Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: পাথরের ভেতর লুকিয়ে থাকা পাখি।।

পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট শহরে থাকতেন ভাস্কর নীলকান্ত। পাথর কেটে মূর্তি তৈরি করাই ছিল তাঁর পেশা। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় শক্ত, নির্জীব পাথরেও যেন প্রাণ ফুটে উঠত।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাজের চাহিদা কমতে লাগল। বড় বড় কারখানায় তৈরি মূর্তি কম দামে বিক্রি হওয়ায় কেউ আর হাতে তৈরি শিল্পকর্মের জন্য অপেক্ষা করতে চাইত না।

তবু নীলকান্ত প্রতিদিন তাঁর কর্মশালায় বসতেন।

একদিন তাঁর কাছে এল এক তরুণী। নাম অন্বেষা। সে শিল্পকলার ছাত্রী।

অন্বেষা কর্মশালার এক কোণে পড়ে থাকা বড় কালো পাথরটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“গুরুজি, এই পাথরটা দিয়ে কী বানাবেন?”

নীলকান্ত বললেন,

—“এখনও ঠিক করিনি।”

অন্বেষা হেসে বলল,

—“এত বড় পাথর, অথচ আপনি জানেন না এর মধ্যে কী আছে?”

নীলকান্ত পাথরটির গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন,

—“আমি জানি না এর মধ্যে কী আছে। শুধু জানি, অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো সরিয়ে দিতে পারলে কিছু একটা বেরিয়ে আসবে।”

কথাটা অন্বেষার মনে গেঁথে গেল।

সে প্রতিদিন কর্মশালায় আসতে শুরু করল। নীলকান্তের কাজ দেখত, পাথরের গায়ে হাত বোলাত, কখনও নকশা আঁকত।

একদিন অন্বেষা বলল,

—“আমি একটা পাখি বানাতে চাই।”

নীলকান্ত জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেমন পাখি?”

—“যে উড়তে পারে না, তবু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।”

নীলকান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তাহলে পাথরটা তুমিই কাটবে।”

অন্বেষা ভয় পেয়ে গেল।

—“আমি পারব না! ভুল হলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।”

নীলকান্ত শান্ত গলায় বললেন,

—“ভুল করার ভয়েই যদি হাত না চালাও, তবে পাথরের ভেতরে যে পাখি লুকিয়ে আছে, সে কোনওদিন বেরোবে না।”

অন্বেষা কাজ শুরু করল।

প্রথম দিন পাথরের একটি ছোট অংশ ভেঙে গেল। দ্বিতীয় দিন পাখির ডানার রেখা বেঁকে গেল। কয়েকবার সে কাজ ছেড়ে দিতে চাইল।

প্রতিবার নীলকান্ত তাকে শুধু একটি কথাই বলতেন,

—“ধীরে করো। পাথরের সঙ্গে লড়াই কোরো না, তাকে বোঝার চেষ্টা করো।”

মাসখানেক পরে পাথরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটি পাখির অবয়ব ফুটে উঠল। তার ডানা দুটো শরীরের গায়ে ভাঁজ করা, মাথা সামান্য উঁচু, চোখ স্থির আকাশের দিকে।

পাখিটি উড়তে পারত না।

কিন্তু তার ভঙ্গিতে ছিল উড়ে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা।

মূর্তিটি দেখে নীলকান্ত দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

অন্বেষা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

—“ভালো হয়নি?”

বৃদ্ধ ভাস্কর মৃদু হেসে বললেন,

—“আমি এত বছর ধরে পাথর কেটেছি। আজ বুঝলাম, শুধু পাথরের ভেতর থেকে মূর্তি বের করতে হয় না। নিজের ভেতরের ভয়টাকেও একটু একটু করে সরাতে হয়।”

অন্বেষা মূর্তিটির নাম দিল ‘আকাশের অপেক্ষা’।

শিল্পকলার প্রদর্শনীতে মূর্তিটি বিশেষ প্রশংসা পেল। কিন্তু অন্বেষার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল অন্য কিছু।

প্রদর্শনী শেষে সে ফিরে এসে নীলকান্তকে বলল,

—“গুরুজি, আমি নিজের কর্মশালা খুলব। যারা ভাবে তারা কিছুই পারে না, তাদের নিয়ে কাজ করব।”

নীলকান্ত বললেন,

—“তাহলে একটা কথা মনে রেখো। কাউকে তার দুর্বলতা দেখে বিচার কোরো না।”

—“কেন?”

—“কারণ তুমি জানো না, তার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে।”

কয়েক বছর পর নীলকান্ত আর পাথর কাটতে পারতেন না। তাঁর হাত কাঁপত, চোখেও আগের মতো জোর ছিল না।

অন্বেষা তাঁর কর্মশালার দায়িত্ব নিল। সেখানে নতুন শিল্পীরা আসতে শুরু করল। কেউ ভাঙা পাথর নিয়ে, কেউ অসম্পূর্ণ নকশা নিয়ে, কেউ আবার নিজের ওপর সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে।

দরজার সামনে একটি পাথরের পাখি রাখা থাকত।

তার নিচে খোদাই করা ছিল—

“ডানা না থাকলেও আকাশের দিকে তাকানো যায়। আর সাহস থাকলে একদিন নিজের আকাশও তৈরি করা যায়।”

শিক্ষা: মানুষের সামর্থ্য সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ধৈর্য, অনুশীলন আর বিশ্বাস অনেক সময় আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে প্রকাশ করে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *