Categories
অনুগল্প বিবিধ

নীরবতার ভাষা।।

শহরের এক পুরোনো পাড়ায় থাকত বারো বছরের মেয়ে তিথি। সে খুব চঞ্চল, কথা বলতে ভালোবাসত, আর নতুন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে তার একটুও সময় লাগত না। কিন্তু তাদের বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটে নতুন পরিবারটি আসার পর তিথির কৌতূহল যেন আরও বেড়ে গেল।

পরিবারে ছিলেন এক বৃদ্ধা, তাঁর ছেলে এবং বছর দশেকের একটি ছেলে—নাম নীল। নীলকে প্রায়ই বারান্দায় বসে থাকতে দেখা যেত। অন্য ছেলেমেয়েরা খেলতে এলে সে দূর থেকে তাদের দেখত, কিন্তু কখনও খেলায় যোগ দিত না।

একদিন তিথি সাহস করে নীলের কাছে গেল।

“তুমি আমাদের সঙ্গে খেলতে আসো না কেন?”

নীল কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসল।

তিথি আবার প্রশ্ন করল, “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না?”

নীল মাথা নাড়ল। তারপর নিজের আঙুল দিয়ে ইশারা করে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করল। তিথি কিছুই বুঝতে পারল না। একটু অস্বস্তি নিয়ে সে চলে এল।

সন্ধ্যায় মাকে সব কথা বলতেই মা জানালেন, নীল কানে শুনতে পায় না এবং কথা বলতেও পারে না। সে ইশারা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে নিজের মনের কথা প্রকাশ করে।

তিথি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করব কীভাবে?”

মা মৃদু হেসে বললেন, “বন্ধুত্ব করতে সব সময় কথার প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও মন দিয়ে দেখলেই অনেক কথা বোঝা যায়।”

কথাটা তিথির মনে গেঁথে গেল।

পরের দিন স্কুল থেকে ফিরে সে খাতায় কয়েকটি সহজ ইশারা আঁকল। মায়ের সাহায্যে শিখল—‘নমস্কার’, ‘বন্ধু’, ‘খেলা’, ‘ধন্যবাদ’—এই শব্দগুলির সংকেত। কয়েক দিন ধরে সে অনুশীলন করল। ভুল হলে নিজেই হেসে ফেলত, আবার নতুন করে চেষ্টা করত।

এক বিকেলে তিথি নীলের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দুহাত তুলে শিখে রাখা ইশারায় বলল, “তুমি কি আমার বন্ধু হবে?”

নীলের মুখটা মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আনন্দে মাথা নেড়ে তিথিকে ঘরে ডাকল।

সেদিন থেকে শুরু হল তাদের বন্ধুত্ব। তারা ছবি এঁকে, বল ছুড়ে, মুখভঙ্গি করে আর ছোট ছোট ইশারা শিখে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। তিথি বুঝতে পারল, নীলও তার মতোই হাসতে ভালোবাসে, নতুন খেলা আবিষ্কার করে এবং ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ভীষণ আনন্দ পায়।

কিন্তু একদিন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় সমস্যা দেখা দিল। নীলও অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চেয়েছিল। সে মঞ্চে একটি ছোট নাটকে অভিনয় করতে আগ্রহী ছিল। কয়েকজন ছাত্র আপত্তি জানাল। তাদের বক্তব্য, নীল তো সংলাপ বলতে পারবে না, তাই নাটকে তাকে নেওয়া সম্ভব নয়।

কথাগুলো শুনে তিথির খুব খারাপ লাগল। সে শিক্ষিকার কাছে গিয়ে বলল, “নাটকে কি শুধু মুখে কথা বললেই অভিনয় হয়? নীল ইশারায় কথা বলতে পারে। আমরা এমন একটা নাটক করতে পারি, যেখানে কথার পাশাপাশি ইশারাও থাকবে।”

শিক্ষিকা কিছুক্ষণ ভেবে রাজি হলেন।

শুরু হল নতুন প্রস্তুতি। তিথি ও তার বন্ধুরা নীলের কাছ থেকে কয়েকটি ইশারা শিখল। নাটকটির বিষয় ছিল—একটি স্কুলে নতুন আসা শিশুকে সবাই মিলে আপন করে নেওয়া। সেখানে কিছু সংলাপ বলা হবে, কিছু কথা প্রকাশ পাবে ইশারায়, আর বাকিটা ফুটে উঠবে মুখের অভিব্যক্তি ও অভিনয়ের মাধ্যমে।

অনুষ্ঠানের দিন দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে নাটকটি দেখল। নীল যখন মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইশারায় বন্ধুত্বের বার্তা প্রকাশ করল, তখন পুরো হল হাততালিতে ভরে উঠল। নীলের চোখে আনন্দের জল চিকচিক করছিল।

অনুষ্ঠান শেষে সেই ছাত্রদের একজন, যারা প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিল, নীলের কাছে এসে ইশারায় ‘বন্ধু’ বলতে চেষ্টা করল। তার ইশারা নিখুঁত হয়নি, কিন্তু নীল হেসে তাকে ঠিক করে দিল।

তিথি দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে বুঝল, তাদের নাটক শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না। সেটি অনেকের মনে নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছে।

এরপর স্কুলে সপ্তাহে একদিন ইশারার ভাষা শেখার ছোট ক্লাস শুরু হল। তিথি আর নীল সেখানে অন্যদের সঙ্গে অনুশীলন করত। ধীরে ধীরে নীল আর একা বসে থাকত না। তার চারপাশে তৈরি হল এমন একটি বন্ধুত্বের বৃত্ত, যেখানে সবাই কথা বলার জন্য একই পদ্ধতি ব্যবহার করত না, তবু একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করত।

একদিন নীল খাতায় একটি ছবি আঁকল। ছবিতে দুটি হাত পাশাপাশি রাখা, আর তাদের মাঝখানে একটি ছোট হৃদয়। নিচে সে ইশারার ভাষায় লিখল—“বোঝার ইচ্ছাই সবচেয়ে বড় ভাষা।”

তিথি ছবিটা দেখে হাসল।

সে বুঝেছিল, নীরবতা মানেই শূন্যতা নয়। অনেক সময় সেখানে এমন সব কথা লুকিয়ে থাকে, যা শোনার জন্য কান নয়, প্রয়োজন মনোযোগ, ধৈর্য আর আন্তরিকতা।

শিক্ষা: মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ গড়ে ওঠে শুধু কথার মাধ্যমে নয়, পারস্পরিক সম্মান, বোঝার চেষ্টা এবং হৃদয়ের আন্তরিকতার মাধ্যমে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *