Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : মাটির নিচে চাপা পড়া ঘণ্টাধ্বনি।

বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতি বছর বর্ষার পর অদ্ভুত একটা শব্দ শোনা যেত।

সন্ধ্যার দিকে মাটির নিচ থেকে ভেসে আসত—

ঢং… ঢং… ঢং…

গ্রামের লোকেরা বলত, ওটা নাকি মাটির নিচে চাপা পড়া মন্দিরের ঘণ্টা।

কিন্তু কেউ কখনও সেই ঘণ্টা দেখেনি।

গ্রামের স্কুলশিক্ষক সৌরভ এসব গল্পে বিশ্বাস করতেন না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তিনিও সেই শব্দ শুনলেন।

কিন্তু শব্দটা এবার অন্যরকম।

যেন খুব গভীর মাটি থেকে আসছে।

পরদিন সৌরভ স্কুলের কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে জায়গাটা পরীক্ষা করতে গেলেন।

এক ছাত্র রাকেশ বলল,

“স্যার, এখানে মাটি অন্য জায়গার থেকে নরম।”

সৌরভ লাঠি দিয়ে মাটি খুঁচিয়ে দেখলেন।

সত্যিই নিচে ফাঁপা শব্দ।

কয়েকজন গ্রামবাসীকে ডেকে মাটি সরানোর কাজ শুরু হল।

প্রায় চার ফুট নিচে একটি পাথরের কাঠামো বেরিয়ে এল।

আর তার মধ্যে একটি লোহার দরজা।

দরজা খুলতেই সবাই অবাক।

নিচে নামার জন্য সরু সিঁড়ি।

সৌরভ টর্চ জ্বালিয়ে নামলেন।

সিঁড়ির শেষে একটি ছোট ঘর।

ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল পুরোনো ঘণ্টা।

কিন্তু ঘণ্টাটি নড়ার কোনো সুযোগ নেই।

তাহলে শব্দ আসে কীভাবে?

সৌরভ চারপাশ পরীক্ষা করতে লাগলেন।

দেয়ালে খোদাই করা কিছু লেখা দেখতে পেলেন।

বাংলা অক্ষরে লেখা—

“বিপদের দিনে এই ঘণ্টা বাজবে।”

আরেক পাশে একটি সাল—

১৮৯৮।

সৌরভ বুঝলেন, এটি কোনো সাধারণ মন্দির নয়।

এটি ছিল গ্রামের পুরোনো সতর্কবার্তা কেন্দ্র।

ঠিক তখন রাকেশ চিৎকার করে বলল,

“স্যার! এখানে আরেকটা দরজা!”

দরজার ওপারে আরও একটি সরু পথ।

পথটি মাটির নিচ দিয়ে গ্রামের পুরোনো বাঁধের দিকে গিয়েছে।

হঠাৎ সৌরভের মনে পড়ল, গত কয়েকদিন ধরে গ্রামের নদীর জল অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।

সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এসে বাঁধ পরীক্ষা করতে গেল।

বাঁধের একটি অংশে বড় ফাটল।

যদি রাতের বৃষ্টিতে নদীর জল আরও বাড়ে, তাহলে বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।

সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চায়েত ও প্রশাসনকে খবর দিলেন।

কিন্তু গ্রামের মানুষ প্রথমে গুরুত্ব দিল না।

তখন সৌরভ তাদের ভূগর্ভস্থ ঘণ্টাটি দেখালেন।

এক বৃদ্ধ বললেন,

“আমার ঠাকুরদা বলতেন, এই ঘণ্টা একবার বাজলে গ্রামের সবাইকে উঁচু জায়গায় চলে যেতে হতো।”

“কিন্তু এখন তো ঘণ্টা বাজে না।”

বৃদ্ধ বললেন,

“হয়তো আমরা ভুলে গেছি কীভাবে বাজাতে হয়।”

সৌরভ ঘণ্টাটির কাঠামো পরীক্ষা করলেন।

দেখলেন, মাটির নিচে একটি পুরোনো লোহার দড়ি চলে গেছে বাঁধের কাছে।

সম্ভবত নদীর জল নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠলে জলচাপের কারণে দড়িটি টানত এবং ঘণ্টা বাজত।

কিন্তু বহু বছর ধরে ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে।

সৌরভ সেই পুরোনো ব্যবস্থাটি মেরামত করার চেষ্টা করলেন।

সেই রাতেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হল।

নদীর জল দ্রুত বাড়তে লাগল।

মাঝরাতে হঠাৎ—

ঢং!

তারপর—

ঢং!

ঢং!

পুরো গ্রাম কেঁপে উঠল।

মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বৃদ্ধরা বুঝে গেলেন—এটি সতর্কবার্তা।

সৌরভ মাইক নিয়ে সবাইকে উঁচু জায়গায় চলে যেতে বললেন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাঁধের সেই অংশ ভেঙে গেল।

জল গ্রামে ঢুকল।

কিন্তু ততক্ষণে প্রায় সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।

সকাল হলে দেখা গেল, গ্রামের নিচু এলাকার অনেক বাড়ি জলে ডুবে গেছে।

কিন্তু প্রাণহানি হয়নি।

প্রশাসনের লোকেরা এসে পুরোনো ভূগর্ভস্থ ঘরটি দেখতে চাইল।

সৌরভ তাদের সব দেখালেন।

একজন ইতিহাসবিদ বললেন,

“এটি শুধু ঘণ্টাঘর নয়। এটি একশো বছরেরও বেশি পুরোনো একটি স্থানীয় দুর্যোগ-সতর্কতা ব্যবস্থা।”

গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিল, জায়গাটি আর মাটির নিচে চাপা থাকবে না।

ঘণ্টাটি তুলে এনে গ্রামের উঁচু জায়গায় স্থাপন করা হল।

তার পাশে একটি ফলক লাগানো হল—

“যে ঘণ্টা একদিন মানুষকে বাঁচাত, তাকে ভুলে গেলে বিপদও একদিন আমাদের ভুলে যায়।”

রাকেশ একদিন সৌরভকে জিজ্ঞেস করল,

“স্যার, ঘণ্টাটা কি সত্যিই নিজে নিজে বাজে?”

সৌরভ হাসলেন।

“না। ঘণ্টা নিজে কাউকে বাঁচাতে পারে না।”

“তাহলে?”

“মানুষকে সতর্ক করে। বাঁচায় মানুষই।”

রাকেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তাহলে আমরা ঘণ্টাটাকে মনে রাখব।”

সৌরভ মাথা নাড়লেন।

দূরে তখন পুরোনো ঘণ্টাটি ঝুলছে।

হাওয়ায় সামান্য দুলছে।

কিন্তু এবার তার শব্দ শুধু ভয়ের নয়।

এটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, সতর্কতা আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার প্রতীক।।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *