Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ বাড়ির জানালায় (প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে কেউ থাকে না)।

রাত তখন এগারোটা বেয়াল্লিশ।

শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বাড়িটার সামনে এসে থামল অর্কর গাড়ি। চারদিকে ঘন কুয়াশা। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, তাদের ভেজা পাতার ফাঁক দিয়ে দূরের আলোও যেন ঠিকমতো পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

বাড়িটার নাম ছিল ‘শান্তিনিকেতন’।

নামটা শুনলে মনে হয়, এখানে শান্তি ছাড়া আর কিছু থাকার কথা নয়। কিন্তু এলাকার মানুষ বাড়িটাকে অন্য নামে চিনত—‘শেষ বাড়ি’।

কারণ, বাড়িটার পরে আর কোনো বাড়ি ছিল না। তার পরেই শুরু হয়েছে বিস্তীর্ণ পরিত্যক্ত জমি, ঝোপঝাড় আর বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি পুরোনো রেললাইন।

অর্ক এই বাড়িতে শেষবার এসেছিল বারো বছর আগে।

তখন তার বয়স ছিল ষোলো। বাবা মারা যাওয়ার পর মা তাকে নিয়ে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। সেই থেকে এই বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু তিন দিন আগে একটি চিঠি সবকিছু বদলে দিয়েছে।

চিঠিটা এসেছিল ডাকযোগে। খামের ওপর প্রেরকের নাম নেই। শুধু অর্কর নাম আর ঠিকানা। ভেতরে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে লেখা ছিল—

“অর্ক, তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও তোমার বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, তাহলে অমাবস্যার রাতে শেষ বাড়ির জানালায় আলো জ্বলতে দেখো। রাত বারোটার আগে বাড়িতে ঢুকবে না। আর ঢোকার পর যদি কেউ তোমাকে তোমার নামে ডাকে, কোনোভাবেই উত্তর দেবে না।

—একজন, যে এখনও বেঁচে আছে।”

চিঠির শেষ বাক্যটা অর্ককে সবচেয়ে বেশি অস্থির করে তুলেছিল।

একজন, যে এখনও বেঁচে আছে।

কে সেই মানুষ?

আর বারো বছর আগে মারা যাওয়া তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্কই বা কী?

অর্ক গাড়ি থেকে নেমে পকেট থেকে চাবিটা বের করল। চাবিটা তার মায়ের আলমারিতে লুকিয়ে রাখা ছিল। মৃত্যুর আগে মা তাকে চাবিটা দিয়ে বলেছিলেন, “কোনোদিন যদি মনে হয় সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন শেষ বাড়িতে ফিরে যাস।”

সেই কথার অর্থ সে কখনও বুঝতে পারেনি।

আজ বুঝতে এসেছে।

বাড়ির প্রধান দরজায় তালা ছিল না। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে। অর্ক ঠেলে খুলতেই কবজায় একটা দীর্ঘ, কর্কশ শব্দ উঠল।

ভেতরে পা দিয়েই সে থমকে দাঁড়াল।

বাড়িটা বাইরে থেকে যতটা পরিত্যক্ত মনে হয়েছিল, ভেতরে ততটা নয়। মেঝেতে ধুলো জমেছে, দেওয়ালের রং উঠে গেছে, কিন্তু বসার ঘরের মাঝখানে রাখা কাঠের টেবিলের ওপর একটি কাঁচের গ্লাসে জল রয়েছে।

জলটা একেবারে টাটকা।

অর্কর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।

কেউ এখানে থাকে।

অথচ এলাকার মানুষ শপথ করে বলেছে, বারো বছর ধরে এই বাড়িতে কেউ ঢোকেনি।

সে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে চারদিকে আলো ফেলল। দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবির সামনে এসে থামল।

ছবিতে তার বাবা অমিতাভ সেন, মা মৃণালিনী এবং ছোট্ট অর্ক। ছবিটা তোলা হয়েছিল তার দশম জন্মদিনে।

কিন্তু ছবির পেছনে কালো কালি দিয়ে লেখা একটি বাক্য তার চোখে পড়ল।

“আমাদের চতুর্থ মানুষটিকে কখনও খুঁজবে না।”

অর্কর মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর বরফ ঢেলে দিয়েছে।

চতুর্থ মানুষ?

তাদের পরিবারে তো তিনজনই ছিল!

বাবা, মা আর সে।

তাহলে চতুর্থ মানুষটি কে?

ঠিক সেই সময় বাড়ির দোতলা থেকে একটা শব্দ এল।

ঠক।

তারপর আবার।

ঠক।

যেন কেউ বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কাঠে আঘাত করছে।

অর্ক টর্চের আলো সিঁড়ির দিকে ফেলল। সিঁড়ির ওপর ছড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট পায়ের ছাপ। ধুলোর ওপর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পায়ের ছাপগুলো দোতলা থেকে নেমে এসেছে। কিন্তু সিঁড়ির নিচে এসে হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে।

কেউ যেন মাঝপথে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

অর্ক নিজের ভয়কে দমন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।

দোতলায় তিনটি ঘর। প্রথম ঘরটা ফাঁকা। দ্বিতীয় ঘরে ভাঙা আসবাবপত্র। তৃতীয় ঘরের দরজায় বড়সড় লোহার তালা ঝুলছে।

দরজার ওপর সাদা রঙে লেখা—

“অর্কর ঘর।”

অর্কর মনে পড়ল, ছোটবেলায় এই বাড়িতে তার নিজের একটি ঘর ছিল। কিন্তু সেটি তো দোতলার প্রথম ঘর। এই ঘরটার কথা তার মনে পড়ছে না কেন?

সে তালাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে একটা শিশুকণ্ঠ ভেসে এল।

—দাদা?

অর্কর হাত থেকে মোবাইল প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

কণ্ঠটা আবার শোনা গেল।

—দাদা, তুমি এসেছ?

অর্ক কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল। চিঠির সতর্কবাণী তার মনে পড়ল।

কেউ তোমাকে তোমার নামে ডাকলে উত্তর দেবে না।

কিন্তু শিশুটি তাকে দাদা বলে ডাকছে।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে একটা মৃদু কান্নার শব্দ ভেসে এল।

—দাদা, আমাকে এখান থেকে বের করো। অনেকদিন ধরে অন্ধকারে আছি।

অর্কর চোখে জল এসে গেল, যদিও সে নিজেও জানত না কেন।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় মা মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন। একবার সে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, তুমি কাঁদছ কেন?”

মা বলেছিলেন, “একটা স্বপ্ন দেখেছি।”

—কী স্বপ্ন?

মা উত্তর দেননি।

শুধু বলেছিলেন, “তুই যদি কোনোদিন বাড়িতে আরেকটা শিশুকে দেখতে পাস, তাকে ভয় পাবি না।”

অর্ক তখন ভেবেছিল, মা হয়তো কোনো গল্প বলছেন।

আজ সেই কথাটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।

দরজার ওপাশ থেকে আবার আওয়াজ এল।

—দাদা, ওরা আসছে!

তারপর হঠাৎ সব চুপ।

অর্ক দরজার তালাটা পরীক্ষা করল। তালার গায়ে মরচে জমেছে, কিন্তু চাবির মুখের কাছে আঁচড়ের দাগ। মনে হচ্ছে, সম্প্রতি কেউ তালাটা খোলার চেষ্টা করেছে।

সে পকেট থেকে মায়ের দেওয়া চাবিটা বের করল।

চাবিটা তালায় ঢুকে গেল।

কিন্তু ঘোরানোর আগেই নিচের তলায় দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

ধড়াম!

অর্ক চমকে সিঁড়ির দিকে তাকাল।

কেউ বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে।

তারপর ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার শব্দ।

একজন নয়।

দুজন।

তিনজন।

অর্ক দ্রুত ঘরের পাশের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে গভীর অন্ধকার। জানালার নিচে সরু কার্নিশ, তার পরেই প্রায় পনেরো ফুট নিচে উঠোন।

পালানোর পথ নেই।

পায়ের শব্দ থেমে গেল দোতলার সিঁড়ির মুখে।

একজন পুরুষের গলা শোনা গেল।

—ছেলেটা এসেছে?

আরেকজন বলল, —গাড়িটা বাইরে আছে। ও এখানেই আছে।

প্রথম লোকটি হেসে উঠল।

—তাহলে বারো বছর পর অবশেষে ও নিজেই দরজা খুলতে এসেছে।

অর্ক নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

লোকটি আবার বলল, —মনে রেখো, ছেলেটাকে মেরে ফেলার দরকার নেই। শুধু ওর কাছে যা আছে, সেটা নিয়ে নিতে হবে।

—আর যদি ও সব জেনে যায়?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর উত্তর এল—

—তাহলে ওর বাবার মতো ওকেও চুপ করিয়ে দিতে হবে।

অর্কর সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

তার বাবার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না?

তাহলে কি কেউ তাঁকে হত্যা করেছিল?

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে।

অর্ক দ্রুত ঘরের কোণে রাখা পুরোনো আলমারির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড পর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল তিনজন লোক।

তাদের মধ্যে একজনের হাতে টর্চ, অন্যজনের হাতে কালো ব্যাগ। তৃতীয় লোকটির মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তার মাথায় কালো টুপি, মুখের অর্ধেক ঢাকা।

টর্চের আলো দরজার ওপর লেখা নামটার দিকে পড়ল।

“অর্কর ঘর।”

লোকটি ফিসফিস করে বলল, —এখানেই আছে।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে সেই শিশুকণ্ঠ আবার শোনা গেল।

—দাদা, ওদের বিশ্বাস কোরো না!

তিনজন লোক একসঙ্গে পিছিয়ে গেল।

কালো টুপিওয়ালা লোকটি পকেট থেকে একটা চাবি বের করল। তালায় চাবি ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে ঘোরাল।

ক্লিক।

দরজাটা খুলে গেল।

কিন্তু ঘরের ভেতরে কেউ নেই।

শুধু মাঝখানে রাখা একটি ছোট্ট কাঠের খাট। তার ওপর সাদা চাদর। আর চাদরের ওপর পড়ে রয়েছে একটি পুরোনো লাল রঙের খেলনা গাড়ি।

অর্ক খেলনা গাড়িটা দেখেই চিনতে পারল।

এটা তার নিজের খেলনা ছিল।

বারো বছর আগে বাবার মৃত্যুর দিন গাড়িটা হারিয়ে গিয়েছিল।

কালো টুপিওয়ালা লোকটি খেলনাটা হাতে তুলে নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, —ও ফিরে এসেছে।

অন্য লোকটি জিজ্ঞেস করল, —কী বলছ?

—অমিতাভর ছেলে ফিরে এসেছে। তার মানে চতুর্থ মানুষটাও আর বেশি দিন লুকিয়ে থাকবে না।

অর্কর মনে হলো, তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।

চতুর্থ মানুষটি এখনও বেঁচে আছে!

ঠিক তখনই আলমারির আড়ালে তার মোবাইলটা কেঁপে উঠল।

একটি নতুন বার্তা।

অজানা নম্বর থেকে।

“অর্ক, ওদের সামনে বেরিয়ো না। তোমার বাবাকে যারা মেরেছিল, তাদের মধ্যে একজন এখন তোমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।”

অর্কর রক্ত হিম হয়ে গেল।

কারণ বার্তাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার ঘাড়ের কাছে কারও গরম নিঃশ্বাস অনুভব করল সে।

তার কানের পাশে একটি পরিচিত কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠল—

—এত বছর পরেও আমাকে চিনতে পারলি না, অর্ক?

অর্ক ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরল।

অন্ধকারের মধ্যে যে মুখটা দেখতে পেল, সেই মুখ দেখার জন্য সে কখনও প্রস্তুত ছিল না।

কারণ লোকটি আর কেউ নয়।

তার নিজের মৃত বাবা অমিতাভ সেন!

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *