Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে দোকানে সময় ভাড়া পাওয়া যেত।

শহরের পুরনো বাজারে একটি অদ্ভুত দোকান ছিল। দোকানটির নাম ‘সময়ের ঘর’। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, সেখানে হয়তো পুরনো বই কিংবা নানা রকম উপহারসামগ্রী বিক্রি হয়। কিন্তু দোকানের কাচের দরজায় লেখা ছিল একটি আশ্চর্য বাক্য—

“এখানে সময় ভাড়া পাওয়া যায়। টাকা নয়, দাম দিতে হয় নিজের অভ্যাস দিয়ে।”

দোকানটির মালিক ছিলেন এক বৃদ্ধ, নাম শশাঙ্কবাবু। তাঁর বয়স কত, কেউ জানত না। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ীরাও তাঁকে ছোটবেলা থেকে একই রকম দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করতেন।

একদিন কলেজপড়ুয়া অদিতি দোকানটির সামনে এসে দাঁড়াল। পরীক্ষার আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। অথচ তার পড়া শেষ হয়নি। মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখতে দেখতে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে, কখন যে দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যায়, সে বুঝতেই পারে না।

অদিতি দোকানের লেখাটি পড়ে হেসে ফেলল। তারপর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে বলল, “কাকু, সত্যিই কি সময় ভাড়া দেন?”

শশাঙ্কবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “কত ঘণ্টা লাগবে?”

“প্রতিদিন অন্তত তিন ঘণ্টা বেশি সময় পেলে ভালো হতো।”

বৃদ্ধ একটি মোটা খাতা খুললেন। সেখানে অসংখ্য মানুষের নামের পাশে বিভিন্ন হিসাব লেখা। কারও পাশে লেখা ‘প্রতিদিন কুড়ি মিনিট’, কারও পাশে ‘এক ঘণ্টা’, আবার কারও পাশে ‘নিজের জন্য আধ ঘণ্টা’।

অদিতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত মানুষ আপনার কাছ থেকে সময় নিয়েছেন?”

“নিয়েছেন তো বটেই। কিন্তু সবাই সময়ের দাম দিতে পারেননি।”

“দাম কত?”

শশাঙ্কবাবু বললেন, “তোমাকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা দেব। তার বদলে তোমাকে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, পড়ার সময় মোবাইল ফোন অন্য ঘরে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, দিনের শুরুতেই কাজের তালিকা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, রাতে ঘুমানোর আগে দেখতে হবে, সময়টা কোথায় খরচ করলে।”

অদিতি হেসে বলল, “এ তো সময় ভাড়া নয়, নিয়ম মানা!”

বৃদ্ধ শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “সময় তো তোমার কাছেই আছে। আমি শুধু তোমাকে তার দরজা দেখাচ্ছি।”

অদিতি চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করল।

প্রথম দিনই তার অসুবিধা হলো। মোবাইল ফোন অন্য ঘরে রেখে পড়তে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ হয়তো বার্তা পাঠিয়েছে। কয়েকবার উঠে ফোন আনতে গিয়েও সে নিজেকে সামলাল। কাজের তালিকা তৈরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু সব কাজ শেষ করতে পারেনি।

রাতে দোকানে ফিরে সে বলল, “আজ আপনার নিয়ম মেনেও তিন ঘণ্টা বেশি সময় পেলাম না!”

শশাঙ্কবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি পড়ার মাঝে বারবার জানালার বাইরে তাকিয়েছ? অপ্রয়োজনীয় কাজ করেছ? একই বিষয় বারবার পড়েছ, কারণ মনোযোগ ছিল না?”

অদিতি একটু ভেবে মাথা নাড়ল।

“তাহলে সময় কোথায় হারিয়েছে, তা খুঁজে বের করো। সময়ের হিসাব রাখা মানে শুধু ঘড়ির দিকে তাকানো নয়, নিজের অভ্যাসকে চিনতে শেখা।”

পরদিন থেকে অদিতি পড়ার সময়কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করল। নির্দিষ্ট সময় পড়ল, মাঝখানে বিরতি নিল, তারপর আগের পড়া নিজেকে প্রশ্ন করে যাচাই করল। সব কাজ এক দিনে শেষ করার চেষ্টা না করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে করল।

এক সপ্তাহ পরে তার পড়ার গতি বেড়ে গেল। শুধু তাই নয়, সে প্রতিদিন কিছুটা সময় গান শোনার এবং মায়ের সঙ্গে গল্প করার জন্যও রাখতে পারল।

পরীক্ষার আগের দিন অদিতি আবার ‘সময়ের ঘর’-এ এল। বলল, “কাকু, এখন আর আমার তিন ঘণ্টা বাড়তি সময় দরকার হয় না। যে সময়টুকু আছে, সেটাই ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি।”

শশাঙ্কবাবু মৃদু হাসলেন। “তাহলে তোমার ভাড়া শেষ।”

অদিতি কৌতূহল নিয়ে খাতার দিকে তাকাল। “এবার কি অন্য কাউকে সময় দেবেন?”

বৃদ্ধ বললেন, “দেব। তবে মনে রেখো, কেউ কারও জন্য সময় তৈরি করে দিতে পারে না। শুধু সময় নষ্ট হওয়ার পথগুলো বন্ধ করতে সাহায্য করতে পারে।”

অদিতি দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পিছন ফিরে দেখল। বৃদ্ধ খাতার পাতায় নতুন একটি নাম লিখছেন। নামের পাশে লিখলেন—‘নিজের সময় খুঁজে পেতে চায়’।

বাড়ি ফেরার পথে অদিতি বুঝল, সময়ের অভাব অনেক সময় ঘড়ির কাঁটায় থাকে না; থাকে আমাদের ছড়িয়ে থাকা মনোযোগে, অগোছালো অভ্যাসে এবং কোন কাজটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে না পারার মধ্যে।

পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন অদিতি খুব ভালো নম্বর পেল। কিন্তু তার কাছে সাফল্য শুধু নম্বর ছিল না। সে শিখেছিল, নিজের সময়কে সম্মান করা মানে নিজের জীবনকেও সম্মান করা।

অনেক দিন পরে সে আবার বাজারে গেল। কিন্তু ‘সময়ের ঘর’ নামে কোনও দোকান খুঁজে পেল না। সেখানে তখন একটি ছোট্ট সাধারণ বইয়ের দোকান।

দোকানের মালিক জানালেন, শশাঙ্কবাবু বহু বছর আগেই মারা গিয়েছেন। তবে তাঁর একটি খাতা দোকানের পুরনো আলমারিতে রাখা আছে।

অদিতি খাতাটি খুলে শেষ পাতায় একটি বাক্য দেখতে পেল—

“সময় কারও সম্পত্তি নয়। কিন্তু সময়কে কীভাবে ব্যবহার করবে, সেই সিদ্ধান্ত তোমার।”

অদিতি বাক্যটি নিজের ডায়েরিতে লিখে নিল। তার মনে হলো, শশাঙ্কবাবুর দোকান হয়তো সত্যিই জাদুর ছিল না, কিন্তু সেখানে পাওয়া শিক্ষা তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।

শিক্ষা: সময় বাড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখা সম্ভব। মনোযোগ, পরিকল্পনা, নিয়মিত বিরতি এবং অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অল্প সময়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা যায়।

Share This
Categories
বিবিধ

যে মেয়েটি নীরবতার ছবি আঁকত।

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি বিশেষ বিদ্যালয়। সেখানে এমন সব শিশু পড়তে আসত, যাদের শেখার ধরন ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। কেউ কথা বলতে অসুবিধা অনুভব করত, কেউ শব্দের চেয়ে ছবি সহজে বুঝতে পারত, আবার কেউ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য সময় নিত একটু বেশি।

সেই বিদ্যালয়ের পাশের বাড়িতে থাকত পনেরো বছরের মেয়ে মেঘলা। ছবি আঁকতে সে খুব ভালোবাসত। তার খাতায় ফুটে উঠত নদী, পাহাড়, মানুষের মুখ, ভিড়ের রাস্তা কিংবা একাকী দাঁড়িয়ে থাকা গাছ। কিন্তু মেঘলার ছবির একটি বিশেষত্ব ছিল—সে ছবিতে মানুষের মুখের অভিব্যক্তি আঁকতে ভালোবাসত।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, বিদ্যালয়ের বারান্দায় একটি ছেলে বসে আছে। তার নাম অর্ণব। ছেলেটি নতুন ভর্তি হয়েছে। অন্য শিশুরা মাঠে খেললেও সে চুপচাপ নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে বসেছিল।

মেঘলা দূর থেকে তাকে লক্ষ করল। পরদিনও একই দৃশ্য। তৃতীয় দিনেও তাই।

একদিন সে সাহস করে অর্ণবের পাশে বসে খাতা খুলল। তারপর একটি কাগজে হাসিমুখ আঁকল, তার পাশে আঁকল দুঃখী মুখ, আর শেষে আঁকল একটি ছোট্ট বিড়াল।

অর্ণব ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে সে বিড়ালটির ছবিতে আঙুল রাখল। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটি পেন্সিল বের করে কাগজের অন্য পাশে একটি বাড়ি আঁকল।

মেঘলা অবাক হয়ে দেখল, অর্ণবের আঁকার হাত অসাধারণ। কয়েকটি রেখার মধ্যেই সে বাড়ির জানালা, উঠোনে রাখা ফুলের টব আর দরজার সামনে বসে থাকা একটি বিড়াল এঁকে ফেলেছে।

সেদিন তাদের খুব বেশি কথা হয়নি। তবু একটি নতুন বন্ধুত্বের শুরু হলো।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ মেঘলা নিয়মিত অর্ণবের সঙ্গে ছবি আঁকতে লাগল। কখনও তারা রং মেলাত, কখনও অসম্পূর্ণ ছবিতে নতুন কিছু যোগ করত। অর্ণব কথা বলতে স্বচ্ছন্দ ছিল না, কিন্তু ছবির মাধ্যমে সে নিজের পছন্দ, অপছন্দ আর অনুভূতি বোঝাতে পারত।

মেঘলা বুঝতে শিখল, কারও কথা কম বলার অর্থ এই নয় যে তার মনে বলার মতো কিছু নেই।

একদিন বিদ্যালয়ে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। শিক্ষকরা ঠিক করলেন, বিদ্যালয়ের করিডরে শিশুদের আঁকা ছবি দিয়ে একটি প্রদর্শনী করা হবে। মেঘলা প্রস্তাব দিল, অর্ণবের ছবিগুলিও সেখানে রাখা হোক।

একজন শিক্ষক বললেন, “ও কি নিজের ছবিগুলো অন্যদের দেখাতে চাইবে?”

মেঘলা বলল, “ওকে জিজ্ঞেস করলেই তো জানা যাবে।”

সে অর্ণবের সামনে কয়েকটি ছবি রাখল এবং প্রদর্শনীর একটি ছোট্ট পোস্টার দেখাল। অর্ণব প্রথমে দ্বিধা করল। তারপর নিজের আঁকা বাড়িটির ছবিটি বেছে নিয়ে পোস্টারের পাশে রাখল।

অনুষ্ঠানের দিন করিডরে অনেক মানুষ এলেন। কেউ রঙের ব্যবহার দেখে প্রশংসা করলেন, কেউ ছবির গল্প জানতে চাইলেন। অর্ণব প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও শিক্ষক তার পাশে দাঁড়ালেন। মেঘলা ছবির পাশে একটি ছোট্ট লেখা লাগিয়ে দিল—‘একটি বাড়ি, যেখানে কেউ একা নয়।’

একজন দর্শক ছবিটি দেখে বললেন, “এত সুন্দর ছবি! ছেলেটি কী বলতে চেয়েছে?”

মেঘলা উত্তর দিল, “ছবিটি ওর নিজের। ওর কাছ থেকেই জানতে হবে। আমরা শুধু অনুমান করতে পারি।”

তারপর সে অর্ণবকে ছবিটির দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করল, সে কি ছবির গল্প বোঝাতে চায়। অর্ণব ধীরে ধীরে ছবির বাড়ি, ফুলের টব এবং বিড়ালটির দিকে আঙুল দেখাল। শিক্ষক তার ইশারা ও পরিচিত যোগাযোগপদ্ধতির সাহায্যে কথাগুলোর অর্থ বুঝতে সাহায্য করলেন।

অর্ণব বোঝাতে চেয়েছিল, তার বাড়িতে একটি বিড়াল আছে। স্কুলে যখন তার মন খারাপ হয়, তখন সে সেই বিড়ালটির কথা ভাবে। বিড়ালটি তার কাছে নিরাপত্তা আর ভালোবাসার প্রতীক।

সেদিন ছবিটি প্রদর্শনীর বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠল। কিন্তু মেঘলার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল অন্য কিছু। অনুষ্ঠান শেষে অর্ণব নিজে থেকে তার খাতা খুলে নতুন একটি ছবি আঁকতে শুরু করেছিল। ছবিতে ছিল দুটি শিশু, পাশাপাশি বসে আছে। একজনের হাতে রংতুলি, অন্যজনের হাতে পেন্সিল।

ছবিটি শেষ করে অর্ণব মেঘলার দিকে তাকিয়ে হাসল।

মেঘলা বুঝল, বন্ধুত্বের জন্য সব সময় একই ভাষায় কথা বলতে হয় না। কখনও মনোযোগ দিয়ে দেখা, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং অন্যের প্রকাশের ধরনকে সম্মান করাই যথেষ্ট।

এরপর বিদ্যালয়ে একটি ছোট্ট শিল্পকর্মের দল তৈরি হলো। সেখানে প্রত্যেক শিশুকে নিজের মতো করে ছবি আঁকা, রং করা কিংবা অন্য কোনও সৃজনশীল কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। কেউ মুখে গল্প বলল, কেউ ছবি আঁকল, কেউ আবার পরিচিত ইশারা ব্যবহার করে নিজের ভাবনা প্রকাশ করল।

মেঘলা প্রায়ই সেই দলের কাছে যেত। সে কাউকে শেখাতে যাওয়ার আগে জানতে চাইত, সে কী করতে চায়।

বছর কয়েক পরে মেঘলা শিল্পকলার পড়াশোনা শুরু করল। তার স্বপ্ন ছিল এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ পাবে—কথায়, ছবিতে কিংবা নিজের পছন্দের অন্য কোনও মাধ্যমে।

তার খাতার প্রথম পাতায় সে লিখেছিল—

‘সবাই একইভাবে কথা বলে না, কিন্তু প্রত্যেকের অনুভূতি শোনার মতো মূল্যবান।’

শিক্ষা: মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ গড়ে তুলতে শুধু কথা বললেই হয় না; মনোযোগ দিয়ে বুঝতেও হয়। প্রত্যেকের প্রকাশের ধরনকে সম্মান করা এবং নিজের ধারণা চাপিয়ে না দেওয়াই সহমর্মিতার প্রকৃত পরিচয়।

Share This
Categories
নারী কথা বিবিধ

মহীয়সী নারী: পার্বতী গিরি — ওড়িশার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সমাজসেবার এক বিস্মৃতপ্রায় মহীয়সী।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন বহু নারী রয়েছেন, যাঁরা দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্নে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে তাঁদের অনেকেই ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা বা আরামের জীবন বেছে না নিয়ে সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কাছে দেশপ্রেম শুধু বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল না; দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের জীবনকে উন্নত করার দায়িত্বও ছিল তারই অংশ।

ওড়িশার ইতিহাসে পার্বতী গিরি এমনই এক অসাধারণ নারী। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসেবী এবং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে ওড়িশার পশ্চিমাঞ্চলে তাঁর কাজ মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি পরবর্তী সময়ে অনাথ শিশু, অসহায় মানুষ এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করেন।

পার্বতী গিরির জীবন আমাদের শেখায়, দেশকে ভালোবাসার অর্থ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন নয়—দেশের মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য কাজ করাও দেশসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ

পার্বতী গিরির জন্ম ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ওড়িশা অঞ্চলে। তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন জীবনীতে পশ্চিম ওড়িশার পদমপুর এলাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমান ওড়িশার বারগড় জেলার সঙ্গে তাঁর জীবনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি এমন এক সময়ে বড় হয়ে উঠেছিলেন, যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি দেশের নানা অঞ্চলে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়িয়ে তুলেছিল।

ওড়িশার গ্রামাঞ্চলেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়ছিল। জাতীয় আন্দোলনের পাশাপাশি সেখানে সামাজিক সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

এই সময়ের পরিবেশ পার্বতী গিরির চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। অল্প বয়স থেকেই তিনি দেশের স্বাধীনতা এবং মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন।

অল্প বয়সে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান

পার্বতী গিরির জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলির একটি হলো, তিনি খুব অল্প বয়সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সাধারণভাবে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তার সূচনা কিশোরীবেলায় বলে উল্লেখ করা হয়।

তখন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, মিছিল, প্রচার এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধ শুরু হয়।

এই আন্দোলনে বহু তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনের স্বাভাবিক পথ ছেড়ে স্বাধীনতার কাজে যুক্ত হন। পার্বতী গিরিও সেই প্রজন্মের একজন সাহসী প্রতিনিধি ছিলেন।

অল্প বয়সে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা সহজ ছিল না। ব্রিটিশ প্রশাসনের নজরদারি, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা এবং সামাজিক বাধা—সবকিছুর মধ্যেই আন্দোলনকারীদের কাজ করতে হতো। পার্বতী গিরি সেই পরিস্থিতিতেও নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।

‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রভাব

১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সম্মতি ছাড়াই দেশকে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। অন্যদিকে, স্বাধীনতার দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছিল।

গান্ধীজি ও জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবি আরও তীব্র হয়। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর বহু জাতীয় নেতা গ্রেপ্তার হন। তবুও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ চালিয়ে যান।

পার্বতী গিরি এই বৃহত্তর আন্দোলনের আবহে স্বাধীনতার কাজে যুক্ত হন। তাঁর মতো তরুণ কর্মীরা গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্বাধীনতার আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর জীবনের এই অধ্যায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি এমন বয়সে জাতীয় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, যখন অধিকাংশ তরুণের কাছে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান চিন্তা থাকে শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পার্বতী গিরি দেশের স্বাধীনতাকে নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

নারীর সাহস ও সামাজিক বাধা

স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তাঁদের সামনে নানা সামাজিক বাধা ছিল। অনেক পরিবারে নারীদের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হতো না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সামাজিক রীতিনীতি এবং প্রচলিত ধারণা নারীদের স্বাধীন চলাফেরা ও জনজীবনে অংশগ্রহণকে সীমিত করত।

এই পরিস্থিতিতে পার্বতী গিরির মতো নারীদের আন্দোলনে যোগদান ছিল সাহসের পরিচয়। তাঁরা দেখিয়েছিলেন, দেশ ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরাও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

তাঁর জীবন নারীস্বাধীনতার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একজন আন্দোলনকারী ছিলেন না; পরবর্তী জীবনে সমাজসেবার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, নারীর কর্মপরিসর পরিবার বা ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।

স্বাধীনতার পরে নতুন দায়িত্ব

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পরও দেশের সামনে ছিল দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা সমস্যা।

পার্বতী গিরি স্বাধীনতার পরে সমাজসেবার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটানো এবং সমাজের দুর্বল অংশের পাশে দাঁড়ানো।

বিশেষ করে অনাথ ও অসহায় শিশুদের জন্য তাঁর কাজ উল্লেখযোগ্য। তিনি বুঝেছিলেন, একটি শিশুর জীবনে নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, পুষ্টি এবং স্নেহের গুরুত্ব অপরিসীম। যেসব শিশু পরিবার বা সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য সংগঠিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন এবং শিশুদের পুনর্বাসন ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অনাথ শিশুদের জন্য কাজ

পার্বতী গিরির সমাজসেবার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল অনাথ ও অসহায় শিশুদের কল্যাণ। দরিদ্র পরিবার, সামাজিক বিপর্যয় কিংবা পারিবারিক আশ্রয়ের অভাবে বহু শিশু নিরাপদ জীবন থেকে বঞ্চিত হয়। স্বাধীনতার পরও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সমস্যা ছিল গভীর।

পার্বতী গিরি শিশুদের জন্য এমন পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন, যেখানে তারা নিরাপদে বড় হতে পারে, শিক্ষা পেতে পারে এবং ভবিষ্যতে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

শিশুদের জন্য আশ্রয় তৈরি করা মানে শুধু মাথার ওপর ছাদ দেওয়া নয়। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আত্মসম্মানের বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সমাজসেবা কেবল সাময়িক সাহায্য দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।

সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে

পার্বতী গিরি শুধু শিশুদের কল্যাণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ওড়িশার পশ্চিমাঞ্চলের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নেও তিনি কাজ করেন।

গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা মানুষের উন্নতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যাগুলি দূর করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সমাজকর্মীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।

পার্বতী গিরি মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে তাঁদের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর কাজের মূল ভিত্তি ছিল সেবা, সহমর্মিতা এবং বাস্তব প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগ।

সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে সাহায্য করার সময় তাঁদের আত্মসম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহায্য যেন মানুষের ওপর অনুগ্রহ প্রদর্শনের মাধ্যম না হয়ে ওঠে, বরং তাঁদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে—এই ভাবনা আধুনিক সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি

শিক্ষা মানুষের জীবন পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। শিক্ষা মানুষকে শুধু পড়তে ও লিখতে শেখায় না; নিজের অধিকার বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে সাহায্য করে।

পার্বতী গিরির সমাজসেবার ভাবনায় অসহায় শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। শিশুরা যদি শিক্ষা ও উপযুক্ত পরিবেশ পায়, তাহলে দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে নিজেদের জীবনকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষিত মেয়ে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে এবং পরিবার ও সমাজের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।

আজকের দিনে যখন শিশু অধিকার, সমান সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন পার্বতী গিরির মতো সমাজকর্মীদের জীবন আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে।

কেন তিনি স্মরণীয়?

পার্বতী গিরিকে স্মরণ করার প্রধান কারণ শুধু তাঁর স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ নয়। স্বাধীনতার পরও তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর মতো তাঁর কাছেও দেশপ্রেমের অর্থ ছিল দেশের মানুষের পাশে থাকা।

তাঁর জীবনকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে দেখা যায়।

প্রথমত, তিনি অল্প বয়সে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার পর সমাজের অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করে দেখিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বও জড়িত।

তৃতীয়ত, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন।

এই তিনটি দিক তাঁর জীবনকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে পার্বতী গিরির শিক্ষা

পার্বতী গিরির জীবন থেকে বর্তমান প্রজন্ম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারে।

প্রথমত, বয়স কখনও মহৎ কাজের পথে বাধা নয়। অল্প বয়সেও একজন মানুষ সমাজ ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, দেশপ্রেম মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন দরিদ্র, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষও তার সুফল পান।

তৃতীয়ত, শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সমাজের দায়িত্ব। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ থাকা উচিত।

চতুর্থত, সমাজসেবায় ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। একদিনের সাহায্য অনেক সময় সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ মানুষের জীবনকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।

পঞ্চমত, নারীর নেতৃত্বকে সম্মান করতে হবে। ইতিহাসে নারীরা স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

উপসংহার

পার্বতী গিরি ছিলেন ওড়িশার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সমাজসেবার ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য নারী। অল্প বয়সে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহসী জীবনের সূচনা হয়। পরে তিনি সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও অনাথ শিশুদের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জন একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হলেও সমাজের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য নিরন্তর কাজ করতে হয়। মানুষের জীবনে শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

পার্বতী গিরির মতো মানুষরা হয়তো সব সময় জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন না, কিন্তু তাঁদের কাজ বহু মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনে।

দেশকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ শুধু দেশের অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়; দেশের মানুষের ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করে তোলার জন্য কাজ করাও দেশপ্রেমের এক মহান প্রকাশ—পার্বতী গিরির জীবন সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

মহীয়সী নারী: লাল দেদ — কাশ্মীরের আধ্যাত্মিক কবি, যাঁর বাণীতে মিশেছিল মানবতা ও আত্মঅনুসন্ধান।

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নারী রয়েছেন, যাঁদের হাতে ছিল না রাজদণ্ড, যাঁদের সামনে ছিল না বিশাল সেনাবাহিনী, অথচ তাঁদের চিন্তা ও সৃষ্টির প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে রয়েছে। তাঁরা নিজেদের জীবন, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন গভীর সত্যের সন্ধান। কাশ্মীরের মধ্যযুগীয় আধ্যাত্মিক কবি লাল দেদ, যিনি লল্লেশ্বরী নামেও পরিচিত, ছিলেন তেমনই এক অসামান্য নারী।

লাল দেদ কাশ্মীরি ভাষার প্রাচীনতম গুরুত্বপূর্ণ কবিদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর আধ্যাত্মিক বাণী, আত্মজিজ্ঞাসা এবং বাহ্যিক আচারসর্বস্বতার সমালোচনা কাশ্মীরের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর রচনাগুলি মূলত ভাখ নামে পরিচিত সংক্ষিপ্ত আধ্যাত্মিক পদ বা বাণীর মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি এমন এক সময়ে জীবনযাপন করেছিলেন, যখন নারীদের সামাজিক স্বাধীনতা সীমিত ছিল এবং ধর্মীয় ও দার্শনিক চর্চার ক্ষেত্রেও তাঁদের সুযোগ ছিল কম। সেই সময়ে নিজের উপলব্ধিকে কবিতার ভাষায় প্রকাশ করে লাল দেদ এক স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সত্যের অনুসন্ধান বাইরের জগতে যেমন চলতে পারে, তেমনই মানুষের নিজের অন্তরের মধ্যেও তার সন্ধান পাওয়া যায়।

কাশ্মীরের মাটিতে জন্ম

লাল দেদের জন্মসাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, তিনি চতুর্দশ শতকে কাশ্মীরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জীবনের বহু ঘটনা লোককথা ও মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে তাঁর জীবনের প্রতিটি বিবরণকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

তাঁর জন্মনাম সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। লাল দেদ, লল্লেশ্বরী এবং লালেশ্বরী—এই নামগুলির মাধ্যমে তিনি কাশ্মীরি সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিচিত।

তাঁর সময়ের কাশ্মীর ছিল ধর্মীয়, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। শৈব দর্শনের নানা ধারা সেখানে বিকশিত হয়েছিল। পাশাপাশি সুফি ভাবধারার বিস্তারও কাশ্মীরের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছিল।

এই বহুমাত্রিক পরিবেশে লাল দেদের চিন্তার বিকাশ ঘটে বলে মনে করা হয়। তাঁর বাণীতে আত্মজ্ঞান, মানবিকতা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং বাহ্যিক আচার থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রচলিত জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে

লাল দেদের জীবনের প্রথম পর্ব সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, অল্প বয়সে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। বিবাহিত জীবনে তিনি নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে।

তবে এসব কাহিনির অনেকগুলিই পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সব ঘটনা নির্ভুলভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়।

তাঁর জীবনকাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশার গণ্ডি অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের পথে এগিয়ে গিয়েছিলেন বলে স্মরণ করা হয়।

সাধারণত নারীদের জীবনকে পরিবার ও গৃহস্থালির দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার প্রবণতা বহু সমাজে দীর্ঘকাল ধরে ছিল। লাল দেদের স্মৃতিতে আমরা এমন এক নারীর পরিচয় পাই, যিনি নিজের জীবন ও বিশ্বাসের প্রশ্নে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।

এই কারণে তাঁর জীবন শুধু আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে নয়, নারীর আত্মপরিচয় ও স্বাধীন চিন্তার ইতিহাসেও তাৎপর্যপূর্ণ।

আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের পথ

লাল দেদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল আত্মজ্ঞান। তাঁর বাণীতে মানুষের নিজের অস্তিত্ব, মন, আকাঙ্ক্ষা এবং সত্য উপলব্ধির প্রশ্ন উঠে আসে।

তাঁর সঙ্গে কাশ্মীরি শৈব দর্শনের সম্পর্ক বিশেষভাবে আলোচিত হয়। এই দর্শনের বিভিন্ন ধারায় চেতনা, আত্মউপলব্ধি এবং মানুষের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

লাল দেদের বাণী থেকে বোঝা যায়, তিনি কেবল বাহ্যিক ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার সম্পূর্ণ অর্থ খুঁজে পেতেন না। তাঁর কাছে মানুষের নিজের অন্তরকে বোঝা, অহংকার ও অজ্ঞতা অতিক্রম করা এবং গভীর উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর এই ভাবনা মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসার দিকে আহ্বান জানায়। আমরা কী বিশ্বাস করি, কেন বিশ্বাস করি এবং আমাদের আচরণের সঙ্গে সেই বিশ্বাসের সম্পর্ক কী—এ ধরনের প্রশ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

‘ভাখ’: সাধারণ মানুষের ভাষায় গভীর দর্শন

লাল দেদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক অবদান তাঁর ভাখ। এগুলি কাশ্মীরি ভাষায় রচিত সংক্ষিপ্ত আধ্যাত্মিক বাণী, যেগুলির মাধ্যমে তিনি জটিল দার্শনিক ভাবনাকে সহজ ও স্মরণযোগ্য ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁর সময়ে সংস্কৃত ছিল দর্শন ও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই ভাষায় লেখা সব রচনা সহজে পৌঁছত না। লাল দেদ কাশ্মীরি ভাষায় নিজের উপলব্ধি প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছিলেন।

এটি ছিল তাঁর সাহিত্যিক শক্তির অন্যতম দিক। তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁর বাণী শুধু পণ্ডিতদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

তাঁর রচনাগুলি দীর্ঘকাল মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এই কারণে বিভিন্ন বাণীর ভাষা ও পাঠে ভিন্নতা দেখা যায়। তবু সামগ্রিকভাবে তাঁর কবিতার মূল ভাব—আত্মঅনুসন্ধান, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং বাহ্যিকতার সীমাবদ্ধতা—স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

বাহ্যিক আচার নয়, অন্তরের উপলব্ধি

লাল দেদের বাণীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় জীবনের বাহ্যিক রূপ নিয়ে তাঁর প্রশ্ন তোলা।

ধর্মীয় আচার অনেক মানুষের কাছে বিশ্বাস প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু কোনো আচার পালন করলেই যে মানুষের অন্তরে জ্ঞান, সহমর্মিতা বা সত্যের উপলব্ধি তৈরি হবে, তা নিশ্চিত নয়।

লাল দেদের ভাবনায় এই পার্থক্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বাণী মানুষকে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে শেখায়। শুধু অন্যের কাছে ধর্মপরায়ণ বলে পরিচিত হওয়া নয়, বরং নিজের চিন্তা ও আচরণকে বোঝা জরুরি—এই উপলব্ধি তাঁর আধ্যাত্মিকতার অন্যতম দিক।

তাঁর চিন্তাকে তাই নিছক ধর্মীয় আচারবিরোধিতা হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হবে। বরং বলা যায়, তিনি আধ্যাত্মিক জীবনের গভীরতা ও আন্তরিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

আজকের সময়েও এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। মানুষ যখন পরিচয়, বাহ্যিক সাফল্য এবং সামাজিক স্বীকৃতির পেছনে ছুটে চলে, তখন নিজের মন ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।

কাশ্মীরি সংস্কৃতিতে তাঁর স্থান

কাশ্মীরি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে লাল দেদের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বাণী কাশ্মীরি ভাষার সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কবি, সাধক ও চিন্তাবিদদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

তাঁর রচনার বিশেষত্ব হলো, সেখানে আধ্যাত্মিক দর্শন ও লোকজ অভিজ্ঞতা একসঙ্গে উপস্থিত। ফলে তাঁর বাণীকে কেবল ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে নয়, কাশ্মীরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

ভাষার ইতিহাসের দিক থেকেও তাঁর গুরুত্ব রয়েছে। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় গভীর চিন্তা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি কাশ্মীরি সাহিত্যকে একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য উপহার দিয়েছেন।

যে রচনাগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে প্রচারিত হয়, সেগুলি শুধু সাহিত্য নয়; সেগুলির মধ্যে মানুষের বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং জীবনবোধও সংরক্ষিত থাকে। লাল দেদের বাণী সেই সাংস্কৃতিক স্মৃতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লাল দেদ ও সুফি ভাবধারা

কাশ্মীরের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে লাল দেদ এবং সুফি সাধক শেখ নূরউদ্দিন নূরানি, যিনি নুন্দ ঋষি নামেও পরিচিত, বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের সময়কাল ও ভাবধারা নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে।

কাশ্মীরি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তাঁদের নাম অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসে। তবে তাঁদের সম্পর্ক সম্পর্কে প্রচলিত কিছু কাহিনি ঐতিহাসিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

লাল দেদের বাণী এবং কাশ্মীরের ঋষি-সুফি ঐতিহ্যের মধ্যে মানুষের অন্তরের শুদ্ধতা, আত্মজ্ঞান ও মানবিকতার মতো কিছু ভাবগত সাদৃশ্য দেখা যায়। এই সাদৃশ্য কাশ্মীরের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির বহুমাত্রিক চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর উত্তরাধিকারকে কোনও একটি সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে কাশ্মীরের বিস্তৃত সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

নারীস্বাধীনতার দৃষ্টিতে লাল দেদ

লাল দেদের জীবনকাহিনি নারীর স্বাধীন চিন্তা ও আত্মপরিচয়ের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মধ্যযুগীয় সমাজে নারীদের জীবনের ওপর পরিবার, সামাজিক রীতি এবং ধর্মীয় প্রত্যাশার প্রভাব ছিল প্রবল। সেই প্রেক্ষাপটে নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করা এবং প্রচলিত জীবনধারার বাইরে আধ্যাত্মিক পথ বেছে নেওয়া ছিল সহজ কাজ নয়।

লাল দেদের স্মৃতি আমাদের এমন এক নারীর পরিচয় দেয়, যিনি নিজের জীবনকে শুধু অন্যের নির্ধারিত ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর চিন্তা ও বাণী তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

তবে তাঁকে আধুনিক অর্থে নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী বলা ঠিক হবে না। তাঁর সময় ও কাজের প্রেক্ষাপট ছিল আলাদা। কিন্তু তাঁর জীবন নারীর আত্মজিজ্ঞাসা, স্বাধীনতা এবং নিজের বিশ্বাস প্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।

বর্তমান সময়ে লাল দেদের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি ও যোগাযোগের উন্নতির ফলে মানুষের কাছে তথ্যের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বেশি তথ্য পাওয়া মানেই গভীর জ্ঞান অর্জন করা নয়।

মানুষের জীবনে আত্মবিশ্লেষণ, মানসিক স্থিরতা এবং নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। লাল দেদের বাণী সেই আত্মজিজ্ঞাসার দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করে।

তাঁর ভাবনা থেকে আমরা শিখতে পারি, বাইরের পরিচয় দিয়ে মানুষের সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় বোঝার জন্য তাঁর চিন্তা, আচরণ এবং অন্য মানুষের প্রতি মনোভাবের দিকেও তাকাতে হয়।

তাঁর রচনায় যে আত্মজ্ঞান ও আন্তরিকতার কথা উঠে আসে, তা ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরেও মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

লাল দেদের জীবন ও বাণী থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথমত, নিজেকে জানার চেষ্টা করতে হবে। অন্যের মতামতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

দ্বিতীয়ত, ভাষা কখনও জ্ঞানের পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। সাধারণ মানুষের ভাষায় গভীর চিন্তা প্রকাশ করা সম্ভব। লাল দেদের রচনা তারই উদাহরণ।

তৃতীয়ত, বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের আচরণকে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মর্যাদা বা ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সততা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার মূল্যও অপরিসীম।

চতুর্থত, নারীর নিজস্ব চিন্তা ও সৃজনশীলতার অধিকারকে সম্মান করতে হবে। সমাজের প্রচলিত প্রত্যাশা অতিক্রম করে নারীরাও সাহিত্য, দর্শন ও জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।

পঞ্চমত, সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করতে হবে। কাশ্মীরের সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য দেখায়, বিভিন্ন চিন্তাধারা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সংলাপ সমাজকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

উপসংহার

লাল দেদ ছিলেন কাশ্মীরের মধ্যযুগীয় আধ্যাত্মিক কবিতার এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাঁর ভাখ সাধারণ মানুষের ভাষায় গভীর দর্শন ও আত্মঅনুসন্ধানের কথা তুলে ধরেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে তাঁর বাণী বেঁচে রয়েছে, যা তাঁর চিন্তার স্থায়ী প্রভাবের পরিচয় বহন করে।

তাঁর জীবন সম্পর্কে অনেক তথ্য লোককথা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হলেও, কাশ্মীরি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি দেখিয়েছেন, গভীর চিন্তা প্রকাশের জন্য রাজকীয় ক্ষমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদার প্রয়োজন হয় না। মানুষের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং সত্যের অনুসন্ধানও ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিতে পারে।

লাল দেদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজেকে জানার চেষ্টা, মানবিকতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সত্যের আন্তরিক অনুসন্ধানই মানুষের অন্তর্জগতকে সমৃদ্ধ করার অন্যতম পথ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

মহীয়সী নারী: গৌরী লঙ্কেশ — সত্যের পক্ষে নির্ভীক কলমের এক প্রতিবাদী কণ্ঠ।

একটি কলম কখনও শুধু সংবাদ লেখে না। কখনও সেই কলম সমাজের অন্যায়কে সামনে আনে, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আবার কখনও মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা বাধা ও বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন। ভারতের সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গৌরী লঙ্কেশ ছিলেন তেমনই এক প্রতিবাদী কণ্ঠ।

গৌরী লঙ্কেশ ছিলেন কর্ণাটকের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মী। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বৈষম্য, জাতপাতের বিভাজন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁর লেখালেখির জন্য। তাঁর সম্পাদিত কন্নড় সাপ্তাহিক পত্রিকা গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিত।

২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়ির সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যু গোটা দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের গুরুত্ব নিয়ে গভীর আলোচনা সৃষ্টি করে।

গৌরী লঙ্কেশের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পক্ষে কথা বলা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়—অনেক সময় তা সামাজিক সাহসেরও পরীক্ষা।

পরিবার ও শৈশবের প্রভাব

গৌরী লঙ্কেশের জন্ম ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি কর্ণাটকে। তাঁর বাবা পি. লঙ্কেশ ছিলেন একজন বিশিষ্ট কন্নড় লেখক, কবি, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি লঙ্কেশ পত্রিকে নামে একটি প্রভাবশালী কন্নড় সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পি. লঙ্কেশের লেখালেখিতে সমাজের প্রচলিত ধারণা, বৈষম্য এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা ছিল। তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা কর্ণাটকের সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।

এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে গৌরী লঙ্কেশ ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। তবে নিজের সাংবাদিক পরিচয় তিনি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে তোলেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের মতাদর্শ, অভিজ্ঞতা ও কাজের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

তিনি সাংবাদিকতাকে শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সমাজের প্রান্তিক মানুষের সমস্যা তুলে ধরা এবং ক্ষমতাবানদের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ

গৌরী লঙ্কেশ পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতা দিয়ে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারি ঘোষণা বা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য প্রকাশ করা নয়; সেই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা, সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশ্লেষণ করা এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।

একজন সাংবাদিকের কাছে তথ্য সংগ্রহ, সূত্র যাচাই, নিরপেক্ষভাবে ঘটনা বোঝার চেষ্টা এবং পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গৌরী লঙ্কেশের লেখালেখিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের সরাসরি বিশ্লেষণ দেখা যেত।

তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থান তাঁকে যেমন সমর্থন এনে দেয়, তেমনই বিরোধিতা ও বিতর্কের মুখেও দাঁড় করায়।

গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে: একটি প্রতিবাদী সংবাদমাধ্যম

বাবা পি. লঙ্কেশের মৃত্যুর পর গৌরী লঙ্কেশ লঙ্কেশ পত্রিকে-র সঙ্গে যুক্ত থাকেন এবং পরে নিজের সম্পাদনায় গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে প্রকাশ করেন।

কন্নড় ভাষায় প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থানের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। এতে সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতের বৈষম্য, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং মানবাধিকারের মতো বিষয় স্থান পেত।

আঞ্চলিক ভাষার সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনেক সময় জাতীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় যথেষ্টভাবে উঠে আসে না। অথচ স্থানীয় ভাষার সংবাদপত্র সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গৌরী লঙ্কেশের পত্রিকা সেই পরিসরে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিল। তিনি সংবাদমাধ্যমকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর সমালোচনা করা যায় এবং প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা সামনে আনা যায়।

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান

গৌরী লঙ্কেশের সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচনা। তিনি ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানো, সামাজিক বিভাজন তৈরি করা এবং ভিন্নমতের মানুষকে শত্রু হিসেবে দেখানোর প্রবণতার বিরোধিতা করতেন।

ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুভাষিক দেশে সামাজিক সম্প্রীতি গণতান্ত্রিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।

কিন্তু যখন ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজে অবিশ্বাস ও বৈরিতা বাড়তে পারে। গৌরী লঙ্কেশ তাঁর লেখায় এই ধরনের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন।

তাঁর অবস্থানের কারণে তিনি রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে দেখতেন, অন্যদিকে তাঁর সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করতেন।

গণতান্ত্রিক সমাজে মতের বিরোধিতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো ব্যক্তির মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তাঁর নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা জরুরি—গৌরী লঙ্কেশের জীবন ও মৃত্যু এই প্রশ্নটিকে বিশেষভাবে সামনে নিয়ে আসে।

জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই

ভারতীয় সমাজে জাতপাতের বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা, জীবিকা ও মর্যাদাকে প্রভাবিত করেছে। সংবিধান আইনের চোখে সমতা এবং অস্পৃশ্যতার অবসানের কথা বললেও বাস্তবে বিভিন্ন অঞ্চলে বৈষম্যের নানা রূপ দেখা যায়।

গৌরী লঙ্কেশ সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। তিনি দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং সমতার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতেন।

তাঁর সাংবাদিকতার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখেননি; সেই ঘটনার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের সম্পর্ক কী, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক, তা শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষ কতটা মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি গৌরী লঙ্কেশের কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

লেখালেখি ও রাজনৈতিক বিতর্ক

গৌরী লঙ্কেশের লেখালেখি বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তাঁর বক্তব্য ও সম্পাদকীয় অনেক পাঠকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। আবার তাঁর অবস্থানের বিরোধিতাও ছিল।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মতামতধর্মী লেখা এবং তথ্যভিত্তিক সংবাদ এক জিনিস নয়। সম্পাদকীয়তে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেতে পারে, কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই ও যথার্থতা অপরিহার্য। একইভাবে রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রেও যুক্তি, প্রমাণ এবং জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ।

গৌরী লঙ্কেশের কাজ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলার কোনো গণতান্ত্রিক বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। রাজনৈতিক মতভেদ কিংবা লেখার বিরোধিতা কখনও সহিংসতার যুক্তি হতে পারে না।

তাঁর জীবন এই বিষয়টিও সামনে আনে যে, গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা শুধু জনপ্রিয় মতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; অস্বস্তিকর বা ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করে এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর: এক মর্মান্তিক ঘটনা

২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়ির সামনে গৌরী লঙ্কেশকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।

এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের বহু মানুষ তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদ জানান।

ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়।

একজন সাংবাদিক যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখার কারণে প্রাণ হারানোর আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন কাজের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলে সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিখতে দ্বিধা বোধ করতে পারেন। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জানার অধিকারেও।

গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ড তাই ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে এক গভীর ক্ষত হিসেবে স্মরণ করা হয়।

বিচারপ্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একাধিক অভিযুক্তের নাম উঠে আসে এবং মামলাটি দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোয়। এই মামলায় সংগঠিত সহিংসতা, মতাদর্শগত বিদ্বেষ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বহু প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে।

এ ধরনের মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে আইনের শাসন বজায় থাকা প্রয়োজন।

গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ও সমর্থকেরা ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলেছে।

এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা শুধু সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেন জরুরি?

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বলতে বোঝায়—সাংবাদিকেরা যেন ভয়, হুমকি বা অন্যায় চাপ ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করতে পারেন। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। ভুল তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা কিংবা যাচাই না করা অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থী।

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম সরকারের কাজ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এই প্রশ্ন তোলার ক্ষমতাই জনজবাবদিহি বাড়াতে সাহায্য করে।

যদি সাংবাদিকেরা সমালোচনার জন্য হুমকি বা সহিংসতার শিকার হন, তাহলে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি সামনে আসার সুযোগ কমে যেতে পারে।

গৌরী লঙ্কেশের জীবন এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাঁর কাজ নিয়ে মানুষের মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকের নিরাপদে কাজ করার অধিকার এবং সহিংসতামুক্ত সমাজের দাবি সর্বজনীন গুরুত্ব বহন করে।

নতুন প্রজন্মের কাছে গৌরী লঙ্কেশের শিক্ষা

গৌরী লঙ্কেশের জীবন থেকে নতুন প্রজন্ম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারে।

প্রথমত, প্রশ্ন করার সাহস থাকা দরকার। কোনো বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত শুধু ক্ষমতাবান ব্যক্তি বলেছেন বলে তা যাচাই না করে মেনে নেওয়া উচিত নয়। যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয় বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ভিন্নমতকে সম্মান করতে হবে। মতের অমিল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কারও বক্তব্যের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু তাঁর ওপর হুমকি বা সহিংসতা চালানো কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।

তৃতীয়ত, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। জাতপাত, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে ছোট করে দেখা মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী।

চতুর্থত, সংবাদ পড়ার সময় তথ্য যাচাই করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি বক্তব্য সত্য নয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র, প্রমাণ এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করে মত গঠন করা উচিত।

পঞ্চমত, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু ভোট দেওয়াই নয়, সমাজের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকা, শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

উপসংহার

গৌরী লঙ্কেশ ছিলেন একজন সাংবাদিক, সম্পাদক এবং সামাজিক প্রতিবাদের কণ্ঠ। তিনি সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতের বৈষম্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর লেখালেখি বহু মানুষের কাছে প্রতিবাদ ও সামাজিক সচেতনতার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল।

২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর হত্যাকাণ্ড ভারতের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।

কোনো সাংবাদিকের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু তথ্য প্রকাশ, প্রশ্ন তোলা এবং ক্ষমতার সমালোচনা করার অধিকারকে সম্মান করা জরুরি। কারণ, ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া না হলে গণতান্ত্রিক আলোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে।

গৌরী লঙ্কেশের স্মৃতি তাই শুধু একজন সাংবাদিকের স্মৃতি নয়; এটি সত্য অনুসন্ধান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায় এবং নির্ভীক নাগরিকতার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার এক স্থায়ী আহ্বান।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

মহীয়সী নারী: কিত্তুরের রানি চেন্নাম্মা — ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক বীরাঙ্গনার অমর সংগ্রাম।

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন বহু নারী রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের সাহস, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রেখে গিয়েছেন। তাঁদের কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউ সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেছেন, আবার কেউ অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের রাজ্য ও মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখেছেন। কর্ণাটকের কিত্তুরের রানি চেন্নাম্মা ছিলেন এই সাহসী নারীদের অন্যতম।

রানি কিত্তুর চেন্নাম্মা উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১৮২৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে কিত্তুরের মানুষ ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বহু আগে সংঘটিত এই প্রতিরোধ তাঁকে ভারতের ঔপনিবেশিকবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে।

রানি চেন্নাম্মার জীবন শুধু একজন রাজরানির বীরত্বের কাহিনি নয়। এটি রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা, আত্মমর্যাদা বজায় রাখা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।

জন্ম ও শৈশব

রানি চেন্নাম্মার জন্ম ১৭৭৮ সালে, বর্তমান কর্ণাটকের বেলগাভি অঞ্চলের কাছাকাছি কাকতি নামের স্থানে বলে সাধারণভাবে স্বীকৃত। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

তাঁর সময়ে রাজপরিবারের অনেক নারীকে মূলত গৃহস্থালি ও প্রাসাদের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হতো। কিন্তু চেন্নাম্মার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্যে ঘোড়ায় চড়া, অস্ত্র চালানো এবং যুদ্ধসংক্রান্ত দক্ষতার চর্চাও ছিল বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়।

এই প্রশিক্ষণ তাঁর পরবর্তী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন সংকটের মুখে পড়ে, তখন তাঁকে শুধু রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একজন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নেত্রী হিসেবেও সামনে আসতে হয়েছিল।

শৈশব থেকেই গড়ে ওঠা সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার মানসিকতা তাঁকে সেই দায়িত্ব পালনে সাহায্য করেছিল।

কিত্তুরের রানি হয়ে ওঠা

চেন্নাম্মার বিবাহ হয় কিত্তুরের শাসক মল্লসর্জ দেশাইয়ের সঙ্গে। বিবাহের পর তিনি কিত্তুরের রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন।

কিত্তুর ছিল দক্ষিণ ভারতের একটি ছোট রাজ্য। ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রাজ্যটির নিজস্ব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল। রাজপরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আশপাশের রাজনৈতিক শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও ছিল শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্বামী মল্লসর্জের মৃত্যুর পর রাজপরিবারে উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই সময় চেন্নাম্মার জীবনে ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়।

রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, শাসকের উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বাইরের শক্তি সেই পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারত।

কিত্তুরের ক্ষেত্রেও পরবর্তী সময়ে ঠিক এমনই একটি সংকট তৈরি হয়।

উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট

কিত্তুরের শাসনব্যবস্থায় উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রানি চেন্নাম্মা দত্তকপুত্র শিবলিঙ্গাপ্পাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন।

তৎকালীন ভারতীয় রাজ্যগুলিতে দত্তক গ্রহণের মাধ্যমে উত্তরাধিকার নির্ধারণের রীতি প্রচলিত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল। ফলে কোনো রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সেখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ খুঁজত।

কিত্তুরের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ শিবলিঙ্গাপ্পার উত্তরাধিকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। এর ফলে রাজ্যের স্বাধীন প্রশাসনিক অধিকার এবং রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।

রানি চেন্নাম্মা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তাঁর দৃষ্টিতে, কিত্তুরের উত্তরাধিকার নির্ধারণের অধিকার রাজ্যের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়। বাইরের একটি বাণিজ্যিক-রাজনৈতিক শক্তি সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।

এই বিরোধই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের সঙ্গে কিত্তুরের সংঘর্ষের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রস্তুতি

উনিশ শতকের গোড়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বাড়িয়ে চলেছিল। অনেক দেশীয় রাজ্যকে চুক্তি, চাপ কিংবা সামরিক শক্তির মাধ্যমে কোম্পানির অধীনস্থ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

কিত্তুরের পরিস্থিতিও ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রাজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে রানি চেন্নাম্মা প্রতিরোধের পথ বেছে নেন।

তিনি রাজ্যের সৈন্যদের সংগঠিত করেন এবং প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি নেন। তাঁর নেতৃত্বে কিত্তুরের মানুষ ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।

একটি তুলনামূলকভাবে ছোট রাজ্যের পক্ষে ব্রিটিশদের মতো সামরিক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করা সহজ ছিল না। তবু রানি চেন্নাম্মা বুঝেছিলেন, প্রতিরোধ না করলে রাজ্যের রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যেতে পারে।

তাই তিনি কেবল আলোচনার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্যও প্রস্তুত হন।

১৮২৪ সালের কিত্তুরের যুদ্ধ

১৮২৪ সালে কিত্তুরকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও রানি চেন্নাম্মার বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

ব্রিটিশ বাহিনী কিত্তুরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে এলে রানি চেন্নাম্মার নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এই যুদ্ধে কিত্তুরের সৈন্যরা সাহসিকতার পরিচয় দেন। ব্রিটিশ বাহিনীও প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

প্রথম পর্যায়ের সংঘর্ষে কিত্তুরের প্রতিরোধ ব্রিটিশদের জন্য উল্লেখযোগ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ পক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা বন্দি হন। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকর্তা সেন্ট জন থ্যাকারে সংঘর্ষে নিহত হন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এই ঘটনা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। কিত্তুরের প্রতিরোধ ভাঙতে তারা অতিরিক্ত বাহিনী নিয়ে আসে।

রানি চেন্নাম্মার নেতৃত্বে সংঘটিত এই যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় যে, ব্রিটিশ শাসনের সম্প্রসারণ সর্বত্র বাধাহীন ছিল না। দেশীয় রাজ্যগুলির কিছু শাসক নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধে নামতে প্রস্তুত ছিলেন।

সাহসী নেতৃত্বের পরিচয়

রানি চেন্নাম্মার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর দৃঢ়তা। তিনি জানতেন, ব্রিটিশদের সামরিক শক্তি অনেক বেশি। তবু তিনি রাজ্যের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে আপস করতে চাননি।

যুদ্ধের সময় একজন নেতার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া নয়। সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখা, রাজ্যের মানুষের সমর্থন বজায় রাখা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রানি চেন্নাম্মা এই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর প্রতিরোধ কিত্তুরের মানুষের কাছে রাজ্যের সম্মান ও স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।

তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সংকটের সময়। ক্ষমতা ও সুবিধা থাকা অবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, তখন নিজের অবস্থান বজায় রাখতে বিশেষ সাহস ও মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন হয়।

পরাজয় ও বন্দিজীবন

প্রথম দফার প্রতিরোধের পর ব্রিটিশরা আরও শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে কিত্তুর আক্রমণ করে। দীর্ঘ সংঘর্ষের পর ১৮২৪ সালের শেষ দিকে কিত্তুর ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

রানি চেন্নাম্মা বন্দি হন এবং তাঁকে বাইহোঙ্গলের দুর্গে আটক রাখা হয়। বন্দিজীবনের মধ্যেই ১৮২৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাদায়ক। যে রাজ্যের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য তিনি লড়াই করেছিলেন, সেই রাজ্য শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়।

কিন্তু সামরিক পরাজয় তাঁর সংগ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মুছে দিতে পারেনি। বরং তাঁর প্রতিরোধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সাঙ্গোল্লি রায়ান্নার সংগ্রাম

কিত্তুরের প্রতিরোধের ইতিহাসে সাঙ্গোল্লি রায়ান্নার নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি রানি চেন্নাম্মার অনুগত সেনানায়ক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান।

রানি চেন্নাম্মা বন্দি হওয়ার পরও প্রতিরোধের স্মৃতি কিত্তুর অঞ্চলে টিকে ছিল। সাঙ্গোল্লি রায়ান্না গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকেও ব্রিটিশরা বন্দি করে ১৮৩১ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এই ধারাবাহিক সংগ্রাম দেখায়, কিত্তুরের প্রতিরোধ কেবল একজন শাসকের ব্যক্তিগত লড়াই ছিল না। রাজ্যের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আরও অনেকে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ভারতের নারী প্রতিরোধের ইতিহাসে তাঁর স্থান

ভারতের ইতিহাসে রানি লক্ষ্মীবাই, বেগম হজরত মহল এবং রানি চেন্নাম্মার মতো নারীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের সংগ্রামের সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য ছিল।

রানি চেন্নাম্মার বিশেষত্ব হলো, তিনি ১৮২৪ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন—অর্থাৎ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহেরও বহু আগে।

তাঁর সংগ্রাম ছিল কিত্তুরের রাজনৈতিক অধিকার ও উত্তরাধিকার রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই স্থানীয় প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই তিনি ব্রিটিশ সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরোধিতা করেন।

তাঁকে শুধু একজন বীরাঙ্গনা হিসেবে স্মরণ করলেই যথেষ্ট নয়; তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব এবং প্রতিরোধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বোঝা জরুরি।

স্মৃতিতে রানি চেন্নাম্মা

বর্তমান কর্ণাটকে রানি কিত্তুর চেন্নাম্মা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। তাঁর স্মৃতিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং কিত্তুরের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়।

তাঁর জীবন নিয়ে সাহিত্য, নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক চর্চাও হয়েছে। এর ফলে নতুন প্রজন্ম তাঁর সংগ্রাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।

ভারতের ইতিহাসে আঞ্চলিক প্রতিরোধের গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁর স্মৃতি মূল্যবান। কারণ, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম একদিনে বা একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, সেগুলিও ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রানি চেন্নাম্মার জীবন সেই বিস্তৃত ইতিহাসেরই একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

রানি চেন্নাম্মার জীবন থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারি।

প্রথমত, অধিকার রক্ষায় সচেতনতা জরুরি। নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বের জন্য সাহসের পাশাপাশি বিচক্ষণতাও দরকার। কঠিন পরিস্থিতিতে আবেগের সঙ্গে বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তৃতীয়ত, নারীর নেতৃত্বকে কখনও ছোট করে দেখা উচিত নয়। ইতিহাসে বহু নারী প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা কঠিন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

চতুর্থত, পরাজয় মানেই ইতিহাসে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া নয়। কোনো সংগ্রাম তাৎক্ষণিকভাবে সফল না হলেও তার সাহস, আদর্শ ও আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

উপসংহার

রানি কিত্তুর চেন্নাম্মা ছিলেন ভারতের ঔপনিবেশিকবিরোধী প্রতিরোধের ইতিহাসে এক সাহসী নারী নেত্রী। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন কিত্তুরের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিতে উদ্যত হয়, তখন তিনি প্রতিবাদের পথ বেছে নেন। ১৮২৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধ ব্রিটিশ সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে দেশীয় প্রতিরোধের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

শেষ পর্যন্ত তিনি বন্দি হন এবং বন্দিজীবনেই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর সাহস ও আত্মমর্যাদার কাহিনি আজও মানুষের মনে অনুপ্রেরণা জাগায়।

রানি চেন্নাম্মা আমাদের মনে করিয়ে দেন, নিজের অধিকার রক্ষার জন্য দাঁড়ানোই সাহসের প্রথম পরিচয়। তাঁর জীবন ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি যুদ্ধের বিবরণ নয়; এটি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অমর অধ্যায়।

ব্রিটিশ শাসনের শক্তির সামনে মাথা নত না করে কিত্তুরের অধিকার রক্ষার জন্য যে সাহসী সংগ্রাম তিনি করেছিলেন, তার জন্য রানি চেন্নাম্মা ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : আয়নার ওপারে যে মেয়েটি- (তৃতীয় পর্ব: যে মুখটি আয়নার ছিল না)।

রাত তখন দুটো সতেরো।

আয়নার ওপারের অন্ধকার করিডরে দাঁড়িয়ে তিয়াসা বুঝতে পারছিল, এই জায়গাটা কোনও সাধারণ ঘর নয়। চারদিকে দেয়াল থাকলেও সেগুলোর গায়ে লেগে আছে অসংখ্য স্মৃতি—কোথাও দুর্গাপুজোর আলো, কোথাও মায়ের শাড়ির আঁচল, কোথাও বাবার সাইকেলের ঘণ্টা, আবার কোথাও ছোট্ট তারার হাসি। স্মৃতিগুলো যেন পুরোনো সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে উঠছে, মিলিয়ে যাচ্ছে।

তারার হাত শক্ত করে ধরে ছিল তিয়াসা।

বারো বছর আগে যে বোনকে সে মৃত বলে মেনে নিয়েছিল, সেই বোন আজ তার সামনে। অথচ তারার চেহারায় বারো বছরের কোনও পরিবর্তন নেই। সেই একই ছোট্ট মুখ, একই চোখ, একই লাল ফিতের স্মৃতি জাগানো চুল। যেন সময় তারাকে ছুঁতেই পারেনি।

করিডরের শেষ প্রান্তে বিশাল একটা আয়না।

তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে তাদের পুরোনো বাড়ির সেই ঘর। জানলার বাইরে পুজোর আলো, ঘরের এক কোণে কাঠের আলমারি, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ষোলো বছরের তিয়াসা।

কিন্তু সেই তিয়াসার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যা দেখে বর্তমানের তিয়াসার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে হাসছে।

ঠিক সেই হাসি, যা আয়নায় প্রথম দেখেছিল তিয়াসা—যখন তার নিজের মুখে কোনও হাসি ছিল না।

তার পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট তারা। সে কাঁদছে, আর বারবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বলছে, “দিদি, ওটা তুই নোস!”

বর্তমানের তিয়াসা কাচের দিকে এগিয়ে গেল।

“এটা কী দেখছি আমরা?”

তারা মাথা নাড়ল।

“সেই রাত। যে রাতটার কথা আমরা কেউ ঠিক করে মনে রাখতে পারিনি।”

“কিন্তু আমি তো মনে করতে পারি! আগুন লেগেছিল। আমি তোকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। তারপর—”

“তারপর কী হয়েছিল, দিদি?”

তিয়াসা উত্তর দিতে পারল না।

তার মনে পড়ল ধোঁয়া, গরম বাতাস, কারও চিৎকার, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মতো দেখতে একটা মুখ। কিন্তু এরপরের স্মৃতিগুলো যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছে।

আয়নার ভেতরের দৃশ্য বদলে গেল।

এবার দেখা গেল, ছোট্ট তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা কাগজের নৌকা। সে নৌকাটা আয়নার সামনে রেখে ফিসফিস করে বলছে, “তুমি যদি সত্যিই আমার দিদি হও, তা হলে আমাকে একটা কথা বলো।”

আয়নার ভেতরের মুখটা হাসল।

“কী কথা?”

“দিদি আমাকে ছোটবেলায় কী বলত, যখন আমি অন্ধকারে ভয় পেতাম?”

প্রতিচ্ছবিটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ভয় পাস না। আমি আছি।”

তারা মাথা নাড়ল।

“না। দিদি কখনও এ কথা বলত না।”

প্রতিচ্ছবির হাসি মিলিয়ে গেল।

তারা এবার আয়নার খুব কাছে গিয়ে বলল, “দিদি বলত, ‘অন্ধকার যত বড়ই হোক, দরজায় তিনবার টোকা দিলেই আমি তোকে খুঁজে নেব।’”

এই কথা শুনে আয়নার ভেতরের মুখটা কেঁপে উঠল।

তারপর সেই মুখের চোখ, নাক, ঠোঁট—সব যেন গলে যেতে শুরু করল।

মুখের জায়গায় রইল এক অন্ধকার শূন্যতা।

তিয়াসা শিউরে উঠল।

“ওটা কে?”

তারার চোখে জল এসে গেল।

“ও জানে না আমাদের সব কথা। ও মানুষের মুখ নিতে পারে, স্মৃতি চুরি করতে পারে, কিন্তু আমাদের ভালোবাসার আসল মানে বুঝতে পারে না।”

ঠিক তখনই করিডরের চারদিকে একটা গম্ভীর হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

“ভালোবাসা?”

অন্ধকারের মধ্য থেকে সেই মুখহীন সত্তা বেরিয়ে এল।

কখনও তার মুখ বাবার মতো, কখনও মায়ের মতো, কখনও তিয়াসার নিজের মুখ। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে মৃত তারার চেহারাও ফুটে উঠল।

“তোমরা মানুষরা ভালোবাসাকে খুব বড় করে দেখো,” সে বলল। “কিন্তু তোমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও তো সেটাই। কাউকে হারানোর ভয় দেখালেই তোমরা নিজেরাই আমার কাছে দরজা খুলে দাও।”

তিয়াসা তারার সামনে দাঁড়াল।

“তুই আমাদের কী চাস?”

“তোমার জীবন।”

“আমার জীবন?”

“তুমি বারো বছর ধরে যে জীবন কাটিয়েছ, সেটা আমারই তৈরি করা পথের ওপর দাঁড়িয়ে। তোমার অপরাধবোধ, তোমার দুঃস্বপ্ন, তোমার বোনকে হারানোর যন্ত্রণা—সব আমি যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছি। তুমি যতবার নিজেকে দোষ দিয়েছ, ততবার আমি শক্তিশালী হয়েছি।”

তিয়াসার মনে হল, কেউ যেন তার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পুরোনো ক্ষতগুলো আবার খুলে দিয়েছে।

“তাহলে আগুনের রাতটা?”

সত্তাটি হাসল।

“সেই রাতে তোমরা দুজনেই আমার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলে। তোমার বোন আমাকে বিশ্বাস করেছিল, কারণ সে তার মৃত দিদিকে ফিরে পেতে চেয়েছিল। আর তুমি আমাকে ভয় পেয়েছিলে। তুমি আয়নাটা ভেঙে দিতে চেয়েছিলে। কিন্তু তার আগে আমি তোমার মুখ নিয়ে নিয়েছিলাম।”

আয়নার ভেতরের দৃশ্য আবার বদলে গেল।


বারো বছর আগের সেই রাত।

দুর্গাপুজোর অষ্টমী। বাইরে ঢাক বাজছে। বাড়ির অন্য ঘরে মা অতিথিদের সঙ্গে কথা বলছেন। বাবা তখনও কাজে থেকে ফেরেননি।

ছোট্ট তারা একা দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে।

আয়নার ওপারে তার দিদি।

“তারা, এদিকে আয়,” প্রতিচ্ছবি বলছে। “আমি তোকে একটা গোপন জায়গা দেখাব।”

“কিন্তু দিদি তো বাড়িতে নেই।”

“আমি তোর দিদি। ওটা যে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওটা আসল তিয়াসা নয়।”

তারা পিছিয়ে গিয়েছিল।

“তুমি মিথ্যে বলছ।”

প্রতিচ্ছবির চোখ দুটো হঠাৎ কালো হয়ে উঠেছিল।

“তুই কি তোর দিদিকে ফিরে পেতে চাস না?”

“আমার দিদি তো বেঁচে আছে!”

“তাহলে আমাকে দরজা খুলে দে। আমি তোকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে কেউ কাউকে হারায় না।”

তারা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ঘরের দরজা খুলছিল না।

ঠিক তখনই সত্যিকারের তিয়াসা বাড়িতে ফিরে আসে।

সে সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার পুজো দেখতে গিয়েছিল। ঘরে ঢুকেই বোনের কান্না শুনে ছুটে এসেছিল।

“তারা!”

ছোট্ট তারা দিদির দিকে ছুটে এসেছিল।

“দিদি, ওটা কে?”

তিয়াসা আয়নার দিকে তাকিয়েছিল।

সেখানে তার নিজের মুখ। অথচ সেই মুখ তার নড়াচড়ার সঙ্গে মিলছে না। বাস্তবের তিয়াসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রতিচ্ছবিটি ধীরে ধীরে হাত তুলেছিল।

তারপর ঠোঁট না নাড়িয়েই ঘরের মধ্যে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল।

“তিয়াসা, তুই অনেক দেরি করে ফেলেছিস।”

তিয়াসা ভয়ে তারাকে পিছনে সরিয়ে দিয়েছিল।

“তুই কে?”

“আমি সেই মুখ, যাকে তুই প্রতিদিন আয়নায় দেখিস। তোর হাসি, তোর কান্না, তোর রাগ—সব আমার। তুই যদি না থাকিস, তবেই আমি সম্পূর্ণ হব।”

তিয়াসা তারাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।

কিন্তু আয়নার কাচের ওপর হঠাৎ একটা কালো ফাটল দেখা দিয়েছিল। ফাটলটা ক্রমশ বড় হতে হতে দরজার মতো হয়ে গিয়েছিল। সেই দরজার ভেতর থেকে বরফের মতো ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছিল।

তারা দিদির হাত আঁকড়ে ধরেছিল।

“দিদি, আমাকে ছেড়ে যাস না!”

“কখনও না!”

তিয়াসা তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।

ঠিক তখনই আয়নার ভেতর থেকে আরেকটি হাত বেরিয়ে এসেছিল। সেই হাত তিয়াসার কবজি ধরে টেনে নিয়েছিল ভেতরে।

তিয়াসা চিৎকার করে উঠেছিল।

তারা দিদিকে বাঁচাতে গিয়ে আয়নার সামনে পড়ে গিয়েছিল। পরের মুহূর্তে ঘরের আলো নিভে গিয়েছিল। জানলার পর্দায় আগুনের মতো লাল আলো ছড়িয়ে পড়েছিল।

কিন্তু সেই আগুন ছিল না সাধারণ আগুন।

সেটা ছিল আয়নার তৈরি করা এক মিথ্যা দৃশ্য—যার উদ্দেশ্য ছিল বাইরের পৃথিবীকে বিশ্বাস করানো যে বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

আসল আগুন পরে লেগেছিল। ঘরের বৈদ্যুতিক তার পুড়ে গিয়েছিল, কাঠের আসবাব জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু তার আগেই আয়নার দরজা তারাকে নিজের ভেতরের এক অন্ধকার কক্ষে আটকে ফেলেছিল।

তিয়াসা আটকে গিয়েছিল স্মৃতির জগতে।

আর সত্তাটি তৈরি করেছিল তার মুখের একটি নকল প্রতিরূপ।

সেই প্রতিরূপই বাইরে বেরিয়ে এসেছিল—তিয়াসার জীবন দখল করার জন্য।

কিন্তু তার পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি। তিয়াসার স্মৃতির গভীরে আটকে থাকা ভালোবাসা তাকে সম্পূর্ণ মুছে যেতে দেয়নি। সত্তাটি তিয়াসার শরীর বা পরিচয় পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। সে কেবল তার মনে অপরাধবোধ ঢুকিয়ে, বাস্তব আর স্মৃতির সীমারেখা মুছে দিয়ে, ধীরে ধীরে শক্তি বাড়িয়েছিল।

আর যে দেহটিকে আগুনের পর তারার দেহ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল সেই রাতের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া এক অজ্ঞাত শিশুর দেহ। লাল ফিতেটি সেখানে রেখেছিল সত্তাটি—পরিবারকে ভুল পথে চালিত করার জন্য।

সবাই ভেবেছিল তারা মারা গেছে।

কেউ জানত না, সে আয়নার পাশের এক বন্ধ কক্ষে আটকে আছে, যেখানে সময়ের প্রবাহ বাইরের পৃথিবীর মতো নয়।


বর্তমানের করিডরে ফিরে এসে তিয়াসা বুঝতে পারল, তার জীবনের বারো বছরের যন্ত্রণা কোনও দুর্ঘটনার ফল ছিল না। কেউ তার অপরাধবোধকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, কারণ সেই যন্ত্রণাই ছিল তার শিকল।

মুখহীন সত্তাটি এবার তিয়াসার সামনে এসে দাঁড়াল।

“এখন সব জেনে গেছিস। এবার সিদ্ধান্ত নে। আমার সঙ্গে থাকলে তুই তোর বোনকে নিয়ে এখানেই থাকতে পারবি। কোনও মৃত্যু নেই, কোনও বিচ্ছেদ নেই, কোনও বার্ধক্য নেই। তোর মা-ও এখানে আছে। তোর বাবা-ও আছে। তুই যাদের হারিয়েছিস, সবাইকে ফিরিয়ে দেব।”

অন্ধকারের মধ্যে একের পর এক মুখ ভেসে উঠল।

বাবা হাসছেন।

মা তিয়াসাকে ডাকছেন।

শৈশবের বন্ধুরা হাত নাড়ছে।

এমনকি সেই ছোট্ট বাড়িটাও দেখা গেল, যেখানে একসময় পুজোর সময় সারা রাত আলো জ্বলত।

তিয়াসার চোখ ভিজে উঠল।

সে বাবাকে খুব মিস করত। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কও দূরে সরে গিয়েছিল। বহুবার সে ভেবেছিল, যদি সেই রাতটা অন্যরকম হত, যদি সে একটু আগে বাড়ি ফিরত, যদি সে তারাকে বাঁচাতে পারত!

সত্তাটি তার মনের কথাগুলো পড়তে পারছিল।

“তুই তো সব সময় নিজেকে দোষ দিয়েছিস। তুই ভাবিস, তুই যদি সেদিন বাড়িতে থাকতিস, তা হলে কিছুই হত না। আমি তোকে সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিতে পারি।”

তিয়াসা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“না। তুই আমাকে মুক্তি দিতে চাস না। তুই চাস আমি যেন সারাজীবন বিশ্বাস করি, সব দোষ আমার।”

সত্তাটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুই বুঝতে পারছিস না।”

“আমি বুঝতে পারছি। আমি আমার বোনকে হারিয়েছিলাম বলে তোকে বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, কোনওভাবে সে ফিরে আসুক। কিন্তু তুই আমার বোন নোস। তুই শুধু আমার শোকের মুখোশ।”

সত্তাটি গর্জে উঠল।

করিডরের দেয়াল কেঁপে উঠল। আয়নাগুলোর মধ্যে ফাটল ধরতে শুরু করল।

“তুই যদি আমার সঙ্গে না থাকিস, তা হলে তোর বোনও বাঁচবে না!”

তিয়াসা তারার দিকে তাকাল।

“তুই কী চাস, তারা?”

তারা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে দিদির হাত আরও শক্ত করে ধরল।

“আমি বাড়ি যেতে চাই।”

“সেখানে তোকে আবার বড় হতে হবে। অনেক কিছু নতুন করে শিখতে হবে। এত বছর যা হারিয়েছিস, সব একদিনে ফিরে পাবি না।”

তারা চোখ মুছে বলল, “তবু বাড়ি যেতে চাই। আমি বড় হব, দিদি। আমি আবার স্কুলে যাব। আমি মায়ের কাছে ঘুমোব। আমি জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখব। আমি সত্যিকারের পৃথিবীতে বাঁচতে চাই।”

তিয়াসা তাকে জড়িয়ে ধরল।

“আমিও তোকে বাড়ি নিয়ে যাব।”

মুখহীন সত্তাটি এবার তারার রূপ নিল।

“দিদি, আমি তো তোর সেই ছোট্ট তারা! আমাকে ছেড়ে যাবি?”

তিয়াসা তাকিয়ে রইল।

সত্তাটি তারার চোখ, তার কণ্ঠস্বর, তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট—সব নিখুঁতভাবে নকল করছিল।

“দিদি, মনে আছে? তুই বলেছিলি, আমাকে কখনও ছেড়ে যাবি না।”

তিয়াসার বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা ভেঙে গেল। এত নিখুঁত অভিনয়, এত পরিচিত মুখ—এক মুহূর্তের জন্য তার হাত শিথিল হয়ে এল।

কিন্তু তার পাশের সত্যিকারের তারা ধীরে ধীরে তিনবার তিয়াসার হাতের ওপর টোকা দিল।

টোক।

টোক।

টোক।

তিয়াসার চোখে আলো জ্বলে উঠল।

এটাই তাদের শৈশবের সংকেত। অন্ধকার ঘরে তারা হারিয়ে গেলে দিদিকে খুঁজে পেতে দরজায় তিনবার টোকা দিত। আর তিয়াসা তিনবার উত্তর দিত।

কথাটা সত্তাটি জানত না—কারণ কথাটার অর্থ কোনও স্মৃতিতে নয়, বেঁচে থাকা দুই বোনের সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে ছিল।

তিয়াসা তারার হাত চেপে ধরল।

“আমি তোকে চিনেছি।”

তারপর মুখহীন সত্তাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তোকে চিনে গেছি।”

সত্তাটি ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল।

তারার মুখটা ভেঙে পড়ল। তার জায়গায় ফুটে উঠল তিয়াসার মুখ, তারপর মায়ের মুখ, বাবার মুখ, তারপর এমন এক মুখ—যার কোনও চোখ নেই, নাক নেই, ঠোঁট নেই। কেবল গভীর অন্ধকার।

“তুই আমার কাছ থেকে পালাতে পারবি না!”

“আমি পালাচ্ছি না,” তিয়াসা বলল। “আমি তোকে আর আমার জীবনের অংশ হতে দিচ্ছি না।”

সে করিডরের শেষ প্রান্তের আয়নার দিকে দৌড়ে গেল।

আয়নার মধ্যে এখনও তাদের পুরোনো ঘর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দরজাটা ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে। তার ওপারে বাস্তব পৃথিবী। তাদের বাড়ি। তাদের মা। তাদের জীবনের বাকি অংশ।

তিয়াসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে কাচে আঘাত করল।

কিছু হল না।

সত্তাটি পিছন থেকে ছুটে আসছে।

তারা চিৎকার করল, “দিদি, দরজায় তিনবার টোকা দে!”

তিয়াসা বুঝতে পারল।

সে আয়নার ওপর তিনবার টোকা দিল।

টোক।

টোক।

টোক।

তারপর বলল, “তারা, আমি তোকে খুঁজে পেয়েছি।”

আয়নার কাচের ওপর সোনালি আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়ল। রেখাগুলো একত্র হয়ে দরজার মতো একটা আকৃতি তৈরি করল।

সত্তাটি থমকে দাঁড়াল।

“না! এটা সম্ভব নয়!”

“কেন?” তিয়াসা বলল। “কারণ তুই ভেবেছিলি, আমরা শুধু আমাদের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে আছি। কিন্তু স্মৃতি তো শুধু অতীত নয়। স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কারা। আর আমরা যদি নিজেদের চিনতে পারি, তা হলে তুই আমাদের মুখ চুরি করতে পারবি না।”

সে তারাকে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

সত্তাটি শেষ চেষ্টা করল। সে এবার তিয়াসার মৃত বাবার রূপ নিল।

“তিয়াসা, মা, দাঁড়া। আমাকে ছেড়ে যাস না।”

তিয়াসার পা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

বাবার কণ্ঠস্বর।

ঠিক সেই স্নেহমাখা ডাক, যা সে বহু বছর শোনেনি।

তার চোখে জল এসে গেল।

“বাবা…”

সত্তাটি হাত বাড়াল।

“একবার আমার কাছে আয়। আমি তোকে সব বুঝিয়ে দেব।”

তিয়াসা চোখ বন্ধ করল। বাবার শেষ চিঠির কথা মনে পড়ল—ভালোবাসার নামে কেউ যদি তোকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে বিশ্বাস করিস না।

সে চোখ খুলে বলল, “আমার বাবা আমাকে কখনও নিজের কাছে আটকে রাখতেন না। তিনি চাইতেন আমি বাঁচি।”

সত্তাটির মুখে আবার ফাটল ধরল।

তিয়াসা আর একবারও পিছনে তাকাল না।

দুই বোন আলোর দরজা পেরিয়ে গেল।


বাস্তব পৃথিবীতে তখন রাত দুটো সতেরো।

পুরোনো বাড়ির সেই ঘরে মেঝেতে পড়ে ছিল তিয়াসা। তার পাশে নিথর হয়ে শুয়ে ছিল ছোট্ট তারা। ঘরের কোণে রাখা পুরোনো আয়নাটির কাচে ক্রমশ ফাটল ছড়িয়ে পড়ছিল।

হঠাৎ তিয়াসার আঙুল নড়ল।

তারপর সে হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুলল।

প্রথমেই সে তারার দিকে তাকাল।

“তারা!”

মেয়েটি নড়ল না।

তিয়াসা তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিল।

“তারা, চোখ খোল! আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি। তুই শুনতে পাচ্ছিস?”

কয়েক মুহূর্ত পর তারার চোখের পাতা কেঁপে উঠল।

সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

“দিদি?”

“হ্যাঁ, আমি।”

তারা কাঁদতে কাঁদতে দিদির গলা জড়িয়ে ধরল।

“আমরা কি সত্যিই বাড়ি এসেছি?”

তিয়াসা তার কপালে চুমু খেল।

“হ্যাঁ। এবার সত্যিই।”

ঠিক তখনই ঘরের কোণে একটা প্রচণ্ড শব্দ হল।

পুরোনো আয়নাটা মাঝখান থেকে ফেটে গেল। তার কাচের প্রতিটি টুকরোয় এক মুহূর্তের জন্য মুখহীন সত্তাটিকে দেখা গেল। সে কখনও চিৎকার করছে, কখনও কাঁদছে, কখনও তিয়াসার মুখ নিয়ে বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু প্রতিটি টুকরোর মধ্যে তার মুখ আরও ছোট হয়ে আসছিল।

শেষে একটি ক্ষুদ্র কাচের টুকরোয় শুধু কালো একটা ছায়া দেখা গেল।

তারপর সেটিও নিভে গেল।

ঘরের বাতাস হঠাৎ স্বাভাবিক হয়ে উঠল।

বহু বছরের জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ মিলিয়ে গেল। জানলার বাইরে ভোরের প্রথম পাখি ডাকল।

তিয়াসা বুঝল, সত্তাটি আর তাদের পিছু নিতে পারবে না।


তিয়াসা প্রথমে মাকে ফোন করেছিল।

ফোনের অন্য প্রান্তে ঘুমজড়ানো কণ্ঠস্বর।

“তিয়াসা? এত রাতে কী হয়েছে?”

কথা বলতে গিয়ে তিয়াসার গলা আটকে গেল।

“মা…”

“কী হয়েছে, মা? তুই কাঁদছিস কেন?”

তিয়াসা তারার দিকে তাকাল। মেয়েটি তার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। এতক্ষণে তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। বারো বছরের বন্দিদশা, ভয়, ক্ষুধা আর অন্ধকারের পর সে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। কিন্তু তার কাছে পৃথিবীটা এখনও অচেনা।

তিয়াসা ধীরে ধীরে বলল, “মা, আমি তোকে একটা কথা বলব। তুই ভয় পাবি না।”

“বল।”

“তারা বেঁচে আছে।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর মায়ের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

“কী বললি?”

“তারা বেঁচে আছে, মা। আমার কাছে আছে।”

“না… না, তিয়াসা, এ হতে পারে না। আমরা তো—”

মায়ের কথা শেষ হল না। ফোনের ওপাশে কান্নার শব্দ শোনা গেল।

“মা, তুই একবার এখানে আয়। নিজের চোখে দেখ।”

প্রায় এক ঘণ্টা পর মা এসে পৌঁছলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে তিয়াসাকে দেখলেন, তারপর তার পাশে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটিকে।

মেয়েটির মুখে বারো বছর আগের তারার ছায়া।

মা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেলেন।

“তারা?”

মেয়েটি মাথা তুলল।

“মা?”

একটি শব্দেই যেন বারো বছরের জমাট অন্ধকার ভেঙে গেল।

মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। তিয়াসাও তাদের সঙ্গে কাঁদতে লাগল।

কেউ কোনও কথা বলতে পারছিল না।

এত বছর ধরে যে শোককে তারা সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল, তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল জীবন্ত এক অলৌকিকতা।

কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে এল এক কঠিন বাস্তবতা।

তারা শারীরিকভাবে এখনও এগারো-বারো বছরের মেয়ে। তার স্মৃতির মধ্যে আটকে আছে সেই রাত, সেই আয়না, সেই ভয়ংকর অন্ধকার। বাইরে পৃথিবীতে বারো বছর কেটে গেছে। তার বন্ধুরা বড় হয়েছে, স্কুলের বই বদলেছে, শহরের রাস্তাঘাট বদলেছে, বাবা আর বেঁচে নেই।

তাকে সব নতুন করে শিখতে হবে।

তিয়াসা জানত, বোনকে ফিরে পাওয়া মানেই তার সমস্ত কষ্ট মুহূর্তে মুছে যাওয়া নয়। তাদের সামনে দীর্ঘ পথ পড়ে আছে—চিকিৎসা, নিরাপত্তা, স্মৃতির ক্ষত সারানো এবং নতুন করে জীবন গড়ার পথ।

কিন্তু এবার তারা একা নয়।


পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে পুরোনো বাড়ির ঘটনার তদন্ত শুরু হয়।

অবসরপ্রাপ্ত দমকলকর্মী প্রদীপ মণ্ডল নিজের পুরোনো নথি খুঁজে বের করেন। আগুনের রাতের রিপোর্টে সত্যিই অসংগতি ছিল। উদ্ধার হওয়া শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। লাল ফিতেটি ছাড়া এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না, যা দেহটিকে তারার বলে শনাক্ত করতে পারত।

বছরের পর বছর ধরে পরিবারটি অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে একটি মৃত্যুকে সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল।

তিয়াসা সব কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেনি। আয়নার ওপারের জগতের গল্প শুনলে কেউ হয়তো বিশ্বাস করত না। কিন্তু সে আর নিজের স্মৃতিকে ভয় পেত না। যা ঘটেছিল, তার সব ব্যাখ্যা সে জানে না। তবু সে জানে, সেই সত্তা তাদের জীবনের ওপর যে মিথ্যা চাপিয়ে দিয়েছিল, সেটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

মায়ের ঘরে এখন তারার জন্য একটা ছোট্ট বিছানা পাতা হয়েছে। জানলার পাশে রাখা আছে রঙিন পেন্সিল, খাতা আর গল্পের বই। প্রথম কয়েক দিন তারা ঘুমোতে পারত না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে দিদিকে ডাকত।

তিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে তার ঘরে যেত।

“দিদি, তুই আছিস?”

“আছি।”

“তুই চলে যাবি না তো?”

তিয়াসা তার পাশে বসে হাত ধরত।

“আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

এক রাতে তারা বলল, “দিদি, তুই কি আমাকে আবার স্কুলে ভর্তি করাবি?”

তিয়াসা হেসে ফেলল। বহু বছর পর তার হাসিটা একেবারে নিজের মতো লাগল।

“অবশ্যই। তবে আগে তোর শরীরটা ভালো হতে হবে।”

“আমি বড় হয়ে কী হব জানিস?”

“কী?”

“আমি এমন একটা বই লিখব, যেখানে কেউ কাউকে হারিয়ে ফেললেও আবার খুঁজে পাবে।”

তিয়াসা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।

“তাহলে বইটা আমাকেই প্রথম পড়তে দিবি।”

“দেব। তবে একটা শর্ত আছে।”

“কী শর্ত?”

“বইয়ের শেষটা যেন সুখের হয়।”

তিয়াসা বোনকে বুকে টেনে নিল।

“হবে। কারণ এবার আমরা নিজেরাই আমাদের গল্পের শেষটা লিখব।”


এক মাস পর তিয়াসা আবার সেই পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়ির ঘরগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দেওয়াল মেরামত করা হচ্ছে। যে ঘরে আয়নাটি ছিল, সেখানে এখন জানলা দিয়ে সকালের রোদ ঢোকে।

মেঝেতে পড়ে থাকা আয়নার কাচের টুকরোগুলো সে আগেই সরিয়ে ফেলেছিল। তবু দেওয়ালের এক কোণে ছোট্ট একটি কাচের টুকরো রয়ে গিয়েছিল। সেটি সরাতে গিয়ে তিয়াসা এক মুহূর্ত থেমে গেল।

কাচে তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছিল।

স্বাভাবিক মুখ। ক্লান্ত, কিন্তু শান্ত।

সে ডান হাত তুলল।

প্রতিচ্ছবিও হাত তুলল।

সে চোখ বন্ধ করল।

প্রতিচ্ছবিও চোখ বন্ধ করল।

সবকিছু স্বাভাবিক।

তিয়াসা কাচের টুকরোটি তুলে কাপড়ে মুড়ে ফেলল। তারপর বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল।

সূর্য তখন উঠছে। রাস্তায় মানুষজন কাজে বেরোচ্ছে। দূরে কোনও বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে।

তিয়াসা আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ল বাবা, যিনি সত্যিটা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও মেয়েদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। মনে পড়ল মা, যিনি অপরাধবোধের ভার নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছেন। আর মনে পড়ল ছোট্ট তারা—যে অন্ধকারের মধ্যেও বিশ্বাস করতে ভোলেনি যে তার দিদি একদিন তাকে খুঁজে নেবে।

তিয়াসা জানত, তাদের জীবনে আর কোনওদিন সবকিছু আগের মতো হবে না।

কিন্তু আগের মতো হওয়ার প্রয়োজনও নেই।

কারণ কিছু হারানো জিনিস ফিরে এলে মানুষ অতীতের কাছে ফিরে যায় না; বরং নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পায়।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিয়াসা তার ডায়েরি খুলল। অনেক দিন ধরে সে সেখানে নিজের দুঃস্বপ্ন লিখে রাখত। আজ প্রথমবার সে লিখল—

“আমি আর আয়নার ভেতরে কাউকে খুঁজি না। কারণ যে মানুষকে ভালোবাসি, তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য সব সময় কোনও অলৌকিক দরজার দরকার হয় না। কখনও কখনও দরকার হয় শুধু অপেক্ষা, বিশ্বাস আর ফিরে আসার সাহস।”

লেখা শেষ করে সে ডায়েরি বন্ধ করল।

অন্য ঘর থেকে তারার ডাক এল।

“দিদি! তাড়াতাড়ি আয়। মা পায়েস করেছে!”

তিয়াসা উঠে দাঁড়াল।

“আসছি!”

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

তার পিছনে কোনও আয়না ছিল না। কোনও অচেনা প্রতিচ্ছবি ছিল না। ছিল শুধু সকালের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠা একটি বাড়ি, যেখানে বারো বছর পর আবার দুই বোনের হাসি শোনা যাচ্ছে।

আর কোথাও, কোনও অন্ধকার কাচের গভীরে, যে মুখটি কখনও মানুষের ছিল না—সে আর কোনও মুখ ধার করতে পারল না।

কারণ তিয়াসা ও তারা অবশেষে নিজেদের মুখ চিনে নিয়েছিল।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : আয়নার ওপারে যে মেয়েটি(তৃতীয় পর্ব: যে মেয়েটি কখনও মারা যায়নি)

আয়নার কাচে ফাটলটা ক্রমশ বড় হচ্ছিল।

প্রথমে সরু একটা রেখা। তারপর সেই রেখা থেকে শাখার মতো আরও কয়েকটি ফাটল বেরিয়ে এসে গোটা কাচে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোনও শব্দ হচ্ছিল না। যেন কাচ ভাঙছে না, বরং অন্য কোনও জগৎ থেকে কেউ ধীরে ধীরে দরজাটা খুলছে।

তিয়াসা পিছিয়ে এল।

আয়নার ভিতরে তার নিজের মুখ। কপালে রক্তের রেখা, ঠোঁটের কোণে পোড়া ক্ষত, চোখের নীচে গভীর কালো ছায়া। সেই মুখ তার মতো হলেও তার নয়।

প্রতিবিম্বটি বলল, “ভয় পাচ্ছিস কেন, দিদি? এত দিন তো আমাকেই খুঁজছিলি।”

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “তুই কে?”

—আমি তুই।

—মিথ্যে বলিস না!

—তাহলে আয়নার দিকে তাকিয়ে বল, তুই কোনও দিন নিজের বোনকে বাঁচাতে চেয়েছিলি না।

কথাটা তিয়াসার বুকের মধ্যে গিয়ে বিঁধল।

সে চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ল, আগুনের আগের রাতে সে তারার সঙ্গে ঝগড়া করেছিল। মনে পড়ল, বাড়ি ফিরে আয়নার ভিতরে নিজের মুখ দেখে সে ভয় পেয়েছিল। মনে পড়ল, সেই রাতের পরের ঘটনাগুলো তার স্মৃতিতে যেন ছেঁড়া ছেঁড়া ছবির মতো রয়ে গিয়েছে।

কিন্তু একটি বিষয় এখনও পরিষ্কার নয়।

দমকলকর্মী বলেছে, ঘরে দুটি শিশুর পায়ের ছাপ ছিল। অথচ দেহ পাওয়া গিয়েছিল একটি।

তাহলে অন্য শিশুটি কে?

তিয়াসা মোবাইল তুলে সেই অচেনা নম্বরে ফোন করল।

ফোন ধরতেই একজন বৃদ্ধ পুরুষের গলা শোনা গেল।

—হ্যালো?

—আপনি কি সেই দমকলকর্মী? আপনি আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

—হ্যাঁ। আমার নাম প্রদীপ মণ্ডল। আমি তখন দমকলের কর্মী ছিলাম। এখন অবসর নিয়েছি।

—আপনি কী দেখেছিলেন, আমাকে সব বলুন।

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর প্রদীপবাবু বললেন, “অনেক বছর ধরে কাউকে কথাটা বলিনি। কারণ যা দেখেছিলাম, তা কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। সেদিন আমরা যখন বাড়িতে ঢুকি, তখন আগুন অনেকটা নেভানো হয়ে গিয়েছিল। দোতলার একটি ঘর প্রায় পুরো পুড়ে গিয়েছিল। ঘরের মধ্যে একটা ছোট্ট দেহ পড়ে ছিল। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ওটাই আপনার বোন।”

—কিন্তু?

—কিন্তু ঘরের মেঝেতে দুটি আলাদা পায়ের ছাপ ছিল। একটি ছোট শিশুর। অন্যটি একটু বড় মেয়ের। আশ্চর্যের বিষয়, পায়ের ছাপগুলো ধোঁয়া আর ছাইয়ের মধ্যেও পরিষ্কার ছিল। আমরা অনুসরণ করে দেখেছিলাম, দুটো ছাপই গিয়ে শেষ হয়েছে আয়নার সামনে।

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

—আয়নাটা কি অক্ষত ছিল?

—হ্যাঁ। কাঠের ফ্রেম পুড়ে কালো হয়েছিল, কিন্তু কাচে কোনও ক্ষতি হয়নি। আমি নিজে আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল, কাচের ভিতরে কেউ নড়ে উঠল। আমি ঘুরে তাকিয়েছিলাম। কেউ ছিল না।

—আপনি কি আমার বাবাকে এসব বলেছিলেন?

—বলেছিলাম। উনি আমাকে চুপ থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। বলেছিলেন, পরিবারটা এমনিতেই ভেঙে পড়েছে। আর একটা অস্বাভাবিক কথা ছড়িয়ে পড়লে আপনার মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হবে।

তিয়াসা চোখ বন্ধ করল।

—দেহটা কি আমার বোনের ছিল?

প্রদীপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি বলতে পারব না। পরে শুনেছিলাম, শনাক্তকরণের জন্য পরিবারের কাউকে আর আলাদা করে ডাকা হয়নি। কিন্তু একটা কথা মনে আছে। দেহটা উদ্ধার করার সময় তার একটি হাতে লাল ফিতের টুকরো ছিল। অথচ আপনার বাবার কাছে পরে শুনেছিলাম, আপনার বোনের লাল ফিতেটা আগুন লাগার আগেই হারিয়ে গিয়েছিল।

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।

তারপর প্রদীপবাবু বললেন, “আপনি যদি সত্যিটা খুঁজতে চান, একটা জায়গায় যান। পুরোনো বাড়ির পিছনে একটা বন্ধ ঘর ছিল। বাড়িটা ভাঙার আগে আমি একবার সেখানে গিয়েছিলাম। ঘরের দেওয়ালে একটা ছোট্ট দরজা ছিল। আপনার বাবা সেটাকে ইট দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।”

—কোন দরজা?

—আমি জানি না। তবে আপনার বাবা বলেছিলেন, “ওপাশে কিছু নেই।” অথচ দরজাটার ওপার থেকে তখন কারও কাঁদার শব্দ আসছিল।

ফোনটা কেটে গেল।

তিয়াসা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর আয়নার দিকে তাকাল।

প্রতিবিম্বটি আর হাসছে না।

তার চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য সত্যিকারের ভয় ফুটে উঠল।

—তুই ওর সঙ্গে কথা বললি কেন?—প্রতিবিম্বটি ফিসফিস করে বলল।

তিয়াসা বুঝল, সে ঠিক পথেই এগোচ্ছে।

—কারণ আমি সত্যিটা জানতে চাই।

প্রতিবিম্বটি কাচে হাত রাখল।

—সত্যি জানলে তুই আমাকে আর ভালোবাসবি না।

—তুই যদি সত্যিই তারা হোস, তাহলে সত্যি জানলেও তোকে ভালোবাসব।

এই উত্তর শুনে আয়নার মেয়েটির মুখ বদলে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে শিশুসুলভ অভিমান দেখা গেল।

তারপর মুখের উপর কালো ছায়া নেমে এল।

—তাহলে আয়নার দরজা খুলে দেখ। কে তোর বোন, আর কে নয়।


পরদিন দুপুরে তিয়াসা হাওড়ার পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়িটা আর নেই। বহু বছর আগেই সেটি ভেঙে বহুতল তৈরি হয়েছে। কিন্তু পিছনের সরু গলিটা এখনও আছে। গলির শেষে একটা পরিত্যক্ত গুদামঘর। একসময় সেখানে বাড়ির পুরোনো আসবাব রাখা হত।

প্রদীপবাবুর কথা মনে করে তিয়াসা গুদামঘরের মালিকের সঙ্গে কথা বলল। বৃদ্ধ মালিক প্রথমে কিছুতেই ভিতরে ঢুকতে দিতে চাননি। পরে বাবার নাম শুনে রাজি হলেন।

ঘরের ভিতরে ধুলো, ভাঙা চেয়ার, মরচে ধরা আলমারি আর পুরোনো কাঠের বাক্সের স্তূপ।

দেয়ালের এক পাশে নতুন ইটের গাঁথুনি দেখা গেল। আশপাশের দেওয়ালের তুলনায় ইটগুলো আলাদা। তিয়াসা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। ইটের ফাঁকে পুরোনো সিমেন্টের দাগ।

—এই দেওয়ালের ওপারে কী আছে?—সে জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধ বললেন, “আগে নাকি একটা ছোট ঘর ছিল। বাড়ি ভাঙার সময় দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেন, তা জানি না।”

তিয়াসা মোবাইলের আলো জ্বেলে দেওয়াল পরীক্ষা করল। নীচের দিকে একটা ছোট্ট ধাতব পাত আটকে আছে। ধুলো সরাতেই দেখা গেল, সেটি আসলে একটি পুরোনো তালার মুখ।

দেওয়ালের মধ্যে দরজা!

সে তালাটাকে নাড়তেই একটা ক্ষীণ শব্দ হল।

তারপর ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তিয়াসার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল।

কিন্তু এবার সে পালাল না।

বৃদ্ধ লোকটি ভয়ে পিছিয়ে গেলেন।

—মা, এখানে আর দাঁড়িও না। এটা ভালো জায়গা নয়।

তিয়াসা বলল, “আপনি বাইরে যান। আমি একটু দেখে আসছি।”

—তুমি একা যাবে?

—হ্যাঁ।

বৃদ্ধ আর বাধা দিলেন না। তিনি বাইরে চলে গেলেন।

তিয়াসা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “তারা?”

ভিতর থেকে কোনও উত্তর এল না।

সে আবার বলল, “আমি তিয়াসা। আমি সত্যিটা জানতে এসেছি।”

দরজার ওপাশে যেন কেউ ধীরে ধীরে হাঁটছে।

তারপর একটা মেয়ের গলা শোনা গেল।

—দিদি?

এই কণ্ঠস্বরটা তিয়াসার পরিচিত। আয়নার ভিতরের কণ্ঠস্বরের মতো ঠান্ডা নয়। এতে ভয় আছে, কাঁপুনি আছে, বেঁচে থাকার আকুতি আছে।

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

—তারা, তুই ভিতরে আছিস?

—দিদি, দরজাটা খোল।

তিয়াসা তালাটা টানল। নড়ল না। সে পাশের ভাঙা কাঠের টুকরো দিয়ে তালায় আঘাত করল। দু-তিনবার আঘাত করার পর তালাটা খুলে পড়ল।

দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই তার মুখে ধুলো এসে লাগল।

ঘরটা ছোট। দেওয়ালে কোনও জানলা নেই। মেঝেতে একটা পুরোনো কম্বল, ভাঙা জলের বোতল, কয়েকটা শুকনো বিস্কুটের প্যাকেট। কোণে বসে আছে একটি মেয়ে।

বয়স বারো-তেরোর বেশি নয়।

চুল এলোমেলো। গায়ে ময়লা পোশাক। মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু চোখ দুটো—

সেই চোখ তিয়াসা চেনে।

তারার চোখ।

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়াল।

—দিদি!

তিয়াসা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

মেয়েটির শরীর উষ্ণ।

তার বুক ওঠানামা করছে।

সে জীবিত।

তিয়াসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুই বেঁচে আছিস! তুই সত্যিই বেঁচে আছিস!”

তারা তার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদল।

—আমি তোকে কত দিন ধরে ডাকছি, দিদি!

—তুই এখানে কী করে এলি? আগুনের রাতে কী হয়েছিল?

তারা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু দুর্বলতায় তার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।

তিয়াসা তাকে বাইরে নিয়ে এল। বৃদ্ধ মালিক জল দিলেন। কিছুক্ষণ পরে তারা একটু সুস্থ হল।

তারপর সে বলতে শুরু করল।


“সেদিন আয়নার মেয়েটা আমাকে বলেছিল, দিদি বাড়ি ফিরলে আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকব। আমি ওকে বিশ্বাস করেছিলাম। আমি জানতাম না, ও আসলে কী চায়।”

তারা ধীরে ধীরে কথা বলছিল।

“দিদি, তুই যখন বাড়ি ফিরলি, তখন আয়নার ভিতরের মেয়েটা তোর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, ও তোর কোনও রকম ছায়া। কিন্তু ও তোর মতো কথা বলছিল, তোর মতো হাঁটছিল। শুধু একটা জিনিস আলাদা ছিল—ওর পায়ের ছাপ ছিল না।”

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

“তুই আয়নায় তাকানোর পর ও তোর হাত ধরেছিল। তারপর ঘরের আলো নিভে গিয়েছিল। আমি তোকে টেনে সরাতে গিয়েছিলাম। তখন আয়নার কাচটা দরজার মতো খুলে গেল। তুই ভিতরে পড়ে গেলি।”

—আমি?

তারা মাথা নাড়ল।

“আমি তোকে ধরেছিলাম। কিন্তু তোর হাত আমার হাত থেকে ছুটে গেল। তারপর আয়নার ভিতর থেকে তোরই গলা শুনলাম। তুই বলছিলি, আমাকে বাঁচা, তারা! আমাকে বের করে নে!”

তিয়াসার মাথা ঘুরে উঠল।

—তারপর?

“আমি ভিতরে ঢুকতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অন্য মেয়েটা আমাকে ধরে ফেলল। ও বলল, তুই যদি ভিতরে যাস, তাহলে তুই আর কখনও ফিরতে পারবি না। আমি ওর হাত ছাড়িয়ে পালাতে চেয়েছিলাম। তখন ঘরে আগুন ধরে গেল।”

তারা চোখ বন্ধ করল।

“আগুনটা কোথা থেকে এসেছিল, জানি না। কিন্তু আগুনের মধ্যেও আয়নার ভিতরের দরজাটা খোলা ছিল। আমি দেখলাম, তুই ওপারে দাঁড়িয়ে কাঁদছিস। আমি তোকে ডাকছিলাম। তারপর কেউ আমাকে টেনে নিয়ে গেল।”

—কে?

তারা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“একজন লোক। তার মুখ ছিল না। সে আমার মুখে হাত রেখে বলল, ‘তুই বাইরে থাকবি, কিন্তু তোর দিদি ভিতরে থাকবে।’ তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল।”

তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।

—তাহলে আগুনের রাতে যে দেহ পাওয়া গিয়েছিল…

“সেটা আমি ছিলাম না, দিদি।”

তারার চোখে জল জমল।

“আমি জানি না সেটা কার দেহ ছিল। আমি শুধু জানি, তারপর থেকে আমাকে এই ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। কখনও মনে হত, কয়েক ঘণ্টা কেটেছে। কখনও মনে হত, অনেক বছর। কেউ আমাকে খাবার দিয়ে যেত। আমি তার মুখ দেখতে পেতাম না।”

—তুই পালিয়ে আসতে পারিসনি কেন?

—কারণ দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। আর রাতে ওই লোকটা আসত। সে বলত, আমি যদি কাউকে সব কথা বলি, তাহলে তুই আর কোনও দিন ফিরতে পারবি না।

তিয়াসা তার বোনের হাত শক্ত করে ধরল।

—এখন আর কেউ তোকে আটকে রাখতে পারবে না।

তারা মাথা নাড়ল।

—পারবে, দিদি। কারণ ওই লোকটা এখনও আছে।

ঠিক তখনই গুদামঘরের বাইরে থেকে একটা শব্দ এল।

কেউ যেন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে।

তারা তিয়াসার হাত চেপে ধরল।

তার মুখের রং বদলে গেল।

—ও এসেছে।


গুদামঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথমে সাধারণ একজন বৃদ্ধ বলে মনে হয়েছিল। সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চুল, হাতে একটা লাঠি।

কিন্তু তার মুখের দিকে তাকাতেই তিয়াসার বুক হিম হয়ে গেল।

লোকটির মুখ স্থির নয়।

এক মুহূর্তে তার মুখে বাবার চেহারা ফুটে উঠছে। পরের মুহূর্তে মায়ের। তারপর নিবারণবাবুর। তারপর তিয়াসার নিজের মুখ।

যেন এক মুখের উপর আর-এক মুখ পরানো হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত মুখটা স্থির হল তারার মুখে।

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

—তিয়াসা, অবশেষে তুই সত্যিটা জেনে গেছিস।

তিয়াসা তারার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

—তুমি কে?

—আমাকে অনেক নামে ডাকা হয়েছে। কিন্তু কোনও নামই আমার নয়।

—তুমি আমার বোনকে এখানে আটকে রেখেছিলে?

—আমি ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।

—কীসের থেকে?

—মৃত্যুর থেকে। বিস্মৃতির থেকে। তোদের পরিবারের মিথ্যে থেকে।

তিয়াসা রাগে কাঁপতে লাগল।

—তুমি মিথ্যে বলছ!

লোকটি হাসল।

—তুই কি জানিস, তোর বোন কেন বেঁচে আছে? কারণ সে তোকে ছেড়ে যেতে পারেনি। আর তুই কেন আয়নায় আমাকে দেখতে পাস? কারণ তুইও তাকে ছেড়ে যেতে পারিসনি।

তিয়াসা কিছু বলতে পারল না।

লোকটি ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে ঢুকল।

—তোর বাবা আমাকে থামাতে চেয়েছিল। সে আয়নাটা সরিয়ে দিয়েছিল, দরজা বন্ধ করেছিল। কিন্তু সে জানত না, দরজা বন্ধ করলেই পথ বন্ধ হয় না।

—তুমি আমার বাবাকে চিনতে?

—আমি তোদের সবাইকে চিনি। তোদের বাড়িতে যখনই কেউ মৃতকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে, আমি সেখানে ছিলাম।

লোকটি তারার দিকে তাকাল।

—তারা, তুই কি দিদিকে সব বলেছিস?

তারা কাঁপছিল।

—সব নয়।

—তাহলে বল।

তারা মাথা নাড়ল।

—না।

লোকটির মুখে প্রথমবার ক্রোধ ফুটে উঠল।

তার চারপাশের বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল। দেওয়ালের ছায়াগুলো লম্বা হতে লাগল। তিয়াসা দেখল, লোকটির পায়ের নীচে কোনও ছায়া নেই।

লোকটি বলল, “তাহলে আমি বলি।”

সে তিয়াসার দিকে তাকাল।

“আগুনের রাতে তুই আয়নার ভিতরে পড়ে গিয়েছিলি। কিন্তু তোর শরীর মারা যায়নি। তুই অচেতন হয়ে পড়েছিলি। আমি তোর স্মৃতিকে আয়নার ভিতরে আটকে রেখেছিলাম। তোর শরীরকে বাইরে রেখে দিয়েছিলাম, যাতে সবাই ভাবে তুই বেঁচে আছিস।”

তিয়াসা হতভম্ব।

—কী বলছ?

—তুই এখন যে জীবনটাকে নিজের জীবন বলে জানিস, তার অনেকটাই তোর স্মৃতির তৈরি। তুই যে বাড়ি ছেড়েছিস, যে স্কুলে পড়েছিস, যে চাকরি করছিস—সবই তোর মনে তৈরি করা এক দীর্ঘ স্বপ্ন।

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

—না। এটা সত্যি হতে পারে না।

—তাহলে বল, তোর প্রথম চাকরির দিন কী হয়েছিল? তোর বাবার মৃত্যুর আগের রাতে তিনি তোকে কী বলেছিলেন? তোর মায়ের হাতে যে পোড়া দাগ আছে, সেটা কীভাবে হয়েছিল?

তিয়াসা উত্তর দিতে পারল না।

কিছু স্মৃতি তার মনে পরিষ্কার। কিছু স্মৃতি ঝাপসা। আর কিছু স্মৃতি যেন অন্য কারও জীবনের ঘটনা।

লোকটি বলল, “তুই আয়নার ওপারে আটকে আছিস। তোর বোন বাইরে ছিল। কিন্তু তুই তাকে মনে করতে পারিসনি, কারণ আমি তোদের স্মৃতির মধ্যে দেয়াল তুলে দিয়েছিলাম।”

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

—তাহলে আমি কি মৃত?

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—তুই কী, সেটা এখনই জানা দরকার নেই। দরকার হল, তুই কী বেছে নিবি।

সে হাত বাড়িয়ে দিল।

তার তালুতে একটি ছোট্ট চাবি।

—এই চাবি দিয়ে তুই দরজাটা খুলতে পারবি। ওপারে গেলে তুই তোর আসল জীবন দেখতে পাবি। কিন্তু তোর বোনকে ছেড়ে যেতে হবে।

তারা চিৎকার করে উঠল।

—দিদি, ওর কথা শুনিস না!

লোকটি বলল, “তুই যদি দরজা না খুলিস, তাহলে তোরা দুজনেই এই জায়গায় আটকে থাকবি। তোর বোনের শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাবে। আর তুই নিজের স্মৃতির ভিতরে হারিয়ে যাবি।”

তিয়াসা চাবিটার দিকে তাকাল।

তার সামনে দুটি পথ।

একদিকে তারার হাত। অন্যদিকে সেই সত্যি, যার মুখোমুখি হতে সে বারো বছর ধরে ভয় পেয়েছে।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।

লোকটির মুখে হাসি ফুটল।

কিন্তু তিয়াসা চাবি নিল না।

সে বলল, “আমি আমার বোনকে ছেড়ে যাব না। আর তোমার কথায় নিজের স্মৃতিকে সত্যি বলে মেনে নেব না।”

লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল।

—তাহলে তুই কখনও জানতে পারবি না, তুই কে।

তিয়াসা তারার হাত ধরল।

—আমি তিয়াসা। আমি তারার দিদি। আর আমরা দুজনেই সত্যিটা জানতে চাই।

এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে গুদামঘরের দেওয়াল কেঁপে উঠল।

দূরে কোথাও কাচ ভাঙার শব্দ হল।

লোকটির মুখের উপর ফাটল ধরতে শুরু করল। তারার মুখ ভেঙে বেরিয়ে এল তিয়াসার মুখ। তারপর সেই মুখও বদলে গেল। একের পর এক পরিচিত মুখ ভেসে উঠল—বাবা, মা, নিবারণবাবু, ছোটবেলার তিয়াসা।

শেষে সব মুখ মুছে গিয়ে রইল এক ফাঁকা অন্ধকার।

সেই অন্ধকারের ভিতর থেকে কণ্ঠস্বর এল—

“তাহলে তোকে সত্যিই ফিরতে হবে।”


গুদামঘরের মেঝে হঠাৎ দু-ভাগ হয়ে গেল।

নীচে দেখা গেল লম্বা এক করিডর। করিডরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো আয়না। কাচের ভিতরে একটি ঘর, আর ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে ষোলো বছরের তিয়াসা।

তার হাতে আঁকার খাতা।

তার চোখে রাগ।

আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট তারা।

তিয়াসা বুঝতে পারল, এটাই সেই রাতের শেষ স্মৃতি।

যে স্মৃতিটা এত দিন তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

লোকটির কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল—

“তুই যদি সত্যিটা দেখতে চাস, এই করিডর দিয়ে হাঁট। কিন্তু মনে রাখিস, যে দরজা একবার খোলে, সে দরজা সব সময় বন্ধ করা যায় না।”

তারা তিয়াসার হাত শক্ত করে ধরল।

—দিদি, আমরা একসঙ্গে যাব।

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

দুজনেই করিডরে পা রাখল।

তাদের পিছনে গুদামঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সামনে আয়না।

আয়নার ভিতরে ছোটবেলার তিয়াসা মুখ তুলে তাকাল।

তারপর ঠোঁট নেড়ে বলল—

“তারা, তুই দরজাটা বন্ধ কর। দিদি আর ফিরবে না।”

তিয়াসা থমকে গেল।

কারণ এই কণ্ঠস্বরটা তার নিজের।

আর সে জানে—সেদিন রাতে সে ঠিক এই কথাটাই বলেছিল।

কিন্তু কেন বলেছিল?

কাকে বাঁচাতে চেয়েছিল?

আর কাকে ফেলে এসেছিল?

করিডরের শেষ মাথায় আয়নার কাচে আগুনের লাল আলো জ্বলে উঠল।

তিয়াসা তারার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

তারপর তারা দুজনে একসঙ্গে আয়নার ভিতরে পা রাখল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : আয়নার ওপারে যে মেয়েটি – (দ্বিতীয় পর্ব: আগুনের রাতের গোপন দরজা)।

দরজাটা খুলছিল খুব ধীরে।

আয়নার ওপারের অন্ধকার করিডরে দাঁড়িয়ে তিয়াসা দেখতে পেল, দরজার ফাঁক দিয়ে কমলা আলো বেরিয়ে আসছে। সেই আলোতে ভেসে উঠছে ধোঁয়ার রেখা, পোড়া কাঠের গন্ধ আর একটি শিশুর ছায়া।

তারার ছায়া।

কিন্তু মেয়েটি দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে তিয়াসার ঠিক পিছনে।

তিয়াসা ঘুরে তাকাতে চাইল।

সঙ্গে সঙ্গে আয়নার ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে এল।

—পিছনে তাকাস না, দিদি!

তিয়াসা স্থির হয়ে গেল।

তার পিছনে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। সেই নিঃশ্বাসে পোড়া কাপড়ের গন্ধ। ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেল। মনে হল, তার পায়ের নীচে মেঝে নয়, আগুনে গরম হয়ে যাওয়া কোনও লোহার পাত।

তারপর সেই গভীর কণ্ঠস্বর আবার বলল—

—তুই কি সত্যিই জানতে চাস, সেদিন কী হয়েছিল?

তিয়াসা চোখ বন্ধ করল।

—হ্যাঁ।

—তাহলে চোখ খোল।

সে চোখ খুলতেই দেখল, সে আর নিজের ঘরে নেই।

তার সামনে পুরোনো হাওড়ার বাড়ি। দেয়ালে ফিকে নীল রং, কাঠের জানলা, বারান্দায় মায়ের লাগানো তুলসীগাছ। দূরে পাড়ার মণ্ডপ থেকে ঢাকের শব্দ আসছে। সপ্তমীর রাত।

তিয়াসা বুঝতে পারল, সে স্মৃতির মধ্যে এসে পড়েছে।

তার বয়স ষোলো। পরনে লাল-সাদা সালোয়ার। হাতে একটি নতুন আঁকার খাতা।

সামনের ঘর থেকে তারার গলা ভেসে এল।

—দিদি, তুই এসেছিস?

তিয়াসা ছোটবেলার নিজের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যেন অন্য একটি দৃশ্যের দর্শক। ইচ্ছা করলেও স্মৃতির মানুষদের ছুঁতে পারছে না।

স্মৃতির তিয়াসা বিরক্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, এসেছি। এবার কী হয়েছে?”

তারা দৌড়ে ঘরে এল। হাতে একটি ছোট্ট কাগজ। চোখে উত্তেজনা।

—দিদি, তোকে একটা জিনিস দেখাব।

—আবার কী?

—আয়নাটা কথা বলেছে!

তিয়াসা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই আবার শুরু করেছিস? কতবার বলেছি, এসব বাজে কথা বলবি না।”

—কিন্তু দিদি, আমি সত্যি বলছি। আয়নার ভিতরে আর-একটা আমি আছে। ও আমার সঙ্গে কথা বলে।

—তুই সারাদিন ভূতের গল্প পড়িস, তাই এসব মনে হয়।

তারা চুপ করে গেল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল, “ও বলেছে, তুই ওকে দেখতে পাবি।”

স্মৃতির তিয়াসা হেসে উঠল।

—আমি? কেন?

—কারণ ও তোকে চেনে।

—কীভাবে?

তারা উত্তর দিল না। শুধু কাগজটা তিয়াসার হাতে ধরিয়ে দিল।

কাগজে আঁকা একটি আয়না। আয়নার ভিতরে দুটি মেয়ে। একটির পাশে লেখা ‘তারা’, অন্যটির পাশে লেখা ‘তিয়াসা’।

আর ছবির নীচে ছোট্ট অক্ষরে লেখা—

একজন বাইরে। একজন ভিতরে।

তিয়াসার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।

এই ছবিটা সে কোনও দিন দেখেনি। অন্তত তার মনে পড়ে না।

দৃশ্যটা বদলে গেল।

এবার রাত আরও গভীর। বাড়িতে কেউ নেই। বাইরে পুজোর আলো, দূরে বাজি ফাটার শব্দ। তারার ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তারা।

—তুমি সত্যি আমার মতো দেখতে?—তারা জিজ্ঞেস করছে।

আয়নার ভিতরের মেয়েটি মাথা নাড়ল।

—আমার থেকেও বেশি।

—তুমি কোথায় থাকো?

—যেখানে তোমরা ফেলে রেখে যাও।

—আমি কি তোমার কাছে আসতে পারি?

—পারিস। তবে একা নয়।

—কার সঙ্গে?

আয়নার মেয়েটি মৃদু হাসল।

—তোর দিদির সঙ্গে।

তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—দিদি তো আমাকে বিশ্বাস করে না।

—তাহলে ওকে বিশ্বাস করাতে হবে।

আয়নার কাচের উপর একটি হাত উঠে এল। কাচের ওপার থেকে হাতটি ঠেকল তারার হাতের সঙ্গে।

তারপর আয়নার মেয়েটি বলল—

—আগামীকাল রাতে তোদের দুজনকে একসঙ্গে চাই।

দৃশ্যটা আবার বদলে গেল।

এবার তিয়াসা নিজেকে দেখতে পেল বাড়ির বাইরে। সে বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। হাতে ফোন। বারবার বাড়ি থেকে ফোন আসছে, কিন্তু সে ধরছে না।

তারপর হঠাৎ তারার একটি বার্তা এল।

দিদি, বাড়ি ফিরে আয়। খুব দরকার।

তিয়াসা রেগে গিয়ে উত্তর দিল—

এখন পারব না। সব সময় বিরক্ত করিস কেন?

বার্তাটি পাঠানোর পর সে ফোন বন্ধ করে দিল।

কিন্তু কয়েক মিনিট পরে তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে বন্ধুকে বলল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি।”

স্মৃতির দৃশ্য দ্রুত এগিয়ে চলল।

তিয়াসা বাড়ি ফিরল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠে তারার ঘরের সামনে দাঁড়াল। দরজা খোলা। ঘরের ভিতরে আলো জ্বলছে। আয়নার সামনে তারা অপেক্ষা করছে।

—তুই এসেছিস!—তারা ছুটে এল।

তিয়াসা বিরক্ত গলায় বলল, “কী হয়েছে বল তো?”

—আমাকে বিশ্বাস করবি?

—আগে বল কী হয়েছে।

তারা তার হাত ধরে আয়নার সামনে নিয়ে গেল।

প্রথমে তিয়াসা কিছুই দেখতে পেল না। নিজের মুখ, পিছনে বোন, ঘরের দেওয়াল—সব স্বাভাবিক।

তারপর কাচের গভীরে অন্ধকার জমতে লাগল।

আয়নার ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়াসার প্রতিবিম্ব হঠাৎ চোখের পলক ফেলল না। অথচ আসল তিয়াসা চোখ পিটপিট করছে।

প্রতিবিম্বটি ধীরে ধীরে হাসল।

স্মৃতির তিয়াসা পিছিয়ে গেল।

—এটা কী?

তারা ফিসফিস করে বলল, “বলেছিলাম তো!”

আয়নার মেয়েটি হাত তুলল।

তারপর কাচের ওপার থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

—তিয়াসা, তুই কি কখনও ভেবেছিস, তোর বোনের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে তোর জীবনটা কেমন হত?

তিয়াসা রেগে গেল।

—তুই কে?

—আমি তুই।

—মিথ্যে!

—তাহলে তোর নিজের মুখ দেখে ভয় পাচ্ছিস কেন?

তিয়াসা আয়নাটিকে ধাক্কা দিল।

সঙ্গে সঙ্গে কাচের ভিতর থেকে বিকট শব্দ উঠল। ঘরের আলো নিভে গেল। তারার চিৎকার শোনা গেল।

তারপর—

আগুন।


তিয়াসা হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঘরে ফিরে এল।

তার দুই হাত কাঁপছে। কপালে ঘাম। ঘড়িতে রাত দুটো উনিশ।

আয়নার ভিতরে আবার তারার মুখ।

—সব মনে পড়ছে?

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

—আমি সেদিন বাড়ি ফিরেছিলাম।

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আগুন লাগল কীভাবে?

তারার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—আমি জানি না।

—তুই জানিস না?

—আগুন লাগার পর আমি আর কিছু মনে করতে পারি না। শুধু মনে আছে, তুই আমাকে টেনে ধরেছিলি। তারপর একটা দরজা খুলে গিয়েছিল।

—কোন দরজা?

—যেটা আয়নার পিছনে।

তিয়াসা কাচের দিকে তাকাল।

—তুই কি ওই দরজার ভিতরে গিয়েছিলি?

তারা উত্তর দিল না।

তার বদলে আয়নার গভীরে একটি দৃশ্য ফুটে উঠল। ধোঁয়ায় ঢাকা ঘর। মেঝেতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট লাল ফিতে। জানলার পাশে একটি ছায়া দাঁড়িয়ে।

ছায়াটির মুখ নেই।

তিয়াসা কাচের দিকে এগিয়ে গেল।

—ওটা কে?

তারার চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

—ওর কথা বলিস না।

—কেন?

—ও আমাদের মতো নয়।

—তাহলে কী?

আয়নার মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—

—ও সেই মানুষ, যে কারও মুখ ধার করতে পারে। যে কোনও স্মৃতির ভিতরে ঢুকতে পারে। ওর নিজের কোনও মুখ নেই, কোনও নাম নেই। আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের মুখ ব্যবহার করে ও আমাদের কাছে আসে।

তিয়াসা ঠান্ডা হয়ে গেল।

—তাহলে তুইও কি ওর তৈরি?

তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “আমি জানি না।”

এই প্রথম তিয়াসার মনে হল, আয়নার ভিতরের মেয়েটিও ভয় পায়।


পরদিন সকালে তিয়াসা আবার নিবারণবাবুর দোকানে গেল।

বৃদ্ধ তাকে দেখে যেন আগেই বুঝে ফেললেন, রাতটা তার ভালো কাটেনি।

—তুই দেখেছিস, তাই না?

তিয়াসা চমকে উঠল।

—আপনি জানতেন?

—আমি জানতাম, কোনও দিন এই দিন আসবে।

নিবারণবাবু দোকানের ভিতরের ঘর থেকে একটি কাপড়ে মোড়া বই বের করলেন। বইটির মলাট ছেঁড়া। নাম প্রায় মুছে গিয়েছে। শুধু কয়েকটি শব্দ পড়া যায়—

প্রতিচ্ছবি ও অদৃশ্য দ্বার।

—এই বইটা তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোমাকে কখনও দিতে হলে যেন পুরোটা পড়তে বলি।

তিয়াসা বইটি খুলল।

ভিতরের পাতায় পুরোনো বাংলা অক্ষরে লেখা—

“কিছু প্রতিফলক বস্তু মানুষের মুখের সঙ্গে সঙ্গে তার আকাঙ্ক্ষার ছায়াও ধারণ করে। কোনও কোনও সময় গভীর শোক, দীর্ঘদিনের অপরাধবোধ কিংবা অসম্পূর্ণ বিদায় সেই ছায়াকে পৃথক সত্তার রূপ দেয়। তখন প্রতিচ্ছবি আর নিছক প্রতিচ্ছবি থাকে না। সে কথা বলে, অপেক্ষা করে, কখনও কখনও পথও খুলে দেয়।”

তিয়াসা পড়তে লাগল।

বইতে এমন কিছু আয়নার কথা লেখা ছিল, যেগুলোকে বলা হত ‘স্মৃতিদ্বার’। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই আয়নাগুলোর সামনে দীর্ঘ সময় ধরে মৃত মানুষকে স্মরণ করলে প্রতিচ্ছবির মধ্যে অন্য এক জগৎ তৈরি হতে পারে। সেই জগতে হারানো মানুষের চেহারা দেখা যায়, কিন্তু তারা জীবিত মানুষের মতো স্বাধীন নয়। তাদের মুখ, কথা, আচরণ—সবই স্মৃতি আর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

কিন্তু বইয়ের পরের অংশে সতর্কবার্তা ছিল।

“স্মৃতিদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করলে মানুষ কখনও নিজের স্মৃতি হারায়, কখনও নিজের পরিচয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক হল সেই সত্তা, যার কোনও নিজস্ব প্রতিচ্ছবি নেই। সে অন্যের মুখ ব্যবহার করে। সে মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেয়—হারানো মানুষকে ফিরিয়ে দেবে। বিনিময়ে সে চায় জীবিত মানুষের স্থান।”

তিয়াসা বইটা বন্ধ করল।

—জীবিত মানুষের স্থান মানে?

নিবারণবাবু বললেন, “আমি জানি না। হয়তো স্মৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখা। হয়তো অন্য কিছু। কিন্তু তোমার বাবা এই আয়নাটা নিয়ে ভয় পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আগুনের রাতে যা ঘটেছিল, সেটা দুর্ঘটনা হলেও তার ভিতরে অন্য কিছু জড়িয়ে ছিল।”

—বাবা কি জানতেন, তারা বেঁচে আছে?

—না। তিনি জানতেন না তারা কোথায়। কিন্তু মৃত্যুর পরে যে দেহ পাওয়া গিয়েছিল, সেটি তারার ছিল কি না—সে বিষয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেননি।

তিয়াসার হাত থেকে বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

—কী বললেন?

—তোমার বাবা বলেছিলেন, আগুনের পর দেহটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছিল। তখন তোমাদের পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। তদন্তও বেশিদিন এগোয়নি।

—তাহলে আমার বোন…

—আমি বলছি না যে সে বেঁচে আছে। আমি শুধু বলছি, তোমাদের কাছে যে সত্যিটা পৌঁছেছিল, সেটাই হয়তো সম্পূর্ণ সত্যি ছিল না।

তিয়াসা কোনও কথা বলতে পারল না।

দীর্ঘ বারো বছর ধরে সে নিজের বোনকে মৃত বলে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন সেই বিশ্বাসের ভিতটাই কেঁপে উঠেছে।

নিবারণবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “একটা কথা মনে রাখিস। আয়নার ভিতরে যা দেখবি, তাকে প্রমাণ বলে ধরে নিবি না। সত্যি জানতে হলে বাস্তবের প্রমাণও খুঁজতে হবে।”

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

—আমি কী করব?

বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন, “আগুনের রাতের নথি খুঁজে বের কর। দমকলের রিপোর্ট, পুলিশের কাগজ, হাসপাতালের নথি—যা পাওয়া যায়। আর তোর মাকে আবার জিজ্ঞেস কর। তবে এবার শুধু প্রশ্ন করিস না। তাঁকে বলিস, তুই তাঁকে দোষ দিতে আসিসনি।”


সেই বিকেলেই তিয়াসা মায়ের কাছে গেল।

মা তখন গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। দরজা খুলে মেয়েকে দেখে অবাক হলেন।

—হঠাৎ এলি যে?

তিয়াসা মায়ের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেল।

—মা, আজ তোমাকে সব বলতে হবে।

মা চুপ করে রইলেন।

তিয়াসা বলল, “আমি তারাকে আয়নায় দেখছি।”

মায়ের মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।

তিনি চেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরলেন।

—কী বললি?

—প্রতিদিন রাত দুটো সতেরোয়। ও আমার সঙ্গে কথা বলে। সেদিন কী হয়েছিল, সেটা জানতে চাইছে।

মা উঠে দাঁড়ালেন।

—তুই আর ওই আয়নার সামনে দাঁড়াবি না!

—কেন?

—কারণ ওটা তোর বোন নয়!

—তাহলে তুমি কাকে দেখতে?

মা স্থির হয়ে গেলেন।

তিয়াসা বুঝতে পারল, প্রশ্নটা ঠিক জায়গায় লেগেছে।

—বাবার চিঠি পড়েছি,—সে বলল।—তুমি নাকি তোমার মৃত দিদিকে আয়নায় দেখতে পেতে।

মা দুহাতে মুখ ঢাকলেন।

অনেকক্ষণ পরে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, ওটা শুধু আমার কল্পনা।”

—কী দেখেছিলে তুমি?

মা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।

—তোর মাসি যখন মারা যায়, তখন আমার বয়স মাত্র বারো। অসুখে মারা গিয়েছিল। শেষ দিনগুলোতে আমি ওর পাশে বসে থাকতাম। ও বলেছিল, বড় হলে আমাকে একটা লাল শাড়ি কিনে দেবে। কিন্তু ও আর বড় হয়নি।

মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।

—তোর বাবা যখন সেই পুরোনো আয়নাটা বাড়িতে আনল, প্রথম কয়েক মাস কিছুই হয়নি। তারপর একদিন রাতে আমি আয়নায় আমার দিদিকে দেখতে পেলাম। সে আগের মতোই হাসছিল। বলল, সে আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু পরে বারবার দেখলাম।

—তুমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে?

—হ্যাঁ। ও আমার কথা শুনত। আমার কষ্ট বুঝত। আমি তোকে আর তারাকে নিয়ে চিন্তা করলে ও আমাকে সান্ত্বনা দিত।

মা থামলেন।

—কিন্তু একদিন ও আমাকে বলল, আমি যদি ওকে ছুঁতে চাই, তাহলে আমাকে আয়নার সামনে একা দাঁড়াতে হবে। আমি ভয় পেয়ে যাই। তারপর আর কোনও দিন ওর কথা শুনিনি।

—তারার সঙ্গে কী হয়েছিল?

মা চোখ বন্ধ করলেন।

—তারা একদিন আমাকে বলেছিল, আয়নার ভিতরে আর-একটি তারা আছে। আমি ওকে বকেছিলাম। ভেবেছিলাম, ও ছোট বলে কল্পনা করছে। আগুনের আগের রাতে সে আমাকে বলেছিল, “মা, আয়নার মেয়েটা দিদিকে চায়।” আমি রাগ করে বলেছিলাম, “এসব কথা আর শুনব না।”

মা কাঁদতে লাগলেন।

—আমি যদি সেদিন ওর কথা শুনতাম!

তিয়াসা মায়ের হাত ধরল।

—মা, তুমি জানতেই না কী ঘটতে পারে।

—কিন্তু আমি জানতাম, ওই আয়নায় কিছু একটা আছে। তবু আমি ওটাকে ঘরে রেখেছিলাম। কারণ আমি আমার দিদিকে দেখতে চাইতাম।

তিয়াসা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমরা সবাই কাউকে না কাউকে ফিরে পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আমাদের দোষ নয়।”

মা মেয়ের দিকে তাকালেন।

—তুই কি আয়নার দরজা খুলবি?

তিয়াসা উত্তর দিল না।

মা তার হাত আরও শক্ত করে ধরলেন।

—খুলিস না, মা। আমি আমার দিদিকে হারিয়েছি। তোর বাবাকেও হারিয়েছি। এবার তোকে হারাতে পারব না।

তিয়াসা মাকে জড়িয়ে ধরল।

—আমি সাবধানে থাকব।

কিন্তু সে জানত, সাবধান থাকা আর সত্যি থেকে পালিয়ে থাকা এক কথা নয়।


সেই রাতেই তিয়াসা পুরোনো বাড়ির আগুনের নথি খুঁজতে শুরু করল।

বাবার আলমারিতে কয়েকটি ফাইল ছিল। বেশিরভাগই পুরোনো বিল, চাকরির কাগজ আর বাড়ির দলিল। শেষের দিকে একটি বাদামি ফোল্ডার পেল সে। তার ওপরে লেখা—

সপ্তমীর রাত — ব্যক্তিগত নথি।

ফোল্ডারের ভিতরে দমকলের রিপোর্টের অনুলিপি, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের কাগজ এবং একটি পুরোনো ছবি।

ছবিটা দেখে তিয়াসার বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।

হাওড়ার সেই বাড়ি। আগুনের পরের সকাল। পোড়া দেওয়াল, ভাঙা জানলা, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাবা।

আর বাড়ির দোতলার জানলায়—একটি মেয়ে।

ছবির অন্য সবাই মাটিতে দাঁড়িয়ে। জানলার কাচ পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। তবু সেই কালো কাচের পিছনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটি ছোট্ট মুখ।

তারার মুখ।

তিয়াসা ছবিটা উল্টে দেখল।

পিছনে বাবার হাতের লেখা—

“ছবিটি তোলার সময় জানলাটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।”

তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

ছবির তারাটি কি সত্যিই তারা?

নাকি আয়নার ভিতরের সেই সত্তা?

হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এল। অচেনা নম্বর।

আপনি কি তিয়াসা সেন?

সে উত্তর দিল, হ্যাঁ। কে বলছেন?

কিছুক্ষণ পরে উত্তর এল—

আমি সেই দমকলকর্মী, যে আপনার বাড়ির আগুনের রাতে প্রথম ঘরে ঢুকেছিল। এত বছর পরে আপনাকে একটা কথা জানানো দরকার।

তিয়াসার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

কী কথা?

উত্তর আসতে কয়েক মিনিট লাগল।

তারপর—

আমরা ঘরের ভিতরে দুটি শিশুর পায়ের ছাপ পেয়েছিলাম। কিন্তু দেহ উদ্ধার হয়েছিল মাত্র একটি।

তিয়াসা মোবাইলটা শক্ত করে ধরে রইল।

আরও একটি বার্তা এল।

আর একটা কথা। আগুন নেভানোর পর বাড়ির ভিতরে যে আয়নাটা ছিল, তার সামনে মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। সেই ছাপগুলো ঘরের বাইরে যায়নি। সবগুলো গিয়ে শেষ হয়েছিল আয়নার সামনে।

তিয়াসা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

ঘরের অন্য প্রান্তে আয়নাটা দাঁড়িয়ে আছে।

কাচের উপর কোনও প্রতিচ্ছবি নেই।

না তিয়াসা, না ঘর, না আলো।

শুধু গভীর অন্ধকার।

তারপর সেই অন্ধকারের মধ্যে একটি ছোট্ট হাত দেখা গেল।

হাতটা কাচের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠল।

আঙুলের ডগায় লাল ফিতে বাঁধা।

তারার সেই লাল ফিতে—যেটা তিয়াসা স্মৃতির মধ্যে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছিল।

আয়নার ভিতর থেকে এবার তারার গলা নয়, অন্য একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

—তিয়াসা, দরজাটা খোলার সময় হয়েছে।

—তুমি কে?

কণ্ঠস্বরটা হাসল।

—যাকে তুই বারো বছর ধরে খুঁজছিস।

—তুমি কি তারা?

—আমি তারা।

এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল—

—আবার আমি তারা নই।

আয়নার ভিতরের অন্ধকারে ধীরে ধীরে একটি মুখ ফুটে উঠল।

সেই মুখ তিয়াসার নিজের।

কিন্তু তার চোখের নীচে কালো দাগ, ঠোঁটের কোণে পোড়া ক্ষত, আর কপালের এক পাশে রক্তের সরু রেখা।

প্রতিবিম্বটি ঠোঁট নেড়ে বলল—

“দিদি, এবার তোর জায়গায় আমি বাইরে আসব।”

ঘড়িতে রাত দুটো সতেরো।

আয়নার কাচে প্রথম ফাটল ধরল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : আয়নার ওপারে যে মেয়েটি – (প্রথম পর্ব: রাত দুটো সতেরোর প্রতিচ্ছবি)।

কলকাতার উত্তর শহরতলির একটি পুরোনো বাড়িতে সেদিন রাত দুটো সতেরো মিনিটে প্রথমবার আয়নাটা হেসে উঠেছিল।

হাসিটা খুব মৃদু। যেন কেউ অনেকক্ষণ কেঁদে হঠাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটিয়েছে।

কিন্তু ঘরের মধ্যে তখন একা ছিল তিয়াসা।

আর সে মোটেই হাসছিল না।

বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল সে। পরদিন সকালে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় জমা দিতে হবে নতুন প্রচারাভিযানের নকশা। কাজের চাপ এতটাই ছিল যে রাতের খাবার খাওয়ার কথাও তার মনে ছিল না। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটির দিকে তাকানোর সময়ও হয়নি।

হাসির শব্দটা শোনার পর সে মাথা তুলল।

ঘড়িতে রাত দুটো সতেরো।

তিয়াসা প্রথমে ভেবেছিল, পাশের ঘরে মা হয়তো কোনও ভিডিও দেখছেন। কিন্তু মা তো গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন দুদিন আগে। এই ফ্ল্যাটে সে একাই আছে।

—কে?

কোনও উত্তর এল না।

তিয়াসা ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘুরে তাকাল।

আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব। এলোমেলো চুল, ক্লান্ত চোখ, কপালের পাশে ছোট্ট কালো তিল। সবই স্বাভাবিক।

তবু একটা জিনিস অস্বাভাবিক।

আয়নায় তার প্রতিবিম্বের ঠোঁটে হাসি লেগে আছে।

তিয়াসার নিজের মুখ গম্ভীর।

কিন্তু আয়নার মেয়েটি হাসছে।

প্রথমে তিয়াসা নড়তে পারল না। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে গেল। প্রতিবিম্বও উঠে দাঁড়াল। সে ডান হাত তুলল—প্রতিবিম্বও ডান হাত তুলল। সে মাথা বাঁ দিকে কাত করল—প্রতিবিম্বও তাই করল।

কিন্তু ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেল না।

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি কে?”

প্রতিবিম্বের ঠোঁট নড়ল।

শব্দ বেরোল না।

তারপর আয়নার ভেতর থেকে কাচে কুয়াশা জমার মতো সাদা একটা দাগ ফুটে উঠল। সেই দাগের উপর ধীরে ধীরে কয়েকটি অক্ষর তৈরি হল।

আমাকে চিনতে পারছিস না?

তিয়াসার বুকের মধ্যে যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।

এই হাতের লেখা সে চেনে।

ছোটবেলায় স্কুলের খাতার শেষ পাতায়, জন্মদিনের কার্ডে, পুজোর ছুটিতে লেখা চিঠিতে—এই একই গোলগাল অক্ষর।

এই লেখা তার ছোট বোনের।

তারার।

যে বোন মারা গিয়েছিল বারো বছর আগে।


তিয়াসা তখন ষোলো। তারা মাত্র এগারো।

তাদের বাড়ি ছিল হাওড়ার এক পুরোনো পাড়ায়। বাবা রেলকর্মী, মা স্কুলশিক্ষিকা। সংসারে খুব বেশি বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু দুই বোনের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। তারা ছিল চঞ্চল, দুষ্টু, সারাক্ষণ কথা বলত। তিয়াসা ছিল শান্ত, পড়াশোনায় ভালো, নিজের জগতে ডুবে থাকা মেয়ে।

তারা প্রায়ই বলত, “দিদি, তুই বড় হয়ে গেলে আমাকে ভুলে যাবি না তো?”

তিয়াসা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিত, “কী যে বলিস! একই বাড়িতে থাকি, তোকে ভুলব কী করে?”

তারা তখন গম্ভীর মুখে বলত, “সবাই তো এক বাড়িতে থাকে না। একদিন সবাই আলাদা হয়ে যায়।”

তখন এই কথার অর্থ বুঝত না তিয়াসা।

বারো বছর আগে, দুর্গাপুজোর সপ্তমীর রাতে, তাদের বাড়িতে আগুন লেগেছিল।

আগুনের কারণ নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। রান্নাঘরের পুরোনো বৈদ্যুতিক তার থেকে শর্ট সার্কিট হয়েছিল বলে দমকলের রিপোর্টে লেখা ছিল। তিয়াসা সেদিন বাড়ির বাইরে ছিল—বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল। মা-বাবা ছিলেন আত্মীয়ের বাড়িতে। বাড়িতে একা ছিল তারা।

আগুন নেভানোর পর তারাকে আর জীবিত পাওয়া যায়নি।

তারার ঘরের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা আয়নাটা অবশ্য অক্ষত ছিল।

আশ্চর্যের বিষয়, আগুনে ঘরের প্রায় সবকিছু পুড়ে গেলেও আয়নার কাচে কোনও আঁচড় পড়েনি। শুধু তার কাঠের ফ্রেমের নীচে কালো দাগ পড়েছিল।

সেই আয়নাটাই পরে তাদের নতুন বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন মা।

তিয়াসা বহুবার বলেছিল, “ওটা ফেলে দাও। ওটা দেখলেই আমার সব মনে পড়ে।”

মা শুধু বলেছিলেন, “তোর বোনের শেষ জিনিস। ফেলে দিতে পারব না।”

তিয়াসা আর জোর করেনি।

কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিল।

এত বছর পরে, কলকাতার নতুন ফ্ল্যাটে সেই আয়নাটি আবার তার সামনে দাঁড়িয়ে।

আর তার ভিতরে হাসছে মৃত বোন।


তিয়াসা হাত বাড়িয়ে আয়নায় লেখা শব্দগুলো ছুঁতে গেল।

আঙুল কাচে লাগতেই একটা ঠান্ডা স্রোত তার হাত বেয়ে কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল। সে চমকে হাত সরিয়ে নিল।

আয়নার মেয়েটি এবার ঠোঁট নাড়ল।

“দিদি।”

এইবার শব্দ শোনা গেল।

স্পষ্ট, পরিচিত, একেবারে তারার কণ্ঠস্বর।

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

—তুই… তুই সত্যি?

আয়নার মেয়েটি মাথা নাড়ল।

—আমি তোকে কত দিন ধরে ডাকছি।

—কোথায় ছিলি তুই?

প্রতিবিম্বের মুখ থেকে হাসি মুছে গেল।

—এইখানে।

—আয়নার ভিতরে?

—না। তুই যেখানেই তাকাস, আমি সেখানেই আছি। তুই শুধু দেখতে চাইতিস না।

তিয়াসা পিছিয়ে এল।

—এটা সম্ভব নয়। তুই মারা গিয়েছিস।

—তুই কি নিজের চোখে আমাকে মরতে দেখেছিলি?

প্রশ্নটা শুনে তিয়াসা থমকে গেল।

না। সে তারাকে মরতে দেখেনি। আগুনের পরে পুলিশ তাকে জানিয়েছিল, ঘরের ভিতর থেকে একটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। পরে শনাক্তকরণের জন্য তাকে ডাকা হয়নি। মা-বাবাই সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন। তিয়াসা শুধু জানত, তার বোন আর নেই।

কিন্তু সে কি কখনও সত্যিটা জানতে চেয়েছিল?

চেয়েছিল।

প্রথম কয়েক মাস সে বারবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তারাকে কোথায় পাওয়া গিয়েছিল, শেষ মুহূর্তে সে কী বলেছিল, আগুন লাগার সময় সে কোথায় ছিল। মা প্রতিবার কেঁদে ফেলতেন। বাবা রেগে যেতেন। একসময় সবাই তাকে বলেছিল, পুরোনো কথা ভুলে যেতে।

তারপর তিয়াসা সত্যিই প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছিল।

কিন্তু ভুলতে পারেনি।

—তুই আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস,—সে বলল।

প্রতিবিম্ব মাথা নাড়ল।

—আমি তোকে ভয় দেখাতে আসিনি। তোকে একটা কথা বলতে এসেছি।

—কী কথা?

আয়নার কাচের ওপরে এবার নতুন অক্ষর ফুটে উঠল।

সেদিন আগুন লাগেনি।

তিয়াসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর শব্দগুলো মিলিয়ে গেল। প্রতিবিম্বের মুখ আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কিছুই ঘটেনি।

ঘড়িতে তখন দুটো আঠারো।

তিয়াসা সারা রাত আর ঘুমোতে পারেনি।


সকালে সে প্রথমেই মাকে ফোন করল।

—মা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব।

ওপাশ থেকে মায়ের ক্লান্ত গলা শোনা গেল।

—কী হয়েছে?

—তারার মৃত্যুর দিনটা তোমার মনে আছে?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

—এসব কথা আবার কেন?

—আমাকে সত্যিটা বলো।

—কোন সত্যি?

—আগুন কীভাবে লেগেছিল?

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তিয়াসা, এত বছর পরে আবার এসব…

—মা, প্লিজ। আমি আর পারছি না। আমি জানতে চাই, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল।

ওপাশে একটা অস্পষ্ট শব্দ হল। মনে হল, মা ফোনটা হাতে নিয়ে কোথাও বসে পড়েছেন।

তারপর বললেন, “আগুন লেগেছিল। তোর বোন বেরোতে পারেনি। এই তো সব জানিস।”

—তারাকে কি তুমি শেষবার দেখেছিলে?

মা উত্তর দিলেন না।

—মা?

—আমাকে এখন ফোন রাখতে হবে।

ফোন কেটে গেল।

তিয়াসা কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পুরোনো জিনিসপত্র রাখার বাক্সটা বের করল। সেখানে তারার কয়েকটি ছবি, স্কুলের পরিচয়পত্র, পুরোনো ডায়েরি এবং একটি ছোট্ট নীল খাতা ছিল।

খাতার প্রথম পাতায় লেখা—

আমার গোপন কথা। কেউ পড়বি না।

তিয়াসা জানত, তারা এই খাতায় প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখত। কিন্তু বোনের মৃত্যুর পরে সে আর খাতাটা খোলেনি।

কাঁপা হাতে পাতা উল্টাতে লাগল।

প্রথম দিকের পাতায় স্কুলের কথা, বন্ধুর কথা, পছন্দের খাবার, পুজোর জামার বর্ণনা। তারপর একটি পাতায় এসে তার চোখ আটকে গেল।

তারিখ—দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী, আগুন লাগার এক দিন আগে।

“আজ আবার আয়নার মেয়েটাকে দেখলাম। সে আমার মতো দেখতে, কিন্তু আমার মতো নয়। আমি হাত তুললে সেও হাত তোলে না। সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। গতকাল আমাকে বলেছে, আমি নাকি একদিন ওর জায়গায় চলে যাব। আমি দিদিকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দিদি হাসবে।”

পরের পাতায় লেখা—

“আজ আয়নার মেয়েটা আমাকে একটা কথা বলেছে। বলেছে, আমাদের বাড়িতে একটা দরজা আছে, যেটা কেউ দেখতে পায় না। দরজাটা নাকি আয়নার পিছনে। আমি যদি দরজা খুলতে পারি, তাহলে আমি এমন একজনের সঙ্গে দেখা করতে পারব, যাকে সবাই হারিয়ে ফেলেছে।”

তারপর কয়েকটি পাতা ফাঁকা।

শেষের দিকে, আগুন লাগার দিনের তারিখে লেখা মাত্র দুটি লাইন—

আজ দিদি বাড়ি ফিরবে।

আমি ওকে সব বলব।

তিয়াসার হাত থেকে খাতাটা পড়ে গেল।

তারার মৃত্যুর আগের দিন সে সত্যিই বাড়ি ফিরেছিল। কিন্তু বোনের সঙ্গে কথা বলার বদলে ঝগড়া করেছিল। তারা তার নতুন আঁকার খাতা নিয়ে কিছু বলেছিল, তিয়াসা রেগে গিয়ে বলেছিল, “সব সময় আমার জিনিসে হাত দিবি না!”

তারপর সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

এটাই ছিল তারার সঙ্গে শেষ কথোপকথন।

তিয়াসা এত বছর ধরে সেই ঝগড়াটাকেই নিজের অপরাধ মনে করে এসেছে। তার মনে হত, যদি সেদিন সে একটু ভালোভাবে কথা বলত, যদি বোনকে জড়িয়ে ধরত, যদি বলত যে সে তাকে ভালোবাসে—তাহলে হয়তো সব বদলে যেত।

কিন্তু ডায়েরির কথাগুলো অন্য এক অন্ধকারের দিকে ইঙ্গিত করছে।

আয়নার মেয়েটি কে ছিল?

আর তারা কী বলতে চেয়েছিল?


সেদিন সন্ধ্যায় তিয়াসা অফিস থেকে ফেরার পথে একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকল। ছোটবেলায় বাবা তাকে এখানে নিয়ে আসতেন। দোকানের মালিক ছিলেন নিবারণবাবু, বয়স আশির কাছাকাছি। এখনও দোকানের এক কোণে বসে পুরোনো বইয়ের ধুলো ঝাড়েন।

তিয়াসা তারার ডায়েরির কথা সরাসরি বলল না। শুধু জিজ্ঞেস করল, “কাকু, আপনি কি কখনও শুনেছেন, আয়নার মধ্যে অন্য কাউকে দেখা যায়?”

নিবারণবাবু চশমার উপর দিয়ে তাকালেন।

—কেন জিজ্ঞেস করছ?

—এমনিই।

—আয়না নিয়ে কৌতূহল ভালো নয়, মা। বিশেষ করে পুরোনো আয়না।

—কেন?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দোকানের দরজা বন্ধ করে দিলেন।

—তোমাদের হাওড়ার বাড়ির কথা মনে আছে? আগুন লাগার আগের কথা?

তিয়াসার বুক ধক করে উঠল।

—আপনি কী করে জানেন?

—তোমার বাবা আমার কাছে একবার এসেছিলেন। তোমাদের বাড়িতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল। তিনি একটা বই খুঁজছিলেন—আয়না আর লোকবিশ্বাস নিয়ে লেখা পুরোনো বই।

—কী ঘটনা?

নিবারণবাবু ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার বাবা বলেছিলেন, তোমার ছোট বোন নাকি মাঝরাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, বাচ্চাদের কল্পনা। কিন্তু একদিন তিনিও দেখেছিলেন।”

তিয়াসা ঠান্ডা হয়ে গেল।

—কী দেখেছিলেন?

—তোমার বোন ঘুমিয়ে ছিল। অথচ আয়নায় তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। আর তার পাশে আর-একটি মেয়ে। দুজনের মুখ এক। তোমার বাবা নাকি সেই দৃশ্য দেখে আয়নাটা সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তোমার মা বাধা দিয়েছিলেন।

—কেন?

—তোমার মা বলেছিলেন, আয়নাটা তোমাদের বাড়িতে আসার পর থেকেই নাকি তিনি তাঁর মৃত দিদিকে দেখতে পান।

তিয়াসা অবাক হয়ে গেল।

তার মায়ের কোনও দিদি ছিল, যিনি ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন—এই কথা সে জানত। কিন্তু আয়নার সঙ্গে সেই সম্পর্কের কথা কোনও দিন শোনেনি।

নিবারণবাবু একটা পুরোনো খাতা বের করলেন।

—আমি তখন এই বিষয় নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছিলাম। লোকবিশ্বাসে বলা হয়, কিছু আয়না শুধু মুখ দেখায় না। মানুষ যা হারিয়েছে, তার প্রতিচ্ছবিও দেখায়। কিন্তু প্রতিচ্ছবি আর মানুষ এক জিনিস নয়। প্রতিচ্ছবি তোমার আকাঙ্ক্ষা জানে। তোমার দুর্বলতা জানে। তুমি কী শুনতে চাও, সেটাও জানে।

—তাহলে ওরা কি ভূত?

—আমি জানি না। তবে একটা কথা জানি—যে প্রতিচ্ছবি তোমাকে নিজের কাছে টেনে নিতে চায়, তাকে কখনও অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নেই।

তিয়াসা বেরিয়ে আসার সময় নিবারণবাবু তাকে থামালেন।

—আর একটা কথা। তোমাদের বাড়ির আগুনের ঘটনার পরে তোমার বাবা আমার কাছে আবার এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আয়নাটা আর কোনও দিন যেন কেউ না দেখে।

—তারপর?

—তারপর তিনি একটা খাম রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনও দিন যদি তুমি এসে তারার কথা জিজ্ঞেস করো, তখন যেন তোমাকে দিই।

বৃদ্ধ আলমারির ভিতর থেকে হলুদ হয়ে যাওয়া একটি খাম বের করলেন।

খামের ওপরে বাবার হাতের লেখা—

তিয়াসার জন্য। সত্য জানার সময় হলে।

তিয়াসার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

বাবা মারা গিয়েছেন আট বছর আগে। তিনি কি জানতেন, একদিন এই প্রশ্ন ফিরে আসবে?

সে খামটা নিয়ে বাড়ি ফিরল।


রাত দুটো সতেরো।

তিয়াসা আয়নার সামনে বসে আছে। আজ সে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। টেবিলের উপর বাবার খাম, তারার ডায়েরি, একটি টর্চ আর মোবাইল ফোন।

খাম খুলে সে চিঠিটা বের করল।

“তিয়াসা,

তুই যখন এই চিঠি পড়বি, হয়তো আমি আর থাকব না। কিছু কথা তোকে বলা উচিত ছিল। কিন্তু তোকে আর তোর মাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে আমি সত্যিটা লুকিয়েছি।

তোর বোনকে আমরা আগুনের মধ্যে হারাইনি—এ কথা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিন্তু আগুন লাগার আগে বাড়িতে যা ঘটেছিল, তা সাধারণ কিছু ছিল না।

তারার ঘরের আয়নায় আমরা এমন কিছু দেখেছিলাম, যা কোনও আয়নায় দেখা সম্ভব নয়। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। পরে নিজের চোখে দেখেছি। আয়নার ভিতরে দাঁড়িয়ে ছিল আর-একটি তারা। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আসল তারা তখন আমার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

আমি আয়নাটা ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার মা আমাকে থামিয়েছিল। সে বলেছিল, আয়নার ভিতরের মেয়েটি নাকি তার মৃত দিদির কণ্ঠে কথা বলে। সে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, একদিন তার দিদিকে ফিরিয়ে দেবে।

আমি জানি না, সেই প্রতিশ্রুতি সত্যি ছিল কি না। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, আয়নাটা আমাদের প্রত্যেকের এমন কিছু দেখায়, যা আমরা ফিরে পেতে চাই।

তারার মৃত্যুর রাতে আমি বাড়িতে ছিলাম না। ফিরে এসে আগুন দেখেছি। তারপর থেকে তোমার মা আর কোনও দিন স্বাভাবিক হননি। আমিও নই।

একটা কথা মনে রাখিস। যদি কোনও দিন আয়নায় তারাকে দেখতে পাস, তাকে প্রশ্ন করিস না, সে কোথায় ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করিস, সে তোকে কী করতে বলছে।

কারণ যে ভালোবাসা তোকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে নিতে চায়, তা ভালোবাসা নয়।

—বাবা।”

চিঠিটা পড়ে তিয়াসা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর আয়নার দিকে তাকাল।

কাচে ধীরে ধীরে কুয়াশা জমছে।

অক্ষর ফুটে উঠল—

দিদি, তুই কি বাবার চিঠি পড়েছিস?

তিয়াসা কোনও উত্তর দিল না।

আরও কয়েকটি শব্দ ফুটে উঠল।

আমি তোকে সব বলতে চাই।

তিয়াসা গভীর শ্বাস নিল।

—কী বলতে চাস?

প্রতিবিম্বের মুখ দেখা গেল। তারার মুখ। সেই ছোটবেলার মুখ, যে হাসতে হাসতে দিদির বিছানায় লাফিয়ে উঠত, যে গোপনে চকোলেট লুকিয়ে রাখত, যে বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা বানাত।

কিন্তু চোখ দুটো যেন অন্য কারও।

—সেদিন আমি একা ছিলাম না, দিদি।

তিয়াসার গলা শুকিয়ে গেল।

—তাহলে কে ছিল?

তারার প্রতিবিম্ব আয়নার কাচে হাত রাখল।

—তুই।

তিয়াসা উঠে দাঁড়াল।

—মিথ্যে কথা!

—তুই বাড়ি ফিরেছিলি। তুই আমার ঘরে এসেছিলি। তুই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলি।

—আমি তো সেদিন ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম!

—তুই গিয়েছিলি। আবার ফিরেও এসেছিলি।

তিয়াসার মাথার মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি মারল। বহু বছরের স্মৃতির ভিতর একটা দরজা খুলতে চাইছে। সে মনে করার চেষ্টা করল—সপ্তমীর রাত, বাড়ির সামনে আগুনের লাল আলো, লোকজনের চিৎকার, পুলিশের গাড়ি।

কিন্তু তার আগের কিছুই স্পষ্ট নয়।

সে কি সত্যিই বাড়ি ফিরেছিল?

তারার প্রতিবিম্ব এবার হাসল না।

—দিদি, তুই যদি সত্যিটা জানতে চাস, কাল রাত দুটো সতেরোয় আয়নার সামনে দাঁড়াবি। ঘরের আলো নিভিয়ে দিবি। আর পিছনে তাকাবি না।

—কেন?

—কারণ দরজাটা খুলে যাবে।

—কোন দরজা?

প্রতিবিম্বের পিছনে অন্ধকার জমাট বাঁধতে লাগল। আয়নার ভিতরের ঘরটা যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সেখানে আর ড্রেসিং টেবিল নেই, বিছানা নেই, জানলা নেই। শুধু একটা লম্বা করিডর। করিডরের শেষে একটি বন্ধ দরজা।

দরজার নীচ দিয়ে কমলা রঙের আলো বেরিয়ে আসছে।

আগুনের মতো আলো।

তারার কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলল—

“দিদি, তুই যদি দরজাটা না খোলিস, তাহলে আমি কোনও দিন জানতে পারব না, সেদিন সত্যিই কী হয়েছিল।”

তিয়াসা কাচের দিকে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে সে অনুভব করল, কেউ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করছে।

কণ্ঠস্বরটা তারার নয়।

বরং অনেক গভীর, অনেক পুরোনো।

“তিয়াসা… তোর বোন তোকে সব বলেনি।”

তারপর আয়নার ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

ঘড়িতে রাত দুটো সতেরো।

আর আয়নার ওপারে বন্ধ দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।

চলবে…

Share This