রাত তখন সাড়ে এগারোটা। অনিক নিজের নতুন ফ্ল্যাটে বসে কাজ করছিল। শহরের একটি বহুতলের দশতলায় তার ফ্ল্যাট। বাড়িটি আধুনিক, নিরাপদ এবং সারাক্ষণ মানুষের আনাগোনা।
তবু তিন দিন ধরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল।
রাত ঠিক এগারোটা সতেরো মিনিটে তার শোবার ঘরের দেওয়াল থেকে ক্ষীণ শব্দ আসত।
টক… টক… টক…
প্রথম রাতে সে ভেবেছিল পাইপের শব্দ।
দ্বিতীয় রাতে ভেবেছিল পাশের ফ্ল্যাটের কোনো কাজ।
তৃতীয় রাতে শব্দটা আরও পরিষ্কার হল।
টক… টক… টক…
তারপর খুব নিচু স্বরে যেন কেউ বলল—
“শুনতে পাচ্ছেন?”
অনিকের শরীর কেঁপে উঠল।
সে দেওয়ালের কাছে কান রাখল।
কিছু নেই।
পরদিন সকালে মিস্ত্রিকে ডেকে দেওয়াল পরীক্ষা করাল।
মিস্ত্রি বলল,
“দেওয়ালের মধ্যে পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন আছে। শব্দ হতে পারে।”
অনিক কথাটা মেনে নিল।
কিন্তু সেই রাতেই আবার শব্দ হল।
এবার শব্দের পর একটি বাক্য পরিষ্কার শোনা গেল—
“ওরা আমাকে খুঁজছে।”
অনিক সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সে বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তারক্ষী হরিকে জিজ্ঞেস করল,
“এই ফ্ল্যাটে আগে কে থাকত?”
হরি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“একজন ব্যাংককর্মী। নাম অমিত।”
“কতদিন আগে?”
“প্রায় দুই বছর।”
“তারপর?”
“একদিন হঠাৎ ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যায়।”
“কোথায়?”
হরি মাথা নাড়ল।
“জানি না।”
অনিকের কৌতূহল বাড়ল।
সে বাড়ির পুরোনো রক্ষণাবেক্ষণের নথি দেখতে চাইল।
সেখানে একটি তথ্য পেল—
দুই বছর আগে দশতলার ওই অংশের দেওয়াল ভেঙে নতুন করে বানানো হয়েছিল।
কেন?
নথিতে লেখা—“বিশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণে।”
অনিক এবার পুলিশের এক পরিচিত অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
তদন্তে জানা গেল, অমিত যে ব্যাংকে কাজ করত সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ তছরুপের একটি ঘটনা ঘটেছিল।
অমিত নিখোঁজ হওয়ার আগে কয়েকজন সন্দেহজনক ব্যক্তির নাম জানিয়েছিল।
কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনিকের মনে হল, দেওয়ালের শব্দের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক আছে।
একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে দেওয়ালের অংশ পরীক্ষা করা হল।
দেওয়ালের ভেতর থেকে একটি সরু পাইপের মতো ফাঁপা অংশ পাওয়া গেল।
তার মধ্যে একটি ছোট রেকর্ডিং ডিভাইস।
ডিভাইসটি চালু করতেই অমিতের কণ্ঠ শোনা গেল।
“যদি কেউ এটা পায়, তাহলে বুঝবেন আমি বিপদে আছি।”
তারপর কয়েকজন মানুষের কথোপকথন।
টাকার হিসাব।
ব্যাংকের নথি।
আর একটি নাম।
একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর।
অনিক বুঝল, অমিত দেওয়ালের ভেতর প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হল, অমিত কোথায়?
তদন্তকারী দল পুরোনো নথি খুঁজে জানতে পারল, অমিতকে শেষবার একটি গাড়িতে উঠতে দেখা গিয়েছিল।
গাড়িটির মালিক সেই ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।
মামলা নতুন মোড় নিল।
কয়েকদিন পর অমিতের সন্ধান পাওয়া গেল অন্য শহরে।
সে জীবিত।
ভয়ে পরিচয় গোপন করে ছিল।
অমিত পুলিশকে বলল,
“আমি জানতাম, আমার কাছে প্রমাণ আছে সেটা ওরা বুঝে গেছে। তাই ডিভাইসটা দেওয়ালের ভেতর রেখে পালিয়ে যাই।”
অনিক জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু রাতে যে শব্দ শুনতাম?”
অমিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“আমি একটা সময় ডিভাইসটায় টাইমার সেট করেছিলাম। প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময়ে কয়েক সেকেন্ডের রেকর্ডিং চালু হওয়ার কথা ছিল।”
“কিন্তু আপনি তো চলে গিয়েছিলেন!”
অমিত বলল,
“আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বাড়ি ভাঙার সময় ডিভাইসটা নষ্ট হয়ে গেছে।”
অনিক জানালার বাইরে তাকাল।
“আপনি কি জানতেন, কেউ নতুন করে এই ফ্ল্যাটে থাকবে?”
অমিত মাথা নাড়ল।
“না।”
মামলার তদন্ত এগোল।
রেকর্ডিংয়ের সূত্র ধরে বড় আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ সামনে এল।
অনেকদিনের রহস্যের সমাধান হল।
কয়েক সপ্তাহ পর অনিক নিজের ঘরের সেই দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
দেওয়ালটি পুরোপুরি মেরামত করা হয়েছে।
আর কোনো শব্দ নেই।
তবু সেদিন রাত এগারোটা সতেরো মিনিটে অনিক হঠাৎ থেমে গেল।
টক… টক…
সে চমকে দেওয়ালের দিকে তাকাল।
আবার—
টক… টক… টক…
তারপর খুব ক্ষীণ একটি শব্দ।
“ধন্যবাদ।”
অনিক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সে জানত, প্রযুক্তির ব্যাখ্যা হয়তো এর পেছনে আছে।
তবু মানুষের মন সবকিছুর ব্যাখ্যা মানতে চায় না।
সে দেওয়ালে হাত রেখে ধীরে বলল,
“আপনার সত্যিটা এবার আর দেয়ালের মধ্যে আটকে নেই।”
তারপর ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সেই রাতের পর আর কোনো শব্দ শোনা যায়নি।
কখনও কখনও সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায়।
কিন্তু চিরদিনের জন্য নয়।
কারণ সত্যের নিজেরও এক ধরনের শব্দ আছে—
যে শব্দ কোনো না কোনোদিন দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসবেই।