Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ টিকিটের রহস্য।

শহরের পুরোনো নাট্যমঞ্চটির নাম ছিল ‘রঙ্গমহল’। একসময় সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাটক হত। দর্শকদের ভিড়ে সামনের রাস্তা পর্যন্ত জমজমাট হয়ে থাকত। কিন্তু সময় বদলেছে। সিনেমা হল, টেলিভিশন আর মোবাইলের যুগে নাট্যমঞ্চের জনপ্রিয়তা কমতে কমতে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

রঙ্গমহলের টিকিটঘরে কাজ করতেন প্রভাসবাবু। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি দর্শকদের হাতে টিকিট তুলে দিয়েছেন। তাঁর কাছে প্রতিটি টিকিট ছিল একটি গল্পের প্রবেশপত্র। কেউ প্রথমবার নাটক দেখতে আসত, কেউ পরিবার নিয়ে, আবার কেউ প্রিয় অভিনেতার অভিনয় দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াত।

কিন্তু সেদিন সকালে নাট্যমঞ্চের মালিক এসে জানালেন, আর্থিক ক্ষতির কারণে আগামী রবিবারের পর রঙ্গমহল চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

খবরটি শুনে প্রভাসবাবু চুপ করে রইলেন। এত বছর ধরে যে জায়গাটিকে নিজের জীবনের অংশ বলে মনে করেছেন, সেটি আর থাকবে না—এই কথা মেনে নিতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।

পরদিন থেকে তিনি লক্ষ করলেন, টিকিটের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। পুরোনো দর্শকেরা খবর পেয়ে শেষবারের মতো নাটক দেখতে আসতে চাইছেন। ফোনে, কাউন্টারে, এমনকি চিঠি পাঠিয়েও অনেকে টিকিট চাইছেন।

শেষ দিনের জন্য নির্ধারিত নাটকটির নাম ছিল ‘ফিরে দেখা’। বহু বছর আগে এই নাটকেই অভিনয় করে বিখ্যাত হয়েছিলেন অভিনেতা অমরেশ সেন। বর্তমানে তিনি অসুস্থতার কারণে অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।

রবিবারের শোয়ের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। শুধু একটি টিকিট বাকি রইল। সেটি ছিল প্রথম সারির মাঝখানের আসনের।

প্রভাসবাবু টিকিটটি কাউন্টারের কাচের নিচে রেখে দিলেন। কেন জানি না, তাঁর মনে হচ্ছিল, টিকিটটি কোনও বিশেষ মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।

শনিবার বিকেলে এক কিশোর কাউন্টারে এল। তার নাম ঈশান। পরনে সাধারণ জামাকাপড়, হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।

সে জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, কালকের নাটকের একটা টিকিট হবে?”

প্রভাসবাবু বললেন, “সব বিক্রি হয়ে গেছে। শুধু একটি আছে। কিন্তু সেটি প্রথম সারির। দামও একটু বেশি।”

ঈশান ব্যাগ থেকে কয়েকটি নোট ও কয়েন বের করল। সব মিলিয়ে টিকিটের দামের চেয়ে কম।

“আর কিছু টাকা নেই কাকু,” সে বলল। “আমি অনেক দিন ধরে এই নাটকটা দেখতে চাইছি।”

প্রভাসবাবু তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত আগ্রহ কেন?”

ঈশান একটু ইতস্তত করে বলল, “আমার দাদু আগে নাটক করতেন। তিনি বলতেন, রঙ্গমহলের মঞ্চে একদিন অভিনয় করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সংসারের দায়িত্বে আর হয়ে ওঠেনি। দাদু এখন আর ভালো দেখতে পান না। তবু এই নাট্যমঞ্চের গল্প আমাকে প্রায়ই শোনান। কাল আমি নাটকটা দেখে তাঁকে সব বলব।”

প্রভাসবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর টিকিটটি তুলে ঈশানের হাতে দিয়ে বললেন, “টাকাটা থাক। টিকিটটি তোমার।”

ঈশান অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু কাকু, আপনি কি নিজের পকেট থেকে টাকা দেবেন?”

“না,” প্রভাসবাবু হেসে বললেন, “আজ এই টিকিটের দাম আমি অন্যভাবে পেলাম।”

রবিবার সন্ধ্যায় নাট্যমঞ্চ দর্শকে পূর্ণ হয়ে গেল। মঞ্চে আলো জ্বলল, পর্দা উঠল, অভিনেতারা অভিনয় শুরু করলেন। দর্শকদের মধ্যে ঈশানও বসেছিল। নাটকের প্রতিটি দৃশ্য সে মন দিয়ে দেখছিল।

শেষ দৃশ্যে নায়ক দীর্ঘদিন পর নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। মঞ্চের সংলাপ শুনে ঈশানের চোখ ভিজে উঠল। সে যেন নিজের দাদুর না-পাওয়া স্বপ্নের কথা ভাবছিল।

নাটক শেষ হলে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। অনেকের চোখে জল। অভিনেতারা মঞ্চে এসে শেষবারের মতো দর্শকদের অভিবাদন জানালেন।

পর্দা নামার পর ঈশান টিকিটঘরের কাছে ফিরে এল। তার হাতে সেই টিকিটটি।

সে বলল, “কাকু, দাদুর জন্য নাটকের কিছু সংলাপ লিখে নিয়েছি। বাড়ি গিয়ে তাঁকে পড়ে শোনাব। আজ বুঝলাম, একটা গল্প শুধু মঞ্চে শেষ হয় না।”

প্রভাসবাবু টিকিটটি হাতে নিলেন। তার পেছনে ঈশান নিজের হাতে লিখেছে—‘স্বপ্ন দেখার জন্য কোনও মঞ্চই ছোট নয়।’

প্রভাসবাবু টিকিটটি যত্ন করে নিজের ডায়েরিতে রেখে দিলেন।

পরদিন রঙ্গমহলের দরজায় তালা পড়ল। নামিয়ে ফেলা হল পুরোনো সাইনবোর্ড। টিকিটঘরের জানালাও বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু প্রভাসবাবুর ডায়েরিতে রয়ে গেল সেই শেষ টিকিটটি। তিনি জানতেন, একদিন হয়তো কেউ আর রঙ্গমহলের কথা মনে রাখবে না। তবু একটি কিশোরের মনে নাটকের প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছে, সেটি অন্য কোনও মঞ্চে, অন্য কোনও গল্পে আবার আলো জ্বালাতে পারে।

বহু বছর পর ঈশান নিজেই একটি ছোট নাট্যদল গড়ে তুলেছিল। তাদের প্রথম নাটকের নাম ছিল ‘শেষ টিকিট’। মঞ্চের এক কোণে সে একটি পুরোনো টিকিট বাঁধিয়ে রেখেছিল—রঙ্গমহলের স্মৃতিতে।

দর্শকদের কেউ জানতেন না, সেই টিকিটের পেছনে লেখা কয়েকটি শব্দ একদিন এক কিশোরের স্বপ্নকে নতুন পথ দেখিয়েছিল।

শিক্ষা: কোনও স্বপ্নের মূল্য শুধু তার সফলতায় নয়, অন্যের মনে সেই স্বপ্নের আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা।।

শান্তিপুরের একটি স্কুলে প্রতি বছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। দৌড়, লং জাম্প, অঙ্কের কুইজ, গান—সব বিভাগেই ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিত। যারা প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হত, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হত পুরস্কার।

কিন্তু এবছর প্রধান শিক্ষক অরুণবাবু ঘোষণা করলেন, স্কুলে একটি নতুন প্রতিযোগিতা হবে। নাম—‘সবচেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতা’।

ঘোষণাটি শুনে ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে গেল।

সপ্তম শ্রেণির রুদ্র বন্ধুদের বলল, “ভালো মানুষ হওয়ার আবার প্রতিযোগিতা হয় নাকি? কে কত ভালো, সেটা মাপবে কী দিয়ে?”

তার বন্ধু সায়ন হেসে বলল, “হয়তো যে সবচেয়ে বেশি ভালো কথা বলতে পারবে, সে জিতবে!”

ক্লাসের সবাই হেসে উঠল।

পরদিন অরুণবাবু প্রতিযোগিতার নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন। আগামী সাত দিন ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিনের আচরণ, দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের চেষ্টা লক্ষ করা হবে। কোনও নির্দিষ্ট নম্বরের তালিকা থাকবে না। শিক্ষকেরা বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবেন, তবে কাউকে কোনও ভালো কাজ করতে বাধ্য করা হবে না।

রুদ্র প্রতিযোগিতাটিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নিল। সে ঠিক করল, যেভাবেই হোক তাকে জিততেই হবে।

প্রথম দিন সে শ্রেণিকক্ষের মেঝে থেকে একটি কাগজ তুলে ডাস্টবিনে ফেলল। তারপর পাশের বন্ধুকে বলল, “দেখেছিস? আমি কত ভালো কাজ করলাম!”

দ্বিতীয় দিন সে একজন সহপাঠীকে পেনসিল ধার দিল। কিন্তু ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই তিনবার তাকে মনে করিয়ে দিল, যেন শিক্ষককে বিষয়টি জানায়।

তৃতীয় দিন সে লাইনে দাঁড়িয়ে এক ছোট ছাত্রকে আগে যেতে দিল। তারপর বন্ধুদের কাছে গিয়ে বলল, “এমন সুযোগ পেলে তোমরাও কিন্তু আমাকে ভোট দেবে!”

তার বন্ধুরা হাসলেও রুদ্র বুঝতে পারল না, কেন তারা তার প্রশংসা করছে না।

অন্যদিকে একই ক্লাসের মেঘলা কোনও প্রতিযোগিতার কথা বিশেষ ভাবছিল না। একদিন সে দেখল, নতুন ছাত্র রাহুল বাংলা পড়তে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে। মেঘলা নিজের কাজ শেষ করে তাকে পড়াটা বুঝিয়ে দিল।

আরেক দিন স্কুলের এক কর্মচারীর হাত থেকে কিছু কাগজ মাটিতে পড়ে গেলে সে সেগুলো কুড়িয়ে দিল। কেউ দেখেছে কি না, সে দিকে তার কোনও খেয়াল ছিল না।

সপ্তম দিনের সকালে রুদ্র স্কুলে এসে দেখল, তার প্রিয় ফুটবলটি শ্রেণিকক্ষের জানালার পাশে পড়ে আছে। আগের দিন সে বলটি সেখানে রেখেছিল। হঠাৎ তার মনে হল, প্রতিযোগিতায় ভালো নম্বর পেতে হলে আজও কিছু একটা করতে হবে।

সে বলটি হাতে নিয়ে মাঠে যাওয়ার সময় দেখল, স্কুলের ছোট্ট বাগানের পাশে একটি টব উল্টে পড়ে আছে। গাছটি মাটি থেকে প্রায় উপড়ে এসেছে। রুদ্র চারদিকে তাকাল। কেউ নেই।

প্রথমে সে ভাবল, গাছটি ঠিক করে দিলে হয়তো শিক্ষকরা দেখতে পাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল, প্রতিযোগিতা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এত সময় নষ্ট করলে ফুটবল খেলতে পারবে না।

সে এগিয়ে গেল মাঠের দিকে।

কিছুদূর যাওয়ার পর তার চোখে পড়ল মেঘলা। সে হাঁটু গেড়ে বসে টবের গাছটিকে আবার মাটিতে বসাচ্ছে। তার স্কুলের পোশাকে মাটি লেগে গেছে। মেঘলা খুব সাবধানে গাছটির চারপাশে মাটি চেপে দিচ্ছিল, যাতে শিকড়গুলো ঠিকমতো বসে যায়।

রুদ্র জিজ্ঞাসা করল, “তুই এখানে কী করছিস? প্রতিযোগিতা তো আজ শেষ!”

মেঘলা মাথা না তুলে বলল, “গাছটা পড়ে ছিল। এভাবে থাকলে শুকিয়ে যাবে।”

“কিন্তু শিক্ষকরা তো দেখছেন না!”

মেঘলা এবার তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “গাছটাকে বাঁচানোর জন্য শিক্ষককে দেখানোর দরকার কী?”

কথাটা রুদ্রকে থামিয়ে দিল।

সে নিজের ফুটবলটি পাশে রেখে মেঘলাকে সাহায্য করতে বসে পড়ল। দুজনে মিলে টবটি সোজা করল, মাটি ভরল এবং জল দিল। কাজ শেষ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। মাঠে পৌঁছে রুদ্র দেখল, তার বন্ধুরা খেলা শুরু করে দিয়েছে।

সেদিন বিকেলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অরুণবাবু মঞ্চে উঠলেন। তিনি জানালেন, এই প্রতিযোগিতায় কোনও প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নেই। বরং স্কুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে নিজের আচরণ সম্পর্কে ভাবার জন্য একটি করে ডায়েরি দেওয়া হবে।

রুদ্র একটু হতাশ হল। সে ভেবেছিল, অন্তত একটি পুরস্কার পাবে।

অনুষ্ঠান শেষে অরুণবাবু তাকে কাছে ডাকলেন।

“রুদ্র, তুমি কি জানো, এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী ছিল?”

রুদ্র মাথা নাড়ল।

শিক্ষক বললেন, “ভালো কাজের জন্য প্রশংসা পাওয়া আনন্দের। কিন্তু প্রশংসা পাওয়ার আশায় ভালো কাজ করলে নিজের উদ্দেশ্যটাই ছোট হয়ে যায়। আসল পরিবর্তন তখনই আসে, যখন কেউ না দেখলেও আমরা ঠিক কাজটি করি।”

রুদ্র চুপ করে রইল। তার মনে পড়ল, মেঘলার সঙ্গে গাছটি ঠিক করার সময় কোনও পুরস্কারের কথা তার মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছিল, গাছটিকে বাঁচানো দরকার।

বাড়ি ফেরার পথে সে সিদ্ধান্ত নিল, পরের দিন থেকে নিজের কাজের হিসাব অন্যদের কাছে দেওয়ার বদলে প্রতিদিন রাতে ডায়েরিতে লিখবে—কোথায় সে ভালো করেছে, কোথায় ভুল করেছে এবং পরদিন কীভাবে নিজেকে একটু ভালো করতে পারে।

কয়েক মাস পর রুদ্রের আচরণে সত্যিই পরিবর্তন এল। সে আগের মতোই খেলত, হাসত, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করত। কিন্তু ভালো কাজ করার পর আর কারও কাছে তার হিসাব দিত না।

স্কুলের বাগানে সেই টবের গাছটিও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল।

একদিন তার প্রথম ফুলটি ফুটলে রুদ্র আর মেঘলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফুলটির দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ ছবি তুলল না, কেউ পুরস্কার দিল না।

তবু দুজনের মনেই সেদিন এক অদ্ভুত আনন্দ জন্মেছিল।

শিক্ষা: ভালো মানুষ হওয়া কোনও প্রতিযোগিতা নয়। অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার জন্য ভালো কাজ করাই প্রকৃত মানবিকতা।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার ওপারে (তৃতীয় পর্ব : যে সত্যকে মুছে ফেলা যায় না)।

শেষ পর্ব

কাচের ঘরের ভিতরে দুটি শিশু একসঙ্গে চোখ খুলেছে।

নীলাঞ্জনা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, এতক্ষণ যা কিছু দেখেছে, তার কোনওটাই সত্যি নয়। আবার সবকিছুই যেন তার জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে।

দুটি শিশুর মুখ অবিকল এক।

তাদের চোখের মণি গাঢ় নীল।

কাচের ঘরের দেয়ালে লাল আলো জ্বলছে। যন্ত্রের ভিতর থেকে একটানা শব্দ আসছে। আর সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বারবার ঘোষণা করছে—

‘বিষয়বস্তু নং ২৭, জেগে উঠুন।’

নীলাঞ্জনা পিছনে ফিরে ইরার দিকে তাকাল।

‘এগুলো কী?’

ইরা পিস্তলটা নামিয়ে বলল, ‘আমি জানি না। কিন্তু এই ঘরটার খোঁজ আমি ছোটবেলা থেকে করছি।’

‘তুমি কী করে জানতে?’

‘কারণ আমাকে যখন এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমার বয়স ছয় মাস। আমার মনে থাকার কথা নয়। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি আমার কাছে ফিরে এসেছে। একটি অন্ধকার ঘর, কাচের দেওয়াল, আর দুটো শিশুর কান্না।’

অদ্বৈত রায় সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখে আর সেই আত্মবিশ্বাস নেই।

তিনি বললেন, ‘তোমরা যা দেখছ, তার ভুল ব্যাখ্যা কোরো না। এই ঘরটি একটি পরীক্ষাগার ছিল।’

নীলাঞ্জনা ঘুরে দাঁড়াল।

‘কীসের পরীক্ষাগার?’

অদ্বৈত উত্তর দিলেন না।

সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চলত এখানে। মানুষ কীভাবে নিজের অতীত ভুলে যায়, কীভাবে অন্যের বলা কথা নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে—সেসব নিয়ে গবেষণা করা হত।’

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘আমাদের ওপর?’

‘হ্যাঁ,’ সুচরিতা বললেন। ‘তোমাদের জন্মের পর তোমাদের বাবা অরুণাভ জানতে পেরেছিলেন, এই প্রকল্পে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি তোমাদের দুজনকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।’

ইরা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে আমাদের স্মৃতিগুলো মিথ্যে?’

‘সব নয়,’ মা বললেন। ‘কিছু সত্যি, কিছু অন্যের তৈরি করে দেওয়া। কোনটা কোনটি, তা বোঝা খুব কঠিন।’

নীলাঞ্জনা কাচের ভিতরে শুয়ে থাকা শিশু দুটির দিকে তাকাল।

‘তাহলে ওরা কারা?’

অদ্বৈত ধীরে ধীরে বললেন, ‘ওরা এই প্রকল্পের শেষ দুটি নমুনা।’

‘নমুনা?’ নীলাঞ্জনার গলা কেঁপে উঠল। ‘ওরা শিশু!’

‘আমি জানি।’

‘না, আপনি জানেন না!’ নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল। ‘আপনি এত বছর ধরে কী করেছেন? আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করেছেন, আমাদের পরিচয় কেড়ে নিয়েছেন, আর এখন বলছেন আপনি জানেন?’

অদ্বৈত মাথা নীচু করলেন।

‘আমি অপরাধ করেছি। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত আমার ছিল না।’

‘তাহলে সিদ্ধান্ত কে নিত?’

অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ঋত্বিক চৌধুরী।’

নামটা শুনে নীলাঞ্জনার শরীর শক্ত হয়ে গেল।

তার অফিসের মালিক। যে মানুষটি তাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। যিনি তার সাংবাদিকতার প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। যিনি মায়ের মৃত্যুর পর তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সেই মানুষই কি এত বড় ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে?

ঠিক তখনই উপরতলা থেকে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন পুরুষের গলা ভেসে এল—

‘অদ্বৈত, আর কতক্ষণ লাগবে?’

নীলাঞ্জনা মুখ তুলে তাকাল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন ঋত্বিক চৌধুরী।

পরনে কালো কোট, হাতে একটি চামড়ার ব্যাগ। তাঁর মুখে কোনও বিস্ময় নেই। যেন তিনি জানতেন, নীলাঞ্জনা ঠিক এখানেই থাকবে।

‘বাবা?’ শব্দটা নীলাঞ্জনার মুখ থেকে অনিচ্ছায় বেরিয়ে এল।

ঋত্বিক হাসলেন।

‘এত বছর পর এই সম্বোধন শুনতে ভালো লাগছে।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আপনি আমার বাবা নন।’

‘রক্তের সম্পর্কই কি সব?’

‘আপনি আমার মায়ের সঙ্গে কী করেছেন?’

ঋত্বিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘তোমার মা এমন কিছু সত্য জেনে ফেলেছিলেন, যা তাঁর জানা উচিত ছিল না।’

‘আপনি তাঁকে বন্দি করে রেখেছিলেন?’

‘আমি তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’

সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যে! তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখোনি। তুমি আমাকে আমার সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা করেছিলে!’

ঋত্বিক মায়ের দিকে তাকালেন।

‘তুমি যদি চুপ থাকতে, তাহলে কিছুই হত না।’

‘আমার সন্তানদের নিয়ে পরীক্ষা চালানোর অনুমতি আমি তোমাকে দিইনি!’

‘পরীক্ষা?’ ঋত্বিক মৃদু হাসলেন। ‘তুমি এখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারোনি, সুচরিতা। আমরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলাম, যার সাহায্যে মানুষের স্মৃতি থেকে যন্ত্রণা মুছে ফেলা সম্ভব। যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অত্যাচার—মানুষের মস্তিষ্কে জমে থাকা ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মুছে ফেলা গেলে পৃথিবীটা আরও ভালো হত।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘তাহলে শিশুদের কেন ব্যবহার করেছিলেন?’

ঋত্বিকের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

‘কারণ শিশুদের মস্তিষ্কে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করলে ফল পাওয়া সহজ। কিন্তু তোমাদের মা বাধা দিয়েছিলেন। তোমার বাবা অরুণাভও বাধা দিয়েছিলেন। তাই আমাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।’

ইরা পিস্তলটা তুলে ধরল।

‘আপনি আমার পরিবার কেড়ে নিয়েছেন।’

ঋত্বিক তার দিকে তাকালেন।

‘তোমার পরিবার তোমাকে ছেড়ে যায়নি, ইরা। তোমাকে রক্ষা করার জন্যই তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল।’

‘আমাকে মিথ্যে বলা হয়েছিল!’

‘হ্যাঁ। কারণ সত্যিটা জানলে তুমি এখানে ফিরে আসতে।’

‘আমি ফিরে এসেছি আপনাকে থামাতে।’

ঋত্বিক মৃদু হাসলেন।

‘তুমি কি জানো, তোমার হাতে থাকা পিস্তলটা আসল নয়?’

ইরা চমকে উঠল।

ঋত্বিক বললেন, ‘তুমি যখন এই বাড়িতে ঢুকেছিলে, তখন তোমার হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে তার বদলে অন্য একটি অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। তুমি বুঝতে পারোনি।’

ইরা ট্রিগার টিপল।

শুধু একটা মৃদু ক্লিক শব্দ হল।

কোনও গুলি বেরোল না।

ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।

‘এবার অস্ত্রটা নামিয়ে রাখো।’

ইরা পিছিয়ে গেল। তার মুখে আতঙ্ক।

নীলাঞ্জনা বোনের সামনে দাঁড়াল।

‘আপনি আর এক পা এগোবেন না।’

ঋত্বিক থেমে গেলেন।

‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, নীলু। তোমাকে এখানে আনা আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তুমি নিজেই সব দরজা খুলে দিয়েছ।’

‘কেন?’

‘কারণ তোমার স্মৃতির মধ্যে এমন একটি তথ্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা কেউ খুঁজে পাইনি।’

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

‘আমার কোনও বিশেষ স্মৃতি নেই।’

‘আছে। তোমার জন্মের রাতের স্মৃতি। যে স্মৃতি তোমার বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই তোমার মস্তিষ্কে তৈরি হয়েছিল। তুমি সেই রাতের একটি দৃশ্য দেখেছিলে, যা অন্য কেউ দেখেনি।’

সুচরিতা ফিসফিস করে বললেন, ‘নীলু, ওর কথা শুনিস না।’

ঋত্বিক বললেন, ‘তোমার বাবা মৃত্যুর আগে একটি রেকর্ডিং রেখে গিয়েছিলেন। সেই রেকর্ডিংয়ে তিনি বলেছিলেন, নীলাঞ্জনা একদিন সব মনে করতে পারবে। সেই স্মৃতির মধ্যেই আছে প্রকল্প নীলের আসল নথি কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।’

ঋত্বিক চামড়ার ব্যাগ থেকে একটি ছোট যন্ত্র বের করলেন।

‘এই যন্ত্র তোমার মস্তিষ্কের পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত সংকেত শনাক্ত করতে পারবে। একবার তথ্যটা পেয়ে গেলে, তুমি মুক্ত। আমরাও মুক্ত।’

‘আর এই শিশু দুটো?’

‘ওদেরও মুক্ত করা হবে।’

‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।’

ঋত্বিকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘তাহলে তোমার মায়ের কী হবে, ভেবে দেখো।’

তিনি ব্যাগের ভিতর থেকে একটি ছোট রিমোট বের করলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাচের ঘরের ভিতরে লাল আলো জ্বলে উঠল। দুটি শিশুর বিছানার পাশে যন্ত্রগুলো দ্রুত শব্দ করতে শুরু করল।

সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘ঋত্বিক, বন্ধ করো! ওরা মারা যাবে!’

‘নীলাঞ্জনা, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’

নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।

তারপর কাচের ভিতরে শুয়ে থাকা শিশু দুটির দিকে।

একটি শিশু কাঁদছে। অন্যটি স্থির হয়ে আছে।

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, সময় খুব কম।

সে চোখ বন্ধ করল।

মনে করার চেষ্টা করল সেই রাতের কথা।

হাসপাতালের ঘর। মায়ের কান্না। বাবার কণ্ঠস্বর। অদ্বৈতের হাতে সাদা কাপড়ে মোড়া শিশু।

তারপর একটি দরজা।

দরজার গায়ে লেখা—১৩।

আর দরজার ওপারে একটি কাঠের বাক্স।

বাক্সের ভিতরে একটি লাল ডায়েরি।

নীলাঞ্জনা চোখ খুলে বলল, ‘ডায়েরিটা কোথায়?’

ঋত্বিক চমকে গেলেন।

‘কোন ডায়েরি?’

‘লাল ডায়েরি। বাবা সেটা কক্ষ ১৩-তে লুকিয়ে রেখেছিলেন।’

ঋত্বিকের মুখে প্রথমবার ভয়ের ছাপ দেখা গেল।

‘তুমি মনে করতে পেরেছ?’

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

‘হ্যাঁ। আর আমি জানি, সেটা কোথায়।’

সে মেঝের নীচে খোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

কাচের ঘরের পিছনে আরেকটি সরু পথ রয়েছে। সেই পথের শেষে একটি ছোট কাঠের বাক্স। নীলাঞ্জনা বাক্সটা খুলল।

ভিতরে সত্যিই একটি লাল ডায়েরি।

ডায়েরির প্রথম পাতায় অরুণাভ সেনের হাতের লেখা—

‘যদি আমার মেয়েরা কখনও এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে জেনে রেখো—তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল তোমাদের বাঁচানোর জন্য নয়। তোমাদের স্মৃতির ভিতরে একটি অপরাধের প্রমাণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।’

নীলাঞ্জনা পাতা উল্টাতে লাগল।

পরের পাতায় একটি তালিকা।

সেখানে কয়েকজন চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার নাম লেখা। তাঁদের প্রত্যেকের পাশে উল্লেখ রয়েছে, প্রকল্প নীলের কোন পর্যায়ে তাঁরা যুক্ত ছিলেন।

শেষ পাতায় লেখা—

‘প্রকল্প নীল কখনও স্মৃতি মুছে ফেলার প্রকল্প ছিল না। এটি ছিল সাক্ষীদের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রকল্প।’

নীলাঞ্জনার মাথায় যেন বাজ পড়ল।

ঋত্বিকের মুখের রং বদলে গেছে।

‘ডায়েরিটা আমাকে দাও।’

নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

‘না।’

ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।

‘তুমি বুঝতে পারছ না, এটা প্রকাশ পেলে কত মানুষ ধ্বংস হবে।’

‘যারা অপরাধ করেছে, তাদেরই ধ্বংস হওয়া উচিত।’

‘তুমি কি তোমার নিজের জীবনটাও ধ্বংস করতে চাও?’

নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল, ‘আমার জীবন আপনারা অনেক আগেই ধ্বংস করেছেন। এবার সত্যিটা বাইরে আসবে।’

ঋত্বিক তার হাত থেকে ডায়েরি কেড়ে নিতে গেলেন।

ঠিক সেই সময় অদ্বৈত তাঁর সামনে দাঁড়ালেন।

‘যথেষ্ট হয়েছে, ঋত্বিক।’

ঋত্বিক অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।

‘তুমিও আমার বিরুদ্ধে যাবে?’

অদ্বৈত বললেন, ‘আমি অনেক দিন তোমার হয়ে অপরাধ করেছি। আর নয়।’

তিনি পকেট থেকে একটি ছোট রেকর্ডার বের করলেন।

‘তোমার সমস্ত কথা রেকর্ড হয়েছে।’

ঋত্বিকের চোখ জ্বলে উঠল।

‘তুমি জানো না, তুমি কী করছ।’

‘জানি। এত বছর পরে প্রথমবার ঠিক কাজ করছি।’

ঋত্বিক অদ্বৈতের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হল। রেকর্ডারটা মেঝেতে পড়ে গেল। নীলাঞ্জনা সেটি তুলে নিয়ে ইরার হাতে দিল।

‘এটা নিয়ে মাকে বের করে নিয়ে যাও!’

ইরা মাকে ধরে সিঁড়ির দিকে এগোল।

কিন্তু ঋত্বিক হঠাৎ অদ্বৈতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তারপর কাচের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন। তিনি একটি লাল বোতাম টিপলেন।

ঘরের ভিতর থেকে তীব্র অ্যালার্মের শব্দ উঠল।

যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘোষণা করল—

‘স্বয়ংক্রিয় ধ্বংসপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট সময়: পাঁচ মিনিট।’

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি কী করলেন?’

ঋত্বিক বললেন, ‘কোনও প্রমাণ থাকবে না।’

কাচের ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শিশুদুটিকে ঘিরে থাকা যন্ত্রগুলো থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল।

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু তালা খুলছে না।

ইরা চাবিটা বের করে তালায় ঢোকাল। তবু দরজা খুলল না।

সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ওদের বাঁচাও!’

অদ্বৈত দেয়ালের পাশে একটি লাল সুইচ দেখতে পেলেন।

‘এটাই জরুরি বন্ধের সুইচ!’

তিনি সুইচের দিকে ছুটলেন।

ঋত্বিক তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালেন।

‘ওটা ছুঁয়ো না!’

অদ্বৈত বললেন, ‘এই পাগলামি শেষ হতেই হবে।’

ঋত্বিক তাঁকে আঘাত করলেন। অদ্বৈত মেঝেতে পড়ে গেলেন।

নীলাঞ্জনা আর অপেক্ষা করল না। সে মায়ের দেওয়া পুরোনো চাবিটা নিয়ে সুইচের বাক্সের তালা ভাঙল। ভিতরে তিনটি বোতাম।

কালো।

সাদা।

নীল।

ডায়েরির শেষ পাতায় অরুণাভের লেখা ছিল একটি নির্দেশ—

‘বিপদ এলে নীল বোতাম টিপবে। অন্য দুটিতে হাত দেবে না।’

নীলাঞ্জনা নীল বোতাম টিপে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য সব আলো নিভে গেল।

তারপর অ্যালার্ম থেমে গেল। কাচের ঘরের দরজা খুলে গেল। যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে গেল।

দুটি শিশু কাঁদছে।

নীলাঞ্জনা দৌড়ে গিয়ে প্রথম শিশুটিকে কোলে তুলে নিল। ইরা দ্বিতীয় শিশুটিকে তুলে নিল।

শিশু দুটির কান্না ধীরে ধীরে থেমে এল।

নীলাঞ্জনা নিজের হাতে ধরা শিশুটির কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘তোমাদের আর কেউ আঘাত করতে পারবে না।’

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঋত্বিক মেঝেতে বসে পড়েছেন। তাঁর চোখে আর কোনও অহংকার নেই।

সুচরিতা এগিয়ে এসে দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।

বহু বছর পর নীলকুঠির নীল আলো নিভে গেল।

৫. শেষ সাক্ষ্য

পরের কয়েক ঘণ্টার ঘটনা যেন ঝড়ের মতো কেটে গেল।

নীলাঞ্জনা নিজের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় দপ্তরে ফোন করল। রেকর্ডার, ডায়েরি এবং হাসপাতালের নথির ছবি নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দিল। তারপর পুলিশের কাছে খবর দেওয়া হল।

পুলিশ নীলকুঠি থেকে উদ্ধার করল বহু বছরের নথি, পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং প্রকল্প নীলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা। ঋত্বিক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হল। অদ্বৈত রায়ও তদন্তে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করলেন।

তবে সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া গেল না।

প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন। কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কিছু নথি ধ্বংস করা হয়েছিল। আর নীলাঞ্জনার স্মৃতিতে যে রাতের দৃশ্যগুলি ফিরে এসেছিল, তার সবকিছুর প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হল না।

তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি প্রকাশ্যে এল।

প্রকল্প নীলের আড়ালে বহু মানুষের স্মৃতি ও সাক্ষ্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মধ্যে কয়েকজনকে নতুন পরিচয় দিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছিল। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ইরা ছিল সেই শিশুদের একজন, যাকে তার প্রকৃত পরিচয় থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল।

আর নীলাঞ্জনা?

তার জন্মপরিচয় নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর বাকি। ঋত্বিক দাবি করেছিলেন, তিনি তার জৈবিক বাবা। কিন্তু আদালতে তা প্রমাণ করার জন্য আরও নথি এবং পরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। নীলাঞ্জনা সিদ্ধান্ত নিল, নিজের পরিচয়ের সত্য জানতে সে আইনি পথেই এগোবে।

তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় কথা—সে আর কোনও মিথ্যার মধ্যে বাস করবে না।

কয়েক মাস পরে, শালিখা গ্রামের আদালতে সাক্ষ্য দিতে এলেন সুচরিতা সেন।

নীলাঞ্জনা ও ইরা পাশাপাশি বসেছিল। দুজনের মাঝখানে একটি ছোট শিশু ঘুমোচ্ছিল। উদ্ধার হওয়া শিশু দুটির মধ্যে একজনকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, অন্যজনকে রাখা হয়েছে বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে। তাদের পরিচয় এবং পরিবারের খোঁজ চলছে।

সুচরিতা আদালতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার মেয়েদের কাছ থেকে সত্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, চুপ থাকলে ওদের বাঁচাতে পারব। কিন্তু নীরবতা অপরাধকে আরও শক্তিশালী করেছে।’

তাঁর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

‘আজ আমি চাই, কোনও মা যেন আর নিজের সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে নিজের স্মৃতিকেই সন্দেহ না করে। কোনও সন্তান যেন নিজের পরিচয় জানার অধিকার হারিয়ে না ফেলে।’

আদালতকক্ষে নীরবতা নেমে এল।

সেদিন নীলাঞ্জনা বুঝল, সত্যের জন্য লড়াই মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি চাওয়া নয়। সত্যের জন্য লড়াই মানে যাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

৬. দুই বোনের নতুন জীবন

ছয় মাস পর।

কলকাতার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে নীলাঞ্জনা একটি প্রতিবেদন লিখছে। শিরোনাম—‘প্রকল্প নীল: স্মৃতি, পরিচয় ও হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কাহিনি।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সে শেষবারের মতো নথিগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিল।

দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।

ইরা এসেছে।

তার হাতে দুটি কাপ চা।

‘আবার কাজ?’

নীলাঞ্জনা হেসে বলল, ‘শেষ করতে হবে।’

‘তুই কোনও দিন বদলাবি না।’

‘তুইও তো বদলাসনি।’

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু সেই হাসির ভিতরে আর আগের মতো ভয় নেই। আছে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ফিরে পাওয়া সম্পর্কের উষ্ণতা।

ইরা জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।

‘দিদি, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’

‘কর।’

‘তোর কি এখনও মনে হয়, আমাদের জীবনে যা ঘটেছিল, তার সবকিছুর উত্তর আমরা পেয়ে গেছি?’

নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

‘না। কিছু উত্তর হয়তো কোনও দিন পাব না। কিন্তু এখন অন্তত আমরা জানি, কোন প্রশ্নগুলো করা দরকার।’

ইরা মাথা নাড়ল।

‘আমি মাঝে মাঝে এখনও সেই নীল দরজার স্বপ্ন দেখি।’

‘আমিও।’

‘স্বপ্নে দেখি, দরজার ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।’

নীলাঞ্জনা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।

‘কে?’

ইরা বলল, ‘জানি না। কিন্তু সে আমাদের নাম ধরে ডাকে।’

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নীলাঞ্জনা নিজের ল্যাপটপ বন্ধ করল।

‘চল, আজ কোথাও ঘুরে আসি।’

‘কোথায়?’

‘যেখানে কোনও পুরোনো বাড়ি নেই, কোনও বন্ধ দরজা নেই, কোনও গোপন নথি নেই।’

ইরা হেসে বলল, ‘তোর পক্ষে সেটা সম্ভব?’

‘চেষ্টা করে দেখা যাক।’

দুজন বেরিয়ে গেল।

বাইরে শরতের আকাশ। রাস্তায় মানুষের ভিড়, দোকানে আলো, চায়ের কাপে ধোঁয়া। পৃথিবীটা অন্য দিনের মতোই চলছে।

কেউ জানে না, এই দুই বোন কত অন্ধকার পেরিয়ে এখানে এসেছে।

কেউ জানে না, তাদের শৈশবের কতটা সময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু তারা জানে—তাদের জীবন আর অন্য কারও হাতে লেখা হবে না।

সেদিন রাতে নীলাঞ্জনা বাড়ি ফিরে মায়ের পুরোনো ডায়েরিটা খুলল। ডায়েরির শেষ পাতার নীচে সে একটি নতুন বাক্য লিখল—

‘স্মৃতি ভুলে যাওয়া যায়, পরিচয় লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে চিরকাল বন্দি করে রাখা যায় না।’

ডায়েরিটা বন্ধ করে সে জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে আকাশে মেঘ জমেছে।

হঠাৎ তার মনে হল, কোনও এক অন্ধকার ঘরে নীল আলো জ্বলে উঠল।

সে চোখ মুছে আবার তাকাল।

আলো নেই।

শুধু দূরের বাড়িগুলোর জানালায় সাধারণ হলুদ আলো জ্বলছে।

নীলাঞ্জনা নিজেকে বোঝাল, সব শেষ হয়েছে। নীলকুঠির গোপন ঘর সিল করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প নীলের নথি তদন্তকারীদের হাতে। ঋত্বিকের বিচার চলছে।

আর কোনও রহস্য নেই।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।

বার্তায় লেখা—

‘তোমরা দুজনেই বেঁচে গেছ। কিন্তু তৃতীয় শিশুটির কী হল, তা কি মনে আছে?’

নীলাঞ্জনার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ইরাকে ফোন করল।

ফোন ধরতেই নীলাঞ্জনা বলল, ‘ইরা, তুই কোথায়?’

‘বাড়িতে। কী হয়েছে?’

‘আমাদের জন্মের সময় কি সত্যিই দুটো শিশু ছিল?’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ইরা বলল, ‘দিদি, তুই কী বলতে চাইছিস?’

নীলাঞ্জনা বার্তাটি পড়ে শোনাল।

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘অসম্ভব। আমরা তো সব নথি দেখেছি।’

‘হয়তো কোনও নথি আমাদের দেখানো হয়নি।’

‘তুই কি আবার নীলকুঠিতে যাবি?’

নীলাঞ্জনা জানালার বাইরে তাকাল।

তার মনে পড়ল সেই নীল দরজা, সেই অন্ধকার সিঁড়ি, সেই কাচের ঘর।

তারপর সে ধীরে ধীরে বলল, ‘না। এবার আমরা কোথাও অন্ধকারে ঢুকব না। আগে খুঁজে বের করব, এই বার্তা কে পাঠিয়েছে।’

সে নম্বরটিতে ফোন করল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

কেউ ধরল না।

তারপর ফোনের পর্দায় আরেকটি বার্তা ভেসে উঠল।

‘আমি তোমাদের তৃতীয় বোন।’

নীলাঞ্জনা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক সেই মুহূর্তে, শহরের অন্য প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ির নীল দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ভিতর থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

‘এবার আমার পালা।’

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার (ওপারে দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মেয়ের ফিরে আসা)।

রাত এগারোটা তেতাল্লিশ।

নীলকুঠির সমস্ত জানালায় তখনও নীল আলো জ্বলছে। বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতে একটি লাল বল। মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি, অথচ চোখের গভীরে জমে রয়েছে বহু বছরের অভিমান।

মেয়েটি একবার গেটের তালায় হাত রাখল।

সঙ্গে সঙ্গে তালাটি খুলে মাটিতে পড়ে গেল।

সে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল না। বরং বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব নিচু গলায় বলল, ‘দিদি, আমি এসেছি।’

বাড়ির ভিতর থেকে কোনও উত্তর এল না।

মেয়েটি মাথা তুলে দোতলার দিকে তাকাল। নীল আলোয় ভেসে থাকা জানালার ওপারে যেন একটা ছায়া নড়ে উঠল।

‘দিদি, তুমি কি এখনও আমাকে ভয় পাও?’

তারপর সে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।

১. বন্ধ ঘরের ভিতর

নীলাঞ্জনা তখনও নীল ঘরের মেঝেতে বসে। অন্ধকারের মধ্যে তার হাত দুটো কাঁপছে। বৃদ্ধ কোথায় গেলেন, সে বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে যাঁকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের সাক্ষী বলে মনে করেছিল, তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।

আয়নাটা আবার দৃশ্যমান হয়েছে।

কিন্তু এবার তাতে হাসপাতালের ঘর নেই। দেখা যাচ্ছে নীলকুঠির দোতলার করিডর। করিডরের এক প্রান্ত থেকে সাদা পোশাক পরা একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে।

নীলাঞ্জনা চোখ মুছল।

মেয়েটি তারই মতো দেখতে। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। এমনকী বাঁ ভ্রুর পাশে ছোট্ট তিলটিও রয়েছে।

মেয়েটি আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।

তার ঠোঁট নড়ল।

‘তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?’

নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিল না।

‘ছোটবেলায় তুমি আমাকে একটা নাম দিয়েছিলে। মনে আছে?’

‘আমি তোমাকে কখনও দেখিনি।’

‘দেখেছ। শুধু তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল। ‘এসব মিথ্যে। আমার কোনও বোন নেই।’

মেয়েটি মৃদু হাসল।

‘তাহলে তোমার জন্মদিনে প্রতি বছর কেন দুটি মোমবাতি জ্বালানো হত?’

প্রশ্নটা শুনে নীলাঞ্জনার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

ছোটবেলায় জন্মদিনের কেক কাটার আগে তার মা দুটি মোমবাতি জ্বালাতেন। একটি নীলাঞ্জনার জন্য, অন্যটি কার জন্য—সে কোনও দিন জানতে পারেনি। একবার জিজ্ঞাসা করায় মা কেঁদে ফেলেছিলেন। তারপর থেকে সে আর প্রশ্ন করেনি।

মেয়েটি আবার বলল, ‘আমার নাম ইরা। তোমার যমজ বোন।’

নীলাঞ্জনা চোখ বন্ধ করল।

তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় একটা স্বপ্ন সে প্রায়ই দেখত। একটি মেয়ে তার পাশে শুয়ে আছে। দুজনেরই পরনে একই রঙের পোশাক। মেয়েটি তার হাত ধরে বলছে, ‘তুই আমাকে ছেড়ে যাবি না তো?’

প্রতিবার ঘুম ভাঙলে নীলাঞ্জনা মায়ের কাছে ছুটে যেত। মা তাকে বুকে টেনে নিতেন, কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতেন না।

এত বছর ধরে সেই স্বপ্নকে সে শিশুমনের কল্পনা ভেবেছে।

নীলাঞ্জনা চোখ খুলে বলল, ‘তুমি যদি আমার বোন হও, এত বছর কোথায় ছিলে?’

ইরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘যেখানে আমাকে রেখে গিয়েছিল তোমাদের বাবা।’

‘আমার বাবা তোমাকে কোথায় রেখে গিয়েছিলেন?’

‘এই বাড়িতেই।’

নীলাঞ্জনা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

ইরা বলল, ‘তুমি চলে যাওয়ার পর আমি অনেক দিন এখানে ছিলাম। তারপর একদিন আমাকে বলা হল, তুমি আর বেঁচে নেই। মা-ও নেই। বাবা-ও নেই। আমার পৃথিবীতে কেউ নেই।’

‘কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!’

‘হ্যাঁ। তুমি বেঁচে আছ। আর আমি এত বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।’

‘তুমি কোথায় ছিলে?’

ইরা উত্তর দেওয়ার আগেই আয়নার কাচে ফাটল ধরল।

একটি সরু রেখা মাঝখান থেকে নীচের দিকে নেমে এল। তারপর আরেকটি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো আয়নাটা জালের মতো ফাটলে ভরে গেল।

ইরা চিৎকার করে উঠল, ‘দিদি, ঘর থেকে বেরিয়ে যাও!’

‘কেন?’

‘ও জেগে উঠেছে!’

‘কে?’

আয়নার ভিতর থেকে এবার একটি পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

‘যে সত্যকে কবর দিয়েছিল।’

নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।

ফাটল ধরা আয়নার ভিতরে এবার তার বাবাকে দেখা যাচ্ছে।

অরুণাভ সেন—যাঁর মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তাঁর মুখে সেই পরিচিত হাসি, কিন্তু চোখে এমন এক কঠোরতা যা নীলাঞ্জনা কোনও দিন দেখেনি।

তিনি বললেন, ‘নীলু, আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্যই সব করেছি।’

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি আমার বোনকে কোথায় রেখেছিলেন?’

‘ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’

‘কার থেকে?’

অরুণাভের মুখ বদলে গেল।

‘তোমার মায়ের কাছ থেকে।’

এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেল।

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘মায়ের কাছ থেকে?’

‘তোমার মা যা জানত, তা পৃথিবীর কেউ জানতে পারত না। তাই ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

‘কে সরিয়ে দিয়েছিল?’

অরুণাভ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আয়নাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

কাচের টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

প্রতিটি টুকরোয় দেখা যাচ্ছে নীলাঞ্জনার আলাদা আলাদা প্রতিবিম্ব। কিন্তু কোনও প্রতিবিম্বেই তার মুখ এক নয়। কোথাও সে শিশু, কোথাও কিশোরী, কোথাও বৃদ্ধা। আর একটি টুকরোয় সে দাঁড়িয়ে আছে একটি হাসপাতালের বিছানার পাশে।

বিছানায় শুয়ে আছে ইরা।

তার চোখ বন্ধ।

মনিটরে সোজা একটি রেখা।

নীলাঞ্জনা সেই টুকরোটা তুলতেই তার হাত কেটে গেল। রক্তের ফোঁটা কাচের ওপর পড়ল।

মুহূর্তের মধ্যে ঘরের নীল আলো নিভে গেল।

দরজার বাইরে থেকে শোনা গেল পায়ের শব্দ।

কেউ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।

এবার আর কোনও রহস্যময় শব্দ নয়।

এটি একজন জীবিত মানুষের পায়ের শব্দ।

২. ডাক্তারের স্বীকারোক্তি

দরজাটা খুলে গেল।

সাদা পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর মুখে উদ্বেগ। হাতে একটি ছোট টর্চ এবং বাদামি রঙের ফাইল।

‘তোমাকে এখানে আনা আমার ভুল হয়েছে,’ তিনি বললেন।

নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়াল। ‘আপনি কে? আমার পরিবারের সব কথা জানেন কীভাবে?’

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আমার নাম ডা. শৈলেন বসু। বাইশ বছর আগে আমি এই অঞ্চলের একটি নার্সিংহোমে কাজ করতাম। তোমার জন্মের সময় তোমার মায়ের চিকিৎসা আমিই করেছিলাম।’

‘আমার মা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?’

বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।

‘আমাকে উত্তর দিন!’

‘না,’ তিনি বললেন। ‘তোমার মা সেদিন মারা যাননি।’

নীলাঞ্জনার চোখে জল চলে এল। ‘তাহলে তাঁকে মৃত বলে জানানো হল কেন?’

ডাক্তার ফাইল খুললেন।

‘তোমার জন্মের সময় পরিস্থিতি খুব জটিল ছিল। তোমার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একই সময়ে তোমাদের পরিবারে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা বাইরে প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন বদলে যেত।’

‘কী ঘটনা?’

‘তোমার যমজ বোন ইরার জন্মের কয়েক মিনিট পর থেকেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চিকিৎসার জন্য তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার আগেই হাসপাতাল থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’

‘কে সরিয়েছিল?’

‘তোমার বাবা।’

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

ডাক্তার বললেন, ‘তোমার বাবা বলেছিলেন, ইরাকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু পরে জানা যায়, তাকে এই নীলকুঠিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেন, সেটা আমি তখন বুঝতে পারিনি।’

‘আর মা?’

‘তোমার মা সুস্থ হওয়ার পর ইরার খোঁজ করেন। তাঁকে বলা হয়, মেয়েটি মারা গেছে। তোমার মা বিশ্বাস করেননি। তিনি বারবার খোঁজ নিতে থাকেন। তারপর একদিন হঠাৎ তাঁকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।’

‘কোথায়?’

‘সেই উত্তর আমার কাছে নেই।’

নীলাঞ্জনা ফাইলটা ছিনিয়ে নিল। ভিতরে হাসপাতালের নথি, কয়েকটি ছবি এবং পুরোনো চিঠি রয়েছে। একটি কাগজে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই, ১৯৯৮। তার নীচে দুটি শিশুর নাম।

প্রথমটি: নীলাঞ্জনা সেন।

দ্বিতীয়টি: ইরা সেন।

দুটি নামের পাশে একই জন্মসময়।

নীলাঞ্জনার হাত কাঁপতে লাগল।

‘আপনি এত বছর চুপ করে ছিলেন কেন?’

ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম।’

‘কাকে?’

‘তোমার বাবাকে নয়। যে মানুষটা তোমার বাবাকে নির্দেশ দিত, তাকে।’

‘কে সে?’

ডাক্তার উত্তর দেওয়ার আগে নীচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

তারপর কেউ জোরে বলল, ‘ডাক্তারবাবু! আপনি ভিতরে আছেন?’

শৈলেন বসুর মুখের রং বদলে গেল।

তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘সে এসে গেছে।’

‘কে?’

‘যার কথা এতক্ষণ বলছিলাম।’

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ থামল।

একজন পুরুষ বলল, ‘নীলাঞ্জনা, তোমার মায়ের কথা জানতে চাও? তাহলে আমার সঙ্গে এসো।’

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ডাক্তার তার হাত ধরে থামালেন।

‘না। ওর কথা শুনবে না।’

বাইরে থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর—

‘তোমার মা বেঁচে আছেন। আর তুমি যদি আজ রাতেই আমার সঙ্গে না যাও, কাল সকালে তাঁর মৃতদেহ পাবে।’

নীলাঞ্জনা ডাক্তারকে সরিয়ে দরজা খুলে দিল।

করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সে চিনতে পারল।

তার নাম অদ্বৈত রায়। কলকাতার বিখ্যাত চিকিৎসক, বহু হাসপাতালের উপদেষ্টা এবং তার বাবার পুরোনো বন্ধু। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই নীলাঞ্জনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে চাকরির প্রথম সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই তিনি সাহায্য করেছিলেন।

নীলাঞ্জনা তাঁকে প্রায় পরিবারের সদস্য বলেই মনে করত।

অদ্বৈত মৃদু হাসলেন।

‘অবশেষে দেখা হল, নীলু।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আপনি আমার মাকে কোথায় রেখেছেন?’

অদ্বৈতের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘তোমার মা কোথায় আছেন, সেটা জানার অধিকার তোমার নেই।’

‘কেন?’

‘কারণ তুমি এখনও সত্যের জন্য প্রস্তুত নও।’

‘আমার বোনকে কোথায় রেখেছিলেন?’

অদ্বৈত এবার শৈলেন বসুর দিকে তাকালেন।

‘ডাক্তারবাবু, আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই বিষয় নিয়ে আর মুখ খুলবেন না।’

শৈলেন বললেন, ‘আমি অনেক দিন চুপ থেকেছি। আর নয়।’

অদ্বৈত ধীরে ধীরে কোটের পকেটে হাত ঢোকালেন।

নীলাঞ্জনা ভাবল, তিনি হয়তো ফোন বের করবেন।

কিন্তু তিনি একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে নীলকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন মানুষ—অরুণাভ সেন, সুচরিতা এবং অদ্বৈত। তাঁদের মাঝখানে দুটি ছোট মেয়ে।

ছবির নীচে লেখা—

‘পরিবার, ১৯৯৯।’

নীলাঞ্জনা ছবির দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েদের মধ্যে একজন সে নিজে। অন্যজন ইরা।

কিন্তু ছবির পিছনে লাল কালিতে লেখা ছিল আরও একটি বাক্য—

‘দ্বিতীয় মেয়েটি আসল নয়।’

৩. ইরা কি সত্যিই ফিরে এসেছে?

অদ্বৈত ছবিটা আবার পকেটে রেখে দিলেন।

‘চলো, তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাই।’

নীলাঞ্জনা নড়ল না।

‘আমি কোথাও যাব না। আগে বলুন, ছবির পিছনে ওই কথাটা কে লিখেছে?’

অদ্বৈত ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘তোমার মা।’

‘কেন?’

‘কারণ তোমার মা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে একজন মানুষ নয়।’

শৈলেন বসু চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যে!’

অদ্বৈত তাঁর দিকে তাকালেন। ‘আপনি এখনও সবটা জানেন না, ডাক্তারবাবু।’

‘আমি জানি, আপনি কী করেছিলেন।’

‘আপনি শুধু অর্ধেকটা জানেন।’

নীলাঞ্জনা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ কি আমাকে সত্যিটা বলবেন?’

অদ্বৈত কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘তোমার জন্মের আগেই এই পরিবারের একটা ইতিহাস ছিল। তোমার মা ছোটবেলায় একটি দুর্ঘটনায় তাঁর যমজ বোনকে হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকে তিনি বিশ্বাস করতেন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ কখনও কখনও অন্য কারও জীবনে ফিরে আসে।’

‘এটা তো কুসংস্কার!’

‘হতে পারে। কিন্তু তোমার জন্মের পর তোমার মা এমন কিছু ঘটনা দেখেছিলেন, যেগুলো তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।’

‘যেমন?’

‘তোমার মা দাবি করেছিলেন, একই সময়ে তোমাদের দুজনকে আলাদা ঘরে রেখে গেলেও তোমরা একই কথা বলতে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কাঁদত। একজনের শরীরে আঘাত লাগলে অন্যজনের শরীরেও একই জায়গায় দাগ দেখা যেত।’

নীলাঞ্জনা কাঁপা গলায় বলল, ‘এগুলো কি সত্যি?’

শৈলেন বললেন, ‘কিছু ঘটনা সত্যি ছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনও অলৌকিক ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। শিশুদের মধ্যে এমন কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে পারে। আর তোমার মা তখন মানসিকভাবে খুব দুর্বল ছিলেন।’

অদ্বৈত মাথা নাড়লেন।

‘কিন্তু একটি ঘটনা কাকতালীয় ছিল না। তোমার জন্মের ছয় মাস পর ইরা নিখোঁজ হয়ে যায়। আর ঠিক সেই রাতেই তোমার মা একটি ডায়েরিতে লেখেন—“আমার মেয়েটি ফিরে এসেছে। কিন্তু সে আমার মেয়ে নয়।”’

নীলাঞ্জনা চোখ বন্ধ করল।

তার মাথার ভিতর শব্দগুলো ঘুরতে লাগল।

‘আমার মেয়ে নয়…’

‘এর মানে কী?’ সে জিজ্ঞাসা করল।

অদ্বৈত বললেন, ‘সেটাই জানতে তোমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’

নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে এখানে নিয়ে আসেননি। আমি নিজেই এসেছি।’

অদ্বৈত মৃদু হাসলেন।

‘তুমি কি নিশ্চিত?’

তিনি কোটের পকেট থেকে আরেকটি কাগজ বের করলেন। সেটি একটি পুরোনো চিঠি। নীলাঞ্জনার নিজের হাতের লেখার মতো দেখতে অক্ষরে লেখা—

‘আমি নীলকুঠিতে আসছি। আমার বোনকে ফিরিয়ে আনব।’

তারিখ—তিন মাস আগের।

নীলাঞ্জনা চিঠিটা দেখে শিউরে উঠল।

‘আমি এই চিঠি লিখিনি।’

‘তোমার হাতের লেখা নয়?’ অদ্বৈত জিজ্ঞাসা করলেন।

‘না।’

‘তাহলে তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে যে, চিঠিতে তোমার ব্যক্তিগত ডায়েরির একটি বাক্য হুবহু লেখা আছে?’

নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিতে পারল না।

সে বুঝতে পারছিল, কেউ তাকে বহুদিন ধরে এই বাড়ির দিকে ঠেলে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কে? আর কেন?

হঠাৎ করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে ইরার গলা ভেসে এল।

‘দিদি!’

নীলাঞ্জনা ঘুরে তাকাল।

সাদা পোশাক পরা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে লাল বল। চোখে জল।

‘ওদের কথা শুনো না। ওরা তোমাকে আবার নিয়ে যাবে।’

অদ্বৈত মেয়েটিকে দেখে এক পা পিছিয়ে গেলেন।

শৈলেন বসু ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।

নীলাঞ্জনা ইরার দিকে এগিয়ে গেল।

‘তুমি কোথায় ছিলে?’

ইরা বলল, ‘আমি সব সময় তোমার কাছেই ছিলাম।’

‘কিন্তু আমি তোমাকে দেখিনি কেন?’

‘কারণ তোমাকে দেখানো হয়নি।’

অদ্বৈত হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওর কাছে যেও না!’

নীলাঞ্জনা থেমে গেল।

‘কেন?’

অদ্বৈত বললেন, ‘ও ইরা নয়।’

ইরা কেঁদে উঠল।

‘দিদি, তুমি কি ওদের কথা বিশ্বাস করবে?’

নীলাঞ্জনা এক পা এগোল।

ইরা হাত বাড়িয়ে দিল।

তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল।

সেই মুহূর্তে নীলাঞ্জনার চোখের সামনে সবকিছু বদলে গেল।

সে আর নীলকুঠিতে নেই।

সে দাঁড়িয়ে আছে একটি অন্ধকার হাসপাতালের করিডরে। দেয়ালে লাল আলো জ্বলছে। দূরে একটি শিশুর কান্না। দরজার পাশে তার মা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি শিশুকে জড়িয়ে রাখা সাদা কাপড়।

মা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে হারাতে হবে।’

তারপর অদ্বৈতকে দেখা গেল। তিনি মায়ের হাত থেকে শিশুটিকে নিয়ে অন্ধকার ঘরে ঢুকে গেলেন।

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল।

দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

সে আবার নীলকুঠির করিডরে দাঁড়িয়ে। ইরা তার সামনে নেই।

তার বদলে মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো হাসপাতালের পরিচয়পত্র।

কার্ডে লেখা—

রোগীর নাম: সুচরিতা সেন।

অবস্থা: জীবিত।

স্থানান্তরের তারিখ: ১৭ জুলাই, ১৯৯৮।

গন্তব্য: কক্ষ ১৩।

নীলাঞ্জনা কার্ডটা হাতে তুলে নিল।

‘কক্ষ ১৩ কোথায়?’

অদ্বৈত এবার আর হাসলেন না।

তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘নীলকুঠির নীচে।’

৪. বাড়ির নীচে আরেকটি বাড়ি

বাড়ির নীচতলার পেছনের অংশে একটি সরু করিডর ছিল। এতক্ষণ কেউ সেখানে যাওয়ার কথা বলেনি। অদ্বৈত দরজাটা খুলতেই ভেজা মাটির গন্ধ বেরিয়ে এল।

সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে।

শৈলেন বসু বললেন, ‘এখানে যাওয়া ঠিক হবে না।’

নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আগে এসেছেন?’

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

‘একবার। বাইশ বছর আগে। তখন এখানে একটি ছোট চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। অমরেশবাবু গ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জন্য এটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এক রাতে সব বন্ধ হয়ে যায়।’

‘কেন?’

‘সেই রাতে একজন রোগী নিখোঁজ হয়েছিলেন।’

‘কে?’

শৈলেন উত্তর দেওয়ার আগেই অদ্বৈত বললেন, ‘সুচরিতা সেন।’

নীলাঞ্জনা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করল।

প্রতিটি ধাপের পাশে মরচে ধরা লোহার রেলিং। দেয়ালে পুরোনো বৈদ্যুতিক তার। কয়েকটি বাল্ব এখনও জ্বলছে, যদিও বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ থাকার কথা নয়।

নীচে পৌঁছে দেখা গেল, সামনে তিনটি দরজা।

প্রথম দরজায় লেখা—কক্ষ ১১।

দ্বিতীয় দরজায়—কক্ষ ১২।

তৃতীয় দরজায় কোনও নম্বর নেই। শুধু নীল রঙের একটি হাতের ছাপ।

নীলাঞ্জনা হাতের ছাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, এই হাতের ছাপ সে আগে কোথাও দেখেছে।

মায়ের পুরোনো ডায়েরিতে।

ডায়েরির শেষ পাতায় নীল কালিতে আঁকা ছিল ঠিক এই চিহ্নটি।

অদ্বৈত বললেন, ‘এই দরজার ওপারে যা আছে, তা দেখার পর তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমার জীবন তো অনেক আগেই বদলে গেছে।’

সে হাতের ছাপের ওপর হাত রাখল।

দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভিতরে একটি ছোট ঘর। মাঝখানে হাসপাতালের বিছানা। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার, কয়েকটি পুরোনো যন্ত্র এবং দেয়ালে ঝোলানো একটি ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা বেয়াল্লিশে থেমে আছে।

বিছানায় কেউ নেই।

কিন্তু বিছানার পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন একজন মহিলা।

চুল সাদা হয়ে গেছে। মুখে বয়সের ছাপ। হাতে একটি বই। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন কারও আসার অপেক্ষা করছেন।

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে বলল, ‘মা?’

মহিলাটি মাথা ঘোরালেন।

দুটি চোখে জল জমে উঠল।

‘নীলু?’

নীলাঞ্জনা দৌড়ে তাঁর কাছে গেল। মাকে জড়িয়ে ধরল। বহু বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এল।

‘তুমি বেঁচে আছ! তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?’

সুচরিতা মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন।

‘আমি তোকে খুঁজেছি, মা। প্রতিদিন খুঁজেছি।’

‘তাহলে ফিরে এলে না কেন?’

সুচরিতা চোখ বন্ধ করলেন।

‘কারণ আমি জানতাম না, তুই সত্যিই আমার মেয়ে কি না।’

নীলাঞ্জনা মায়ের হাত ছেড়ে পিছিয়ে গেল।

‘তুমি কী বলছ?’

সুচরিতা কাঁপা গলায় বললেন, ‘যেদিন তোর জন্ম হয়েছিল, সেদিন আমার দুটি মেয়ে জন্মেছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমার কোলে ছিল একটি শিশু। অন্য শিশুটিকে মৃত বলে জানানো হয়েছিল।’

‘ইরা?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু ইরা তো বেঁচে আছে!’

সুচরিতা মাথা নাড়লেন।

‘আমি জানি না, মা। আমি জানি না ও বেঁচে আছে কি না। আমি শুধু জানি, তোর বাবার মৃত্যুর আগে সে আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল—যদি কখনও নীলাঞ্জনা নীলকুঠিতে ফিরে আসে, তাকে কক্ষ ১৩-তে নিয়ে যেও না।’

নীলাঞ্জনা হতবাক হয়ে গেল।

‘কিন্তু তুমি তো এখানেই আছ!’

সুচরিতা চারদিকে তাকালেন।

‘আমি এখানে আসিনি। আমাকে এখানে রাখা হয়েছে।’

‘কে রেখেছে?’

মা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

অদ্বৈত রায় বাইরে থেকে বললেন, ‘দুঃখিত, সুচরিতা। কিন্তু এবার সত্যিটা শেষ করতে হবে।’

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে ছুটে গেল। দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হয়েছে।

শৈলেন বসুর গলা শোনা গেল, ‘অদ্বৈতবাবু, আপনি কী করছেন?’

‘যা বাইশ বছর আগে করা উচিত ছিল।’

তারপর ভারী কোনও যন্ত্র চালু হওয়ার শব্দ এল।

ঘরের এক কোণে লাল আলো জ্বলে উঠল।

সুচরিতা আতঙ্কিত হয়ে নীলাঞ্জনার হাত ধরলেন।

‘নীলু, তুই এখানে আসতে পারিস না। তোর এখানে থাকার কথা নয়।’

‘মা, আমাকে বলো, কী হচ্ছে!’

সুচরিতা মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিলেন।

‘তুই আমার মেয়ে। তোর জন্মের সময় কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি। কেউ মৃত থেকে ফিরে আসেনি। কিন্তু তোর বাবার একটি অপরাধ ছিল—সে একটি শিশুকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিল, আর সেই শিশুর পরিচয় বদলে দিয়েছিল।’

‘কেন?’

‘কারণ সেই শিশুর বাবা ছিল এমন একজন মানুষ, যার অপরাধ প্রকাশ পেলে অনেক বড় বড় মানুষ ধ্বংস হয়ে যেত।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘শিশুটি কে?’

সুচরিতা তার চোখের দিকে তাকালেন।

‘তুই।’

কথাটা শুনে নীলাঞ্জনার মনে হল, মাটিটা তার পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে।

‘আমি?’

‘হ্যাঁ। তুই যে পরিবারে বড় হয়েছিস, তারা তোকে ভালোবেসেছে। কিন্তু তোর জন্মের সত্যিটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তোর আসল বাবা অরুণাভ সেন নয়।’

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে আমার বাবা কে?’

সুচরিতা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দেয়ালে একটি পর্দা জ্বলে উঠল। সেখানে একটি পুরোনো ভিডিও দেখা যাচ্ছে।

ভিডিওতে অল্পবয়সি অরুণাভ সেন একটি শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে অদ্বৈত রায়। আর তাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন এক অচেনা মানুষ।

লোকটির মুখ ক্যামেরার দিকে ফিরতেই নীলাঞ্জনা শিউরে উঠল।

এ মুখ সে দেখেছে।

ছোটবেলার একটি ছবিতে।

মায়ের আলমারির ভিতরে লুকিয়ে রাখা সেই ছবিতে।

লোকটি আর কেউ নয়—তার নিজের বর্তমান বস, সংবাদপত্রের মালিক, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ঋত্বিক চৌধুরী।

ভিডিওতে ঋত্বিক বলছেন, ‘মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখো। বড় হলে ও নিজেই আমাদের কাছে ফিরে আসবে।’

তারপর পর্দা কালো হয়ে গেল।

নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।

‘ঋত্বিক চৌধুরী আমার বাবা?’

সুচরিতা চোখ নামিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে অদ্বৈতের কণ্ঠস্বর এল।

‘সত্যিটা জানলে ভালোই হল, নীলাঞ্জনা। এবার আর তোমাকে কিছু লুকোতে হবে না।’

দরজা খুলে গেল।

কিন্তু অদ্বৈত একা ছিলেন না।

তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাক পরা সেই মেয়েটি—ইরা।

ইরার হাতে একটি পিস্তল।

সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিদি, মাকে নিয়ে বেরিয়ে এসো।’

নীলাঞ্জনা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

‘তুমি তো বলেছিলে, তুমি আমার বোন!’

ইরা মৃদু হাসল।

‘আমি তোর বোনই।’

‘তাহলে তোমার হাতে পিস্তল কেন?’

ইরার চোখে জল এসে গেল।

‘কারণ যে মানুষটা আমাদের দুজনকে আলাদা করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।’

সে পিস্তলটা ঘুরিয়ে অদ্বৈতের দিকে তাক করল।

‘ডাক্তারবাবু, এবার বলুন—আমার জন্মের সময় দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন?’

অদ্বৈত চুপ করে রইলেন।

ইরা আবার বলল, ‘আপনি যদি আজও মিথ্যে বলেন, আমি গুলি চালাব।’

সুচরিতা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

‘ইরা, না!’

ইরা মায়ের দিকে তাকাল।

‘তুমি এত বছর আমাকে খুঁজলে না কেন, মা?’

সুচরিতা কেঁদে ফেললেন।

‘আমি তোকে খুঁজেছি, ইরা। কিন্তু যে মেয়েটাকে আমি খুঁজছিলাম, সে আমার কাছে ফিরতে চায়নি।’

ইরার মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল।

‘কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলে।’

‘না!’

‘আমাকে বলা হয়েছিল, দিদি আমার জায়গা নিয়ে নিয়েছে। আমার নাম, আমার পরিবার, আমার জীবন—সব কেড়ে নিয়েছে।’

নীলাঞ্জনা ইরার কাছে এগিয়ে গেল।

‘আমি কিছুই জানতাম না, ইরা। বিশ্বাস করো।’

ইরা তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পিস্তলটা নীচু করে রাখল।

তারপর বলল, ‘আমি জানি।’

‘তাহলে আমরা একসঙ্গে এখান থেকে বেরিয়ে যাব।’

ইরা মাথা নাড়ল।

‘না, দিদি। এখনও একটা সত্যি বাকি।’

সে পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করল। চাবির গায়ে খোদাই করা—১৩।

‘কক্ষ ১৩-এর দরজা খুলতে এই চাবি লাগে। কিন্তু এই ঘরটা কক্ষ ১৩ নয়।’

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘তাহলে কক্ষ ১৩ কোথায়?’

ইরা মেঝের দিকে তাকাল।

‘আমাদের পায়ের নীচে।’

তারপর সে চাবিটা মেঝের একটি ছোট ছিদ্রে ঢুকিয়ে ঘোরাল।

ঘরের মেঝে কেঁপে উঠল।

বিছানার নীচে একটি গোপন দরজা খুলে গেল। ভিতর থেকে ভেসে এল শিশুর কান্না।

একটি নয়।

দুটি শিশুর কান্না।

সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘না! এই দরজাটা খোলার কথা ছিল না!’

নীলাঞ্জনা নীচের দিকে তাকাল।

অন্ধকার সিঁড়ির শেষে একটি কাচের ঘর দেখা যাচ্ছে। কাচের ভিতরে পাশাপাশি রাখা দুটি ছোট হাসপাতালের বিছানা।

একটি বিছানায় শুয়ে আছে নবজাতক শিশু।

অন্য বিছানাটিও খালি নয়।

সেখানে শুয়ে আছে আরেকটি শিশু।

দুটি শিশুর মুখ অবিকল এক।

আর কাচের ঘরের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

‘প্রকল্প নীল: প্রথম পর্যায় সম্পূর্ণ। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে ১৭ জুলাই, ২০২৬।’

নীলাঞ্জনা তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল।

আজ ১৭ জুলাই, ২০২৬।

ঠিক সেই মুহূর্তে কাচের ঘরের ভিতর থেকে একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘোষণা করল—

‘দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হচ্ছে। বিষয়বস্তু নং ২৭, জেগে উঠুন।’

একটি শিশুর চোখ খুলে গেল।

তারপর অন্য শিশুটিরও।

আর দুজনেই একই সঙ্গে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে হাসল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার ওপারে প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে কেউ থাকে না)।

রাত তখন এগারোটা বেয়াল্লিশ।

শহরের শেষ বাসটা চলে যাওয়ার পর শালিখা গ্রামের রাস্তায় আর কোনও যানবাহন দেখা যায় না। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক, মাঝে মাঝে বাঁশবাগানের মাথায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, আর আকাশজুড়ে জমে থাকা কালো মেঘ—সব মিলিয়ে রাতটা যেন অস্বাভাবিক রকমের ভারী।

এই অন্ধকারের মধ্যেই একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনা।

বাড়িটার নাম ‘নীলকুঠি’।

গ্রামের লোকেরা বলে, গত বাইশ বছর ধরে বাড়িটায় কেউ থাকে না। বাড়ির মালিক অমরেশ মুখোপাধ্যায় এক বর্ষার রাতে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী মাধুরী দেবী তার কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যান। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ইরা কোথায় গিয়েছিল, তা কেউ জানে না। কেউ বলে তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল, কেউ বলে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। কিন্তু কোনও কথারই প্রমাণ নেই।

তারপর থেকে বাড়িটা বন্ধ।

তবু প্রতি বছর বর্ষার প্রথম রাতে বাড়ির দোতলার একটি জানালায় নীল আলো জ্বলে ওঠে।

নীলাঞ্জনা এসব গল্প বিশ্বাস করত না।

সে কলকাতার একটি সংবাদপত্রে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লেখে। রহস্যময় বাড়ি, নিখোঁজ মানুষ, পুরোনো মামলা—এসবের পিছনে তার আগ্রহ বহুদিনের। তিন সপ্তাহ আগে তার কাছে একটি বেনামি খাম এসেছিল। খামের ভিতরে ছিল একটি সাদা-কালো ছবি, একটি পুরোনো চাবি এবং মাত্র এক লাইনের চিঠি।

‘তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্য জানতে চাইলে, আষাঢ়ের প্রথম রাতে নীলকুঠিতে এসো।’

চিঠির নীচে কোনও নাম ছিল না।

কিন্তু ছবিটা দেখার পর নীলাঞ্জনার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল।

ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি তার মা—সুচরিতা সেন।

সুচরিতা মারা গিয়েছিলেন যখন নীলাঞ্জনার বয়স মাত্র আট বছর। সরকারি নথিতে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল, গাড়ি দুর্ঘটনা। কিন্তু নীলাঞ্জনার মনে আছে, মৃত্যুর আগের কয়েক মাস মা প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। কাউকে ফোনে খুব নিচু গলায় বলতেন, ‘ওরা আবার ফিরে এসেছে।’

কাদের কথা বলতেন মা?

কেন মৃত্যুর আগের রাতে মাকে এত আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল?

আর বাইশ বছর আগে পরিত্যক্ত একটি বাড়ির সামনে তাঁর মা দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?

ছবির পিছনে লেখা তারিখটি ছিল মায়ের মৃত্যুর ঠিক সাত দিন আগের।

নীলাঞ্জনা ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করল। মরচে পড়া লোহার গেটের তালায় চাবি ঢোকাতেই একটা খটাস শব্দ হল। তালাটা খুলে গেল আশ্চর্য সহজে।

গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ উঠল।

বাড়ির সামনে আগাছায় ঢাকা বাগান। মাঝখানে পাথরের শুকনো ফোয়ারা। একপাশে ভাঙা দোলনা, অন্য পাশে একটি বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মূর্তির মুখ শ্যাওলায় ঢেকে গেছে।

নীলাঞ্জনা টর্চ জ্বালিয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল।

দোতলার বাঁদিকের জানালায় নীল আলো জ্বলছে।

সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। আলোয় বাড়িটার দেয়ালে দেখা গেল লম্বা, কালচে দাগ—যেন বহু বছর আগে আগুন লেগেছিল। অথচ গ্রামের লোকেরা বলেছিল, বাড়িতে কখনও আগুন লাগেনি।

সদর দরজার সামনে পৌঁছে সে কলিং বেল খুঁজল। ভাঙা কাঠের দরজায় বেল নেই। শুধু পিতলের একটি হাতল।

নীলাঞ্জনা হাতলটি তুলতেই ভিতর থেকে তিনবার শব্দ হল।

ঠক। ঠক। ঠক।

সে থমকে দাঁড়াল।

দরজায় তো সে মাত্র একবার আঘাত করেছে।

ভিতর থেকে কে যেন তার আঘাতের জবাব দিল!

‘কে?’ নীলাঞ্জনা জোরে বলল।

কোনও উত্তর এল না।

সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।

একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল। মেঝের ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ। দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো ছবি, অধিকাংশের কাচ ভাঙা। এক কোণে কাঠের আলমারি, তার পাশে পড়ে আছে একটি ভাঙা ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে এগারোটা বেয়াল্লিশে।

নীলাঞ্জনা নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল।

এগারোটা বেয়াল্লিশ।

তার বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঠিক তখনই উপরতলা থেকে কারও পায়ের শব্দ ভেসে এল।

ধীরে ধীরে।

এক পা।

দুই পা।

তিন পা।

যেন কেউ সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছে।

নীলাঞ্জনা টর্চটা সিঁড়ির দিকে ধরল।

কেউ নেই।

কিন্তু সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে একটা ছোট্ট লাল বল গড়িয়ে পড়ল। বলটা তার পায়ের কাছে এসে থামল।

নীলাঞ্জনা বলটা তুলে নিল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার মায়ের আলমারিতে ঠিক এমনই একটি লাল বল ছিল। মা বলতেন, বলটি তাঁর ছোটবেলার। একবার নীলাঞ্জনা খেলতে গিয়ে সেটি হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর আর কখনও খুঁজে পায়নি।

বলটার গায়ে সাদা রঙে লেখা—‘ইরা’।

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘ইরা কে?’

উপরতলা থেকে এবার একটি মেয়ের গলা ভেসে এল।

‘তুমি এত দেরি করলে কেন?’

গলাটা খুব পরিচিত।

এতটাই পরিচিত যে নীলাঞ্জনার চোখে জল চলে এল।

ওই গলায় তার মা তাকে ছোটবেলায় ঘুম পাড়াতেন।

‘মা?’

শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই বাড়ির ভিতরের সব দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

ধড়াম!

ধড়াম!

ধড়াম!

টর্চের আলো কেঁপে উঠল। নীলাঞ্জনা নিজেকে সামলে সিঁড়ির দিকে এগোল। প্রতিটি ধাপের কাঠ চাপ পড়লেই কেঁদে উঠছে। দোতলায় পৌঁছে সে দেখতে পেল, করিডরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা।

দরজাটি নীল রঙের।

বাড়ির অন্য সব দরজা কালচে বাদামি, শুধু এই দরজাটিই উজ্জ্বল নীল। দরজার মাঝখানে পিতলের ছোট্ট ফলকে খোদাই করা—

‘ইরার ঘর। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।’

দরজার নীচ দিয়ে নীল আলো বেরিয়ে আসছে।

নীলাঞ্জনা হাত বাড়িয়ে দরজায় ঠেলা দিল।

দরজাটি খুলল না।

সে হাতল ঘোরাল। তালা দেওয়া।

ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করতেই বুঝল, চাবিটি এই দরজার তালার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

চাবি ঢুকিয়ে ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে একটি মেয়ের হাসির শব্দ এল।

তারপর ফিসফিসানি—

‘মাকে তুমি চিনতে পেরেছ?’

নীলাঞ্জনার হাত কেঁপে উঠল।

‘তুমি কে?’

‘আমি ইরা।’

‘তুমি কোথায়?’

‘দরজার ওপারে।’

‘দরজা খোলো।’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেয়েটি বলল, ‘খুললে তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।’

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল, ‘আমি সত্য জানতে এসেছি।’

‘সত্য?’ মেয়েটি হেসে উঠল। ‘সত্য তো তোমার বাড়িতেই ছিল। তুমি কোনও দিন খুঁজে দেখোনি।’

কথাটা শুনে নীলাঞ্জনার মাথার ভিতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।

তার বাড়ি?

কলকাতার ফ্ল্যাটে তো মায়ের পুরোনো জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিলেন। তিনি কখনও নীলকুঠির কথা বলেননি। এমনকী গ্রামের নামও বলেননি।

তাহলে ইরা তার বাড়ির কথা জানে কী করে?

নীলাঞ্জনা আবার চাবি ঘোরাল।

ক্লিক করে তালা খুলে গেল।

দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই ভিতর থেকে বরফশীতল বাতাস বেরিয়ে এল। নীল আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ঘরটা আশ্চর্য পরিষ্কার।

একটি ছোট বিছানা, কাঠের পড়ার টেবিল, দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার, জানালার পাশে নীল পর্দা। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই এবং একটি খোলা ডায়েরি। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বড় আয়না, যার ওপর সাদা কাপড় ঢাকা।

কিন্তু ঘরে কেউ নেই।

নীলাঞ্জনা ভিতরে ঢুকল।

দরজাটি পিছনে বন্ধ হয়ে গেল।

সে দ্রুত ঘুরে হাতল টানল। দরজা নড়ল না।

‘ইরা!’

কোনও উত্তর নেই।

টেবিলের ওপর ডায়েরিটা খুলে সে প্রথম পাতায় তারিখ দেখতে পেল—১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই।

নীলাঞ্জনার জন্ম ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই।

তার শ্বাস আটকে এল।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

‘আজ আমার মেয়ে পৃথিবীতে এসেছে। ওর নাম রাখব নীলাঞ্জনা। কিন্তু ওকে কেউ যেন জানতে না দেয়, ও আসলে কার মেয়ে।’

নীলাঞ্জনা চেয়ারটা ধরে দাঁড়াল।

‘না… এটা হতে পারে না।’

সে পরের পাতাটা উল্টাল।

‘অমরেশ বলেছে, মেয়েটিকে বাঁচাতে হলে ওকে দূরে পাঠাতেই হবে। সুচরিতা রাজি নয়। সে বলছে, মেয়েকে ছাড়া সে বাঁচবে না। কিন্তু আমরা যদি সত্যিটা বলে দিই, তাহলে ওরা নীলাঞ্জনাকেও নিয়ে যাবে।’

পরের পাতাগুলো ছেঁড়া।

শেষ পাতায় শুধু একটি বাক্য—

‘আজ রাত এগারোটা বেয়াল্লিশে দরজাটা খুলবে। যদি নীলাঞ্জনা ফিরে আসে, তাকে বলবে—তার মা কখনও মারা যায়নি।’

নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা হাত থেকে ফেলে দিল।

তার মা মারা যাননি?

তাহলে যে দেহটি সে দেখেছিল, যে শেষকৃত্যে সে কেঁদেছিল, যে ছবির সামনে প্রতি বছর ফুল দিয়েছে—সবই কি মিথ্যে?

তার মাথার মধ্যে একের পর এক স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল। বাবার মুখ, হাসপাতালের করিডর, সাদা চাদরে ঢাকা একটি দেহ, আর মায়ের ঠান্ডা হাত ধরে থাকা ছোট্ট নীলাঞ্জনা।

কিন্তু সেই স্মৃতির মধ্যে একটা অদ্ভুত ফাঁক ছিল।

সে কখনও মায়ের মুখটা স্পষ্ট মনে করতে পারে না।

শুধু কণ্ঠস্বর মনে আছে।

শুধু একটি কথা মনে আছে—

‘কখনও নীল দরজার ওপারে যাস না।’

ঘরের কোণে ঢাকা আয়নাটির দিক থেকে একটা শব্দ এল।

খসখস।

যেন কেউ কাপড়ের নীচে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিল।

আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা গেল না।

দেখা গেল একটি হাসপাতালের ঘর।

সাদা দেয়াল, জানালার পাশে একটি বিছানা। বিছানায় শুয়ে আছে এক মহিলা। মুখে অক্সিজেনের নল। চুলের পাশে পাক ধরেছে, চোখ বন্ধ।

নীলাঞ্জনা মহিলাটিকে চিনতে পারল।

ছবিতে দেখা সেই মুখ।

তার মা—সুচরিতা সেন।

মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বৃদ্ধ। হাতে একটি ফাইল। তাঁর মুখটা স্পষ্ট নয়। তিনি ঝুঁকে মহিলার কানে কিছু বললেন।

সুচরিতা চোখ খুললেন।

আয়নার ওপার থেকে তাঁর ঠোঁট নড়ল।

‘নীলু… পালিয়ে যা।’

ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটি হাত নীলাঞ্জনার কাঁধ চেপে ধরল।

সে চিৎকার করে ঘুরে দাঁড়াল।

একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন তার পিছনে। ধূসর চুল, কুঁচকে যাওয়া মুখ, চোখে মোটা কাচের চশমা। পরনে পুরোনো ধাঁচের সাদা পাঞ্জাবি।

নীলাঞ্জনা তাঁকে কোনও দিন দেখেনি।

কিন্তু বৃদ্ধের মুখে এমন এক পরিচিত বিষণ্ণতা ছিল, যেন বহু বছর ধরে তিনি তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

বৃদ্ধ বললেন, ‘তুমি অবশেষে এসেছ।’

‘আপনি কে?’

‘যে মানুষটাকে তোমার বাবা মৃত বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন।’

নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তিনজন মানুষ—একজন তরুণী, একজন পুরুষ এবং কোলে একটি শিশু। তরুণীটি সুচরিতা। পুরুষটির মুখ বৃদ্ধের সঙ্গে মিলে যায়।

আর শিশুটি—

নীলাঞ্জনার নিজের মুখের মতো।

কিন্তু ছবির পিছনে লেখা ছিল অন্য একটি নাম।

‘ইরা মুখোপাধ্যায়।’

বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমাকে নীলাঞ্জনা নামে বড় করা হয়েছে। কিন্তু তোমার জন্মের সময় তোমার নাম রাখা হয়েছিল ইরা। আর যে মেয়েটিকে তুমি এতক্ষণ খুঁজছ, সে তোমার বোন।’

নীলাঞ্জনা কোনও কথা বলতে পারল না।

‘আমার বোন কোথায়?’

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই নীল দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

দরজার ওপাশ থেকে একটি মেয়ের গলা চিৎকার করে উঠল—

‘দাদু, ওকে কিছু বলো না! ও এখনও জানে না, ওর ভিতরে কী আছে!’

বৃদ্ধের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি নীলাঞ্জনার হাত শক্ত করে ধরলেন।

‘শোনো, যা-ই ঘটুক, দরজাটা আবার খুলবে না। তোমার বোন ওখানে নেই।’

‘তাহলে কে কথা বলছে?’

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

দরজার ওপাশের কণ্ঠস্বর এবার বদলে গেল। মেয়েলি গলা মিলিয়ে গেল এক পুরুষের কর্কশ হাসিতে।

তারপর শোনা গেল নীলাঞ্জনার বাবার কণ্ঠস্বর—

‘নীলু, দরজাটা খোলো। বাবা এসেছে।’

নীলাঞ্জনা জমে গেল।

তার বাবা মারা গিয়েছেন পাঁচ বছর আগে।

আয়নার ভিতরে হাসপাতালের দৃশ্যটা আবার ফিরে এল। বিছানায় শুয়ে থাকা সুচরিতা এবার চোখ মেলে সরাসরি নীলাঞ্জনার দিকে তাকালেন।

আয়নার কাচে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কয়েকটি শব্দ—

‘তোমার জন্মের দিন একজন মারা গিয়েছিল। কিন্তু সে তোমার মা নয়।’

তারপর আলো নিভে গেল।

পুরো ঘর অন্ধকার।

বৃদ্ধের হাত নীলাঞ্জনার হাত থেকে সরে গেল।

সে চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি কোথায়?’

কোনও উত্তর এল না।

শুধু অন্ধকারের মধ্যে কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।

তারপর একেবারে কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলল—

‘ইরা, এবার তোমার পালা।’

দরজার বাইরে আবার তিনবার আঘাত পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

এবার নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, শব্দটা দরজার ওপার থেকে আসছে না।

আসছে তার নিজের বুকের ভিতর থেকে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল এমন একটি স্মৃতি, যা তার মনে থাকার কথা নয়।

একটি হাসপাতালের ঘর।

দুটি নবজাতক শিশু।

একটি শিশুকে কোলে তুলে নিচ্ছেন সুচরিতা।

অন্য শিশুটিকে নিয়ে অন্ধকার করিডরে চলে যাচ্ছেন এক অচেনা মানুষ।

আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার বাবা বলছেন—

‘একটাকে বাঁচাতে হলে অন্যটাকে হারাতেই হবে।’

নীলাঞ্জনা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি শিশুর কান্না ভেসে এল।

সেই কান্না যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা কোনও দরজার ওপার থেকে আসছে।

আর বাড়ির নীচতলায়, যেখানে ভাঙা ঘড়িটা এগারোটা বেয়াল্লিশে থেমে ছিল, সেখানে ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল।

এগারোটা তেতাল্লিশ।

বাইশ বছর পর প্রথমবার।

নীলকুঠির সব জানালায় একসঙ্গে নীল আলো জ্বলে উঠল।

বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে তখন একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে সাদা পোশাক, হাতে লাল বল। মুখটা নীলাঞ্জনার মতোই।

সে বাড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—

‘দিদি, এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।’

তারপর সে গেটের দিকে এগিয়ে এল।

কিন্তু গেটের তালা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল না।

ভিতর থেকে কেউ সেটি আটকে রেখেছিল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে যাত্রার শেষ নেই)।

১. নিজের মুখোমুখি

“দাদা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”

ছোট ছেলেটির প্রশ্নে অরিন্দমের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল।

ছেলেটির বয়স আট কি নয়। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, পায়ে কালো জুতো, হাতে লাল রঙের খেলনা ট্রেন। কপালের বাঁ দিকে ছোট একটি কাটা দাগ।

অরিন্দমের নিজের শৈশবের ছবিতেও ঠিক সেই জায়গায় এমন একটি দাগ ছিল।

“তুমি কে?” অরিন্দম কোনও রকমে প্রশ্ন করল।

ছেলেটি অবাক হয়ে তাকাল।

“আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তো তোমার সঙ্গে সব সময় খেলতাম!”

মেঘলা অরিন্দমের পাশে এসে দাঁড়াল।

“এটা কোনওভাবে সম্ভব নয়। তুমি তো বলেছিলে, তোমার যমজ ভাই জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা গিয়েছিল।”

অরিন্দম ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার নাম কী?”

ছেলেটি হাসল।

“তুমি জানো না? আমার নাম অরুণ।”

“অরুণ রায়?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি কোথায় থাকো?”

ছেলেটি আঙুল তুলে ট্রেনের দিকে দেখাল।

“ওখানে।”

তারপর সে অরিন্দমের হাত ধরতে গেল।

অরিন্দম পিছিয়ে এল।

“আমাকে ছোঁবে না!”

ছেলেটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মাথা নীচু করে বলল, “তুমিও কি আমাকে ভুলে গেছ?”

এই প্রশ্নটি অরিন্দমের বুকের গভীরে কোথাও আঘাত করল। তার মনে পড়তে লাগল কিছু অস্পষ্ট ছবি—একটি ছোট বাড়ি, উঠোনে দু’টি শিশু, মায়ের কোলে বসে থাকা দুই ভাই, আর একটি খেলনা ট্রেন নিয়ে ঝগড়া।

কিন্তু সে জানত, স্মৃতি সব সময় নির্ভুল নয়। কোনও ছবি মনে পড়লেই সেটি বাস্তব ঘটনা ছিল, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সে নিজেকে সামলে বলল, “আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। কিন্তু তোমার পরিচয় জানতে চাই।”

ছেলেটি খেলনা ট্রেনটি মেঝেতে রাখল।

“তাহলে আমার সঙ্গে চলো। মা অপেক্ষা করছেন।”

“তোমার মা?”

“আমাদের মা।”

অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।

তার মা মারা গিয়েছিলেন যখন সে খুব ছোট। মায়ের মুখের স্মৃতি তার কাছে ঝাপসা। কিন্তু ছেলেটির কথায় এমন একটি ব্যথা ছিল, যা অভিনয় বলে মনে হচ্ছিল না।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “ওর সঙ্গে যেও না। আমরা জানি না, এটা কী।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আমি কোথাও যাচ্ছি না। আগে প্রমাণ চাই।”

ছেলেটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে দিল।

ছবিতে দু’টি শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজন অরিন্দম, অন্যজন সম্ভবত অরুণ। পিছনে তাঁদের মা। ছবিটির কোণে তারিখ লেখা—১৭ মার্চ, ১৯৯৬।

অরিন্দম ছবিটি হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগল।

“এই ছবিটা কোথায় পেলে?”

“মা দিয়েছেন।”

“তোমার মা কোথায়?”

ছেলেটি এবার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “শেষ কামরায়।”

তারপর সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার অবয়ব কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল।

অরিন্দম ছুটে এগিয়ে গেল।

“দাঁড়াও! অরুণ!”

কিন্তু সেখানে আর কেউ নেই।

মেঝেতে পড়ে রয়েছে শুধু লাল খেলনা ট্রেনটি।

অরিন্দম সেটি তুলে নিল। খেলনাটির নীচে ছোট অক্ষরে লেখা—‘অরিন্দম ও অরুণের জন্য, মা।’

তার চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু ঠিক তখনই সে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করল।

খেলনাটির গায়ে ধুলো জমে আছে, কিন্তু ছেলেটির হাত থেকে পড়ার পর মেঝেতে কোনও পায়ের ছাপ নেই।

সে মেঘলার দিকে তাকাল।

“আমরা যা দেখলাম, তার ব্যাখ্যা এখনও জানি না। কিন্তু এই খেলনাটি বাস্তব। ছবিটাও বাস্তব হতে পারে। আমাদের জানতে হবে, আমার যমজ ভাইয়ের কথা পরিবার কেন গোপন করেছিল।”

মেঘলা বলল, “তাহলে প্রথমে তোমার জন্মের নথি খুঁজতে হবে।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আর তারপর কালো সেতুতে যেতে হবে।”

২. জন্মের নথিতে যে মিথ্যে ছিল

ভোর পাঁচটার দিকে তাঁরা শালবনপুর স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লেন। রাতের অদ্ভুত ঘটনার পরও অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দীর্ঘ স্বপ্নের মধ্যে রয়েছে।

কিন্তু তার পকেটে রাখা ছবিটি বাস্তব। লাল খেলনা ট্রেনটিও বাস্তব।

সকালে তাঁরা শহরের পুরোনো পুরসভা কার্যালয়ে পৌঁছলেন। সেখানে অরিন্দমের জন্মের নথি থাকার কথা। অরিন্দম আগে কখনও এই নথি সংগ্রহ করার চেষ্টা করেনি, কারণ পরিবারের সবাই বলেছিল, তার জন্মের সময় কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একজন প্রবীণ কর্মচারী পুরোনো রেজিস্টার বের করে আনলেন।

জন্মের তারিখ: ১৭ মার্চ, ১৯৯৬।

প্রথম শিশুর নাম: অরিন্দম রায়।

দ্বিতীয় শিশুর নাম: অরুণ রায়।

দু’জনের জন্মের ব্যবধান: চার মিনিট।

অরিন্দমের হাত কেঁপে উঠল।

“দ্বিতীয় শিশুর মৃত্যুর কোনও নথি আছে?”

কর্মচারী অন্য একটি রেজিস্টার খুললেন।

সেখানে লেখা ছিল, দ্বিতীয় শিশুকে জন্মের পর চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। মৃত্যুর নথি নেই।

অরিন্দম ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।

“তাহলে সবাই কেন বলেছিল, সে জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল?”

কর্মচারী অসহায়ভাবে বললেন, “আমি শুধু নথি দেখাতে পারি। কেন এমন বলা হয়েছিল, তা জানি না।”

অরিন্দম নিজের ফোনে নথির ছবি তুলে নিল।

ঠিক তখন তার ফোনে একটি কল এল। নম্বরটি অচেনা।

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

“তুমি অবশেষে জন্মের নথি খুঁজে পেয়েছ?”

অরিন্দম চমকে উঠল।

“আপনি কে?”

“আমার নাম ড. শৈলেন বসু। আমি তোমার জন্মের সময় হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম।”

“আপনি কি আমার যমজ ভাইকে চিনতেন?”

“হ্যাঁ। আর আমি জানি, তাকে কেন তোমাদের পরিবার থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।”

অরিন্দম উঠে দাঁড়াল।

“কেন?”

“ফোনে সব বলা সম্ভব নয়। তুমি যদি সত্য জানতে চাও, আজ বিকেল চারটায় পুরোনো মাতৃসদনে এসো। তবে একা এসো না।”

কল কেটে গেল।

মেঘলা বলল, “আমরা যাব।”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“তুমি কি মনে করো, এই লোকটি বিশ্বাসযোগ্য?”

“না। কিন্তু তাঁর কাছে এমন তথ্য থাকতে পারে, যা আমাদের দরকার। আমরা প্রমাণ যাচাই করব।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, এই রহস্যের সমাধান হয়তো কোনও ভূতুড়ে ট্রেনে নেই।

সমাধান লুকিয়ে আছে মানুষের তৈরি নথি, গোপন সিদ্ধান্ত এবং বহু বছরের অপরাধবোধের মধ্যে।

৩. ডাক্তারের স্বীকারোক্তি

পুরোনো মাতৃসদনটি শহরের এক নির্জন প্রান্তে। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভবনটির বেশিরভাগ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। শুধু একটি ছোট অফিসঘর এখনও ব্যবহারযোগ্য।

বিকেল চারটায় অরিন্দম ও মেঘলা সেখানে পৌঁছলেন।

ঘরের ভিতরে বসে ছিলেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধ। পাশে একটি লাঠি, টেবিলে কয়েকটি পুরোনো ফাইল।

“আপনি অরিন্দম?” বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যাঁ।”

“তোমাকে দেখে তোমার বাবার কথা মনে পড়ছে।”

অরিন্দম সরাসরি বলল, “আমার যমজ ভাই কোথায়?”

ড. শৈলেন বসু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার ভাই জন্মের পর মারা যায়নি। সে জীবিত ছিল। কিন্তু জন্মের সময় তার শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তোমার বাবা-মায়ের মধ্যে একটি গুরুতর বিরোধ শুরু হয়।”

“কী নিয়ে?”

“তোমার বাবা চেয়েছিলেন, দুই সন্তানকে একসঙ্গে বড় করতে। কিন্তু তোমার মা তখন দীর্ঘদিনের একটি অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তোমার বাবার এক আত্মীয় নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি অরুণকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন।”

অরিন্দমের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে আমার ভাইকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটি সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায় হয়নি। তোমার মা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলাতে চেয়েছিলেন। তখন পরিবারের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়। কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ বিষয়টি গোপন রাখেন।”

“আমার বাবার ভূমিকা কী ছিল?”

ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, “তোমার বাবা প্রথমে রাজি হয়েছিলেন। পরে অনুতপ্ত হন। তিনি অরুণকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে শিশুটিকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

“কোথায়?”

“এ তথ্য আমার কাছে নেই। আমি শুধু চিকিৎসার নথি দেখেছিলাম। পরে আমাকে চুপ থাকতে বলা হয়।”

অরিন্দম টেবিলে হাত রাখল।

“আপনি এত বছর চুপ ছিলেন কেন?”

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার চাকরি, সুনাম, পরিবার—সব হারানোর ভয় ছিল। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, নীরব থেকেও আমি অন্যায়ের অংশ হয়েছি।”

তিনি একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন।

“এখানে তোমার ভাইকে স্থানান্তরের কাগজ রয়েছে। ঠিকানাটি পুরোনো, কিন্তু শেষ যে প্রতিষ্ঠানটির নাম আছে, সেটি শালবনপুরের কাছেই।”

অরিন্দম কাগজটি পড়ল।

প্রতিষ্ঠানের নাম—শিশু কল্যাণ নিবাস।

ঠিকানার পাশে লাল কালিতে লেখা ছিল—‘পরবর্তীকালে বন্ধ’।

মেঘলা বলল, “আমাদের সেখানে যেতে হবে।”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“যাও। কিন্তু মনে রেখো, তোমার ভাইয়ের জীবন তোমার কল্পনার মতো নাও হতে পারে। তাকে খুঁজে পেলেই তোমরা আবার ছোটবেলার মতো হয়ে যাবে, এমন নয়।”

অরিন্দম ধীরে বলল, “আমি তাকে ফিরে পেতে চাই না শুধু। আমি জানতে চাই, তার সঙ্গে কী ঘটেছিল।”

ডাক্তার তার দিকে তাকালেন।

“তাহলে তুমি সত্য জানার জন্য প্রস্তুত।”

৪. শিশু কল্যাণ নিবাস

শিশু কল্যাণ নিবাস ছিল শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো ভবন। একসময় সেখানে অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুদের রাখা হতো। এখন ভবনটি সরকারি দপ্তরের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অরিন্দম ও মেঘলা সেখানে পৌঁছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর সঙ্গে কথা বললেন।

প্রথমে কেউ পুরোনো নথি খুঁজে দিতে রাজি হলো না। পরে ড. শৈলেন বসুর দেওয়া কাগজ দেখে একজন কর্মী পুরোনো রেজিস্টারের ঘরে তাঁদের নিয়ে গেলেন।

ধুলোমাখা আলমারি থেকে একটি রেজিস্টার বের করা হলো।

অরুণ রায়ের নাম সেখানে রয়েছে।

কিন্তু তার পাশে একটি নোট লেখা—

‘দত্তক গ্রহণকারী পরিবার শিশুটিকে অন্য জেলায় স্থানান্তর করেছে।’

পরিবারের নাম: সেনগুপ্ত পরিবার।

ঠিকানা: কলকাতা।

অরিন্দমের মনে পড়ল, তার বাবার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন দেবাশিস সেনগুপ্ত। তিনি কলকাতায় থাকতেন এবং বহু বছর আগে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

“আমাদের কলকাতায় ফিরতে হবে,” অরিন্দম বলল।

কর্মচারী তাঁদের থামিয়ে দিলেন।

“একটা কথা বলি? এই নথির সঙ্গে আরেকটি কাগজ আছে। সেটি বহু বছর আগে কেউ এখানে জমা দিয়েছিল।”

কাগজটি ছিল একটি চিঠি।

‘অরুণ,

তুমি হয়তো কোনও দিন জানতে পারবে না, তোমার জন্মের পর কী ঘটেছিল। কিন্তু মনে রেখো, তোমার মা তোমাকে ছেড়ে দিতে চাননি। তিনি শেষ পর্যন্ত তোমাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

যদি কোনও দিন তোমার ভাই তোমাকে খুঁজতে আসে, তাকে বলবে, তোমাদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত তোমাদের কোনও দোষের জন্য নেওয়া হয়নি।

তোমাদের দু’জনের জীবনই তোমাদের নিজেদের।

— এক অপরাধী মানুষ।’

চিঠির নীচে কোনও নাম নেই।

অরিন্দম চিঠিটি পড়ে দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল।

“এই চিঠি কে লিখেছিল?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।

কর্মচারী বললেন, “জানি না। তবে চিঠিটি এখানে জমা পড়েছিল ২০০৪ সালে।”

অরিন্দম মাথা তুলল।

“২০০৪? আমি তখন আট বছরের। দিদি তখন হাসপাতালের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। আর এই চিঠির তারিখের সঙ্গে ১৩০৭ নম্বর ট্রেনের কোনও সম্পর্ক আছে কি?”

মেঘলা বলল, “হয়তো সরাসরি নয়। কিন্তু তোমার পরিবারের ইতিহাস আর নন্দিতার তদন্তের মধ্যে কোনও যোগ থাকতে পারে।”

অরিন্দম কাগজটি পকেটে রাখল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি ছবি এল।

অচেনা নম্বর থেকে পাঠানো।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বৃদ্ধ লোক জানলার পাশে বসে আছেন। তাঁর হাতে একটি ছোট্ট খেলনা ট্রেন।

ছবির নীচে লেখা—

‘তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে কালো সেতুতে ফিরে যাও। সেখানে তোমার দিদি অপেক্ষা করছে।’

অরিন্দম মেঘলার দিকে তাকাল।

“আমাদের আবার কালো সেতুতে যেতে হবে।”

৫. কালো সেতুর নীচে

পরদিন ভোরে তাঁরা কালো সেতুর কাছে পৌঁছলেন।

সেতুটি এখন পরিত্যক্ত। পুরোনো রেললাইন তুলে নেওয়া হয়েছে, শুধু কিছু মরচে ধরা কাঠের স্লিপার পড়ে আছে। নিচে সরু নদী। বর্ষার জল কমে গিয়ে পাথর দেখা যাচ্ছে।

অরিন্দম চারদিকে তাকাল।

“এখানে তো কোনও ট্রেন চলতে পারে না।”

মেঘলা বলল, “সরকারি লাইনে নয়। কিন্তু সাত বছর আগের দুর্ঘটনার নথি অনুযায়ী, ওই রাতে এখানে একটি বিশেষ ট্রেন ছিল।”

তারা সেতুর নীচে নামল।

একটি ভাঙা কংক্রিটের স্তম্ভের পাশে অরিন্দম একটি ধাতব ফলক দেখতে পেল। ফলকটি মাটির মধ্যে অর্ধেক পোঁতা।

সে মাটি সরিয়ে ফলকটি বের করল।

তাতে লেখা—

‘দুর্ঘটনাস্থল: ১৩ অক্টোবর, ২০১৯। তদন্তাধীন।’

অরিন্দমের মাথায় তারিখটি ঘুরতে লাগল। নন্দিতা নিখোঁজ হয়েছিল সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে। অথচ যাত্রী তালিকায় ১৩ অক্টোবর, ২০২৬-এর তারিখও রয়েছে।

একই তারিখের পুনরাবৃত্তি।

একই সময়।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

মেঘলা নদীর ধারে কিছু দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল।

একটি ছোট ধাতব বাক্স পাথরের নীচে লুকিয়ে রাখা। বাক্সের তালা ভাঙা, ভিতরে কয়েকটি কাগজ এবং একটি অডিও রেকর্ডার।

অরিন্দম রেকর্ডারটি চালু করল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ।

“আমার নাম দেবব্রত দত্ত। আমি শালবনপুর স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। আজ ১৩ অক্টোবর, ২০১৯। রাত ১১টা ৪৫ মিনিট।”

মেঘলা চোখ বন্ধ করল। বাবার কণ্ঠ সে কোনও দিন ভুলতে পারেনি।

রেকর্ডিং চলতে লাগল।

“আজ একটি বিশেষ ট্রেনকে নির্ধারিত লাইনের বদলে পুরোনো লাইনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশটি লিখিত নয়। আমাকে বলা হয়েছে, ট্রেনে কয়েকজন যাত্রীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু যাত্রী তালিকায় তাঁদের নাম নেই। আমি আপত্তি জানিয়েছি।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

“ট্রেনটি এখন স্টেশন ছেড়েছে। চালককে শেষ মুহূর্তে সিগন্যাল বদলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি আশঙ্কা করছি, সামনে বিপদ রয়েছে। যদি এই রেকর্ডিং কেউ পায়, তবে জানবে—এই দুর্ঘটনা কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না।”

রেকর্ডিংয়ে হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল। তারপর শব্দ থেমে গেল।

মেঘলা কাঁদতে শুরু করল।

“বাবা জানতেন! তিনি দুর্ঘটনা আটকাতে পারেননি!”

অরিন্দম রেকর্ডারটি বন্ধ করল না। শেষ অংশে আবার কণ্ঠ শোনা গেল।

“আরেকটি কথা। নন্দিতা রায়কে এই ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। কিন্তু সে কোনও অপরাধ করেনি। সে শুধু যাত্রীদের তালিকা দেখেছিল। তাকে বাঁচাতে হলে আসল নথি খুঁজে বের করতে হবে।”

তারপর দেবব্রত দত্তের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

“যদি অরিন্দম রায় কখনও এই রেকর্ডিং শোনে, তাকে বলবে, তার ভাই জীবিত। কিন্তু তার ভাইকে খুঁজে পাওয়ার আগে তাকে জানতে হবে, কেন তাদের আলাদা করা হয়েছিল। কারণ এই ঘটনায় একই মানুষ বারবার নিজের পরিচয় বদলেছে।”

রেকর্ডিং শেষ।

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

“একই মানুষ বারবার নিজের পরিচয় বদলেছে—এর অর্থ কী?”

মেঘলা বলল, “হয়তো কেউ মিথ্যা নামে কাজ করছিল।”

“কিন্তু কে?”

ঠিক তখন সেতুর ওপর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“আমি।”

দু’জনেই উপরে তাকাল।

একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন।

লম্বা চুল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ।

নন্দিতা।

এবার তাঁর হাতে কোনও কাগজ নেই, জানলার কাচও নেই। তিনি সরাসরি তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

অরিন্দম ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“দিদি?”

নন্দিতা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন।

“হ্যাঁ, ভাই। আমি নন্দিতা।”

অরিন্দম ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

নন্দিতা কাঁদতে লাগলেন। সাত বছরের বিচ্ছেদ যেন সেই মুহূর্তে সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিল।

“তুমি কোথায় ছিলে?” অরিন্দম বলল। “কেন ফিরে এলে না?”

নন্দিতা তার মুখ দু’হাতে ধরে বললেন, “সব বলব। কিন্তু আগে তোমাকে একটা কথা জানতে হবে।”

“কী কথা?”

নন্দিতা মেঘলার দিকে তাকালেন।

“দেবব্রত দত্তের মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনায় হয়নি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।”

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

“কী বলছেন?”

নন্দিতা ধীরে বললেন, “আর যে মানুষটি এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, সে এখনও জীবিত।”

৬. শেষ যাত্রার আসল যাত্রী

নন্দিতা তাঁদের কালো সেতুর পাশের একটি ছোট বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়িটি ছিল পরিত্যক্ত রেলওয়ে কর্মচারীদের থাকার জায়গা। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না, সেখানে কেউ থাকে।

ঘরের ভিতরে পুরোনো কাগজ, মানচিত্র এবং কয়েকটি কম্পিউটার রাখা। দেওয়ালে বিভিন্ন তারিখের সংবাদপত্রের কাটিং।

অরিন্দম বলল, “তুমি এত বছর এখানে ছিলে?”

“না। আমি বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ছিলাম। এই বাড়িটি ব্যবহার করতাম শুধু প্রমাণ রাখার জন্য।”

মেঘলা বাবার রেকর্ডিংটি টেবিলে রাখল।

“আমার বাবার সঙ্গে কী হয়েছিল?”

নন্দিতা চেয়ারে বসে পড়লেন।

“দেবব্রতবাবু দুর্ঘটনার রাতে ট্রেনটিকে ভুল লাইনে পাঠানোর নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি জানতেন, ট্রেনে এমন কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন একটি বড় আর্থিক দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সেই সাক্ষীকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার নামে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে ট্রেনের রহস্য আসলে একটি গোপন পরিবহণ ব্যবস্থা?”

“প্রথমে তাই ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে যায়। ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। কয়েকজন মারা যান, কয়েকজন বেঁচে যান। বেঁচে যাওয়া লোকদের মধ্যে দেবব্রতবাবুও ছিলেন। তিনি দুর্ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে তাঁকে কে হত্যা করল?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “রেলওয়ের তৎকালীন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিকাশ সেন। তিনি বিশেষ ট্রেনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার দায় চাপা দিতে তিনি নথি বদলান, সাক্ষীদের আলাদা করে দেন এবং কয়েকজনকে নিখোঁজ বলে দেখানোর ব্যবস্থা করেন।”

“তিনি এখন কোথায়?” অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল।

“অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে কলকাতায় থাকেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ তখন আমাদের হাতে ছিল না।”

নন্দিতা একটি ফাইল বের করলেন।

“এই ফাইলে ট্রেনের আসল যাত্রী তালিকা, সিগন্যাল পরিবর্তনের নির্দেশ এবং দুর্ঘটনার পরে তৈরি করা ভুয়ো রিপোর্টের অনুলিপি আছে। দেবব্রতবাবু এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন।”

মেঘলা ফাইলটি খুলে বাবার স্বাক্ষর দেখল।

“তাহলে এত বছর ধরে যে ট্রেনকে আমরা দেখেছি, তার রহস্য কী?”

নন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সবকিছু একসঙ্গে ঘটেনি। প্রথম দিকে আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, ওই ট্রেন আবার ফিরে আসে। দুর্ঘটনার রাতের কিছু দৃশ্য আমার মনে এত গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, বারবার মনে হতো, আমি ট্রেনটিকে দেখছি। দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব, ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে থাকলে মানুষের উপলব্ধিতে এমন প্রভাব পড়তে পারে। পরে বুঝেছি, স্টেশনের কিছু পুরোনো কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভয়কে ব্যবহার করত।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে জানলার ভিতরে তোমাকে দেখা যাওয়া?”

“সেটি কীভাবে ঘটেছিল, আমি নিশ্চিত নই। স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রজেকশন ব্যবস্থা ছিল। পরে কেউ সেটিকে ব্যবহার করেছে কি না, তা তদন্ত করতে হবে। আর কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা এখনও আমাদের জানা নেই। কিন্তু অজানা বলেই তাকে অতিপ্রাকৃত বলে মেনে নেওয়ার দরকার নেই।”

মেঘলা বলল, “আমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম সেই ট্রেনে।”

নন্দিতা তার হাত ধরলেন।

“তুমি তাঁকে দেখেছিলে বলে তোমার কষ্ট বা স্মৃতি মিথ্যা হয়ে যায় না। কিন্তু সেই দৃশ্যের অর্থ বোঝার জন্য আমাদের প্রমাণ দরকার। আমরা জানি, তিনি দুর্ঘটনার পর বেঁচে ছিলেন। আমরা জানি, তাঁর রেকর্ডিং রয়েছে। কিন্তু তাঁর শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য আরও তদন্ত দরকার।”

অরিন্দম হঠাৎ বলল, “আমার ভাই অরুণ কোথায়?”

নন্দিতা মাথা নীচু করলেন।

“আমি জানি, সে বেঁচে আছে। তাকে কলকাতার একটি পরিবার দত্তক নিয়েছিল। কিন্তু পরে সেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি বহু বছর ধরে তাকে খুঁজেছি।”

“তাহলে কাল রাতে যে ছেলেটিকে দেখলাম?”

“আমি জানি না। তুমি সত্যিই তাকে দেখেছ, নাকি ক্লান্তি ও মানসিক চাপের কারণে তোমার চোখে এমন দৃশ্য এসেছে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে তোমার ভাইয়ের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। সেটাই আমাদের অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া উচিত।”

অরিন্দম চুপ করে গেল।

তার এত দিনের রহস্যের একটি বড় অংশের উত্তর মিলেছে। কিন্তু সবচেয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নটির উত্তর এখনও বাকি।

তার ভাই কোথায়?

আর সেই ভাই কি এখনও তাকে মনে রেখেছে?

৭. বিকাশ সেনের মুখোমুখি

নন্দিতার দেওয়া নথিগুলি যাচাই করার জন্য অরিন্দম তার সাংবাদিক বন্ধু সৌরভের সাহায্য নিল। পাশাপাশি একজন আইনজীবীর মাধ্যমে পুলিশকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো হলো। নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পুরোনো রেলওয়ে রেকর্ড, হাসপাতালের কাগজ এবং সরকারি তদন্তের ফাইল সংগ্রহ করা শুরু হলো।

তদন্তকারীরা প্রথমে বিষয়টিকে পুরোনো, প্রমাণহীন অভিযোগ বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেবব্রত দত্তের রেকর্ডিং, সিগন্যাল রেজিস্টার এবং নন্দিতার সংগ্রহ করা নথির মধ্যে মিল পাওয়া গেল।

এরপর বিকাশ সেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হলো।

অরিন্দম ও নন্দিতা আইনজীবীর উপস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

বিকাশ সেনের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। পরিপাটি পোশাক, শান্ত মুখ, কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস। প্রথমে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলেন।

“এই নথি জাল হতে পারে,” তিনি বললেন। “আমি কোনও গোপন ট্রেন চালানোর নির্দেশ দিইনি।”

অরিন্দম টেবিলে সিগন্যাল পরিবর্তনের নথি রাখল।

“এখানে আপনার স্বাক্ষর রয়েছে।”

“স্বাক্ষর জাল করা কঠিন নয়।”

নন্দিতা এবার কথা বললেন।

“দেবব্রত দত্ত আপনাকে ফোন করেছিলেন দুর্ঘটনার আগে। সেই ফোনের রেকর্ডও রয়েছে।”

বিকাশ সেনের মুখের ভাব সামান্য বদলে গেল।

“আমি বহু বছর আগে অবসর নিয়েছি। এত পুরোনো ঘটনা আমার মনে নেই।”

অরিন্দম বলল, “আপনি কি দেবব্রত দত্তকে চিনতেন?”

“অনেক কর্মচারীকে চিনতাম।”

“তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে কিছু জানেন?”

“না।”

নন্দিতা একটি ছবি বের করলেন। ছবিতে বিকাশ সেনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেবব্রত দত্ত। ছবিটি দুর্ঘটনার কয়েক মাস আগে তোলা।

“আপনি বলেছিলেন, তাঁকে মনে নেই। কিন্তু এই ছবিতে আপনারা একসঙ্গে আছেন।”

বিকাশ সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ছবি দিয়ে অপরাধ প্রমাণ হয় না।”

“ঠিক বলেছেন,” অরিন্দম বলল। “তাই আমরা ছবি নয়, সব প্রমাণ একসঙ্গে তদন্তকারীদের হাতে দিয়েছি।”

বিকাশ সেন এবার আর কিছু বললেন না।

সেদিন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো দুর্ঘটনার নথি বদল, প্রমাণ নষ্ট করা এবং সম্ভাব্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়।

নন্দিতা বাইরে এসে বললেন, “এটা শেষ নয়।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আমি জানি। কিন্তু এবার অন্তত সত্যটা কাগজে রয়েছে। কেউ সহজে মুছে ফেলতে পারবে না।”

৮. অরুণের সন্ধানে

দুর্ঘটনার তদন্ত নতুন করে শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে অরিন্দম একটি ফোন পেল।

ফোন করেছিলেন কলকাতার এক বৃদ্ধ আইনজীবী। তাঁর কাছে দেবাশিস সেনগুপ্তের পুরোনো নথি ছিল। তিনি জানালেন, অরুণ রায়কে দত্তক নেওয়ার পরে তাঁর নাম বদলে রাখা হয়েছিল—অরুণাভ সেনগুপ্ত।

বহু বছর আগে দেবাশিসবাবুর পরিবার অন্য শহরে চলে যায়। অরুণাভ বড় হয়ে একজন সংগীতশিক্ষক হন। পরে তিনি উত্তরবঙ্গে চলে যান।

বর্তমান ঠিকানা ছিল শিলিগুড়ির কাছে একটি ছোট সংগীত বিদ্যালয়।

অরিন্দম আর দেরি করল না। নন্দিতাকে সঙ্গে নিয়ে সে উত্তরবঙ্গে গেল।

সংগীত বিদ্যালয়টি ছিল একটি পুরোনো বাড়ির একতলায়। দরজার বাইরে ছোট একটি ফলকে লেখা—‘সুরবীথি সংগীতশিক্ষা কেন্দ্র’।

ভিতর থেকে হারমোনিয়ামের সুর ভেসে আসছিল।

একজন যুবক ছাত্রদের গান শেখাচ্ছিলেন। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। মুখের গঠন অরিন্দমের মতো, চোখের কোণে একই ভাঁজ।

লোকটি ক্লাস শেষ করে তাঁদের দিকে এগিয়ে এলেন।

“আপনারা কাকে খুঁজছেন?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

নন্দিতা এগিয়ে এলেন।

“অরুণাভ?”

লোকটি থমকে গেল।

“আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?”

নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।

“আমি তোমার দিদি নন্দিতা। আর এই যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোমার যমজ ভাই অরিন্দম।”

অরুণাভ দীর্ঘক্ষণ তাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন, “আমার তো কোনও ভাই নেই।”

অরিন্দম পকেট থেকে পুরোনো ছবিটি বের করল।

দুই শিশুর ছবি।

“এই ছবিটি দেখো।”

অরুণাভ ছবিটি হাতে নিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর আঙুল কাঁপছিল।

“এটা কোথায় পেলে?”

“শালবনপুর স্টেশনে।”

অরুণাভ ছবির পিছনের লেখাটি পড়লেন।

‘অরিন্দম ও অরুণের জন্য, মা।’

তাঁর চোখে জল এসে গেল।

“ছোটবেলায় আমি প্রায়ই একটি স্বপ্ন দেখতাম,” তিনি বললেন। “একটি ছেলে আমার পাশে বসে খেলনা ট্রেন নিয়ে খেলছে। আমি তাকে দাদা বলে ডাকছি। কিন্তু বড় হওয়ার পর সবাই বলেছে, এগুলো আমার কল্পনা।”

অরিন্দম ধীরে তাঁর পাশে বসল।

“আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু তোমাকে আমার ভাই বলে মেনে নিতে হবে, এমন কোনও দাবি করতে আসিনি। তুমি চাইলে আমরা একসঙ্গে বসে নথিগুলো দেখতে পারি। তুমি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।”

অরুণাভ তার দিকে তাকালেন।

“তুমি এত বছর আমাকে খুঁজেছ?”

“আমি জানতামই না, তোমাকে খুঁজতে হবে। সত্যিটা আমিও সম্প্রতি জেনেছি।”

নন্দিতা দু’জনের হাত একসঙ্গে ধরলেন।

“তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল বড়দের সিদ্ধান্তে। তোমাদের কারও দোষ ছিল না।”

অরুণাভ ধীরে বললেন, “আমি কি তোমাদের সঙ্গে কলকাতায় যেতে পারি?”

অরিন্দমের মুখে প্রথমবারের মতো স্বস্তির হাসি ফুটল।

“অবশ্যই। তবে তোমার কাজ, তোমার জীবন—সবকিছু তোমার নিজের থাকবে। আমরা শুধু নতুন করে পরিচিত হব।”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“আমার মনে হয়, সেটাই ঠিক।”

৯. শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী

এক বছর পরে শালবনপুর স্টেশনে একটি ছোট স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হলো। সাত বছর আগের দুর্ঘটনায় নিহতদের নাম সংগ্রহ করে একটি স্মারক ফলক তৈরি করা হয়েছে। যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, তাঁদের নামও সেখানে লেখা।

দেবব্রত দত্তের নামের পাশে লেখা—

‘সত্য প্রকাশের জন্য যিনি নিজের নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করেছিলেন।’

তদন্তে বহু বাধা এসেছে। কিছু নথি এখনও পাওয়া যায়নি। কয়েকজন সাক্ষী মারা গেছেন। বিকাশ সেনের বিরুদ্ধে মামলার বিচারও শেষ হয়নি। কিন্তু দুর্ঘটনাটি আর কোনও গুজব নয়। সরকারি তদন্তের নথিতে এখন তার উল্লেখ রয়েছে।

মেঘলা বাবার স্মারকের সামনে একটি ফুল রাখল।

“বাবা, আমি জানি না তোমার শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল। কিন্তু তোমার কণ্ঠ আমি শুনেছি। তোমার সংগ্রামের প্রমাণ পেয়েছি। তুমি হারিয়ে যাওনি—তোমার সত্য এত দিন চাপা ছিল।”

নন্দিতা তার কাঁধে হাত রাখলেন।

অরিন্দম ও অরুণাভ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

অরুণাভ বলল, “তুমি কি এখনও সেই ট্রেনটিকে দেখতে পাও?”

অরিন্দম মৃদু হাসল।

“না। এখন আর কোনও ট্রেনকে ভয় পাই না।”

“তাহলে সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“না। কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই। কিন্তু আমি বুঝেছি, প্রতিটি অজানা ঘটনার ব্যাখ্যা অলৌকিক কিছু হতে হবে না। কখনও অপরাধ, কখনও ভয়, কখনও স্মৃতির ভুল—আর কখনও এমন তথ্য, যা আমরা এখনও জানি না।”

অরুণাভ বলল, “তুমি কি আমাকে দাদা বলে ডাকতে পারবে?”

অরিন্দম তার কাঁধে হাত রাখল।

“আমি ছোটবেলায় তোকে চিনতাম কি না, তা মনে নেই। কিন্তু আজ থেকে তোকে চিনতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।”

দু’জনেই হেসে উঠল।

ঠিক তখনই স্টেশনের মাইক্রোফোনে ঘোষণা শোনা গেল—

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, রামপুর জংশনগামী শেষ লোকাল ট্রেনটি কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম নম্বর দুইয়ে প্রবেশ করবে।”

সবাই স্বাভাবিকভাবে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু অরিন্দমের চোখ একবার চলে গেল দূরের পুরোনো লাইনের দিকে। যে লাইনটি বহু বছর আগে তুলে ফেলা হয়েছে, সেখানে এখন শুধু ঘাস জন্মেছে।

কুয়াশার মধ্যে সে যেন এক মুহূর্তের জন্য একটি ট্রেনের আলো দেখতে পেল।

শেষ কামরার জানলায় একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি পুরোনো রেলওয়ে পরিচয়পত্র।

অরিন্দম চোখ মুছে আবার তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু বাতাসে ঘাস নড়ছে।

সে আর কাউকে ডাকল না। কোনও ছবি তুলল না। কাউকে বললও না যে সে কী দেখেছে।

কারণ, এবার সে জানত—দেখা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

কিছুক্ষণ পরে নন্দিতা এসে তার পাশে দাঁড়ালেন।

“কী দেখছিস?”

অরিন্দম হেসে বলল, “কিছু না। পুরোনো লাইনের দিকে তাকাচ্ছিলাম।”

নন্দিতা তার হাত ধরলেন।

“চল। ট্রেন এসে গেছে।”

চারজন একসঙ্গে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে লাগল—অরিন্দম, নন্দিতা, অরুণাভ আর মেঘলা।

সেদিন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে কোনও অদ্ভুত ট্রেন আসেনি।

কোনও অচেনা কণ্ঠ মাইক্রোফোনে কথা বলেনি।

কোনও মৃত মানুষ জানলার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকেনি।

এসেছিল একটি সাধারণ লোকাল ট্রেন। তার কামরায় ছিল ক্লান্ত যাত্রী, ঘুমন্ত শিশু, বাড়ি ফেরার তাড়া আর জীবনের স্বাভাবিক শব্দ।

অরিন্দম ট্রেনে উঠে জানলার পাশে বসল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

সাত বছর ধরে যে রহস্য তাকে তাড়া করেছে, তার সমস্ত উত্তর সে পায়নি। কিন্তু সে তার দিদিকে ফিরে পেয়েছে, ভাইকে চিনেছে, আর বাবার অতীত সম্পর্কে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, সে আর নিজের স্মৃতি বা ভয়ের হাতে বন্দি নয়।

ট্রেনটি অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে চলল।

অরিন্দম জানলার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। তার পাশে বসে আছে অরুণাভ। সামনের সিটে নন্দিতা ও মেঘলা কথা বলছে।

চারটি মানুষ। চারটি আলাদা জীবন। আর একটি নতুন শুরু।

অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।

এবার তার মনে কোনও অজানা ট্রেনের হুইসেল বাজল না।

বাজল বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক শব্দ।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের টিকিট)।

১. সুড়ঙ্গের ওপারে কে?

“অরিন্দম, বাড়ি ফিরে যা।”

অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটি আবার শোনা গেল।

অরিন্দমের শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর পর সে আর কখনও এই কণ্ঠ শোনেনি। পরিবারের অ্যালবামে বাবার কয়েকটি ছবি ছাড়া তাঁর স্মৃতি বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। অথচ সেই কণ্ঠের স্বর, কথা বলার ভঙ্গি—সবই যেন তার মনের গভীরে কোথাও জমে ছিল।

মেঘলা তার হাত চেপে ধরল।

“ওপাশে যাবেন না। আপনার দিদিও তো আপনাকে ট্রেনে উঠতে নিষেধ করেছিলেন।”

অরিন্দম চোখ না সরিয়ে বলল, “কিন্তু যদি সত্যিই বাবা হন?”

“যদি না হন?”

প্রশ্নটা অরিন্দমকে থামিয়ে দিল।

সে সাংবাদিকতা করত। বহু প্রতারণা, জালিয়াতি, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করেছে। অন্যের কাছে প্রমাণ চেয়েছে। অথচ নিজের দিদির মুখ দেখার পর থেকেই তার যুক্তিবোধ যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সে মোবাইলের আলো সুড়ঙ্গের দিকে ফেলল।

সামনে প্রায় বিশ গজ দূরে একটি দরজা। দরজার ওপরে মরচে ধরা ফলক।

প্ল্যাটফর্ম ১৩।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব? এই স্টেশনে তো তিনটি প্ল্যাটফর্ম।”

অরিন্দম বলল, “আমাদের সামনে যা আছে, সেটাকে অস্বীকার করে লাভ নেই। কিন্তু কী দেখছি, তা না বুঝে বিশ্বাসও করব না।”

দু’জনে সাবধানে এগিয়ে গেল।

দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখা গেল, মেঝেতে একটি কালো চামড়ার জুতো পড়ে আছে। জুতোটির পাশে ছোট একটি ধাতব বাক্স।

অরিন্দম বাক্সটি তুলে খুলল।

ভিতরে একটি পুরোনো রেলওয়ে পরিচয়পত্র।

ছবিতে মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ। চোখে চশমা, মুখে গম্ভীর ভাব।

নাম: দেবব্রত দত্ত।

মেঘলা কেঁপে উঠল।

“এটা আমার বাবার পরিচয়পত্র।”

পরিচয়পত্রের পিছনে পেন্সিলে লেখা ছিল—

‘যদি আমার মেয়ে কখনও এখানে আসে, তাকে বলবে, তার বাবাকে খুঁজতে হলে সে যেন ট্রেনের দিকে না তাকিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়।’

মেঘলা অস্ফুট স্বরে বলল, “ঘড়ির দিকে তাকাবে মানে?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোনে আলো জ্বলে উঠল।

কোনও নেটওয়ার্ক ছিল না, তবু একটি নতুন বার্তা এসেছে।

বার্তায় মাত্র তিনটি শব্দ—

“সময়টা পরীক্ষা করো।”

অরিন্দম মাথা তুলে ঘড়ির দিকে তাকাল।

সিগন্যাল ঘরের নীচের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

কিন্তু তার হাতঘড়িতে রাত ১২টা ৪১।

মেঘলার ফোনে রাত ১২টা ০৯।

তিনটি ঘড়িতে তিন রকম সময়।

অরিন্দম ধীরে বলল, “এই ঘরে সময়ের হিসাব ঠিক নেই।”

ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

দেবব্রত দত্তের কণ্ঠ আবার ভেসে এল।

“মেঘলা, তুমি এসেছ?”

মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“বাবা!”

সে দরজার দিকে ছুটতে গেল। অরিন্দম তাকে ধরে ফেলল।

“দাঁড়ান!”

“ছাড়ুন! আমি আমার বাবাকে সাত বছর ধরে খুঁজছি!”

“আপনার বাবা যদি সত্যিই ওখানে থাকেন, তিনি এখানেও থাকতে পারেন। কিন্তু দরজা খুলে কী আছে না জেনে ঢোকা বিপজ্জনক।”

মেঘলা চোখ মুছে তার দিকে তাকাল।

“তাহলে কী করব?”

অরিন্দম ধাতব বাক্সের মধ্যে আবার হাত ঢোকাল। এবার একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।

সেখানে লেখা—

‘১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনোর আগে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নাও।

প্রথম প্রশ্ন: যে মানুষ নিখোঁজ, সে কি সত্যিই হারিয়ে যায়?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: যে মানুষকে মৃত বলা হয়েছে, তার মৃত্যু কে দেখেছে?

তৃতীয় প্রশ্ন: যে ট্রেন কখনও সময়সূচিতে ছিল না, তার টিকিট কে কেটেছে?’

অরিন্দম কাগজটি মুঠোয় ধরল।

“এটা কোনও ভূতের ধাঁধা নয়। কেউ আমাদের কিছু বোঝাতে চাইছে।”

“কে?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।

অরিন্দম উত্তর দিল না।

কারণ, ঠিক তখনই দরজার নীচ দিয়ে একটি সাদা কাগজ গড়িয়ে এসে তাদের পায়ের কাছে থামল।

কাগজে লেখা—

‘অরিন্দম, তোমার দিদি তোমাকে যা বলেছে, তার অর্ধেক সত্যি। বাকি অর্ধেক জানলে তুমি আর তাকে খুঁজতে চাইবে না।’

২. বন্ধ স্টেশনের পুরোনো হিসাব

দু’জনে সিগন্যাল ঘরের নীচে ফিরে এল।

অরিন্দমের মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে। নন্দিতা কি সত্যিই বেঁচে আছে? দেবব্রত দত্ত কি জীবিত? আর যদি সবটাই কোনও পরিকল্পিত প্রতারণা হয়, তবে তার উদ্দেশ্য কী?

সে পুরোনো রেলওয়ে রেজিস্টারগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখল।

“মেঘলা, তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার আগে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল?”

মেঘলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “বাবা শেষ কয়েক মাস খুব চিন্তায় থাকতেন। রাতে ঘুমোতে পারতেন না। বাড়িতে পুরোনো নথি নিয়ে আসতেন। একদিন তাঁকে বলতে শুনেছিলাম, রেলওয়ের একটি দুর্ঘটনার রিপোর্ট বদলে দেওয়া হয়েছে।”

“কী দুর্ঘটনা?”

“সেটা জানি না। আমি তখন কলেজে পড়ি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, এসব বড়দের ব্যাপার।”

“আর তোমার বাবার মৃত্যুসনদ?”

“পুলিশ একটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। মুখ চেনা যাচ্ছিল না। পোশাক ও একটি আংটি দেখে তাঁকে আমার বাবা বলে শনাক্ত করা হয়। আমাকে দেহ দেখানো হয়নি। আমার মা তখন বেঁচে ছিলেন না। মামা আমাকে বলেছিলেন, দেহ শনাক্ত করা হয়ে গেছে।”

অরিন্দম চুপ করে রইল।

“তুমি কি কখনও ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলে?”

“না। তখন এসব ভাবিনি। বাবার মৃত্যুর কষ্টে ভেঙে পড়েছিলাম।”

অরিন্দম রেজিস্টারের একটি পাতায় আঙুল রাখল।

“এখানে দেখো। সাত বছর আগে, ১৩ অক্টোবর, রাত ১২টা ১৭ মিনিটে বিশেষ যাত্রী পরিবহণের উল্লেখ আছে। কিন্তু ট্রেনের নম্বর নেই, চালকের নাম নেই, গার্ডের নাম নেই।”

“এটা কি জাল রেজিস্টার হতে পারে?”

“হতে পারে। কিন্তু এই পাতায় যে সিল আছে, সেটি পুরোনো রেলওয়ে দপ্তরের আসল সিলের মতো।”

সে পরের পাতাটি উল্টাল।

একটি নামের পাশে লাল কালি দিয়ে দাগ দেওয়া।

নন্দিতা রায় — কর্মী নথি নম্বর: ৪৭১২।

অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“দিদি তো এই স্টেশনে কাজ করত না।”

মেঘলা বলল, “হয়তো অন্য কোনও নথি থেকে নামটা এখানে এসেছে।”

অরিন্দম নথির নীচে লেখা তারিখটি দেখল। তারিখটি নন্দিতার নিখোঁজ হওয়ার ছয় মাস আগের।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, নামের পাশে লেখা ছিল—

‘সাক্ষী হিসেবে নিযুক্ত। বিশেষ দুর্ঘটনা তদন্ত।’

অরিন্দম এবার বুঝতে পারল, নন্দিতার নিখোঁজ হওয়ার আগে এমন কিছু ঘটেছিল, যার কথা তার জানা ছিল না।

সে ফোন বের করে নিজের পুরোনো সহকর্মী সৌরভকে কল করল। সৌরভ রেলওয়ে সংক্রান্ত খবর নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে।

কয়েকবার চেষ্টা করার পর ফোন ধরল সৌরভ।

“এত রাতে ফোন করেছিস কেন?”

“শালবনপুরে সাত বছর আগের কোনও রেল দুর্ঘটনার খবর মনে আছে?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

“কেন জিজ্ঞাসা করছিস?”

“একটা পুরোনো তদন্ত করছি। ১৩ অক্টোবরের রাত। বিশেষ ট্রেন, সম্ভবত ১৩০৭ নম্বর।”

সৌরভের গলা বদলে গেল।

“অরিন্দম, তুই কোথায় আছিস?”

“শালবনপুরে।”

“যেখানেই থাকিস, এখনই সেখান থেকে চলে আয়।”

“কেন?”

সৌরভ নিচু গলায় বলল, “সাত বছর আগে শালবনপুরের কাছে একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়েছিল। সরকারি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, কোনও যাত্রীবাহী ট্রেন জড়িত ছিল না। কিন্তু দুর্ঘটনার পর কয়েকজন রেলকর্মী নিখোঁজ হন। একজনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, বাকিদের খোঁজ মেলেনি।”

“তাদের নাম কী?”

“আমি সব নাম মনে করতে পারছি না। কিন্তু সহকারী স্টেশনমাস্টার দেবব্রত দত্তের নাম শুনেছিলাম।”

মেঘলা ফোনের কাছে এগিয়ে এল।

“আমার বাবা!”

সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মেঘলা দত্ত কি তোর সঙ্গে আছে?”

অরিন্দম বিস্মিত হয়ে বলল, “তুই তার নাম জানিস কী করে?”

“কারণ দুর্ঘটনার তদন্তে তার বাবার সাক্ষ্য নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি নিখোঁজ হন।”

“আর নন্দিতা রায়?”

এবার সৌরভের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

“তোর দিদি সেই দুর্ঘটনার একমাত্র বেসরকারি প্রত্যক্ষদর্শী ছিল।”

অরিন্দমের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“কী বলছিস?”

“দুর্ঘটনার পর একটা অভিযোগ উঠেছিল, রেললাইনে সিগন্যালের সমস্যা ছিল। কয়েকজন যাত্রীকে নির্ধারিত ট্রেনের বদলে অন্য একটি ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি নথিতে সেই ট্রেনের অস্তিত্ব নেই। নন্দিতা নাকি সেই যাত্রীদের তালিকা দেখেছিল।”

“তারপর?”

“তারপর সব নথি গায়েব হয়ে যায়। তোর দিদি নিখোঁজ হয়। আর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।”

অরিন্দম ধীরে ফোন নামিয়ে রাখল।

মেঘলা ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে।

“তাহলে আমার বাবা কোনও রহস্যময় ট্রেনে হারিয়ে যাননি। তিনি দুর্ঘটনার সাক্ষী ছিলেন!”

অরিন্দম বলল, “হয়তো। কিন্তু এখনও সব প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।”

ঠিক তখনই ওপরের ঘর থেকে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।

দু’জনে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।

দরজার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।

কালো কোট, মাথায় টুপি, হাতে একটি পুরোনো টিকিট।

লোকটি মুখ তুলে তাকাল।

“আপনারা দু’জনেই ভুল জায়গায় এসেছেন।”

৩. টিকিট পরীক্ষক

লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ছাঁটা গোঁফ, চোখে গোল চশমা। তার পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল, সে কোনও পুরোনো রেলওয়ে কর্মচারী।

অরিন্দম বলল, “আপনি কে?”

লোকটি টিকিটটি সামনে ধরল।

“আমি এই ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক।”

“কোন ট্রেনের?”

“যে ট্রেনের অস্তিত্ব আপনারা অস্বীকার করছেন।”

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

লোকটি মৃদু হাসল।

“ভয় পাবেন না। আমি আপনাদের ক্ষতি করতে আসিনি। বরং আপনাদের বাঁচাতে এসেছি।”

অরিন্দম বলল, “আপনি যদি টিকিট পরীক্ষক হন, আপনার পরিচয়পত্র কোথায়?”

লোকটি পকেট থেকে একটি কার্ড বের করল।

কার্ডে লেখা—

শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।
টিকিট পরীক্ষক।
বিশেষ যাত্রী পরিবহণ বিভাগ।

অরিন্দম কার্ডটি হাতে নিল। কাগজটি পুরোনো, কিন্তু তাতে যে ছবি রয়েছে, তা স্পষ্ট।

“আপনি কি এই স্টেশনে কাজ করতেন?”

“করতাম।”

“কত বছর আগে?”

“অনেক বছর আগে।”

“আপনার চাকরির নথি কোথায়?”

লোকটি উত্তর দিল না।

অরিন্দম আবার জিজ্ঞাসা করল, “আপনি আমাদের বাঁচাতে এসেছেন বললেন। কী থেকে?”

শশাঙ্ক শেষ কামরার দিকে তাকাল।

“সেই ট্রেন থেকে, যার যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্য ভুলে গেছে।”

“আপনি কি নন্দিতা রায়কে চেনেন?”

লোকটির চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।

“চিনি।”

“তিনি কোথায়?”

“ট্রেনে।”

“তিনি জীবিত?”

শশাঙ্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে, জীবিত থাকার অর্থ কী।”

অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বলল, “ধাঁধা বন্ধ করুন। সরাসরি উত্তর দিন।”

শশাঙ্ক তার হাতে থাকা টিকিটটি টেবিলে রাখল।

টিকিটে লেখা—

যাত্রীর নাম: অরিন্দম রায়।

যাত্রার তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।

গন্তব্য: ফিরে যাওয়ার অসম্ভব স্থান।

অরিন্দম টিকিটটি তুলে নিল।

“এটা কে বানিয়েছে?”

“আপনার দিদি।”

“কিন্তু আমি তো টিকিট কাটিনি!”

“সব যাত্রীর টিকিট নিজের হাতে কাটা হয় না।”

মেঘলা বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার বাবারও টিকিট কাটা হয়েছিল?”

শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তিনি কোথায়?”

“তিনি তাঁর যাত্রা শেষ করতে পারেননি।”

মেঘলা চোখ মুছে বলল, “আমি তাঁকে দেখতে চাই।”

শশাঙ্কের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“তাহলে আপনাকে তিনটি বিষয় জানতে হবে। প্রথমত, আপনার বাবা কেন সেই ট্রেনে উঠেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি কেন ফিরতে পারেননি। তৃতীয়ত, আপনি যদি তাঁকে দেখতে পান, তাঁকে চিনতে পারবেন কি না।”

মেঘলা বলল, “আমি আমার বাবাকে চিনব।”

শশাঙ্ক মৃদু মাথা নাড়ল।

“সেটাই সবাই ভাবে।”

অরিন্দম টেবিলে হাত রেখে বলল, “আপনি কি জানেন, সাত বছর আগে কী ঘটেছিল?”

“জানি।”

“তাহলে বলুন।”

শশাঙ্ক জানলার দিকে তাকাল।

“সাত বছর আগে একটি বিশেষ ট্রেনে কয়েকজন যাত্রীকে তোলা হয়েছিল। তাঁদের বলা হয়েছিল, ট্রেনটি তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবে। কিন্তু ট্রেনটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছয়নি। পথে দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারি নথিতে দুর্ঘটনার বিবরণ বদলে দেওয়া হয়। কিছু মানুষ মারা যান, কয়েকজন নিখোঁজ হন। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই সত্য প্রকাশ করতে পারেননি।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে এই ট্রেন সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আমরা যে ট্রেন দেখলাম, সেটি কীভাবে সাত বছর ধরে প্রতি বছর ফিরে আসে?”

শশাঙ্ক এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।

“আমি জানি না। হয়তো আপনারা যে ট্রেন দেখছেন, তা বাস্তব ট্রেন নয়। হয়তো পুরোনো স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং গোপন নথির মধ্যে তৈরি একটি বিভ্রম। কিন্তু একটা বিষয় সত্যি—যে মানুষদের নাম ওই যাত্রী তালিকায় রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে একটি বাস্তব ঘটনা জড়িত।”

অরিন্দম কিছুটা শান্ত হলো।

“তাহলে আমরা কি কোনও মানসিক প্রভাবের শিকার হচ্ছি?”

“সেটাও হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমের অভাব, ভয়, অন্ধকার এবং প্রত্যাশা মানুষের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই যা দেখছেন, তার সবকিছুকে সত্যি ধরে নেবেন না।”

মেঘলা প্রশ্ন করল, “তাহলে আপনি কে? সত্যিই কি টিকিট পরীক্ষক?”

শশাঙ্ক কোনও উত্তর দিল না।

বরং সে টেবিলের নীচ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।

“এই খামটি আপনার দিদি রেখে গিয়েছিলেন, অরিন্দম।”

খামের ওপর লেখা—‘ভাইয়ের জন্য’।

অরিন্দম হাত বাড়াতেই শশাঙ্ক বলল, “খোলার আগে একটা কথা মনে রাখবেন। আপনার দিদি হয়তো আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি যা করেছেন, তার সবটাই সঠিক ছিল—এমন নয়।”

৪. নন্দিতার চিঠি

অরিন্দম খাম খুলল।

ভিতরে চার পাতার একটি চিঠি।

‘অরিন্দম,

যদি এই চিঠি তোর হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝব তুই শেষ পর্যন্ত শালবনপুরে এসেছিস।

আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। আমি জানি, তুই ভেবেছিস আমি তোকে ছেড়ে চলে গেছি। কিন্তু সত্যিটা এত সহজ নয়।

সাত বছর আগে আমি হাসপাতালের কাজে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা জানতে পারি। রেল দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজন যাত্রীকে আমাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁদের নাম সরকারি তালিকার সঙ্গে মিলছিল না। একজন বৃদ্ধ বারবার বলছিলেন, তাঁকে যে ট্রেনে তোলা হয়েছিল, সেটির নম্বর ১৩০৭।

কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সেদিন ওই নম্বরের কোনও ট্রেন চলেনি।

আহতদের মধ্যে একজন ছিলেন দেবব্রত দত্ত। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ট্রেনটি দুর্ঘটনার আগে অন্য লাইনে পাঠানো হয়েছিল। সিগন্যাল পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা, যার নাম কোনও নথিতে ছিল না।

আমি তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেছিলাম।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে ওই রোগীদের মধ্যে দু’জন মারা যান, একজন নিখোঁজ হন, আর দেবব্রত দত্তকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আমি বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই আমাকে হুমকি দেওয়া হয়।

আমি তোকে কিছু বলতে পারিনি, কারণ তুই তখন কলেজে পড়তিস। আমি চাইনি, তুই এই বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়িস।

কিন্তু এরপর আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।

আমি জানতে পারি, দুর্ঘটনার রাতে যে ট্রেনটি চলেছিল, তার যাত্রী তালিকায় আমার নিজের নামও রয়েছে।

অথচ আমি সেদিন ট্রেনে উঠিনি।

কেউ আমার নামে টিকিট কেটেছিল।

কেন?

সেই উত্তর আমি এখনও জানি না।

আমি জানি না, যে ট্রেনটিকে আমি দেখেছিলাম, সেটি সত্যিই ছিল কি না। আমি শুধু জানি, দুর্ঘটনার পরে কিছু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিখোঁজ বলে দেখানো হয়েছিল।

আমি এখন নিরাপদে আছি। কিন্তু আমার কাছে এমন নথি রয়েছে, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের নাম সামনে চলে আসবে।

আমি চাই না, তুই আমার জন্য বিপদে পড়িস।

যদি কখনও আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করিস না। আমার পরিচয় যাচাই করিস। আমার কথা প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিস।

কারণ, এই ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য কোনও ভূতুড়ে ট্রেন নয়।

সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—কেউ কেন চেয়েছিল, কিছু মানুষকে পৃথিবীর চোখে মৃত করে দিতে?

— তোর দিদি, নন্দিতা।’

চিঠিটি পড়ে অরিন্দমের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

“দিদি জীবিত,” সে ফিসফিস করে বলল। “চিঠিতে সে নিজেই লিখেছে।”

শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।

“চিঠিটি সাত বছর আগে লেখা। এখন তিনি কোথায়, আমি জানি না।”

“কিন্তু একটু আগেই তো তাঁকে ট্রেনে দেখেছি!”

“আপনি তাঁর মুখ দেখেছেন। কিন্তু তিনি সত্যিই সেখানে ছিলেন কি না, তা এখনও প্রমাণিত নয়।”

অরিন্দম রাগে বলল, “তাহলে এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে এসব খেলা করছেন কেন?”

শশাঙ্ক শান্ত গলায় বলল, “কারণ আপনাকে এমন জায়গায় পৌঁছতে হবে, যেখানে কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন।”

সে টেবিলের ওপর একটি মানচিত্র খুলল।

মানচিত্রে শালবনপুর স্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো রেলসেতু চিহ্নিত করা।

সেতুটির নাম—কালো সেতু।

“সাত বছর আগে দুর্ঘটনাটি এখানেই ঘটেছিল,” শশাঙ্ক বলল। “সরকারি রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই রাতে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনও সেখানে ছিল।”

অরিন্দম মানচিত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

“যদি আমরা সেখানে যাই?”

“তাহলে হয়তো এমন কিছু পাবেন, যা এখনও কেউ সরাতে পারেনি।”

মেঘলা বলল, “চলুন। আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না।”

শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।

“এখন নয়। সূর্য ওঠার আগে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। রাতের অন্ধকারে আপনারা আবার এমন কিছু দেখতে পারেন, যা আপনাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে আমরা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করব।”

শশাঙ্ক উঠে দাঁড়াল।

“আমি যাচ্ছি। কিন্তু যাওয়ার আগে আপনাদের একটি কথা বলি। ১৩০৭ নম্বর ট্রেনের যাত্রী তালিকায় একটি নাম এখনও অজানা রয়ে গেছে।”

“কার নাম?”

শশাঙ্ক দরজার কাছে গিয়ে থামল।

“আপনাদের দু’জনের মধ্যে একজনের।”

৫. যে নামটি লেখা ছিল না

শশাঙ্ক চলে যাওয়ার পর অরিন্দম আবার রেজিস্টারের কাছে ফিরে গেল।

সে যাত্রী তালিকাটি খুলে দেখল।

নন্দিতা রায়।

দেবব্রত দত্ত।

অজ্ঞাতপরিচয় নারী।

অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।

চারটি নাম বা পরিচয়।

কিন্তু শশাঙ্ক বলেছে, অরিন্দম ও মেঘলার মধ্যে একজনের নাম তালিকায় রয়েছে।

“এটা কীভাবে সম্ভব?” মেঘলা বলল।

অরিন্দম উত্তর দিল, “আমাদের কারও নাম হয়তো পরে বদলে দেওয়া হয়েছে।”

“আমার বাবার নাম তো আছে।”

“তাহলে অন্য কেউ।”

অরিন্দম পুরোনো নথির প্রতিটি পাতা পরীক্ষা করতে লাগল। একটি পাতার কোণে সে দেখতে পেল, কালি দিয়ে কিছু মুছে ফেলা হয়েছে। কাগজটি আলোয় ধরতেই নিচে লেখা অক্ষরগুলো অস্পষ্টভাবে দেখা গেল।

সে মোবাইলের আলো কাগজের পিছন থেকে ফেলল।

মুছে দেওয়া নামটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো।

অরিন্দম রায়।

তারিখ—১৩ অক্টোবর, ২০২৬।

অরিন্দমের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

“এটা অসম্ভব। আমি তো আজ প্রথম এখানে এসেছি!”

মেঘলা কাগজটি হাতে নিয়ে দেখল।

“এই নামটা আজকের তারিখে লেখা। কিন্তু তুমি তো সাত বছর আগে নিখোঁজ হওনি।”

“তাহলে কে আমার নামে টিকিট কেটেছে?”

তারপরই অরিন্দমের মনে পড়ল, শৈশবে একবার সে একটি দুর্ঘটনার কথা শুনেছিল। তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আত্মীয়রা বলেছিল, অরিন্দমের জন্মের আগেই তার এক যমজ ভাই জন্মেছিল, কিন্তু জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায়।

অরিন্দম কোনও দিন বিষয়টি নিয়ে বেশি প্রশ্ন করেনি।

কিন্তু এখন তার মনে হলো, হয়তো পরিবারের ইতিহাসের আরও একটি অধ্যায় গোপন করা হয়েছে।

সে মেঘলাকে বলল, “আমার জন্মের নথি দেখতে হবে।”

“কেন?”

“কারণ, আমার নামে এই ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছে। আর আমি জানতে চাই, আমার জন্মের দিন সত্যিই কী ঘটেছিল।”

মেঘলা বলল, “তোমার কি যমজ ভাই ছিল?”

অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি কী করে জানলে?”

“তোমার মুখে শুনিনি। কিন্তু রেজিস্টারের শেষ পাতায় একটা নোট আছে।”

সে পাতাটি উল্টে দেখাল।

সেখানে লেখা—

‘যাত্রী নম্বর ৫: অরিন্দম রায়। পরিচয় যাচাই বাকি। যমজ জন্মের নথি সংযুক্ত।’

অরিন্দমের মাথার ভিতর যেন সবকিছু ঘুরতে লাগল।

যে রহস্যের সমাধান করতে সে শালবনপুরে এসেছিল, সেটি এখন তার নিজের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

সে জানলার বাইরে তাকাল।

দূরে কুয়াশার মধ্যে শেষ ট্রেনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

শেষ কামরার জানলায় আবার সেই পরিচিত মুখ।

নন্দিতা এবার কাচের ওপারে একটি কাগজ তুলে ধরল।

অরিন্দম চোখ কুঁচকে দেখল।

কাগজে বড় অক্ষরে লেখা—

“তোর জন্মের দিনই প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল।”

তারপর জানলার আলো নিভে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে সিগন্যাল ঘরের পুরোনো ঘড়িটি চলতে শুরু করল।

কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট থেকে ১২টা ১৬।

তারপর ১২টা ১৫।

তারপর ১২টা ১৪।

মেঘলা আতঙ্কিত গলায় বলল, “অরিন্দম, ঘড়িটা উল্টো দিকে চলছে!”

অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল—

“সময়টা পিছিয়ে যাচ্ছে না। কেউ আমাদের অতীতের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে।”

দূরে ট্রেনের দরজা খুলল।

শেষ কামরা থেকে নেমে এল একটি ছোট ছেলে।

তার পরনে পুরোনো স্কুলের পোশাক। হাতে লাল রঙের খেলনা ট্রেন।

ছেলেটি ধীরে ধীরে সিগন্যাল ঘরের দিকে এগিয়ে এল।

অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর বলল—

“দাদা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”

অরিন্দম ছেলেটির মুখ দেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

কারণ, ছেলেটির মুখটি অবিকল তার নিজের ছোটবেলার মুখ।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (প্রথম পর্ব: যে মেয়েটি ট্রেন থেকে নামেনি)।

১. রাত ১২টা ১৭ মিনিট

রাতের শেষ ট্রেনটা যখন শালবনপুর স্টেশনে ঢুকল, তখন প্ল্যাটফর্মে মাত্র চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।

একজন বৃদ্ধ চা-ওয়ালা, দু’জন রেলকর্মী আর স্টেশনের বুকিং ক্লার্ক অমলবাবু। শীতের শেষ দিকের রাত। চারপাশে হালকা কুয়াশা। দূরের সিগন্যালের লাল আলোটা কুয়াশার মধ্যে জ্বলজ্বল করছিল।

ট্রেনটির নাম ছিল নীলাচল লোকাল। প্রতিদিন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে এটি শালবনপুর স্টেশনে পৌঁছত। তারপর কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে আবার রামপুর জংশনের দিকে চলে যেত।

সেদিনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।

অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত।

ট্রেনটি থামতেই শেষ কামরার দরজা থেকে এক যুবক নেমে এল। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। পরনে কালো জ্যাকেট, কাঁধে বাদামি ব্যাগ। মুখে কয়েক দিনের দাড়ি। চোখ দুটো অস্বাভাবিক ক্লান্ত।

যুবকটি প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই চারদিকে তাকাল।

তারপর সোজা স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

“আপনি কি অমলবাবু?”

অমলবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।

“হ্যাঁ। আপনি?”

“আমার নাম অরিন্দম রায়। আমি কলকাতা থেকে এসেছি।”

“এত রাতে? কিছু দরকার?”

অরিন্দম ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। লম্বা চুল, কপালে ছোট্ট কালো টিপ, চোখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

অমলবাবু ছবিটি দেখেই স্থির হয়ে গেলেন।

তাঁর হাত থেকে কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল।

“এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন?”

অরিন্দম শান্ত গলায় বলল, “আমার দিদি। নাম নন্দিতা রায়। সাত বছর আগে এই স্টেশন থেকে নিখোঁজ হয়েছিল।”

অমলবাবু কোনও উত্তর দিলেন না।

“পুলিশ বলেছিল, দিদি হয়তো ট্রেনে কোথাও চলে গিয়েছিল। কিন্তু তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সাত বছর ধরে আমি তাকে খুঁজছি।”

অরিন্দম ছবিটি টেবিলে রাখল।

“তিন দিন আগে আমার বাড়িতে একটি চিঠি এসেছে। চিঠিতে লেখা—নন্দিতা এই স্টেশন ছেড়ে কখনও যায়নি।”

বাইরে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা এল। স্টেশনমাস্টারের ঘরের জানলা কেঁপে উঠল।

অমলবাবু ফিসফিস করে বললেন, “আপনি চলে যান।”

অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।

“কী বললেন?”

“আমি কিছু জানি না। এই ব্যাপারে আমাকে আর প্রশ্ন করবেন না।”

“কিন্তু আপনি ছবিটা দেখেই চিনেছেন!”

অমলবাবু উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি বলেছি, চলে যান!”

ঠিক সেই সময় স্টেশনের মাইক্রোফোনে কর্কশ শব্দ হলো। তারপর একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, ১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যে ছেড়ে যাবে।”

অরিন্দম চমকে উঠল।

শালবনপুর স্টেশনে মাত্র তিনটি প্ল্যাটফর্ম।

১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্ম বলে কিছু নেই।

কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।

“অরিন্দম রায়, আপনার দিদি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। শেষ কামরায় উঠে পড়ুন।”

অরিন্দমের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

স্টেশনমাস্টারের ঘর থেকে বেরিয়ে সে প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটল।

নীলাচল লোকাল তখনও দাঁড়িয়ে আছে। কামরাগুলোর অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। কিন্তু শেষ কামরার একটি জানলায় হলুদ আলো জ্বলছে।

জানলার পাশে একজন মহিলা বসে আছেন।

লম্বা চুল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ।

নন্দিতা।

অরিন্দমের মনে হলো, তার পা দুটো মাটিতে আটকে গেছে।

সাত বছর ধরে যে মুখটি সে শুধু ছবিতে দেখেছে, সেই মুখ আজ তার সামনে।

মহিলাটি ধীরে জানলার দিকে মুখ ফেরালেন।

তারপর ঠোঁট নাড়লেন।

অরিন্দম স্পষ্ট বুঝতে পারল, তিনি বলছেন—

“ভাই, ট্রেনে উঠিস না।”

পরের মুহূর্তেই ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।

২. সাত বছর আগের সেই রাত

অরিন্দমের মনে পড়ল সেই রাতের কথা।

তখন তার বয়স তেইশ। নন্দিতা ছিল তার একমাত্র দিদি। বাবা-মা দু’জনেই মারা গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। ছোটবেলা থেকে দিদিই তাকে আগলে রেখেছিল।

নন্দিতা একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের কাজ করত। কাজের প্রতি তার অদ্ভুত নিষ্ঠা ছিল। রাতের ডিউটি শেষ করেও অসুস্থ রোগীদের পাশে বসে থাকত।

কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে তার আচরণ বদলে গিয়েছিল।

সে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে দরজা পরীক্ষা করত। বাড়ির ফোন বাজলেই ভয় পেত। একদিন অরিন্দম দেখেছিল, দিদি পুরোনো কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলছে।

“কী পুড়িয়ে ফেলছ?”

নন্দিতা চমকে উঠে বলেছিল, “কিছু না।”

“আমার কাছেও লুকোবে?”

দিদি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “অরিন্দম, কখনও যদি আমি হঠাৎ চলে যাই, আমাকে খুঁজতে যাবি না।”

অরিন্দম হেসেছিল।

“তুমি কি সিনেমার নায়িকা? হঠাৎ চলে যাবে কেন?”

নন্দিতা হাসেনি।

“কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছ থেকে দূরে থাকা যায় না। আবার কাছে থাকাও বিপজ্জনক।”

অরিন্দম তখন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।

সাত বছর আগে, এক নভেম্বরের রাতে নন্দিতা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। বলেছিল, হাসপাতালে অতিরিক্ত ডিউটি আছে। তারপর আর ফেরেনি।

তার মোবাইল বন্ধ। হাসপাতাল জানিয়েছিল, সে সেদিন ডিউটিতে যোগ দেয়নি। শালবনপুর স্টেশনের একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাকে রাতের শেষ ট্রেনে উঠতে দেখা গিয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করেছিল।

কিন্তু সেই ফুটেজের কোনও কপি অরিন্দমকে দেওয়া হয়নি।

পুলিশের তদন্ত কয়েক মাস চলেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ফাইল বন্ধ হয়ে যায়।

অরিন্দম থামেনি।

সে হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে, পুরোনো সহকর্মীদের খুঁজেছে, নন্দিতার বন্ধুদের বাড়িতে গিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকের উত্তর ছিল আলাদা, আর প্রত্যেক উত্তরেই যেন কোনও একটা অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নন্দিতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নিখোঁজ হওয়ার পরেও কয়েকবার টাকা জমা পড়েছিল।

প্রতিবার টাকা জমা পড়েছে রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।

প্রতিবার জমার উৎস ছিল—শালবনপুর রেলওয়ে বুকিং অফিস।

অরিন্দম এই তথ্য পুলিশকে জানিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, প্রযুক্তিগত ভুল।

কিন্তু একই ভুল সাত বছর ধরে চলতে পারে না।

তিন দিন আগে আসা চিঠিটি সেই কারণেই তাকে শালবনপুরে টেনে এনেছে।

চিঠিতে লেখা ছিল—

‘যদি সত্য জানতে চাও, ১৩ অক্টোবর রাত ১২টা ১৭ মিনিটে শালবনপুর স্টেশনে এসো। শেষ ট্রেনটি চলে যাওয়ার আগে তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

— নন্দিতা।’

আজ ১৩ অক্টোবর।

আর কয়েক মিনিট আগেই সে তার দিদিকে ট্রেনের জানলায় দেখেছে।

৩. বন্ধ কামরার ভিতরে

ট্রেনটি হঠাৎ কেঁপে উঠল।

অরিন্দম প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দেখল, শেষ কামরার দরজা নিজে থেকেই খুলে গেছে।

ভিতরে কেউ নেই।

সে এক পা এগিয়ে গেল।

তার মনে পড়ল দিদির সতর্কবাণী—“ভাই, ট্রেনে উঠিস না।”

কিন্তু সাত বছর ধরে সে যে উত্তর খুঁজছে, তা যদি এই ট্রেনের ভিতরেই থাকে?

অরিন্দম দরজার কাছে পৌঁছতেই পেছন থেকে কেউ তার হাত চেপে ধরল।

“উঠবেন না!”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

একজন তরুণী। বয়স আটাশ-তিরিশ। পরনে রেলওয়ের কর্মীদের মতো নীল পোশাক। গলায় পরিচয়পত্র, কিন্তু তার ওপর কোনও নাম লেখা নেই।

“আপনি কে?” অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল।

“আমার নাম মেঘলা দত্ত। আমি এই স্টেশনে কাজ করি।”

“তাহলে ট্রেনে উঠতে বাধা দিচ্ছেন কেন?”

মেঘলা শেষ কামরার দিকে তাকাল।

“কারণ, যে ট্রেনে আপনার দিদিকে দেখেছেন, সেটি আজ প্রথমবার আসেনি।”

“মানে?”

“প্রতি বছর এই তারিখে আসে। ঠিক রাত ১২টা ১৭ মিনিটে। আর প্রত্যেকবার কেউ না কেউ শেষ কামরায় নিজের পরিচিত মানুষকে দেখতে পায়।”

অরিন্দমের মুখ শুকিয়ে গেল।

“তারপর?”

“কেউ ট্রেনে ওঠে না। যারা ওঠে, তারা আর ফিরে আসে না—এমন কথা প্রচলিত আছে।”

“এটা কি কুসংস্কার?”

“আমি জানি না। আমি শুধু জানি, সাত বছর আগে এই ট্রেনে আমার বাবাও উঠেছিলেন।”

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আপনার বাবাও নিখোঁজ?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“তিনি ছিলেন এই স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—কোনও দিন যদি রাতের শেষ ট্রেনটি এসে দাঁড়ায়, তার যাত্রীদের মুখের দিকে তাকাবে না।”

“কেন?”

“কারণ তাদের মধ্যে এমন মানুষও থাকতে পারে, যারা অনেক বছর আগেই মারা গেছেন।”

দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

মেঘলা অরিন্দমের হাত আরও শক্ত করে ধরল।

“এখন আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।”

ঠিক তখনই শেষ কামরার জানলায় আবার নন্দিতাকে দেখা গেল।

এবার তার পাশে আরও একজন বসে আছেন।

একজন বৃদ্ধ।

মেঘলা বৃদ্ধটিকে দেখেই হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

“বাবা…”

বৃদ্ধ ধীরে মাথা তুললেন। জানলার কাচের ওপার থেকে তাঁর চোখ সরাসরি মেয়ের দিকে।

তারপর তিনি হাত তুলে জানলার কাচে তিনবার আঘাত করলেন।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মেঘলা কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল।

“এটা হতে পারে না। বাবা তো সাত বছর আগেই মারা গেছেন!”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“আপনি বলেছিলেন, তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাদের বাড়িতে তাঁর মৃত্যুসনদ এসেছে। নদীর ধারে একটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, সেটি বাবার। কিন্তু আমি কখনও মুখ দেখিনি।”

ট্রেনের ভিতর থেকে এবার একটি শিশুর কান্না ভেসে এল।

তারপর মাইক্রোফোনে সেই নারীকণ্ঠ—

“যাত্রীরা সাবধান। যাঁরা জীবিত, তাঁরা যেন মৃতদের সঙ্গে যাত্রা না করেন।”

অরিন্দমের মনে হলো, মাটির নীচ থেকে যেন ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে।

ট্রেনের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “এবার আর কোনও উপায় নেই।”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“কী উপায়?”

মেঘলা পকেট থেকে একটি ছোট চাবি বের করল।

“ট্রেন চলে যাওয়ার আগে আমাদের স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরে যেতে হবে। আমার বাবা সেখানে কিছু রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেষ ট্রেনের রহস্য বুঝতে হলে প্রথমে সেই ঘরের দরজা খুলতে হবে।”

৪. সিগন্যাল ঘরের নীচে

স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। নতুন প্রযুক্তি চালু হওয়ার পর সেটি আর ব্যবহার করা হয় না। ভবনটির চারদিকে আগাছা, দেওয়ালে শ্যাওলা, জানলায় ধুলো জমে আছে।

মেঘলা তালায় চাবি ঢোকাল।

দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পুরোনো কাগজ ও স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ বেরিয়ে এল।

ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল লোহার যন্ত্র। দেওয়ালে কয়েকটি পুরোনো ঘড়ি। তার নীচে একটি কাঠের টেবিল, যার ওপর ধুলো জমে আছে।

মেঘলা টেবিলের ড্রয়ার খুলল।

ভিতরে একটি চিঠি।

‘মেঘলা,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে শেষ ট্রেন আবার এসেছে।

আমি জানি, তুমি তোমার বাবাকে খুঁজবে। কিন্তু মনে রেখো, এই রহস্যের সঙ্গে শুধু আমার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জড়িত নয়। সাত বছর আগে যে রাতে নন্দিতা রায় নিখোঁজ হয়েছিল, সেই রাতেই স্টেশনের পুরোনো রেকর্ড থেকে একটি ট্রেনের নাম মুছে ফেলা হয়।

ট্রেনটির নম্বর ছিল ১৩০৭।

সরকারি সময়সূচিতে এই ট্রেনের কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু পুরোনো সিগন্যাল রেজিস্টারে তার উল্লেখ রয়েছে।

রাত ১২টা ১৭ মিনিটে যে ট্রেনটি আসে, সেটি নীলাচল লোকাল নয়।

এটি এমন একটি ট্রেন, যার যাত্রা কখনও নথিভুক্ত হয়নি।

এর শেষ কামরায় যে মানুষদের দেখা যায়, তারা সবাই কোনও না কোনও অসমাপ্ত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।

তাদের মধ্যে কেউ নিখোঁজ, কেউ মৃত বলে ঘোষিত, আবার কেউ এমন মানুষ, যাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর কোনও দিন প্রকাশিতই হয়নি।

এই ট্রেন কোথা থেকে আসে, আমি জানি না।

কিন্তু আমি জানি, একে থামানোর চেষ্টা করলে আরও মানুষ হারিয়ে যাবে।

— তোমার বাবা।’

মেঘলা চিঠিটি পড়ে কেঁপে উঠল।

অরিন্দম বলল, “আপনার বাবা কি সত্যিই এই চিঠি লিখেছিলেন?”

“হাতের লেখা তাঁরই।”

“তাহলে তিনি জানতেন, এই ট্রেন আসবে।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“কিন্তু তিনি জানতেন না, কেন আসে।”

অরিন্দম ঘরের চারদিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল মেঝের একটি অংশে। অন্য অংশের তুলনায় সেখানে ধুলো কম।

সে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে মেঝেতে চাপ দিল।

একটি কাঠের পাত নড়ে উঠল।

পাতটি সরাতেই নীচে সিঁড়ি দেখা গেল।

অন্ধকারে নেমে গেছে সরু সিঁড়ি।

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

“এখানে তো কোনও ঘর থাকার কথা নয়!”

অরিন্দম মোবাইলের আলো জ্বালল।

“আপনার বাবা এই পথের কথা জানতেন?”

“না।”

দু’জন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল।

নিচে ছোট একটি ঘর। দেওয়ালে পুরোনো মানচিত্র। টেবিলের ওপর কয়েকটি রেলওয়ে রেজিস্টার। এক কোণে ধাতব আলমারি।

অরিন্দম একটি রেজিস্টার খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

১৩০৭ — বিশেষ যাত্রী পরিবহণ।

পরের পাতায় যাত্রীদের নাম।

তারিখ: ১৩ অক্টোবর, সাত বছর আগে।

যাত্রী নম্বর ১: নন্দিতা রায়।

যাত্রী নম্বর ২: দেবব্রত দত্ত।

যাত্রী নম্বর ৩: অজ্ঞাতপরিচয় নারী।

যাত্রী নম্বর ৪: অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।

অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“মেঘলা, দেবব্রত দত্ত কি আপনার বাবার পুরো নাম?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

অরিন্দম পরের পাতাটি উল্টাল।

সেখানে লাল কালিতে একটি বাক্য লেখা।

‘যাত্রীদের কেউই নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাননি।’

তার নীচে আরও একটি লাইন—

‘পরবর্তী যাত্রার তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।’

অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত ১২টা ৩৬ মিনিট।

ট্রেন চলে যাওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই।

কিন্তু ওপরের প্ল্যাটফর্ম থেকে এখনও ট্রেনের শব্দ আসছে।

তারপরই ঘরের পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।

রিং।

রিং।

রিং।

মেঘলা ভয়ে স্থির হয়ে গেল।

অরিন্দম রিসিভার তুলল।

ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ বলল—

“অরিন্দম, তুমি এখনও নীচে আছ?”

“কে বলছেন?”

“আমি নন্দিতা।”

অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।

“দিদি! তুমি কোথায়?”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নন্দিতা বলল—

“তুমি যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছ, সেই ঘরটা সাত বছর আগে তৈরি হয়নি।”

“মানে?”

“এই ঘর তৈরি হয়েছিল অনেক আগে। আর এই ঘরে শেষবার যে মানুষটি এসেছিলেন, তিনি তোমার বাবা।”

অরিন্দম হতবাক।

“আমাদের বাবা তো ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছিলেন!”

ওপাশে নন্দিতার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“তোমাকে সেটাই বলা হয়েছিল। কিন্তু অরিন্দম, তোমার বাবা মারা যাননি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পিছনের দেওয়ালে একটি লোহার দরজা খুলে গেল।

দরজার ওপারে অন্ধকার সুড়ঙ্গ।

সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে ভেসে এল ট্রেনের চাকার শব্দ।

আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে একটি পুরুষকণ্ঠ—

“অরিন্দম, বাড়ি ফিরে যা।”

অরিন্দমের হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভার পড়ে গেল।

কারণ, সেই কণ্ঠ সে চিনতে পেরেছে।

সাত বছর নয়, তারও বহু আগে শৈশবের স্মৃতিতে সে এই কণ্ঠ শুনেছিল।

এটি তার বাবার কণ্ঠ।

চলবে…

Share This
Categories
বিবিধ

স্নেহার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি, বিধাননগর মাঠ থেকে মিছিল।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- গৃহবধূ স্নেহা চক্রবর্তীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে মোমবাতি হাতে মৌন মিছিল করলেন তাঁর বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেদিনীপুর শহরের বিধাননগর মাঠ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে সংলগ্ন বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন স্নেহার বাবা-মাও। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের আবহে একদিকে যেমন স্নেহার আত্মার শান্তি কামনা করা হয়, তেমনই অন্যদিকে তাঁর মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে।

মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের দাবি, স্নেহার মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, স্নেহার পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন যমুনাবালিতে স্নেহার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। স্নেহার বাপের বাড়ির পক্ষ থেকে থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ স্নেহার স্বামী রণদীপ জানা এবং তাঁর বাবাকে গ্রেফতার করেছে।

স্নেহার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে তাঁর পরিবার-পরিজন ও পরিচিতদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের একাংশের দাবি, স্নেহা আত্মহত্যা করতে পারেন না। তাঁদের অভিযোগ, এই মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার নেপথ্যে কী রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।

মঙ্গলবারের মোমবাতি মিছিল থেকে স্নেহার মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। প্রজ্জ্বলিত মোমবাতি হাতে নীরবে পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে প্রয়াত স্নেহার প্রতি শ্রদ্ধা জানান মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা। তাঁদের একটাই প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক এবং স্নেহার পরিবার ন্যায়বিচার পাক।

Share This
Categories
বিবিধ

রক্তের সংকট মেটাতে এগিয়ে এল শুকনাতোড় যুব সংঘ, রক্তদান শিবিরে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসবের আবহে ব্লাড ব্যাংকগুলিতে রক্তের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করল শুকনাতোড় যুব সংঘ ক্লাব। মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা ৩ নম্বর ব্লকের চন্দ্রকোনারোড শহর সংলগ্ন শুকনাতোড় এলাকায় ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এক রক্তদান শিবিরের।
এই রক্তদান শিবিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এলাকার বহু মানুষ। শিবিরে ২৩ জন মহিলা-সহ মোট ৭৩ জন রক্তদাতা রক্তদান করেন। উৎসবের আনন্দের মাঝেও মুমূর্ষু রোগীদের পাশে দাঁড়াতে এবং রক্তের সংকট মোকাবিলায় ক্লাবের এই উদ্যোগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এই দিনের রক্তদান শিবিরে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবী ধীমান কোলে, ক্লাবের সভাপতি গোলাপ হোসেন পাঠান, নিশার আলী পাঠান, সম্পাদক মনিরুল পাঠান, কোষাধ্যক্ষ ইস্তাজুল পাঠান, নাসিবুল পাঠান-সহ ক্লাবের অন্যান্য সদস্যরা। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নজরুল পাঠান। ক্লাব সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী দিনেও সমাজের স্বার্থে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও সমাজসেবামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
উৎসবের মরশুমে রক্তের চাহিদা মেটাতে শুকনাতোড় যুব সংঘের এই উদ্যোগ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠল।

Share This