ক্যানসার নিয়ে মানুষের ভয় বহু পুরনো। কিন্তু ক্যানসারের কারণ কী, পরিবেশের কোন উপাদান শরীরের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘদিনের কোনো অভ্যাস কীভাবে শরীরে জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের বহু দশক ধরে গবেষণা করতে হয়েছে।
ভারতের সেই গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ড. রাজনী এ. ভিসে।
তিনি ছিলেন একজন জীবরসায়নবিদ ও ক্যানসার গবেষক। তাঁর বিশেষ গবেষণার ক্ষেত্র ছিল environmental carcinogenesis, molecular epidemiology এবং বিভিন্ন পরিবেশগত ও পেশাগত ঝুঁকির সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক। Indian Medical Association-এর একটি প্রকাশনাতেও তাঁকে পরিবেশগত carcinogenesis এবং molecular epidemiology-র গবেষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তাঁর কাজ কেবল গবেষণাগারের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তামাক, পানমশলা এবং অন্যান্য চিবোনো তামাকজাত দ্রব্যের সম্ভাব্য ক্যানসার-ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এবং সেই ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিও তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
বিজ্ঞানের পথে যাত্রা
রাজনী এ. ভিসের জন্ম ২০ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে বোম্বাইয়ে, যা বর্তমানে মুম্বই নামে পরিচিত। তিনি University of Bombay থেকে স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরে Indian Cancer Research Centre-এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।
National Book Trust-এর “Women Scientists in India” গ্রন্থে তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি University of Bombay থেকে B.Sc. করার পর Indian Cancer Research Centre-এ যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে সেখান থেকেই উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি Ph.D. লাভ করেন।
এই সময়ে ক্যানসার গবেষণা দ্রুত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছিল। শুধু কোনো অঙ্গের রোগ হিসেবে ক্যানসারকে দেখার পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা কোষ, জিন, পরিবেশ এবং রাসায়নিক পদার্থের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
রাজনী ভিসের গবেষণার ক্ষেত্রও ধীরে ধীরে সেই দিকেই বিস্তৃত হয়।
গবেষণাগার থেকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
উচ্চতর গবেষণার সময় রাজনী ভিসে বিদেশেও কাজের সুযোগ পান।
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Philadelphia-র Institute for Cancer Research-এ ড. Jerome J. Freed-এর গবেষণাগারে Research Assistant হিসেবে কাজ করেন। National Book Trust-এর জীবনীতে বলা হয়েছে, সেখানে তিনি আধুনিক গবেষণাগার-পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
বিদেশের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
কিন্তু তিনি নিজের গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন ভারতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে সামনে রেখে।
ভারতে তামাক ব্যবহার, বিড়ি তৈরি, পানমশালা এবং বিভিন্ন ধরনের চিবোনো তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। ফলে এই অভ্যাসগুলোর সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক বোঝা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ছিল না—এটি জনস্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ক্যানসার গবেষণার নেতৃত্বে
বিদেশ থেকে ফিরে রাজনী ভিসে Cancer Research Institute, Mumbai-তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
National Book Trust-এর জীবনী অনুযায়ী, তিনি সেখানে Carcinogenesis Division-এর প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং গবেষণাগারটির উন্নয়ন ও গবেষণার পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরে তাঁর নিজের জীবনীতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৬–১৯৯০ সময়কালে Genetic Toxicity Unit-এর দায়িত্বে ছিলেন এবং ১৯৯০–২০০১ সাল পর্যন্ত Carcinogenesis Division-এর Head হিসেবে কাজ করেন।
একজন গবেষণা-প্রধানের কাজ শুধু নিজে পরীক্ষা করা নয়। তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, গবেষণার বিষয় নির্বাচন, পরীক্ষার পদ্ধতি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ।
রাজনী ভিসে এই সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিলেন।
তামাকের ক্ষতি নিয়ে অনুসন্ধান
তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তামাক এবং ক্যানসারের সম্পর্ক।
বিশেষ করে পানমশালা, বিড়ি এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের রাসায়নিক প্রভাব নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।
তাঁর নিজের সংক্ষিপ্ত গবেষণা-জীবনীতে বলা হয়েছে, তিনি তামাক ও পানমশালার cancer-causing effect বোঝার জন্য animal models, tissue culture, mutagenicity এবং biochemical assays ব্যবহার করেছিলেন। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের সঙ্গে জিনগত ক্ষতির সম্পর্কও অনুসন্ধান করেন।
এখানে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কেবল একটি রাসায়নিক পদার্থের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করেননি। বরং মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা, পেশা, পরিবেশ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সেই ঝুঁকিকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন।
বিড়ি শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা
ভারতে বিড়ি শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। কিন্তু বিড়ি তৈরির সময় দীর্ঘ সময় তামাকের ধুলো এবং অন্যান্য উপাদানের সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রাজনী ভিসের গবেষণায় এই পেশাগত ঝুঁকিও গুরুত্ব পায়।
Indian Medical Association-এর প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত Genetic Toxicology Laboratory-তে বিড়ি শ্রমিক এবং তামাক প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে পরিবেশগত তামাক-সংস্পর্শের ফলে জিনগত ক্ষতির সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
এই গবেষণার গুরুত্ব ছিল দ্বিমুখী।
একদিকে এটি তামাকের রাসায়নিক ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য দিচ্ছিল। অন্যদিকে, কাজের পরিবেশের সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও সামনে আনছিল।
‘জিন’ এবং পরিবেশের সম্পর্ক
ক্যানসারের ক্ষেত্রে সব মানুষ একই ঝুঁকিতে থাকেন না। একই ধরনের পরিবেশগত সংস্পর্শেও ব্যক্তিভেদে ঝুঁকির পার্থক্য থাকতে পারে।
এই প্রশ্নটি বোঝার জন্য molecular epidemiology অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনী ভিসে এই ক্ষেত্রেও গবেষণা করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে gene-environment interaction বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য কীভাবে তামাকের মতো পরিবেশগত ঝুঁকির প্রভাবকে পরিবর্তিত করতে পারে—তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
২০০৭ সালের একটি গবেষণাপত্রে Rajani A. Bhisey-সহ গবেষকরা ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে oral cancer এবং কিছু নির্দিষ্ট genetic polymorphism-এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তামাকের সংস্পর্শকে একটি গুরুত্বপূর্ণ environmental exposure হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
এ ধরনের গবেষণা ক্যানসারকে শুধুমাত্র একটি রোগ হিসেবে না দেখে জিন + পরিবেশ + জীবনযাপন—এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বোঝার পথকে শক্তিশালী করে।
গবেষণাগারে তৈরি হয়েছিল নতুন মডেল
রাজনী ভিসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক কাজ ছিল পরিবেশগত carcinogens-এর প্রভাব বোঝার জন্য পরীক্ষামূলক animal model তৈরি করা।
তাঁর নিজের গবেষণা-জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, তিনি environmental agents-এর মাধ্যমে tumor initiation এবং promotion বোঝার জন্য বিশেষ animal models তৈরি ও ব্যবহার করেছিলেন।
এই ধরনের মডেল বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়।
কোনো ক্ষতিকর উপাদান শরীরের কোষে কী পরিবর্তন ঘটায়, সেই পরিবর্তন কীভাবে ধীরে ধীরে tumor formation-এর দিকে যেতে পারে—এসব বিষয় সরাসরি মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক মডেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনী ভিসে সেই গবেষণার ক্ষেত্রকে ভারতের ক্যানসার গবেষণায় আরও শক্তিশালী করতে কাজ করেন।
শুধু গবেষক নন, শিক্ষকও
রাজনী ভিসে গবেষণার পাশাপাশি বহু তরুণ বিজ্ঞানীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
তাঁর নিজের তথ্য অনুযায়ী, তিনি University of Bombay-তে Ph.D. ও M.Sc. গবেষণার guide হিসেবে কাজ করেছেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে ১০ জন Ph.D. ও একজন M.Sc. গবেষক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
এটি তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।
একজন বিজ্ঞানীর প্রকাশিত গবেষণাপত্র তাঁর জ্ঞানকে ধরে রাখে। কিন্তু তাঁর ছাত্রছাত্রীরা সেই জ্ঞানকে আরও বহু বছর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
তাই গবেষণাগারের পাশাপাশি একজন ভালো mentor হিসেবেও রাজনী ভিসের অবদান উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশগ্রহণ
তাঁর গবেষণার পরিসর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি International Agency for Research on Cancer-এর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। IARC-এর প্রকাশিত নথিতে Rajani A. Bhisey-কে smokeless tobacco এবং tobacco-specific carcinogens নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক Working Group-এর সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
NCBI Bookshelf-এ প্রকাশিত IARC-এর আরেকটি নথিতেও তাঁকে একই ধরনের আন্তর্জাতিক গবেষণা আলোচনার সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে ভারতীয় তামাক-সম্পর্কিত গবেষণার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
অবসর মানেই গবেষণার শেষ নয়
প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়নি।
তিনি University of Pune-এর সঙ্গে Adjunct Professor হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা-জীবনীতে ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বের উল্লেখ রয়েছে। পরে Mumbai-র Center for Excellence in Basic Sciences-এর সঙ্গেও তিনি Faculty Member হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ তাঁর কাছে গবেষণা ছিল চাকরির নির্দিষ্ট সময়সীমায় আবদ্ধ কোনো কাজ নয়।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গবেষণা, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক জনসচেতনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
বিজ্ঞান থেকে সমাজের দিকে
রাজনী ভিসের জীবনের বিশেষত্ব এখানেই যে, তাঁর গবেষণার বিষয়টি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ছিল—তামাক ও অন্যান্য চিবোনো পণ্যের সংস্পর্শ কীভাবে শরীরে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাতে পারে?
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে তার সামাজিক প্রভাব সীমিত হতে পারত।
তাই তিনি তামাক ও পানমশালার ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজেও গুরুত্ব দিয়েছেন। National Book Trust-এর জীবনীতে তাঁকে oral cancer প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির সঙ্গে যুক্ত একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে বিজ্ঞানীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়।
গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা—এটিও জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরস্কারের চেয়েও বড় উত্তরাধিকার
রাজনী ভিসে Indian National Science Academy-র Fellow ছিলেন; একটি সংকলনে তাঁকে environmental carcinogenesis এবং molecular epidemiology-র বিশেষজ্ঞ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, গবেষণা-অধ্যায় এবং পর্যালোচনামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নিজের দেওয়া সংক্ষিপ্ত CV-তে ৭৫টি full-length paper, chapter ও review-এর উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু তাঁর কাজের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু প্রকাশনার সংখ্যায় মাপা যায় না।
তিনি এমন একটি সময়ে ভারতে ক্যানসার গবেষণা করেছেন, যখন molecular epidemiology এবং genetic toxicology এখনও সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত শব্দ।
তিনি গবেষণার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন—ক্যানসার শুধু ভাগ্যের বিষয় নয়; পরিবেশ, পেশা, জীবনযাপন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের পারস্পরিক সম্পর্কও রোগের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এক বিজ্ঞানীর দীর্ঘ পথ
রাজনী এ. ভিসের জীবন একদিকে গবেষণাগারের কঠিন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের গল্প, অন্যদিকে সমাজের জন্য বিজ্ঞানের ব্যবহারিক মূল্য বোঝার গল্প।
বোম্বাইয়ের এক তরুণী ছাত্রী থেকে ক্যানসার গবেষক, বিদেশের গবেষণাগার থেকে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব, Genetic Toxicology Laboratory থেকে আন্তর্জাতিক IARC Working Group—তাঁর পথ ছিল বহুমাত্রিক।
তিনি দেখিয়েছেন, একজন বিজ্ঞানীর কাজ কেবল নতুন তথ্য আবিষ্কার করা নয়।
কখনও সেই কাজের অর্থ হলো একটি বিপজ্জনক অভ্যাসের বৈজ্ঞানিক ক্ষতি বোঝানো।
কখনও তার অর্থ শ্রমিকদের অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করা।
কখনও আবার তরুণ গবেষকদের হাতে সেই জ্ঞান তুলে দেওয়া।
শেষ কথা
ড. রাজনী এ. ভিসের গবেষণার কেন্দ্রে ছিল এমন এক শত্রু, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না—কোষের ভিতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন।
তামাকের ধোঁয়া বা চিবোনো তামাকের রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করার পর কীভাবে জিনগত ক্ষতি তৈরি করতে পারে, পরিবেশগত সংস্পর্শ কীভাবে carcinogenesis-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে তিনি কয়েক দশক গবেষণা করেছেন।
তাঁর জীবন তাই শুধু একজন ক্যানসার গবেষকের জীবনী নয়।
এটি এমন একজন বিজ্ঞানীর গল্প, যিনি গবেষণাগারের মাইক্রোস্কোপ থেকে সমাজের বাস্তব জীবন পর্যন্ত বিজ্ঞানের সেতু তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
বিজ্ঞান কখনও কখনও খুব নিঃশব্দে মানুষের জীবন বদলে দেয়। একটি গবেষণাগারের পরীক্ষা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু সেই গবেষণা যদি কোনো রোগের কারণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেয়, ভবিষ্যৎ গবেষণাকে এগিয়ে দেয় কিংবা একটি বিপজ্জনক অভ্যাস সম্পর্কে সমাজকে সতর্ক করে—তাহলে তার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।
ড. রাজনী এ. ভিসের দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক জীবন সেই নীরব অথচ গভীর প্রভাবেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।