Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে শহরে কেউ দাম জিজ্ঞাসা করত না।

শহরের এক ব্যস্ত মোড়ে প্রতি বছর শীতের শুরুতে একটি অদ্ভুত বাজার বসত। সেখানে পুরোনো আসবাব, হাতঘড়ি, বই কিংবা পোশাক বিক্রি হতো না। বিক্রি হতো মানুষের দক্ষতা।

কেউ এক ঘণ্টা ধরে অন্যকে রান্না শেখাতেন, কেউ সাইকেল মেরামত করতেন, কেউ আবার ছোটদের গণিত বোঝাতেন। বিনিময়ে তাঁরা টাকা নিতেন না। তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য কেউ নিজের দক্ষতা দিয়ে সাহায্য করতেন।

এই বাজারের নাম ছিল ‘দক্ষতা বিনিময় মেলা’। উদ্যোগটি শুরু করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক নির্মলবাবু। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে অর্থ কম থাকলেও অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব নেই।

মেলায় প্রথমবার এসেছিল চব্বিশ বছরের ইরা। সে একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করত। ছবি আঁকতে ভালোবাসলেও নিজের আঁকা ছবি কখনও কাউকে দেখানোর সাহস পায়নি। তার মনে হতো, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পীদের মতো সে আঁকতে পারে না।

মেলার প্রবেশপথে একটি বোর্ডে লেখা ছিল—

‘এখানে আপনার কাজের দাম ঠিক হবে না আপনার পোশাক দেখে, পরিচয় দেখে কিংবা আপনার কাছে কত টাকা আছে তা দেখে। আগে জানুন, আপনি কী দিতে পারেন এবং কী শিখতে চান।’

ইরা বোর্ডটি পড়ে ভেতরে ঢুকল।

এক কোণে বসে ছিলেন বৃদ্ধা মৃণালিনী দেবী। তাঁর সামনে কয়েকটি কাপড়, সুতো আর নকশার কাগজ রাখা। তিনি বহু বছর ধরে পোশাকে সূচিশিল্প করতেন। এখন চোখে কম দেখেন বলে আগের মতো সূক্ষ্ম কাজ করতে পারেন না। তবে নতুনদের নকশা নির্বাচন ও রঙের সমন্বয় শেখাতে পারতেন।

ইরা তাঁর কাছে গিয়ে বলল, “আমি ছবি আঁকি। আপনার নকশাগুলো দেখে শিখতে চাই।”

মৃণালিনী দেবী হাসলেন। “আমি তোমাকে নকশা দেখাব। তার বদলে তুমি কি আমার নাতনিকে একটু ছবি আঁকা শেখাবে? সে আঁকতে ভালোবাসে, কিন্তু কাগজে প্রথম দাগ টানতেই ভয় পায়।”

ইরা রাজি হয়ে গেল।

পরের সপ্তাহে সে মৃণালিনী দেবীর বাড়িতে গেল। সেখানে বারো বছরের তুলি একটি খাতা নিয়ে বসেছিল। খাতার প্রতিটি পাতায় হালকা পেন্সিলের দাগ, কিন্তু কোনও ছবি সম্পূর্ণ করা হয়নি।

ইরা জিজ্ঞাসা করল, “ছবিগুলো শেষ করো না কেন?”

তুলি বলল, “ভুল হলে ছবিটা নষ্ট হয়ে যাবে।”

ইরা নিজের খাতা খুলে তাকে কয়েকটি অসম্পূর্ণ ছবি দেখাল। কোথাও রেখা বেঁকে গেছে, কোথাও রঙের দাগ কাগজের বাইরে চলে গেছে।

“দেখো, আমার ছবিতেও ভুল আছে। কিন্তু একটা রেখা ভুল দিকে চলে গেলে সেখান থেকেই অন্য কিছু আঁকা যায়। সব ভুল ঠিক করতে হয় না, আবার সব ভুল রেখে দিলেই ছবিটা ভালো হয় না। দেখতে হবে, কোনটা বদলালে ছবিটা আরও সুন্দর হবে।”

তুলি ধীরে ধীরে আঁকতে শুরু করল।

এদিকে মেলায় ফিরে ইরা মৃণালিনী দেবীর কাছ থেকে রঙের ব্যবহার ও নকশার ভারসাম্য সম্পর্কে শিখতে লাগল। সে বুঝতে পারল, কাপড়ে সূচিশিল্পের নকশা তৈরির ক্ষেত্রেও আলো-ছায়া, রেখার প্রবাহ এবং ফাঁকা জায়গার গুরুত্ব রয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ পরে মৃণালিনী দেবী তাকে একটি পুরোনো নকশার খাতা দেখালেন। খাতাটির অনেক পাতায় লেখা ছিল, কোন রঙের সঙ্গে কোন রং ভালো মানায়, কোন ধরনের নকশায় কতটা ফাঁকা জায়গা রাখা দরকার।

ইরা বিস্মিত হয়ে বলল, “এ তো রঙের একটা সম্পূর্ণ পাঠশালা!”

মৃণালিনী দেবী মৃদু হেসে বললেন, “জীবনভর কাজ করতে করতে অনেক কিছু শিখেছি। কিন্তু সবকিছু লিখে রাখিনি। এখন যতটুকু পারি, অন্যদের শিখিয়ে যেতে চাই।”

ইরা প্রস্তাব দিল, মেলার অন্য সদস্যদের সাহায্যে নকশাগুলোর ছবি ও বিবরণ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে মৃণালিনী দেবীর অনুমতি ছাড়া কোনও নকশা প্রকাশ করা হবে না, আর তাঁর কাজের স্বীকৃতিও স্পষ্টভাবে থাকবে।

নির্মলবাবু উদ্যোগটি শুনে খুশি হলেন। তিনি মেলার সদস্যদের নিয়ে একটি ছোট কর্মশালার ব্যবস্থা করলেন। সেখানে প্রত্যেকে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিলেন এবং অন্যদের শেখানোর জন্য সময় নির্ধারণ করলেন।

একজন অবসরপ্রাপ্ত বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি তরুণদের ঘরের সাধারণ বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা বোঝালেন। এক মহিলা হিসাবরক্ষক ছোট ব্যবসায়ীদের আয়-ব্যয়ের খাতা রাখতে শেখালেন। একজন দর্জি পোশাকের মাপ নেওয়া শেখালেন, আর এক তরুণ কম্পিউটার ব্যবহার করতে না-পারা সদস্যদের ডিজিটাল ফর্ম পূরণের পদ্ধতি বুঝিয়ে দিল।

কেউ কাউকে দয়া করে সাহায্য করছিলেন না। প্রত্যেকে নিজের দক্ষতা নিয়ে এসেছিলেন, আবার অন্যের কাছ থেকে কিছু শিখছিলেন।

তবু একদিন সমস্যা দেখা দিল। নতুন এক সদস্য মেলায় এসে বললেন, “আমি তো অনেক বছর বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। আমার এক ঘণ্টার পরামর্শের বিনিময়ে অন্য কেউ এক ঘণ্টা সাধারণ কাজ করবে, এটা কীভাবে ন্যায্য হয়?”

নির্মলবাবু তাঁকে বসতে বললেন।

“আপনার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই মূল্যবান,” তিনি বললেন। “কিন্তু এখানে আমরা মানুষের মর্যাদা বা দক্ষতাকে একটিমাত্র মাপে বিচার করি না। কেউ এক ঘণ্টায় জটিল হিসাব বুঝিয়ে দিতে পারেন, আবার কেউ এক ঘণ্টায় এমন কাজ করতে পারেন, যা আপনার পক্ষে শেখা কঠিন। বিনিময়ের নিয়ম আলোচনা করে ঠিক করা যায়, কিন্তু মানুষকে ছোট করে নয়।”

সদস্যটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে হিসাবের ভুল ধরতে সাহায্য করলেন। বিনিময়ে একজন তাঁকে বাগানের পরিচর্যা শেখালেন, আর অন্য একজন তাঁর পুরোনো সাইকেলটি মেরামত করে দিলেন।

শীতের শেষে মেলাটি আর শুধু এক দিনের অনুষ্ঠান রইল না। সদস্যরা মাসে দুবার মিলিত হতে শুরু করলেন। কে কী শেখাতে পারেন, কে কী শিখতে চান এবং কোন কাজের জন্য কতটা সময় লাগবে—সবকিছু নথিভুক্ত করা হলো। যাতে কেউ বারবার সাহায্য দিয়ে নিজেই বঞ্চিত না হন, তার জন্যও নিয়ম তৈরি করা হলো।

ইরা ধীরে ধীরে নিজের আঁকা ছবি অন্যদের দেখাতে শুরু করল। একদিন মেলার ছোট প্রদর্শনীতে তার আঁকা একটি ছবির সামনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে রইলেন। ছবিতে ছিল একটি বাজার, যেখানে নানা বয়সের মানুষ নিজেদের দক্ষতা ভাগ করে নিচ্ছেন।

ছবির নিচে সে লিখেছিল—

‘প্রত্যেক মানুষের কাছে এমন কিছু আছে, যা অন্য কারও কাজে লাগতে পারে।’

মৃণালিনী দেবী ছবিটি দেখে বললেন, “তুমি তো আমাদের বাজারটাকেই এঁকে ফেলেছ!”

ইরা হেসে উত্তর দিল, “আমি শুধু বাজার দেখিনি। এখানে এসে বুঝেছি, আমার কাছেও কিছু দেওয়ার আছে।”

সেদিন মেলা শেষ হওয়ার সময় নির্মলবাবু দেখলেন, প্রবেশপথের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন নতুন মানুষ বোর্ডটি পড়ছেন। তাঁদের কারও হাতে ছিল রান্নার বই, কারও হাতে কাজের সরঞ্জাম, কেউ আবার এসেছিলেন শুধু শেখার ইচ্ছা নিয়ে।

তিনি বুঝলেন, মেলার সবচেয়ে বড় সাফল্য মানুষকে বিনা মূল্যে কিছু দেওয়া নয়। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য নিয়ে আসতে পারেন, অন্যের দক্ষতাকে সম্মান করতে পারেন এবং বিনিময়ের মাধ্যমে আরও স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেন।

শিক্ষা: মানুষের মূল্য শুধু অর্থ বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে মাপা যায় না। নিজের দক্ষতা ভাগ করে নেওয়া এবং অন্যের কাছ থেকে শেখার মানসিকতা সমাজে পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *