Categories
বিবিধ

বদ্ধ ট্যাঙ্কে বিষাক্ত গ্যাসের আশঙ্কা, মোহনপুরে এক পরিবারের তিনজন-সহ চারজনের মৃত্যু।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:-একজনকে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লেন একে একে। শেষ পর্যন্ত সেপটিক ট্যাঙ্কের ভিতরে প্রাণ হারালেন এক মহিলা-সহ চারজন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের মোহনপুর থানার আঁতলা এলাকায়। মৃতদের মধ্যে তিনজন একই পরিবারের সদস্য বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, ট্যাঙ্কের ভিতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরও এক প্রতিবেশী যুবক। তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে মোহনপুর থানার অন্তর্গত আঁতলা এলাকার একটি বাড়িতে সেপটিক ট্যাঙ্কের কাজ চলছিল। কাজের প্রয়োজনেই প্রথমে এক ব্যক্তি ট্যাঙ্কের ভিতরে নামেন। কিন্তু ট্যাঙ্কের ভিতরে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে। আচমকা তাঁর এমন পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসার জন্য তৎপরতা শুরু হয়।
কিন্তু বিপদের গভীরতা বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায় আরও বড় বিপত্তি। ভিতরে আটকে পড়া ব্যক্তিকে বাঁচানোর তাগিদে ট্যাঙ্কের ভিতরে নামেন তাঁর বোন-সহ আরও দু’জন যুবক। উদ্দেশ্য ছিল, যেভাবেই হোক প্রিয়জনকে উদ্ধার করে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসা। কিন্তু যাঁকে বাঁচাতে তাঁরা এগিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্ধার প্রচেষ্টাই তাঁদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
অভিযোগ, ট্যাঙ্কের ভিতরে প্রবেশ করার পর একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন আরও তিনজন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্থানীয়দের দাবি, বদ্ধ ট্যাঙ্কের ভিতরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বা ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাবে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। শেষ পর্যন্ত চারজনেরই মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
এই দিকে, ট্যাঙ্কের ভিতরে একের পর এক ব্যক্তির অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন এক প্রতিবেশী যুবক। বিপদের কথা চিন্তা না করেই তিনি উদ্ধারের চেষ্টা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠায় স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে মোহনপুরের বাগদা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় মোহনপুর থানার পুলিশ। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, কী পরিস্থিতিতে একের পর এক ব্যক্তি সেপটিক ট্যাঙ্কের ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং ট্যাঙ্কের ভিতরে ঠিক কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বদ্ধ জায়গায় অক্সিজেনের ঘাটতি কিংবা বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। একটি দুর্ঘটনা, আর তাতেই শেষ হয়ে গেল চারটি প্রাণ!
এই মর্মান্তিক ঘটনার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিক হল, একজনকে বাঁচানোর জন্যই একে একে বিপদের মুখে এগিয়ে গিয়েছিলেন অন্যরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই আর নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল না। মৃতদের মধ্যে তিনজন একই পরিবারের সদস্য হওয়ায় শোকের মাত্রা আরও বেড়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতরা। গোটা এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের আবহ।
মোহনপুরের আঁতলার এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল সেপটিক ট্যাঙ্কের মতো বদ্ধ জায়গায় কাজ করার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে চলার গুরুত্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপটিক ট্যাঙ্কের ভিতরে অক্সিজেনের অভাব এবং হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভিতরে প্রবেশ করার আগে বিপদের মাত্রা বোঝা সম্ভব হয় না। ফলে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে উদ্ধারের জন্য কোনওরকম সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া অন্য কেউ ভিতরে প্রবেশ করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।
তাই সেপটিক ট্যাঙ্ক বা অন্য কোনও বদ্ধ জায়গায় প্রবেশের আগে প্রশিক্ষিত কর্মীর সাহায্য নেওয়া, গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা, পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও উপযুক্ত সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ভিতরে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সরাসরি ভিতরে নেমে পড়াও বিপজ্জনক হতে পারে। তবে আঁতলার এই দুর্ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না, ট্যাঙ্কের ভিতরে কী ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে একের পর এক চারজনের মৃত্যু হল, সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
আপাতত পুলিশি তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে, একই পরিবারের তিনজন-সহ মোট চারজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা আঁতলা এলাকা। একজনকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা শেষ পর্যন্ত চারটি প্রাণ কেড়ে নিল—মোহনপুরের এই ঘটনা দীর্ঘদিন মনে থাকবে এলাকাবাসীর।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না (তৃতীয় পর্ব: শেষ দরজার ওপারে)

শেষ পর্ব

“যে জন্মেছিল, সে ফিরবে। যে তৈরি হয়েছিল, সে মুছে যাবে।”

নীলকুঠির প্রতিটি দরজায় একই বাক্য জ্বলজ্বল করছিল। দেয়ালের চুন খসে পড়ছিল, ছাদের কাঠ ভেঙে আসছিল, আর উত্তর জানালার ওপারে নদী যেন উল্টো দিকে বয়ে চলেছিল। তবু অদ্বৈতের মনে হচ্ছিল, বাড়িটা ভাঙছে না—বরং তার চারপাশের পৃথিবীটাকেই ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে।

মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে অরিন্দম নিজের মুখ ঢেকে রেখেছিল। তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে আসছিল।

“দাদা, আমাকে বাঁচা।”

অদ্বৈত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এই প্রথম অরিন্দম তাকে দাদা বলে ডাকল। অথচ সেই ডাকের মধ্যে কোনও স্নেহের চেয়ে বেশি ছিল আতঙ্ক, যেন এতদিন ধরে সে যে সত্যিটাকে আড়াল করে রেখেছিল, তা এখন তার নিজের শরীরকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

“তুই আসলে কে, অরিন্দম?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।

অরিন্দম মুখ তুলল। তার চোখ দুটো আবার নীল হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই নীলের মধ্যে অদ্ভুত এক শূন্যতা।

“আমি তোর ভাই।”

“তাহলে এতক্ষণ বলছিলি, তুই আমার স্মৃতি থেকে তৈরি!”

“দুটো কথাই সত্যি হতে পারে।”

“একসঙ্গে কীভাবে?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ আমাদের বাবা-মা যা লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা শুধু আমাদের জন্মের ঘটনা নয়। তাঁরা আমাদের জন্মের আগেই আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিতে চেয়েছিলেন।”

“কে ঠিক করেছিল?”

“বাবা।”

অদ্বৈত তার সামনে বসে পড়ল।

“সব খুলে বল। আর একটাও মিথ্যে বলবি না।”

অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“অনেক বছর আগে, এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তোর জন্মেরও আগে। তোর মা তখন অন্তঃসত্ত্বা। বাবা নীলকুঠির পুরোনো দলিলপত্র ঘাঁটতে গিয়ে একটি ডায়েরি পেয়েছিলেন। ডায়েরিটা ছিল এই বাড়ির প্রথম মালিকের।”

“প্রথম মালিক কে ছিলেন?”

“অমরেশ রায়চৌধুরী। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মৃত্যু আসলে শরীরের মৃত্যু নয়। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে তার স্মৃতি। আর স্মৃতিকে যদি শরীরের বাইরে ধরে রাখা যায়, তাহলে মৃত মানুষকেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”

অদ্বৈত বলল, “এগুলো তো কুসংস্কার।”

“বাবাও প্রথমে তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু ডায়েরিতে এমন কিছু বিবরণ ছিল, যেগুলো তাঁর নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। তারপর তিনি এই বাড়িতে পরীক্ষা শুরু করেন।”

“কী পরীক্ষা?”

অরিন্দমের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“একজন মানুষের স্মৃতি আরেকজনের মধ্যে রাখা যায় কি না, সেই পরীক্ষা।”

অদ্বৈত চুপ করে রইল।

“তোর বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, মৃত মানুষের স্মৃতি ধরে রাখবেন। কিন্তু পরে তাঁর ধারণা বদলে গেল। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, একটি মানুষের স্মৃতির মধ্যে আরেকটি মানুষকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব। আর সেই আশ্রয় যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, তাহলে স্মৃতির মানুষটিও একদিন জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।”

“তাহলে আমাকে দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন?”

“শুধু তোকে নয়।”

অদ্বৈত তাকাল।

অরিন্দম নিচু গলায় বলল, “আমাকেও।”

ঘরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কিন্তু তুই তো বলেছিলি, আমি তোকে তৈরি করেছি!”

“আমি বলেছিলাম, তোর স্মৃতি থেকে আমাকে তৈরি করা হয়েছিল। সেটা পুরো সত্যি নয়। আমি জন্মেছিলাম তোর আগেই, কিন্তু আমার শরীর পৃথিবীতে বেশিদিন টেকেনি।”

অদ্বৈত হতভম্ব হয়ে গেল।

“তুই কী বলতে চাইছিস?”

অরিন্দমের চোখে জল জমল।

“আমরা যমজ ছিলাম, অদ্বৈত। আমাদের জন্ম একই দিনে। কিন্তু জন্মের পর আমি বেঁচে ছিলাম মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আমার শরীর আর বাঁচবে না। মা আমাকে বুকে নিয়ে কেঁদেছিলেন। বাবা আমাকে মৃত ভেবেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।”

“কিন্তু তুই তো এখানে আছিস!”

“আমার শরীর মারা গিয়েছিল। কিন্তু বাবা আমাকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমি এখনও কোথাও আছি—তোর স্মৃতির মধ্যে, মায়ের কণ্ঠের মধ্যে, এই বাড়ির দেয়ালের মধ্যে। তিনি আমাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।”

অদ্বৈত মাথা নাড়ল।

“না। এটা হতে পারে না।”

“আমি জানি, বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু মনে করে দেখ, ছোটবেলায় তুই কতবার এমন কাউকে দেখেছিস, যার অস্তিত্ব অন্য কেউ স্বীকার করেনি। তুই কতবার নিজের সঙ্গে কথা বলেছিস, অথচ পরে মনে করতে পারিসনি কী বলেছিলি। তোর কতগুলো স্বপ্নে এমন ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো তোর জীবনে কোনও দিন ঘটেনি।”

অদ্বৈত ধীরে ধীরে সেইসব স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল।

একটি অন্ধকার ঘর। দুটি শিশু। একজন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে। আরেকজন বিছানায় শুয়ে কাঁদছে।

তারপর বাবার কণ্ঠ—“একজনকে বাঁচাতে গেলে অন্যজনকে মুছে ফেলতেই হবে।”

“তাহলে তুই আমার স্মৃতিতে কীভাবে এলি?”

অরিন্দম বলল, “বাবা তোর স্মৃতি থেকে আমাকে তৈরি করেননি। তিনি তোর স্মৃতিকে আমার আশ্রয় বানিয়েছিলেন। আমার যে জীবনটা শেষ হয়ে গিয়েছিল, তার বাকি অংশটুকু তিনি তোর মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।”

“আর মা?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই উত্তর জানালা থেকে মাধবীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“এবার আমার কথা শোনার সময় হয়েছে, অদ্বৈত।”

দুজনেই জানালার দিকে তাকাল।

মাধবী আর সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। তিনি এখন ঘরের ভেতরে। তাঁর কোলে কোনও শিশু নেই। পরনে সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ। মুখে ক্লান্তি, চোখের নিচে গভীর কালো ছাপ।

অদ্বৈত ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরতে চাইল।

কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল।

কারণ মাধবীর পায়ের নিচে কোনও ছায়া ছিল না।

“তুমি কি সত্যিই আমার মা?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।

মাধবী চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি তোর মা। কিন্তু তুই যে মাকে মনে রেখেছিস, আমি শুধু সেই মানুষটি নই।”

“তাহলে তুমি কে?”

“আমি মাধবী মুখার্জি। যে তোকে জন্ম দিয়েছিল। যে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে এমন একটি দরজা খুলেছিল, যেটা কোনও দিন খোলা উচিত ছিল না।”

অদ্বৈত তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।

“আমাদের সঙ্গে কী হয়েছিল? সব বলো।”

মাধবী ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করলেন।

“তোর জন্মের দিন আমি তিনটি শিশুর কান্না শুনেছিলাম।”

অদ্বৈত অবাক হয়ে বলল, “তিনটি?”

“তুই, অরিন্দম, আর আমার মেয়ে তিতলি।”

“কিন্তু তিতলি তো—”

“তিতলি জন্মের পর কয়েক দিন বেঁচেছিল। তারপর অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তোর বাবা তাকে হারানোর শোক সহ্য করতে পারেননি। তার আগেই অরিন্দমকে হারিয়েছিলেন। পরপর দুটি সন্তানকে হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।”

মাধবী থামলেন। তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তারপর তিনি সেই ডায়েরির কথা মনে করলেন। বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, মৃত মানুষকে স্মৃতির মধ্যে ধরে রাখা যায়। প্রথমে তিনি তিতলির স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিতলি ফিরে আসেনি। তারপর অরিন্দমকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন।”

অদ্বৈত ফিসফিস করে বলল, “আর আমাকে ব্যবহার করেছিলেন?”

“হ্যাঁ। তোর মধ্যে ছিল সেই অদ্ভুত ক্ষমতা, যা বাবা বুঝতে পারেননি। তুই খুব ছোটবেলা থেকেই মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর আর অনুভূতি নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারতিস। তোর বাবা ভেবেছিলেন, তোর স্মৃতি হবে অরিন্দমের আশ্রয়।”

“তাহলে তিতলি?”

“তিতলি এই বাড়ির স্মৃতির মধ্যে রয়ে গিয়েছিল। ওকে ফিরিয়ে আনার কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু বাড়িটা ওর অস্তিত্ব ধরে রেখেছিল। তুই যাকে দেখেছিস, সে তিতলির স্মৃতি, তার কষ্ট, তার শেষ ইচ্ছা—সব মিলিয়ে তৈরি হওয়া এক উপস্থিতি।”

অদ্বৈত স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে উত্তর জানালার ওপারে যে শিশুটিকে দেখেছি?”

মাধবীর মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

“সেই শিশুটির কথা তুই আর জিজ্ঞেস করিস না।”

“কেন?”

“কারণ ও তোর ভাই নয়। ও তোর বোনও নয়। ও সেই শূন্যতা, যেটা আমরা সবাই মিলে তৈরি করেছি।”

অরিন্দম হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

“মিথ্যে বলছ! তুমি এখনও সব লুকোচ্ছ!”

মাধবী তার দিকে তাকালেন।

“তুই কী জানতে চাস, অরিন্দম? যে তোকে ফিরিয়ে আনার জন্য তোর মায়ের স্মৃতি থেকে কী কী কেড়ে নেওয়া হয়েছিল? নাকি জানতে চাস, তুই ফিরে আসার পর কেন এই বাড়িতে কেউ শান্তিতে ঘুমোতে পারেনি?”

অরিন্দম দাঁত চেপে বলল, “আমি জানতে চাই, তুমি আমাকে কেন গ্রহণ করোনি!”

মাধবী কেঁদে ফেললেন।

“কারণ তুই ফিরে আসার পর আর আমার সন্তান ছিলি না। তুই আমার সন্তানের স্মৃতি নিয়ে তৈরি হওয়া এক অস্তিত্ব ছিলি। তুই আমার কাছে এসে ‘মা’ বলে ডাকতিস, কিন্তু তোর চোখে আমি এমন কিছু দেখেছিলাম, যা কোনও শিশুর চোখে থাকার কথা নয়।”

“কী দেখেছিলে?”

“তুই আমাকে চিনতিস না। তুই শুধু জানতিস, আমি তোর মা। তুই আমার মুখ চিনতিস, আমার কণ্ঠ চিনতিস, কিন্তু আমার স্পর্শ চিনতিস না।”

অরিন্দম পিছিয়ে গেল।

মাধবী বললেন, “তুই যখন আমার কাছে আসতিস, আমি তোকে জড়িয়ে ধরতাম। কিন্তু আমার মনে হত, আমি যেন এমন কাউকে আলিঙ্গন করছি, যে আমার সন্তানকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

অদ্বৈত অনুভব করল, তার বুকের ভেতরে জমে থাকা রাগ ধীরে ধীরে অন্য এক অনুভূতিতে বদলে যাচ্ছে। এতদিন সে ভেবেছিল, তার বাবা-মা তাকে ঠকিয়েছেন। এখন বুঝতে পারছে, তারা নিজেরাই এমন এক সত্যির মধ্যে আটকে পড়েছিলেন, যার কোনও সহজ সমাধান ছিল না।

তবু একটি প্রশ্ন রয়ে গেল।

“মা, তুমি যদি জানতে অরিন্দম ফিরে আসেনি, তাহলে আমাকে কেন কিছু বলোনি?”

মাধবী অদ্বৈতের দিকে তাকালেন।

“কারণ তুই তখন বারো বছরের শিশু। তোর বাবা তোর স্মৃতি থেকে অনেক কিছু সরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, তুই স্বাভাবিক জীবন কাটাস। কিন্তু তিনি জানতেন না, স্মৃতি মুছে ফেললেই তার ছায়া মুছে যায় না।”

“আর তুমি?”

“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তাই নীলকুঠির উত্তর ঘর বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু অরিন্দমকে সেখানে আটকে রাখার পর বাড়িটা আর কখনও স্বাভাবিক হয়নি।”

অদ্বৈত ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে আমাকে এখানে ডেকে এনেছ কে?”

মাধবী চুপ করে রইলেন।

অরিন্দমের মুখে আবার সেই অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।

“এবার বুঝলি? তোকে এখানে কেউ ডেকে আনেনি। তুই নিজেই ফিরেছিস।”

“কীভাবে?”

“কারণ তোর স্মৃতি জেগে উঠছিল। তুই যত বড় হয়েছিস, ততই আমার অস্তিত্ব তোর মধ্যে শক্তিশালী হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তুই নিজেই সেই চিঠি লিখেছিস।”

অদ্বৈত অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল।

“আমি? আমি চিঠি লিখেছি?”

“হ্যাঁ। তোর হাতেই লেখা হয়েছিল। কিন্তু তুই মনে রাখতে পারিসনি। তোর মধ্যে যে অংশটা আমাকে চিনত, সেই অংশটাই তোকে এখানে ফিরিয়ে এনেছে।”

অদ্বৈত পকেট থেকে চিঠিটি বের করল। কাগজের ওপর লেখা অক্ষরগুলো যেন চোখের সামনে নড়ে উঠল। হাতের লেখা তার নিজের মতোই, কিন্তু একটি অক্ষরও তার মনে পড়ছে না।

সে ফিসফিস করে বলল, “তাহলে আমি নিজেকেই এখানে ডেকে এনেছি।”

মাধবী মাথা নাড়লেন।

“এখন তোর সামনে দুটো পথ। তুই যদি এই বাড়ির সমস্ত স্মৃতি মুক্ত করে দিস, তাহলে অরিন্দম, তিতলি আর আমার এই অসম্পূর্ণ অস্তিত্ব—সব শেষ হয়ে যাবে। তুই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবি। কিন্তু তোর শৈশবের অনেক স্মৃতি আর কোনও দিন ফিরে পাবি না।”

“আর অন্য পথ?”

মাধবী চোখ নামিয়ে বললেন, “তুই যদি অরিন্দমকে নিজের মধ্যে জায়গা দিস, তাহলে ও বেঁচে থাকবে। কিন্তু তোর নিজের স্মৃতি, তোর নিজের পরিচয় ধীরে ধীরে মুছে যাবে। একদিন তুই আর বুঝতে পারবি না, তুই অদ্বৈত, না অরিন্দম।”

অরিন্দম তাড়াতাড়ি বলল, “আমাকে বেছে নে, দাদা। আমি তোকে কখনও কষ্ট দেব না।”

অদ্বৈত তার দিকে তাকাল।

“তুই কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস?”

অরিন্দমের মুখে বিস্ময়।

“কী প্রশ্ন করছিস?”

“তুই যদি আমাকে ভালোবাসিস, তাহলে আমার জীবন কেড়ে নিতে চাইছিস কেন?”

অরিন্দম কিছু বলতে পারল না।

অদ্বৈত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“আমি তোকে মুছে ফেলতে চাই না। কিন্তু নিজের জীবনও তোকে দিতে পারব না।”

অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে আমি আবার একা হয়ে যাব।”

অদ্বৈত তার কাছে গিয়ে হাত বাড়াল।

“না। তুই একা হবি না। তুই আমার ভাই। কিন্তু তোকে আমার মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে না। তোর নিজের অস্তিত্বের সত্যিটাকে মেনে নিতে হবে।”

অরিন্দম তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে অদ্বৈতের হাত ধরল।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সমস্ত আয়না ভেঙে পড়ল।

নীলকুঠির দেয়াল কেঁপে উঠল। ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়ল। দূরে কোথাও একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

মাধবী চিৎকার করে বললেন, “না! এখনই নয়!”

অদ্বৈত বুঝতে পারল না কী হচ্ছে।

অরিন্দম তার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “দাদা, আমার কথা মন দিয়ে শোন। তুই যা দেখেছিস, সব সত্যি নয়। মা অনেক কিছু জানে, কিন্তু সবটা জানে না। বাবা যে দরজাটা বন্ধ করেছিলেন, তার ওপারে শুধু আমাদের স্মৃতি নেই।”

“তাহলে কী আছে?”

অরিন্দম উত্তর দিল, “যে প্রথম এই বাড়িতে ফিরে এসেছিল।”

মাধবী আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন।

“অরিন্দম, চুপ কর!”

কিন্তু ততক্ষণে উত্তর জানালার ওপার থেকে সেই অচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছে।

“অনেক দেরি হয়ে গেছে, মাধবী।”

জানালার কাচের ওপরে একটি শিশুর হাতের ছাপ ফুটে উঠল।

তারপর আরেকটি।

তারপর তৃতীয়টি।

কাচের ওপারে কোনও মুখ দেখা যাচ্ছিল না। শুধু একটি ছায়া, যার মাথা মানুষের মতো, কিন্তু শরীরের দৈর্ঘ্য জানালার চেয়ে অনেক বেশি।

অদ্বৈত অনুভব করল, তার হাতের মধ্যে অরিন্দমের হাত ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসছে।

“ওটা কী?” সে জিজ্ঞেস করল।

অরিন্দম ফিসফিস করে বলল, “ও সেই স্মৃতি, যেটাকে বাবা কোনও দিন মুছতে পারেননি।”

“কার স্মৃতি?”

“এই বাড়ির প্রথম মৃত মানুষের।”

জানালার ওপারের ছায়াটি এবার কথা বলল।

“অদ্বৈত, তুমি কি জানো, তোমার নামের অর্থ কী?”

অদ্বৈত উত্তর দিল না।

“অদ্বৈত মানে, যার দ্বিতীয় কেউ নেই। অথচ তোমার জীবন শুরু হয়েছিল তিনটি শিশুর গল্প দিয়ে। তোমার বাবা তোমাকে একমাত্র সন্তান বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সত্যিকে মুছে ফেললেই সত্যি শেষ হয়ে যায় না।”

ঘরের মেঝে ফেটে গেল।

তার নিচে দেখা গেল একটি সরু সিঁড়ি, যা নেমে গেছে অন্ধকারে।

মাধবী কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এই সিঁড়ি তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল!”

অদ্বৈত তাঁর দিকে তাকাল।

“কোথায় যায় এটা?”

মাধবী উত্তর দিলেন না।

জানালার ওপারের কণ্ঠস্বর বলল, “নিচে নেমে যাও, অদ্বৈত। সেখানে তুমি জানতে পারবে, তোমার বাবা কেন আমাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।”

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এটাই সেই শেষ দরজা। যে দরজার কথা বাবার ডায়েরিতে লেখা ছিল না, যে দরজার অস্তিত্ব নীলকুঠির নকশায় ছিল না।

সে সিঁড়ির দিকে এগোল।

মাধবী তার হাত চেপে ধরলেন।

“যাস না। তুই যদি নিচে নামিস, তাহলে আর ফিরে আসতে পারবি না।”

অদ্বৈত শান্ত গলায় বলল, “আমি এত বছর ধরে অর্ধেক সত্যি নিয়ে বেঁচেছি। আর নয়।”

“কিন্তু তুই যা খুঁজছিস, তা জানার পর হয়তো নিজের জীবনকেই ক্ষমা করতে পারবি না।”

অদ্বৈত মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “নিজের জীবনকে ক্ষমা করতে না পারার চেয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে কিছুই না জানা অনেক বেশি ভয়ংকর।”

সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।

অরিন্দম তার পেছনে এল। মাধবী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে তাঁদের অনুসরণ করলেন।

সিঁড়ির নিচে ছিল একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ঘর। চারদিকে পাথরের দেয়াল। মাঝখানে গোলাকার একটি কালো পুকুর, যার জল একেবারেই স্থির। পুকুরের ওপরে ঝুলছে অসংখ্য ছোট ছোট কাচের বোতল। প্রতিটি বোতলের ভেতরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে।

কোনওটায় একটি শিশুর হাসি।

কোনওটায় একজন বৃদ্ধের কান্না।

কোনওটায় কোনও মহিলার গান।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এগুলো সাধারণ বোতল নয়। প্রতিটি বোতলের মধ্যে যেন কারও স্মৃতি বন্দি।

ঘরের এক কোণে একটি কাঠের টেবিল। তার ওপর খোলা ডায়েরি, কয়েকটি পুরোনো ছবি, আর একটি চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—‘আমার শেষ সন্তানের জন্য’।

অদ্বৈত চিঠিটি তুলে নিল।

লেখা অনিরুদ্ধের।

“যে-ই এই চিঠি পড়ছিস, জেনে রাখিস, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। আমি ভেবেছিলাম, মৃত্যুকে হারানো যায়। ভেবেছিলাম, স্মৃতি ধরে রাখলে মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু আমি বুঝিনি, স্মৃতি কোনও মানুষ নয়। স্মৃতি শুধু তার ছায়া।

আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছি। তারপর তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে আমার জীবিত সন্তানকেও হারানোর পথে ঠেলে দিয়েছি।

আমি যে দরজাটি খুলেছিলাম, তার ওপারে কোনও মৃত মানুষ ছিল না। ছিল এমন এক শূন্যতা, যা মানুষের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়। সেই শূন্যতা আমাদের হারানো মানুষদের মুখ ধার করে। তাদের কণ্ঠ ধার করে। তারপর আমাদের বিশ্বাস করায়, তারা ফিরে এসেছে।

যদি কখনও আমার ছেলে এই ঘরে আসে, তাকে বলিস—সে যেন কাউকে ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ না করে। মৃতদের ভালোবাসতে হলে তাদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, নিজেদের জীবনকে মুছে ফেলতে হয় না।”

চিঠির শেষে লেখা ছিল—

“অদ্বৈত, যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তবে বুঝব আমি তোকে বাঁচাতে পারিনি। তবু শেষবারের মতো বলছি, তুই যা-ই দেখিস, নিজের নাম ভুলিস না।”

অদ্বৈতের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

“বাবা জানতেন,” সে ফিসফিস করে বলল। “তিনি জানতেন, সবকিছু ভুল ছিল।”

মাধবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“তিনি শেষ জীবনে বুঝেছিলেন। কিন্তু ততদিনে এই বাড়ি অনেক স্মৃতি নিজের মধ্যে ধরে ফেলেছিল।”

অদ্বৈত পুকুরের দিকে তাকাল।

“এই বোতলগুলোতে কী আছে?”

মাধবী বললেন, “যাদের হারানোর শোক আমরা মেনে নিতে পারিনি, তাদের স্মৃতি। তোর বাবা ভেবেছিলেন, এই স্মৃতিগুলো একত্র করলে মৃত মানুষদের ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু এই স্মৃতিগুলোই ধীরে ধীরে বাড়িটাকে জীবন্ত করে তুলেছে।”

“আর সেই অন্ধকারের অস্তিত্ব?”

“ও কোনও একজনের স্মৃতি নয়। ও তৈরি হয়েছে অনেক মানুষের হারানোর যন্ত্রণা থেকে। এই বাড়িতে যারা প্রিয়জনকে হারিয়ে এসেছে, তাদের প্রত্যেকের শোক ওর মধ্যে জমেছে। যত মানুষ ওকে বিশ্বাস করেছে, ও তত শক্তিশালী হয়েছে।”

অদ্বৈত পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল।

জলের মধ্যে এবার একটি মুখ ফুটে উঠল।

তার নিজের মুখ।

কিন্তু সেই মুখের চোখ নীল।

পুকুরের প্রতিবিম্ব বলল, “তুমি কি সত্যিই ভাবছ, আমাকে মুছে দিলে সব শেষ হয়ে যাবে?”

অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।

প্রতিবিম্বটি হাসল।

“তোমার মা আমাকে ভুলে যেতে চেয়েছিল। তোমার বাবা আমাকে বন্দি করতে চেয়েছিল। অরিন্দম আমাকে নিজের শরীর দিতে চেয়েছিল। আর তুমি আমাকে ধ্বংস করতে চাও। কিন্তু তোমাদের কেউই বুঝতে পারছ না, আমি তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছি।”

“তুই কে?” অদ্বৈত চিৎকার করে উঠল।

পুকুরের জল কেঁপে উঠল।

“আমি সেই ইচ্ছা, যা মানুষকে মৃতদের ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করে। আমি সেই শূন্যতা, যা প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর বুকের মধ্যে থেকে যায়। আমি সেই প্রশ্ন, যার উত্তর কেউ পায় না—যদি আর একবার দেখা হতো, যদি আর একবার কথা বলা যেত, যদি আর একবার হাতটা ধরা যেত!”

অদ্বৈত চোখ বন্ধ করল।

তার সামনে ভেসে উঠল মায়ের মুখ। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়া। অসুখের রাতে মায়ের কপালে ঠান্ডা কাপড়। দুর্গাপুজোর সকালে মায়ের শাঁখ বাজানো। বাবার সঙ্গে বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখা।

তারপর সেই স্মৃতির মধ্যে অরিন্দমের মুখও ভেসে উঠল—যে ভাইকে সে কোনও দিন চিনতে পারেনি, তবু যার অস্তিত্ব তার নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এই অন্ধকারকে শক্তিশালী করেছে তার নিজের আকাঙ্ক্ষাও। সে চেয়েছিল মাকে ফিরে পেতে। সে চেয়েছিল বাবার কথার অর্থ বুঝতে। সে চেয়েছিল অতীতের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে।

কিন্তু ভালোবাসা আর কাউকে ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা এক নয়।

সে পুকুরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“আমি তোকে ধ্বংস করতে আসিনি,” অদ্বৈত বলল। “আমি এসেছি তোকে আর আমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে না দিতে।”

প্রতিবিম্বের মুখ বদলে গেল।

“তাহলে তুই আমাকে কী দিবি?”

“কিছুই না।”

“তুই আমাকে তোর মায়ের স্মৃতি দিবি না?”

“না।”

“তোর ভাইয়ের অস্তিত্ব দিবি না?”

“না।”

“তোর নিজের শৈশবও না?”

অদ্বৈত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমার শৈশবের কিছু স্মৃতি ফিরে নাও। কিছু স্মৃতি আমার কাছে থাক। কিছু স্মৃতি হয়তো কোনও দিন আর মনে পড়বে না। তবু আমি আমার জীবন বেছে নেব।”

পুকুরের জল হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল।

ঘরের সমস্ত বোতল কাঁপতে লাগল। একের পর এক বোতল মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। তাদের ভেতর থেকে আলো বেরিয়ে এসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

সেই আলোয় অদ্বৈত দেখতে পেল অসংখ্য মুখ—যারা বহু বছর আগে এই বাড়িতে এসেছিল। কেউ তার মৃত স্ত্রীকে খুঁজছিল, কেউ হারানো সন্তানকে, কেউ এমন এক ভাইকে, যার সঙ্গে শেষবার কথা বলা হয়নি। তাদের মুখে দুঃখ ছিল, কিন্তু ভয় ছিল না।

একজন বৃদ্ধ তার স্ত্রীর হাত ধরে হাসলেন।

একটি শিশু তার মায়ের কোলে মাথা রাখল।

একজন তরুণ তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি।”

তারপর তারা একে একে আলো হয়ে মিলিয়ে গেল।

মাধবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “অদ্বৈত, তুই পারছিস!”

কিন্তু সেই মুহূর্তে অরিন্দমের শরীর কেঁপে উঠল।

তার নীল চোখের রং মুছে যেতে লাগল। হাতের আঙুলগুলো ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।

“দাদা…”

অদ্বৈত ছুটে গেল।

“না! তোকে কিছু হতে দেব না!”

অরিন্দম দুর্বল হাসল।

“তুই তো বলেছিলি, আমাকে তোর মধ্যে বাঁচতে হবে না। এবার আমাকে আমার মতো চলে যেতে দে।”

“কিন্তু তুই আমার ভাই!”

“হ্যাঁ। আর সেই সত্যিটা কোনও দরজা, কোনও বাড়ি, কোনও স্মৃতি মুছে দিতে পারবে না।”

অদ্বৈত তার হাত ধরল।

“আমি তোকে কখনও চিনতেই পারলাম না।”

অরিন্দম বলল, “তুই আমাকে চিনেছিস। এটাই যথেষ্ট।”

তারপর সে অদ্বৈতের কপালে হাত রাখল।

সঙ্গে সঙ্গে অদ্বৈতের মনে একটি স্মৃতি ফিরে এল।

সে খুব ছোট। মায়ের কোলে বসে আছে। পাশে আরেকটি শিশু। দুজনের মাঝখানে শুয়ে আছে ছোট্ট একটি মেয়ে। মাধবী তিনজনের মাথায় হাত বুলিয়ে গান গাইছেন।

“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি…”

স্মৃতিটি ছিল উষ্ণ, শান্ত, ভালোবাসায় ভরা।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এই স্মৃতিটাই এতদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার ভাই আর বোনের অস্তিত্ব মুছে যায়নি। শুধু তাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো তার মনে ছিল না।

“অরিন্দম,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল।

অরিন্দমের মুখে শেষবারের মতো হাসি ফুটল।

“আমাকে ভুলে যাস না, দাদা। কিন্তু আমাকে ধরে রাখার জন্য নিজের জীবন থামিয়ে রাখিস না।”

তারপর অরিন্দমের শরীর আলো হয়ে ভেঙে গেল।

আলোটি অদ্বৈতের বুকের মধ্যে প্রবেশ করল না। বরং জানালার দিকে উঠে গিয়ে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

অদ্বৈত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

সে জানত না, তার ভাই সত্যিই চলে গেল কি না। সে শুধু বুঝতে পারল, প্রথমবারের মতো অরিন্দমকে নিজের জীবন কেড়ে না নিয়েই বিদায় জানাতে পেরেছে।

পুকুরের জল শান্ত হয়ে এল।

শেষ বোতলটি তখনও অক্ষত ছিল।

তার ভেতরে বন্দি ছিল মাধবীর স্মৃতি।

মাধবী বোতলটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার আমারও যাওয়ার সময় হয়েছে।”

অদ্বৈত উঠে দাঁড়াল।

“তুমি কি আর ফিরবে না?”

মাধবী মৃদু হাসলেন।

“আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না। তোর মনে আমার যে স্মৃতিগুলো আছে, সেগুলো নিয়েই তুই বাঁচবি। কিন্তু আমি যদি এই বাড়ির মধ্যে থেকে যাই, তাহলে তুই কোনও দিন এই রাত থেকে বেরোতে পারবি না।”

“আমি তোমাকে আর একবার মা বলে ডাকতে চাই।”

মাধবী এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।

“ডাক, বাবা।”

অদ্বৈতের গলা ভেঙে গেল।

“মা!”

মাধবী তাকে বুকে টেনে নিলেন।

দীর্ঘ বহু বছর পর অদ্বৈত যেন সত্যিই মায়ের স্পর্শ অনুভব করল। কোনও শীতলতা নেই, কোনও ভয় নেই, কোনও রহস্য নেই। শুধু একজন মায়ের আলিঙ্গন।

মাধবী তার কানে কানে বললেন, “তুই আমার সন্তান। তোর জন্মের সত্যি যা-ই হোক, তোর জীবনের অধিকার তোরই। কাউকে তোকে নিজের স্মৃতির বন্দি করতে দিস না।”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেলেন।

তাঁর শরীরের চারপাশে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ল।

অদ্বৈত হাত বাড়িয়ে তাঁকে ধরে রাখতে চাইল, কিন্তু মাধবী মাথা নাড়লেন।

“আমাকে যেতে দে।”

অদ্বৈত হাত নামিয়ে নিল।

মাধবী শেষবারের মতো হাসলেন।

তারপর তিনিও আলো হয়ে মিলিয়ে গেলেন।

সঙ্গে সঙ্গে নীলকুঠির গভীর থেকে এক ভয়ংকর শব্দ উঠল। পাথরের দেয়াল ভেঙে পড়তে শুরু করল। ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়ল। পুকুরের জল শুকিয়ে গেল। কাচের বোতলগুলো একে একে ফেটে গেল।

অদ্বৈত সিঁড়ির দিকে দৌড়ল।

কিন্তু সিঁড়ির মুখে এসে দেখল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তিতলি।

“তুমি এখনও যাওনি?” অদ্বৈত হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।

তিতলি হাসল।

“আমি তো অনেক আগেই চলে গেছি। তুমি শুধু আমাকে দেখতে পাচ্ছিলে।”

“তুমি কি সত্যিই আমার বোন ছিলে?”

তিতলি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আর তুই আমার দাদা।”

অদ্বৈত তার হাত ধরতে গেল। তিতলি নিজেই তার হাত বাড়িয়ে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য অদ্বৈত অনুভব করল, সে সত্যিই তার বোনের হাত ধরেছে।

তিতলি বলল, “দাদা, বাড়ির বাইরে গিয়ে একবার নদীর দিকে তাকাবি। কিন্তু ফিরে আসার চেষ্টা করিস না।”

“কেন?”

“কারণ এই বাড়ি তোর জন্য আর অপেক্ষা করবে না।”

তিতলির মুখ ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে গেল।

“তিতলি!”

“ভালো থাকিস, দাদা।”

তারপর সে মিলিয়ে গেল।

অদ্বৈত একা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।

উত্তর ঘরের দরজা খোলা। জানালার ওপারে নদী আবার স্বাভাবিক দিকে বইছে। আকাশে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে।

বাড়ির প্রধান দরজার কাছে পৌঁছে অদ্বৈত শেষবারের মতো পিছনে তাকাল।

নীলকুঠির উত্তর জানালায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই।

দেয়ালে কোনও লেখা নেই।

মেঝেতে কোনও ভাঙা আয়না নেই।

শুধু একটি পুরোনো পারিবারিক ছবি পড়ে আছে টেবিলের ওপর। ছবিতে মাধবী, অনিরুদ্ধ, ছোট্ট অদ্বৈত, অরিন্দম আর তিতলি—পাঁচজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবির পেছনে একটি বাক্য লেখা।

“যাদের আমরা ভালোবাসি, তারা চলে গেলেও ভালোবাসা থেকে যায়।”

অদ্বৈত ছবিটি পকেটে রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন ভোর।

নদীর ওপর কুয়াশা। দূরে কয়েকটি নৌকা ভেসে যাচ্ছে। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। পৃথিবী যেন আগের মতোই আছে, অথচ অদ্বৈতের কাছে সবকিছু নতুন।

সে একবার নীলকুঠির দিকে তাকাল।

বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার জানালাগুলো বন্ধ, দরজাগুলো নিঃশব্দ। বহু বছরের জমে থাকা অন্ধকার যেন এক রাতেই ফুরিয়ে গেছে।

অদ্বৈত নদীর ধারে বসে পড়ল।

তার চোখে জল এল।

এই প্রথম সে মায়ের জন্য কাঁদল।

বাবার জন্য কাঁদল।

অরিন্দম আর তিতলির জন্য কাঁদল।

কিন্তু সেই কান্নার মধ্যে এবার কোনও আতঙ্ক ছিল না। কোনও রহস্য ছিল না। ছিল হারানোর বেদনা, আর সেই বেদনাকে মেনে নেওয়ার সাহস।

কলকাতায় ফিরে এসে অদ্বৈত অনেক দিন নীলকুঠির কথা কাউকে বলেনি। সে নিজের কাজ শুরু করল, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করল, বহু বছর পরে মায়ের ছবি ঘরের দেয়ালে টাঙাল। বাবার ডায়েরির কিছু অংশ সে সংরক্ষণ করল, আর বাকিটা নদীর জলে ভাসিয়ে দিল।

কখনও কখনও রাতে তার ঘুম ভেঙে যেত। মনে হতো, কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে।

কিন্তু সে আর জানালা খুলত না।

সে জানত, সব ডাকের উত্তর দিতে হয় না। কিছু কণ্ঠস্বর স্মৃতি হয়ে থাকলেই সুন্দর।

প্রায় এক বছর পর, এক বর্ষার সকালে, অদ্বৈত নিজের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে একটি খাম পেল। খামের ওপর তার নিজের হাতের লেখা।

ভেতরে একটি ছোট চিঠি।

“অদ্বৈত,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিস। আমি জানি না, তোর মনে আমার কতটা স্মৃতি রয়ে গেছে। হয়তো কোনও দিন তুই আমাকে ভুলে যাবি। হয়তো আমার মুখটাও আর মনে পড়বে না।

তবু একটা কথা মনে রাখিস—তুই আমাকে বাঁচাতে পারিসনি বলে তোর কোনও অপরাধ নেই। তুই আমাকে ভালোবেসেছিলি। সেটাই যথেষ্ট।

তোর ভাই, অরিন্দম।”

অদ্বৈত চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তারপর জানালার বাইরে তাকাল।

আকাশে বৃষ্টি থেমেছে। রাস্তার পাশে একটি ছোট ছেলে মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। ছেলেটি হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকিয়ে হাসল।

এক মুহূর্তের জন্য অদ্বৈতের মনে হল, ছেলেটির চোখ নীল।

সে চোখের পলক ফেলল।

ছেলেটি তখন মায়ের হাত ধরে দূরে চলে যাচ্ছে।

অদ্বৈত আর তাকে অনুসরণ করল না।

সে জানালাটি বন্ধ করে দিল।

তারপর নিজের ঘরের টেবিলে বসে একটি নতুন গল্প লিখতে শুরু করল।

গল্পের নাম দিল—যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না।

গল্পের শেষ লাইনে সে লিখল—

“কোনও কোনও বাড়ি মানুষকে ফিরিয়ে আনে না। তারা শুধু অপেক্ষা করে, যতক্ষণ না মানুষ বুঝতে শেখে—যারা চলে গেছে, তাদের ভালোবাসতে হলে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।”

কলম নামিয়ে অদ্বৈত চোখ বন্ধ করল।

তার মনে এবার মায়ের মুখ স্পষ্ট।

বাবার হাসিও।

আর খুব দূরে, স্মৃতির এক শান্ত কোণে, অরিন্দম ও তিতলি হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

তারা আর তাকে ডাকছে না।

তারা শুধু হাসছে।

আর সেই হাসির মধ্যে কোনও রহস্য নেই।

শুধু বিদায়।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না (দ্বিতীয় পর্ব: জন্মের আগের স্মৃতি)।

রাত তখন বারোটা সাত মিনিট পেরিয়ে গেছে।

নীলকুঠির উত্তর দিকের গোপন ঘরটিতে দাঁড়িয়ে অদ্বৈত মুখার্জি নিজেরই মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আয়নার ওপারে দাঁড়ানো যুবকটির মুখ তার মুখের অবিকল প্রতিচ্ছবি। শুধু চোখ দুটো আলাদা—অদ্বৈতের চোখ কালো, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অরিন্দমের চোখ অস্বাভাবিক নীল।

দুজনের মাঝখানে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে ভাঙা আয়নার টুকরো। প্রতিটি টুকরোয় যেন আলাদা আলাদা মুখ দেখা যাচ্ছে। কোথাও অদ্বৈত, কোথাও অরিন্দম, কোথাও আবার এমন একটি শিশুর মুখ, যার চোখের মণি সম্পূর্ণ কালো।

দরজার ওপার থেকে মাধবীর কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল।

“তোমাদের দুজনের মধ্যে যে সত্যি, সে যেন কোনও দিন এই বাড়ি থেকে বেরোতে না পারে।”

অদ্বৈত কেঁপে উঠল।

“মা! তুমি কোথায়? সামনে এসো!”

কোনও উত্তর এল না।

অরিন্দম ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি নিয়ে বলল, “এখনও মাকে খুঁজছিস? যে মানুষটা তোকে বারো বছর ধরে মিথ্যে বলে বড় করেছে, তার কথাও বিশ্বাস করিসনি। অথচ এই বাড়ির দেয়ালের মধ্যে যে কণ্ঠস্বর ঘুরে বেড়ায়, তাকেই মা বলে ডাকছিস!”

“তুই আমার বাবার কথা জানিস কী করে?”

“কারণ তোর বাবার সঙ্গে আমারও সম্পর্ক ছিল।”

“কী সম্পর্ক?”

“যে সম্পর্কের কথা জানলে তুই নিজের নামটাও আর ব্যবহার করতে চাইবি না।”

অদ্বৈত অরিন্দমের দিকে এগিয়ে গেল। “ধাঁধা বন্ধ কর। জন্মের শংসাপত্র দুটো একই রকম কেন? আমাদের বাবা-মায়ের নাম এক কেন? জন্মতারিখও একই কেন?”

অরিন্দম এবার গম্ভীর হল।

“কারণ কাগজে আমরা দুজনেই একই দিনে জন্মেছি। কিন্তু পৃথিবীতে জন্মানো আর পৃথিবীতে উপস্থিত হওয়া এক জিনিস নয়।”

“স্পষ্ট করে বল।”

“তোর বাবা আমাকে তৈরি করেছিলেন।”

কথাটা শুনে অদ্বৈত থমকে গেল।

“তৈরি করেছিলেন মানে?”

“মানুষ যেমন নিজের সন্তানের জন্ম দেয়, তেমন নয়। তিনি আমাকে তৈরি করেছিলেন তোর স্মৃতি থেকে, তোর ভয় থেকে, তোর সেইসব স্বপ্ন থেকে যেগুলো তুই ছোটবেলায় দেখতিস কিন্তু সকালে উঠে মনে রাখতে পারতিস না।”

অদ্বৈত হেসে উঠল। হাসিটা ছিল আতঙ্ক ঢাকার চেষ্টা।

“তুই পাগল।”

“হতে পারে। কিন্তু পাগল মানুষও কখনও কখনও সত্যি কথা বলে।”

অরিন্দম হাত বাড়িয়ে পাশের দেয়ালে স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের ওপর একটি দৃশ্য ফুটে উঠল—পুরোনো কলকাতার একটি বাড়ি, বৃষ্টিভেজা উঠোন, কাঠের দোলনা। দোলনায় বসে আছে পাঁচ বছরের একটি ছেলে। তার পাশে বসে এক মহিলা গান গাইছেন।

মহিলাটি মাধবী।

ছেলেটি অদ্বৈত।

কিন্তু দৃশ্যের মধ্যে আরও একটি শিশু ছিল। সে দাঁড়িয়ে ছিল জানালার পাশে। তার চোখ নীল।

অদ্বৈত নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

“এটা কী?”

“তোর প্রথম স্মৃতি,” অরিন্দম বলল। “যেটা তোকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

দৃশ্যটি বদলে গেল। এবার দেখা গেল, মাধবী দুটি শিশুকে নিয়ে একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকছেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ। তাঁর হাতে একটি ছোট কাচের শিশি। ঘরের মাঝখানে গোলাকার একটি চিহ্ন আঁকা, আর চারদিকে জ্বলছে মোমবাতি।

মাধবী কাঁদছেন।

“না, অনিরুদ্ধ! ওদের আলাদা কোরো না। ওরা একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না।”

অনিরুদ্ধের মুখ পাথরের মতো শক্ত।

“একজনকে বাঁচাতে গেলে অন্যজনকে মুছে ফেলতেই হবে।”

তারপর আলো নিভে গেল।

অদ্বৈত চিৎকার করে উঠল।

“বন্ধ কর! এসব বন্ধ কর!”

দেয়ালের দৃশ্য মিলিয়ে গেল। ঘরের বাতাস হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে উঠল।

অরিন্দম বলল, “তোর মনে নেই, কারণ তোর স্মৃতির একটা অংশ আমার কাছে রাখা হয়েছিল। তুই বড় হয়েছিস সেই অংশ ছাড়া। আর আমি বড় হয়েছি তোর ফেলে দেওয়া স্মৃতি নিয়ে।”

“তা হলে তুই মানুষ নোস?”

“মানুষ কী দিয়ে তৈরি, অদ্বৈত? শরীর দিয়ে? রক্ত দিয়ে? নাকি স্মৃতি দিয়ে?”

অদ্বৈত উত্তর দিতে পারল না।

ঠিক সেই সময় ঘরের পেছনের দেয়ালে তিনবার টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

অরিন্দমের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল।

“ও এসেছে।”

“কে?”

“যাকে তুই মা বলে ডাকছিস।”

দরজার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে একটি সাদা হাত বেরিয়ে এল। হাতটি অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। আঙুলের ডগায় কালো দাগ, যেন বহুদিন ধরে কালি মাখানো।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে মাধবী বললেন, “অদ্বৈত, ওর কথা শুনিস না। ও তোকে বাইরে যেতে দিতে চায় না।”

অরিন্দম তীব্র স্বরে বলল, “মিথ্যে! তুমি আমাকে আটকে রেখেছ!”

“আমি তোকে বাঁচিয়েছি।”

“কাকে বাঁচিয়েছ? আমাকে, না নিজেকে?”

দরজার ওপাশে নীরবতা।

অদ্বৈত দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। তার মনের মধ্যে যেন একসঙ্গে বহু মানুষের কণ্ঠস্বর কথা বলতে শুরু করেছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ বারবার বলছে—‘ফিরে আয়’, ‘দরজা খোল’, ‘আমাকে ভুলে যাস না’।

তারপর হঠাৎ সে একটি শিশুর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

“দাদা, তুমি আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে কেন?”

অদ্বৈত চোখ তুলে তাকাল।

ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই শিশুটি, যাকে সে প্রথম রাতে উত্তর জানালার ওপারে দেখেছিল। তার গায়ে ময়লা সাদা জামা, কপালের ওপর এলোমেলো চুল। চোখ দুটো এত কালো যে মণি আর সাদা অংশ আলাদা করা যায় না।

“তুমি কে?” অদ্বৈত ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

শিশুটি উত্তর দিল না। শুধু হাত বাড়িয়ে দেখাল মেঝের একটি আয়নার টুকরোর দিকে।

সেখানে অদ্বৈত নিজের মুখ দেখতে পেল না।

দেখল একটি শিশুকে—যে কাঁদতে কাঁদতে একটি বন্ধ দরজায় ঘুষি মারছে।

দরজার ওপাশ থেকে আরেকটি শিশু চিৎকার করছে, “আমাকে বেরোতে দাও!”

তারপর দৃশ্যের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল।

অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।

“আমি এই স্মৃতি দেখতে চাই না!”

শিশুটি বলল, “কিন্তু এই স্মৃতিই তো তোমাকে তৈরি করেছে।”

পরের মুহূর্তেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল।

অরিন্দম অদ্বৈতের কাঁধ চেপে ধরল।

“শোন। আমাদের হাতে সময় খুব কম। রাত একটা বাজলে এই ঘর বদলে যাবে। তখন তুই আর আমি যে যার স্মৃতির মধ্যে আটকে পড়ব। বাইরে বেরোনোর একটাই উপায়।”

“কী উপায়?”

“উত্তরের দরজা খুলতে হবে।”

“মা তো বলেছে দরজা খুলতে না।”

“তোর মা অনেক কিছুই বলেছে। কিন্তু কখনও কি বলেছে, কেন তুই বারো বছর বয়সে তার মৃত্যুর খবর শুনেও একবারও কাঁদতে পারিসনি?”

অদ্বৈত স্তব্ধ হয়ে গেল।

সত্যিই তো। মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। চোখে জল আসেনি। আত্মীয়রা বলেছিল, শোকের ধাক্কায় সে বাকরুদ্ধ। বাবা বলেছিলেন, সে নাকি মায়ের শেষ মুখ দেখতে চায়নি।

কিন্তু তার নিজের মনে পড়ে, মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগের রাতে সে একটি স্বপ্ন দেখেছিল।

স্বপ্নে মাধবী তার হাত ধরে বলেছিলেন, “তুই যদি আমাকে ভুলে যাস, তা হলে তুই বেঁচে থাকবি। আর যদি সব মনে রাখিস, তা হলে তোর আর আমার মধ্যে একজনকেই বেছে নিতে হবে।”

পরদিন সকালে বাবা তাকে বলেছিলেন, মা আর নেই।

“আমি কেন কাঁদিনি?” অদ্বৈত নিজের কাছেই প্রশ্ন করল।

অরিন্দম উত্তর দিল, “কারণ তোর শোকটাও আমার মধ্যে রাখা হয়েছিল।”

ঘরের কোথাও একটা ঘড়ি বেজে উঠল।

বারোটা পঞ্চান্ন।

অরিন্দম অদ্বৈতের হাত ধরে উত্তর দিকের দেয়ালের দিকে এগোল। সেখানে আগে কোনও দরজা ছিল না। কিন্তু এখন দেয়ালের মাঝখানে সরু কালো রেখা দেখা যাচ্ছে।

“ওই দরজার ওপারে কী আছে?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।

“আমাদের জন্মের আগের সত্যি।”

“জন্মের আগেও কি স্মৃতি থাকে?”

অরিন্দম মৃদু হাসল।

“যে স্মৃতি মানুষের নয়, বাড়ির—সেটা জন্মের আগেও থাকে।”

দরজার ওপার থেকে এবার মাধবীর কণ্ঠস্বর এল না। বরং শোনা গেল অনিরুদ্ধের গলা।

“অদ্বৈত, দরজাটা খুলিস না। তোর মাকে বিশ্বাস করিস না, অরিন্দমকেও না। তুই যদি সত্যিই আমার ছেলে হোস, তা হলে আমার কথা শুনে ফিরে যা।”

অদ্বৈত জমে গেল।

তার বাবা তো বহু বছর আগে মারা গেছেন।

তবু কণ্ঠস্বরটি একেবারে জীবন্ত। এমনকি সেই পরিচিত কাশি, বাক্যের শেষে নিঃশ্বাস ফেলার অভ্যাস—সবই একই।

“বাবা?”

“হ্যাঁ, বাবা। আমি এখানেই আছি।”

দরজার ওপাশে ধীরে ধীরে কারও পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।

“তুই জানিস না, আমি তোকে কতটা ভালোবাসতাম। তোকে বাঁচানোর জন্যই সব করেছিলাম। তোর মা যা করেছে, তা জানলে তুই কোনও দিন ওকে ক্ষমা করতে পারবি না।”

অদ্বৈত দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

অরিন্দম তার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “থাম!”

“ও আমার বাবা!”

“তোর বাবার মৃত্যু হয়েছিল ছয় বছর আগে। তুই নিজে তাঁর শেষকৃত্যে ছিলি।”

“তা হলে এই কণ্ঠস্বর?”

“এই বাড়িতে কণ্ঠস্বর কখনও মরে না। স্মৃতি মরে না। কিন্তু সব স্মৃতির মালিক জীবিত মানুষ হয় না।”

দরজার ওপাশ থেকে অনিরুদ্ধ আবার বললেন, “অদ্বৈত, ও তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। তুই যদি দরজা না খোলিস, তা হলে তোর সত্যিটা চিরদিন অন্ধকারে থাকবে।”

অদ্বৈতের বুকের মধ্যে একটা তীব্র টান অনুভূত হল। বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে তার মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় অসুখের রাতে বাবার কপালে হাত রাখা, স্কুলে প্রথম পুরস্কার পাওয়ার পর বাবার হাসি, মায়ের ছবি লুকিয়ে রাখার সময় বাবার কাঁপা হাত।

যদি এই বাড়ি তার স্মৃতি দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে, তবে কোন স্মৃতিটা সত্যি?

যে স্মৃতিতে বাবা তাকে ভালোবেসেছিলেন?

নাকি যে স্মৃতিতে বাবা মাকে বন্দি করেছিলেন?

“আমি দরজা খুলব,” অদ্বৈত বলল।

অরিন্দমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“তাহলে আমাদের কেউই বেরোতে পারব না।”

“আমি সত্যিটা জানতে চাই।”

“সত্যি জানার জন্য সব সময় দরজা খোলা লাগে না। কখনও কখনও দরজা বন্ধ রাখাই শেষ বেঁচে থাকার উপায়।”

অদ্বৈত হাত ছাড়িয়ে দরজার কালো রেখায় আঙুল রাখল।

দরজাটি ঠান্ডা ছিল না, গরমও ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, তার ওপারে কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে ঠেলল।

দরজা খুলে গেল।

ওপারে কোনও ঘর ছিল না।

ছিল এক দীর্ঘ করিডর, যার দুপাশে সারি সারি কাঠের দরজা। প্রতিটি দরজার ওপর একটি করে নাম লেখা—মাধবী, অনিরুদ্ধ, অদ্বৈত, অরিন্দম, তিতলি, নিতাই।

সবশেষের দরজায় লেখা ছিল—‘যে ফিরে আসেনি’।

করিডরের মেঝেতে জল জমে আছে। জল এত স্বচ্ছ যে তাতে নিজের মুখ দেখা যায়। কিন্তু অদ্বৈত যখন নিচে তাকাল, সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল না। দেখল এক মধ্যবয়স্ক মানুষকে, যার মুখ অনিরুদ্ধের মতো, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ।

মানুষটি জল থেকে মুখ তুলে বলল, “তুই দেরি করে ফেলেছিস।”

অদ্বৈত কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কে?”

“আমি সেই মানুষ, যে এই বাড়িতে প্রথম দরজা খুলেছিল।”

“আপনি আমার বাবা?”

লোকটি মাথা নাড়ল।

“আমি তোর বাবার স্মৃতি। আর তোর বাবা যে মানুষ ছিলেন, তাঁকে তুই কোনও দিন পুরোপুরি চিনতে পারিসনি।”

অদ্বৈত এক পা পিছিয়ে গেল।

“তাহলে আসল বাবা কোথায়?”

“যে ঘরে কেউ ফিরে আসে না।”

লোকটি করিডরের শেষ দরজাটির দিকে আঙুল তুলল।

অদ্বৈত এগোতে শুরু করল। অরিন্দম তার পেছনে এল, কিন্তু কয়েক পা যেতেই থেমে গেল।

“আমি যেতে পারব না।”

“কেন?”

“ওই দরজার ওপারে যা আছে, তা আমার স্মৃতি নয়।”

“তাহলে কার?”

অরিন্দম উত্তর দিল না।

অদ্বৈত শেষ দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজার গায়ে অসংখ্য নখের আঁচড়। নিচের দিকে শুকনো রক্তের মতো বাদামি দাগ। হাতলটি শিশুর হাতের উচ্চতায় লাগানো।

সে হাতল ধরতেই ভেতর থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“অদ্বৈত, তুমি অবশেষে এসেছ।”

তিতলি।

অদ্বৈত দরজা খুলে ফেলল।

ঘরটি ছিল ছোট। মাঝখানে একটি লোহার খাট। দেয়ালে শিশুর আঁকা ছবি—একটি বাড়ি, বাড়ির সামনে নদী, আর বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে তিনটি মানুষ। একজন মহিলার পাশে দুটি শিশু। এক শিশুর চোখ কালো, অন্যটির নীল।

খাটের ওপর বসে আছে তিতলি।

কিন্তু এবার তার শরীরের কোনও স্বচ্ছতা নেই। সে সম্পূর্ণ জীবন্ত দেখাচ্ছে। চোখে জল, ঠোঁট কাঁপছে।

“তুমি এখানে কীভাবে?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।

তিতলি বলল, “আমি কখনও এখান থেকে বেরোইনি।”

“তুমি তো বলেছিলে এই বাড়িতে থাকতে।”

“আমি থাকতাম। কিন্তু আমি যে মেয়ে ছিলাম, সে অনেক আগেই চলে গেছে।”

অদ্বৈত ধীরে ধীরে তার সামনে বসে পড়ল।

“তুমি কে, তিতলি?”

মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সেই তৃতীয় শিশুটি, যার কথা তোমাদের কেউ মনে রাখতে চায়নি।”

অদ্বৈতের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হল।

“তৃতীয় শিশু?”

তিতলি দেয়ালের ছবিটির দিকে আঙুল তুলল।

“তোমাদের দুজনের মাঝখানে যে শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে, সে আমি। মাধবী আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু তোমাদের জন্মের গল্পে আমার নাম নেই।”

“এটা অসম্ভব। আমার মা—”

“তোমার মা তিনটি সন্তানকে জন্ম দিয়েছিলেন, অদ্বৈত। কিন্তু তিনজনকে একসঙ্গে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা এই বাড়ির ছিল না।”

অদ্বৈত অনুভব করল, তার পায়ের নিচের মেঝে দুলছে।

“কেন? কেন আমাদের আলাদা করা হয়েছিল?”

তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ তোমাদের মধ্যে একজনের জন্মের সঙ্গে এই বাড়ির একটি পুরোনো অভিশাপ জড়িয়ে ছিল। তোমাদের বাবা ভেবেছিলেন, একজনকে সরিয়ে দিলে বাকি দুজন বেঁচে যাবে। কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন। যে শিশুটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে আসলে কোনও শিশু ছিল না।”

“তাহলে সে কী ছিল?”

তিতলি উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল।

দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো একে একে মাটিতে পড়তে লাগল। লোহার খাটের নিচ থেকে জল বেরিয়ে এল। সেই জলের মধ্যে ভেসে উঠল তিনটি ছোট হাত।

একটি কালো চোখের শিশুর।

একটি নীল চোখের শিশুর।

আর একটি মেয়ের হাত।

তিতলি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “না! ও আবার জেগে উঠেছে!”

ঘরের কোণে অন্ধকার জমাট বাঁধতে লাগল। সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি অবয়ব বেরিয়ে এল। মুখ দেখা যায় না, কিন্তু তার পায়ের শব্দ স্পষ্ট। ধীরে ধীরে সে অদ্বৈতের সামনে এসে দাঁড়াল।

তারপর এমন একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যা অদ্বৈত আগে কখনও শোনেনি—তবু মনে হল, জন্মের পর থেকেই সে এই কণ্ঠস্বর চেনে।

“তোমরা সবাই আমার নাম ভুলে গেছ।”

অদ্বৈত শুকনো গলায় বলল, “তুমি কে?”

অন্ধকারের অবয়বটি মাথা নিচু করল।

“আমি সেই সন্তান, যার জন্য তোমাদের মা প্রথমবার এই বাড়ির উত্তর জানালা খুলেছিলেন।”

তিতলি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “অদ্বৈত, ওর নাম জিজ্ঞেস কোরো না!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি ছোট হাত বেরিয়ে এল। হাতটি অদ্বৈতের কপালে স্পর্শ করল।

তারপর সে দেখতে পেল—

একটি ঝড়ের রাত।

নদীর জল ফুলে উঠেছে। নীলকুঠির জানালায় আলো জ্বলছে। মাধবী একটি নবজাতককে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অনিরুদ্ধ তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছেন।

“ওকে রেখে দাও, মাধবী। ওকে বাঁচতে দাও। বাকিদের আমি সামলে নেব।”

মাধবী মাথা নাড়ছেন।

“তুমি বুঝতে পারছ না, অনিরুদ্ধ। ও যদি এই বাড়িতে থাকে, তা হলে একদিন ও আমাদের সবার স্মৃতি খেয়ে ফেলবে।”

“ও তো আমাদেরই সন্তান!”

মাধবী শিশুটিকে জানালার কাছে নিয়ে গেলেন।

বাইরে নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো বাড়ি—নীলকুঠিরই মতো, কিন্তু উল্টো প্রতিচ্ছবি। সেই বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে তিনটি ছায়া।

একটি ছায়া হাত বাড়িয়ে আছে।

মাধবী শিশুটিকে বুকের কাছে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “আমি তোমাকে ভুলে যাব, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে দেব না।”

তারপর তিনি জানালা খুললেন।

দৃশ্যটি ভেঙে গেল।

অদ্বৈত মেঝেতে পড়ে গেল। তিতলি তাকে ধরে বসাল।

“তুমি কী দেখলে?” সে জিজ্ঞেস করল।

অদ্বৈত কাঁপতে কাঁপতে বলল, “একটি শিশু। মা তাকে জানালা দিয়ে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছিল।”

তিতলি চোখ বন্ধ করল।

“না। মা তাকে পাঠাননি। মা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।”

“কোথায়?”

তিতলি ধীরে ধীরে উত্তর জানালার দিকে তাকাল।

“যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না।”

দূরে ঘড়ির ঘণ্টা বাজল।

একটা।

তারপর নীলকুঠির সমস্ত জানালা একসঙ্গে খুলে গেল।

বাইরে নদীর জল উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে। আকাশে চাঁদ নেই, তবু বাড়ির ছাদে সাদা আলো পড়ছে। উত্তর জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে মাধবী। তাঁর কোলে একটি শিশু।

তিনি অদ্বৈতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার তুই বেছে নে। তুই কি নিজের জন্মের সত্যিটা জানতে চাস, নাকি সেই শিশুটিকে ফিরিয়ে আনতে চাস, যাকে তোর জন্য হারিয়ে যেতে হয়েছিল?”

অদ্বৈত উঠে দাঁড়াল।

“দুটোই চাই।”

মাধবীর মুখে অদ্ভুত এক দুঃখের হাসি ফুটল।

“তাহলে তোর হাতে আর কোনও সময় নেই।”

তিনি শিশুটিকে জানালার ওপার থেকে তুলে ধরলেন।

শিশুটি চোখ খুলল।

একটি চোখ কালো।

অন্যটি নীল।

আর তার কপালের মাঝখানে ছিল তৃতীয় একটি চোখ—বন্ধ, কিন্তু তার পাতার নিচে যেন কেউ নড়াচড়া করছে।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, অরিন্দম এতক্ষণ যা বলেছে, তার কোনওটাই সম্পূর্ণ সত্যি নয়।

সে নিজেও জানে না, সে আসলে কে।

হঠাৎ পেছন থেকে অরিন্দমের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“অদ্বৈত, ওর দিকে তাকাস না!”

অদ্বৈত ঘুরে দাঁড়াল।

অরিন্দমের নীল চোখের জায়গায় এখন দুটো গভীর কালো গর্ত।

সে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ও আমার মুখ নিয়ে নিচ্ছে।”

তারপর অরিন্দম মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“দাদা,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাকে বাঁচা।”

অদ্বৈত স্তব্ধ হয়ে গেল।

প্রথমবার অরিন্দম তাকে ‘দাদা’ বলে ডাকল।

ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তর জানালার ওপার থেকে শিশুটির হাসি শোনা গেল।

আর নীলকুঠির সমস্ত দরজায় একসঙ্গে লেখা ফুটে উঠল—

“যে জন্মেছিল, সে ফিরবে। যে তৈরি হয়েছিল, সে মুছে যাবে।”

অদ্বৈত জানত না, এই কথার মধ্যে তার নিজের জন্য কোন পরিণতি লুকিয়ে আছে।

কিন্তু সে বুঝতে পারল, রাত এখনও শেষ হয়নি।

আর এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের কাউকে না কাউকে সত্যিই মুছে যেতে হবে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না (প্রথম পর্ব: বন্ধ জানালার ওপারে)।

১. রাত বারোটার অতিথি

রাত তখন বারোটা পেরিয়ে গেছে।

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশের বুক চিরে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে, আর সেই আলোয় নদীর ধারের পুরোনো বাড়িটাকে মনে হচ্ছে কোনও মৃত মানুষের স্মৃতিস্তম্ভ।

বাড়িটার নাম ‘নীলকুঠি’।

একসময় এই বাড়িতে আলো জ্বলত রাতভর। উঠোনে বসত গানের আসর, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত মশলার গন্ধ, আর বারান্দায় বসে বাড়ির বৃদ্ধ কর্তা হরিনারায়ণ চৌধুরী সন্ধ্যায় অতিথিদের সঙ্গে গল্প করতেন। কিন্তু আজ সেই বাড়ির দরজায় মরচে পড়েছে, জানালার পাল্লা ভেঙে গেছে, বাগানের পথ আগাছায় ঢেকে গেছে।

গত পনেরো বছর ধরে বাড়িটিতে কেউ থাকে না।

অন্তত গ্রামের মানুষ তাই জানে।

সেই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটি সাদা গাড়ি। গাড়ি থেকে নামল তিরিশ বছর বয়সি এক যুবক। নাম অদ্বৈত মুখার্জি। পেশায় সাংবাদিক। কলকাতার একটি সংবাদপত্রে কাজ করে সে।

আজ থেকে তিন দিন আগে তার কাছে একটি অদ্ভুত চিঠি এসেছিল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

‘অদ্বৈত,

তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, তোমার মায়ের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তাহলে অমাবস্যার রাতে নীলকুঠিতে এসো।

তোমার জন্য একটি ঘর খোলা থাকবে।

কিন্তু মনে রেখো, রাত বারোটার পর বাড়ির উত্তর দিকের জানালা খুলবে না।

আর যদি কেউ তোমাকে তোমার নিজের নামে ডাকে, উত্তর দেবে না।

— একজন পুরোনো পরিচিত।’

চিঠির নীচে কোনও ঠিকানা নেই, প্রেরকের নাম নেই। শুধু নীল কালিতে আঁকা একটি ছোট্ট চাবির ছবি।

অদ্বৈত প্রথমে চিঠিটাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু খামের ভিতরে মায়ের একটি পুরোনো ছবি পাওয়ার পর তার কৌতূহল বেড়ে যায়।

ছবিতে তার মা মাধবী মুখার্জি দাঁড়িয়ে আছেন নীলকুঠির সামনে।

ছবির পিছনে লেখা—‘যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না, সেখানেই একদিন সবাইকে ফিরতে হয়।’

অদ্বৈতের মা মারা গিয়েছিলেন সে যখন মাত্র বারো বছরের। সরকারি নথিতে লেখা ছিল, রাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু অদ্বৈত কোনও দিন মায়ের দেহ দেখেনি। তার বাবা তাকে বলেছিলেন, দুর্ঘটনার পর দেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে শেষবারের মতো দেখানো সম্ভব হয়নি।

বাবা মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই কথাই বলেছিলেন।

কিন্তু মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি অদ্বৈতকে একটি বাক্য বলেছিলেন, যা তার মনে গেঁথে আছে—

‘তোর মা মারা যায়নি, অদ্বৈত। ওকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।’

তখন অদ্বৈত কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।

আজ সে সেই অর্থ খুঁজতেই নীলকুঠিতে এসেছে।

গাড়ির দরজা বন্ধ করে সে বাড়ির দিকে এগোল। প্রধান ফটকটি আধখোলা। ঠেলে দিতেই কড়কড় শব্দে খুলে গেল।

ভিতরে ঢুকে সে দেখল, উঠোনের মাঝখানে একটি পুরোনো কুয়ো। কুয়োর চারপাশে শ্যাওলা জমেছে। তার পাশে একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়া গাছ। অথচ বৃষ্টির মধ্যে গাছটির একটি ডালে ঝুলছে টাটকা লাল ফুলের মালা।

অদ্বৈত থমকে দাঁড়াল।

এই বাড়িতে তো কেউ থাকে না!

তাহলে ফুলের মালাটা কে ঝুলিয়েছে?

ঠিক সেই সময় বাড়ির ভিতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল—

‘এত দেরি করলে কেন, অদ্বৈত?’

অদ্বৈতের বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল।

কণ্ঠস্বরটি তার মায়ের।

যে কণ্ঠস্বর সে পনেরো বছর ধরে কোনও দিন শোনেনি, সেই কণ্ঠস্বর আজ তাকে নাম ধরে ডাকছে।

সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ নেই।

তারপর আবার সেই কণ্ঠস্বর—

‘ভিতরে এসো। তোমার ঘর তৈরি আছে।’

অদ্বৈত নিজেকে সামলে নিল। সে একজন সাংবাদিক। অজানা ঘটনার পিছনে ছুটে বেড়ানো তার কাজ। ভূতপ্রেতের গল্পে সে বিশ্বাস করে না।

কিন্তু মায়ের কণ্ঠস্বর?

সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে?

সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।

বাড়ির ভিতর আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার। মেঝেতে ধুলো নেই, দেওয়ালে মাকড়সার জাল নেই। হলঘরের মাঝখানে একটি বড় ঝাড়বাতি জ্বলছে। চারদিকে পুরোনো আসবাবপত্র, দেওয়ালে তেলরঙের ছবি, আর সিঁড়ির মাথায় ঝুলছে একটি বিশাল ঘড়ি।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে বারোটা সাত মিনিটে।

অদ্বৈত নিজের ঘড়ি দেখল।

বারোটা সাত মিনিট।

হলঘরের এক কোণে একটি মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাদা শাড়ি, খোলা চুল, মুখটা আধো অন্ধকারে ঢাকা।

অদ্বৈত এগিয়ে গেল।

‘আপনি কে?’

মহিলাটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

অদ্বৈতের হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেল।

এ তো তার মা!

ছবিতে দেখা সেই মুখ। কপালের বাঁদিকে ছোট্ট তিল। চোখের পাশে হালকা ভাঁজ। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত হাসি।

মাধবী মুখার্জি।

পনেরো বছর আগে যাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

মহিলাটি এগিয়ে এসে অদ্বৈতের মাথায় হাত রাখলেন।

‘কত বড় হয়ে গেছিস, বাবা।’

অদ্বৈতের গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।

মহিলাটি মৃদু হেসে বললেন, ‘ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো তোর মা।’

অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।

‘আপনি আমার মা হতে পারেন না। মা মারা গেছেন।’

মহিলাটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘কে বলেছে?’

‘বাবা। সরকারি নথি। সবাই জানে।’

মাধবী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোর বাবা অনেক মিথ্যে বলেছিল। কিন্তু সব মিথ্যের পিছনে একটা কারণ ছিল।’

‘কী কারণ?’

‘তোকে বাঁচিয়ে রাখা।’

অদ্বৈত কাঁপা গলায় বলল, ‘কিসের থেকে?’

মাধবী উত্তর দিলেন না। তিনি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

‘চল। তোর ঘর দেখাব।’

অদ্বৈত তাঁর পিছনে হাঁটতে শুরু করল।

সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই তার চোখ পড়ল দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবির দিকে।

ছবিতে নীলকুঠির পরিবারের সবাই দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝখানে হরিনারায়ণ চৌধুরী, তাঁর পাশে স্ত্রী সরযূবালা, আর সামনে কয়েকজন তরুণ-তরুণী।

ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে বারো-তেরো বছরের একটি ছেলে।

ছেলেটির মুখ অবিকল অদ্বৈতের মতো।

শুধু চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।

অদ্বৈত ছবির সামনে থেমে গেল।

‘এই ছেলেটি কে?’

মাধবী ছবিটার দিকে তাকালেন না।

‘ওর কথা এখন থাক।’

‘কেন? ও আমার মতো দেখতে কেন?’

মাধবী এবার পিছন ফিরে তাকালেন।

‘কারণ ও তুই।’

অদ্বৈতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

‘অসম্ভব!’

‘সব অসম্ভব জিনিসই একদিন সত্যি হয়ে ওঠে, অদ্বৈত।’

তিনি আবার হাঁটতে শুরু করলেন।

উপরতলায় পৌঁছে একটি ঘরের দরজা খুললেন। ঘরের ভিতরে একটি পুরোনো খাট, কাঠের টেবিল, আলমারি এবং জানালার পাশে একটি ছোট্ট দোলনা।

দোলনাটির ভিতরে রাখা একটি পুতুল।

অদ্বৈত পুতুলটা হাতে তুলে নিল। পুতুলটির চোখে কালো কাচ বসানো। মাথার চুল একপাশে পুড়ে গেছে।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় মায়ের কাছে এমন একটি পুতুল ছিল। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর সেটি আর সে কোনও দিন দেখেনি।

‘এটা এখানে এল কীভাবে?’

মাধবী বললেন, ‘তুই যখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলি, তখন পুতুলটা এখানেই ছিল।’

‘আমি কখনও এই বাড়িতে আসিনি।’

মাধবী মৃদু হেসে বললেন, ‘তোর মনে নেই।’

অদ্বৈত প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের উত্তর দিকের জানালায় তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মাধবীর মুখের রং বদলে গেল।

তিনি দ্রুত অদ্বৈতের হাত থেকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে আলমারির ভিতর ঢুকিয়ে দিলেন।

‘যাই হোক না কেন, জানালাটা খুলবি না।’

‘কেন?’

‘কারণ ও জানে তুই ফিরে এসেছিস।’

‘কে?’

মাধবী উত্তর দিলেন না। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন—

‘আর একটা কথা। রাত বারোটার পর কেউ যদি তোকে তোর নিজের নামে ডাকে, কোনও উত্তর দিবি না।’

অদ্বৈত চমকে উঠল।

চিঠিতেও ঠিক এই কথাই লেখা ছিল।

মাধবী চলে গেলেন।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অদ্বৈত একা দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর জানালার ওপার থেকে একটি শিশুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

‘দাদা, দরজাটা খোলো।’

অদ্বৈতের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

কেউ তাকে কোনও দিন দাদা বলে ডাকেনি।

তার কোনও ভাই বা বোন নেই।

তাহলে জানালার বাইরে কে?

২. মৃত শিশুর ডায়েরি

অদ্বৈত সারারাত ঘুমোতে পারল না।

জানালার বাইরে থেকে আর কোনও শব্দ আসেনি। কিন্তু ভোরের দিকে সে লক্ষ্য করল, জানালার নীচের কাঠে ছোট ছোট নখের আঁচড়ের মতো দাগ রয়েছে। দাগগুলো নতুন। কাঠের গায়ে জমে থাকা ধুলোও যেন কেউ আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে।

সে জানালাটা খুলল না।

সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, বাড়ির হলঘরে একটি বৃদ্ধ লোক বসে আছেন। ধূসর ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি, চোখে মোটা চশমা। সামনে একটি চায়ের কাপ।

বৃদ্ধ তাকে দেখে বললেন, ‘তুমি অদ্বৈত?’

‘হ্যাঁ। আপনি কে?’

‘আমি নীলকুঠির পুরোনো তত্ত্বাবধায়ক। আমার নাম নিতাই পাল।’

‘আপনি এখানে থাকেন?’

‘থাকি না। তবু মাঝেমধ্যে আসতে হয়।’

‘কেন?’

নিতাই পাল চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন।

‘এই বাড়ি কাউকে বেশিদিন দূরে থাকতে দেয় না।’

অদ্বৈত চেয়ার টেনে বসল।

‘আমার মা কোথায়?’

‘তোমার মা?’

বৃদ্ধের মুখে বিস্ময় দেখা গেল।

‘তুমি কি মাধবী দেবীকে দেখেছ?’

‘গত রাতে।’

নিতাই পাল দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি যা দেখেছ, তার সবটাকে সত্যি বলে ধরে নিও না।’

অদ্বৈত বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সবাই একই কথা বলছে। কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলছে না কেন?’

‘কারণ এই বাড়ির সত্যি একবারে বলা যায় না।’

‘তাহলে ধীরে ধীরে বলুন।’

নিতাই পাল উঠে দাঁড়ালেন।

‘প্রথমে তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে হবে।’

তিনি অদ্বৈতকে বাড়ির পিছনের দিকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি ছোট ঘর। দরজায় তালা ঝুলছে। নিতাই পাল পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললেন।

ঘরের ভিতরে পুরোনো আলমারি, বইয়ের তাক, কিছু ভাঙা খেলনা এবং কাগজের স্তূপ। দেওয়ালে একটি বড় মানচিত্র ঝুলছে। মানচিত্রে নীলকুঠির বিভিন্ন ঘর চিহ্নিত করা হয়েছে।

নিতাই পাল আলমারির নীচ থেকে একটি কালো ডায়েরি বের করলেন।

‘এটা তোমার বাবার।’

অদ্বৈত ডায়েরিটা হাতে নিল।

বাবা অনিরুদ্ধ মুখার্জি জীবনের শেষ কয়েক বছর খুব কম কথা বলতেন। মৃত্যুর আগে তিনি সমস্ত পুরোনো কাগজ পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। অদ্বৈত তখন ভেবেছিল, বাবা হয়তো নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতি মুছে ফেলতে চাইছেন।

আজ বুঝতে পারছে, হয়তো তিনি অন্য কিছু লুকোচ্ছিলেন।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

‘নীলকুঠি, ১৭ অক্টোবর ২০০৯।

আজ আবার উত্তর দিকের জানালায় শব্দ শুনলাম। মাধবী বলেছে, জানালাটা খুলতে নেই। কিন্তু আমি জানি, ওখানে কেউ আছে।’

অদ্বৈত পাতা উল্টোল।

‘২১ অক্টোবর।

অদ্বৈতকে আজ প্রথমবার এই বাড়িতে নিয়ে এলাম। সে কিছুই মনে করতে পারছে না। ডাক্তার বলেছে, তার স্মৃতির কিছু অংশ হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, শুধু স্মৃতি হারায়নি। তার মধ্যে অন্য একজনের স্মৃতিও জেগে উঠছে।’

অদ্বৈত থমকে গেল।

‘অন্য একজনের স্মৃতি?’

নিতাই পাল বললেন, ‘পড়ো।’

পরের পাতায় লেখা—

‘২৫ অক্টোবর।

আজ রাতে অদ্বৈত ঘুমের মধ্যে অন্য একটি নাম বলেছে—অরিন্দম। বলেছে, অরিন্দমকে খুঁজে বের করতে হবে। আমি জানি না, এই নাম কোথা থেকে এসেছে।’

আরেকটি পাতায়—

‘২ নভেম্বর।

মাধবী আজ স্বীকার করেছে, সে উত্তর দিকের ঘরে গিয়েছিল। সেখানে সে একটি শিশুকে দেখেছে। শিশুটি অদ্বৈতের মতো দেখতে। কিন্তু তার চোখের রং কালো নয়, নীল।’

অদ্বৈত ডায়েরি থেকে মুখ তুলল।

‘অরিন্দম কে?’

নিতাই পাল বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।’

‘আপনি কি জানেন, আমার মা সত্যিই মারা গিয়েছিলেন কি না?’

বৃদ্ধ জানালার দিকে তাকালেন।

‘মাধবী দেবীকে শেষবার দেখা গিয়েছিল এই বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে। তারপর থেকে তাঁর কোনও খোঁজ নেই।’

‘কিন্তু আমার মা তো পনেরো বছর আগে মারা গেছেন!’

‘তোমার বাবা সেটাই বলেছিলেন।’

‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’

নিতাই পাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আমি বলতে চাইছি, এই বাড়িতে যাদের মৃত্যু ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের সবাইকে আমরা সত্যিই মৃত দেখিনি।’

অদ্বৈত ডায়েরির শেষ পাতাগুলো দ্রুত উল্টোল।

শেষের দিকে একটি পাতায় লাল কালিতে লেখা—

‘যদি অদ্বৈত কখনও ফিরে আসে, তাকে উত্তর দিকের ঘরে যেতে দিতে হবে। কিন্তু তার আগে তাকে জানতে হবে, অরিন্দম কে। কারণ অরিন্দম ফিরে এলে নীলকুঠির দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।’

অদ্বৈত মাথা তুলল।

‘উত্তর দিকের ঘর কোথায়?’

নিতাই পাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘উপরতলায়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথ কেউ জানে না।’

‘কেন?’

‘কারণ বাড়ির নকশায় ওই ঘরটির কোনও অস্তিত্ব নেই।’

অদ্বৈত মানচিত্রটা নামিয়ে ভালো করে দেখল।

উপরতলার পশ্চিম দিকে তিনটি ঘর চিহ্নিত। পূর্ব দিকে দুটি। কিন্তু উত্তর দিকে একটি ফাঁকা অংশ রয়েছে। সেখানে কোনও দরজা বা জানালা আঁকা নেই।

অথচ গত রাতে তার ঘরের উত্তর দিকের জানালায় কেউ টোকা দিয়েছিল।

তার মানে, ঘরটি মানচিত্রের বাইরে।

অদ্বৈত ডায়েরিটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।

‘আমি ওই ঘর খুঁজে বের করব।’

নিতাই পাল তার হাত চেপে ধরলেন।

‘একবার ওই ঘরে ঢুকলে তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।’

অদ্বৈত শান্ত গলায় বলল, ‘আমি আগের মানুষ আছি কি না, সেটাই তো জানতে এসেছি।’

৩. যে মেয়েটির কোনও ছায়া নেই

দুপুরের দিকে বৃষ্টি থেমে গেল।

অদ্বৈত বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখতে শুরু করল। পুরোনো বসার ঘর, রান্নাঘর, অতিথিশালা, লাইব্রেরি—সব জায়গায় ধুলোহীন অদ্ভুত পরিচ্ছন্নতা। যেন বাড়িটি সত্যিই পরিত্যক্ত নয়, বরং কেউ প্রতিদিন যত্ন করে পরিষ্কার করে রাখে।

লাইব্রেরিতে ঢুকে সে একটি বইয়ের তাকের সামনে থামল।

তাকের মাঝখানে রাখা একটি বইয়ের নাম—‘হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি’।

বইটি খুলতেই ভিতর থেকে একটি ছোট্ট কাগজ পড়ে গেল।

কাগজে লেখা—

‘অদ্বৈত, তুমি যদি এই লেখা পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি এখনও অপেক্ষা করছি।

তুমি আমাকে ভুলে গেছ। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।

আমার নাম অরিন্দম নয়। অরিন্দম আমার ভাইয়ের নাম।

আমার নাম—অদ্বৈত।

আমাদের মধ্যে একজন সত্যি, আর একজন শুধু স্মৃতি।

কিন্তু কোনজন সত্যি, তা জানার অধিকার তোমার নেই।

— তোমারই একজন।’

অদ্বৈত কাগজটা বারবার পড়ল।

তার নাম অদ্বৈত।

যে লিখেছে, সেও নিজেকে অদ্বৈত বলছে।

এ কেমন রহস্য?

ঠিক তখন লাইব্রেরির দরজায় একটি মেয়েকে দেখা গেল। বয়স চৌদ্দ-পনেরো। পরনে নীল ফ্রক, চুল দুদিকে বিনুনি করা। তার মুখে এমন এক শান্ত ভাব, যেন এই বাড়ির অন্ধকারের সঙ্গে সে বহুদিন ধরে পরিচিত।

মেয়েটি বলল, ‘তুমি কি অদ্বৈতদা?’

অদ্বৈত চমকে তাকাল।

‘তুমি কে?’

‘আমি তিতলি।’

‘তুমি এখানে থাকো?’

তিতলি মাথা নাড়ল।

‘এই বাড়িতেই।’

‘কিন্তু এখানে তো কেউ থাকে না।’

মেয়েটি হেসে বলল, ‘তোমাকে সবাই তাই বলেছে?’

অদ্বৈত কোনও উত্তর দিল না।

তিতলি এগিয়ে এসে বইয়ের তাক থেকে একটি পুরোনো ছবির অ্যালবাম নামাল। অ্যালবাম খুলে একটি ছবি দেখাল।

ছবিতে অদ্বৈত দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট মেয়ের পাশে। দুজনের বয়সই পাঁচ-ছয় বছরের বেশি নয়। অদ্বৈতের হাতে একটি খেলনা গাড়ি। মেয়েটির হাতে পুতুল।

ছবির পিছনে লেখা—‘অদ্বৈত ও তিতলি, নীলকুঠি, ২০০৪।’

অদ্বৈত ছবিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘এটা অসম্ভব। আমি তো কোনও দিন এখানে আসিনি।’

তিতলি বলল, ‘তুমি এসেছিলে।’

‘তুমি আমার বোন?’

তিতলি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

‘তুমি আমাকে কী মনে করতে চাও, সেটাই বড় কথা।’

‘তোমার বাবা-মা কে?’

‘এই বাড়িতে যাদের বাবা-মা ছিল, তারা কেউ এখন নেই।’

অদ্বৈত মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত নীল আভা।

‘তুমি কি অরিন্দমকে চেনো?’

তিতলির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘তুমি ওই নাম কোথায় শুনেছ?’

‘বাবার ডায়েরিতে।’

‘ওর কথা আর কখনও বলবে না।’

‘কেন?’

তিতলি কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘কারণ অরিন্দম এই বাড়ির সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ।’

‘সে কোথায়?’

‘উত্তর দিকের ঘরে।’

অদ্বৈতের বুকের ভিতর ধক করে উঠল।

‘সেখানে যাওয়ার পথ কোথায়?’

তিতলি আঙুল তুলে লাইব্রেরির শেষ দেওয়াল দেখাল।

‘ওই দেওয়ালের পিছনে।’

অদ্বৈত দেওয়ালটা পরীক্ষা করতে শুরু করল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর বইয়ের তাকের পিছনে একটি ছোট্ট লোহার হাতল দেখতে পেল। হাতলটা টানতেই দেওয়ালের একটি অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।

ভিতরে অন্ধকার সরু পথ।

দূরে কোথাও জল পড়ার শব্দ।

তিতলি বলল, ‘তুমি যদি ভিতরে যাও, একটা কথা মনে রেখো।’

‘কী?’

‘ওখানে যে তোমার মুখ দেখাবে, সে তোমার মতো দেখতে হলেও তোমার মতো মানুষ নয়।’

অদ্বৈত টর্চ জ্বালাল।

‘তুমি আমার সঙ্গে আসবে?’

তিতলি মাথা নাড়ল।

‘আমি ওই পথ দিয়ে যেতে পারি না।’

‘কেন?’

মেয়েটি নিচের দিকে তাকাল।

অদ্বৈত প্রথমবার লক্ষ্য করল, তার পায়ের নীচে কোনও ছায়া নেই।

জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসছে, টেবিলের ছায়া মেঝেতে পড়েছে, অদ্বৈতের নিজের ছায়াও স্পষ্ট। কিন্তু তিতলির কোনও ছায়া নেই।

অদ্বৈত এক পা পিছিয়ে গেল।

তিতলি মৃদু হেসে বলল, ‘ভয় পেয়ো না। আমি তোমার শত্রু নই।’

‘তুমি কি মানুষ?’

তিতলি উত্তর দিল না।

সে শুধু বলল, ‘আজ রাত বারোটা সাত মিনিটে উত্তর দিকের ঘরে যেয়ো। তার আগে নয়।’

দেওয়ালের পিছনের পথ থেকে হঠাৎ একটি শিশুর হাসি ভেসে এল।

তিতলি দ্রুত পিছিয়ে গেল।

‘ও জেগে উঠেছে!’

‘কে?’

‘যে তোমার জায়গা নিতে চায়।’

পরের মুহূর্তে লাইব্রেরির সমস্ত বই একসঙ্গে মেঝেতে পড়ে গেল।

অদ্বৈত চোখ বন্ধ করেছিল মাত্র এক মুহূর্তের জন্য।

চোখ খুলে দেখল, তিতলি নেই।

দেওয়ালের গোপন পথটিও বন্ধ।

শুধু মেঝেতে পড়ে থাকা অ্যালবামের শেষ পাতায় একটি নতুন ছবি দেখা যাচ্ছে।

ছবিতে অদ্বৈত দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠির কুয়োর পাশে।

তার পাশে তিতলি।

আর তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আরও একজন—অদ্বৈতের অবিকল প্রতিচ্ছবি।

ছবির নীচে লেখা—

‘একজন বাড়ি ফিরেছে। অন্যজন এখনও বাইরে।’

৪. রাত বারোটা সাত মিনিট

সন্ধ্যা নামতেই নীলকুঠির পরিবেশ বদলে গেল।

দুপুরে যে বাড়িকে শান্ত মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার পর সেই বাড়ির প্রতিটি কোণ থেকে অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসতে লাগল। কখনও মনে হচ্ছিল, কেউ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। কখনও মনে হচ্ছিল, রান্নাঘরে বাসন নাড়াচাড়া হচ্ছে। আবার কখনও দূরের ঘর থেকে কেউ কান্না করছে।

অদ্বৈত নিতাই পালকে খুঁজতে গেল।

বৃদ্ধকে কোথাও পাওয়া গেল না।

তার ঘরে একটি কাগজ পড়ে ছিল।

‘আমি চলে যাচ্ছি। তুমি যদি রাত বারোটা সাত মিনিটে উত্তর দিকের ঘরে যাও, মনে রেখো—প্রথম যে দরজাটি খুলবে, সেটি বন্ধ করে দেবে। দ্বিতীয় দরজাটি খুলবে না। তৃতীয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নাম তিনবার বলবে।

কিন্তু যদি নিজের কণ্ঠস্বর অন্য কোথাও থেকে শুনতে পাও, কোনও উত্তর দেবে না।’

অদ্বৈত কাগজটা পকেটে রাখল।

রাত এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে সে উপরের ঘরে ফিরে এল। টেবিলের ওপর টর্চ, বাবার ডায়েরি, মায়ের ছবি আর একটি ছোট ছুরি রাখল। ছুরিটি আত্মরক্ষার জন্য এনেছিল।

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে।

এগারোটা ঊনষাট।

তারপর ঠিক বারোটা।

বাড়ির সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

অদ্বৈত টর্চ জ্বালাল।

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিকের জানালায় তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তারপর মায়ের কণ্ঠস্বর—

‘অদ্বৈত, জানালাটা খোলো।’

অদ্বৈত চুপ করে রইল।

‘বাবা, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।’

সে চোখ বন্ধ করল।

‘আমাকে ভিতরে আসতে দে।’

অদ্বৈত উত্তর দিল না।

হঠাৎ জানালার ওপার থেকে আরেকটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

তার নিজের কণ্ঠস্বর।

‘অদ্বৈত, তুই ভিতরে আছিস কেন? বাইরে আয়। তোর জন্য অপেক্ষা করছি।’

অদ্বৈতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে টর্চ নিয়ে দেওয়ালের দিকে এগোল। লাইব্রেরির গোপন পথের মুখ খুঁজে পেল। দেওয়ালের হাতল টানতেই পথ খুলে গেল।

ভিতরে সরু সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে।

সে ধীরে ধীরে নামতে লাগল।

প্রথম দরজাটি কাঠের। দরজার ওপরে লেখা—‘শৈশব’।

অদ্বৈত দরজা খুলতেই দেখতে পেল, একটি ছোট্ট ঘর। মেঝেতে খেলনা, দেওয়ালে রঙিন ছবি, জানালার পাশে দোলনা। দোলনার মধ্যে বসে আছে পাঁচ বছরের একটি শিশু।

শিশুটির মুখ অবিকল অদ্বৈতের ছোটবেলার ছবির মতো।

শিশুটি মাথা তুলে বলল, ‘দাদা, তুমি ফিরে এসেছ?’

অদ্বৈত কোনও উত্তর দিল না।

নিতাই পালের নির্দেশ মনে পড়ল—প্রথম দরজাটি খুলবে, তারপর বন্ধ করে দেবে।

সে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

দ্বিতীয় দরজাটি লোহার। তার ওপরে লেখা—‘স্মৃতি’।

অদ্বৈত দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভিতর থেকে কান্নার শব্দ এল। তারপর বাবার কণ্ঠস্বর—

‘অদ্বৈত, আমাকে বাঁচা।’

সে দরজায় হাত রাখল।

ভিতর থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর—

‘আমি তোর বাবা। দরজাটা খোল।’

অদ্বৈত চোখ বন্ধ করে পিছিয়ে এল। দ্বিতীয় দরজাটি খুলল না।

এবার সে তৃতীয় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

দরজাটি সাদা। কোনও হাতল নেই। শুধু মাঝখানে একটি ছোট গোল আয়না।

অদ্বৈত আয়নায় নিজের মুখ দেখল।

তারপর নিতাই পালের নির্দেশ অনুযায়ী নিজের নাম তিনবার বলল।

‘অদ্বৈত।’

‘অদ্বৈত।’

‘অদ্বৈত।’

দরজার ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

‘মিথ্যে।’

অদ্বৈত জমে গেল।

‘তোর নাম অদ্বৈত নয়।’

‘কে তুমি?’

ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এল।

‘আমি সেই মানুষ, যার জীবন তুই চুরি করেছিস।’

দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ভিতরে একটি বড় ঘর। চারদিকে আয়না। প্রতিটি আয়নায় অদ্বৈতের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিচ্ছবির মুখের অভিব্যক্তি আলাদা—কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ রাগে দাঁত চেপে আছে।

ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ারে বসে আছে একটি যুবক।

অদ্বৈতের অবিকল মুখ।

একই উচ্চতা, একই চোখ, একই চুল।

শুধু তার চোখের মণি নীল।

যুবকটি উঠে দাঁড়াল।

‘এতদিনে এলি?’

অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।

‘তুমি কে?’

যুবকটি মৃদু হেসে বলল, ‘আমি অরিন্দম।’

‘তুমি আমার মতো দেখতে কেন?’

‘কারণ তুই আমার মতো দেখতে।’

‘অসম্ভব!’

অরিন্দম টেবিলের ওপর থেকে একটি পুরোনো জন্মসনদ তুলে ধরল।

‘এটা দেখ।’

অদ্বৈত কাগজটা হাতে নিল।

নাম—অদ্বৈত মুখার্জি।

জন্মতারিখ—একই।

পিতার নাম—অনিরুদ্ধ মুখার্জি।

মাতার নাম—মাধবী মুখার্জি।

অন্য একটি জন্মসনদ।

নাম—অরিন্দম মুখার্জি।

জন্মতারিখ—একই।

পিতার নাম—অনিরুদ্ধ মুখার্জি।

মাতার নাম—মাধবী মুখার্জি।

দুটি জন্মসনদ।

একই বাবা-মা।

একই জন্মতারিখ।

একই মুখ।

অদ্বৈতের মাথা ঘুরতে লাগল।

‘আমরা কি যমজ?’

অরিন্দম বলল, ‘যমজ হলে সবকিছু এত সহজ হত।’

‘তাহলে কী?’

অরিন্দম তার কাছে এগিয়ে এল।

‘আমাদের মধ্যে একজন জন্মেছিল। অন্যজন তৈরি হয়েছিল।’

অদ্বৈত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।

‘কীভাবে?’

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের সমস্ত আয়না একসঙ্গে ফেটে গেল।

কাচের টুকরো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

অন্ধকারের মধ্যে মাধবীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

‘অদ্বৈত, ওর কথা বিশ্বাস করিস না!’

অরিন্দম চিৎকার করে উঠল—

‘মা, এবার আর আমাকে থামাতে পারবে না!’

দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

অদ্বৈত ঘুরে দেখল, ঘরের একমাত্র দরজার ওপরে নতুন করে একটি বাক্য ফুটে উঠেছে।

‘এই বাড়ি থেকে একজনই বেরোবে।’

তারপর অন্ধকারের ভিতর অরিন্দমের হাত এগিয়ে এল।

‘এবার বল, অদ্বৈত—তুই বাঁচতে চাস, না সত্যিটা জানতে চাস?’

অদ্বৈত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বহু বছর আগে মৃত বলে ঘোষিত তার মায়ের কণ্ঠস্বর শেষবারের মতো শোনা গেল—

‘তোমাদের দুজনের মধ্যে যে সত্যি, সে যেন কোনও দিন এই বাড়ি থেকে বেরোতে না পারে।’

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : কুয়াশার ওপারে শেষ চিঠি (তৃতীয় পর্ব: শেষ চিঠির ওপারে)।

১. যে মানুষটি ফিরে এসেছিল

পরিত্যক্ত রেলকোয়ার্টারের নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঋতুপর্ণার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের সমস্ত পরিচিত সত্য একে একে ভেঙে পড়ছে।

দরজার ওপারে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে সে চেনে। অন্তত তার মুখ, তার চোখ, তার হাসি—সবই পরিচিত। বারো বছর আগে কলেজের করিডরে যে ছেলেটির সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল, নদীর ধারে যার সঙ্গে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, যার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরেও সে প্রতিটি বর্ষায় ফিরে আসার অপেক্ষা করেছে—সেই অর্ক সেন।

কিন্তু মানুষটি নিজেকে অর্ক দত্ত বলে পরিচয় দিয়েছে। দাবি করেছে, সে ঋতুপর্ণার বাবা সৌম্য দত্তের ছেলে। অর্থাৎ, ঋতুপর্ণার নিজের সৎভাই।

আর কয়েক মিনিট আগে পাওয়া চিঠিতে লেখা—‘তুমি যাকে অর্ক বলে ভালোবেসেছিলে, সে তোমার বাবা ছিল।’

ঋতুপর্ণা দেওয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।

‘আমাকে আর একবার বলো,’ সে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি আসলে কে?’

অর্কের চোখে জল জমে উঠল।

‘আমি অর্ক দত্ত। সৌম্য দত্তের ছেলে। তোমার সৎভাই।’

‘তাহলে এত বছর ধরে আমার সঙ্গে যা যা হয়েছে, সবই কি মিথ্যে?’

‘না, ঋতু। তোমার অনুভূতিগুলো মিথ্যে ছিল না। কিন্তু তোমাকে যে পরিচয় দিয়ে আমার কাছে আনা হয়েছিল, সেই পরিচয় মিথ্যে ছিল।’

ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

অর্ক তাকে ঘরের ভিতরে বসতে বলল। সে নিজেও টেবিলের সামনে বসে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। জানালার বাইরে শুকনো পাতার ওপর বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।

‘বারো বছর আগে,’ অর্ক বলতে শুরু করল, ‘তোমার বাবা সৌম্য দত্ত রেল দপ্তরের একটি বড় দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। একটি দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা গিয়েছিল। কিন্তু সরকারি নথিতে মৃতের সংখ্যা কম দেখানো হয়। ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করা হয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ লুকিয়ে রাখা হয়। তোমার বাবা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।’

‘তুমি তখন কোথায় ছিলে?’

‘আমি অন্য শহরে থাকতাম। আমার মা ছিলেন সৌম্যর প্রথম স্ত্রী। তাঁদের বিচ্ছেদের পর আমি মায়ের কাছেই বড় হই। পরে বাবার সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। তিনি আমাকে কিছু নথি খুঁজে পেতে সাহায্য করতে বলেন।’

‘আর আমার মা?’

‘মীরা কাকিমা সব জানতেন। তোমার বাবা যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর জীবন বিপদের মধ্যে, তখন তিনি তোমার মাকে অনুরোধ করেছিলেন তোমাকে নিরাপদে রাখতে।’

ঋতুপর্ণা চমকে উঠল।

‘কিন্তু আমার মা তো বলেছিলেন, আমার বাবা আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন!’

‘তোমাকে রক্ষা করার জন্যই সেই মিথ্যে বলা হয়েছিল। কিন্তু একসময় সেই মিথ্যেই তোমার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।’

ঋতুপর্ণা টেবিলে রাখা পুরোনো ছবিটা তুলে নিল। ছবিতে সৌম্য দত্ত, অর্ক, অয়ন এবং নিবারণ পাল দাঁড়িয়ে আছেন।

‘তাহলে কলেজে আমাদের দেখা হওয়ার পর তুমি আমাকে চিনতে পেরেছিলে?’

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘প্রথম দিনেই।’

‘তবু তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি?’

‘আমি ভেবেছিলাম, সঠিক সময়ে বলব। কিন্তু তোমার সঙ্গে যত বেশি সময় কাটিয়েছি, ততই ভয় পেয়েছি। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে। আমি জানতাম, সত্যিটা বললে তোমার পৃথিবী ভেঙে যাবে।’

ঋতুপর্ণা তিক্ত হাসল।

‘তাই তুমি আমার পৃথিবীটাকে মিথ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখলে?’

অর্ক কোনও উত্তর দিল না।

‘নদীর ধারে সেদিন কী ঘটেছিল?’ ঋতুপর্ণা জিজ্ঞাসা করল। ‘আমার বাবার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?’

অর্কের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

‘সেদিন রাতে বাবা আমাদের দুজনকে নদীর ধারে ডেকেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল দুর্নীতির সমস্ত প্রমাণ। তিনি চেয়েছিলেন, নথিগুলো পুলিশের কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন নিবারণ পাল এবং আরও একজন।’

‘কে?’

‘শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।’

ঋতুপর্ণার বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।

‘আমাদের স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষক?’

‘হ্যাঁ। তিনিই ছিলেন পুরো ঘটনার মূল ষড়যন্ত্রকারী।’

‘তারপর?’

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

‘বাবা নথিগুলো দিতে অস্বীকার করেন। তাঁদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। আমি বাবার পাশে দাঁড়াই। তখন পিছন থেকে কেউ আমাকে আঘাত করে। আমি নদীতে পড়ে যাই। জ্ঞান হারানোর আগে শুধু দেখেছিলাম, বাবা আমার দিকে ছুটে আসছেন।’

‘তুমি বেঁচে গেলে কীভাবে?’

‘নদীর স্রোতে ভেসে আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। একজন জেলে আমাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু আমার স্মৃতি তখন প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। পরে যখন সব মনে পড়ে, তখন জানতে পারি, বাবার কোনও খোঁজ নেই।’

‘তাহলে সবাই ভেবেছিল তুমি মারা গেছ?’

‘হ্যাঁ। আর শশাঙ্ক সেই সুযোগে আমার পরিচয় মুছে দেয়। সে চেয়েছিল, আমি যেন আর কোনও দিন ফিরে না আসি।’

ঋতুপর্ণা চুপ করে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, এত দিন ধরে সে যে মানুষটিকে খুঁজেছে, সে শুধু নিখোঁজ হয়নি। তার নিজের পরিচয়, তার পরিবারের ইতিহাস, তার বাবার মৃত্যুর সত্য—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র।

কিন্তু এখনও একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

‘আমার বাবার দেহ কোথায়?’

অর্ক মাথা নাড়ল।

‘আমি জানি না।’

‘তাহলে শশাঙ্ক জানে?’

‘সম্ভবত।’

অর্ক উঠে জানালার কাছে গেল।

‘ঋতু, তোমাকে একটা কথা বলতে হবে। শশাঙ্ক এখনও বেঁচে আছে। আর সে জানে, তুমি সত্যিটা জানতে শুরু করেছ।’

ঠিক তখনই বাইরে একটি গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

অর্ক জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থমকে গেল।

‘সে এসে গেছে।’

২. মুখোশের আড়ালে

গাড়ি থেকে নামলেন অনিরুদ্ধবাবু—ঋতুপর্ণাদের স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক।

তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। হাতে একটি কালো ব্যাগ। বাইরে থেকে তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি এমন কোনও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, দুর্নীতি এবং বারো বছরের পুরোনো রহস্য।

দরজায় টোকা পড়ল।

‘অর্ক, দরজা খোলো। আমি জানি তুমি ভিতরে আছ।’

অর্ক ঋতুপর্ণাকে পিছনে থাকতে ইশারা করল।

‘আপনি এখানে কেন এসেছেন?’

বাইরে থেকে শান্ত কণ্ঠে উত্তর এল, ‘শেষবারের মতো কথা বলতে।’

অর্ক দরজা খুলল না।

অনিরুদ্ধবাবু আবার বললেন, ‘তোমার বাবার মতো তুমিও ভুল করছ। সত্যি প্রকাশ করে তুমি কারও উপকার করতে পারবে না।’

অর্ক বলল, ‘সত্যি প্রকাশের অধিকার আমার আছে।’

‘তুমি কি ভেবেছ, শুধু কয়েকটা কাগজ দিয়ে এত বড় অপরাধ প্রমাণ করা যায়? অনেক আগেই সব নথি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।’

ঋতুপর্ণা এবার সামনে এসে দাঁড়াল।

‘আপনি কি শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়?’

বাইরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

‘হ্যাঁ।’

ঋতুপর্ণা দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।

অনিরুদ্ধবাবু ঘরে ঢুকে চারপাশে তাকালেন। তাঁর চোখে বিস্ময়ের কোনও চিহ্ন নেই। যেন তিনি জানতেন, এই দিন একদিন আসবেই।

‘তুমি অনেক কিছু জেনে গেছ, ঋতুপর্ণা,’ তিনি বললেন।

‘আমার বাবাকে কেন হত্যা করেছিলেন?’

শশাঙ্ক চেয়ারে বসে ব্যাগটা টেবিলে রাখলেন।

‘তোমার বাবা নিজের সীমা ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি এমন কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন নষ্ট হয়ে যেত।’

‘অপরাধীদের জীবন?’

শশাঙ্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না। পৃথিবীটা এত সরল নয়। অনেক সময় বড় স্বার্থ রক্ষা করতে কিছু ছোট অন্যায় মেনে নিতে হয়।’

ঋতুপর্ণা বলল, ‘আমার বাবার জীবন আপনার কাছে ছোট অন্যায় ছিল?’

শশাঙ্ক উত্তর দিলেন না।

অর্ক সামনে এগিয়ে এল।

‘সৌম্য দত্তকে আপনি নদীর ধারে ডেকেছিলেন। আপনি জানতেন, তিনি নথিগুলো পুলিশের হাতে তুলে দিতে চলেছেন। আপনি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলেন।’

‘আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম, কারণ তিনি নিজেই বিপদে পড়তেন।’

‘তারপর তাঁকে হত্যা করলেন?’

শশাঙ্কের চোখে এক মুহূর্তের জন্য ক্রোধ ঝলসে উঠল।

‘আমি তাঁকে হত্যা করিনি!’

‘তাহলে কে করেছিল?’

‘যে মানুষটি সেদিন নদীর ধারে ছিল, সে-ই জানে।’

ঋতুপর্ণা চমকে উঠল।

‘আর কে ছিল সেখানে?’

শশাঙ্ক ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে নদীর ধারে চারজন মানুষ। সৌম্য, অর্ক, নিবারণ এবং অয়ন। কিন্তু ছবির পেছনে আরেকজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে।

‘এই ছবিটা দেখো,’ তিনি বললেন।

ঋতুপর্ণা ছবিটা হাতে নিল।

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার ডান হাতে একটি বিশেষ আংটি দেখা যাচ্ছে—রুপোর ওপর কালো পাথর বসানো।

ঋতুপর্ণার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার মা একটি পুরোনো আংটি লুকিয়ে রাখতেন। সেই আংটির নকশাও একই রকম ছিল।

‘এই আংটি কার?’ সে জিজ্ঞাসা করল।

শশাঙ্ক বললেন, ‘তোমার বাবার নয়। আমারও নয়।’

‘তাহলে কার?’

শশাঙ্ক ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোমার মায়ের।’

ঋতুপর্ণার মাথার ভিতর যেন বজ্রপাত হল।

‘আপনি কী বলছেন?’

‘সেদিন নদীর ধারে তোমার মা-ও ছিলেন।’

অর্ক অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

‘অসম্ভব! মীরা কাকিমা তো বলেছিলেন, তিনি বাড়িতে ছিলেন।’

শশাঙ্ক মৃদু হেসে বললেন, ‘মানুষের স্মৃতি দিয়ে সব সত্যি মাপা যায় না। তোমার মা অনেক কিছু জানতেন। তিনি শুধু তোমাকে নয়, আমাদের সবাইকে একটি গল্প বিশ্বাস করিয়েছিলেন।’

ঋতুপর্ণা কাঁপা গলায় বলল, ‘আমার মা কি আমার বাবাকে হত্যা করেছিলেন?’

‘আমি তা বলিনি।’

‘তাহলে আংটি তাঁর কাছে ছিল কেন?’

শশাঙ্ক উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা গেল।

অয়ন ঘরে ঢুকে পড়ল। তার মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক।

‘আপনারা কেউ এখান থেকে বেরোবেন না,’ সে বলল। ‘পুলিশ আসছে।’

শশাঙ্ক উঠে দাঁড়ালেন।

‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, অয়ন। তুমি যে সত্যিটা জানো, সেটা সত্যির অর্ধেক।’

অয়ন বলল, ‘আমি জানি, আপনি সৌম্য দত্তের নথি চুরি করেছিলেন।’

‘আর তুমি জানো না, সেই নথিগুলো চুরি করতে আমাকে কে সাহায্য করেছিল।’

অয়ন চুপ করে গেল।

শশাঙ্ক এবার ঋতুপর্ণার দিকে তাকালেন।

‘তোমার মাকে দোষ দেওয়ার আগে তাঁর শেষ চিঠিটা পড়ো। সেটা তোমার বাড়ির পুরোনো কাঠের বাক্সে আছে।’

ঋতুপর্ণা আর অপেক্ষা করল না। সে অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে বাড়ি যেতে হবে।’

অর্ক মাথা নাড়ল।

‘আমি তোমার সঙ্গে যাব।’

শশাঙ্ক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যাও। তবে মনে রেখো, সত্যি সব সময় মানুষকে মুক্তি দেয় না। কখনও কখনও সত্যিই মানুষকে নিজের প্রিয়জনের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।’

৩. মায়ের শেষ স্বীকারোক্তি

বাড়িতে ফিরে ঋতুপর্ণা সরাসরি মায়ের ঘরে গেল।

কাঠের বাক্সটি আলমারির নীচে রাখা ছিল। সে বাক্সটা টেনে বের করল। ভিতরে পুরোনো শাড়ির নীচে একটি খাম। খামের ওপরে লেখা—

‘ঋতুর জন্য। যখন সে আর আমাকে প্রশ্ন করতে পারবে না।’

চিঠিটা খুলতে তার হাত কাঁপছিল।

‘আমার ঋতু,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে তুমি সেই সত্যির কাছে পৌঁছে গেছ, যেটা আমি সারা জীবন তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম।

আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তবু আজ সব বলতে চাই।

সৌম্য শুধু তোমার বাবা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। কিন্তু তাঁর একটি দুর্বলতা ছিল—তিনি ভাবতেন, সত্যি প্রকাশ করলেই অন্যায়ের অবসান হবে। তিনি বুঝতে পারেননি, অন্যায়ের শিকড় অনেক গভীরে।

সেদিন রাতে আমি নদীর ধারে গিয়েছিলাম। সৌম্য আমাকে বলেছিলেন, তিনি এমন কিছু প্রমাণ পেয়েছেন, যা দিয়ে বহু মানুষের অপরাধ প্রকাশ করা সম্ভব। আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম, শশাঙ্ক তাঁকে ছেড়ে দেবে না।

কিন্তু সৌম্য আমার কথা শোনেননি।

আমি যখন সেখানে পৌঁছই, তখন তর্ক শুরু হয়ে গেছে। শশাঙ্ক সৌম্যর হাত থেকে নথি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। অর্ক তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল। অয়নও সেখানে ছিল।

তারপর হঠাৎ ধস্তাধস্তি শুরু হয়। সৌম্য পিছিয়ে গিয়ে নদীর ধারে পড়ে যান। আমি তাঁর দিকে ছুটে গিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ আমাকে ধরে পিছনে টেনে নেয়।

আমি সৌম্যকে আর বাঁচাতে পারিনি।

আমি দেখেছিলাম, তিনি নদীর জলে তলিয়ে যাচ্ছেন। আমি চিৎকার করেছিলাম। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।

এরপর কী হয়েছিল, তার সবটা আমি জানি না। অর্কও নিখোঁজ হয়ে যায়। শশাঙ্ক আমাকে হুমকি দেয়—আমি যদি কাউকে কিছু বলি, তাহলে তোমার জীবনও বিপন্ন হবে।

আমি ভয়ে চুপ করে যাই।

আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল, আমি তোমাকে সত্যিটা বলিনি। তোমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়ার বদলে আমি তোমাকে সেই শহরেই রেখেছিলাম, যেখানে তোমার বাবার মৃত্যুর স্মৃতি প্রতিদিন তোমাকে ঘিরে থাকত।

অর্ক যখন তোমার জীবনে ফিরে আসে, তখন আমি বুঝেছিলাম, তোমার সামনে আবার সেই অতীত ফিরে এসেছে। আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম, যেন তোমাকে সত্যিটা না বলে। আমি ভেবেছিলাম, এভাবে তোমাকে রক্ষা করতে পারব।

আমি ভুল করেছিলাম।

সৌম্যকে কে নদীতে ফেলে দিয়েছিল, তা আমি নিজের চোখে স্পষ্ট দেখতে পাইনি। কিন্তু শশাঙ্কের হাতে আমি রক্ত দেখেছিলাম। আমি জানি না, সেই রক্ত কার ছিল।

ঋতু, তুমি যদি সত্যি জানতে চাও, শশাঙ্কের কথা শুনে থেমে যেয়ো না। অয়নের কথাও অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরো না। অর্ককেও প্রশ্ন করতে ভয় পেয়ো না।

তোমার জীবনের সত্যি তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে।

আমি তোমাকে ভালোবাসি।

— তোমার মা, মীরা।’

চিঠি পড়ে ঋতুপর্ণা দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তার মা সত্যিই নদীর ধারে ছিলেন। তিনি সব জানতেন, কিন্তু ভয়ের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। তবু চিঠিতে তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি। নিজের ভুল স্বীকার করেছেন।

ঋতুপর্ণা চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল।

অর্ক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

‘তুমি কি মাকে ঘৃণা করো?’ সে জিজ্ঞাসা করল।

ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।

‘না। আমি কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, ভয় মানুষকে এমন কিছু করায়, যা সে নিজেও কোনও দিন করতে চায়নি।’

‘তাহলে এখন কী করবে?’

ঋতুপর্ণা জানালার বাইরে তাকাল।

‘আমি সত্যিটা শেষ পর্যন্ত জানব।’

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

ঋতুপর্ণা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে অয়নের কণ্ঠস্বর এল।

‘ঋতুপর্ণা, আমি হাসপাতালে।’

‘আপনার কী হয়েছে?’

‘আমি ঠিক আছি। কিন্তু একটা খবর আছে। শশাঙ্ককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সে জেরার সময় একটা নাম বলেছে।’

‘কার নাম?’

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘সৌম্য দত্তের মৃত্যুর আসল সাক্ষী এখনও বেঁচে আছে। আর সেই সাক্ষী আপনার পরিবারেরই একজন।’

ঋতুপর্ণার গলা শুকিয়ে গেল।

‘কে?’

অয়ন বলল, ‘আপনার বাবা নিজে।’

ফোন কেটে গেল।

ঋতুপর্ণা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার বাবা কি সত্যিই বেঁচে আছেন?

৪. নদী যা ফিরিয়ে দেয়

সেদিন রাতেই ঋতুপর্ণা ও অর্ক আবার নদীর ধারে গেল।

কুয়াশা ঘন হয়ে এসেছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। পুরোনো ঘাটের সিঁড়িতে জল জমে আছে। দূরে একটি নৌকার আলো দেখা যাচ্ছে।

ঋতুপর্ণা বলল, ‘অয়ন বলেছে, বাবা বেঁচে আছেন।’

অর্ক দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

‘আমি জানি না, এটা সত্যি কি না।’

‘তুমি কি কখনও ভেবেছ, বাবা বেঁচে থাকতে পারেন?’

‘প্রথম কয়েক বছর ভেবেছিলাম। পরে সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

‘তাহলে এখন?’

অর্ক নদীর দিকে তাকাল।

‘এখন মনে হচ্ছে, আমাদের জানা সত্যির বাইরেও কিছু আছে।’

হঠাৎ নদীর ওপার থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

‘ঋতু!’

ঋতুপর্ণা স্থির হয়ে গেল।

এই কণ্ঠস্বর তার কাছে অপরিচিত নয়। ছোটবেলায় মায়ের কাছে যে কণ্ঠস্বরের গল্প শুনেছিল, যে কণ্ঠস্বরকে সে কখনও বাস্তবে শোনেনি, সেই কণ্ঠস্বর।

‘বাবা?’ তার ঠোঁট থেকে শব্দটা বেরিয়ে এল।

কুয়াশার মধ্যে একটি মানুষ এগিয়ে আসছে। পরনে সাদা শার্ট। হাতে কালো ছাতা। ধীরে ধীরে সে ঘাটের কাছে এসে দাঁড়াল।

তার মুখে বয়সের ছাপ। চুলে পাক ধরেছে। চোখের কোণে গভীর ক্লান্তি। কিন্তু মুখের গড়ন, চোখের দৃষ্টি—ঋতুপর্ণা জানে, এই মানুষটিকে সে কোথাও দেখেছে।

তার বাবার পুরোনো ছবিতে।

মানুষটি বললেন, ‘ঋতু, তুমি বড় হয়ে গেছ।’

ঋতুপর্ণা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে গেল।

‘আপনি কি আমার বাবা?’

মানুষটি উত্তর দিলেন না। শুধু পকেট থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করে তার হাতে দিলেন।

সৌম্য দত্ত।

ছবির মানুষটির সঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখের মিল স্পষ্ট।

অর্কও এগিয়ে এল।

‘বাবা!’

সৌম্য দত্ত তার দিকে তাকালেন। চোখে জল জমে উঠল।

‘অর্ক, আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।’

অর্ক বাবার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে রাগ, কষ্ট, অবিশ্বাস—সব একসঙ্গে।

‘আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?’

সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘যেখানে মৃত মানুষদের বেঁচে থাকতে হয়, কিন্তু নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে নেই।’

ঋতুপর্ণা বলল, ‘আপনি কি জানতেন, সবাই আপনাকে মৃত বলে বিশ্বাস করে?’

‘জানতাম।’

‘তাহলে ফিরে আসেননি কেন?’

সৌম্য মাথা নীচু করলেন।

‘আমি ফিরে এলে তোমাদের জীবন বিপন্ন হত। শশাঙ্ক আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। নদীর ধারে সেই রাতে আমি জলে পড়ে গিয়েছিলাম। একজন জেলে আমাকে উদ্ধার করে। পরে বুঝতে পারি, শশাঙ্ক আমাকে মৃত ভেবেছে। আমি সেই ভুলকে কাজে লাগিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করি।’

অর্ক বলল, ‘আপনি আমাদের জানাতে পারতেন।’

‘পারতাম। কিন্তু তখন তোমাদের খুঁজে বের করলেই শশাঙ্কের লোকেরা তোমাদের কাছে পৌঁছে যেত। আমি ভেবেছিলাম, সময় হলে ফিরে আসব।’

ঋতুপর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘সময় কখনও আসেনি, বাবা?’

সৌম্য তার দিকে তাকালেন।

‘আমি ভুল করেছি, ঋতু। তোমাকে রক্ষা করতে গিয়ে তোমার কাছ থেকে তোমার বাবাকেই কেড়ে নিয়েছিলাম।’

ঋতুপর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

‘আমি জানি না, আপনাকে কীভাবে ক্ষমা করব। আমি জানি না, এত বছর হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট কীভাবে ভুলব। কিন্তু আজ আমি আপনাকে আর হারাতে চাই না।’

সৌম্য মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

অর্কও তাদের পাশে এসে দাঁড়াল।

দীর্ঘ বারো বছরের বিচ্ছেদ, মিথ্যে পরিচয় আর গোপন অপরাধের অন্ধকারের মধ্যে এই প্রথম তিনজন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াল।

কিন্তু গল্পের শেষ এখনও হয়নি।

সৌম্য পকেট থেকে একটি ছোট খাম বের করলেন।

‘এটাই সেই শেষ চিঠি, যার জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছি।’

ঋতুপর্ণা খামটা খুলল।

ভিতরে একটি পুরোনো কাগজ। তাতে কয়েকটি নাম, কিছু তারিখ এবং একটি বাক্য লেখা—

‘শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায় একা ছিল না। তার সঙ্গে ছিল এমন একজন, যাকে এই পরিবার আজও বিশ্বাস করে।’

ঋতুপর্ণা বাবার দিকে তাকাল।

‘কে?’

সৌম্য নদীর ওপারের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।

‘যে মানুষটি এতক্ষণ আমাদের দেখছিল।’

তিনজন একসঙ্গে পিছন ফিরে তাকাল।

কুয়াশার মধ্যে একটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কালো ছাতা। মুখ দেখা যাচ্ছে না।

সৌম্য ফিসফিস করে বললেন, ‘সে এখনও আমাদের অনুসরণ করছে।’

অর্ক ঋতুপর্ণার হাত ধরে বলল, ‘চলো। এবার আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।’

তারা ঘাট ছেড়ে এগিয়ে গেল।

পিছনে নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে। কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে। দূরে কোথাও একটি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ঋতুপর্ণা একবার পিছনে তাকাল।

ছায়ামূর্তিটি আর নেই।

শুধু নদীর ধারে পড়ে আছে একটি কালো ছাতা।

ছাতার হাতলে সাদা অক্ষরে লেখা—

‘সব চিঠির উত্তর থাকে না। কিছু চিঠি নতুন রহস্যের জন্ম দেয়।’

ঋতুপর্ণা ছাতাটির দিকে আর তাকাল না।

সে জানত, তার জীবনে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। কিন্তু এবার সে আর অতীতের বন্দি নয়। সে নিজের চোখে সত্যি দেখেছে, নিজের কানে স্বীকারোক্তি শুনেছে, আর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখেছে।

কুয়াশার ওপারে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।

নদী তার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা বহু বছরের গোপন কথা ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কিছু রহস্য এখনও জলের নীচে ঘুমিয়ে আছে।

ঋতুপর্ণা জানত না, পরের চিঠিটা কখন আসবে।

তবে এবার সে অপেক্ষা করতে ভয় পায় না।

কারণ সে শিখেছে—সত্যি যত গভীরেই লুকিয়ে থাকুক, একদিন না একদিন তার পথ খুঁজে নেয়।

আর সেই পথের নামই জীবন।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : কুয়াশার ওপারে শেষ চিঠি (দ্বিতীয় পর্ব: নদী যাকে ফিরিয়ে দিল)।

১. মৃত মানুষের ডাক

‘মা!’

শব্দটা আবার ভেসে এল।

পুরোনো ডাকঘরের জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এবার আরও কাছে চলে এসেছে। চারপাশে জল, অথচ তার হাতে ধরা কালো ছাতাটিতে একফোঁটা জলও জমেনি।

ঋতুপর্ণা কাচের গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, বুকের ভিতরটা কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে।

তার বাবা মারা গিয়েছিলেন তার জন্মের আগেই—এ কথা সে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে। মায়ের মুখে বাবার গল্প খুব কম শুনেছে। শুধু জানত, তাঁর নাম ছিল সৌম্য দত্ত। তিনি নাকি রেল দপ্তরে কাজ করতেন। এক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, আর সেই ঘটনার পরেই ঋতুপর্ণার মা মীরা দত্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কিন্তু বাবার মৃত্যুর কোনও ছবি নেই। কোনও মৃত্যুসনদ সে কখনও দেখেনি। এমনকী তাঁর শেষকৃত্যের কথাও মা কখনও বলেননি।

আজ সেই মানুষই নদীর জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছেন!

‘বাবা?’ ঋতুপর্ণার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

পিছন থেকে অয়নের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

‘জানালার কাছে যাবেন না।’

ঋতুপর্ণা ঘুরে দাঁড়াল।

‘আপনি জানতেন?’

‘কী?’

‘ওখানে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার বাবার মতো দেখতে!’

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি শুধু এটুকু জানি, এই ডাকঘরে রাত বারোটার পর যা দেখা যায়, তা সব সময় বাস্তব নয়।’

‘তাহলে আপনি আমাকে এখানে আনলেন কেন?’

‘কারণ আপনাকে একটা চিঠি পড়তে হবে।’

অয়ন কাউন্টারের নীচ থেকে একটি লোহার বাক্স বের করল। বাক্সের গায়ে মরচে পড়েছে। তালার পাশে ছোট্ট অক্ষরে লেখা—‘সৌম্য দত্ত, ব্যক্তিগত নথি।’

ঋতুপর্ণার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

‘এটা আমার বাবার বাক্স?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি পেলেন কোথায়?’

‘হরিপদ মাইতির কাছ থেকে।’

‘কিন্তু উনি তো মারা গেছেন।’

‘মৃত্যুর আগে তিনি বাক্সটা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনার হাতে পৌঁছে দিতে।’

ঋতুপর্ণা চাবিটা বের করল। দেওয়ালঘড়ির পিছনে পাওয়া সেই চাবি। তালায় ঢোকাতেই বাক্সটা খুলে গেল।

ভিতরে কয়েকটি পুরোনো ছবি, রেল দপ্তরের পরিচয়পত্র, কিছু সরকারি কাগজ এবং একটি নীল খাম।

নীল খামের ওপরে লেখা—

‘আমার মেয়ে ঋতুর জন্য। যখন সে জানতে চাইবে, আমি কেন ফিরে আসিনি।’

ঋতুপর্ণার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

সে খামটা খুলল।

চিঠিতে লেখা—

‘ঋতু,

তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার কাছে আর থাকব না। কিন্তু আমি চাই না, তুমি কোনও দিন ভাবো যে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।

তোমার জন্মের সময় আমি একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রেল দপ্তরের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং এমন একটি দুর্ঘটনা, যার খবর কোনও দিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি।

আমি প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু প্রমাণগুলো নিয়ে বাড়ি ফেরার আগেই বুঝতে পারি, আমাকে অনুসরণ করা হচ্ছে।

তোমার মা আমাকে বলেছিল, সবকিছু ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। আমি পারিনি। কারণ যাদের জীবন ওই ঘটনার জন্য শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাদের সত্যিটা প্রকাশ করা আমার দায়িত্ব ছিল।

যদি কোনও দিন অর্ক সেনের নাম তোমার সামনে আসে, তাকে ঘৃণা কোরো না। সে আমার কাছে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

কিন্তু যদি অয়ন নামের কাউকে দেখো, তাকে আমার কথা বিশ্বাস করতে বলবে না। সে যা বলে, তার অর্ধেক সত্য আর অর্ধেক মিথ্যে।

আর সবচেয়ে বড় কথা—নদীর ধারে যে মানুষটিকে দেখবে, তাকে কখনও নিজের হাতে ছোঁয়ার চেষ্টা কোরো না।

জল সব সময় মৃত মানুষকে ফেরত দেয় না। কখনও কখনও সে শুধু আমাদের অপরাধবোধ ফিরিয়ে দেয়।

— তোমার বাবা, সৌম্য।’

চিঠিটা পড়ে ঋতুপর্ণা মাথা তুলল।

‘অর্ক আমার বাবাকে চিনত?’

অয়ন বলল, ‘চিনত।’

‘কীভাবে?’

‘কারণ আপনার বাবা অর্কের বাবার সহকর্মী ছিলেন।’

‘অর্কের বাবা কে ছিলেন?’

অয়ন উত্তর দিল না।

ঋতুপর্ণা আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আর আপনি? আপনি কে?’

অয়ন জানালার দিকে তাকাল।

বাইরের মানুষটি আর নেই। শুধু জল, কুয়াশা আর অন্ধকার।

অয়ন ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি এমন একজন মানুষ, যে বারো বছর আগে একটি ভুল করেছিল। সেই ভুলের জন্য একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল, একজন মানুষ মারা গিয়েছিল, আর একটি মেয়ের জীবন অপেক্ষার মধ্যে আটকে গিয়েছিল।’

‘আপনি কি অর্ককে মেরেছিলেন?’

অয়ন মুখ ফিরিয়ে তাকাল।

‘আমি জানি না অর্ক মারা গিয়েছিল কি না।’

ঋতুপর্ণা হতভম্ব হয়ে গেল।

‘আপনি কী বলছেন?’

অয়ন উত্তর দেওয়ার আগেই ডাকঘরের পুরোনো টেলিফোনটা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

টেলিফোনের তার বহু বছর আগে কেটে দেওয়া হয়েছিল। তবু ঘণ্টা বাজছে।

অয়ন রিসিভার তুলল।

ওপাশ থেকে একটা কর্কশ পুরুষকণ্ঠ বলল, ‘চিঠিটা কি ও পড়েছে?’

অয়ন বলল, ‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে এবার তাকে নদীর কাছে নিয়ে যাও।’

‘কিন্তু—’

‘কোনও কিন্তু নয়। বারো বছর আগে যে কাজ শেষ করতে পারোনি, আজ সেটা শেষ করো।’

লাইন কেটে গেল।

অয়ন ধীরে ধীরে রিসিভার নামিয়ে রাখল।

ঋতুপর্ণা বলল, ‘কে ফোন করেছিল?’

অয়ন কোনও উত্তর দিল না।

তারপর কাউন্টারের নীচ থেকে একটি টর্চ বের করে বলল, ‘আমাদের এখনই বেরোতে হবে।’

‘কোথায়?’

‘যেখানে অর্ক শেষবার দাঁড়িয়েছিল।’

২. নদীর ধারে তৃতীয় মানুষ

পুরোনো ডাকঘরের দরজা খুলতেই দেখা গেল, বাইরের রাস্তায় একফোঁটা জল নেই।

কিছুক্ষণ আগেও জানালার ওপারে যে জল উঠছিল, তার কোনও চিহ্ন নেই। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে, দূরে একটি কুকুর ঘুমোচ্ছে, আর বাতাসে ভেসে আসছে রাতের মাটির গন্ধ।

ঋতুপর্ণা একবার পিছনে তাকাল।

‘আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম?’

অয়ন বলল, ‘স্বপ্ন হলে ভালো হত।’

দুজন হাঁটতে শুরু করল।

শহরের শেষ প্রান্ত পেরিয়ে তারা পৌঁছল নদীর পুরোনো ঘাটে। বারো বছর আগে এখানেই অর্ক নিখোঁজ হয়েছিল।

ঘাটের পাশে একটি ভাঙা শিবমন্দির। তার পিছনে কাশবন। দূরে নদীর কালো জল বয়ে চলেছে। পূর্ণিমা না হলেও চাঁদের আলোয় জলের ওপর একটা সরু রুপোলি পথ তৈরি হয়েছে।

ঋতুপর্ণা থেমে গেল।

‘এখানে অর্ক নিখোঁজ হয়েছিল?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি সেদিন এখানে ছিলেন?’

অয়ন মাথা নাড়ল।

‘ছিলাম।’

‘তাহলে সব বলুন। সেদিন কী হয়েছিল?’

অয়ন ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়ল।

‘বারো বছর আগে অর্ক একটা নথি পেয়েছিল। সেই নথিতে রেল দপ্তরের একটি দুর্ঘটনার কথা ছিল। সরকারি নথিতে লেখা হয়েছিল, একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়েছিল। কিন্তু আসলে ওই রাতে যাত্রীবাহী একটি ছোট ট্রেনও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। কয়েকজন যাত্রী মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একজন সরকারি কর্মী, যিনি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতেন।’

ঋতুপর্ণা বলল, ‘আমার বাবা?’

‘হ্যাঁ। আপনার বাবা ওই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি কিছু নথি সংগ্রহ করেছিলেন। অর্ক সেই নথিগুলো খুঁজে পায়।’

‘কিন্তু আমার বাবা তো রেল দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন বলে শুনেছি।’

‘ওটাই ছিল সরকারি বক্তব্য।’

ঋতুপর্ণা শিউরে উঠল।

‘তাহলে সত্যিটা কী?’

অয়ন নদীর দিকে তাকাল।

‘আপনার বাবা নিখোঁজ হননি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।’

ঋতুপর্ণার চোখে জল এসে গেল।

‘কে করেছিল?’

‘আমি জানি না। কিন্তু অর্ক জানত।’

‘তাহলে অর্ক কেন আমাকে কিছু বলেনি?’

‘কারণ সে আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিল।’

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল, ‘সবাই আমাকে বাঁচানোর কথা বলে! অথচ কেউ আমাকে সত্যিটা বলে না!’

অয়ন চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, ‘সেদিন রাতে অর্ক আমাকে ফোন করেছিল। বলেছিল, তার কাছে প্রমাণ আছে। সে চেয়েছিল আমি ঘাটে আসি। আমি এসেছিলাম। কিন্তু আমার সঙ্গে আরেকজন ছিল।’

‘কে?’

‘একজন লোক, যার মুখ আমি কোনও দিন ভুলতে পারিনি।’

‘নাম?’

অয়ন পকেট থেকে একটি ছবি বের করল।

ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে অর্ক। একপাশে অয়ন। অন্য পাশে সেই সাদা শার্ট পরা লোকটি, যার হাতে কালো ছাতা।

লোকটির মুখ এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ঋতুপর্ণা ছবিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘এ তো…’

‘চিনতে পেরেছেন?’

ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।

লোকটি তাদের শহরের পুরোনো ডাকঘরের প্রধান কর্মী ছিলেন। নাম ছিল নিবারণ পাল। ছোটবেলায় ঋতুপর্ণা তাঁকে দেখেছে। তিনি তার বাবার বন্ধু ছিলেন বলে মা বলতেন।

কিন্তু নিবারণ পাল তো মারা গিয়েছিলেন দশ বছর আগে।

অয়ন বলল, ‘সেদিন তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। অর্ক বলেছিল, নিবারণবাবু তাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু ঘাটে পৌঁছনোর পর সবকিছু বদলে গেল।’

‘কী হয়েছিল?’

‘আমরা তর্ক করছিলাম। অর্ক বলছিল, নথি পুলিশের হাতে তুলে দেবে। নিবারণবাবু বলছিলেন, তাতে অনেক নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি হবে। আমি মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলাম।’

‘তারপর?’

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

‘একটা ধাক্কা। একটা চিৎকার। তারপর অর্ক নদীতে পড়ে গেল।’

ঋতুপর্ণা নিশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

‘আপনি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি?’

‘করেছিলাম। কিন্তু নদীর স্রোত খুব বেশি ছিল। আমি জলে নেমেছিলাম। অর্ককে আর খুঁজে পাইনি।’

‘আর নিবারণবাবু?’

‘তিনি চলে গিয়েছিলেন।’

ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে বলল, ‘তাহলে অর্ককে ধাক্কা দিয়েছিল কে?’

অয়ন তার দিকে তাকাল।

‘আমি জানি না।’

‘আপনি জানেন!’

‘আমি শপথ করে বলছি, আমি জানি না!’

ঋতুপর্ণা ছবিটা মুঠোয় চেপে ধরল।

‘আপনি এত বছর চুপ করে ছিলেন কেন?’

অয়ন মাথা নীচু করল।

‘কারণ আমার হাতেও রক্ত লেগেছিল।’

‘আপনি কি অর্ককে ধাক্কা দিয়েছিলেন?’

অয়ন উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই নদীর ওপার থেকে একটা আলো দেখা গেল।

একটি নৌকা ধীরে ধীরে এদিকে এগিয়ে আসছে। নৌকায় একজন মানুষ বসে আছেন। পরনে সাদা শার্ট, হাতে কালো ছাতা।

ঋতুপর্ণা উঠে দাঁড়াল।

‘নিবারণ পাল!’

অয়ন তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল।

‘চুপ!’

নৌকাটি ঘাটে এসে থামল।

লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। মুখে বয়সের ছাপ নেই। যেন বারো বছর আগের সেই ছবির মানুষটি।

তিনি ঘাটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অয়ন, তুমি অবশেষে তাকে নিয়ে এসেছ।’

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, ‘আপনি তো মারা গেছেন।’

লোকটি হাসলেন।

‘মানুষের মৃত্যু হয়, অয়ন। কিন্তু তার কাজের শেষ হয় না।’

ঋতুপর্ণা সামনে এগিয়ে গেল।

‘আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?’

নিবারণ পাল তার দিকে তাকালেন।

‘তোমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম সেই রাতে, যখন অর্ক নদীতে পড়েছিল।’

‘আপনি জানেন, আমার বাবার কী হয়েছিল?’

‘জানি।’

‘তাহলে বলুন!’

নিবারণ পাল ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোমার বাবা নদীতে মারা যাননি। তাঁকে এই নদীর ধারেই মাটির নীচে পুঁতে রাখা হয়েছিল।’

ঋতুপর্ণার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।

‘কোথায়?’

নিবারণ পাল ঘাটের পিছনের কাশবনের দিকে আঙুল তুললেন।

‘ওখানে।’

৩. মাটির নীচে লুকোনো নাম

রাত তখন প্রায় দুটো।

নিবারণ পাল নৌকা থেকে একটি কোদাল বের করলেন। অয়ন তাঁকে বাধা দিল।

‘আপনি যা করছেন, তা বন্ধ করুন।’

নিবারণ পাল বললেন, ‘বারো বছর আগে তুমি যা করতে পারোনি, আজ সেটা শেষ করতে হবে।’

‘আপনি বলেছিলেন, কেউ কোনও দিন জানতে পারবে না।’

‘আমি অনেক কথা বলেছিলাম। তার সবটাই মিথ্যে ছিল।’

ঋতুপর্ণা তাঁদের কথোপকথন শুনছিল। তার মাথার ভিতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—তার বাবা কি সত্যিই নদীর ধারে পুঁতে রাখা হয়েছিলেন?

নিবারণ পাল কাশবনের এক জায়গায় মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন।

কয়েক মিনিট পর কোদাল শক্ত কিছুতে আঘাত করল।

ঠক।

তিনি মাটি সরিয়ে একটি পুরোনো লোহার বাক্স বের করলেন।

বাক্সটি খুলতেই ভিতরে দেখা গেল কয়েকটি কাগজ, একটি পরিচয়পত্র এবং একটি ছোট্ট ডায়েরি।

পরিচয়পত্রে লেখা—সৌম্য দত্ত।

ঋতুপর্ণা বাক্সের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

‘এটা আমার বাবার?’

নিবারণ পাল মাথা নাড়লেন।

‘হ্যাঁ।’

‘তাঁর দেহ কোথায়?’

‘সেটা আমি জানি না।’

‘আপনি মিথ্যে বলছেন!’

নিবারণ পাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘তোমার বাবাকে সেদিন মেরে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু দেহটা কে সরিয়েছিল, তা আমি জানি না। আমি শুধু এই বাক্সটা লুকিয়ে রেখেছিলাম।’

ঋতুপর্ণা ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘যদি কেউ এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে বুঝবে আমি সত্যিটা বলতে পারিনি।’

পরের পাতায় কয়েকটি তারিখ। রেল দুর্ঘটনার বিবরণ। কিছু নাম। কিছু গোপন লেনদেনের হিসাব।

শেষের দিকে একটি পাতা ছেঁড়া।

তার ঠিক আগের পাতায় লেখা—

‘অর্ককে বাঁচাতে হলে ঋতুপর্ণাকে সবকিছু ভুলিয়ে দিতে হবে। কারণ সে ইতিমধ্যেই সত্যিটা জেনে গেছে।’

ঋতুপর্ণা থমকে গেল।

‘আমি সত্যিটা জেনেছিলাম?’

নিবারণ পাল বললেন, ‘হ্যাঁ।’

‘কখন?’

‘বারো বছর আগে।’

ঋতুপর্ণা মাথা নাড়ল।

‘অসম্ভব। আমার কিছুই মনে নেই।’

নিবারণ পাল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার মনে নেই, কারণ তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

‘কীভাবে?’

‘তোমাকে কোনও ওষুধ খাইয়ে নয়। তোমাকে বারবার এমন একটি গল্প শোনানো হয়েছিল, যাতে তুমি নিজের স্মৃতিকেই সন্দেহ করতে শুরু করো। তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলে, তোমার বাবা জন্মের আগেই মারা গেছেন। তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলে, অর্ক তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর একসময় তুমি নিজের দেখা ঘটনাগুলোকে স্বপ্ন বলে ভাবতে শুরু করেছিলে।’

ঋতুপর্ণা মাথায় হাত দিল।

তার স্মৃতির ভিতরে হঠাৎ কয়েকটি দৃশ্য ঝলসে উঠল।

বারো বছর আগের রাত।

অর্কের সঙ্গে তর্ক।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নিবারণ পাল।

একটি গাড়ির হেডলাইট।

তার বাবার কণ্ঠস্বর—‘ঋতু, বাড়ি চলে যা।’

তারপর একটা শব্দ।

ধপ!

আর নদীর জলে ছিটকে পড়া একটি মানুষ।

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল।

‘আমি দেখেছিলাম! আমি সব দেখেছিলাম!’

অয়ন তার দিকে এগিয়ে এল।

‘কী দেখেছিলেন?’

ঋতুপর্ণা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘সেদিন নদীতে অর্ক পড়েনি।’

অয়ন স্থির হয়ে গেল।

‘তাহলে?’

ঋতুপর্ণা চোখ তুলে তাকাল।

‘নদীতে পড়েছিল আমার বাবা।’

কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।

নিবারণ পাল কোদালটা মাটিতে রেখে দিলেন।

অয়ন ফিসফিস করে বলল, ‘না। এটা সম্ভব নয়।’

ঋতুপর্ণা ডায়েরির শেষ পাতাটা আবার পড়ল। তার মনে হচ্ছিল, মাথার ভিতর বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটা দরজা খুলে যাচ্ছে।

‘অর্ক আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। বাবা নদীতে পড়ে যাওয়ার পর অর্ক ঝাঁপ দিয়েছিল। কিন্তু আমি…’

তার গলা আটকে গেল।

‘আমি অর্ককে ধরে রাখতে পারিনি।’

নিবারণ পাল বললেন, ‘তোমাকে কেউ দোষ দেয়নি।’

ঋতুপর্ণা তাঁর দিকে তাকাল।

‘কিন্তু আপনি আমাকে সত্যিটা জানতে দেননি।’

নিবারণ পাল মাথা নীচু করলেন।

‘আমি ভয় পেয়েছিলাম।’

‘কাকে?’

‘যে মানুষটা তোমার বাবাকে হত্যা করেছিল, তাকে।’

ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

‘কে সে?’

নিবারণ পাল উত্তর দেওয়ার আগেই নদীর ওপার থেকে গুলির শব্দ এল।

একবার।

তারপর দ্বিতীয়বার।

নিবারণ পাল বুক চেপে মাটিতে পড়ে গেলেন।

অয়ন চিৎকার করে উঠল।

ঋতুপর্ণা তাঁর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নিবারণের জামায় রক্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে।

তিনি কষ্ট করে ঋতুপর্ণার হাত ধরলেন।

‘বাক্সের নীচে… একটা ছবি আছে।’

ঋতুপর্ণা বাক্সের ভিতর হাত ঢোকাল।

সত্যিই একটি ছবি রয়েছে।

ছবিতে চারজন মানুষ—সৌম্য দত্ত, নিবারণ পাল, অর্ক এবং অয়ন।

কিন্তু ছবির একেবারে পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন আরও একজন।

মুখটা স্পষ্ট।

ঋতুপর্ণা তাঁকে চিনতে পারল।

তিনি তাদের স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।

যিনি তিন বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

নিবারণ পাল শেষবারের মতো বললেন, ‘তিনি মারা যাননি, ঋতুপর্ণা। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। আর তিনিই জানেন, অর্ক কোথায়।’

তারপর তাঁর হাত ঢিলে হয়ে গেল।

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল।

অয়ন দ্রুত চারদিকে তাকাল। নদীর ওপারের কুয়াশার মধ্যে একটি ছায়া সরে যাচ্ছে।

‘আমাদের এখান থেকে যেতে হবে!’

ঋতুপর্ণা বাক্সটা তুলে নিল।

‘না। এবার আর পালাব না।’

অয়ন বলল, ‘আপনি বুঝতে পারছেন না, তারা আপনাকে মেরে ফেলবে।’

ঋতুপর্ণা শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘তাহলে এত বছর ধরে তারা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কেন?’

অয়ন কোনও উত্তর দিতে পারল না।

৪. স্কুলের শেষ ঘণ্টা

পরদিন সকালেই ঋতুপর্ণা স্কুলে গেল।

শহরের পুরোনো উচ্চবিদ্যালয়টি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। লাল ইটের ভবন, সামনে বড় মাঠ, মাঝখানে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। এই স্কুলেই শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায় প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ঋতুপর্ণার বাবা নাকি এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন—এ কথা সে ছোটবেলায় শুনেছিল।

কিন্তু শশাঙ্কবাবুর মৃত্যুর পর স্কুলের পুরোনো নথি গুদামঘরে সরিয়ে রাখা হয়। কেউ সেগুলো আর খুঁজে দেখেনি।

ঋতুপর্ণা সরাসরি প্রধান শিক্ষকের ঘরে গেল।

বর্তমান প্রধান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু তাকে দেখে অবাক হলেন।

‘কী ব্যাপার, ঋতুপর্ণা? আজ তো তোমার ক্লাস নেই।’

ঋতুপর্ণা বলল, ‘পুরোনো ভর্তি রেজিস্টারগুলো দেখতে চাই।’

‘কেন?’

‘শশাঙ্কবাবুর সময়কার।’

অনিরুদ্ধবাবু একটু থমকালেন।

‘সেগুলো তো গুদামঘরে আছে। অনেক পুরোনো কাগজ। কেন দরকার?’

‘একটা ব্যক্তিগত তদন্তের জন্য।’

অনিরুদ্ধবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চাবি বের করলেন।

‘চলো।’

গুদামঘরটা স্কুলের পিছনের দিকে। ধুলোমাখা আলমারি, ভাঙা বেঞ্চ, পুরোনো মানচিত্র আর কাগজের স্তূপ। অনিরুদ্ধবাবু একটি বড় কাঠের আলমারি খুলে দিলেন।

‘যা দরকার দেখে নাও।’

ঋতুপর্ণা একের পর এক রেজিস্টার খুলতে লাগল।

১৯৯৮।

১৯৯৯।

২০০০।

তারপর ২০১৪ সালের একটি পুরোনো ফাইল।

ফাইলের ভিতরে শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত নোটবুক। প্রথম কয়েকটি পাতা সাধারণ স্কুলের হিসাব। তারপর কিছু নাম, তারিখ এবং সংক্ষিপ্ত বাক্য।

একটি পাতায় লেখা—

‘সৌম্য দত্তের মেয়ে ঋতুপর্ণা। স্মৃতির সমস্যা এখনও আছে। তাকে পুরোনো ঘটনার কথা মনে করানো যাবে না।’

পরের পাতায়—

‘অর্ক সেনকে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। কিন্তু অয়নকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।’

তারপরের পাতায়—

‘যদি কখনও ঋতুপর্ণা সত্যিটা জানতে চায়, তাকে নদীর কাছে যেতে দিও না।’

ঋতুপর্ণা পাতাটা শক্ত করে ধরে রইল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

সে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ বলল, ‘ঋতুপর্ণা দত্ত?’

‘কে বলছেন?’

‘আমি শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।’

ঋতুপর্ণার হাত থেকে ফাইলটা পড়ে গেল।

‘কিন্তু আপনি তো মারা গেছেন!’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর কণ্ঠস্বর বলল, ‘সবাই তাই জানে।’

‘আপনি কোথায়?’

‘তোমার সামনে যে রেজিস্টারটা খোলা আছে, তার শেষ পাতাটা দেখো।’

ঋতুপর্ণা তাড়াতাড়ি পাতাগুলো উল্টে শেষ পাতায় পৌঁছল।

সেখানে একটি ঠিকানা লেখা।

চন্দ্রকোণা শহরের বাইরে, পরিত্যক্ত একটি রেলকোয়ার্টার।

শশাঙ্কবাবু বললেন, ‘সেখানে অর্ক আছে।’

ঋতুপর্ণার চোখে জল এসে গেল।

‘সে বেঁচে আছে?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু আর বেশি সময় নেই।’

‘কী হয়েছে তার?’

‘সেটা তোমাকে তার কাছ থেকেই শুনতে হবে।’

ঋতুপর্ণা কাঁপা গলায় বলল, ‘আমি এখনই আসছি।’

ফোনের ওপাশ থেকে শশাঙ্কবাবুর শেষ কথাটা ভেসে এল—

‘একটা কথা মনে রেখো। অর্ককে তুমি খুঁজে পাবে। কিন্তু যাকে তুমি এত দিন অর্ক বলে জেনে এসেছ, সে আসলে কে—সেই প্রশ্নের উত্তর তোমাকে নিজের কাছেই খুঁজতে হবে।’

লাইন কেটে গেল।

ঋতুপর্ণা ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার সামনে খোলা রেজিস্টারের শেষ পাতায় আরেকটি বাক্য লেখা ছিল—

‘এই তদন্তের আসল সাক্ষী ঋতুপর্ণা নয়। আসল সাক্ষী সেই মানুষ, যে বারো বছর ধরে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বেঁচে আছে।’

বাইরে স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল।

ঋতুপর্ণা জানালার দিকে তাকাল।

মাঠের ওপারে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা শার্ট। হাতে কালো ছাতা।

সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

মুখটা এবার স্পষ্ট দেখা গেল।

অর্ক সেন।

বারো বছর আগে যে মানুষটিকে সে হারিয়েছিল, সে-ই দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের মাঠে।

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়ল।

‘ঋতু, এবার বাড়ি চলো।’

ঋতুপর্ণা দৌড়ে দরজার দিকে গেল।

কিন্তু মাঠে পৌঁছে দেখল, সেখানে কেউ নেই।

শুধু কৃষ্ণচূড়ার নীচে পড়ে আছে একটি ভেজা চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

‘শেষ চিঠি পড়ার আগে কাউকে বিশ্বাস কোরো না।’

ঋতুপর্ণা খামটা খুলল।

ভিতরে মাত্র একটি লাইন—

‘তুমি যাকে অর্ক বলে ভালোবেসেছিলে, সে তোমার বাবা ছিল।’

ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল।

তারপর চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল।

দূরে, পরিত্যক্ত রেলকোয়ার্টারের দিকে একটি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

অথচ ওই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছে পনেরো বছর আগে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : কুয়াশার ওপারে শেষ চিঠি- (প্রথম পর্ব: যে চিঠি পৌঁছেছিল বারো বছর পরে)।

১. ডাকবাক্সের ভিতরে

ডাকপিয়নটি মারা যাওয়ার তিন দিন পর তাঁর বাড়িতে একটি চিঠি এসে পৌঁছল।

চিঠিটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। হলুদ হয়ে যাওয়া খাম, কোণায় পুরোনো ডাকটিকিট, আর নীল কালিতে লেখা একটি ঠিকানা। খামের ওপর প্রাপকের নাম—ঋতুপর্ণা দত্ত। ঠিকানাটি পশ্চিম মেদিনীপুরের ছোট্ট শহর চন্দ্রকোণার একটি পুরোনো বাড়ির।

কিন্তু চিঠিটির তারিখ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।

বারো বছর আগের তারিখ।

আর প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা ছিল—

অর্ক।

অর্ক সেন, যে বারো বছর আগে পাহাড়ি নদীতে ডুবে নিখোঁজ হয়েছিল।

ঋতুপর্ণার বয়স তখন উনিশ। অর্ক ছিল তার কলেজের সহপাঠী। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল, আর সেই বন্ধুত্ব যে কখন ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল, তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।

অর্ক নিখোঁজ হওয়ার পর তার দেহ পাওয়া যায়নি। পুলিশ দীর্ঘদিন খোঁজ চালিয়েছিল। পরে সরকারি নথিতে তাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়। ঋতুপর্ণা কোনও দিন তা মেনে নিতে পারেনি।

অর্কের পরিবার শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তার বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। মা এক আত্মীয়ের কাছে চলে যান। আর ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে নিজের জীবন গুছিয়ে নেয়। সে এখন একটি স্কুলে বাংলা পড়ায়। তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। পুরোনো বাড়িতে সে একাই থাকে।

বাইরের মানুষ তাকে শান্ত, সংযত, নিজের কাজে ডুবে থাকা একজন নারী বলেই জানে।

কেউ জানে না, প্রতি বছর বর্ষার প্রথম দিনে সে অর্কের পুরোনো ছবিটা বের করে।

কেউ জানে না, তার আলমারির একেবারে নীচের তাকে এখনও রাখা আছে অর্কের দেওয়া একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল।

আর কেউ জানে না, বারো বছর আগে অর্ক নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের রাতে ঋতুপর্ণা তাকে একটি কথা বলেছিল, যার উত্তর সে কোনও দিন পায়নি।

সেদিন অর্ক বলেছিল, ‘আমি ফিরে এসে সব বলব।’

তারপর সে আর ফেরেনি।

চিঠিটা হাতে নিয়ে ঋতুপর্ণা অনেকক্ষণ বসে রইল।

খামের গায়ে অর্কের হাতের লেখা। সেই একই বাঁকানো অক্ষর, একইভাবে ‘ঋ’ লেখার অভ্যাস। এত বছর পরেও সে ভুল করতে পারে না।

কাঁপা হাতে খামটা খুলল।

ভিতরে মাত্র একটি পাতার চিঠি।

‘ঋতু,

যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝবে আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউ আমাকে ফিরতে দেয়নি।

তুমি আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভেবো না।

আর একটা কথা মনে রেখো—যে রাতে আমি নিখোঁজ হয়েছিলাম, সেই রাতে নদীর ধারে আমরা দুজন ছাড়া আরও একজন ছিল।

তুমি তাকে দেখেছিলে। কিন্তু তোমার মনে নেই।

তোমার ঘরের পুরোনো দেওয়ালঘড়ির পিছনে যে চাবিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেটা এখনও আছে কি না দেখে নিও।

চাবিটা পেলে রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে এসো।

কাউকে সঙ্গে এনো না।

বিশ্বাস করো, ঋতু, আমি তোমাকে কখনও মিথ্যে বলিনি।

— অর্ক।’

চিঠিটা পড়া শেষ করে ঋতুপর্ণা বুঝতে পারল, তার হাত কাঁপছে।

দেওয়ালঘড়ির পিছনে চাবি?

সে তো কোনও দিন এমন চাবির কথা শোনেনি।

অথচ ঘড়িটা এখনও তার ঘরে রয়েছে। বহু বছর আগে বাবা কিনেছিলেন। ঘড়িটা চলে না, তবু সে ফেলে দেয়নি। অর্ক একবার মজা করে বলেছিল, ‘এই ঘড়ির মধ্যে যদি কোনও গুপ্তধন লুকিয়ে রাখি, তুই খুঁজে পাবি?’

ঋতুপর্ণা হেসে বলেছিল, ‘তুই গুপ্তধন রাখার আগে নিজেই হারিয়ে যাবি।’

কথাটা মনে পড়তেই তার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে ঘড়িটা দেওয়াল থেকে নামাল।

পিছনে ধুলো জমেছে। কাঠের খোলের নীচের দিকে একটা ছোট্ট ফাঁক। আঙুল ঢুকিয়ে টানতেই বেরিয়ে এল কালো কাপড়ে মোড়া একটি চাবি।

চাবির সঙ্গে বাঁধা ছোট্ট কাগজে লেখা—

‘বারো বছর অপেক্ষা করো।’

ঋতুপর্ণা চেয়ারে বসে পড়ল।

বারো বছর আগে অর্ক এই চাবি লুকিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু কেন?

আর চিঠিটা এত দিন পরে এল কীভাবে?

২. মৃত ডাকপিয়নের শেষ পথ

পরদিন সকালে ঋতুপর্ণা গেল স্থানীয় ডাকঘরে।

চিঠিটা যে ডাকপিয়নের হাত দিয়ে এসেছে, তাঁর নাম ছিল হরিপদ মাইতি। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে চিঠি বিলি করেছেন। তিন দিন আগে নিজের বাড়িতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

ডাকঘরের বর্তমান কর্মী সুমিত প্রথমে চিঠিটা দেখে বলল, ‘এটা তো পুরোনো চিঠি। নতুন করে কীভাবে এল, বুঝতে পারছি না।’

‘খামের ওপর কোনও নতুন ডাকঘরের সিল নেই,’ বলল ঋতুপর্ণা। ‘তাহলে এটা আপনারা পেলেন কোথায়?’

সুমিত রেজিস্টার ঘাঁটতে লাগল।

‘হরিপদ কাকু মারা যাওয়ার আগের দিন কিছু পুরোনো চিঠি জমা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এগুলো ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতে হবে। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো কোনও পুরোনো বস্তা থেকে পাওয়া।’

‘আর কোনও চিঠি ছিল?’

‘ছিল। বেশ কয়েকটা। কিন্তু সেগুলো অন্য এলাকার।’

ঋতুপর্ণা একটু ঝুঁকে বলল, ‘হরিপদবাবু কি এই চিঠির কথা কিছু বলেছিলেন?’

সুমিত মাথা নাড়ল।

‘শুধু বলেছিলেন, এই চিঠিটা যেন দেরি না করে পৌঁছে যায়। আর একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন।’

‘কী কথা?’

‘বলেছিলেন, “চিঠির মানুষটা ফিরে এসেছে।”’

ঋতুপর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘হরিপদবাবুর বাড়ি কোথায়?’

সুমিত ঠিকানাটা লিখে দিল।

বিকেলে ঋতুপর্ণা গেল হরিপদ মাইতির বাড়িতে। ছোট্ট টালির ঘর, সামনে তুলসীমঞ্চ, উঠোনে শুকোতে দেওয়া কাপড়। দরজায় বসে ছিলেন তাঁর বিধবা মেয়ে মঞ্জু।

ঋতুপর্ণা নিজের পরিচয় দিয়ে চিঠির কথা বলতেই মঞ্জু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘বাবা শেষ কয়েক মাস খুব অদ্ভুত আচরণ করছিলেন। মাঝরাতে উঠে পুরোনো চিঠির বাক্স খুলতেন। কখনও কখনও বলতেন, “আমি আর দেরি করতে পারব না। ওদের কাছে চিঠিগুলো পৌঁছে দিতেই হবে।”’

‘ওদের মানে?’

‘জিজ্ঞাসা করলেই চুপ করে যেতেন।’

মঞ্জু ভিতরে গিয়ে একটি পুরোনো টিনের বাক্স নিয়ে এল।

‘বাবা মারা যাওয়ার আগে এটা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কেউ যদি চিঠি নিয়ে আসে, তাকে বাক্সটা দেখাতে।’

বাক্সের ভিতরে অনেকগুলো খাম। অধিকাংশই পুরোনো, কিছু খোলা, কিছু বন্ধ। প্রত্যেকটির গায়ে আলাদা নাম লেখা।

ঋতুপর্ণা একটা খাম তুলে নিল।

তার নিজের নাম।

আরেকটি খামে লেখা—অর্ক সেন।

তৃতীয় খামটিতে লেখা—‘যে সত্য জানে’।

তার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।

‘এই চিঠিগুলো কত দিনের পুরোনো?’

মঞ্জু বলল, ‘বাবা বলতেন, সব চিঠি একই রাতে লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো কখনও বিলি করা যায়নি।’

‘কেন?’

মঞ্জু মাথা নাড়ল।

‘বাবা বলেননি। শুধু মৃত্যুর আগের রাতে একটা কথা বলেছিলেন—“নদী কাউকে ফেরত দেয় না, কিন্তু কখনও কখনও নদীর কাছ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হয়।”’

ঋতুপর্ণা টিনের বাক্সের দিকে তাকিয়ে রইল।

অর্কের চিঠির পাশে আরও একটি খাম রয়েছে। তার ওপর লেখা—

‘ঋতুপর্ণার জন্য। অর্কের চিঠি পড়ার পর খুলবে।’

সে খামটা হাতে নিল।

ভিতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

‘যদি অর্কের চিঠি পেয়ে থাকো, তাহলে রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে যেয়ো না।

ওখানে যে অপেক্ষা করছে, সে অর্ক নয়।’

ঋতুপর্ণার হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

দুটি চিঠি।

একটি তাকে পুরোনো ডাকঘরে যেতে বলছে।

অন্যটি নিষেধ করছে।

দুটিতেই তার নাম।

আর দুটিই যেন অর্ককে ঘিরে।

৩. বারো বছর আগের নদী

সন্ধ্যার পর ঋতুপর্ণা পুরোনো ছবির বাক্স খুলল।

অর্কের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো এখনও আছে। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান, পিকনিক, নদীর ধারে বসে থাকা, বইমেলায় ঘোরার ছবি। প্রতিটি ছবিতে অর্কের চোখে যেন কোনও গোপন কথা লুকিয়ে আছে।

একটি ছবির দিকে তাকিয়ে সে থেমে গেল।

ছবিটা তোলা হয়েছিল অর্ক নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে তারা দুজন। পিছনে কাশফুল, দূরে ছোট্ট নৌকা। ছবিতে ঋতুপর্ণা হাসছে, অর্ক তাকিয়ে আছে তার দিকে।

কিন্তু ছবির একেবারে ডানদিকে ঝাপসা একটি অবয়ব দেখা যাচ্ছে।

একজন মানুষ।

মুখ বোঝা যাচ্ছে না।

ঋতুপর্ণা ছবিটা আলোয় ধরল। বড় করে দেখার চেষ্টা করল।

লোকটির পরনে সাদা শার্ট। ডান হাতে কালো ছাতা।

তার মনে পড়ল, সেদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল। বৃষ্টি হয়নি। তবু নদীর ধারে একজন লোক ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে লোকটিকে দেখেছিল।

কিন্তু কে ছিল?

সেদিন অর্ক আচমকা বলেছিল, ‘ঋতু, যদি কোনও দিন আমার কথা ভুলে যাস, তাহলে নদীর কাছে যাস না।’

ঋতুপর্ণা হেসে বলেছিল, ‘নদীর সঙ্গে তোর কী শত্রুতা?’

অর্ক কোনও উত্তর দেয়নি।

বরং তার হাত ধরে বলেছিল, ‘একটা কথা বলবি?’

‘কী?’

‘যদি আমি হারিয়ে যাই, তুই কি আমাকে খুঁজবি?’

ঋতুপর্ণা বলেছিল, ‘তুই হারাবি কেন?’

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ।

তারপর বলেছিল, ‘কখনও কখনও মানুষ নিজে হারায় না, তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়।’

সেদিন কথাটার মানে বুঝতে পারেনি ঋতুপর্ণা।

আজ বুঝতে পারছে, অর্ক কিছু একটা জানত।

কিছু একটা, যা তার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত।

রাত এগারোটার দিকে সে পুরোনো ডাকঘরের ঠিকানা খুঁজতে বেরোল। ডাকঘরটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের প্রান্তে, নদীর পুরোনো ঘাটের কাছে, ভাঙাচোরা একতলা বাড়ি।

বাড়িটার সামনে পৌঁছে ঋতুপর্ণা থামল।

তার ফোনে সময়—রাত ১১টা ৪৮।

চিঠিতে লেখা ছিল রাত বারোটায় আসতে।

সে ভিতরে ঢুকল না। রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।

ঠিক তখনই একটা মোটরবাইক এসে থামল।

বাইক থেকে নামল এক যুবক। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে হালকা দাড়ি, পরনে কালো জ্যাকেট। সে চারদিকে তাকিয়ে ডাকঘরের দিকে এগোল।

ঋতুপর্ণা ছায়ার আড়াল থেকে দেখছিল।

যুবকটি দরজায় তিনবার টোকা দিল।

ভিতর থেকে দরজা খুলে গেল।

কেউ যেন তাকে ভিতরে টেনে নিল।

ঋতুপর্ণা আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে দৌড়ে দরজার কাছে গেল।

দরজাটা বন্ধ।

ভিতর থেকে কথা শোনা যাচ্ছে।

একটি পুরুষের গলা বলল, ‘তুমি দেরি করে ফেলেছ।’

অন্য কণ্ঠস্বরটি শুনে ঋতুপর্ণার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

অর্ক!

‘আমি ফিরে আসতে চাইনি,’ সেই কণ্ঠস্বর বলল। ‘কিন্তু এবার আমাকে আসতেই হল।’

ঋতুপর্ণা দরজায় ধাক্কা দিল।

‘অর্ক!’

ভিতরের কথাবার্তা থেমে গেল।

তারপর একেবারে নীরবতা।

সে আবার ডাকল, ‘অর্ক, আমি ঋতু!’

দরজার ওপাশ থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।

কেউ হাতল ধরল।

দরজাটা সামান্য খুলল।

ফাঁক দিয়ে একটি চোখ দেখা গেল।

ঋতুপর্ণা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

চোখটা অর্কের মতো।

কিন্তু দরজা খুলতেই সে পিছিয়ে গেল।

কারণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি অর্ক নয়।

সে সেই যুবক, যে কিছুক্ষণ আগে মোটরবাইক নিয়ে এসেছিল।

যুবকটি শান্ত গলায় বলল, ‘আপনি ঋতুপর্ণা দত্ত?’

‘হ্যাঁ। অর্ক কোথায়?’

যুবকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল, ‘অর্ক সেন বারো বছর আগে মারা গেছে।’

ঋতুপর্ণা কেঁপে উঠল।

‘তাহলে আমি ভিতরে ওর গলা শুনলাম কেন?’

যুবকটি উত্তর দিল না।

সে পকেট থেকে একটি ছবি বের করল। ছবিতে তিনজন মানুষ—অর্ক, সেই যুবক এবং সাদা শার্ট পরা একজন অচেনা লোক।

ছবির পিছনে লেখা—

‘যে রাতে একজন নিখোঁজ হয়েছিল, সেদিন আসলে দুজন মারা গিয়েছিল।’

ঋতুপর্ণা ছবিটা আঁকড়ে ধরল।

‘আপনি কে?’

যুবকটি বলল, ‘আমার নাম অয়ন। অর্ক আমার দাদা।’

‘কিন্তু অর্কের তো কোনও ভাই ছিল না!’

অয়ন মৃদু হেসে বলল, ‘সেটাই সবাইকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।’

তারপর সে ডাকঘরের ভিতরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি যদি সত্য জানতে চান, তাহলে আমার সঙ্গে আসুন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—আজ রাতের পর আপনি আর কোনও মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারবেন না।’

ঋতুপর্ণা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ভিতরে পা রাখল।

পুরোনো ডাকঘরের মেঝেতে ধুলো জমে আছে। দেয়ালে ঝুলছে ছেঁড়া ক্যালেন্ডার। কাউন্টারের পিছনে একটি কাঠের আলমারি। আলমারির দরজা খোলা, ভিতরে অসংখ্য চিঠি।

প্রতিটি চিঠির গায়ে একটি করে নাম।

ঋতুপর্ণা এগিয়ে গিয়ে দেখল, তার নামও লেখা আছে।

শুধু একটি নয়।

বারোটি খাম।

প্রতিটি খামের ওপর আলাদা তারিখ।

প্রথমটি বারো বছর আগের।

শেষটি আজকের তারিখে লেখা।

সে কাঁপা হাতে শেষ খামটা খুলল।

ভিতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

‘ঋতু,

আমি জানি, তুমি এখন এই ঘরে দাঁড়িয়ে আছ।

আমি জানি, তুমি অয়নের সঙ্গে দেখা করেছ।

কিন্তু অয়নকে বিশ্বাস কোরো না।

সে আমার ভাই নয়।

সে-ই সেই মানুষ, যে আমাকে নদীতে ঠেলে দিয়েছিল।

তোমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার পরিচয় চুরি করেছে।

আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যটা হল—

সেদিন নদীর ধারে যে দ্বিতীয় মানুষটি মারা গিয়েছিল, সে ছিল তোমার বাবা।’

ঋতুপর্ণার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল।

তার বাবা তো মারা গিয়েছিলেন তার জন্মেরও আগে!

তাহলে অর্কের চিঠিতে এই কথা কেন লেখা?

আর চিঠির লেখক যদি সত্যিই অর্ক হয়, তবে সে বারো বছর ধরে কোথায় ছিল?

ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

অয়ন তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে সেই একই শান্ত হাসি।

‘চিঠিটা পড়েছেন?’ সে জিজ্ঞাসা করল।

ঋতুপর্ণা কোনও উত্তর দিল না।

অয়ন বলল, ‘এবার আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।’

‘কোথায়?’

‘নদীর ধারে।’

‘আমি সেখানে যাব না।’

অয়নের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘আপনি না গেলেও হবে। কারণ নদী নিজেই আপনার কাছে চলে এসেছে।’

ঠিক তখনই পুরোনো ডাকঘরের সমস্ত জানালা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

বাইরে থেকে ভেসে এল জলের শব্দ।

প্রথমে মৃদু।

তারপর ক্রমশ প্রবল।

যেন একটা বিশাল নদী ডাকঘরের চারদিক ঘিরে ফেলছে।

ঋতুপর্ণা জানালার দিকে ছুটে গেল।

কাচের ওপারে জল উঠে আসছে।

রাস্তা, গাছ, বাড়ি—সবকিছু জলের নীচে ডুবে যাচ্ছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি ছিল দূরে।

জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।

পরনে ভেজা সাদা শার্ট।

ডান হাতে কালো ছাতা।

মুখটা অন্ধকারে ঢাকা।

লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

আর জানালার ওপার থেকে ঋতুপর্ণার নাম ধরে ডাকল—

‘মা!’

ঋতুপর্ণার পা থেকে যেন সমস্ত শক্তি চলে গেল।

কারণ সেই কণ্ঠস্বরটি কোনও অচেনা মানুষের নয়।

সেই কণ্ঠস্বরটি তার নিজের বাবার।

যে বাবাকে সে কোনও দিন দেখেনি।

চলবে…

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

মহীয়সী নারী: পি. কে. রোজি—ভারতীয় চলচ্চিত্রে জাতপাত ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লব।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের অবদান তাঁদের জীবদ্দশায় যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। সমাজের বৈষম্য, জাতপাতের বিভাজন এবং লিঙ্গভিত্তিক বাধার কারণে তাঁদের প্রতিভা অনেক সময় চাপা পড়ে গিয়েছে। তবু তাঁদের সাহস ও পথচলা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে। এমনই এক বিস্মৃত পথিকৃৎ হলেন পি. কে. রোজি—মালয়ালম চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের এক নারী অভিনেত্রী, যাঁর জীবন ভারতীয় সমাজের গভীরে থাকা বৈষম্যের কঠিন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে কেরালার সমাজে জাতপাতের বিভাজন ছিল অত্যন্ত কঠোর। সেই সময়ে একজন দলিত নারীর অভিনয়জগতে প্রবেশ করাই ছিল বিরল ঘটনা। তার ওপর চলচ্চিত্রে এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করা, যা প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল, তাঁকে আরও বড় প্রতিকূলতার সামনে দাঁড় করায়।

পি. কে. রোজির জীবন শুধু একজন অভিনেত্রীর সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি শিল্পের স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং ইতিহাসে প্রান্তিক মানুষের স্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

জন্ম ও শৈশব

পি. কে. রোজির জন্ম ১৯০৩ সালের দিকে তৎকালীন ত্রিবাঙ্কুর অঞ্চলে, যা বর্তমানে কেরালার অংশ। তাঁর জন্মনাম ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণভাবে তাঁকে দলিত সমাজের সঙ্গে যুক্ত একটি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তাঁর শৈশব এমন এক সামাজিক পরিবেশে কাটে, যেখানে জাতপাতের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা ও সুযোগ নির্ধারিত হতো। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রবেশ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

রোজির জীবনের প্রথম দিকের তথ্য খুব বেশি নথিবদ্ধ নেই। তাঁর পারিবারিক জীবন, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং শৈশবের বহু ঘটনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত। এই তথ্যের অভাব নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইতিহাসে প্রান্তিক মানুষের জীবন ও অবদান অনেক সময় যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি।

তবে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে তাঁর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ এবং নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উঠে এসেছে। অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে এমন এক পথে নিয়ে যায়, যা তাঁর সময়ের সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ

পি. কে. রোজি অভিনয় ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এমন এক সময়ে, যখন মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের জগৎ মূলত পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। নারীদের অভিনয় করাকে বহু সামাজিক গোষ্ঠী ভালো চোখে দেখত না। প্রান্তিক জাতির একজন নারীর পক্ষে এই জগতে প্রবেশ করা ছিল আরও কঠিন।

সেই সময়ে চলচ্চিত্রও আজকের মতো ব্যাপক জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়নি। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে অভিনয়ের মাধ্যমে গল্প প্রকাশ করা হতো। মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের ভাষা এবং দৃশ্যের বিন্যাস ছিল অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রোজি এই জগতে প্রবেশ করে নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ খুঁজেছিলেন। তাঁর অভিনয়জীবনের বিস্তারিত তথ্য সীমিত হলেও, মালয়ালম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় একটি ঐতিহাসিক কারণে—তিনি এমন একটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, যা মালয়ালম ভাষার প্রথম দিকের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম।

‘বিগাথাকুমারন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়

১৯২৮ সালে জে. সি. ড্যানিয়েল পরিচালিত Vigathakumaran বা ‘বিগাথাকুমারন’ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ছবিটি মালয়ালম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। পি. কে. রোজি এই ছবিতে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন বলে চলচ্চিত্র-ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

ছবিটির গল্পে রোজি সারোজিনী নামে এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সেই সময়ের সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষাপটে একজন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের নারীর পর্দায় অভিনয় করা ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ।

ছবিটির নির্মাণ ও প্রদর্শন ছিল সীমিত পরিসরের। সে সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো, অর্থ এবং প্রশিক্ষিত শিল্পীর অভাব ছিল। তবুও জে. সি. ড্যানিয়েল মালয়ালম ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন, আর রোজি সেই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।

কিন্তু ছবিটির প্রদর্শনের পর যে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা রোজির জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

জাতপাতের কঠোর বাস্তবতা

রোজির জীবনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, তাঁর অভিনয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সামাজিক প্রতিক্রিয়া। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়, ছবিতে উচ্চবর্ণের নারীর চরিত্রে একজন দলিত নারীর অভিনয় তৎকালীন সমাজের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

এখানে শুধু অভিনয়ের প্রশ্ন ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল জাতপাতের ভিত্তিতে কে কোন ভূমিকায় অভিনয় করতে পারবেন, কে কোন সামাজিক পরিচয় ধারণ করতে পারবেন এবং কার সাংস্কৃতিক প্রকাশের অধিকার থাকবে—এই গভীর বৈষম্যমূলক ধারণাগুলি।

চলচ্চিত্রে একজন অভিনেত্রী অন্য একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। শিল্পের স্বাভাবিক নিয়মেই অভিনেত্রী ও চরিত্রের সামাজিক পরিচয় এক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু রোজির ক্ষেত্রে এই সাধারণ শিল্পনৈতিক ধারণাটিও তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কারের সামনে বাধার মুখে পড়ে।

এই ঘটনা দেখায়, সমাজের বৈষম্য কখনও কখনও শিল্পের স্বাধীনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একজন মানুষের প্রতিভা ও কর্মকে মূল্যায়ন না করে তাঁর জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা হলে সৃজনশীলতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও জীবনসংগ্রাম

বিগাথাকুমারন প্রদর্শনের পর রোজিকে বিরূপ সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে বহু বিবরণে উল্লেখ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে জাতপাতের ভিত্তিতে আপত্তি ওঠে এবং তাঁর অভিনয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

তবে এই ঘটনার সব বিবরণ সমানভাবে নথিবদ্ধ নয়। কোন ঘটনাটি ঠিক কখন ঘটেছিল, কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং রোজির জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে কী কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে বিভিন্ন বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। তাই তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করার সময় ইতিহাসসম্মত সতর্কতা জরুরি।

যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো তাঁর অভিনয়জীবন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি এবং পরবর্তী সময়ে তিনি চলচ্চিত্রের মূলধারার ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়ে যান।

একজন শিল্পীর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও যদি সমাজ তাঁকে কাজ করার সুযোগ না দেয়, তাহলে সেই ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়; সমগ্র শিল্পজগতের। রোজির ঘটনা সেই সত্যকে সামনে আনে।

ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পী

পি. কে. রোজির জীবনের পরবর্তী পর্যায় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত। বিভিন্ন জীবনীতে বলা হয়, সামাজিক বিরোধিতার কারণে তাঁকে নিজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। তাঁর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে নানা কাহিনি প্রচলিত থাকলেও সব তথ্যকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

এই তথ্যের অভাব আমাদের ইতিহাসচর্চার একটি বড় সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের ইতিহাসে নির্মাতা, প্রযোজক এবং প্রযুক্তিগত দিকের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির নাম সংরক্ষিত হলেও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অভিনেত্রীদের জীবন সম্পর্কে তথ্য খুব কম পাওয়া যায়।

রোজির অবদান যদি যথাযথভাবে নথিবদ্ধ হতো, তাহলে তাঁর জীবন, কাজ এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হতো। তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু বিখ্যাত ব্যক্তিদের কীর্তি সংরক্ষণ করার বিষয় নয়; যাঁদের কণ্ঠ চাপা পড়েছে, তাঁদের জীবনও খুঁজে বের করা জরুরি।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব

পি. কে. রোজিকে মালয়ালম চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের নারী অভিনেত্রী এবং প্রথম নারী প্রধান চরিত্রাভিনেত্রীদের একজন হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর কাজ ভারতীয় চলচ্চিত্রে নারীর অংশগ্রহণের প্রাথমিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।

আজ চলচ্চিত্রে নারী অভিনেত্রীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও, একসময় তাঁদের অংশগ্রহণের পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। সামাজিক রক্ষণশীলতা, পরিবারের আপত্তি, পেশাগত নিরাপত্তার অভাব এবং নারীদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা তাঁদের সামনে বাধা তৈরি করত।

রোজির মতো নারীরা সেই বাধার মধ্যেই অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর জীবন দেখায়, চলচ্চিত্রের ইতিহাস কেবল ক্যামেরা, প্রযুক্তি বা ব্যবসার ইতিহাস নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং মানুষের অধিকার সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে আরও সম্পূর্ণভাবে দেখা।

নারী ও প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব

রোজির কাহিনি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—শিল্পে কারা নিজেদের গল্প বলতে পারবেন?

দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের মূলধারায় অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব সীমিত ছিল। অনেক সময় তাঁদের নিয়ে গল্প তৈরি হলেও তাঁদের নিজেদের কণ্ঠ ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে স্থান পায়নি।

একজন দলিত নারীর অভিনয় সেই সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। তাঁর উপস্থিতি দেখিয়েছিল, প্রান্তিক মানুষেরাও শিল্পের সক্রিয় স্রষ্টা হতে পারেন।

আজ চলচ্চিত্রে অন্তর্ভুক্তি, সমান সুযোগ এবং বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। রোজির জীবন এই আলোচনার ঐতিহাসিক ভিত্তি বুঝতে সাহায্য করে।

শিল্পে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে শুধু প্রতিভার প্রশংসা করলেই হবে না; এমন পরিবেশও তৈরি করতে হবে, যেখানে জন্মপরিচয় বা লিঙ্গের কারণে কাউকে পিছিয়ে পড়তে না হয়।

আধুনিক সময়ে রোজির পুনরাবিষ্কার

দীর্ঘদিন বিস্মৃত থাকার পর পি. কে. রোজির জীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চলচ্চিত্র-ইতিহাসবিদ, লেখক এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা মানুষ তাঁর অবদানকে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন।

ডিজিটাল যুগে তাঁর নাম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। তাঁর জীবন নিয়ে প্রবন্ধ, আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। তাঁকে স্মরণ করার মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি উপেক্ষিত অধ্যায় পুনরায় আলোচনায় এসেছে।

রোজিকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন অভিনেত্রীকে সম্মান জানানো নয়। এটি সেই সামাজিক বৈষম্যগুলিকে চিনে নেওয়ারও সুযোগ, যেগুলি একসময় তাঁর জীবন ও কর্মকে প্রভাবিত করেছিল।

ইতিহাসের ভুলে যাওয়া মানুষদের পুনরাবিষ্কার করা আমাদের বর্তমান সমাজকেও নতুন করে বুঝতে সাহায্য করে।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

পি. কে. রোজির জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথমত, প্রতিভার মূল্য জন্মপরিচয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। একজন মানুষের কাজ ও যোগ্যতাই তাঁর পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক মানুষের চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্র। সামাজিক কুসংস্কার দিয়ে এই ক্ষেত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়।

তৃতীয়ত, ইতিহাসে প্রান্তিক মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কোনও ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে তথ্য কম থাকলে তাঁকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর অবদান অনুসন্ধান করা জরুরি।

চতুর্থত, সমান সুযোগ ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের শিক্ষা, কাজ এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

উপসংহার

পি. কে. রোজির জীবন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অথচ দীর্ঘদিন অবহেলিত অধ্যায়। মালয়ালম চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের প্রধান নারী অভিনেত্রীদের একজন হিসেবে তিনি এমন সময়ে অভিনয় করেছিলেন, যখন জাতপাত ও লিঙ্গবৈষম্য মানুষের স্বাধীনতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করত।

তাঁর জীবন সম্পর্কে বহু তথ্য আজও অজানা। তবু যে ইতিহাস আমাদের সামনে রয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়, তাঁর অভিনয় শুধু চলচ্চিত্রের একটি ভূমিকা ছিল না; সেটি ছিল সামাজিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ।

তাঁর কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের পাতায় যাঁদের নাম কম লেখা হয়েছে, তাঁদের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং তাঁদের জীবন অনুসন্ধান করলে সমাজের এমন অনেক সত্য সামনে আসে, যা মূলধারার ইতিহাসে উপেক্ষিত থেকে গিয়েছে।

পি. কে. রোজি তাই শুধু মালয়ালম চলচ্চিত্রের এক বিস্মৃত অভিনেত্রী নন; তিনি শিল্পের স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকারের এক স্মরণীয় প্রতীক।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

মহীয়সী নারী: বেগম হজরত মহল — ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে স্বাধীনতার এক দুর্ধর্ষ প্রতীক।

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন অনেক নারী রয়েছেন, যাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের কথা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। কেউ কলম হাতে সমাজের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করেছেন, কেউ শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন বেগম হজরত মহল—১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের এক গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী।

অযোধ্যা বা আওধের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন আওধ দখল করে নেয়, তখন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন। নিজের পুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর সংগ্রাম শুধু রাজপরিবারের ক্ষমতা রক্ষার লড়াই ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সম্মান, অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতীক।

বেগম হজরত মহলের জীবন আমাদের শেখায়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শুধু ক্ষমতা বা পদমর্যাদা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সাহস, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং নিজের অবস্থানের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর মানসিকতা।

শৈশব ও জীবনের প্রথম অধ্যায়

বেগম হজরত মহলের জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্যের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর জন্মের নাম ছিল মুহাম্মদি খানম। তিনি এমন এক সামাজিক পরিবেশ থেকে উঠে এসেছিলেন, যেখানে রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার আগে তাঁর জীবনে নানা পরিবর্তন ঘটেছিল।

পরবর্তীকালে তিনি আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের সঙ্গে বিবাহসূত্রে যুক্ত হন। নবাব তাঁকে ‘হজরত মহল’ উপাধি দেন। তাঁদের পুত্র ছিলেন বিরজিস কদর।

আওধের রাজধানী লখনউ তখন শিল্প, সংগীত, সাহিত্য, নৃত্য এবং সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলে সাংস্কৃতিক জীবন সমৃদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের পাশাপাশি রাজ্যটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় রাজ্যগুলির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল। আওধও সেই সম্প্রসারণবাদী নীতির বাইরে ছিল না।

ব্রিটিশদের আওধ দখল

১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আওধ দখল করে নেয়। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রাজ্যটির প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ বলে দাবি করেছিল। কিন্তু এই দখলের পেছনে কোম্পানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে কলকাতায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। এই ঘটনার ফলে রাজপরিবারের রাজনৈতিক ক্ষমতা ভেঙে পড়ে এবং রাজ্যের বহু অভিজাত, সৈনিক, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

ব্রিটিশ শাসনের এই সম্প্রসারণ শুধু একটি রাজপরিবারের ক্ষমতা হ্রাস করেনি; আওধের প্রচলিত প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বহু মানুষের জীবিকা ও মর্যাদা বিপন্ন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বেগম হজরত মহল নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি। স্বামীর নির্বাসনের পর তিনি আওধের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ

১৮৫৭ সালে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু হয়। ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষ, দেশীয় রাজ্য দখল, প্রশাসনিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক আশঙ্কা—বিভিন্ন কারণ এই বিদ্রোহের পেছনে কাজ করেছিল।

মিরাট থেকে শুরু হওয়া বিদ্রোহ দ্রুত দিল্লি, কানপুর, ঝাঁসি, লখনউ এবং উত্তর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের চরিত্র সব অঞ্চলে একরকম ছিল না। কোথাও সিপাহিরা নেতৃত্ব দেন, কোথাও দেশীয় শাসক ও জমিদারেরা যুক্ত হন, আবার কোথাও সাধারণ মানুষও প্রতিরোধে অংশ নেন।

আওধে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বিশেষ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ, মাত্র এক বছর আগেই ব্রিটিশরা রাজ্যটি দখল করেছিল। ফলে রাজপরিবারের সমর্থক, প্রাক্তন সৈনিক এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল।

এই সংকটের সময় বেগম হজরত মহল গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

পুত্র বিরজিস কদরকে সিংহাসনে বসানো

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় বেগম হজরত মহল তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র বিরজিস কদরকে আওধের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজে কার্যত শাসন ও প্রতিরোধের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল গভীর। ব্রিটিশরা আওধ দখল করে নবাবের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। বিরজিস কদরকে সিংহাসনে বসানোর মাধ্যমে বেগম হজরত মহল সেই দখলদারির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানান।

তাঁর নেতৃত্বে লখনউকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধ সংগঠিত হয়। বিদ্রোহী সৈনিক ও স্থানীয় সমর্থকদের একত্রিত করা, রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ছিল এই সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন নারী হিসেবে এমন অস্থির সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুদ্ধ, প্রশাসন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে তাঁকে একই সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

লখনউয়ের প্রতিরোধে তাঁর ভূমিকা

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে লখনউ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্রোহী শক্তির মধ্যে সেখানে দীর্ঘ সংঘর্ষ চলে। বেগম হজরত মহল এই প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।

তাঁর নেতৃত্বে আওধের বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেন। এই প্রতিরোধে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল। ফলে আন্দোলনটি কেবল রাজপরিবারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিস্তৃত অসন্তোষ।

বেগম হজরত মহল রাজনৈতিক ঘোষণা ও বক্তব্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নীতির বিরোধিতা করেন। তিনি বিদেশি শাসনের অধীনে আওধের অধিকার ও মর্যাদা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন।

তাঁর সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু প্রতীকী প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে থেকে প্রতিরোধ পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন।

ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে প্রতিরোধ

ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের সময় বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হয়ে উঠেছিল। তবে আওধের প্রতিরোধে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়।

বেগম হজরত মহলের সংগ্রামকে বোঝার ক্ষেত্রে এই বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজ্য দখল, প্রশাসনিক পরিবর্তন, সৈনিকদের অসন্তোষ এবং জীবিকা হারানোর আশঙ্কা নানা গোষ্ঠীকে একত্রিত করেছিল।

তাঁর নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে আওধের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি সামনে আসে। এই কারণে তিনি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর সংগ্রামকে কেবল রাজপরিবারের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে তার সম্পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যায় না।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ

বেগম হজরত মহল ব্রিটিশ শাসনের নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ঘোষণার বিরোধিতা করে তিনি নিজের রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরেন।

১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রানির ঘোষণার মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের পরিবর্তে ভারতের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে আসে। এই ঘোষণায় দেশীয় রাজ্য, ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং প্রজাদের প্রতি আচরণ সম্পর্কে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

বেগম হজরত মহল ব্রিটিশদের এই নীতির আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে ব্রিটিশ শাসনের দ্বিচারিতা এবং ভারতীয় রাজ্যগুলির ওপর তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারের প্রবণতা উঠে আসে।

এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে তিনি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাবলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনমত গঠনের গুরুত্বও বুঝতেন।

পরাজয় ও নেপালে আশ্রয়

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ শক্তির কাছে পরাজিত হয়। ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে লখনউ ও আওধের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পুনর্দখল করে। বিদ্রোহীদের পক্ষে সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে বেগম হজরত মহলকে আওধ ছেড়ে চলে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নেপালে আশ্রয় নেন। নির্বাসিত জীবন তাঁর সংগ্রামের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।

নিজের জন্মভূমি ও রাজনৈতিক কেন্দ্র থেকে দূরে থাকার পরও তিনি ব্রিটিশ কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে ফিরে আসেননি। নেপালেই তিনি জীবনের শেষ সময় কাটান।

১৮৭৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সাধারণভাবে স্বীকৃত। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকলেও, ইতিহাসে তাঁর প্রতিরোধের স্মৃতি মুছে যায়নি।

একজন নারী নেত্রীর অসাধারণ সাহস

বেগম হজরত মহলের জীবনের বিশেষত্ব হলো, তিনি এমন এক সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন রাজনীতি ও যুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্রগুলি সাধারণত পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

তাঁর সামনে ছিল একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ—স্বামীর নির্বাসন, রাজ্যের দখল, অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্রের ভবিষ্যৎ, ব্রিটিশ সামরিক শক্তির মোকাবিলা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাসিত জীবন।

এসব পরিস্থিতির মধ্যে তিনি যে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা তাঁর দৃঢ়তা ও সাহসের পরিচয় বহন করে।

তাঁর জীবন নারীদের নেতৃত্বের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, সংকটের মুহূর্তে একজন নারীও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিরোধ সংগঠিত করা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

ইতিহাসে বেগম হজরত মহলের স্থান

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই বিদ্রোহ পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি একরকম ছিল না; এর লক্ষ্য, নেতৃত্ব ও সামাজিক ভিত্তি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ছিল। তবু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিস্তৃত প্রতিরোধ হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

বেগম হজরত মহল এই বিদ্রোহের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নারী নেতা। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের মতো তিনিও ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, তবে তাঁর সংগ্রামের কেন্দ্র ছিল আওধ ও লখনউয়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, ভারতের প্রতিরোধের ইতিহাস শুধু কয়েকজন বিখ্যাত পুরুষ নেতার ইতিহাস নয়। বিভিন্ন অঞ্চলের নারী-পুরুষ, সৈনিক, কৃষক, অভিজাত এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা ও স্বার্থ থেকে এই প্রতিরোধে অংশ নিয়েছিলেন।

এই বৃহত্তর ইতিহাসের মধ্যে বেগম হজরত মহলের অবদান বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

বেগম হজরত মহলের জীবন থেকে আজকের প্রজন্ম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারে।

প্রথমত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস থাকা জরুরি। পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও নিজের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে দৃঢ় থাকা মানুষের অন্যতম বড় শক্তি।

দ্বিতীয়ত, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা ভোগ করা নয়। সংকটের সময় দায়িত্ব গ্রহণ করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।

তৃতীয়ত, ইতিহাসকে বহুমাত্রিকভাবে জানতে হবে। একটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে অনেক মানুষের ভূমিকা থাকে। তাঁদের প্রত্যেকের অবদান জানলে ইতিহাস আরও পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে।

চতুর্থত, নারীর ক্ষমতা ও সক্ষমতাকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। বেগম হজরত মহলের জীবন দেখায়, নারীও রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিতে পারেন।

উপসংহার

বেগম হজরত মহল ছিলেন ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের এক সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী। ব্রিটিশদের হাতে আওধ দখল, নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের নির্বাসন এবং রাজ্যের রাজনৈতিক অধিকার হারানোর পর তিনি প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছিলেন। পুত্র বিরজিস কদরকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগঠিত করেন।

শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের দেশ ছেড়ে নেপালে আশ্রয় নিতে হলেও তাঁর সংগ্রাম ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সাফল্য সব সময় বিজয়ের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। কখনও কখনও পরাজয়ের মধ্যেও এমন সাহস ও আত্মমর্যাদার পরিচয় থাকে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।

আজ যখন আমরা ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস স্মরণ করি, তখন বেগম হজরত মহলের অবদানও যথাযোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে নিজের অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়াই করাই প্রকৃত সাহসের পরিচয়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

মহীয়সী নারী: বুলা চৌধুরী — জলের বুকে সাহস ও অধ্যবসায়ের এক অনন্য নাম।।

জল কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল। কখনও তার বুকে রোদের ঝিলিক, আবার কখনও ঢেউয়ের পর ঢেউ মানুষের সাহসকে পরীক্ষা করে। সেই জলরাশির বুক চিরে যাঁরা এগিয়ে যান, তাঁদের কাছে সাঁতার শুধু একটি খেলা নয়—এ এক কঠিন মানসিক পরীক্ষা, আত্মবিশ্বাসের লড়াই এবং অসাধ্যকে সাধন করার সাধনা। ভারতের সাঁতারের ইতিহাসে এমনই এক উজ্জ্বল নাম বুলা চৌধুরী।

পশ্চিমবঙ্গের এই কৃতী সাঁতারু দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ক্রীড়াজগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। সুইমিং পুলের নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে, বিশাল সমুদ্রের অনিশ্চিত জলরাশিতে দীর্ঘ দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর জীবন শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রের সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি।

শৈশব থেকেই জলের সঙ্গে বন্ধুত্ব

বুলা চৌধুরীর জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গে। ছোটবেলা থেকেই সাঁতারের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। অল্প বয়সেই তিনি সাঁতারের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে থাকেন।

সাঁতার এমন একটি খেলা, যেখানে সাফল্য পেতে হলে শরীরের শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন, শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ এবং মানসিক দৃঢ়তা। ছোটবেলা থেকেই এই বিষয়গুলির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখেছিলেন বুলা।

প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে ভালো ফল করার জন্য প্রতিদিনের অনুশীলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই কৌশল বারবার রপ্ত করা, নিজের সময়ের উন্নতি ঘটানো এবং শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। এই ধারাবাহিক অনুশীলনই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাফল্যের ভিত তৈরি করে।

প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে সাফল্য

বুলা চৌধুরী অল্প বয়সেই জাতীয় স্তরের সাঁতার প্রতিযোগিতায় নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেন এবং ভারতীয় সাঁতারের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

তাঁর ক্রীড়াজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে বিশেষ দক্ষতা অর্জন। সাধারণত সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সময় পরিবেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকে। সেখানে জলের তাপমাত্রা, দূরত্ব এবং প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া যায়।

কিন্তু খোলা সমুদ্রে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে ঢেউ, স্রোত, জলের তাপমাত্রা, আবহাওয়া এবং দৃশ্যমানতার পরিবর্তন সাঁতারুকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। তাই দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে শুধু দ্রুত সাঁতার কাটতে পারলেই হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা।

বুলা চৌধুরী এই কঠিন ক্ষেত্রেই নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন।

ইংলিশ চ্যানেল জয়

বুলা চৌধুরীর ক্রীড়াজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হওয়া।

ইংলিশ চ্যানেল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যবর্তী একটি জলপথ। এই পথ পাড়ি দেওয়া দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারুদের কাছে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। দূরত্বের পাশাপাশি সমুদ্রের স্রোত, ঠান্ডা জল, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক শক্তি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা এই সাঁতারকে কঠিন করে তোলে।

বুলা চৌধুরী ১৯৮৯ সালে প্রথমবার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। এই সাফল্য তাঁকে দেশের ক্রীড়ামহলে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।

পরবর্তীকালে ১৯৯৯ সালে তিনি আবারও ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন। দুইবার এই কঠিন জলপথ পাড়ি দেওয়ার সাফল্য তাঁর দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ বহন করে।

ইংলিশ চ্যানেল জয় কেবল একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করা নয়। এর জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্থিরতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা দরকার। বুলার এই সাফল্য প্রমাণ করে, লক্ষ্য স্থির রেখে ধারাবাহিক পরিশ্রম করলে কঠিন বাধাও অতিক্রম করা সম্ভব।

সাত সমুদ্রের চ্যালেঞ্জ

বুলা চৌধুরীর পরিচিতি শুধু ইংলিশ চ্যানেল জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্য তাঁকে ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য মহিলা সাঁতারু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

খোলা সমুদ্রে সাঁতার কাটার সময় একজন সাঁতারুকে নিজের শরীরের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার ফলে ক্লান্তি আসে, পেশিতে চাপ পড়ে এবং মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে থাকে স্রোত ও ঢেউয়ের অনিশ্চয়তা।

এই পরিস্থিতিতে সাঁতারুর মানসিক শক্তি অনেক সময় শারীরিক শক্তির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বুলা চৌধুরীর সাফল্য দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং আত্মবিশ্বাসের সাহায্যে এই চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করা সম্ভব।

তাঁর কৃতিত্ব ভারতীয় মহিলাদের জন্য আন্তর্জাতিক জলক্রীড়ার জগতে নতুন সম্ভাবনার দিকও তুলে ধরে।

খোলা সমুদ্রে সাঁতার: কেন এত কঠিন?

বুলা চৌধুরীর সাফল্য বুঝতে হলে দীর্ঘ দূরত্বের খোলা জলের সাঁতারের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

প্রথমত, সমুদ্রের স্রোত সাঁতারুর অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে। কখনও স্রোত অনুকূলে থাকে, আবার কখনও বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়। ফলে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ঠান্ডা জলে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং অভিজ্ঞ সহায়ক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, দীর্ঘক্ষণ একই ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করার কারণে ক্লান্তি ও পেশির টান দেখা দিতে পারে। সাঁতারুকে নিজের শক্তি এমনভাবে ব্যবহার করতে হয়, যাতে শুরুতেই অতিরিক্ত পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে না পড়েন।

চতুর্থত, খোলা সমুদ্রে পরিবেশ সব সময় পূর্বানুমানযোগ্য নয়। আবহাওয়া বদলে যেতে পারে, ঢেউ বেড়ে যেতে পারে কিংবা স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে।

এই সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাই একজন দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারুকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বুলা চৌধুরীর জীবন সেই কঠিন প্রস্তুতি ও মানসিক দৃঢ়তারই পরিচয় বহন করে।

নারী ক্রীড়াবিদ হিসেবে পথচলা

ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আজ অনেক বেড়েছে। কিন্তু প্রত্যেক সময়েই নারীদের সামনে সমান সুযোগ ছিল না। প্রশিক্ষণ, পরিকাঠামো, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক স্বীকৃতি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারের মতো কঠিন ক্রীড়াক্ষেত্রে একজন মহিলা খেলোয়াড়কে নিজের দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয় দিতে হয়। দীর্ঘ সময় জলে থাকা, কঠোর অনুশীলন এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়।

বুলা চৌধুরীর সাফল্য দেখিয়েছে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে ভারতীয় মহিলারাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেন।

তাঁর জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের মেয়েরা শিখতে পারে, কোনো ক্ষেত্রকে শুধু পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট বলে ভাবার প্রয়োজন নেই। নিজের আগ্রহ, দক্ষতা এবং অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে এগিয়ে গেলে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।

সম্মান ও স্বীকৃতি

বুলা চৌধুরীর ক্রীড়া-অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত করেছে। ১৯৯০ সালে তিনি অর্জন করেন অর্জুন পুরস্কার। পরে ২০০৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করা হয়।

এই সম্মানগুলি তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি হলেও, তার গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। এগুলি দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারের মতো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ক্রীড়াক্ষেত্রের প্রতিও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ক্রীড়াবিদদের সাফল্য অনেক সময় শুধু পদক বা পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ান এবং দেশের ক্রীড়া-পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেন। বুলা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও এই কথাটি প্রযোজ্য।

রাজনীতিতে প্রবেশ ও জনজীবন

ক্রীড়াজীবনের পাশাপাশি বুলা চৌধুরী পরবর্তী সময়ে জনজীবনেও অংশগ্রহণ করেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিধায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

একজন ক্রীড়াবিদের জনজীবনে প্রবেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খেলাধুলার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত কিছু গুণ—যেমন শৃঙ্খলা, লক্ষ্য স্থির রাখা, পরিশ্রম এবং চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া—জনসেবার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

অবশ্য ক্রীড়াক্ষেত্র ও রাজনীতির কাজের ধরন এক নয়। কিন্তু বুলা চৌধুরীর জীবন দেখায়, একজন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন।

তাঁর পরিচয় তাই শুধু একজন সাঁতারু হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রের বাইরেও জনজীবনে ভূমিকা রেখেছেন।

নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর শিক্ষা

বুলা চৌধুরীর জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথম শিক্ষা—নিয়মিত অনুশীলনের বিকল্প নেই। বড় সাফল্য সাধারণত একদিনে আসে না। ছোট ছোট প্রচেষ্টা, প্রতিদিনের অনুশীলন এবং নিজের ভুল সংশোধনের মধ্য দিয়েই দক্ষতা তৈরি হয়।

দ্বিতীয় শিক্ষা—ভয়কে বুঝতে হবে, কিন্তু ভয়ের কাছে হার মানলে চলবে না। সমুদ্রের মতো অনিশ্চিত পরিবেশে সাঁতার কাটতে সাহসের প্রয়োজন হয়। তবে সাহস মানে বিপদকে অগ্রাহ্য করা নয়; প্রস্তুতি, নিরাপত্তা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাহস।

তৃতীয় শিক্ষা—ব্যর্থতা বা বাধা এলেই লক্ষ্য ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কঠিন প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার পথে বাধা আসতে পারে। সেই বাধা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার চেষ্টা করার মানসিকতা সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চতুর্থ শিক্ষা—নিজের পরিচয় নিজেকেই তৈরি করতে হয়। বুলা চৌধুরী এমন একটি ক্ষেত্রে নিজের পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতার সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি পরিচিত ছিল না। নিজের কাজের মাধ্যমে তিনি সেই ক্ষেত্রকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।

খেলাধুলা ও জীবনের সম্পর্ক

সাঁতার আমাদের শেখায়, জলের সঙ্গে লড়াই করে সব সময় জয়ী হওয়া যায় না। কখনও স্রোতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, কখনও গতি কমাতে হয়, আবার কখনও পরিস্থিতি বুঝে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়।

জীবনের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। সব পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু প্রস্তুতি, ধৈর্য এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

বুলা চৌধুরীর দীর্ঘ ক্রীড়াজীবন এই সত্যকে মনে করিয়ে দেয়। তাঁর সাফল্য শুধু সমুদ্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখার গল্প।

উপসংহার

বুলা চৌধুরী ভারতীয় ক্রীড়াজগতের এক অনুপ্রেরণামূলক ব্যক্তিত্ব। অল্প বয়সে সাঁতারে সাফল্য অর্জন, ইংলিশ চ্যানেল দুবার অতিক্রম করা এবং আন্তর্জাতিক জলক্রীড়ার ক্ষেত্রে নিজের পরিচিতি তৈরি করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস মানুষের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য সব সময় সহজ পথের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিকূলতার মুখেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

আজকের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে যারা খেলাধুলার জগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের কাছে বুলা চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাঁর সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভা পথ দেখায় ঠিকই, কিন্তু সেই পথের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে সাহায্য করে নিয়মিত অনুশীলন, শৃঙ্খলা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

সমুদ্রের ঢেউ যতই উঁচু হোক, দৃঢ় সংকল্প আর সঠিক প্রস্তুতি থাকলে মানুষ নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে—বুলা চৌধুরীর জীবন সেই বিশ্বাসেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক।

Share This