পুলিশ অফিসারের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল তিয়াসার।
ছবিতে যে মৃতদেহের মুখ দেখা যাচ্ছে, সেটি তার বাবার মুখ। অথচ কয়েক মিনিট আগেও অমিতাভ সেন এই বাড়িতে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলছিলেন।
তাহলে কে সেই মানুষ, যাকে সে এত বছর বাবা বলে ডেকেছে?
আর বারো বছর আগে পুকুরে যে মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, সেটি কার?
তিয়াসা তাড়াতাড়ি চারদিকে তাকাল।
“আমার বাবা কোথায়? যিনি একটু আগেও এখানে ছিলেন?”
পুলিশ অফিসার বললেন, “আপনার বাবা যদি সত্যিই এখানে এসে থাকেন, তাহলে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যে মৃতদেহটি পেয়েছি, তার সঙ্গে আপনার পরিবারের পুরোনো নথির মিল রয়েছে।”
“কিন্তু তিনি তো বেঁচে আছেন!”
“আপনি নিশ্চিত?”
তিয়াসা উত্তর দিতে পারল না।
ঠিক তখনই তার ফোনে আবার বার্তা এল।
‘উত্তরের ঘরে এসো। একা। সব সত্যি জানতে চাইলে কাউকে সঙ্গে আনবে না।’
বার্তাটি পাঠিয়েছে অমিতাভ সেনের নম্বর থেকে।
তিয়াসা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“যাস না, দিদি। এটা ফাঁদ।”
“কিন্তু সত্যিটা জানতেই হবে।”
“সত্যিটা জানার জন্য তুই এতদিন ধরে কত বিপদের মধ্যে পড়েছিস, একবার ভেবে দেখেছিস?”
তিয়াসা তার হাত ধরল।
“আমি আর পালাতে পারব না, তারা। আমার জীবনের প্রতিটি মানুষ আমার কাছে মিথ্যে বলেছে। এবার অন্তত জানতে চাই, আমার নিজের পরিচয়টা কী।”
বিছানায় শুয়ে থাকা অন্বেষা দুর্বল গলায় বলল, “উত্তরের ঘরে যাস। কিন্তু যাওয়ার আগে দেওয়ালের আয়নাটা দেখিস। ওই আয়নায় যে মুখ দেখা যায়, সেটাকে বিশ্বাস করিস না।”
তিয়াসা অবাক হয়ে তাকাল।
“কেন?”
অন্বেষা উত্তর দিল না। শুধু নিজের বালিশের নীচ থেকে একটা ছোট্ট চাবি বের করে তিয়াসার হাতে দিল।
“এটা তোর জন্মের রাতের চাবি।”
“জন্মের রাতের চাবি আবার কী?”
“যে ঘরে তোর জন্ম হয়েছিল, তার দরজা এই চাবি দিয়েই খোলা যায়।”
তিয়াসা চাবিটা মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল।
তারপর একবার তারার দিকে, একবার অন্বেষার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিকের করিডরের দিকে এগিয়ে গেল।
উত্তরের ঘরটি বাড়ির অন্য ঘরগুলোর চেয়ে অনেক পুরোনো।
দরজার কাঠে গভীর আঁচড়। দেওয়ালের চুন খসে পড়েছে। ঘরের মাঝখানে একটা বিশাল আয়না, তার সামনে ধুলো জমে থাকা টেবিল।
তিয়াসা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পিছন থেকে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরে কেউ নেই।
শুধু টেবিলের ওপর রাখা একটি টেপ রেকর্ডার।
তার পাশে একটা খাম।
খামের ওপরে লেখা—‘আমার আসল মেয়ের জন্য।’
তিয়াসা কাঁপা হাতে খাম খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো ছবি এবং একটি চিঠি।
ছবিতে তরুণী মধুমিতা সেন পাঁচটি নবজাতককে ঘিরে বসে আছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ। মুখটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাঁর ডান হাতে একটি আংটি।
তিয়াসা চিঠিটা পড়তে শুরু করল।
‘তিয়াসা,
যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তার মানে আমি আর সত্যিটা নিজের মুখে বলতে পারব না।
তোর জন্মের রাতে পাঁচটি শিশু জন্মেছিল। কিন্তু পাঁচটি শিশুর জন্মের চেয়েও বড় ঘটনা ঘটেছিল সেই রাতে—একজন মানুষ মারা গিয়েছিল, আর একজন মানুষ তার পরিচয় নিয়ে বেঁচে উঠেছিল।
আমি সেই ঘটনার সাক্ষী।
যে মানুষটিকে তুই বাবা বলে চিনিস, সে তোর জীবনে এসেছিল তোর আসল বাবার মৃত্যুর পরে। সে তোকে ভালোবেসেছে কি না, সেটা তুই নিজেই বিচার করবি। কিন্তু সে কখনও চায়নি, তুই নিজের জন্মের সত্যিটা জানিস।
