১. পরিত্যক্ত মঞ্চ
পশ্চিম মেদিনীপুরের ছোট্ট একটি গ্রাম শালবনিতে একসময় প্রতি বছর শীতকালে নাটকের আসর বসত। গ্রামের মানুষ নিজেরাই নাটক লিখতেন, অভিনয় করতেন, মঞ্চ সাজাতেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সেই নাটক দেখতে আসত। কারও হাতে থাকত মুড়ি, কারও হাতে বাদাম, আর ছোটদের চোখে থাকত আনন্দের ঝিলিক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উৎসব হারিয়ে গেল। গ্রামের পুরোনো ক্লাবঘরের পাশের কাঠের মঞ্চটি ভেঙে পড়তে শুরু করল। রঙ উঠে যাওয়া পর্দা ছিঁড়ে গেল, মঞ্চের এক কোণে জমল শুকনো পাতা। একসময় যেখানে সন্ধ্যা হলেই মহড়ার শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
সেই গ্রামেই থাকত পনেরো বছরের মেয়ে মেঘলা। সে নবম শ্রেণিতে পড়ত। পড়াশোনার পাশাপাশি গল্প পড়তে এবং মানুষের অভিনয় দেখতে তার খুব ভালো লাগত।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে পুরোনো মঞ্চটির সামনে দাঁড়াল। কাঠের ফাঁক দিয়ে আগাছা গজিয়েছে। ছাদের টিনের কয়েকটি অংশও খুলে পড়েছে।
মেঘলা দীর্ঘক্ষণ মঞ্চটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই মঞ্চটি যেন অনেক দিন ধরে কাউকে কিছু বলতে চাইছে।
বাড়ি ফিরে সে দিদাকে জিজ্ঞাসা করল, —দিদা, আমাদের গ্রামের এখানে আগে কি সত্যিই নাটক হতো?
দিদা হেসে বললেন, —হতো না মানে! তোর দাদু একসময় নাটকের দলেই ছিলেন। দুর্গাপুজোর পরে সবাই মিলে নাটক করত। কত মানুষ যে আসত! নাটক শেষ হলে রাত হয়ে যেত, তবু কেউ বাড়ি ফিরতে চাইত না।
মেঘলা অবাক হয়ে শুনল।
—এখন আর হয় না কেন?
দিদার মুখ একটু ম্লান হয়ে গেল।
—সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ শহরে চলে গেল, কেউ চাকরি পেল, কেউ সংসারের দায়িত্বে আটকে গেল। ধীরে ধীরে মঞ্চটাও হারিয়ে গেল।
সেদিন রাতে মেঘলার ঘুম এল না। তার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—যে কাজ একসময় গোটা গ্রামকে এক করেছিল, সেটি আবার শুরু করা যায় না কেন?
২. স্বপ্নের কথা
পরের দিন স্কুলে টিফিনের সময় মেঘলা তার বন্ধু তৃষা, অয়ন এবং রাহুলকে নিজের পরিকল্পনার কথা বলল।
—আমরা যদি আবার নাটক করি, কেমন হয়?
অয়ন হেসে উঠল।
—আমরা নাটক করব? আমাদের মধ্যে কেউ ঠিকমতো সংলাপ বলতেই পারে না!
তৃষা অবশ্য আগ্রহ দেখাল।
—নাটক করতে গেলে আগে একটা গল্প দরকার। আর মঞ্চটাও তো ভাঙা।
মেঘলা বলল, —সব এক দিনে করতে হবে না। আগে একটা ছোট নাটক লিখব। তারপর মহড়া দেব। গ্রামের বড়দের সাহায্য চাইব।
রাহুল একটু ভেবে বলল, —কিন্তু নাটক দেখতে লোক আসবে তো?
মেঘলা উত্তর দিল, —আমরা যদি এমন গল্প বলি, যেখানে গ্রামের মানুষের নিজের জীবনের কথা থাকবে, তাহলে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ দেখতে আসবে।
চার বন্ধু ঠিক করল, তারা চেষ্টা করবে।
তবে তাদের সামনে প্রথম বাধা ছিল বাড়ির অনুমতি। মেঘলার বাবা সুশান্তবাবু একটি ছোট দোকান চালাতেন। মেয়ের কথা শুনে তিনি প্রথমে বললেন, —পড়াশোনার সময় নষ্ট করিস না। নাটক করে কি ভবিষ্যৎ তৈরি হবে?
মেঘলা শান্তভাবে বলল, —পড়াশোনা ছাড়ব না বাবা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়ব। নাটকের মহড়াও সেই সময়ের বাইরে করব।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—পরীক্ষার ফল খারাপ হলে কিন্তু নাটকের দোহাই দিতে পারবি না।
মেঘলা হেসে বলল, —দেব না।
মায়ের সাহায্যে সে বাড়ির কাজের জন্যও একটি সময়সূচি তৈরি করল। ধীরে ধীরে বাবা বুঝলেন, মেয়েটি শুধু আবেগের বশে কিছু বলতে চাইছে না; সে সত্যিই পরিকল্পনা করে এগোতে চাইছে।
৩. গল্প খোঁজার অভিযান
নাটকের জন্য গল্প লিখতে বসে মেঘলা বুঝল, কাজটি সহজ নয়। প্রথমে সে রাজা-রানির গল্প লিখল। কিন্তু বন্ধুরা পড়ে বলল, গল্পটি তাদের কাছে খুব চেনা লাগছে।
দ্বিতীয় গল্পে ছিল এক ধনী ব্যবসায়ী ও এক দরিদ্র কৃষকের বিরোধ। সেটিও তাদের পছন্দ হলো না।
একদিন দিদা তাকে বললেন, —গল্প খুঁজতে দূরে যেতে হয় না রে। চারপাশে তাকিয়ে দেখ। মানুষের জীবনেই কত গল্প আছে!
মেঘলা কথাটা মনে রাখল।
সে গ্রামের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। বাজারের সবজি বিক্রেতা, মাঠের কৃষক, স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পঞ্চায়েতের কর্মী, এমনকি গ্রামের বৃদ্ধ মানুষদের কাছ থেকেও নানা অভিজ্ঞতা শুনল।
একদিন সে দেখল, গ্রামের একটি পরিবারে ছোট ছেলেটি পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সাহায্য করে। অন্যদিকে গ্রামেরই আরেকটি মেয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও আত্মবিশ্বাসের অভাবে স্কুলের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চায় না।
মেঘলার মনে হলো, তাদের নাটকে এমন একটি গল্প থাকা উচিত, যেখানে মানুষ বুঝতে পারবে—প্রত্যেকের জীবনে বাধা থাকে, কিন্তু সবাইকে সুযোগ দেওয়া হলে অনেক অজানা প্রতিভা সামনে আসতে পারে।
সে লিখতে শুরু করল একটি নাটক। নাম দিল—‘আমাদের সবার মঞ্চ’।
নাটকের গল্পে একটি গ্রামের মানুষ প্রথমে নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। কেউ মনে করে, শুধু বড়লোকের সন্তানরাই ভালো অভিনয় করতে পারে। কেউ মনে করে, মেয়েদের মঞ্চে ওঠা উচিত নয়। আবার কেউ ভাবে, পড়াশোনায় ভালো না হলে অন্য কোনো কাজেও সাফল্য পাওয়া যায় না।
শেষ পর্যন্ত গ্রামের এক কিশোরী সবাইকে বোঝায়, মঞ্চে দাঁড়ানোর অধিকার সবার আছে। প্রতিভা প্রকাশের জন্য দরকার সুযোগ, অনুশীলন এবং একে অপরের প্রতি সম্মান।
গল্পটি পড়ে তৃষা বলল, —এটা তো আমাদের গ্রামের কথাই!
মেঘলা হেসে উত্তর দিল, —সেই জন্যই তো লিখেছি।
৪. প্রথম মহড়া, প্রথম বিপত্তি
গ্রামের পুরোনো ক্লাবঘরে মহড়া শুরু হলো। প্রথম দিন এল মাত্র পাঁচজন। দ্বিতীয় দিন এল সাতজন। তৃতীয় দিন অয়ন জানাল, বাড়িতে অতিথি এসেছে বলে সে আর আসতে পারবে না।
রাহুল সংলাপ ভুলে যাচ্ছিল। তৃষা মঞ্চে উঠলেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলছিল। মেঘলা নিজে নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেও তার সংলাপ বলতে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছিল।
একদিন বিরক্ত হয়ে অয়ন বলল, —আমাদের দিয়ে হবে না। এত ঝামেলা করে লাভ কী?
মেঘলারও মন খারাপ হচ্ছিল। সে বলল, —ভুল তো হবেই। প্রথম দিনেই সবাই ভালো অভিনয় করতে পারলে মহড়ার দরকার হতো না।
তবু সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না।
তখন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হরিপদবাবু তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। তিনি একসময় গ্রামের নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মহড়া দেখে তিনি বললেন, —তোমরা সংলাপ মুখস্থ করার চেষ্টা করছ, কিন্তু চরিত্রটা বোঝার চেষ্টা করছ না। আগে ভাবো, তোমরা যে মানুষটির অভিনয় করছ, সে কেন এই কথাটি বলছে। তারপরে সংলাপ বলো।
তিনি তাদের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং মঞ্চে দাঁড়ানোর সহজ কিছু কৌশল শেখালেন।
মেঘলা বুঝল, শুধু উৎসাহ থাকলেই হয় না। কাজকে ভালোভাবে করতে হলে অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শেখাও জরুরি।
৫. গ্রামের মানুষের কাছে আবেদন
মঞ্চটি সংস্কার না করলে নাটক করা সম্ভব ছিল না। ছাদ থেকে জল পড়ত, কাঠের কয়েকটি তক্তা ভাঙা ছিল, আর পেছনের দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছিল।
মেঘলা ও তার বন্ধুরা গ্রামের মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে শুরু করল। তারা কাউকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে বলল না। কেউ বাঁশ দিতে পারলে বাঁশ, কেউ রং দিতে পারলে রং, কেউ শ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারলে শ্রম—এই ছিল তাদের আবেদন।
প্রথম দিকে অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন না।
একজন বললেন, —এখনকার ছেলেমেয়েরা দুদিন উৎসাহ দেখায়, তারপর সব বন্ধ হয়ে যায়।
আরেকজন বললেন, —নাটক করে কী হবে? তার চেয়ে পড়াশোনায় মন দাও।
মেঘলা কারও সঙ্গে তর্ক করল না। সে শুধু বলল, —আমরা চেষ্টা করতে চাই। কাজটা শেষ করতে পারলে আপনারা নিজেরাই বিচার করবেন।
হরিপদবাবু গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চটি পরীক্ষা করলেন। কোথায় মেরামত দরকার, কোন কাজ অভিজ্ঞ কারিগরের সাহায্যে করতে হবে—সেগুলি ঠিক করা হলো। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে বড়দের তত্ত্বাবধানে সংস্কারের কাজ শুরু হলো।
দোকানদার নিবারণবাবু কিছু রং দিলেন। কাঠের মিস্ত্রি অল্প পারিশ্রমিকে কয়েকটি তক্তা মেরামত করতে রাজি হলেন। কয়েকজন যুবক পরিষ্কারের কাজে হাত লাগালেন।
সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা ঘটল যখন রঘুনাথ কাকু, যিনি প্রথমে মেঘলার পরিকল্পনায় হাসাহাসি করেছিলেন, তিনি নিজের হাতে কিছু বাঁশ এনে দিলেন।
তিনি বললেন, —ছোটবেলায় আমিও এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলাম। আবার যদি নাটক হয়, আমিও দেখতে আসব।
মেঘলার মনে হলো, তাদের নাটক শুরু হওয়ার আগেই গ্রামের মানুষের মধ্যে এক অদৃশ্য পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে।
৬. যে মেয়েটি কথা বলতে ভয় পেত
নাটকের একটি চরিত্র ছিল গ্রামের এমন এক মেয়ে, যে ভালো গান গাইতে পারে, কিন্তু মানুষের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। এই চরিত্রটির জন্য তারা খুঁজছিল একজন উপযুক্ত অভিনেত্রী।
তখন তৃষা গ্রামের এক কিশোরীর নাম প্রস্তাব করল। তার নাম পিয়ালি। পিয়ালি পড়াশোনায় ভালো ছিল, ছবি আঁকত, গানও গাইত। কিন্তু মানুষের সামনে কথা বলতে গেলে সে ভয় পেত।
