১. যে দরজা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল না
“ওরা তোমাকে ছোটবেলাতেই মেরে ফেলেছিল, ঋদ্ধি।”
আয়নার ওপারে রূপসার ঠোঁট থেকে কথাগুলো বেরোনোর পর ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল। এক মুহূর্তের জন্য ঋদ্ধির মনে হলো, তার পায়ের নীচের মেঝেটা সরে যাচ্ছে। সে হাত বাড়িয়ে কিছু ধরতে চাইল, কিন্তু চারপাশে শুধু অন্ধকার।
“মায়া!”
কোনও উত্তর নেই।
“মায়া, তুমি কোথায়?”
দূরে কোথাও ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তারপর করিডরে একসঙ্গে কয়েকটি পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।
ঋদ্ধি পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বালাল। আলো পড়তেই সে দেখল, মায়া ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে আতঙ্ক, হাতে সেই ফাইলটি।
“দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে বেরোতে হবে,” মায়া বলল।
“আয়নার মধ্যে আমার দিদি ছিল। উনি বললেন, আমাকে ছোটবেলায় মেরে ফেলা হয়েছিল। এর মানে কী?”
“এখন সব বলার সময় নেই।”
“বারো বছর ধরে আমি দিদিকে খুঁজছি। এখন তাঁকে চোখের সামনে দেখেও চলে যাব?”
মায়া তার হাত চেপে ধরল।
“তুমি যদি এখানেই থাকো, তাহলে তোমাকে আবার সেই পরীক্ষার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। তুমি জানো না, এই ঘর কীভাবে কাজ করে।”
“তুমি জানো?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি এই ঘরের প্রথম বন্দিদের একজন।”
দরজার বাইরে থেকে চাবি ঘোরানোর শব্দ এল।
মায়া তাড়াতাড়ি টেবিলের নীচে হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট সুইচ টিপল। দেওয়ালের বইয়ের তাকটি ধীরে ধীরে সরে গেল। তার পিছনে একটি সরু পথ।
“এই পথ কোথায় যায়?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।
“বাড়ির পুরোনো বেসমেন্টে। ড. অনিরুদ্ধ বসু এই পথ বানিয়েছিলেন। তেরো নম্বর ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে গেলে যাতে মূল করিডরে দেখা না যায়, তার ব্যবস্থা ছিল।”
“তাহলে তিনি নিজেই পালানোর রাস্তা তৈরি করেছিলেন?”
“তিনি পালানোর রাস্তা তৈরি করেননি। তৈরি করেছিলেন গোপন যাতায়াতের ব্যবস্থা। পার্থক্যটা মনে রেখো।”
ঋদ্ধি মায়ার পিছনে সরু পথ দিয়ে ঢুকে পড়ল। মায়া তাকটি আবার বন্ধ করে দিল।
পরক্ষণেই বাইরে থেকে দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল।
কেউ ঘরে ঢুকে চিৎকার করে উঠল, “এরা কোথায় গেল?”
ঋদ্ধি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে মায়ার হাত তার হাতের ওপর শক্ত হয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পরে মায়া ফিসফিস করে বলল, “তুমি যে সত্য খুঁজতে এসেছ, তা শুধু তোমার দিদির নিখোঁজ হওয়ার রহস্য নয়। এই বাড়িতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য বহু মানুষ নিজেদের অতীত হারিয়েছে।”
“আর আমি?”
“তুমিও তাদের একজন।”
২. বারো বছর আগের হাসপাতাল
সুড়ঙ্গটি শেষ হয়েছিল একটি ছোট ঘরে। ঘরের দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ, মেঝেতে ভাঙা ইট। একটি পুরোনো কাঠের দরজা ঠেলে তারা অন্য করিডরে বেরিয়ে এল।
মায়া জানাল, বাড়িটির নীচে একসময় একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। সেখানে ড. অনিরুদ্ধ বসু তাঁর গবেষণার জন্য কিছু ঘর ব্যবহার করতেন। সরকারি নথিতে সেটিকে পরামর্শকেন্দ্র হিসেবে দেখানো হলেও, আসলে সেখানে মানুষের স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হতো।
“এই গবেষণার সঙ্গে আমার দিদির কী সম্পর্ক?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।
“তোমার দিদি প্রথমে অনুবাদের কাজ করতেন। বিদেশি গবেষণাপত্র বাংলায় অনুবাদ করা, সাক্ষাৎকারের নথি তৈরি করা—এসব ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, কিছু রোগীকে তাদের সম্মতি ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।”
“তিনি কি সেই প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে তিনি একটি ঘটনা জানতে পারেন।”
মায়া থামল। তারপর বলল, “বারো বছর আগে তোমার একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল।”
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“আমার মনে আছে। ছোটবেলায় সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। মাথায় আঘাত লেগেছিল। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”
“সেটাই পুরো ঘটনা নয়।”
“তাহলে?”
“হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, তুমি কয়েক ঘণ্টা অচেতন ছিলে। কিন্তু ড. বসুর ব্যক্তিগত নথিতে লেখা আছে, তোমাকে পরে এই বাড়িতে আনা হয়েছিল। তোমার মস্তিষ্কে আঘাতের পর স্মৃতির কিছু অংশ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।”
ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমার পরিবার আমাকে এখানে এনেছিল?”
“তোমার মা-বাবাকে বলা হয়েছিল, তোমাকে একটি বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচিতে রাখা হবে। তাঁরা জানতেন না, সেই কর্মসূচির আড়ালে কী করা হচ্ছিল।”
“আমার মা-বাবা কি এখনও বেঁচে আছেন?”
মায়া চোখ নামিয়ে বলল, “তোমার মা মারা গেছেন আট বছর আগে। তোমার বাবা—”
“বাবার কী হয়েছে?”
“তিনি নিখোঁজ।”
ঋদ্ধি দেওয়ালে হাত রাখল। মাথার মধ্যে পুরোনো স্মৃতিগুলো ভাঙা কাচের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। হাসপাতালের সাদা বিছানা, মাথায় ব্যান্ডেজ, মায়ের কান্না, বাবার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অচেনা মানুষ।
তারপর শূন্যতা।
“আমি কি মারা গিয়েছিলাম?” সে ফিসফিস করে বলল।
“আমি জানি না,” মায়া উত্তর দিল। “তোমার শারীরিক মৃত্যু হয়েছিল, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমি দেখিনি। কিন্তু ড. বসুর একটি নথিতে লেখা আছে—‘বিষয় ১৩/০৭-এর মূল স্মৃতিচিত্র স্থগিত। পরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু।’”
ঋদ্ধি রাগে ফেটে পড়ল।
“আমি কোনও বিষয় নই! আমার নাম ঋদ্ধি সেন!”
“আমি জানি।”
“তাহলে আমার জীবন নিয়ে ওরা কী করেছে?”
মায়া উত্তর দিল না।
সে ব্যাগ থেকে একটি ছোট পেনড্রাইভ বের করল।
“তোমার দিদি এই নথিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি সব পড়তে পারিনি। কিন্তু এখানে তোমার নাম আছে।”
ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি হাতে নিল।
“এটা কোথায় চালাব?”
মায়া বলল, “এখানে নয়। বাড়ির বাইরে যেতে হবে। তবে তার আগে তোমাকে এমন একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে, যিনি তোমার দুর্ঘটনার দিন হাসপাতালে ছিলেন।”
“কে তিনি?”
“ডাক্তার সায়ন রায়।”
৩. যে ডাক্তার নিজের সাক্ষ্য বদলেছিলেন
ভোর হওয়ার কিছু আগে তারা শান্তিনিকেতন লজের পিছনের একটি ছোট দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গলির মুখে একটি চায়ের দোকান খুলছিল। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
ঋদ্ধি একটি ট্যাক্সি ডেকে মায়াকে নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার একটি পুরোনো আবাসনের সামনে পৌঁছল।
ডাক্তার সায়ন রায় এখন অবসরপ্রাপ্ত। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর। একসময় তিনি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন। এখন খুব কম মানুষের সঙ্গে দেখা করেন।
দরজায় ঘণ্টা বাজাতেই এক বৃদ্ধা দরজা খুললেন। মায়ার পরিচয় শুনে তিনি তাঁদের ভেতরে নিয়ে গেলেন।
সায়ন রায় বসার ঘরে বসে পুরোনো বই পড়ছিলেন। ঋদ্ধিকে দেখে তাঁর হাত থেকে বইটি পড়ে গেল।
“তুমি?”
ঋদ্ধি সামনে এগিয়ে গেল।
“আপনি আমাকে চেনেন?”
বৃদ্ধের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
“তোমার এখানে আসার কথা ছিল না।”
“কেন? আপনি কি আমাকে ছোটবেলায় চিকিৎসা করেছিলেন?”
সায়ন রায় দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “হ্যাঁ।”
“আমার দুর্ঘটনার দিন কী ঘটেছিল?”
বৃদ্ধ চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“তোমার মাথায় আঘাত লেগেছিল। হাসপাতালে আনার সময় তোমার শ্বাসপ্রশ্বাস অত্যন্ত দুর্বল ছিল। চিকিৎসার পর তোমার অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছিল। কিন্তু তুমি কয়েক দিন কথা বলতে পারোনি।”
“তারপর আমাকে শান্তিনিকেতন লজে নিয়ে যাওয়া হয়?”
“তোমার বাবা-মাকে বলা হয়েছিল, একটি বিশেষ পুনর্বাসন কেন্দ্রে তোমাকে রাখা হবে। আমি তখন ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমি জানতাম, সেখানে স্মৃতি পুনরুদ্ধারের কিছু পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।”
“আপনি জানতেন, আমার ওপর পরীক্ষা হবে?”
“আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে সাহায্য করা হবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, পরীক্ষার সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে।”
ঋদ্ধি কঠিন গলায় বলল, “আমি কি মারা গিয়েছিলাম?”
সায়ন রায় মাথা নাড়লেন।
“না। তুমি মারা যাওনি। তোমার হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের জন্য। চিকিৎসায় তোমাকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।”
“তাহলে দিদি কেন বললেন, আমাকে মেরে ফেলা হয়েছিল?”
বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগে মায়ার দিকে তাকালেন।
“সম্ভবত তিনি বলতে চেয়েছেন, তোমার পুরোনো পরিচয়কে মুছে ফেলা হয়েছিল। তোমার কিছু স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছিল, কিছু স্মৃতি তোমার মনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তোমার স্বাভাবিক স্মৃতির সঙ্গে অন্য মানুষের গল্প, ছবি ও নথি মিশে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল।”
ঋদ্ধি বলল, “আমার স্মৃতির মধ্যে কি অন্য মানুষের স্মৃতি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল?”
“সরাসরি অন্যের স্মৃতি মাথায় বসিয়ে দেওয়া যায়—এমন প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু বারবার একই ছবি দেখানো, একই গল্প শোনানো, প্রশ্নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উত্তর তৈরি করা এবং রোগীকে তার স্মৃতি সম্পর্কে সন্দেহে ফেলা—এসবের ফলে মানুষ নিজের অতীত সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারে।”
“আপনি তাহলে সব জানতেন!”
সায়ন রায় মাথা নিচু করলেন।
“সব জানতাম না। কিন্তু সন্দেহ হওয়ার পরও আমি প্রতিবাদ করিনি। সেটাই আমার অপরাধ।”
তিনি আলমারি থেকে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।
“তোমার দিদি নিখোঁজ হওয়ার আগে এটি আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একদিন তুমি সত্য খুঁজতে আসবে।”
খামের ভেতরে একটি ছবি।
ছবিতে বারো বছরের ঋদ্ধি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে রূপসা দাঁড়িয়ে। তাঁদের পিছনে ড. অনিরুদ্ধ বসু এবং সায়ন রায়।
ছবির পিছনে লেখা—
‘প্রথম পর্যায় শেষ। বিষয় ১৩/০৭-এর স্মৃতি পুনর্গঠনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।’
তার নীচে রূপসার হাতের লেখায় আরও একটি বাক্য—
‘ওকে ওর নিজের জীবন ফিরিয়ে দাও।’
ঋদ্ধি ছবিটি বুকে চেপে ধরল।
তারপর সে সায়ন রায়কে জিজ্ঞাসা করল, “ড. অনিরুদ্ধ বসু কোথায়?”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “আমি জানি না। কিন্তু তোমার দিদি একবার বলেছিলেন, বসু নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন এমন একটি জায়গায়, যেখানে কেউ তাঁর পুরোনো পরিচয় জানে না।”
“কোথায়?”
সায়ন রায় মাথা নাড়লেন।
“সেটা তিনি বলেননি।”
৪. মায়ার আসল পরিচয়
সায়ন রায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঋদ্ধি কাছের একটি নির্জন পার্কে বসে পড়ল। আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে। তার সামনে এত তথ্য, অথচ কোনও তথ্যই পুরো সত্যকে প্রকাশ করছে না।
সে মায়ার দিকে তাকাল।
“তুমি কীভাবে এই সব জানো?”
মায়া চুপ করে রইল।
“তুমি বলেছিলে, তুমি তেরো নম্বর ঘরের প্রথম বন্দিদের একজন। তুমি কি সেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলে?”
“না।”
“তাহলে?”
মায়া ধীরে বলল, “আমার মা সেখানে কাজ করতেন। তিনি ড. বসুর গবেষণাকেন্দ্রে সহকারী ছিলেন। ছোটবেলায় আমি মায়ের সঙ্গে ওই বাড়িতে যেতাম। একদিন আমি এমন কিছু নথি দেখে ফেলি, যা আমার দেখার কথা ছিল না।”
“তারপর?”
“আমাকে বলা হয়, আমি যা দেখেছি, তা ভুলে যেতে হবে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা খারাপ স্বপ্ন। পরে বুঝতে পারি, আমার মনে যা ঘটেছিল, তার অনেক কিছুই আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি না।”
“তুমি কি তখন থেকেই তেরো নম্বর ঘরে বন্দি?”
“সব সময় নয়। আমাকে মাঝে মাঝে বাইরে যেতে দেওয়া হতো। কিন্তু আমার ওপর নজর রাখা হতো। আমি বড় হওয়ার পর বুঝতে পারি, আমার স্মৃতির ফাঁকগুলো কোনও স্বাভাবিক কারণে তৈরি হয়নি।”
ঋদ্ধি বলল, “তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য করছ কেন?”
মায়া ব্যাগ থেকে আরেকটি ছবি বের করল।
ছবিতে একটি ছোট মেয়ে, তার পাশে কিশোরী রূপসা। মেয়েটির বয়স আট-নয় বছর হবে। ছবির পিছনে লেখা—‘মায়া, ২০০৪’।
“তোমার দিদি আমাকে একবার পালাতে সাহায্য করেছিলেন,” মায়া বলল। “তারপর তিনি নিজেই নিখোঁজ হয়ে যান। আমি এত বছর ধরে তাঁর খোঁজ করেছি। যখন জানতে পারি, তুমি সাংবাদিক হয়েছ এবং পুরোনো নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করছ, তখন তোমাকে খুঁজে বের করি।”
ঋদ্ধি ছবিটি ভালো করে দেখল।
“তুমি আমার দিদির কাছে ছিলে?”
“হ্যাঁ। রূপসা আমাকে বলেছিলেন, একদিন তাঁর ভাই আসবে। তাকে যেন সাহায্য করি। কিন্তু তিনি এটাও বলেছিলেন, তোমার কাছে সব সত্য একবারে বলা যাবে না।”
“কেন?”
“কারণ তোমার স্মৃতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তুমি নিজেও জানো না। আর সেই স্মৃতির সূত্রেই ড. বসুর গবেষণার আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ পেতে পারে।”
ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।
“আমি আর কোনও অর্ধসত্য শুনতে চাই না। আমরা এখনই আবার ওই বাড়িতে ফিরব।”
মায়া মাথা নাড়ল।
“ফিরতে হবে। কিন্তু এবার প্রস্তুতি নিয়ে।”
“কী প্রস্তুতি?”
মায়া বলল, “আমাদের জানতে হবে, তেরো নম্বর ঘরের আয়নাটি আসলে কী। আর তোমার দিদি কেন ওই আয়নার মধ্যে দেখা যাচ্ছেন।”
৫. আয়নার ওপারের ঘর
দুপুরের আগে তারা শান্তিনিকেতন লজে ফিরে এল। হরিপদ তাঁদের দেখে অবাক হলেন, কিন্তু কোনও প্রশ্ন করলেন না।
মায়া জানাল, তেরো নম্বর ঘরের আয়নাটি সাধারণ আয়না নয়। তার পিছনে একটি গোপন কক্ষ রয়েছে, যেখানে পুরোনো ভিডিও রেকর্ডিং, অডিও নথি এবং পর্যবেক্ষণের যন্ত্র রাখা হতো।
“তাহলে আমরা আয়নায় রূপসাকে দেখেছিলাম কীভাবে?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।
“সম্ভবত আয়নার পিছনের ঘরে ক্যামেরা ও প্রদর্শনযন্ত্র ছিল। তবে যন্ত্রগুলো এখনও কাজ করছে কি না, তা জানি না।”
“তাহলে দিদি ওই ঘরেই বন্দি?”
“আমি নিশ্চিত নই।”
তারা তেরো নম্বর ঘরে ঢুকল। এবার দরজা খোলা ছিল। টেবিলের ওপর ফাইলটি এখনও পড়ে আছে। দেওয়ালের আয়নাটি আগের মতোই স্থির।
ঋদ্ধি আয়নার ফ্রেম পরীক্ষা করতে লাগল। নীচের দিকে একটি ছোট ধাতব বোতাম দেখতে পেল। বোতামটি চাপতেই ফ্রেমের এক পাশ থেকে মৃদু শব্দ হলো।
আয়নাটি সামান্য সরে গেল।
পিছনে একটি সরু দরজা।
দরজা খুলে তারা ছোট একটি কক্ষে ঢুকল। ঘরের দেওয়ালজুড়ে পুরোনো মনিটর, তারের জট, ভিডিও ক্যাসেটের তাক। এক কোণে একটি কম্পিউটার। আশ্চর্যজনকভাবে কম্পিউটারটি চালু ছিল।
মনিটরে একটি ফোল্ডার খোলা।
নাম—‘১৩/০৭—শেষ সাক্ষ্য’।
ঋদ্ধি ফাইলটি চালু করল।
স্ক্রিনে রূপসার মুখ ভেসে উঠল। রেকর্ডিংটি বহু পুরোনো। তাঁর চুল এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কণ্ঠ দৃঢ়।
“যদি কেউ এই রেকর্ডিং দেখো, তাহলে জেনে রেখো, আমার নাম রূপসা সেন। আমি এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি। আমি এমন কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, যা প্রকাশ পেলে ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণার আড়ালে চলা অনৈতিক কাজগুলো সামনে আসবে।”
তিনি একটু থামলেন।
“এই গবেষণায় মানুষের স্মৃতি সরাসরি বদলে দেওয়ার কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তার পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করা যায়। কোনও ব্যক্তিকে বারবার বলা হলে যে সে একটি ঘটনা ভুল মনে করছে, তার নিজের স্মৃতির ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ছবি, নথি এবং সাজানো সাক্ষ্য ব্যবহার করে তার অতীত সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা তৈরি করা যায়।”
ঋদ্ধি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
রূপসা বললেন, “ড. বসু এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন এমন মানুষদের ওপর, যাদের অতীত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি কম। তাঁর দাবি ছিল, মানসিক আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে নতুন পরিচয় দিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতি মানুষকে নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে না শেখিয়ে বরং গবেষকের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছিল।”
মায়া ফিসফিস করে বলল, “এটাই ছিল তাঁর আসল পরীক্ষা।”
রূপসার রেকর্ডিং চলতে থাকল।
“আমার ভাই ঋদ্ধি দুর্ঘটনার পর কিছু স্মৃতি হারিয়েছিল। আমি চাইনি, তার দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হোক। কিন্তু আমার অনুমতি ছাড়াই তাকে এই গবেষণার মধ্যে আনা হয়েছিল। আমি যখন প্রতিবাদ করি, তখন আমাকে বলা হয়, ঋদ্ধির চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে।”
ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।
“আমি প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এই বাড়িতে এমন কিছু নথি আছে, যা শুধু গবেষণার অপরাধ নয়, আরও একটি অপরাধের প্রমাণ। ড. বসু এমন কয়েকজন মানুষের পরিচয় বদলে দিতে চেয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারতেন।”
রূপসা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকালেন।
“ঋদ্ধি, যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে আমাকে খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন কোরো না। তুমি আমার ভাই। তোমার স্মৃতিতে কিছু ফাঁক থাকলেও, তোমার জীবন মিথ্যা নয়। তুমি যা অনুভব করেছ, যা শিখেছ, যাদের ভালোবেসেছ—সেগুলো তোমারই।”
ভিডিওর শেষে তিনি একটি নাম বললেন।
“অনিরুদ্ধ বসুর আসল নাম—অরুণাভ সেন।”
ঋদ্ধি চমকে উঠল।
“সেন? আমাদের পদবিও সেন!”
মায়া তার দিকে তাকাল।
“তোমার পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল?”
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“আমি জানি না।”
রেকর্ডিংয়ের শেষ অংশে রূপসা বললেন—
“এই নামটি মনে রেখো। অরুণাভ সেন শুধু গবেষক ছিলেন না। তিনি আমাদের পরিবারের একজন ছিলেন। আর তিনি যে অপরাধ করেছেন, তার সাক্ষী শুধু আমি নই।”
ভিডিও বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
ঋদ্ধি ধীরে বলল, “অরুণাভ সেন আমাদের কে?”
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই কম্পিউটারের পর্দায় নতুন একটি ফাইল খুলে গেল।
ফাইলটি নিজে থেকেই চালু হয়েছে।
স্ক্রিনে এক বৃদ্ধ মানুষের মুখ দেখা গেল। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“ঋদ্ধি, তুমি যদি এই বার্তা দেখে থাকো, তাহলে বুঝব, রূপসা তার শেষ কাজটি সম্পূর্ণ করেছে।”
বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।
“আমি তোমার দাদু, অরুণাভ সেন। আর তোমার জন্মের আগেই আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার ফল তোমাদের পরিবারকে বারো বছর ধরে ভোগ করতে হয়েছে।”
ঋদ্ধির বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
বৃদ্ধের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।
“তোমার দিদি এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে তোমাকে জানতে হবে, বারো বছর আগে সে কেন নিজের নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”
ঋদ্ধি বিস্ময়ে বলে উঠল, “নিজের নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত?”
বৃদ্ধের মুখে বিষণ্ণ হাসি ফুটল।
“হ্যাঁ, ঋদ্ধি। তোমার দিদি নিখোঁজ হয়নি। সে নিজেকে আড়াল করেছিল—তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”
স্ক্রিনের আলো নিভে গেল।
ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।
হরিপদ দৌড়ে ঘরে ঢুকে বললেন, “পুলিশ এসেছে! তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন লোক রয়েছে। তাঁরা বলছেন, এই বাড়িতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা হয়েছে।”
মায়া দ্রুত কম্পিউটার থেকে পেনড্রাইভটি খুলে ঋদ্ধির হাতে দিল।
“এটা লুকিয়ে রাখো।”
“ওরা কারা?”
মায়া দরজার দিকে তাকাল।
“যারা চায়, তেরো নম্বর ঘরের রহস্য কোনও দিন প্রকাশ না পাক।”
বাইরে থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
“ঋদ্ধি সেন, আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে।”
ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি মুঠোয় চেপে ধরল।
তারপর কম্পিউটারের কালো পর্দায় হঠাৎ একটি নতুন বাক্য ফুটে উঠল—
‘বিষয় ১৩/০৭: স্মৃতি পুনরুদ্ধারের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু।’
ঋদ্ধি বুঝতে পারল, এতক্ষণ যে রহস্যের দরজা সে খুলেছে, তার পিছনে আরও একটি দরজা রয়েছে।
আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে এমন এক সত্য, যা তার পরিবারকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে চিনতে বাধ্য করবে।
চলবে…