১. যে মানুষটি নিজের নাম লুকিয়েছিল
“ঋদ্ধি সেন, আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে।”
বাইরের গম্ভীর কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
শান্তিনিকেতন লজের তিনতলার ছোট ঘরে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধি বুঝতে পারছিল, সময় খুব কম। তার হাতে পেনড্রাইভ, কম্পিউটারের পর্দায় কয়েক মুহূর্ত আগেও যে বার্তাটি দেখা গিয়েছিল, সেটি এখন অদৃশ্য। মায়া দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। হরিপদ ভয়ে কাঁপছেন।
“ওরা কারা?” ঋদ্ধি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল।
মায়া বলল, “কয়েকজনকে আমি চিনি। তারা একসময় ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করত। এখন তারা নিজেদের একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু এই বাড়ির পুরোনো নথি তারা বহু বছর ধরে সরিয়ে ফেলছে।”
“পুলিশও কি তাদের সঙ্গে আছে?”
“বাইরে সত্যিই পুলিশ আছে কি না, আমি জানি না। এই লোকেরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে মিথ্যা বলতে পারে।”
ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি পকেটে রাখল।
“আমরা পালাব না। এত দিন পরে প্রমাণ পেয়েছি। এবার সব প্রকাশ করতে হবে।”
মায়া মাথা নাড়ল।
“প্রমাণ প্রকাশ করতে হলে আগে নিশ্চিত হতে হবে, সেগুলো অক্ষত আছে। আর তোমার দাদুর ভিডিওতে যা বলা হয়েছে, তার অর্থও বুঝতে হবে।”
“তিনি বললেন, দিদি নিজেকে আড়াল করেছিলেন আমাকে বাঁচানোর জন্য। কেন?”
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজায় ধাক্কা পড়ল।
“দরজা খুলুন!”
হরিপদ কাঁপা হাতে দরজার কাছে এগোলেন। কিন্তু ঋদ্ধি তাঁকে থামিয়ে দিল।
“আপনি খুলবেন না।”
সে ঘরের পিছনের দিকে তাকাল। আয়নার পাশের গোপন পথটি এখনও খোলা ছিল। তিনজন দ্রুত তার মধ্যে ঢুকে পড়ল। মায়া তাকটি টেনে বন্ধ করতেই বাইরে দরজা ভাঙার শব্দ শোনা গেল।
সুড়ঙ্গের মধ্যে নেমে আসার সময় ঋদ্ধি পিছন ফিরে তাকাল।
“হরিপদ কাকু?”
বৃদ্ধ বললেন, “তোমরা যাও। এই বাড়িতে এত বছর কাটিয়েছি। এবার অন্তত একটা সত্যের পাশে দাঁড়াতে চাই।”
ঋদ্ধি তাঁর হাত ধরল।
“আপনাকে একা ফেলে যাব না।”
হরিপদ মৃদু হাসলেন।
“আমি বৃদ্ধ মানুষ। তোমাদের মতো দৌড়তে পারব না। কিন্তু কিছুক্ষণ তাদের ব্যস্ত রাখতে পারব। তোমরা পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাও।”
বাধ্য হয়ে ঋদ্ধি ও মায়া এগিয়ে গেল। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা একটি লোহার দরজার সামনে পৌঁছল। দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। মায়া কোমর থেকে ছোট একটি চাবি বের করে তালা খুলল।
দরজার ওপারে একটি পরিত্যক্ত গ্যারাজ। সেখানে ধুলো জমা একটি পুরোনো মোটরসাইকেল এবং কয়েকটি ভাঙা বাক্স পড়ে আছে।
তারা গ্যারাজের পাশের সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে এল।
বাইরে তখন সকাল সাড়ে সাতটা।
শহর জেগে উঠেছে। দোকান খুলছে, বাস চলছে, মানুষ কাজে যাচ্ছে। কেউ জানে না, কয়েক গজ দূরের একটি পুরোনো বাড়িতে কী ঘটছে।
ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার আমাদের গন্তব্য কোথায়?”
মায়া উত্তর দিল, “তোমার দাদুর কাছে।”
“তিনি কোথায় আছেন?”
“যে জায়গায় তোমার দিদি বারো বছর আগে প্রথমবার গিয়েছিলেন।”
“কোথায়?”
মায়া ধীরে বলল, “একটি পুরোনো শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। নাম—নির্ভয় আশ্রয়।”
২. নির্ভয় আশ্রয়ের নথি
নির্ভয় আশ্রয় ছিল শহরের উপকণ্ঠে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। একসময় সেখানে অসুস্থ ও বিপর্যস্ত শিশুদের সাময়িকভাবে রাখা হতো। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে, দেওয়ালের রং উঠে গেছে, বাগানে আগাছা জন্মেছে।
ঋদ্ধি ও মায়া পাশের একটি দোকান থেকে বাড়িটির পুরোনো কর্মচারী সম্পর্কে খোঁজ নিল। দোকানদার জানালেন, প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন হিসাবরক্ষক এখনও কাছেই থাকেন। তাঁর নাম নির্মল দত্ত।
এক ঘণ্টা পরে তাঁরা নির্মলবাবুর বাড়িতে পৌঁছল।
বৃদ্ধ মানুষটি প্রথমে দরজা খুলতে চাননি। কিন্তু ঋদ্ধি যখন নিজের পরিচয় দিল এবং অরুণাভ সেনের নাম বলল, তখন তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।
“তুমি অরুণাভবাবুর নাতি?”
“হ্যাঁ। আপনি তাঁকে চিনতেন?”
নির্মলবাবু তাঁদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন।
“চিনতাম। তিনি নির্ভয় আশ্রয়ের জন্য অর্থ সাহায্য করতেন। বাইরে থেকে তাঁকে খুব দয়ালু মানুষ বলে মনে হতো। অনেকে ভাবত, তিনি অনাথ শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান। কিন্তু পরে বুঝলাম, তাঁর সাহায্যের আড়ালে অন্য উদ্দেশ্যও ছিল।”
ঋদ্ধি বলল, “কী উদ্দেশ্য?”
“যেসব শিশুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কম, যাদের অতীতের নথি অসম্পূর্ণ, তাদের নিয়ে তিনি বিশেষ গবেষণা করতেন। তাঁর ধারণা ছিল, শৈশবের স্মৃতি মানুষের পরিচয় গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্মৃতিতে আঘাত লাগলে বা স্মৃতি অসম্পূর্ণ হলে, অন্যের প্রভাব সহজে পড়তে পারে।”
মায়া বলল, “তিনি কি শিশুদের ওপর পরীক্ষা করতেন?”
নির্মলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি সরাসরি কোনও পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলাম না। কিন্তু কিছু শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। ফিরে আসার পর তাদের আচরণ বদলে যেত। কেউ কোনও পুরোনো ঘটনা মনে করতে পারত না, কেউ আবার এমন কিছু বলত, যা তার জানার কথা নয়।”
ঋদ্ধি পকেট থেকে ছবিটি বের করল। হাসপাতালে শুয়ে থাকা তার ছবি।
“আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?”
নির্মলবাবু ছবিটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
“তোমাকে আমি এখানে দেখেছি।”
ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।
“কবে?”
“তুমি যখন বারো বছরের। তোমার মাথায় ব্যান্ডেজ ছিল। তোমার সঙ্গে একজন মহিলা এসেছিলেন। তিনি তোমার দিদি কি না, আমি তখন জানতাম না।”
“রূপসা?”
“সম্ভবত। তিনি তোমাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরে বাইরে এসে আমাকে বলেছিলেন, যদি কখনও কোনও লোক তোমার খোঁজে আসে, তাহলে যেন তোমার নাম কোনও নথিতে না দেখাই।”
“কেন?”
“তিনি বলেছিলেন, তোমার জীবন বিপদের মধ্যে রয়েছে।”
ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“তারপর কী হয়েছিল?”
নির্মলবাবু বললেন, “সেই দিন রাতেই অরুণাভবাবু এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ড. সায়ন রায় ছিলেন। তাঁরা একটি ফাইল নিয়ে চলে যান। পরদিন শুনলাম, রূপসা নিখোঁজ।”
“আপনি পুলিশকে জানাননি?”
“আমি ভয় পেয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, আমার নিজের নামেও কিছু নথি তৈরি হয়েছে। সেখানে লেখা, আমি নাকি অর্থ আত্মসাৎ করেছি। সেই অভিযোগে চাকরি চলে যায়। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি।”
ঋদ্ধি শান্ত গলায় বলল, “আপনি যা জানেন, সব আমাদের বলতে হবে। অন্য অনেক মানুষের জীবনও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে।”
নির্মলবাবু মাথা নাড়লেন।
“আমি বলব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা জিনিস দিতে চাই।”
তিনি আলমারি খুলে একটি ছোট বাক্স বের করলেন। বাক্সের মধ্যে একটি পুরোনো ডায়েরি, কয়েকটি চিঠি এবং একটি ফটোগ্রাফ।
ফটোগ্রাফে তিনজন মানুষ—অরুণাভ সেন, রূপসা এবং আরেকজন অচেনা যুবক।
ছবির পিছনে লেখা—‘প্রকল্প ১৩-এর শেষ বৈঠক, ২০০৪’।
ঋদ্ধি যুবকটির মুখ দেখে চমকে উঠল।
এটি সেই মানুষ, যাকে সে বহুবার নিজের শৈশবের স্মৃতিতে দেখেছে—হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষটি।
“এই লোকটি কে?”
নির্মলবাবু বললেন, “তার নাম অমিতাভ পাল। তিনি ড. বসুর গবেষণাকেন্দ্রে প্রযুক্তিগত কাজ করতেন। কিন্তু তিনিই প্রথম বুঝেছিলেন, স্মৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করার নামে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নষ্ট করা হচ্ছে।”
“তিনি এখন কোথায়?”
“শেষ খবর অনুযায়ী, তিনি উত্তরবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি অরুণাভবাবুর বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”
ঋদ্ধি ডায়েরিটি খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
‘যে মানুষ নিজের স্মৃতি হারায়, তাকে শুধু অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না। তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই সত্যকে চিকিৎসার নামে ব্যবহার করা অপরাধ।’
ডায়েরির শেষ পাতায় একটি ঠিকানা।
শিলিগুড়ি, হাকিমপাড়া, বাড়ি নম্বর ২১।
ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকাল।
“আমাদের উত্তরবঙ্গে যেতে হবে।”
৩. অরুণাভ সেনের স্বীকারোক্তি
শিলিগুড়ি যাওয়ার আগে ঋদ্ধি একটি কাজ করল। সে পেনড্রাইভের সমস্ত নথির অনুলিপি তৈরি করে তিনটি আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করল। একটি বিশ্বস্ত সহকর্মীর কাছে, একটি আইনজীবীর কাছে এবং একটি নিরাপদ অনলাইন সংরক্ষণস্থলে।
তারপর সে নির্ভয় আশ্রয়ের নথি ও ছবি নিয়ে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করল। প্রতিবেদনে কোনও অপ্রমাণিত অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে লেখা হলো না। বরং উল্লেখ করা হলো, কিছু পুরোনো নথিতে অনৈতিক গবেষণা, অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগের ইঙ্গিত রয়েছে।
কিন্তু প্রকাশের আগে সে সিদ্ধান্ত নিল, অমিতাভ পালের সঙ্গে কথা বলবে।
শিলিগুড়ি পৌঁছতে তাদের প্রায় আট ঘণ্টা লাগল। হাকিমপাড়ার বাড়ি নম্বর ২১ একটি ছোট দোতলা বাড়ি। দরজায় ঘণ্টা বাজাতেই এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন।
ঋদ্ধি নিজের পরিচয় দিতেই লোকটির মুখের রং বদলে গেল।
“তোমাকে এখানে আসতে কে বলেছে?”
“নির্মল দত্ত। আমি অরুণাভ সেনের নাতি।”
লোকটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজা খুলে দিলেন।
“ভেতরে এসো।”
তিনি নিজেকে অমিতাভ পাল বলে পরিচয় দিলেন। বয়স প্রায় পঞ্চাশ। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু চোখে এখনও সতর্কতা।
ঋদ্ধি তাঁর সামনে ছবিটি রাখল।
“এই ছবিতে আপনি আছেন।”
অমিতাভ ছবিটি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“হ্যাঁ। সেই সময় আমি অনেক ভুল করেছি।”
“আমার দিদি কোথায়?”
“আমি জানি না।”
“আপনি কি জানেন, তাঁকে কেন নিখোঁজ হতে হয়েছিল?”
অমিতাভ বললেন, “রূপসা এমন কিছু নথি পেয়েছিল, যা প্রমাণ করতে পারত, অরুণাভ নিজের গবেষণার ফলাফল নিয়ে মিথ্যা দাবি করেছেন। তিনি মানুষের স্মৃতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আবিষ্কার করেননি। কিন্তু মানুষের স্মৃতির দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে তাদের বক্তব্য, আত্মবিশ্বাস এবং পরিচয়বোধকে প্রভাবিত করার একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন।”
“এটা কি চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেত না?”
“নৈতিক নিয়ম মেনে, রোগীর সম্মতি নিয়ে, সীমিত ক্ষেত্রে মানসিক পুনর্বাসনের কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু অরুণাভের প্রকল্পে সম্মতি ছিল না। রোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। কখনও তাঁদের বারবার ভুল তথ্য দেখানো হতো, কখনও পুরোনো নথি লুকিয়ে রাখা হতো, আবার কখনও তাঁদের পরিবারের মানুষদের সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা হতো।”
ঋদ্ধি বলল, “আমার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল?”
অমিতাভ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“তোমার দুর্ঘটনার পরে তোমার কিছু স্মৃতি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তোমাকে সাহায্য করার বদলে অরুণাভ তোমাকে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, একজন শিশুর স্মৃতি ও পরিচয়বোধে প্রভাব ফেললে সে কীভাবে নিজের অতীত সম্পর্কে নতুন বিশ্বাস তৈরি করে।”
“তাহলে আমার দিদি আমাকে বাঁচানোর জন্য তাঁকে বাধা দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। রূপসা তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। সে তোমার চিকিৎসার নথি সংগ্রহ করে। কিন্তু অরুণাভ তখন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর গবেষণা প্রকাশ পেলে তাঁর সুনাম, অর্থ এবং স্বাধীনতা সব নষ্ট হবে।”
ঋদ্ধি কঠিন গলায় বলল, “তাহলে আমার দাদু অপরাধী।”
অমিতাভ চোখ নামিয়ে বললেন, “তিনি গুরুতর ভুল করেছিলেন। কিন্তু সব দায় শুধু তাঁর নয়। আমি নিজেও অনেকদিন চুপ ছিলাম।”
“রূপসা কোথায়?”
অমিতাভ একটি পুরোনো খাম বের করলেন।
“রূপসা নিখোঁজ হওয়ার আগে আমাকে এটি দিয়েছিল। বলেছিল, তুমি একদিন সত্য জানতে চাইলে যেন তোমাকে দিই।”
খামের ভিতরে একটি ছোট চিঠি।
‘অমিতাভদা,
আমি যদি ফিরে আসতে না পারি, তাহলে ঋদ্ধিকে বলবেন, আমি তাকে কখনও ছেড়ে যাইনি। আমি তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাকে সত্য বলার সময় এখনও আসেনি।
অরুণাভের কাছে এমন কিছু নথি আছে, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষ নিজের অতীতের সত্য জানতে পারবে। আবার সেই নথি ভুল হাতে পড়লে আরও মানুষের ক্ষতি হতে পারে।
আমাকে খুঁজতে হলে পুরোনো পাহাড়ি স্যানেটোরিয়ামের রেকর্ড দেখবেন।
— রূপসা।’
চিঠির সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল—‘পাইন হিল পুনর্বাসন কেন্দ্র’।
অমিতাভ বললেন, “এই কেন্দ্রটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে কিছু রোগীকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। রূপসা হয়তো সেখানেই ছিল।”
ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।
“আমি সেখানে যাব।”
অমিতাভ মাথা নাড়লেন।
“যাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। তোমার দাদু হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন। তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তার অর্থ তিনি জানতেন তুমি সত্য খুঁজতে শুরু করবে।”
“তিনি কোথায়?”
অমিতাভ জানালেন, পাইন হিলের পুরোনো রেকর্ডে অরুণাভ সেনের নাম শেষবার দেখা গিয়েছিল।
৪. পাহাড়ের পুরোনো স্যানেটোরিয়াম
দার্জিলিংয়ের দিকে যাওয়া পাহাড়ি রাস্তায় দুপুরের পর কুয়াশা নেমে এসেছিল। ঋদ্ধি ও মায়া একটি গাড়ি ভাড়া করে পাইন হিল পুনর্বাসন কেন্দ্রের দিকে এগোল।
কেন্দ্রটি পাহাড়ের এক নির্জন অংশে অবস্থিত। বহু বছর আগে মানসিক আঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। পরে অর্থের অভাব ও প্রশাসনিক সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়।
প্রধান ফটক ভাঙা। বাগানের গাছপালা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। ভবনের জানলায় কাঠের পাটাতন লাগানো।
ঋদ্ধি গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকাল।
“এখানে কেউ থাকে?”
মায়া বলল, “আমি জানি না। কিন্তু পুরোনো রেকর্ডে এই জায়গার নাম রয়েছে।”
তারা পাশের একটি ছোট বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিল। সেখানে এক বৃদ্ধা থাকতেন, নাম সরলা দে। তিনি একসময় স্যানেটোরিয়ামের রান্নাঘরে কাজ করতেন।
রূপসার নাম শুনে তিনি চমকে উঠলেন।
“তোমরা রূপসাকে খুঁজছ?”
ঋদ্ধি দ্রুত বলল, “আপনি তাঁকে চিনতেন?”
“চিনতাম। মেয়েটি খুব সাহসী ছিল। অন্য রোগীদের সাহায্য করত। কিন্তু নিজের কথা খুব কম বলত।”
“তিনি কি এখনও এখানে আছেন?”
সরলা মাথা নাড়লেন।
“না। তিনি বহু বছর আগে চলে গেছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে একটি চিঠি রেখে গিয়েছিলেন।”
বৃদ্ধা ঘরের ভিতর থেকে একটি টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের মধ্যে কয়েকটি পুরোনো কাগজ, রোগীদের তালিকা এবং একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
‘আমি রূপসা সেন। আমার এখানে থাকার কারণ চিকিৎসা নয়, নিরাপত্তা। আমি জানি, আমার ভাই একদিন আমাকে খুঁজতে আসবে। সে যেন জানতে পারে, আমি বেঁচে আছি এবং নিজের ইচ্ছায় এই জায়গা ছেড়েছি।
আমি আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাই না। আমি চাই, আমার ভাই নিজের জীবন নিয়ে বাঁচুক। সে যেন আমার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে নিজের অপরাধ বলে মনে না করে।
যদি সে এখানে আসে, তাকে বলবেন—আমাকে খুঁজে পাওয়ার আগে তাকে নিজের অতীত সম্পর্কে সত্য জানতে হবে।’
চিঠির শেষে একটি ঠিকানা লেখা ছিল। পাহাড়ের অন্য প্রান্তে একটি ছোট গ্রাম—লেপচাঝোরা।
সরলা বললেন, “রূপসা চলে যাওয়ার সময় বলেছিল, সে এমন জায়গায় যাবে, যেখানে কেউ তাকে তার পুরোনো পরিচয় দিয়ে চিনবে না। আমি আর তার খবর পাইনি।”
ঋদ্ধি চিঠিটি হাতে নিয়ে বসে পড়ল।
বারো বছর ধরে সে দিদিকে খুঁজেছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, রূপসা শুধু নিখোঁজ হননি; তিনি নিজেকে এমন একটি জগৎ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর জীবন অন্যের হাতে চলে যাচ্ছিল।
তবু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি।
কেন তিনি ঋদ্ধিকে নিজের কাছে রাখেননি?
৫. লেপচাঝোরার বাড়ি
লেপচাঝোরা ছোট একটি পাহাড়ি গ্রাম। সেখানে পৌঁছতে গাড়ি ছেড়ে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়। পাইনগাছের সারি, সরু পথ, দূরে পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি বাড়ি।
গ্রামের এক বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁদের রূপসার ঠিকানাটি চিনিয়ে দিলেন। একটি ছোট কাঠের বাড়ি। সামনের উঠোনে ফুলের গাছ, পাশে সবজি বাগান।
ঋদ্ধি দরজায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টা বাজাল।
কিছুক্ষণ পরে দরজা খুললেন এক নারী।
চুলে পাক ধরেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু চোখ দুটি একই রকম—যে চোখ ঋদ্ধি শৈশব থেকে চেনে।
রূপসা।
দু’জনেই কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না।
ঋদ্ধির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“দিদি…”
রূপসা ধীরে এগিয়ে এলেন।
“ঋদ্ধি।”
ঋদ্ধি তাঁকে জড়িয়ে ধরল। বারো বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এল।
“তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে কত খুঁজেছি! তুমি একবারও খবর দিলে না কেন?”
রূপসা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“আমি জানি। তোমাকে এত কষ্ট দিতে চাইনি।”
ঋদ্ধি তাঁকে ছেড়ে বলল, “তাহলে কেন চলে গিয়েছিলে? তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারতে না?”
রূপসা চোখ মুছলেন।
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু তখন তোমার বয়স কম ছিল। তুমি অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছিলে। তোমার স্মৃতির মধ্যে কী সত্যি আর কী ভুল, তা নিয়ে তুমি নিজেই বিভ্রান্ত ছিলে। অরুণাভ তোমাকে তাঁর গবেষণার অংশ করতে চেয়েছিলেন। আমি যদি তোমাকে নিয়ে পালাতাম, তাহলে তোমার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যেত। আর আমি যদি তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতাম, তিনি তোমার চিকিৎসার নথি ব্যবহার করে তোমাকে অস্থিতিশীল বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন।”
“তাহলে তুমি একাই পালালে?”
“আমি প্রথমে তোমাকে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করেছিলাম। পরে বুঝলাম, তোমার বাবা-মায়ের কাছেও সব সত্য বলা নিরাপদ নয়। তাঁরা তোমাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু অরুণাভকে বিশ্বাস করতেন। তিনি পরিবারের বড় মানুষ ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও ছিল না।”
ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল, “মা তো আট বছর আগে মারা গেছেন। বাবা কোথায়, তুমি জানো?”
রূপসার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“বাবা আমাকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অরুণাভ ভুল করেছেন। কিন্তু তাঁর কাছে এমন কিছু নথি ছিল, যা প্রকাশ পেলে পরিবারের সুনাম নষ্ট হতো। তিনি সব প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তারপর একদিন তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না।”
“তুমি কি মনে করো, দাদু বাবার নিখোঁজ হওয়ার জন্য দায়ী?”
রূপসা মাথা নাড়লেন।
“আমি নিশ্চিত নই। অরুণাভ অনেক কিছু গোপন করেছেন, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা যায় না।”
ঋদ্ধি বলল, “আমি তাঁর ভিডিও দেখেছি। তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি ভুল করেছেন।”
রূপসা চোখ বন্ধ করলেন।
“তাহলে অবশেষে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পেরেছেন।”
“দিদি, আমি জানতে চাই, আমার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।”
রূপসা তাকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। কাঠের টেবিলে বসিয়ে একটি পুরোনো খাতা খুললেন।
“তোমার দুর্ঘটনার পর তুমি কয়েকটি স্মৃতি হারিয়েছিলে। কিন্তু তুমি নিজেকে চিনতে, পরিবারকে চিনতে এবং নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে পারতে। অরুণাভ বলেছিলেন, তোমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ চিকিৎসা দরকার। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিলাম।”
“তারপর?”
“তিনি তোমাকে বারবার কিছু ছবি দেখাতেন, কিছু গল্প শোনাতেন এবং তোমাকে একই প্রশ্ন করতেন। প্রথমে মনে হতো, এটা স্মৃতি ফিরে পাওয়ার চিকিৎসা। পরে বুঝলাম, তিনি তোমাকে নির্দিষ্ট উত্তর দিতে অভ্যস্ত করে তুলছেন। তুমি যখন নিজের স্মৃতির কথা বলতে, তিনি বলতেন তুমি ভুল বলছ। ধীরে ধীরে তুমি নিজের মনে থাকা ঘটনাগুলোকেও সন্দেহ করতে শুরু করেছিলে।”
ঋদ্ধি নীরবে শুনছিল।
“একদিন তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে, আমি সত্যিই তোমার দিদি কি না। সেই দিন আমি বুঝেছিলাম, এই গবেষণা তোমার ক্ষতি করছে। আমি তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অরুণাভ আমাকে বাধা দেন।”
“তুমি তখন কী করলে?”
“আমি গবেষণার নথি সংগ্রহ করি। কিছু প্রমাণ অমিতাভের কাছে রাখি। তারপর তোমাকে নিরাপদ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজেকে আড়াল করি। আমি ভেবেছিলাম, কিছুদিন পরে ফিরে আসব। কিন্তু অরুণাভের লোকেরা আমাকে খুঁজছিল। আমি যেখানে যেতাম, সেখানে কেউ না কেউ এসে হাজির হতো।”
“তুমি কি কখনও আমার কাছে ফিরে আসতে চাওনি?”
রূপসার চোখ ভিজে উঠল।
“প্রতিদিন চেয়েছি। তোমার জন্মদিনে, দুর্গাপুজোয়, মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার দিন—প্রতিটি মুহূর্তে তোমার কাছে ফিরতে চেয়েছি। কিন্তু আমার ফিরে আসা যদি তোমাকে আবার বিপদের মুখে ঠেলে দিত, তাহলে আমি কীভাবে ফিরতাম?”
ঋদ্ধি দিদির হাত ধরল।
“এবার আর পালাতে হবে না। প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। আমরা সত্য প্রকাশ করব।”
রূপসা কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“তুমি বড় হয়ে গেছ, ঋদ্ধি।”
ঋদ্ধি মৃদু হাসল।
“বারো বছর তো কম সময় নয়।”
৬. দাদুর শেষ চিঠি
সেদিন সন্ধ্যায় রূপসা একটি কাঠের বাক্স খুললেন। বাক্সের মধ্যে বেশ কিছু চিঠি, পুরোনো ছবি এবং একটি খাম ছিল। খামের ওপর লেখা—‘ঋদ্ধির জন্য’।
“এটা অরুণাভ আমাকে দিয়েছিলেন,” রূপসা বললেন। “তখন আমি তাঁকে বিশ্বাস করতাম না। তাই চিঠিটি খুলি নি। তিনি বলেছিলেন, একদিন তুমি নিজের ইচ্ছায় সত্য খুঁজতে শুরু করলে, তখনই এটি পড়বে।”
ঋদ্ধি চিঠিটি খুলল।
‘ঋদ্ধি,
তুমি আমাকে হয়তো ক্ষমা করবে না। তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকারও আমার আছে কি না, জানি না।
আমি একসময় বিশ্বাস করতাম, মানুষের স্মৃতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিলে তার যন্ত্রণা কমানো সম্ভব। আমার গবেষণার শুরু ছিল মানুষের মানসিক আঘাত থেকে মুক্তির পথ খোঁজা। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি নিজের ধারণার প্রতি এতটাই অন্ধ হয়ে পড়ি যে, মানুষের সম্মতি, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার গুরুত্ব ভুলে যাই।
তোমার দুর্ঘটনা আমাকে একটি সুযোগ দিয়েছিল—আমি ভেবেছিলাম, তোমার স্মৃতির ফাঁক পূরণ করে তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু তোমার ইচ্ছা না জেনে তোমার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে আমি তোমার বিশ্বাস নষ্ট করেছি।
তোমার দিদি আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল। আমি তাকে বাধা দিয়েছি। তোমার বাবাও প্রতিবাদ করেছিলেন। আমি তাঁদের কথা শুনিনি।
আমি তোমার কাছে যা করেছি, তার কোনও যুক্তি নেই।
আমি জানি না, তুমি কখনও আমাকে দাদু বলে ডাকবে কি না। আমি শুধু চাই, তুমি সত্যিটা জানো। তোমার স্মৃতিতে কিছু ফাঁক আছে বলে তুমি অসম্পূর্ণ মানুষ নও। তোমার অতীতের প্রতিটি ঘটনা মনে না থাকলেও তোমার বর্তমান জীবন সত্যি।
আমি এখন এমন একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে আছি, যেখানে নিজের মানসিক অবস্থার চিকিৎসা নিচ্ছি। আমার শরীর দুর্বল। হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা হবে না।
যদি কখনও আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমাকে ক্ষমা করার জন্য নিজেকে বাধ্য কোরো না।
তুমি নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচবে।
— অরুণাভ সেন।’
চিঠি পড়ে ঋদ্ধি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মনে রাগ ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে একটি অদ্ভুত শূন্যতাও তৈরি হলো। যে মানুষটিকে সে দাদু বলে চিনত, সেই মানুষই তার শৈশবের একটি অংশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলেন।
রূপসা বললেন, “তুমি কি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাও?”
ঋদ্ধি জানলার বাইরে তাকাল।
“হ্যাঁ। কিন্তু ক্ষমা করার জন্য নয়। সত্যিটা নিজের মুখে শুনতে চাই।”
রূপসা মাথা নাড়লেন।
“তাহলে কাল সকালে আমরা যাব।”
৭. শেষ সাক্ষাৎ
পরদিন সকালে তাঁরা পাহাড়ের একটি ছোট চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছলেন। অরুণাভ সেন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বয়স আশির কাছাকাছি। শরীর দুর্বল, চলাফেরায় অসুবিধা। কিন্তু চেতনা পরিষ্কার।
ঋদ্ধিকে দেখে তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“তুমি এসেছ।”
ঋদ্ধি বলল, “আমি এসেছি কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে।”
অরুণাভ মাথা নাড়লেন।
“প্রশ্ন করো।”
“আপনি কি আমাকে সত্যিই সাহায্য করতে চেয়েছিলেন?”
“শুরুতে হ্যাঁ। কিন্তু পরে আমি নিজের গবেষণাকে তোমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করি। আমি নিজেকে বোঝাতাম, তোমার ভালোর জন্যই সব করছি। আসলে আমি নিজের ভুল স্বীকার করতে চাইনি।”
“আপনি কি জানতেন, আমার দিদি আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন?”
“জানতাম।”
“তবু তাঁকে থামিয়েছিলেন?”
অরুণাভ চোখ বন্ধ করলেন।
“হ্যাঁ।”
ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“আমার বাবা কোথায়?”
অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তোমার বাবা আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি সেগুলো প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করিনি, কিন্তু তাঁকে যথেষ্ট সাহায্যও করিনি। তিনি একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে জানতে পারি, তিনি অন্য শহরে চলে গেছেন। এরপর তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।”
“আপনি জানতেন না তিনি কোথায়?”
“না। আমি খোঁজ করেছিলাম। কিন্তু পাইনি।”
“আপনি কি তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?”
অরুণাভ দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন।
“না। আমি তোমার বাবাকে থামাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাঁর ক্ষতি করিনি। আমার ভুলের দায় আমি নেব, কিন্তু যে অপরাধ করিনি, তার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেব না।”
ঋদ্ধি তাঁর চোখের দিকে তাকাল।
সে বুঝতে পারছিল না, কতটা বিশ্বাস করবে। কিন্তু এবার সে জানত, শুধু স্মৃতি বা আবেগের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
“আপনি যে গবেষণা করেছেন, তার সব নথি কি এখনও আছে?”
“সব নয়। কিছু নথি রূপসা নিয়ে গিয়েছিল, কিছু অমিতাভের কাছে। কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কাছে একটি তালিকা আছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের নাম ও তারিখ লেখা।”
“সেটা কোথায়?”
অরুণাভ বালিশের নীচ থেকে একটি ছোট খাম বের করলেন।
“এখানে।”
ঋদ্ধি খামটি নিল।
“আপনি কি চান, আমি সব প্রকাশ করি?”
অরুণাভ বললেন, “আমি চাই, সত্য প্রকাশ হোক। কিন্তু যাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসার তথ্য রয়েছে, তাদের পরিচয় রক্ষা করতে হবে। অপরাধ প্রকাশ করতে গিয়ে আর কারও ক্ষতি কোরো না।”
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“আমি সেটাই করব।”
বিদায় নেওয়ার আগে অরুণাভ ধীরে বললেন, “ঋদ্ধি, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”
ঋদ্ধি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
“আমি জানি না। হয়তো কোনও দিন পারব, হয়তো পারব না। কিন্তু আমি আপনার ভুলের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করব না।”
অরুণাভের চোখে জল এসে গেল।
“এটাই আমার প্রাপ্য উত্তর।”
ঋদ্ধি ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রূপসা তার পাশে হাঁটছিলেন।
“তুমি ঠিক আছ?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“আমি প্রথমবার বুঝলাম, কাউকে ক্ষমা করা আর তার কাজকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া এক জিনিস নয়।”
রূপসা ভাইয়ের হাত ধরলেন।
“তুমি অবশেষে নিজের স্মৃতির বাইরে গিয়ে সত্যকে দেখতে শিখেছ।”
৮. তেরো নম্বর ঘরের শেষ দরজা
কলকাতায় ফিরে ঋদ্ধি সমস্ত প্রমাণ আইনজীবী ও বিশ্বস্ত সাংবাদিকদের সঙ্গে ভাগ করে নিল। পুরোনো নথি যাচাই করা হলো। হাসপাতালের রেকর্ড, পুনর্বাসন কেন্দ্রের কাগজ, অমিতাভ পালের সাক্ষ্য এবং অরুণাভের স্বীকারোক্তি মিলিয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন তৈরি হলো।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত শুরু হয়। কয়েকজন প্রাক্তন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যাঁরা গবেষণার নামে মানুষের সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়। তবে প্রত্যেক অভিযোগের জন্য পৃথক প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়; কেবল পুরোনো নথির ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়নি।
শান্তিনিকেতন লজের তেরো নম্বর ঘরটি সিল করে দেওয়া হলো। ঘরের কম্পিউটার, ভিডিও ক্যাসেট এবং নথি তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
হরিপদ মণ্ডলও নিজের সাক্ষ্য দিলেন। তিনি স্বীকার করলেন, বহু বছর আগে তিনি ভয়ে কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন। তদন্তে সহযোগিতা করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা পুরোনো অভিযোগগুলিও পুনর্বিবেচনা করা হলো।
মায়া প্রথমবারের মতো নিজের জীবনের কথা প্রকাশ্যে বলতে রাজি হলো। সে জানাল, কীভাবে ছোটবেলায় তাকে কিছু ঘটনা ভুলে যেতে বলা হয়েছিল, কীভাবে নিজের স্মৃতির ওপর তার বিশ্বাস কমে গিয়েছিল, এবং কীভাবে রূপসা তাকে সাহায্য করেছিলেন।
কিন্তু সে এটাও বলল, সব স্মৃতির ফাঁককে কোনও গোপন পরীক্ষার ফল বলে ধরে নেওয়া যায় না। কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়, কিছু মানসিক আঘাতে হারিয়ে যায়, আবার কিছু ঘটনা মানুষ ভুলভাবে মনে রাখে। সত্য খুঁজতে হলে সাক্ষ্য, নথি এবং নিরপেক্ষ যাচাই—সবই দরকার।
ঋদ্ধি তার প্রতিবেদনের শেষে লিখল—
‘মানুষের স্মৃতি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু স্মৃতির সীমাবদ্ধতা কাউকে অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দেয় না। চিকিৎসা, গবেষণা বা পুনর্বাসনের নামে কোনও মানুষের সম্মতি ও মর্যাদা উপেক্ষা করা যায় না। অতীতের সত্য খোঁজার উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; উদ্দেশ্য হলো অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।’
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে তেরো নম্বর ঘরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ঘরের আয়না সরানোর সময় তার পিছনে একটি ছোট ধাতব বাক্স পাওয়া গেল।
বাক্সের মধ্যে কোনও যন্ত্র ছিল না। ছিল একটি মাত্র ছবি।
ছবিতে ছোট্ট ঋদ্ধি, তার দিদি রূপসা এবং তাদের মা-বাবা। সবাই একসঙ্গে বসে হাসছে। ছবিটি সম্ভবত ঋদ্ধির দুর্ঘটনার আগের।
পিছনে মায়ের হাতের লেখায় লেখা—
‘স্মৃতি ভুল হতে পারে। ভালোবাসা যেন কখনও মিথ্যা না হয়।’
ঋদ্ধি ছবিটি নিজের কাছে রেখে দিল।
৯. যে জীবন আবার শুরু হলো
ছয় মাস পরে রূপসা কলকাতায় ফিরে এলেন। তিনি আর আগের চাকরিতে যোগ দেননি। বরং মানসিক আঘাতের শিকার মানুষদের সহায়তা করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন, কারও কষ্টের কথা শোনা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া।
মায়াও ধীরে ধীরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিল। সে চিকিৎসা ও পরামর্শের সাহায্য নিল, পুরোনো স্মৃতি ফিরে পাওয়ার জন্য নিজেকে বাধ্য করল না। যে স্মৃতিগুলো স্পষ্ট ছিল, সেগুলো লিখে রাখল; যেগুলো অস্পষ্ট, সেগুলোকে প্রশ্ন হিসেবেই রেখে দিল।
ঋদ্ধি আবার সাংবাদিকতার কাজে ফিরে গেল। তবে এবার সে রহস্যের খবর লিখতে গিয়ে আরও সতর্ক হলো। কোনও অদ্ভুত ঘটনা দেখলেই সেটিকে অতিপ্রাকৃত বলে ঘোষণা করত না। আবার ক্ষমতাবান কেউ ব্যাখ্যা দিতে না পারলে ঘটনাটিকে মিথ্যা বলেও উড়িয়ে দিত না।
তার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রমাণ, মানুষের সাক্ষ্য এবং নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতন থাকা।
একদিন সন্ধ্যায় রূপসা তাদের পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে ছিলেন। ঋদ্ধি দু’কাপ চা নিয়ে এল।
রূপসা হাসলেন।
“মনে আছে, ছোটবেলায় তুমি চা খেতে চাইতে না?”
ঋদ্ধি হেসে বলল, “মনে আছে। তুমি জোর করে দুধ খাওয়াতে।”
“তুমি তখন খুব জেদি ছিলে।”
“এখনও আছি।”
দু’জনেই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পরে রূপসা বললেন, “তুমি কি এখনও দাদুর কথা ভাবো?”
ঋদ্ধি চায়ের কাপে তাকিয়ে রইল।
“হ্যাঁ। তাঁর কাজের জন্য রাগ হয়। আবার তাঁর শেষ কথাগুলোও মনে পড়ে। আমি তাঁকে পুরোপুরি ক্ষমা করেছি কি না, জানি না।”
“তোমাকে করতেই হবে না।”
ঋদ্ধি দিদির দিকে তাকাল।
“তুমি কি তাঁকে ক্ষমা করেছ?”
রূপসা একটু ভেবে বললেন, “আমি তাঁর কাজকে ক্ষমা করতে পারি না। কিন্তু তাঁর ভুল স্বীকার করার ক্ষমতাকে অস্বীকারও করতে পারি না। মানুষকে তার কাজের জন্য দায় নিতে হবে। আর আমাদের নিজেদের জীবনকে সেই অপরাধের মধ্যে চিরকাল আটকে রাখা চলবে না।”
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“আমার মনে হয়, আমি এত দিন দিদিকে খুঁজছিলাম। কিন্তু আসলে নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনটাকেও খুঁজছিলাম।”
রূপসা তার হাত ধরলেন।
“এবার তুমি দুটোই ফিরে পেয়েছ।”
১০. শেষ স্মৃতির দরজা
এক বছর পরে শান্তিনিকেতন লজের ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ভবনটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল এবং তার কাঠামো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ভাঙার আগে তদন্তকারীরা সমস্ত নথি, যন্ত্র এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী সরিয়ে নেন।
ঋদ্ধি শেষবারের মতো বাড়িটির সামনে দাঁড়াল। তার পাশে রূপসা ও মায়া।
তিনতলার জানলাগুলি ফাঁকা। দেওয়ালের রং উঠে গেছে। ফটকের ওপরের ফলকটি খুলে রাখা হয়েছে।
রূপসা বললেন, “তুমি কি শেষবারের মতো তেরো নম্বর ঘরটি দেখতে চাও?”
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“না। সেখানে আমার জীবনের একটা অন্ধকার অধ্যায় ছিল। কিন্তু আমার জীবন শুধু সেই অধ্যায় নয়।”
মায়া মৃদু হাসল।
“তাহলে এবার কোথায় যাবে?”
ঋদ্ধি আকাশের দিকে তাকাল।
“বাড়ি। তারপর কাজে। এখনও অনেক মানুষের গল্প লেখা বাকি।”
তারা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ ঋদ্ধির ফোনে একটি বার্তা এল। অচেনা নম্বর থেকে।
‘তেরো নম্বর ঘরের রহস্য শেষ হয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, মানুষের স্মৃতি সব সময় নিখুঁত নয়। নিজের স্মৃতিকে ভালোবাসবে, কিন্তু প্রশ্ন করতেও ভয় পাবে না।’
বার্তার নীচে কোনও নাম নেই।
ঋদ্ধি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর নম্বরটি পরীক্ষা করল। সেটি বন্ধ।
মায়া জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”
ঋদ্ধি ফোনটি পকেটে রেখে বলল, “কিছু নয়। হয়তো কেউ একটা কথা মনে করিয়ে দিল।”
“কী কথা?”
ঋদ্ধি হাসল।
“যে সত্য খুঁজতে হলে প্রশ্ন করতে হয়। কিন্তু প্রতিটি অজানা জিনিসের পিছনে নতুন ষড়যন্ত্র আছে—এমন ভাবার দরকার নেই।”
গাড়ি চলতে শুরু করল।
পিছনে পড়ে রইল শান্তিনিকেতন লজ, তার বন্ধ জানলা, অন্ধকার করিডর আর তেরো নম্বর ঘরের সেই আয়না।
ঋদ্ধি জানত, তার জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি। বাবার নিখোঁজ হওয়ার রহস্যও এখনও পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা আর তাকে আগের মতো ভয় দেখায় না।
কারণ সে শিখেছে, সব উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। কিছু সত্য প্রমাণের অপেক্ষায় থাকে, কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ফিরে আসে, আর কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেলেও জীবন থেমে থাকে না।
সে দিদির দিকে তাকাল।
রূপসা জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন। তাঁর মুখে বহু বছরের ক্লান্তি, কিন্তু চোখে নতুন জীবনের আলো।
ঋদ্ধি মনে মনে বলল, ‘এবার আর কাউকে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে হারাব না।’
গাড়ি শহরের ভিড়ে মিশে গেল।
তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ হয়েছে।
কিন্তু ঋদ্ধির জীবনের দরজা এবার সত্যিই খুলেছে—অতীতের দিকে নয়, ভবিষ্যতের দিকে।
— সমাপ্ত —