Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে বন্ধ জানালার ওপারে অপেক্ষা করছিল এক নতুন পৃথিবী।

১. যে জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যেত না

মল্লিকপুর গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। বাড়িটির নাম ছিল ‘শান্তিনিবাস’। একসময় সেখানে হাসি, গল্প আর মানুষের যাতায়াতে মুখর থাকত প্রতিটি ঘর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির মানুষজন ছড়িয়ে পড়েছিলেন নানা জায়গায়। কেউ শহরে চাকরি পেয়েছেন, কেউ সংসার গড়েছেন অন্যত্র। বাড়িতে থেকে গিয়েছিলেন শুধু ছিয়াত্তর বছরের সরলা দেবী।

বাড়ির দক্ষিণ দিকের একটি জানালা বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল। জানালাটির কাঠ ফুলে গিয়েছিল, পাল্লায় জমেছিল ধুলো, আর লোহার ছিটকিনিতে ধরেছিল মরচে। একসময় সেই জানালা খুললেই দেখা যেত বিস্তীর্ণ মাঠ, দূরের তালগাছ আর বিকেলের আকাশ। এখন বাইরে আগাছা বেড়েছে, মাঠের একাংশে তৈরি হয়েছে নতুন বাড়ি।

সরলা দেবী প্রায়ই জানালাটির সামনে বসে থাকতেন।

তাঁর স্বামী অমলেন্দু জীবিত থাকতে এই জানালার পাশে বসে খবরের কাগজ পড়তেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে অরিন্দম ছোটবেলায় এই জানালা দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো দেখত। সেই দিনগুলো চলে গেছে। ছেলে এখন বেঙ্গালুরুতে থাকে। কাজের ব্যস্ততায় ফোন করে, কিন্তু বছরে একবারের বেশি বাড়িতে আসতে পারে না।

সরলা দেবী কখনও অভিযোগ করতেন না। শুধু বিকেলের দিকে জানালার সামনে বসে থাকতেন, যেন বন্ধ কাঠের পাল্লার ওপারে এখনও তাঁর পুরোনো পৃথিবীটি অপেক্ষা করছে।

একদিন বাড়ির মেরামতির কাজে এসেছিল পাশের বাড়ির মেয়ে তিথি। সে কলেজে পড়ে। কাজের ফাঁকে সরলা দেবীকে জানালার পাশে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “ঠাকুমা, জানালাটা খোলেন না কেন?”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “অনেক বছর খোলা হয়নি মা। এখন আর খুলবে কি না জানি না।”

তিথি জানালার পাল্লায় হাত রেখে বলল, “চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?”

সরলা দেবী একটু চুপ করে থেকে বললেন, “সব বন্ধ জিনিস খোলা যায় না রে। কিছু কিছু বন্ধ হয়ে গেলে আর আগের মতো হয় না।”

তিথি কথাটার অর্থ পুরো বুঝল না। কিন্তু জানালাটির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, কাঠের পাল্লা দুটো শুধু একটি ঘরকেই অন্ধকার করে রাখেনি, সরলা দেবীর জীবন থেকেও যেন কিছু আলো আটকে রেখেছে।

২. একটি অদ্ভুত আবিষ্কার

পরের রবিবার তিথি তার বাবা সমীরবাবুকে নিয়ে শান্তিনিবাসে গেল। সমীরবাবু কাঠের কাজ জানতেন। তিনি জানালাটি পরীক্ষা করে বললেন, “পাল্লা নষ্ট হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। একটু যত্ন করলে খোলা সম্ভব।”

সরলা দেবী প্রথমে রাজি হলেন না।

“এত খরচ করে কী হবে? এখন আর জানালা খুলে কী দেখব?”

তিথি বলল, “খরচের কথা ভাববেন না, ঠাকুমা। আমরা যতটা পারি নিজেরাই করব। আর জানালা খুললে কী দেখা যাবে, সেটা তো না খুললে বোঝা যাবে না!”

অবশেষে সরলা দেবী সম্মতি দিলেন।

সমীরবাবু সাবধানে পুরোনো ছিটকিনি খুললেন। কাঠের পাল্লার জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার করা হলো। নষ্ট অংশ মেরামত করা হলো, আর জানালার চারপাশের আগাছা সরিয়ে দেওয়া হলো।

কাজ করতে গিয়ে তিথি জানালার নিচে একটি ছোট কাঠের তাক দেখতে পেল। তাকটি এতটাই ধুলোয় ঢাকা ছিল যে আগে চোখেই পড়েনি। তার ওপর রাখা ছিল একটি টিনের বাক্স।

সরলা দেবী বাক্সটি দেখে চমকে উঠলেন।

“এটা তো অমলেন্দুর বাক্স!”

বাক্সের মধ্যে ছিল কিছু পুরোনো চিঠি নয়, বরং নানা রকম বীজের ছোট প্যাকেট, গাছের পরিচর্যা নিয়ে লেখা হাতে তৈরি নোট, আর বাড়ির চারপাশে কোন গাছ কোথায় লাগানো হয়েছিল তার একটি পুরোনো তালিকা।

সরলা দেবী বাক্সটি হাতে নিয়ে বললেন, “তোমার দাদু গাছ খুব ভালোবাসতেন। বাড়ির বাগানটা তিনিই তৈরি করেছিলেন। কোন ঋতুতে কোন গাছ লাগাতে হবে, সব লিখে রাখতেন।”

তিথি আগ্রহ নিয়ে নোটগুলো দেখতে লাগল। কিছু বীজের প্যাকেটে নাম লেখা ছিল, কয়েকটিতে শুধু তারিখ। অনেক বীজই হয়তো আর অঙ্কুরিত হবে না। তবু বাক্সটি যেন একটি হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসের স্মৃতি বহন করছিল।

“ঠাকুমা, এই বাগানটা আবার তৈরি করা যায় না?” তিথি জিজ্ঞাসা করল।

সরলা দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাগান করতে লোক চাই, সময় চাই। এখন আর সে বয়স আছে?”

তিথি মৃদু হেসে বলল, “আপনাকে একা করতে হবে না। আমরা সবাই মিলে করব।”

৩. পুরোনো বাগানের নতুন পরিকল্পনা

পরের সপ্তাহে তিথি তার কলেজের দুই বন্ধু এবং কয়েকজন প্রতিবেশীকে নিয়ে এল। তারা প্রথমে বাগানের অবস্থা দেখল। কোথাও ভাঙা টব, কোথাও শুকনো ডাল, আবার কোথাও আগাছায় ঢেকে থাকা মাটির অংশ।

কেউ কেউ বলল, “এত বড় জায়গা পরিষ্কার করতে অনেক সময় লাগবে। বরং ছোট করে শুরু করাই ভালো।”

তিথি সেই পরামর্শ মেনে নিল। তারা ঠিক করল, পুরো বাগান একসঙ্গে সাজানোর চেষ্টা না করে জানালার সামনে একটি ছোট অংশে কাজ শুরু করবে।

সরলা দেবী পুরোনো নোট দেখে জানালেন, সেখানে আগে শিউলি, জবা, অপরাজিতা আর তুলসী ছিল। কিছু গাছের বীজ নতুন করে সংগ্রহ করা হলো। স্থানীয় নার্সারি থেকে কয়েকটি চারা আনা হলো। পুরোনো টবগুলো পরিষ্কার করে ব্যবহার করা হলো।

তিথি বুঝতে পারল, গাছ লাগানো শুধু মাটি খুঁড়ে চারা বসিয়ে দেওয়া নয়। মাটির ধরন, জল দেওয়ার পরিমাণ, সূর্যের আলো—সবকিছুর দিকে নজর রাখতে হয়।

সরলা দেবী নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের অনেক কিছু শেখালেন।

“চারা লাগানোর পর প্রতিদিন বেশি জল দিলেই যে গাছ ভালো হবে, তা নয়,” তিনি বলতেন। “গাছেরও নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সময় আছে।”

তিথি হেসে বলত, “মানুষের ক্ষেত্রেও কথাটা মিলে যায়, তাই না ঠাকুমা?”

সরলা দেবী উত্তর দিতেন না। শুধু মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠত।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জানালার সামনের জায়গাটি বদলে গেল। সব গাছ একসঙ্গে বড় হয়নি। দু-একটি চারা শুকিয়েও গেল। কিন্তু কয়েকটি নতুন পাতা দেখা দিল, আর অপরাজিতার লতায় ছোট্ট একটি কুঁড়ি ফুটল।

সেদিন তিথি ছুটে গিয়ে সরলা দেবীকে ডাকল।

“ঠাকুমা, দেখুন! ফুল আসছে!”

সরলা দেবী ধীরে ধীরে উঠে জানালার কাছে এলেন। বহু বছর পর তিনি নিজে হাত দিয়ে জানালার পাল্লা ঠেলে খুললেন।

বাইরের আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল।

তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “এত বছর পর বুঝলাম, জানালাটা শুধু বন্ধ ছিল না। আমিও যেন নিজের মনটা বন্ধ করে রেখেছিলাম।”

তিথি তাঁর হাত ধরল।

৪. যখন সবাই পাশে দাঁড়াল

বাগানটির কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা বিকেলে এসে গাছ দেখত। কেউ শুকনো পাতা সরিয়ে দিত, কেউ টবে জল দিত। তবে তিথি তাদের শিখিয়ে দিয়েছিল, অনুমতি ছাড়া গাছের ডাল ভাঙা যাবে না, অপরিচিত গাছের পাতা মুখে দেওয়া যাবে না এবং অতিরিক্ত জল দেওয়াও ঠিক নয়।

সরলা দেবী এখন প্রতিদিন বিকেলে জানালার পাশে বসতেন। কখনও শিশুদের গাছের গল্প বলতেন, কখনও তাদের শেখাতেন কীভাবে একটি ছোট চারাকে যত্ন করে বড় করতে হয়।

একদিন পাড়ার আট বছরের মেয়ে পিউ এসে বলল, “ঠাকুমা, আমার বাড়িতে একটা গাছ লাগাব। কিন্তু মা বলে, আমাদের বাড়িতে জায়গা নেই।”

সরলা দেবী বললেন, “জায়গা ছোট হলেও একটা টব তো রাখা যায়। তবে এমন গাছ বেছে নিস, যেটার জন্য যত্ন করতে পারবি।”

পিউ মাথা নাড়ল। পরের সপ্তাহে সে একটি ছোট টবে গাছ লাগিয়ে নিয়ে এল। সরলা দেবী তাকে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে মাটি আলগা করতে হয় এবং গাছের অবস্থা দেখে জল দিতে হয়।

বাগানটি আর শুধু সরলা দেবীর স্মৃতির জায়গা রইল না। এটি হয়ে উঠল পাড়ার শিশুদের শেখার একটি ছোট্ট ক্ষেত্র।

তিথি একদিন প্রস্তাব দিল, “আমরা কি প্রতি মাসে একদিন সবাই মিলে গাছের যত্ন আর পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে পারি?”

সবাই রাজি হলো। মাসে একদিন বাগানে ছোট্ট সমাবেশ বসতে লাগল। সেখানে শিশুরা গাছের বৃদ্ধি দেখত, পাখি পর্যবেক্ষণ করত এবং বাড়ির বর্জ্য কীভাবে আলাদা করে রাখা যায়, তা শিখত।

কেউ কোনও বড় ঘোষণা করল না। কোনও ব্যানার লাগানো হলো না। তবু ছোট ছোট অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে পাড়ার মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠল।

৫. দূরে থাকা ছেলের ফিরে আসা

দুর্গাপুজোর আগে অরিন্দম কয়েক দিনের জন্য বাড়ি এল। বহুদিন পর বাড়িতে ঢুকে সে প্রথমেই অবাক হলো। মায়ের ঘরের দক্ষিণের জানালাটি খোলা। বাইরে সবুজ গাছ, টবে ফুটে থাকা ফুল আর কয়েকটি শিশুর হাসির শব্দ।

সে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “এত কিছু হলো কীভাবে?”

সরলা দেবী বললেন, “তিথি আর পাড়ার ছেলেমেয়েরা করেছে। আমি শুধু পুরোনো গাছগুলোর কথা বলেছি।”

অরিন্দম মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, তাঁর মধ্যে যেন নতুন প্রাণ ফিরে এসেছে।

রাতে খাওয়ার পর মা-ছেলে জানালার পাশে বসল। বাইরে শিউলির গন্ধ ভেসে আসছিল।

অরিন্দম বলল, “মা, তুমি আগে ফোনে বলতে যে বাড়িটা খুব ফাঁকা লাগে। আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে শহরে নিয়ে গেলে হয়তো ভালো থাকবে। কিন্তু তোমার এই জায়গাটার সঙ্গে যে এত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেটা ঠিক বুঝিনি।”

সরলা দেবী শান্ত গলায় বললেন, “আমি তোকে দোষ দিইনি বাবা। তোর নিজের জীবন আছে। কিন্তু মানুষ শুধু ছাদের নিচে থাকলেই ভালো থাকে না। তার কথা শোনার কেউ থাকা দরকার, তার সঙ্গে কিছু ভাগ করে নেওয়ার মানুষ থাকা দরকার।”

অরিন্দম মায়ের হাত ধরে বলল, “আমি এবার থেকে নিয়মিত ফোন করব। আর যতটা সম্ভব সময় বের করে আসব। শুধু ফোন করলেই যে সব দায়িত্ব শেষ হয় না, সেটাও বুঝেছি।”

মা হেসে বললেন, “তুই নিজের কাজ মন দিয়ে কর। কিন্তু নিজের মানুষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগটুকু রেখো। সম্পর্কও গাছের মতো—যত্ন না পেলে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।”

পরদিন অরিন্দম তিথি ও তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করল। বাগানের জন্য কয়েকটি উপযুক্ত গাছের চারা কিনে দিল। তবে তিথি তাকে মনে করিয়ে দিল, “শুধু চারা কিনে দিলেই হবে না। এগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে।”

অরিন্দম হেসে বলল, “ঠিক বলেছ। এবার থেকে আমিও ছুটিতে এসে সাহায্য করব।”

৬. খোলা জানালার আলো

এক বছর পরে শান্তিনিবাসের দক্ষিণের জানালাটি আর কখনও বন্ধ রাখা হতো না। বর্ষার দিনে বৃষ্টি বেশি হলে পাল্লা টেনে দেওয়া হতো, আবার বৃষ্টি থামলে জানালা খুলে দেওয়া হতো। জানালার সামনে ছোট্ট বাগানটি আরও সবুজ হয়ে উঠেছিল।

সরলা দেবী এখন আগের চেয়ে বেশি কথা বলতেন। তাঁর শরীর অবশ্য বয়সের নিয়মে দুর্বল হচ্ছিল, কিন্তু প্রতিদিন বিকেলে জানালার পাশে বসার অভ্যাসটি তিনি ছাড়েননি।

একদিন তিথি তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, “ঠাকুমা, এই জানালাটা খুলে আপনার সবচেয়ে বড় কী লাভ হয়েছে জানেন?”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “বাইরের আলো দেখতে পাচ্ছি।”

তিথি মাথা নেড়ে বলল, “শুধু আলো নয়। আমরা সবাই আপনাকে নতুন করে চিনতে পেরেছি। আপনার পুরোনো অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগছে। আর আপনার বাড়িটাও আবার মানুষের হাসিতে ভরে উঠেছে।”

সরলা দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম। কোনও কিছু শেষ হয়ে গেলেই সব শেষ হয়ে যায় না। কখনও পুরোনো কিছুর মধ্যেই নতুন শুরুর পথ লুকিয়ে থাকে।”

সন্ধ্যা নেমে এল। জানালার বাইরে আকাশে প্রথম তারা দেখা দিল। বাগানের পাতায় হালকা বাতাস লাগল। দূরে কয়েকটি শিশু বাড়ি ফিরছিল, তাদের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

সরলা দেবী জানালার কাঠে হাত রেখে বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

একসময় যে জানালা তাঁকে অতীতের কথা মনে করিয়ে দিত, এখন সেই জানালাই তাঁকে প্রতিদিন নতুন দিনের অপেক্ষা করতে শেখায়।

তিনি বুঝেছিলেন, জীবনের সব বন্ধ দরজা জোর করে খুলতে হয় না। কখনও একটি জানালা খুলে দেওয়াই যথেষ্ট—যার মধ্য দিয়ে আলো আসে, বাতাস আসে, আর ফিরে আসে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

নৈতিক শিক্ষা: একাকিত্ব দূর করতে সব সময় বড় কোনও ব্যবস্থা দরকার হয় না। আন্তরিক সঙ্গ, ছোট ছোট যৌথ উদ্যোগ এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করার মধ্য দিয়েও নতুন জীবনের সূচনা হতে পারে। অতীতকে আঁকড়ে ধরে থেমে না থেকে, তার ভালো স্মৃতিগুলোকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানকে সুন্দর করে তোলাই জীবনের প্রকৃত শিক্ষা।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে পুরোনো নোটিশ বোর্ডে বদলে গেল গ্রামের ভাগ্য।

১. একটি বোর্ড, অনেকগুলো প্রশ্ন

নদিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রাম শ্যামলপুর। গ্রামের মানুষ পরিশ্রমী, কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত। কারও জমিতে ফসল ভালো হয় না, কেউ কাজের সন্ধানে শহরে ঘোরেন, আবার কেউ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হয়েও সঠিক তথ্যের অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হন।

গ্রামের মোড়ে একটি পুরোনো নোটিশ বোর্ড ছিল। একসময় সেখানে পঞ্চায়েতের ঘোষণা, স্বাস্থ্য শিবিরের খবর কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময়সূচি টাঙানো হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বোর্ডটি প্রায় অবহেলায় পড়েছিল। কাঠের ফ্রেমে পোকা ধরেছিল, টিনের ছাদে মরচে পড়েছিল, আর পুরোনো কাগজগুলো বাতাসে ছিঁড়ে উড়ে যেত।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বোর্ডটির দিকে তাকাতেনও না।

কিন্তু পঁচিশ বছরের অয়ন একদিন বোর্ডটির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবল, “এত মানুষ প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যায়। অথচ এমন একটা জায়গা থাকা সত্ত্বেও কেউ জানে না কোথায় কী খবর পাওয়া যায়!”

অয়ন স্নাতক পাশ করেছিল। শহরে চাকরি খুঁজতে গিয়ে কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছে। বাড়িতে বাবা অসুস্থ, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। সংসারের দায়িত্ব সামলাতে অয়নকে মাঝেমধ্যে বাজারে একটি দোকানেও কাজ করতে হয়।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষের সমস্যাগুলোও সে কাছ থেকে দেখত।

একদিন তার বন্ধু সুমন বলল, “তুই নিজের চাকরি পাচ্ছিস না, আবার গ্রামের সব সমস্যা সমাধান করতে নেমে পড়বি নাকি?”

অয়ন হেসে উত্তর দিল, “সব সমস্যা আমি সমাধান করতে পারব না। কিন্তু মানুষ যদি প্রয়োজনীয় খবরটাই না পায়, তাহলে চেষ্টা করবে কীভাবে?”

কথাটা সুমনের মনে ধরল না। সে চলে গেল।

অয়ন কিন্তু বোর্ডটির কথা ভুলল না।

২. শুরুটা খুব ছোট

পরের রবিবার অয়ন একটি ঝাড়ু, কাপড় আর কয়েকটি পেরেক নিয়ে বোর্ডটির কাছে গেল। নিজের হাতে ধুলো পরিষ্কার করল, ভাঙা কাঠের অংশ মেরামত করল এবং পুরোনো কাগজ সরিয়ে দিল।

পাশের চায়ের দোকানের মালিক নিতাই কাকা তাকে দেখে বললেন, “কী রে, অয়ন, বোর্ডটা পরিষ্কার করে কী হবে? আবার তো নোংরা হয়ে যাবে!”

অয়ন বলল, “হতে পারে। কিন্তু একবার চেষ্টা করে দেখি না, কাকা?”

