Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (একাদশ ও শেষ পর্ব: নিজের শ্রাদ্ধে শেষবার)।

“বাবা, এবার আমার পালা।”

ভাঙা আয়নার ওপার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শুনে দেবব্রত রায়ের মুখের সমস্ত রং মুছে গেল।

যে মানুষটি কয়েক মুহূর্ত আগেও পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অপরাধ অস্বীকার করছিলেন না, সেই মানুষটিই এবার দু’হাতে কান চেপে মেঝেতে বসে পড়লেন।

“না! তুই আসতে পারিস না! তুই তো মরে গিয়েছিলি!”

ভাঙা কাচের টুকরোগুলোর মধ্যে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটি মেয়ের মুখ।

তিয়াসা তাকিয়ে রইল।

মুখটা তার নিজের মতো। চোখ, নাক, ঠোঁট—সবকিছু হুবহু এক। শুধু চোখের নীচে ছোট্ট একটি তিল। ঠিক সেই তিল, যেটা অন্বেষার মুখে ছিল।

মেয়েটি বলল, “তুমি আমাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলে, বাবা। তারপর সবাইকে বলেছিলে, আমি মারা গিয়েছি। কিন্তু তুমি একবারও ফিরে তাকিয়ে দেখোনি, আমি সত্যিই মরেছিলাম কি না।”

দেবব্রত কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “আমি জানতাম না তুই বেঁচে আছিস!”

“তুমি জানতে চাওনি।”

মেয়েটির কণ্ঠে এবার রাগের চেয়ে অভিমান বেশি ছিল।

“আমি বারো বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর পর তুমি আমার শ্রাদ্ধ করেছ। আমার নামে পিণ্ড দিয়েছ। আর আমি সেই বাড়ির জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখেছি, তুমি কীভাবে আমার মৃত্যুর অভিনয় করছ।”

তিয়াসার মনে পড়ল, ছোটবেলায় সে প্রতি বছর একটি অচেনা মেয়ের শ্রাদ্ধে বসত। বাবা বলতেন, মেয়েটি তাদের পরিবারের কেউ ছিল। কিন্তু তার নাম কখনও বলতেন না।

আজ সে বুঝতে পারল, সেই শ্রাদ্ধের আড়ালে লুকিয়ে ছিল একটি জীবন্ত মানুষের পরিচয় মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

তিয়াসা ভাঙা আয়নার দিকে এগিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি মৃদু হাসল।

“আমি তোর বোন, তিয়াসা। আমার নাম মৃণালিনী।”

“তুমি কি সত্যিই বেঁচে আছ?”

“হ্যাঁ। আমি বেঁচে আছি। আর এত বছর ধরে যে মানুষগুলো নিজেদের অপরাধ লুকিয়ে রেখেছে, তাদের প্রত্যেকের মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্যই ফিরে এসেছি।”

তিয়াসা চোখ মুছল।

“তাহলে তুমি কোথায় ছিলে এতদিন?”

“এই বাড়ির বাইরে। একজন বৃদ্ধা আমাকে পুকুর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে নিজের নাতনি বলে বড় করেছেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে একটি চিঠি দিয়ে যান। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, আমার আসল পরিবার শালবনীর এই বাড়িতে রয়েছে।”

“তাহলে এতদিন তুমি আমাদের কাছে এলে না কেন?”

মৃণালিনী একটু থামল।

“কারণ আমি জানতাম না, এখানে এসে কাকে বিশ্বাস করব। যে বাবা নিজের মেয়েকে মৃত ঘোষণা করতে পারে, যে মানুষ নিজের স্ত্রীর পরিচয় বদলে দিতে পারে, যে পরিবার একটি শিশুর জন্মের নথি পাল্টে দিতে পারে—তাদের কাছে ফিরে আসার সাহস আমার ছিল না।”

পুলিশ অফিসার দেবব্রতকে তুলে দাঁড় করালেন।

“দেবব্রত রায়, আপনাকে হত্যার চেষ্টা, পরিচয় জালিয়াতি এবং একাধিক অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার করা হচ্ছে।”

দেবব্রত কোনও প্রতিবাদ করলেন না।

তিনি শুধু তিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোকে ভালোবাসতাম, মেয়ে।”

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

“ভালোবাসা কাউকে বাঁচতে দেয়, বাবা। কাউকে মৃত সাজিয়ে রাখে না।”

দেবব্রত মাথা নীচু করলেন।

পুলিশ তাঁকে নিয়ে চলে গেল।

কিন্তু তিয়াসার সামনে তখনও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছিল।

তার আসল মা কোথায়?


সেই রাতেই পুলিশ বাড়ির নীচের গোপন ঘরটি খুঁজে পেল।

ঘরের ভেতরে একটি সরু বিছানা, কয়েকটি ওষুধের শিশি এবং দেওয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের পাতায় বারো বছর আগের তারিখে লাল দাগ দেওয়া।

বিছানায় শুয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধা।

চুল পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। মুখে অসংখ্য বলিরেখা। চোখ বন্ধ। শ্বাস অত্যন্ত ক্ষীণ।

তিয়াসা তাঁর কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“মা?”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।

এক মুহূর্তের জন্য তাঁর দৃষ্টিতে কোনও পরিচয় ছিল না। তারপর তিনি তিয়াসার মুখে হাত রাখলেন।

“তিয়াসা?”

তিয়াসা কেঁদে ফেলল।

“হ্যাঁ, মা। আমি তিয়াসা।”

বৃদ্ধার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুই এত বড় হয়ে গেছিস, মা!”

“আমাকে চিনতে পেরেছ?”

“একজন মা তার সন্তানকে ভুলতে পারে? তোর মুখ আমি বারো বছর ধরে স্বপ্নে দেখেছি।”

তিয়াসা তাঁর হাত দুটো নিজের মুখে চেপে ধরল।

“তোমার কী হয়েছিল, মা? সবাই বলেছে তুমি মারা গিয়েছ।”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

“আমার নাম মধুমিতা সেন। তোর জন্মের রাতে পাঁচটি শিশু জন্মেছিল। আমি জানতাম, এই পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বড় ষড়যন্ত্র চলছে। দেবব্রত আর তার সহযোগীরা চেয়েছিল, শিশুদের পরিচয় বদলে দিয়ে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিজেদের হাতে রাখতে।”

“তুমি কিছু করতে পারোনি?”

“আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমাকে বন্দি করে রাখা হয়। আমার যমজ বোন মাধুরী আমার পরিচয় নিয়ে বাইরে চলে যায়। আর আমাকে এই ঘরে আটকে রাখা হয়।”

“তাহলে বাবা?”

মধুমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“অমিতাভ তোকে নিজের মেয়ে ভেবেই বড় করেছে। সে সব সত্যি জানত না। কিন্তু পরে যখন জানতে পারে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সে নিজের অপরাধের ভয়ে চুপ করে ছিল। তবু তোকে সে সত্যিই ভালোবাসত।”

তিয়াসা মাথা নীচু করল।

“সে এখন কোথায়?”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি জানি না। কিন্তু তুই যদি তাকে খুঁজে পাস, তাকে বলিস—আমি তাকে ক্ষমা করেছি। ক্ষমা করেছি বলে তার অপরাধ মুছে যাবে না। কিন্তু আমি চাই না, আমার মেয়েরা সারাজীবন প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে বাঁচুক।”

তিয়াসা মায়ের কপালে চুমু খেল।

“আমরা আর কাউকে হারাতে দেব না, মা।”

মধুমিতা মৃদু হাসলেন।

“তোর বোনদের খুঁজে বের করিস। ওদের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আসিস। অনেক বছর ধরে আমি পাঁচটি সন্তানের মা হয়েও একা বেঁচে আছি।”

তিয়াসা মায়ের হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করল, সে আর কোনওদিন তার পরিবারকে অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেবে না।


পরের কয়েক মাসে শালবনীর সেই বাড়ির গোপন ইতিহাস প্রকাশ্যে এল।

পুরোনো হাসপাতালের নথি, জাল মৃত্যুর শংসাপত্র, সম্পত্তির দলিল এবং অমিতাভের রেকর্ড করা স্বীকারোক্তি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হল। তদন্তে একাধিক পরিচয় জালিয়াতি ও অপরাধের প্রমাণ মিলল। দেবব্রত এবং ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হল।

মৃণালিনীকে তাঁর প্রকৃত পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া হল।

অন্বেষার চিকিৎসা শুরু হল।

তারা, মেঘলা এবং নন্দিতার পরিচয় নিয়েও নতুন করে তদন্ত হল। দীর্ঘদিনের মিথ্যে আর বিভ্রান্তির আড়ালে থাকা তাদের জীবনের সত্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পেল। তবে সবাইকে এক পরিচয়ে বেঁধে ফেলার চেষ্টা আর করা হল না। তারা প্রত্যেকে নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার ফিরে পেল।

অমিতাভেরও খোঁজ পাওয়া গেল।

তিনি শালবনীর বাইরে একটি ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রে আত্মগোপন করে ছিলেন। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করার আগে তিনি তিয়াসাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

চিঠিতে লেখা ছিল—

‘তিয়াসা,

তুই আমাকে বাবা বলে ডাকবি কি না, সেটা তোর সিদ্ধান্ত। আমি তোকে জন্ম দিইনি, কিন্তু তোকে বড় করার সময় আমি কখনও ভাবিনি, তুই আমার নিজের সন্তান নোস। আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ, আমি সত্যিটা জানার পরও তোকে বলিনি।

আমি জানি, শুধু ভালোবাসা দিয়ে সব অপরাধের ক্ষমা পাওয়া যায় না।

তুই নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করিস। আমার ভুলের বোঝা তুই আর বহন করিস না।’

তিয়াসা চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল।

সে অমিতাভকে ক্ষমা করেছিল কি না, তার উত্তর সে নিজেও জানত না। কিন্তু সে বুঝেছিল, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবার তার নিজের হাতে।


এক বছর পরে।

আবার দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে।

শালবনীর পুরোনো বাড়িটি আর আগের মতো ভুতুড়ে নেই। উত্তর দিকের বন্ধ ঘর খুলে দেওয়া হয়েছে। গোপন সিঁড়ির দরজা সরিয়ে সেখানে আলো লাগানো হয়েছে। পুকুরের ধারে নতুন করে গাছ লাগানো হয়েছে।

সেই সন্ধ্যায় তিয়াসা পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে একটি ছোট্ট প্রদীপ।

আজ ১৭ অক্টোবর।

যে দিনটিতে সে এত বছর ধরে নিজের মৃত বোনের শ্রাদ্ধ করত।

কিন্তু আজ সে কোনও মৃত মানুষের জন্য শ্রাদ্ধ করতে আসেনি।

সে এসেছে সেই সমস্ত মিথ্যে পরিচয়, সেই সমস্ত ভয় আর সেই সমস্ত অপরাধের স্মৃতিকে বিদায় জানাতে, যেগুলো তার পরিবারকে এত বছর ধরে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।

মধুমিতা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“কী ভাবছিস, মা?”

তিয়াসা পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাবছি, মানুষ বেঁচে থেকেও কতবার মারা যেতে পারে। নাম হারিয়ে, পরিচয় হারিয়ে, নিজের পরিবারের ভালোবাসা হারিয়ে।”

মধুমিতা মেয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

“আর মানুষ আবার বেঁচেও উঠতে পারে। যখন সত্যিটা জানার সাহস পায়।”

ঠিক তখনই পিছন থেকে মৃণালিনী, তারা, মেঘলা, নন্দিতা ও অন্বেষা এসে দাঁড়াল।

পাঁচটি মেয়ে।

পাঁচটি আলাদা জীবন।

পাঁচটি আলাদা সত্য।

কিন্তু এবার তাদের মধ্যে কোনও গোপন দরজা নেই।

তিয়াসা প্রদীপটি পুকুরের জলে ভাসিয়ে দিল।

প্রদীপটি ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। জলের ওপর তার আলো কাঁপছিল, কিন্তু নিভে যাচ্ছিল না।

হঠাৎ তিয়াসার মনে হল, পুকুরের ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

একটি ছোট্ট মেয়ে।

সাদা পোশাক। ভেজা চুল। মুখে মৃদু হাসি।

মেয়েটি হাত তুলে তাকে ডাকল।

তিয়াসা এক পা এগিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি হাসল।

“আমাকে চিনতে পারছ না?”

তিয়াসা ভালো করে তাকাল।

মেয়েটির মুখটি তার নিজের ছোটবেলার মুখের মতো।

সেই মুখ, যে মুখ সে বহু বছর ধরে নিজের শ্রাদ্ধের ছবিতে দেখেছে।

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি কি আমার মৃত বোন?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“না, দিদি। আমি তোর সেই ছোট্ট বয়সটা, যেটাকে তুই এতদিন ভয় পেয়ে লুকিয়ে রেখেছিলি।”

তিয়াসা চোখ বন্ধ করল।

আবার চোখ খুলে দেখল, পুকুরের ওপারে কেউ নেই।

শুধু জলের ওপর ভাসছে প্রদীপটি।

সেদিন রাতে তিয়াসা বাড়ি ফিরে পুরোনো অ্যালবামটি খুলল। সেখানে তার শৈশবের একটি ছবি ছিল—একটি ছোট্ট মেয়ে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে হাসি।

ছবির নীচে লেখা—

‘তিয়াসা সেন। জন্ম: ১৭ অক্টোবর।’

সে ছবিটা বুকের কাছে টেনে নিল।

তারপর বহু বছর পর প্রথমবার নিজের জন্মদিনের তারিখটি উচ্চারণ করল।

“আমি তিয়াসা। আমি বেঁচে আছি। আর আমার জীবনের গল্পটা অন্য কেউ লিখবে না।”

জানলার বাইরে হালকা বাতাস বইছিল।

দূরে মন্দিরের ঘণ্টা বাজল।

আর সেই রাতের পর শালবনীর বাড়িতে আর কখনও কেউ নিজের শ্রাদ্ধে আসেনি।

কারণ অবশেষে মৃতদের নাম ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল জীবিতদের কাছে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *