১. মধ্যরাতের ফোন
রাত তখন ১টা ১৩ মিনিট।
কলকাতার উত্তর শহরতলির পুরোনো বাড়ি ‘শান্তিনিকেতন লজ’-এর তিনতলার করিডরে দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল ঋদ্ধি সেন। বাড়িটির নাম শান্তিনিকেতন লজ হলেও সেখানে কোনও অতিথি থাকতেন না। একসময় এটি ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাসভবন। পরে বাড়ির মালিকেরা শহর ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে বাড়িটির দেখাশোনা করেন এক বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক, হরিপদ মণ্ডল।
ঋদ্ধি পেশায় সাংবাদিক। একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে অপরাধ ও রহস্যসংক্রান্ত খবর লেখে। শহরের পুরোনো বাড়ি, পরিত্যক্ত কারখানা, নিখোঁজ মানুষ এবং বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অপরাধ—এই ধরনের বিষয় নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ।
সেদিন রাতে তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এসেছিল।
‘আপনি যদি সত্যিই হারিয়ে যাওয়া মানুষের খবর খুঁজে বের করতে চান, তাহলে শান্তিনিকেতন লজে আসুন। তেরো নম্বর ঘরটি খুলবেন না। দরজার ওপারে যে মেয়েটি আছে, সে আপনার নাম জানে।’
বার্তাটির নীচে আরও একটি লাইন ছিল।
‘আপনার দিদি এখনও বেঁচে আছেন।’
লাইনটি পড়ে ঋদ্ধির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
তার দিদি রূপসা সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন বারো বছর আগে। তখন ঋদ্ধির বয়স মাত্র ষোলো। রূপসার বয়স ছিল চব্বিশ। এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি উধাও হয়ে যান। পুলিশ তদন্ত করেছিল, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল—কিন্তু কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কিছুদিন পরে পুলিশ ধরে নিয়েছিল, রূপসা স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছেন। পরিবার সেই সিদ্ধান্ত কখনও মেনে নিতে পারেনি।
ঋদ্ধি বড় হয়ে সাংবাদিক হওয়ার পরও দিদিকে খোঁজা বন্ধ করেনি। কিন্তু বারো বছরে সে এমন কোনও সূত্র পায়নি, যা তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আর আজ, মাঝরাতে, অচেনা কেউ তাকে জানাচ্ছে—রূপসা বেঁচে আছেন।
ঋদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে নম্বরে ফোন করল।
ফোন বেজে উঠল একবার।
দু’বার।
তৃতীয়বারে ওপার থেকে এক নারীকণ্ঠ শোনা গেল।
“আপনি কি ঋদ্ধি সেন?”
“হ্যাঁ। আপনি কে? আমার দিদির কথা জানেন?”
“আপনার দিদি সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে আজ রাতেই এখানে আসতে হবে।”
“কোথায়?”
“শান্তিনিকেতন লজ। তেরো নম্বর ঘরের সামনে।”
“আপনি কি আমার দিদি?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর নারীকণ্ঠটি বলল, “আমি আপনার দিদি নই। কিন্তু আপনার দিদি আমাকে চেনেন।”
“তিনি কোথায়?”
“যে প্রশ্নের উত্তর আপনি বারো বছর ধরে খুঁজছেন, তার উত্তর এই বাড়িতেই আছে।”
ফোন কেটে গেল।
ঋদ্ধি আর অপেক্ষা করল না। জ্যাকেট, টর্চ, নোটবুক আর ক্যামেরা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
বাইরে তখন শীতের রাত। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার মধ্যে দূরের বাতিগুলি ঝাপসা দেখাচ্ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, বারো বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজা যেন হঠাৎ খুলতে শুরু করেছে।
কিন্তু সে জানত না, দরজার ওপারে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
২. শান্তিনিকেতন লজ
বাড়িটি শহরের এক পুরোনো গলির শেষে দাঁড়িয়ে ছিল। উঁচু লোহার ফটকে মরচে পড়েছে। ফটকের গায়ে পাথরের ফলকে লেখা—‘শান্তিনিকেতন লজ, প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬’।
ঋদ্ধি কলিং বেল চাপল।
কোনও সাড়া এল না।
দ্বিতীয়বার চাপতেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কিছুক্ষণ পরে ফটক খুলে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।
মাথায় সাদা চুল, গায়ে ধূসর সোয়েটার, হাতে একটি পুরোনো লণ্ঠন।
“কাকে চাই?”
“আমি ঋদ্ধি সেন। আপনার সঙ্গে আগে কথা হয়নি। আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছে।”
বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।
“কে বলেছে?”
“জানি না। একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আপনি কি রূপসা দেবীর ভাই?”
ঋদ্ধির বুকের মধ্যে যেন কেউ ধাক্কা দিল।
“আপনি আমার দিদিকে চিনতেন?”
বৃদ্ধ কোনও উত্তর না দিয়ে ফটক পুরো খুলে দিলেন।
“ভেতরে আসুন।”
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ঋদ্ধি বুঝল, এই জায়গায় বহু বছর ধরে কেউ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করেনি। দেওয়ালে পুরোনো ছবি, কাঠের সিঁড়িতে ধুলো, করিডরের কোণে ভাঙা ফুলদানি। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
বৃদ্ধ নিজেকে পরিচয় দিলেন।
“আমার নাম হরিপদ মণ্ডল। এই বাড়ির দেখাশোনা করি।”
“আমার দিদি এখানে এসেছিলেন?”
“এসেছিলেন।”
“কবে?”
হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগে একবার সিঁড়ির দিকে তাকালেন।
“বারো বছর আগে।”
ঋদ্ধি চমকে উঠল।
“কিন্তু তিনি তো অফিস থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন!”
“মানুষকে শেষবার যেখানে দেখা যায়, সে সব সময় সেখানেই হারিয়ে যায় না।”
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আপনার দিদি এই বাড়িতে এসেছিলেন এক বর্ষার রাতে। তাঁর সঙ্গে আরও দু’জন মানুষ ছিল। পরদিন সকালে তাঁরা চলে যান। কিন্তু রূপসা দেবী আর বেরিয়ে যাননি।”
ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।
“তাহলে তিনি এখনও এই বাড়িতে আছেন?”
“আমি জানি না।”
“জানেন না, না বলতে চাইছেন না?”
হরিপদ চোখ নামিয়ে বললেন, “কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস আমার নেই।”
ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে উঠল।
“একজন মানুষ বারো বছর ধরে নিখোঁজ। আপনি জানেন তিনি এখানে এসেছিলেন, অথচ পুলিশকে জানাননি?”
“জানিয়েছিলাম।”
“কী বলছেন?”
“সেই সময় থানায় খবর দিয়েছিলাম। পুলিশ এসেছিল। কিন্তু বাড়িতে তল্লাশি করে কিছুই পায়নি। তারপর আমাকে বলা হয়, এ বিষয়ে আর কাউকে কিছু না বলতে।”
“কেন?”
“সেটা আমি জানি না।”
ঋদ্ধি নিজের ফোন বের করে হরিপদর কথা রেকর্ড করতে শুরু করল।
বৃদ্ধ তা দেখে বললেন, “রেকর্ড করছেন? করুন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—এই বাড়িতে সব দরজা মানুষের জন্য তৈরি হয়নি।”
ঋদ্ধি ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি ভূতপ্রেত বিশ্বাস করি না।”
“আমিও করতাম না।”
“তাহলে?”
হরিপদ লণ্ঠন তুলে সিঁড়ির দিকে এগোলেন।
“তাহলে চলুন, তেরো নম্বর ঘরটি দেখে আসুন।”
৩. তেরো নম্বর দরজা
তিনতলার করিডরটি অন্য দুই তলার চেয়ে অনেক সরু। দু’পাশে পুরোনো কাঠের দরজা। প্রতিটি দরজার ওপর পিতলের নম্বর লাগানো।
এক নম্বর।
তিন নম্বর।
পাঁচ নম্বর।
তারপর সাত, নয়, এগারো।
করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি কালো দরজা। দরজার ওপর পিতলের ফলকে লেখা—১৩।
ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল, “এখানে তো বিজোড় নম্বরের ঘর। মাঝের ঘরগুলো কোথায়?”
হরিপদ বললেন, “বাড়ির পুরোনো নকশায় এই তলায় ছয়টি ঘর ছিল। কিন্তু সংস্কারের সময় কয়েকটি ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
“তাহলে তেরো নম্বর ঘরটি?”
“এটা সব সময় ছিল।”
“আপনি বললেন, বাড়ির নকশায় ছয়টি ঘর। তা হলে তেরো নম্বর এল কোথা থেকে?”
হরিপদ উত্তর দিলেন না।
দরজার সামনে এসে ঋদ্ধি থামল।
দরজার নীচ দিয়ে সরু আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।
ঘরের ভেতরে কেউ আছে।
ঋদ্ধি দরজায় কান পাতল।
প্রথমে কোনও শব্দ শোনা গেল না। তারপর খুব মৃদু কণ্ঠে একটি মেয়ে বলল—
“ঋদ্ধি, তুমি এসেছ?”
ঋদ্ধির শরীর শিউরে উঠল।
এই কণ্ঠস্বর সে চেনে।
ছোটবেলায় রূপসা তাকে ঘুম পাড়ানোর সময় এমন করেই ডাকতেন।
“দিদি?”
ভেতর থেকে উত্তর এল, “দরজাটা খুলো না।”
ঋদ্ধি দরজার হাতলে হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেল।
“তুমি কোথায়? তুমি কি সত্যিই আমার দিদি?”
“আমি তোমার দিদিকে চিনি।”
“এটা কী ধরনের কথা? তুমি কে?”
“তোমার কাছে একটা ছবি আছে। ছবির পিছনে কী লেখা আছে, মনে আছে?”
ঋদ্ধি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার মধ্যে একটি পুরোনো ছবি রয়েছে। ছবিতে সে, রূপসা এবং তাদের মা-বাবা। রূপসার নিখোঁজ হওয়ার পর ছবিটি ঋদ্ধি সব সময় সঙ্গে রাখে।
ছবির পিছনে মায়ের হাতের লেখায় লেখা—‘আমরা একে অপরকে হারাব না।’
ঋদ্ধি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “লেখাটা কীভাবে জানলে?”
ভেতর থেকে মেয়েটি বলল, “কারণ তোমার দিদি ছবিটা আমাকে দিয়েছিল।”
“কবে?”
“যেদিন সে এই ঘরে ঢুকেছিল।”
ঋদ্ধি দরজার হাতল ঘুরিয়ে দেখল। দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ নয়। তবু হাতল নড়ল না।
সে জোরে ধাক্কা দিল।
দরজাটি একচুলও খুলল না।
“দরজা খুলছে না কেন?”
“কারণ তুমি এখনও সেই প্রশ্নের উত্তর জানো না।”
“কোন প্রশ্ন?”
“বারো বছর আগে তোমার দিদি কেন এই বাড়িতে এসেছিল?”
ঋদ্ধি বলল, “আমি জানি না। তুমি জানো?”
“জানি। কিন্তু তুমি যদি এখন দরজা খোলো, তাহলে যে মানুষটিকে খুঁজছ, তাকে হয়তো আর কখনও খুঁজে পাবে না।”
“এ কেমন ধাঁধা?”
“এই বাড়িতে সবাই কাউকে না কাউকে খুঁজতে আসে। কেউ তার অতীতকে, কেউ তার ভবিষ্যৎকে, আর কেউ এমন একজনকে, যে কোনও দিন এই পৃথিবীতে ছিলই না।”
ঋদ্ধি রাগে দরজায় ঘুষি মারল।
“আমি ধাঁধা শুনতে আসিনি! আমার দিদি কোথায়, সেটা বলো!”
হঠাৎ ভেতর থেকে একটি কাগজ দরজার নীচ দিয়ে বেরিয়ে এল।
ঋদ্ধি কাগজটি তুলে নিল।
তাতে লেখা—
‘ঘড়ির কাঁটা যখন থেমে যাবে, তখন দরজা খুলবে। কিন্তু দরজা খোলার আগে নিজের নামটি মনে রাখবেন।’
কাগজের নীচে একটি সময় লেখা—রাত ২টা ১৭ মিনিট।
ঋদ্ধি ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ১টা ৪৮ মিনিট।
তার হাতে প্রায় আধঘণ্টা সময় আছে।
৪. যে বাড়ির নকশায় তেরো নেই
ঋদ্ধি হরিপদকে নিয়ে নিচে নেমে এল। তার মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন।
“এই বাড়ির পুরোনো নকশা কোথায়?”
হরিপদ বললেন, “দোতলার স্টোররুমে কিছু কাগজ আছে।”
“আমাকে দেখান।”
স্টোররুমের দরজা খুলতেই ধুলো উড়ে উঠল। একপাশে কাঠের আলমারি, অন্য পাশে ভাঙা চেয়ার এবং পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ।
হরিপদ একটি লোহার বাক্স খুলে কয়েকটি নকশা বের করলেন।
ঋদ্ধি সেগুলি মেঝেতে বিছিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল।
প্রথম নকশাটি ১৯৩৬ সালের। দ্বিতীয়টি ১৯৫২ সালের। তৃতীয়টি ১৯৮১ সালের।
তিনটি নকশাতেই তিনতলায় ছয়টি ঘর দেখানো হয়েছে। কোনওটিতেই তেরো নম্বর ঘর নেই।
কিন্তু ১৯৯৮ সালের একটি হাতে আঁকা নকশায় তিনতলার করিডরের শেষে একটি অতিরিক্ত ঘর দেখা গেল। তার পাশে লেখা—‘বিশেষ কক্ষ—প্রবেশ নিষেধ’।
নকশাটির নীচে একটি স্বাক্ষর।
ড. অনিরুদ্ধ বসু।
ঋদ্ধি নামটি আগে কোথাও পড়েছে বলে মনে করল।
সে ফোনে নামটি খুঁজে দেখল। পুরোনো সংবাদপত্রের একটি ডিজিটাল আর্কাইভে একটি প্রতিবেদন পাওয়া গেল।
‘মনস্তাত্ত্বিক গবেষক ড. অনিরুদ্ধ বসু রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ।’
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০১ সালে। অনিরুদ্ধ বসু মানুষের স্মৃতি, পরিচয় এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত নিয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রাক্তন সহকারী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি অনুমতি ছাড়া মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন।
তদন্ত শুরু হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনও মামলা শেষ পর্যন্ত আদালতে পৌঁছয়নি। কারণ অভিযোগের প্রধান সাক্ষীসহ কয়েকজন হঠাৎ বক্তব্য বদলে ফেলেছিলেন।
ঋদ্ধি আরও খুঁজতে লাগল।
২০০৪ সালে ড. বসুর বাড়ি থেকে কিছু গবেষণার নথি উদ্ধার হয়েছিল। সেই নথিতে ‘ঘর ১৩’ নামে একটি প্রকল্পের উল্লেখ ছিল।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনও বিস্তারিত তথ্য ছিল না।
ঋদ্ধি হরিপদকে জিজ্ঞাসা করল, “ড. অনিরুদ্ধ বসু কে ছিলেন?”
বৃদ্ধের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“এই বাড়ির আগের মালিকের চিকিৎসক। তিনি কিছুদিন এখানে থাকতেন।”
“কী ধরনের চিকিৎসক?”
“মানুষের মন নিয়ে কাজ করতেন।”
“তিনি কি তেরো নম্বর ঘর তৈরি করেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তিনি বলতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার তার নিজের স্মৃতি। কোনও মানুষ যদি নিজের অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে যায়, তাহলে সে নতুন করে বাঁচতে পারে। আবার যদি কেউ অন্যের স্মৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে সে সেই মানুষটির জীবনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
ঋদ্ধি ধীরে বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, তিনি মানুষের স্মৃতি মুছে দিতেন?”
“আমি জানি না তিনি ঠিক কী করতেন। তবে তাঁর কাছে আসা কয়েকজন মানুষ পরে নিজেদের অতীত সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতে শুরু করেছিল।”
“আর আমার দিদি?”
হরিপদ মাথা নিচু করলেন।
“রূপসা দেবী তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”
ঋদ্ধি হতবাক হয়ে গেল।
“আমার দিদি তো একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন!”
“সেটা ঠিক। কিন্তু তিনি অনিরুদ্ধবাবুর গবেষণার নথি অনুবাদ করতেন। একসময় তিনি জানতে পারেন, গবেষণার নামে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এবং স্মৃতি নিয়ে অনৈতিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।”
“তাহলে দিদি সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তিনি তার আগেই নিখোঁজ হয়ে যান।”
ঋদ্ধির মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।
বারো বছর ধরে সে ভেবেছে, দিদি হয়তো কোনও ব্যক্তিগত কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। অথচ তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে ছিল এমন এক গোপন গবেষণা, যার কথা পরিবার কিছুই জানত না।
“ড. অনিরুদ্ধ বসু এখন কোথায়?”
হরিপদ বললেন, “কেউ জানে না।”
“তাহলে তেরো নম্বর ঘরের চাবি কার কাছে?”
বৃদ্ধের চোখ করিডরের দিকে চলে গেল।
“চাবি কোনও দিন আমার কাছে ছিল না।”
“তাহলে দরজা খুলবে কীভাবে?”
হরিপদ ধীরে বললেন, “সময় হলে দরজা নিজেই খুলবে।”
৫. বন্ধ ঘড়ির শব্দ
রাত ২টা ৫ মিনিট।
ঋদ্ধি আবার তিনতলায় উঠে এল। হরিপদ তার সঙ্গে ছিলেন। করিডরের বাতিগুলি একটির পর একটি জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে।
তেরো নম্বর দরজার সামনে এসে ঋদ্ধি দেখল, দরজার পাশে একটি পুরোনো দেয়ালঘড়ি ঝুলছে। ঘড়িটি এতক্ষণ বন্ধ ছিল। এখন তার কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
২টা ১০।
২টা ১১।
২টা ১২।
ঋদ্ধি ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ঘড়ি এতক্ষণ বন্ধ ছিল। হঠাৎ চলছে কেন?”
হরিপদ কোনও উত্তর দিলেন না।
ঘড়ির কাঁটা ২টা ১৬ মিনিটে পৌঁছতেই করিডরের সব আলো নিভে গেল।
সম্পূর্ণ অন্ধকার।
তারপর ঘড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।
টিক।
টিক।
টিক।
২টা ১৭ মিনিট।
ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল।
এক মুহূর্ত পরে তেরো নম্বর ঘরের দরজায় ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
দরজার হাতল নিজে থেকেই ঘুরে গেল।
দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ঋদ্ধি টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে আলো ফেলল।
ঘরটি অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার। কোনও ধুলো নেই, কোনও ভাঙা আসবাব নেই। মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল, দু’পাশে দুটি চেয়ার। দেওয়ালে সারি সারি ফাইল। ঘরের এক কোণে একটি পুরোনো টেলিফোন।
আর টেবিলের সামনে বসে আছে একটি মেয়ে।
তার বয়স আনুমানিক পঁচিশ। পরনে সাদা পোশাক। চুল কাঁধ পর্যন্ত। মুখটি ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।
ঋদ্ধি টর্চের আলো তার মুখে ফেলতেই মেয়েটি বলল, “তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ।”
ঋদ্ধি কয়েক পা এগিয়ে গেল।
“তুমি কে?”
মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।
“আমার নাম মায়া।”
“তুমি কি আমার দিদিকে চেনো?”
“চিনি।”
“তিনি কোথায়?”
মায়া টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইল তুলে ধরল।
“এই ফাইলের মধ্যে তোমার দিদির শেষ সাক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”
ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে বলল, “আবার প্রশ্ন?”
“তোমার দিদি যখন নিখোঁজ হন, তখন তুমি কোথায় ছিলে?”
ঋদ্ধি থমকে গেল।
“বাড়িতে।”
“কোন বাড়িতে?”
“আমাদের বাড়িতে।”
“তোমাদের বাড়ির ঠিকানা কী ছিল?”
ঋদ্ধি উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।
তার মাথার মধ্যে যেন কুয়াশা জমে উঠল। সে জানে তাদের বাড়ি কোথায় ছিল। সে প্রতিদিন সেই বাড়ির কথা ভাবে। কিন্তু হঠাৎ করে রাস্তার নামটি মনে পড়ছে না।
সে চোখ বন্ধ করল।
পুরোনো বাড়ির বারান্দা, মায়ের গানের শব্দ, বাবার পড়ার ঘর—সব মনে পড়ছে। অথচ ঠিকানাটি মনে পড়ছে না।
মায়া বলল, “ভয় পেয়ো না। কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায় না। শুধু তাদের কাছে পৌঁছনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।”
ঋদ্ধি রাগে বলল, “আমার স্মৃতি নিয়ে খেলা বন্ধ করো!”
মায়া শান্ত গলায় বলল, “আমি তোমার স্মৃতি নিয়ে কিছু করছি না। তুমি এখানে আসার আগেই কিছু স্মৃতি তোমার কাছে বন্ধ ছিল।”
“কেন?”
মায়া ফাইলটি টেবিলে রাখল।
“কারণ তোমার দিদি শুধু নিজের জন্য নয়, তোমার জন্যও কিছু লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
ঋদ্ধি ফাইলটি খুলল।
প্রথম পাতায় তার নিজের ছবি।
ছবির নীচে লেখা—
বিষয়: ঋদ্ধি সেন।
পরীক্ষা নম্বর: ১৩/০৭।
স্মৃতিগত বিচ্ছিন্নতার প্রাথমিক লক্ষণ: নিশ্চিত।
ঋদ্ধির হাত থেকে ফাইলটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“এটা কী?”
মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার দিদি নিখোঁজ হওয়ার বারো বছর আগে, তোমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা তুমি ভুলে গেছ।”
ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল, “কী ঘটনা?”
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।
একবার।
দু’বার।
তিনবার।
মায়া ফোন তুলল।
ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
“মায়া, ছেলেটিকে ঘর থেকে বের করে দাও। এখনই।”
মায়ার মুখের রং বদলে গেল।
“কিন্তু সে সত্যিটা জেনে গেছে।”
পুরুষকণ্ঠ বলল, “তাহলে তাকে আর বেরোতে দেওয়া যাবে না।”
ফোন কেটে গেল।
মায়া ধীরে ধীরে ঋদ্ধির দিকে ফিরল।
“তোমাকে এখনই এখান থেকে যেতে হবে।”
ঋদ্ধি বলল, “আমি কোথাও যাব না। আমার দিদির কী হয়েছে, সেটা না জেনে আমি যাব না।”
মায়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
“তাহলে শোনো। তোমার দিদি এই ঘরে বন্দি নন।”
“তাহলে কোথায়?”
মায়া দরজার পিছনের দেওয়ালের দিকে তাকাল।
দেওয়ালে একটি বড় আয়না ঝুলছে। এতক্ষণ ঋদ্ধি সেটিকে সাধারণ আয়না বলেই ভেবেছিল। কিন্তু এখন তার মধ্যে ঘরের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে না।
দেখা যাচ্ছে একটি ছোট ঘর।
সেই ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ারে বসে আছে এক নারী।
চুল লম্বা। মুখ ক্লান্ত। চোখ দুটি বন্ধ।
ঋদ্ধি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
সে মুখটি চিনতে পারে।
বারো বছর ধরে প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি জন্মদিন, প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাতে সে এই মুখটিই মনে করেছে।
“দিদি!”
আয়নার ওপারের নারী ধীরে চোখ খুললেন।
তার ঠোঁট নড়ল।
শব্দ শোনা গেল না।
ঋদ্ধি আয়নার দিকে ছুটে গেল।
নারীটি এবার স্পষ্ট করে বললেন—
“ঋদ্ধি, তুমি এখানে কেন এসেছ?”
তারপর আয়নার ওপারের ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে ভেসে এল আরেকটি কণ্ঠ।
“রূপসাকে ফিরিয়ে আনতে হলে, তোমাকে নিজের হারিয়ে যাওয়া বারো বছর ফিরে পেতে হবে।”
ঋদ্ধি পিছিয়ে এল।
মায়া ফিসফিস করে বলল, “এবার থেকে তোমার কোনও স্মৃতিকে বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ খুঁজবে। কারণ এই বাড়িতে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস কোনও ভূত নয়, কোনও অদৃশ্য শক্তিও নয়।”
সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটির দিকে তাকাল।
“সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হলো—যে সত্যকে তুমি নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করো, অথচ সেটি কখনও তোমার ছিল না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে করিডরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
একজন নয়।
অনেকজন।
দরজার সামনে এসে শব্দ থেমে গেল।
তারপর বাইরে থেকে কেউ বলল—
“তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ করো। বিষয় নম্বর ১৩/০৭ জেগে উঠেছে।”
ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকাল।
মায়া তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—
“দৌড়াও!”
কিন্তু ঘর থেকে বেরোনোর একমাত্র দরজাটি তখন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
আর আয়নার ওপারে, অন্ধকার ঘরে, রূপসা সেন আবার চোখ খুললেন।
তিনি এবার সরাসরি ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়লেন।
“ওরা তোমাকে ছোটবেলাতেই মেরে ফেলেছিল, ঋদ্ধি।”
তারপর সব আলো নিভে গেল।
চলবে…