Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত্যুর আগে শেষ ফোন (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের গোপন ডায়েরি)।

ঘরের সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড ঋত্বিক কোনও কিছু দেখতে পেল না।

তার কানে তখনও বাজছে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা শেষ কথাগুলো—

“আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে যে মানুষটি মারা যাবে, সে আর কেউ নয়—তুমি নিজে।”

হঠাৎ জরুরি আলোর ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।

ঋত্বিক মেঝের দিকে তাকাল।

যেখানে কিছুক্ষণ আগে একটি মৃতদেহ পড়ে ছিল, সেখানে এখন কেউ নেই।

শুধু মেঝেতে পড়ে রয়েছে রক্তমাখা ছুরি আর একটি পুরোনো চশমা।

“মৃতদেহটা কোথায় গেল?”

ঋত্বিকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন।

“কোন মৃতদেহের কথা বলছেন?”

“অমিতাভ রায়! কিছুক্ষণ আগেও তো এখানে পড়ে ছিলেন!”

অফিসার বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন? এই ঘরে কোনও মৃতদেহ ছিল না। আমরা আপনাকে এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।”

ঋত্বিক হতভম্ব হয়ে গেল।

“আপনারা নিজের চোখে দেখেননি? আমি নিজেই তো আপনাদের ফোন করেছিলাম!”

অফিসার এবার সন্দেহের চোখে তাকালেন।

“আপনি আমাদের ফোন করেননি। এই বাড়ির দারোয়ান খবর দিয়েছিল যে দোতলায় একটা ঘর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আমরা এসে আপনাকে পাই।”

ঋত্বিক নিজের ফোন বের করল।

কলের তালিকায় অচেনা নম্বরটি রয়েছে। কিন্তু সেই কথোপকথনের কোনও রেকর্ড নেই।

সে ঘরের আলমারির দিকে ছুটে গেল। নীচের ড্রয়ার খুলতেই একটি লাল ফাইল দেখতে পেল।

ফাইলের প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—

অনিরুদ্ধ চৌধুরী: মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।

ঋত্বিকের হাত কেঁপে উঠল।

সে ফাইলটি খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পিছন থেকে একজন মহিলা বললেন, “ওটা খুলবেন না।”

ঋত্বিক ঘুরে তাকাল।

ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মধ্যবয়সি মহিলা তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁর চোখে আর কান্না নেই। মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।

“আপনি কে?” ঋত্বিক জিজ্ঞাসা করল।

মহিলা উত্তর দিলেন, “আমার নাম নন্দিতা রায়। আমি অমিতাভ রায়ের স্ত্রী।”

“আপনার স্বামী কোথায়?”

নন্দিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “আমার স্বামী বারো বছর আগে মারা গিয়েছেন।”

ঋত্বিকের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।

“কিন্তু আজ সকালে তো—”

“আজ সকালে আপনি যা দেখেছেন, তা পুরোপুরি সত্যি নয়। এই বাড়িতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলো বাইরে থেকে একরকম দেখায়, কিন্তু ভিতরের সত্য সম্পূর্ণ আলাদা।”

ঋত্বিক লাল ফাইলটি শক্ত করে ধরে বলল, “আমার বাবার নাম এখানে কেন?”

নন্দিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনার বাবা কি অনিরুদ্ধ চৌধুরী?”

“হ্যাঁ। বারো বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।”

নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“তাহলে অবশেষে সেই দিন এসে গিয়েছে।”

“কোন দিন?”

“যেদিন আপনার বাবার মৃত্যুর সত্য প্রকাশ পাবে।”

তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

“আপনি যদি সত্যিই জানতে চান কী হয়েছিল, তাহলে আজ রাত দশটায় আমার সঙ্গে দেখা করবেন। ঠিকানা এই ফাইলের শেষ পাতায় রয়েছে।”

“এখনই বলুন!”

নন্দিতা থামলেন না।

শুধু যাওয়ার আগে বললেন, “একটা কথা মনে রাখবেন। আজ রাতের আগে কাউকে বিশ্বাস করবেন না। এমনকি নিজের চোখকেও নয়।”

তিনি চলে গেলেন।

ঋত্বিক ফাইলের শেষ পাতা খুলল।

সেখানে একটি ঠিকানা লেখা—

বাগবাজার, ১৪ নম্বর গলি, বাড়ি ৭।

ঠিকানার নীচে আরও একটি বাক্য—

‘মৃত্যুর আগে শেষ ফোন কখনও মৃত মানুষ করে না।’

ঋত্বিক বুঝতে পারছিল, তাকে এমন একটি রহস্যের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে, যার প্রতিটি সূত্র তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছিল।

যদি অমিতাভ রায় বারো বছর আগেই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে ফোনের ওপাশে নিজেকে অমিতাভ পরিচয় দেওয়া মানুষটি কে?

আর যে মৃতদেহটি সে দেখেছিল, সেটি কার?


১. পুরোনো রেকর্ড রুম

সেদিন বিকেলেই ঋত্বিক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পুরোনো রেকর্ড রুমে পৌঁছল।

সেখানে তার সঙ্গে দেখা করলেন হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী প্রদীপ মজুমদার। কয়েক দিন আগে একটি পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজতে গিয়ে ঋত্বিক তাঁর নাম পেয়েছিল।

“ডাক্তার সৌম্যদীপ বসুকে আপনি চিনতেন?” ঋত্বিক জিজ্ঞাসা করল।

প্রদীপবাবু চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “চিনতাম। উনি বারো বছর আগে এখানে কাজ করতেন। তারপর হঠাৎ চাকরি ছেড়ে চলে যান।”

“কেন?”

“একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার পর।”

ঋত্বিকের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

“কার মৃত্যু?”

“একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাত ছিল। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরে মৃতদেহটি হাসপাতাল থেকে উধাও হয়ে যায়।”

“তারপর?”

“তদন্ত হয়েছিল। কিন্তু কোনও ফল পাওয়া যায়নি। ডাক্তার সৌম্যদীপ বলেছিলেন, মৃতদেহটি অন্য কারও নামে নথিভুক্ত করা হয়েছিল।”

ঋত্বিক জিজ্ঞাসা করল, “সেই মৃত ব্যক্তির নাম কী ছিল?”

প্রদীপবাবু পুরোনো রেজিস্টার বের করে পাতা উল্টাতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পরে একটি পাতায় আঙুল রাখলেন।

সেখানে লেখা—

রোগীর নাম: অনিরুদ্ধ চৌধুরী।

মৃত্যুর তারিখ: ১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

ঋত্বিকের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“কিন্তু আমার বাবার দুর্ঘটনার খবর তো ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছিল!”

প্রদীপবাবু বললেন, “কারণ দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের আগেই হাসপাতালে অন্য একটি মৃত্যুর রেকর্ড তৈরি হয়েছিল। কেউ চাইছিল, ওই মৃতদেহটিকে আপনার বাবার মৃতদেহ হিসেবে শনাক্ত করা হোক।”

“তাহলে আমার বাবা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?”

প্রদীপবাবু উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু একটি ছোট্ট খাম ঋত্বিকের হাতে দিলেন।

“এটা ডাক্তার সৌম্যদীপ আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনও দিন যদি অনিরুদ্ধ চৌধুরীর ছেলে আসে, তাহলে তাকে যেন দিয়ে দিই।”

খামের ভিতরে ছিল একটি পুরোনো হাসপাতালের ছবি।

ছবিতে পাশাপাশি দুটি স্ট্রেচারে দুজন মানুষ শুয়ে আছেন।

একজনের মুখে অক্সিজেনের মাস্ক। অন্যজনের মুখ ঢাকা সাদা চাদরে।

ছবির নীচে লেখা—

‘একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যজনকে মৃত বলে দেখানো হয়েছিল।’

ঋত্বিক ছবি উল্টে দেখল।

পিছনে দুটি নাম লেখা—

অরিন্দম সেন।

অনিরুদ্ধ চৌধুরী।

কিন্তু এই দুই মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কী?

সে ছবিটি পকেটে রাখল।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

ঋত্বিক ফোন ধরতেই সেই পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

“আপনি সঠিক জায়গায় পৌঁছেছেন।”

ঋত্বিক চিৎকার করে বলল, “আপনি কে? আমার বাবার কী হয়েছিল?”

ওপাশের লোকটি বলল, “আজ রাত দশটায় বাগবাজারের বাড়িতে যান। সেখানে আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পাবেন।”

“আর ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু? আপনি বলেছিলেন, আগামীকাল তাঁর খুন হবে!”

“আমি বলিনি যে তিনি মারা যাবেন। বলেছিলাম, তাঁর মৃত্যুর খবর আপনি পাবেন।”

ঋত্বিক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কথার এই খেলাটা কেন?”

“কারণ আপনি এখনও বুঝতে পারেননি, এই গল্পে জীবিত মানুষদের চেয়ে মৃত মানুষের পরিচয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

ফোন কেটে গেল।

ঋত্বিক দ্রুত হাসপাতালের কর্মীদের কাছে ডাক্তার সৌম্যদীপের বর্তমান ঠিকানা জানতে চাইল।

কিন্তু কেউ তাঁর সম্পর্কে কিছু জানাতে পারল না।

একজন কর্মী শুধু বললেন, “ডাক্তারবাবু গত কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ।”

ঋত্বিকের মনে হল, রহস্যটা যত এগোচ্ছে, ততই আরও জটিল হয়ে উঠছে।


২. রাত দশটার সাক্ষাৎ

রাত দশটা পাঁচ।

বাগবাজারের ১৪ নম্বর গলির শেষ বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক দরজায় কড়া নাড়ল।

দরজা খুললেন নন্দিতা রায়।

তিনি দ্রুত তাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

“আপনি দেরি করেছেন।”

“আমি ঠিক দশটাতেই পৌঁছেছি।”

“এই বাড়িতে সময়ের হিসাব অন্যভাবে চলে।”

ঋত্বিক বিরক্ত হয়ে বলল, “দয়া করে আর ধাঁধা দেবেন না। আমি সত্য জানতে চাই।”

নন্দিতা তাকে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল। তার উপর একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ছবি এবং একটি কালো ডায়েরি।

“আপনার বাবা মৃত্যুর আগে এই ডায়েরিটা লিখেছিলেন,” নন্দিতা বললেন।

ঋত্বিক ডায়েরি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

আজ আমি এমন একটি সত্য জেনেছি, যার জন্য হয়তো আমাকে মরতে হবে। কিন্তু আমার ছেলেকে আমি সব সত্য জানিয়ে যেতে চাই।’

ঋত্বিক পড়তে লাগল।

ডায়েরির পরের পাতায় লেখা ছিল, তার বাবা একটি আর্থিক প্রতারণার ঘটনা তদন্ত করছিলেন। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মৃত মানুষের পরিচয় ব্যবহার করে সম্পত্তির মালিকানা বদলাচ্ছিলেন। হাসপাতালের রেকর্ড, মৃত্যুর শংসাপত্র এবং পুলিশের কিছু নথি বদলে দিয়ে তাঁরা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করতেন।

এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল একজন চিকিৎসক, একজন আইনজীবী এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক।

ঋত্বিকের চোখ আটকে গেল একটি নামের উপর।

ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু।

সে বলল, “তাহলে ডাক্তারবাবু এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?”

নন্দিতা মাথা নাড়লেন।

“প্রথমে ছিলেন। পরে তিনি সব বুঝতে পেরে চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।”

“আর অমিতাভ রায়?”

“অমিতাভ ছিলেন আইনজীবী। তিনি ওই চক্রের জন্য নথি তৈরি করতেন। কিন্তু একসময় তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। আপনার বাবাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন।”

ঋত্বিক বিস্ময়ে বলল, “কিন্তু আপনি তো বললেন, অমিতাভ বারো বছর আগে মারা গিয়েছেন!”

নন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর নাম ব্যবহার করে আরও একজন বহু বছর ধরে বেঁচে ছিল। আসল অমিতাভের মৃত্যু গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ তিনি যে নথিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলো এখনও চক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”

ঋত্বিক এবার কালো ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলল।

সেখানে লেখা—

‘আমার মৃত্যুর পর যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে সে যেন মনে রাখে—আমি আমার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য নিজের পরিচয় বদলাতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার ছেলে যদি কোনও দিন সত্যের খোঁজে ফিরে আসে, তাকে বলবে, সে যাকে বাবা বলে জানে, তার পরিচয়ই এই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় অংশ।’

ঋত্বিকের হাত কাঁপতে লাগল।

“আমার বাবা কি নিজের পরিচয় বদলে ফেলেছিলেন?”

নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“আপনি যাঁকে বাবা বলে জানেন, তিনি হয়তো আপনার জৈবিক বাবা নন।”

ঋত্বিকের পৃথিবী যেন ভেঙে পড়ল।

“আপনি কী বলছেন? আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন। আমার বাবার সঙ্গে আমার ছোটবেলার ছবি রয়েছে। তিনি আমাকে বড় করেছেন!”

“আমি জানি। কিন্তু ছবির মানুষ আর আপনার জন্মের সত্য এক জিনিস নয়।”

“তাহলে আমার আসল বাবা কে?”

নন্দিতা উত্তর দেওয়ার আগে টেপ রেকর্ডারটি চালু করলেন।

একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“ঋত্বিক, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি আর তোর কাছে নেই। তোর জন্মের সত্য আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম, কারণ তোর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ত। তুই আমার ছেলে—এই কথাটা রক্তের সম্পর্ক দিয়ে বিচার করিস না। আমি তোকে বড় করেছি, ভালোবেসেছি, আর তোর জন্যই সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি।”

ঋত্বিকের চোখে জল এসে গেল।

কণ্ঠটি তার বাবার।

রেকর্ডিং আবার চলতে লাগল।

“কিন্তু তোর জন্মের সঙ্গে এমন একজন মানুষের সম্পর্ক রয়েছে, যাকে সবাই মৃত বলে জানে। সেই মানুষটি যদি ফিরে আসে, তাহলে তুই বুঝতে পারবি কেন প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর তোর ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

ঋত্বিক নন্দিতার দিকে তাকাল।

“আমার ফোনে তো আজও সেই কল এসেছে।”

নন্দিতা মাথা নাড়লেন।

“কারণ যে মানুষটি আপনাকে ফোন করছে, সে আপনার জন্মের সত্য জানে। আর সে চায়, আপনি আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে তার সঙ্গে দেখা করুন।”

“কোথায়?”

নন্দিতা একটি কাগজ এগিয়ে দিলেন।

সেখানে লেখা—

‘পুরোনো শ্মশানঘাট। গঙ্গার ধারে। সকাল ৮টা ১০ মিনিট।’

ঋত্বিক কাগজটি হাতে নিতেই তার ফোন বেজে উঠল।

একই অচেনা নম্বর।

সে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে কণ্ঠটি বলল—

“ঋত্বিক, কাল সকালে তুমি তোমার বাবাকে দেখতে পাবে।”

ঋত্বিকের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“কোন বাবাকে?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“যিনি তোমাকে জন্ম দিয়েছেন।”

ফোন কেটে গেল।

ঋত্বিক কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নন্দিতা বললেন, “কাল সকালে আপনি একা যাবেন না। কারণ যে মানুষটি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবে, সে সত্য বলবে কি না, আমি জানি না।”

ঋত্বিক ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“এবার আর পালাব না।”

কিন্তু দরজা খুলে বাইরে বেরোনোর সময় সে খেয়াল করল, ঘরের টেবিলে রাখা ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবিতে লাল কালি দিয়ে গোল দাগ দেওয়া রয়েছে।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি হাসপাতালের সামনে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

একজন ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু।

একজন অমিতাভ রায়।

আর তৃতীয় ব্যক্তি—

ঋত্বিক নিজে।

কিন্তু ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর।

সেই সময় ঋত্বিকের বয়স ছিল মাত্র আঠারো।

ছবির পিছনে লেখা—

‘তৃতীয় মানুষটি জানে না, সে নিজেই এই মামলার শেষ সাক্ষী।’

ঋত্বিক ছবিটি পকেটে রাখল।

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

তার ফোনে আবার একটি বার্তা এল।

‘কাল সকাল ৮টা ১০ মিনিট। সত্য জানার জন্য প্রস্তুত থাকুন। তবে মনে রাখবেন, যাঁকে আপনি বাবা বলে ডাকবেন, তিনি হয়তো আপনাকে চিনবেন না।’

ঋত্বিক আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হল, বারো বছর আগে তার জীবনে যে অধ্যায় শুরু হয়েছিল, আগামীকাল সেই অধ্যায়ের শেষ হতে চলেছে।

কিন্তু সে জানত না, সত্য জানার পর তার সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

কারণ রাত বারোটার ঠিক আগে তার বাড়ির দরজার নীচ দিয়ে কেউ একটি খাম ঢুকিয়ে দিল।

খামের ভিতরে একটি ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শ্মশানঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ ঋত্বিকের দিকে তাকিয়ে আছেন।

লোকটির মুখ অবিকল ঋত্বিকের নিজের মতো।

ছবির পিছনে মাত্র একটি বাক্য—

‘আগামীকাল তোমাদের মধ্যে একজনই বেঁচে থাকবে।’

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত্যুর আগে শেষ ফোন (প্রথম পর্ব: যে খুন এখনও ঘটেনি)।

রাত তখন ১২টা ১৭ মিনিট।

কলকাতার আকাশে ঘন মেঘ। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি অন্ধকার শহরটাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে দিচ্ছে। রাস্তার অধিকাংশ দোকান বন্ধ। বৃষ্টির জলে ফাঁকা রাস্তাগুলো চকচক করছে।

উত্তর কলকাতার একটি পুরোনো বাড়ির তিনতলায় বসে ল্যাপটপে খবর লিখছিল সাংবাদিক ঋত্বিক চৌধুরী।

বয়স তিরিশ। একটি জনপ্রিয় বাংলা সংবাদপোর্টালে ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে কাজ করে সে। গত ছয় বছর ধরে খুন, অপহরণ, প্রতারণা এবং রাজনৈতিক অপরাধের খবর করতে করতে মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অনেকটাই কমে গিয়েছে।

তবু একটা ব্যাপারে সে এখনও বিশ্বাস করে—প্রমাণ ছাড়া কোনও ঘটনাকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া যায় না।

সেদিন রাতেও সে একটি পুরোনো খুনের মামলা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছিল। ঠিক তখনই টেবিলের উপর রাখা ফোনটি বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

ঋত্বিক ফোন ধরল।

“হ্যালো, কে বলছেন?”

ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনও উত্তর এল না।

তারপর একজন পুরুষের চাপা গলা শোনা গেল।

“ঋত্বিকবাবু, কাল সকালে আপনি একটা খুনের খবর করবেন।”

ঋত্বিক বিরক্ত হয়ে বলল, “কে আপনি? এসব মজা করার সময় নয়।”

লোকটি শান্ত গলায় বলল, “আমি মজা করছি না। আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে কলকাতার শ্যামবাজারের কাছে একটি পুরোনো বাড়িতে একজন মানুষকে খুন করা হবে।”

ঋত্বিক চেয়ারে সোজা হয়ে বসল।

“আপনি কীভাবে জানলেন?”

“কারণ খুনটা যে করবে, সে আমার খুব পরিচিত।”

“খুনির নাম কী?”

“এখন বলতে পারব না। তবে মৃত মানুষের নাম বলতে পারি।”

ঋত্বিক কলমটা হাতে নিল।

“বলুন।”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“অমিতাভ রায়। বয়স সাতচল্লিশ। পেশায় আইনজীবী। তাঁর বুকের বাঁ দিকে ছুরি মারা হবে। পুলিশ প্রথমে ঘটনাটাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করবে।”

ঋত্বিকের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“একজন মানুষকে খুন করা হবে, আর আপনি আমাকে ফোন করে জানাচ্ছেন? আপনার কাছে প্রমাণ আছে?”

“প্রমাণ পাবেন আগামীকাল সকালে। শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড় থেকে পুরোনো বাড়িটির দিকে গেলে একটি বন্ধ ওষুধের দোকান দেখতে পাবেন। তার পাশের নর্দমার উপর একটি কালো খাম রাখা থাকবে। খামটি খুললেই বুঝবেন, আমি মিথ্যে বলছি না।”

ঋত্বিক আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই ফোন কেটে গেল।

সে নম্বরটিতে আবার ফোন করল।

যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল—নম্বরটি বর্তমানে পরিষেবার বাইরে।

ঋত্বিক নিজের মনে বলল, “কেউ হয়তো আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।”

কিন্তু রাতটা আর স্বাভাবিকভাবে কাটল না।

পরদিন সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে সে ক্যামেরা, নোটবুক এবং ফোন নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

শ্যামবাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল আটটা পাঁচ।

চারপাশে তখন ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। দোকান খুলছেন ব্যবসায়ীরা, বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা, রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে ভিড় জমেছে।

ঋত্বিক বন্ধ ওষুধের দোকানটি খুঁজে পেল।

দোকানের পাশের নর্দমার উপর সত্যিই একটি কালো খাম পড়ে রয়েছে।

সে চারপাশে তাকিয়ে খামটি তুলে নিল।

ভিতরে ছিল তিনটি জিনিস—একটি পুরোনো ছবি, একটি ছোট্ট চাবি এবং হাতে লেখা একটি কাগজ।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অমিতাভ রায় একটি ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে আরও দুজন মানুষ। একজন মধ্যবয়সি মহিলা, অন্যজন বছর পঁচিশের এক যুবক।

ছবির পিছনে লেখা—

‘এই তিনজনের মধ্যে একজন আজ মারা যাবে। আর একজন জানে, কেন মৃত্যু অবধারিত।’

ঋত্বিক কাগজটি খুলল।

সেখানে লেখা—

“ঘড়িতে যখন আটটা দশ বাজবে, তখন বাড়ির দোতলার উত্তর দিকের ঘরে তাকাবেন। আপনি যা দেখবেন, তা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় খবর হবে।”

ঋত্বিক ঘড়ির দিকে তাকাল।

সকাল আটটা সাত।

সে দ্রুত পুরোনো বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল।

বাড়িটির রং উঠে গিয়েছে। বারান্দার রেলিংয়ে মরচে। দরজার সামনে একটি পুরোনো নামফলক—‘রায় ভিলা’।

দরজা সামান্য খোলা।

ঋত্বিক ভিতরে ঢুকে দেখল, এক বৃদ্ধ দারোয়ান চেয়ারে বসে সংবাদপত্র পড়ছেন।

“অমিতাভ রায়বাবু আছেন?”

বৃদ্ধ মাথা তুলে তাকালেন।

“আপনি কে?”

“আমি সাংবাদিক। ওঁর সঙ্গে একটু কথা ছিল।”

বৃদ্ধ সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, “বাবু এখন কারও সঙ্গে দেখা করবেন না।”

ঠিক তখনই দোতলা থেকে একজন মহিলার চিৎকার শোনা গেল।

“বাঁচান! কেউ আছেন?”

ঋত্বিক সিঁড়ি দিয়ে ছুটে উঠল।

উত্তর দিকের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সে ধাক্কা দিতে লাগল।

“দরজা খুলুন! কী হয়েছে?”

কোনও উত্তর নেই।

ঘড়িতে সকাল আটটা দশ।

ঠিক সেই মুহূর্তে ভিতর থেকে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হল।

ঋত্বিক আর অপেক্ষা করল না। দারোয়ানের সাহায্যে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল।

মেঝেতে পড়ে আছেন অমিতাভ রায়।

তাঁর বুকের বাঁ দিকে রক্তের দাগ। পাশে পড়ে রয়েছে একটি ছুরি।

ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন ছবিতে দেখা সেই মধ্যবয়সি মহিলা।

ঋত্বিক দ্রুত পুলিশে ফোন করল।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ এসে পৌঁছল। মৃতদেহ পরীক্ষা করে প্রাথমিকভাবে একজন পুলিশকর্মী বললেন, “দেখে তো আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে।”

ঋত্বিক প্রতিবাদ করল, “কিন্তু আমাকে গত রাতে ফোন করে বলা হয়েছিল, এই সময়ে এখানে খুন হবে!”

পুলিশের এক অফিসার তার দিকে ঘুরে তাকালেন।

“আপনাকে কে ফোন করেছিল?”

“জানি না। অচেনা নম্বর।”

“ফোনের রেকর্ড আছে?”

ঋত্বিক ফোন দেখাল। নম্বরটি রয়েছে, কিন্তু সেটিতে কলব্যাক করলে কোনও সংযোগ হচ্ছে না।

অফিসার বললেন, “আপনি আমাদের সঙ্গে থানায় চলুন। আপনার বক্তব্য নথিভুক্ত করতে হবে।”

ঋত্বিক বুঝতে পারছিল, বিষয়টি আর সাধারণ কোনও অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাটি তখনও বাকি ছিল।

পুলিশ যখন মৃতদেহ সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ঋত্বিকের ফোন আবার বেজে উঠল।

একই অচেনা নম্বর।

সে পুলিশ অফিসারের সামনেই ফোন ধরল।

“আপনি কে? কীভাবে সব জানলেন?”

ওপাশের লোকটি বলল, “প্রথম খবরটা পেয়ে গেছেন তো?”

ঋত্বিক দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি কি খুনটা করেছেন?”

“না।”

“তাহলে কে করেছে?”

“যে মানুষটি মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।”

ঋত্বিকের চোখ ধীরে ধীরে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার দিকে গেল।

মহিলা তখনও কাঁদছেন।

লোকটি আবার বলল, “তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করলেই সত্যি জানা যাবে না। কারণ অমিতাভ রায়ের মৃত্যু হয়েছে আজ নয়, বারো বছর আগে।”

ঋত্বিক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কী বলছেন আপনি?”

“আজ যে মানুষটিকে মৃত অবস্থায় দেখছেন, সে অমিতাভ রায় নয়। সে এমন একজন, যে বারো বছর ধরে মৃত মানুষের পরিচয় নিয়ে বেঁচে ছিল।”

ঋত্বিকের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন?”

ওপাশের লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল—

“দোতলার ঘরের আলমারির নীচের ড্রয়ার খুলুন। সেখানে একটি লাল ফাইল পাবেন। ফাইলের প্রথম পাতায় আপনার বাবার নাম লেখা আছে।”

ঋত্বিকের বুকের ভিতরটা যেন থেমে গেল।

তার বাবা, অনিরুদ্ধ চৌধুরী, বারো বছর আগে একটি রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। ঋত্বিক তখন কলেজে পড়ে। বাবার মৃত্যুর পর পুলিশ জানিয়েছিল, দুর্ঘটনাটি নিছকই একটি দুর্ঘটনা।

কিন্তু অচেনা লোকটি তার বাবার নাম জানল কীভাবে?

সে ফিসফিস করে বলল, “আমার বাবার সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“আপনার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি, ঋত্বিকবাবু।”

ঋত্বিকের চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল।

“তাহলে কী হয়েছিল?”

লোকটি বলল, “সেটা জানতে হলে আপনাকে নিজের বাবার মৃত্যুর তদন্ত আবার শুরু করতে হবে। আর তাড়াতাড়ি করতে হবে। কারণ আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে দ্বিতীয় খুনটি ঘটবে।”

“কার খুন?”

ওপাশ থেকে একটি নাম ভেসে এল।

“ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু।”

ঋত্বিক দ্রুত নামটি লিখে নিল।

“কোথায়?”

“কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পুরোনো রেকর্ড রুমে।”

“কিন্তু আপনি কে?”

এবার লোকটি এমন একটি কথা বলল, যা শুনে ঋত্বিকের বুকের ভিতর বরফ জমে গেল।

“আমি সেই মানুষ, যাকে আপনার বাবা শেষবার ফোন করেছিলেন।”

“আপনি কি বাবাকে চিনতেন?”

“শুধু চিনতাম না। আপনার বাবার মৃত্যুর রাতেও আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম।”

ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল, “আপনি যদি সব জানেন, তাহলে এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”

লোকটি ধীরে ধীরে বলল—

“কারণ আপনার বাবা আমাকে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে বড় না হওয়া পর্যন্ত আমি সত্যিটা প্রকাশ করব না।”

“আপনার নাম বলুন!”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর লোকটি বলল—

“আমার নাম অমিতাভ রায়।”

ঋত্বিকের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

যে মানুষটির মৃতদেহ তার সামনে পড়ে রয়েছে, সেই মানুষই তাকে ফোন করছে!

সে তাড়াতাড়ি ঘরের মেঝের দিকে তাকাল।

কিন্তু পরের মুহূর্তে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।

মেঝেতে পড়ে থাকা মৃতদেহটির মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, মৃত মানুষটি অমিতাভ রায় নন।

মুখটি তার নিজের বাবার মতো দেখতে।

অনিরুদ্ধ চৌধুরী!

ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল, “বাবা!”

আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে ফোনের ওপাশ থেকে শেষ কথাটি ভেসে এল—

“ঋত্বিক, এবার তোমার পালা। আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে যে মানুষটি মারা যাবে, সে আর কেউ নয়—তুমি নিজে।”

কল কেটে গেল।

ঋত্বিক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ঘড়ির দিকে তাকাল।

ঘড়ির কাঁটা আবার আটটা দশ মিনিটে ফিরে এসেছে।

এবং মৃতদেহের পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে এমন একজন মানুষ, যাকে ঋত্বিক নিজের চোখে বারো বছর আগে কবর দিতে দেখেছিল।

তার বাবা।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী(তৃতীয় ও শেষ পর্ব: শেষ ট্রেনের শেষ সত্য)।

রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

পুরোনো সিগন্যাল ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে অর্ক সেনের মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে পড়েছে। সামনে তার বাবার মুখের মতো দেখতে একজন মানুষ। পাশে তার মা মধুরিমা। আর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার হরিপদ, যাঁর নামই কিনা বাবার হত্যার নথিতে লেখা রয়েছে।

অর্কের হাতে সেই পুরোনো ছবিটি।

ছবির পিছনে লেখা—‘সেই রাতে আমরা তিনজনই মারা গিয়েছিলাম।’

অর্ক ছবিটি তুলে ধরে বলল, “আমি আর কোনও ধাঁধা চাই না। আপনারা প্রত্যেকে নিজেদের পরিচয় দিন। সত্যিটা এখনই জানতে চাই।”

দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“আমার নাম অরিন্দম সেন। আমি তোমার বাবা।”

অর্ক চিৎকার করে উঠল, “প্রমাণ কী?”

লোকটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট রুপোর লকেট বের করল। লকেটটি খুলতেই ভিতরে দেখা গেল অর্কের ছোটবেলার ছবি।

“তোমার জন্মের দিন তোমার মা এই লকেটটি আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন আমাদের ছেলে বড় হলে যেন আমি ওকে এটা দিই।”

মধুরিমা লকেটটি দেখে কেঁপে উঠলেন।

“এই লকেটটা তো আমি তোমার হাতে দিয়েছিলাম, অরিন্দম!”

অর্কের মাথা ঘুরে গেল।

দুজনেই একই স্মৃতি জানেন। দুজনের কাছেই এমন কিছু প্রমাণ রয়েছে, যা তাঁদের সত্যি বলে মনে করাতে পারে।

তখন হরিপদ ধীরে ধীরে বললেন, “এবার আমার কথা শোনো। এই রহস্যের সমাধান করতে হলে তোমাকে বারো বছর আগের সেই রাতের ঘটনাটা জানতে হবে।”

তিনি ঘরের পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসলেন।

“২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর, রাত এগারোটার দিকে, তোমার বাবা অরিন্দম আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর ভাই অনিরুদ্ধ এমন একটি ষড়যন্ত্র করেছে, যা প্রকাশ পেলে অনেক প্রভাবশালী মানুষের মুখোশ খুলে যাবে। তোমার বাবা সেই ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নিয়ে আমার কাছে আসছিলেন।”

“তারপর?”

“তারপর একটি গাড়ি রেলক্রসিংয়ের কাছে দুর্ঘটনার শিকার হয়। গাড়ির ভিতরে তিনজন ছিলেন বলে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু গাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে যে দেহ উদ্ধার হয়েছিল, তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।”

অর্ক বলল, “তাহলে বাবা মারা যাননি?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, তিনি মারা গিয়েছেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর যখন তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কাগজপত্র তৈরি হচ্ছিল, তখন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় থেকেই আমি সন্দেহ করতে শুরু করি, দুর্ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল।”

মধুরিমা বললেন, “সেই রাতেই আমাকে অপহরণ করা হয়। অর্ককে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমি বারবার জানতে চেয়েছিলাম, আমার স্বামী কোথায়। কিন্তু কেউ আমাকে উত্তর দেয়নি।”

অর্ক মায়ের হাত ধরল।

“তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

“একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আমাকে আটকে রাখা হয়েছিল। আমার কাছে যে নথিগুলো ছিল, সেগুলোর জন্যই আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। ওরা ভেবেছিল, একদিন আমি নথিগুলোর অবস্থান জানিয়ে দেব।”

“কিন্তু তুমি তো এখন আমার সামনে!”

মধুরিমা মৃদু হাসলেন।

“কারণ আজকের রাতেই আমাকে শেষবারের মতো সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তুমি এখানে এসে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছ।”

দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষটি হঠাৎ বলল, “অনেক হয়েছে। এবার নথিগুলো আমার হাতে দাও।”

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যদি সত্যিই আমার বাবা হন, তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আমার জন্মের সময় মা কী বলেছিলেন?”

লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তিনি বলেছিলেন, আমাদের ছেলে একদিন বড় হয়ে সত্যের জন্য লড়বে।”

মধুরিমা চোখ বন্ধ করলেন।

“না। আমি বলেছিলাম, আমাদের ছেলে যেন কখনও মিথ্যার কাছে মাথা নত না করে।”

অর্ক বুঝতে পারল, লোকটি স্মৃতির কথাগুলো বদলে বলছে। কিন্তু শুধু এই ভুল দিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না।

ঠিক তখনই বৃদ্ধ হরিপদ উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি জানি, কীভাবে এই রহস্যের সমাধান হবে।”

তিনি আলমারির ভিতর থেকে আরেকটি খাম বের করলেন।

খামের উপর লেখা—‘অর্কের জন্য। শুধু ১৭ অক্টোবর খুলবে।’

অর্ক খামটি খুলল।

ভিতরে একটি চিঠি এবং একটি ছোট্ট অডিও রেকর্ডার।

চিঠিতে লেখা—

‘অর্ক, যদি তুমি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝব তুমি শেষ পর্যন্ত সত্যের কাছে পৌঁছেছ। তোমাকে একটি কথা মনে রাখতে হবে। মানুষের মুখ নকল করা যায়, তার স্মৃতির অনুকরণ করা যায়, কিন্তু অপরাধের উদ্দেশ্য লুকিয়ে রাখা যায় না। যে মানুষ তোমাকে সত্যের বদলে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে, তাকে কখনও বিশ্বাস করবে না।’

চিঠির নীচে স্বাক্ষর—

অরিন্দম সেন।

অর্ক রেকর্ডারটি চালু করল।

প্রথমে কিছু শব্দ, তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ।

“আমি অরিন্দম সেন। আমার যমজ ভাই অনিরুদ্ধ বহু বছর ধরে আমার পরিচয় ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে একা নয়। আমাদের পরিবারের সম্পত্তি দখলের ষড়যন্ত্রে আরও একজন জড়িত। সেই মানুষটি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মী। আমি যদি আর ফিরে না আসি, তাহলে হরিপদকে বিশ্বাস করবে। সে ভুল করেছে, কিন্তু সে আমার হত্যাকারী নয়।”

রেকর্ডিং শেষ হল।

অর্ক ধীরে ধীরে হরিপদের দিকে তাকাল।

“আপনি তাহলে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি একটি ভুল করেছিলাম। তোমার বাবার অনুরোধ সত্ত্বেও আমি তাঁর যাত্রার কথা অন্য একজনকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সে তাঁকে সাহায্য করবে। কিন্তু সেই তথ্যই ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে পৌঁছে যায়। তোমার বাবাকে বাঁচাতে পারিনি। তারপর থেকে অপরাধবোধ আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে।”

“সেই অন্য মানুষটি কে?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার বাইরে থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“সেই মানুষটি আমি।”

ঘরের সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।

সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। সাদা চুল, কালো কোট, হাতে লাঠি। তাঁর মুখে অদ্ভুত এক হাসি।

অর্ক তাঁকে চিনতে পারল।

তিনি দেবব্রত সেন—অর্কের দাদু।

কিন্তু তাঁর তো বহু বছর আগেই মৃত্যু হয়েছিল!

অর্ক হতবাক হয়ে বলল, “দাদু! আপনি বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন।

“হ্যাঁ, অর্ক। আমি বেঁচে আছি। আর তোমার পরিবারের এই সমস্ত বিপর্যয়ের জন্য আমিই দায়ী।”

মধুরিমা চিৎকার করে উঠলেন, “দেবব্রতবাবু! আপনি নিজের ছেলেকেও রেহাই দেননি!”

দেবব্রত মাথা নিচু করলেন না। বরং ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি যা করেছি, সব করেছি পরিবারকে বাঁচানোর জন্য।”

অর্ক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।

“পরিবারকে বাঁচানোর জন্য নিজের ছেলেকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন?”

“তোমার বাবা পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি করে সমস্ত টাকা একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে দান করতে চেয়েছিল। আমি সেটা মেনে নিতে পারিনি। সেই সম্পত্তির উপর আমার অধিকার ছিল।”

“তাই আপনি অনিরুদ্ধের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। অনিরুদ্ধকে আমি ফিরিয়ে এনেছিলাম। ওকে তোমার বাবার পরিচয় নিতে সাহায্য করেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল, অরিন্দমকে সরিয়ে দিয়ে অনিরুদ্ধকে পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। তারপর সম্পত্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।”

অর্কের চোখে ঘৃণা।

“আর মা?”

“মধুরিমা নথিগুলোর অবস্থান জানত। তাই তাকে বন্দি রাখা হয়েছিল।”

“আর আমাকে?”

দেবব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোমাকে অন্য পরিচয়ে বড় করা হয়েছিল, যাতে তুমি কখনও এই পরিবারের সত্য জানতে না পারো। আমি ভেবেছিলাম, তুমি কিছুই মনে রাখতে পারবে না।”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

“আপনি আমার দাদু ছিলেন। আমি ছোটবেলায় আপনার ছবি দেখে আপনাকে মনে করার চেষ্টা করেছি। আর আপনি আমার জীবনটাই মিথ্যে দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিলেন!”

দেবব্রত প্রথমবারের মতো চোখ নামিয়ে নিলেন।

কিন্তু তাঁর মুখে অনুশোচনার চিহ্ন খুব সামান্য।

“আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন আর কিছু বদলানো সম্ভব নয়। নথিগুলো আমাকে দাও। আমি তোমার মাকে মুক্তি দেব।”

অর্ক বলল, “আপনি এখনও ভাবছেন, আমি আপনার সঙ্গে সমঝোতা করব?”

দেবব্রত লাঠির মাথায় চাপ দিলেন। ঘরের এক কোণে লুকোনো একটি দরজা খুলে গেল।

সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন সেই মানুষটি, যাকে অর্ক এতক্ষণ নিজের বাবা বলে ভাবছিল।

লোকটি এবার মুখের উপর থেকে একটি পাতলা কৃত্রিম আবরণ খুলে ফেলল।

অর্ক দেখল, মুখটি অরিন্দমের মতো হলেও চোখে অন্য রকম চাহনি।

লোকটি বলল, “আমি অনিরুদ্ধ সেন। তোমার কাকা। আর তোমার বাবা কোথায় আছে, সেটা একমাত্র আমি জানি।”

অর্ক তার দিকে এগিয়ে গেল।

“আমার বাবা বেঁচে আছেন?”

অনিরুদ্ধ মুচকি হাসল।

“হয়তো। হয়তো নেই। তুমি যদি নথিগুলো দাও, তাহলে জানতে পারবে।”

মধুরিমা চিৎকার করে উঠলেন, “ওর কথা বিশ্বাস কোরো না!”

অনিরুদ্ধ পকেট থেকে একটি ছোট্ট ছবি বের করল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি অন্ধকার ঘরে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন অরিন্দম সেন। ছবির নীচে লেখা—‘শেষ সাক্ষাৎ’।

অর্কের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

“কোথায় তিনি?”

অনিরুদ্ধ বলল, “পুরোনো রেলওয়ে টানেলের শেষ প্রান্তে। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগে তোমাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে।”

হরিপদ বাধা দিতে গেলেন। দেবব্রত লাঠি তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

অনিরুদ্ধ চমকে উঠল।

“পুলিশ এখানে এল কীভাবে?”

অর্ক শান্ত গলায় বলল, “আমি স্টেশনে আসার আগেই সমস্ত তথ্য আমার সহকর্মীকে পাঠিয়েছিলাম। আমার ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকলেও, স্টেশনে ঢোকার আগে পাঠানো বার্তাগুলো পৌঁছে গিয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমার খবর না পেলে পুলিশকে জানাতে।”

দেবব্রত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন।

“তুমি সব নষ্ট করে দিলে!”

তিনি দরজার দিকে দৌড়তে গেলেন। কিন্তু ঠিক তখনই পুলিশ সিগন্যাল ঘরে ঢুকে পড়ল।

অনিরুদ্ধ পালানোর চেষ্টা করল। একজন পুলিশকর্মী তাকে ধরে ফেললেন। দেবব্রতকেও আটক করা হল।

কিন্তু অর্কের একটাই প্রশ্ন—

তার বাবা কোথায়?

হরিপদ দ্রুত বললেন, “টানেল। আমাদের এখনই সেখানে যেতে হবে।”

পুলিশের সাহায্যে অর্ক, মধুরিমা ও হরিপদ পুরোনো রেলওয়ে টানেলের দিকে রওনা দিলেন।

টানেলের ভিতরে অন্ধকার। দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে পুরোনো কাঠ আর লোহার টুকরো।

শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট ঘর।

দরজা খুলতেই অর্ক দেখতে পেল, একজন মানুষ মেঝেতে বসে আছেন। মুখে দাড়ি, চুল এলোমেলো, শরীর দুর্বল।

কিন্তু চোখ দুটি অর্কের অচেনা নয়।

অর্ক দৌড়ে গিয়ে তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

“বাবা!”

লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“অর্ক?”

অর্ক বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বারো বছর ধরে যে মানুষটির মৃত্যুশোক বয়ে বেড়িয়েছে, তিনি তার সামনে জীবিত।

অরিন্দম কাঁপা হাতে ছেলের মুখ ছুঁয়ে বললেন, “তুই এত বড় হয়ে গেছিস! আমি জানতাম, একদিন তুই সত্যের খোঁজে আসবি।”

মধুরিমা স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, আর কোনও দিন তোমাকে দেখতে পাব না।”

অরিন্দম বললেন, “ওরা আমাকে বছরের পর বছর আটকে রেখেছিল। আমাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, যাতে কেউ আমার খোঁজ না করে। কিন্তু আমি জানতাম, অর্ক একদিন সব খুঁজে বের করবে।”

অর্ক বলল, “বাবা, তুমি জানতেই কীভাবে যে আমি আসব?”

অরিন্দম মৃদু হাসলেন।

“কারণ সত্যকে যতই চাপা দেওয়া হোক, একদিন না একদিন কেউ না কেউ তার খোঁজ করবেই। আমি শুধু আশা করেছিলাম, সেই মানুষটা তুই হবি।”

পুলিশ অরিন্দমকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে এল।

ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। শালবনি রোড স্টেশনের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

কিন্তু অর্কের মনে আরও একটি প্রশ্ন রয়ে গেল।

“বাবা, সেই ট্রেনটা কী? কেন প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর এখানে আসে? কেন আমি বারবার একই সময় দেখতে পাচ্ছিলাম?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “তুই যে ট্রেন দেখেছিস, সেটা কোনও ভূতের ট্রেন নয়। বারো বছর আগে দুর্ঘটনার রাতে এই লাইনে একটি বিশেষ ট্রেন দাঁড়িয়েছিল। সেই ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী ষড়যন্ত্রের সাক্ষী হয়েছিলেন। পরে তাঁদের পরিচয় গোপন করা হয়। রেলওয়ের কিছু কর্মী আর স্থানীয় কয়েকজন মানুষ মিলে প্রতি বছর ওই রাতের স্মৃতি ধরে রাখতেন। পুরোনো মাইক, বন্ধ সিগন্যাল আর স্টেশনের আলো ব্যবহার করে একটা রহস্যের আবহ তৈরি হয়েছিল, যাতে কেউ সহজে সত্যের কাছে পৌঁছতে না পারে।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল, “তাহলে সময় থেমে যাওয়ার ব্যাপারটা?”

হরিপদ বললেন, “স্টেশনের পুরোনো ঘড়ি বহু বছর ধরে নষ্ট। আর তোর ফোনে সময় আটকে যাওয়ার কারণ ছিল দুর্বল নেটওয়ার্ক ও যন্ত্রের সমস্যা। তুই যখন ভয় পেয়েছিলি, তখন প্রতিটি ঘটনাকে আরও রহস্যময় মনে হচ্ছিল। তবে সবকিছু যে সাজানো ছিল, তা নয়। তোর বাবাকে সত্যিই বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তোর মাকে সত্যিই অপহরণ করা হয়েছিল, আর তোর পরিবারকে সত্যিই ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল।”

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সে বুঝতে পারল, সব রহস্যের উত্তর অতিপ্রাকৃত নয়। কখনও কখনও মানুষের লোভ, ভয় আর অপরাধই ভূতের গল্পের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

কয়েক মাস পরে আদালতে দেবব্রত সেন ও অনিরুদ্ধ সেনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হল। তদন্তে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এল। হরিপদ নিজের ভুলের কথা স্বীকার করে তদন্তে সহযোগিতা করলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বহু পুরোনো নথি উদ্ধার করা সম্ভব হল।

অর্ক আবার কলকাতায় ফিরে গেল।

কিন্তু এবার সে আর আগের অর্ক নয়।

সে নিজের সংবাদপোর্টালে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করল—

‘শেষ ট্রেনের যাত্রী: ভূতের গল্পের আড়ালে বারো বছরের অপরাধ।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোড়ন পড়ে গেল। বহু মানুষ জানতে পারলেন, কীভাবে একটি পরিবারকে সম্পত্তির লোভে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল।

এক বছর পর, ১৭ অক্টোবর।

অর্ক আবার শালবনি রোড স্টেশনে এল। এবার তার সঙ্গে বাবা-মা দুজনেই রয়েছেন।

প্ল্যাটফর্মের পুরোনো ঘড়িটি মেরামত করা হয়েছে। মাইকেও আর কোনও অদ্ভুত ঘোষণা শোনা যায় না।

রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে অর্ক একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।

ঠিক সেই সময় দূরে একটি ট্রেনের আলো দেখা গেল।

অর্কের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

একজন বৃদ্ধ যাত্রী নেমে অর্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে একটি কালো ডায়েরি।

অর্ক চমকে উঠল।

এটা সেই ডায়েরি, যেটি এক বছর আগে বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার হরিপদ তাকে দিয়েছিলেন!

বৃদ্ধ ডায়েরিটি অর্কের হাতে দিয়ে বললেন, “সব সত্যি কি জানতে পেরেছ?”

অর্ক উত্তর দিল, “হ্যাঁ। সব রহস্যের সমাধান হয়েছে।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“তাহলে শেষ পাতাটা পড়ে দেখো।”

অর্ক ডায়েরির শেষ পাতা খুলল।

সেখানে লেখা—

‘১৭ অক্টোবর, ২০২৬। আজ শেষ ট্রেনটি আর কাউকে নিয়ে যাবে না। কারণ যে সত্য এত বছর ধরে অন্ধকারে বন্দি ছিল, আজ সে মুক্ত।’

অর্ক মুখ তুলে তাকাল।

বৃদ্ধ আর সেখানে নেই।

প্ল্যাটফর্মে শুধু অর্ক, তার বাবা-মা আর সকালের দিকে ছুটে চলা কয়েকজন যাত্রী।

অর্ক ডায়েরিটি বন্ধ করে দিল।

সে জানত না, বৃদ্ধটি সত্যিই হরিপদ ছিলেন, নাকি তার ক্লান্ত মনের কল্পনা। তবে এবার সে ভয় পেল না।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, রহস্যের অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্যের সন্ধান থামিয়ে দেওয়া যায় না।

অরিন্দম ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।

“চল, বাড়ি যাই।”

অর্ক মায়ের হাত ধরল। তারপর বাবার সঙ্গে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল।

পিছনে রেললাইনের উপর সূর্যের আলো পড়েছে।

শেষ ট্রেনটি ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।

এবার তার কোনও রহস্য নেই।

কোনও বন্দি যাত্রী নেই।

কোনও অসমাপ্ত অপেক্ষা নেই।

শুধু একটি পরিবারের ফিরে পাওয়া জীবন, আর একজন সাংবাদিকের অটুট বিশ্বাস—

“মিথ্যে যত শক্তিশালীই হোক, সত্যকে চিরকাল আটকে রাখা যায় না।”

সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: যে ছেলেটি নিজের জন্মের সাক্ষী)।

রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

শালবনি রোড স্টেশনের শেষ ট্রেনের ভিতরে দাঁড়িয়ে অর্ক সেন বুঝতে পারছিল না, কাকে বিশ্বাস করবে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি তার বাবার মতো দেখতে। আর তার পাশে বসে থাকা মহিলা দাবি করছেন, তিনি তার মা।

কিন্তু দুজনের একজন মিথ্যে বলছেন।

হয়তো দুজনেই।

ট্রেনের মাইকে আবার ঘোষণা হল—

“যাত্রী অর্ক সেনকে জানানো যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আপনার হাতে আর এগারো মিনিট সময় রয়েছে।”

অর্ক পকেট থেকে ফোন বের করল। কোনও নেটওয়ার্ক নেই। সময় ১১টা ৪৭ মিনিটেই আটকে রয়েছে।

সে বাবার মতো দেখতে মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যদি আমার বাবা হন, তাহলে আমার ছোটবেলার এমন একটা কথা বলুন, যা বাইরের কেউ জানে না।”

লোকটি এক মুহূর্তও দেরি করল না।

“তুমি যখন পাঁচ বছরের ছিলে, তখন একদিন ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিলে। তোমার বাঁ হাঁটুতে একটা দাগ হয়েছিল। তুমি কেঁদে বলেছিলে, বড় হয়ে তুমি ডাক্তার হবে, যাতে কাউকে আর ব্যথা পেতে না হয়।”

অর্ক নিজের বাঁ হাঁটুর দিকে তাকাল। সত্যিই সেখানে ছোট্ট একটা দাগ রয়েছে।

তার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

লোকটি মৃদু হাসল।

“দেখলে তো? আমিই তোমার বাবা।”

অর্ক এবার মায়ের দিকে ফিরল।

মধুরিমা চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। তাঁর গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

“মা, তুমি কিছু বলছ না কেন?”

মধুরিমা ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।

“কারণ ওই কথাটা সত্যি। কিন্তু তোমার বাবার স্মৃতি যার কাছে রয়েছে, সে তোমার বাবা হয়ে যায় না।”

“তাহলে ও আমার সম্পর্কে এত কিছু জানে কীভাবে?”

মধুরিমা উত্তর দিলেন না।

বাবার মতো দেখতে লোকটি হঠাৎ হেসে উঠল।

“তোমার মা বরাবরই এমন। নিজের অপরাধ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে ওর জুড়ি নেই।”

অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনারা দুজনেই শুধু অভিযোগ করছেন। কেউ সত্যিটা বলছেন না।”

সে কামরার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার বাইরে তাকাতেই দেখল, প্ল্যাটফর্ম নেই। জানালার বাইরে ছুটে চলেছে অসংখ্য অন্ধকার গাছ। মাঝেমধ্যে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে পুরোনো বাড়ি, ভাঙা সেতু আর কয়েকজন মানুষের ছায়া।

হঠাৎ একটি দৃশ্য দেখে অর্কের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট ছেলে। তার বয়স পাঁচ বছর। পরনে নীল জামা। ছেলেটি দুহাত তুলে ট্রেন থামানোর চেষ্টা করছে।

অর্ক বুঝতে পারল, ছেলেটি দেখতে অবিকল তার ছোটবেলার মতো।

তারপরই একটি বিকট শব্দ হল।

ট্রেনের জানালা কেঁপে উঠল।

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

কয়েক সেকেন্ড পরে চোখ খুলে দেখল, সে আর ট্রেনের কামরায় নেই।

সে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি পুরোনো বাড়ির সামনে।

বাড়ির দরজায় লেখা—‘সেন নিবাস’।

দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের চিৎকার।

একজন মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, “আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও!”

একজন পুরুষ বলছেন, “ওকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবাইকে চুপ থাকতে হবে।”

তারপর একটি ছোট্ট ছেলেকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ।

অর্ক ছুটে গেল তাঁর দিকে।

“আপনি কে? ওই বাচ্চাটা কে?”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।

“তুমি এত বড় হয়ে গেছ, অর্ক?”

অর্ক স্তব্ধ।

বৃদ্ধের মুখ সে চেনে। তাঁর ছবি তাদের বাড়ির পুরোনো অ্যালবামে রয়েছে। তিনি অর্কের দাদু, দেবব্রত সেন। অর্কের জন্মের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে পরিবারে সবাই জানত।

দাদু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমাকে একটা সত্যি জানতে হবে। বারো বছর আগে তোমার বাবা-মায়ের গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়নি। দুর্ঘটনার গল্পটা বানানো হয়েছিল।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা একটি গোপন নথি খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই নথিতে প্রমাণ ছিল, আমাদের পরিবারের সম্পত্তি দখল করার জন্য বহু বছর ধরে একটি চক্র কাজ করছিল। সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল আমাদেরই একজন আত্মীয়।”

“কে সে?”

দাদু উত্তর দেওয়ার আগেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল।

আবার সেই ট্রেনের কামরা।

অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুলল।

মধুরিমা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আর বাবার মতো দেখতে লোকটি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে।

“কিছু মনে পড়ল, অর্ক?”

অর্ক চিৎকার করে উঠল, “ওটা কী ছিল? আমি আমার দাদুকে দেখলাম!”

লোকটি বলল, “তোমার মস্তিষ্ক তোমাকে বিভ্রান্ত করছে। তোমার মা তোমাকে এইসব দৃশ্য দেখাচ্ছেন।”

মধুরিমা এবার উঠে দাঁড়ালেন।

“আর কত মিথ্যে বলবে? অর্ক, তুমি যা দেখেছ, তার কিছু অংশ তোমার স্মৃতি। ছোটবেলায় তুমি সেই রাতের ঘটনা নিজের চোখে দেখেছিলে। তারপর তোমাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।”

“কিন্তু আমি তো জানতাম, আমার বাবা-মা মারা গিয়েছেন!”

“তোমাকে তাই বিশ্বাস করানো হয়েছিল।”

মধুরিমা নিজের শাড়ির আঁচল থেকে একটি ছোট্ট চাবি বের করলেন।

“এই চাবিটা তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে একটি নথি লুকিয়ে রাখা আছে। সেই নথি উদ্ধার করতে পারলে সব সত্যি প্রকাশ পাবে।”

অর্ক চাবিটি হাতে নিল।

“নথিটা কোথায়?”

“শালবনি রোড স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরে।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু আমরা তো ট্রেনের ভিতরে!”

মধুরিমা জানালার বাইরে আঙুল দেখালেন।

“পরের স্টেশনেই নামতে হবে।”

ঠিক তখনই ট্রেনের গতি কমে এল।

মাইকে ঘোষণা হল—

“শালবনি রোড। যাঁদের নামার কথা, তাঁরা প্রস্তুত হোন।”

দরজা খুলতেই অর্ক দেখতে পেল, প্ল্যাটফর্মে সেই বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার হরিপদ দাঁড়িয়ে আছেন।

তিনি অর্ককে দেখে বললেন, “চাবিটা পেয়েছ?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“তাহলে তাড়াতাড়ি চলো। ভোর হওয়ার আগেই তোমাকে সব জানতে হবে।”

অর্ক মায়ের দিকে তাকাল।

“তুমি আমার সঙ্গে আসবে?”

মধুরিমা মৃদু হাসলেন।

“আমি এত বছর এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছি।”

তিনজন দ্রুত স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘরটির দরজায় মরচে পড়েছে। জানালায় মাকড়সার জাল। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, বহু বছর কেউ এখানে আসেনি।

হরিপদ একটি পুরোনো তালা দেখিয়ে বললেন, “এই তালাটা কখনও ভাঙা হয়নি। কারণ এর চাবি শুধু তোমার বাবার কাছে ছিল।”

অর্ক নিজের হাতে থাকা চাবিটি তালায় ঢোকাল।

খট করে শব্দ হল।

দরজা খুলে গেল।

ঘরের ভিতরে একটি লোহার আলমারি। আলমারির ভিতরে পুরোনো কাগজপত্র, কয়েকটি ছবি এবং একটি ছোট্ট টেপ রেকর্ডার।

অর্ক কাগজগুলো বের করে দেখতে লাগল।

প্রথম নথিতে লেখা ছিল—একটি বড় জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তির বিবরণ।

দ্বিতীয় নথিতে কয়েকজন মানুষের নাম।

তৃতীয় কাগজটি দেখে অর্কের চোখ স্থির হয়ে গেল।

সেখানে লেখা—

‘অরিন্দম সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পরিচয় গ্রহণ করবে বিকল্প ব্যক্তি। সাক্ষী: দেবব্রত সেন।’

অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “বিকল্প ব্যক্তি মানে কী?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“তোমার বাবার একটি যমজ ভাই ছিল।”

“কী!”

মধুরিমা চোখ মুছলেন।

“তোমার বাবা অরিন্দম সেনের যমজ ভাইয়ের নাম ছিল অনিরুদ্ধ। ছোটবেলায় পারিবারিক বিবাদের কারণে দুই ভাই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। অনিরুদ্ধ বহু বছর পর ফিরে আসে। তখন থেকেই আমাদের জীবনে বিপদ শুরু হয়।”

অর্ক কাগজের পরের অংশ পড়তে লাগল।

সেখানে লেখা ছিল, অনিরুদ্ধ নিজের ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু অরিন্দম সেই পরিকল্পনা জেনে যাওয়ায় দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

“তাহলে ট্রেনে যে লোকটি নিজেকে আমার বাবা বলছে, সে কি অনিরুদ্ধ?”

মধুরিমা মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু সে আমার বাবার সব স্মৃতি জানে কীভাবে?”

“কারণ তোমার দাদুর বাড়িতে ছোটবেলায় তোমাদের দুই ভাইয়ের ছবি, চিঠি আর ব্যক্তিগত নথি ছিল। অনিরুদ্ধ সেগুলো সংগ্রহ করেছিল। আর তোমাকে যখন ছোটবেলায় কিছুদিন তার কাছে রাখা হয়েছিল, তখন সে তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে যায়।”

অর্কের মনে পড়ল, তার শৈশবের কয়েকটি বছর সম্পর্কে কোনও পরিষ্কার স্মৃতি নেই। পরিবারের লোকেরা সবসময় বলত, দুর্ঘটনার পর সে মানসিক আঘাত পেয়েছিল।

কিন্তু সেই আঘাতের আড়ালে কি অন্য কোনও ইতিহাস লুকিয়ে ছিল?

হরিপদ টেপ রেকর্ডারটি চালু করলেন।

কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ হওয়ার পর একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

“আমি অরিন্দম সেন। যদি এই রেকর্ডিং কেউ শুনে থাকেন, তাহলে বুঝবেন আমি হয়তো আর বেঁচে নেই। আমার ভাই অনিরুদ্ধ আমার পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমার স্ত্রী মধুরিমা এবং ছেলে অর্ক বিপদের মধ্যে রয়েছে। আমি চাই, সত্যিটা একদিন প্রকাশ পাক।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

আবার সেই কণ্ঠ—

“সবচেয়ে বড় কথা, আমার মৃত্যুর জন্য যে মানুষটিকে দায়ী করা হবে, সে আসল অপরাধী নয়। প্রকৃত অপরাধী আমাদের পরিবারের এমন একজন, যাকে আমি নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতাম।”

রেকর্ডিং শেষ হয়ে গেল।

অর্ক হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“তাহলে অনিরুদ্ধ একা নয়। আর কেউ আছে!”

হরিপদ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“হ্যাঁ। আর সেই মানুষটি এখনও বেঁচে আছে।”

ঠিক তখনই সিগন্যাল ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

কেউ দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

তারপর পরিচিত একটি কণ্ঠ বলল—

“অর্ক, নথিগুলো আমার হাতে তুলে দাও।”

অর্ক দরজার দিকে তাকাল।

সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের বাবা অরিন্দম সেন।

কিন্তু কীভাবে?

মধুরিমা পিছিয়ে গেলেন। হরিপদ মুখ ঢেকে ফেললেন।

আর অর্কের হাতে থাকা নথির শেষ পাতাটি হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গেল।

পাতার একেবারে নিচে একটি নাম লেখা ছিল—

‘প্রধান ষড়যন্ত্রকারী: হরিপদ মুখোপাধ্যায়।’

অর্ক ধীরে ধীরে বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টারের দিকে ফিরল।

হরিপদ মাথা নিচু করে বললেন, “হ্যাঁ, অর্ক। তোমার বাবাকে বাঁচাতে আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। আর সেই অপরাধের শাস্তি আমি বারো বছর ধরে ভোগ করছি।”

অর্ক চিৎকার করে উঠল, “তাহলে আপনি আমাকে এতক্ষণ সাহায্য করলেন কেন?”

হরিপদ চোখ তুলে তাকালেন।

“কারণ তোমার বাবা আমাকে মৃত্যুর আগে একটা কথা বলেছিলেন—যেদিন অর্ক সত্যের খোঁজে ফিরে আসবে, সেদিন যেন আমি আর পালিয়ে না বেড়াই।”

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ঘরে ঢুকল।

সে অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার সব প্রশ্নের উত্তর পাবে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

“কী সিদ্ধান্ত?”

লোকটি বলল, “তুমি কি তোমার বাবার হত্যাকারীকে শাস্তি দিতে চাও, নাকি নিজের মাকে বাঁচাতে চাও?”

অর্ক মায়ের দিকে তাকাল।

মধুরিমার চোখে আতঙ্ক।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

হরিপদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলেন—

“সময় শেষ! ট্রেন আবার চলে যাচ্ছে!”

মাইকে ঘোষণা হল—

“শেষ ট্রেনের যাত্রী অর্ক সেনকে জানানো যাচ্ছে, আপনার কাছে আর মাত্র এক মিনিট সময় রয়েছে।”

অর্ক বুঝতে পারল, এই রাতের শেষ সিদ্ধান্তই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হতে চলেছে।

কিন্তু সে জানত না, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সত্যিই তার বাবা কি না।

কারণ ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা একটি পুরোনো ছবিতে সে এমন কিছু দেখতে পেল, যা সব হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

ছবিতে অরিন্দম সেনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন হরিপদ।

আর তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন ছোট্ট ছেলে।

ছেলেটি অর্ক নয়।

তার মুখ অবিকল অনিরুদ্ধের মতো।

ছবির পিছনে লেখা—

‘১৭ অক্টোবর, ২০১৪। সেই রাতে আমরা তিনজনই মারা গিয়েছিলাম।’

অর্ক ছবিটি শক্ত করে ধরে রইল।

যদি তিনজনই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কারা?

আর শেষ ট্রেনটি কাদের ফিরিয়ে আনছে?

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস: শেষ ট্রেনের যাত্রী, (প্রথম পর্ব: যে যাত্রী বারো বছর আগে মারা গিয়েছিল)।

রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট।

শীতের কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছে ছোট্ট রেলস্টেশনটি। প্ল্যাটফর্মের মাথায় ঝুলতে থাকা হলুদ আলোটা বারবার জ্বলে উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। স্টেশনের ঘড়িতে সময় থমকে আছে রাত ১১টা ৪৭ মিনিটেই।

স্টেশনটির নাম শালবনি রোড।

একসময় এই স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করতেন। কিন্তু বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনার পর থেকে রাতের শেষ ট্রেনটি আর কখনও এই স্টেশনে থামে না। অন্তত সরকারি রেলওয়ে রেকর্ডে তেমনটাই লেখা আছে।

কিন্তু প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর রাত ১২টার ঠিক আগে, স্টেশনের পুরোনো মাইকে একটি ঘোষণা শোনা যায়।

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ ট্রেনটি এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে। যাঁদের গন্তব্য শালবনি রোড, তাঁরা প্রস্তুত হোন।”

ঘোষণাটি শোনার পর স্টেশনমাস্টার থেকে শুরু করে এলাকার বৃদ্ধ বাসিন্দারাও দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন।

কারণ তাঁরা জানেন, ওই ট্রেনে যাঁরা ওঠেন, তাঁদের কেউ আর ফিরে আসেন না।

কিন্তু কলকাতা থেকে আসা তরুণ সাংবাদিক অর্ক সেন এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করত না।

একটি জনপ্রিয় সংবাদপোর্টালে কাজ করত সে। ভূতুড়ে স্টেশন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে তার মনে হয়েছিল, এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও অপরাধচক্র অথবা মানুষের তৈরি কোনও রহস্য রয়েছে।

সেই রহস্যের খোঁজেই সে পৌঁছেছিল শালবনি রোড স্টেশনে।

রাত ১১টা ৩০ মিনিটে স্টেশনে নেমে অর্ক দেখতে পেল, গোটা প্ল্যাটফর্মে সে ছাড়া আর মাত্র একজন মানুষ রয়েছে। লোকটি স্টেশনমাস্টারের ঘরের সামনে কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলেন। পরনে পুরোনো রেলওয়ে ইউনিফর্ম, মাথায় টুপি, আর হাতে একটি কালো রঙের ডায়েরি।

অর্ক এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি এখানকার স্টেশনমাস্টার?”

লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

“ছিলাম।”

“মানে?”

“এখন আর কেউ আমাকে স্টেশনমাস্টার বলে না।”

অর্ক হেসে বলল, “আপনার নামটা জানতে পারি?”

“হরিপদ মুখোপাধ্যায়।”

নামটা শুনে অর্কের বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল। এই নামটাই সে পুরোনো সংবাদপত্রে পড়েছিল। বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সময় শালবনি রোড স্টেশনের দায়িত্বে ছিলেন হরিপদ মুখোপাধ্যায়।

কিন্তু দুর্ঘটনার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।

অর্ক নিজের ফোন বের করে পুরোনো একটি খবর খুলে ধরল।

“আপনি কি এই মানুষটিই?”

হরিপদ ছবিটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“ছবিতে যাকে দেখছ, সে আর বেঁচে নেই।”

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে আপনি কে?”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু ডায়েরিটা অর্কের হাতে দিয়ে বললেন, “রাত বারোটার আগে এখান থেকে চলে যাও। আজ ১৭ অক্টোবর। আজকের রাতটা তোমার জন্য নয়।”

অর্ক ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় লাল কালিতে লেখা—

‘১৭ অক্টোবর, রাত ১১টা ৪৭ মিনিট। আজ আবার সে ফিরবে। এবার তার সঙ্গে থাকবে সেই মানুষটি, যাকে আমি নিজের হাতে মৃত ঘোষণা করেছিলাম।’

অর্ক মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, বেঞ্চটি ফাঁকা।

বৃদ্ধ কোথায় গেলেন, সে বুঝতেই পারল না।

ঠিক তখনই স্টেশনের পুরোনো মাইকে ঘোষণা শুরু হল।

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে…”

তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।

“অর্ক সেন, আপনার জন্য একটি বিশেষ ঘোষণা রয়েছে। আপনি যে সত্যের সন্ধানে এসেছেন, সেই সত্য আপনার নিজের বাড়িতেই লুকিয়ে আছে।”

অর্কের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।

তার নাম এই স্টেশনের মাইকে কে ঘোষণা করল?

সে তো কাউকে নিজের পরিচয় দেয়নি!

দূরে রেললাইনের উপর একটা আলো দেখা গেল। কুয়াশার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটি ট্রেন। অথচ ট্রেনের শব্দ নেই, হুইসেল নেই, এমনকি চাকার ঘর্ষণের আওয়াজও নেই।

ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

তার গায়ে মরচে পড়েছে। জানালার কাচ ভাঙা। দরজার উপরে লেখা রয়েছে—

১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

বারো বছর আগের তারিখ!

অর্ক কাঁপা হাতে নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল। বর্তমান বছর ২০২৬। তারিখ ১৭ অক্টোবর।

ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

প্রথমে নামল একটি ছোট্ট মেয়ে। বয়স আট কি নয়। সাদা ফ্রক পরা, হাতে লাল রঙের একটি পুতুল। মেয়েটি প্ল্যাটফর্মে নেমেই অর্কের দিকে তাকাল।

“তুমি অর্কদা?”

অর্ক অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।

মেয়েটি বলল, “আমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

“তোমার মা কোথায়?”

মেয়েটি ট্রেনের ভিতরে আঙুল দেখাল।

“ওই কামরায়। তবে সাবধান, অর্কদা। মা তোমাকে দেখে খুশি হবেন না।”

অর্ক ট্রেনের ভিতরে পা রাখল।

কামরার প্রতিটি আসন খালি। শুধু একেবারে শেষের সিটে একজন মহিলা বসে আছেন। তাঁর মুখ ঘোমটায় ঢাকা। কোলে একটি পুরোনো ছবি।

অর্ক কাছে যেতেই মহিলা ছবিটি তার দিকে এগিয়ে দিলেন।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনজন মানুষ—একজন যুবক, একজন মহিলা এবং একটি ছোট্ট ছেলে।

যুবকটি অর্কের বাবা।

মহিলাটি তার মা।

আর ছোট্ট ছেলেটি অর্ক নিজেই।

কিন্তু ছবির পিছনে লেখা তারিখটি দেখে অর্কের পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।

১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

সেই দিনই তো তার বাবা-মায়ের গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল বলে তাকে জানানো হয়েছিল।

মহিলাটি ধীরে ধীরে ঘোমটা সরালেন।

অর্কের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।

এই মুখ সে হাজারবার ছবিতে দেখেছে। ছোটবেলায় যার কোলে মাথা রেখে ঘুমোত, যার মৃত্যুর পর থেকে প্রতি বছর নিঃশব্দে কাঁদত—

তিনি তার মা, মধুরিমা সেন।

কিন্তু তাঁর মৃত্যু তো বারো বছর আগেই হয়েছিল!

মধুরিমা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অর্ক, তোমাকে একটা কথা জানতে হবে। তোমার বাবার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়নি। আর আমিও মারা যাইনি।”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

“এটা কীভাবে সম্ভব? তাহলে এত বছর আপনি কোথায় ছিলেন?”

মধুরিমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“কারণ তোমার বাবা এমন একটা সত্য জেনে ফেলেছিলেন, যার জন্য তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই সত্যের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ছিলে তুমি।”

“আমি? কিন্তু আমার তো কিছুই মনে নেই!”

“মনে নেই, কারণ তোমার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তোমাকে অন্য পরিচয়ে বড় করে তোলা হয়েছিল।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“না, এটা মিথ্যে। আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুর কাগজপত্র রয়েছে। পুলিশ তদন্ত করেছিল। সংবাদপত্রেও খবর বেরিয়েছিল।”

মধুরিমা শান্ত গলায় বললেন, “সব কাগজ সত্যি কথা বলে না, অর্ক। কিছু কাগজ তৈরি করা হয় সত্যকে কবর দেওয়ার জন্য।”

ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে মধুরিমার কণ্ঠ শোনা গেল—

“ওরা এসে গেছে।”

“কারা?”

“যারা তোমার বাবাকে মেরেছিল। যারা আমাকে বারো বছর বন্দি করে রেখেছে। তারা জানে, তুমি আজ এখানে এসেছ।”

ট্রেনের বাইরে ভারী বুটের শব্দ।

তারপর দরজায় তিনবার আঘাত।

ঠক। ঠক। ঠক।

একটি পুরুষকণ্ঠ বলল, “অর্ক সেন, দরজা খুলুন। পুলিশ।”

অর্ক দরজার দিকে এগোতেই মধুরিমা তার হাত চেপে ধরলেন।

“না! ওরা পুলিশ নয়।”

“তাহলে কারা?”

মধুরিমা ফিসফিস করে বললেন, “তোমার বাবার হত্যাকারীরা।”

দরজার বাইরে থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।

“অর্ক, আমরা জানি তোমার মা ভিতরে আছেন। তাঁকে আমাদের হাতে তুলে দাও।”

অর্ক মায়ের দিকে তাকাল।

মধুরিমা কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও তোমার বাবা কে ছিলেন, তাহলে আমার কথা শোনো। তোমার বাবার আসল নাম অরিন্দম সেন নয়।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে বাবার আসল নাম কী?”

মধুরিমা উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার দরজাটি প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে অর্কের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

লোকটির মুখ হুবহু তার বাবার মতো।

সেই চোখ, সেই নাক, সেই কপালের কাটা দাগ।

অর্ক কাঁপতে কাঁপতে বলল, “বাবা?”

লোকটি মৃদু হাসল।

“হ্যাঁ, অর্ক। আমি তোমার বাবা।”

তারপর সে মধুরিমার দিকে তাকিয়ে বলল, “অনেক লুকোচুরি হয়েছে। এবার ছেলেকে সত্যিটা বলার সময় এসেছে।”

মধুরিমা চিৎকার করে উঠলেন—

“তুমি অরিন্দম নও! তুমি আমার স্বামীর মুখোশ পরে থাকা সেই মানুষ, যে আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে!”

লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে অর্কের দিকে এগিয়ে এল।

“অর্ক, তোমার মা তোমাকে মিথ্যে বলছেন। সত্যিটা জানতে চাইলে আমার সঙ্গে এসো।”

ট্রেনের জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অথচ ঘড়িতে এখনও রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

অর্ক বুঝতে পারল, এই ট্রেন সময়ের নিয়ম মেনে চলে না।

এবং সে এমন এক রহস্যের মধ্যে আটকে পড়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার জন্ম, তার বাবা-মা এবং তার নিজের পরিচয়।

ঠিক সেই মুহূর্তে মায়ের হাত থেকে একটি ছোট্ট চিরকুট মেঝেতে পড়ে গেল।

অর্ক সেটি তুলে নিল।

চিরকুটে মাত্র একটি বাক্য লেখা—

‘তোমার বাবা-মায়ের মধ্যে একজনই সত্যিকারের মানুষ। অন্যজনকে বিশ্বাস করলে তুমি কখনও বাড়ি ফিরতে পারবে না।’

অর্ক মুখ তুলে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন—একজন তার মা, অন্যজন তার বাবার মতো দেখতে মানুষ।

দুজনেই দাবি করছেন, তাঁরাই সত্যি বলছেন।

আর ট্রেনের মাইকে শেষবারের মতো ঘোষণা শোনা গেল—

“শেষ ট্রেনের যাত্রী অর্ক সেনকে জানানো যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আপনার হাতে সময় রয়েছে মাত্র বারো মিনিট।”

তারপর সব আলো নিভে গেল।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
বিবিধ

দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল পুলিশকর্মীর, শোকস্তব্ধ পরিবারের সঙ্গে দেখা করে পাশে থাকার আশ্বাস পুলিশ সুপারের।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতার রসকুণ্ড মোড় এলাকায় পথ দুর্ঘটনায় এক পুলিশকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃত পুলিশকর্মীর নাম বিশ্বজিৎ পাত্র। তাঁর বয়স আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ বছর। তিনি হোমগার্ড দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি গোয়ালতোড় থানার জোগাড়ডাঙ্গা অঞ্চলের কুরকুটবান্দি এলাকায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, চন্দ্রকোনা টাউন থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন বিশ্বজিৎ পাত্র। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ময়নাতদন্তের পর তাঁর মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর রাতে শোকস্তব্ধ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে পৌঁছন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা।

মৃত পুলিশকর্মীর পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান পুলিশ সুপার। পাশাপাশি, এই কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দেন তিনি।

এক সহকর্মীর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুলিশ মহলেও। শোকস্তব্ধ পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিল জেলা পুলিশ প্রশাসন।

Share This
Categories
বিবিধ

নির্বিঘ্নে প্রতিমা নিরঞ্জনে উদ্যোগী প্রশাসন, বালুরঘাটের কল্যাণী সদরঘাটে হাইড্রোলিক ব্যবস্থা।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট: -বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জন ঘিরে বালুরঘাটের আত্রেয়ী নদীর সদরঘাটে বিশেষ ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। কল্যাণী হল সংলগ্ন এই ঘাটে জেলা প্রশাসন ও বালুরঘাট পৌরসভার উদ্যোগে হাইড্রোলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিমা নিরঞ্জন চলছে। বিসর্জন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। সতর্ক রয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পুলিশ।
প্রতি বছরের মতো এ বারও সদরঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। হাইড্রোলিক পদ্ধতিতে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা থাকায় বিসর্জন প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, নদীর ঘাটে ভিড় সামলানো এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশাসন ও পুলিশের সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বালুরঘাট পৌরসভার নথিতেও কল্যাণী সদরঘাটে আত্রেয়ী নদীর প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং হাইড্রোলিক র‌্যাম্পের উল্লেখ রয়েছে। বিজয়া দশমীর বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ঘাটের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বজায় রাখাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

Share This
Categories
বিবিধ

ধর্মীয় নিষ্ঠা ও সাবেকি আয়োজনেই আকর্ষণ, বালুরঘাটের চকভবানী কালীবাড়িতে দুর্গোৎসব ঘিরে উন্মাদনা।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট:- ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়িতে শাস্ত্র ও রীতিনীতি মেনে দুর্গোৎসব, প্রতিদিন অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণ।অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বার দর্শনার্থীদের ভিড় অনেকটাই বেশি। বালুরঘাটের চকভবানী বারোয়ারি কালীবাড়ির দুর্গোৎসবে সকাল থেকেই প্রতিমা দর্শন ও পুজো দিতে ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ। ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কালীবাড়ির পুজো দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। শাস্ত্র, নিয়ম ও রীতিনীতি মেনে সম্পূর্ণ সাবেকি আঙ্গিকে এখানে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়।
আধুনিক থিমের চাকচিক্যের বদলে প্রথা ও ধর্মীয় নিষ্ঠাই এই পুজোর মূল বৈশিষ্ট্য। পুজোর প্রতিটি পর্বে সেই ঐতিহ্য বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেন উদ্যোক্তারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দর্শনার্থীদের সমাগম। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকা থেকেও বহু মানুষ আসছেন পুজো দেখতে।
পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন দুপুরে কমিটির পক্ষ থেকে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। অঞ্জলি দিতেও প্রতিদিন বহু মানুষের সমাগম হচ্ছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রসাদ গ্রহণ করেন ভক্তেরা।
দীর্ঘদিনের ধর্মীয় পরম্পরা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আয়োজিত এই দুর্গোৎসব এ বারও বালুরঘাটের পুজো মানচিত্রে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

Share This
Categories
বিবিধ

দায়িত্বে কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাব, একচালা প্রতিমায় আজও অমলিন বালুরঘাটের ঐতিহ্য।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট:- পুজো বন্ধের আশঙ্কা কাটিয়ে প্রায় ১৭৫ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাব। বালুরঘাটের কবিতীর্থ পাড়ায় দীননাথ চৌধুরীর বাড়ির দুর্গাপুজোয় বুধবার বিজয়া দশমীতে দেবীকে বিদায়ের আগে সিঁদুরখেলায় মাতলেন স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার গৃহবধূরা। সাবেকি রীতিতে ঘট বিসর্জনের আয়োজনও হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আনুমানিক ১৮৫০ সালে চৌধুরী পরিবারে এই পুজোর সূচনা। পরবর্তী সময়ে পরিবারের পক্ষে পুজোর আয়োজন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই সময় দায়িত্ব নেয় কবিতীর্থ অ্যাথলেটিক্স ক্লাব। তারপর থেকে ক্লাবের উদ্যোগে পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। আজও একচালা প্রতিমায় দেবীর আরাধনা এবং সাবেকি আচার মেনেই চলে পুজো। দায়িত্ব বদলালেও ঐতিহ্য অটুট রেখে বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলা ও ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানালেন এলাকার মহিলারা।

Share This
Categories
বিবিধ

থিমের চাকচিক্য নয়, ঐতিহ্যই পুজোর পরিচয়, বালুরঘাটের প্রাচ্যভারতীতে সিঁদুরখেলায় মাতলেন গৃহবধূরা।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট:- আট দশকের ঐতিহ্য অটুট রেখে বুধবার বিজয়া দশমীতে দেবীকে বিদায় জানাল বালুরঘাটের প্রাচ্যভারতী ক্লাব। ঘট বিসর্জনের আগে স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার গৃহবধূরা সিঁদুরখেলায় অংশ নেন। সাবেকি রীতি ও ঘরোয়া পরিবেশে পুজোর শেষ পর্ব ঘিরে মেতে ওঠেন সকলে।
১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী রাধামোহন মোহান্তের উদ্যোগে এই পুজোর সূচনা। ১৯৪৭ সাল থেকে ক্লাবের পরিচালনায় ধারাবাহিকভাবে দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। এবার পুজো ৮০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। থিমের চাকচিক্যের বদলে সাবেকি মাতৃপ্রতিমা ও পুরনো আচার-অনুষ্ঠানই এই পুজোর পরিচয়। আট দশক পেরিয়েও সেই পরম্পরা ধরে রেখেছে ক্লাব। বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলা ও ঘট বিসর্জনের আয়োজনেও ফুটে উঠল ঐতিহ্যের সেই ধারাবাহিকতা।

Share This