Categories
উপন্যাস বিবিধ

শ্মশানের শেষ ট্রেন (পর্ব  : শেষ যাত্রীর আসল পরিচয়)।

দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“দিদি, তাড়াতাড়ি করো। ট্রেনটা আসার আগে আমাদের মধ্যে একজনকে মরতেই হবে।”

ঈশিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার নিজের কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারে। আনন্দে, দুঃখে, রাগে কিংবা ভয়ে—নিজের গলার স্বর কখনো ভুল হয় না। অথচ বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে যে মেয়েটি কথা বলছে, তার কণ্ঠস্বর অবিকল ঈশিতার মতো।

শুধু একটা পার্থক্য আছে।

ঈশিতা যখন কথা বলে, তার গলায় জীবন্ত মানুষের উষ্ণতা থাকে। আর ঘরের ভিতরের কণ্ঠস্বরটা যেন বহু দূরের কোনো ফাঁকা সুড়ঙ্গ থেকে ফিরে আসছে।

“তুমি কে?” ঈশিতা দরজার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।

ভিতর থেকে উত্তর এল, “তুমি।”

“মিথ্যে বলছ!”

“তাহলে দরজা খুলে দেখো।”

পিছন থেকে মা—যাঁকে এত দিন ঈশিতা নিজের মা বলে জেনে এসেছে—তার হাত চেপে ধরলেন।

“খুলবে না, ঈশিতা। ওই ঘরে ঢুকলে তুমি আর ফিরে আসতে পারবে না।”

“কিন্তু ভিতরে আমারই গলা!”

“আমি জানি।”

“তুমি জানো?”

মহিলা চোখ বন্ধ করলেন।

“এই ঘরের দরজা তোমার জন্মের পর থেকে বন্ধ। তোমার বাবা বলেছিলেন, একদিন তুমি যদি ফিরে এসে দরজার ওপাশ থেকে নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পাও, তবে যেন তোমাকে কোনোভাবেই ভিতরে ঢুকতে না দিই।”

“কেন?”

“কারণ দরজার ওপাশে যে আছে, সে তোমার শরীর চায়।”

ঈশিতার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আমার শরীর?”

“হ্যাঁ। সে তোমার স্মৃতি পেয়েছে, তোমার কণ্ঠস্বর পেয়েছে, তোমার মুখ পেয়েছে। কিন্তু সে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে না। তার জন্য দরকার জীবিত একজনের শরীর।”

দরজার ওপাশ থেকে এবার হাসির শব্দ এল।

“মা, তুমি আবার মিথ্যে বলছ।”

মহিলা কেঁপে উঠলেন।

“চুপ কর!”

“তুমি তো জানো, আমি কে। তুমি তো আমাকে নিজের হাতে ঘুম পাড়িয়েছিলে। আমার কপালে চুমু খেয়েছিলে। তারপর ট্রেনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলে।”

“না!” মহিলা চিৎকার করে উঠলেন। “আমি তোমাকে ট্রেনে নিয়ে যাইনি!”

ভিতর থেকে মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে আমার পায়ের নূপুরটা তোমার কাছে এল কীভাবে?”

ঈশিতা মহিলার মুখের দিকে তাকাল।

তিনি দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছেন। তাঁর কাঁধ কাঁপছে।

“তুমি কী লুকিয়েছ আমার কাছ থেকে?” ঈশিতা জিজ্ঞেস করল।

কোনো উত্তর এল না।

ঘড়িতে তখন রাত ১টা ১৬ মিনিট।

ঠিক এক মিনিট পর শেষ ট্রেন আসবে।

ঈশিতা আর অপেক্ষা করল না। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা পুরোনো চাবিটা তুলে নিয়ে তালায় ঢুকিয়ে দিল।

মহিলা তার হাত টেনে ধরলেন।

“ঈশিতা, না!”

কিন্তু ততক্ষণে তালা খুলে গিয়েছে।

দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ঘরের ভিতর কোনো আসবাব নেই। জানলা নেই। দেওয়ালে ধুলো নেই। মেঝেতে শুধু কালো রঙের একটা রেললাইন চলে গেছে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

আর সেই লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।

ঈশিতার মতোই মুখ। একই উচ্চতা। একই চোখ। একই কপালের ছোট্ট দাগ।

মেয়েটির পরনে সাদা ফ্রক।

পায়ে রুপোর নূপুর।

সে হাসল।

“অবশেষে এলে, দিদি।”

ঈশিতা পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পা নড়ল না।

মেয়েটি রেললাইনের ওপর দিয়ে এগিয়ে এল।

“এত বছর পরেও তুমি আমাকে চিনতে পারলে না?”

“তুমি অনন্যা?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“কখনো অনন্যা। কখনো ঈশিতা। আবার কখনো কেউই নই।”

“এসবের মানে কী?”

মেয়েটি উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের ভিতর হঠাৎ একটা হুইসেল বাজল।

দেওয়াল কেঁপে উঠল।

মেঝের রেললাইন ধরে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই কুয়াশার ভিতর থেকে ফুটে উঠল পুরোনো একটা হাসপাতালের দৃশ্য।

দুটি শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে।

একটি কাঁদছে।

অন্যটি নিঃশব্দে চোখ খুলে তাকিয়ে আছে।

তার পাশে দাঁড়িয়ে তরুণ অরুণাভ মুখার্জি। মুখে আতঙ্ক। হাতে একটা সাদা কাপড়।

আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই মহিলা, যাঁর মুখ ঈশিতার সঙ্গে মিলে যায়।

মীরা।

ঈশিতা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

মেয়েটি বলল, “এবার নিজের জন্মের গল্পটা দেখো।”


১. জন্মের দিন

১৮ অক্টোবর ২০০০।

কলকাতার একটি পুরোনো হাসপাতালে গভীর রাত।

প্রসবকক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রণার পর মীরার দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়েছিল। প্রথম শিশুটি জোরে কেঁদে উঠেছিল। দ্বিতীয় শিশুটি জন্মানোর পর ঘরে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছিল।

চিকিৎসক পরীক্ষা করে বলেছিলেন, দ্বিতীয় শিশুটির হৃদস্পন্দন নেই।

কিন্তু অরুণাভ শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কিছু লক্ষ করেছিলেন।

শিশুটির চোখ খোলা।

সেই চোখে কোনো নবজাতকের অস্পষ্টতা নেই। বরং মনে হচ্ছিল, সে ঘরের প্রত্যেককে চিনতে পারছে।

অরুণাভ শিশুটিকে কোলে নিতেই করিডরের আলো নিভে গেল।

দূরে একটা ট্রেনের হুইসেল বাজল।

হাসপাতালের জানলা বন্ধ ছিল। হাসপাতাল থেকে কাছাকাছি কোনো রেললাইনও ছিল না। তবু শব্দটা এত স্পষ্ট ছিল যে সবাই চমকে উঠেছিল।

তারপর প্রসবকক্ষের দরজায় একজন লোক এসে দাঁড়াল।

কালো রেলওয়ে ইউনিফর্ম। মাথায় পুরোনো টুপি। মুখে অস্বাভাবিক স্থিরতা।

সেই লোকটাই ছবির অস্পষ্ট মুখের মানুষ।

চালক।

সে অরুণাভর দিকে তাকিয়ে বলল, “একটি যাত্রা অসম্পূর্ণ রয়েছে।”

অরুণাভ শিশুটিকে বুকে চেপে ধরলেন।

“এখানে তোমার কোনো অধিকার নেই।”

লোকটি হাসল।

“এই শিশুর নাম আমার তালিকায় রয়েছে।”

“তালিকা থেকে নাম মুছে দাও।”

“নাম একবার লেখা হলে মুছে যায় না।”

“আমি মুছে দেব।”

চালক ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“তুমি চেষ্টা করতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, একটি জীবনের বিনিময়ে আরেকটি জীবন নয়—একটি অসম্পূর্ণ যাত্রার বিনিময়ে আরেকটি অসম্পূর্ণ যাত্রা।”

তারপর সে শিশুটির দিকে তাকিয়ে বলল, “ঈশিতা।”

শিশুটি চোখ বন্ধ করল।

অরুণাভ বুঝতে পারলেন, এই মানুষটি শুধু তার পরিবারের কথা জানে না। সে এমন কিছু জানে, যা কোনো সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়।

চালক চলে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা আবার শিশুটিকে পরীক্ষা করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা জানালেন, দ্বিতীয় শিশুটির হৃদস্পন্দন ফিরে এসেছে।

কিন্তু পরদিন হাসপাতালের নথিতে লেখা হল—দুটি শিশুর মধ্যে একটি মৃত অবস্থায় জন্মেছিল।

কেন?

কারণ অরুণাভ বুঝেছিলেন, সত্যিটা নথিভুক্ত হলে চালক আবার ফিরে আসবে।

তিনি একটি শিশুকে নিজের কাছে রাখলেন।

অন্য শিশুটিকে মীরার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “ওকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। ওর নাম বদলে দিও। কেউ যেন জানতে না পারে, ওর জন্মের সময় আরেকটি শিশু ছিল।”

মীরা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “তাহলে আমাদের অন্য মেয়েটার কী হবে?”

অরুণাভ উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি ওকে বাঁচাব।”

কিন্তু তিনি জানতেন না, যে শিশুটিকে তিনি বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা করেছেন, সে ইতিমধ্যেই চালকের তালিকায় লেখা হয়ে গেছে।

দৃশ্যটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

ঈশিতা হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে বসে পড়ল।

“তাহলে আমি আর অনন্যা যমজ?”

সাদা ফ্রকের মেয়েটি তার পাশে এসে বসল।

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু কে বেঁচে ছিল? কে মারা গিয়েছিল?”

মেয়েটি মাথা নীচু করল।

“এই প্রশ্নের উত্তরটাই তোমাকে এত দিন আটকে রেখেছিল।”

“কী বলতে চাইছ?”

“আমাদের দুজনেরই জন্ম হয়েছিল। আমাদের দুজনেরই হৃদস্পন্দন ছিল। কিন্তু ট্রেনের তালিকায় আমাদের মধ্যে একজনের নাম লেখা ছিল মৃতদের তালিকায়।”

“কার নাম?”

মেয়েটি ঈশিতার হাত ধরল।

তার হাত বরফের মতো ঠান্ডা।

“তোমার।”

ঈশিতা হাত সরিয়ে নিল।

“অসম্ভব!”

“তুমি জন্মের পর কয়েক মিনিট বেঁচে ছিলে না, দিদি। চিকিৎসকরা তোমাকে মৃত ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাবা তোমাকে ছাড়েননি।”

“তাহলে আমি এখন কীভাবে বেঁচে আছি?”

“বাবা তোমাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।”

“কীভাবে?”

মেয়েটি উত্তর দিল না।

তার বদলে সে ঈশিতার বুকের ওপর হাত রাখল।

“তোমার হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছ?”

ঈশিতা নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।

হৃদস্পন্দন চলছে।

কিন্তু সেই স্পন্দনের মধ্যে অদ্ভুত একটা ছন্দ—দুটি দ্রুত স্পন্দনের পর দীর্ঘ বিরতি, তারপর আবার দুটি স্পন্দন।

মেয়েটি বলল, “এই ছন্দটা মনে রেখো। শেষ ট্রেনের চাকা এই ছন্দেই ঘোরে।”

ঈশিতা উঠে দাঁড়াল।

“আমি এসব বিশ্বাস করি না। আমি বেঁচে আছি। আমি বড় হয়েছি। পড়াশোনা করেছি। চাকরি করছি। আমি মানুষ!”

“আমি কি বলেছি তুমি মানুষ নও?”

“তাহলে তুমি কী বলতে চাইছ?”

মেয়েটি তার চোখের দিকে তাকাল।

“তুমি বেঁচে আছ, কারণ তোমার জায়গায় অন্য কেউ ট্রেনে উঠেছিল।”

ঈশিতার মনে পড়ল বাবার নোটবইয়ের সেই লাইন—‘যদি আমি নিজে উঠি, হয়তো দুজনকেই বাঁচানো সম্ভব।’

“বাবা?” সে ফিসফিস করে বলল।

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“বাবা আমাদের দুজনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ট্রেন তাঁকে পুরোপুরি নিতে পারেনি। তাই তিনি এখনও ভিতরে আটকে আছেন।”

“তাহলে অনন্যা?”

মেয়েটির মুখে বিষণ্ণ হাসি ফুটল।

“আমি সেই নাম, যাকে পৃথিবী মৃত বলে জানে। আমি সেই স্মৃতি, যাকে তুমি ভুলে গেছ। আর আমি সেই যাত্রী, যে এখনও নিজের গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি।”


২. শেষ ট্রেনের ভিতরে

ঘরের রেললাইনের ওপর আলো জ্বলে উঠল।

দূরে দেখা গেল কালো ধোঁয়া। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল একটি বিশাল কালো ট্রেন।

ট্রেনের গায়ে লেখা—

শেষ যাত্রা।

দরজা খুলে গেল।

ভিতর থেকে দেবাশিস রায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“ঈশিতা! সময় নেই!”

ঈশিতা ঘুরে দেখল, দেবাশিসবাবু ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটা লণ্ঠন।

“আপনি এখানে কী করছেন?”

“তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।”

“কোথায়?”

“তোমার বাবার কাছে।”

ঈশিতা এগিয়ে গেল। কিন্তু সাদা ফ্রকের মেয়েটি তার হাত ধরে ফেলল।

“ওঁর সঙ্গে যেও না।”

“কেন?”

“কারণ উনি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, তোমাকে বাঁচাবেন নাকি নিজের স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনবেন।”

ঈশিতা থমকে গেল।

দেবাশিসবাবু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে অস্বাভাবিক ক্লান্তি।

“ওর কথা শুনো না, ঈশিতা,” তিনি বললেন। “ট্রেনে ওঠো। তোমার বাবা অপেক্ষা করছেন।”

“আমার বাবা কি সত্যিই ভিতরে আছেন?”

“হ্যাঁ।”

“আর আমার জন্মদাত্রী মা?”

দেবাশিসবাবুর চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।

“তুমি তাঁকে খুঁজে পাবে।”

“আপনি কি জানেন, তিনি কোথায়?”

দেবাশিসবাবু চুপ করে রইলেন।

সেই নীরবতাই ঈশিতাকে বুঝিয়ে দিল, কিছু একটা ঠিক নেই।

“আপনি দেবাশিস রায় নন,” সে বলল।

লোকটি হাসল।

“কীভাবে বুঝলে?”

“দেবাশিসবাবু আমাকে কখনো মিথ্যে বলে ট্রেনে তুলতে চাইবেন না।”

“মানুষকে বাঁচানোর জন্য কখনো কখনো মিথ্যে বলতে হয়।”

“আর মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্য?”

লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তার মাথার ওপরের টুপিটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। মুখের চামড়া যেন ধোঁয়ার মতো গলে পড়তে লাগল। চোখের জায়গায় ফুটে উঠল দুটি কালো গর্ত।

চালক।

সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “তোমার বাবা আমাকে ঠকিয়েছে। পনেরো বছর ধরে সে ট্রেনের ভিতরে সময় আটকে রেখেছে। তার জন্য কোনো যাত্রী নিজের গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি।”

“তাহলে তাদের ছেড়ে দাও।”

“তাদের মুক্তি দিতে হলে অসম্পূর্ণ যাত্রা শেষ করতে হবে।”

“কীভাবে?”

“তোমাকে ট্রেনে উঠতে হবে।”

“আর যদি না উঠি?”

চালক মৃদু হাসল।

“তাহলে আজ রাতেই ট্রেন তোমার বাড়ি থেকে আরেকজনকে নিয়ে যাবে।”

ঈশিতা পিছনে তাকাল।

মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে আতঙ্ক।

“না,” ঈশিতা বলল। “আর কাউকে তুমি নিতে পারবে না।”

চালক হাত বাড়াল।

“তাহলে এসো।”

ঈশিতা এক পা এগিয়ে গেল।

অনন্যা তাকে থামাল না। শুধু বলল, “দিদি, ট্রেনে ওঠার আগে নিজের নামটা মনে রেখো।”

ঈশিতা তার দিকে তাকাল।

“আমার নাম ঈশিতা মুখার্জি।”

অনন্যা মাথা নাড়ল।

“এটাই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু ট্রেনের ভিতরে তোমার নাম কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবে না।”

ঈশিতা ট্রেনে উঠল।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।


ট্রেনের ভিতরে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

কোনো আসনে কেউ বসে নেই। অথচ জানলার বাইরে ছুটে চলেছে অসংখ্য মুখ—বৃদ্ধ, শিশু, তরুণ, নারী। প্রত্যেকের মুখে একই অভিব্যক্তি: তারা যেন কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলতে পারছে না।

ঈশিতা প্রথম কামরায় একটা পুরোনো ঘড়ি দেখতে পেল।

ঘড়ির কাঁটা ১টা ১৭ মিনিটে থেমে আছে।

দ্বিতীয় কামরায় কয়েকজন যাত্রী বসে। তাঁদের চোখ খোলা, কিন্তু চোখের মণি নেই।

তৃতীয় কামরায় একটা ছোট ছেলে জানলার ধারে বসে কাঁদছে।

“তুমি কি জানো, আমরা কোথায় যাচ্ছি?” ঈশিতা জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটি বলল, “শ্মশানঘাটে।”

“সেখানে গেলে কী হয়?”

“যারা নিজেদের নাম ভুলে যায়, তারা আর ফিরতে পারে না।”

“আর যারা নাম মনে রাখে?”

ছেলেটি মাথা তুলল।

“তারা অন্য কারও নাম মনে করতে পারে।”

ঈশিতা বুঝতে পারল না।

সে পরের কামরায় এগিয়ে গেল।

সেখানে একটি বৃদ্ধা বসে আছেন। কোলে একটা পুতুল। পুতুলটির মুখ ঈশিতার ছোটবেলার ছবির মতো।

বৃদ্ধা বললেন, “তোমার বাবা শেষ কামরায়।”

“শেষ কামরায় কী আছে?”

“যে সত্যিটা তুমি খুঁজছ।”

ঈশিতা হাঁটতে শুরু করল।

প্রতিটি কামরা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল।

স্কুলের প্রথম দিন।

মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া।

বাবার কাঁধে চড়ে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ দেখা।

আর একটা রাত—যে রাতে সে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির নীচের ঘরে এসেছিল।

তার মনে পড়ল, দরজার ওপাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

মেয়েটি তারই মতো দেখতে।

সে বলেছিল, “আমার সঙ্গে খেলবে?”

ঈশিতা দরজা খুলেছিল।

তারপর দুজন হাত ধরে রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল।

কিন্তু মাঝপথে একটা ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছিল।

ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অরুণাভ।

তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, “ঈশিতা, ফিরে আয়!”

দুই মেয়ের মধ্যে একজন বাবার দিকে দৌড়েছিল।

অন্যজন দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

তারপর আলো নিভে গিয়েছিল।

ঈশিতা থেমে গেল।

“আমি তো ফিরে এসেছিলাম,” সে নিজের মনে বলল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে অনন্যার কণ্ঠস্বর এল।

“না, দিদি। তুমি ফিরে আসোনি।”

ঈশিতা ঘুরে দাঁড়াল।

অনন্যা তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।

“তাহলে কে ফিরেছিল?”

অনন্যা ধীরে ধীরে বলল, “তোমার স্মৃতি।”


৩. বাবার শেষ স্বীকারোক্তি

শেষ কামরার দরজা খুলতেই ঈশিতা দেখল, একটি ছোট্ট ঘর। ঘরের মাঝখানে কাঠের চেয়ার। সেখানে বসে আছেন অরুণাভ মুখার্জি।

পনেরো বছর আগের মতোই তাঁর মুখ। চুলে পাক ধরেনি। চোখে সেই একই গভীরতা।

ঈশিতা দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

“বাবা!”

অরুণাভ প্রথমে নড়লেন না। তারপর ধীরে ধীরে মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।

“তুই এসেছিস, ঈশিতা।”

ঈশিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুমি এত দিন কোথায় ছিলে? কেন ফিরে আসোনি?”

“আমি ফিরতে পারিনি।”

“কেন?”

“কারণ আমি ট্রেনের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিলাম।”

ঈশিতা বাবার মুখের দিকে তাকাল।

“কী চুক্তি?”

অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাকে একজন যাত্রী হতে হয়েছিল। কিন্তু চালক আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। সে তোমাদের মধ্যে একজনকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, আর অন্যজনকে ট্রেনের ভিতরে আটকে রেখেছিল।”

“কাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল?”

অরুণাভ চোখ নামিয়ে নিলেন।

“তুই যখন বাড়ি ফিরেছিলি, তখন তোর শরীর ফিরে এসেছিল। কিন্তু তোর স্মৃতির একটা অংশ ট্রেনে রয়ে গিয়েছিল।”

“তাহলে আমি কে?”

“তুই আমার মেয়ে।”

“আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি?”

অরুণাভ তার হাত দুটো ধরে বললেন, “তুই শ্বাস নিচ্ছিস, তোর হৃদস্পন্দন চলছে, তুই ভালোবাসতে পারিস, কাঁদতে পারিস, অন্য মানুষের দুঃখ বুঝতে পারিস। এগুলোই তোর জীবনের প্রমাণ। কিন্তু তোর জন্মের সময় যে অসম্পূর্ণতা তৈরি হয়েছিল, সেটা এখনও শেষ হয়নি।”

“আর অনন্যা?”

“অনন্যা আমার আরেক মেয়ে। সে ট্রেনের ভিতরে আটকে আছে।”

ঈশিতা চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তাহলে আমাদের দুজনকে বাঁচানোর উপায় কী?”

অরুণাভ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “চালক চায়, তুই নিজের নাম ছেড়ে দিস। তুই যদি নিজের নাম ভুলে যাস, সে তোর শরীর নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে। আর অনন্যা চিরদিনের জন্য ট্রেনে আটকে থাকবে।”

“আর যদি আমি নাম না ভুলি?”

“তাহলে ট্রেনের নিয়ম ভাঙবে। কিন্তু তার মূল্য দিতে হবে।”

“কী মূল্য?”

অরুণাভ উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে চালকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“মূল্য দিতে হবে আমাকে।”

আলো ফিরে আসতেই দেখা গেল, চালক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

“অরুণাভ মুখার্জি,” সে বলল, “তুমি পনেরো বছর ধরে আমার ট্রেন আটকে রেখেছ। যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছতে দাওনি। এখন সময় এসেছে তোমার নিজের যাত্রা শেষ করার।”

অরুণাভ উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি প্রস্তুত।”

ঈশিতা চিৎকার করে উঠল, “না! তুমি আর কাউকে নিজের জীবন দিতে পারবে না!”

চালক তার দিকে তাকাল।

“তাহলে তুমি দেবে?”

ঈশিতা বাবার হাত শক্ত করে ধরল।

“না।”

“তাহলে তোমার বোনকে বেছে নাও।”

অনন্যা কামরার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

চালক বলল, “একজনকে পৃথিবীতে থাকতে হবে। অন্যজনকে শেষ যাত্রা সম্পূর্ণ করতে হবে। এটাই নিয়ম।”

ঈশিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“তোমার নিয়ম কে তৈরি করেছে?”

চালক থমকে গেল।

“কী বললে?”

“এই ট্রেনের নিয়ম কে তৈরি করেছে? মানুষ? ঈশ্বর? নাকি তুমি নিজে?”

চালকের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।

ঈশিতা বলল, “যদি এটা একটা যাত্রা হয়, তাহলে যাত্রীর গন্তব্য সে নিজেই বেছে নেবে। তুমি কাউকে জোর করে নিয়ে যেতে পারো না।”

চালক হেসে উঠল।

“তুমি ভাবছ, একটা প্রশ্ন করে আমাকে হারিয়ে দেবে?”

“না। আমি শুধু জানতে চাই, তুমি এত মৃত মানুষকে নিয়ে কোথায় যাও?”

চালক আর হাসল না।

কিছুক্ষণ পর সে বলল, “আমি কাউকে কোথাও নিয়ে যাই না। আমি শুধু তাদের শেষ স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দিই।”

“তাহলে তাদের মুক্তি দাও।”

“তাদের স্মৃতি অসম্পূর্ণ।”

“কেন?”

চালক অরুণাভর দিকে তাকাল।

“কারণ তোমার বাবা ট্রেন থামিয়ে রেখেছে। তাদের শেষ মুহূর্ত শেষ হয়নি। যতক্ষণ ট্রেন থেমে থাকবে, তারা নিজেদের শেষ স্মৃতি থেকে বেরোতে পারবে না।”

ঈশিতা বাবার দিকে তাকাল।

অরুণাভ চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, ট্রেন থামিয়ে রাখলে তোমাদের বাঁচাতে পারব,” তিনি বললেন। “কিন্তু বুঝিনি, অন্য যাত্রীদেরও আমি আটকে রাখছি।”

ঈশিতা ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এই ট্রেনের রহস্য শুধু তার পরিবারকে ঘিরে নয়। পনেরো বছর ধরে শত শত মানুষের অসমাপ্ত স্মৃতি এই ট্রেনের ভিতরে আটকে আছে।

চালক হাত বাড়িয়ে বলল, “এখন সিদ্ধান্ত নাও।”

ঈশিতা চোখ বন্ধ করল।

তার মনে পড়ল মায়ের কথা। বাবার নোটবই। অনন্যার নূপুর। হাসপাতালের সেই ঘর। আর নিজের শৈশবের সেই রাত, যে রাতের স্মৃতি সে এত দিন ভুলে ছিল।

সে চোখ খুলল।

“আমি আমার নাম ছাড়ব না।”

চালকের মুখে প্রথমবারের মতো ভয়ের ছায়া দেখা গেল।

ঈশিতা বলল, “আমার নাম ঈশিতা মুখার্জি। আমি বেঁচে আছি। আমার বোন অনন্যা। সেও আমার পরিবারের অংশ। আমরা দুজনের কেউই তোমার সম্পত্তি নই।”

অনন্যা তার হাত ধরল।

দুজনের হাত মিলতেই তাদের রুপোর নূপুর দুটো একসঙ্গে বেজে উঠল।

ঝনঝন।

ঝনঝন।

ট্রেনের চাকা থেমে গেল।

ঘড়ির কাঁটা ১টা ১৭ মিনিট থেকে পিছিয়ে যেতে লাগল।

১টা ১৬।

১টা ১৫।

১টা ১৪।

চালক পিছিয়ে গেল।

“এটা অসম্ভব!”

অরুণাভ চিৎকার করে বললেন, “ঈশিতা, থামিস না! তোদের নাম মনে রাখ!”

ঈশিতা আর অনন্যা একসঙ্গে বলল—

“আমরা ঈশিতা ও অনন্যা মুখার্জি।”

ট্রেনের জানলাগুলো একে একে খুলে গেল।

প্রতিটি জানলার বাইরে আটকে থাকা যাত্রীরা যেন গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠল। কেউ নিজের মায়ের নাম বলল, কেউ সন্তানের নাম, কেউ হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর নাম। তাদের কণ্ঠস্বর একসঙ্গে মিশে একটা বিশাল ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

চালক চিৎকার করে উঠল।

তার কালো ইউনিফর্ম ছিঁড়ে যেতে লাগল। মুখের অন্ধকারের ভিতর থেকে ফুটে উঠল এক বৃদ্ধ মানুষের মুখ।

একজন সাধারণ রেলকর্মীর মুখ।

ঈশিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

“তুমি কে?”

বৃদ্ধ লোকটি কাঁপা গলায় বলল, “আমার নাম হরিপদ দাস। আমি একসময় এই রেললাইনের কর্মচারী ছিলাম।”

“তাহলে তুমি এই ট্রেন চালাও কেন?”

লোকটির চোখে জল এসে গেল।

“কারণ আমি একদিন একটা শিশুকে বাঁচাতে পারিনি।”

সে বলতে শুরু করল।

পঞ্চাশ বছর আগে এক ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা গিয়েছিল। হরিপদ ছিলেন সেই রাতের ডিউটিতে। ভুল সংকেতের কারণে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ভুল লাইনে চলে গিয়েছিল। দুর্ঘটনার আগে তিনি বিপদের সংকেত দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময়মতো পারেননি।

সেই দুর্ঘটনায় তাঁর নিজের ছোট্ট মেয়েও মারা যায়।

হরিপদ সেই অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেননি। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি, অনুশোচনা আর অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল শেষ ট্রেনের রহস্য।

তিনি মৃতদের শেষ স্মৃতির মধ্যে আটকে রাখতেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, কেউ নিজের শেষ মুহূর্ত থেকে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য নয়, যতক্ষণ না সে নিজের ভুলের মুখোমুখি হচ্ছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেই ভুলে গিয়েছিলেন, তাঁর মেয়ের নাম কী ছিল।

“আমি শুধু মনে রেখেছিলাম, তাকে বাঁচাতে পারিনি,” হরিপদ বললেন। “তাই অন্য কাউকে যেতে দিইনি।”

ঈশিতা শান্ত গলায় বলল, “আপনার মেয়ের মৃত্যু আপনার ভুলের শাস্তি ছিল না। কিন্তু অন্য মানুষকে আটকে রাখা তার সমাধানও নয়।”

হরিপদ চোখ বন্ধ করলেন।

অনেক বছর পর তাঁর মুখে প্রথমবারের মতো শান্তি ফুটে উঠল।

“আমার মেয়ের নাম ছিল কমলা,” তিনি ফিসফিস করে বললেন।

নামটা উচ্চারণ করতেই ট্রেনের সমস্ত দরজা খুলে গেল।

জানলার বাইরে ভোরের আলো দেখা গেল।


৪. শেষ যাত্রার শেষ স্টেশন

ট্রেন থেমে গেল।

কিন্তু এবার কোনো শ্মশানঘাট নেই। কোনো কালো কুয়াশা নেই। কোনো মৃত মানুষের কান্না নেই।

সামনে দেখা যাচ্ছে একটা ছোট্ট স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে সাদা আলো। দূরে গাছের সারি। আকাশে ভোরের প্রথম রং।

অরুণাভ ঈশিতার দিকে তাকালেন।

“আমাদের নাম মনে রাখার জন্য তুই আজ সবাইকে মুক্তি দিয়েছিস।”

ঈশিতা বাবার হাত ধরল।

“তুমি এবার বাড়ি ফিরবে?”

অরুণাভ মৃদু হাসলেন।

“আমি ফিরতে পারব না, মা। আমার যাত্রা শেষ।”

“না! আমি তোমাকে আবার হারাতে চাই না!”

“আমাকে হারাবি না। তোর স্মৃতিতে আমি থাকব।”

ঈশিতা কাঁদতে লাগল।

অরুণাভ তার কপালে চুমু খেলেন।

“আর একটা কথা মনে রাখিস—যে মানুষ সত্যকে ভয় পায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই হারিয়ে যায়। তুই সত্যকে ভয় পাসনি। এটাই তোর শক্তি।”

তারপর তিনি অনন্যার দিকে তাকালেন।

“তুইও এবার বাড়ি ফিরতে পারিস।”

অনন্যা ঈশিতার হাত ছেড়ে বাবার কাছে এগিয়ে গেল।

“বাবা, আমি কি সত্যিই বেঁচে ছিলাম?”

অরুণাভ তার মাথায় হাত রাখলেন।

“তুই আমার মেয়ে। তোর জীবনের মূল্য কোনো নথি, কোনো তালিকা বা কোনো ট্রেন ঠিক করতে পারে না।”

অনন্যা চোখ বন্ধ করল।

তার শরীরের চারপাশে সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ল। সাদা ফ্রকটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। রুপোর নূপুর দুটি মেঝেতে পড়ে রইল।

ঈশিতা ঝুঁকে নূপুর দুটি তুলে নিল।

তারপর সে বাবার দিকে তাকাল।

কিন্তু অরুণাভ আর সেখানে নেই।

শুধু একটা পুরোনো টিকিট পড়ে রয়েছে।

টিকিটে লেখা—

যাত্রা সম্পূর্ণ।

যাত্রী: অরুণাভ মুখার্জি।

গন্তব্য: মুক্তি।

ঈশিতা টিকিটটা বুকে চেপে ধরল।

ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

সে বাইরে পা রাখতেই চারদিক আলোয় ভরে উঠল।


৫. যে মেয়েটি বাড়ি ফিরেছিল

ঈশিতার জ্ঞান ফিরল শিয়ালদহ স্টেশনের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে।

সকাল হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের ভিড়। চায়ের দোকানে কেটলি ফুটছে। ঘোষণায় পরের ট্রেনের সময় জানানো হচ্ছে।

তার পাশে বসে আছেন দেবাশিস রায়।

“তুমি ঠিক আছ?” তিনি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

ঈশিতা উঠে বসল।

“ট্রেনটা কোথায়?”

দেবাশিসবাবু চারপাশে তাকালেন।

“কোনো ট্রেন আসেনি। তুমি রাত একটা নাগাদ প্ল্যাটফর্মে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে। তারপর থেকে এখানেই আছ।”

ঈশিতা নিজের হাতের দিকে তাকাল।

তার মুঠোর মধ্যে রুপোর দুটি নূপুর।

একটিতে ‘ঈ’, অন্যটিতে ‘অ’ খোদাই করা।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“সব শেষ হয়েছে,” সে বলল।

দেবাশিসবাবু তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“তুমি কি তোমার বাবাকে দেখেছ?”

ঈশিতা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“তিনি কি ফিরবেন?”

ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তিনি মুক্তি পেয়েছেন।”

দেবাশিসবাবু চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুখে স্বস্তি আর বিষাদের মিশ্র ছায়া।

“তাহলে এত বছরের অপেক্ষা শেষ।”

ঈশিতা স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল।

বাড়িতে ফিরে দেখল, মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাশে।

ঈশিতাকে দেখে তিনি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন।

“তুই ফিরে এসেছিস!”

ঈশিতা তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“হ্যাঁ, মা।”

মহিলা কেঁদে ফেললেন।

“তুই আমাকে ক্ষমা করবি?”

ঈশিতা কিছুক্ষণ তাঁর কাঁধে মাথা রেখে রইল।

তারপর বলল, “তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি। কিন্তু তুমি আমাকে ভালোবেসেছ। আমি সেটা অস্বীকার করতে পারি না।”

মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম, তোকে হারাব।”

“তুমি আমাকে হারাওনি। কিন্তু আর কোনোদিন আমার কাছ থেকে সত্যিটা লুকিয়ো না।”

মহিলা মাথা নাড়লেন।

সেদিন প্রথমবার ঈশিতা তাঁকে নতুন করে মা বলে ডাকল।

তারপর দুজনে মিলে পুরোনো ঘরটা খুলল। রেললাইন আর নেই। কালো ধোঁয়া নেই। দেওয়ালের মাঝখানে একটা ছোট্ট জানলা দেখা যাচ্ছে, যেটা আগে কখনো ছিল না।

জানলার পাশে একটা কাঠের বাক্স।

বাক্স খুলে ঈশিতা পেল একটি পুরোনো চিঠি।

চিঠিটা অরুণাভর লেখা।

‘আমার দুই মেয়ে,

যদি তোমরা কোনো দিন এই চিঠি পড়তে পারো, তবে বুঝব তোমরা নিজেদের নাম ফিরে পেয়েছ।

আমি জানি না, তোমাদের মধ্যে কে পৃথিবীতে থাকবে, আর কে আমার সঙ্গে শেষ যাত্রায় যাবে। কিন্তু আমি চাই, তোমরা দুজনেই জানো—তোমাদের কেউই ভুল করে জন্মায়নি। তোমাদের কারও অস্তিত্ব কোনো অভিশাপ নয়।

মানুষের জীবন কখনো কখনো এমন রহস্যে জড়িয়ে যায়, যার উত্তর বিজ্ঞান দিতে পারে না, আইন দিতে পারে না, এমনকি বিশ্বাসও দিতে পারে না। কিন্তু ভালোবাসা কখনো কাউকে নিজের সম্পত্তি মনে করে না। ভালোবাসা মুক্তি দেয়।

যদি আমি ফিরে না আসি, তবে আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না।

বেঁচে থেকো।

নিজেদের নাম মনে রেখো।

— বাবা।’

ঈশিতা চিঠিটা ভাঁজ করে বুকে রাখল।

তারপর জানলার বাইরে তাকাল।

আকাশ পরিষ্কার। সকালের রোদে কলকাতা ঝলমল করছে।

দূরে একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ঈশিতা চমকে উঠল।

কিন্তু এবার সে ভয় পেল না।

কারণ সে জানে, সব ট্রেন কাউকে নিয়ে যেতে আসে না। কোনো কোনো ট্রেন মানুষকে তার অতীত থেকে মুক্ত করতেও আসে।


৬. পনেরো বছর পর

পনেরো বছর কেটে গেল।

ঈশিতা এখন একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক। শেষ ট্রেনের ঘটনাটা নিয়ে সে কখনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। কারণ তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, যা দিয়ে ঘটনাটাকে পৃথিবীর সামনে সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করা যায়।

শুধু তার কাছে রয়ে গেছে বাবার চিঠি আর রুপোর দুটি নূপুর।

প্রতি বছর ১৮ অক্টোবর সে বাড়িতে একটি প্রদীপ জ্বালায়।

মা পাশে বসে থাকেন।

তাঁরা আর কখনো অনন্যার মৃত্যুর কথা বলেন না। তাঁরা জানেন, অনন্যা নামটি শুধু হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুর নাম নয়—এটি এমন এক স্মৃতি, যাকে পৃথিবী মৃত ঘোষণা করেছিল, অথচ ভালোবাসা তাকে মুক্তি দিয়েছিল।

২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর, রাত ১টা ১৭ মিনিটে, ঈশিতা তার ঘরে বসে বাবার চিঠিটা পড়ছিল।

হঠাৎ তার মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এল।

প্রেরকের নাম নেই।

বার্তায় লেখা—

দিদি, তুমি কি আমাকে মনে রেখেছ?

ঈশিতার বুক ধক করে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে জানলার কাছে গেল।

রাস্তার ওপারে, স্ট্রিটলাইটের নীচে একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা ফ্রক। পায়ে রুপোর নূপুর।

ঈশিতা জানলা খুলে দিল।

“অনন্যা?”

মেয়েটি মাথা তুলল।

তার মুখে সেই পুরোনো হাসি।

“আমি তো কোথাও যাইনি, দিদি।”

ঈশিতার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি কি ফিরে এসেছ?”

মেয়েটি বলল, “আমি ফিরিনি। আমি শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দিতে এসেছি—কোনো যাত্রা সত্যিই শেষ হয় না, যতক্ষণ কেউ তার গল্প মনে রাখে।”

তারপর সে ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

ঈশিতা অনেকক্ষণ জানলার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাতে ধরা নূপুর দুটো একবার মৃদু শব্দ করে উঠল।

ঝনঝন।

তারপর সব শান্ত।

দেওয়ালের ঘড়িতে তখন রাত ১টা ১৮ মিনিট।

এই প্রথম, পনেরো বছরের মধ্যে, ১৮ অক্টোবরের রাত ১টা ১৭ মিনিট পেরিয়ে গেছে—কোনো ট্রেনের হুইসেল ছাড়াই।

ঈশিতা চোখ বন্ধ করে বাবার কথা মনে করল।

তারপর প্রদীপের সামনে বসে ফিসফিস করে বলল—

“আমি তোমাদের ভুলিনি।”

দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল।

শ্মশানের শেষ ট্রেন আর কখনো আসেনি।

অন্তত ঈশিতা আর তাকে দেখেনি।

কিন্তু শিয়ালদহ স্টেশনের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মের পুরোনো রেজিস্টারে, যেখানে বহু বছর ধরে কোনো অজানা ট্রেনের নাম লেখা ছিল না, সেখানে আজও একটি লাইন দেখা যায়—

১৮ অক্টোবর, রাত ১টা ১৭ মিনিট।

শেষ যাত্রা: সম্পূর্ণ।

যাত্রী: মুক্ত।

চালক: অনুপস্থিত।

আর তার নীচে, একেবারে ছোট অক্ষরে, কে যেন লিখে রেখেছে—

যে নিজের নাম মনে রাখে, তাকে অন্ধকারও চিরকাল আটকে রাখতে পারে না।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *