Categories
উপন্যাস বিবিধ

শ্মশানের শেষ ট্রেন (পর্ব  : মৃতদের তালিকায় যে নামটি ছিল না)।

মুখার্জি ভবনের ঘড়িতে তখন ১টা ১৭ মিনিট।

অথচ ঈশিতা জানত, সন্ধ্যা সবে নেমেছে। কয়েক মিনিট আগেও জানলার বাইরে আলো ছিল, দূরে রাস্তার গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু এখন গোটা বাড়িটা এমন অন্ধকারে ডুবে গেছে, যেন পৃথিবীর বাকি অংশের সঙ্গে তার সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।

জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি আর নেই।

শুধু মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে রুপোর একটি নূপুর।

ঈশিতা কাঁপা হাতে নূপুরটি তুলে নিল। তাতে খোদাই করা একটি অক্ষর—‘অ’।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির পুরোনো টেলিফোনটা আবার বেজে উঠল।

ক্রিং… ক্রিং… ক্রিং…

পনেরো বছর ধরে যে ফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন, সেই ফোনের আওয়াজ যেন অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। ঈশিতা ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, ফোনটা না ধরাই ভালো। কিন্তু অন্যদিকে একটা অদ্ভুত টান তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

তৃতীয়বার ঘণ্টা বাজার পর সে রিসিভার তুলল।

“হ্যালো?”

প্রথমে কোনো উত্তর এল না। শুধু একটা শিশুর কান্না।

তারপর খুব পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর বলল, “দিদি?”

ঈশিতার বুকের মধ্যে যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।

“কে তুমি?”

“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”

“অনন্যা?”

ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ থেমে গেল।

“তুমি আমার নাম জানলে কী করে?”

ঈশিতা উত্তর দিতে পারল না। কিছুক্ষণ আগে জানলার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি নিজেকে অনন্যা বলে পরিচয় দিয়েছিল। অথচ তার জন্মের কাগজে লেখা ছিল, অনন্যা মৃত অবস্থায় জন্মেছিল।

“তুমি কোথায়?” ঈশিতা জিজ্ঞেস করল।

“যেখানে তুমি আমাকে রেখে এসেছিলে।”

“আমি তোমাকে কোথাও রেখে আসিনি!”

“তাহলে আমার নূপুরটা তোমার কাছে কেন?”

ঈশিতা মুঠোর মধ্যে ধরা নূপুরটির দিকে তাকাল।

“তুমি আমার বোন হলে প্রমাণ দাও।”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর মেয়েটি এমন একটি কথা বলল, যা শুনে ঈশিতার সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে গেল।

“তোমার ডান কাঁধের পিছনে ছোট্ট যে কালো দাগটা আছে, সেটা কীভাবে হয়েছিল মনে আছে? তোমার যখন এগারো বছর বয়স, সেদিন তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলে। কিন্তু তুমি তো জানো না, সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল।”

ঈশিতা অজান্তেই নিজের কাঁধে হাত রাখল।

দাগটা সত্যিই আছে। ছোটবেলা থেকেই আছে। মা বলতেন, জন্মদাগ।

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

“তুমি সব ভুলে গেছ, দিদি। তোমার মনে আছে শুধু সেই রাতের পরের সকালটা। তার আগের রাতটা তোমার মনে নেই।”

“তুমি কোথায়?”

“শেষ ট্রেনে।”

“তুমি কি বেঁচে আছ?”

ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

“এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে তোমাকে আজ রাতেই স্টেশনে আসতে হবে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—ট্রেন যখন থামবে, বাবা যদি তোমাকে ডাকেন, তাঁর কাছে যেও না।”

“কেন?”

“কারণ যে মানুষটা ট্রেনের জানলা দিয়ে তোমাকে ডাকছে, সে তোমার বাবা নয়।”

লাইনটা কেটে গেল।

ঠিক তখনই বাড়ির সমস্ত আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল।

ঈশিতা দেখল, ঘড়ির কাঁটা আবার সন্ধ্যা সাতটায় ফিরে এসেছে। বাইরে রাস্তার গাড়ির আওয়াজ, মানুষের কথাবার্তা—সব স্বাভাবিক।

কিন্তু টেবিলের ওপর একটা নতুন জিনিস পড়ে রয়েছে।

একটি পুরোনো রেলওয়ে টিকিট।

টিকিটের গায়ে লেখা—

যাত্রী: ঈশিতা মুখার্জি।

যাত্রার তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০১১।

গন্তব্য: শ্মশানঘাট।

আর টিকিটের নীচে লাল কালিতে লেখা—

যাত্রা অসম্পূর্ণ।


১. যে ছবিতে তিনটি মুখ ছিল

ঈশিতা আর এক মুহূর্তও মুখার্জি ভবনে থাকতে পারল না।

বাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে সে প্রথমেই দেবাশিস রায়কে ফোন করার চেষ্টা করল। কিন্তু মোবাইলে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। সে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াতেই ফোনে নেটওয়ার্ক ফিরে এল।

দেবাশিসবাবু ফোন ধরলেন দ্বিতীয়বার রিং হতেই।

“আপনি কোথায়?” ঈশিতা উত্তেজিত গলায় বলল।

“বাড়িতে। কী হয়েছে?”

“আমার বোন ফোন করেছিল।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা।

তারপর দেবাশিসবাবু নিচু গলায় বললেন, “সে কী বলেছে?”

“আপনি জানতেন যে অনন্যা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে?”

“আমি জানতাম, আজ রাতে কিছু একটা ঘটতে পারে। কিন্তু সে ফোন করবে, সেটা জানতাম না।”

“আমার জন্মের কাগজে লেখা অনন্যা মৃত অবস্থায় জন্মেছিল। তাহলে সে কীভাবে এগারো বছর বয়সে ট্রেনে উঠল?”

দেবাশিসবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে একটা কথা জানি—তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আর তোমার বোনের অন্তর্ধান একই রহস্যের অংশ।”

“আপনি আমাকে সব বলেননি।”

“ঠিক বলেছ। কিছু কথা তোমাকে বলার সাহস পাইনি।”

“কী কথা?”

“তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করো না। অন্তত আজ রাতে নয়।”

ঈশিতা থমকে গেল।

“আপনিও একই কথা বলছেন? বাবা বলেছিলেন মাকে বিশ্বাস না করতে। অনন্যা বলল, ট্রেনে থাকা মানুষটাকে বিশ্বাস না করতে। আপনি বলছেন মায়ের সঙ্গে দেখা না করতে। আসলে আপনারা সবাই কী লুকোচ্ছেন?”

“তুমি যদি সত্যিই উত্তর জানতে চাও, পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টারে চলে এসো। এখনই।”

“কোথায়?”

“শিয়ালদহের পুরোনো কর্মচারী আবাসনের পিছনে। আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাব, যেটা তোমার দেখা দরকার।”

ফোন কেটে গেল।

ঈশিতা একটা ট্যাক্সি নিয়ে শিয়ালদহের দিকে রওনা দিল।

পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টারটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। দেওয়ালে শ্যাওলা, ভাঙা জানলা, সিঁড়ির কোণে জমে থাকা শুকনো পাতা—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা। দ্বিতীয় তলার একটি ঘরে মৃদু আলো জ্বলছিল।

দরজা খুলে দেবাশিসবাবু তাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন।

ঘরের মধ্যে একটা কাঠের টেবিল, কয়েকটা পুরোনো ফাইল, দেওয়ালে ঝোলানো রেলওয়ের মানচিত্র আর একটা বড় ট্রাঙ্ক।

“বসো,” তিনি বললেন।

ঈশিতা বসল না।

“আগে বলুন, আমার বোন কি সত্যিই বেঁচে আছে?”

দেবাশিসবাবু তার দিকে তাকালেন।

“আমি জানি না, অনন্যা জীবিত কি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, যে মেয়েটিকে তুমি দেখেছ, সে তোমার কল্পনা নয়।”

“তাহলে সে কে?”

“এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পনেরো বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি।”

তিনি ট্রাঙ্ক খুলে একটা পুরোনো খাম বের করলেন। খামের ওপর লেখা—‘১৮ অক্টোবর ২০১১—বিশেষ তদন্ত নথি।’

খামের ভিতর থেকে একটি সাদা-কালো ছবি বেরোল।

ছবিতে তিনজন মানুষ।

একজন অরুণাভ মুখার্জি। ঈশিতা তাঁর বাবাকে চিনতে পারল।

আরেকজন একজন তরুণী। তাঁর চোখ-মুখ ঈশিতার সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিলে যায়। ছবির পিছনে লেখা—‘মীরা মুখার্জি, ২০০০।’

তৃতীয়জন একজন রেলকর্মী। মাথায় পুরোনো ধরনের টুপি, পরনে ইউনিফর্ম। তাঁর মুখটা অস্বাভাবিকভাবে অস্পষ্ট হয়ে আছে, যেন ছবির ওই অংশ কেউ ইচ্ছা করে ঘষে মুছে দিয়েছে।

“এই মহিলাকে চিনতে পারছ?” দেবাশিসবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

ঈশিতা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

মহিলাটির চোখ তার নিজের চোখের মতো। ঠোঁটের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা তিল। ঈশিতারও ঠিক সেই জায়গায় তিল রয়েছে।

“ইনি কি আমার জন্মদাত্রী মা?”

“আমার ধারণা, হ্যাঁ।”

“আর বাবা?”

“তোমার বাবা তখন রেলওয়ের সিগন্যাল বিভাগের একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি এই ট্রেনের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতেন। শুধু জানতেনই না, ট্রেনটাকে থামানোর উপায়ও খুঁজছিলেন।”

“কিন্তু এই রেলকর্মী কে?”

দেবাশিসবাবু ছবির অস্পষ্ট মুখটার দিকে তাকালেন।

“এই মানুষটিকে নিয়ে সরকারি নথিতে কিছুই নেই। যে কর্মচারী তালিকায় তাঁর নাম থাকার কথা, সেখানে কোনো নাম নেই। অথচ এই ছবিতে তিনি আছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, ট্রেনটির যে কয়েকটি পুরোনো নথি আমি দেখেছি, সেখানেও এই একই ইউনিফর্ম পরা একজন মানুষের উল্লেখ রয়েছে।”

“নাম?”

“কেউ তাঁকে নাম ধরে ডাকত না। সবাই বলত—চালক।”

“ট্রেনের চালক?”

“হ্যাঁ। কিন্তু সে জীবিত মানুষ কি না, তা কেউ জানে না।”

ঈশিতা ছবিটা আরও কাছে টেনে নিল।

“ছবিটা কবে তোলা?”

“২০০০ সালের অক্টোবরে। তোমাদের জন্মের কয়েক দিন আগে।”

“তাহলে আমার জন্মের আগেই বাবা এই ট্রেন সম্পর্কে জানতেন?”

“শুধু জানতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ট্রেনটির সঙ্গে তোমাদের পরিবারের একটা সম্পর্ক রয়েছে।”

দেবাশিসবাবু টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি ছোট্ট নোটবই বের করলেন।

“এটা তোমার বাবার ব্যক্তিগত নোটবই। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পরে রেলওয়ের এক কর্মচারী আমাকে দিয়েছিলেন। আমি এত দিন এটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, কারণ বুঝতে পারছিলাম না, কার হাতে তুলে দেব।”

ঈশিতা নোটবই খুলল।

প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—

‘যদি কোনো দিন ঈশিতা এই নোটবই পড়ে, তবে বুঝতে হবে আমি ব্যর্থ হয়েছি।’

তার নীচে আরেকটি বাক্য—

‘একটি ট্রেন মানুষকে তার গন্তব্যে নিয়ে যায়। কিন্তু শেষ যাত্রার ট্রেন মানুষকে নিয়ে যায় তার সত্যের কাছে।’


২. বাবার নোটবই

নোটবইয়ের পাতাগুলো হলদে হয়ে গিয়েছে। কিছু জায়গায় কালি ছড়িয়ে পড়েছে। তবু বেশির ভাগ লেখা পড়া যায়।

ঈশিতা একের পর এক পাতা উল্টাতে লাগল।

১২ অক্টোবর ২০০০

‘আজ আবার সেই সংকেত ধরা পড়েছে। কোনো নির্ধারিত ট্রেন নয়, অথচ সিগন্যাল ব্যবস্থায় একটি ট্রেনের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। লাইনের অবস্থান অনুযায়ী সেটি শিয়ালদহে ঢোকার কথা। কিন্তু কোনো চালক নেই, কোনো নম্বর নেই, কোনো সরকারি সময়সূচি নেই।’

১৫ অক্টোবর ২০০০

‘মীরাকে সব বলেছি। সে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আজ রাতে সে নিজেই ট্রেনের হুইসেল শুনেছে। শব্দটা আমাদের বাড়ির বাইরে থেকে আসেনি। এসেছে ঘরের ভিতর থেকে।’

১৭ অক্টোবর ২০০০

‘জন্মের সময় যত এগিয়ে আসছে, সংকেত তত শক্তিশালী হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ট্রেনটি কাউকে নিতে আসছে। কিন্তু কাকে?’

১৮ অক্টোবর ২০০০

এই পাতায় এসে ঈশিতার হাত থেমে গেল।

লেখাগুলো অন্য পাতার তুলনায় অনেক বেশি অগোছালো।

‘দুটি শিশু জন্মেছে।

একটি কেঁদেছে।

অন্যটি চোখ খুলেছে।

ডাক্তার বলছেন, দ্বিতীয় শিশুটি মৃত। কিন্তু আমি তার চোখ দেখেছি। সে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

মীরা বলছে, দুটি শিশুকেই বাঁচাতে হবে।

কিন্তু হাসপাতালের করিডরে যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে আমাদের সন্তানদের নাম জানে।

সে বলেছে, একটিকে পৃথিবীতে থাকতে দেওয়া হবে। অন্যটিকে ফিরিয়ে নিতে হবে।

আমি তাকে বলেছি, কোনো সন্তানকে আমি দেব না।

সে হেসেছে।

বলেছে, তাহলে ট্রেন নিজের যাত্রী নিজেই বেছে নেবে।’

ঈশিতার আঙুল কাঁপতে লাগল।

পরের পাতায় শুধু একটি তারিখ—১৮ অক্টোবর ২০১১।

‘আজ আমার দুই মেয়ের এগারো বছর পূর্ণ হল।

কিন্তু একজনের বয়স এগারো, আর অন্যজনের বয়স—শূন্য।

আমি আর জানি না, কোনটি আমার মেয়ে।

আমি শুধু জানি, রাত ১টা ১৭ মিনিটে ট্রেনটি আসবে।

যদি ঈশিতা ট্রেনে ওঠে, তবে সে ফিরে আসবে না।

যদি অনন্যা ওঠে, তবে ঈশিতার জীবন বদলে যাবে।

আর যদি আমি নিজে উঠি, হয়তো দুজনকেই বাঁচানো সম্ভব।’

তারপরের পাতাটি ছেঁড়া।

ঈশিতা নোটবই বন্ধ করল।

“এখানে কী ঘটেছিল?” সে ফিসফিস করে বলল।

দেবাশিসবাবু উত্তর দিলেন না।

“আপনি কি ২০১১ সালের সেই রাতে শিয়ালদহ স্টেশনে ছিলেন?”

“ছিলাম।”

“আপনি কী দেখেছিলেন?”

দেবাশিসবাবু চেয়ারে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে হঠাৎ ক্লান্তির ছায়া নেমে এল।

“আমি তখন রেলওয়ে পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর। রাতের ডিউটি ছিল। ১টা ১৭ মিনিটে সিগন্যাল প্যানেলে এমন একটা সংকেত এল, যা কোনো লাইনের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছিল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্মের আলো নিভে গেল। তারপর সেই ট্রেন এল।”

“তারপর?”

“একটা ছোট মেয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছিল। সাদা ফ্রক পরা। তার পায়ে রুপোর নূপুর। সে ট্রেনের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল। অরুণাভবাবু তাকে ধরে রাখতে চাইছিলেন। কিন্তু ট্রেনের দরজা খুলতেই মেয়েটা যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির টানে এগিয়ে গেল।”

“আপনি তাকে বাঁচাননি কেন?”

প্রশ্নটা শুনে দেবাশিসবাবু চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি চেষ্টা করেছিলাম। সত্যিই করেছিলাম। কিন্তু ট্রেনের দরজার কাছে পৌঁছতেই আমার হাতটা যেন বরফে জমে গেল। আমি নড়তে পারছিলাম না। তারপর একটা হুইসেল বাজল। ট্রেন চলে গেল। মেয়েটাও।”

“মেয়েটা অনন্যা?”

“আমি ভেবেছিলাম, হ্যাঁ।”

“আর বাবা?”

“ট্রেন চলে যাওয়ার পর অরুণাভবাবু প্ল্যাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটা ছোট্ট নূপুর। তিনি বারবার বলছিলেন, ‘ওকে নয়, আমাকে নেওয়ার কথা ছিল।’ তারপর তিনি আমাকে একটা খাম দিয়ে বললেন, যদি কোনো দিন ঈশিতা ফিরে আসে, তবে যেন তাকে সবটা জানাই।”

“কিন্তু আপনি তো আমাকে কিছুই জানাননি!”

“কারণ পরের দিন সকালে আমি যখন আবার সেই প্ল্যাটফর্মে গেলাম, তখন অরুণাভবাবু আর সেখানে ছিলেন না। তাঁর বাড়ি থেকে খবর এল, তিনি নিখোঁজ। আর আশ্চর্যের বিষয়, স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে ওই রাতের কোনো ছবি ছিল না। ডিউটি রেজিস্টারে সেই রাতের উল্লেখও মুছে গিয়েছিল।”

“তাহলে আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে ঘটনাটা সত্যি?”

দেবাশিসবাবু তাঁর ডান হাতের কবজি দেখালেন।

সেখানে একটা পুরোনো দাগ। যেন কেউ বরফের ধারালো টুকরো দিয়ে চামড়া কেটে দিয়েছিল।

“সেই রাতে ট্রেনের দরজায় হাত রাখার চেষ্টা করেছিলাম। এই দাগটা তখনই হয়। প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর রাত ১টা ১৭ মিনিটে দাগটা আবার ঠান্ডা হয়ে যায়। আজও।”

তিনি হাত নামিয়ে বললেন, “আর আজ সকাল থেকে আমার মনে হচ্ছে, এবার ট্রেনটা শুধু একজনকে নিতে আসেনি।”

“কাকে নিতে এসেছে?”

দেবাশিসবাবু সরাসরি ঈশিতার চোখের দিকে তাকালেন।

“তোমাকে।”


৩. মায়ের ঘরে লুকোনো সত্য

ঈশিতা উঠে দাঁড়াল।

“আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।”

“কোথায়?”

“মায়ের কাছে।”

দেবাশিসবাবু বাধা দিলেন না।

“যাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—তোমার মা যদি এমন কিছু বলেন, যা তোমার স্মৃতির সঙ্গে মেলে না, সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস কোরো না।”

“আমি আর কাউকেই বিশ্বাস করছি না।”

ঈশিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। শহর স্বাভাবিক। রাস্তায় মানুষের ভিড়, দোকানের আলো, বাসের শব্দ—সবই আগের মতো। অথচ তার মনে হচ্ছিল, এই স্বাভাবিকতার আড়ালে কোথাও একটা অদৃশ্য দরজা খুলে রয়েছে।

বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, মা বসার ঘরে বসে আছেন। সামনে একটা প্রদীপ জ্বলছে।

প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর তিনি এই প্রদীপ জ্বালান।

আজও জ্বালিয়েছেন।

ঈশিতা দরজা বন্ধ করে বলল, “মা, তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব।”

মা মুখ তুললেন। তাঁর চোখের নীচে ক্লান্তির ছাপ।

“কী হয়েছে?”

“আমার জন্মের দিন হাসপাতালে কী ঘটেছিল?”

মায়ের মুখের রং বদলে গেল।

“হঠাৎ এসব প্রশ্ন করছ কেন?”

“আমার যমজ বোন ছিল?”

প্রদীপের শিখাটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তোমার বাবা তোমাকে কী বলেছে?”

“বাবা পনেরো বছর ধরে নিখোঁজ। তিনি আমাকে কিছু বলেননি। কিন্তু তাঁর নোটবই বলছে, আমার জন্মের দিন দুটি শিশু জন্মেছিল। একজন বেঁচে ছিল, অন্যজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”

মা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“নোটবইটা কোথায় পেলে?”

“সেটা বড় কথা নয়। সত্যিটা বলো।”

মা জানলার দিকে তাকালেন। বাইরে বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে।

“তোমার জন্মের দিন আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান ফিরলে ডাক্তার বলেছিলেন, আমার একটি মেয়ে হয়েছে। পরে অরুণাভ আমাকে বলেছিল, আরেকটি শিশুও জন্মেছিল, কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি।”

“তুমি কি তাকে দেখেছিলে?”

“না।”

“তাহলে তুমি কীভাবে জানলে যে সে মারা গিয়েছিল?”

মা কোনো উত্তর দিলেন না।

ঈশিতা আরও কাছে এগিয়ে গেল।

“তুমি প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর প্রদীপ জ্বালাও কেন?”

মায়ের চোখে জল এসে গেল।

“কারণ আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ওই দিনটাকে কখনো ভুলব না।”

“কাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলে?”

“তোমার বাবাকে।”

“কেন?”

মা ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “কারণ তোমার বাবা বলেছিল, ওই রাতের কথা ভুলে গেলে তুমি বাঁচবে না।”

ঈশিতার বুক ধক করে উঠল।

“আমি কী দেখেছিলাম?”

মা তার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ভয় ছিল, অপরাধবোধ ছিল, আর ছিল এমন এক অসহায়তা, যা ঈশিতা আগে কখনো দেখেনি।

“তুমি এগারো বছর বয়সে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিখোঁজ হয়েছিলে। আমরা তোমাকে বাড়ির কোথাও খুঁজে পাইনি। পুলিশ ডেকেছিলাম। তারপর রাতের শেষে তুমি নিজেই ফিরে এসেছিলে।”

“কোথা থেকে?”

“তুমি কিছু বলতে পারোনি। শুধু বারবার বলছিলে, ‘ট্রেনটা আবার আসবে।’”

ঈশিতার মাথার ভিতর যেন একটা বন্ধ দরজা কেঁপে উঠল।

হঠাৎ তার মনে পড়ল—কালো অন্ধকার, লোহার দরজা, দূরে একটা শিশুর কান্না, আর কেউ একজন তার হাত ধরে বলছে, ‘চোখ বন্ধ করিস না।’

স্মৃতিটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

“মা, সেই রাতে আমার সঙ্গে আর কেউ ছিল?”

মা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “তোমার বাবা।”

“তিনি কি আমাকে ট্রেনে নিয়ে গিয়েছিলেন?”

“না। তিনি তোমাকে ট্রেন থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

“তাহলে অনন্যা?”

মা দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললেন।

“আমি জানি না, অনন্যা কে। আমি শুধু জানি, তুমি যখন ফিরে এসেছিলে, তোমার বাবার হাতে রক্ত ছিল। আর তিনি বলেছিলেন, এবার থেকে আমাদের একটা মেয়েকেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”

ঈশিতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“একটা মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে মানে?”

মা উত্তর দিলেন না।

ঠিক সেই সময় বসার ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ঘড়িটা বেজে উঠল।

ঢং…

ঢং…

ঢং…

ঘড়ির কাঁটা নিজে থেকেই এগোতে লাগল।

সাতটা।

আটটা।

নয়টা।

তারপর দশটা।

তারপর এগারোটা।

তারপর বারোটা।

কাঁটা থামল না।

একটা।

রাত ১টা ১৭ মিনিট।

ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

টক।

টক।

টক।

বাইরে থেকে বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“ঈশিতা, দরজা খোল।”

ঈশিতা জমে গেল।

কণ্ঠটা তার বাবার। সেই একই স্বর, সেই একই ডাক।

“ঈশিতা, আমি ফিরে এসেছি। দরজা খোল।”

মা আতঙ্কে তার হাত চেপে ধরলেন।

“খুলবে না!”

বাইরে থেকে আবার ডাক এল।

“মা, তুমি ওকে থামিয়ো না। ওর আমার কাছে আসার সময় হয়েছে।”

ঈশিতা মায়ের দিকে তাকাল।

“তুমি কি বাবার গলা চিনতে পারছ?”

মা মাথা নাড়লেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে।

“চিনতে পারছি। কিন্তু এটা তোমার বাবা নয়।”

দরজার বাইরে এবার একটা শিশুর হাসি শোনা গেল।

তারপর বাবার কণ্ঠস্বর বদলে গেল। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষ কথা বলছে।

“দরজা খোল, ঈশিতা। এবার আর একজনকে নিয়ে যেতে আসিনি।”

একটু থেমে কণ্ঠটা ফিসফিস করে বলল—

“এবার তোমাকে ফিরিয়ে দিতে এসেছি।”

দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু একটা ঘরের ভিতরে ঢুকতে লাগল। সেই ধোঁয়ার মধ্যে ভেসে উঠল একটি ছোট্ট সাদা ফ্রক, রুপোর নূপুর, আর রক্তে ভেজা একটা হাত।

ঈশিতা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মা তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন।

“না! তুমি যদি দরজা খোলো, সব শেষ হয়ে যাবে!”

“কিন্তু মা, বাবা বাইরে!”

“ওটা তোমার বাবা নয়!”

“তুমি কী করে জানো?”

মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “কারণ তোমার বাবা আজও ওই ট্রেনের ভিতরে আটকে আছে।”

ঈশিতা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

“কী বললে?”

মা তাকে আরও শক্ত করে ধরে বললেন, “আমি এত বছর তোমাকে মিথ্যে বলেছি। তোমার বাবার মৃত্যু হয়নি। তিনি নিখোঁজও হননি। তিনি নিজেকে ওই ট্রেনের ভিতরে আটকে রেখেছেন, যাতে ট্রেনটা তোমাকে নিতে না পারে।”

বাইরে থেকে একটা দীর্ঘ হুইসেল শোনা গেল।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে বাবার কণ্ঠস্বর বলল—

“মীরা, মিথ্যে বলা বন্ধ করো।”

মা হঠাৎ কেঁপে উঠলেন।

ঈশিতা তাঁর মুখের দিকে তাকাল।

“মীরা?”

মা চোখ বন্ধ করলেন।

“ওই ছবির মহিলার নাম মীরা। তুমি এত দিন যাকে মা বলে জেনেছ, আমি সেই মানুষ নই।”

ঈশিতার মনে হল, মেঝেটা তার পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে।

“তাহলে তুমি কে?”

মা ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।

“আমি তোমার মাকে কথা দিয়েছিলাম, তোমাকে নিজের মেয়ের মতো বড় করব। কিন্তু তোমার জন্মের সত্যিটা কখনো বলব না।”

দরজায় আবার আঘাত পড়ল।

এবার এত জোরে যে কাঠ কেঁপে উঠল।

বাইরে থেকে কণ্ঠস্বর বলল—

“ঈশিতা, তোমার মা তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে তোমার নাম বদলে দিয়েছিল।”

“আমার নাম বদলে দিয়েছিল?” ঈশিতা ফিসফিস করে বলল।

মা মাথা নাড়লেন।

“তোমার জন্মের সময় তোমার নাম ছিল অন্য কিছু।”

“কী নাম?”

মা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার ওপাশ থেকে সেই কণ্ঠস্বর বলে উঠল—

“অনন্যা।”

ঈশিতার হাত থেকে নূপুরটা পড়ে গেল।

একই সঙ্গে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি থেমে গেল।

দরজার ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর খুব ধীরে, খুব স্পষ্ট করে কেউ বলল—

“এবার আসল যাত্রীকে ফিরিয়ে দাও।”

দরজার তালা নিজে থেকেই খুলে গেল।


৪. শ্মশানঘাটের টিকিট

দরজাটা খুলতেই বাইরে কাউকে দেখা গেল না।

সিঁড়ির নীচে শুধু একটা পুরোনো কালো ছাতা পড়ে রয়েছে। ছাতার হাতলে বাঁধা সাদা কাগজে লেখা—

শিয়ালদহ স্টেশন। প্ল্যাটফর্ম ৭। রাত ১টা ১৭ মিনিট।

তার নীচে আরও একটি লাইন—

যাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন।

মা দরজার সামনে বসে পড়লেন।

“ওরা জানে,” তিনি কাঁপা গলায় বললেন।

“কারা?”

“যারা ওই ট্রেন চালায়।”

ঈশিতা ছাতাটা তুলে নিল।

“আমি স্টেশনে যাব।”

মা তার হাত ধরে ফেললেন।

“তুমি বুঝতে পারছ না। ওই ট্রেনে যে একবার ওঠে, সে আর আগের মানুষ থাকে না।”

“আমার বাবা সেখানে আটকে আছেন। আমার বোনও হয়তো। আমি যাব।”

“তাহলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলো।”

ঈশিতা অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি তো বললে তুমি আমার মা নও।”

মা তার চোখের জল মুছে বললেন, “মা হওয়ার জন্য জন্ম দেওয়া লাগে না। আমি তোমাকে কোলে নিয়ে বড় করেছি। তোমার জ্বরের রাতে সারারাত জেগেছি। তোমার স্কুলের প্রথম দিন তোমার হাত ধরেছিলাম। তুমি যখন ভয় পেতে, আমি তোমার পাশে বসে থাকতাম। আমি তোমার জন্মদাত্রী নই—কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। এই সত্যিটা কেউ বদলাতে পারবে না।”

ঈশিতার চোখ ভিজে উঠল।

এতক্ষণ সে শুধু সত্যিটা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু সত্যি সামনে আসতেই বুঝতে পারল, সত্যি কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পর্কটাকেও ভেঙে দেয়।

সে মায়ের হাত ধরল।

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে। কিন্তু একটা কথা বলবে—আমার আসল মা কোথায়?”

মা মাথা নীচু করলেন।

“আমি জানি না।”

“তুমি কি তাঁকে শেষবার দেখেছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায়?”

“হাসপাতালের করিডরে। তোমার জন্মের পর। তিনি তোমাকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি কখনো ট্রেনটা ফিরে আসে, আমার মেয়েকে ওর হাতে তুলে দেবে না।’ তারপর তিনি অরুণাভর সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন।”

“আর ফিরে আসেননি?”

“না।”

“তাহলে তিনি কি বেঁচে আছেন?”

মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একটা শিশুকণ্ঠ ভেসে এল।

“বেঁচে আছে।”

দুজনেই দরজার দিকে তাকাল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে সেই ছোট্ট মেয়েটি দাঁড়িয়ে। সাদা ফ্রক, রুপোর নূপুর, আর মুখে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি।

অনন্যা।

সে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার মা বেঁচে আছেন। কিন্তু তাঁকে খুঁজতে গেলে তোমাকে নিজের নাম ভুলে যেতে হবে।”

ঈশিতা এক পা এগিয়ে গেল।

“তুমি কি সত্যিই আমার বোন?”

মেয়েটি মৃদু হাসল।

“আমি তোমার সেই অংশ, যাকে তুমি ভুলে গেছ।”

“তুমি কি অনন্যা?”

মেয়েটি মাথা কাত করল।

“অনন্যা নামটা তোমারও ছিল।”

“কিন্তু আমার জন্মের কাগজে—”

“কাগজে যা লেখা থাকে, সব সত্যি হয় না, দিদি।”

মেয়েটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট টিকিট বের করল। টিকিটটা ঈশিতার হাতে দিয়ে বলল, “এটা রাখো। ট্রেনে উঠলে কাউকে তোমার নাম বলবে না।”

“কেন?”

“কারণ চালক নাম শুনেই যাত্রী চিনতে পারে।”

“চালক কে?”

মেয়েটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“যে মানুষটা তোমার জন্মের আগেও ছিল, তোমার মৃত্যুর পরেও থাকবে।”

“সে কি মানুষ?”

“একসময় ছিল।”

“তার নাম কী?”

মেয়েটি উত্তর দিল না। শুধু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগল।

ঈশিতা তার পিছনে ছুটল।

“অনন্যা! দাঁড়াও!”

সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে ঈশিতা দেখল, বাইরে কেউ নেই। শুধু রাস্তার বাতির নীচে একটা কালো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। ছায়াটার মাথায় রেলওয়ের পুরোনো টুপি।

ঈশিতা চোখের পলক ফেলতেই ছায়াটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

তার হাতে ধরা টিকিটে এবার নতুন লেখা ফুটে উঠেছে—

যাত্রী সংখ্যা: ২।

নাম: অজ্ঞাত।

ফেরার অনুমতি: নেই।

ঈশিতা মায়ের দিকে তাকাল।

মা ফিসফিস করে বললেন, “আমাদের হাতে আর সময় নেই।”

দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল বাজল।

এবার সেই শব্দ শিয়ালদহের দিক থেকে আসেনি।

শব্দটা এসেছে বাড়ির নীচের বন্ধ ঘর থেকে—যে ঘরটা পনেরো বছর ধরে কেউ খোলেনি।

ঈশিতা ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেল।

দরজার গায়ে মরচে ধরা তালা ঝুলছে। কিন্তু তালার নীচে একটা নতুন কাগজ আটকানো।

তাতে বাবার হাতের লেখা—

ঈশিতা, যদি তুমি এই ঘর খুলে থাকো, তবে বুঝব তুমি সত্যিটা জানার জন্য প্রস্তুত।

কিন্তু ভিতরে ঢোকার আগে মনে রেখো—তোমার বোনকে খুঁজতে গিয়ে নিজের মুখ দেখতে পেয়ো না।

ঈশিতা তালার দিকে হাত বাড়াল।

ঠিক তখনই ঘরের ভিতর থেকে কেউ দরজায় তিনবার টোকা দিল।

টক।

টক।

টক।

তারপর ভিতর থেকে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“মা, দরজা খোলো। আমি ফিরে এসেছি।”

ঈশিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

কারণ তার কণ্ঠস্বর তো বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছে।

তাহলে ঘরের ভিতরে কে?

আর ঘরের ভিতর থেকে যে মেয়েটি কথা বলছে, সে যদি ঈশিতা হয়—তবে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশিতা কে?

দূরে আবার ট্রেনের হুইসেল বাজল।

ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল রাত ১টা ১৬ মিনিটের দিকে।

আর দরজার ওপাশ থেকে সেই অচেনা ঈশিতা ফিসফিস করে বলল—

“দিদি, তাড়াতাড়ি করো। ট্রেনটা আসার আগে আমাদের মধ্যে একজনকে মরতেই হবে।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *