পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটি গ্রামে থাকতেন কৃষক জগন্নাথ। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল এক টুকরো জমি। সেই জমিতে তিনি ধান, শাকসবজি আর নানা রকমের ফসল ফলাতেন।
কিন্তু পরপর দু’বছর বৃষ্টি ঠিকমতো হল না। জমি শুকিয়ে গেল, পুকুরের জল কমে গেল, আর ফসলের আশায় বোনা বীজগুলো মাটির নিচেই নষ্ট হয়ে গেল।
গ্রামের অনেক কৃষক কাজের সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে গেলেন। জগন্নাথও ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর ঘরে তখন সামান্য চাল আর একটি ছোট কাপড়ের থলিতে রাখা কয়েকটি বীজ ছাড়া কিছুই ছিল না।
একদিন তাঁর নাতি অয়ন থলিটা দেখে জিজ্ঞেস করল,
—“দাদু, এগুলো কী?”
জগন্নাথ বললেন,
—“এগুলো বীজ। আগামী দিনের আশা।”
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
—“কিন্তু বৃষ্টি না হলে এগুলো গাছ হবে কী করে?”
জগন্নাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“সেটাই তো জানি না রে।”
পরদিন সকালে অয়ন দেখল, দাদু জমির এক কোণে মাটি খুঁড়ছেন।
সে ছুটে গিয়ে বলল,
—“তুমি আবার বীজ পুঁতছ?”
জগন্নাথ মাথা নাড়লেন।
—“সব বীজ যদি ঘরে রেখে দিই, তবে নতুন গাছ জন্মাবে কী করে?”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সে বাড়ির উঠোন থেকে একটা ছোট পাত্রে জল নিয়ে এল। প্রতিদিন সেই পাত্রের জল থেকে অল্প অল্প করে বীজ পোঁতা জায়গাটিতে দিতে লাগল।
প্রথম কয়েক দিন কিছুই হল না।
অয়ন হতাশ হয়ে বলল,
—“দাদু, বীজগুলো বুঝি মরে গেছে?”
জগন্নাথ বললেন,
—“মাটির নিচে কী হচ্ছে, তা সব সময় চোখে দেখা যায় না। তাই বলে কিছুই হচ্ছে না, এমন ভাবতে নেই।”
দিন কেটে গেল।
এক সকালে অয়ন দৌড়ে এসে দাদুকে ডাকল।
—“দাদু! দাদু! সবুজ পাতা বেরিয়েছে!”
জগন্নাথ লাঠিতে ভর দিয়ে জমির কাছে গেলেন। শুকনো মাটির বুক চিরে সত্যিই কয়েকটি ছোট্ট চারা মাথা তুলেছে।
তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি চারাগুলোর চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করলেন। অয়ন প্রতিদিন সেগুলোর যত্ন নিতে লাগল।
কিছুদিন পর গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষক এসে চারাগুলো দেখলেন।
একজন বললেন,
—“এত অল্প জলে তুমি কী করে এগুলো বাঁচালে?”
জগন্নাথ বললেন,
—“আমি একা পারিনি। আমার নাতি হাল ছাড়েনি।”
গ্রামের মানুষ মিলে পাশের পাহাড়ি ঝরনা থেকে ছোট নালা কাটলেন। বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য তৈরি করলেন কয়েকটি জলাধার। ধীরে ধীরে আরও কিছু জমিতে চাষ শুরু হল।
সেই বছর ফসল খুব বেশি হয়নি। কিন্তু গ্রামের মানুষ নতুন করে বীজ জমাতে শিখলেন, জলের অপচয় বন্ধ করলেন এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ালেন।
বহু বছর পর অয়ন কৃষিবিদ হয়ে গ্রামে ফিরে এল। সে কৃষকদের কম জলে চাষের পদ্ধতি শেখাতে শুরু করল।
একদিন পুরনো জমির ধারে দাঁড়িয়ে সে দাদুকে বলল,
—“দাদু, মনে আছে সেই শেষ বীজগুলোর কথা?”
জগন্নাথ মৃদু হেসে বললেন,
—“মনে আছে। সেদিন বীজগুলো শুধু গাছ দেয়নি, আমাদের নতুন করে বাঁচতেও শিখিয়েছিল।”
অয়ন মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে তখন নতুন ফসলের চারা দুলছে।
জগন্নাথের সেই শেষ বীজগুলো আসলে কখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেগুলো থেকে জন্মেছিল অসংখ্য নতুন বীজ, আর সেই বীজের সঙ্গে জন্মেছিল একটি গ্রামের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস।
শিক্ষা: প্রতিকূল সময়ে ছোট্ট একটি উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আশা শুধু মনে রাখলেই হয় না, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন একটু করে কাজও করতে হয়।