Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: মাটির ঘোড়ার চোখ।।।

গ্রামের শেষ প্রান্তে কুমোরপাড়ায় থাকতেন হরিপদ পাল। তাঁর হাতের মাটির কাজ একসময় দূরদূরান্তে বিখ্যাত ছিল। এখন অবশ্য প্লাস্টিক আর কারখানায় তৈরি খেলনার দাপটে তাঁর দোকানে ক্রেতা খুব কম।

তবু প্রতিদিন ভোরে তিনি উঠতেন। পুকুরের পাড় থেকে নরম মাটি এনে বসতেন চাকার সামনে।

একদিন বিকেলে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল আট বছরের মেয়ে মিঠি।

তার হাতে ছিল কয়েকটা মুদ্রা।

—“কাকু, একটা মাটির ঘোড়া হবে?”

হরিপদ তাকিয়ে দেখলেন, টাকাটা খুবই কম।

—“এই টাকায় ছোট ঘোড়া হবে।”

মিঠি মাথা নাড়ল।

হরিপদ মাটি দিয়ে একটা ছোট ঘোড়া বানিয়ে তার হাতে দিলেন। কিন্তু মিঠি ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কাকু, এর চোখ নেই কেন?”

হরিপদ হেসে বললেন, —“চোখ তো আঁকা হয়নি।”

মিঠি বলল, —“চোখ না থাকলে ও কী করে আমাকে দেখবে?”

কথাটা শুনে হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর তিনি সূক্ষ্ম কাঠি দিয়ে ঘোড়াটার মুখে দুটো ছোট চোখ আঁকলেন।

মিঠি খুশি হয়ে চলে গেল।

পরদিন সে আবার এল।

তার হাতে ঘোড়াটা।

—“কাকু, ওর একটা পা ভেঙে গেছে।”

হরিপদ ঘোড়াটা নিয়ে যত্ন করে পা জুড়ে দিলেন।

—“এবার ঠিক আছে।”

মিঠি চলে যাওয়ার সময় বলল, —“আপনি জিনিস ঠিক করতে পারেন?”

হরিপদ বললেন, —“যতটা পারি।”

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“তাহলে আমার মাকেও একটু ঠিক করে দেবেন?”

হরিপদ অবাক।

মিঠি বলল, তার মা অনেকদিন ধরে অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। বাড়িতে টাকা নেই।

হরিপদ কিছু বললেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মিঠির বাড়িতে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন কিছু চাল, ওষুধ আর নিজের জমানো সামান্য টাকা।

মিঠির মা অবাক হয়ে বললেন, —“আপনি এত কিছু করছেন কেন?”

হরিপদ শুধু বললেন, —“আপনার মেয়েটা আমার একটা ঘোড়ার চোখ এঁকে দিয়েছে। তাই ভাবলাম, আমিও একটু চোখ খুলে দেখি।”

কয়েক মাস পর মিঠির মা সুস্থ হয়ে উঠলেন।

মিঠি স্কুলে পড়তে শুরু করল।

বছর কেটে গেল।

হরিপদের দোকান একদিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দিল না।

অনেক বছর পরে এক সকালে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ল এক তরুণী।

হাতে একটি মাটির ঘোড়া।

ঘোড়াটার দুটো চোখ খুব যত্ন করে আঁকা।

—“কাকু, চিনতে পারছেন?”

হরিপদ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললেন,

—“মিঠি?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

—“আমি এখন মৃৎশিল্প শেখাই। আপনার কাছ থেকেই শুরু করেছিলাম।”

হরিপদের চোখ ভিজে উঠল।

মিঠি ঘোড়াটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,

—“এটা আপনার জন্য। তবে একটা কথা মনে আছে?”

—“কী?”

—“আপনি বলেছিলেন, যতটা পারি জিনিস ঠিক করি।”

হরিপদ হেসে বললেন, —“হ্যাঁ।”

মিঠি উত্তর দিল,

—“আপনি শুধু একটা মাটির ঘোড়া ঠিক করেননি, কাকু। আপনি আমার পুরো জীবনটার দিকটাই বদলে দিয়েছিলেন।”

হরিপদ ঘোড়াটার চোখের দিকে তাকালেন।

সেদিন তিনি বুঝলেন—

কখনও কখনও আমরা কারও জীবনে কতটা আলো জ্বালিয়েছি, তা জানতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *