১. যে জমিতে আর ফসল হতো না
পূর্ব মেদিনীপুরের এক গ্রাম, নাম উত্তর কাশীপুর। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় ধান, শীতকালে সবজি আর গরমকালে তিল কিংবা ডাল চাষ করেই বহু পরিবারের সংসার চলত।
কিন্তু কয়েক বছর ধরে গ্রামের কৃষকদের মুখে হাসি কমে আসছিল। কোথাও জমিতে আগের মতো ফসল হচ্ছিল না, কোথাও গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছিল, আবার কোথাও সামান্য সার দিলেও ফলন বাড়ছিল না। কৃষকেরা বুঝতে পারছিলেন, জমির মধ্যে কোথাও একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা ঠিক কী, তা তাঁরা জানতেন না।
সেই গ্রামেই থাকত সতেরো বছরের মেয়ে ইলা। তার বাবা নিতাই মণ্ডল ছিলেন কৃষক। তাঁদের অল্প কয়েক বিঘা জমি ছিল। সেই জমির ফসল বিক্রি করেই সংসারের বেশিরভাগ খরচ চলত।
ইলা ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে যেত। কখনও বীজ বাছতে সাহায্য করত, কখনও ধানের চারা রোপণের সময় মায়ের পাশে বসে থাকত। মাঠের মাটি তার কাছে শুধু ধুলোবালি ছিল না; সে জানত, এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের পরিবারের প্রতিটি দিনের হিসাব।
একদিন সকালে বাবা মাঠ থেকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —এবারও জমির এক অংশে ধান ভালো হলো না। এত সার দিয়েও লাভ হলো না।
মা চিন্তিত হয়ে বললেন, —তাহলে এ বছর ঋণের টাকা শোধ হবে কী করে?
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
দরজার পাশে বসে ইলা সব শুনছিল। তার মনে প্রশ্ন জাগল, এত পরিশ্রমের পরও জমি কেন আগের মতো ফসল দিচ্ছে না?
সেদিন থেকেই সে সমস্যার উত্তর খুঁজতে শুরু করল।
২. বিজ্ঞানের ক্লাসে নতুন প্রশ্ন
ইলা তখন উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল। তাদের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক প্রশান্তবাবু একদিন মাটির গঠন, উদ্ভিদের পুষ্টি এবং কৃষির ওপর পরিবেশের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
ইলা হাত তুলে জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, একই জমিতে বারবার চাষ করলে কি মাটির গুণাগুণ বদলে যেতে পারে?
শিক্ষক বললেন, —অবশ্যই। ফসলের ধরন, সারের ব্যবহার, জল নিষ্কাশন, মাটির অম্লত্ব কিংবা ক্ষারত্ব—অনেক বিষয়ই জমির উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। তবে কোনো জমিতে সমস্যা হলে অনুমান করে ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক নয়। মাটির পরীক্ষা করানো দরকার।
ইলা মন দিয়ে কথাগুলো শুনল।
ক্লাসের পরে সে শিক্ষকের কাছে গিয়ে নিজের গ্রামের সমস্যার কথা জানাল।
প্রশান্তবাবু বললেন, —তুমি চাইলে স্কুলের বিজ্ঞান প্রকল্প হিসেবে বিষয়টা নিয়ে কাজ করতে পারো। প্রথমে কৃষকদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করো। তারপর কৃষি দপ্তর বা মাটি পরীক্ষার উপযুক্ত কেন্দ্রের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করো।
ইলার চোখে নতুন স্বপ্ন জ্বলে উঠল।
সে ঠিক করল, শুধু বাবার জমি নয়, গ্রামের অন্য কৃষকদের জমির সমস্যাও বোঝার চেষ্টা করবে।
৩. গ্রামের মানুষের অবিশ্বাস
পরের কয়েক দিন ইলা গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কেউ বললেন, আগের মতো বৃষ্টি হয় না। কেউ বললেন, সার নকল হতে পারে। কেউ আবার বিশ্বাস করতেন, জমির ওপর কোনো অশুভ প্রভাব পড়েছে।
ইলা প্রত্যেকের কথা মন দিয়ে শুনত এবং খাতায় লিখে রাখত।
একদিন সে গ্রামের প্রবীণ কৃষক রঘুনাথ কাকুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, —কাকু, আপনার জমিতে কোন ফসল ভালো হয় আর কোনটা হয় না, সেটা কি লিখে রাখেন?
রঘুনাথ কাকু হেসে বললেন, —এত দিন ধরে চাষ করছি, সব মুখস্থ আছে। আবার লিখে রাখব কেন?
ইলা বলল, —লিখে রাখলে হয়তো বোঝা যাবে, কোন বছরে কী পরিবর্তন হয়েছে।
তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, —তুই এখনও ছোট। বই পড়ে চাষ শেখা যায় না। মাঠে নামলে বুঝবি।
কথাটা শুনে ইলার খারাপ লাগল। কিন্তু সে জানত, কৃষকদের অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে শুধু বইয়ের কথা বললে চলবে না।
সে বাবাকে বলল, —আমি কারও অভিজ্ঞতাকে ভুল বলতে চাই না। শুধু জানতে চাই, আমাদের জমিতে ঠিক কী সমস্যা হয়েছে।
বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, —তাহলে খুঁজে দেখ। তবে মনে রাখিস, মাঠের কাজে সময় আর টাকা দুটোই লাগে।
ইলা মাথা নাড়ল।
৪. এক মুঠো মাটির পরীক্ষা
প্রশান্তবাবুর সাহায্যে ইলা জানতে পারল, কাছাকাছি কৃষি সহায়তা কেন্দ্রে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে মাটির নমুনা সংগ্রহের নিয়মও শেখানো হয়।
সে কয়েকজন কৃষককে নিয়ে কেন্দ্রে গেল। কর্মীরা তাদের বোঝালেন, জমির বিভিন্ন অংশ থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে মাটি সংগ্রহ করতে হয়। শুধু এক জায়গা থেকে এক মুঠো মাটি তুলে পরীক্ষা করলে সব সময় পুরো জমির অবস্থা বোঝা যায় না।
ইলা মন দিয়ে নিয়মগুলো লিখে নিল।
তারপর বাবার জমির নির্দিষ্ট অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হলো। অন্য কয়েকজন কৃষকও তাঁদের জমির নমুনা পরীক্ষার জন্য দিলেন।
ফলাফল পেতে কিছুটা সময় লাগল। সেই সময়টায় ইলা জমির ইতিহাস লিখে রাখল—কোন বছরে কী ফসল হয়েছে, কী ধরনের সার ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় জল জমে থাকে এবং কোন অংশে গাছ বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরে সে বুঝল, সব জমির সমস্যা এক নয়। কোনো জমিতে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ইঙ্গিত রয়েছে, কোথাও মাটির অম্লত্ব পরীক্ষা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন, আবার কোথাও জল নিষ্কাশনের সমস্যাও থাকতে পারে।
কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীরা রিপোর্ট অনুযায়ী পরামর্শ দিলেন। তাঁরা জানালেন, মাটির পরীক্ষার ফল বুঝে তবেই সার ব্যবহার করতে হবে। নিজের ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত সার দিলে খরচ বাড়তে পারে, মাটির ক্ষতিও হতে পারে।
ইলা রিপোর্টটি বাবার হাতে দিয়ে বলল, —দেখো বাবা, সব জমিতে একই ব্যবস্থা নিলে হবে না। জমি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিতাইবাবু রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
৫. প্রথম পরিবর্তন
কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে নিতাইবাবু জমির সমস্যাযুক্ত অংশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনলেন। সারের ব্যবহার ঠিক করা হলো, জমির জল নিষ্কাশনের দিকে নজর দেওয়া হলো এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নতুন কিছু পদ্ধতি শেখা হলো।
ইলা বাবাকে বলল, —আমরা এবার ফলন কত হবে, সেটা আগে থেকে ধরে নেব না। বরং কী কী পরিবর্তন করলাম, সেটা লিখে রাখব।
বাবা হেসে বললেন, —তোর এই খাতাটা এখন আমার জমির নতুন হিসাবের বই হয়ে গেছে!
ইলা প্রতিদিন মাঠে গিয়ে গাছের অবস্থা লক্ষ করত। পাতার রং, গাছের বৃদ্ধি, জমিতে জল জমছে কি না—সব নোট করত। সে বুঝতে পারছিল, কৃষিকাজে একবার ব্যবস্থা নিলেই সঙ্গে সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান হয় না।
কিছুদিন পরে গাছের বৃদ্ধি আগের তুলনায় ভালো দেখা গেল। তবে সব অংশে সমান পরিবর্তন হয়নি। কোথাও আরও পরীক্ষা ও পরামর্শের প্রয়োজন ছিল।
ইলা বিষয়টি লুকোল না। সে প্রশান্তবাবুকে বলল, —স্যার, কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সব সমস্যা মেটেনি।
শিক্ষক বললেন, —এটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞান মানে একবার পরীক্ষা করে সব উত্তর পেয়ে যাওয়া নয়। ফলাফল দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করাও বিজ্ঞানের অংশ।
৬. কৃষকদের সভা
ইলার কাজের কথা ধীরে ধীরে গ্রামের অন্য কৃষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। একদিন রঘুনাথ কাকু নিজেই তার কাছে এসে বললেন, —শুনলাম, তোর বাবার জমিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আমার জমিতেও কয়েক বছর ধরে সমস্যা হচ্ছে। কী করা যায় বল তো?
ইলা বলল, —প্রথমে মাটি পরীক্ষা করানো ভালো। আপনার জমির সমস্যাটা বাবার জমির মতো নাও হতে পারে।
রঘুনাথ কাকু এবার আর আপত্তি করলেন না।
প্রশান্তবাবুর উদ্যোগে গ্রামের কৃষকদের নিয়ে একটি আলোচনা সভা হলো। সেখানে কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের একজন কর্মী মাটির স্বাস্থ্য, সারের সঠিক ব্যবহার, ফসলের পর্যায়ক্রম এবং জল সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা করলেন।
ইলা তার খাতায় লেখা পর্যবেক্ষণগুলো দেখাল। সে স্পষ্ট করে বলল, তার কাজ কোনো বিশেষজ্ঞের বিকল্প নয়। বরং কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে সুবিধা হবে।
একজন কৃষক প্রশ্ন করলেন, —মাটি পরীক্ষা করালে কি প্রতি বছরই একই রকম ফল পাওয়া যায়?
কর্মী বুঝিয়ে বললেন, —মাটির অবস্থা সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কত ঘন ঘন পরীক্ষা করা দরকার, তা জমির অবস্থা ও স্থানীয় পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করতে হয়।
সভা শেষে কয়েকজন কৃষক একসঙ্গে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে যোগাযোগ ও যাতায়াতের খরচও কিছুটা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হলো।
ইলার মনে হলো, তার ছোট্ট খাতাটি এবার অনেকের কাজে লাগতে শুরু করেছে।
৭. ঝড়ের মতো নতুন বিপদ
সবকিছু যখন একটু একটু করে ঠিক হচ্ছে, তখন এক বছর অনিয়মিত বৃষ্টিতে গ্রামের কৃষকেরা নতুন সমস্যায় পড়লেন। কখনও অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টি, কখনও আবার দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। কিছু জমিতে জল জমে গাছের ক্ষতি হলো, অন্য জমিতে মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ল।
ইলার বাবাও চিন্তায় পড়লেন।
—মাটি পরীক্ষা করিয়ে কিছুটা বুঝতে পারলাম, কিন্তু আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেব?
ইলা এবার কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীদের কাছে জানতে চাইল, স্থানীয় পরিস্থিতিতে কোন ব্যবস্থা উপযোগী হতে পারে।
তাঁরা জমির ধরন অনুযায়ী জল নিষ্কাশন, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার পদ্ধতি, ফসলের সময় নির্বাচন এবং উপযুক্ত জাত সম্পর্কে পরামর্শ দিলেন। সব ব্যবস্থা সব জমিতে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়—সেটাও তাঁরা স্পষ্ট করে জানালেন।
গ্রামের কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন। যাঁদের জমিতে জল বেশি জমে, তাঁরা নিষ্কাশনের সমস্যার কথা বললেন। যাঁদের জমিতে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, তাঁরা আর্দ্রতা ধরে রাখার অভিজ্ঞতা জানালেন।
ইলা বুঝল, কৃষির সমস্যা শুধু এক মুঠো মাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবহাওয়া, জল, ফসলের ধরন, অর্থনৈতিক সামর্থ্য—সবকিছুর সঙ্গে মাটির সম্পর্ক রয়েছে।
৮. স্কুলের বিজ্ঞান মেলায়
সেই বছর স্কুলে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হলো। ইলা তার প্রকল্পের নাম দিল—‘আমাদের মাটি, আমাদের ভবিষ্যৎ’।
তার টেবিলে রাখা হলো মাটির নমুনা, পর্যবেক্ষণের খাতা, কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের রিপোর্টের ব্যাখ্যা এবং জমির পরিবর্তনের নথি। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করে সে দেখাল, কীভাবে পরীক্ষা ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কৃষির সমস্যাকে ভালোভাবে বোঝা যায়।
বিচারকদের একজন প্রশ্ন করলেন, —তোমার প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?
ইলা বলল, —আমি এমন কোনো আবিষ্কার করিনি, যা সব কৃষকের সমস্যার সমাধান করবে। আমি শিখেছি, একই সমস্যা মনে হলেও জমির প্রকৃত অবস্থা আলাদা হতে পারে। তাই অনুমানের বদলে পরীক্ষা, তথ্য আর বিশেষজ্ঞের পরামর্শের ওপর নির্ভর করা জরুরি।
আরেকজন বিচারক জানতে চাইলেন, —তোমার এই কাজ ভবিষ্যতে কীভাবে এগোতে পারে?
ইলা বলল, —আমরা গ্রামের কৃষকদের জমির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য লিখে রাখতে পারি। কোন ফসল হয়েছে, কী সমস্যা দেখা দিয়েছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব নথি থাকলে পরের বার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। তবে প্রতিটি জমির জন্য উপযুক্ত পরামর্শ কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেই নিতে হবে।
তার প্রকল্পটি বিশেষ প্রশংসা পেল। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় বিষয় ছিল, কয়েকজন শিক্ষক এবং কৃষি বিশেষজ্ঞ তার কাজকে আরও উন্নত করার জন্য পরামর্শ দিতে রাজি হলেন।
৯. মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক
সময়ের সঙ্গে ইলা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। তার ইচ্ছে কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা। সে জানত, পথটা সহজ হবে না। পড়াশোনার খরচ, পরিবারের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সবই তাকে ভাবাত।
তবু সে নিজের খাতা গুছিয়ে রাখত। সেখানে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, কৃষকদের অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন এবং পরবর্তী সময়ে কী পরীক্ষা করা দরকার, তার তালিকাও থাকত।
একদিন বিকেলে বাবা তাকে মাঠে ডাকলেন। ধানের চারা বাতাসে দুলছিল। নিতাইবাবু এক মুঠো মাটি তুলে মেয়ের হাতে দিলেন।
—বল তো, এই মাটির মধ্যে কী আছে?
ইলা মাটি হাতে নিয়ে বলল, —অনেক কিছু। খনিজ, জৈব পদার্থ, জল, বাতাস, অসংখ্য ক্ষুদ্র জীব। আর আমাদের মতো কৃষকদের জীবিকাও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বাবা মৃদু হেসে বললেন, —তুই আগে মাটিকে শুধু আমাদের জমি বলে চিনতিস। এখন দেখছি, তুই মাটির মধ্যে একটা গোটা পৃথিবী দেখতে শিখেছিস।
ইলা বলল, —মাটি ভালো রাখার দায়িত্বও আমাদের। শুধু বেশি ফসল হলেই চলবে না, জমির স্বাস্থ্যও বুঝতে হবে।
বাবা মাথা নাড়লেন।
সন্ধ্যা নেমে আসছিল। দূরে কয়েকজন কৃষক নিজেদের জমির দিকে যাচ্ছিলেন। কেউ সেচের ব্যবস্থা দেখবেন, কেউ পরদিনের কাজের পরিকল্পনা করবেন।
ইলা জানত, তার গ্রামের সব সমস্যা এখনও মেটেনি। কোনো কোনো জমিতে আরও পরীক্ষা দরকার, কোনো পরিবার আর্থিক সমস্যায় রয়েছে, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। কিন্তু একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে—মানুষ এখন প্রশ্ন করছে, তথ্য সংগ্রহ করছে, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছে এবং একে অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছে।
সে মুঠোয় ধরা মাটিটুকু ধীরে ধীরে জমিতে ফিরিয়ে দিল।
তার মনে হলো, এই এক মুঠো মাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে শুধু ফসলের সম্ভাবনা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্বও।
কারণ, মাটিকে বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু জমিকে উর্বর রাখা নয়; মানুষের পরিশ্রম, কৃষকের সম্মান এবং আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তাকে রক্ষা করা।