নিতাই কাকা আর কথা বাড়ালেন না। তবে নিজের দোকান থেকে একটি পুরোনো কাপড় এগিয়ে দিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় বোর্ডটির চেহারা অনেকটাই বদলে গেল। অয়ন নিজের খরচে কয়েকটি সাদা কাগজ কিনে তাতে বড় বড় অক্ষরে লিখল—

‘গ্রামের প্রয়োজনীয় খবর এখানে জানানো হবে।’

তার নিচে লিখল—

‘কোনও খবর বিশ্বাস করার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যাচাই করুন। ব্যক্তিগত তথ্য বা টাকা কাউকে দেবেন না।’

প্রথম দিন কেউ বিশেষ গুরুত্ব দিল না। দ্বিতীয় দিনও না।

তৃতীয় দিন এক বৃদ্ধ কৃষক বোর্ডটির সামনে দাঁড়িয়ে অয়নকে ডাকলেন।

“বাবা, এখানে কি চাষের ব্যাপারে খবর পাওয়া যাবে?”

অয়ন বলল, “অবশ্যই চেষ্টা করব, কাকা। তবে যে খবরই দেব, আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করব।”

বৃদ্ধের নাম নিবারণ পাল। তিনি বহু বছর ধরে চাষ করছেন। তাঁর সমস্যা ছিল, কৃষিকাজের জন্য কোথায় পরামর্শ পাওয়া যায়, কখন কৃষি শিবির হয় কিংবা কীভাবে সরকারি কৃষি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়—এসব তথ্য তিনি নিয়মিত জানতে পারতেন না।

অয়ন তাঁর সমস্যার কথা লিখে নিল।

তারপর সে কৃষি দপ্তরের স্থানীয় কার্যালয়ে যোগাযোগ করল। সেখানে জেনে নিল, কৃষকদের জন্য কোথায় পরামর্শ শিবির হবে এবং কীভাবে সরকারি নির্দেশিকা পাওয়া যায়। অনুমতি ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার পর বোর্ডে একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা টাঙিয়ে দিল।

নিবারণ কাকা খবরটি পড়ে বললেন, “এতদিন পরে বুঝলাম, খবর জানারও একটা পথ আছে!”

অয়নের মনে সাহস এল।

৩. খবরের সঙ্গে জুড়ল মানুষের জীবন

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বোর্ডটি গ্রামের মানুষের নজরে আসতে শুরু করল।

কেউ স্বাস্থ্য শিবিরের খবর জানতে চাইতেন, কেউ বিভিন্ন পরীক্ষার আবেদনের শেষ তারিখ, কেউ আবার স্থানীয় কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি।

অয়ন বুঝতে পারল, শুধু খবর টাঙিয়ে দিলেই হবে না। তথ্য যেন সঠিক হয়, তারিখ যেন পুরোনো না হয়ে যায় এবং মানুষ যেন ভুল আশায় টাকা খরচ না করেন—সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

সে কয়েকটি নিয়ম তৈরি করল।

প্রথমত, কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা কর্মসংস্থানের খবর নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই না করে বোর্ডে দেওয়া হবে না।

দ্বিতীয়ত, পুরোনো বিজ্ঞপ্তির পাশে স্পষ্ট করে লেখা থাকবে যে আবেদন করার সময়সীমা শেষ হয়েছে, অথবা কাগজটি সরিয়ে ফেলা হবে।

তৃতীয়ত, কোনও ব্যক্তি চাকরি দেওয়ার নামে টাকা চাইলে তাঁর বিজ্ঞাপন বোর্ডে টাঙানো হবে না।

চতুর্থত, কারও ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা আর্থিক বিবরণ প্রকাশ করা হবে না।

অয়নের এই নিয়মগুলো শুনে গ্রামের স্কুলশিক্ষক নির্মলবাবু খুব খুশি হলেন।

তিনি বললেন, “তুই আসলে শুধু একটা বোর্ড চালাচ্ছিস না। মানুষকে তথ্য যাচাই করতে শেখাচ্ছিস।”

একদিন নির্মলবাবু নিজেই অয়নকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তিনি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে একটি ছোট সচেতনতা কর্মসূচি করলেন। ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানাল, গ্রামের মোড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয় এবং কোনও খবর নিয়ে সন্দেহ থাকলে কীভাবে তা যাচাই করতে হয়।

ধীরে ধীরে অয়নের উদ্যোগে আরও কয়েকজন যুক্ত হল।

সুমনও একদিন এসে বলল, “তুই যখন শুরু করেছিলি, ভেবেছিলাম দুদিন পর বন্ধ করে দিবি। এখন দেখছি, মানুষ সত্যিই উপকার পাচ্ছে। আমিও সাহায্য করব।”

অয়ন হেসে বলল, “তাহলে তুই সপ্তাহে একদিন বোর্ডের খবরগুলো দেখে দিস। পুরোনো কাগজ যেন পড়ে না থাকে।”

সুমন রাজি হয়ে গেল।

৪. একটি ভুল খবরের পরীক্ষা

সবকিছু ভালো চলছিল। কিন্তু একদিন বড় বিপদ দেখা দিল।

সকালে বোর্ডে একটি কাগজ টাঙানো হলো। তাতে লেখা ছিল, একটি সংস্থা নাকি গ্রামের যুবকদের বিনা খরচে চাকরি দেবে। আবেদন করতে গেলে নির্দিষ্ট একটি নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।

কাগজটি কে টাঙিয়েছিল, কেউ জানত না।

খবরটি পড়ে কয়েকজন যুবক অয়নের কাছে এল। একজন বলল, “দাদা, চাকরিটা হলে আমাদের খুব উপকার হবে। নম্বরটায় ফোন করব?”

অয়ন কাগজটি মন দিয়ে পড়ল। বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থার ঠিকানা নেই, কোনও সরকারি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নেই, শুধু একটি ফোন নম্বর দেওয়া।

তার সন্দেহ হলো।

সে যুবকদের বলল, “এখনই ফোন করে ব্যক্তিগত তথ্য দিও না। আগে খবরটা যাচাই করা দরকার।”

এরপর অয়ন বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা সংস্থার পরিচয় খুঁজতে চেষ্টা করল। নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য পাওয়া গেল না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বিজ্ঞপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করা গেল না।

তখন সে বোর্ড থেকে কাগজটি সরিয়ে দিল এবং তার জায়গায় একটি সতর্কবার্তা লাগাল।

সতর্কবার্তায় লেখা হলো, যাচাই না হওয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সাড়া দেওয়ার আগে সাবধান হতে হবে। চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ টাকা চাইলে বা অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত নথি চাইলে তা দেওয়া উচিত নয়।

কয়েক দিন পরে গ্রামের এক যুবক জানাল, সে অন্য একটি জায়গায় একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি দেখেছে। সেখানে আবেদনকারীদের কাছ থেকে টাকা চাওয়া হচ্ছিল।

অয়ন বুঝল, সতর্ক হওয়াটা জরুরি ছিল।

তবে সে কাউকে অপরাধী বলে প্রচার করল না। প্রমাণ ছাড়া কোনও অভিযোগ না করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো।

ঘটনাটি গ্রামের মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখাল। তারা বুঝল, খবর ছড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু সত্যতা যাচাই করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৫. বোর্ডের বাইরে আরও বড় স্বপ্ন

ছয় মাস কেটে গেল।

শ্যামলপুরের পুরোনো নোটিশ বোর্ডটি এখন গ্রামের পরিচিত তথ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কৃষি শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি, স্থানীয় সভা এবং সরকারি দপ্তরের যোগাযোগের তথ্য সেখানে নিয়মিত টাঙানো হয়।

তবে অয়ন কখনও দাবি করেনি যে বোর্ডে সব তথ্য পাওয়া যাবে। সে জানত, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি অনলাইনে প্রকাশিত হয়, আবার সব তথ্য বোর্ডে টাঙানো সম্ভবও নয়।

তাই সে একটি ছোট খাতা রাখল। তাতে নির্ভরযোগ্য ও সরকারি তথ্যের সূত্র, যোগাযোগের ঠিকানা এবং তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি লেখা থাকত। স্মার্টফোন ব্যবহার করতে জানেন না, এমন মানুষদেরও সে সাহায্য করত কীভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তথ্য নিতে হয়।

একদিন গ্রামের এক বিধবা মহিলা, মালতী দেবী, তার কাছে এলেন। তিনি একটি সরকারি সহায়তা প্রকল্পের কথা শুনেছিলেন, কিন্তু কোথায় যোগাযোগ করতে হবে বুঝতে পারছিলেন না।

অয়ন তাঁকে প্রয়োজনীয় দপ্তরের ঠিকানা জানাল। কী কী নথি লাগতে পারে, তা সরকারি নির্দেশিকা থেকে বুঝিয়ে দিল। কোনও কাজের নিশ্চয়তা দিল না, কোনও টাকা নিল না।

কয়েক সপ্তাহ পর মালতী দেবী এসে জানালেন, তিনি আবেদন জমা দিতে পেরেছেন।

তিনি বললেন, “বাবা, সাহায্যটা পাব কি না জানি না। কিন্তু এতদিন অন্তত কোথায় যাব, সেটাই বুঝতাম না। এখন নিজের কাজটা নিজে করার সাহস পেয়েছি।”

এই কথাটাই অয়নের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়ে রইল।

একদিন পঞ্চায়েতের একটি সভায় গ্রামের মানুষ অয়নের উদ্যোগের কথা তুললেন। তাঁরা বোর্ডটির জন্য একটি ভালো ছাউনি এবং তালাবন্ধ কাচের বাক্সের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিলেন, যাতে বৃষ্টি বা দুষ্টুমি করে কেউ কাগজ নষ্ট করতে না পারে।

অয়ন বলল, “বোর্ডটা আমার একার নয়। গ্রামের সকলের। তাই এর দেখাশোনার দায়িত্বও ভাগ করে নিতে হবে।”

তার প্রস্তাবে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক এগিয়ে এলেন। কে কোন দিন বোর্ডের খবর যাচাই করবেন, কে পুরোনো কাগজ সরাবেন, কে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন—সব ঠিক করা হলো।

এবার উদ্যোগটি আর একজন মানুষের ওপর নির্ভরশীল রইল না।

৬. নতুন পথের শুরু

এক বছর পর অয়ন একটি চাকরি পেল। কাজটি শহরে, কিন্তু সে ঠিক করল, গ্রামের তথ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবে। সপ্তাহান্তে বাড়ি এলে বোর্ডের কাজ দেখবে এবং প্রয়োজনে নতুন স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেবে।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় সে একবার নোটিশ বোর্ডটির সামনে দাঁড়াল।

সেখানে একটি নতুন কাগজ টাঙানো ছিল—

‘এই বোর্ড সবার। সঠিক তথ্য জানুন, যাচাই করুন, অন্যকে জানাতে সাহায্য করুন।’

অয়ন কাগজটির দিকে তাকিয়ে হাসল।

নিতাই কাকা চায়ের দোকান থেকে ডাকলেন, “কী রে, অয়ন! এবার তো শহরে চলে যাবি। বোর্ডটা কে দেখবে?”

অয়ন বলল, “সবাই মিলে দেখবে, কাকা। এটাই তো আসল সাফল্য।”

নিতাই কাকা বললেন, “তা ঠিক। একটা পুরোনো বোর্ড যে এত কাজ করতে পারে, আগে কে জানত!”

অয়ন উত্তর দিল, “বোর্ডটা তো আগেও ছিল। শুধু আমরা বুঝিনি, এর সঠিক ব্যবহার কীভাবে করতে হয়।”

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় অয়ন উপলব্ধি করল, তার জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়নি। চাকরি পাওয়ার পরও সংসারের দায়িত্ব থাকবে, বাবার চিকিৎসার চিন্তা থাকবে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাও থাকবে।

কিন্তু সে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে—নিজের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথটুকুও সহজ করা যায়।

একটি পুরোনো বোর্ড গ্রামের ভাগ্য রাতারাতি বদলে দেয়নি। কিন্তু সেটি মানুষকে তথ্যের কাছে নিয়ে গেছে, ভুল খবরের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করেছে।

আর সেই ছোট পরিবর্তনই একদিন বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠল।

নৈতিক শিক্ষা: সঠিক তথ্য মানুষের শক্তি। কিন্তু তথ্যের সঙ্গে দায়িত্ববোধ না থাকলে তা বিপদের কারণও হতে পারে। তাই কোনও খবর বিশ্বাস বা প্রচার করার আগে যাচাই করা জরুরি। আর সমাজের উন্নতি তখনই স্থায়ী হয়, যখন একজনের উদ্যোগ ধীরে ধীরে সবার সম্মিলিত দায়িত্বে পরিণত হয়।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ সংকেতের ওপারে।

সোনাঝুরি গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি ছোট রেলস্টেশন। স্টেশনটির নাম ছিল শালবনি রোড। প্রতিদিন সকালে কয়েকটি লোকাল ট্রেন সেখানে দাঁড়াত, আর সন্ধ্যার পর প্ল্যাটফর্মের ওপর নেমে আসত এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। স্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো সংকেতকক্ষটি বহু বছর ধরে গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। লাল ইটের ছোট্ট ঘর, মরচে ধরা জানালা আর দরজার সামনে একটি বিবর্ণ সাইনবোর্ড—সব মিলিয়ে যেন অতীতের কোনো স্মৃতি।

সেই সংকেতকক্ষে একসময় কাজ করতেন হরিপদ মণ্ডল। দীর্ঘ তিরিশ বছর রেলের চাকরি করার পর অবসর নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব ছিল, চাকরির সময় তাঁর দায়িত্বে থাকা পথে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি।

অবসরের পরও প্রতিদিন বিকেলে তিনি স্টেশনে আসতেন। প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বসে ট্রেনের আসা-যাওয়া দেখতেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে হাসিমুখে বলতেন, “রেলের চাকরি ছেড়েছি, কিন্তু রেলের প্রতি টানটা তো আর অবসর নেয়নি!”

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তাঁর কথায় হাসত। কিন্তু একজন মানুষ তাঁর কথাগুলো মন দিয়ে শুনত। সে হলো একুশ বছরের রূপা।

রূপা ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি নিয়ে কৌতূহলী ছিল। বাড়ির নষ্ট টর্চ, পুরোনো ঘড়ি কিংবা ভাঙা রেডিও খুলে সে দেখত, কীভাবে সেগুলো কাজ করে। গ্রামের অনেকে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করত।

“মেয়েমানুষ হয়ে এত যন্ত্রপাতি নিয়ে কী হবে? বরং সেলাই শিখে কিছু উপার্জনের ব্যবস্থা করো,” প্রতিবেশী কাকিমারা বলতেন।

রূপা হাসত। সে জানত, তার স্বপ্ন অন্য রকম। সে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু বাবার ছোট্ট চায়ের দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন ছিল। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাই একসময় থমকে গিয়েছিল।

তবু শেখার ইচ্ছেটা থামেনি।

হরিপদবাবুর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর রূপা প্রায়ই তাঁর কাছে বসত। সংকেত কীভাবে কাজ করে, রেললাইনের নিরাপত্তা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া হয়—এসব প্রশ্ন করত।

হরিপদবাবু তাকে বোঝাতেন, “রেলের সংকেত শুধু একটা আলো নয়, রূপা। এটা অনেক মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। একটা ভুল সিদ্ধান্তের দাম কখনও কখনও ভয়াবহ হতে পারে। তাই রেলের নিরাপত্তার কাজ কেবল অনুমান করে করা যায় না। নিয়ম, প্রশিক্ষণ আর অনুমোদিত পদ্ধতিই এখানে শেষ কথা।”

রূপা কথাগুলো মন দিয়ে শুনত।

একদিন বিকেলে স্টেশনের পাশের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল সে। হঠাৎ দেখল, কয়েকজন মানুষ রেললাইনের কাছের একটি পুরোনো পথ দিয়ে শর্টকাটে যাতায়াত করছে। পথটি অনেক দিন ধরে ব্যবহার করা হলেও সেটি নিরাপদ পারাপারের জন্য নির্ধারিত ছিল না। আশপাশের ঝোপঝাড়ের কারণে দূর থেকে আসা ট্রেন সব সময় ভালোভাবে দেখা যেত না।

রূপা কয়েকজনকে সতর্ক করল।

“এভাবে লাইন পার হবেন না। একটু ঘুরে নির্ধারিত পারাপারের পথ দিয়ে যান।”

একজন বিরক্ত হয়ে বললেন, “ও পথে গেলে দশ মিনিট বেশি লাগে। এত বছর ধরে এভাবেই যাচ্ছি, কিছু হয়নি!”

রূপা আর কথা বাড়াল না। কিন্তু ঘটনাটি তার মনে দাগ কেটে গেল।

পরের কয়েক সপ্তাহে সে লক্ষ্য করল, স্কুলের ছাত্রছাত্রী, বাজারে যাওয়া মানুষ, এমনকি সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করা কয়েকজনও একই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করছে। একদিন এক বৃদ্ধ প্রায় ট্রেনের সামনে পড়ে যাচ্ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আশপাশের লোকজন তাঁকে টেনে সরিয়ে নেন।

সেদিন রাতে রূপার ঘুম হলো না।

পরদিন সে হরিপদবাবুর কাছে গিয়ে বলল, “কাকু, এই সমস্যাটা কীভাবে সমাধান করা যায়? সবাইকে শুধু বারণ করলে তো হবে না।”

হরিপদবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “মানুষ কেন নিয়ম ভাঙছে, সেটা আগে বুঝতে হবে। পথটা যদি অসুবিধাজনক হয়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। কিন্তু মনে রেখো, রেলের কোনো সংকেত বা নিরাপত্তাব্যবস্থায় নিজের মতো করে পরিবর্তন করার অধিকার কারও নেই।”

রূপা মাথা নাড়ল। সে কোনো যন্ত্র বানিয়ে বিপদ বাড়াতে চায়নি। সে চেয়েছিল, সমস্যাটা সঠিকভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে।

পরের রবিবার সে কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া, স্থানীয় দোকানদার এবং গ্রামের দুজন প্রবীণ মানুষকে নিয়ে আলোচনা করল। তারা লিখে রাখল, কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ওই পথ ব্যবহার করে, কেন তারা নির্ধারিত পথ এড়িয়ে চলে এবং কী ধরনের অসুবিধার মুখোমুখি হয়।

রূপা কাউকে রেললাইনের কাছে দাঁড়িয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বলল না। দূর থেকে নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে সাধারণ যাতায়াতের ধরন পর্যবেক্ষণ করা হলো। ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ না করে তারা শুধু সমস্যার বিবরণ তৈরি করল।

এরপর রূপা গ্রামের পঞ্চায়েত এবং সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিল। আবেদনে নিরাপদ পারাপারের সুবিধা উন্নত করা, পথের দিকনির্দেশ স্পষ্ট করা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হলো।

কিন্তু উত্তর এল না।

এক সপ্তাহ গেল, তারপর আরও এক সপ্তাহ। গ্রামের লোকজন ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।

একদিন চায়ের দোকানে বসে একজন বললেন, “এসব করে কিছু হবে না। বড় বড় অফিসে কত আবেদন পড়ে থাকে!”

রূপার মন খারাপ হলো। সে ভেবেছিল, সবাই পাশে থাকবে। অথচ এখন তাকে একাই লড়তে হচ্ছে।

সেদিন সন্ধ্যায় সে সংকেতকক্ষের সামনে বসে ছিল। হরিপদবাবু এসে পাশে বসলেন।

“হাল ছেড়ে দিলে?”

রূপা নিচু গলায় বলল, “মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সবাই কথা বলে, কিন্তু কাজের সময় কেউ পাশে থাকে না।”

হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “সবাই প্রথম দিন পাশে দাঁড়াবে, এমন আশা করিস না। কাজটা ঠিক হলে ধীরে ধীরে মানুষ বুঝবে। তবে নিজের সিদ্ধান্তকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য নয়, সত্যিই সমস্যার সমাধান করার জন্য কাজ করবি।”

কথাগুলো রূপার মনে গেঁথে গেল।

সে আবার আবেদনটির নথি গুছিয়ে নিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সাহায্যে আবেদন জমা দেওয়ার প্রমাণ সংগ্রহ করল। তারপর নির্ধারিত দপ্তরে যোগাযোগ করে জানতে চাইল, বিষয়টি কোন পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য ও ছবির সাহায্যে সমস্যাটির বিবরণ আরও পরিষ্কার করে জমা দিল।

এবার কয়েক দিনের মধ্যে একটি উত্তর এল। সংশ্লিষ্ট কর্মীরা এলাকা পরিদর্শন করবেন বলে জানানো হলো।

পরিদর্শনের দিন গ্রামের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। রূপা তাদের সামনে সমস্যার কথা তুলে ধরল। কেউ বললেন, নির্ধারিত পথটি অনেকটা দূরে; কেউ জানালেন, সন্ধ্যার পর পথের নির্দেশ বুঝতে অসুবিধা হয়। কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা সব কথা শুনলেন এবং জানালেন, নিরাপত্তা ও কারিগরি দিক পরীক্ষা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোনো রাতারাতি পরিবর্তন ঘটল না। কয়েক মাস সময় লাগল। অবশেষে নির্ধারিত পারাপারের পথটি ব্যবহার করা সহজ করার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলো। পথের দিকনির্দেশ আরও স্পষ্ট করা হলো, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সচেতনতা প্রচার চালানো হলো এবং বিপজ্জনক শর্টকাটটি ব্যবহার না করার জন্য মানুষকে বারবার বোঝানো হলো।

সব সমস্যার সমাধান একদিনে হয়নি। তবু ধীরে ধীরে ওই ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে মানুষের যাতায়াত কমতে শুরু করল।

এক বিকেলে রূপা দেখল, স্কুলের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী নির্ধারিত পথ দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন বন্ধুকে বলছে, “চল, একটু বেশি সময় লাগলেও নিরাপদ পথ দিয়েই যাই।”

রূপার বুকের মধ্যে অদ্ভুত আনন্দ হলো। সে বুঝল, পরিবর্তন শুধু রাস্তা বা ব্যবস্থায় আসে না, মানুষের চিন্তাতেও আসে।

কয়েক দিন পর হরিপদবাবু তাকে সংকেতকক্ষের সামনে ডাকলেন। তাঁর হাতে একটি পুরোনো কাঠের বাক্স।

“এটা তোর জন্য,” তিনি বললেন।

রূপা অবাক হয়ে বাক্সটি খুলল। ভেতরে ছিল একটি পুরোনো নোটবই, কয়েকটি প্রযুক্তিবিষয়ক বই এবং হরিপদবাবুর চাকরিজীবনের কিছু সাধারণ শিক্ষামূলক নথি।

“এগুলো দিয়ে কী করব, কাকু?”

“পড়বি। তুই যন্ত্রপাতি ভালোবাসিস। তোর পড়াশোনার পথ যেন পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়। আমি তোকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারব না, কিন্তু যতটুকু জানি, তা ভাগ করে দিতে পারি।”

রূপার চোখ ভিজে উঠল।

সে বলল, “আমি যদি কোনো দিন ইঞ্জিনিয়ার হতে পারি, আপনার কথা ভুলব না।”

হরিপদবাবু হেসে বললেন, “আমার কথা মনে রাখার দরকার নেই। শুধু মনে রাখিস, যে জ্ঞান মানুষের কাজে লাগে না, সেই জ্ঞানের মূল্য অসম্পূর্ণ।”

তারপর থেকে রূপা আবার নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করল। দিনের বেলা বাবার দোকানে সাহায্য করত, রাতে পড়ত। অনলাইনে বিনামূল্যের শিক্ষামূলক ক্লাস দেখত, পুরোনো বই পড়ত, আর নিজের তৈরি নোটে কঠিন বিষয়গুলো লিখে রাখত। অর্থের অভাব তখনও ছিল, কিন্তু তার স্বপ্ন আর একা ছিল না।

এক বছর পর রাজ্যের একটি বৃত্তি পরীক্ষায় সে ভালো ফল করল। উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। খবরটি প্রথমে সে হরিপদবাবুকেই জানাল।

বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “দেখলি তো, একটা সংকেতের কাজ শুধু থামতে বলা নয়। কখনও কখনও ঠিক সময়ে সঠিক দিক চিনিয়ে দেওয়াও জরুরি।”

রূপা দূরে তাকাল। সন্ধ্যার আলোয় রেললাইনের ওপর দিয়ে একটি ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছিল। সংকেতকক্ষের জানালায় আলো জ্বলেছে। সেই আলোয় তার মনে হলো, জীবনের পথও যেন রেললাইনের মতো—কখনও সোজা, কখনও বাঁকানো, কখনও সামনে বাধা এসে দাঁড়ায়।

কিন্তু বাধা দেখেই যাত্রা থামিয়ে দিতে নেই। কোথায় থামতে হবে, কোথায় অপেক্ষা করতে হবে, আর কখন নিরাপদ পথে এগিয়ে যেতে হবে—সেই বোধটাই আসল।

বহু বছর পরে রূপা সত্যিই একজন দক্ষ প্রকৌশলী হলো। কর্মজীবনে সে রেল ও গণপরিবহণের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেল। নিজের গ্রামের সেই ছোট্ট স্টেশনটির কথা সে কখনও ভুলল না। একদিন কাজের সূত্রে সেখানে ফিরে এসে হরিপদবাবুর সঙ্গে দেখা করল।

বৃদ্ধ তখন আরও দুর্বল হয়েছেন। রূপাকে দেখে তাঁর মুখে সেই পুরোনো হাসি ফুটে উঠল।

“তুই শেষ পর্যন্ত সংকেতের ওপারে পৌঁছে গেলি?”

রূপা তাঁর হাত ধরে বলল, “না কাকু, আমি শুধু পথ চিনতে শিখেছি। পথ দেখানোর কাজ এখনও বাকি।”

স্টেশনের ওপর দিয়ে তখন আরেকটি ট্রেন ছুটে যাচ্ছিল। তার শব্দে কিছুক্ষণের জন্য কথাবার্তা থেমে গেল। ট্রেনটি দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর রূপা আবার বলল, “আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনুমান নয়, সঠিক নিয়ম মেনে চলতে হয়। আর জীবনের ক্ষেত্রে শিখিয়েছিলেন, কোনো সমস্যাকে উপেক্ষা না করে তার সমাধানের চেষ্টা করতে হয়।”

হরিপদবাবু মৃদু মাথা নাড়লেন।

সেদিন সন্ধ্যায় স্টেশনের আলো জ্বলে উঠলে রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, সেই পুরোনো সংকেতকক্ষের আলো কেবল রেলপথকে আলোকিত করছে না, তার নিজের জীবনের পথকেও একদিন আলোকিত করেছিল।

সে বুঝেছিল, পৃথিবী বদলাতে সব সময় বড় পদ, প্রচুর অর্থ কিংবা অসাধারণ ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় একটি সৎ প্রশ্ন, দায়িত্বশীল উদ্যোগ, ধৈর্য এবং সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।

নৈতিক শিক্ষা: অন্যায় বা বিপদ চোখে পড়লে শুধু অভিযোগ করে থেমে থাকা উচিত নয়। নিয়ম মেনে, তথ্যের ভিত্তিতে এবং মানুষের সহযোগিতা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হয়। ছোট একটি উদ্যোগও অনেক মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে ছিল এক অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা।

১. ধুলোমাখা বেঞ্চের রহস্য

পূর্ব মেদিনীপুরের চন্দনপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল খুব সাধারণ। লালচে দেওয়াল, টিনের ছাদ, ছোট্ট খেলার মাঠ আর কয়েকটি পুরোনো শ্রেণিকক্ষ—এই নিয়েই স্কুলটির সংসার। তবু গ্রামের বহু মানুষের শৈশব জড়িয়ে ছিল এই স্কুলের সঙ্গে।

স্কুলের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নয়, বরং স্কুলের পুরোনো নথিপত্র গোছানোর জন্য একদিন শিক্ষকরা কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে সাহায্য করতে বললেন। তাদের মধ্যে ছিল নবম শ্রেণির ছাত্র অর্ণব। সে পড়াশোনায় মাঝারি মানের হলেও কোনও কিছু খুঁজে বের করার ব্যাপারে তার অদ্ভুত আগ্রহ ছিল।

সেদিন বিকেলে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে অর্ণব শেষ বেঞ্চটি একটু সরাতেই দেখতে পেল, বেঞ্চের নিচের কাঠের পাতের এক পাশে কিছু একটা আটকে আছে।

সে হাত বাড়িয়ে টেনে বের করল একটি পুরোনো খাম।

খামটির রং হলদেটে। ধুলো জমে গিয়েছে, তবু ভেতরে কাগজ থাকার আভাস স্পষ্ট। অর্ণব সাবধানে খামটি খুলল।

ভেতরে ছিল হাতে লেখা কয়েকটি পৃষ্ঠা।

প্রথম পাতার ওপরে লেখা—

‘আমাদের স্কুলের জন্য একটি প্রতিজ্ঞা।’

তারিখটি প্রায় পঁচিশ বছর আগের।

অর্ণব কৌতূহলী হয়ে পড়তে শুরু করল।

চিঠিতে লেখা ছিল, একদল ছাত্রছাত্রী প্রতিজ্ঞা করেছিল, তাদের স্কুলে যেন কোনও শিশু অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়। তারা ঠিক করেছিল, নিজেদের পুরোনো বই, খাতা ও পড়ার উপকরণ সংগ্রহ করে এমন বন্ধুদের সাহায্য করবে, যাদের সেগুলো কেনার সামর্থ্য নেই।

শেষ পাতায় কয়েকজনের নাম ছিল। তার মধ্যে একটি নামের পাশে লেখা—‘আমি কথা দিলাম, একদিন আবার ফিরে এসে এই কাজ শুরু করব।’

নামটি ছিল অনিরুদ্ধ সেন।

অর্ণবের মনে হলো, কাগজের পাতায় যেন বহু বছর আগের কিছু কণ্ঠস্বর ঘুমিয়ে আছে।

সে ছুটে গিয়ে বাংলা শিক্ষিকা শর্মিষ্ঠা দেবীকে চিঠিটি দেখাল।

শিক্ষিকা মন দিয়ে পড়লেন। তারপর ধীরে বললেন, “এই নামটা আমার চেনা মনে হচ্ছে। অনিরুদ্ধ সেন একসময় এই স্কুলের খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পরে তাঁর পরিবার অন্য জায়গায় চলে যায়।”

অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “দিদিমণি, উনি কি সত্যিই ফিরে এসেছিলেন?”

শিক্ষিকা মাথা নাড়লেন।

“তা আমি জানি না। তবে এই প্রতিজ্ঞাটা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত না হয়ে থাকে, তাহলে সেটা জানার চেষ্টা করা যেতে পারে।”

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় অর্ণবের মনে হচ্ছিল, সে যেন কেবল একটি চিঠি খুঁজে পায়নি; খুঁজে পেয়েছে এমন একটি কাজের সূত্র, যা বহু বছর আগে শুরু হওয়ার কথা ছিল।

২. পুরোনো নামের সন্ধান

পরদিন অর্ণব চিঠিটির কথা বন্ধু সোহম ও তনুশ্রীকে জানাল। তারা তিনজন মিলে ঠিক করল, প্রথমে স্কুলের পুরোনো নথিতে অনিরুদ্ধ সেন সম্পর্কে খোঁজ করবে।

প্রধান শিক্ষক অনুমতি দেওয়ায় তারা পুরোনো ভর্তি খাতা ও ছাত্রছাত্রীদের তালিকা দেখতে শুরু করল। অনেক নাম অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়েও গিয়েছিল। তবু একটি খাতায় অনিরুদ্ধের নাম পাওয়া গেল।

সেখানে তাঁর বাবার নাম এবং পুরোনো ঠিকানাও লেখা ছিল।

কিন্তু ঠিকানাটি এখন আর আগের মতো নেই। গ্রামের সেই পাড়ায় নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে, পুরোনো বাড়িগুলোর অনেকগুলো ভেঙে গিয়েছে।

অর্ণব হতাশ হয়ে বলল, “এভাবে কি কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?”

তনুশ্রী বলল, “একেবারে অসম্ভব নয়। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।”

তারা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী নৃপেনবাবুর কাছে গেলেন। তিনি বহু বছর এই স্কুলে কাজ করেছেন।

চিঠিটি দেখে নৃপেনবাবু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“অনিরুদ্ধ! ও খুব ভালো ছেলে ছিল। সব সময় অন্যদের বই ধার দিত। একবার এক সহপাঠীর বই হারিয়ে গিয়েছিল বলে নিজের বই ভাগ করে পড়েছিল।”

অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “উনি এখন কোথায় থাকেন জানেন?”

নৃপেনবাবু বললেন, “অনেক বছর আগে শুনেছিলাম, কলকাতায় চাকরি করেন। ঠিক কোথায়, সেটা জানি না। তবে তাঁর পরিবারের একজন আত্মীয় এই গ্রামেই থাকেন বলে মনে হয়।”

পরের কয়েক দিনে তারা গ্রামের প্রবীণদের কাছ থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করল। কারও মনে ছিল তাঁর বাবার নাম, কারও মনে ছিল তাঁদের বাড়ির পাশের পুরোনো মন্দিরটির কথা।

অবশেষে এক বৃদ্ধ জানালেন, অনিরুদ্ধের পরিবারের এক আত্মীয় এখনও পাশের পাড়ায় থাকেন। তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা যেতে পারে।

কয়েক দিনের মধ্যে অর্ণবদের কাছে একটি ফোন নম্বর এল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রথমে যোগাযোগ করে তাঁদের উদ্দেশ্য জানালেন। তারপর অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো।

ফোনের ওপার থেকে একটি শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“হ্যাঁ, আমি অনিরুদ্ধ বলছি।”

অর্ণব নিজের পরিচয় দিয়ে চিঠিটির কথা জানাল।

কিছুক্ষণ কোনও উত্তর এল না।

তারপর অনিরুদ্ধবাবু ধীরে বললেন, “চিঠিটা এখনও আছে?”

অর্ণব বলল, “হ্যাঁ। আমরা যত্ন করে রেখেছি।”

ওপার থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

“আমি ভেবেছিলাম, ওই প্রতিজ্ঞার কথা সবাই ভুলে গেছে।”

৩. ফিরে আসার দিন

এক সপ্তাহ পর অনিরুদ্ধবাবু স্কুলে এলেন।

তাঁর বয়স এখন চল্লিশের কাছাকাছি। পরনে সাধারণ পোশাক, কাঁধে একটি ব্যাগ। স্কুলের গেট পেরিয়ে মাঠে পা রাখতেই তিনি কিছুক্ষণ থেমে গেলেন।

“কিছুই যেন পুরোপুরি বদলায়নি,” তিনি বললেন। “আবার কত কিছু বদলেও গিয়েছে।”

অর্ণব তাঁকে সেই শ্রেণিকক্ষে নিয়ে গেল, যেখানে চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল।

অনিরুদ্ধবাবু শেষ বেঞ্চটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “এই বেঞ্চেই বসতাম। আর ওই জানালার পাশে বসত রতন।”

তিনি জানালেন, তাঁদের সময়ে রতনের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। বই কেনার টাকা না থাকায় সে প্রায়ই অন্যদের কাছ থেকে বই ধার নিত। একবার সে স্কুল ছেড়ে কাজ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সেই ঘটনায় অনিরুদ্ধ ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তাঁরা ঠিক করেছিলেন, যাদের বই কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য পুরোনো বই সংগ্রহ করবেন। নিজেদের পকেটখরচ থেকেও সামান্য টাকা জমাবেন।

কিন্তু তার কিছুদিন পর অনিরুদ্ধের বাবার বদলি হয়। পরিবারকে অন্য শহরে চলে যেতে হয়। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, পড়াশোনা এবং পরবর্তী জীবনের ব্যস্ততায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।

“আমি ভেবেছিলাম, একদিন ফিরে এসে কাজটা আবার শুরু করব,” অনিরুদ্ধবাবু বললেন। “কিন্তু বছর কেটে গিয়েছিল। তারপর মনে হতো, এত দেরি হয়ে গেছে যে আর ফিরে গিয়ে কী হবে!”

অর্ণব চিঠিটি তাঁর হাতে তুলে দিল।

অনিরুদ্ধবাবু কাগজের শেষ পাতায় নিজের নামের পাশে লেখা বাক্যটি পড়লেন।

‘আমি কথা দিলাম, একদিন আবার ফিরে এসে এই কাজ শুরু করব।’

তাঁর চোখের কোণে জল জমল।

“দেখো, একটা ছোট প্রতিজ্ঞা কত বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকতে পারে!”

অর্ণব বলল, “কিন্তু এখন তো আপনি ফিরে এসেছেন।”

অনিরুদ্ধবাবু ছেলেটির দিকে তাকালেন।

“হ্যাঁ। এবার আর শুধু প্রতিজ্ঞা করে চলে যাব না।”

৪. সাহায্য, কিন্তু সম্মান বজায় রেখে

পরের সপ্তাহে স্কুলে একটি বৈঠক হলো। অনিরুদ্ধবাবু, প্রধান শিক্ষক, কয়েকজন শিক্ষক, অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন, তিনি কিছু অর্থ দিয়ে উদ্যোগটি শুরু করতে চান। তবে তাঁর প্রস্তাব ছিল, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই যেন কাজটির পরিচালনায় অংশ নেয়।

শর্মিষ্ঠা দেবী বললেন, “সাহায্য অবশ্যই দরকার। কিন্তু কারা সাহায্য পাবে, তা নির্ধারণ করার সময় শিশুদের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।”

সবাই একমত হলেন।

সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, প্রথমে স্কুলের শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় বই ও পড়ার উপকরণের ঘাটতি সম্পর্কে অভিভাবকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন। কোনও শিশুকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে তার অভাবের কথা বলতে হবে না।

তারপর পুরোনো কিন্তু ব্যবহারযোগ্য পাঠ্যবই সংগ্রহ করা হবে। বইগুলো শ্রেণি অনুযায়ী সাজানো হবে, প্রয়োজনমতো মেরামত করা হবে এবং শিক্ষকেরা দেখে নেবেন সেগুলো বর্তমান পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মেলে কি না।

যে বইগুলো আর কাজে লাগবে না, সেগুলো জোর করে কাউকে দেওয়া হবে না। আর নতুন বই কেনার প্রয়োজন হলে স্কুলের অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তা করা হবে।

অর্ণব ও তার বন্ধুরা কাজের দায়িত্ব পেল। তারা একটি খাতা তৈরি করল, যেখানে সংগ্রহ করা বই, বইয়ের অবস্থা এবং বিতরণের হিসাব রাখা হতো।

প্রথম সপ্তাহে মাত্র বারোটি বই জমা পড়ল। কিন্তু পরের সপ্তাহে গ্রামের আরও অনেকে এগিয়ে এলেন।

কেউ তাঁর সন্তানের পুরোনো পাঠ্যবই দিলেন। কেউ গল্পের বই দিলেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কয়েকটি অভিধান ও রেফারেন্স বই উপহার দিলেন।

কয়েক মাসের মধ্যে স্কুলে একটি ছোট বই-সহায়তা কেন্দ্র গড়ে উঠল।

অনিরুদ্ধবাবু কোনও বড় নামফলক লাগাতে দিলেন না।

তিনি বললেন, “এটা আমার একার উদ্যোগ নয়। এই কাজ অনেক বছর আগে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী শুরু করতে চেয়েছিল। আজকের ছাত্রছাত্রীরা তাকে বাস্তব করছে। এখানে কোনও একজনের নাম বড় করে লেখার প্রয়োজন নেই।”

৫. রতনের ফিরে আসা

একদিন স্কুলে বই গোছানোর সময় অর্ণব জানতে পারল, অনিরুদ্ধবাবুর পুরোনো বন্ধু রতন এখনও এই অঞ্চলে থাকেন। তিনি এখন একটি ছোট দোকান চালান।

অর্ণবের অনুরোধে অনিরুদ্ধবাবু রতনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

কয়েক দিন পর রতন স্কুলে এলেন।

অনিরুদ্ধবাবুকে দেখে তিনি প্রথমে অবাক হয়ে গেলেন। তারপর দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরোনো বন্ধুত্ব যেন মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এল।

রতন হেসে বললেন, “তুই তো একদিন বলেছিলি, আমাদের বইয়ের ব্যবস্থা করবি। তারপর কোথায় হারিয়ে গেলি?”

অনিরুদ্ধবাবু মাথা নিচু করে বললেন, “হারিয়ে গিয়েছিলাম নিজের জীবন নিয়েই। কিন্তু তোর কথাটা ভুলিনি।”

রতন জানালেন, শেষ পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, পড়াশোনার সুযোগ হারানোর কষ্ট কতটা গভীর।

“আমি চাই না, আমার দোকানে কাজ করতে আসা কোনও ছোট ছেলে শুধু বই কেনার টাকা নেই বলে স্কুল ছেড়ে দিক,” তিনি বললেন।

তিনি নিজের দোকানের এক পাশে একটি ছোট তাক তৈরি করে পুরোনো গল্পের বই রাখার প্রস্তাব দিলেন। যে শিশু বই পড়তে চাইবে, সে দোকানে এসে বই নিয়ে যেতে পারবে এবং পরে ফেরত দিতে পারবে।

স্কুলের শিক্ষকরা এই উদ্যোগের জন্য উপযুক্ত বই বেছে দিলেন। রতন নিজের দোকানের জায়গা দিলেন, আর গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক বইয়ের দেখাশোনায় সাহায্য করতে রাজি হলেন।

অর্ণব বুঝতে পারল, একটি প্রতিজ্ঞা শুধু তার পুরোনো লেখককে ফিরিয়ে আনেনি; বহু বছর আগে যে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটিকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে।

৬. অসমাপ্ত কথার পূর্ণতা

বছরের শেষে স্কুলে একটি ছোট অনুষ্ঠান হলো। সেখানে কোনও বিশাল মঞ্চ ছিল না, কোনও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনও ছিল না। ছিল ছাত্রছাত্রীদের হাতে সাজানো বইয়ের তাক, কিছু চেয়ার আর বহু মানুষের মুখে হাসি।

অনিরুদ্ধবাবু সেই পুরোনো চিঠিটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দিলেন। সেটিকে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হলো, যাতে ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীরাও দেখতে পারে—একসময় তাদেরই মতো কয়েকজন শিক্ষার্থী কী স্বপ্ন দেখেছিল।

অর্ণবকে অনুষ্ঠানে কিছু বলতে বলা হলো।

সে বলল, “আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, বেঞ্চের নিচে পাওয়া চিঠিটি শুধু পুরোনো কাগজ। পরে বুঝেছি, সেটা ছিল এমন একটি কাজের স্মৃতি, যা শেষ হয়নি। আমরা হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কিন্তু আগে কেউ কোনও ভালো কাজের কথা ভেবেছিল বলে সেই কাজ চিরকাল অসমাপ্ত থাকবে, এমন তো নয়।”

সবাই হাততালি দিলেন।

অনুষ্ঠানের শেষে অনিরুদ্ধবাবু শেষ বেঞ্চটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি বেঞ্চের ওপর হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর অর্ণবকে বললেন, “জীবনে অনেক প্রতিজ্ঞা করা হয়। সব প্রতিজ্ঞা পূরণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু কোনও প্রতিজ্ঞা যদি সত্যিই মানুষের উপকার করতে পারে, তাহলে সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে নতুন করে শুরু করা যায়।”

স্কুল থেকে বেরিয়ে অনিরুদ্ধবাবু একবার পিছন ফিরে তাকালেন। জানালা দিয়ে বিকেলের আলো শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে পড়েছে। বেঞ্চগুলো আগের মতোই সারি দিয়ে রাখা।

শুধু একটি জায়গায় পরিবর্তন এসেছে।

শেষ বেঞ্চের নিচে আর কোনও অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা লুকিয়ে নেই।

সেই প্রতিজ্ঞা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বইয়ের পাতায়, ছাত্রছাত্রীদের কাজে এবং গ্রামের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

অর্ণব সেদিন বাড়ি ফিরে নিজের খাতায় একটি বাক্য লিখল—

‘ভালো কাজের সময় কখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। কেউ একজন আবার শুরু করতে পারলেই তার নতুন সকাল আসে।’

নৈতিক শিক্ষা: জীবনের ব্যস্ততায় অনেক ভালো ইচ্ছা অসমাপ্ত থেকে যায়। কিন্তু অতীতের ভুল বা বিলম্বকে অজুহাত না করে, বর্তমানের সামর্থ্য দিয়ে সেই কাজ আবার শুরু করা যায়। আর কোনও ভালো উদ্যোগকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ জরুরি।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে ছোট্ট মানচিত্র বদলে দিয়েছিল একটি পরিবারের ভাগ্য।

১. অচেনা পথের সন্ধানে

পশ্চিম মেদিনীপুরের কাঁসাইপুর গ্রামের মেয়ে পায়েল ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু জানতে ভালোবাসত। অন্যরা যখন বিকেলে মাঠে খেলতে যেত, তখন পায়েল কখনও মায়ের সঙ্গে বাজারে যেত, কখনও বাবার পাশে বসে তাঁর কাজের গল্প শুনত। তার সবচেয়ে ভালো লাগত মানুষের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে।

পায়েলের বাবা শম্ভুনাথ একটি ছোট পরিবহণ সংস্থায় কাজ করতেন। কখনও পণ্য পৌঁছে দিতেন, কখনও চালকদের সঙ্গে গিয়ে বিভিন্ন জায়গার পথ চিনিয়ে দিতেন। তাঁর কাছ থেকেই পায়েল শিখেছিল, কোনও গন্তব্যে পৌঁছতে হলে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হয় না; সঠিক পথও জানতে হয়।

একদিন সন্ধ্যায় বাবা বাড়ি ফিরে খুব চিন্তিত মুখে বসে ছিলেন।

মা জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? শরীর খারাপ?”

শম্ভুনাথ মাথা নাড়লেন।

“শরীর নয়। আজ একটা কাজের সুযোগ হাতছাড়া হলো। শহরের একটি সংস্থায় কয়েকজন কর্মী নেওয়া হচ্ছিল। আমাদের গ্রামের দুজন ছেলে সেখানে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কী কাগজপত্র লাগবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে—কিছুই ঠিকমতো জানতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সময় পেরিয়ে গেল।”

পায়েল পাশেই বসেছিল। সে বলল, “কিন্তু এসব খবর গ্রামের সবাই আগে থেকে জানতে পারে না কেন?”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “খবর পাওয়ারও একটা পথ আছে মা। কারও পরিচিত মানুষ থাকে, কেউ খবরের কাগজ পড়ে, কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানে। আবার অনেকে সুযোগের কথা জানতে জানতে সময় হারিয়ে ফেলে।”

কথাটা পায়েলের মনে গেঁথে গেল।

পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় সে দেখল, গ্রামের দেওয়ালে নানা রকম বিজ্ঞপ্তি লাগানো আছে। কোথাও প্রশিক্ষণের খবর, কোথাও চাকরির বিজ্ঞাপন, কোথাও আবার সরকারি দপ্তরের কোনও বিজ্ঞপ্তির পুরোনো কাগজ ঝুলছে। অনেক বিজ্ঞপ্তিতে যোগাযোগের ঠিকানা থাকলেও সেগুলো পড়ার বা বোঝার মতো ব্যবস্থা ছিল না।

পায়েল ভাবল, গ্রামের মানুষ যদি এক জায়গায় জানতে পারেন কোন সুযোগ কোথায় রয়েছে, তাহলে অনেকের উপকার হতে পারে।

সেই রাতেই সে তার খাতায় একটি পরিকল্পনা লিখল।

তার নাম দিল—‘সুযোগের ঠিকানা’।

২. একটি খাতা থেকে শুরু

পায়েল প্রথমে তার শিক্ষিকা নন্দিতা দেবীর সঙ্গে কথা বলল।

“দিদিমণি, গ্রামের মানুষ কোথায় কী প্রশিক্ষণ হচ্ছে, কোথায় কাজের সুযোগ রয়েছে, কোথায় পড়াশোনার জন্য আবেদন করা যায়—এসব খবর এক জায়গায় পেলে ভালো হতো না?”

নন্দিতা দেবী বললেন, “অবশ্যই ভালো হতো। কিন্তু খবরগুলো নির্ভরযোগ্য হতে হবে। ভুল খবর দিলে মানুষ সময় ও টাকা দুটোই হারাতে পারেন।”

পায়েল মাথা নাড়ল। “আমি সেই কারণেই আপনাকে বলছি। আমি একা সব যাচাই করতে পারব না।”

শিক্ষিকা তার উদ্যোগকে সমর্থন করলেন। স্কুলের গ্রন্থাগারে একটি খাতা রাখার অনুমতি পাওয়া গেল। সেখানে প্রশিক্ষণ, বৃত্তি, চাকরির বিজ্ঞপ্তি এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক সুযোগের তথ্য লেখা হবে।

কিন্তু খাতা রাখলেই তো সবাই জানতে পারবেন না। তাই পায়েল একটি বড় কাগজে গ্রামের সাধারণ মানচিত্র আঁকল। সেখানে বাজার, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডাকঘর এবং বাসস্ট্যান্ড চিহ্নিত করল। মানচিত্রের পাশে লিখল—কোথায় কোন ধরনের তথ্য পাওয়া যাবে।

এটি কোনও সরকারি মানচিত্র ছিল না। ছিল গ্রামের মানুষের সুবিধার জন্য তৈরি একটি সাধারণ নির্দেশিকা।

পায়েলের বন্ধু সুমিত বলল, “মানচিত্রটা সুন্দর হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে চাকরি বা প্রশিক্ষণের খবরের সম্পর্ক কী?”

পায়েল বোঝাল, “মানচিত্রটা মানুষকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে সাহায্য করবে। আর খাতাটা জানাবে, সেখানে যাওয়ার আগে কী তথ্য জেনে নিতে হবে।”

তারা ঠিক করল, স্কুলের গ্রন্থাগারে তথ্য রাখা হবে এবং গ্রামের পাঠাগারের নোটিস বোর্ডে সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হবে। যাঁরা পড়তে পারেন না, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট দিনে স্বেচ্ছাসেবকেরা তথ্য পড়ে শোনাবেন।

কাজটি ছোট ছিল, কিন্তু দায়িত্ব কম ছিল না।

৩. প্রথম ভুল এবং বড় শিক্ষা

প্রথম সপ্তাহেই একটি সমস্যার মুখে পড়ল পায়েল।

একটি বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল, কাছের শহরে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ভর্তি চলছে। পায়েল বিজ্ঞপ্তিটি দেখে খাতায় তথ্য লিখে রাখল। কয়েকজন তরুণ সেই খবর শুনে যোগাযোগ করতে গেলেন।

কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাঁরা জানতে পারলেন, বিজ্ঞপ্তিটি পুরোনো। ভর্তির সময়সীমা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।

গ্রামে ফিরে একজন তরুণ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, “তোমরা যদি খবর ঠিকমতো যাচাই করতে না পারো, তাহলে মানুষকে জানাচ্ছ কেন?”

পায়েল খুব কষ্ট পেল। তার মনে হলো, একটি ভুলের জন্য মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সে নন্দিতা দেবীর কাছে সব কথা খুলে বলল।

শিক্ষিকা বললেন, “ভুল হয়েছে, সেটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যবস্থা উন্নত করাই আসল কাজ।”

পরদিন পায়েল নোটিস বোর্ডে একটি সংশোধনী লিখল। সেখানে জানাল, আগের বিজ্ঞপ্তিটির সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং যাচাই না করে সেটি নথিভুক্ত করা তার ভুল।

এরপর তারা নতুন নিয়ম তৈরি করল।

কোনও সুযোগের খবর প্রকাশের আগে মূল বিজ্ঞপ্তি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করতে হবে। আবেদন করার শেষ তারিখ, যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং কোনও ফি থাকলে তার বিবরণ স্পষ্টভাবে লিখতে হবে। সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন বা অগ্রিম টাকা চাওয়া অনিশ্চিত প্রস্তাব প্রকাশ করা হবে না।

সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব না হলে সেটিকে নিশ্চিত খবর হিসেবে না দেখিয়ে স্পষ্টভাবে জানানো হবে যে আরও যাচাই প্রয়োজন।

পায়েল বুঝল, মানুষের জন্য কাজ করার অর্থ শুধু দ্রুত খবর পৌঁছে দেওয়া নয়; সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়া।

৪. মালতী মাসির আবেদন

একদিন দুপুরে মালতী মাসি স্কুলের গ্রন্থাগারে এলেন। তাঁর বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়েছে। তিনি বাড়িতে রান্না ও পরিচারিকার কাজ করতেন, কিন্তু আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হচ্ছিল।

তিনি পায়েলকে বললেন, “শুনেছি তোমরা কাজ শেখার খবর রাখো। আমার মতো মানুষ কি কোনও প্রশিক্ষণ নিতে পারে?”

পায়েল তাঁকে বসতে দিল।

মালতী মাসি পড়তে পারেন, কিন্তু দীর্ঘ বিজ্ঞপ্তি বুঝতে অসুবিধা হয়। আবেদনপদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতাও কম।

পায়েল প্রথমে তাঁর আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাইল। মালতী মাসি বললেন, তিনি খাবার তৈরি করতে ভালোবাসেন এবং ছোট অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করেছেন। তিনি জানতে চান, খাবার তৈরি ও নিরাপদ খাদ্য পরিচালনা সম্পর্কে কোনও প্রশিক্ষণ আছে কি না।

পায়েল সঙ্গে সঙ্গে কোনও সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিল না। বরং নন্দিতা দেবীর সাহায্যে স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করল।

কয়েক দিনের মধ্যে তারা একটি স্বল্পমেয়াদি খাদ্য-পরিচালনা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির নির্ভরযোগ্য তথ্য পেল। আবেদন করার যোগ্যতা, সময়সীমা, যোগাযোগের ঠিকানা এবং প্রয়োজনীয় নথির তালিকাও সংগ্রহ করল।

পায়েল মালতী মাসিকে তথ্যগুলো বুঝিয়ে দিল। আবেদনপত্র পূরণ করার সময় কোথায় কী লিখতে হবে, সেটাও দেখিয়ে দিল। তবে ব্যক্তিগত নথি নিরাপদে রাখার ব্যাপারে সতর্ক করল এবং কোনও অচেনা ব্যক্তিকে নথি বা টাকা না দিতে বলল।

মালতী মাসি আবেদন করলেন।

কয়েক সপ্তাহ পরে খবর এল, তিনি প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।

সেদিন মালতী মাসি স্কুলে এসে পায়েলের হাত ধরে বললেন, “তুই আমার জন্য কাজটা করে দিসনি মা। তুই আমাকে পথটা চিনিয়ে দিয়েছিস। হাঁটতে হয়েছে আমাকেই।”

পায়েল কথাটির গভীরতা অনুভব করল।

সে বুঝল, কাউকে সাহায্য করার সবচেয়ে ভালো উপায় সব সময় তার হয়ে কাজ করে দেওয়া নয়; অনেক সময় তাকে নিজের কাজটি করার মতো আত্মবিশ্বাস ও তথ্য দেওয়াই যথেষ্ট।

৫. গ্রামের মানচিত্রে নতুন চিহ্ন

মালতী মাসির সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আরও অনেকে ‘সুযোগের ঠিকানা’ সম্পর্কে জানতে চাইলেন।

কেউ জানতে চাইলেন ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তির কথা। কেউ জানতে চাইলেন দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ কোথায় হয়। কেউ আবার ছোট ব্যবসার জন্য কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, তা জানতে চাইলেন।

পায়েল একা সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত না। তাই সে কাজ ভাগ করে দিল।

সুমিত শিক্ষামূলক সুযোগের তথ্য সংগ্রহ করত। রিমি মহিলাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও স্বনির্ভরতার কর্মসূচির খবর খুঁজত। আরেক বন্ধু অর্ক বিজ্ঞপ্তির তারিখ ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতে সাহায্য করত।

তবে তারা কেউ নিজেদের সরকারি প্রতিনিধি বলে পরিচয় দিত না। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিত, এটি ছাত্রছাত্রীদের পরিচালিত একটি তথ্য-সহায়তা উদ্যোগ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, আবেদন গ্রহণ এবং যোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের।

স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা উদ্যোগটির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করলেন। সপ্তাহে একদিন গ্রন্থাগারে এসে গ্রামের মানুষ তথ্য জানতে পারতেন। যাঁদের অনলাইনে আবেদন করতে হতো, তাঁদের শেখানো হতো কীভাবে নিজের মোবাইল ব্যবহার করে নিরাপদে আবেদন করতে হয়।

কাউকে পাসওয়ার্ড বা গোপন যাচাইকরণ কোড অন্যের হাতে দিতে বলা হতো না। প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করার সময় আবেদনকারী নিজেই তা পরীক্ষা করতেন।

ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ নিজেরাও বিজ্ঞপ্তি নিয়ে আসতে শুরু করলেন। কেউ কোনও সুযোগের খবর পেলে তার উৎস জানাতেন। কেউ পুরোনো বিজ্ঞপ্তি সরিয়ে নতুন তথ্য লাগিয়ে দিতেন।

মানচিত্রের পাশে এবার কয়েকটি নতুন চিহ্ন যোগ হলো—শিক্ষামূলক তথ্যের জন্য গ্রন্থাগার, প্রশিক্ষণের তথ্যের জন্য নির্দিষ্ট সহায়তা ডেস্ক এবং সাধারণ আবেদনপদ্ধতি শেখার জন্য সাপ্তাহিক সময়সূচি।

একটি কাগজের মানচিত্র যেন গ্রামের মানুষের কাছে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল।

৬. নিজের পথ খুঁজে পাওয়া

সময়ের সঙ্গে পায়েলেরও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার দিন এগিয়ে এল। ‘সুযোগের ঠিকানা’ চালাতে গিয়ে সে অনেক কিছু শিখেছিল। কিন্তু পড়াশোনায় যেন ক্ষতি না হয়, সে দিকেও নজর দিতে হতো।

একদিন বাবা তাকে বললেন, “মানুষের জন্য কাজ করছিস, সেটা ভালো। কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎটাও গড়তে হবে।”

পায়েল বলল, “আমি জানি বাবা। আমি চাই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। ভবিষ্যতে এমন কাজ করতে চাই, যাতে তথ্য ও শিক্ষার সুযোগ আরও মানুষের কাছে পৌঁছয়।”

বাবা মৃদু হেসে বললেন, “তাহলে নিজের পথটাও ঠিক করে রাখ।”

পরীক্ষার আগে পায়েল উদ্যোগটির দায়িত্ব বন্ধুদের মধ্যে ভাগ করে দিল। একটি নথিতে তারা লিখে রাখল কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কখন পুরোনো বিজ্ঞপ্তি সরাতে হয় এবং কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখতে হয়।

পরীক্ষার পরে পায়েল আরও পড়াশোনার প্রস্তুতি শুরু করল। সে জানত, তার সামনে এখনও অনেক পথ বাকি। কিন্তু নিজের গ্রামেই সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শিখেছে—সঠিক তথ্য মানুষকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

