Categories
গল্প বিবিধ

যে মেয়েটি দাবার বোর্ডে নিজের ভাগ্য লিখেছিল।

১. সাদাকালো ঘরের অদ্ভুত আকর্ষণ

পূর্ব বর্ধমানের এক ছোট্ট গ্রামে থাকত তেরো বছরের মেয়ে অন্বেষা। তার বাবা একটি সাইকেল মেরামতির দোকান চালাতেন। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু অন্বেষার স্বপ্ন দেখতে কোনো বাধা ছিল না।

অন্বেষা পড়াশোনায় ভালো হলেও খুব বেশি কথা বলত না। স্কুলে বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, তখন সে কখনও কখনও স্কুলের পুরোনো বারান্দায় বসে বই পড়ত। তবে তার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল এমন একটি খেলার প্রতি, যার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল এক বৃষ্টির দুপুরে।

সেদিন স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় অন্বেষা শিক্ষকদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ ভেতর থেকে কয়েকজনের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনতে পেল।

—তুমি চালটা বুঝতেই পারোনি!

—দাঁড়াও, এবার তোমার রাজাকে বাঁচানো যাবে না!

কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। দুজন শিক্ষক একটি সাদাকালো বোর্ডের সামনে বসে খেলছিলেন। বোর্ডের ওপর সাজানো ছোট ছোট ঘুঁটিগুলো দেখে অন্বেষার মনে হলো, যেন একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। সেখানে রাজা আছে, রানি আছে, সৈন্য আছে, ঘোড়া আছে। প্রত্যেকের চলার নিয়ম আলাদা।

অন্বেষা জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, এটা কী খেলা?

একজন শিক্ষক হেসে বললেন, —এটা দাবা। খেলতে শিখবে?

অন্বেষা একটু ইতস্তত করে বলল, —আমি পারব?

—চেষ্টা না করলে বুঝবে কী করে?

সেদিন শিক্ষক তাকে দাবার বোর্ডের প্রথম নিয়মগুলো শেখালেন। রাজা কীভাবে চলে, নৌকা কীভাবে চলে, ঘোড়া কেন অন্য ঘুঁটির ওপর দিয়ে লাফ দিতে পারে—সব শুনে অন্বেষা মুগ্ধ হয়ে গেল।

বাড়ি ফেরার পথে তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—কীভাবে আবার দাবা খেলতে পারবে?

২. পুরোনো বোর্ডের নতুন খেলোয়াড়

অন্বেষার বাড়িতে দাবার বোর্ড ছিল না। সে বাবাকে কথাটা বলতেই বাবা হেসে বললেন, —দাবা খেলতে শিখবি? ভালো কথা। তবে এখনই বোর্ড কেনার মতো টাকা হাতে নেই রে।

অন্বেষার মুখ একটু ম্লান হয়ে গেল।

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, —টাকা না থাকলে কী হয়েছে? অন্য কোনো উপায় খুঁজে দেখ।

পরদিন স্কুলে গিয়ে অন্বেষা তার সমস্যার কথা শিক্ষকদের জানাল। গণিতের শিক্ষক অরুণবাবু বললেন, —আমার বাড়িতে একটা পুরোনো দাবার বোর্ড আছে। অনেক দিন ব্যবহার করি না। চাইলে নিয়ে যেতে পারিস।

অন্বেষার আনন্দ দেখে কে!

বোর্ডটি ছিল পুরোনো। কয়েকটি ঘুঁটির রং উঠে গিয়েছিল, একটি সাদা ঘোড়ার কান ভাঙা, আর একটি কালো সৈন্যের মাথায় আঁচড়। কিন্তু অন্বেষার কাছে সেটি যেন গুপ্তধন।

সে বাড়ি ফিরে বোর্ডটি পরিষ্কার করল। ভাঙা ঘুঁটিগুলো আলাদা করে রাখল এবং কাগজে নতুন ঘুঁটির আকার এঁকে অনুশীলন শুরু করল।

প্রথম কয়েক দিন সে নিজের সঙ্গেই খেলত। সাদা ঘুঁটি দিয়ে চাল দিত, তারপর কালো ঘুঁটির দিক থেকে ভাবত কীভাবে সেই চালের উত্তর দেওয়া যায়।

তার মা অবাক হয়ে দেখতেন, মেয়েটি একা একা বোর্ডের সামনে বসে কখনও হাসছে, কখনও কপাল কুঁচকে ভাবছে।

একদিন মা জিজ্ঞাসা করলেন, —একাই খেলছিস, তবু এত ভাবতে হয় কেন?

অন্বেষা বলল, —মা, দাবায় শুধু নিজের চাল ভাবলে হয় না। অন্যজন কী করতে পারে, সেটাও ভাবতে হয়।

মা কথাটা শুনে হেসে বললেন, —তাহলে তো এই খেলা জীবনের মতোই!

অন্বেষা তখনও জানত না, মায়ের কথাটি একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠবে।

৩. প্রথম হার

স্কুলে দাবা শেখার জন্য একটি ছোট দল তৈরি হলো। অন্বেষাও তাতে যোগ দিল। সেখানে তার পরিচয় হলো সৌরভ নামে এক ছেলের সঙ্গে। সৌরভ বহুদিন ধরে দাবা খেলত এবং নিজের দক্ষতা নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল।

প্রথম দিনেই অন্বেষা তার সঙ্গে খেলতে বসল।

খেলা শুরু হওয়ার পর অন্বেষা খুব মন দিয়ে চাল দিতে লাগল। সে ভাবছিল, কোন ঘুঁটি কোথায় রাখলে সুবিধা হবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সৌরভ তার রানিকে আটকে দিল।

আর কয়েকটি চালের পরই অন্বেষা হেরে গেল।

সৌরভ হাসতে হাসতে বলল, —দাবা এত সহজ নয়। শুধু ঘুঁটি চালতে জানলেই হবে না।

কথাটা অন্বেষার মনে লাগল। সে বোর্ড গুছিয়ে রেখে চুপচাপ বাড়ি ফিরল।

সেদিন রাতে খাবার খাওয়ার পরও সে চুপ করে বসেছিল। বাবা বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, —কী হয়েছে?

অন্বেষা বলল, —আমি হেরে গেছি। আমার মনে হয়, আমি ভালো খেলতে পারব না।

বাবা নিজের দোকানের একটি অভিজ্ঞতার কথা বললেন।

—জানিস, আমি যখন প্রথম সাইকেল মেরামতির কাজ শিখছিলাম, তখন একটা ছোট যন্ত্র ঠিক করতে গিয়ে বারবার ভুল করতাম। একদিন তো পুরো কাজটাই আবার খুলে করতে হয়েছিল। তখন আমার ওস্তাদ বলেছিলেন, ভুলটা কোথায় হয়েছে সেটা বুঝতে পারলে পরের বার কাজটা ভালো হবে।

অন্বেষা মন দিয়ে শুনল।

বাবা আরও বললেন, —হারলে শুধু কষ্ট পেয়ে বসে থাকিস না। দেখ, কেন হারলি।

পরদিন অন্বেষা সৌরভের কাছে গিয়ে বলল, —গতকালের খেলাটা আবার দেখাতে পারবে? আমি বুঝতে চাই কোথায় ভুল করেছি।

সৌরভ প্রথমে একটু অবাক হলো। তারপর বোর্ড সাজিয়ে বসে পড়ল।

খেলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চাল তারা আবার দেখল। অন্বেষা বুঝতে পারল, সে নিজের ঘুঁটি এগিয়ে দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ খেয়াল করেনি।

সেদিন থেকে সে শুধু খেলতে নয়, নিজের ভুল বিশ্লেষণ করতেও শিখল।

৪. চালের ভেতর লুকিয়ে থাকা শিক্ষা

অন্বেষার নিয়মিত অনুশীলন শুরু হলো। স্কুলের পরে প্রতিদিন আধঘণ্টা সে দাবা খেলত। কোনো দিন সৌরভের সঙ্গে, কোনো দিন অন্য বন্ধুদের সঙ্গে। প্রতিটি খেলার পরে সে খাতায় লিখে রাখত—কোন চাল ভালো হয়েছে, কোথায় ভুল হয়েছে, পরের বার কীভাবে উন্নতি করা যায়।

অরুণবাবু তাকে দাবার কয়েকটি বই দিলেন। বইয়ের জটিল অবস্থানগুলো প্রথমে বুঝতে অসুবিধা হতো। কখনও একটি সমস্যার সমাধান করতে তার অনেক সময় লেগে যেত।

তবু সে চেষ্টা ছাড়ল না।

একদিন শিক্ষক তাকে একটি অবস্থান দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, —এখানে তোমার প্রতিপক্ষের রানি বিপদে আছে। তুমি কী করবে?

অন্বেষা সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতে চাইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝল, তাড়াহুড়ো করে চাল দিলে তার নিজের রাজাও বিপদে পড়তে পারে।

সে থেমে বলল, —স্যার, আগে নিজের রাজাকে নিরাপদ রাখব। তারপর আক্রমণের সুযোগ খুঁজব।

অরুণবাবু হাসলেন।

—খুব ভালো। অনেক সময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় চালটাই সবচেয়ে ভালো চাল নয়।

অন্বেষা বুঝতে পারছিল, দাবা তাকে ধৈর্য শেখাচ্ছে। প্রতিটি সমস্যার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। কখনও অপেক্ষা করতে হয়, কখনও নিজের পরিকল্পনা বদলাতে হয়, কখনও আবার আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে তা স্বীকার করতে হয়।

এই শিক্ষা তার পড়াশোনাতেও কাজে লাগতে শুরু করল। কঠিন অঙ্ক দেখলেই সে আর খাতা বন্ধ করে দিত না। প্রশ্নটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সমাধান করার চেষ্টা করত।

৫. প্রতিযোগিতার খবর

কয়েক মাস পরে স্কুলে ঘোষণা হলো, জেলা পর্যায়ের একটি দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেখানে অংশ নিতে পারবে।

অন্বেষার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল। সে অংশ নিতে চাইল।

কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিযোগিতায় যাওয়ার জন্য যাতায়াতের খরচ এবং প্রয়োজনীয় কিছু খরচের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাড়িতে কথাটা বলতেই বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

—যেতে তোকে বাধা দেব না। কিন্তু এ মাসে দোকানে কাজও খুব বেশি নেই। সব খরচ একসঙ্গে জোগাড় করা কঠিন হবে।

অন্বেষা বলল, —আমি বুঝতে পারছি বাবা। তুমি চিন্তা কোরো না। স্কুলে কথা বলে দেখি কোনো ব্যবস্থা হয় কি না।

অরুণবাবু স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করলেন। স্কুল থেকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হলো। কয়েকজন শিক্ষকও অন্বেষাকে উৎসাহ দিলেন।

প্রতিযোগিতার আগে সে আরও নিয়মিত অনুশীলন করতে লাগল। তবে এবার অরুণবাবু তাকে একটি কথা বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিলেন।

—শুধু জেতার জন্য খেলবি না। নিজের সেরা খেলাটা খেলার চেষ্টা করবি। জয়-পরাজয় দুটোই প্রতিযোগিতার অংশ।

অন্বেষা মাথা নাড়ল।

তার মনে হচ্ছিল, এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানেই শুধু পুরস্কারের জন্য লড়াই নয়। নিজের শেখা বিষয়গুলো পরীক্ষা করারও সুযোগ।

৬. প্রতিযোগিতার সকাল

প্রতিযোগিতার দিন অন্বেষা খুব ভোরে উঠে পড়ল। মা তার জন্য খাবার গুছিয়ে দিলেন। বাবা দোকানে যাওয়ার আগে বললেন, —মনে রাখিস, বোর্ডের ওপারে যে বসবে, সে তোর শত্রু নয়। সেও তোর মতোই শিখতে এসেছে।

অন্বেষা কথাটা মনে গেঁথে নিল।

প্রতিযোগিতার হলে ঢুকে সে দেখল, অনেক ছাত্রছাত্রী ইতিমধ্যেই এসে গেছে। কারও হাতে দাবার বই, কেউ বোর্ডের সামনে শেষ মুহূর্তের অনুশীলন করছে। অন্বেষার বুক ধুকপুক করতে লাগল।

প্রথম খেলায় সে জিতল। দ্বিতীয় খেলায়ও ভালো করল। কিন্তু তৃতীয় খেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি অসাবধানতায় হারিয়ে ফেলল। সেই খেলায় সে পরাজিত হলো।

কিছুক্ষণের জন্য তার মন ভেঙে গেল। তবে এবার সে আগের মতো বোর্ড ছেড়ে উঠে গেল না। খেলার পরে প্রতিপক্ষের সঙ্গে চালগুলো নিয়ে আলোচনা করল।

