১. যে ছেলেটিকে কেউ চিনত না
শেষ ট্রেনটি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়ার পরও শালবন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কেউ নড়ল না।
মধুমিতা ঘোষ মাটিতে বসে ছিলেন। তাঁর চোখ রেললাইনের দিকে স্থির। ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরোচ্ছিল না।
তিতলি তাঁর কাঁধে হাত রাখল।
“আপনি বললেন, আপনার ছেলে কখনও ট্রেনে ওঠেনি। কিন্তু অরিত্রবাবু তো বললেন, সে ট্রেনে উঠে গেছে।”
মধুমিতা মুখ তুললেন।
“আমার ছেলে বাইশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।”
নিবারণ চক্রবর্তী স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
“আপনার ছেলে নিখোঁজ হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। ২০০৪ সালের ১৭ নভেম্বর। অরিত্র সেদিন আমাকে ফোন করে বলেছিল, সে একটি শিশুকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, কোনও বিপদে পড়া শিশুকে সাহায্য করছে। পরে সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরদিন সকালে আমার ছেলেও নিখোঁজ হয়ে যায়।”
তিতলি ধীরে ধীরে বলল, “আপনার ছেলের নাম কী ছিল?”
মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।
“ঋজু। ওর পুরো নাম ছিল ঋজু ঘোষ।”
নিবারণের হাত থেকে অরিত্রের ডায়েরিটি পড়ে গেল।
ঋজু ঘোষ।
নামটি তাঁর অপরিচিত নয়। ডায়েরির একটি পুরোনো পাতায় তিনি এই নাম দেখেছিলেন। নামের পাশে লেখা ছিল—
‘শিশুটিকে বাঁচাতে হলে তাকে সময়ের বাইরে নিয়ে যেতে হবে।’
নিবারণ দ্রুত ডায়েরিটি খুলে পাতাটি বের করলেন।
“এই নামটা অরিত্রের ডায়েরিতে রয়েছে।”
মধুমিতা কাগজটি দেখে কেঁপে উঠলেন।
“এটা অরিত্রের হাতের লেখা। আমি চিনতে পারছি।”
“কিন্তু সে কেন আপনার ছেলেকে সময়ের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা লিখেছিল?”
মধুমিতা মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি না। আমি শুধু জানি, অরিত্র আমাকে কথা দিয়েছিল, ঋজুকে সে কিছুতেই বিপদের মুখে পড়তে দেবে না।”
তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি যদি আপনাকে বলি, আমিও হয়তো সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?”
মধুমিতা তার দিকে তাকালেন।
“তুমি কী বলতে চাইছ?”
তিতলি নিজের ব্যাগ থেকে সেই পুরোনো ছবিটি বের করল। ছবিতে অরিত্রের পাশে একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে। ছেলেটির মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার বাঁ হাতে একটি লাল সুতো বাঁধা।
তিতলি নিজের বাঁ হাতের কবজির দিকে তাকাল। সেখানে বহু পুরোনো একটি দাগ। ছোটবেলা থেকেই সে জানে, তার হাতে একসময় সুতো বাঁধা ছিল। অনাথ আশ্রমে তাকে যখন পাওয়া যায়, তখন তার পোশাকের পকেটে একটি কাগজ ছিল। কাগজে শুধু একটি শব্দ লেখা—
‘ঋজু।’
“আমি জানি না, এই নামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী,” তিতলি বলল। “কিন্তু আমার মনে হয়, আমি যে মানুষটিকে খুঁজছি, সে শুধু আমার পরিবারের কেউ নয়। সে আমার নিজের অতীতের অংশ।”
মধুমিতা তিতলির হাত ধরলেন।
“তুমি আমার ছেলেকে দেখেছ?”
“না। কিন্তু গতকাল যে লোকটি আমাকে চিঠি দিয়েছিল, সে বলেছিল—আমার বাবার শেষ খবর অরিত্রের কাছে আছে।”
মধুমিতা ধীরে বললেন, “তাহলে আমাদের একসঙ্গে সত্যিটা খুঁজতে হবে।”
নিবারণ মাথা নাড়লেন।
“সত্যিটা খুঁজতে হলে প্রথমে জানতে হবে, ওই ট্রেন কোথায় যায়।”
২. হারিয়ে যাওয়া স্টেশনের মানচিত্র
পরদিন সকালেই নিবারণ স্টেশনের পুরোনো নথিঘরে গেলেন। আগের রাতের ঘটনায় তাঁর ঘুম হয়নি। তিনি জানতেন, এই রহস্যের উত্তর সাধারণ রেলওয়ে রেকর্ডে পাওয়া যাবে না। তবু কোনও সূত্র বাদ দিতে চাননি।
২০০৪ সালের নভেম্বর মাসের রেল চলাচলের নথি, সিগন্যাল লগ, ট্রেনের সময়সূচি—সব একে একে পরীক্ষা করতে লাগলেন।
একটি পুরোনো মানচিত্র তাঁর চোখে পড়ল।
মানচিত্রটি ১৯৮৭ সালে তৈরি। শালবন স্টেশনের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মূল লাইনের বাইরে একটি সরু শাখা লাইন দেখানো হয়েছে। সেই লাইনটি জঙ্গলের দিকে গিয়ে শেষ হয়েছে একটি ছোট স্টেশনে।
স্টেশনটির নাম—নীলডাঙা হল্ট।
কিন্তু বর্তমান রেলমানচিত্রে নীলডাঙা হল্টের কোনও অস্তিত্ব নেই।
নিবারণ আরও পুরোনো নথি ঘেঁটে দেখলেন, ১৯৯১ সালে ওই শাখা লাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি কারণ—ভূমিধস এবং যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া।
কিন্তু একটি প্রতিবেদনে অন্য কথা লেখা ছিল।
‘১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে নীলডাঙা হল্টে একটি বিশেষ ট্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ট্রেনটিতে কতজন যাত্রী ছিলেন, তা নিশ্চিত করা যায়নি। পরবর্তী অনুসন্ধানে ট্রেনটির কোনও ধ্বংসাবশেষ বা যাত্রীর সন্ধান মেলেনি।’
প্রতিবেদনটির শেষে লাল কালিতে একটি মন্তব্য—
‘ঘটনাটি প্রকাশ্যে আলোচনা করা যাবে না।’
নিবারণ চেয়ারে বসে পড়লেন।
১৭ নভেম্বর।
ঠিক সেই তারিখেই অরিত্র নিখোঁজ হয়েছিলেন। ঠিক সেই তারিখেই সুব্রত চক্রবর্তী হারিয়ে গিয়েছিলেন। আর গত রাতেও শেষ ট্রেনটি এসেছিল একই তারিখের স্মৃতি বহন করে।
কিন্তু ১৯৯১ সালের ঘটনাটির সঙ্গে ২০০৪ সালের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্ক কী?
তিনি মানচিত্রটি নিয়ে মধুমিতার কাছে গেলেন।
মধুমিতা নথিটি দেখে বললেন, “অরিত্র নীলডাঙা হল্টের কথা জানত। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে সে আমাকে এই নাম বলেছিল। আমি ভেবেছিলাম, কোনও পুরোনো রেলস্টেশন নিয়ে প্রতিবেদন লিখছে।”
“সে কি বলেছিল, সেখানে কী আছে?”
“বলেছিল, কিছু জায়গা মানচিত্র থেকে মুছে গেলেও মানুষের জীবন থেকে মুছে যায় না।”
তিতলি মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলল, “নীলডাঙা হল্ট কি এখনও আছে?”
নিবারণ উত্তর দিলেন, “নথি অনুযায়ী, স্টেশনটি বন্ধ। কিন্তু ১৯৯১ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশেষ ট্রেনটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।”
“তাহলে ট্রেনটি কি এখনও কোথাও চলছে?”
নিবারণ কোনও উত্তর দিলেন না।
কিন্তু তাঁর মনে হচ্ছিল, গত রাতে যে ট্রেনটি শালবন ছেড়ে গিয়েছিল, সেটি কোনও সাধারণ ট্রেন ছিল না। সেটি হয়তো এমন একটি রেলপথ ধরে চলেছে, যা সরকারি মানচিত্রে আর নেই।
৩. সুব্রতর চিঠি
সেদিন বিকেলে নিবারণের বাড়িতে একটি খাম এসে পৌঁছল।
খামের ওপর প্রেরকের নাম নেই। ডাকটিকিটও নেই। অথচ খামটি সিল করা এবং নিবারণের নাম ও ঠিকানা নির্ভুলভাবে লেখা।
ভেতরে একটি চিঠি।
হাতের লেখা দেখে নিবারণ চমকে উঠলেন।
এটি তাঁর বড় ভাই সুব্রতর লেখা।
‘নিবারণ,
তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝবি, আমি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাইনি।
আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। কিন্তু তুই যে সময়ে আমাকে খুঁজেছিস, আমি সেই সময়ে ছিলাম না।
এখানে দিন আর রাতের হিসাব ঠিকমতো চলে না। কখনও মনে হয়, আমি কয়েক ঘণ্টা এখানে আছি। আবার কখনও জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি, পৃথিবীতে কয়েক বছর কেটে গেছে।
আমি জানি না, এই জায়গাকে কী বলে বোঝাব। এটা কোনও ভূতুড়ে জগৎ নয়। আবার সাধারণ পৃথিবীর মতোও নয়। এখানে এমন মানুষ আছে, যারা বহু বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। কেউ নিজের ইচ্ছায় এসেছে, কেউ বাধ্য হয়ে।
আমি একটি ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের জন্যই আমাকে এখানে থাকতে হচ্ছে।
শেষ ট্রেনের রহস্য জানতে চাইলে অরিত্রকে বিশ্বাস করিস। কিন্তু তার সব কথা বিশ্বাস করিস না।
আর সবচেয়ে জরুরি কথা—ঋজুকে খুঁজে পেলে তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিস।
ওর কোনও দোষ ছিল না।
— তোর দাদা, সুব্রত।’
চিঠিটি পড়ে নিবারণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তাঁর মনে পড়ল, ছোটবেলায় সুব্রত সবসময় তাঁকে বিপদ থেকে বাঁচাতেন। স্কুলে কেউ মারতে এলে দাদা সামনে দাঁড়াতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্বও তিনিই নিয়েছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ একদিন কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি হারিয়ে গেলেন।
নিবারণ এত বছর ভেবেছেন, দাদা হয়তো তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন।
আজ প্রথমবার বুঝলেন, হয়তো তিনি নিজের ইচ্ছায় চলে যাননি।
মধুমিতা চিঠিটি পড়ে বললেন, “ঋজুকে খুঁজে পেলে তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে বলেছে। তার মানে সুব্রত আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আমার ছেলের পরিচয় ছিল।”
“কিন্তু কীভাবে?”
তিতলি ধীরে বলল, “হয়তো আমাদের সবাইকে একই ঘটনার বিভিন্ন অংশ জানানো হয়েছে।”
নিবারণ চিঠিটি ভাঁজ করে রাখলেন।
“এবার আমাদের নীলডাঙা হল্টে যেতে হবে।”
৪. জঙ্গলের পথ
শালবন স্টেশন থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে নীলডাঙা হল্টের পুরোনো শাখা লাইনটি জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। বহু বছর ধরে সেখানে কোনও ট্রেন চলেনি। রেললাইনের ওপর গাছপালা জন্মেছে, কোথাও মাটি জমেছে, কোথাও স্লিপার ভেঙে গেছে।
নিবারণ, মধুমিতা, তিতলি এবং অদিতি—যে স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল—একসঙ্গে রওনা দিলেন।
অদিতি নীলডাঙা হল্টের কথা শুনে আগ্রহী হয়েছিল। সে জানাল, ১৯৯১ সালের ঘটনাটির কিছু সংবাদপত্রের কাটিং সে খুঁজে পেয়েছে। সেখানে একটি বিশেষ ট্রেনের উল্লেখ আছে, কিন্তু ট্রেনের নম্বর নেই। যাত্রীদের নামও প্রকাশ করা হয়নি।
জঙ্গলের মধ্যে ঢোকার কিছুক্ষণ পর তারা একটি ভাঙা সাইনবোর্ড দেখতে পেল।
সাইনবোর্ডে মরচে ধরা অক্ষরে লেখা—
নীলডাঙা হল্ট।
প্ল্যাটফর্মটি ছোট। এক পাশে ভাঙা টিকিটঘর, অন্য পাশে আগাছায় ঢাকা একটি বেঞ্চ। স্টেশনের ছাদ প্রায় ভেঙে পড়েছে। তবু প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে একটি ঘড়ি ঝুলছে।
