১. রাত ১১টা ৪৭
রাতের শেষ লোকাল ট্রেনটি যখন শালবন স্টেশনে ঢুকল, তখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে কেউই জানত না, কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত রহস্যের মুখোমুখি হতে হবে।
শীতের রাত। কুয়াশায় ঢেকে গেছে রেললাইন। দূরের সিগন্যালের লাল আলোটি কুয়াশার মধ্যে জ্বলন্ত চোখের মতো দেখাচ্ছে। স্টেশনের ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
ট্রেনটি হাওড়া থেকে ছেড়ে আসা শেষ লোকাল। কামরাগুলিতে যাত্রী প্রায় নেই বললেই চলে। দু-একজন শ্রমিক, ঘুমন্ত এক বৃদ্ধ, জানলার পাশে বসে থাকা কলেজপড়ুয়া মেয়ে আর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোক।
ট্রেন থামতেই স্টেশনমাস্টার নিবারণ চক্রবর্তী ঘড়ির দিকে তাকালেন।
প্রতিদিনের মতোই ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মিনিট দেরিতে এসেছে।
কিন্তু আজ একটি বিষয় তাঁর চোখে পড়ল।
শেষ কামরার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি নামল না।
লোকটির গায়ে ধূসর রঙের কোট, মাথায় কালো টুপি। হাতে একটি পুরোনো চামড়ার সুটকেস। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ট্রেন থামার পরও তার মধ্যে কোনও নড়াচড়া দেখা গেল না।
নিবারণ চিৎকার করে বললেন, “এই যে, নামবেন না?”
লোকটি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।
তার চোখে এমন এক ধরনের ক্লান্তি ছিল, যেন সে বহু বছর ধরে ঘুমোয়নি।
সে শুধু বলল, “এখানে নামা যাবে না।”
“কেন? এটা তো আপনার গন্তব্য নয়?”
লোকটি উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণের মধ্যে গার্ডের বাঁশি বাজল। ট্রেন আবার চলতে শুরু করল। নিবারণ হাত তুলে সংকেত দিলেন। ট্রেনটি ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
তারপর তিনি প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ট্রেন চলে যাওয়ার পরও সেখানে একটি চামড়ার সুটকেস পড়ে রয়েছে।
লোকটির সুটকেস।
নিবারণ এগিয়ে গিয়ে সেটি তুলে নিলেন।
সুটকেসের হাতলে একটি ছোট সাদা ট্যাগ লাগানো। সেখানে কালো কালিতে লেখা—
অরিত্র সেন।
নিবারণ নামটি পড়ে থমকে গেলেন।
এই নাম তিনি আগে শুনেছেন।
অনেক বছর আগে।
প্রায় বাইশ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক তরুণ সাংবাদিকের নাম ছিল অরিত্র সেন।
আর সেই সাংবাদিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শালবন স্টেশনেরই এক পুরোনো রহস্য।
২. নিখোঁজ সাংবাদিক
অরিত্র সেন তখন তিরিশ বছরের তরুণ সাংবাদিক। কলকাতার একটি সংবাদপত্রে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লিখতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখার জন্য তাঁর সুনাম ছিল। পুলিশের কাছে পৌঁছনোর আগেই তিনি অনেক সময় এমন তথ্য জোগাড় করে ফেলতেন, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
বাইশ বছর আগে, ২০০৪ সালের ১৭ নভেম্বর, অরিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ খবরের সূত্র পেয়েছিলেন।
খবরটি ছিল শালবন এলাকার একটি পুরোনো রেলগুদামকে কেন্দ্র করে। সরকারি নথিতে গুদামটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে বলে উল্লেখ থাকলেও, রাতের অন্ধকারে সেখানে নিয়মিত কিছু মালপত্র আনা-নেওয়া হতো। গ্রামের মানুষ মাঝেমধ্যে অচেনা গাড়ি দেখতে পেতেন। কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস করতেন না।
অরিত্র খবরটি অনুসন্ধান করতে শালবনে এসেছিলেন।
সেই রাতে তিনি শেষবার ফোন করেছিলেন তাঁর সহকর্মী মধুমিতা ঘোষকে।
ফোনে অরিত্র বলেছিলেন, “যদি কাল সকালের মধ্যে আমার কোনও খবর না পাও, তাহলে শালবন স্টেশনের পুরোনো রেজিস্টারটা খুঁজবে। সেখানে এমন কিছু আছে, যা কেউ মুছে ফেলতে পারেনি।”
মধুমিতা জানতে চেয়েছিলেন, “তুমি কোথায়?”
অরিত্র বলেছিলেন, “স্টেশনে। একটা ট্রেন আসছে।”
তারপর ফোন কেটে যায়।
পরদিন অরিত্র আর কলকাতায় ফেরেননি।
তাঁর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল। শালবনের আশপাশের পুকুর, জঙ্গল, পরিত্যক্ত বাড়ি—সব জায়গায় খোঁজ করা হয়। কিন্তু অরিত্রের কোনও সন্ধান মেলেনি।
কয়েক মাস পরে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সংবাদপত্রের ছোট একটি খবর হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তাঁকে ভুলে যায়।
শুধু মধুমিতা ভোলেননি।
তিনি বহু বছর ধরে অরিত্রের শেষ ফোনের কথাগুলি মনে রেখেছিলেন।
বিশেষ করে সেই কথাটি—
‘শালবন স্টেশনের পুরোনো রেজিস্টারটা খুঁজবে।’
কিন্তু স্টেশনের রেজিস্টারে কী এমন ছিল, যার জন্য অরিত্র নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন?
সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানত না।
৩. স্টেশনমাস্টারের অস্বস্তি
সুটকেসটি নিয়ে নিবারণ চক্রবর্তী স্টেশনমাস্টারের ঘরে ফিরলেন।
ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ক্যালেন্ডার, কাঠের টেবিল, কয়েকটি রেজিস্টার আর একটি ছোট বৈদ্যুতিক হিটার। জানলার বাইরে রেললাইনের ওপর কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে।
নিবারণ সুটকেসটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
তারপর আবার নামের ট্যাগটি দেখলেন।
অরিত্র সেন।
তিনি নিজের মনে বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”
অরিত্র সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন বাইশ বছর আগে। তাঁর বয়স এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু একটু আগে ট্রেনে যে লোকটিকে দেখলেন, তার চেহারা যেন তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি নয়।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়, লোকটির চোখে এমন একটা পরিচিত ভাব ছিল, যা নিবারণকে বহু বছর আগের একটি রাতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
সেই রাতেও শেষ ট্রেনটি এসেছিল ১১টা ৪৭ মিনিটে।
সেই রাতেও এক ব্যক্তি শেষ কামরা থেকে নামেননি।
আর পরদিন সকালে স্টেশনের পাশের ঝোপে পাওয়া গিয়েছিল রক্তমাখা একটি শার্ট।
সেই ঘটনার পর স্টেশনের পুরোনো রেজিস্টারের একটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল।
নিবারণ তখন এই স্টেশনে কর্মরত ছিলেন না। তিনি এসেছিলেন ঘটনার প্রায় তিন বছর পরে। কিন্তু তাঁর পূর্বসূরি একদিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে বলেছিলেন, “শালবনে রাতের শেষ ট্রেনকে কখনও হালকাভাবে নিও না। কখনও কখনও ট্রেন এমন যাত্রী নিয়ে আসে, যারা বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছে।”
নিবারণ তখন কথাটিকে নিছক কুসংস্কার ভেবেছিলেন।
আজ আর তা ভাবতে পারলেন না।
তিনি সুটকেসের তালা পরীক্ষা করলেন। তালাটি খোলা ছিল।
সুটকেসের ভেতরে ছিল তিনটি জিনিস—একটি পুরোনো ক্যামেরা, একটি কালো ডায়েরি এবং একটি খাম।
খামের ওপরে লেখা—
স্টেশনমাস্টার নিবারণ চক্রবর্তীর জন্য।
নিবারণের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
তিনি তো অরিত্রকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। বাইশ বছর আগে এই স্টেশনে তিনি চাকরিও করতেন না। তাহলে অরিত্রের সুটকেসে তাঁর নাম লেখা খাম এল কীভাবে?
তিনি ধীরে ধীরে খামটি খুললেন।
ভেতরে একটি ছোট কাগজ।
মাত্র দুটি লাইন।
‘আপনি যদি এই চিঠি পড়েন, তাহলে বুঝবেন আমি আবার ফিরে এসেছি।
পুরোনো রেজিস্টারের ১৭ নভেম্বরের পাতাটি খুঁজুন।’
নীচে স্বাক্ষর—
অরিত্র সেন।
৪. মধুমিতার ফোন
পরদিন সকাল আটটায় নিবারণ কলকাতার একটি পুরোনো নম্বরে ফোন করলেন। নম্বরটি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন স্টেশনের রেকর্ডে সংরক্ষিত একটি সংবাদপত্রের যোগাযোগের তালিকা থেকে।
ফোনের ওপারে এক মহিলা উত্তর দিলেন।
“হ্যালো?”
“আমি কি মধুমিতা ঘোষের সঙ্গে কথা বলছি?”
“বলছি। আপনি কে?”
“আমি শালবন স্টেশনের স্টেশনমাস্টার নিবারণ চক্রবর্তী। আপনার পরিচিত অরিত্র সেনের সম্পর্কে কিছু কথা ছিল।”
ওপারে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর মহিলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“অরিত্রের সম্পর্কে? এত বছর পরে?”
“গত রাতে একটি লোক শেষ ট্রেনে এসেছিল। তার সুটকেসে অরিত্র সেনের নাম লেখা ছিল।”
“লোকটিকে আপনি দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“সে দেখতে কেমন?”
নিবারণ লোকটির চেহারার বর্ণনা দিলেন।
সব শুনে মধুমিতা বললেন, “আপনি কি নিশ্চিত, তার বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মতো?”
“হ্যাঁ।”
“তার ডান ভ্রুর ওপর কি একটা ছোট কাটা দাগ ছিল?”
নিবারণ চমকে উঠলেন।
“ছিল।”
ফোনের ওপারে মধুমিতা নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করলেন।
“ও অরিত্রই। আমি জানতাম, একদিন ও ফিরবে।”
নিবারণ হতবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু বাইশ বছর ধরে নিখোঁজ একজন মানুষ কীভাবে একই বয়সের থাকতে পারে?”
মধুমিতা উত্তর দিলেন না।
কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন, “আমি আজই শালবনে আসছি। সুটকেসটা কাউকে দেবেন না। আর একটা কথা—ও যদি আবার ফিরে আসে, ওকে কোনওভাবেই স্টেশন ছেড়ে যেতে দেবেন না।”
“কেন?”
মধুমিতা ফিসফিস করে বললেন, “কারণ অরিত্র একবার আমাকে বলেছিল, সে যদি কোনও দিন ফিরে আসে, তাহলে হয়তো সে আর আগের মানুষ থাকবে না।”
ফোন কেটে গেল।
নিবারণ জানলার বাইরে তাকালেন।
দূরে একটি মালগাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার শেষ কামরাটি পার হওয়ার সময় তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, একটি জানলার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
ধূসর কোট।
কালো টুপি।
আর সেই একই মুখ।
নিবারণ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
মালগাড়িটি ইতিমধ্যে অনেক দূরে চলে গেছে।
৫. পুরোনো রেজিস্টার
শালবন স্টেশনের নথিঘরটি ছিল প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে। ছোট একটি ঘর, যেখানে বহু পুরোনো কাগজপত্র, বাতিল টিকিট, স্টেশন ডায়েরি ও যাত্রীসংক্রান্ত নথি জমা করে রাখা হতো।
ঘরটির চাবি ছিল নিবারণের কাছে।
তিনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। ধুলোয় ঢাকা তাক থেকে ২০০৪ সালের রেজিস্টারটি নামাতে বেশ কিছু সময় লাগল।
রেজিস্টারের পাতাগুলি হলদে হয়ে গেছে। কোথাও কালি ছড়িয়ে পড়েছে, কোথাও ইঁদুরে কাগজ কেটেছে।
তিনি নভেম্বর মাসের অংশ খুঁজে বের করলেন।
১৭ নভেম্বরের পাতাটি মাঝখান থেকে ছেঁড়া।
কেউ খুব সাবধানে পাতা ছেঁড়েনি। কাগজের গোড়ায় আঁশ উঠে রয়েছে। বোঝা যায়, জোর করে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল।
কিন্তু পাতার আগের ও পরের অংশে কিছু অস্পষ্ট লেখা রয়ে গেছে।
১৬ নভেম্বরের শেষ এন্ট্রিতে লেখা—
‘রাত ২৩:৪৭। শেষ লোকাল। অতিরিক্ত যাত্রী—১। গন্তব্য অজ্ঞাত।’
১৮ নভেম্বরের প্রথম এন্ট্রিতে লেখা—
‘রাত ০০:১২। প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করার সময় একটি কালো ব্যাগ উদ্ধার। কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
নিবারণ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
১৭ নভেম্বরের পাতা ছেঁড়া, কিন্তু ১৬ নভেম্বরের শেষ ট্রেনের সময় এবং অতিরিক্ত যাত্রীর উল্লেখ রয়েছে।
তিনি পাতা উল্টে দেখলেন। রেজিস্টারের পেছনের দিকে একটি পাতার কোণে পেন্সিলে লেখা কয়েকটি শব্দ।
‘শেষ ট্রেনের যাত্রী—নাম লেখা যাবে না।’
নীচে একটি তারিখ—১৭/১১/২০০৪।
তারপর আরও ছোট করে লেখা—
‘যদি সে আবার আসে, ২৩:৪৭-এ ঘড়ি থামিয়ে দেবে।’
নিবারণ ঘড়ির দিকে তাকালেন।
স্টেশনের বড় ঘড়িটি তখন সকাল ৮টা ৩৬ মিনিট দেখাচ্ছে।
তিনি জানতেন না, এই কথার অর্থ কী।
কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হলো, ঘড়িটি যেন কেবল সময় দেখানোর যন্ত্র নয়। এই স্টেশনে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
তিনি রেজিস্টারটি নিয়ে স্টেশনমাস্টারের ঘরে ফিরে এলেন। টেবিলের ওপর অরিত্রের কালো ডায়েরিটি রাখা ছিল।
এবার তিনি সেটি খুললেন।
প্রথম কয়েকটি পাতায় সাধারণ নোট—ট্রেনের সময়, কয়েকজনের নাম, গুদামের ঠিকানা, কিছু ফোন নম্বর। তারপর একটি পাতায় লেখা—
‘শালবন স্টেশনে একই রাত দু’বার ঘটে। প্রথমবার আমরা ঘটনাটি দেখি। দ্বিতীয়বার আমরা তার পরিণতি দেখি।’
পরের পাতায়—
‘যে লোকটি শেষ ট্রেনে ওঠে, সে আসলে কোথাও যায় না। সে শুধু ফিরে আসে সেই জায়গায়, যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল।’
আরও কয়েকটি পাতা উল্টে নিবারণ একটি নাম দেখতে পেলেন।
সুব্রত চক্রবর্তী।
নামটি পড়েই তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সুব্রত ছিলেন তাঁর বড় ভাই।
বাইশ বছর আগে, ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে, সুব্রত হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবারকে বলা হয়েছিল, তিনি কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে চলে গেছেন। কিন্তু কোনও চিঠি, ফোন বা খবর আর কখনও আসেনি।
নিবারণ তখন তরুণ। তিনি বহুবার ভাইকে খুঁজেছেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন।
ডায়েরির পাতায় সুব্রতর নামের পাশে লেখা—
‘শেষ ট্রেনের যাত্রীকে থামাতে গিয়ে সুব্রত নিখোঁজ। তার শরীর পাওয়া যায়নি। সে মৃত নয়—এ কথাও প্রমাণ করা যায়নি।’
নিবারণ টেবিলের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন।
অরিত্র সেনের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্ক আছে?
তাহলে কি সেই রাতেই সুব্রত শেষ ট্রেনে উঠেছিলেন?
আর অরিত্র কেন তাঁর নাম নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন?
৬. যে মেয়েটি প্রতিদিন অপেক্ষা করে
সেদিন দুপুরে নিবারণ স্টেশন থেকে বেরিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গেলেন। স্টেশন চত্বরে একটি মেয়ে প্রায় প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে এসে বসে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। সাধারণ পোশাক, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। সে কাউকে বিরক্ত করে না, কারও সঙ্গে বেশি কথা বলে না। ট্রেন এলে যাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মেয়েটির নাম তিতলি।
নিবারণ বহুবার তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, সে কার জন্য অপেক্ষা করে। প্রতিবারই তিতলি হেসে বলেছে, “একজন আসবে।”
“কে আসবে?”
“যাকে আমি কোনও দিন দেখিনি।”
প্রথমবার শুনে নিবারণ ভেবেছিলেন, মেয়েটি হয়তো মানসিকভাবে অসুস্থ। পরে জানতে পেরেছিলেন, তিতলি ছোটবেলায় স্টেশনের কাছেই এক অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। তার বাবা-মা সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই।
সেদিন নিবারণ তিতলিকে ডেকে বললেন, “তুমি কি অরিত্র সেন নামটা শুনেছ?”
তিতলি প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে এক তরুণ পুরুষ। গায়ে ধূসর কোট, মাথায় কালো টুপি। ডান ভ্রুর ওপর ছোট একটি কাটা দাগ।
নিবারণ ছবিটি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
এটি সেই লোকটির ছবি, যাকে তিনি আগের রাতে শেষ ট্রেনে দেখেছিলেন।
তিতলি বলল, “এই মানুষটা আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল।”
“কবে?”
“গতকাল।”
“তুমি তাকে কোথায় দেখেছিলে?”
“স্টেশনের বাইরে। আমি যখন বাড়ি ফিরছিলাম, তখন সে আমাকে ডেকে বলল, আমার কাছে যেন এই ছবিটা থাকে। তারপর বলল, ‘যদি রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে শেষ ট্রেন আসে, তাহলে প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসে থাকবে। কাউকে বিশ্বাস করবে না।’”
নিবারণ তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর?”
“তারপর লোকটা চলে যায়। আমি আর তাকে দেখিনি।”
“তুমি কি তাকে আগে চিনতে?”
তিতলি মাথা নাড়ল।
“না। কিন্তু ছবিটা দেখে মনে হয়েছিল, আমি তাকে অনেক দিন ধরে চিনি।”
নিবারণ বললেন, “তোমার কাছে যে চিঠিটা আছে, সেটা আমাকে দেখাবে?”
তিতলি ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করল।
চিঠিতে লেখা—
‘তিতলি,
তুমি যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছ, তার উত্তর শালবন স্টেশনে আছে। কিন্তু মনে রেখো, তোমার জন্মের গল্প তোমাকে যারা বলেছে, তাদের কেউই পুরো সত্য জানে না।
শেষ ট্রেন যখন আসবে, তখন প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসবে।
যে মানুষটি তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে, সে তোমার বাবা নয়। কিন্তু তার কাছেই তোমার বাবার শেষ খবর আছে।
— অরিত্র।’
চিঠিটি পড়ে নিবারণ তিতলির দিকে তাকালেন।
“তুমি কি জানো, তোমার বাবা কে?”
তিতলি মাথা নাড়ল।
“না। অনাথ আশ্রমে আমাকে পাওয়া গিয়েছিল বলে শুনেছি। আমার নামও নাকি আশ্রমের এক কর্মী রেখেছিলেন।”
“কবে?”
“২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে। ঠিক কোন তারিখ, তা কেউ বলতে পারেনি।”
নিবারণের হাত থেকে চিঠিটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
২০০৪ সালের নভেম্বর।
অরিত্র সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন সেই মাসেই। সুব্রত চক্রবর্তীও নিখোঁজ হয়েছিলেন সেই সময়।
আর এখন সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত একটি মেয়ে প্রতিদিন স্টেশনে এসে অপেক্ষা করে।
নিবারণ হঠাৎ বুঝতে পারলেন, এই রহস্য কেবল অরিত্রের নয়। তাঁর নিজের পরিবারের ইতিহাসও এর মধ্যে জড়িয়ে আছে।
৭. রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে
সেদিন রাতে নিবারণ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি স্টেশন ছেড়ে যাবেন না।
মধুমিতা তখনও এসে পৌঁছননি। তিনি ফোনে জানিয়েছেন, সন্ধ্যার মধ্যে রওনা দেবেন। কিন্তু কোনও কারণে তাঁর ট্রেন দেরি হয়েছে।
তিতলি প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসে আছে। তার পাশে নিবারণ। হাতে অরিত্রের ডায়েরি।
রাত ১১টা ৪০।
কুয়াশা ঘন হচ্ছে।
রাত ১১টা ৪৫।
দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
নিবারণ উঠে দাঁড়ালেন। তিনি স্টেশনের বড় ঘড়ির দিকে তাকালেন।
ঘড়িতে ১১টা ৪৬।
তারপর ১১টা ৪৭।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—ঘড়ির কাঁটা সেখানেই থেমে গেল।
একই সময়ে রেললাইনের দূরে দুটি সাদা আলো দেখা দিল। আলো দুটি ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। ট্রেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু শব্দের মধ্যে যেন কোনও ভার নেই। যেন একটি ট্রেন বাস্তবের রেললাইনের ওপর দিয়ে নয়, কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে।
তিতলি উঠে দাঁড়াল।
“ও আসছে,” সে বলল।
“কে?”
তিতলি উত্তর দিল না।
ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।
সব কামরার আলো নিভে আছে। শুধু শেষ কামরার একটি জানলায় আলো জ্বলছে।
সেই জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অরিত্র সেন।
তার মুখে কোনও বিস্ময় নেই। যেন সে জানত, নিবারণ এবং তিতলি তার জন্য অপেক্ষা করবে।
দরজাটি খুলে গেল।
অরিত্র প্ল্যাটফর্মে নামল না।
সে জানলার ভেতর থেকে একটি কাগজ বাইরে ছুড়ে দিল। কাগজটি উড়ে এসে নিবারণের পায়ের কাছে পড়ল।
নিবারণ কাগজটি তুলে নিলেন।
তাতে লেখা—
‘নিবারণ, তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে আজ রাতেই শেষ কামরায় ওঠো। কিন্তু সাবধান—ট্রেন থেকে নামার পর তুমি যে পৃথিবীতে ফিরবে, সেটি হয়তো তোমার পরিচিত পৃথিবী হবে না।’
নিবারণ কাগজটি পড়ে তিতলির দিকে তাকালেন।
“তুমি কি আমার সঙ্গে আসবে?”
তিতলি বলল, “আমি এত বছর ধরে এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করেছি।”
নিবারণ এক পা এগিয়ে ট্রেনের দরজার দিকে গেলেন।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
“ওই ট্রেনে উঠবেন না!”
দু’জনেই ঘুরে তাকালেন।
প্ল্যাটফর্মের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা। হাতে ছোট ব্যাগ, মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক।
তিনি মধুমিতা ঘোষ।
“আপনারা যদি ওই ট্রেনে ওঠেন,” তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “তাহলে হয়তো আর ফিরতে পারবেন না।”
নিবারণ বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি জানেন, ওই ট্রেনে কী আছে?”
মধুমিতা অরিত্রের দিকে তাকালেন।
“আমি জানি, এই ট্রেনের যাত্রীরা সবাই একই সময়ের মানুষ নয়। কেউ বাইশ বছর আগের, কেউ আজকের। আর কেউ কেউ এমন একটি সময় থেকে আসে, যার কথা আমরা এখনও জানি না।”
অরিত্র জানলার ভেতর থেকে মৃদু হাসল।
তারপর সে এমন একটি কথা বলল, যা শুনে মধুমিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“মধু, তুমি দেরি করে ফেলেছ। তোমার ছেলেও ট্রেনে উঠে গেছে।”
মধুমিতা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “না! আমার ছেলে তো কখনও—”
কথা শেষ করার আগেই ট্রেনের শেষ কামরার অন্য একটি জানলায় আলো জ্বলে উঠল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর।
তার মুখ মধুমিতার মতো, চোখ দুটি অরিত্রের মতো।
কিশোরটি জানলার কাচে হাত রেখে বাইরে তাকিয়ে আছে।
তার ঠোঁট নড়ছে।
কাচের ওপার থেকে শব্দ শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে নিবারণ বুঝতে পারলেন, ছেলেটি বলছে—
‘মা, আমাকে নামিয়ে নাও।’
পরের মুহূর্তেই ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।
ঘড়ির কাঁটা আবার চলতে শুরু করল।
আর ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল।
মধুমিতা মাটিতে বসে পড়লেন।
তিতলি তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
নিবারণ রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি জানতেন, আজ রাতের পর আর কোনও কিছু আগের মতো থাকবে না।
কারণ শেষ ট্রেনটি এবার শুধু একজন নিখোঁজ মানুষকে নিয়ে আসেনি।
সে নিয়ে গেছে এমন এক যাত্রীকে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ জানত না।
আর সেই যাত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবার তাদেরই উঠতে হবে সেই ট্রেনে।
চলবে…