সে বুঝতে পারল, চাপের মধ্যে সে অতিরিক্ত দ্রুত চাল দিয়েছিল।

পরের খেলায় সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। প্রতিটি চালের আগে বোর্ডের দিকে মন দিয়ে তাকাল। প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য উত্তরগুলোও ভাবল।

তার পরের দুটি খেলায় সে ভালো ফল করল।

শেষ রাউন্ডের আগে আয়োজক ঘোষণা করলেন, ফলাফলের ভিত্তিতে কয়েকজন খেলোয়াড় পুরস্কারের জন্য লড়াই করছেন। অন্বেষারও সুযোগ রয়েছে।

সে আর কোনো হিসাব করতে চাইল না। নিজের সামনে থাকা বোর্ডটির দিকে মন দিল।

৭. শেষ খেলার কঠিন সিদ্ধান্ত

শেষ খেলায় অন্বেষার প্রতিপক্ষ ছিল অভিজ্ঞ এক খেলোয়াড়, নাম ঋত্বিক। সে খুব দ্রুত চাল দিচ্ছিল। অন্বেষা প্রথমে কিছুটা চাপে পড়ে গেল।

খেলার মাঝামাঝি সময়ে তার একটি ঘুঁটি আটকে গেল। সে বুঝতে পারছিল, ভুল সিদ্ধান্ত নিলে দ্রুত হারতে পারে।

তার মনে পড়ল অরুণবাবুর কথা—তাড়াহুড়ো করে আকর্ষণীয় চাল দেওয়ার চেয়ে অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

সে গভীরভাবে বোর্ডের দিকে তাকাল। কয়েকটি সম্ভাব্য চাল ভাবল। একটি চাল তার কাছে খুব ভালো মনে হচ্ছিল, কিন্তু সেটি দিলে প্রতিপক্ষ পাল্টা আক্রমণ করতে পারত।

অবশেষে সে অন্য একটি চাল বেছে নিল। এতে সঙ্গে সঙ্গে জয় আসার সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু তার ঘুঁটিগুলোর অবস্থান অনেকটা নিরাপদ হলো।

ঋত্বিক কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর নিজের চাল দিল।

খেলা আরও এগোল। অন্বেষা ধৈর্য ধরে খেলতে লাগল। একসময় সে এমন একটি সুযোগ পেল, যেখানে প্রতিপক্ষের ভুলকে কাজে লাগিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব।

সে সুযোগটি কাজে লাগাল।

শেষ পর্যন্ত ঋত্বিক পরাজয় স্বীকার করল।

অন্বেষা জিতে গেল!

তবে সে চিৎকার করে উঠল না। প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলল, —খুব ভালো খেলেছেন। আপনার কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখলাম।

ঋত্বিক হাসল।

—তুমিও ভালো খেলেছ। বিশেষ করে শেষের দিকে ধৈর্য হারাওনি।

অন্বেষার মনে হলো, জয়ের আনন্দের পাশাপাশি এই স্বীকৃতিটাও তার কাছে অনেক মূল্যবান।

৮. পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি

ফলাফল ঘোষণার সময় অন্বেষার নামও পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকায় উঠে এল। সে প্রথম হয়নি, কিন্তু ভালো ফল করে একটি সম্মানজনক স্থান অর্জন করেছিল।

তার হাতে যখন ছোট্ট ট্রফিটি তুলে দেওয়া হলো, তখন তার মনে পড়ল পুরোনো বোর্ডটির কথা। সেই বোর্ডে ভাঙা ঘুঁটি সাজিয়ে যে মেয়েটি একা একা অনুশীলন করত, আজ সে জেলার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে।

বাড়ি ফিরে সে ট্রফিটি বাবার হাতে দিল।

বাবা ট্রফিটি দেখে মৃদু হেসে বললেন, —তাহলে তোর পরিশ্রম বৃথা যায়নি।

অন্বেষা বলল, —আমি আরও ভালো খেলতে চাই। এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি।

মা বললেন, —সেটাই ভালো। পুরস্কার পেয়েছিস বলে থেমে যাস না, আবার কোনো দিন না জিতলেও নিজের ওপর বিশ্বাস হারাবি না।

সেই রাতে অন্বেষা ট্রফিটি পড়ার টেবিলে রাখল। কিন্তু তার পাশে সে পুরোনো খাতাটিও রাখল, যেখানে লেখা ছিল তার ভুল, শেখা কৌশল আর নতুন পরিকল্পনার কথা।

ট্রফিটি তাকে সাফল্যের কথা মনে করিয়ে দিত। আর খাতাটি মনে করিয়ে দিত, সাফল্যের পথে কতবার ভুল করে আবার শুরু করতে হয়।

৯. নতুনদের জন্য একটি বোর্ড

কয়েক মাস পর অন্বেষা স্কুলের ছোটদের দাবা শেখাতে শুরু করল। যারা আগে মনে করত দাবা খুব কঠিন, তাদের সে প্রথমে ঘুঁটিগুলোর চলন শেখাত। তারপর ছোট ছোট সমস্যা দিত।

একদিন একটি ছোট ছেলে খেলায় হেরে রেগে গিয়ে বলল, —আমি আর খেলব না। আমি কখনও জিততে পারব না!

অন্বেষা তার পাশে বসে বলল, —আজ হেরেছিস, কিন্তু আজ একটা নতুন ভুল চিনতে পেরেছিস। পরের বার সেই ভুলটা না করলে তুই আরও ভালো খেলবি।

ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, —তুমিও কি অনেক হেরেছিলে?

অন্বেষা হেসে বলল, —অনেকবার। আমি এখনও হারি। কিন্তু প্রতিবার চেষ্টা করি, কেন হারলাম সেটা বুঝতে।

স্কুলে ছোটদের জন্য একটি দাবা ক্লাব তৈরি হলো। পুরোনো বোর্ডের পাশাপাশি কয়েকটি নতুন বোর্ডও জোগাড় করা গেল। শিক্ষকরা পালা করে তাদের অনুশীলনে সাহায্য করতেন।

অন্বেষা বুঝল, তার সাফল্য তখনই আরও অর্থবহ হবে, যখন তার শেখা অন্যদেরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

১০. নিজের ভাগ্য নিজেই গড়া

এক সন্ধ্যায় অন্বেষা পড়ার টেবিলে বসে দাবার বোর্ড সাজাচ্ছিল। জানালার বাইরে আকাশে লালচে আলো। মা সেলাই করছেন, বাবা দোকান থেকে ফিরে হিসাব লিখছেন।

অন্বেষা সাদা ঘুঁটিগুলো সাজিয়ে কালো ঘুঁটিগুলোর দিকে তাকাল। বোর্ডে সাদা-কালো ঘরগুলো পাশাপাশি রয়েছে। কোনো ঘর একা পুরো বোর্ড নয়; প্রতিটি ঘরের সঙ্গে অন্য ঘরের সম্পর্ক রয়েছে।

তার মনে হলো, জীবনও অনেকটা দাবার মতো। সব চাল নিজের ইচ্ছেমতো হবে না। কখনও প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বুঝতে হবে, কখনও নিজের ভুলের দায় নিতে হবে, কখনও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধরতে হবে। আর কখনও হেরে গিয়েও আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।

তবে জীবনের সঙ্গে দাবার একটি বড় পার্থক্যও আছে—জীবনে সবাইকে হারিয়ে এগোতে হয় না। অন্যকে শেখানো, পাশে দাঁড়ানো এবং একসঙ্গে ভালো কিছু তৈরি করাও সাফল্যের অংশ।

অন্বেষা বোর্ডের ওপর হাত রেখে মনে মনে বলল, —আমার পথ আমি নিজেই তৈরি করব। এক চাল করে, এক দিন করে।

তার সামনে তখনও অনেক পথ বাকি। বড় প্রতিযোগিতা, আরও কঠিন অনুশীলন, নতুন নতুন শিক্ষা—সবই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু এখন আর সে নিজের সামর্থ্য নিয়ে আগের মতো সন্দেহ করত না।

কারণ সে জেনে গিয়েছিল, ভাগ্য সব সময় হাতে এসে ধরা দেয় না। অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্ত, পরিশ্রম এবং ধৈর্য দিয়ে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হয়।

শিক্ষা: সাফল্য শুধু জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ভুল থেকে শেখা, প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং অর্জিত জ্ঞান অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই প্রকৃত উন্নতির পথ।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *