Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ইন্দ্রা নূয়ি: ভারতীয় শিকড় থেকে বিশ্ব কর্পোরেট জগতের শীর্ষে পৌঁছনো এক মহীয়সী নারী।

পৃথিবীর বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির শীর্ষে পৌঁছনো সহজ কাজ নয়। সেখানে প্রতিযোগিতা প্রবল, সিদ্ধান্তের দায়িত্ব বিপুল এবং প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব পড়ে হাজার হাজার কর্মী ও কোটি কোটি গ্রাহকের জীবনে। এমন এক কঠিন জগতে নিজের মেধা, পরিশ্রম, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইন্দ্রা নূয়ি।

তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থা পেপসিকোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী আধিকারিক বা সিইও। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাটির সিইও ছিলেন এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি পুষ্টি, পরিবেশ এবং কর্মীদের কল্যাণের মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছিল।

ইন্দ্রা নূয়ির জীবন শুধু একজন সফল কর্পোরেট নেত্রীর জীবনী নয়। এটি এমন এক নারীর কাহিনি, যিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের সীমানা পেরিয়েছেন, নতুন পরিবেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং নেতৃত্বের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছেন।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

ইন্দ্রা কৃষ্ণমূর্তি নূয়ির জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর, তৎকালীন মাদ্রাজে, যা বর্তমানে চেন্নাই নামে পরিচিত। তিনি এমন একটি পরিবারে বড় হয়ে ওঠেন, যেখানে শিক্ষা, শৃঙ্খলা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তবে তাঁর আগ্রহ শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি খেলাধুলা ও সংগীতেও উৎসাহী ছিলেন। ছাত্রজীবনে ক্রিকেট খেলা এবং সংগীতচর্চার সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। এই বহুমুখী আগ্রহ তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।

তাঁর বেড়ে ওঠার সময় ভারতীয় সমাজে নারীদের কর্মজীবন নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা ছিল। বহু পরিবারে মেয়েদের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ থাকলেও উচ্চপদে কাজ করা কিংবা বিদেশে গিয়ে পেশাগত জীবন গড়ার সিদ্ধান্তকে সব সময় সহজভাবে দেখা হতো না।

কিন্তু ইন্দ্রা নূয়ি নিজের সম্ভাবনাকে সীমিত করে রাখতে চাননি। তিনি বুঝেছিলেন, জীবনে এগিয়ে যেতে হলে শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না; সেই স্বপ্নের উপযুক্ত শিক্ষা, দক্ষতা এবং কঠোর পরিশ্রমও প্রয়োজন।

উচ্চশিক্ষার পথে

ইন্দ্রা নূয়ি প্রথমে চেন্নাইয়ের ম্যাড্রাস ক্রিশ্চিয়ান কলেজে পড়াশোনা করেন এবং বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি কলকাতার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭৬ সালে ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা বা এমবিএ-সমমানের যোগ্যতা অর্জন করেন।

কলকাতায় পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাঁর কর্মজীবনের ভিত্তি মজবুত করে। ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হয়, একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিকল্পনা কীভাবে তৈরি হয়, বাজারের চাহিদা কীভাবে বোঝা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া উচিত—এসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ক্রমশ বাড়তে থাকে।

তবে তাঁর শিক্ষাযাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবসার জগতে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করতে হলে বিশ্ব অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করা জরুরি।

এই উপলব্ধি থেকেই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে পড়তে যান। সেখানে তিনি পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু তিনি সেই চ্যালেঞ্জকে নিজের বিকাশের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।

কর্মজীবনের প্রথম অধ্যায়

শিক্ষা শেষ করে ইন্দ্রা নূয়ি ভারতে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি মেট্টুর বিয়ারসেল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং পরে জনসন অ্যান্ড জনসনের সঙ্গে যুক্ত হন।

এই সময়ে তিনি বুঝতে পারেন, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত শুধু পণ্যের গুণমান বা বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে না। গ্রাহকের প্রয়োজন, সামাজিক পরিস্থিতি, বাজারের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের মানসিকতা—সবকিছুই ব্যবসার সাফল্যের সঙ্গে জড়িত।

কর্মজীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতাগুলি তাঁকে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শেখায়। কীভাবে মানুষের প্রয়োজন বোঝা যায়, কীভাবে সীমিত সুযোগের মধ্যে কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা যায় এবং কীভাবে একটি পণ্যকে উপযুক্ত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই শিক্ষা তিনি কাজে লাগান।

পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর যে সাফল্য আসে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই প্রাথমিক অভিজ্ঞতাগুলির মধ্য দিয়েই।

বিদেশে নতুন জীবন

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর ইন্দ্রা নূয়ি যুক্তরাষ্ট্রে পেশাগত জীবন গড়ে তোলেন। বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ অবশ্যই সহজ ছিল না। নতুন দেশে একজন অভিবাসী নারী হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করা, পেশাগত যোগাযোগ গড়ে তোলা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে এগিয়ে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপে কাজ করেন। এই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক ব্যবসার জটিলতা, বাজারের পরিবর্তন এবং বড় সংস্থাগুলির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে।

এরপর তিনি মোটোরোলা এবং এশিয়া ব্রাউন বোভেরির মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে কৌশলগত পরিকল্পনা, ব্যবসার উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা আরও বিকশিত হয়।

তিনি কেবল দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করতেন না; বরং একটি প্রতিষ্ঠান আগামী দশ বা কুড়ি বছরে কোন পথে এগোবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্ন নিয়েও ভাবতেন। তাঁর এই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা তাঁকে কর্পোরেট জগতে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

পেপসিকোতে যোগদান

১৯৯৪ সালে ইন্দ্রা নূয়ি পেপসিকোতে যোগ দেন। তখন সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতের জন্য ব্যবসায়িক কাঠামোকে উপযুক্ত করে তোলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

পেপসিকোতে যোগ দেওয়ার পর তিনি কৌশলগত পরিকল্পনা ও ব্যবসার উন্নয়নের কাজে যুক্ত হন। তিনি বাজারের প্রবণতা, গ্রাহকের পছন্দ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন।

ব্যবসায়িক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাঁর একটি বিশেষ গুণ ছিল—তিনি বর্তমানের লাভের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদাকেও গুরুত্ব দিতেন। একটি প্রতিষ্ঠান আজ সফল হলেই যে আগামী দিনেও একইভাবে সফল থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, প্রযুক্তি, পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যায়। তাই প্রতিষ্ঠানকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হয়।

ইন্দ্রা নূয়ি এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর কৌশলগত চিন্তা পেপসিকোর ব্যবসায়িক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নেতৃত্বের শীর্ষে পৌঁছনো

২০০১ সালে ইন্দ্রা নূয়ি পেপসিকোর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থ আধিকারিক বা সিএফও হন। এই দায়িত্বে তিনি অর্থনীতি, কৌশল, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের সঙ্গে কাজ করেন।

২০০৬ সালে তিনি সংস্থাটির সিইও হন। পরের বছর, ২০০৭ সালে, তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বও গ্রহণ করেন।

একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে পৌঁছনো ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে যে নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জন্মস্থান বা লিঙ্গ নয়, বরং দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি। তিনি এক দিনে শীর্ষপদে পৌঁছননি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ, কঠিন দায়িত্ব পালন, ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধান এবং ক্রমাগত শেখার মধ্য দিয়েই তাঁর দক্ষতা তৈরি হয়েছিল।

ব্যবসায়িক কৌশল ও বড় সিদ্ধান্ত

পেপসিকোতে ইন্দ্রা নূয়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সংস্থার ব্যবসায়িক কাঠামোকে ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।

তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রপিকানা অধিগ্রহণ, কোয়েকার ওটসের সঙ্গে সংযুক্তি এবং গ্যাটোরেডের মতো পণ্যের ব্যবসাকে পেপসিকোর পরিসরে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তে তিনি ভূমিকা পালন করেন।

এই সিদ্ধান্তগুলির ফলে পেপসিকোর পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। সংস্থাটি শুধু কোমল পানীয়ের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন ধরনের পানীয়, শস্যজাত খাদ্য ও স্ন্যাকসের বাজারেও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।

ব্যবসায় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। কোনো সংস্থা অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করলে তার সঙ্গে নতুন বাজার, নতুন পণ্য এবং নতুন সম্ভাবনা আসে। একই সঙ্গে আসে আর্থিক দায়িত্ব, ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ।

ইন্দ্রা নূয়ির নেতৃত্বে পেপসিকো এই ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছিল। তাঁর কাজ দেখিয়েছে, সফল ব্যবসায়িক নেতৃত্ব মানে শুধু বর্তমান ব্যবসাকে চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা চিনে নিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সাহস দেখানো।

‘পারফরম্যান্স উইথ পারপাস’: লাভের পাশাপাশি দায়িত্ব

ইন্দ্রা নূয়ির নেতৃত্বের অন্যতম পরিচিত ধারণা ছিল ‘পারফরম্যান্স উইথ পারপাস’। এর মূল ভাবনা ছিল—একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু আর্থিক লাভ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; সমাজ ও পরিবেশের প্রতি তার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

এই ভাবনার অধীনে পেপসিকো পুষ্টিগুণসম্পন্ন পণ্যের পরিসর বাড়ানো, উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর প্রভাব কমানো এবং কর্মীদের উন্নয়নের মতো বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে।

খাদ্য ও পানীয় শিল্পে এই বিষয়গুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে হয়, অন্যদিকে স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হয়।

ইন্দ্রা নূয়ির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, ব্যবসার উন্নতি এবং সামাজিক দায়িত্বকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখলে চলবে না। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব।

অবশ্যই, একটি বৃহৎ খাদ্য ও পানীয় প্রতিষ্ঠানের পণ্য, বিপণন এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনাও থাকতে পারে। তাই তাঁর নেতৃত্বের মূল্যায়ন করতে গেলে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি এই ক্ষেত্রগুলির বাস্তব ফলাফলও বিচার করা দরকার। তবুও কর্পোরেট নেতৃত্বের আলোচনায় সামাজিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

নারীদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা

বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে নারীদের শীর্ষপদে পৌঁছনোর পথে দীর্ঘদিন ধরে নানা বাধা রয়েছে। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পক্ষপাত, কর্মক্ষেত্রে অসম সুযোগ এবং পরিবার ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চাপ—এসব সমস্যা বহু নারীর সামনে আসে।

ইন্দ্রা নূয়ির জীবন এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। তিনি এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন, যেখানে বিপুল আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে হতো।

তাঁর সাফল্য বহু নারীকে ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, ব্যবসা ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

তবে শুধু একজন সফল নারীকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেই সমস্যার সমাধান হয় না। নারীদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসার জন্য শিক্ষার সুযোগ, ন্যায্য নিয়োগ, সমান বেতন, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র এবং পরিবারবান্ধব নীতিও প্রয়োজন। ইন্দ্রা নূয়ির অভিজ্ঞতা আমাদের এই বিষয়গুলির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে।

পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য

ইন্দ্রা নূয়ির জীবনে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি তাঁর স্বামী রাজ নূয়ি এবং দুই কন্যাকে নিয়ে পারিবারিক জীবন গড়ে তুলেছেন। একই সঙ্গে তাঁকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে।

নিজের স্মৃতিকথা My Life in Full: Work, Family, and Our Future-এ তিনি কর্মজীবন, পরিবার এবং নারীদের পেশাগত অগ্রগতির অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, উচ্চপদে কাজ করা মানুষের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, বাস্তবে তার মধ্যে সময়ের চাপ, দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমন্বয়ের প্রশ্ন থাকে।

অনেক সময় নারীদের কাছে প্রত্যাশা করা হয় যে তাঁরা কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি পরিবারের সমস্ত দায়িত্বও নিখুঁতভাবে পালন করবেন। কিন্তু পরিবার ও পরিচর্যার দায়িত্ব শুধু নারীর একার নয়। পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা থাকলে নারীরা তাঁদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন।

ইন্দ্রা নূয়ির লেখা ও বক্তব্যে এই বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা যায়।

সম্মান ও স্বীকৃতি

ইন্দ্রা নূয়ির কর্মজীবনের সাফল্য তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। ২০০৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। এটি ভারতের অন্যতম উচ্চ অসামরিক সম্মান।

তাঁর নেতৃত্ব, ব্যবসায়িক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট জগতে অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কাছ থেকেও সম্মান পেয়েছেন।

২০১৯ সালে তাঁর প্রতিকৃতি স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে স্থান পায়। ২০২২ সালে তিনি ন্যাশনাল উইমেনস হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন।

এই স্বীকৃতিগুলি তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারীদের উপস্থিতিকেও তুলে ধরে।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু পুরস্কার বা পদ নয়। বরং তিনি যে দীর্ঘ কর্মযাত্রার মধ্য দিয়ে একটি বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ভবিষ্যৎমুখী চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়েছেন, সেটিই তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে।

পেপসিকোর পরবর্তী জীবন

২০১৮ সালে ইন্দ্রা নূয়ি পেপসিকোর সিইও পদ ছাড়েন এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ান।

কিন্তু তাঁর পেশাগত জীবন সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও উপদেষ্টা পর্যায়ে কাজ করেছেন। তিনি আমাজনের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও যুক্ত হন এবং বিভিন্ন শিক্ষা, শিল্প ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন।

২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পয়েন্টে নেতৃত্ববিষয়ক অধ্যয়নের একটি বিশেষ পদেও কাজ করেন। সেখানে নেতৃত্ব, চরিত্র গঠন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান।

এই পর্যায়টি দেখায় যে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ভূমিকা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের নেতাদের প্রশিক্ষণ, নীতি নির্ধারণ এবং সামাজিক উদ্যোগেও কাজে লাগতে পারে।

তাঁর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা

ইন্দ্রা নূয়ির জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথমত, শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করেছেন এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, সাফল্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা জরুরি। শুধু তাৎক্ষণিক লাভের দিকে তাকালে একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ভবিষ্যতের পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না।

তৃতীয়ত, নেতৃত্ব মানে শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়। নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মানুষের কথা শোনা, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সিদ্ধান্তের ফলাফলের দায়িত্ব গ্রহণ করা।

চতুর্থত, নিজের পরিচয়কে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভারতীয় শিকড়, বিদেশে অভিবাসী হিসেবে জীবন এবং নারী হিসেবে পেশাগত অভিজ্ঞতা—এই সমস্ত বিষয়কে সঙ্গে নিয়েই ইন্দ্রা নূয়ি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

পঞ্চমত, ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বের সম্পর্ক রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যত বড় হয়, তার সিদ্ধান্তের প্রভাবও তত বিস্তৃত হয়। তাই লাভের পাশাপাশি পরিবেশ, কর্মী এবং সমাজের ওপর প্রভাব বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

ইন্দ্রা নূয়ির জীবন এক অনন্য কর্মযাত্রার গল্প। চেন্নাইয়ের শিক্ষাজীবন থেকে কলকাতার ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, তারপর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত পেপসিকোর মতো বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব—প্রতিটি ধাপ তাঁর অধ্যবসায়, মেধা ও দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।

তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন দেখার সঙ্গে সেই স্বপ্নের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াও সমান জরুরি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কঠিন পরিবেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ক্রমাগত শেখার মানসিকতা প্রয়োজন।

তাঁর কর্মজীবন একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, একজন নেতার সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত উন্নতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সিদ্ধান্ত একটি প্রতিষ্ঠান, তার কর্মী, গ্রাহক এবং বৃহত্তর সমাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আজকের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে যেসব নারী ব্যবসা, ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাঁদের কাছে ইন্দ্রা নূয়ির জীবন অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

ইন্দ্রা নূয়ির গল্প আমাদের শেখায়—সাফল্যের পথ তৈরি হয় শিক্ষা, অধ্যবসায়, দূরদর্শিতা এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করার সাহস দিয়ে। নিজের যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চললে পরিচিত সীমানার বাইরেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *