Categories
গল্প বিবিধ

পাহাড়ের ওপারে যে আলো জ্বলত।

পাহাড়ঘেরা ছোট্ট গ্রামটির নাম ছিল অরুণঝোরা। চারদিকে সবুজ পাহাড়, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু ঝরনা, আর দূরে মেঘে ঢাকা আকাশ—সব মিলিয়ে জায়গাটি ছিল অপূর্ব সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক কঠিন বাস্তবতা।

গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও সরবরাহ ছিল অনিয়মিত। সন্ধ্যা নামলেই অনেক বাড়িতে আলো নিভে যেত। বিশেষ করে পাহাড়ের উঁচু দিকের বসতিগুলিতে সমস্যা ছিল আরও বেশি। ঝড়বৃষ্টি হলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ফিরত না।

সেই গ্রামেই থাকত পনেরো বছরের মেয়ে অর্পিতা। পড়াশোনায় সে খুব ভালো ছিল। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়বে এবং পাহাড়ি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে কাজ করবে।

কিন্তু স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তাকে প্রতিদিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়তে হতো। সন্ধ্যার পর আলো না থাকলে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ত। বাড়িতে একটি ছোট ব্যাটারির আলো ছিল, কিন্তু সেটিও বেশিক্ষণ চলত না।

অর্পিতার বাবা ছিলেন পাহাড়ি পথে পণ্য বহনকারী শ্রমিক। প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতেন। মা বাড়ির কাজের পাশাপাশি কয়েকটি পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করে দিতেন। সংসারে অতিরিক্ত খরচ করার মতো অর্থ ছিল না।

একদিন স্কুলে বিজ্ঞানশিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু ক্লাসে সৌরশক্তি নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। তিনি বোঝাচ্ছিলেন, সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায় এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সাহায্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

ক্লাস শেষে অর্পিতা তাঁর কাছে এসে দাঁড়াল।

“স্যার, আমাদের গ্রামে কি সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব?”

অনিরুদ্ধবাবু হেসে বললেন, “অবশ্যই সম্ভব। তবে শুধু প্যানেল লাগালেই হবে না। কতটা বিদ্যুৎ দরকার, কোথায় বসানো হবে, ব্যাটারির ব্যবস্থা কেমন হবে, রক্ষণাবেক্ষণ কে করবে—সব বুঝে পরিকল্পনা করতে হবে।”

অর্পিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের গ্রামের অনেক ছাত্রছাত্রী সন্ধ্যায় পড়তে পারে না। আমরা কি স্কুলে একটা সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারি?”

শিক্ষক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, প্রশ্নটি কৌতূহল থেকে এসেছে ঠিকই, কিন্তু এর মধ্যে আরও বড় একটি ইচ্ছা লুকিয়ে আছে।

তিনি বললেন, “চেষ্টা করা যায়। তবে প্রথমে সমস্যাটা ভালো করে বুঝতে হবে।”

সেদিন থেকেই অর্পিতার নতুন যাত্রা শুরু হলো।

১. সমস্যার খোঁজে

পরের সপ্তাহে অনিরুদ্ধবাবুর অনুমতি নিয়ে অর্পিতা কয়েকজন সহপাঠীকে সঙ্গে নিল। তারা ঠিক করল, গ্রামের কোন কোন জায়গায় আলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়, তার একটি তালিকা তৈরি করবে।

তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলল। কেউ জানালেন, সন্ধ্যার পর পড়াশোনা করতে অসুবিধা হয়। কেউ বললেন, মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গেলে জরুরি যোগাযোগ করা যায় না। আবার কয়েকজন জানালেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ না থাকলে রাতে কাজ করতে সমস্যা হয়।

অর্পিতা সব তথ্য একটি খাতায় লিখে রাখল। সে বুঝতে পারল, সমস্যাটি শুধু তার নিজের পড়াশোনার নয়। এটি গ্রামের শিক্ষা, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও যুক্ত।

তবে সবাই তার পরিকল্পনায় উৎসাহ দেখালেন না।

গ্রামের এক ব্যক্তি বললেন, “এসব শহরের বড় বড় কথা। আমাদের এখানে কত প্রকল্প এসেছে, কত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে! শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।”

আরেকজন বললেন, “সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসাতে অনেক টাকা লাগে। তোমরা স্কুলের ছেলেমেয়ে, এসব করতে পারবে?”

কথাগুলো শুনে অর্পিতার মন খারাপ হলো। তবু সে শিক্ষকের কাছে ফিরে গেল।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন, “মানুষের সন্দেহকে শত্রু ভাববে না। অনেক সময় তারা আগের অভিজ্ঞতা থেকে অবিশ্বাস করতে শেখে। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।”

তিনি অর্পিতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা শেখালেন—প্রকল্পের আগে সমস্যার প্রমাণ, সম্ভাব্য খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা থাকা দরকার।

অর্পিতা এবার আরও মন দিয়ে কাজ শুরু করল। সে বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য পড়ল, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে শিক্ষামূলক বই দেখল এবং শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে একজন অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদের সঙ্গে কথা বলল।

তারা জানল, স্কুলের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর আগে ছাদের অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। প্যানেলের জন্য উপযুক্ত জায়গা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ, ব্যাটারির নিরাপদ সংরক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর সাহায্য—সবই জরুরি।

অর্পিতা বুঝল, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রস্তুতিও প্রয়োজন।

২. একটি ছোট্ট মডেল

বড় প্রকল্পের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা তখনও নিশ্চিত ছিল না। তাই অনিরুদ্ধবাবু প্রথমে একটি ছোট বিজ্ঞান-প্রকল্প তৈরি করার পরামর্শ দিলেন।

অর্পিতা ও তার বন্ধুরা একটি ক্ষুদ্র সৌরপ্যানেল, একটি উপযুক্ত রিচার্জেবল ব্যাটারি, একটি ছোট এলইডি আলো এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করল। সব উপকরণ শিক্ষক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে যুক্ত করা হলো।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল, সূর্যের আলো ব্যবহার করে কীভাবে দিনের বেলায় শক্তি সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় আলো জ্বালানো যায়, তা দেখানো।

প্রথম দিন পরীক্ষাটি সফল হলো না। আলো কিছুক্ষণ জ্বলে নিভে গেল। অর্পিতা ভেবেছিল, হয়তো পুরো পরিকল্পনাটাই ভুল।

কিন্তু শিক্ষক বললেন, “পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে মানে তুমি কিছুই শেখোনি, তা নয়। এখন খুঁজে বের করতে হবে, কোথায় সমস্যা।”

তারা ব্যাটারির চার্জ, সংযোগ এবং উপকরণের ক্ষমতা পরীক্ষা করল। প্রযুক্তিবিদের সাহায্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার পর আবার পরীক্ষা চালানো হলো।

এবার আলো জ্বলল।

একটি ছোট আলো, অথচ অর্পিতার কাছে মনে হলো যেন অন্ধকার ঘরের মধ্যে নতুন একটি জানালা খুলে গেছে।

তার সহপাঠী সোনম আনন্দে বলে উঠল, “এটা যদি আমাদের স্কুলে করা যায়, তাহলে সন্ধ্যায়ও আমরা পড়তে পারব!”

অর্পিতা বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু এই মডেল দিয়ে পুরো স্কুল চালানো যাবে না। কতটা বিদ্যুৎ লাগবে, সেটা আলাদা করে হিসাব করতে হবে।”

বন্ধুরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। অর্পিতা এখন শুধু স্বপ্ন দেখছিল না, স্বপ্নের সীমাবদ্ধতাও বুঝতে শিখছিল।

৩. গ্রামসভার দিন

অর্পিতা ও তার বন্ধুরা স্কুলের বিজ্ঞান-প্রদর্শনীতে মডেলটি দেখাল। কয়েকজন শিক্ষক প্রশংসা করলেন। স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মীও প্রকল্পটি দেখতে এলেন।

অনিরুদ্ধবাবুর সহযোগিতায় তারা গ্রামের সভায় নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরার সুযোগ পেল।

সেদিন গ্রামের বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অর্পিতা প্রথমে কিছুটা ভয় পেয়েছিল। এত মানুষের সামনে কথা বলার অভ্যাস তার ছিল না।

কিন্তু যখন সে দেখল, তার মা সামনের সারিতে বসে আছেন, তখন সাহস পেল।

সে বলল, “আমরা পুরো গ্রামের বিদ্যুতের সমস্যা একদিনে সমাধান করতে পারব না। কিন্তু স্কুলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আলো ব্যবস্থার উন্নতি করা সম্ভব কি না, সেটা যাচাই করতে চাই। তার জন্য সঠিক সমীক্ষা, খরচের হিসাব এবং দক্ষ কর্মীর সাহায্য দরকার।”

তারপর সে ছোট মডেলটি দেখাল।

একজন প্রবীণ বাসিন্দা জিজ্ঞাসা করলেন, “মেঘলা দিনে সূর্যের আলো কম থাকলে কী হবে?”

অর্পিতা উত্তর দিল, “তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হতে পারে। তাই ব্যাটারির ক্ষমতা, ব্যবহারের পরিমাণ এবং প্রয়োজনে বিকল্প বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু সৌরপ্যানেল বসালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না।”

আরেকজন জানতে চাইলেন, “প্যানেল নষ্ট হলে কে মেরামত করবে?”

এবার অনিরুদ্ধবাবু বললেন, “সেই কারণেই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এবং অর্থের ব্যবস্থা আগে থেকে নির্ধারণ করতে হবে। শিশুদের দিয়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামত করানো হবে না। এসব কাজ প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই করবেন।”

আলোচনার শেষে সিদ্ধান্ত হলো, স্কুলের কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ-প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে।

অর্পিতার মনে হলো, তার প্রথম বড় পদক্ষেপটি সফল হয়েছে।

সবাই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়নি, কিন্তু এবার মানুষ অন্তত তার কথা শুনেছে।

৪. ঝড়ের রাত

কয়েক সপ্তাহ পরে পাহাড়ে প্রবল ঝড় হলো। সারাদিন আকাশ কালো মেঘে ঢাকা ছিল। সন্ধ্যার আগেই বিদ্যুৎ চলে গেল। বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টি এমনভাবে আছড়ে পড়ছিল যে বাড়ির বাইরে বেরোনো অসম্ভব হয়ে উঠল।

অর্পিতার মা রান্নাঘরে ছোট আলোটি জ্বালিয়ে বসেছিলেন। বাবা তখনও কাজ থেকে ফেরেননি।

হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে খবর এল, এক বৃদ্ধের শরীর খারাপ হয়েছে। তাঁর পরিবারের লোকজন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে চাইছিলেন, কিন্তু মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষ।

অর্পিতা নিজের বাড়ির ব্যাটারির আলো নিয়ে প্রতিবেশীদের সাহায্য করতে গেল। সেখানে পৌঁছে সে দেখল, পরিবারের লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

সে বলল, “আলো নিয়ে চিন্তা করবেন না। আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের চেষ্টা করি।”

পাশের বাড়ির একটি চার্জ থাকা ফোন দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খবর পাঠানো হলো। প্রয়োজনীয় পরামর্শ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য পাওয়া গেল।

অর্পিতা সেদিন বুঝল, আলো কেবল পড়ার জন্য নয়; অনেক সময় সঠিক সময়ে সাহায্য পাওয়ার পথও সহজ করে দেয়।

তবে সেই রাত তাকে আরেকটি শিক্ষা দিয়েছিল। তার ছোট সৌর-মডেলটি কয়েকটি আলো জ্বালানোর জন্য তৈরি, জরুরি পরিষেবা চালানোর জন্য নয়। তাই গ্রামের মানুষের নিরাপত্তার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থা থাকা কতটা জরুরি, সে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারল।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে শিক্ষককে বলল, “স্যার, আমাদের প্রকল্পে শুধু পড়াশোনার আলো নয়, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে যোগাযোগ সচল রাখা যায়, সেটাও ভাবা দরকার।”

অনিরুদ্ধবাবু বললেন, “ভাবা দরকার ঠিকই। কিন্তু প্রতিটি ব্যবস্থার উপযুক্ত ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ থাকতে হবে। ছোট মডেল থেকে আমরা ধারণা পাই, বাস্তব প্রকল্পের জন্য বিশেষজ্ঞের পরিকল্পনা দরকার।”

৫. আলো পৌঁছানোর পথ

পরবর্তী কয়েক মাস ধরে সমীক্ষার কাজ চলল। স্কুলের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব নেওয়া হলো। ছাদের অবস্থা পরীক্ষা করা হলো। সম্ভাব্য খরচ, ব্যাটারির প্রয়োজন এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলি নথিভুক্ত করা হলো।

প্রাথমিকভাবে একটি ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রস্তাব তৈরি হলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও অর্থের ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর প্রশিক্ষিত কর্মীরা ইনস্টলেশনের কাজ শুরু করলেন।

অর্পিতা ও তার বন্ধুরা দূর থেকে কাজটি দেখল। তাদের কাউকে বৈদ্যুতিক সংযোগে হাত দিতে দেওয়া হলো না। বরং প্রযুক্তিবিদরা তাদের বুঝিয়ে দিলেন, কীভাবে শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহার পরিমাপ করা হয় এবং কীভাবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ব্যবস্থার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

অবশেষে স্কুলের একটি নির্দিষ্ট অংশে সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে আলো জ্বালানো সম্ভব হলো। সন্ধ্যায় বিশেষ অনুমতি ও তত্ত্বাবধানে সেখানে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হলো।

প্রথম দিন অর্পিতা যখন আলো জ্বলা ঘরে ঢুকল, তার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।

তার পাশে বসে সোনম বই খুলে বলল, “এবার আর সন্ধ্যা নামলেই পড়া বন্ধ করতে হবে না।”

অর্পিতা হেসে উত্তর দিল, “সব সমস্যার সমাধান হয়নি। কিন্তু একটা পথ তো খুলেছে।”

স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানালেন, ব্যবস্থাটি নিয়মিত পরীক্ষা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ করা হবে। গ্রামের অন্য জায়গায় একই ধরনের প্রকল্প করা সম্ভব কি না, তা ভবিষ্যতে মূল্যায়ন করা হবে।

অর্পিতা জানত, একটি ছোট ব্যবস্থা দিয়ে পুরো পাহাড়ি অঞ্চলের বিদ্যুতের সমস্যা মেটানো যাবে না। তবু এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছিল, সঠিক পরিকল্পনা ও সহযোগিতা থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করা যায়।

৬. পাহাড়ের ওপারে

একদিন স্কুল ছুটির পর অর্পিতা পাহাড়ের চূড়ার দিকে ওঠা একটি পথ ধরে হাঁটছিল। দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। নিচের গ্রামে একে একে বাড়ির আলো জ্বলতে শুরু করেছে।

তার মনে পড়ল সেই প্রথম দিনের কথা, যখন বিজ্ঞানশিক্ষকের কাছে সে জানতে চেয়েছিল—সূর্যের আলো দিয়ে কি তাদের গ্রামের অন্ধকার দূর করা যায়?

সেই প্রশ্নের উত্তর সে পেয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে আরও অনেক প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। কীভাবে শক্তির অপচয় কমানো যায়? কীভাবে পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশের ক্ষতি না করে উন্নয়ন করা যায়? কীভাবে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, যা সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে?

অর্পিতা বুঝল, বিজ্ঞান মানে শুধু বইয়ের সূত্র মুখস্থ করা নয়। বিজ্ঞান মানে বাস্তব সমস্যাকে প্রশ্ন করা, তথ্য সংগ্রহ করা, পরীক্ষা করা, ভুল থেকে শেখা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বাড়ি ফিরে সে পড়ার টেবিলে বসল। জানালার বাইরে পাহাড়ের ওপারে শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ঘরের ভিতরে তার বইয়ের পাতায় আলো পড়ে ছিল।

মা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “আজ এত খুশি কেন?”

অর্পিতা বলল, “কারণ আজ বুঝেছি, বড় পরিবর্তন সব সময় বড় জায়গা থেকে শুরু হয় না। কখনও একটা প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়।”

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“তাহলে প্রশ্ন করতে থাকিস। তবে মানুষের কথা শুনে, নিজের কাজ শিখে, আর বাস্তবতাকে বুঝে এগোবি।”

অর্পিতা বই খুলে পড়তে শুরু করল।

পাহাড়ের ওপারে তখনও অনেক গ্রাম অন্ধকারে ডুবে ছিল। তাদের প্রত্যেকটির সমস্যা আলাদা, প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজন আলাদা পরিকল্পনা। অর্পিতা জানত, একদিনে সব আলো পৌঁছে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

কিন্তু সে এটাও জানত—অন্ধকার দেখে শুধু অভিযোগ করলে পথ তৈরি হয় না। পথ তৈরি হয় যখন কেউ সমস্যাটিকে বুঝতে চায়, অন্যদের সঙ্গে হাত মেলায় এবং ছোট একটি কাজকে দায়িত্ব নিয়ে শেষ করে।

সেই রাতে অরুণঝোরার আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল। আর একটি ছোট্ট ঘরে বসে অর্পিতা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল—এমন এক বিজ্ঞানী, যে শুধু নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করবে না, মানুষের বাস্তব জীবনে সেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার কথাও ভাববে।

নৈতিক শিক্ষা: বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে একটি ছোট প্রশ্ন থেকে। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন অধ্যবসায়, বৈজ্ঞানিক চিন্তা, সঠিক পরিকল্পনা এবং মানুষের সহযোগিতা। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে এগোতে পারলেই ছোট উদ্যোগও সমাজের উপকারে আসতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *