প্রথম পর্ব — যে মেয়েটি রাত বারোটায় এসেছিল
বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি।
স্টেশনের ঘড়িতে রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
পুরো প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। দূরে স্টেশনমাস্টারের ঘরের জানালা দিয়ে হলুদ আলো বেরিয়ে এসে ভিজে প্ল্যাটফর্মের ওপর একটা লম্বা রেখা তৈরি করেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে চারপাশটা কয়েক মুহূর্তের জন্য দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, তারপর আবার সবকিছু ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে।
স্টেশনের নাম—শালবনী রোড।
ছোট্ট একটা স্টেশন। দিনে কিছু লোকজন থাকে, চায়ের দোকান খোলা থাকে, রিকশা-ভ্যানের আনাগোনা দেখা যায়। কিন্তু রাত বাড়লে এই স্টেশন যেন অন্য একটা পৃথিবী হয়ে যায়।
আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
শেষ ট্রেনটা আসার কথা রাত ১২টা ০৫ মিনিটে।
ট্রেনটা শহর থেকে আসবে। তারপর কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে আবার পাহাড়ের দিকের ছোট্ট শহর নির্ভয়পুরের উদ্দেশে রওনা দেবে।
স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একা বসে ছিল অর্ক।
বয়স তিরিশের কাছাকাছি।
চোখে চশমা, হাতে একটা পুরনো কালো ব্যাগ। ব্যাগটার ভেতরে কয়েকটা জামাকাপড়, কিছু বই আর একটা ডায়েরি।
অর্ক কলকাতায় একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করত।
গত তিন বছর ধরে শহরে থাকার পর হঠাৎই সে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে।
কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সে কাউকেই দেয়নি।
এমনকি নিজের কাছেও পুরোপুরি স্বীকার করেনি।
তিন বছর আগে ঠিক এই বর্ষার রাতেই তার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার পর থেকে সে আর আগের মানুষটি নেই।
তারপর থেকে প্রতি বছর এই সময়টা এলেই তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়।
আজ সেই অস্থিরতাই তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে শালবনী রোডে।
অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।
১১টা ৫২।
আর মাত্র তেরো মিনিট।
সে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা পুরনো কাগজ বের করল।
কাগজটা বহুবার ভাঁজ করা হয়েছে। প্রান্তগুলো ছিঁড়ে গেছে। তবু অর্ক সেটাকে অত্যন্ত যত্ন করে রেখেছে।
কাগজের ওপর মাত্র একটা বাক্য লেখা—
“তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে চাও, শেষ ট্রেনটা ধরো।”
নিচে কোনো নাম নেই।
শুধু একটা তারিখ।
তিন বছর আগের আজকের তারিখ।
অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর চোখ বন্ধ করল।
তিন বছর আগের সেই রাতটা আবার মনে পড়ল।
তখন অর্ক কলকাতায় থাকত।
একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একা।
তার জীবনে তখন এসেছিল মেঘলা।
মেঘলা ছিল অদ্ভুত মেয়ে।
প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল খুব সাধারণ। কলেজের অধ্যাপকের মেয়ে, বই পড়তে ভালোবাসে, রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালোবাসে, আর বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে থাকতে পছন্দ করে।
কিন্তু অর্ক যত তাকে চিনেছিল, ততই বুঝেছিল মেঘলার ভেতরে একটা গভীর অন্ধকার আছে।
সে নিজের অতীত নিয়ে কখনও কথা বলত না।
কখনও কখনও হঠাৎ কয়েক ঘণ্টার জন্য অর্কের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিত।
ফোন বন্ধ।
মেসেজের উত্তর নেই।
তারপর হঠাৎ ফিরে এসে বলত—
“আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।”
অর্ক জিজ্ঞেস করত,
“কেন?”
মেঘলা হেসে বলত,
“সব প্রশ্নের উত্তর জানতে নেই।”
সেই হাসির মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা থাকত।
অর্ক তখন বুঝতে পারেনি।
ভালোবাসা মানুষকে অনেক কিছু দেখতে দেয় না।
অর্ক মেঘলাকে ভালোবাসত।
খুব ভালোবাসত।
আর মেঘলাও কি তাকে ভালোবাসত?
অর্ক জানত না।
কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত ছিল, যখন তার মনে হতো পৃথিবীতে মেঘলার চেয়ে আপন আর কেউ নেই।
আবার কিছু কিছু রাত ছিল, যখন মনে হতো মেঘলা যেন তার কাছেই নেই।
যেন সে অন্য কোনো পৃথিবীর মানুষ।
তিন বছর আগে বর্ষার এক রাতে মেঘলা অর্ককে ফোন করেছিল।
রাত তখন ১০টা ৩৮।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেঘলার কাঁপা গলা—
“অর্ক?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কোথায়?”
“বাড়িতে।”
“আজ রাতে তুমি কি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?”
“এখন?”
“হ্যাঁ। এখনই।”
অর্ক অবাক হয়েছিল।
“কী হয়েছে?”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেঘলা বলেছিল,
“আমার কাছে বেশি সময় নেই।”
অর্কের বুক কেঁপে উঠেছিল।
“মানে?”
“তুমি শুধু স্টেশনে চলে এসো।”
“কোন স্টেশন?”
“শালবনী রোড।”
“কিন্তু এত রাতে—”
“অর্ক, প্লিজ।”
তারপর ফোন কেটে গিয়েছিল।
অর্ক আবার ফোন করেছিল।
ফোন বন্ধ।
সে ছুটে বেরিয়ে পড়েছিল।
সেই রাতের কথা তার খুব স্পষ্ট মনে আছে।
বৃষ্টি হচ্ছিল।
রাস্তা জলে ডুবে গিয়েছিল।
অনেক কষ্টে একটা গাড়ি নিয়ে সে স্টেশনে পৌঁছেছিল রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে।
কিন্তু মেঘলা সেখানে ছিল না।
স্টেশন প্রায় ফাঁকা।
সে দৌড়ে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে গিয়েছিল।
কাউকে পেল না।
শেষ ট্রেনটা এসেছিল ১২টা ০৫ মিনিটে।
ট্রেন থামার পর অর্ক প্রতিটি কামরায় খুঁজেছিল মেঘলাকে।
কোথাও নেই।
শেষে ট্রেন চলে গিয়েছিল।
অর্ক সারা রাত স্টেশনে বসে ছিল।
ভোরে বাড়ি ফিরেছিল।
মেঘলা আর কখনও তার জীবনে ফিরে আসেনি।
পরের দিন তার ফোন বন্ধ।
তারপর তার বাড়িতে গিয়েও অর্ক জানতে পেরেছিল—
মেঘলা নাকি কয়েক মাস আগেই বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছে।
কিন্তু অর্ক জানত, সেটা মিথ্যা।
কারণ আগের রাতেই মেঘলা তার সঙ্গে কথা বলেছিল।
তারপর?
কিছুই জানা যায়নি।
তিন বছর ধরে অর্ক মেঘলাকে খুঁজেছে।
কোনো খবর নেই।
তারপর কয়েকদিন আগে সেই চিঠিটা আসে।
একটা অচেনা খাম।
ভেতরে শুধু ওই এক লাইন—
“তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে চাও, শেষ ট্রেনটা ধরো।”
আজ অর্ক সেই ট্রেনেই উঠবে।
হঠাৎ স্টেশনের লাউডস্পিকারে কড়কড় শব্দ হলো।
অর্ক চোখ খুলল।
তারপর ঘোষণা ভেসে এল—
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে… শালবনী রোড স্টেশনে… শেষ ট্রেনটি… কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রবেশ করবে…”
শব্দটা পরিষ্কার নয়।
বৃষ্টির আওয়াজে অনেকটা ঢাকা পড়ে গেল।
অর্ক উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই সে দেখল—
প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা পোশাক।
হাতে একটা কালো ছাতা।
মেয়েটা একেবারে স্থির।
অর্ক প্রথমে ভেবেছিল কোনো যাত্রী।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
মেয়েটা ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরল।
বিদ্যুতের আলো এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে পড়ল।
অর্ক নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
মুখটা—
মেঘলার মতো।
ঠিক মেঘলার মতো।
অর্ক কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর দৌড়ে গেল।
“মেঘলা!”
মেয়েটা দাঁড়িয়ে রইল।
অর্ক কাছে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“মেঘলা… তুমি?”
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“তুমি এসেছ।”
অর্কের শরীর শিউরে উঠল।
“তুমি আমাকে ডাকলে?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“কোথায় ছিলে এতদিন?”
মেয়েটা একটু হাসল।
“তিন বছর ধরে?”
অর্ক থমকে গেল।
“তুমি জানো?”
“আমি সব জানি।”
“তাহলে আমাকে এতদিন একটা খবরও দিলে না কেন?”
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“কারণ আমি পারিনি।”
“কেন?”
“কারণ আমি তখন আর স্বাধীন ছিলাম না।”
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
“মানে?”
মেয়েটা চারপাশে তাকাল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
“এখানে দাঁড়িয়ে এসব বলা যাবে না।”
“তাহলে কোথায়?”
“ট্রেনে ওঠো।”
“কোথায় যাব?”
“যেখানে তোমাকে তিন বছর আগে যেতে বলা হয়েছিল।”
“কোথায়?”
মেয়েটা অর্কের চোখের দিকে তাকাল।
“নির্ভয়পুর।”
অর্ক চমকে উঠল।
নির্ভয়পুর!
এই নামটা সে আগে কখনও মেঘলার মুখে শোনেনি।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
একটা দীর্ঘ, কর্কশ শব্দ।
মেয়েটা বলল,
“ট্রেন আসছে।”
অর্ক বলল,
“তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”
মেয়েটা হাসল।
“আমি তো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি।”
ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।
বৃষ্টির মধ্যে হেডলাইটের আলো ছুটে এল।
চাকা ঘষে প্রচণ্ড শব্দ হলো।
ট্রেন থামতেই অর্ক মেয়েটার দিকে তাকাল।
“চলো।”
মেয়েটা মাথা নাড়ল।
দুজনেই একটা ফাঁকা কামরায় উঠে পড়ল।
অর্ক জানালার পাশে বসল।
মেয়েটা তার বিপরীতে।
ট্রেন ছাড়ার আগে অর্ক আবার জিজ্ঞেস করল,
“তোমার নাম মেঘলা তো?”
মেয়েটা তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“তুমি এখনও আমাকে মেঘলা বলে ডাকো?”
অর্ক অবাক।
“মানে?”
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।
ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
শালবনী রোড স্টেশন পিছিয়ে গেল।
বাইরে শুধু অন্ধকার আর বৃষ্টি।
অর্ক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ সে খেয়াল করল—
মেয়েটার পোশাক ভিজে নেই।
অথচ বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।
তার হাতে থাকা ছাতাটাও সম্পূর্ণ শুকনো।
অর্কের বুকের মধ্যে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
সে কিছু বলতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই মেয়েটা তার দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—
“অর্ক, একটা কথা মনে রেখো।”
“কী?”
“নির্ভয়পুরে পৌঁছানোর আগে যদি কেউ তোমাকে বলে আমি মারা গেছি…”
অর্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
মেয়েটা তার চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটা বলল—
“তুমি বিশ্বাস করবে না।”
ট্রেনের আলো হঠাৎ নিভে গেল।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর আলো ফিরে এল।
অর্ক সামনে তাকিয়ে দেখল—
সিটটা খালি।
মেয়েটা নেই।
শুধু তার জায়গায় পড়ে আছে একটা পুরনো নীল খাম।
অর্ক কাঁপা হাতে খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা—
“অর্কের জন্য—তিন বছর আগে যে সত্যিটা বলা হয়নি।”
ট্রেন তখন অন্ধকারের মধ্যে ছুটে চলেছে।
আর অর্ক প্রথমবার বুঝতে পারল—
সে হয়তো মেঘলাকে খুঁজতে ট্রেনে ওঠেনি।
বরং মেঘলা তাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।
চলবে…
পরের পর্বে অর্ক পৌঁছবে নির্ভয়পুরে, আর নীল খামের ভেতরের চিঠি খুলতেই তিন বছর আগের সেই রাতের এমন একটি সত্যি সামনে আসবে, যা তার নিজের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।