নরোত্তম সঙ্গ ছেড়ে। চিত্ত বড় ব্যাকুল হল। শেষে, “কান্দিতে কান্দিতে প্রেমে করয়ে গমন। খেতুরি পানে একদৃষ্টে করি নিরীক্ষণ।।” (ঐ)। পত্নী সম্ভাষণে গেলেন কবিরাজ মহাশয় বান্ধবের শপথ রক্ষা করতে। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে কুমারগ্রাম ত্যাগ করে যখন খেতুরীতে প্রত্যাগমন করলেন তখন প্রভাত। পূজারী আরতি করছেন শ্রীমন্দিরে। তিনি একাধারে রাখা মার্জনী (ঝাড়ু)টি তুলে নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গন মার্জন করতে লাগলেন। কবিরাজ মহাশয় আড় চোক্ষে ঠাকুর মহাশয়কে দর্শন করে… নিজেকেই নিজে তিরস্কার করে বলতে লাগলেন, ‘হায়। আমি কী অধম চিত্তের অধিকারী। এখানকার এমন দিব্য সুখ আমার ভালো লাগলো না। আমি বহু সময় হেলায় নষ্ট করে এলাম কাল। ধিক্ আমায় ধিক্‌।’-এই প্রলাপ করেই তিনি নিজের পৃষ্ঠে নিজেই মার্জনী দ্বারা প্রহার করতে লাগলেন। অবিলম্বে নরোত্তম ঠাকুর তাঁকে বিরত করতে তাঁর হস্ত ধরে ফেললেন। বললেন, ‘আহা। করো কী, করো কী রামচন্দ্র! আমার যে বড় ব্যথা লাগলো। আর এমন কর্ম কোরো না। দেখতো কী করলে আমার অবস্থা।”-এই বলে নিজের পৃষ্ঠখানি রামচন্দ্রের সম্মুখে ধরলেন। আর রামচন্দ্র কবিরাজ দেখলেন তাঁর বান্ধব নরোত্তমের পৃষ্ঠ ফুলে গিয়েছে প্রহারে। নিজের পৃষ্ঠের প্রতিটি আঘাত নরোত্তম ঠাকুরের পৃষ্ঠে পড়েছে। সকল বেদনা তাঁর বান্ধব নিজের শরীরে ধারণ করেছেন। তখন উভয়ের ক্রন্দন আর থামে না। এমন বন্ধুপ্রীতি যে ইহজগতের ঘটনা নয়। ভাবের আবেশে ভাববিহ্বল তনু-মন-প্রাণ একাত্ম হয়ে ভূমিতে গড়াগড়ি করে বিস্তর ক্রন্দন করলেন। “দোঁহে গলাগলি কান্দে ভূমি গড়ি যায়। দুইজনে হেন প্রীতি জানে গোরারায়।।” (ঐ)।
{ ‘শ্রীগুরুকৃপার দান’ গ্রন্থে, শ্রীপাদ রামদাস বাবাজী মহাশয়ের শ্রীমুখ নিঃসৃত ‘শ্রীরামচন্দ্র কবিরাজের সূচক কীৰ্ত্তনে বলা হয়েছে- “শ্রীআচার্য্য প্রিয়তম নরোত্তম প্রাণ যেন / রামচন্দ্র কবিরাজ সেই। … গুরুবাক্যে নিষ্ঠা তাঁর (রামচন্দ্র-র) ত্রিভুবনে পরচার/ এই বাক্য হয় সুপ্রমাণ…. যদি গুরুপদে হয় রতি তুলনা নাহিক কতি/ শুনহ সে অপূৰ্ব্ব কথন/ একদিন শ্রীআচার্য্য /আদেশিলেন রামচন্দ্রে/ রামচন্দ্র একবার যাও/সম্ভাষণ করে এস/বিবাহিতা পত্নীসনে সম্ভাষণ করে এস./…… অপূর্ব রহস্য কথা…../ সারা নিশি করলেন আলাপন …. শ্রীগুরু-গৌর লীলা প্রসঙ্গ সারা নিশি করলেন আলাপন… নিশি পরভাত হল…. শ্রীগুরুসেবার সময় হয়েছে। চলিলেন ত্বরা করে……/ শ্রীযাজিগ্রামের পথে এসে মনে হল/ প্রভু আজ্ঞা করেছিলেন…./পুনঃরায় ফিরে গেলেন/সম্ভাষণ করলেন/রামচন্দ্রের পুরুষ অভিমান নাই / সেই স্বভাবে রামচন্দ্র করিলেন আলিঙ্গন/লাগিল রামচন্দ্র ললাটে/প্রিয়ার সিঁথির সিন্দুর লাগিল রামচন্দ্র ললাটে/ উপনীত যাজিগ্রামে/তখন নরোত্তম করছিলেন আঙ্গিনা মার্জ্জন/জিজ্ঞাসেন রামচন্দ্রে/ কোথা গিয়েছিলে বা এখন বা যাও কোথা / পত্নী সম্ভাষণে গিয়েছিলাম/ এখন যাই শ্রীগুরুসেবায় /(তখন) নরোত্তম আঘাত করলেন রোষভরে/রামচন্দ্রের পৃষ্ঠদেশে আঘাত করলেন রোষভরে/ সম্মার্জ্জনী লয়ে করে আঘাত করলে রোষভরে/…. আবার মধ্যাহ্নে নরোত্তমের সেবা/ করিতেছিলেন তৈল মৰ্দ্দন/শ্রীনিবাস আচার্য্যের পৃষ্ঠ-দেশে করিতেছিলেন তৈল মৰ্দ্দন/অকস্মাত্‍ দেখতে পেলেন/আচার্য্যের পৃষ্ঠ-দেশে অকস্মাত্‍ দেখতে পেলেন/আচার্য্যের পৃষ্ঠ-দেশে মার্জ্জনীর আঘাত অকস্মাত্‍ দেখতে পেলেন/মনে মনে ভাবলেন /কার অঙ্গে আঘাত করেছি/ এ তো নয় রামচন্দ্রের দেহ/নরোত্তম ব্যাকুল হলেন/অপরাধ স্খালন লাগি/ নরোত্তম করলেন মনে/এ হাত পোড়াব আগুনে নরোত্তম করলেন মনে … সে ভাব বুঝে আচার্য্য বলেন মনে মনে……এ দেশে বিচার নাই বাপ রে বাপ। দিনে মারে ঝাঁটার বাড়ী রাত্রে পোড়ায় হাত।।/কি সুমধুর লীলা রে/বালাই লয়ে মরে যাই/শ্রীগুরুসেবার আদর্শ শ্রীরামচন্দ্র/ শ্রীগুরুপদে আত্ম-সমর্পণের আদর্শ শ্রীরামচন্দ্র/বিকালে তাঁর পদতলে সর্ব্বোত্তমা গতি মিলে……}

এমনই হরিহর আত্মা ছিলেন নরোত্তম-কবিরাজ। যখন শ্রীনিবাস আচার্য্য শিষ্য রামচন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে বৃন্দাবনে গমন করলেন তখন ঠাকুর নরোত্তমের বিপ্রলম্ভ ভাব অর্থাত্‍ বিরহ ভাব আর চক্ষে দেখা যেত না। তিনি তাঁর প্রেমস্থলী নামক ভজন স্থানে ভূমিতে পড়ে অহর্নিশি বুকফাটা রোদন করতেন। বিশ্বে তাঁর মতো বন্ধুবিরহীকে সান্ত্বনাদানের কোন বস্তু বা ভাষা ছিল না। সব শূণ্য তাঁর কাছে তখন। বিরহালনে দগ্ধ হৃদয় হয়ে কী মর্মবিদরী পয়ার লিখলেন-‘রামচন্দ্র কবিরাজ সেই সঙ্গে মোর কাজ /তাঁর সঙ্গ বিনা সব শূণ্য। যদি হয় জন্ম পুনঃ তাঁর সঙ্গ হয় যেন /তবে হয় নরোত্তম ধন্য।। (প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা-১১৮)। এখানে ‘সেই সঙ্গে মোর কাজ’ বলতে রামচন্দ্র কবিরাজের মতো ভক্তবন্ধুর সঙ্গপ্রসঙ্গে তিনি যে ভগবত্‍মাধুরী ও কৃষ্ণপ্রেমরস আস্বাদন করতেন তার কথা বলেছেন। আবার নিজের প্রেমভক্তির প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে, ভক্তির অতৃপ্তি স্বভাববশতঃ যারপরনাই দৈন্য ভরে ভেবেছেন হয়তো তাঁকে আবার জন্ম নিতে হবে। আর তখন যদি রামচন্দ্র কবিরাজের মতো ভক্তের সঙ্গ পান তখনই তাঁর জীবন ধন্য হবে। তাঁর পুনঃ প্রার্থনাতেও তাঁকে লিখতে দেখা যায় “রামচন্দ্র সঙ্গ মাগে নরোত্তম দাস।” এ হেন অন্তরে সুহৃদ, পরমপ্রেমিক রামচন্দ্র। কবিরাজের মতো বান্ধব-বিরহে শ্রীল নরোত্তম ঠাকুর তাই লিখেছেন– “তাঁর সঙ্গ বিনা সব শূণ্য ।’ তাইতো — “কৃষ্ণ-ভক্ত বিরহ বিনা দুঃখ নাহি আর” ।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

জানুন, বজ্রবিদ্যুত্‍ মাথায় নিয়েও কেমন করে প্রাণকৃষ্ণ বাবা ভাগবত কথা বলতে থাকলেন।।।

জানুন, বজ্রবিদ্যুত্‍ মাথায় নিয়েও কেমন করে প্রাণকৃষ্ণ বাবা ভাগবত কথা বলতে থাকলেন…… রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক.. . শ্রীপ্রাণকৃষ্ণ দাস বাবাজী মহারাজ প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামীর শিষ্য। ত্রিপুরা জেলার ভবানীপুর গ্রামে দেবশর্মা বংশে জন্মগ্রহণ করেন প্রাণকৃষ্ণ দাস বাবাজী। পিতার নাম দীননাথ ও মাতা রেবতীদেবী।

বৈশাখ মাসে শুভ পূর্ণিমা তিথিতে আবির্ভূত হন তিনি। বিদ‍্যাধ্যয়নেও গভীর মনোযোগী ছাত্র ছিলেন । অকস্মাত্‍ মাতৃবিয়োগ হয় কিশোর বয়সে। পিতার বাত্‍সল‍্যে বড় হতে থাকেন।
দৈবেচ্ছায় একদিন স্বপ্নে গিরীধারীর দর্শন পেলেন। আর তবে থেকেই মনের সুপ্ত ভজন সংস্কারের উদ্গম হল। মন সর্বক্ষণ উচাটন থাকে কতদিনে সাক্ষাত্‍ভাবে সেই নয়নাভিরাম ব্রজেন্দ্রনন্দনের দর্শন পাবেন এই ভাবাবেগে। বিধি কৃপাময় হলেন। দর্শন পেলেন তিনি প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামীপাদের। দর্শন মাত্র আত্মসমর্পণ করে দিলেন প্রভুপাদের পদারবিন্দে। মনে হল এই তো সেই ঈপ্সিত ধন, যাঁর জন্য এত ব‍্যাকুলভাবে অপেক্ষা করছিলেন এতকাল। তাঁর অস্থির মন সুস্থির হল। মন বলতে থাকলো, এই তো সেই যোগ্য কান্ডারী, যিনি তাঁকে অনায়াসে ভবনদী পার করে গিরিধারীর নিত‍্যদেশে নিয়ে যাবেন।
সেসময় প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী নদীতে স্নান করছিলেন। আর প্রাণকৃষ্ণ বাবা খেয়া-পারাপার করে এপারে আসছিলেন। তিনি নৌকা থেকেই দেখলেন স্নানরত প্রভুপাদকে। নৌকা থেকে নেমে অপেক্ষা করতে থাকলেন কতক্ষণে প্রভুপাদ স্নান করে নদী থেকে উঠে আসবেন। যে মুহুর্তে তিনি সিক্ত বদনে উঠে এসেছেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা লুটিয়ে পড়লেন তাঁর চরণে। কিশোর প্রাণকৃষ্ণের লাবণ্যময় অঙ্গ, শান্ত ভাব, অপরূপ কান্তি, তেজোময় দীপ্তি দেখে মন ভরে গেল প্রভুপাদের। তিনি নাম, পরিচয়, দেশ, কী কারণে আগমন সব একে একে ধীরে ধীরে জানলেন। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন নিজের আলয়ে। তাঁর মাতা তথা শ্রীগুরুদেবী সারদা সুন্দরী দেবীর কাছে অর্পণ করলেন। বড়মাতাও প্রাণকৃষ্ণের ভাব দেখে প্রসন্ন হলেন তাঁর প্রতি। প্রভুপাদের গৃহেতেই প্রাণকৃষ্ণ থাকতে লাগলেন। প্রাণকৃষ্ণ বাবা নিজের অভিলাষের কথা ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন। অর্থাত্‍, তিনি যে প্রাণগোপাল প্রভুর পদাশ্রয় করে ভজন পরায়ণ হতে চান তা জানিয়েছেন। নিবেদন করেছেন দীক্ষা প্রদানের জন্য। বড় মাতা সারদা সুন্দরী দেবীর সন্তান যেমন প্রভুপাদ, তেমন শিষ্যও আবার।তাই বড়মাতা সব শুনে হাসলেন।
বড় মাতা একদিন প্রাণগোপাল প্রভুপাদকে আদেশ করলেন দীক্ষা অর্পণ করতে প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। তিনি বললেন, “প্রাণগোপাল, তুমি প্রাণকৃষ্ণকে দীক্ষা দাও। আমি ওর মধ্যে মহাজনসুলভ চিহ্ন দেখতে পেরেছি। সদা অনুরাগী ভক্ত সে। সেবা অভিলাষী। ভোগে বিন্দুমাত্র আশা নেই। বৈরাগ্য ভাব ওর। আমার বিশ্বাস এ তোমার উপযুক্ত শিষ্য হবে। তোমার মুখোজ্জ্বল করবে একদিন। তুমি একে অঙ্গীকার করে নাও।”
মাতার আদেশ পেয়ে হৃষ্টমনে এক শুভদিনে যুগলমন্ত্রে দীক্ষা দিলেন প্রাণগোপাল প্রভু প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। তিনি আত্মসাত্‍ করে নিলেন তাঁকে। আর প্রাণকৃষ্ণ বাবা তো প্রথম দিনই দর্শন মাত্র আত্মসমর্পণ করেছিলেন, এখন দীক্ষা মন্ত্র পাবার পর বাহ‍্যজ্ঞানশূন্য হয়ে কায়মনোবচনে সেবা শুরু করলেন সর্বভাবে দ্বিধাহীন চিত্তে। তাঁর নিষ্ঠাভক্তি দেখে বড় মাতা সারদা সুন্দরী দেবীও শক্তি সঞ্চার করে দিলেন আপন প্রশিষ্যকে। আর প্রভুপাদ প্রাণগোপালের তো কথাই নেই। তিনি সর্বশক্তি উজাড় করে দিলেন প্রিয় শিষ্য প্রাণকৃষ্ণকে। তাঁর কাছে থেকেই নিত্য, বাদ্য, গীত শিক্ষা করলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। প্রভুপাদের কাছে ভক্তিগ্রন্থ অধ্যয়ন করে পাণ্ডিত্য অর্জন করলেন। মহানন্দে ভজন করতে থেকে ভজনানন্দী হলেন।
এমন করে বহুকাল কাটলো। তারপর একসময় প্রাণগোপাল প্রভুর থেকে আদেশ পেয়ে নবদ্বীপ ধাম ভ্রমণ করে তীর্থ পর্যটনে বের হলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। নানা তীর্থ দর্শন করে, উপনীত হলেন বৃন্দাবনে রাধাকুণ্ডতটে। সেখানে তখন ভজন করতেন সিদ্ধ বাবা গৌরকিশোর মহারাজ। তিনি কোন শিষ্য করতেন না। সদা নিগূঢ় ভজনানন্দী মহাত্মা। তাঁর গুণগাথা ভক্ত মুখে শ্রবণ করে একদিন তাঁর চরণ দর্শন করতে এলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। তাঁকে দর্শন করে, নিত্য সঙ্গ-সান্নিধ্য লাভ করে এত অনুপ্রাণিত হলেন যে, তিনি গৌরকিশোর বাবার কাছে বেশাশ্রয় ভিক্ষা করলেন। নিত্য তাঁর নিষ্ঠাভরা সেবায় গৌরকিশোর বাবার চিত্ত ততদিনে করুণায় সম্পৃক্ত হয়ে গেছে তাঁর প্রতি। কিন্তু, তিনি যেহেতু শিষ্য করেন না তাই প্রথমে সম্মত হননি। অবশেষে প্রাণকৃষ্ণ বাবার নিষ্ঠা, কাকুতি-মিনতি, আর্তির কাছে বশীভূত হলেন।
প্রাণকৃষ্ণ বাবার দু’নয়ন দিয়ে অবিরাম প্রেমাশ্রু ঝড়তো। সুখ-দুঃখ বলে কোন ব্যাপার ছিল না। সদা-সর্বদা গৌরনাম নিতেন। অনন‍্য রতি তাঁর ছিল শ্রীগৌরাঙ্গের পদে। তাঁর অনুরাগ দেখে ভেকপ্রদানে আর অরাজী থাকতে পারলেন না গৌরকিশোর বাবা। তিনি ভেকপ্রদান করলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। ভেকাশ্রয়ী হয়ে প্রাণকৃষ্ণ বাবার প্রেমানুরাগ আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেল। গৌরকিশোর বাবার কৃপা শক্তিতে না জানি কী বল পেলেন ভজনে তিনি, কখনো হাসেন, কখনো কাঁদেন, অদ্ভুত প্রেম প্রকাশ পেল তাঁর মধ্যে। অনুক্ষণ বাবা মহারাজের সেবায় তিনি নিমজ্জিত থাকেন । বাবা মহারাজও মহা প্রসন্ন হন এহেন প্রেমানুরাগী, নিষ্ঠাবান, সেবাপরায়ণ শিষ্য পেয়ে।
অবশেষে একদিন গৌরকিশোর বাবার থেকে অনুমতি নিয়ে মহা উদাসীন প্রাণকৃষ্ণ বাবা তীর্থ পযর্টনে যাত্রা করলেন। করঙ্গ-কৌপীন, ছেড়া কাঁথা সঙ্গে নিয়ে, ছিন্নবাস পরিধান করে প্রাণকৃষ্ণ বাবা ভ্রমণ করতে থাকলেন। যেখানে সেখানে রাত কাটান, কখনো ভক্ষণ, কখনো উপবাসে থাকেন, কখনো নৃত‍্য-গীত করেন, কখনো বা হুঙ্কার পারেন, কভু দ্রুত পদচারণা, তো কখনো অতি ধীরে যাত্রা। প্রেমেতে সদা তাঁর টলমল দশা, ভাবাবেশে বিহ্বল তিনি। এভাবে নানা তীর্থ ভ্রমণ করে এবার উদ্দেশ্য দ্বারকায় গমন। কত নদী, কত পাহাড় অতিক্রম করে, কত জনপদ পিছু রেখে অবশেষে শ্রীমতীর ইচ্ছায় তিনি পথভ্রষ্ট হলেন। দ্বারকার পরিবর্তে উপনীত হলেন মরুভূমির দেশে। তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন ছিলেন। বহু পরিশ্রমে মরুভূমি অতিক্রম করে সিন্ধুর দর্শন পেলেন। দু’জন তো ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণ বাবা প্রেমাবেশে চলতে চলতে সেই দুর্লঙ্ঘ্য পথের যাত্রায় থেকে গেলেন। তৃষ্ণায় আকুল হয় প্রাণ। জলের দেখা কোথাও পাবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু, রাধারাণীর কৃপায়, অবশেষে জলের সন্ধান পেলেন সেই মহা মরুভূমিতেও। বাবা এক খেজুর বৃক্ষের যত্‍সামান্য ছায়ায় বসে যখন ক্লান্ত-অবসন্ন দেহে ভাবছেন যে এবার বুঝি প্রাণ চলে যাবে জলতেষ্টায়, তখন দেখেন অদূরে কিছু ভাটপত্র পড়ে আছে। তিনি সেই ভাটপত্রের কাছে কী মনে হতে গেলেন। আর ভাটপত্রের কাছে যেতেই দেখেন সেটি আসলে এক জলকুন্ড। সুশীতল বারিতে পরিপূর্ণ সেই কুন্ড। কুন্ডের বারিতে স্নান-পান করে তখন তাঁর জীবনরক্ষা হল শ্রীমতীর কৃপায়। দেহের ক্লান্তি দূরীভূত হলে আবার যাত্রা শুরু করলেন শ্রীগৌরচরণ স্মরণ করে। গৌরনাম করেন, গৌরপদ ধ্যান করেন আর পদব্রজে চলতে থাকেন।
চলতে চলতে তিন দিন অতিক্রান্ত হল আরও। উপবাসে অনাহারে আছেন। পেলেন এক মহাবন পথে। সেই দুর্গম বনপথে চলে চলেছেন। হঠাত্‍ দেখলেন সুবিশাল বৃক্ষের তলায় এক মহাযোগী বসে আছেন। অতি দীর্ঘ জটা তাঁর, অপরূপ অঙ্গকান্তি, বিপিন ঝলক বপু থেকে, দর্শনেই মন-প্রাণ হরণ হয়ে যায়। আশ্চর্য হলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা তাঁকে দেখে। অমন দুর্গম বনে একাসনে বসে সাধনা করে চলেছেন দিবারাত্র ! তিনি প্রণত হলেন, স্তব-স্তুতি করে সেখানে করজোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে যোগী বাবার ধ্যান ভাঙ্গার অপেক্ষা করতে থাকলেন। এক সময় চোখ খুললেন যোগী বাবা। তিনি বললেন, “এই গভীর বনে তো কোন মানুষ আসে না, ঢোকে না। তুমি কী ভাবে এলে?” প্রাণকৃষ্ণ বাবা বললেন আমি তীর্থ দর্শন করতে বেরিয়ে ভ্রমণ করতে করতে এখানে এসে পড়েছি। জানি না এ স্থান কোথায়, কী নাম! যোগীবর বললেন, “আমি এখানেই বারো বছর ধরে সাধনা করছি। এই প্রথম কোন মানুষের দেখা পেলাম। আচ্ছা, তুমি ক্ষিদেতে কষ্ট পাচ্ছ তো! যাও, ওখানে এক কূপ আছে , স্নান করে আসো।”
প্রাণকৃষ্ণ বাবা যোগীবরের কথা মতন স্নান করে এলেন। যোগীবর ধ্যান করে এক কামধেনু আনালেন। কামধেনুর বাটের তলায় পাত্র পেতে দিতে আপনা থেকে সে পাত্র দুগ্ধপূর্ণ হয়ে গেল।যোগীবর সে পাত্র অর্পণ করলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। বাবা পান করতেই দেহের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়ে মহাবল ফিরে পেলেন যেন । তবে পানের আগে যোগীবরকেও সেধেছিলেন তিনি।তখন যোগীবর জানান যে তিনি সন্ধ্যার সময় পান করবেন, তার আগে পান করেন না। সেদিন সারারাত কৃষ্ণকথা রসে মজলেন তাঁরা দু’জন। পরদিন প্রভাতে যোগীবর পথ বলে দিলেন। সেই পথে যাত্রা শুরু করলেন আবার প্রাণকৃষ্ণ বাবা। তিনি মহানন্দে গমন করতে করতে যখন পিছন ফিরে আবার একবার যোগীবরকে দর্শন করে নিতে গেলেন শেষবারের মতন, দেখেন কোথায় কী! সব উধাও! যোগীবর আর নেই সেই স্থানে। এমনকি সেই মহা বিশাল বটবৃক্ষও নেই। ক্ষণিকের মধ্যে অন্তর্দ্ধান করেছে সব‌। অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা এ ঘটনায় ।
নানান ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে তিনি পথ দিয়ে যাচ্ছেন। যেতে যেতে হঠাত্‍ দেখেন বিশাল এক দীর্ঘ দেহের বাঘ বসে সামনে। হঠাত্‍ করে চোখে পড়ায় প্রথমে তিনি চমকে ওঠেন স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু পরমুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে যেই না তিনি “জয় নিত্যানন্দ” বলে এক হুঙ্কার পেরেছেন, অমনি বাঘ লম্ফ দিয়ে সে স্থান ত‍্যাগ করে পালিয়েছে প্রাণভয়ে। নিতাই নামের ধ্বনির এমনই মাহাত্ম্য। নাম মহিমার প্রমাণ পেলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। তিনি নামানন্দে মজে নিশ্চিন্তে আবার যাত্রা করতে থাকলেন। এবার নির্বিঘ্নে নিরাপদে এক লহমায় বনপথ অতিক্রম করে ফেললেন যেন তিনি। প্রেমভরে নাম নিতে নিতে কখন যে বনপথ পার করে ফেলেছেন বুঝতেই পারেন নি। দেখলেন অনতিদূরে এক জনবসতি।
গ্রামে পৌঁছে জানালেন, সেখানে নিকটে এক সাধু থাকেন। লোকমুখে প্রশংসা শুনে তাঁর কাছে গেলেন। তিনি সারাদিন গুহায় বসে ধ‍্যান করেন, আর সন্ধ‍্যের পর গুহা থেকে বেড়িয়ে এসে গভীর বনে প্রবেশ করে যান। সাধু কুটিয়া থেকে বেড়োতেই প্রাণকৃষ্ণ বাবা দন্ডবত্‍ প্রণাম করলেন। অনেক স্তব-স্তুতি করলেন। তারপর নিবেদন করলেন, “বাবা, আমাকে একটু কৃপা করুন, যাতে আমি ভজন পথে অগ্রসর হতে পারি।” সাধু বাবা বললেন, “কৃপা চাও! তবে যাও ঐ কুয়োতে ঝাঁপ দাও।” এই বলে অঙ্গুলি নির্দেশ করে পাশের একটি কুয়ো দেখিয়ে দিলেন। আর তার মুখের বাক্য শেষ হওয়া মাত্র প্রাণকৃষ্ণ বাবা গিয়ে কুয়োতে ঝাঁপ দিলেন। কুয়োর গভীর জলের মধ্যে পড়ে প্রভু যখন ছটফটাচ্ছেন, দেখলেন কুয়োর মধ্যে শূন‍্যপথে ভাসছেন সাধুবাবা। সাধুবাবা হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবাকে। কুয়োর বাইরে এনে নিজের গুহার মধ্যে প্রবেশ করতে দিলেন বাবাকে। তারপর বন থেকে আনা কন্দ খেতে দিলেন। সে কন্দ খেয়ে এক অদ্ভুত ব‍্যাপার ঘটেছিল। টানা সাতদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিছু পেয়েছিল না প্রাণকৃষ্ণ বাবার। প্রেমে মত্ত ছিলেন। সেদিন সারারাত্রি কৃষ্ণকথা আলাপ করে কাটলো। প্রভাত হতে আবার বাবা যাত্রা শুরু করেন। সাধুবাবাই পথনির্দেশ করে দিয়েছিলেন এক মন্দিরের। সেই পথ ধরে যেতে যেতে একসময় দর্শন পেলেন এক বিপ্রের। প্রাণকৃষ্ণ বাবা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আর কতদূর গেলে মন্দির দর্শন হবে। বিপ্র বললেন, “আর বেশী দূরে নেই। আপনি ধৈর্য ধরে আর কিছু পথ গেলেই দর্শন পাবেন। আমি তো ওই মন্দিরেরই পূজারী। পূজা দিয়ে ফিরছি। নিন্ প্রসাদ খান।” এই বলে প্রাণকৃষ্ণ বাবার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটি লাড্ডু। ভগবানের প্রসাদ পেয়ে মহানন্দিত হলেন বাবা। দিব‍্য সে প্রসাদের সুগন্ধ এমন যে মন-প্রাণ হরণ করে নেয়। নানা ভাবের স্ফূরণ হল তাঁর প্রসাদ পেতে পেতে। এরপরই তিনি পিছনে ফিরে দেখেন বিপ্র নেই আর। বিস্মিত হলেন তিনি, ভাবলেন তবে কী পেয়েও হারালাম আমার ইষ্টদেবকে!” তিনি সত্বর মন্দিরের পথে পা বাড়ালেন। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও বিপ্রের কোন সংবাদ পেলেন না। শ্রীমন্দিরে বিগ্রহ দর্শন করে আবার যাত্রা শুরু করলেন। এভাবে তাঁর চলার পথে নানাভাবে দয়াময় শ্রীকৃষ্ণ কৃপা করেছেন কখনো অলক্ষ্যে কখনো বা অন্য রূপ ধরে এসে।
চলতে চলতে প্রাণকৃষ্ণ বাবা পুনরায় ফিরে এলেন বৃন্দাবনের কুণ্ডতটে। শ্রীরাধাকুণ্ডতটে গভীর সাধনায় মগ্ন হলেন তিনি টানা পাঁচ বছর। কেবলমাত্র বৃক্ষের পত্র ভক্ষণ করে কাটিয়ে অষ্টকালীন লীলা স্মরণ করে ভজন করেছেন। পাঁচ বছর পর বৃন্দাবনের সকল মহিমাময় স্থানে কুঞ্জে-কুঞ্জে বিহার করেছেন। সকল লীলাস্থলী দর্শন করেছেন একে একে। প্রতিটি গ্রামে গেছেন যেখানে যেখানে যুগল লীলা করেছেন, আর দৈন্য ভরে প্রার্থনা করেছেন যাতে তাঁরা প্রকট হয়ে দর্শন দেন তাঁকে।
বৃন্দাবনের বন ভ্রমণ করতে করতে একসময় মিলন হল পরম রসিক কৃপাসিন্ধু মহারাজের সঙ্গে। রসিক রসিককে পেয়ে মহারসের পারাবার উথলিত হল। উভয়ে ইষ্টগোষ্ঠী করে দারুণ সুখে দিন কাটাতে থাকলেন। এদিকে প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী জানতে পারলেন যে তাঁর প্রিয় শিষ্য বৃন্দাবনে ফিরে এসেছে। তিনি অবিলম্বে নিজে গিয়ে কৃপা করে দেখা দিলেন শিষ্যকে। বললেন, “প্রাণকৃষ্ণ, আর মনে দ্বিধা না রেখে আমার আজ্ঞা শিরে নিয়ে এবার তুমি বঙ্গদেশে গমন কর। জানোতো, ধন অনেক উপার্জন করার পর যদি ধনবান তাঁর ধন দীনজনকে না বিতরণ করে, তবে তা কৃপণের কর্ম হয়। তুমি প্রেমধনে ধনী হয়ে গেছো অনেক। এবার তো তোমার বিতরণ করার পালা। নিত‍্য একা একা প্রেমফল খাবে, অপরকে দেবে না, তা তো উচিত্‍ কর্ম হবে না ! সুধীজনেরা অন্যকে ভোজন করিয়ে নিজে সুখী হয়। কেউ আচার করে, কেউ বা প্রচার করে। তুমি আচার-প্রচার দুটোই কর এবার একসাথে। স্বয়ং শ্রীগৌরাঙ্গ আদেশ দিয়েছেন যে, নিজে খাও, অপরকে প্রেমফল বিলাও। এবার তো মহাপ্রভুর আদেশ পালন করতে হবে তোমায়।”
প্রাণকৃষ্ণ বাবা তখন বললেন, “আমি কী পারবো!”
প্রভু প্রাণগোপাল গোস্বামীপাদ বললেন, “কেন পারবে না! আমি তোমায় কৃপাশীষ করছি তুমি অতি সহজেই সকলকে প্রেমে ডোবাতে পারবে।”
শ্রীগুরুআজ্ঞা মেনে প্রাণকৃষ্ণ বাবা বঙ্গদেশে ফিরে এলেন। তিনি প্রভুপাদের সঙ্গেই নানা স্থানে বিহার করে নাম-প্রেম প্রচার করতে থাকলেন। কত পাষন্ডী, কত তার্কিক উদ্ধার হল। গৌরগুণগানে মত্ত হল লোকে। মায়া-মোহে আচ্ছন্ন কত লোক ভক্তিপথের সন্ধান পেল বাবার ভাগবত ব‍্যাখ‍্যা শ্রবণ করে, তাঁর সঙ্গে নামে মজে। বাবা নিজে কেঁদে অপরকে কাঁদালেন। নিজের শক্তিবলে বিশুদ্ধ ভক্তির সন্ধান দিয়ে ধন‍্য করলেন কত মানুষের ভজন জীবন।
অনেক বত্‍সর পর আবার এলেন বৃন্দাবন ধাম। শ্রীল লোকনাথ গোস্বামীর চরণ সমীপে থাকলেন। শ্রীরাধাবিনোদ দর্শন করে বশীভূত হলেন বিগ্রহের প্রেমে। এরপর গেলেন গোকুলানন্দ ঘেরায়। সেখানে ভেটনামায় ঘর নিয়ে নীলু ভক্ত ও অন‍্যান‍্য ভক্তদের সঙ্গে একসাথে বিহার করলেন। কিছুদিন কাটালেন সেখানে। এরপর এলেন গোপেশ্বর মহল্লায়। সেখানে ভক্তিকুঞ্জের প্রকাশ করলেন। সদা নাম-পাঠ-গানে ব‍্যস্ত থাকেন। অযাচিত ভাবে প্রেম প্রদান করেন স্ত্রী-পুরুষ, শূদ্র-ব্রাহ্মণ নির্বিশেষে সকলকে। তিনি পূর্ববঙ্গের যশোহর, খুলনা, নোয়াখালি, ত্রিপুরায়, পশ্চিমে নানা স্থানে প্রেমপ্রদান করেছেন। গৌরপ্রেম প্রচার করেছেন। শ্রীগুরু বলে বলীয়ান প্রাণকৃষ্ণ বাবা পুনরায় বৃন্দাবনে আসেন। পাথর পুরায় এসে ভক্তি মন্দির প্রকাশ করলেন। শ্রীমদনগোপাল বিগ্রহের সেবার প্রারম্ভ করলেন। প্রতিবছর সেখানে মহা মহোত্‍সব করতেন, ঝুলন যাত্রা ও অন‍্যান‍্য তিথি পালিত হত। চৌষট্টি মোহান্তের ভোগ লাগতো। কতশত বৈষ্ণবরা উপস্থিত হতেন সেসকল মহোত্‍সবে। পরম যত্নে বৈষ্ণব সেবা করে কৃতকৃতার্থ হতেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা।
অনেককাল পরে এলেন বঙ্গদেশের কুমারহট্টে শ্রীগৌরাঙ্গের শ্রীগুরুদেব শ্রীঈশ্বরপুরী পাদের জন্মভিটায়। সেই স্থানে তখন শ্রীমন্ মহাপ্রভুর শ্রীহস্তে খোদিত চৈতন‍্যডোবা। ‘মম জীবন প্রাণ’ বলে পুরীজীর জন্মভিটাকে স্তুতি করেছিলেন মহাপ্রভু –একথা জেনে ব্যাকুল প্রাণে চৈতন্যডোবা দর্শন করতে এসেছিলেন প্রাণকৃষ্ণ বাবা। সেস্থানে এসে দেখেন অরণ্যে আবৃত্ত চারিপাশ, লুপ্ততীর্থ প্রায়। কীভাবে জন্মভিটার সন্ধান পাবেন! শুরু করলেন সংকীর্তন। যে স্থানে চৈতন্যডোবাটি ছিল সেই স্থানে কীর্তন কালে অন্তরে মহাপ্রভুর নির্দেশ পেলেন। প্রাণকৃষ্ণ বাবা অনুভব করলেন যে, ওই স্থানেই ছিল পুরীজীর জন্মভিটা। সেই স্থান তিনি ক্রয় করে নিলেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজ হাতে জঙ্গলাদি পরিষ্কার করে জমি সংস্কার করলেন। তারপর মন্দির স্থাপন করলেন। মন্দিরে শ্রীরাধাবিনোদসহ নিতাই-গৌর বিগ্রহ স্থাপন করলেন। প্রেম সেবার সূচনা করে শিষ্য-ভক্তদের নিয়ে উত্‍সব করলেন। সেবার পরিপাটি দেখে আঁখি জুড়িয়ে যায়। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণা তৃতীয়া দিবসে গৌর আগমন স্মরণোত্‍সবের আয়োজন করতেন। অত্যাদ্ভুত কীর্তন লীলা, নৃত্য-গীত যাঁরা দেখতেন, শুনতেন, অংশগ্রহণ করতেন ধন্য হয়ে যেতেন। সারা বত্‍সরের সকল ব্রত, তিথি মহোত্‍সব পালন হত শ্রীমন্দিরে নিষ্ঠা ও প্রেমসহ।
ইতিমধ্যে প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী গুরুতর অসুস্থ হলেন। শিষ্য প্রাণকৃষ্ণ বাবা সবিনয়ে সে রোগ গ্রহণ করতে চাইলেন। তিনি বললেন, “প্রভু আপনি রোগে কষ্ট পাবেন, আর আমি এই রোগহীন হয়ে সুখে ঘুরে বেড়াব এ কখনোই হতে পারে না। আমি আপনার শিষ্য, তাই আপনার বোঝা বহন করার দায়িত্ব আমার। আপনি কৃপা করে অধিকার দিন।” এরপরই প্রাণগোপাল প্রভু সুস্থ হয়ে যান আর প্রাণকৃষ্ণ বাবা সেই রোগে অসুস্থ হন। তিনি সেই রোগচিহ্ন নিয়েই নাম-সংকীর্তন , পাঠ-প্রবচন, নর্তন করতেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, যখন তিনি এসব করতেন, তখন সেই রোগের প্রকোপ তাঁর দেহে থাকতো না।
প্রাণগোপাল বাবা নোয়াখালিতে হাজিপুরের কাছে বিশ বিঘা জমিতে এক উত্‍সবের আয়োজন করেছিলেন। সেই মহা মহোত্‍সবে অগণিত লোক অংশ নিয়েছিলেন, অসংখ্য কীর্তনের দল এসেছিলেন। প্রায় ৬০০ জন লোক কেবল রন্ধনের কার্য‍্যেই ব‍্যস্ত ছিলেন। অতএব, কত জনসমাগম যে হয়েছিল তা সহজেই অনুভূত হয়। টানা সাত দিন বাবার ক্ষিদে-তেষ্টা বলে কিছু ছিল না। কখনো তিনি তদারকি করছেন সবের, কখনো বা নৃত‍্য-গীতে ব‍্যস্ত, আবার কখনো সমাধি মগ্ন। সে এক পরম অদ্ভুত আবেশ তাঁর ভিতর।
আর একবার তো এক অলৌকিক কান্ড ঘটালেন। ফেনীর উত্তর দিকে পাঠাঙ্গর গ্রামে, যখন তিনি ব‍্যাসাসনে বসে প্রবচন দিচ্ছেন তখন হঠাত্‍ করে বজ্রবিদ্যুত্‍ পতন শুরু হয় ভয়ানক ভাবে। ভক্তরা প্রাণভয়ে ভীত হচ্ছে দেখে তিনি সকলকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, “তোমরা চিন্তা করো না। যে ইন্দ্রদেব এই ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তিনিও ভক্তদেরকে মান্য করেন। তোমরা স্থিরভাবে বসে পাঠে মন দাও। দেখবে সকল বিপদ দূরে সরে যাবে।” বাস্তবিক তাই হল। সেই স্থান বাদ দিয়ে সকল স্থানে ভারী বর্ষণ হল, কিন্তু, উত্‍সবের স্থানে এক ফোটাও বৃষ্টি হল না। বাবার নির্দেশমত সকলে স্থির চিত্তে গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠে মনোনিবেশ করে বসেছিলেন। পাঠাঙ্গর গ্রামের সেই মহোত্‍সব শেষে সকল গ্রামবাসী প্রেমপ্রাপ্ত হয়ে ধুলায় গড়াগড়ি দিয়েছিলেন। চতুর্দিক ধন্য ধন্য করেছিল তাঁর লীলা দেখে।
প্রাণকৃষ্ণ বাবার বৈরাগ্য ছিল অপরিসীম। তিনি ধাতুপাত্র বর্জন করে, মৃত্‍পাত্রে প্রসাদ পেতেন, ভূমিতলে শয়ন করতেন, দিবানিশি নামে মজে থাকতেন।
যেদিন বাবা লীলাসঙ্গোপন করলেন সেদিন মহোত্‍সব শেষে সকল ভক্তদের প্রসাদ পাবার পর তিনি শয়নে গেলেন। বললেন যে, তাঁর দেহ অবশ, আর তিনি উঠবেন না, সেই তাঁর শেষ শয‍্যা। তাই শেষ পূজা দিয়ে নিতে চান। তাঁর আজ্ঞামত তাঁর বক্ষের ওপর রেশমী আসন পাতা হল। তারপর, তাঁর গুরুদেবের চিত্রপট বসানো হল সেই আসনের ওপর। তিনি পূজা করলেন। তাঁর নির্দেশমত পঞ্চতত্ত্ব চিত্রপটও বসানো হল তাঁর বক্ষের ওপর। তিনি পূজা করলেন। এরপর, রাধাবিনোদ বিগ্রহ বসানো হল তিনি পূজা দিলেন। বিগ্রহ নামানো হল বক্ষ থেকে। তিনি ধ‍্যানমগ্ন হলেন শয়ন অবস্থাতেই। লীলা সম্বরণ করলেন বাবা। তখন ছিল আষাঢ় মাসের শেষে শুক্লা চতুর্দশীর রাত্রে চতুর্থ প্রহর। সকল শিষ্য-ভক্তরা চতুর্দিক অন্ধকার দেখলেন তাঁর অদর্শনে।
প্রসঙ্গত, লিখছি, প্রাণকৃষ্ণ বাবা এ অধমার পরাত্‍পর গুরুদেব। আমার পরমগুরু শ্রীগুরুপদ দাস বাবা প্রাণকৃষ্ণ বাবার জীবনীকথা বলেছিলেন আমার গুরুদেব শ্রীকিশোরীদাস বাবাকে। গুরুপদ দাস বাবার আজ্ঞায় কিশোরীবাবা প্রকাশ করেছিলেন তাঁর লেখনীতে। আর এখন আমি কিশোরীদাস বাবার আজ্ঞায় লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস করলাম। দোষ-ত্রুটি তাঁদের ক্ষমাসুন্দর নয়নে দেখবেন এই প্রার্থনা জানালাম তাঁদের পদ-পঙ্কজে।
।। কলমে : রাধাবিনোদিনী বিন্তি।।

Share This