কৃষ্ণপুর গ্রামের মাটির রাস্তার ধারে ছোট্ট একটি খাবারের দোকান ছিল রতনের। দোকানে ভাত, ডাল, শাক, মাছ আর সন্ধ্যায় গরম চা—এই ছিল তার সম্বল।
বছর দশেক আগে শহরে কাজ করতে যাওয়ার আগে রতনের সঙ্গে মাধবীর গভীর বন্ধুত্ব ছিল।
বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি।
কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলেনি।
একদিন হঠাৎ মাধবীর বিয়ে হয়ে গেল।
রতন শহরে চলে গেল।
দশ বছর কেটে গেল।
এক বর্ষার দুপুরে দোকানে বসে থালা ধুচ্ছিল রতন। হঠাৎ এক বৃদ্ধা এসে বললেন,
“বাবা, এই দোকানটা কি রতনের?”
রতন সামনে এল।
“আমি রতন।”
বৃদ্ধা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো কাঁসার থালা বের করলেন।
থালার নিচে খোদাই করা—
“মাধবী”
রতনের হাত থেমে গেল।
“এটা কোথায় পেলেন?”
“পুরোনো বাসন বিক্রি করতে এসেছিল এক লোক। আমি নামটা দেখে কিনে নিয়েছিলাম। ভাবলাম, তোমার কাছে পৌঁছে দেব।”
রতন থালাটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
“মাধবী কোথায়?”
বৃদ্ধা বললেন,
“এখনও এই গ্রামেই আছে।”
রতনের বুক ধক করে উঠল।
“ওর বিয়ে?”
“হয়েছিল। স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে।”
রতন কোনো কথা বলল না।
সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে সে মাধবীর বাড়ির সামনে গেল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সাহস সঞ্চয় করল।
শেষে কড়া নাড়ল।
একজন কিশোরী দরজা খুলল।
“কাকে চাই?”
“মাধবীকে।”
ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল,
“কে?”
রতন বলল,
“আমি।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মাধবী বাইরে এল।
দুজনের চোখাচোখি হল।
দশ বছর যেন এক মুহূর্তে ফিরে এল।
মাধবী মৃদু হেসে বলল,
“তুই সত্যিই রতন?”
রতনও হাসল।
“তুইও তো বদলে গেছিস।”
“বদলাতেই হয়।”
দুজন উঠোনে বসে অনেকক্ষণ কথা বলল।
পুরোনো দিনের কথা।
স্কুলের কথা।
বর্ষার দুপুর।
পুকুরঘাট।
আর সেইসব কথা, যেগুলো তারা কোনোদিন মুখে বলেনি।
হঠাৎ মাধবী জিজ্ঞেস করল,
“তুই আমাকে কোনোদিন খুঁজিসনি?”
রতন মাথা নিচু করল।
“খুঁজেছিলাম।”
“তাহলে আসিসনি কেন?”
“ভেবেছিলাম, তুই সুখে আছিস।”
মাধবী মৃদু হেসে বলল,
“আর আমি ভেবেছিলাম, তুই আমাকে ভুলে গেছিস।”
দুজনেই চুপ।
কিছুক্ষণ পর রতন কাঁসার থালাটি বের করল।
“এটা তোর?”
মাধবীর চোখ বড় হয়ে গেল।
“এটা!”
সে থালাটি হাতে নিল।
“এটা আমার মায়ের।”
“তোর নাম কেন লেখা?”
মাধবী হাসল।
“আমার বিয়ের সময় মা আমার জন্য বানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সংসারে যত ঝড়ই আসুক, নিজের নামটা যেন কখনও হারিয়ে না ফেলি।”
রতন থালাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“তাহলে এটা পুরোনো বাসনের সঙ্গে গেল কীভাবে?”
মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অনেক জিনিস বিক্রি করতে হয়েছিল।”
রতন কিছু বলল না।
মাধবী থালাটি ফেরত দিতে গেলে রতন বলল,
“এটা রাখ।”
“কেন?”
“তোর মায়ের স্মৃতি।”
মাধবী মাথা নাড়ল।
“তুই রাখ।”
“আমি?”
“হ্যাঁ। এত বছর পরও তুই নামটা চিনতে পেরেছিস। তাই মনে হয়, থালাটা তোর কাছেই থাকা উচিত।”
রতন থালাটি নিল না।
“না। নামটা যার, থালাটাও তার।”
মাধবী মৃদু হেসে বলল,
“তুই এখনও আগের মতোই জেদি।”
পরদিন মাধবী তার মেয়েকে নিয়ে রতনের দোকানে এল।
মেয়েটি বলল,
“মা বলেছে, এখানকার মাছ নাকি খুব ভালো।”
রতন হেসে বলল,
“আজ মাছের সঙ্গে মিষ্টিও থাকবে।”
মাধবী তাকিয়ে বলল,
“মিষ্টি কেন?”
“দশ বছর পর পুরোনো বন্ধুকে পেয়েছি।”
মাধবী কিছু বলল না।
তবে তার মুখের হাসিটা অনেক কিছু বলছিল।
তারপর থেকে মাধবী প্রায়ই দোকানে আসতে লাগল।
কখনও মেয়েকে নিয়ে।
কখনও একা।
তাদের সম্পর্কের নাম কী—সেটা কেউ জানত না।
হয়তো বন্ধুত্ব।
হয়তো পুরোনো ভালোবাসা।
হয়তো দুটোর মাঝখানে এমন একটি জায়গা, যার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই।
একদিন রতন দোকানের দেওয়ালে সেই কাঁসার থালাটি ঝুলিয়ে দিল।
মাধবী দেখে বলল,
“আমার নামটা এত বড় করে কেন রেখেছিস?”
রতন হেসে বলল,
“যে নাম দশ বছর ধরে মনে ছিল, তাকে ছোট করে লিখব কেন?”
মাধবী কিছু বলল না।
শুধু থালাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে তখন বৃষ্টি নামছিল।
দোকানের টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ।
মাধবী ধীরে বলল,
“কিছু মানুষকে হারানো যায় না, রতন।”
রতন তাকাল।
“কীভাবে?”
“সময় তাদের দূরে নিয়ে যায়। কিন্তু মনে একটা জায়গা রেখে যায়।”
রতন মৃদু হেসে বলল,
“সেই জায়গাটা কি এখনও খালি আছে?”
মাধবী উত্তর দিল না।
শুধু কাঁসার থালায় আঙুল বুলিয়ে নিজের নামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কখনও কখনও ভালোবাসার জন্য বড় কোনো প্রতিশ্রুতি লাগে না।
একটি নামই যথেষ্ট।
যদি সেই নামটি দশ বছর পরেও কারও হৃদয়ে একইভাবে লেখা থাকে।