ঘড়িটি থেমে আছে ১১টা ৪৭ মিনিটে।
তিতলি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল, “এখানেও একই সময়।”
অদিতি ঘড়ির নিচে একটি ধাতব ফলক দেখতে পেল। ফলকে লেখা—
‘বিশেষ পরিষেবা: ১৭ নভেম্বর, ১৯৯১। যাত্রীদের পরিচয় গোপন রাখা হবে।’
নিবারণ প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালেন। রেললাইনটি জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তিনি হাঁটু গেড়ে মাটি পরীক্ষা করলেন।
মাটির ওপর নতুন জুতোর ছাপ।
অদিতি বলল, “এখানে সম্প্রতি কেউ এসেছে।”
ছাপগুলি অনুসরণ করে তারা স্টেশনের পেছনের দিকে গেল। সেখানে একটি ছোট ইটের ঘর। দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ, কিন্তু জানলার কাঠ ভাঙা।
ভেতরে ঢুকে তারা দেখল, ঘরটি একসময় সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত হতো। দেওয়ালে একটি পুরোনো বোর্ড, কয়েকটি লিভার এবং মরচে ধরা তার। টেবিলের ওপর ধুলো জমে থাকলেও মাঝখানে একটি পরিষ্কার জায়গা রয়েছে।
সেখানে রাখা একটি খাতা।
খাতাটি খুলতেই দেখা গেল, গত কয়েক মাসের তারিখ লেখা রয়েছে। প্রতিটি তারিখের পাশে একটি করে নাম।
কিছু নামের পাশে লেখা—‘ফিরেছে’।
কিছু নামের পাশে—‘অপেক্ষমাণ’।
আর কয়েকটি নামের পাশে—‘ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়’।
শেষ পাতায় লেখা—
‘পরবর্তী আগমন: ১২ অক্টোবর, ২০২৬। যাত্রী: নিবারণ চক্রবর্তী। সঙ্গে থাকবে তিতলি এবং মধুমিতা ঘোষ।’
অদিতি বিস্ময়ে বলল, “আজকের তারিখ তো ১২ অক্টোবর!”
নিবারণ খাতাটি বন্ধ করলেন।
“তার মানে, আমাদের আসার কথা আগে থেকেই জানা ছিল।”
তিতলি টেবিলের নীচে একটি ছোট বাক্স দেখতে পেল। বাক্সের ভেতরে তিনটি পুরোনো রেলটিকিট।
প্রতিটি টিকিটে একই সময় ছাপা—
২৩:৪৭।
কিন্তু গন্তব্যের জায়গায় তিনটি আলাদা নাম।
নিবারণ চক্রবর্তী।
তিতলি।
মধুমিতা ঘোষ।
তাদের প্রত্যেকের নামের পাশে একটি করে সংখ্যা লেখা—১৭, ০৪ এবং ৯১।
অদিতি বলল, “এগুলো কি যাত্রীর নম্বর?”
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।
একবার।
দু’বার।
তিনবার।
সবাই দরজার দিকে তাকাল।
বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা নীলডাঙা হল্টে কোথাও বিদ্যুৎ নেই। কোনও কর্মচারী নেই। কোনও ট্রেনের সময়সূচিও নেই।
তবু ঘণ্টাটি বাজছে।
আর জঙ্গলের গভীর থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইসেল।
৫. যে ট্রেনের কোনও নম্বর নেই
রাত ১১টা ৪৫।
নিবারণরা প্ল্যাটফর্মে ফিরে এলেন।
কুয়াশা এমনভাবে নেমেছে যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। অদিতি মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, ঘড়ির সময়ও বারবার বদলে যাচ্ছে।
১১টা ৪৬।
দূরে আলো দেখা দিল।
ট্রেনের চাকা রেললাইনের ওপর দিয়ে চলার পরিচিত শব্দ শোনা গেল। কিন্তু শব্দটি ক্রমশ কাছে এলেও রেললাইনের ওপর কোনও কম্পন অনুভূত হচ্ছিল না।
১১টা ৪৭।
ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।
কামরাগুলি পুরোনো। জানলায় কাঠের ফ্রেম, দরজায় মরচে ধরা হাতল। বাইরে কোনও ট্রেন নম্বর নেই। শুধু ইঞ্জিনের গায়ে সাদা রঙে লেখা—
শেষ পরিষেবা।
প্রথম কামরার দরজা খুলে গেল।
একজন বৃদ্ধ নেমে এলেন। তাঁর পরনে ১৯৯০-এর দশকের পোশাক। তিনি প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই চারদিকে তাকালেন, যেন বহু বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরেছেন।
তারপর আরও কয়েকজন নামলেন।
একজন পুলিশকর্মী, একজন স্কুলশিক্ষক, একজন তরুণী, একজন শ্রমিক। তাঁদের মুখে একই ধরনের বিভ্রান্তি।
একটি ছোট ছেলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।
মধুমিতা ছেলেটিকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন।
“ঋজু!”
ছেলেটি মুখ তুলল।
তারপর মধুমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “মা?”
মধুমিতা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি থেমে গেলেন।
ছেলেটির বয়স পাঁচ বছরের বেশি নয়। অথচ মধুমিতার ছেলে নিখোঁজ হয়েছিল বাইশ বছর আগে। আজ তার বয়স হওয়ার কথা সাতাশ।
তিতলি এগিয়ে এল।
ছেলেটি তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসল।
“তুমি এসেছ?”
তিতলি হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “তুমি আমাকে চেনো?”
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
“তুমি আমার সঙ্গে খেলতে। তুমি বলেছিলে, বড় হলে আমরা একসঙ্গে বাড়ি ফিরব।”
তিতলির চোখে জল এসে গেল।
“তোমার নাম কী?”
ছেলেটি বলল, “ঋজু।”
মধুমিতা ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু তাঁর চোখে আনন্দের পাশাপাশি গভীর আতঙ্ক।
“এটা কীভাবে সম্ভব? তুমি তো বড় হয়ে যাওয়ার কথা!”
ছেলেটি শান্ত গলায় বলল, “আমি তো বড় হইনি, মা। এখানে সময় থেমে আছে।”
নিবারণ এগিয়ে এসে বললেন, “এই ট্রেন কোথা থেকে এসেছে?”
ছেলেটি রেললাইনের অন্ধকারের দিকে তাকাল।
“যেখান থেকে সবাই ফিরে যেতে চায়।”
“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
“অরিত্র কাকু আমাকে নিয়ে এসেছিল। বলেছিল, কিছুক্ষণের জন্য এখানে থাকতে হবে। তারপর আমাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবে।”
মধুমিতা ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, “অরিত্র কোথায়?”
ছেলেটি শেষ কামরার দিকে আঙুল দেখাল।
“ওখানে।”
নিবারণ শেষ কামরার দিকে এগোলেন।
কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে তিনি দেখলেন, কামরার ভেতর অন্ধকার। একটি বেঞ্চের ওপর বসে আছেন তাঁর বড় ভাই সুব্রত।
একই মুখ। একই চোখ। যেন বাইশ বছর নয়, মাত্র কয়েক দিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন।
নিবারণের গলা আটকে গেল।
“দাদা?”
সুব্রত উঠে দাঁড়ালেন।
“নিবারণ, তুই বড় হয়ে গেছিস।”
নিবারণের চোখ ভিজে উঠল।
“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”
সুব্রত ধীরে বললেন, “যে জায়গায় গেলে মানুষ নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে না।”
“তুমি বাড়ি ফিরবে না?”
“ফিরব। কিন্তু তার আগে একটা কাজ বাকি আছে।”
“কী কাজ?”
সুব্রত জানলার বাইরে তাকালেন।
“এই ট্রেনটাকে থামাতে হবে।”
৬. অরিত্রের আসল উদ্দেশ্য
সুব্রত নিবারণকে কামরার ভেতরে বসতে বললেন। তিতলি এবং অদিতিও তাঁদের সঙ্গে ঢুকল। মধুমিতা ঋজুকে নিয়ে পাশের বেঞ্চে বসে রইলেন।
কামরার ভেতরে একটি ছোট টেবিল। টেবিলের ওপর রেলওয়ের পুরোনো নথি, কয়েকটি ছবি এবং একটি হাতঘড়ি রাখা।
সুব্রত বললেন, “তুই ভাবছিস, এই ট্রেন মানুষকে সময়ের বাইরে নিয়ে যায়। আসলে বিষয়টা তার চেয়েও জটিল।”
অদিতি প্রশ্ন করল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, সময় সত্যিই এখানে থেমে যায়?”
“না। আমি বলতে চাইছি, আমরা যা দেখছি, তার সবকিছুর ব্যাখ্যা এখনও আমাদের জানা নেই। এই ট্রেনের যাত্রীরা বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ হয়েছে। কেউ কয়েক ঘণ্টার জন্য, কেউ কয়েক দশকের জন্য। কিন্তু তারা এখানে যে সময় কাটায়, তা বাইরের পৃথিবীর সময়ের সঙ্গে মেলে না।”
নিবারণ বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”
সুব্রত মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি না। প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা কোনও গোপন রেল প্রকল্প। পরে বুঝলাম, এখানে কিছু ঘটনা ঘটছে, যা প্রচলিত ব্যাখ্যায় মেলানো কঠিন। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—কেউ এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে।”
“কে?”
“একটি গোপন দল। তারা এমন মানুষদের বেছে নিত, যাদের নিখোঁজ হওয়ার পর কেউ খুব বেশি খোঁজ করবে না। কখনও তাদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে, কখনও দুর্ঘটনার গল্প সাজিয়ে এই ট্রেনে তুলে দেওয়া হতো। তাদের মধ্যে কেউ ফিরে এসেছে, কেউ আর ফেরেনি।”
অদিতি বলল, “কিন্তু অরিত্র কেন এতে জড়াল?”
“অরিত্র প্রথমে সাংবাদিক হিসেবে তদন্ত করতে এসেছিল। সে জানতে পেরেছিল, এই ট্রেনের সাহায্যে মানুষকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সে প্রমাণ সংগ্রহ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে সে ঋজুকে খুঁজে পায়। শিশুটিকে একটি পরীক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।”
মধুমিতা দূর থেকে কথাগুলি শুনছিলেন।
“কীসের পরীক্ষা?”
সুব্রত বললেন, “১৯৯১ সালে নীলডাঙা হল্টে একটি বিশেষ রেল-পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সরকারি উদ্দেশ্য ছিল দূরবর্তী রেলপথে স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা। কিন্তু প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মানুষ এমন একটি অজানা ঘটনার মুখোমুখি হয়, যার পর ট্রেনটি নিখোঁজ হয়। পরে প্রকল্পটি বন্ধ করা হয়। কিছু মানুষ সেই ঘটনাকে গোপন রাখার জন্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় বদলে দেয়, কিছু নথি নষ্ট করে।”
“তাহলে এই ট্রেন কি ১৯৯১ সাল থেকেই চলছে?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।
“ট্রেনটি যে সব সময় একইভাবে চলছে, তা বলা যাবে না। কখনও এটি দেখা যায়, কখনও যায় না। কিছু মানুষ এতে উঠতে পারে, কিন্তু কোথায় নামবে তা জানে না। আর যারা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, তারা নিজেরাই এর মধ্যে আটকে পড়েছে।”
নিবারণ ভাইয়ের দিকে তাকালেন।
“তুমি কীভাবে উঠেছিলে?”
সুব্রত বললেন, “আমি অরিত্রকে সাহায্য করছিলাম। সে যখন বুঝল, ঋজুকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, তখন তাকে নিরাপদ রাখার জন্য এখানে নিয়ে আসে। আমি তাদের সঙ্গে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে যাব। কিন্তু ট্রেনটি ছাড়ার পর আর স্বাভাবিক পৃথিবীতে ফিরতে পারিনি।”
“তুমি এত বছর এখানে ছিলে?”
“আমার কাছে হয়তো কয়েক মাস। কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে বাইশ বছর কেটে গেছে।”
নিবারণ মাথা নিচু করলেন।
“তাহলে কি তুমিও আর ফিরতে পারবে না?”
সুব্রত উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার দরজায় অরিত্র এসে দাঁড়াল।
তার হাতে একটি কালো ডায়েরি।
“ফিরতে পারবে,” অরিত্র বলল। “কিন্তু সবাই নয়।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
অরিত্র বলল, “এই ট্রেনের যাত্রা শেষ করতে হলে এমন একজনকে থাকতে হবে, যে শেষবারের মতো সিগন্যাল চালু করবে।”
“মানে?” নিবারণ প্রশ্ন করলেন।
“এই ট্রেন যখন নীলডাঙা হল্টে ফিরে আসবে, তখন সিগন্যাল কক্ষে একটি লিভার টানতে হবে। লিভারটি টানলে ট্রেনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। যারা ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে, তারা নিজেদের সময়ে ফিরে যাবে। কিন্তু যে লিভার টানবে, সে হয়তো আর ফিরতে পারবে না।”
মধুমিতা উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনি কি এতদিন ধরে এটাই করতে চাইছেন?”
অরিত্র মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। আমি ঋজুকে ফিরিয়ে দিতে চাই। আর যারা এই ট্রেনের মধ্যে আটকে আছে, তাদেরও মুক্ত করতে চাই।”
তিতলি বলল, “কিন্তু আপনি নিজে কেন লিভার টানছেন না?”
অরিত্র তার দিকে তাকাল।
“কারণ আমার এখনও একটা কাজ বাকি।”
“কী কাজ?”
অরিত্র উত্তর দিল না।
তার চোখ চলে গেল কামরার শেষ প্রান্তে।
সেখানে একটি দরজা ধীরে ধীরে খুলছে।
দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ।
তার মুখ অরিত্রের মতোই।
কিন্তু চোখে কোনও ক্লান্তি নেই।
বরং অদ্ভুত এক শীতল হাসি।
লোকটি বলল, “অরিত্র, এতদিন পরেও তুমি একই ভুল করছ।”
অরিত্রের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
লোকটি হাসল।
“এই ট্রেন আমার তৈরি। তুমি ভেবেছিলে, তুমি একে থামাতে পারবে?”
নিবারণ লোকটির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, তার মুখটি অরিত্রের মতো হলেও সে অরিত্র নয়।
লোকটি নিজের পরিচয় দিল।
“আমার নাম অরিন্দম সেন। আর তোমরা যে সত্যিটা এতদিন ধরে খুঁজছ, তার অর্ধেকও তোমাদের জানা নেই।”
তারপর সে টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ছবি রাখল।
ছবিতে ১৯৯১ সালের নীলডাঙা হল্ট।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন রেলকর্মী। তাঁদের মাঝখানে একটি ছোট ছেলে।
ছেলেটির মুখ স্পষ্ট।
সে ঋজু নয়।
তিতলিও নয়।
ছেলেটি অরিত্র।
ছবির পেছনে লেখা—
‘প্রথম যাত্রী: অরিত্র সেন। বয়স: পাঁচ বছর।’
কামরার মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
মধুমিতা ফিসফিস করে বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”
অরিন্দম সেন হাসল।
“কারণ অরিত্রের গল্প তোমরা যেভাবে জানো, তা সত্যি নয়। সে বাইশ বছর আগে নিখোঁজ হয়নি। সে এই ট্রেনে উঠেছিল পাঁচ বছর বয়সে। আর তোমরা যে মানুষটিকে অরিত্র বলে চিনছ, সে আসলে সেই শিশুটির বড় হয়ে যাওয়া রূপ নয়।”
নিবারণ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।
“তাহলে সে কে?”
অরিন্দম সেন ধীরে ধীরে বলল—
“সে এমন একজন, যার জন্মই হয়েছিল এই ট্রেনের রহস্যকে আড়াল করার জন্য।”
অরিত্র চিৎকার করে উঠল, “চুপ করো!”
কিন্তু ততক্ষণে ট্রেনের সব আলো নিভে গেছে।
কামরার জানলার বাইরে অন্ধকারের মধ্যে একটি নতুন স্টেশনের নাম ভেসে উঠল।
শালবন—১৭ নভেম্বর, ২০০৪।
আর স্পিকারে ঘোষণা শোনা গেল—
“পরবর্তী স্টেশন: যাত্রার প্রথম দিন। সকল যাত্রীকে নিজ নিজ পরিচয় যাচাই করার অনুরোধ করা হচ্ছে।”
নিবারণ বুঝতে পারলেন, তাঁদের সামনে এখন আরও ভয়ংকর রহস্য অপেক্ষা করছে।
কারণ এই ট্রেন শুধু মানুষকে হারিয়ে দেয় না।
এটি মানুষের অতীতকেও বদলে দিতে পারে।
চলবে…