প্রথমে পিয়ালি রাজি হলো না।
—আমি পারব না। সবাই হাসবে।
মেঘলা বলল, —ভুল করলে আমরা একসঙ্গে ঠিক করে নেব। কেউ কাউকে নিয়ে হাসব না।
পিয়ালি মহড়ায় আসতে শুরু করল। প্রথম দিন সে একটি সংলাপ বলতেই থেমে গেল। দ্বিতীয় দিনও খুব বেশি বলতে পারল না। কিন্তু কেউ তাকে তাড়া দিল না।
হরিপদবাবু বললেন, —মঞ্চে ওঠা মানেই প্রথম দিন থেকে নিখুঁত হওয়া নয়। নিজের ভয়কে একটু একটু করে চিনতে শেখাই প্রথম কাজ।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পিয়ালির পরিবর্তন দেখা গেল। সে শুধু নিজের সংলাপই ভালোভাবে বলতে শিখল না, অন্যদের ভুলও ধরিয়ে দিতে লাগল।
একদিন মহড়া শেষে সে মেঘলাকে বলল, —জানিস, আগে ভাবতাম আমি কিছুই পারি না। এখন বুঝছি, আমি চেষ্টা করার সুযোগটাই নিইনি।
মেঘলা তার হাত ধরে বলল, —আমাদের মঞ্চে সবাই নতুন করে শুরু করতে পারে।
৭. নাটকের দিন
অবশেষে নাটকের দিন এসে গেল। শীতের সন্ধ্যা। মঞ্চের সামনে গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছেন। কেউ চেয়ারে বসেছেন, কেউ মাদুর পেতে। শিশুরা সামনের দিকে বসে অপেক্ষা করছে।
মেঘলার বুক ধুকপুক করছিল। সে বারবার নিজের সংলাপ মনে করার চেষ্টা করছিল।
ঠিক তখনই খবর এল, নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল যে ছেলেটির, সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে আসতে পারবে না।
দলের সবাই চিন্তায় পড়ে গেল।
অয়ন বলল, —এখন কী হবে? ওই চরিত্র বাদ দিলে গল্পটাই বদলে যাবে!
মেঘলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, —আমরা সংলাপগুলো ভাগ করে নেব। যে যতটা পারি, সাহায্য করব। গল্পের মূল কথাটা যেন ঠিক থাকে।
সবাই দ্রুত আলোচনা করে ব্যবস্থা করল। একজনের সংলাপ অন্য দুজন ভাগ করে নিল। কিছু দৃশ্য ছোট করা হলো। তবু নাটকের মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ণ রইল।
পর্দা উঠল।
প্রথম দৃশ্যে কয়েকজনের সংলাপ একটু এলোমেলো হলো। দর্শকদের মধ্যে সামান্য হাসির শব্দ উঠল। কিন্তু কেউ কাউকে থামিয়ে দিল না। অভিনয় এগিয়ে চলল।
পিয়ালির দৃশ্য আসতেই মঞ্চে নীরবতা নেমে এল। সে ধীরে ধীরে নিজের সংলাপ বলল। তার কণ্ঠ প্রথমে কাঁপছিল, কিন্তু শেষের দিকে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তারপর এল মেঘলার দৃশ্য।
সে বলল, —একটি মঞ্চ শুধু অভিনয়ের জায়গা নয়। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে আমরা অন্যের কথা শুনতে শিখি, নিজের ভুল বুঝতে শিখি, আর বুঝতে পারি—আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আছে।
দর্শকদের মধ্যে করতালি শুরু হলো।
নাটকের শেষ দৃশ্যে গ্রামের সব চরিত্র একসঙ্গে মঞ্চে দাঁড়াল। কেউ বলল, মানুষকে সুযোগ দিতে হবে। কেউ বলল, অন্যের প্রতিভাকে সম্মান করতে হবে। কেউ বলল, গ্রামের উন্নতি শুধু একজনের কাজ নয়, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
নাটক শেষ হলে করতালিতে ভরে উঠল চারপাশ।
মেঘলা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার বাবা-মা সামনের সারিতে বসে হাসছেন। দিদার চোখে জল চিকচিক করছে। হরিপদবাবু সন্তুষ্ট মুখে মাথা নাড়ছেন।
মেঘলার মনে হলো, এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
৮. সাফল্যের পরেও কাজ বাকি
পরদিন সকালে মেঘলা স্কুলে যাওয়ার পথে মঞ্চটির সামনে দাঁড়াল। আগের সেই ভাঙাচোরা জায়গাটি এখন পরিষ্কার। দেয়ালে নতুন রং, সামনে ছোট্ট বাগান, আর পাশে একটি বোর্ডে লেখা—‘আমাদের সবার মঞ্চ’।
কিন্তু মেঘলা জানত, একটি সফল অনুষ্ঠানই শেষ কথা নয়।
সে বন্ধুদের নিয়ে ঠিক করল, মাসে অন্তত একবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। শুধু নাটক নয়, কবিতা পাঠ, গল্প বলা, লোকসংগীত, ছোটদের আবৃত্তি—সব কিছুর জন্য মঞ্চটি খোলা থাকবে।
তারা আরও সিদ্ধান্ত নিল, মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে এবং অর্থের অভাবে কেউ যাতে বাদ না পড়ে, তার চেষ্টা করা হবে। পোশাক বা সাজসজ্জার জন্য অতিরিক্ত খরচ না করে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হবে।
কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের মানুষ মঞ্চটিকে নিজেদের জায়গা হিসেবে ভাবতে শুরু করলেন। কেউ নিজের লেখা কবিতা নিয়ে এলেন, কেউ পুরোনো লোকগান শেখাতে চাইলেন, কেউ শিশুদের গল্প বলার আসর আয়োজন করলেন।
একদিন সন্ধ্যায় দিদা মেঘলাকে বললেন, —তুই শুধু একটা নাটক করিসনি রে। তুই গ্রামের মানুষকে আবার একসঙ্গে বসার একটা কারণ দিয়েছিস।
মেঘলা হেসে বলল, —আমি একা কিছুই করতে পারতাম না দিদা। সবাই সাহায্য করেছে বলেই সম্ভব হয়েছে।
দিদা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, —সেই তো আসল শিক্ষা। যে স্বপ্ন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা যায়, সেই স্বপ্নের শিকড় অনেক গভীরে যায়।
৯. নতুন প্রজন্মের আলো
এক বছর পরে গ্রামের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেঘলাকে ছোটদের উদ্দেশে কিছু বলতে বলা হলো।
মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে সে দেখল, প্রথম সারিতে বসে আছে কয়েকটি ছোট মেয়ে। তাদের চোখে সেই একই কৌতূহল, যা একসময় তার নিজের চোখে ছিল।
মেঘলা বলল, —তোমরা কেউ ভাববে না যে মঞ্চে দাঁড়ানোর অধিকার শুধু সাহসী বা খুব ভালো অভিনয় করতে পারা মানুষের। কেউ গান গাইতে পারো, কেউ গল্প বলতে পারো, কেউ সাজসজ্জা করতে পারো, কেউ আলো বা শব্দের কাজে সাহায্য করতে পারো। প্রত্যেকের কাজের মূল্য আছে।
সে আরও বলল, —কোনো কাজ শুরু করার আগে সবকিছু নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষা করলে অনেক স্বপ্নই শুরু হবে না। ছোট করে শুরু করো, ভুল থেকে শেখো, আর অন্যের সাহায্য নিতে লজ্জা পেয়ো না।
সেদিন অনুষ্ঠান শেষে একটি ছোট মেয়ে মেঘলার কাছে এসে বলল, —দিদি, আমিও নাটক করতে চাই। কিন্তু আমার খুব ভয় করে।
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
—তাহলে পরের মহড়ায় চলে এসো। আমরা একসঙ্গে চেষ্টা করব।
মঞ্চের ওপর তখনও আলো জ্বলছিল। চারপাশে মানুষের কথাবার্তা, শিশুদের হাসি আর গুছিয়ে নেওয়ার শব্দ।
মেঘলা বুঝল, তার স্বপ্ন কোনো একদিনের করতালিতে শেষ হয়নি। সেই স্বপ্ন এখন অন্য মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি পরিত্যক্ত মঞ্চ আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে, কারণ একজন কিশোরী বিশ্বাস করেছিল—পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় ক্ষমতা বা অনেক টাকা লাগে না। কখনও কখনও লাগে একটি সৎ ইচ্ছা, কয়েকজন সহযাত্রী এবং প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস।
শিক্ষা: নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার পাশাপাশি অন্যকে সুযোগ করে দেওয়াও বড় সাফল্য। সম্মিলিত উদ্যোগে একটি ছোট স্বপ্নও গোটা সমাজের আনন্দ ও আত্মবিশ্বাসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।