কয়েক মাস পর মালতী মাসি প্রশিক্ষণ শেষ করে ছোট ছোট অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ পেতে শুরু করলেন। তাঁর আয় খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। তিনি অন্য মহিলাদেরও প্রশিক্ষণের খবর জানাতেন।

একদিন তিনি স্কুলে এসে বললেন, “আমার মেয়েও এখন পড়াশোনার পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার কথা ভাবছে। আগে মনে হতো, আমাদের মতো মানুষের জন্য এসব সুযোগ নেই। এখন জানি, খুঁজে দেখতে হয়।”

পায়েল তাঁর কথা শুনে হাসল।

তার মনে পড়ল, বাবার সেই সন্ধ্যার কথা—যেদিন কয়েকজন তরুণ শুধু সঠিক তথ্য না জানার কারণে একটি সুযোগ হারিয়েছিলেন।

সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল একটি ছোট খাতা। তারপর তৈরি হয়েছিল মানচিত্র। আর এখন সেই উদ্যোগ গ্রামের মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে সাহায্য করছে।

বছরের শেষে স্কুলের নোটিস বোর্ডে নতুন একটি বাক্য লেখা হলো—

‘সুযোগ সব সময় আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ে না। কখনও কখনও সঠিক তথ্য খুঁজে নিয়ে আমাদেরই তার কাছে পৌঁছতে হয়।’

পায়েল বাক্যটি পড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

সে জানত, একটি মানচিত্র কাউকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে না, যদি সে নিজে হাঁটতে না চায়। কিন্তু সঠিক পথের সন্ধান পেলে সেই হাঁটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

আর কখনও কখনও, সেই সামান্য সাহায্যই একটি পরিবারের ভাগ্য বদলে দেওয়ার সূচনা করে।

নৈতিক শিক্ষা: সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কাউকে সাহায্য করার সময় শুধু সুযোগের কথা জানানোই যথেষ্ট নয়; সেই তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনীয় পদ্ধতি বুঝিয়ে দেওয়া এবং মানুষকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করাও জরুরি। কারণ প্রকৃত সহায়তা মানুষকে নির্ভরশীল করে না, বরং আত্মনির্ভর হতে শেখায়।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : সাতটি সুরে বাঁধা ছিল সাতটি মানুষের জীবন।।

১. অচেনা কণ্ঠের ডাক

পশ্চিম মেদিনীপুরের শ্যামলপুর গ্রামটি ছিল শান্ত, সবুজ আর সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে ভরা। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে ছোট বাজার। সন্ধ্যা নামলে বাজারের দোকানগুলোতে আলো জ্বলত, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠত, আর মানুষের কথাবার্তায় ধীরে ধীরে দিনের ক্লান্তি মিলিয়ে যেত।

এই গ্রামেরই মেয়ে ইশিতা। বয়স সতেরো। উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল—সে মানুষের কথা মন দিয়ে শুনত।

বাসে যেতে যেতে দুজনের কথোপকথন, বাজারে সবজি বিক্রেতার দুশ্চিন্তা, স্কুলের পরিচারিকার সংসারের গল্প কিংবা মাঠ থেকে ফিরে আসা কৃষকের দীর্ঘশ্বাস—সব কিছুই তার কানে আসত। অন্যরা যেখানে কথাগুলো শুনে ভুলে যেত, ইশিতা সেখানে ভাবতে বসত।

তার মনে হতো, প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন কিছু গল্প থাকে, যা কেউ শোনে না। অথচ সেই গল্পগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সাহস, অভিজ্ঞতা আর বেঁচে থাকার শিক্ষা।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে দেখল, বাজারের এক কোণে একটি ছোট দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দোকানটির মালিক নিতাইবাবু বহু বছর ধরে সেখানে পুরোনো বই, খাতা আর লেখার সরঞ্জাম বিক্রি করতেন। কিন্তু নতুন দোকান আর বড় বিপণির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তিনি ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছিলেন।

ইশিতা জিজ্ঞেস করল, “কাকু, দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন?”

নিতাইবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর চালাতে পারছি না মা। ক্রেতা কমে গেছে। সংসার চালাতে হবে তো!”

ইশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। দোকানের এক কোণে পুরোনো কাগজে মোড়া একটি ছোট রেডিও রাখা ছিল।

সে জিজ্ঞেস করল, “ওটা কী?”

নিতাইবাবু হেসে বললেন, “অনেক পুরোনো রেডিও। একসময় সন্ধ্যায় এটা চালিয়ে গান শুনতাম। এখন আর চলে না।”

ইশিতা রেডিওটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটি ভাবনা অনুভব করল। যদি গ্রামের মানুষের কথাগুলো রেকর্ড করে শোনানো যায়? যদি গ্রামের ছোট ছোট উদ্যোগ, অভিজ্ঞতা, সমস্যা আর সাফল্যের গল্প সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়?

সেদিন বাড়ি ফিরে সে একটি খাতায় লিখল—

‘আমাদের গ্রামের কথা, আমাদের মানুষের মুখে।’

তারপর নিচে একটি নাম লিখল—‘সাত সুর’।

কেন সাত সুর? কারণ তার বিশ্বাস ছিল, গ্রামের মানুষের জীবন আলাদা হলেও তাদের আশা, দুঃখ, ভালোবাসা আর লড়াই কোথাও না কোথাও একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায়।

২. প্রথম কণ্ঠস্বর

পরদিন ইশিতা তার বন্ধু অয়ন, রিমি ও শুভকে পরিকল্পনাটি জানাল।

অয়ন বলল, “রেডিও স্টেশন খুলবি নাকি?”

ইশিতা হেসে বলল, “না রে, বড় কিছু নয়। মোবাইলে মানুষের কথা রেকর্ড করব। তারপর অনুমতি নিয়ে ছোট ছোট অডিও তৈরি করব। স্কুলের অনুষ্ঠান, গ্রামের সভা কিংবা অনলাইনে শোনানো যাবে।”

রিমি বলল, “কিন্তু মানুষ নিজেদের কথা বলতে চাইবে?”

“চেষ্টা করে দেখি,” উত্তর দিল ইশিতা।

প্রথমে তারা নিতাইবাবুর দোকানে গেল। তাঁর অনুমতি নিয়ে ইশিতা মোবাইলে কথোপকথন রেকর্ড করল।

নিতাইবাবু বললেন, কীভাবে তাঁর বাবা এই দোকান শুরু করেছিলেন, কীভাবে তিনি ছোটবেলায় বইয়ের গন্ধে বড় হয়েছেন এবং কীভাবে একসময় গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলের বই কিনতে তাঁর দোকানে ভিড় করত।

কথা বলতে বলতে তাঁর গলা ভারী হয়ে এল।

“দোকানটা শুধু ব্যবসা ছিল না মা। কত ছেলেমেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টেছে! কারও কাছে টাকা না থাকলে পরে দেওয়ার কথা বলেছি। এখন ভাবি, সব শেষ হয়ে গেল।”

ইশিতা রেকর্ডিং বন্ধ করে বলল, “সব শেষ হয়নি কাকু। আপনার গল্পটা অনেকের জানা দরকার।”

পরের কয়েক দিনে তারা আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলল।

প্রথম জন ছিলেন কমলা দেবী, যিনি বাড়িতে খাবার তৈরি করে বিক্রি করতেন। দ্বিতীয় জন ছিলেন কৃষক মনোরঞ্জনবাবু, যিনি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যেও চাষ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃতীয় জন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ডাককর্মী সুধীরবাবু, যাঁর জীবনের বড় অংশ কেটেছে মানুষের খবর পৌঁছে দিতে।

প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কিন্তু প্রতিটি গল্পের মধ্যে ছিল এমন কিছু কথা, যা অন্যদের ভাবাতে পারে।

ইশিতা বুঝল, ভালোভাবে শুনতে পারলে সাধারণ মানুষের জীবনও অসাধারণ হয়ে ওঠে।

৩. ভুল বোঝাবুঝির ঝড়

‘সাত সুর’-এর প্রথম অডিওটি তৈরি হতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগল। অয়ন শব্দ পরিষ্কার করল, রিমি ছোট্ট পরিচিতি লিখল, আর শুভ গ্রামের কয়েকজনকে অডিওটি শোনানোর ব্যবস্থা করল।

নিতাইবাবুর গল্প শুনে অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। কেউ বললেন, “এই দোকান থেকে আমিও ছোটবেলায় বই কিনেছি।” কেউ আবার তাঁর দোকানে গিয়ে কিছু খাতা কিনলেন।

নিতাইবাবুর মুখে আবার হাসি ফুটল।

কিন্তু সব প্রতিক্রিয়া ভালো ছিল না।

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বললেন, “এভাবে মানুষের ব্যক্তিগত কথা প্রচার করা ঠিক নয়। কাল যদি কেউ অন্যের কথা রেকর্ড করে ভুলভাবে ছড়ায়?”

কথাটি ইশিতার মনে দাগ কাটল। সে বুঝল, মানুষের গল্প প্রকাশ করা মানে শুধু রেকর্ড করা নয়; এর সঙ্গে দায়িত্বও জড়িয়ে আছে।

তারপর একটি অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দিল। গ্রামের এক ব্যক্তি অডিওর একটি অংশ শুনে ভুল বুঝলেন। তাঁর মনে হলো, নিতাইবাবুর ব্যবসা বন্ধ হওয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট দোকানদার দায়ী বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

অথচ অডিওতে এমন কোনও কথা ছিল না।

ইশিতা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে ভাবল, তার উদ্যোগের কারণে যদি কারও সম্মানহানি হয়, তাহলে এই কাজ বন্ধ করে দেওয়াই ভালো।

সন্ধ্যায় সে শিক্ষিকা মধুমিতা দেবীর কাছে গেল।

সব শুনে শিক্ষিকা বললেন, “মানুষের কথা তুলে ধরার ক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সঠিকভাবে কথা তুলে ধরা। তোমাদের কয়েকটি নিয়ম তৈরি করতে হবে।”

“কী রকম নিয়ম, দিদিমণি?”

“প্রথমত, যার কথা রেকর্ড করবে, তার স্পষ্ট অনুমতি নেবে। দ্বিতীয়ত, প্রকাশের আগে তাকে রেকর্ডিং শুনিয়ে দেবে। তৃতীয়ত, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে যাচাই না করে প্রচার করবে না। আর চতুর্থত, কারও ব্যক্তিগত তথ্য তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করবে না।”

ইশিতা মন দিয়ে কথাগুলো শুনল।

সেদিনই তারা ‘সাত সুর’-এর জন্য কয়েকটি নীতি লিখে ফেলল। ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি পরিষ্কার করতে তারা নিতাইবাবুর সঙ্গে কথা বলল এবং অডিওর সম্পূর্ণ অংশ আবার শোনাল। প্রয়োজনে ব্যাখ্যাও প্রকাশ করল।

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো।

ইশিতা শিখল, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই কাজ নিখুঁত হয় না। ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং সংশোধন করাও দায়িত্বের অংশ।

৪. সাতটি জীবনের গল্প

পরবর্তী দুই মাসে ‘সাত সুর’ আরও বড় হয়ে উঠল। তারা কোনও পেশাদার সংবাদমাধ্যম ছিল না। ছিল কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর ছোট্ট উদ্যোগ। তবু তাদের কাজের মধ্যে যত্ন ছিল।

প্রথম গল্পটি ছিল নিতাইবাবুর।

দ্বিতীয় গল্পে কমলা দেবী জানালেন, কীভাবে অল্প উপকরণ দিয়ে তিনি বাড়িতে খাবার তৈরি করে সংসারের আয় বাড়িয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা শুনে গ্রামের আরও কয়েকজন মহিলা নিজেদের তৈরি খাবার বিক্রি করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করলেন।

তৃতীয় গল্পটি ছিল মনোরঞ্জনবাবুর। তিনি বললেন, চাষের ক্ষেত্রে আগাম পরিকল্পনা, মাটির অবস্থা বোঝা এবং খরচের হিসাব রাখা কতটা জরুরি। ইশিতা তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে নিজের কোনও অনুমান যোগ করল না; বরং কৃষি-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য স্থানীয় কৃষি দপ্তরের পরামর্শ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করল।

চতুর্থ গল্পে সুধীরবাবু তাঁর চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা শোনালেন। মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার সময় কতবার তিনি বিপদে পড়েছেন, কতবার অপরিচিত মানুষের সাহায্য পেয়েছেন—সব কথা বললেন।

পঞ্চম গল্পটি ছিল এক তরুণী নার্সের, যিনি দূরের হাসপাতালে কাজ করতেন। তিনি জানালেন, রোগীর পরিবারের সঙ্গে ধৈর্য ধরে কথা বলা চিকিৎসার পরিবেশকে কীভাবে সহজ করতে পারে।

ষষ্ঠ গল্পে গ্রামের এক তরুণ বলল, পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর কীভাবে সে নিজের ভুল বিশ্লেষণ করে আবার পড়াশোনা শুরু করেছিল। সে স্পষ্ট করে জানাল, সবার সাফল্যের পথ এক নয়; তাই অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে নিজের অগ্রগতি দেখা জরুরি।

সপ্তম গল্পটি ছিল গ্রামের এক বৃদ্ধা, সরস্বতী দেবীর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, “মানুষকে সাহায্য করা ভালো, কিন্তু যে সাহায্য করে, তার বিশ্রামও দরকার। নিজের যত্ন নিতে ভুলে গেলে অন্যের যত্ন নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়।”

এই কথাটি ইশিতার মনে গভীরভাবে থেকে গেল।

সাতটি গল্পের প্রতিটিই যেন জীবনের আলাদা একটি দরজা খুলে দিল।

তাদের অডিও শোনার জন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অপেক্ষা করতে শুরু করল। গ্রামের কয়েকজন প্রবীণও জানতে চাইলেন, পরের গল্পটি কার হবে।

কেউ কেউ নিজেদের অভিজ্ঞতা শোনানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তবে ইশিতা একটি বিষয় সব সময় মনে রাখত—কেউ গল্প বলতে না চাইলে তাকে কখনও চাপ দেওয়া যাবে না।

৫. যে গল্পটি কেউ বলতে চাইছিল না

একদিন রিমি খবর দিল, গ্রামের প্রান্তে থাকা এক যুবক, নাম দেবাশিস, সম্প্রতি কাজ হারিয়েছেন। তিনি আগে একটি ছোট কারখানায় কাজ করতেন। কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি নতুন কাজ খুঁজছেন।

রিমির ইচ্ছা ছিল তাঁর গল্প রেকর্ড করার। কিন্তু ইশিতা প্রথমে রাজি হলো না।

“উনি যদি নিজের কথা বলতে না চান?”

রিমি বলল, “তাহলে রেকর্ড করব না। শুধু একবার কথা বলে দেখতে পারি।”

তারা দেবাশিসের সঙ্গে দেখা করল। প্রথমে তিনি কথা বলতে চাননি। তাঁর মনে হচ্ছিল, কাজ হারানোর কথা প্রকাশ করলে মানুষ তাঁকে ব্যর্থ ভাববে।

ইশিতা বলল, “আপনাকে নিজের কথা বলতেই হবে, এমন নয়। আপনি চাইলে আমরা চলে যাব। শুধু এটুকু বলতে চাই, কাজ হারানো মানেই একজন মানুষের মূল্য শেষ হয়ে যাওয়া নয়।”

দেবাশিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আমি কাজ হারিয়েছি, কিন্তু কাজ করার ইচ্ছা হারাইনি। সমস্যা হলো, কোথা থেকে আবার শুরু করব বুঝতে পারছি না।”

তাঁর গল্প রেকর্ড করা হলো না। বরং তাঁর অনুমতি নিয়ে ইশিতা ও বন্ধুরা স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার প্রস্তাব দিল।

তারা একটি স্থানীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করল। সেখানে কয়েকটি কাজের উপযোগী প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেল। দেবাশিসের যোগ্যতার সঙ্গে মেলে এমন একটি সুযোগের খবর তাঁকে জানানো হলো। পরে তিনি সেখানে যোগাযোগ করলেন।

কয়েক সপ্তাহ পর দেবাশিস নিজেই ‘সাত সুর’-এর কাছে ফিরে এলেন।

তিনি বললেন, “এবার আমি আমার গল্প বলতে চাই। তবে কাজ পাওয়ার গল্প নয়, কাজ খুঁজতে গিয়ে যে ভুলগুলো করেছি, সেগুলোও বলতে চাই। অন্য কেউ যেন সেগুলো থেকে শিখতে পারে।”

সেদিন ইশিতা বুঝল, মানুষের গল্পের মূল্য শুধু তার প্রকাশে নয়, তার পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও রয়েছে।

৬. কণ্ঠস্বরের বাইরে

বছর ঘুরতে চলল। ‘সাত সুর’ গ্রামের পরিচিত একটি নাম হয়ে উঠল। তারা কখনও নিয়মিত অনুষ্ঠান করার প্রতিশ্রুতি দেয়নি, কারণ সবাই পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তবু মাসে অন্তত দুটো নতুন গল্প প্রকাশ করার চেষ্টা করত।

একদিন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাদের একটি বিশেষ পর্বের আয়োজন করা হলো। সেখানে সাতজন গল্পদাতা নিজেরাই উপস্থিত ছিলেন।

নিতাইবাবু জানালেন, তিনি দোকানটি পুরোপুরি বন্ধ করেননি। এখন সীমিত পরিসরে বই-খাতা বিক্রি করেন, পাশাপাশি ছোটদের পুরোনো বই বিনিময়ের সুযোগও দেন।

কমলা দেবী তাঁর খাবারের কাজ একটু বাড়িয়েছেন। মনোরঞ্জনবাবু গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় শুরু করেছেন। সুধীরবাবু ছোটদের চিঠি লেখার পুরোনো কৌশল শেখান। নার্সটি স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা নিয়ে স্কুলে কথা বলতে রাজি হয়েছেন।

দেবাশিসও নতুন কাজের সুযোগ পেয়েছেন। তিনি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে বললেন, “কেউ যখন আমার সমস্যার কথা শুনতে চেয়েছিল, তখন মনে হয়েছিল আমি একা নই। এই অনুভূতিটাই আমাকে আবার চেষ্টা করতে সাহায্য করেছে।”

শেষে ইশিতাকে কিছু বলতে বলা হলো।

সে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল, “আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, মানুষের গল্প রেকর্ড করব। পরে বুঝেছি, শুধু গল্প শোনানোই আমাদের কাজ নয়। কাউকে বিচার না করে শোনা, তথ্য যাচাই করা, মানুষের সম্মান রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সঠিক সাহায্যের পথ খুঁজে দেওয়াও জরুরি।”

তারপর সে একটু থেমে বলল, “আমাদের গ্রামের প্রত্যেক মানুষই একটা করে সুর। কেউ আনন্দের, কেউ সংগ্রামের, কেউ অভিজ্ঞতার। একা একা সেই সুরগুলো হয়তো আলাদা শোনায়। কিন্তু সবাইকে সম্মান দিয়ে শুনলে বোঝা যায়, তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য বন্ধন রয়েছে।”

অনুষ্ঠান শেষে ইশিতা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। দূরে বাজারের আলো জ্বলতে শুরু করেছে।

রাস্তার পাশে নিতাইবাবুর দোকানটি এখনও দাঁড়িয়ে। দোকানের সামনে কয়েকজন স্কুলছাত্র বইয়ের পাতা উল্টে দেখছে। তাদের হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে।

ইশিতা থেমে তাকাল।

তার মনে হলো, মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো সব সময় বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। কিছু গল্প লুকিয়ে থাকে ছোট দোকানে, কৃষকের মাঠে, হাসপাতালের করিডরে কিংবা ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানো কোনও মানুষের মনে।

সেই গল্পগুলো শোনার জন্য দরকার শুধু একটি খোলা মন।

আর কখনও কখনও, একটি ছোট্ট উদ্যোগই বহু মানুষের কণ্ঠস্বরকে একসঙ্গে বেঁধে দিতে পারে।

নৈতিক শিক্ষা: অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা, তার অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা এবং যাচাই না করে কোনও তথ্য প্রচার না করা—এসবই দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মানুষের গল্প শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে তা অন্যকে সাহস দিতে পারে, ভুল ধারণা ভাঙতে পারে এবং নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

অন্ধকার ঘরের তেরো নম্বর দরজা (তৃতীয় ও শেষ পর্ব: শেষ দরজার ওপারে)।

“দাদা, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না?”

দরজার ওপার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠটা অরিত্রর বুকের ভিতর কাঁপন ধরিয়ে দিল।

সে মৃণালিনীর দিকে তাকাল। তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে তিনি কাঁপছেন।

“মা, দরজার বাইরে কে?”

মৃণালিনী উত্তর দিলেন না।

অরিত্র দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু হাতল স্পর্শ করার আগেই মা তার হাত চেপে ধরলেন।

“খুলিস না!”

“কেন? বাইরে যে তোমার মেয়ে বলে দাবি করছে!”

“কারণ আমি জানি না, ও সত্যিই আমার মেয়ে কি না।”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তুমি নিজেই তো বললে, ও ফিরে এসেছে!”

মৃণালিনী অসহায় চোখে ছেলের দিকে তাকালেন।

“আমি অনেক বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। কিন্তু এত বছর পর যে ফিরে আসে, তাকে চিনতে পারা আর তার পরিচয় নিশ্চিত করা এক কথা নয়।”

বাইরে থেকে আবার শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

“মা, তুমি কি এখনও আমাকে ভয় পাও? তুমি তো বলেছিলে, একদিন সব সত্যি প্রকাশ করবে।”

অরিত্রর মনে হল, দরজার ওপারের মেয়েটি তাদের প্রতিটি কথা শুনতে পাচ্ছে।

সে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, “তোমার মেয়ের নাম কী?”

মৃণালিনী চোখ মুছে বললেন, “অদিতি।”

“সে কোথায় ছিল এতদিন?”

“আজ থেকে আটাশ বছর আগে, এই বাড়িতেই তার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু জন্মের পরেই তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।”

অরিত্রর হাত থেকে ডায়েরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“তাহলে ডায়েরিতে যে দুটো শিশুর ছবি রয়েছে…”

“একজন অদিতি। অন্যজন তুমি।”

“কিন্তু আমার নাম তো অদ্বৈত মুখার্জি!”

মৃণালিনী মাথা নাড়লেন।

“তোমার জন্মের সময় নাম রাখা হয়েছিল অদ্বৈত। কিন্তু তোমাকে অন্য একটি পরিচয়ে বড় করা হয়। আর অদিতিকে মৃত বলে দেখানো হয়েছিল। আসল কারণটা আমি এত বছর তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছি।”

অরিত্র মায়ের হাত ছেড়ে দিল।

“কেন? কেন আমার জীবন নিয়ে এত বড় মিথ্যে বললে?”

মৃণালিনী এবার আর চোখের জল আটকে রাখতে পারলেন না।

“কারণ তোমার দাদু নীলমাধব সেন বিশ্বাস করতেন, তাঁর পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারীকে বাঁচাতে হলে অন্য একটি শিশুর পরিচয় মুছে দিতে হবে। তিনি সম্পত্তির জন্য, নিজের অপরাধ লুকোনোর জন্য, এমনকী মানুষের জীবন নিয়েও খেলতে প্রস্তুত ছিলেন।”

“তাহলে বাবা?”

“তোমার বাবা অরিন্দম সেন নীলমাধবের ছেলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাঁর বড় ভাইয়ের সন্তান। এই বাড়ির সম্পত্তির প্রকৃত উত্তরাধিকারী ছিলেন অরিন্দম। নীলমাধব সেই সত্য মেনে নিতে পারেননি। সম্পত্তি নিজের দখলে রাখতে তিনি একের পর এক নথি বদলেছিলেন।”

অরিত্রর মনে পড়ল, তেরো নম্বর ঘরে দেখা সেই মানুষটির কথা, যিনি নিজেকে তার বাবা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।

“তাহলে যে মানুষটিকে আমি ঘরে দেখেছিলাম, তিনি কে?”

মৃণালিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“আমি জানি না। তবে আমার ধারণা, তিনি অরিন্দমের মতো দেখতে একজন মানুষ। নীলমাধবের পুরোনো সহযোগী। তোমাকে ভয় দেখিয়ে এই বাড়ি থেকে দূরে রাখাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।”

অরিত্র বলল, “কিন্তু আয়নায় আমার মৃত মুখ দেখলাম কেন?”

“কারণ তোমার নামে একটি মৃত্যুসনদ তৈরি হয়েছিল। তুমি যখন ছোট, তখন তোমার পরিচয় বদলানোর সময় সেই নথি তৈরি করা হয়। তেরো নম্বর ঘরে থাকা আয়নার পিছনে নীলমাধব নথিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে তোমার ছবি ও মৃত্যুসনদ ছিল। তুমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলে, আলো আর কাচের প্রতিফলনে সেই পুরোনো ছবির সঙ্গে নিজের মুখ মিলিয়ে ফেলেছিলে। ভয় আর অন্ধকার তোমাকে এমন কিছু দেখিয়েছে, যা বাস্তবের চেয়েও ভয়ংকর মনে হয়েছে।”

দরজার বাইরে এবার নীরবতা।

তারপর মেয়েটির কণ্ঠ শোনা গেল।

“দাদা, তুমি সবটা এখনও জানো না।”

অরিত্র দরজার কাছে গিয়ে বলল, “তুমি যদি সত্যিই অদিতি হও, তাহলে প্রমাণ দাও।”

কয়েক সেকেন্ড পর দরজার নীচ দিয়ে একটি পুরোনো পিতলের লকেট গড়িয়ে এল।

মৃণালিনী লকেটটি দেখেই চিৎকার করে উঠলেন।

“অদিতি!”

তিনি ছুটে দরজা খুলে দিলেন।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল এক তরুণী। বয়স প্রায় আটাশ। পরনে ধূসর শাড়ি, কাঁধ পর্যন্ত চুল। মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

মৃণালিনী তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

“আমার মেয়ে! আমার মেয়ে ফিরে এসেছে!”

অদিতি মায়ের কাঁধে মাথা রাখল। তারপর অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, দাদা?”

অরিত্র ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আমি তোমাকে কোনওদিন দেখিনি।”

“দেখেছ। ছোটবেলায় তুমি আমার হাত ধরে এই বাড়ির উঠোনে হাঁটতে। কিন্তু তোমার যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন আমাকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সবাইকে বলা হয়, আমি মারা গেছি।”

“কে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল?”

“কমলিনী।”

অরিত্র চমকে উঠল।

“তেরো নম্বর বাড়ির সেই বৃদ্ধা?”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“তিনি আমাকে মানুষ করেছেন। নীলমাধবের পরিকল্পনা জানার পর তিনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। আমার পরিচয় বদলে অন্য একটি পরিবারে আমাকে বড় হতে দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে তিনি আমাকে সব সত্যি জানান। তারপর আমি ফিরে আসি।”

“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে?”

“এই শহরেই। তোমাদের কাছাকাছি। কিন্তু তোমাদের সামনে আসার সাহস হয়নি। কারণ নীলমাধবের সহযোগীরা এখনও সক্রিয় ছিল।”

অরিত্রর মাথায় হঠাৎ একটি প্রশ্ন এল।

“কমলিনী কোথায়?”

অদিতির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“তিনি আর বেঁচে নেই।”

“কী!”

“দুদিন আগে তাঁকে তেরো নম্বর বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ বলেছে, স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু আমি জানি, তিনি কিছু নথি লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেই নথি খুঁজতে গিয়েই তাঁকে আর জীবিত দেখিনি।”

অরিত্র বুঝতে পারল, রহস্যের শেষ এখনও হয়নি।

সে ডায়েরিটা টেবিলের উপর রাখল।

“তাহলে আমাদের এখন কী করতে হবে?”

অদিতি বলল, “তেরো নম্বর ঘরে ফিরে যেতে হবে। সেখানে শেষ নথিটা রয়েছে। সেটি না পেলে আমাদের পরিচয়ের সত্য কোনওদিন প্রমাণ করা যাবে না।”

মৃণালিনী আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন।

“না! তোমরা কেউ ওই বাড়িতে যাবে না। তোমাদের বাবা ওই বাড়ির সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আমি আর কাউকে হারাতে চাই না।”

অরিত্র মায়ের কাছে এগিয়ে গেল।

“মা, তুমি আমাদের এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছ। এবার আমাদের নিজেদের সত্যটা জানার অধিকার দাও।”

মৃণালিনী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আলমারি থেকে একটি ছোট্ট চাবি বের করে দিলেন।

“এটা তোমাদের বাবার কাছে ছিল। মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যেদিন অদিতি ফিরে আসবে, সেদিন এই চাবি তোমাদের হাতে দিতে।”

অরিত্র চাবিটা হাতে নিল।

তার গায়ে খোদাই করা একটি সংখ্যা—

১৩।


সেই রাতেই তিনজন পৌঁছল তেরো নম্বর বাড়িতে।

বাড়ির ভিতর আগের মতোই নিস্তব্ধ। কিন্তু এবার অরিত্রর মনে ভয় ছিল না। ছিল সত্য জানার তীব্র ইচ্ছা।

তারা সোজা দোতলায় উঠল। করিডরের শেষ প্রান্তে সেই দরজা। দরজায় লেখা—১৩।

অরিত্র চাবিটা তালায় ঢোকাল।

খট করে শব্দ হল।

দরজা খুলে গেল।

ঘরের ভিতরে এবার আর কোনও অদ্ভুত সিঁড়ি ছিল না। ছিল একটি পুরোনো কাঠের আলমারি, একটি আয়না এবং দেওয়ালের পাশে রাখা লোহার সিন্দুক।

অদিতি বলল, “কমলিনী বলেছিলেন, সিন্দুকের ভিতরেই সব প্রমাণ রয়েছে।”

অরিত্র চাবি দিয়ে সিন্দুক খুলল।

ভিতরে তিনটি জিনিস।

একটি মোটা খাতা, কয়েকটি হাসপাতালের নথি এবং একটি খাম।

খামের উপরে লেখা—

‘আমার সন্তানদের জন্য—নীলমাধব সেন।’

অরিত্র খাম খুলল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“অদ্বৈত ও অদিতি,

যদি তোমরা এই চিঠি পড়ো, তবে বুঝতে হবে আমি আর বেঁচে নেই।

আমি তোমাদের জন্মের সময় যে কাজ করেছি, তার কোনও ক্ষমা নেই। সম্পত্তির লোভে আমি তোমাদের পরিচয় বদলেছি। একজনকে অন্য নামে বড় হতে বাধ্য করেছি, অন্যজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেছি। তোমাদের মায়ের অসহায়তার সুযোগ নিয়েছি।

আমি ভেবেছিলাম, সব নথি বদলে দিলে সত্যকে মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু সত্যকে মুছে ফেলা যায় না। শুধু তার সামনে দাঁড়াতে দেরি করা যায়।

অরিন্দম আমার অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম। সেই সংঘর্ষেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তোমাদের মা কোনও অপরাধ করেননি। তিনি শুধু সন্তানদের বাঁচাতে চেয়েছিলেন।

আমি জানি, এই চিঠি পড়ে তোমরা আমাকে ক্ষমা করবে না। তবু আমার শেষ ইচ্ছা—তোমরা যেন একে অপরকে হারিয়ে না ফেলো।

এই বাড়ির তেরো নম্বর দরজার পিছনে শুধু একটি ঘর নেই। আছে আমার অপরাধের ইতিহাস।

তোমরা যদি সত্যকে প্রকাশ করো, তবে হয়তো আমার নাম ইতিহাসে অপরাধী হিসেবেই লেখা থাকবে।

সেই শাস্তি আমি মেনে নিলাম।

নীলমাধব সেন।”

চিঠিটা পড়ে ঘরে নেমে এল গভীর নীরবতা।

মৃণালিনী চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অদিতি তাঁর হাত ধরল।

অরিত্র এবার হাসপাতালের নথিগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল। সেখানে দুটো জন্মের রেকর্ড, পরিচয় বদলের কাগজ এবং নীলমাধবের স্বাক্ষর করা নির্দেশপত্র ছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিটি খাতার শেষ পাতায় লুকিয়ে রাখা।

সেখানে লেখা ছিল—

‘অরিন্দম সেনের মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়।’

তার নীচে কয়েকটি নাম, তারিখ এবং একটি ঠিকানা।

অরিত্র ঠিকানাটা পড়ে থমকে গেল।

সেটি ছিল কলকাতার একটি পুরোনো নার্সিংহোমের ঠিকানা। নথি অনুযায়ী, অরিন্দমের মৃত্যুর রাতেই সেখানে একজন অজ্ঞাতপরিচয় রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল। রোগীর নাম লেখা—‘অরিন্দম সেন’।

কিন্তু সেই রোগীকে তিন দিন পর অন্য একটি পরিচয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অরিত্রর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“তার মানে বাবা হয়তো দুর্ঘটনার পরেও বেঁচে ছিলেন!”

মৃণালিনী নথিটা হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগলেন।

“আমি জানতাম না…”

অদিতি বলল, “তাহলে যে মানুষটিকে তুমি ঘরে দেখেছিলে, তিনি শুধু বাবার মতো দেখতে কেউ নাও হতে পারেন। সত্যিটা এখনও অসম্পূর্ণ।”

ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনের দরজায় শব্দ হল।

তারা ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ মানুষ।

সাদা পাঞ্জাবি, মুখে গভীর বলিরেখা, ডান কপালে ক্ষতচিহ্ন।

অরিত্রর ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“বাবা?”

বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“হ্যাঁ, অরিত্র। আমি তোমার বাবা—অরিন্দম সেন।”

মৃণালিনী তাঁর দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন।

“তুমি… তুমি বেঁচে আছ?”

অরিন্দমের চোখে জল।

“আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু তোমাদের কাছে ফিরতে পারিনি। নীলমাধবের লোকেরা আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আমাকে অন্য পরিচয়ে বহু বছর লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। কমলিনীই আমাকে বাঁচিয়েছিলেন।”

অরিত্র বাবার দিকে এগিয়ে গেল।

“তাহলে এত বছর আমাদের খুঁজলে না কেন?”

অরিন্দম মাথা নিচু করলেন।

“খুঁজেছি। কিন্তু তোমাদের কাছে পৌঁছলেই তোমাদের বিপদ বাড়ত। আমি অপেক্ষা করেছি, যতদিন না তোমরা নিজেরাই সত্যের কাছে পৌঁছতে পারো।”

অরিত্র বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বারো বছর ধরে যে শূন্যতা তার ভিতরে ছিল, সেই মুহূর্তে তা যেন ভেঙে পড়ল।

কিন্তু অরিন্দমের মুখে আনন্দের সঙ্গে ভয়ের ছায়াও ছিল।

তিনি বললেন, “আমাদের হাতে সময় খুব কম। নীলমাধবের সব সহযোগী এখনও ধরা পড়েনি। এই নথি নিয়ে আমাদের পুলিশের কাছে যেতে হবে।”

অরিত্র মাথা নাড়ল।

“এবার আর কেউ আমাদের থামাতে পারবে না।”


পরের কয়েক সপ্তাহে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।

অরিত্র ও অদিতির দেওয়া নথির ভিত্তিতে পুলিশ পুরোনো মৃত্যুসনদ, জন্মের রেকর্ড বদল এবং সম্পত্তি জালিয়াতির তদন্ত শুরু করল। নীলমাধব সেনের একাধিক সহযোগী গ্রেপ্তার হল। অরিন্দমের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগও নতুন করে তদন্তের আওতায় এল।

অরিত্র নিজের আসল পরিচয়ের প্রমাণ পেল। সে জানল, তার জন্মের সময় নাম রাখা হয়েছিল অদ্বৈত মুখার্জি, কিন্তু তার মায়ের ইচ্ছায় পরে সে অরিত্র সেন নামে বড় হয়েছে। অদিতি ফিরে পেল নিজের জন্মের নথি এবং পরিবারের পরিচয়।

তবে তারা দুজনেই ঠিক করল, যে নামেই মানুষ তাদের চিনুক, তারা একে অপরকে হারাবে না।

একদিন সন্ধ্যায় চারজন—অরিত্র, অদিতি, মৃণালিনী ও অরিন্দম—তেরো নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

পুলিশ বাড়িটি সিল করে দিয়েছে। বাড়ির ভিতরের নথি আদালতের হেফাজতে। বহু বছর ধরে যে বাড়ির সামনে দাঁড়ালে মানুষ ভয়ে রাস্তা বদলাত, সেই বাড়ির গেট আজ প্রথমবারের মতো খোলা ছিল।

অদিতি অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি মনে করো, বাড়িটায় সত্যিই কোনও অলৌকিক ব্যাপার ছিল?”

অরিত্র মৃদু হাসল।

“আমি জানি না। হয়তো অন্ধকার, ভয় আর মানুষের মিথ্যে মিলে এমন কিছু তৈরি করেছিল, যাকে আমরা অলৌকিক বলে মনে করেছি। কিন্তু একটা কথা বুঝেছি—সবচেয়ে ভয়ংকর ভূত মানুষের অতীত। কারণ সে বারবার ফিরে আসে, যতক্ষণ না আমরা তার মুখোমুখি হই।”

মৃণালিনী ছেলের হাত ধরলেন।

“তাহলে এবার বাড়িটাকে ভেঙে ফেলা হবে?”

অরিন্দম গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বললেন, “না। বাড়িটা থাকুক। তবে আর কোনও সত্যকে এখানে বন্দি রাখা হবে না।”

সেই রাতে অরিত্র বাড়ি ফিরে পুরোনো ডায়েরিটা খুলল। শেষ পাতায় যে বাক্যটি লেখা ছিল, সেটি আর দেখা যাচ্ছিল না।

‘১৭ নভেম্বরের রাত শেষ হওয়ার আগে, একজনকে নিজের নাম ফিরিয়ে দিতে হবে।’

তার বদলে নতুন একটি বাক্য ফুটে উঠেছে—

‘যে নিজের পরিচয় ফিরে পায়, সে আর অন্ধকারকে ভয় পায় না।’

অরিত্র জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে গঙ্গার জল চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে।

তার ফোনে হঠাৎ একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।

‘তেরো নম্বর দরজার রহস্য শেষ হয়েছে। কিন্তু তোমার দাদুর আরও একটি বাড়ি আছে। সেখানে চৌদ্দ নম্বর ঘরটি আজও বন্ধ।’

অরিত্র অনেকক্ষণ বার্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।

সব রহস্যের পিছনে ছুটতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর পাওয়ার পর নতুন দরজা না খোলাই ভালো।

কিন্তু সেই রাতে, ঠিক বারোটা তেরো মিনিটে, অরিত্রর ঘরের বন্ধ আলমারির ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

টক।

টক।

টক।

অরিত্র ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তারপর নিজেকে থামিয়ে দিল।

সে জানত, অতীতের প্রতিটি ডাকের উত্তর দিতে নেই।

আলমারির ভিতর থেকে আর কোনও শব্দ এল না।

বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করল।

তেরো নম্বর দরজার রহস্যের অবসান হল। কিন্তু অরিত্রর জীবনে যে রাত নেমে এসেছিল, তার অন্ধকার এবার আর তাকে গ্রাস করতে পারল না।

কারণ সে অবশেষে নিজের নাম, নিজের পরিবার এবং নিজের সত্যকে ফিরে পেয়েছিল।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

অন্ধকার ঘরের তেরো নম্বর দরজা (দ্বিতীয় পর্ব: আয়নায় বন্দি মৃত মানুষ)।

আয়নায় নিজের মৃত মুখ দেখে অরিত্র চিৎকার করে উঠল।

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, সে বুঝি কোনও দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে পড়েছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আয়নার ভিতরের মুখটা ঠোঁট নাড়ল।

“পালাও, অরিত্র! ও তোমাকে খুঁজে পেয়েছে!”

অরিত্র পিছিয়ে যেতে গিয়েও পারল না। তার পা যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে। আয়নার ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত মানুষটির চোখ দুটো ক্রমশ কালো হয়ে আসছিল।

তারপর হঠাৎ ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

একটা ভারী শব্দ হল।

ধড়াম!

তেরো নম্বর দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

অরিত্র অন্ধকারে হাতড়ে দরজার হাতল খুঁজতে লাগল। কিন্তু দরজা কোথায়? যে সিঁড়ি দিয়ে সে নীচে নেমেছিল, সেটাও যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটা আবার বেজে উঠল।

মায়ের ফোন।

“মা! আমি বেরোতে পারছি না! এখানে কী হচ্ছে?”

ওপার থেকে মৃণালিনীর কান্নাভেজা গলা শোনা গেল।

“মন দিয়ে শোনো। ঘরের মধ্যে যদি তিনবার তোমার নাম ধরে কেউ ডাকে, কোনও উত্তর দেবে না। আর আয়নায় নিজের মুখ দেখার চেষ্টা করবে না।”

“কেন?”

“কারণ এই বাড়িতে যে একবার নিজের প্রতিবিম্ব হারায়, সে আর নিজের জীবনে ফিরে আসতে পারে না।”

অরিত্র কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেল।

তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

“অরিত্র…”

সে চুপ করে রইল।

“অরিত্র সেন…”

কণ্ঠটা এবার আরও কাছে।

“তুমি কি জানতে চাও, তোমার জন্মের আগে এই বাড়িতে কী ঘটেছিল?”

অরিত্র চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তৃতীয়বার ডাকটা এল তার ঠিক পিছন থেকে।

“অরিত্র!”

সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, “কে তুমি?”

সঙ্গে সঙ্গে কোথাও একটা কাচ ভাঙার শব্দ হল।

ঝনঝন!

ঘরে আলো ফিরে এল।

কিন্তু এবার অরিত্র দেখল, সে আর দোতলায় নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট ঘরে। চারপাশে ধুলোমাখা আসবাব, দেওয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার, আর মাঝখানে একটি কাঠের দোলনা।

দোলনার ভিতরে শুয়ে আছে একটি শিশু।

শিশুটির চোখ বন্ধ। পরনে সাদা জামা। তার ডান হাতের কবজিতে একটি কালো সুতো বাঁধা।

অরিত্রর বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল।

কারণ তার নিজের কবজিতেও ছোটবেলা থেকে একই রকম কালো সুতো বাঁধা ছিল। মা বলতেন, এটি তাঁর আশীর্বাদ।

কিন্তু শিশুটির পাশে রাখা কাঠের ফলকে লেখা—

‘অরিত্র সেন। জন্ম: ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮। মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮।’

অরিত্র ফলকটা হাতে তুলে নিল।

“এটা কীভাবে সম্ভব?”

ঠিক তখনই ঘরের কোণে রাখা পুরোনো টেপ রেকর্ডারটা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

প্রথমে ভেসে এল শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একটি মহিলার কণ্ঠ।

“আজ ১৭ নভেম্বর। রাত দুটো পনেরো। আমার সন্তান জন্মেছে। কিন্তু ডাক্তার বলছেন, শিশুটি বাঁচবে না। আমি বিশ্বাস করি না। আমি আমার সন্তানকে বাঁচাবই।”

অরিত্র কণ্ঠটা চিনতে পারল।

এটা তার মায়ের কণ্ঠ।

রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“নীলমাধববাবু বলেছেন, শিশুটিকে বাঁচানোর একটা উপায় আছে। কিন্তু তার জন্য অন্য একটি শিশুর পরিচয় ব্যবহার করতে হবে। আমি জানি না, তিনি কী করতে চলেছেন। আমি শুধু চাই, আমার সন্তান বেঁচে থাকুক।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

আবার কণ্ঠ শোনা গেল।

“না! আপনি এটা করতে পারেন না! ও তো আমার সন্তান!”

এরপর একটা ধাক্কার শব্দ।

তারপর সব চুপ।

অরিত্রর মাথা ঘুরতে লাগল।

তার জন্মের তারিখ ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮। কিন্তু এই বাড়িতে তার মৃত্যুর ফলকও রয়েছে একই তারিখে।

তাহলে কি তার জন্মের রাতেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল?

আর অন্য শিশুটি কে?

ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে গেল।

দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধা। সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ, হাতে একটি লণ্ঠন। তাঁর চুল সম্পূর্ণ সাদা, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।

“তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ,” বৃদ্ধা বললেন।

অরিত্র সতর্ক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে?”

“আমি কমলিনী। এই বাড়িতে একসময় কাজ করতাম। তোমার জন্মের রাতেও আমি এখানে ছিলাম।”

“আমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল?”

কমলিনী দরজা বন্ধ করে দিলেন।

“সত্যিটা জানতে চাও? তাহলে আগে একটা কথা বুঝতে হবে। এই বাড়িতে কোনও ভূত নেই। আছে এমন কিছু মানুষ, যারা মৃত মানুষের পরিচয় নিয়ে বেঁচে আছে। আর আছে এমন কিছু সত্য, যেগুলোকে আয়নার পিছনে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।”

“আয়নার পিছনে?”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

“এই বাড়ির প্রতিটি আয়নার পিছনে একটি করে গোপন কুঠুরি আছে। তোমার দাদু নীলমাধব সেন সেখানে এমন কিছু নথি লুকিয়ে রেখেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে।”

অরিত্রর মনে পড়ল আয়নার ভিতরে দেখা নিজের মৃত মুখটির কথা।

“কিন্তু আয়নায় আমার মৃত মুখ দেখা গেল কেন?”

কমলিনী উত্তর দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“কারণ তোমার নামে একবার মৃত্যুসনদ তৈরি করা হয়েছিল। সেই নথিতে তোমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অন্য একটি শিশুকে তোমার পরিচয়ে বড় করা হয়েছিল। কিন্তু আসল অরিত্রকে গোপনে এই বাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।”

“তাহলে আমি কে?”

কমলিনীর চোখে জল এসে গেল।

“সেটাই তো তোমাকে জানতে হবে। তোমার মা অনেক কিছু জানেন, কিন্তু সবটা জানেন না। তোমার দাদু মারা যাওয়ার আগে একটি ডায়েরি রেখে গিয়েছিলেন। সেই ডায়েরি না পেলে তুমি কোনওদিন নিজের পরিচয় জানতে পারবে না।”

“ডায়েরিটা কোথায়?”

বৃদ্ধা লণ্ঠন তুলে ঘরের উত্তর দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন। দেওয়ালের একটি কাঠের প্যানেল সরাতেই ভিতরে ছোট্ট একটি আলমারি দেখা গেল।

সেখানে রাখা ছিল কালো মলাটের একটি ডায়েরি।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

‘যদি এই ডায়েরি অরিত্রর হাতে পৌঁছয়, তবে বুঝতে হবে তেরো নম্বর দরজাটি আবার খুলেছে। আর দরজা খুললে শুধু সত্য ফিরে আসে না, ফিরে আসে সেই মানুষটিও, যাকে আমরা নিজেদের হাতে কবর দিয়েছিলাম।’

অরিত্র ডায়েরি খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতায় পরিবারের হিসাব, সম্পত্তির দলিল এবং কিছু অদ্ভুত নাম লেখা ছিল। তারপর একটি পাতায় সে নিজের নাম দেখতে পেল।

‘অরিত্র সেন—প্রকৃত পরিচয় অজানা।’

তার নীচে আরও একটি লাইন—

‘রক্তের সম্পর্ক: নীলমাধব সেনের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। জন্মের সময় পরিচয় বদলানো হয়েছে।’

অরিত্রর মাথার ভিতর হাজার প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।

“আমার মা কি সত্যিই আমার মা নন?”

কমলিনী কোনও উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলে দেখালেন।

সেখানে একটি ছবি আটকানো ছিল। ছবিতে দুটো শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে। একটির কবজিতে কালো সুতো, অন্যটির কবজিতে লাল সুতো।

ছবির পিছনে লেখা—

‘একজন বেঁচে থাকবে। অন্যজনের মৃত্যু গোপন থাকবে।’

অরিত্র ছবিটা হাতে নিয়ে বলল, “দ্বিতীয় শিশুটি কে?”

কমলিনী ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।

“সে এখনও বেঁচে আছে।”

“কোথায়?”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে অরিত্রর দিকে তাকালেন।

“তোমার বাড়িতে।”

অরিত্রর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

“আমার বাড়িতে কে আছে?”

কমলিনী ফিসফিস করে বললেন, “তোমার মা যে মানুষটিকে এত বছর ধরে নিজের সন্তান বলে বড় করেছেন, সে হয়তো তুমি নও।”

অরিত্র কিছু বলার আগেই বাড়ির নীচের তলা থেকে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন নয়, একাধিক মানুষ।

কমলিনী দ্রুত ডায়েরিটা অরিত্রর হাতে দিয়ে বললেন, “ওরা এসে গেছে। ডায়েরিটা নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে পালাও।”

“কারা এসেছে?”

বৃদ্ধা লণ্ঠন নিভিয়ে দিলেন।

“যারা চায়, তুমি কোনওদিন নিজের পরিচয় জানতে না পারো।”

দরজার বাইরে থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

“কমলিনী! ছেলেটাকে আমাদের হাতে তুলে দাও। তোমার বয়স হয়েছে। আর কতদিন ওকে লুকিয়ে রাখবে?”

কমলিনী অরিত্রর হাত চেপে ধরলেন।

“যা-ই ঘটুক, মনে রেখো—তোমার মাকে বিশ্বাস করবে, কিন্তু তাঁর বলা প্রতিটি কথাকে সত্য বলে মেনে নেবে না।”

“আপনি কী বলতে চাইছেন?”

বৃদ্ধা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধড়াম!

দরজার কাঠ ফেটে গেল।

অরিত্র পিছনের দরজার দিকে দৌড়ল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল, কমলিনী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে সেই পরিচিত পুরুষকণ্ঠ আবার শোনা গেল।

“অরিত্র, পালিয়ে লাভ নেই। কারণ তোমার মায়ের আসল পরিচয় তুমি এখনও জানো না।”


রাত এগারোটা চল্লিশ।

অরিত্র কোনওমতে বাড়িতে ফিরে এল। জামাকাপড়ে ধুলো, হাতে ডায়েরি, মাথায় অসংখ্য প্রশ্ন।

মৃণালিনী বসার ঘরে বসে ছিলেন। ছেলেকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন।

“তুমি কোথায় ছিলে? আমি কতবার ফোন করেছি!”

অরিত্র ডায়েরিটা টেবিলের উপর রাখল।

“তেরো নম্বর বাড়িতে।”

মৃণালিনী চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম।”

“কারণ তুমি জানো, সেখানে কী আছে!”

অরিত্র ডায়েরির পাতাটি খুলে তাঁর সামনে রাখল। ছবির দুই শিশুকে দেখিয়ে প্রশ্ন করল, “এদের মধ্যে আমি কে?”

মৃণালিনী ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

“আমি জানতাম, একদিন এই প্রশ্নটা আসবে।”

“উত্তর দাও, মা!”

মৃণালিনী মুখ তুললেন।

“তুমি আমার ছেলে। কিন্তু তুমি যে অরিত্র সেন, এই নামটি তোমার জন্মের সময় দেওয়া হয়নি।”

অরিত্রর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“তাহলে আমার আসল নাম কী?”

মৃণালিনী কাঁপা হাতে আলমারি খুললেন। সেখান থেকে একটি পুরোনো নথি বের করে ছেলের সামনে রাখলেন।

নথির উপরে হাসপাতালের সিল।

তার নীচে শিশুর নাম লেখা—

‘অদ্বৈত মুখার্জি।’

অরিত্র অবিশ্বাসের চোখে মায়ের দিকে তাকাল।

“অদ্বৈত মুখার্জি কে?”

মৃণালিনী উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

মৃণালিনী উঠে দরজা খুললেন না।

বাইরে থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“মা, দরজা খোলো। আমি ফিরে এসেছি।”

অরিত্রর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কারণ এই কণ্ঠ সে চেনে।

এই কণ্ঠ তার নিজের ছোটবেলার স্মৃতিতে বহুবার শুনেছে।

কিন্তু যে মেয়েটি এই কণ্ঠের অধিকারী, তার ছবি সে আজ তেরো নম্বর বাড়িতে দেখেছে—সাদা-কালো ছবির সেই ছোট্ট মেয়েটি।

মৃণালিনী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ও ফিরে এসেছে! এত বছর পরে ও ফিরে এসেছে!”

দরজার বাইরে থেকে আবার কণ্ঠ এল—

“মা, দরজা খোলো। আমি অদ্বৈত নই। আমি তোমার মেয়ে।”

অরিত্রর হাতে থাকা ডায়েরি নিজে থেকেই খুলে গেল। শেষ পাতায় নতুন করে একটি লাইন ফুটে উঠেছে—

‘১৭ নভেম্বরের রাত শেষ হওয়ার আগে, একজনকে নিজের নাম ফিরিয়ে দিতে হবে।’

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে।

রাত তখন এগারোটা ঊনপঞ্চাশ।

আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ধীরে ধীরে দরজায় নখ ঘষতে ঘষতে বলল—

“দাদা, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না?”

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

অন্ধকার ঘরের তেরো নম্বর দরজা (প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে মৃতেরা ফিরে আসে)।

কলকাতার উত্তর প্রান্তে, গঙ্গার ধারে একটা পুরোনো বাড়ি ছিল। বাড়িটার নাম কেউ জানত না। আশপাশের লোকেরা শুধু বলত—‘তেরো নম্বর বাড়ি’।

বাড়িটা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পরিত্যক্ত। জানালার কাচ ভাঙা, দেওয়ালে বট-অশ্বত্থের শিকড়, ছাদের কার্নিশে বাদুড়ের বাসা। দিনের আলোতেও বাড়িটার সামনে দাঁড়ালে বুকের ভিতর কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতো।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতি বছর ১৭ নভেম্বর রাতে বাড়িটার দোতলার একটি জানালায় আলো জ্বলত।

তারপর শোনা যেত কারও কান্না।

কেউ বলত, ওটা বাতাসের শব্দ। কেউ বলত, পুরোনো বাড়ির কাঠের দরজা নড়ে আওয়াজ হয়। কিন্তু যাঁরা সেই কান্না একবার শুনেছিলেন, তাঁরা কেউই আর রাতের বেলা ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন না।

তবে এসব গল্পে অরিত্র বিশ্বাস করত না।

অরিত্র সেন, বয়স আটাশ। পেশায় সাংবাদিক। রহস্যজনক ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করাই তার কাজ। ভূত, আত্মা কিংবা অলৌকিক শক্তি—এসবকে সে মানুষের ভয় আর কল্পনার ফল বলেই মনে করত।

কিন্তু একদিন তার নিজের বাড়িতে এমন একটি চিঠি এল, যা তার সমস্ত বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিল।

চিঠিটা এসেছিল ডাকযোগে। খামের উপরে তার নাম ও ঠিকানা লেখা। কিন্তু প্রেরকের নাম নেই।

খাম খুলতেই বেরিয়ে এল একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি।

ছবিতে একটি বাড়ি। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পাঁচজন মানুষ—একজন বৃদ্ধ, এক মহিলা, দুজন যুবক এবং একটি ছোট্ট মেয়ে।

ছবির পিছনে লাল কালিতে লেখা—

‘এই পাঁচজনের মধ্যে চারজন মারা গেছে। পঞ্চম জন এখনও তোমার বাড়িতে থাকে।’

অরিত্র ছবিটা ভালো করে দেখল।

বৃদ্ধ মানুষটিকে সে চিনতে পারল। তিনি তার দাদু, নীলমাধব সেন। বারো বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

মহিলাটি অরিত্রর ঠাকুমা। তিনিও মারা গেছেন।

দুজন যুবকের মধ্যে একজন তার বাবা, আর অন্যজন তার কাকা। বাবা মারা গিয়েছিলেন একটি গাড়ি দুর্ঘটনায়। কাকার মৃত্যু হয়েছিল তারও তিন বছর আগে, রহস্যজনকভাবে।

আর ছোট্ট মেয়েটি?

অরিত্র ছবিটা চোখের কাছে তুলে ধরল।

মেয়েটির মুখ তার পরিচিত। খুব পরিচিত।

কারণ ছবির মেয়েটি আর কেউ নয়—তার মা, মৃণালিনী সেন।

কিন্তু চিঠিতে লেখা ছিল, পাঁচজনের মধ্যে চারজন মারা গেছে। পঞ্চম জন এখনও তার বাড়িতে থাকে।

তার মা তো এখনও বেঁচে আছেন!

তাহলে চিঠিটা কি নিছক মজা?

অরিত্র চিঠি ও ছবিটা নিয়ে মায়ের ঘরে গেল।

মৃণালিনী তখন জানালার পাশে বসে পুরোনো একটি বই পড়ছিলেন। ছেলের হাতে ছবিটা দেখেই তাঁর মুখের রং বদলে গেল। বইটি হাত থেকে পড়ে গেল মেঝেতে।

“এই ছবিটা তুমি কোথায় পেলে?” তাঁর গলা কেঁপে উঠল।

“ডাকযোগে এসেছে। মা, ছবির পিছনে কী লেখা আছে, তুমি পড়েছ?”

মৃণালিনী উত্তর দিলেন না। তিনি ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ ছবিটা ছেলের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন।

অরিত্র তাঁর হাত চেপে ধরল।

“মা! কী করছ? তুমি এই ছবিটা চেনো?”

মৃণালিনী কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এই ছবিটা তোমার কাছে আসার কথা ছিল না।”

“কেন?”

“কারণ এই ছবির সঙ্গে তোমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা জড়িয়ে আছে।”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কী সত্য?”

মৃণালিনী ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে জল।

“তেরো নম্বর বাড়িতে তুমি কখনও যাবে না। যেভাবেই হোক, ওই বাড়ি থেকে দূরে থাকবে।”

“কিন্তু কেন?”

মা উত্তর দিলেন না। শুধু ছেলের হাত শক্ত করে ধরে বললেন, “আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”

সেই রাতেই অরিত্র সিদ্ধান্ত নিল—সে তেরো নম্বর বাড়িতে যাবে।

কারণ একজন সাংবাদিক হিসেবে সে জানত, মানুষ যখন কোনও সত্য লুকোতে চায়, তখন সেই সত্যের পিছনেই সবচেয়ে বড় খবর থাকে।


পরদিন বিকেল পাঁচটায় অরিত্র পৌঁছে গেল গঙ্গার ধারের সেই বাড়ির সামনে।

আকাশ মেঘলা। নদীর জল অস্বাভাবিক রকম শান্ত। বাড়িটির লোহার গেটের গায়ে মরচে ধরা তালা ঝুলছে। অথচ গেটের ঠিক পাশে মাটিতে পড়ে আছে একজোড়া তাজা জুতোর ছাপ।

কেউ সম্প্রতি বাড়িতে ঢুকেছে।

অরিত্র মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে গেটের পাশের ভাঙা দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢুকল।

বাড়ির উঠোনে শুকনো পাতা জমে রয়েছে। মাঝখানে একটা ভাঙা পাথরের মূর্তি। মূর্তির মুখ ক্ষয়ে গেলেও মনে হচ্ছিল, সেটি কোনও নারীর মূর্তি।

দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই একটা তীব্র স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল।

ঘরের দেওয়ালে সারি সারি ছবি। পরিবারের ছবি, বিয়ের ছবি, জন্মদিনের ছবি।

কিন্তু অরিত্রর চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে।

ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে তার কাকা। মাঝখানে সেই একই ছোট্ট মেয়ে—মৃণালিনী।

ছবির নিচে তারিখ লেখা—১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮।

অরিত্রর মনে পড়ল, তার বাবা মারা গিয়েছিলেন ২০১৪ সালে। কাকা মারা গিয়েছিলেন ২০১১ সালে।

কিন্তু ছবির পিছনে পেন্সিলে লেখা ছিল—

‘আজ রাতেই একজনকে মরতে হবে।’

হঠাৎ দোতলা থেকে একটা শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

কেউ যেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।

অরিত্র টর্চের আলো সিঁড়ির দিকে ফেলল।

কেউ নেই।

কিন্তু শব্দটা থামল না।

টক।

টক।

টক।

তারপর এক মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।

“অরিত্র, তুমি অবশেষে এসেছ।”

অরিত্রর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কণ্ঠটা তার মায়ের।

“মা?”

কোনও উত্তর নেই।

সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। দোতলার করিডর একেবারে অন্ধকার। করিডরের শেষ প্রান্তে একটা দরজা। দরজার গায়ে সাদা রঙে লেখা—১৩।

অরিত্র দরজার হাতলে হাত রাখতেই ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

টক।

টক।

টক।

তারপর দরজার ওপার থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ বলল—

“দরজাটা খুলো না, অরিত্র। আমি তোমার বাবা।”

অরিত্রর বুকের ভিতর যেন সবকিছু থেমে গেল।

তার বাবা তো বারো বছর আগে মারা গেছেন!

সে পিছিয়ে আসতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল লাল রঙের তরল।

রক্ত!

অরিত্র কাঁপা হাতে দরজাটা ঠেলে দিল।

দরজার ওপারে কোনও ঘর ছিল না।

ছিল একটি অন্ধকার সিঁড়ি, যা নীচের দিকে নেমে গেছে। অথচ সে তো দোতলায় দাঁড়িয়ে!

সিঁড়ির শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলো জ্বলছিল। সেই আলোয় একজন মানুষ বসে আছেন। মাথা নিচু, পরনে সাদা পাঞ্জাবি।

অরিত্রর মনে হল, এই দৃশ্য সে আগে কোথাও দেখেছে।

হ্যাঁ! তার বাবার শেষ ছবিতে ঠিক এই পোশাকটাই ছিল।

“বাবা?” অরিত্র ফিসফিস করে ডাকল।

লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

অরিত্রর হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল।

সেই মুখ।

সেই চোখ।

সেই কপালের ডান দিকে পুরোনো ক্ষতচিহ্ন।

এ যে তার বাবা, অরিন্দম সেন!

কিন্তু লোকটির মুখে হাসি ফুটতেই অরিত্র বুঝতে পারল, কিছু একটা ভয়ংকরভাবে ভুল হচ্ছে।

লোকটি বললেন, “তুমি দেরি করে ফেলেছ, অরিত্র। তোমার মা তোমাকে সব সত্য বলেনি।”

“আপনি… আপনি বেঁচে আছেন?”

লোকটি কোনও উত্তর দিলেন না। বরং নিজের পিছনের দেওয়ালের দিকে আঙুল তুললেন।

সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

‘অরিত্র সেনের মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।’

অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকাল।

আজ ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।

ঠিক তখনই তার মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের নাম।

সে ফোন ধরতেই ওপার থেকে মৃণালিনীর কান্নাভেজা কণ্ঠ ভেসে এল—

“অরিত্র, তুমি যদি তেরো নম্বর দরজা খুলে থাকো, তাহলে এখনই পালাও! ওটা তোমার বাবা নয়!”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে কে?”

ফোনের ওপারে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মা এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে অরিত্রর সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

“কারণ তোমার বাবা বারো বছর আগে মারা যাননি। তিনি মারা গিয়েছিলেন আজ থেকে আটাশ বছর আগে—তোমার জন্মেরও আগে!”

ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ঘরের ভিতর বসে থাকা লোকটি উঠে দাঁড়ালেন।

তিনি অরিত্রর দিকে এগিয়ে এলেন।

আর ফিসফিস করে বললেন—

“এবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখো, অরিত্র।”

ঘরের দেওয়ালে একটি বিশাল আয়না ছিল।

অরিত্র ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা গেল না।

দেখা গেল একটি মৃত মানুষের মুখ।

আর সেই মুখটি ছিল ঠিক তার নিজের।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত্যুর আগে শেষ ফোন (তৃতীয় ও শেষ পর্ব: যে মানুষটি নিজের মৃত্যুর খবর পেয়েছিল)।

রাত তখন ঠিক বারোটা পেরিয়েছে।

ঋত্বিক চৌধুরী জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে সেই ছবিটি—ছবিতে তার মতো দেখতে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গার ধারের পুরোনো শ্মশানের সামনে। মুখ, চোখ, নাক, এমনকি কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট কাটা দাগটাও এক।

ছবির পিছনে লেখা ছিল—

“আগামীকাল তোমাদের মধ্যে একজনই বেঁচে থাকবে।”

ঋত্বিক ছবিটা উল্টে আবার দেখল। তার বুকের ভিতর একটা প্রশ্ন বারবার আছড়ে পড়ছিল—লোকটা কে?

ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।

সেই অচেনা নম্বর।

ঋত্বিক ফোন ধরতেই ওপার থেকে ভারী গলায় কেউ বলল, “কাল সকাল আটটা দশে শ্মশানে এসো। একা আসবে। সত্যিটা জানার এটাই শেষ সুযোগ।”

“আপনি কে? এতদিন ধরে আমাকে ফোন করছেন কেন?”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর উত্তর এল, “আমি সেই মানুষ, যাকে তোমরা বারো বছর আগে মৃত বলে মেনে নিয়েছিলে।”

“অনিরুদ্ধ চৌধুরী?”

ওপারের মানুষটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“না। আমি অরিন্দম সেন।”

ফোন কেটে গেল।

ঋত্বিকের মাথার ভিতর যেন বজ্রপাত হল। হাসপাতালের সেই পুরোনো ছবিতে পাশাপাশি লেখা ছিল দুটি নাম—অরিন্দম সেন এবং অনিরুদ্ধ চৌধুরী। একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, অন্যজনকে মৃত বলে দেখানো হয়েছিল।

তাহলে কি অরিন্দম সেন বেঁচে আছেন?

আর যদি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি ঋত্বিকের জীবনে কে?

পরদিন সকাল সাতটা পঞ্চান্ন মিনিটে ঋত্বিক পৌঁছে গেল গঙ্গার ধারের পুরোনো শ্মশানে। কুয়াশায় চারপাশ ঢাকা। দূরে কয়েকটি কাক ডাকছিল। গঙ্গার জল ধূসর, বাতাসে পোড়া কাঠের গন্ধ।

ঠিক আটটা দশ মিনিটে শ্মশানের পিছনের ভাঙা দরজা দিয়ে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।

ঋত্বিকের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

লোকটি দেখতে অবিকল তার মতো।

একই মুখ, একই উচ্চতা, একই চোখ। এমনকি হাঁটার ভঙ্গিও এক।

লোকটি সামনে এসে দাঁড়াল।

“তুমি ঋত্বিক?”

“হ্যাঁ। আর তুমি?”

“আমার নাম রুদ্র।”

ঋত্বিক কয়েক পা পিছিয়ে গেল। “তুমি আমার মতো দেখতে কেন?”

রুদ্র পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে দুটো সদ্যোজাত শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে। পিছনে লেখা—১৭ অক্টোবর, ১৯৯৬।

রুদ্র বলল, “কারণ আমরা যমজ ভাই।”

ঋত্বিক ছবিটা কাঁপা হাতে ধরল।

“অসম্ভব! আমার বাবা-মা তো কখনও—”

“তোমার মা মারা গিয়েছিলেন আমাদের জন্মের পরেই। আর যে মানুষটাকে তুমি বাবা বলে জেনেছ, সেই অনিরুদ্ধ চৌধুরী তোমাকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছিলেন। কিন্তু তোমার জন্মের পরই আমাদের দুজনকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল।”

“কেন?”

রুদ্র গঙ্গার দিকে তাকাল।

“কারণ আমাদের জন্মের সঙ্গে এমন একটা সত্য জড়িয়ে ছিল, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ত।”

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“রুদ্র, আর লুকিয়ে লাভ নেই।”

একজন বয়স্ক মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। মুখে গভীর বলিরেখা, চুল সাদা, চোখে ক্লান্তি। কিন্তু ঋত্বিক ছবিতে তাঁকে দেখেছে।

তিনি অরিন্দম সেন।

ঋত্বিক তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, “আপনি কি আমার বাবা?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, তুমি আর রুদ্র—তোমরা দুজনেই আমার সন্তান।”

ঋত্বিকের চোখে জল চলে এল। এত বছর ধরে যে মানুষটিকে সে নিজের বাবা বলে জেনেছে, তিনি কি তবে তার বাবা ছিলেন না?

অরিন্দম যেন তার মনের কথা পড়তে পারলেন।

“অনিরুদ্ধ তোমার রক্তের বাবা না হলেও, তিনি তোমার প্রকৃত অভিভাবক ছিলেন। তিনি তোমাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তোমাকে বাঁচানোর জন্যই তিনি নিজের জীবন, নিজের পরিচয়—সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন।”

“কিন্তু কী থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিলেন?”

অরিন্দম ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

বারো বছর আগে অরিন্দম সেন একটি বড় আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। একটি সংস্থা মৃত মানুষের পরিচয় ব্যবহার করে জমি ও সম্পত্তির মালিকানা বদলে দিত। সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, কয়েকজন চিকিৎসক এবং আইনজীবী। মৃত মানুষের নথি তৈরি করা হত, আবার প্রয়োজনমতো জীবিত মানুষকেও কাগজে-কলমে মৃত বানিয়ে দেওয়া হত।

এই চক্রের মূল নথি ছিল একটি লাল ফাইলে। সেই ফাইলেই ছিল সম্পত্তির দলিল, হাসপাতালের নথি, ভুয়ো মৃত্যুসনদ এবং জড়িত ব্যক্তিদের নাম।

অরিন্দম প্রমাণ সংগ্রহ করার পর বুঝতে পারেন, তাঁর পরিবারও বিপদের মুখে। তখনই আইনজীবী অমিতাভ রায় এবং চিকিৎসক সৌম্যদীপ বসু তাঁকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু চক্রের লোকেরা সব জেনে যায়।

১৭ অক্টোবর, ২০১৪। সেই রাতেই ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা।

অরিন্দমকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। অনিরুদ্ধ তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলে দুজনের পরিচয় গুলিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালের নথিতে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়, আর অন্যজনের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়। এই সুযোগে অপরাধীরা নিজেদের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

অনিরুদ্ধ বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাঁকে মৃত বলে দেখানো হয়েছিল। অরিন্দমও বেঁচে যান, তবে তাঁকে মৃত ঘোষণা করে তাঁর পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা হয়।

দুজনেই আলাদা পরিচয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। অনিরুদ্ধ ঋত্বিককে নিরাপদে বড় করার দায়িত্ব নেন। আর রুদ্রকে অন্য একটি পরিচয়ে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু সেই রাতের পর থেকে অনিরুদ্ধ আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। অপরাধীদের নজর এড়িয়ে তিনি প্রমাণ জমিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে পায় সেই চক্র।

ঋত্বিকের গলা কেঁপে উঠল। “তাহলে রায় ভিলায় আমি যে মৃতদেহ দেখেছিলাম, সেটা কার ছিল?”

অরিন্দম উত্তর দিলেন, “ওটা ছিল সাজানো দৃশ্য। তোমাকে ভয় দেখিয়ে লাল ফাইলের খোঁজে নামানোই ছিল ওদের উদ্দেশ্য। মৃতদেহের মুখ অনিরুদ্ধের মতো করে সাজানো হয়েছিল। পরে লোকজনকে সরিয়ে সেই দেহও সরিয়ে ফেলা হয়। তোমার চোখে যা পড়েছিল, তার কিছু সত্যি, কিছু ছিল পরিকল্পিত প্রতারণা।”

“আর ফোনগুলো?”

“সৌম্যদীপ বসু তোমাকে সতর্ক করছিলেন। অপরাধীদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি অনেক কিছু জানতেন। কিন্তু নিজের পরিচয় প্রকাশ করলে তাঁকেও হত্যা করা হত। তাই তিনি অচেনা নম্বর ব্যবহার করে তোমাকে সূত্র দিয়েছেন। প্রতিটি ফোন ছিল একটি সতর্কবার্তা—ভবিষ্যৎ জানার ক্ষমতা নয়।”

ঋত্বিকের চোখে তখনও একটাই প্রশ্ন।

“অমিতাভ রায়? নন্দিতা রায়? তাঁদের ভূমিকা কী?”

অরিন্দম বললেন, “অমিতাভ প্রথমে চক্রটির হয়ে কাজ করলেও পরে অনুশোচনা করেছিলেন। তিনি আমাদের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। নন্দিতা তাঁর স্ত্রী। অমিতাভ মারা যাওয়ার পর তিনি লাল ফাইলের একটি অংশ লুকিয়ে রাখেন। তোমাকে সেটি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁরই ছিল।”

“তাহলে আমার বাবা কোথায়?”

এই প্রশ্নে অরিন্দমের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

তিনি পকেট থেকে একটি ছোট খাম বের করে ঋত্বিকের হাতে দিলেন।

“এটা অনিরুদ্ধের শেষ চিঠি। তোমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন।”

ঋত্বিক কাঁপা হাতে খাম খুলল।

চিঠিতে লেখা—

“ঋত্বিক,

যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তবে বুঝবে আমি আর তোমার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার মাথায় হাত রাখতে পারব না।

তোমাকে আমি জন্ম দিইনি, কিন্তু তোমার প্রথম কান্না থেকে প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলে যাওয়া—সবকিছুর সাক্ষী আমি। তুমি যখন অসুখে রাতভর কেঁদেছ, আমি তোমার পাশে বসে থেকেছি। তুমি যখন প্রথম লিখেছিলে ‘বাবা’, সেই কাগজটা আজও আমার কাছে ছিল।

তোমাকে সত্যি বলিনি, কারণ তোমাকে হারানোর ভয় ছিল। ভেবেছিলাম, বড় হলে সব বলব। কিন্তু সময় আমাকে সেই সুযোগ দিল না।

মনে রেখো, রক্তের সম্পর্ক মানুষকে জন্ম দেয়, কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে পরিবার দেয়।

আমার পরিচয় নিয়ে কখনও লজ্জা পেয়ো না। আমি তোমার বাবা ছিলাম, আছি, থাকব।

আর একটা কথা—সত্যের পথে হাঁটতে গেলে ভয় পেয়ো না। কারণ মিথ্যে মানুষকে কিছুদিন বাঁচাতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরকাল মেরে রাখতে পারে না।

ইতি, তোমার বাবা, অনিরুদ্ধ।”

চিঠির শেষ লাইনে এসে ঋত্বিক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মাটিতে বসে পড়ল। চোখের জল চিঠির কাগজে পড়তে লাগল।

রুদ্র তার কাঁধে হাত রাখল।

“আমরা বাবাকে হারিয়েছি,” সে বলল, “কিন্তু তাঁর লড়াইটা শেষ হতে দেব না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে শ্মশানের বাইরে একটি গাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামলেন চিকিৎসক সৌম্যদীপ বসু। তাঁর হাতে একটি পেনড্রাইভ এবং কিছু নথি।

“আর সময় নেই,” তিনি বললেন। “ওরা জেনে গেছে তোমরা এখানে এসেছ।”

দূরে দুটি কালো গাড়ি এগিয়ে আসছিল।

সৌম্যদীপ দ্রুত পেনড্রাইভটি ঋত্বিকের হাতে দিলেন।

“এতে পুরো চক্রের প্রমাণ আছে। নাম, লেনদেন, ভুয়ো মৃত্যুসনদ, সব। আমি এতদিন ভয়ে চুপ ছিলাম। কিন্তু অনিরুদ্ধের মৃত্যু আমাকে বুঝিয়েছে, আর চুপ থাকলে আমিও অপরাধী হয়ে থাকব।”

ঋত্বিক উঠে দাঁড়াল।

“আমরা পালাব না।”

সৌম্যদীপ অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।

“ওরা সশস্ত্র হতে পারে!”

“তাই বলে সত্যিটা লুকিয়ে রাখব? এতদিন সবাই ভেবেছে মৃত মানুষ আর কথা বলতে পারে না। এবার মৃতদের হয়ে আমরা কথা বলব।”

ঋত্বিক ফোন বের করে তার সংবাদপত্রের সম্পাদককে ফোন করল। সে সমস্ত নথির কপি পাঠিয়ে দিল। একই সঙ্গে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী শাখার এক আধিকারিকের কাছেও প্রমাণ পৌঁছে গেল।

কালো গাড়ি থেকে কয়েকজন লোক নেমে তাদের দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু এবার তারা একা ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গাড়ি এসে পৌঁছল। অপরাধীরা পালানোর চেষ্টা করলেও কয়েকজনকে ঘটনাস্থলেই আটক করা হল।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে তদন্ত চলল। লাল ফাইল, পেনড্রাইভ এবং হাসপাতালের পুরোনো নথির সূত্র ধরে একের পর এক জালিয়াতি সামনে এল। মৃত মানুষের পরিচয় ব্যবহার করে সম্পত্তি দখলের চক্রের একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হল। বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা মামলাগুলি নতুন করে খোলা হল।

ঋত্বিক তার সংবাদপত্রে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করল—‘মৃত্যুর নথিতে বেঁচে থাকা মানুষ’।

প্রথম প্রতিবেদনের শেষে সে লিখেছিল—

“কাগজে-কলমে কাউকে মৃত ঘোষণা করা যায়। তার নাম মুছে দেওয়া যায়, পরিচয় বদলে দেওয়া যায়। কিন্তু একজন মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি এবং সত্যকে মুছে দেওয়া যায় না।”

একদিন সন্ধ্যায় ঋত্বিক ও রুদ্র গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়েছিল। সূর্য ডুবছে। জলের উপর লাল আলো ছড়িয়ে পড়েছে।

রুদ্র বলল, “তুমি কি বাবাকে ক্ষমা করতে পেরেছ? এত বছর সত্যিটা লুকিয়ে রাখার জন্য?”

ঋত্বিক মৃদু হাসল।

“যে মানুষটা আমার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিল, তাকে ক্ষমা করার প্রশ্ন ওঠে না। আমি শুধু চাই, তাঁর নামটা যেন আর কেউ মুছে দিতে না পারে।”

ঠিক তখনই ঋত্বিকের ফোনে একটি বার্তা এল। প্রেরকের নাম নেই। শুধু একটি বাক্য—

“শেষ ফোনটি এবার সত্যিই শেষ।”

ঋত্বিক কিছুক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বার্তাটি মুছে দিল।

সে জানত, সব অপরাধের বিচার একদিনে হয় না। সব রহস্যের উত্তরও পাওয়া যায় না। কিন্তু সত্যের প্রথম দরজাটা খুলে গেছে।

গঙ্গার ওপারে সন্ধ্যার আলো নিভে আসছিল। দুই ভাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল—একই মুখ, একই রক্ত, কিন্তু দুজনের জীবন আলাদা পথে গড়ে ওঠা।

আর তাদের মাঝখানে রয়ে গেলেন সেই মানুষটি, যিনি রক্তের সম্পর্ক না হয়েও বাবা হয়ে উঠেছিলেন।

বারো বছর আগে একটি মৃত্যুর খবর দিয়ে যে রহস্য শুরু হয়েছিল, তার শেষ হল একটি সত্যকে বাঁচিয়ে রেখে।

ঋত্বিক শেষবারের মতো ফোনের দিকে তাকাল। অচেনা নম্বরটি আর কখনও বাজেনি।

কারণ এবার মৃত মানুষের হয়ে কথা বলার জন্য জীবিত মানুষরা প্রস্তুত ছিল।

সমাপ্ত।

Share This