কারণ সত্যিটা জানলে তুই বুঝতে পারবি, তোর জন্মের সঙ্গে যে অপরাধ জড়িয়ে আছে, সেই অপরাধের সবচেয়ে বড় সাক্ষী তুই নিজেই।’
চিঠির শেষে কোনও নাম নেই।
শুধু একটা তারিখ—১৭ অক্টোবর, ২০১৪।
তিয়াসা চিঠিটা নামিয়ে টেপ রেকর্ডার চালু করল।
প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ।
“আমার নাম অমিতাভ সেন। আমি এই স্বীকারোক্তি করছি নিজের ইচ্ছায়। পঁচিশ বছর আগে আমি একটি অপরাধ করেছিলাম। সেই অপরাধের জন্য বারো বছর আগে আমাকে নিজের মৃত্যু সাজাতে হয়েছিল।”
তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
“আমি মধুমিতাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু মধুমিতা জানত, আমাদের পরিবারের সম্পত্তির কাগজপত্রে জালিয়াতি হয়েছে। সে সবকিছু প্রকাশ করে দিতে চেয়েছিল। আর সেই কারণেই তার পরিচয় বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।”
একটু বিরতি।
তারপর কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল।
“সেই পরিকল্পনার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। কিন্তু যেদিন জানতে পারলাম, মধুমিতার পাঁচটি সন্তান জন্মেছে, সেদিন বুঝলাম, এই অপরাধ আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”
তিয়াসার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“একটি শিশুকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। আর একটি শিশুকে এমন একটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যারা তাকে নিজের সন্তান বলে বড় করবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়েছিল পঞ্চম শিশুটির ক্ষেত্রে। কারণ সেই শিশুটি জন্মের পরই আমার মুখ দেখে কেঁদে উঠেছিল।”
রেকর্ডিং হঠাৎ থেমে গেল।
তারপর অন্য একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
একজন মহিলার।
“অমিতাভ, তুমি কি এখনও ভাবছ, তুমি আমাকে হত্যা করেছ?”
তিয়াসা চমকে উঠে আয়নার দিকে তাকাল।
আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব নেই।
দেখা যাচ্ছে একটি অন্ধকার ঘর। সেই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা। তাঁর মুখ মধুমিতার মতো, কিন্তু চোখ দুটি কালো।
মহিলাটি আয়নার ভেতর থেকে বললেন, “তিয়াসা, তোমার বাবা তোমাকে একটা মিথ্যে বলেছেন। তুমি তাঁর মেয়ে নও, সেটা সত্যি। কিন্তু তিনি তোমার আসল বাবাকে হত্যা করেননি।”
তিয়াসা আয়নার কাছে এগিয়ে গেল।
“তাহলে কে হত্যা করেছে?”
মহিলাটি উত্তর দিলেন, “যে মানুষটি এখনও তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে অমিতাভ সেন বেরিয়ে এলেন।
তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে জল।
“তিয়াসা, আমার কথা শোনো। আমি যা করেছি, তার জন্য আমি শাস্তি পেতে রাজি। কিন্তু তুই যদি এখনই এই বাড়ি ছেড়ে না যাস, তাহলে তোরও মৃত্যু হবে।”
তিয়াসা পিছিয়ে গেল।
“আপনি কে?”
অমিতাভ চোখ নামিয়ে বললেন, “আমি সেই মানুষ, যে তোমার বাবার মৃত্যুর পর তোমাকে নিজের মেয়ে বলে বড় করেছে।”
“আমার আসল বাবা কে?”
অমিতাভ উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজা খুলে গেল।
দেবব্রত রায় দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে।
তাঁর হাতে একটি পিস্তল।
“এবার আর কোনও প্রশ্ন নয়,” তিনি বললেন। “আজ এই বাড়ির সব গল্পের শেষ হবে।”
তিয়াসা পিছিয়ে গিয়ে টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা খেল।
দেবব্রত পিস্তলটা তুলে ধরলেন।
“পঁচিশ বছর ধরে আমি এই পরিবারের জন্য অপেক্ষা করেছি। এতগুলো বছর ধরে সবাই আমাকে মৃত ভেবেছে। কিন্তু কেউ জানত না, আমি বেঁচে ছিলাম। আমি দেখেছি, একের পর এক মানুষ নিজেদের পরিচয় বদলেছে, নিজেদের অপরাধ ঢেকেছে। আর আজ সব শেষ হবে।”
অমিতাভ চিৎকার করে উঠলেন, “দেবব্রত, ওকে ছেড়ে দাও!”
দেবব্রত হেসে উঠলেন।
“তোমার মুখে এই কথা মানায় না, অমিতাভ। তুমি তো নিজের হাতে নিজের বন্ধুকে হত্যা করেছিলে!”
তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।
“বন্ধু?”
দেবব্রত তার দিকে তাকালেন।
“হ্যাঁ, তিয়াসা। তোমার আসল বাবা ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তার নাম ছিল অরিন্দম রায়। সে এই বাড়ির উত্তরাধিকারী ছিল না, কিন্তু এই বাড়ির সমস্ত গোপন নথি তার কাছে ছিল। সে জানত, পাঁচটি শিশুর জন্মের রাতে কারা তাদের পরিচয় বদলে দিয়েছিল।”
“তাহলে আমার মা কে?”
দেবব্রত বললেন, “তোমার মা ছিল মধুমিতা সেন। কিন্তু যে মধুমিতাকে তুমি চিনেছ, তিনি তোমার মা নন। তিনি ছিলেন তাঁর যমজ বোন, মাধুরী।”
তিয়াসার মনে পড়ে গেল সেই বন্দি মহিলার কথা, যিনি নিজেকে মধুমিতা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।
“কিন্তু মাধুরী তো মারা গিয়েছিলেন!”
দেবব্রত ঠান্ডা গলায় বললেন, “মাধুরী মারা যাননি। তিনি নিজের বোনের পরিচয় নিয়ে বেঁচে ছিলেন। আর আসল মধুমিতাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এই বাড়ির নীচের গোপন ঘরে।”
তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।
“তাহলে আমার মা এখনও বেঁচে আছেন?”
দেবব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “হ্যাঁ। আর তিনি এত বছর ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছেন।”
ঠিক তখনই বাড়ির সমস্ত আলো জ্বলে উঠল।
দরজার বাইরে পুলিশের চিৎকার।
“অস্ত্র নামিয়ে রাখুন! পুলিশ!”
দেবব্রত পিস্তলটা তিয়াসার দিকে তাক করলেন।
“কেউ এগোবে না!”
অমিতাভ তিয়াসার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন।
“ওকে ছেড়ে দাও, দেবব্রত। যা শাস্তি দেওয়ার, আমাকে দাও।”
দেবব্রত হাসলেন।
“তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যই তো এতদিন বেঁচে আছি!”
তিনি ট্রিগারে আঙুল রাখলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে তিয়াসা টেবিলের ওপরের ধাতব বাক্সটা তুলে দেবব্রতর দিকে ছুড়ে মারল।
গুলির শব্দে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
অমিতাভ মাটিতে পড়ে গেলেন।
তিয়াসা চিৎকার করে উঠল, “বাবা!”
কিন্তু অমিতাভের শরীর থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল না।
তিনি শুধু তিয়াসার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “আমাকে বাবা বলিস না। আমি তোর বাবা নই।”
তারপর তিনি তিয়াসার হাতে একটি ছোট্ট রুপোর লকেট দিলেন।
“এটা খুললেই তুই তোর আসল বাবার মুখ দেখতে পাবি।”
তিয়াসা লকেটটি খুলল।
ভেতরে একটি ক্ষুদ্র ছবি।
ছবির মানুষটিকে দেখে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
কারণ ছবির মানুষটি আর কেউ নন—দেবব্রত রায়।
তিয়াসা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
দেবব্রত তখন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। কিন্তু তাঁর মুখে কোনও ভয় নেই।
তিনি তিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“হ্যাঁ, তিয়াসা। আমি তোর আসল বাবা।”
তিয়াসা যেন পাথর হয়ে গেল।
“কিন্তু আপনি তো বললেন, আমার বাবা অরিন্দম রায়!”
দেবব্রতর মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটল।
“অরিন্দম ছিল আমার যমজ ভাই। আর এই পরিবারের সবাই এতদিন ধরে আমাদের দু’জনের পরিচয় গুলিয়ে রেখেছিল।”
তিয়াসা কিছু বলার আগেই দেবব্রতর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
তিনি খুব নিচু গলায় বললেন—
“কিন্তু একটা কথা তুই এখনও জানিস না, মেয়ে। তোর জন্মের রাতে আমি যে শিশুটিকে নিজের হাতে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলাম, সে তুই ছিলি না।”
“তাহলে কে ছিল?”
দেবব্রত চোখ বন্ধ করলেন।
“তোর আসল বোন।”
ঠিক তখনই তিয়াসার পিছনে দাঁড়ানো আয়নাটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
আর ভাঙা কাচের ওপার থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল—
“বাবা, এবার আমার পালা।”
চলবে…