Categories
অনুগল্প বিবিধ

ভুল সুরের জয়।

কলকাতার একটি সংগীত বিদ্যালয়ে প্রতি বছর শীতকালে তরুণ বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। সেখানে তবলা, সেতার, সরোদ, বেহালা ও নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রে নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পেত শিক্ষার্থীরা।

সেই বিদ্যালয়ে পড়ত আঠারো বছরের সৌম্য। সে সেতার বাজাত। ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছা ছিল, একদিন বড় মঞ্চে নিজের সুরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করবে। তার গুরু শশাঙ্কবাবু ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ শিল্পী। তিনি প্রায়ই বলতেন, “সুরের সৌন্দর্য শুধু আঙুলের দক্ষতায় নয়, মন দিয়ে শোনার ক্ষমতাতেও লুকিয়ে থাকে।”

সৌম্য কথাটি শুনত, কিন্তু তার কাছে নিখুঁতভাবে বাজানোই ছিল সবচেয়ে বড় কথা। প্রতিটি সুর ঠিক জায়গায় পড়তে হবে, প্রতিটি তান দ্রুত ও পরিষ্কার হতে হবে—এটাই ছিল তার সাধনা।

প্রতিযোগিতার আগে একদিন গুরু তাকে একটি নতুন রাগের অনুশীলন করতে দিলেন। সৌম্য মন দিয়ে বাজাতে শুরু করল। কিন্তু মাঝখানে একটি সুর প্রত্যাশিত জায়গায় না পড়ে অন্যভাবে বেজে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।

“গুরুজি, ভুল হয়ে গেল।”

শশাঙ্কবাবু বললেন, “আবার বাজাও।”

সৌম্য আবার শুরু করল। একই জায়গায় এসে সে সতর্ক হয়ে গেল এবং সুরটি ঠিকঠাক বাজাল।

গুরু মাথা নাড়লেন। “তুমি এবার ভুল করোনি। কিন্তু প্রথমবার যে সুরটি বেরিয়েছিল, সেটি মন দিয়ে শুনেছিলে?”

“ভুল সুর আবার শুনব কেন?” সৌম্য অবাক হয়ে বলল।

শশাঙ্কবাবু উত্তর দিলেন, “কখনও কখনও ভুলের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা থাকে। তবে সম্ভাবনা আর ভুলকে জোর করে সঠিক প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। আগে শুনতে শেখো।”

কথাটি সৌম্যের ভালো লাগল না। সে মনে মনে ভাবল, গুরুজি হয়তো তাকে নতুন কিছু শেখানোর জন্য এমন কথা বলছেন।

প্রতিযোগিতার দিন এগিয়ে এল। সৌম্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করল। তার আঙুলের গতি বাড়ল, সুরের ওপর নিয়ন্ত্রণও ভালো হলো। তবু সেই অপ্রত্যাশিত সুরের কথা মাঝে মাঝে তার মনে পড়ত।

একদিন অনুশীলনের সময় সে আবার একই রাগ বাজাচ্ছিল। সেই জায়গায় এসে তার আঙুল সামান্য পিছলে গেল। এবার সে থামল না। সুরটি কোথায় গিয়ে মিশছে, পরের সুরের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী—সেগুলো মন দিয়ে শুনল।

তার মনে হলো, সুরটি পুরোপুরি বেমানান নয়। রাগটির মূল চলনের সঙ্গে এটি সরাসরি মেলে না ঠিকই, কিন্তু অন্যভাবে সাজালে একটি নতুন সুরের বাক্য তৈরি হতে পারে।

সে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি বিন্যাস চেষ্টা করল। কিছুই ঠিক জমল না। কোথাও সুরের ভারসাম্য নষ্ট হলো, কোথাও আবার মূল রাগের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেল। তবু সে হাল ছাড়ল না। প্রতিটি প্রচেষ্টা শুনে বুঝতে চেষ্টা করল, কোন বিন্যাসে সুরের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকছে।

পরদিন সে গুরুকে নিজের নতুন বিন্যাসটি শোনাল।

শশাঙ্কবাবু মন দিয়ে শুনলেন। শেষে বললেন, “এটি আর নিছক ভুল নয়। তুমি একটি অপ্রত্যাশিত সুরকে পরীক্ষা করে নতুন বিন্যাস তৈরি করেছ। তবে মনে রেখো, যে কোনও সুরকে যে কোনও জায়গায় বসিয়ে দিলেই তা সুন্দর হয় না। সংগীতের নিজস্ব ব্যাকরণ আছে।”

সৌম্য জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কি প্রতিযোগিতায় এটি বাজাতে পারি?”

গুরু বললেন, “প্রথমে নিশ্চিত হও, তুমি যা তৈরি করেছ তা সংগীতের দিক থেকে সঙ্গতিপূর্ণ কি না। তারপর সিদ্ধান্ত নেবে। শুধু নতুন বলেই কোনও কিছু ভালো হয় না, আবার প্রচলিত নয় বলেই তা খারাপও হয় না।”

সৌম্য নতুন বিন্যাসটি নিয়ে আরও কাজ করল। প্রয়োজনে অন্য শিক্ষকদের মতামতও নিল। অবশেষে সে বুঝল, এটি মূল রাগের প্রচলিত পরিবেশনার অংশ হিসেবে বাজানো ঠিক হবে না। তবে প্রতিযোগিতার নিয়মে অনুমোদিত একটি স্বতন্ত্র সৃজনশীল পরিবেশনায় সে নিজের নতুন সুরের ভাবনাটি ব্যবহার করতে পারে।

প্রতিযোগিতার দিন মঞ্চে উঠে সৌম্য প্রথমে নির্ধারিত রাগটি যথাযথভাবে পরিবেশন করল। তারপর অনুমোদিত সৃজনশীল অংশে সে নতুন সুরের বাক্যটি বাজাল। তার পরিবেশনায় প্রচলিত সংগীতশৈলীর প্রতি সম্মান ছিল, পাশাপাশি ছিল নিজের অনুসন্ধানের ছাপ।

বিচারকেরা তার পরিবেশনা মন দিয়ে শুনলেন। একজন বিচারক বললেন, “তোমার সবচেয়ে বড় গুণ শুধু দ্রুত বাজানো নয়। তুমি একটি অপ্রত্যাশিত সুরকে গুরুত্ব দিয়ে শুনেছ, তারপর সেটিকে যাচাই করে নিজের ভাবনায় রূপ দিয়েছ।”

সৌম্য প্রথম পুরস্কার পেল না। সে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করল। প্রথমে একটু খারাপ লাগলেও পরে বুঝল, তার শেখার পথ এখনও অনেক দীর্ঘ।

অনুষ্ঠান শেষে সে গুরুর কাছে গিয়ে বলল, “আপনি সেদিন ঠিকই বলেছিলেন। আমি এত দিন শুধু ভুল এড়াতে চাইতাম, ভুলের কারণ বুঝতে চাইতাম না।”

শশাঙ্কবাবু হেসে বললেন, “ভুলকে ভালোবাসতে হবে, এমন নয়। ভুল থেকে কী শেখা যায়, সেটি জানতে হবে। কখনও ভুল সংশোধন করতে হয়, কখনও তার কারণ বুঝে নতুন পথ তৈরি করতে হয়।”

সৌম্য বাড়ি ফিরে নিজের অনুশীলনের খাতায় একটি নতুন শিরোনাম লিখল—‘যে সুরগুলো আমাকে নতুন করে শুনতে শিখিয়েছে।’

তারপর থেকে অনুশীলনের সময় কোনও সুর প্রত্যাশামতো না বাজলে সে আর সঙ্গে সঙ্গে রেগে যেত না। প্রথমে থামত, শুনত, কারণ খুঁজত। প্রয়োজন হলে সংশোধন করত, আর কোনও নতুন সম্ভাবনা দেখা দিলে সেটিকে নিয়ম মেনে পরীক্ষা করত।

কয়েক বছর পরে সৌম্য নিজেই সংগীত শেখাতে শুরু করল। তার এক শিক্ষার্থী একদিন ভুল সুর বাজিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছিল।

সৌম্য তাকে থামিয়ে বলল, “ভয় পেয়ো না। এবার বলো তো, তুমি কী শুনতে পেলে?”

ছাত্রটি অবাক হয়ে আবার সুরটি বাজাল। সৌম্য তার পাশে বসে মন দিয়ে শুনল।

সেদিন সে বুঝল, সংগীতের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা কোনও একটি নিখুঁত পরিবেশনায় শেষ হয় না। শিক্ষা চলতে থাকে প্রতিটি শোনা সুরে, প্রতিটি সংশোধনে এবং প্রতিটি নতুন প্রশ্নে।

শিক্ষা: ভুলকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া বা তৎক্ষণাৎ বাতিল করা—কোনোটিই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মন দিয়ে ভুলের কারণ বুঝে, প্রমাণ ও নিয়মের ভিত্তিতে তা সংশোধন করতে পারলে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে যায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *