Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (নবম পর্ব: যে মায়ের পাঁচটি মেয়ে)।

“আমার আসল মেয়েকে আমি বারো বছর আগেই নিজের হাতে মেরে ফেলেছি।”

মধুমিতা সেনের কথাটা শুনে তিয়াসার মনে হল, সিঁড়ির প্রতিটি পাথর যেন তার পায়ের নীচে কেঁপে উঠছে।

মধুমিতার ডান হাতে ধরা ছুরিটা মোবাইলের আলোয় ঝলসে উঠল। তাঁর চোখে কোনও রাগ নেই, কোনও অনুশোচনাও নেই। যেন তিনি এমন একটা কথা বলছেন, যা বহু বছর ধরে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে রাখতে আজ আর তাঁর কাছে ভয়ের কিছু নয়।

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কাকে মেরেছেন?”

মধুমিতা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন।

“যে মেয়েটি আমার পরিচয় নিয়ে বেঁচে আছে।”

তিয়াসা পিছিয়ে গেল।

“আপনি কি আমাকে মারতে এসেছেন?”

“না।”

“তাহলে ছুরিটা কেন?”

মধুমিতা ছুরিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“এই ছুরি দিয়ে কাউকে হত্যা করা যায়। আবার নিজের অতীতের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলা যায়। কোন কাজটা করব, সেটা এখনও ঠিক করিনি।”

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তারা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যে কথা! আপনি কাউকে মারতে আসেননি। আপনি এসেছেন দরজার ওপাশে যে মেয়েটি আছে, তাকে চিরদিনের জন্য চুপ করিয়ে দিতে!”

মধুমিতার মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

“তুই এখানে কেন?”

“আমার বোনকে বাঁচাতে।”

“তোর কোনও বোন নেই।”

তারা হেসে উঠল। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে অভিমানই বেশি ছিল।

“এই বাড়িতে সবাইকে একই কথা শেখানো হয়, তাই না? কারও বোন নেই, কারও মা নেই, কারও পরিচয় নেই। শুধু আপনার সবকিছু আছে—নাম, পরিচয়, সম্পত্তি, এমনকী অন্যের জীবনটাও!”

মধুমিতা আর কথা বললেন না।

তিনি তিয়াসার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “আমার সঙ্গে চল। এই দরজাটা খুলিস না।”

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

“না। দরজার ওপারে কে আছে, আমি জানব।”

“জানলে তুই আর কোনও দিন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবি না।”

“আমার স্বাভাবিক জীবন বলে আর কিছু নেই।”

তিয়াসা দরজার হাতলে হাত রাখল।

ঠিক সেই মুহূর্তে মধুমিতা ছুরিটা তুলে ধরলেন।

“দরজাটা খুললে আমি তোকে মেরে ফেলব!”

তিয়াসা থেমে গেল।

কিন্তু এবার তার ভয় হল না। এতদিন ধরে সে মৃত্যু, প্রতারণা আর মিথ্যার এতগুলো মুখ দেখেছে যে আর কোনও হুমকিই তাকে আগের মতো ভয় দেখাতে পারছিল না।

সে মধুমিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যদি সত্যিই আমার মা হন, তাহলে আমাকে বাঁচতে দেবেন। আর যদি আমার মা না হন, তাহলে আপনার কথা শোনার কোনও কারণ নেই।”

মধুমিতার হাত কেঁপে উঠল।

ছুরিটা মেঝেতে পড়ে গেল।

তারপর তিনি দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করলেন।

“আমি তোকে মারতে চাইনি, তিয়াসা। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুই কোনও দিন সত্যিটা জানতে না পারিস।”

তিয়াসা দরজাটা খুলে দিল।

দরজার ওপাশে ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের মাঝখানে কাঠের বিছানা। পাশে একটি টেবিল, তাতে ওষুধের শিশি, কয়েকটি পুরোনো ছবি এবং একটি জং ধরা আয়না।

বিছানায় শুয়ে আছে একটি মেয়ে।

বয়স বারো কিংবা তেরো। মুখ ফ্যাকাশে, চুল কাঁধ ছাড়িয়ে নেমেছে। তার চোখ দুটো বন্ধ।

তিয়াসা কাছে যেতেই মেয়েটি চোখ খুলল।

আর তিয়াসার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে গেল।

মেয়েটির মুখ অবিকল তার নিজের মতো।

শুধু চোখের নীচে একটি ছোট্ট তিল, যা তিয়াসার নেই।

মেয়েটি দুর্বল গলায় বলল, “তুমি অবশেষে এলে, দিদি।”

তিয়াসা বিছানার পাশে বসে পড়ল।

“তোমার নাম কী?”

“তুমি আমাকে কী নামে ডাকতে, মনে আছে?”

তিয়াসার চোখের সামনে আবার সেই ছোটবেলার দৃশ্য ভেসে উঠল। বৃষ্টির রাত, অন্ধকার ঘর, আর একটা মেয়ে তার হাত ধরে বলছে—ভয় পাস না।

“তারা?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“না।”

“মেঘলা?”

“না।”

“নন্দিতা?”

মেয়েটি চোখ বন্ধ করল।

“আমি তোর পঞ্চম বোন, তিয়াসা। আমার নাম ছিল অন্বেষা।”

ঘরের মধ্যে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

মধুমিতা দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের জল থামছে না।

তিয়াসা অন্বেষার হাত ধরে বলল, “তোমাকে এত বছর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কেন?”

অন্বেষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “কারণ আমার জন্মের সময়ই সবাই জানতে পেরেছিল, আমি এই পরিবারের সব গোপন কথা শুনেছি।”

তিয়াসা অবাক হয়ে গেল।

“জন্মের সময় কেউ কথা শুনতে পারে?”

“আমি তখন শিশু ছিলাম। কিন্তু আমার জন্মের পরের রাতটা আমার মনে আছে।”

অন্বেষা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।

“আমাদের জন্মের রাতে এই বাড়িতে পাঁচটি শিশু জন্মেছিল। প্রথমে চারটি শিশুর কথা সবাই জানত। পঞ্চম শিশুটির জন্ম হয়েছিল বাড়ির পুরোনো চিকিৎসাকক্ষে। তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সে বেঁচে ছিল।”

“তুমি?”

অন্বেষা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আমি বেঁচে ছিলাম। আর আমাকে লুকিয়ে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তোমার মাকে।”

তিয়াসা মধুমিতার দিকে তাকাল।

“কিন্তু আপনি তো বললেন, নিজের হাতে নিজের মেয়েকে মেরে ফেলেছেন!”

মধুমিতা মুখ তুলে তাকালেন।

“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”

“কেন?”

“কারণ আমি জানতাম, তুই যদি জানতে পারিস যে অন্বেষা বেঁচে আছে, তাহলে তুই ওর কাছে ফিরে যাবি। আর আমি তোকে হারাতে চাইনি।”

তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আপনি আমাকে ভালোবাসেন?”

মধুমিতা কোনও উত্তর দিতে পারলেন না।

অন্বেষা দুর্বল গলায় বলল, “দিদি, ওঁকে দোষ দিস না। উনি আমাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু উনিই আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। আসল অপরাধী অন্য কেউ।”

“কে?”

অন্বেষা ঘরের কোণে রাখা পুরোনো আয়নাটার দিকে তাকাল।

“যে মানুষটি এখনও আমাদের পরিবারের একজন সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

তিয়াসা ঘুরে তাকাল।

“কে সে?”

অন্বেষা বলল, “দেবব্রত রায়।”

সিঁড়ির ওপর থেকে সঙ্গে সঙ্গে একটা শব্দ এল।

কেউ দ্রুত পায়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে।

তারা ছুটে গিয়ে দরজার বাইরে তাকাল।

“দেবব্রতবাবু কোথায়?”

কেউ উত্তর দিল না।

শশাঙ্ক রায় সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে আতঙ্ক।

“দেবব্রত পালিয়েছে!”

তিয়াসা অন্বেষার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

“কিন্তু ও কেন পালাবে?”

অন্বেষা বলল, “কারণ সে জানে, আমি সব মনে করতে পেরেছি।”

“কী মনে করতে পেরেছ?”

অন্বেষা চোখ বন্ধ করল।

কিছুক্ষণ পর তার ঠোঁট নড়ল।

“পঁচিশ বছর আগে আমাদের জন্মের রাতে, এই বাড়িতে কোনও সম্পত্তির দলিল নিয়ে প্রথম ঝামেলা হয়নি। প্রথমে একটি খুন হয়েছিল।”

“কার খুন?”

অন্বেষা চোখ খুলল।

“আমাদের জন্মদাত্রী মায়ের।”

তিয়াসার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

“কিন্তু মা তো বেঁচে আছেন!”

অন্বেষা মৃদু হাসল।

“যে মহিলাকে তুই মা বলে ডাকিস, তিনি মধুমিতা নন। আর যিনি মধুমিতা সেজে এত বছর বেঁচে আছেন, তিনিও মধুমিতা নন।”

ঘরের মধ্যে যেন সমস্ত আলো নিভে গেল।

তিয়াসা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

“তাহলে আসল মধুমিতা কোথায়?”

অন্বেষা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে করিডরে পুলিশের বুটের আওয়াজ।

একজন পুলিশ অফিসার দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“এখানে কি তিয়াসা সেন আছেন?”

তিয়াসা এগিয়ে এল।

“আমি।”

অফিসার একটি পুরোনো ছবি তার হাতে দিলেন।

“আপনার বাবার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে।”

তিয়াসার মাথার ভেতরটা ঝনঝন করে উঠল।

“কী বলছেন? আমার বাবা তো এখানেই ছিলেন!”

অফিসার ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“আমরা শালবনীর পুকুর থেকে একটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছি। তার পরিচয়পত্রে আপনার বাবার নাম রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, মৃতদেহটির বয়স প্রায় বারো বছর।”

তিয়াসা ছবিটির দিকে তাকাল।

মুখটি অমিতাভ সেনের মতো।

কিন্তু ছবির নীচে লেখা নাম দেখে তার হাত অবশ হয়ে গেল।

মৃত ব্যক্তির নাম: অমিতাভ সেন। মৃত্যুর সম্ভাব্য তারিখ: ১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

তিয়াসা ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকাল।

যে মানুষটিকে সে এতক্ষণ নিজের বাবা বলে জেনে এসেছে, তিনি কোথায়?

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি বার্তা এল।

প্রেরক—অমিতাভ সেন।

বার্তায় লেখা—

‘তিয়াসা, আমি তোমার বাবা নই। আমি সেই মানুষ, যে তোমার আসল বাবাকে হত্যা করেছিল। আর এখন তোমার পালা।’

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *