শহরের এক পুরনো গলির শেষ মাথায় ছোট্ট একটা ফটোস্টুডিও ছিল। নাম— “স্মৃতি ফটো”।
দোকানটা চালাতেন ষাটোর্ধ্ব অমলবাবু। আধুনিক মোবাইল ক্যামেরার যুগে তাঁর ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি প্রতিদিন সকালবেলা দোকানের শাটার তুলতেন, পুরনো ক্যামেরাগুলো পরিষ্কার করতেন আর দেওয়ালে ঝোলানো সাদা-কালো ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
একদিন দোকানে এল কলেজপড়ুয়া এক ছেলে। নাম ঋত্বিক।
সে বলল, —“কাকু, আপনার কাছে পুরনো ফিল্ম ক্যামেরা আছে?”
অমলবাবু একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
—“আছে। কিন্তু ওগুলো এখন আর কেউ ব্যবহার করে না।”
—“আমি একটা প্রজেক্ট করছি। একটা ক্যামেরা দরকার।”
অমলবাবু কাঠের আলমারি খুলে একটা পুরনো ক্যামেরা বের করলেন। ক্যামেরাটার গায়ে ধুলো জমেছিল। কিন্তু লেন্সটা এখনও চকচক করছিল।
—“এটা নিয়ে যাও। তবে সাবধানে রেখো।”
ঋত্বিক ক্যামেরাটা নিয়ে চলে গেল।
দুদিন পর সে আবার এল।
তার হাতে ক্যামেরাটা।
—“কাকু, এর ভেতরে একটা ফিল্ম ছিল।”
অমলবাবু থমকে গেলেন।
তিনি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বললেন, —“আমি তো বহু বছর আগে ফিল্মটা বের করতে ভুলে গিয়েছিলাম!”
ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল, —“ডেভেলপ করা যাবে?”
অমলবাবু মৃদু হেসে বললেন, —“চেষ্টা করা যায়।”
পুরনো রাসায়নিক, অন্ধকার ঘর আর অনেক যত্নের পর ফিল্মটা তৈরি হল।
ছবিগুলো একে একে ফুটে উঠতে লাগল।
একটা নদীর ধারে কয়েকজন মানুষ।
একটা মেলার দৃশ্য।
একটি ছোট মেয়ে হাতে কাগজের ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আর শেষ ছবিটা দেখে অমলবাবুর হাত কেঁপে উঠল।
ছবিতে ছিলেন তাঁর বাবা।
বহু বছর আগের সেই মানুষটি, যাঁর সঙ্গে অমলবাবুর শেষ দেখা হয়েছিল রাগ করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দিন।
ছবির পেছনে ছোট্ট করে লেখা ছিল—
“ছেলেটা রাগ করে চলে গেল। তবু মনে হয়, একদিন ফিরে আসবে।”
অমলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
ঋত্বিক ধীরে বলল, —“কাকু, আপনি কি উনাকে খুব মিস করেন?”
অমলবাবু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, —“মানুষ চলে গেলে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকে না। কিন্তু কিছু ছবি থেকে যায়। তারা চুপ করে থেকেও অনেক কথা বলে।”
সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে অমলবাবু বাবার ছবিটা বড় করে ছাপালেন।
দোকানের সবচেয়ে সামনে সেটাই টাঙিয়ে দিলেন।
তার নিচে লিখলেন—
“কিছু ছবি অতীত দেখায় না, ফিরে যাওয়ার পথ দেখায়।”
পরদিন সকালে ঋত্বিক দোকানে এসে দেখল, অমলবাবু তাঁর পুরনো ক্যামেরাগুলো আবার সাজিয়ে রাখছেন।
—“আবার ব্যবসা শুরু করবেন?”
অমলবাবু হেসে বললেন,
—“না। মানুষকে ছবি তুলতে শেখাব। তবে শুধু মুখের ছবি নয়—যে মুহূর্তগুলো পরে মনে পড়বে, সেগুলো ধরে রাখতে।”
ঋত্বিক বুঝতে পারল, পুরনো ক্যামেরাটা আসলে শুধু একটা ছবি ফিরিয়ে দেয়নি।
একজন মানুষকে তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।