Categories
গল্প

গল্প : নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।

প্রতিদিন ভোরে নদীর ওপর দিয়ে মাছ ধরার নৌকা যেত। কিন্তু গত এক মাস ধরে জেলেদের মধ্যে অদ্ভুত একটি কথা ছড়িয়ে পড়েছিল।

নদীর মাঝখানে নাকি একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।

দূর থেকে দেখা যায়, সে সাদা জামা পরে আছে। নৌকা কাছে গেলেই তাকে আর দেখা যায় না।

জেলেরা তাই ওই অংশটা এড়িয়ে চলত।

কিন্তু রুদ্র এসব কথায় বিশ্বাস করত না।

সে স্থানীয় একটি পত্রিকার জন্য ছবি তুলত। একদিন খবরের সন্ধানে নদীর ঘাটে গিয়ে কয়েকজন জেলের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিল, বিষয়টি নিজেই দেখবে।

পরদিন ভোরে সে মাঝি গণেশকে নিয়ে নৌকায় উঠল।

সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি।

নদীর জল ছিল অস্বাভাবিক শান্ত।

নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছতেই গণেশ হঠাৎ দাঁড় থামিয়ে দিল।

“ওই দেখুন!”

রুদ্র সামনে তাকাল।

সত্যিই একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে!

নদীর বুকের মাঝখানে!

সাদা জামা। মাথা নিচু।

রুদ্র ক্যামেরা তুলল।

একটা ছবি।

দুটো ছবি।

তিনটে ছবি।

তারপর সে চিৎকার করে উঠল,

“নৌকা ওদিকে নিন!”

গণেশ ভয়ে বলল,

“না বাবু, ওদিকে যাব না।”

কিন্তু রুদ্র শুনল না।

নৌকা যত এগোতে লাগল, মানুষটিও যেন তত দূরে সরে যেতে লাগল।

হঠাৎ কুয়াশার একটা পর্দা নেমে এল।

আর মানুষটি অদৃশ্য।

রুদ্র চারদিকে তাকিয়ে রইল।

“কোথায় গেল?”

কোনো উত্তর নেই।

ঘাটে ফিরে এসে রুদ্র ক্যামেরার ছবি কম্পিউটারে তুলল।

প্রথম ছবিতে মানুষটি দূরে।

দ্বিতীয় ছবিতে একটু কাছে।

তৃতীয় ছবিতে আরও কাছে।

কিন্তু চতুর্থ ছবিটি দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।

মানুষটি এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।

মুখ স্পষ্ট নয়।

তবে তার হাতে একটি ছোট ধাতব বাক্স।

রুদ্র ছবিটি বড় করল।

বাক্সটির গায়ে লেখা—

“৭ নম্বর নৌকা।”

রুদ্র বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করল।

পুরোনো নৌকার রেজিস্টার ঘেঁটে সে জানতে পারল, সাত বছর আগে ৭ নম্বর নৌকাটি নদীতে ডুবে গিয়েছিল।

মাঝি ছিলেন অরুণ।

সঙ্গে ছিল আরও দুজন জেলে।

তিনজনের কাউকেই পাওয়া যায়নি।

রুদ্র অরুণের বাড়িতে গেল।

সেখানে তার বৃদ্ধ মা এখনও থাকেন।

অরুণের ছবি দেখাতেই বৃদ্ধা বললেন,

“আমার ছেলে নদীকে খুব ভালোবাসত।”

রুদ্র জিজ্ঞেস করল,

“তার সঙ্গে কোনো ধাতব বাক্স ছিল?”

বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকালেন।

“ছিল। ওর বাবার পুরোনো বাক্স। তাতে কিছু কাগজ রাখত।”

“কী কাগজ?”

“নদীর মাছ ধরার এলাকার হিসাব। আর কিছু লোকের নাম।”

রুদ্রের সন্দেহ হল।

সে পুরোনো দুর্ঘটনার খবর খুঁজতে শুরু করল।

তখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল।

নৌকাটি দুর্ঘটনায় ডোবেনি।

তার নিচে বিস্ফোরণের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল।

কিন্তু তদন্তের পর রিপোর্টটি বন্ধ হয়ে যায়।

রুদ্র আরও খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, অরুণ নদীতে বেআইনি বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার বিষয়টি আবিষ্কার করেছিলেন।

তিনি কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম লিখে রেখেছিলেন।

সম্ভবত সেই কারণেই তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বাক্সটি কোথায়?

রুদ্র আবার নদীতে গেল।

এবার একা নয়। কয়েকজন স্থানীয় জেলে সঙ্গে ছিল।

ছবিতে দেখা জায়গাটি চিহ্নিত করে নদীর তলায় অনুসন্ধান শুরু হল।

কয়েক ঘণ্টা পর একটি মরচেধরা বাক্স পাওয়া গেল।

বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এল পুরোনো কাগজ।

নদীর জল দূষণের প্রমাণ।

কিছু ছবিও ছিল।

আর একটি ছোট কাগজ।

তাতে লেখা—

“যদি আমি ফিরতে না পারি, নদীকে যেন কেউ মেরে ফেলতে না পারে।”

প্রমাণগুলো প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হল।

তদন্ত আবার শুরু হল।

বেআইনি বর্জ্য ফেলার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল।

কিন্তু রুদ্রের মনে তখনও একটি প্রশ্ন।

সে ছবিতে যে মানুষটিকে দেখেছিল, সে কে?

কয়েকদিন পর ভোরে রুদ্র আবার নদীর ঘাটে দাঁড়িয়েছিল।

নদী শান্ত।

কুয়াশা নেই।

হঠাৎ মাঝনদীতে তার চোখ আটকে গেল।

সাদা জামা পরা সেই মানুষটি আবার দাঁড়িয়ে আছে।

রুদ্র ক্যামেরা তুলল।

কিন্তু এবার ছবি তুলল না।

শুধু দাঁড়িয়ে রইল।

মানুষটি ধীরে ধীরে হাত তুলল।

তারপর নদীর দিকে ইশারা করল।

পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল।

রুদ্র সেদিন বুঝতে পারল না, সে সত্যিই কাউকে দেখেছিল, নাকি কুয়াশা আর স্মৃতির খেলা ছিল।

তবে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তার মনে হল—

কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের অসমাপ্ত দায়িত্ব থেকে যায়।

আর কখনও কখনও সেই দায়িত্বই মানুষের চোখে একটি ছায়া হয়ে ফিরে আসে।

নদী তখনও বয়ে চলেছে।

আর তার বুকের জলের নিচে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের গল্প।

কিছু গল্প উদ্ধার হয়।

কিছু গল্প চিরকাল রহস্য হয়েই থেকে যায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *