Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : তেরো নম্বর ঘরের রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের স্মৃতি)।

১. যে দরজা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল না

“ওরা তোমাকে ছোটবেলাতেই মেরে ফেলেছিল, ঋদ্ধি।”

আয়নার ওপারে রূপসার ঠোঁট থেকে কথাগুলো বেরোনোর পর ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল। এক মুহূর্তের জন্য ঋদ্ধির মনে হলো, তার পায়ের নীচের মেঝেটা সরে যাচ্ছে। সে হাত বাড়িয়ে কিছু ধরতে চাইল, কিন্তু চারপাশে শুধু অন্ধকার।

“মায়া!”

কোনও উত্তর নেই।

“মায়া, তুমি কোথায়?”

দূরে কোথাও ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তারপর করিডরে একসঙ্গে কয়েকটি পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।

ঋদ্ধি পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বালাল। আলো পড়তেই সে দেখল, মায়া ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে আতঙ্ক, হাতে সেই ফাইলটি।

“দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে বেরোতে হবে,” মায়া বলল।

“আয়নার মধ্যে আমার দিদি ছিল। উনি বললেন, আমাকে ছোটবেলায় মেরে ফেলা হয়েছিল। এর মানে কী?”

“এখন সব বলার সময় নেই।”

“বারো বছর ধরে আমি দিদিকে খুঁজছি। এখন তাঁকে চোখের সামনে দেখেও চলে যাব?”

মায়া তার হাত চেপে ধরল।

“তুমি যদি এখানেই থাকো, তাহলে তোমাকে আবার সেই পরীক্ষার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। তুমি জানো না, এই ঘর কীভাবে কাজ করে।”

“তুমি জানো?”

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি এই ঘরের প্রথম বন্দিদের একজন।”

দরজার বাইরে থেকে চাবি ঘোরানোর শব্দ এল।

মায়া তাড়াতাড়ি টেবিলের নীচে হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট সুইচ টিপল। দেওয়ালের বইয়ের তাকটি ধীরে ধীরে সরে গেল। তার পিছনে একটি সরু পথ।

“এই পথ কোথায় যায়?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।

“বাড়ির পুরোনো বেসমেন্টে। ড. অনিরুদ্ধ বসু এই পথ বানিয়েছিলেন। তেরো নম্বর ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে গেলে যাতে মূল করিডরে দেখা না যায়, তার ব্যবস্থা ছিল।”

“তাহলে তিনি নিজেই পালানোর রাস্তা তৈরি করেছিলেন?”

“তিনি পালানোর রাস্তা তৈরি করেননি। তৈরি করেছিলেন গোপন যাতায়াতের ব্যবস্থা। পার্থক্যটা মনে রেখো।”

ঋদ্ধি মায়ার পিছনে সরু পথ দিয়ে ঢুকে পড়ল। মায়া তাকটি আবার বন্ধ করে দিল।

পরক্ষণেই বাইরে থেকে দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল।

কেউ ঘরে ঢুকে চিৎকার করে উঠল, “এরা কোথায় গেল?”

ঋদ্ধি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে মায়ার হাত তার হাতের ওপর শক্ত হয়ে ছিল।

কিছুক্ষণ পরে মায়া ফিসফিস করে বলল, “তুমি যে সত্য খুঁজতে এসেছ, তা শুধু তোমার দিদির নিখোঁজ হওয়ার রহস্য নয়। এই বাড়িতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য বহু মানুষ নিজেদের অতীত হারিয়েছে।”

“আর আমি?”

“তুমিও তাদের একজন।”

২. বারো বছর আগের হাসপাতাল

সুড়ঙ্গটি শেষ হয়েছিল একটি ছোট ঘরে। ঘরের দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ, মেঝেতে ভাঙা ইট। একটি পুরোনো কাঠের দরজা ঠেলে তারা অন্য করিডরে বেরিয়ে এল।

মায়া জানাল, বাড়িটির নীচে একসময় একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। সেখানে ড. অনিরুদ্ধ বসু তাঁর গবেষণার জন্য কিছু ঘর ব্যবহার করতেন। সরকারি নথিতে সেটিকে পরামর্শকেন্দ্র হিসেবে দেখানো হলেও, আসলে সেখানে মানুষের স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হতো।

“এই গবেষণার সঙ্গে আমার দিদির কী সম্পর্ক?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।

“তোমার দিদি প্রথমে অনুবাদের কাজ করতেন। বিদেশি গবেষণাপত্র বাংলায় অনুবাদ করা, সাক্ষাৎকারের নথি তৈরি করা—এসব ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, কিছু রোগীকে তাদের সম্মতি ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।”

“তিনি কি সেই প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে তিনি একটি ঘটনা জানতে পারেন।”

মায়া থামল। তারপর বলল, “বারো বছর আগে তোমার একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল।”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমার মনে আছে। ছোটবেলায় সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। মাথায় আঘাত লেগেছিল। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

“সেটাই পুরো ঘটনা নয়।”

“তাহলে?”

“হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, তুমি কয়েক ঘণ্টা অচেতন ছিলে। কিন্তু ড. বসুর ব্যক্তিগত নথিতে লেখা আছে, তোমাকে পরে এই বাড়িতে আনা হয়েছিল। তোমার মস্তিষ্কে আঘাতের পর স্মৃতির কিছু অংশ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমার পরিবার আমাকে এখানে এনেছিল?”

“তোমার মা-বাবাকে বলা হয়েছিল, তোমাকে একটি বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচিতে রাখা হবে। তাঁরা জানতেন না, সেই কর্মসূচির আড়ালে কী করা হচ্ছিল।”

“আমার মা-বাবা কি এখনও বেঁচে আছেন?”

মায়া চোখ নামিয়ে বলল, “তোমার মা মারা গেছেন আট বছর আগে। তোমার বাবা—”

“বাবার কী হয়েছে?”

“তিনি নিখোঁজ।”

ঋদ্ধি দেওয়ালে হাত রাখল। মাথার মধ্যে পুরোনো স্মৃতিগুলো ভাঙা কাচের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। হাসপাতালের সাদা বিছানা, মাথায় ব্যান্ডেজ, মায়ের কান্না, বাবার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অচেনা মানুষ।

তারপর শূন্যতা।

“আমি কি মারা গিয়েছিলাম?” সে ফিসফিস করে বলল।

“আমি জানি না,” মায়া উত্তর দিল। “তোমার শারীরিক মৃত্যু হয়েছিল, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমি দেখিনি। কিন্তু ড. বসুর একটি নথিতে লেখা আছে—‘বিষয় ১৩/০৭-এর মূল স্মৃতিচিত্র স্থগিত। পরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু।’”

ঋদ্ধি রাগে ফেটে পড়ল।

“আমি কোনও বিষয় নই! আমার নাম ঋদ্ধি সেন!”

“আমি জানি।”

“তাহলে আমার জীবন নিয়ে ওরা কী করেছে?”

মায়া উত্তর দিল না।

সে ব্যাগ থেকে একটি ছোট পেনড্রাইভ বের করল।

“তোমার দিদি এই নথিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি সব পড়তে পারিনি। কিন্তু এখানে তোমার নাম আছে।”

ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি হাতে নিল।

“এটা কোথায় চালাব?”

মায়া বলল, “এখানে নয়। বাড়ির বাইরে যেতে হবে। তবে তার আগে তোমাকে এমন একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে, যিনি তোমার দুর্ঘটনার দিন হাসপাতালে ছিলেন।”

“কে তিনি?”

“ডাক্তার সায়ন রায়।”

৩. যে ডাক্তার নিজের সাক্ষ্য বদলেছিলেন

ভোর হওয়ার কিছু আগে তারা শান্তিনিকেতন লজের পিছনের একটি ছোট দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গলির মুখে একটি চায়ের দোকান খুলছিল। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।

ঋদ্ধি একটি ট্যাক্সি ডেকে মায়াকে নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার একটি পুরোনো আবাসনের সামনে পৌঁছল।

ডাক্তার সায়ন রায় এখন অবসরপ্রাপ্ত। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর। একসময় তিনি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন। এখন খুব কম মানুষের সঙ্গে দেখা করেন।

দরজায় ঘণ্টা বাজাতেই এক বৃদ্ধা দরজা খুললেন। মায়ার পরিচয় শুনে তিনি তাঁদের ভেতরে নিয়ে গেলেন।

সায়ন রায় বসার ঘরে বসে পুরোনো বই পড়ছিলেন। ঋদ্ধিকে দেখে তাঁর হাত থেকে বইটি পড়ে গেল।

“তুমি?”

ঋদ্ধি সামনে এগিয়ে গেল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

বৃদ্ধের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“তোমার এখানে আসার কথা ছিল না।”

“কেন? আপনি কি আমাকে ছোটবেলায় চিকিৎসা করেছিলেন?”

সায়ন রায় দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “হ্যাঁ।”

“আমার দুর্ঘটনার দিন কী ঘটেছিল?”

বৃদ্ধ চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।

“তোমার মাথায় আঘাত লেগেছিল। হাসপাতালে আনার সময় তোমার শ্বাসপ্রশ্বাস অত্যন্ত দুর্বল ছিল। চিকিৎসার পর তোমার অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছিল। কিন্তু তুমি কয়েক দিন কথা বলতে পারোনি।”

“তারপর আমাকে শান্তিনিকেতন লজে নিয়ে যাওয়া হয়?”

“তোমার বাবা-মাকে বলা হয়েছিল, একটি বিশেষ পুনর্বাসন কেন্দ্রে তোমাকে রাখা হবে। আমি তখন ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমি জানতাম, সেখানে স্মৃতি পুনরুদ্ধারের কিছু পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।”

“আপনি জানতেন, আমার ওপর পরীক্ষা হবে?”

“আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে সাহায্য করা হবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, পরীক্ষার সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে।”

ঋদ্ধি কঠিন গলায় বলল, “আমি কি মারা গিয়েছিলাম?”

সায়ন রায় মাথা নাড়লেন।

“না। তুমি মারা যাওনি। তোমার হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের জন্য। চিকিৎসায় তোমাকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।”

“তাহলে দিদি কেন বললেন, আমাকে মেরে ফেলা হয়েছিল?”

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগে মায়ার দিকে তাকালেন।

“সম্ভবত তিনি বলতে চেয়েছেন, তোমার পুরোনো পরিচয়কে মুছে ফেলা হয়েছিল। তোমার কিছু স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছিল, কিছু স্মৃতি তোমার মনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তোমার স্বাভাবিক স্মৃতির সঙ্গে অন্য মানুষের গল্প, ছবি ও নথি মিশে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল।”

ঋদ্ধি বলল, “আমার স্মৃতির মধ্যে কি অন্য মানুষের স্মৃতি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল?”

“সরাসরি অন্যের স্মৃতি মাথায় বসিয়ে দেওয়া যায়—এমন প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু বারবার একই ছবি দেখানো, একই গল্প শোনানো, প্রশ্নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উত্তর তৈরি করা এবং রোগীকে তার স্মৃতি সম্পর্কে সন্দেহে ফেলা—এসবের ফলে মানুষ নিজের অতীত সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারে।”

“আপনি তাহলে সব জানতেন!”

সায়ন রায় মাথা নিচু করলেন।

“সব জানতাম না। কিন্তু সন্দেহ হওয়ার পরও আমি প্রতিবাদ করিনি। সেটাই আমার অপরাধ।”

তিনি আলমারি থেকে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

“তোমার দিদি নিখোঁজ হওয়ার আগে এটি আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একদিন তুমি সত্য খুঁজতে আসবে।”

খামের ভেতরে একটি ছবি।

ছবিতে বারো বছরের ঋদ্ধি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে রূপসা দাঁড়িয়ে। তাঁদের পিছনে ড. অনিরুদ্ধ বসু এবং সায়ন রায়।

ছবির পিছনে লেখা—

‘প্রথম পর্যায় শেষ। বিষয় ১৩/০৭-এর স্মৃতি পুনর্গঠনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।’

তার নীচে রূপসার হাতের লেখায় আরও একটি বাক্য—

‘ওকে ওর নিজের জীবন ফিরিয়ে দাও।’

ঋদ্ধি ছবিটি বুকে চেপে ধরল।

তারপর সে সায়ন রায়কে জিজ্ঞাসা করল, “ড. অনিরুদ্ধ বসু কোথায়?”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “আমি জানি না। কিন্তু তোমার দিদি একবার বলেছিলেন, বসু নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন এমন একটি জায়গায়, যেখানে কেউ তাঁর পুরোনো পরিচয় জানে না।”

“কোথায়?”

সায়ন রায় মাথা নাড়লেন।

“সেটা তিনি বলেননি।”

৪. মায়ার আসল পরিচয়

সায়ন রায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঋদ্ধি কাছের একটি নির্জন পার্কে বসে পড়ল। আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে। তার সামনে এত তথ্য, অথচ কোনও তথ্যই পুরো সত্যকে প্রকাশ করছে না।

সে মায়ার দিকে তাকাল।

“তুমি কীভাবে এই সব জানো?”

মায়া চুপ করে রইল।

“তুমি বলেছিলে, তুমি তেরো নম্বর ঘরের প্রথম বন্দিদের একজন। তুমি কি সেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলে?”

“না।”

“তাহলে?”

মায়া ধীরে বলল, “আমার মা সেখানে কাজ করতেন। তিনি ড. বসুর গবেষণাকেন্দ্রে সহকারী ছিলেন। ছোটবেলায় আমি মায়ের সঙ্গে ওই বাড়িতে যেতাম। একদিন আমি এমন কিছু নথি দেখে ফেলি, যা আমার দেখার কথা ছিল না।”

“তারপর?”

“আমাকে বলা হয়, আমি যা দেখেছি, তা ভুলে যেতে হবে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা খারাপ স্বপ্ন। পরে বুঝতে পারি, আমার মনে যা ঘটেছিল, তার অনেক কিছুই আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি না।”

“তুমি কি তখন থেকেই তেরো নম্বর ঘরে বন্দি?”

“সব সময় নয়। আমাকে মাঝে মাঝে বাইরে যেতে দেওয়া হতো। কিন্তু আমার ওপর নজর রাখা হতো। আমি বড় হওয়ার পর বুঝতে পারি, আমার স্মৃতির ফাঁকগুলো কোনও স্বাভাবিক কারণে তৈরি হয়নি।”

ঋদ্ধি বলল, “তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য করছ কেন?”

মায়া ব্যাগ থেকে আরেকটি ছবি বের করল।

ছবিতে একটি ছোট মেয়ে, তার পাশে কিশোরী রূপসা। মেয়েটির বয়স আট-নয় বছর হবে। ছবির পিছনে লেখা—‘মায়া, ২০০৪’।

“তোমার দিদি আমাকে একবার পালাতে সাহায্য করেছিলেন,” মায়া বলল। “তারপর তিনি নিজেই নিখোঁজ হয়ে যান। আমি এত বছর ধরে তাঁর খোঁজ করেছি। যখন জানতে পারি, তুমি সাংবাদিক হয়েছ এবং পুরোনো নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করছ, তখন তোমাকে খুঁজে বের করি।”

ঋদ্ধি ছবিটি ভালো করে দেখল।

“তুমি আমার দিদির কাছে ছিলে?”

“হ্যাঁ। রূপসা আমাকে বলেছিলেন, একদিন তাঁর ভাই আসবে। তাকে যেন সাহায্য করি। কিন্তু তিনি এটাও বলেছিলেন, তোমার কাছে সব সত্য একবারে বলা যাবে না।”

“কেন?”

“কারণ তোমার স্মৃতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তুমি নিজেও জানো না। আর সেই স্মৃতির সূত্রেই ড. বসুর গবেষণার আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ পেতে পারে।”

ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।

“আমি আর কোনও অর্ধসত্য শুনতে চাই না। আমরা এখনই আবার ওই বাড়িতে ফিরব।”

মায়া মাথা নাড়ল।

“ফিরতে হবে। কিন্তু এবার প্রস্তুতি নিয়ে।”

“কী প্রস্তুতি?”

মায়া বলল, “আমাদের জানতে হবে, তেরো নম্বর ঘরের আয়নাটি আসলে কী। আর তোমার দিদি কেন ওই আয়নার মধ্যে দেখা যাচ্ছেন।”

৫. আয়নার ওপারের ঘর

দুপুরের আগে তারা শান্তিনিকেতন লজে ফিরে এল। হরিপদ তাঁদের দেখে অবাক হলেন, কিন্তু কোনও প্রশ্ন করলেন না।

মায়া জানাল, তেরো নম্বর ঘরের আয়নাটি সাধারণ আয়না নয়। তার পিছনে একটি গোপন কক্ষ রয়েছে, যেখানে পুরোনো ভিডিও রেকর্ডিং, অডিও নথি এবং পর্যবেক্ষণের যন্ত্র রাখা হতো।

“তাহলে আমরা আয়নায় রূপসাকে দেখেছিলাম কীভাবে?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।

“সম্ভবত আয়নার পিছনের ঘরে ক্যামেরা ও প্রদর্শনযন্ত্র ছিল। তবে যন্ত্রগুলো এখনও কাজ করছে কি না, তা জানি না।”

“তাহলে দিদি ওই ঘরেই বন্দি?”

“আমি নিশ্চিত নই।”

তারা তেরো নম্বর ঘরে ঢুকল। এবার দরজা খোলা ছিল। টেবিলের ওপর ফাইলটি এখনও পড়ে আছে। দেওয়ালের আয়নাটি আগের মতোই স্থির।

ঋদ্ধি আয়নার ফ্রেম পরীক্ষা করতে লাগল। নীচের দিকে একটি ছোট ধাতব বোতাম দেখতে পেল। বোতামটি চাপতেই ফ্রেমের এক পাশ থেকে মৃদু শব্দ হলো।

আয়নাটি সামান্য সরে গেল।

পিছনে একটি সরু দরজা।

দরজা খুলে তারা ছোট একটি কক্ষে ঢুকল। ঘরের দেওয়ালজুড়ে পুরোনো মনিটর, তারের জট, ভিডিও ক্যাসেটের তাক। এক কোণে একটি কম্পিউটার। আশ্চর্যজনকভাবে কম্পিউটারটি চালু ছিল।

মনিটরে একটি ফোল্ডার খোলা।

নাম—‘১৩/০৭—শেষ সাক্ষ্য’।

ঋদ্ধি ফাইলটি চালু করল।

স্ক্রিনে রূপসার মুখ ভেসে উঠল। রেকর্ডিংটি বহু পুরোনো। তাঁর চুল এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কণ্ঠ দৃঢ়।

“যদি কেউ এই রেকর্ডিং দেখো, তাহলে জেনে রেখো, আমার নাম রূপসা সেন। আমি এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি। আমি এমন কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, যা প্রকাশ পেলে ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণার আড়ালে চলা অনৈতিক কাজগুলো সামনে আসবে।”

তিনি একটু থামলেন।

“এই গবেষণায় মানুষের স্মৃতি সরাসরি বদলে দেওয়ার কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তার পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করা যায়। কোনও ব্যক্তিকে বারবার বলা হলে যে সে একটি ঘটনা ভুল মনে করছে, তার নিজের স্মৃতির ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ছবি, নথি এবং সাজানো সাক্ষ্য ব্যবহার করে তার অতীত সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা তৈরি করা যায়।”

ঋদ্ধি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।

রূপসা বললেন, “ড. বসু এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন এমন মানুষদের ওপর, যাদের অতীত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি কম। তাঁর দাবি ছিল, মানসিক আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে নতুন পরিচয় দিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতি মানুষকে নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে না শেখিয়ে বরং গবেষকের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছিল।”

মায়া ফিসফিস করে বলল, “এটাই ছিল তাঁর আসল পরীক্ষা।”

রূপসার রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“আমার ভাই ঋদ্ধি দুর্ঘটনার পর কিছু স্মৃতি হারিয়েছিল। আমি চাইনি, তার দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হোক। কিন্তু আমার অনুমতি ছাড়াই তাকে এই গবেষণার মধ্যে আনা হয়েছিল। আমি যখন প্রতিবাদ করি, তখন আমাকে বলা হয়, ঋদ্ধির চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে।”

ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।

“আমি প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এই বাড়িতে এমন কিছু নথি আছে, যা শুধু গবেষণার অপরাধ নয়, আরও একটি অপরাধের প্রমাণ। ড. বসু এমন কয়েকজন মানুষের পরিচয় বদলে দিতে চেয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারতেন।”

রূপসা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকালেন।

“ঋদ্ধি, যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে আমাকে খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন কোরো না। তুমি আমার ভাই। তোমার স্মৃতিতে কিছু ফাঁক থাকলেও, তোমার জীবন মিথ্যা নয়। তুমি যা অনুভব করেছ, যা শিখেছ, যাদের ভালোবেসেছ—সেগুলো তোমারই।”

ভিডিওর শেষে তিনি একটি নাম বললেন।

“অনিরুদ্ধ বসুর আসল নাম—অরুণাভ সেন।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“সেন? আমাদের পদবিও সেন!”

মায়া তার দিকে তাকাল।

“তোমার পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল?”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমি জানি না।”

রেকর্ডিংয়ের শেষ অংশে রূপসা বললেন—

“এই নামটি মনে রেখো। অরুণাভ সেন শুধু গবেষক ছিলেন না। তিনি আমাদের পরিবারের একজন ছিলেন। আর তিনি যে অপরাধ করেছেন, তার সাক্ষী শুধু আমি নই।”

ভিডিও বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

ঋদ্ধি ধীরে বলল, “অরুণাভ সেন আমাদের কে?”

মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই কম্পিউটারের পর্দায় নতুন একটি ফাইল খুলে গেল।

ফাইলটি নিজে থেকেই চালু হয়েছে।

স্ক্রিনে এক বৃদ্ধ মানুষের মুখ দেখা গেল। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“ঋদ্ধি, তুমি যদি এই বার্তা দেখে থাকো, তাহলে বুঝব, রূপসা তার শেষ কাজটি সম্পূর্ণ করেছে।”

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।

“আমি তোমার দাদু, অরুণাভ সেন। আর তোমার জন্মের আগেই আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার ফল তোমাদের পরিবারকে বারো বছর ধরে ভোগ করতে হয়েছে।”

ঋদ্ধির বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

বৃদ্ধের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।

“তোমার দিদি এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে তোমাকে জানতে হবে, বারো বছর আগে সে কেন নিজের নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”

ঋদ্ধি বিস্ময়ে বলে উঠল, “নিজের নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত?”

বৃদ্ধের মুখে বিষণ্ণ হাসি ফুটল।

“হ্যাঁ, ঋদ্ধি। তোমার দিদি নিখোঁজ হয়নি। সে নিজেকে আড়াল করেছিল—তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”

স্ক্রিনের আলো নিভে গেল।

ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

হরিপদ দৌড়ে ঘরে ঢুকে বললেন, “পুলিশ এসেছে! তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন লোক রয়েছে। তাঁরা বলছেন, এই বাড়িতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা হয়েছে।”

মায়া দ্রুত কম্পিউটার থেকে পেনড্রাইভটি খুলে ঋদ্ধির হাতে দিল।

“এটা লুকিয়ে রাখো।”

“ওরা কারা?”

মায়া দরজার দিকে তাকাল।

“যারা চায়, তেরো নম্বর ঘরের রহস্য কোনও দিন প্রকাশ না পাক।”

বাইরে থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—

“ঋদ্ধি সেন, আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে।”

ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি মুঠোয় চেপে ধরল।

তারপর কম্পিউটারের কালো পর্দায় হঠাৎ একটি নতুন বাক্য ফুটে উঠল—

‘বিষয় ১৩/০৭: স্মৃতি পুনরুদ্ধারের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু।’

ঋদ্ধি বুঝতে পারল, এতক্ষণ যে রহস্যের দরজা সে খুলেছে, তার পিছনে আরও একটি দরজা রয়েছে।

আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে এমন এক সত্য, যা তার পরিবারকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে চিনতে বাধ্য করবে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : তেরো নম্বর ঘরের রহস্য (প্রথম পর্ব: যে ঘরে কেউ থাকে না)।

১. মধ্যরাতের ফোন

রাত তখন ১টা ১৩ মিনিট।

কলকাতার উত্তর শহরতলির পুরোনো বাড়ি ‘শান্তিনিকেতন লজ’-এর তিনতলার করিডরে দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল ঋদ্ধি সেন। বাড়িটির নাম শান্তিনিকেতন লজ হলেও সেখানে কোনও অতিথি থাকতেন না। একসময় এটি ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাসভবন। পরে বাড়ির মালিকেরা শহর ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে বাড়িটির দেখাশোনা করেন এক বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক, হরিপদ মণ্ডল।

ঋদ্ধি পেশায় সাংবাদিক। একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে অপরাধ ও রহস্যসংক্রান্ত খবর লেখে। শহরের পুরোনো বাড়ি, পরিত্যক্ত কারখানা, নিখোঁজ মানুষ এবং বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অপরাধ—এই ধরনের বিষয় নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ।

সেদিন রাতে তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এসেছিল।

‘আপনি যদি সত্যিই হারিয়ে যাওয়া মানুষের খবর খুঁজে বের করতে চান, তাহলে শান্তিনিকেতন লজে আসুন। তেরো নম্বর ঘরটি খুলবেন না। দরজার ওপারে যে মেয়েটি আছে, সে আপনার নাম জানে।’

বার্তাটির নীচে আরও একটি লাইন ছিল।

‘আপনার দিদি এখনও বেঁচে আছেন।’

লাইনটি পড়ে ঋদ্ধির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

তার দিদি রূপসা সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন বারো বছর আগে। তখন ঋদ্ধির বয়স মাত্র ষোলো। রূপসার বয়স ছিল চব্বিশ। এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি উধাও হয়ে যান। পুলিশ তদন্ত করেছিল, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল—কিন্তু কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কিছুদিন পরে পুলিশ ধরে নিয়েছিল, রূপসা স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছেন। পরিবার সেই সিদ্ধান্ত কখনও মেনে নিতে পারেনি।

ঋদ্ধি বড় হয়ে সাংবাদিক হওয়ার পরও দিদিকে খোঁজা বন্ধ করেনি। কিন্তু বারো বছরে সে এমন কোনও সূত্র পায়নি, যা তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

আর আজ, মাঝরাতে, অচেনা কেউ তাকে জানাচ্ছে—রূপসা বেঁচে আছেন।

ঋদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে নম্বরে ফোন করল।

ফোন বেজে উঠল একবার।

দু’বার।

তৃতীয়বারে ওপার থেকে এক নারীকণ্ঠ শোনা গেল।

“আপনি কি ঋদ্ধি সেন?”

“হ্যাঁ। আপনি কে? আমার দিদির কথা জানেন?”

“আপনার দিদি সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে আজ রাতেই এখানে আসতে হবে।”

“কোথায়?”

“শান্তিনিকেতন লজ। তেরো নম্বর ঘরের সামনে।”

“আপনি কি আমার দিদি?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর নারীকণ্ঠটি বলল, “আমি আপনার দিদি নই। কিন্তু আপনার দিদি আমাকে চেনেন।”

“তিনি কোথায়?”

“যে প্রশ্নের উত্তর আপনি বারো বছর ধরে খুঁজছেন, তার উত্তর এই বাড়িতেই আছে।”

ফোন কেটে গেল।

ঋদ্ধি আর অপেক্ষা করল না। জ্যাকেট, টর্চ, নোটবুক আর ক্যামেরা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

বাইরে তখন শীতের রাত। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার মধ্যে দূরের বাতিগুলি ঝাপসা দেখাচ্ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, বারো বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজা যেন হঠাৎ খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু সে জানত না, দরজার ওপারে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

২. শান্তিনিকেতন লজ

বাড়িটি শহরের এক পুরোনো গলির শেষে দাঁড়িয়ে ছিল। উঁচু লোহার ফটকে মরচে পড়েছে। ফটকের গায়ে পাথরের ফলকে লেখা—‘শান্তিনিকেতন লজ, প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬’।

ঋদ্ধি কলিং বেল চাপল।

কোনও সাড়া এল না।

দ্বিতীয়বার চাপতেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কিছুক্ষণ পরে ফটক খুলে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।

মাথায় সাদা চুল, গায়ে ধূসর সোয়েটার, হাতে একটি পুরোনো লণ্ঠন।

“কাকে চাই?”

“আমি ঋদ্ধি সেন। আপনার সঙ্গে আগে কথা হয়নি। আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছে।”

বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।

“কে বলেছে?”

“জানি না। একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“আপনি কি রূপসা দেবীর ভাই?”

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে যেন কেউ ধাক্কা দিল।

“আপনি আমার দিদিকে চিনতেন?”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর না দিয়ে ফটক পুরো খুলে দিলেন।

“ভেতরে আসুন।”

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ঋদ্ধি বুঝল, এই জায়গায় বহু বছর ধরে কেউ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করেনি। দেওয়ালে পুরোনো ছবি, কাঠের সিঁড়িতে ধুলো, করিডরের কোণে ভাঙা ফুলদানি। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

বৃদ্ধ নিজেকে পরিচয় দিলেন।

“আমার নাম হরিপদ মণ্ডল। এই বাড়ির দেখাশোনা করি।”

“আমার দিদি এখানে এসেছিলেন?”

“এসেছিলেন।”

“কবে?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগে একবার সিঁড়ির দিকে তাকালেন।

“বারো বছর আগে।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“কিন্তু তিনি তো অফিস থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন!”

“মানুষকে শেষবার যেখানে দেখা যায়, সে সব সময় সেখানেই হারিয়ে যায় না।”

“আপনি কী বলতে চাইছেন?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আপনার দিদি এই বাড়িতে এসেছিলেন এক বর্ষার রাতে। তাঁর সঙ্গে আরও দু’জন মানুষ ছিল। পরদিন সকালে তাঁরা চলে যান। কিন্তু রূপসা দেবী আর বেরিয়ে যাননি।”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে তিনি এখনও এই বাড়িতে আছেন?”

“আমি জানি না।”

“জানেন না, না বলতে চাইছেন না?”

হরিপদ চোখ নামিয়ে বললেন, “কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস আমার নেই।”

ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে উঠল।

“একজন মানুষ বারো বছর ধরে নিখোঁজ। আপনি জানেন তিনি এখানে এসেছিলেন, অথচ পুলিশকে জানাননি?”

“জানিয়েছিলাম।”

“কী বলছেন?”

“সেই সময় থানায় খবর দিয়েছিলাম। পুলিশ এসেছিল। কিন্তু বাড়িতে তল্লাশি করে কিছুই পায়নি। তারপর আমাকে বলা হয়, এ বিষয়ে আর কাউকে কিছু না বলতে।”

“কেন?”

“সেটা আমি জানি না।”

ঋদ্ধি নিজের ফোন বের করে হরিপদর কথা রেকর্ড করতে শুরু করল।

বৃদ্ধ তা দেখে বললেন, “রেকর্ড করছেন? করুন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—এই বাড়িতে সব দরজা মানুষের জন্য তৈরি হয়নি।”

ঋদ্ধি ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি ভূতপ্রেত বিশ্বাস করি না।”

“আমিও করতাম না।”

“তাহলে?”

হরিপদ লণ্ঠন তুলে সিঁড়ির দিকে এগোলেন।

“তাহলে চলুন, তেরো নম্বর ঘরটি দেখে আসুন।”

৩. তেরো নম্বর দরজা

তিনতলার করিডরটি অন্য দুই তলার চেয়ে অনেক সরু। দু’পাশে পুরোনো কাঠের দরজা। প্রতিটি দরজার ওপর পিতলের নম্বর লাগানো।

এক নম্বর।

তিন নম্বর।

পাঁচ নম্বর।

তারপর সাত, নয়, এগারো।

করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি কালো দরজা। দরজার ওপর পিতলের ফলকে লেখা—১৩।

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল, “এখানে তো বিজোড় নম্বরের ঘর। মাঝের ঘরগুলো কোথায়?”

হরিপদ বললেন, “বাড়ির পুরোনো নকশায় এই তলায় ছয়টি ঘর ছিল। কিন্তু সংস্কারের সময় কয়েকটি ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

“তাহলে তেরো নম্বর ঘরটি?”

“এটা সব সময় ছিল।”

“আপনি বললেন, বাড়ির নকশায় ছয়টি ঘর। তা হলে তেরো নম্বর এল কোথা থেকে?”

হরিপদ উত্তর দিলেন না।

দরজার সামনে এসে ঋদ্ধি থামল।

দরজার নীচ দিয়ে সরু আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।

ঘরের ভেতরে কেউ আছে।

ঋদ্ধি দরজায় কান পাতল।

প্রথমে কোনও শব্দ শোনা গেল না। তারপর খুব মৃদু কণ্ঠে একটি মেয়ে বলল—

“ঋদ্ধি, তুমি এসেছ?”

ঋদ্ধির শরীর শিউরে উঠল।

এই কণ্ঠস্বর সে চেনে।

ছোটবেলায় রূপসা তাকে ঘুম পাড়ানোর সময় এমন করেই ডাকতেন।

“দিদি?”

ভেতর থেকে উত্তর এল, “দরজাটা খুলো না।”

ঋদ্ধি দরজার হাতলে হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেল।

“তুমি কোথায়? তুমি কি সত্যিই আমার দিদি?”

“আমি তোমার দিদিকে চিনি।”

“এটা কী ধরনের কথা? তুমি কে?”

“তোমার কাছে একটা ছবি আছে। ছবির পিছনে কী লেখা আছে, মনে আছে?”

ঋদ্ধি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার মধ্যে একটি পুরোনো ছবি রয়েছে। ছবিতে সে, রূপসা এবং তাদের মা-বাবা। রূপসার নিখোঁজ হওয়ার পর ছবিটি ঋদ্ধি সব সময় সঙ্গে রাখে।

ছবির পিছনে মায়ের হাতের লেখায় লেখা—‘আমরা একে অপরকে হারাব না।’

ঋদ্ধি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “লেখাটা কীভাবে জানলে?”

ভেতর থেকে মেয়েটি বলল, “কারণ তোমার দিদি ছবিটা আমাকে দিয়েছিল।”

“কবে?”

“যেদিন সে এই ঘরে ঢুকেছিল।”

ঋদ্ধি দরজার হাতল ঘুরিয়ে দেখল। দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ নয়। তবু হাতল নড়ল না।

সে জোরে ধাক্কা দিল।

দরজাটি একচুলও খুলল না।

“দরজা খুলছে না কেন?”

“কারণ তুমি এখনও সেই প্রশ্নের উত্তর জানো না।”

“কোন প্রশ্ন?”

“বারো বছর আগে তোমার দিদি কেন এই বাড়িতে এসেছিল?”

ঋদ্ধি বলল, “আমি জানি না। তুমি জানো?”

“জানি। কিন্তু তুমি যদি এখন দরজা খোলো, তাহলে যে মানুষটিকে খুঁজছ, তাকে হয়তো আর কখনও খুঁজে পাবে না।”

“এ কেমন ধাঁধা?”

“এই বাড়িতে সবাই কাউকে না কাউকে খুঁজতে আসে। কেউ তার অতীতকে, কেউ তার ভবিষ্যৎকে, আর কেউ এমন একজনকে, যে কোনও দিন এই পৃথিবীতে ছিলই না।”

ঋদ্ধি রাগে দরজায় ঘুষি মারল।

“আমি ধাঁধা শুনতে আসিনি! আমার দিদি কোথায়, সেটা বলো!”

হঠাৎ ভেতর থেকে একটি কাগজ দরজার নীচ দিয়ে বেরিয়ে এল।

ঋদ্ধি কাগজটি তুলে নিল।

তাতে লেখা—

‘ঘড়ির কাঁটা যখন থেমে যাবে, তখন দরজা খুলবে। কিন্তু দরজা খোলার আগে নিজের নামটি মনে রাখবেন।’

কাগজের নীচে একটি সময় লেখা—রাত ২টা ১৭ মিনিট।

ঋদ্ধি ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত ১টা ৪৮ মিনিট।

তার হাতে প্রায় আধঘণ্টা সময় আছে।

৪. যে বাড়ির নকশায় তেরো নেই

ঋদ্ধি হরিপদকে নিয়ে নিচে নেমে এল। তার মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন।

“এই বাড়ির পুরোনো নকশা কোথায়?”

হরিপদ বললেন, “দোতলার স্টোররুমে কিছু কাগজ আছে।”

“আমাকে দেখান।”

স্টোররুমের দরজা খুলতেই ধুলো উড়ে উঠল। একপাশে কাঠের আলমারি, অন্য পাশে ভাঙা চেয়ার এবং পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ।

হরিপদ একটি লোহার বাক্স খুলে কয়েকটি নকশা বের করলেন।

ঋদ্ধি সেগুলি মেঝেতে বিছিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল।

প্রথম নকশাটি ১৯৩৬ সালের। দ্বিতীয়টি ১৯৫২ সালের। তৃতীয়টি ১৯৮১ সালের।

তিনটি নকশাতেই তিনতলায় ছয়টি ঘর দেখানো হয়েছে। কোনওটিতেই তেরো নম্বর ঘর নেই।

কিন্তু ১৯৯৮ সালের একটি হাতে আঁকা নকশায় তিনতলার করিডরের শেষে একটি অতিরিক্ত ঘর দেখা গেল। তার পাশে লেখা—‘বিশেষ কক্ষ—প্রবেশ নিষেধ’।

নকশাটির নীচে একটি স্বাক্ষর।

ড. অনিরুদ্ধ বসু।

ঋদ্ধি নামটি আগে কোথাও পড়েছে বলে মনে করল।

সে ফোনে নামটি খুঁজে দেখল। পুরোনো সংবাদপত্রের একটি ডিজিটাল আর্কাইভে একটি প্রতিবেদন পাওয়া গেল।

‘মনস্তাত্ত্বিক গবেষক ড. অনিরুদ্ধ বসু রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০১ সালে। অনিরুদ্ধ বসু মানুষের স্মৃতি, পরিচয় এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত নিয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রাক্তন সহকারী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি অনুমতি ছাড়া মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন।

তদন্ত শুরু হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনও মামলা শেষ পর্যন্ত আদালতে পৌঁছয়নি। কারণ অভিযোগের প্রধান সাক্ষীসহ কয়েকজন হঠাৎ বক্তব্য বদলে ফেলেছিলেন।

ঋদ্ধি আরও খুঁজতে লাগল।

২০০৪ সালে ড. বসুর বাড়ি থেকে কিছু গবেষণার নথি উদ্ধার হয়েছিল। সেই নথিতে ‘ঘর ১৩’ নামে একটি প্রকল্পের উল্লেখ ছিল।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনও বিস্তারিত তথ্য ছিল না।

ঋদ্ধি হরিপদকে জিজ্ঞাসা করল, “ড. অনিরুদ্ধ বসু কে ছিলেন?”

বৃদ্ধের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“এই বাড়ির আগের মালিকের চিকিৎসক। তিনি কিছুদিন এখানে থাকতেন।”

“কী ধরনের চিকিৎসক?”

“মানুষের মন নিয়ে কাজ করতেন।”

“তিনি কি তেরো নম্বর ঘর তৈরি করেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তিনি বলতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার তার নিজের স্মৃতি। কোনও মানুষ যদি নিজের অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে যায়, তাহলে সে নতুন করে বাঁচতে পারে। আবার যদি কেউ অন্যের স্মৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে সে সেই মানুষটির জীবনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”

ঋদ্ধি ধীরে বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, তিনি মানুষের স্মৃতি মুছে দিতেন?”

“আমি জানি না তিনি ঠিক কী করতেন। তবে তাঁর কাছে আসা কয়েকজন মানুষ পরে নিজেদের অতীত সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতে শুরু করেছিল।”

“আর আমার দিদি?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“রূপসা দেবী তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”

ঋদ্ধি হতবাক হয়ে গেল।

“আমার দিদি তো একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন!”

“সেটা ঠিক। কিন্তু তিনি অনিরুদ্ধবাবুর গবেষণার নথি অনুবাদ করতেন। একসময় তিনি জানতে পারেন, গবেষণার নামে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এবং স্মৃতি নিয়ে অনৈতিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।”

“তাহলে দিদি সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তিনি তার আগেই নিখোঁজ হয়ে যান।”

ঋদ্ধির মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।

বারো বছর ধরে সে ভেবেছে, দিদি হয়তো কোনও ব্যক্তিগত কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। অথচ তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে ছিল এমন এক গোপন গবেষণা, যার কথা পরিবার কিছুই জানত না।

“ড. অনিরুদ্ধ বসু এখন কোথায়?”

হরিপদ বললেন, “কেউ জানে না।”

“তাহলে তেরো নম্বর ঘরের চাবি কার কাছে?”

বৃদ্ধের চোখ করিডরের দিকে চলে গেল।

“চাবি কোনও দিন আমার কাছে ছিল না।”

“তাহলে দরজা খুলবে কীভাবে?”

হরিপদ ধীরে বললেন, “সময় হলে দরজা নিজেই খুলবে।”

৫. বন্ধ ঘড়ির শব্দ

রাত ২টা ৫ মিনিট।

ঋদ্ধি আবার তিনতলায় উঠে এল। হরিপদ তার সঙ্গে ছিলেন। করিডরের বাতিগুলি একটির পর একটি জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে।

তেরো নম্বর দরজার সামনে এসে ঋদ্ধি দেখল, দরজার পাশে একটি পুরোনো দেয়ালঘড়ি ঝুলছে। ঘড়িটি এতক্ষণ বন্ধ ছিল। এখন তার কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

২টা ১০।

২টা ১১।

২টা ১২।

ঋদ্ধি ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ঘড়ি এতক্ষণ বন্ধ ছিল। হঠাৎ চলছে কেন?”

হরিপদ কোনও উত্তর দিলেন না।

ঘড়ির কাঁটা ২টা ১৬ মিনিটে পৌঁছতেই করিডরের সব আলো নিভে গেল।

সম্পূর্ণ অন্ধকার।

তারপর ঘড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।

টিক।

টিক।

টিক।

২টা ১৭ মিনিট।

ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল।

এক মুহূর্ত পরে তেরো নম্বর ঘরের দরজায় ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

দরজার হাতল নিজে থেকেই ঘুরে গেল।

দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ঋদ্ধি টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে আলো ফেলল।

ঘরটি অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার। কোনও ধুলো নেই, কোনও ভাঙা আসবাব নেই। মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল, দু’পাশে দুটি চেয়ার। দেওয়ালে সারি সারি ফাইল। ঘরের এক কোণে একটি পুরোনো টেলিফোন।

আর টেবিলের সামনে বসে আছে একটি মেয়ে।

তার বয়স আনুমানিক পঁচিশ। পরনে সাদা পোশাক। চুল কাঁধ পর্যন্ত। মুখটি ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।

ঋদ্ধি টর্চের আলো তার মুখে ফেলতেই মেয়েটি বলল, “তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ।”

ঋদ্ধি কয়েক পা এগিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।

“আমার নাম মায়া।”

“তুমি কি আমার দিদিকে চেনো?”

“চিনি।”

“তিনি কোথায়?”

মায়া টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইল তুলে ধরল।

“এই ফাইলের মধ্যে তোমার দিদির শেষ সাক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”

ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে বলল, “আবার প্রশ্ন?”

“তোমার দিদি যখন নিখোঁজ হন, তখন তুমি কোথায় ছিলে?”

ঋদ্ধি থমকে গেল।

“বাড়িতে।”

“কোন বাড়িতে?”

“আমাদের বাড়িতে।”

“তোমাদের বাড়ির ঠিকানা কী ছিল?”

ঋদ্ধি উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।

তার মাথার মধ্যে যেন কুয়াশা জমে উঠল। সে জানে তাদের বাড়ি কোথায় ছিল। সে প্রতিদিন সেই বাড়ির কথা ভাবে। কিন্তু হঠাৎ করে রাস্তার নামটি মনে পড়ছে না।

সে চোখ বন্ধ করল।

পুরোনো বাড়ির বারান্দা, মায়ের গানের শব্দ, বাবার পড়ার ঘর—সব মনে পড়ছে। অথচ ঠিকানাটি মনে পড়ছে না।

মায়া বলল, “ভয় পেয়ো না। কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায় না। শুধু তাদের কাছে পৌঁছনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।”

ঋদ্ধি রাগে বলল, “আমার স্মৃতি নিয়ে খেলা বন্ধ করো!”

মায়া শান্ত গলায় বলল, “আমি তোমার স্মৃতি নিয়ে কিছু করছি না। তুমি এখানে আসার আগেই কিছু স্মৃতি তোমার কাছে বন্ধ ছিল।”

“কেন?”

মায়া ফাইলটি টেবিলে রাখল।

“কারণ তোমার দিদি শুধু নিজের জন্য নয়, তোমার জন্যও কিছু লুকিয়ে রেখেছিলেন।”

ঋদ্ধি ফাইলটি খুলল।

প্রথম পাতায় তার নিজের ছবি।

ছবির নীচে লেখা—

বিষয়: ঋদ্ধি সেন।

পরীক্ষা নম্বর: ১৩/০৭।

স্মৃতিগত বিচ্ছিন্নতার প্রাথমিক লক্ষণ: নিশ্চিত।

ঋদ্ধির হাত থেকে ফাইলটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“এটা কী?”

মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার দিদি নিখোঁজ হওয়ার বারো বছর আগে, তোমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা তুমি ভুলে গেছ।”

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল, “কী ঘটনা?”

মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।

একবার।

দু’বার।

তিনবার।

মায়া ফোন তুলল।

ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“মায়া, ছেলেটিকে ঘর থেকে বের করে দাও। এখনই।”

মায়ার মুখের রং বদলে গেল।

“কিন্তু সে সত্যিটা জেনে গেছে।”

পুরুষকণ্ঠ বলল, “তাহলে তাকে আর বেরোতে দেওয়া যাবে না।”

ফোন কেটে গেল।

মায়া ধীরে ধীরে ঋদ্ধির দিকে ফিরল।

“তোমাকে এখনই এখান থেকে যেতে হবে।”

ঋদ্ধি বলল, “আমি কোথাও যাব না। আমার দিদির কী হয়েছে, সেটা না জেনে আমি যাব না।”

মায়া তার হাত শক্ত করে ধরল।

“তাহলে শোনো। তোমার দিদি এই ঘরে বন্দি নন।”

“তাহলে কোথায়?”

মায়া দরজার পিছনের দেওয়ালের দিকে তাকাল।

দেওয়ালে একটি বড় আয়না ঝুলছে। এতক্ষণ ঋদ্ধি সেটিকে সাধারণ আয়না বলেই ভেবেছিল। কিন্তু এখন তার মধ্যে ঘরের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে না।

দেখা যাচ্ছে একটি ছোট ঘর।

সেই ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ারে বসে আছে এক নারী।

চুল লম্বা। মুখ ক্লান্ত। চোখ দুটি বন্ধ।

ঋদ্ধি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

সে মুখটি চিনতে পারে।

বারো বছর ধরে প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি জন্মদিন, প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাতে সে এই মুখটিই মনে করেছে।

“দিদি!”

আয়নার ওপারের নারী ধীরে চোখ খুললেন।

তার ঠোঁট নড়ল।

শব্দ শোনা গেল না।

ঋদ্ধি আয়নার দিকে ছুটে গেল।

নারীটি এবার স্পষ্ট করে বললেন—

“ঋদ্ধি, তুমি এখানে কেন এসেছ?”

তারপর আয়নার ওপারের ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে ভেসে এল আরেকটি কণ্ঠ।

“রূপসাকে ফিরিয়ে আনতে হলে, তোমাকে নিজের হারিয়ে যাওয়া বারো বছর ফিরে পেতে হবে।”

ঋদ্ধি পিছিয়ে এল।

মায়া ফিসফিস করে বলল, “এবার থেকে তোমার কোনও স্মৃতিকে বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ খুঁজবে। কারণ এই বাড়িতে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস কোনও ভূত নয়, কোনও অদৃশ্য শক্তিও নয়।”

সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটির দিকে তাকাল।

“সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হলো—যে সত্যকে তুমি নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করো, অথচ সেটি কখনও তোমার ছিল না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে করিডরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন নয়।

অনেকজন।

দরজার সামনে এসে শব্দ থেমে গেল।

তারপর বাইরে থেকে কেউ বলল—

“তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ করো। বিষয় নম্বর ১৩/০৭ জেগে উঠেছে।”

ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকাল।

মায়া তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—

“দৌড়াও!”

কিন্তু ঘর থেকে বেরোনোর একমাত্র দরজাটি তখন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

আর আয়নার ওপারে, অন্ধকার ঘরে, রূপসা সেন আবার চোখ খুললেন।

তিনি এবার সরাসরি ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়লেন।

“ওরা তোমাকে ছোটবেলাতেই মেরে ফেলেছিল, ঋদ্ধি।”

তারপর সব আলো নিভে গেল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে ট্রেন ফিরে আসে না)।

১. যাত্রার প্রথম দিন

“পরবর্তী স্টেশন—শালবন। তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০০৪।”

ঘোষণাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে কামরার সব আলো জ্বলে উঠল।

নিবারণ চক্রবর্তী জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, ট্রেনটি এমন একটি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে, যা তাঁর কাছে পরিচিত অথচ অচেনা। প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে নতুন রং, টিকিটঘরের সামনে কয়েকজন যাত্রী, চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কেটলি। স্টেশনের বড় ঘড়িতে রাত ১১টা ৪২ মিনিট।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্যটি ছিল প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের।

তার হাতে ক্যামেরা, কাঁধে ব্যাগ। পরনে সাধারণ শার্ট ও জিনস। সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, তারপর নিজের মোবাইল ফোনে কিছু লিখছে।

অরিত্র সেন।

যে অরিত্রকে নিবারণ এতক্ষণ ধরে চিনে এসেছেন, তারই তরুণ সংস্করণ যেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে।

মধুমিতা জানলার কাছে ছুটে গেলেন।

“ওই তো অরিত্র!”

তিতলি তাঁর হাত ধরে বলল, “কিন্তু আমাদের সঙ্গে তো অরিত্র কাকু আছেন।”

কামরার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অরিত্র কোনও উত্তর দিল না। সে শুধু জানলার বাইরে নিজের তরুণ সংস্করণের দিকে তাকিয়ে রইল।

অরিন্দম সেন হেসে বলল, “এবার বুঝতে পারছ? তোমরা যাকে অরিত্র বলে চিনেছ, সে আসলে সেই মানুষটির স্মৃতি, নথি আর অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি করা একটি পরিচয়। তার শরীরের বয়স আর তার পরিচয়ের বয়স এক নয়।”

নিবারণ বললেন, “সোজা করে বলুন। আপনি কী করেছেন?”

অরিন্দম একটি আসন টেনে বসল।

“২০০৪ সালে অরিত্র এই স্টেশনে এসেছিল একটি অপরাধের তদন্ত করতে। সে তখন তিরিশ বছরের সাংবাদিক। সে জানতে পেরেছিল, নীলডাঙা হল্টের বন্ধ রেলপথ ব্যবহার করে কিছু মানুষকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাদের পরিচয় মুছে ফেলা হচ্ছে, পরিবারের কাছে বলা হচ্ছে তারা মারা গেছে অথবা অন্য কোথাও চলে গেছে।”

“আপনি কি সেই দলের একজন ছিলেন?” অদিতি প্রশ্ন করল।

“আমি ছিলাম প্রকল্পের প্রশাসনিক দায়িত্বে। কিন্তু প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য প্রথমে আমিও জানতাম না। পরে বুঝেছিলাম, কয়েকজন বিজ্ঞানী এবং রেলকর্মী একটি অস্বাভাবিক ঘটনার সুযোগ নিয়ে গোপন পরিবহণের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। তারা বিশ্বাস করত, নীলডাঙা হল্টের কাছাকাছি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সময়ের ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে এমনভাবে সরিয়ে নেওয়া যায়, যাতে বাইরের পৃথিবীতে তাদের অনুপস্থিতির হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

অদিতি বলল, “কিন্তু আপনি বললেন, অরিত্রের পরিচয় তৈরি করা হয়েছিল। তার মানে এই মানুষটি কি আসল অরিত্র নন?”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে তোমাদের আগে ১৯৯১ সালের ঘটনাটি জানতে হবে।”

২. ১৯৯১ সালের রাত

অরিন্দম জানাল, ১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর নীলডাঙা হল্টে একটি পরীক্ষামূলক রেল পরিষেবা চালু করা হয়েছিল। সরকারি নথিতে প্রকল্পটির নাম ছিল ‘বিশেষ সংকেত ও যোগাযোগ পরীক্ষা’। উদ্দেশ্য ছিল দুর্গম রেলপথে ট্রেনের অবস্থান নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা।

পরীক্ষার রাতে একটি ট্রেন নীলডাঙা হল্ট থেকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেটি পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছয়নি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে মূল রেলপথে ট্রেনটির কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

প্রথমে সবাই ভেবেছিল, ট্রেনটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। কিন্তু আশপাশে কোনও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেল না। ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন জায়গায় ফিরে আসেন। তাঁদের বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে মেলেনি।

কেউ বলেছিলেন, তাঁরা মাত্র কয়েক ঘণ্টা ট্রেনে ছিলেন। কেউ দাবি করেছিলেন, তাঁরা বহু মাস একটি অচেনা স্টেশনে আটকে ছিলেন। আবার কয়েকজন বলেছিলেন, ট্রেনটি কখনও স্টেশন ছেড়েই যায়নি।

“তখনই প্রকল্পের কিছু লোক বুঝতে পারে, এখানে এমন একটি ঘটনা ঘটছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে,” অরিন্দম বলল। “তারা ঘটনাটিকে প্রকাশ্যে না এনে গবেষণার বিষয় করে তোলে। কিন্তু ধীরে ধীরে গবেষণার সঙ্গে অপরাধ জড়িয়ে যায়। কিছু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রেনে পাঠানো হতে থাকে।”

নিবারণ জিজ্ঞাসা করলেন, “আর আমার দাদা?”

“সুব্রত এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সে রেলওয়ের একজন কর্মচারী হিসেবে ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারে। সে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল। পরে অরিত্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। দু’জন মিলে প্রকল্পের নথি বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।”

“তারপর তারা নিখোঁজ হয়।”

“হ্যাঁ। কিন্তু দু’জনের পরিণতি এক ছিল না। সুব্রত ট্রেনের মধ্যে আটকে পড়ে। অরিত্র পালাতে পেরেছিল, কিন্তু তার সংগ্রহ করা প্রমাণ এবং তার পরিচয় নিয়ে এমন ঘটনা ঘটে, যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা আজও আমাদের কাছে নেই।”

অদিতি বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, ট্রেনটি মানুষের পরিচয় বদলে দেয়?”

“না। ট্রেন কোনও জাদুকরী যন্ত্র নয়, যা মানুষের শরীর বা পরিচয় ইচ্ছেমতো বদলে দেয়। এখানে মূল ঘটনা হল সময়ের ব্যবধান, বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘদিনের গোপন আটক এবং নথি জালিয়াতি। এর সঙ্গে একটি অস্বাভাবিক রেল-ঘটনা জড়িয়ে আছে, যার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু সেই অজানাকে ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণা করা হয়েছে।”

অরিত্র এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে বলল, “অরিন্দম সবটা বলছে না।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

“আমাকে সে তৈরি করেনি। আমি কোনও কৃত্রিম মানুষ নই। আমার স্মৃতি আছে, আমার অনুভূতি আছে, আমার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমার জীবনের কিছু অংশ অন্যের নথি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, আমি অরিত্র সেন। আমি সেই নামেই বহু বছর ধরে বেঁচেছি। এখন বুঝতে পারছি, আমার অতীতের কিছু অংশ হয়তো আমার নিজের নয়।”

নিবারণ ধীরে বললেন, “তাহলে আপনি কে?”

অরিত্র দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে উত্তর দিল, “সেটাই আমাকে জানতে হবে।”

৩. যে সত্য কেউ বলতে চায়নি

ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল। জানলার বাইরে শালবন স্টেশনের আলো মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর চারদিকে কুয়াশা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না।

অরিন্দম সেন তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ফাইল বের করল। ফাইলের ওপর লেখা—‘প্রকল্প ১৭/৪৭’।

“এই ফাইলের মধ্যে ২০০৪ সালের ঘটনার নথি রয়েছে। এখানে অরিত্র, সুব্রত, মধুমিতা এবং ঋজুর নাম আছে। কিন্তু আরও একটি নাম আছে, যেটি তোমাদের জানা দরকার।”

সে ফাইল খুলে একটি কাগজ সামনে রাখল।

নাম—অরিন্দম ঘোষ।

মধুমিতা কাগজটি দেখে চমকে উঠলেন।

“এই নামটা আমার স্বামীর।”

নিবারণ তাকালেন।

“আপনার স্বামীর নাম অরিন্দম ঘোষ?”

মধুমিতা মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। ঋজুর বাবা। কিন্তু ও নিখোঁজ হওয়ার পর অরিন্দমও হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। আমাকে বলা হয়েছিল, সে কাজের সূত্রে বাইরে গেছে। পরে আর কোনও খবর পাইনি।”

অরিন্দম সেন বলল, “ঋজুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে তার বাবারও সম্পর্ক ছিল। অরিন্দম ঘোষ প্রকল্পের জন্য কাজ করত না। সে ছিল একজন রেল-প্রযুক্তিবিদ। নীলডাঙা হল্টের পরীক্ষামূলক সিগন্যাল ব্যবস্থায় তার কিছু প্রযুক্তিগত অবদান ছিল। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে, তার তৈরি ব্যবস্থাকে অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

“তাহলে সে কি আমাদের সাহায্য করতে গিয়েছিল?” মধুমিতা প্রশ্ন করলেন।

“হ্যাঁ। সে ঋজুকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই রাতে সে নিজেই নিখোঁজ হয়ে যায়।”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। এত বছর ধরে আমি ভেবেছি, আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”

অরিন্দম বলল, “তার কোনও প্রমাণ নেই। নথি অনুযায়ী, সে শেষবার নীলডাঙা হল্টে দেখা গিয়েছিল। তারপর তার কোনও নির্ভরযোগ্য খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

তিতলি ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে আমার সঙ্গে ঋজুর সম্পর্ক কী?”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“এই প্রশ্নের উত্তরও ওই ফাইলের শেষ পাতায় আছে।”

পাতাটি উল্টে দেখা গেল, সেখানে একটি শিশুর ছবি। ছবির পেছনে লেখা—‘অজ্ঞাতপরিচয় কন্যাশিশু, উদ্ধার: ১৮ নভেম্বর ২০০৪’।

মধুমিতা ছবিটি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেলেন।

শিশুটির বাঁ হাতে একটি লাল সুতো বাঁধা।

তিতলির হাতেও ছোটবেলা থেকে সেই দাগ ছিল।

মধুমিতা কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি কি আমার মেয়ে?”

তিতলি কোনও উত্তর দিতে পারল না।

অরিন্দম বলল, “নথিতে শিশুটির নাম ছিল না। পরে তাকে অনাথ আশ্রমে পাঠানো হয়। তার পরিচয় নির্ধারণের জন্য কোনও পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করা হয়নি। কিন্তু উদ্ধারস্থল, তারিখ এবং হাতে বাঁধা সুতোর বর্ণনা মিলছে।”

তিতলি ধীরে বলল, “আমার জন্মের কথা কেউ জানে না। অনাথ আশ্রমের নথিতে শুধু লেখা আছে, আমাকে শালবন স্টেশনের কাছে পাওয়া গিয়েছিল।”

মধুমিতা তার হাত ধরলেন।

“আমি তোমাকে হারিয়েছিলাম কি না, তা এখনও নিশ্চিত নই। কিন্তু যদি তুমি আমার মেয়ে হও, তাহলে তোমাকে খুঁজে পেতে আমার এত বছর লাগল কেন?”

অরিত্র বলল, “কারণ কেউ চায়নি, তোমরা একে অপরকে খুঁজে পাও। ঋজুকে ট্রেনের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। আর তিতলির পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল, যাতে পরিবারের কোনও সূত্র বাইরে না আসে।”

তিতলি চোখ মুছল।

“তাহলে আমার নাম তিতলি কে রেখেছিল?”

“সম্ভবত অনাথ আশ্রমের কর্মীরা,” অরিন্দম বলল। “তোমার জন্মের নাম কী ছিল, তা নথিতে নেই।”

মধুমিতা তিতলিকে বুকে টেনে নিলেন।

“তোমার নাম যাই হোক, তুমি আমার কাছে হারিয়ে যাওয়া সন্তান হয়ে থাকবে না।”

কিন্তু তিতলি তাঁকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে বলল, “আমি আপনার মেয়ে কি না, তা নিশ্চিত হতে চাই। শুধু এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নয়। আমি প্রমাণ চাই।”

মধুমিতা মাথা নাড়লেন।

“তুমি ঠিক বলেছ। এত বছর মিথ্যা আর অসম্পূর্ণ তথ্যের মধ্যে কাটিয়েছি। এবার সত্যিটা যাচাই করেই এগোব।”

৪. শেষ কামরার গোপন ঘর

ট্রেনের ভেতরে হঠাৎ একটি দীর্ঘ ঘণ্টা বেজে উঠল।

অরিত্র জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমরা নীলডাঙা হল্টের কাছে পৌঁছে গেছি।”

অরিন্দম উঠে দাঁড়াল।

“আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। এই ট্রেন যখন আবার শালবনের দিকে ফিরবে, তখন সিগন্যাল চালু করতে হবে। না হলে ট্রেনটি আবার সেই একই চক্রে ঢুকে পড়বে।”

নিবারণ বললেন, “তাহলে চলুন, এখনই লিভার টেনে দিই।”

“এত সহজ নয়,” অরিন্দম বলল। “সিগন্যাল কক্ষের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এই কামরার পেছনে। কিন্তু সেখানে পৌঁছতে হলে শেষ কামরার দরজা খুলতে হবে। আর সেই দরজা খোলার জন্য একটি পরিচয় যাচাই করতে হয়।”

“কীসের পরিচয়?”

“প্রথম যাত্রীর পরিচয়।”

সবাই অরিত্রের দিকে তাকাল।

অরিত্র বলল, “আমার নাম দিয়ে দরজা খুলবে না। কারণ এই ট্রেনের নথিতে প্রথম যাত্রীর পরিচয় নিয়ে অসঙ্গতি আছে।”

“তাহলে কী করতে হবে?” অদিতি প্রশ্ন করল।

অরিন্দম উত্তর দিল, “যে ব্যক্তি প্রথমবার ট্রেনে উঠেছিল, তাকে নিজের নাম বলতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল, প্রথম যাত্রী কে ছিল, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।”

নিবারণ বললেন, “আপনি তো বললেন, প্রথম যাত্রী অরিত্র।”

“আমি বলেছি, নথিতে সেই নাম রয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের রেজিস্টারে একটি শিশুর নাম লেখা ছিল না। পরে সেই শিশুটির পরিচয় অরিত্র সেন হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। আসল পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল।”

অরিত্র হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

“তুমি কি বলতে চাইছ, আমি অরিত্র নই?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি বলতে চাইছি, তোমার জন্মপরিচয় সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। তোমার স্মৃতি, তোমার নথি এবং তোমার শারীরিক বয়সের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তোমার অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা মিথ্যা।”

অরিত্রের চোখে রাগ জমে উঠল।

“তুমি আমার জীবন নিয়ে পরীক্ষা করেছ। আমাকে এমন একটি নাম দিয়েছ, যার সঙ্গে আমার জন্মের কোনও সম্পর্ক নেই। তারপর বলছ, আমার পরিচয় নিশ্চিত নয়!”

“আমি তোমাকে এই অবস্থায় আনিনি,” অরিন্দম বলল। “আমি শুধু সেই নথিগুলির রক্ষক ছিলাম, যেগুলি অন্যেরা বদলে দিয়েছিল।”

“তাহলে আসল অপরাধী কে?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার দরজা খুলে গেল।

দরজার ওপারে একটি ছোট ঘর। দেওয়ালে পুরোনো সিগন্যাল প্যানেল। তার মাঝখানে একটি লাল লিভার। পাশে একটি ধাতব বাক্স, যার ওপর লেখা—

‘প্রথম যাত্রীর নাম।’

অদিতি বাক্সটির কাছে গিয়ে বলল, “এখানে কোনও বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই। এটা হয়তো যান্ত্রিক লক।”

নিবারণ লিভারটি পরীক্ষা করলেন।

“এটা টানলেই কি ট্রেন থেমে যাবে?”

“সম্ভবত,” অরিন্দম বলল। “কিন্তু লিভার টানার আগে বাক্সটি খুলতে হবে।”

অদিতি বাক্সের তালা পরীক্ষা করে বুঝল, তালাটি সাধারণ চাবি দিয়ে খোলা যায় না। তার পাশে একটি ছোট ধাতব প্লেট, তাতে ছয়টি খোপ। প্রতিটি খোপে একটি করে নামের প্রথম অক্ষর বসানোর জায়গা।

অরিত্র বলল, “আমাদের ছয়জনের নাম?”

“সম্ভবত,” অদিতি উত্তর দিল। “অরিত্র, সুব্রত, নিবারণ, মধুমিতা, ঋজু এবং তিতলি—এই ছয়টি নাম বসালে দেখা যাক কী হয়।”

তারা একে একে অক্ষর বসাল। কিন্তু তালা খুলল না।

তারপর অদিতি পুরোনো রেজিস্টারের পাতাটি মনে করল। সেখানে লেখা ছিল—‘যে নাম প্রথমে লেখা হয়েছিল, সেটি মুছে ফেললেও তার চিহ্ন থেকে যায়।’

সে ধাতব প্লেটের ওপর আলো ফেলল। প্রথম খোপের নীচে ক্ষীণ আঁচড়ে একটি অক্ষর দেখা গেল—‘স’।

নিবারণ বললেন, “সুব্রত?”

সুব্রত মাথা নাড়লেন।

“না। আমার নামের প্রথম অক্ষর এখানে লেখা হয়নি।”

অরিত্র প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “সেটা হয়তো ‘সেন’ নয়। ‘স্মৃতি’।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“না। এটা নামের প্রথম অক্ষর। কিন্তু আমরা যে ছয়টি নাম জানি, তাদের মধ্যে আরেকটি নাম আছে, যেটি কেউ উল্লেখ করেনি।”

মধুমিতা ধীরে বললেন, “অরিন্দম ঘোষ।”

অরিন্দম সেনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“না,” সে বলল। “ওর নাম এখানে থাকার কথা নয়।”

“কেন?” নিবারণ প্রশ্ন করলেন।

অরিন্দম উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই ধাতব বাক্সের ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।

টিক।

তারপর তালাটি খুলে গেল।

বাক্সের ভেতরে একটি ছোট কাগজ।

তাতে লেখা—

প্রথম যাত্রীর নাম: অরিন্দম ঘোষ।

মধুমিতা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।

“তাহলে আমার স্বামীই প্রথম যাত্রী?”

অরিন্দম সেন ধীরে মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। ১৯৯১ সালের পরীক্ষার সময় সে নীলডাঙা হল্টে উপস্থিত ছিল। তার তৈরি সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটির কারণেই প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। পরে সে সেই ভুল সংশোধন করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের অন্যরা তাকে থামিয়ে দেয়।”

“তাহলে সে কোথায়?” মধুমিতা জিজ্ঞাসা করলেন।

অরিন্দম বলল, “এই ট্রেনের মধ্যেই।”

৫. যে মানুষটি নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল

শেষ কামরার পেছনের দরজাটি খুলতেই একটি সরু করিডর দেখা গেল। করিডরের শেষে ছোট একটি কেবিন। সেখানে একজন মানুষ বসে আছেন। মাথা নিচু, সামনে একটি পুরোনো রেলওয়ে লগবুক।

মধুমিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।

“অরিন্দম?”

লোকটি মাথা তুলল।

তার মুখে বয়সের ছাপ রয়েছে। চুল পেকে গেছে, চোখের নীচে গভীর কালি। কিন্তু মধুমিতা তাকে চিনতে পারলেন।

“তুমি!”

অরিন্দম ঘোষ উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ধীরে বললেন, “মধু?”

মধুমিতা কেঁদে ফেললেন।

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর? আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ।”

অরিন্দম তাঁর হাত ধরলেন।

“আমি ফিরতে পারিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে যাব। তারপর বুঝলাম, এই ট্রেনের সময় আর বাইরের সময় এক নয়। আমি যতবার বেরোনোর চেষ্টা করেছি, ততবার আবার এই একই জায়গায় ফিরে এসেছি।”

“ঋজু কোথায়?”

অরিন্দম মধুমিতার মুখের দিকে তাকালেন।

“ঋজু কি ফিরে এসেছে?”

“হ্যাঁ। সে ট্রেনে আছে। তার বয়স এখনও পাঁচ বছর।”

অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।

“আমি ওকে শেষবার দেখেছিলাম যখন ওর বয়স পাঁচ। ওকে নিরাপদে রাখার জন্য অরিত্রকে বলেছিলাম, ট্রেনের বাইরে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমরা জানতাম না, ট্রেনের সময়ের মধ্যে ও আটকে পড়বে।”

মধুমিতা বললেন, “তুমি কি জানো, তিতলি কে?”

অরিন্দম ঘোষ তিতলির দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তিতলি?”

মেয়েটির চোখ ভিজে উঠল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

অরিন্দম ধীরে বললেন, “তুমি আমার মেয়ে। ঋজুর ছোট বোন।”

মধুমিতা বিস্ময়ে বললেন, “কিন্তু আমাদের তো একটাই সন্তান ছিল!”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

“না। তোমাদের দ্বিতীয় সন্তান জন্মেছিল ২০০৪ সালের নভেম্বরের শুরুতে। কিন্তু সেই সময় আমি নীলডাঙার প্রকল্পে আটকে পড়েছিলাম। তুমি অসুস্থ ছিলে। শিশুটিকে হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। পরে যখন আমি তাকে খুঁজতে যাই, তখন জানতে পারি, তাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি আর খুঁজে পাইনি।”

তিতলি কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমি কি সেই শিশু?”

“সম্ভবত,” অরিন্দম বললেন। “কিন্তু আমি চাই, তোমার পরিচয় নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা হোক। এত বছর ধরে যে নথি বদলানো হয়েছে, তার মধ্যে কোনও একটি কাগজকে একমাত্র সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।”

তিতলি এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরল।

“আমি আপনার মেয়ে কি না, তা পরীক্ষায় জানা যাবে। কিন্তু এত বছর ধরে যে মানুষটিকে খুঁজছিলাম, তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন—এটাই আমার কাছে অনেক বড় কথা।”

অরিন্দম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

“আমি তোমাদের কাছে ফিরতে চাই।”

নিবারণ বললেন, “তাহলে আমাদের এখনই ট্রেন থামাতে হবে।”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু লিভার টানলে ট্রেনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে। যারা এই ট্রেনে আটকে আছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের সময়ে ফিরতে পারবে। কিন্তু যারা অন্য সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, তাদের কী হবে, তা আমি জানি না।”

অদিতি বলল, “তাহলে আমাদের ঝুঁকি নিতে হবে। এই ট্রেনকে আর চলতে দেওয়া যায় না।”

৬. শেষ সংকেত

সবাই আবার সিগন্যাল কক্ষে ফিরে এল।

বাইরে ট্রেনের চাকা দ্রুত ঘুরছে। জানলার বাইরে কখনও শালবন, কখনও নীলডাঙা, কখনও অচেনা স্টেশনের আলো ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে, ট্রেনটি একই পথ বারবার অতিক্রম করছে, কিন্তু প্রতিবার সময়ের ভিন্ন বিন্দুতে পৌঁছচ্ছে।

অরিন্দম ঘোষ লিভারের সামনে দাঁড়ালেন।

“এটা আমাকেই করতে হবে। প্রথম যাত্রার ভুল আমার প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমি সিগন্যাল ব্যবস্থায় একটি বিশেষ পুনরাবৃত্তি চক্র তৈরি করেছিলাম। পরে সেটিকে অন্যরা ব্যবহার করে ট্রেনকে একই সময়ে ফিরিয়ে আনতে থাকে।”

নিবারণ বললেন, “আপনি নিশ্চিত?”

“না। কিন্তু এই দায় থেকে আর পালাতে চাই না।”

মধুমিতা তাঁর হাত ধরে বললেন, “এত বছর তুমি একা ছিলে। এবার আর একা সিদ্ধান্ত নিও না।”

অরিন্দম তাঁর দিকে তাকালেন।

“আমি যদি ফিরতে না পারি?”

মধুমিতা চোখ মুছলেন।

“তাহলে অন্তত চেষ্টা করব, যেন আমাদের সন্তানরা সত্যিটা জানতে পারে। কিন্তু আমি চাই, তুমি ফিরে আসো।”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

অদিতি বাক্সের ভেতরের নথিগুলি পরীক্ষা করে দেখল, লিভারের পাশে একটি ছোট সুইচ রয়েছে। সুইচটির নীচে লেখা—

‘শেষ সংকেতের আগে সব যাত্রীর নাম নথিভুক্ত করুন।’

তারা একে একে নাম লিখল—নিবারণ চক্রবর্তী, সুব্রত চক্রবর্তী, মধুমিতা ঘোষ, ঋজু ঘোষ, তিতলি, অদিতি সেন, অরিত্র সেন এবং অরিন্দম ঘোষ।

কিন্তু অরিত্র নিজের নাম লিখতে গিয়ে থেমে গেল।

“আমি কি সত্যিই অরিত্র সেন?”

অরিন্দম ঘোষ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার জন্মপরিচয় সম্পর্কে সব নথি হয়তো উদ্ধার করা যাবে না। কিন্তু তুমি যে মানুষ, তোমার অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্তের দায়িত্ব তোমারই। কোনও নাম তোমার মানবিকতাকে মুছে দিতে পারে না।”

অরিত্র কলম তুলে লিখল—‘অরিত্র সেন—পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ।’

নামটি লেখা শেষ হতেই বাক্সের ভিতরে একটি সবুজ আলো জ্বলে উঠল।

অরিন্দম ঘোষ লিভারটি শক্ত করে ধরলেন।

“সবাই প্রস্তুত?”

নিবারণ বললেন, “হ্যাঁ।”

“তাহলে দরজা বন্ধ করে দিন।”

অদিতি দরজাটি বন্ধ করল।

অরিন্দম লিভার টানলেন।

প্রথমে কিছুই ঘটল না।

তারপর গোটা ট্রেন কেঁপে উঠল। জানলার বাইরে আলো ছুটে যেতে লাগল। স্পিকারে ভাঙা ভাঙা ঘোষণা শোনা গেল—

“বিশেষ পরিষেবা বন্ধ করা হচ্ছে… সকল যাত্রীকে… নিজ নিজ গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হতে অনুরোধ করা হচ্ছে…”

ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল।

হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হলো।

সিগন্যাল কক্ষের আলো নিভে গেল।

অরিন্দম লিভারের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মুখে তীব্র যন্ত্রণা।

মধুমিতা চিৎকার করে উঠলেন, “অরিন্দম!”

তিনি মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলেন। নিবারণ তাঁকে ধরে ফেললেন।

অরিন্দম দুর্বল গলায় বললেন, “ট্রেন থামছে। কিন্তু শেষ সংকেতটা এখনও বাকি।”

“কী করতে হবে?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।

অরিন্দম কষ্ট করে হাত তুলে জানলার বাইরে দেখালেন।

দূরে একটি প্ল্যাটফর্ম দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটি ছোট ঘর। ঘরের দেওয়ালে লেখা—

‘শেষ সিগন্যাল।’

“ওখানে যেতে হবে,” অরিন্দম বললেন। “ট্রেন পুরো থামার আগে সিগন্যালটি চালু করতে হবে। নইলে আবার চক্র শুরু হবে।”

নিবারণ বললেন, “আমি যাব।”

সুব্রত তাঁর হাত ধরে ফেললেন।

“না। তুই এত বছর আমাকে খুঁজেছিস। এবার আমাকে যেতে দে।”

“দাদা, আমি তোমাকে আবার হারাতে পারব না।”

সুব্রত মৃদু হাসলেন।

“তুই আমাকে হারাসনি, নিবারণ। আমি নিজেই পথ হারিয়েছিলাম। এবার বাড়ি ফিরতে চাই।”

তিনি সিগন্যাল কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নিবারণ তাঁর পেছনে ছুটতে চাইলেন, কিন্তু ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

কাচের ওপারে দেখা গেল সুব্রত প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে।

সে ঘরে ঢুকে একটি লাল সুইচ টিপল।

তারপর সব আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল।

ট্রেনটি প্রবল ঝাঁকুনিতে থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত সম্পূর্ণ নীরবতা।

তারপর ঘোষণা শোনা গেল—

“যাত্রা সমাপ্ত। যাত্রীরা অনুগ্রহ করে নিজ নিজ গন্তব্যে নেমে যান।”

৭. যে মানুষটি ফিরে এল

নিবারণ যখন চোখ খুললেন, তখন তিনি শালবন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে আছেন।

ভোরের আলো ফুটেছে। চায়ের দোকান খুলছে। দূরে পাখির ডাক।

মধুমিতা তাঁর পাশে বসে। তিতলি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। অদিতি মোবাইল হাতে কারও সঙ্গে কথা বলছে।

ঋজু মধুমিতার কোলে ঘুমিয়ে।

নিবারণ উঠে বসে চারদিকে তাকালেন।

“দাদা কোথায়?”

কেউ উত্তর দিল না।

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে ছুটে গেলেন। সেখানে একটি পুরোনো বেঞ্চের ওপর সুব্রতর চশমা পড়ে আছে। পাশে একটি ভাঁজ করা কাগজ।

কাগজে লেখা—

‘নিবারণ,

আমি এবার নিজের সময়ে ফিরতে পেরেছি কি না, তা জানি না। কিন্তু তুই যেন আর আমাকে খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন আটকে রাখিস না।

বাড়ি ফিরে যা। আমাদের পুরোনো বাড়ির বারান্দায় এখনও সেই আমগাছটা আছে কি না, দেখে আসিস।

যদি কোনও দিন দেখা হয়, তখন আমাকে আর নিখোঁজ মানুষ বলে ডাকিস না।

— সুব্রত।’

নিবারণ কাগজটি বুকে চেপে ধরলেন।

তিনি জানতেন না, সুব্রত বেঁচে আছেন কি না। তিনি জানতেন না, আবার কখনও দেখা হবে কি না। কিন্তু প্রথমবার তাঁর মনে হলো, দাদার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটা অধ্যায় অন্তত শেষ হয়েছে।

স্টেশনের বড় ঘড়িতে তখন সকাল ৬টা ১২ মিনিট।

ঘড়িটি স্বাভাবিকভাবে চলছে।

অদিতি এসে বলল, “ট্রেনটি আর নেই।”

“মানে?”

“রেললাইনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিয়েছি। নীলডাঙা হল্টের শাখা লাইনে কোনও নতুন চিহ্ন নেই। গত রাতের কোনও ট্রেনের রেকর্ডও নেই। শুধু এই সুটকেসটা পাওয়া গেছে।”

সে একটি পুরোনো চামড়ার সুটকেস নিবারণের হাতে দিল।

সুটকেসের ট্যাগে লেখা—অরিত্র সেন।

ভেতরে একটি চিঠি।

‘যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝবে, ট্রেনটি থেমেছে। আমি জানি না, আমি কোথায় ফিরে গেছি। হয়তো নিজের সময়ে, হয়তো এমন কোনও জায়গায়, যেখানে আমার নামের আর কোনও প্রয়োজন নেই।

আমি যে মানুষ ছিলাম, তাকে খুঁজতে গিয়ে অনেক মানুষকে হারিয়েছি। কিন্তু এবার আমি চাই, যারা বেঁচে আছে, তারা নিজেদের জীবন ফিরে পাক।

আমার গল্পের সব উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে না। তবু আমার নামে যে অন্যায় হয়েছে, তা যেন আর কারও সঙ্গে না হয়।

— অরিত্র।’

মধুমিতা চিঠিটি পড়ে চোখ বন্ধ করলেন।

“ও কি ফিরে আসবে?”

অদিতি উত্তর দিল, “আমি জানি না।”

নিবারণ বললেন, “কিন্তু এবার আমরা ওর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি নতুন করে তদন্ত করব। কোনও প্রমাণ গোপন থাকবে না।”

৮. সাত মাস পরে

পরবর্তী সাত মাসে অনেক কিছু বদলে গেল।

অদিতি এবং নিবারণ মিলে নীলডাঙা হল্টের ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন। পুরোনো রেলকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলির সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হলো। ১৯৯১ সালের বিশেষ পরিষেবার নথি, ২০০৪ সালের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এবং কয়েকটি গোপন প্রশাসনিক আদেশের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেল।

তদন্তে উঠে এল, দীর্ঘদিন ধরে কিছু মানুষকে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের পরিবারকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি সরকারি নথি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে, কয়েকজন নিখোঁজ, আর কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

তবে ট্রেনটির অস্বাভাবিক ঘটনার কোনও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কিছু বিশেষজ্ঞ একে বিচ্ছিন্ন রেল-দুর্ঘটনা, মানসিক আঘাত এবং ভুল স্মৃতির মিশ্রণ বলে মনে করেছেন। অন্যদিকে কয়েকটি নথিতে এমন সময়ের ব্যবধানের উল্লেখ রয়েছে, যা সাধারণ হিসাবের সঙ্গে মেলেনি।

অদিতি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সব প্রমাণ সংরক্ষণ করার পক্ষে মত দিল।

নিবারণ আর কুসংস্কারকে সত্য বলে মানলেন না। আবার নিজের চোখে দেখা ঘটনাগুলিকেও অকারণে উড়িয়ে দিলেন না।

মধুমিতা ও তিতলির সম্পর্কের বিষয়ে চিকিৎসা ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলো। প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেলেও, পুরোনো রেকর্ডের ঘাটতির কারণে সব প্রশ্নের উত্তর একবারে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু মধুমিতা ও তিতলি সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁরা একসঙ্গে থাকবেন এবং নিজেদের সম্পর্ককে সময় দেবেন।

ঋজুর শারীরিক বয়সের সঙ্গে তার স্মৃতির ব্যবধান ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হলো। সে ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করল। মধুমিতা তাকে কোনও পুরোনো স্মৃতি মনে করতে বাধ্য করলেন না। বরং প্রতিদিন নতুন গল্প শোনালেন, নতুন বই পড়ে শোনালেন, তাকে নিয়ে পার্কে গেলেন।

একদিন ঋজু নিজেই জিজ্ঞাসা করল, “মা, আমি কি আবার বড় হব?”

মধুমিতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তুমি নিজের মতো করে বড় হবে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।”

অরিন্দম ঘোষের অবস্থার বিষয়ে কোনও নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। শেষ সিগন্যাল কক্ষে তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি কোথায় গেলেন, তা জানা যায়নি।

আর সুব্রত চক্রবর্তী?

তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি। তবে নিবারণ প্রতি মাসে একবার তাঁদের পুরোনো বাড়িতে যান। বারান্দার আমগাছটি এখনও বেঁচে আছে। গাছের নীচে একটি বেঞ্চ বসানো হয়েছে। সেখানে বসে তিনি কখনও কখনও দাদার চিঠিটি পড়েন।

৯. শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী

এক বছর পর, ১৭ নভেম্বরের রাতে, নিবারণ শালবন স্টেশনে ডিউটি করছিলেন।

সেই রাতে কোনও বিশেষ ট্রেনের কথা ঘোষণা করা হয়নি। রেলওয়ের রেকর্ডে শেষ লোকাল ট্রেনটির সময় রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

নিবারণ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর পাশে অদিতি। দু’জনেই জানতেন, এই তারিখটি তাঁদের জীবনে আর পাঁচটা দিনের মতো নয়।

ঘড়িতে ১১টা ৪৬।

দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল।

১১টা ৪৭।

শেষ লোকাল ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

যাত্রীরা নামল। কেউ ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে গেল, কেউ রিকশার খোঁজ করল। ট্রেনের শেষ কামরা থেকে এক বৃদ্ধ নামলেন। তাঁর হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ।

বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নেমে নিবারণের দিকে তাকালেন।

“মশাই, শালবন বাজারের রাস্তা কোন দিকে?”

নিবারণ রাস্তা দেখিয়ে দিলেন।

বৃদ্ধ ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলেন।

ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

নিবারণ শেষ কামরার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেখানে কোনও ধূসর কোট পরা মানুষ নেই। কোনও রহস্যময় আলো নেই। কোনও অচেনা ঘোষণা নেই।

শুধু সাধারণ যাত্রীদের একটি সাধারণ ট্রেন।

অদিতি বলল, “আপনি কি মনে করেন, সব শেষ হয়ে গেছে?”

নিবারণ কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলেন, “আমি জানি না। হয়তো ট্রেনটি সত্যিই থেমেছে। হয়তো আমরা এমন কিছু দেখেছিলাম, যার ব্যাখ্যা এখনও পাইনি। কিন্তু আমি একটা বিষয় শিখেছি—কোনও মানুষ নিখোঁজ হলে তাকে শুধু একটা পুরোনো খবরের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তার পরিচয়, তার পরিবার, তার স্মৃতি—সবকিছুর মূল্য আছে।”

তিনি স্টেশনের বড় ঘড়ির দিকে তাকালেন।

ঘড়িতে রাত ১১টা ৪৮ মিনিট।

সময় এগিয়ে চলেছে।

সেই সময়ই তাঁর পকেটে রাখা পুরোনো ফোনটি বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

নিবারণ ফোন ধরলেন।

ওপারে কয়েক সেকেন্ড কোনও শব্দ নেই।

তারপর একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

“নিবারণ?”

নিবারণের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“দাদা?”

ওপারে মৃদু হাসি।

“হ্যাঁ, আমি। তুই কেমন আছিস?”

নিবারণের চোখে জল এসে গেল।

“তুমি কোথায়?”

সুব্রত বললেন, “এবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটা কথা বলি। তুই যে আমগাছটার কথা মনে রেখেছিস, সেটার নীচে কাল সকালে দেখা করব।”

“তুমি ফিরেছ?”

“আমি ফিরেছি কি না, সেটা কাল দেখা হলে বুঝবি।”

ফোন কেটে গেল।

নিবারণ অনেকক্ষণ ফোনটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

অদিতি জিজ্ঞাসা করল, “কে ছিল?”

নিবারণ হাসলেন।

“একজন যাত্রী। যে অবশেষে নিজের গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে।”

তিনি আর কোনও কথা বললেন না।

দূরে রাতের আকাশে কুয়াশা জমছে। রেললাইন ধরে পরের ট্রেনের আলো এগিয়ে আসছে। শালবন স্টেশনের ঘড়ি নির্ভুলভাবে সময় দেখাচ্ছে।

কিন্তু নিবারণ জানতেন, কিছু রহস্যের উত্তর কেবল ঘড়ির কাঁটায় মেলে না। কিছু উত্তর মেলে মানুষের ফিরে আসায়, ক্ষমা চাওয়ায়, আর হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলায়।

শেষ ট্রেনের যাত্রা শেষ হয়েছে কি না, তা হয়তো কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না।

কিন্তু যে মানুষগুলি এত বছর ধরে নিজেদের অতীতের কাছে বন্দি ছিল, তারা অন্তত এবার ভবিষ্যতের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।

আর সেটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ফিরে আসা।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: সময়ের ওপারে যে স্টেশন)।

১. যে ছেলেটিকে কেউ চিনত না

শেষ ট্রেনটি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়ার পরও শালবন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কেউ নড়ল না।

মধুমিতা ঘোষ মাটিতে বসে ছিলেন। তাঁর চোখ রেললাইনের দিকে স্থির। ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরোচ্ছিল না।

তিতলি তাঁর কাঁধে হাত রাখল।

“আপনি বললেন, আপনার ছেলে কখনও ট্রেনে ওঠেনি। কিন্তু অরিত্রবাবু তো বললেন, সে ট্রেনে উঠে গেছে।”

মধুমিতা মুখ তুললেন।

“আমার ছেলে বাইশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।”

নিবারণ চক্রবর্তী স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

“আপনার ছেলে নিখোঁজ হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। ২০০৪ সালের ১৭ নভেম্বর। অরিত্র সেদিন আমাকে ফোন করে বলেছিল, সে একটি শিশুকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, কোনও বিপদে পড়া শিশুকে সাহায্য করছে। পরে সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরদিন সকালে আমার ছেলেও নিখোঁজ হয়ে যায়।”

তিতলি ধীরে ধীরে বলল, “আপনার ছেলের নাম কী ছিল?”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।

“ঋজু। ওর পুরো নাম ছিল ঋজু ঘোষ।”

নিবারণের হাত থেকে অরিত্রের ডায়েরিটি পড়ে গেল।

ঋজু ঘোষ।

নামটি তাঁর অপরিচিত নয়। ডায়েরির একটি পুরোনো পাতায় তিনি এই নাম দেখেছিলেন। নামের পাশে লেখা ছিল—

‘শিশুটিকে বাঁচাতে হলে তাকে সময়ের বাইরে নিয়ে যেতে হবে।’

নিবারণ দ্রুত ডায়েরিটি খুলে পাতাটি বের করলেন।

“এই নামটা অরিত্রের ডায়েরিতে রয়েছে।”

মধুমিতা কাগজটি দেখে কেঁপে উঠলেন।

“এটা অরিত্রের হাতের লেখা। আমি চিনতে পারছি।”

“কিন্তু সে কেন আপনার ছেলেকে সময়ের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা লিখেছিল?”

মধুমিতা মাথা নাড়লেন।

“আমি জানি না। আমি শুধু জানি, অরিত্র আমাকে কথা দিয়েছিল, ঋজুকে সে কিছুতেই বিপদের মুখে পড়তে দেবে না।”

তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি যদি আপনাকে বলি, আমিও হয়তো সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?”

মধুমিতা তার দিকে তাকালেন।

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

তিতলি নিজের ব্যাগ থেকে সেই পুরোনো ছবিটি বের করল। ছবিতে অরিত্রের পাশে একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে। ছেলেটির মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার বাঁ হাতে একটি লাল সুতো বাঁধা।

তিতলি নিজের বাঁ হাতের কবজির দিকে তাকাল। সেখানে বহু পুরোনো একটি দাগ। ছোটবেলা থেকেই সে জানে, তার হাতে একসময় সুতো বাঁধা ছিল। অনাথ আশ্রমে তাকে যখন পাওয়া যায়, তখন তার পোশাকের পকেটে একটি কাগজ ছিল। কাগজে শুধু একটি শব্দ লেখা—

‘ঋজু।’

“আমি জানি না, এই নামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী,” তিতলি বলল। “কিন্তু আমার মনে হয়, আমি যে মানুষটিকে খুঁজছি, সে শুধু আমার পরিবারের কেউ নয়। সে আমার নিজের অতীতের অংশ।”

মধুমিতা তিতলির হাত ধরলেন।

“তুমি আমার ছেলেকে দেখেছ?”

“না। কিন্তু গতকাল যে লোকটি আমাকে চিঠি দিয়েছিল, সে বলেছিল—আমার বাবার শেষ খবর অরিত্রের কাছে আছে।”

মধুমিতা ধীরে বললেন, “তাহলে আমাদের একসঙ্গে সত্যিটা খুঁজতে হবে।”

নিবারণ মাথা নাড়লেন।

“সত্যিটা খুঁজতে হলে প্রথমে জানতে হবে, ওই ট্রেন কোথায় যায়।”

২. হারিয়ে যাওয়া স্টেশনের মানচিত্র

পরদিন সকালেই নিবারণ স্টেশনের পুরোনো নথিঘরে গেলেন। আগের রাতের ঘটনায় তাঁর ঘুম হয়নি। তিনি জানতেন, এই রহস্যের উত্তর সাধারণ রেলওয়ে রেকর্ডে পাওয়া যাবে না। তবু কোনও সূত্র বাদ দিতে চাননি।

২০০৪ সালের নভেম্বর মাসের রেল চলাচলের নথি, সিগন্যাল লগ, ট্রেনের সময়সূচি—সব একে একে পরীক্ষা করতে লাগলেন।

একটি পুরোনো মানচিত্র তাঁর চোখে পড়ল।

মানচিত্রটি ১৯৮৭ সালে তৈরি। শালবন স্টেশনের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মূল লাইনের বাইরে একটি সরু শাখা লাইন দেখানো হয়েছে। সেই লাইনটি জঙ্গলের দিকে গিয়ে শেষ হয়েছে একটি ছোট স্টেশনে।

স্টেশনটির নাম—নীলডাঙা হল্ট।

কিন্তু বর্তমান রেলমানচিত্রে নীলডাঙা হল্টের কোনও অস্তিত্ব নেই।

নিবারণ আরও পুরোনো নথি ঘেঁটে দেখলেন, ১৯৯১ সালে ওই শাখা লাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি কারণ—ভূমিধস এবং যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া।

কিন্তু একটি প্রতিবেদনে অন্য কথা লেখা ছিল।

‘১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে নীলডাঙা হল্টে একটি বিশেষ ট্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ট্রেনটিতে কতজন যাত্রী ছিলেন, তা নিশ্চিত করা যায়নি। পরবর্তী অনুসন্ধানে ট্রেনটির কোনও ধ্বংসাবশেষ বা যাত্রীর সন্ধান মেলেনি।’

প্রতিবেদনটির শেষে লাল কালিতে একটি মন্তব্য—

‘ঘটনাটি প্রকাশ্যে আলোচনা করা যাবে না।’

নিবারণ চেয়ারে বসে পড়লেন।

১৭ নভেম্বর।

ঠিক সেই তারিখেই অরিত্র নিখোঁজ হয়েছিলেন। ঠিক সেই তারিখেই সুব্রত চক্রবর্তী হারিয়ে গিয়েছিলেন। আর গত রাতেও শেষ ট্রেনটি এসেছিল একই তারিখের স্মৃতি বহন করে।

কিন্তু ১৯৯১ সালের ঘটনাটির সঙ্গে ২০০৪ সালের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্ক কী?

তিনি মানচিত্রটি নিয়ে মধুমিতার কাছে গেলেন।

মধুমিতা নথিটি দেখে বললেন, “অরিত্র নীলডাঙা হল্টের কথা জানত। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে সে আমাকে এই নাম বলেছিল। আমি ভেবেছিলাম, কোনও পুরোনো রেলস্টেশন নিয়ে প্রতিবেদন লিখছে।”

“সে কি বলেছিল, সেখানে কী আছে?”

“বলেছিল, কিছু জায়গা মানচিত্র থেকে মুছে গেলেও মানুষের জীবন থেকে মুছে যায় না।”

তিতলি মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলল, “নীলডাঙা হল্ট কি এখনও আছে?”

নিবারণ উত্তর দিলেন, “নথি অনুযায়ী, স্টেশনটি বন্ধ। কিন্তু ১৯৯১ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশেষ ট্রেনটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।”

“তাহলে ট্রেনটি কি এখনও কোথাও চলছে?”

নিবারণ কোনও উত্তর দিলেন না।

কিন্তু তাঁর মনে হচ্ছিল, গত রাতে যে ট্রেনটি শালবন ছেড়ে গিয়েছিল, সেটি কোনও সাধারণ ট্রেন ছিল না। সেটি হয়তো এমন একটি রেলপথ ধরে চলেছে, যা সরকারি মানচিত্রে আর নেই।

৩. সুব্রতর চিঠি

সেদিন বিকেলে নিবারণের বাড়িতে একটি খাম এসে পৌঁছল।

খামের ওপর প্রেরকের নাম নেই। ডাকটিকিটও নেই। অথচ খামটি সিল করা এবং নিবারণের নাম ও ঠিকানা নির্ভুলভাবে লেখা।

ভেতরে একটি চিঠি।

হাতের লেখা দেখে নিবারণ চমকে উঠলেন।

এটি তাঁর বড় ভাই সুব্রতর লেখা।

‘নিবারণ,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝবি, আমি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাইনি।

আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। কিন্তু তুই যে সময়ে আমাকে খুঁজেছিস, আমি সেই সময়ে ছিলাম না।

এখানে দিন আর রাতের হিসাব ঠিকমতো চলে না। কখনও মনে হয়, আমি কয়েক ঘণ্টা এখানে আছি। আবার কখনও জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি, পৃথিবীতে কয়েক বছর কেটে গেছে।

আমি জানি না, এই জায়গাকে কী বলে বোঝাব। এটা কোনও ভূতুড়ে জগৎ নয়। আবার সাধারণ পৃথিবীর মতোও নয়। এখানে এমন মানুষ আছে, যারা বহু বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। কেউ নিজের ইচ্ছায় এসেছে, কেউ বাধ্য হয়ে।

আমি একটি ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের জন্যই আমাকে এখানে থাকতে হচ্ছে।

শেষ ট্রেনের রহস্য জানতে চাইলে অরিত্রকে বিশ্বাস করিস। কিন্তু তার সব কথা বিশ্বাস করিস না।

আর সবচেয়ে জরুরি কথা—ঋজুকে খুঁজে পেলে তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিস।

ওর কোনও দোষ ছিল না।

— তোর দাদা, সুব্রত।’

চিঠিটি পড়ে নিবারণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তাঁর মনে পড়ল, ছোটবেলায় সুব্রত সবসময় তাঁকে বিপদ থেকে বাঁচাতেন। স্কুলে কেউ মারতে এলে দাদা সামনে দাঁড়াতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্বও তিনিই নিয়েছিলেন।

কিন্তু হঠাৎ একদিন কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি হারিয়ে গেলেন।

নিবারণ এত বছর ভেবেছেন, দাদা হয়তো তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন।

আজ প্রথমবার বুঝলেন, হয়তো তিনি নিজের ইচ্ছায় চলে যাননি।

মধুমিতা চিঠিটি পড়ে বললেন, “ঋজুকে খুঁজে পেলে তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে বলেছে। তার মানে সুব্রত আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আমার ছেলের পরিচয় ছিল।”

“কিন্তু কীভাবে?”

তিতলি ধীরে বলল, “হয়তো আমাদের সবাইকে একই ঘটনার বিভিন্ন অংশ জানানো হয়েছে।”

নিবারণ চিঠিটি ভাঁজ করে রাখলেন।

“এবার আমাদের নীলডাঙা হল্টে যেতে হবে।”

৪. জঙ্গলের পথ

শালবন স্টেশন থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে নীলডাঙা হল্টের পুরোনো শাখা লাইনটি জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। বহু বছর ধরে সেখানে কোনও ট্রেন চলেনি। রেললাইনের ওপর গাছপালা জন্মেছে, কোথাও মাটি জমেছে, কোথাও স্লিপার ভেঙে গেছে।

নিবারণ, মধুমিতা, তিতলি এবং অদিতি—যে স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল—একসঙ্গে রওনা দিলেন।

অদিতি নীলডাঙা হল্টের কথা শুনে আগ্রহী হয়েছিল। সে জানাল, ১৯৯১ সালের ঘটনাটির কিছু সংবাদপত্রের কাটিং সে খুঁজে পেয়েছে। সেখানে একটি বিশেষ ট্রেনের উল্লেখ আছে, কিন্তু ট্রেনের নম্বর নেই। যাত্রীদের নামও প্রকাশ করা হয়নি।

জঙ্গলের মধ্যে ঢোকার কিছুক্ষণ পর তারা একটি ভাঙা সাইনবোর্ড দেখতে পেল।

সাইনবোর্ডে মরচে ধরা অক্ষরে লেখা—

নীলডাঙা হল্ট।

প্ল্যাটফর্মটি ছোট। এক পাশে ভাঙা টিকিটঘর, অন্য পাশে আগাছায় ঢাকা একটি বেঞ্চ। স্টেশনের ছাদ প্রায় ভেঙে পড়েছে। তবু প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে একটি ঘড়ি ঝুলছে।

ঘড়িটি থেমে আছে ১১টা ৪৭ মিনিটে।

তিতলি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল, “এখানেও একই সময়।”

অদিতি ঘড়ির নিচে একটি ধাতব ফলক দেখতে পেল। ফলকে লেখা—

‘বিশেষ পরিষেবা: ১৭ নভেম্বর, ১৯৯১। যাত্রীদের পরিচয় গোপন রাখা হবে।’

নিবারণ প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালেন। রেললাইনটি জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তিনি হাঁটু গেড়ে মাটি পরীক্ষা করলেন।

মাটির ওপর নতুন জুতোর ছাপ।

অদিতি বলল, “এখানে সম্প্রতি কেউ এসেছে।”

ছাপগুলি অনুসরণ করে তারা স্টেশনের পেছনের দিকে গেল। সেখানে একটি ছোট ইটের ঘর। দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ, কিন্তু জানলার কাঠ ভাঙা।

ভেতরে ঢুকে তারা দেখল, ঘরটি একসময় সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত হতো। দেওয়ালে একটি পুরোনো বোর্ড, কয়েকটি লিভার এবং মরচে ধরা তার। টেবিলের ওপর ধুলো জমে থাকলেও মাঝখানে একটি পরিষ্কার জায়গা রয়েছে।

সেখানে রাখা একটি খাতা।

খাতাটি খুলতেই দেখা গেল, গত কয়েক মাসের তারিখ লেখা রয়েছে। প্রতিটি তারিখের পাশে একটি করে নাম।

কিছু নামের পাশে লেখা—‘ফিরেছে’।

কিছু নামের পাশে—‘অপেক্ষমাণ’।

আর কয়েকটি নামের পাশে—‘ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়’।

শেষ পাতায় লেখা—

‘পরবর্তী আগমন: ১২ অক্টোবর, ২০২৬। যাত্রী: নিবারণ চক্রবর্তী। সঙ্গে থাকবে তিতলি এবং মধুমিতা ঘোষ।’

অদিতি বিস্ময়ে বলল, “আজকের তারিখ তো ১২ অক্টোবর!”

নিবারণ খাতাটি বন্ধ করলেন।

“তার মানে, আমাদের আসার কথা আগে থেকেই জানা ছিল।”

তিতলি টেবিলের নীচে একটি ছোট বাক্স দেখতে পেল। বাক্সের ভেতরে তিনটি পুরোনো রেলটিকিট।

প্রতিটি টিকিটে একই সময় ছাপা—

২৩:৪৭।

কিন্তু গন্তব্যের জায়গায় তিনটি আলাদা নাম।

নিবারণ চক্রবর্তী।

তিতলি।

মধুমিতা ঘোষ।

তাদের প্রত্যেকের নামের পাশে একটি করে সংখ্যা লেখা—১৭, ০৪ এবং ৯১।

অদিতি বলল, “এগুলো কি যাত্রীর নম্বর?”

ঠিক তখনই ঘরের বাইরে একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।

একবার।

দু’বার।

তিনবার।

সবাই দরজার দিকে তাকাল।

বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা নীলডাঙা হল্টে কোথাও বিদ্যুৎ নেই। কোনও কর্মচারী নেই। কোনও ট্রেনের সময়সূচিও নেই।

তবু ঘণ্টাটি বাজছে।

আর জঙ্গলের গভীর থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইসেল।

৫. যে ট্রেনের কোনও নম্বর নেই

রাত ১১টা ৪৫।

নিবারণরা প্ল্যাটফর্মে ফিরে এলেন।

কুয়াশা এমনভাবে নেমেছে যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। অদিতি মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, ঘড়ির সময়ও বারবার বদলে যাচ্ছে।

১১টা ৪৬।

দূরে আলো দেখা দিল।

ট্রেনের চাকা রেললাইনের ওপর দিয়ে চলার পরিচিত শব্দ শোনা গেল। কিন্তু শব্দটি ক্রমশ কাছে এলেও রেললাইনের ওপর কোনও কম্পন অনুভূত হচ্ছিল না।

১১টা ৪৭।

ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

কামরাগুলি পুরোনো। জানলায় কাঠের ফ্রেম, দরজায় মরচে ধরা হাতল। বাইরে কোনও ট্রেন নম্বর নেই। শুধু ইঞ্জিনের গায়ে সাদা রঙে লেখা—

শেষ পরিষেবা।

প্রথম কামরার দরজা খুলে গেল।

একজন বৃদ্ধ নেমে এলেন। তাঁর পরনে ১৯৯০-এর দশকের পোশাক। তিনি প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই চারদিকে তাকালেন, যেন বহু বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরেছেন।

তারপর আরও কয়েকজন নামলেন।

একজন পুলিশকর্মী, একজন স্কুলশিক্ষক, একজন তরুণী, একজন শ্রমিক। তাঁদের মুখে একই ধরনের বিভ্রান্তি।

একটি ছোট ছেলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

মধুমিতা ছেলেটিকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন।

“ঋজু!”

ছেলেটি মুখ তুলল।

তারপর মধুমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “মা?”

মধুমিতা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি থেমে গেলেন।

ছেলেটির বয়স পাঁচ বছরের বেশি নয়। অথচ মধুমিতার ছেলে নিখোঁজ হয়েছিল বাইশ বছর আগে। আজ তার বয়স হওয়ার কথা সাতাশ।

তিতলি এগিয়ে এল।

ছেলেটি তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসল।

“তুমি এসেছ?”

তিতলি হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “তুমি আমাকে চেনো?”

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

“তুমি আমার সঙ্গে খেলতে। তুমি বলেছিলে, বড় হলে আমরা একসঙ্গে বাড়ি ফিরব।”

তিতলির চোখে জল এসে গেল।

“তোমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল, “ঋজু।”

মধুমিতা ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু তাঁর চোখে আনন্দের পাশাপাশি গভীর আতঙ্ক।

“এটা কীভাবে সম্ভব? তুমি তো বড় হয়ে যাওয়ার কথা!”

ছেলেটি শান্ত গলায় বলল, “আমি তো বড় হইনি, মা। এখানে সময় থেমে আছে।”

নিবারণ এগিয়ে এসে বললেন, “এই ট্রেন কোথা থেকে এসেছে?”

ছেলেটি রেললাইনের অন্ধকারের দিকে তাকাল।

“যেখান থেকে সবাই ফিরে যেতে চায়।”

“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”

“অরিত্র কাকু আমাকে নিয়ে এসেছিল। বলেছিল, কিছুক্ষণের জন্য এখানে থাকতে হবে। তারপর আমাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবে।”

মধুমিতা ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, “অরিত্র কোথায়?”

ছেলেটি শেষ কামরার দিকে আঙুল দেখাল।

“ওখানে।”

নিবারণ শেষ কামরার দিকে এগোলেন।

কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে তিনি দেখলেন, কামরার ভেতর অন্ধকার। একটি বেঞ্চের ওপর বসে আছেন তাঁর বড় ভাই সুব্রত।

একই মুখ। একই চোখ। যেন বাইশ বছর নয়, মাত্র কয়েক দিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন।

নিবারণের গলা আটকে গেল।

“দাদা?”

সুব্রত উঠে দাঁড়ালেন।

“নিবারণ, তুই বড় হয়ে গেছিস।”

নিবারণের চোখ ভিজে উঠল।

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”

সুব্রত ধীরে বললেন, “যে জায়গায় গেলে মানুষ নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে না।”

“তুমি বাড়ি ফিরবে না?”

“ফিরব। কিন্তু তার আগে একটা কাজ বাকি আছে।”

“কী কাজ?”

সুব্রত জানলার বাইরে তাকালেন।

“এই ট্রেনটাকে থামাতে হবে।”

৬. অরিত্রের আসল উদ্দেশ্য

সুব্রত নিবারণকে কামরার ভেতরে বসতে বললেন। তিতলি এবং অদিতিও তাঁদের সঙ্গে ঢুকল। মধুমিতা ঋজুকে নিয়ে পাশের বেঞ্চে বসে রইলেন।

কামরার ভেতরে একটি ছোট টেবিল। টেবিলের ওপর রেলওয়ের পুরোনো নথি, কয়েকটি ছবি এবং একটি হাতঘড়ি রাখা।

সুব্রত বললেন, “তুই ভাবছিস, এই ট্রেন মানুষকে সময়ের বাইরে নিয়ে যায়। আসলে বিষয়টা তার চেয়েও জটিল।”

অদিতি প্রশ্ন করল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, সময় সত্যিই এখানে থেমে যায়?”

“না। আমি বলতে চাইছি, আমরা যা দেখছি, তার সবকিছুর ব্যাখ্যা এখনও আমাদের জানা নেই। এই ট্রেনের যাত্রীরা বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ হয়েছে। কেউ কয়েক ঘণ্টার জন্য, কেউ কয়েক দশকের জন্য। কিন্তু তারা এখানে যে সময় কাটায়, তা বাইরের পৃথিবীর সময়ের সঙ্গে মেলে না।”

নিবারণ বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”

সুব্রত মাথা নাড়লেন।

“আমি জানি না। প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা কোনও গোপন রেল প্রকল্প। পরে বুঝলাম, এখানে কিছু ঘটনা ঘটছে, যা প্রচলিত ব্যাখ্যায় মেলানো কঠিন। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—কেউ এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে।”

“কে?”

“একটি গোপন দল। তারা এমন মানুষদের বেছে নিত, যাদের নিখোঁজ হওয়ার পর কেউ খুব বেশি খোঁজ করবে না। কখনও তাদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে, কখনও দুর্ঘটনার গল্প সাজিয়ে এই ট্রেনে তুলে দেওয়া হতো। তাদের মধ্যে কেউ ফিরে এসেছে, কেউ আর ফেরেনি।”

অদিতি বলল, “কিন্তু অরিত্র কেন এতে জড়াল?”

“অরিত্র প্রথমে সাংবাদিক হিসেবে তদন্ত করতে এসেছিল। সে জানতে পেরেছিল, এই ট্রেনের সাহায্যে মানুষকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সে প্রমাণ সংগ্রহ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে সে ঋজুকে খুঁজে পায়। শিশুটিকে একটি পরীক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।”

মধুমিতা দূর থেকে কথাগুলি শুনছিলেন।

“কীসের পরীক্ষা?”

সুব্রত বললেন, “১৯৯১ সালে নীলডাঙা হল্টে একটি বিশেষ রেল-পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সরকারি উদ্দেশ্য ছিল দূরবর্তী রেলপথে স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা। কিন্তু প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মানুষ এমন একটি অজানা ঘটনার মুখোমুখি হয়, যার পর ট্রেনটি নিখোঁজ হয়। পরে প্রকল্পটি বন্ধ করা হয়। কিছু মানুষ সেই ঘটনাকে গোপন রাখার জন্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় বদলে দেয়, কিছু নথি নষ্ট করে।”

“তাহলে এই ট্রেন কি ১৯৯১ সাল থেকেই চলছে?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।

“ট্রেনটি যে সব সময় একইভাবে চলছে, তা বলা যাবে না। কখনও এটি দেখা যায়, কখনও যায় না। কিছু মানুষ এতে উঠতে পারে, কিন্তু কোথায় নামবে তা জানে না। আর যারা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, তারা নিজেরাই এর মধ্যে আটকে পড়েছে।”

নিবারণ ভাইয়ের দিকে তাকালেন।

“তুমি কীভাবে উঠেছিলে?”

সুব্রত বললেন, “আমি অরিত্রকে সাহায্য করছিলাম। সে যখন বুঝল, ঋজুকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, তখন তাকে নিরাপদ রাখার জন্য এখানে নিয়ে আসে। আমি তাদের সঙ্গে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে যাব। কিন্তু ট্রেনটি ছাড়ার পর আর স্বাভাবিক পৃথিবীতে ফিরতে পারিনি।”

“তুমি এত বছর এখানে ছিলে?”

“আমার কাছে হয়তো কয়েক মাস। কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে বাইশ বছর কেটে গেছে।”

নিবারণ মাথা নিচু করলেন।

“তাহলে কি তুমিও আর ফিরতে পারবে না?”

সুব্রত উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার দরজায় অরিত্র এসে দাঁড়াল।

তার হাতে একটি কালো ডায়েরি।

“ফিরতে পারবে,” অরিত্র বলল। “কিন্তু সবাই নয়।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

অরিত্র বলল, “এই ট্রেনের যাত্রা শেষ করতে হলে এমন একজনকে থাকতে হবে, যে শেষবারের মতো সিগন্যাল চালু করবে।”

“মানে?” নিবারণ প্রশ্ন করলেন।

“এই ট্রেন যখন নীলডাঙা হল্টে ফিরে আসবে, তখন সিগন্যাল কক্ষে একটি লিভার টানতে হবে। লিভারটি টানলে ট্রেনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। যারা ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে, তারা নিজেদের সময়ে ফিরে যাবে। কিন্তু যে লিভার টানবে, সে হয়তো আর ফিরতে পারবে না।”

মধুমিতা উঠে দাঁড়ালেন।

“আপনি কি এতদিন ধরে এটাই করতে চাইছেন?”

অরিত্র মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আমি ঋজুকে ফিরিয়ে দিতে চাই। আর যারা এই ট্রেনের মধ্যে আটকে আছে, তাদেরও মুক্ত করতে চাই।”

তিতলি বলল, “কিন্তু আপনি নিজে কেন লিভার টানছেন না?”

অরিত্র তার দিকে তাকাল।

“কারণ আমার এখনও একটা কাজ বাকি।”

“কী কাজ?”

অরিত্র উত্তর দিল না।

তার চোখ চলে গেল কামরার শেষ প্রান্তে।

সেখানে একটি দরজা ধীরে ধীরে খুলছে।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ।

তার মুখ অরিত্রের মতোই।

কিন্তু চোখে কোনও ক্লান্তি নেই।

বরং অদ্ভুত এক শীতল হাসি।

লোকটি বলল, “অরিত্র, এতদিন পরেও তুমি একই ভুল করছ।”

অরিত্রের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”

লোকটি হাসল।

“এই ট্রেন আমার তৈরি। তুমি ভেবেছিলে, তুমি একে থামাতে পারবে?”

নিবারণ লোকটির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, তার মুখটি অরিত্রের মতো হলেও সে অরিত্র নয়।

লোকটি নিজের পরিচয় দিল।

“আমার নাম অরিন্দম সেন। আর তোমরা যে সত্যিটা এতদিন ধরে খুঁজছ, তার অর্ধেকও তোমাদের জানা নেই।”

তারপর সে টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ছবি রাখল।

ছবিতে ১৯৯১ সালের নীলডাঙা হল্ট।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন রেলকর্মী। তাঁদের মাঝখানে একটি ছোট ছেলে।

ছেলেটির মুখ স্পষ্ট।

সে ঋজু নয়।

তিতলিও নয়।

ছেলেটি অরিত্র।

ছবির পেছনে লেখা—

‘প্রথম যাত্রী: অরিত্র সেন। বয়স: পাঁচ বছর।’

কামরার মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

মধুমিতা ফিসফিস করে বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”

অরিন্দম সেন হাসল।

“কারণ অরিত্রের গল্প তোমরা যেভাবে জানো, তা সত্যি নয়। সে বাইশ বছর আগে নিখোঁজ হয়নি। সে এই ট্রেনে উঠেছিল পাঁচ বছর বয়সে। আর তোমরা যে মানুষটিকে অরিত্র বলে চিনছ, সে আসলে সেই শিশুটির বড় হয়ে যাওয়া রূপ নয়।”

নিবারণ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।

“তাহলে সে কে?”

অরিন্দম সেন ধীরে ধীরে বলল—

“সে এমন একজন, যার জন্মই হয়েছিল এই ট্রেনের রহস্যকে আড়াল করার জন্য।”

অরিত্র চিৎকার করে উঠল, “চুপ করো!”

কিন্তু ততক্ষণে ট্রেনের সব আলো নিভে গেছে।

কামরার জানলার বাইরে অন্ধকারের মধ্যে একটি নতুন স্টেশনের নাম ভেসে উঠল।

শালবন—১৭ নভেম্বর, ২০০৪।

আর স্পিকারে ঘোষণা শোনা গেল—

“পরবর্তী স্টেশন: যাত্রার প্রথম দিন। সকল যাত্রীকে নিজ নিজ পরিচয় যাচাই করার অনুরোধ করা হচ্ছে।”

নিবারণ বুঝতে পারলেন, তাঁদের সামনে এখন আরও ভয়ংকর রহস্য অপেক্ষা করছে।

কারণ এই ট্রেন শুধু মানুষকে হারিয়ে দেয় না।

এটি মানুষের অতীতকেও বদলে দিতে পারে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (প্রথম পর্ব: যে লোকটি স্টেশনে নামেনি(।

১. রাত ১১টা ৪৭

রাতের শেষ লোকাল ট্রেনটি যখন শালবন স্টেশনে ঢুকল, তখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে কেউই জানত না, কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত রহস্যের মুখোমুখি হতে হবে।

শীতের রাত। কুয়াশায় ঢেকে গেছে রেললাইন। দূরের সিগন্যালের লাল আলোটি কুয়াশার মধ্যে জ্বলন্ত চোখের মতো দেখাচ্ছে। স্টেশনের ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

ট্রেনটি হাওড়া থেকে ছেড়ে আসা শেষ লোকাল। কামরাগুলিতে যাত্রী প্রায় নেই বললেই চলে। দু-একজন শ্রমিক, ঘুমন্ত এক বৃদ্ধ, জানলার পাশে বসে থাকা কলেজপড়ুয়া মেয়ে আর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোক।

ট্রেন থামতেই স্টেশনমাস্টার নিবারণ চক্রবর্তী ঘড়ির দিকে তাকালেন।

প্রতিদিনের মতোই ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মিনিট দেরিতে এসেছে।

কিন্তু আজ একটি বিষয় তাঁর চোখে পড়ল।

শেষ কামরার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি নামল না।

লোকটির গায়ে ধূসর রঙের কোট, মাথায় কালো টুপি। হাতে একটি পুরোনো চামড়ার সুটকেস। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ট্রেন থামার পরও তার মধ্যে কোনও নড়াচড়া দেখা গেল না।

নিবারণ চিৎকার করে বললেন, “এই যে, নামবেন না?”

লোকটি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।

তার চোখে এমন এক ধরনের ক্লান্তি ছিল, যেন সে বহু বছর ধরে ঘুমোয়নি।

সে শুধু বলল, “এখানে নামা যাবে না।”

“কেন? এটা তো আপনার গন্তব্য নয়?”

লোকটি উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণের মধ্যে গার্ডের বাঁশি বাজল। ট্রেন আবার চলতে শুরু করল। নিবারণ হাত তুলে সংকেত দিলেন। ট্রেনটি ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।

তারপর তিনি প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ট্রেন চলে যাওয়ার পরও সেখানে একটি চামড়ার সুটকেস পড়ে রয়েছে।

লোকটির সুটকেস।

নিবারণ এগিয়ে গিয়ে সেটি তুলে নিলেন।

সুটকেসের হাতলে একটি ছোট সাদা ট্যাগ লাগানো। সেখানে কালো কালিতে লেখা—

অরিত্র সেন।

নিবারণ নামটি পড়ে থমকে গেলেন।

এই নাম তিনি আগে শুনেছেন।

অনেক বছর আগে।

প্রায় বাইশ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক তরুণ সাংবাদিকের নাম ছিল অরিত্র সেন।

আর সেই সাংবাদিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শালবন স্টেশনেরই এক পুরোনো রহস্য।

২. নিখোঁজ সাংবাদিক

অরিত্র সেন তখন তিরিশ বছরের তরুণ সাংবাদিক। কলকাতার একটি সংবাদপত্রে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লিখতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখার জন্য তাঁর সুনাম ছিল। পুলিশের কাছে পৌঁছনোর আগেই তিনি অনেক সময় এমন তথ্য জোগাড় করে ফেলতেন, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

বাইশ বছর আগে, ২০০৪ সালের ১৭ নভেম্বর, অরিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ খবরের সূত্র পেয়েছিলেন।

খবরটি ছিল শালবন এলাকার একটি পুরোনো রেলগুদামকে কেন্দ্র করে। সরকারি নথিতে গুদামটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে বলে উল্লেখ থাকলেও, রাতের অন্ধকারে সেখানে নিয়মিত কিছু মালপত্র আনা-নেওয়া হতো। গ্রামের মানুষ মাঝেমধ্যে অচেনা গাড়ি দেখতে পেতেন। কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস করতেন না।

অরিত্র খবরটি অনুসন্ধান করতে শালবনে এসেছিলেন।

সেই রাতে তিনি শেষবার ফোন করেছিলেন তাঁর সহকর্মী মধুমিতা ঘোষকে।

ফোনে অরিত্র বলেছিলেন, “যদি কাল সকালের মধ্যে আমার কোনও খবর না পাও, তাহলে শালবন স্টেশনের পুরোনো রেজিস্টারটা খুঁজবে। সেখানে এমন কিছু আছে, যা কেউ মুছে ফেলতে পারেনি।”

মধুমিতা জানতে চেয়েছিলেন, “তুমি কোথায়?”

অরিত্র বলেছিলেন, “স্টেশনে। একটা ট্রেন আসছে।”

তারপর ফোন কেটে যায়।

পরদিন অরিত্র আর কলকাতায় ফেরেননি।

তাঁর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল। শালবনের আশপাশের পুকুর, জঙ্গল, পরিত্যক্ত বাড়ি—সব জায়গায় খোঁজ করা হয়। কিন্তু অরিত্রের কোনও সন্ধান মেলেনি।

কয়েক মাস পরে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সংবাদপত্রের ছোট একটি খবর হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তাঁকে ভুলে যায়।

শুধু মধুমিতা ভোলেননি।

তিনি বহু বছর ধরে অরিত্রের শেষ ফোনের কথাগুলি মনে রেখেছিলেন।

বিশেষ করে সেই কথাটি—

‘শালবন স্টেশনের পুরোনো রেজিস্টারটা খুঁজবে।’

কিন্তু স্টেশনের রেজিস্টারে কী এমন ছিল, যার জন্য অরিত্র নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন?

সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানত না।

৩. স্টেশনমাস্টারের অস্বস্তি

সুটকেসটি নিয়ে নিবারণ চক্রবর্তী স্টেশনমাস্টারের ঘরে ফিরলেন।

ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ক্যালেন্ডার, কাঠের টেবিল, কয়েকটি রেজিস্টার আর একটি ছোট বৈদ্যুতিক হিটার। জানলার বাইরে রেললাইনের ওপর কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে।

নিবারণ সুটকেসটি টেবিলের ওপর রাখলেন।

তারপর আবার নামের ট্যাগটি দেখলেন।

অরিত্র সেন।

তিনি নিজের মনে বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”

অরিত্র সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন বাইশ বছর আগে। তাঁর বয়স এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু একটু আগে ট্রেনে যে লোকটিকে দেখলেন, তার চেহারা যেন তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি নয়।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়, লোকটির চোখে এমন একটা পরিচিত ভাব ছিল, যা নিবারণকে বহু বছর আগের একটি রাতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

সেই রাতেও শেষ ট্রেনটি এসেছিল ১১টা ৪৭ মিনিটে।

সেই রাতেও এক ব্যক্তি শেষ কামরা থেকে নামেননি।

আর পরদিন সকালে স্টেশনের পাশের ঝোপে পাওয়া গিয়েছিল রক্তমাখা একটি শার্ট।

সেই ঘটনার পর স্টেশনের পুরোনো রেজিস্টারের একটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল।

নিবারণ তখন এই স্টেশনে কর্মরত ছিলেন না। তিনি এসেছিলেন ঘটনার প্রায় তিন বছর পরে। কিন্তু তাঁর পূর্বসূরি একদিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে বলেছিলেন, “শালবনে রাতের শেষ ট্রেনকে কখনও হালকাভাবে নিও না। কখনও কখনও ট্রেন এমন যাত্রী নিয়ে আসে, যারা বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছে।”

নিবারণ তখন কথাটিকে নিছক কুসংস্কার ভেবেছিলেন।

আজ আর তা ভাবতে পারলেন না।

তিনি সুটকেসের তালা পরীক্ষা করলেন। তালাটি খোলা ছিল।

সুটকেসের ভেতরে ছিল তিনটি জিনিস—একটি পুরোনো ক্যামেরা, একটি কালো ডায়েরি এবং একটি খাম।

খামের ওপরে লেখা—

স্টেশনমাস্টার নিবারণ চক্রবর্তীর জন্য।

নিবারণের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

তিনি তো অরিত্রকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। বাইশ বছর আগে এই স্টেশনে তিনি চাকরিও করতেন না। তাহলে অরিত্রের সুটকেসে তাঁর নাম লেখা খাম এল কীভাবে?

তিনি ধীরে ধীরে খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট কাগজ।

মাত্র দুটি লাইন।

‘আপনি যদি এই চিঠি পড়েন, তাহলে বুঝবেন আমি আবার ফিরে এসেছি।

পুরোনো রেজিস্টারের ১৭ নভেম্বরের পাতাটি খুঁজুন।’

নীচে স্বাক্ষর—

অরিত্র সেন।

৪. মধুমিতার ফোন

পরদিন সকাল আটটায় নিবারণ কলকাতার একটি পুরোনো নম্বরে ফোন করলেন। নম্বরটি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন স্টেশনের রেকর্ডে সংরক্ষিত একটি সংবাদপত্রের যোগাযোগের তালিকা থেকে।

ফোনের ওপারে এক মহিলা উত্তর দিলেন।

“হ্যালো?”

“আমি কি মধুমিতা ঘোষের সঙ্গে কথা বলছি?”

“বলছি। আপনি কে?”

“আমি শালবন স্টেশনের স্টেশনমাস্টার নিবারণ চক্রবর্তী। আপনার পরিচিত অরিত্র সেনের সম্পর্কে কিছু কথা ছিল।”

ওপারে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর মহিলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“অরিত্রের সম্পর্কে? এত বছর পরে?”

“গত রাতে একটি লোক শেষ ট্রেনে এসেছিল। তার সুটকেসে অরিত্র সেনের নাম লেখা ছিল।”

“লোকটিকে আপনি দেখেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“সে দেখতে কেমন?”

নিবারণ লোকটির চেহারার বর্ণনা দিলেন।

সব শুনে মধুমিতা বললেন, “আপনি কি নিশ্চিত, তার বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মতো?”

“হ্যাঁ।”

“তার ডান ভ্রুর ওপর কি একটা ছোট কাটা দাগ ছিল?”

নিবারণ চমকে উঠলেন।

“ছিল।”

ফোনের ওপারে মধুমিতা নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করলেন।

“ও অরিত্রই। আমি জানতাম, একদিন ও ফিরবে।”

নিবারণ হতবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু বাইশ বছর ধরে নিখোঁজ একজন মানুষ কীভাবে একই বয়সের থাকতে পারে?”

মধুমিতা উত্তর দিলেন না।

কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন, “আমি আজই শালবনে আসছি। সুটকেসটা কাউকে দেবেন না। আর একটা কথা—ও যদি আবার ফিরে আসে, ওকে কোনওভাবেই স্টেশন ছেড়ে যেতে দেবেন না।”

“কেন?”

মধুমিতা ফিসফিস করে বললেন, “কারণ অরিত্র একবার আমাকে বলেছিল, সে যদি কোনও দিন ফিরে আসে, তাহলে হয়তো সে আর আগের মানুষ থাকবে না।”

ফোন কেটে গেল।

নিবারণ জানলার বাইরে তাকালেন।

দূরে একটি মালগাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার শেষ কামরাটি পার হওয়ার সময় তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, একটি জানলার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

ধূসর কোট।

কালো টুপি।

আর সেই একই মুখ।

নিবারণ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

মালগাড়িটি ইতিমধ্যে অনেক দূরে চলে গেছে।

৫. পুরোনো রেজিস্টার

শালবন স্টেশনের নথিঘরটি ছিল প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে। ছোট একটি ঘর, যেখানে বহু পুরোনো কাগজপত্র, বাতিল টিকিট, স্টেশন ডায়েরি ও যাত্রীসংক্রান্ত নথি জমা করে রাখা হতো।

ঘরটির চাবি ছিল নিবারণের কাছে।

তিনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। ধুলোয় ঢাকা তাক থেকে ২০০৪ সালের রেজিস্টারটি নামাতে বেশ কিছু সময় লাগল।

রেজিস্টারের পাতাগুলি হলদে হয়ে গেছে। কোথাও কালি ছড়িয়ে পড়েছে, কোথাও ইঁদুরে কাগজ কেটেছে।

তিনি নভেম্বর মাসের অংশ খুঁজে বের করলেন।

১৭ নভেম্বরের পাতাটি মাঝখান থেকে ছেঁড়া।

কেউ খুব সাবধানে পাতা ছেঁড়েনি। কাগজের গোড়ায় আঁশ উঠে রয়েছে। বোঝা যায়, জোর করে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল।

কিন্তু পাতার আগের ও পরের অংশে কিছু অস্পষ্ট লেখা রয়ে গেছে।

১৬ নভেম্বরের শেষ এন্ট্রিতে লেখা—

‘রাত ২৩:৪৭। শেষ লোকাল। অতিরিক্ত যাত্রী—১। গন্তব্য অজ্ঞাত।’

১৮ নভেম্বরের প্রথম এন্ট্রিতে লেখা—

‘রাত ০০:১২। প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করার সময় একটি কালো ব্যাগ উদ্ধার। কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

নিবারণ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

১৭ নভেম্বরের পাতা ছেঁড়া, কিন্তু ১৬ নভেম্বরের শেষ ট্রেনের সময় এবং অতিরিক্ত যাত্রীর উল্লেখ রয়েছে।

তিনি পাতা উল্টে দেখলেন। রেজিস্টারের পেছনের দিকে একটি পাতার কোণে পেন্সিলে লেখা কয়েকটি শব্দ।

‘শেষ ট্রেনের যাত্রী—নাম লেখা যাবে না।’

নীচে একটি তারিখ—১৭/১১/২০০৪।

তারপর আরও ছোট করে লেখা—

‘যদি সে আবার আসে, ২৩:৪৭-এ ঘড়ি থামিয়ে দেবে।’

নিবারণ ঘড়ির দিকে তাকালেন।

স্টেশনের বড় ঘড়িটি তখন সকাল ৮টা ৩৬ মিনিট দেখাচ্ছে।

তিনি জানতেন না, এই কথার অর্থ কী।

কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হলো, ঘড়িটি যেন কেবল সময় দেখানোর যন্ত্র নয়। এই স্টেশনে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

তিনি রেজিস্টারটি নিয়ে স্টেশনমাস্টারের ঘরে ফিরে এলেন। টেবিলের ওপর অরিত্রের কালো ডায়েরিটি রাখা ছিল।

এবার তিনি সেটি খুললেন।

প্রথম কয়েকটি পাতায় সাধারণ নোট—ট্রেনের সময়, কয়েকজনের নাম, গুদামের ঠিকানা, কিছু ফোন নম্বর। তারপর একটি পাতায় লেখা—

‘শালবন স্টেশনে একই রাত দু’বার ঘটে। প্রথমবার আমরা ঘটনাটি দেখি। দ্বিতীয়বার আমরা তার পরিণতি দেখি।’

পরের পাতায়—

‘যে লোকটি শেষ ট্রেনে ওঠে, সে আসলে কোথাও যায় না। সে শুধু ফিরে আসে সেই জায়গায়, যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল।’

আরও কয়েকটি পাতা উল্টে নিবারণ একটি নাম দেখতে পেলেন।

সুব্রত চক্রবর্তী।

নামটি পড়েই তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সুব্রত ছিলেন তাঁর বড় ভাই।

বাইশ বছর আগে, ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে, সুব্রত হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবারকে বলা হয়েছিল, তিনি কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে চলে গেছেন। কিন্তু কোনও চিঠি, ফোন বা খবর আর কখনও আসেনি।

নিবারণ তখন তরুণ। তিনি বহুবার ভাইকে খুঁজেছেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন।

ডায়েরির পাতায় সুব্রতর নামের পাশে লেখা—

‘শেষ ট্রেনের যাত্রীকে থামাতে গিয়ে সুব্রত নিখোঁজ। তার শরীর পাওয়া যায়নি। সে মৃত নয়—এ কথাও প্রমাণ করা যায়নি।’

নিবারণ টেবিলের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন।

অরিত্র সেনের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্ক আছে?

তাহলে কি সেই রাতেই সুব্রত শেষ ট্রেনে উঠেছিলেন?

আর অরিত্র কেন তাঁর নাম নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন?

৬. যে মেয়েটি প্রতিদিন অপেক্ষা করে

সেদিন দুপুরে নিবারণ স্টেশন থেকে বেরিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গেলেন। স্টেশন চত্বরে একটি মেয়ে প্রায় প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে এসে বসে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। সাধারণ পোশাক, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। সে কাউকে বিরক্ত করে না, কারও সঙ্গে বেশি কথা বলে না। ট্রেন এলে যাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মেয়েটির নাম তিতলি।

নিবারণ বহুবার তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, সে কার জন্য অপেক্ষা করে। প্রতিবারই তিতলি হেসে বলেছে, “একজন আসবে।”

“কে আসবে?”

“যাকে আমি কোনও দিন দেখিনি।”

প্রথমবার শুনে নিবারণ ভেবেছিলেন, মেয়েটি হয়তো মানসিকভাবে অসুস্থ। পরে জানতে পেরেছিলেন, তিতলি ছোটবেলায় স্টেশনের কাছেই এক অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। তার বাবা-মা সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই।

সেদিন নিবারণ তিতলিকে ডেকে বললেন, “তুমি কি অরিত্র সেন নামটা শুনেছ?”

তিতলি প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে এক তরুণ পুরুষ। গায়ে ধূসর কোট, মাথায় কালো টুপি। ডান ভ্রুর ওপর ছোট একটি কাটা দাগ।

নিবারণ ছবিটি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

এটি সেই লোকটির ছবি, যাকে তিনি আগের রাতে শেষ ট্রেনে দেখেছিলেন।

তিতলি বলল, “এই মানুষটা আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল।”

“কবে?”

“গতকাল।”

“তুমি তাকে কোথায় দেখেছিলে?”

“স্টেশনের বাইরে। আমি যখন বাড়ি ফিরছিলাম, তখন সে আমাকে ডেকে বলল, আমার কাছে যেন এই ছবিটা থাকে। তারপর বলল, ‘যদি রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে শেষ ট্রেন আসে, তাহলে প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসে থাকবে। কাউকে বিশ্বাস করবে না।’”

নিবারণ তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর?”

“তারপর লোকটা চলে যায়। আমি আর তাকে দেখিনি।”

“তুমি কি তাকে আগে চিনতে?”

তিতলি মাথা নাড়ল।

“না। কিন্তু ছবিটা দেখে মনে হয়েছিল, আমি তাকে অনেক দিন ধরে চিনি।”

নিবারণ বললেন, “তোমার কাছে যে চিঠিটা আছে, সেটা আমাকে দেখাবে?”

তিতলি ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করল।

চিঠিতে লেখা—

‘তিতলি,

তুমি যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছ, তার উত্তর শালবন স্টেশনে আছে। কিন্তু মনে রেখো, তোমার জন্মের গল্প তোমাকে যারা বলেছে, তাদের কেউই পুরো সত্য জানে না।

শেষ ট্রেন যখন আসবে, তখন প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসবে।

যে মানুষটি তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে, সে তোমার বাবা নয়। কিন্তু তার কাছেই তোমার বাবার শেষ খবর আছে।

— অরিত্র।’

চিঠিটি পড়ে নিবারণ তিতলির দিকে তাকালেন।

“তুমি কি জানো, তোমার বাবা কে?”

তিতলি মাথা নাড়ল।

“না। অনাথ আশ্রমে আমাকে পাওয়া গিয়েছিল বলে শুনেছি। আমার নামও নাকি আশ্রমের এক কর্মী রেখেছিলেন।”

“কবে?”

“২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে। ঠিক কোন তারিখ, তা কেউ বলতে পারেনি।”

নিবারণের হাত থেকে চিঠিটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

২০০৪ সালের নভেম্বর।

অরিত্র সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন সেই মাসেই। সুব্রত চক্রবর্তীও নিখোঁজ হয়েছিলেন সেই সময়।

আর এখন সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত একটি মেয়ে প্রতিদিন স্টেশনে এসে অপেক্ষা করে।

নিবারণ হঠাৎ বুঝতে পারলেন, এই রহস্য কেবল অরিত্রের নয়। তাঁর নিজের পরিবারের ইতিহাসও এর মধ্যে জড়িয়ে আছে।

৭. রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে

সেদিন রাতে নিবারণ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি স্টেশন ছেড়ে যাবেন না।

মধুমিতা তখনও এসে পৌঁছননি। তিনি ফোনে জানিয়েছেন, সন্ধ্যার মধ্যে রওনা দেবেন। কিন্তু কোনও কারণে তাঁর ট্রেন দেরি হয়েছে।

তিতলি প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসে আছে। তার পাশে নিবারণ। হাতে অরিত্রের ডায়েরি।

রাত ১১টা ৪০।

কুয়াশা ঘন হচ্ছে।

রাত ১১টা ৪৫।

দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

নিবারণ উঠে দাঁড়ালেন। তিনি স্টেশনের বড় ঘড়ির দিকে তাকালেন।

ঘড়িতে ১১টা ৪৬।

তারপর ১১টা ৪৭।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—ঘড়ির কাঁটা সেখানেই থেমে গেল।

একই সময়ে রেললাইনের দূরে দুটি সাদা আলো দেখা দিল। আলো দুটি ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। ট্রেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু শব্দের মধ্যে যেন কোনও ভার নেই। যেন একটি ট্রেন বাস্তবের রেললাইনের ওপর দিয়ে নয়, কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে।

তিতলি উঠে দাঁড়াল।

“ও আসছে,” সে বলল।

“কে?”

তিতলি উত্তর দিল না।

ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

সব কামরার আলো নিভে আছে। শুধু শেষ কামরার একটি জানলায় আলো জ্বলছে।

সেই জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অরিত্র সেন।

তার মুখে কোনও বিস্ময় নেই। যেন সে জানত, নিবারণ এবং তিতলি তার জন্য অপেক্ষা করবে।

দরজাটি খুলে গেল।

অরিত্র প্ল্যাটফর্মে নামল না।

সে জানলার ভেতর থেকে একটি কাগজ বাইরে ছুড়ে দিল। কাগজটি উড়ে এসে নিবারণের পায়ের কাছে পড়ল।

নিবারণ কাগজটি তুলে নিলেন।

তাতে লেখা—

‘নিবারণ, তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে আজ রাতেই শেষ কামরায় ওঠো। কিন্তু সাবধান—ট্রেন থেকে নামার পর তুমি যে পৃথিবীতে ফিরবে, সেটি হয়তো তোমার পরিচিত পৃথিবী হবে না।’

নিবারণ কাগজটি পড়ে তিতলির দিকে তাকালেন।

“তুমি কি আমার সঙ্গে আসবে?”

তিতলি বলল, “আমি এত বছর ধরে এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করেছি।”

নিবারণ এক পা এগিয়ে ট্রেনের দরজার দিকে গেলেন।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“ওই ট্রেনে উঠবেন না!”

দু’জনেই ঘুরে তাকালেন।

প্ল্যাটফর্মের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা। হাতে ছোট ব্যাগ, মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক।

তিনি মধুমিতা ঘোষ।

“আপনারা যদি ওই ট্রেনে ওঠেন,” তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “তাহলে হয়তো আর ফিরতে পারবেন না।”

নিবারণ বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি জানেন, ওই ট্রেনে কী আছে?”

মধুমিতা অরিত্রের দিকে তাকালেন।

“আমি জানি, এই ট্রেনের যাত্রীরা সবাই একই সময়ের মানুষ নয়। কেউ বাইশ বছর আগের, কেউ আজকের। আর কেউ কেউ এমন একটি সময় থেকে আসে, যার কথা আমরা এখনও জানি না।”

অরিত্র জানলার ভেতর থেকে মৃদু হাসল।

তারপর সে এমন একটি কথা বলল, যা শুনে মধুমিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“মধু, তুমি দেরি করে ফেলেছ। তোমার ছেলেও ট্রেনে উঠে গেছে।”

মধুমিতা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “না! আমার ছেলে তো কখনও—”

কথা শেষ করার আগেই ট্রেনের শেষ কামরার অন্য একটি জানলায় আলো জ্বলে উঠল।

সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর।

তার মুখ মধুমিতার মতো, চোখ দুটি অরিত্রের মতো।

কিশোরটি জানলার কাচে হাত রেখে বাইরে তাকিয়ে আছে।

তার ঠোঁট নড়ছে।

কাচের ওপার থেকে শব্দ শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে নিবারণ বুঝতে পারলেন, ছেলেটি বলছে—

‘মা, আমাকে নামিয়ে নাও।’

পরের মুহূর্তেই ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।

ঘড়ির কাঁটা আবার চলতে শুরু করল।

আর ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল।

মধুমিতা মাটিতে বসে পড়লেন।

তিতলি তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

নিবারণ রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি জানতেন, আজ রাতের পর আর কোনও কিছু আগের মতো থাকবে না।

কারণ শেষ ট্রেনটি এবার শুধু একজন নিখোঁজ মানুষকে নিয়ে আসেনি।

সে নিয়ে গেছে এমন এক যাত্রীকে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ জানত না।

আর সেই যাত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবার তাদেরই উঠতে হবে সেই ট্রেনে।

চলবে…

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

যে মেয়েটি দাবার বোর্ডে নিজের ভাগ্য লিখেছিল।

১. সাদাকালো ঘরের অদ্ভুত আকর্ষণ

পূর্ব বর্ধমানের এক ছোট্ট গ্রামে থাকত তেরো বছরের মেয়ে অন্বেষা। তার বাবা একটি সাইকেল মেরামতির দোকান চালাতেন। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু অন্বেষার স্বপ্ন দেখতে কোনো বাধা ছিল না।

অন্বেষা পড়াশোনায় ভালো হলেও খুব বেশি কথা বলত না। স্কুলে বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, তখন সে কখনও কখনও স্কুলের পুরোনো বারান্দায় বসে বই পড়ত। তবে তার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল এমন একটি খেলার প্রতি, যার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল এক বৃষ্টির দুপুরে।

সেদিন স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় অন্বেষা শিক্ষকদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ ভেতর থেকে কয়েকজনের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনতে পেল।

—তুমি চালটা বুঝতেই পারোনি!

—দাঁড়াও, এবার তোমার রাজাকে বাঁচানো যাবে না!

কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। দুজন শিক্ষক একটি সাদাকালো বোর্ডের সামনে বসে খেলছিলেন। বোর্ডের ওপর সাজানো ছোট ছোট ঘুঁটিগুলো দেখে অন্বেষার মনে হলো, যেন একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। সেখানে রাজা আছে, রানি আছে, সৈন্য আছে, ঘোড়া আছে। প্রত্যেকের চলার নিয়ম আলাদা।

অন্বেষা জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, এটা কী খেলা?

একজন শিক্ষক হেসে বললেন, —এটা দাবা। খেলতে শিখবে?

অন্বেষা একটু ইতস্তত করে বলল, —আমি পারব?

—চেষ্টা না করলে বুঝবে কী করে?

সেদিন শিক্ষক তাকে দাবার বোর্ডের প্রথম নিয়মগুলো শেখালেন। রাজা কীভাবে চলে, নৌকা কীভাবে চলে, ঘোড়া কেন অন্য ঘুঁটির ওপর দিয়ে লাফ দিতে পারে—সব শুনে অন্বেষা মুগ্ধ হয়ে গেল।

বাড়ি ফেরার পথে তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—কীভাবে আবার দাবা খেলতে পারবে?

২. পুরোনো বোর্ডের নতুন খেলোয়াড়

অন্বেষার বাড়িতে দাবার বোর্ড ছিল না। সে বাবাকে কথাটা বলতেই বাবা হেসে বললেন, —দাবা খেলতে শিখবি? ভালো কথা। তবে এখনই বোর্ড কেনার মতো টাকা হাতে নেই রে।

অন্বেষার মুখ একটু ম্লান হয়ে গেল।

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, —টাকা না থাকলে কী হয়েছে? অন্য কোনো উপায় খুঁজে দেখ।

পরদিন স্কুলে গিয়ে অন্বেষা তার সমস্যার কথা শিক্ষকদের জানাল। গণিতের শিক্ষক অরুণবাবু বললেন, —আমার বাড়িতে একটা পুরোনো দাবার বোর্ড আছে। অনেক দিন ব্যবহার করি না। চাইলে নিয়ে যেতে পারিস।

অন্বেষার আনন্দ দেখে কে!

বোর্ডটি ছিল পুরোনো। কয়েকটি ঘুঁটির রং উঠে গিয়েছিল, একটি সাদা ঘোড়ার কান ভাঙা, আর একটি কালো সৈন্যের মাথায় আঁচড়। কিন্তু অন্বেষার কাছে সেটি যেন গুপ্তধন।

সে বাড়ি ফিরে বোর্ডটি পরিষ্কার করল। ভাঙা ঘুঁটিগুলো আলাদা করে রাখল এবং কাগজে নতুন ঘুঁটির আকার এঁকে অনুশীলন শুরু করল।

প্রথম কয়েক দিন সে নিজের সঙ্গেই খেলত। সাদা ঘুঁটি দিয়ে চাল দিত, তারপর কালো ঘুঁটির দিক থেকে ভাবত কীভাবে সেই চালের উত্তর দেওয়া যায়।

তার মা অবাক হয়ে দেখতেন, মেয়েটি একা একা বোর্ডের সামনে বসে কখনও হাসছে, কখনও কপাল কুঁচকে ভাবছে।

একদিন মা জিজ্ঞাসা করলেন, —একাই খেলছিস, তবু এত ভাবতে হয় কেন?

অন্বেষা বলল, —মা, দাবায় শুধু নিজের চাল ভাবলে হয় না। অন্যজন কী করতে পারে, সেটাও ভাবতে হয়।

মা কথাটা শুনে হেসে বললেন, —তাহলে তো এই খেলা জীবনের মতোই!

অন্বেষা তখনও জানত না, মায়ের কথাটি একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠবে।

৩. প্রথম হার

স্কুলে দাবা শেখার জন্য একটি ছোট দল তৈরি হলো। অন্বেষাও তাতে যোগ দিল। সেখানে তার পরিচয় হলো সৌরভ নামে এক ছেলের সঙ্গে। সৌরভ বহুদিন ধরে দাবা খেলত এবং নিজের দক্ষতা নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল।

প্রথম দিনেই অন্বেষা তার সঙ্গে খেলতে বসল।

খেলা শুরু হওয়ার পর অন্বেষা খুব মন দিয়ে চাল দিতে লাগল। সে ভাবছিল, কোন ঘুঁটি কোথায় রাখলে সুবিধা হবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সৌরভ তার রানিকে আটকে দিল।

আর কয়েকটি চালের পরই অন্বেষা হেরে গেল।

সৌরভ হাসতে হাসতে বলল, —দাবা এত সহজ নয়। শুধু ঘুঁটি চালতে জানলেই হবে না।

কথাটা অন্বেষার মনে লাগল। সে বোর্ড গুছিয়ে রেখে চুপচাপ বাড়ি ফিরল।

সেদিন রাতে খাবার খাওয়ার পরও সে চুপ করে বসেছিল। বাবা বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, —কী হয়েছে?

অন্বেষা বলল, —আমি হেরে গেছি। আমার মনে হয়, আমি ভালো খেলতে পারব না।

বাবা নিজের দোকানের একটি অভিজ্ঞতার কথা বললেন।

—জানিস, আমি যখন প্রথম সাইকেল মেরামতির কাজ শিখছিলাম, তখন একটা ছোট যন্ত্র ঠিক করতে গিয়ে বারবার ভুল করতাম। একদিন তো পুরো কাজটাই আবার খুলে করতে হয়েছিল। তখন আমার ওস্তাদ বলেছিলেন, ভুলটা কোথায় হয়েছে সেটা বুঝতে পারলে পরের বার কাজটা ভালো হবে।

অন্বেষা মন দিয়ে শুনল।

বাবা আরও বললেন, —হারলে শুধু কষ্ট পেয়ে বসে থাকিস না। দেখ, কেন হারলি।

পরদিন অন্বেষা সৌরভের কাছে গিয়ে বলল, —গতকালের খেলাটা আবার দেখাতে পারবে? আমি বুঝতে চাই কোথায় ভুল করেছি।

সৌরভ প্রথমে একটু অবাক হলো। তারপর বোর্ড সাজিয়ে বসে পড়ল।

খেলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চাল তারা আবার দেখল। অন্বেষা বুঝতে পারল, সে নিজের ঘুঁটি এগিয়ে দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ খেয়াল করেনি।

সেদিন থেকে সে শুধু খেলতে নয়, নিজের ভুল বিশ্লেষণ করতেও শিখল।

৪. চালের ভেতর লুকিয়ে থাকা শিক্ষা

অন্বেষার নিয়মিত অনুশীলন শুরু হলো। স্কুলের পরে প্রতিদিন আধঘণ্টা সে দাবা খেলত। কোনো দিন সৌরভের সঙ্গে, কোনো দিন অন্য বন্ধুদের সঙ্গে। প্রতিটি খেলার পরে সে খাতায় লিখে রাখত—কোন চাল ভালো হয়েছে, কোথায় ভুল হয়েছে, পরের বার কীভাবে উন্নতি করা যায়।

অরুণবাবু তাকে দাবার কয়েকটি বই দিলেন। বইয়ের জটিল অবস্থানগুলো প্রথমে বুঝতে অসুবিধা হতো। কখনও একটি সমস্যার সমাধান করতে তার অনেক সময় লেগে যেত।

তবু সে চেষ্টা ছাড়ল না।

একদিন শিক্ষক তাকে একটি অবস্থান দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, —এখানে তোমার প্রতিপক্ষের রানি বিপদে আছে। তুমি কী করবে?

অন্বেষা সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতে চাইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝল, তাড়াহুড়ো করে চাল দিলে তার নিজের রাজাও বিপদে পড়তে পারে।

সে থেমে বলল, —স্যার, আগে নিজের রাজাকে নিরাপদ রাখব। তারপর আক্রমণের সুযোগ খুঁজব।

অরুণবাবু হাসলেন।

—খুব ভালো। অনেক সময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় চালটাই সবচেয়ে ভালো চাল নয়।

অন্বেষা বুঝতে পারছিল, দাবা তাকে ধৈর্য শেখাচ্ছে। প্রতিটি সমস্যার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। কখনও অপেক্ষা করতে হয়, কখনও নিজের পরিকল্পনা বদলাতে হয়, কখনও আবার আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে তা স্বীকার করতে হয়।

এই শিক্ষা তার পড়াশোনাতেও কাজে লাগতে শুরু করল। কঠিন অঙ্ক দেখলেই সে আর খাতা বন্ধ করে দিত না। প্রশ্নটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সমাধান করার চেষ্টা করত।

৫. প্রতিযোগিতার খবর

কয়েক মাস পরে স্কুলে ঘোষণা হলো, জেলা পর্যায়ের একটি দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেখানে অংশ নিতে পারবে।

অন্বেষার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল। সে অংশ নিতে চাইল।

কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিযোগিতায় যাওয়ার জন্য যাতায়াতের খরচ এবং প্রয়োজনীয় কিছু খরচের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাড়িতে কথাটা বলতেই বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

—যেতে তোকে বাধা দেব না। কিন্তু এ মাসে দোকানে কাজও খুব বেশি নেই। সব খরচ একসঙ্গে জোগাড় করা কঠিন হবে।

অন্বেষা বলল, —আমি বুঝতে পারছি বাবা। তুমি চিন্তা কোরো না। স্কুলে কথা বলে দেখি কোনো ব্যবস্থা হয় কি না।

অরুণবাবু স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করলেন। স্কুল থেকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হলো। কয়েকজন শিক্ষকও অন্বেষাকে উৎসাহ দিলেন।

প্রতিযোগিতার আগে সে আরও নিয়মিত অনুশীলন করতে লাগল। তবে এবার অরুণবাবু তাকে একটি কথা বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিলেন।

—শুধু জেতার জন্য খেলবি না। নিজের সেরা খেলাটা খেলার চেষ্টা করবি। জয়-পরাজয় দুটোই প্রতিযোগিতার অংশ।

অন্বেষা মাথা নাড়ল।

তার মনে হচ্ছিল, এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানেই শুধু পুরস্কারের জন্য লড়াই নয়। নিজের শেখা বিষয়গুলো পরীক্ষা করারও সুযোগ।

৬. প্রতিযোগিতার সকাল

প্রতিযোগিতার দিন অন্বেষা খুব ভোরে উঠে পড়ল। মা তার জন্য খাবার গুছিয়ে দিলেন। বাবা দোকানে যাওয়ার আগে বললেন, —মনে রাখিস, বোর্ডের ওপারে যে বসবে, সে তোর শত্রু নয়। সেও তোর মতোই শিখতে এসেছে।

অন্বেষা কথাটা মনে গেঁথে নিল।

প্রতিযোগিতার হলে ঢুকে সে দেখল, অনেক ছাত্রছাত্রী ইতিমধ্যেই এসে গেছে। কারও হাতে দাবার বই, কেউ বোর্ডের সামনে শেষ মুহূর্তের অনুশীলন করছে। অন্বেষার বুক ধুকপুক করতে লাগল।

প্রথম খেলায় সে জিতল। দ্বিতীয় খেলায়ও ভালো করল। কিন্তু তৃতীয় খেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি অসাবধানতায় হারিয়ে ফেলল। সেই খেলায় সে পরাজিত হলো।

কিছুক্ষণের জন্য তার মন ভেঙে গেল। তবে এবার সে আগের মতো বোর্ড ছেড়ে উঠে গেল না। খেলার পরে প্রতিপক্ষের সঙ্গে চালগুলো নিয়ে আলোচনা করল।

সে বুঝতে পারল, চাপের মধ্যে সে অতিরিক্ত দ্রুত চাল দিয়েছিল।

পরের খেলায় সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। প্রতিটি চালের আগে বোর্ডের দিকে মন দিয়ে তাকাল। প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য উত্তরগুলোও ভাবল।

তার পরের দুটি খেলায় সে ভালো ফল করল।

শেষ রাউন্ডের আগে আয়োজক ঘোষণা করলেন, ফলাফলের ভিত্তিতে কয়েকজন খেলোয়াড় পুরস্কারের জন্য লড়াই করছেন। অন্বেষারও সুযোগ রয়েছে।

সে আর কোনো হিসাব করতে চাইল না। নিজের সামনে থাকা বোর্ডটির দিকে মন দিল।

৭. শেষ খেলার কঠিন সিদ্ধান্ত

শেষ খেলায় অন্বেষার প্রতিপক্ষ ছিল অভিজ্ঞ এক খেলোয়াড়, নাম ঋত্বিক। সে খুব দ্রুত চাল দিচ্ছিল। অন্বেষা প্রথমে কিছুটা চাপে পড়ে গেল।

খেলার মাঝামাঝি সময়ে তার একটি ঘুঁটি আটকে গেল। সে বুঝতে পারছিল, ভুল সিদ্ধান্ত নিলে দ্রুত হারতে পারে।

তার মনে পড়ল অরুণবাবুর কথা—তাড়াহুড়ো করে আকর্ষণীয় চাল দেওয়ার চেয়ে অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

সে গভীরভাবে বোর্ডের দিকে তাকাল। কয়েকটি সম্ভাব্য চাল ভাবল। একটি চাল তার কাছে খুব ভালো মনে হচ্ছিল, কিন্তু সেটি দিলে প্রতিপক্ষ পাল্টা আক্রমণ করতে পারত।

অবশেষে সে অন্য একটি চাল বেছে নিল। এতে সঙ্গে সঙ্গে জয় আসার সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু তার ঘুঁটিগুলোর অবস্থান অনেকটা নিরাপদ হলো।

ঋত্বিক কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর নিজের চাল দিল।

খেলা আরও এগোল। অন্বেষা ধৈর্য ধরে খেলতে লাগল। একসময় সে এমন একটি সুযোগ পেল, যেখানে প্রতিপক্ষের ভুলকে কাজে লাগিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব।

সে সুযোগটি কাজে লাগাল।

শেষ পর্যন্ত ঋত্বিক পরাজয় স্বীকার করল।

অন্বেষা জিতে গেল!

তবে সে চিৎকার করে উঠল না। প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলল, —খুব ভালো খেলেছেন। আপনার কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখলাম।

ঋত্বিক হাসল।

—তুমিও ভালো খেলেছ। বিশেষ করে শেষের দিকে ধৈর্য হারাওনি।

অন্বেষার মনে হলো, জয়ের আনন্দের পাশাপাশি এই স্বীকৃতিটাও তার কাছে অনেক মূল্যবান।

৮. পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি

ফলাফল ঘোষণার সময় অন্বেষার নামও পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকায় উঠে এল। সে প্রথম হয়নি, কিন্তু ভালো ফল করে একটি সম্মানজনক স্থান অর্জন করেছিল।

তার হাতে যখন ছোট্ট ট্রফিটি তুলে দেওয়া হলো, তখন তার মনে পড়ল পুরোনো বোর্ডটির কথা। সেই বোর্ডে ভাঙা ঘুঁটি সাজিয়ে যে মেয়েটি একা একা অনুশীলন করত, আজ সে জেলার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে।

বাড়ি ফিরে সে ট্রফিটি বাবার হাতে দিল।

বাবা ট্রফিটি দেখে মৃদু হেসে বললেন, —তাহলে তোর পরিশ্রম বৃথা যায়নি।

অন্বেষা বলল, —আমি আরও ভালো খেলতে চাই। এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি।

মা বললেন, —সেটাই ভালো। পুরস্কার পেয়েছিস বলে থেমে যাস না, আবার কোনো দিন না জিতলেও নিজের ওপর বিশ্বাস হারাবি না।

সেই রাতে অন্বেষা ট্রফিটি পড়ার টেবিলে রাখল। কিন্তু তার পাশে সে পুরোনো খাতাটিও রাখল, যেখানে লেখা ছিল তার ভুল, শেখা কৌশল আর নতুন পরিকল্পনার কথা।

ট্রফিটি তাকে সাফল্যের কথা মনে করিয়ে দিত। আর খাতাটি মনে করিয়ে দিত, সাফল্যের পথে কতবার ভুল করে আবার শুরু করতে হয়।

৯. নতুনদের জন্য একটি বোর্ড

কয়েক মাস পর অন্বেষা স্কুলের ছোটদের দাবা শেখাতে শুরু করল। যারা আগে মনে করত দাবা খুব কঠিন, তাদের সে প্রথমে ঘুঁটিগুলোর চলন শেখাত। তারপর ছোট ছোট সমস্যা দিত।

একদিন একটি ছোট ছেলে খেলায় হেরে রেগে গিয়ে বলল, —আমি আর খেলব না। আমি কখনও জিততে পারব না!

অন্বেষা তার পাশে বসে বলল, —আজ হেরেছিস, কিন্তু আজ একটা নতুন ভুল চিনতে পেরেছিস। পরের বার সেই ভুলটা না করলে তুই আরও ভালো খেলবি।

ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, —তুমিও কি অনেক হেরেছিলে?

অন্বেষা হেসে বলল, —অনেকবার। আমি এখনও হারি। কিন্তু প্রতিবার চেষ্টা করি, কেন হারলাম সেটা বুঝতে।

স্কুলে ছোটদের জন্য একটি দাবা ক্লাব তৈরি হলো। পুরোনো বোর্ডের পাশাপাশি কয়েকটি নতুন বোর্ডও জোগাড় করা গেল। শিক্ষকরা পালা করে তাদের অনুশীলনে সাহায্য করতেন।

অন্বেষা বুঝল, তার সাফল্য তখনই আরও অর্থবহ হবে, যখন তার শেখা অন্যদেরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

১০. নিজের ভাগ্য নিজেই গড়া

এক সন্ধ্যায় অন্বেষা পড়ার টেবিলে বসে দাবার বোর্ড সাজাচ্ছিল। জানালার বাইরে আকাশে লালচে আলো। মা সেলাই করছেন, বাবা দোকান থেকে ফিরে হিসাব লিখছেন।

অন্বেষা সাদা ঘুঁটিগুলো সাজিয়ে কালো ঘুঁটিগুলোর দিকে তাকাল। বোর্ডে সাদা-কালো ঘরগুলো পাশাপাশি রয়েছে। কোনো ঘর একা পুরো বোর্ড নয়; প্রতিটি ঘরের সঙ্গে অন্য ঘরের সম্পর্ক রয়েছে।

তার মনে হলো, জীবনও অনেকটা দাবার মতো। সব চাল নিজের ইচ্ছেমতো হবে না। কখনও প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বুঝতে হবে, কখনও নিজের ভুলের দায় নিতে হবে, কখনও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধরতে হবে। আর কখনও হেরে গিয়েও আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।

তবে জীবনের সঙ্গে দাবার একটি বড় পার্থক্যও আছে—জীবনে সবাইকে হারিয়ে এগোতে হয় না। অন্যকে শেখানো, পাশে দাঁড়ানো এবং একসঙ্গে ভালো কিছু তৈরি করাও সাফল্যের অংশ।

অন্বেষা বোর্ডের ওপর হাত রেখে মনে মনে বলল, —আমার পথ আমি নিজেই তৈরি করব। এক চাল করে, এক দিন করে।

তার সামনে তখনও অনেক পথ বাকি। বড় প্রতিযোগিতা, আরও কঠিন অনুশীলন, নতুন নতুন শিক্ষা—সবই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু এখন আর সে নিজের সামর্থ্য নিয়ে আগের মতো সন্দেহ করত না।

কারণ সে জেনে গিয়েছিল, ভাগ্য সব সময় হাতে এসে ধরা দেয় না। অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্ত, পরিশ্রম এবং ধৈর্য দিয়ে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হয়।

শিক্ষা: সাফল্য শুধু জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ভুল থেকে শেখা, প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং অর্জিত জ্ঞান অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই প্রকৃত উন্নতির পথ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

যে ছেলেটি বাতাস থেকে শক্তি খুঁজেছিল।

১. অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রাম

নদিয়া জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে থাকত চোদ্দো বছরের ছেলে অর্ক। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর, আর মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। অভাবের সংসার হলেও অর্কের চোখে ছিল অদ্ভুত এক কৌতূহল। ভাঙা খেলনা, পুরোনো টর্চ, নষ্ট রেডিও কিংবা ফেলে দেওয়া তার—সবকিছুর মধ্যেই সে নতুন কিছু খুঁজে পেত।

তাদের গ্রামে প্রায়ই বিদ্যুৎ চলে যেত। গরমের রাতে পাখা বন্ধ হয়ে গেলে ছোটরা ঘুমোতে পারত না। সন্ধ্যার পরে পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে পড়ত। অর্কের মা সেলাইয়ের কাজ শেষ করতে পারতেন না, আর বাবা পরদিনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে সমস্যায় পড়তেন।

এক রাতে পড়তে বসে হঠাৎ আলো নিভে গেল।

অর্ক বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করল।

—মা, আবার বিদ্যুৎ চলে গেল!

মা সেলাইয়ের কাপড় গুছিয়ে রেখে বললেন, —কী আর করব বল? একটু অপেক্ষা কর। বিদ্যুৎ এলে আবার পড়তে বসিস।

অর্ক জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন জোরে বাতাস বইছে। উঠোনের শুকনো পাতাগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে, তালগাছের পাতা দুলছে, আর বাঁশঝাড়ের মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ উঠছে।

হঠাৎ তার মনে একটা প্রশ্ন এল।

যে বাতাস এত জোরে গাছের ডাল নাড়িয়ে দিতে পারে, সেই বাতাস দিয়ে কি কিছু চালানো যায় না?

প্রশ্নটি তার মাথায় এমনভাবে ঢুকে গেল যে সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও সে সেটি ভুলতে পারল না।

২. বিজ্ঞানের বইয়ের পাতায়

পরদিন স্কুলে অর্ক তার বিজ্ঞান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবুকে প্রশ্নটি করল।

—স্যার, বাতাস দিয়ে কি বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়?

শিক্ষক হাসলেন।

—অবশ্যই যায়। বায়ুশক্তি ব্যবহার করে বায়ুকল বা উইন্ড টারবাইনের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বাতাসের গতিশক্তি টারবাইনের ব্লেড ঘোরায়। সেই ঘূর্ণন উপযুক্ত যন্ত্রের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগে।

অর্ক অবাক হয়ে বলল, —তাহলে আমাদের গ্রামেও কি এটা করা সম্ভব?

—ছোট পরীক্ষামূলক মডেল বানানো সম্ভব। কিন্তু বাড়ির সমস্ত বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো আলাদা বিষয়। তার জন্য বাতাসের গতি, যন্ত্রের ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং খরচ—সব হিসাব করতে হয়।

অর্কের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

শিক্ষক তাকে স্কুলের বিজ্ঞানাগারের কয়েকটি বই পড়তে দিলেন। অর্ক জানতে পারল, বাতাসের শক্তি ব্যবহার করার ধারণা বহু পুরোনো। একসময় মানুষ বাতাস দিয়ে নৌকা চালাত, শস্য পেষাই করত এবং জল তোলার কাজেও বায়ুকল ব্যবহার করত।

আধুনিক প্রযুক্তি সেই ধারণাকে আরও উন্নত করেছে।

সেদিন বাড়ি ফিরে অর্ক তার পুরোনো খাতার প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখল—

‘বাতাসের শক্তি: আমার প্রথম বিজ্ঞান প্রকল্প।’

৩. ফেলে দেওয়া জিনিসের নতুন জীবন

অর্কের হাতে দামি যন্ত্রপাতি কেনার মতো টাকা ছিল না। তাই সে বাড়ির আশপাশে ফেলে দেওয়া জিনিস সংগ্রহ করতে শুরু করল।

একটি ভাঙা খেলনা গাড়ি থেকে ছোট মোটর পেল। পুরোনো প্লাস্টিকের বোতল থেকে ব্লেড বানানোর কথা ভাবল। একটি কাঠের টুকরো, কয়েকটি তার এবং পরিত্যক্ত খেলনার অংশ জোগাড় করল।

তবে সে জানত, বিদ্যুতের কাজ সাবধানে করতে হয়। তাই কোনো সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ বা বিপজ্জনক পরীক্ষা করার চেষ্টা না করে সে প্রথমে কম ভোল্টেজের ছোট মোটর নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিল। শিক্ষকও তাকে নিরাপদভাবে মডেল তৈরি করার পরামর্শ দিলেন।

প্রথম দিনেই সে একটি ছোট বায়ুকলের মতো কাঠামো বানাল।

কিন্তু বাতাস লাগতেই ব্লেডগুলো একবার ঘুরে থেমে গেল।

অর্ক আবার চেষ্টা করল। এবার ব্লেডের আকার বদলাল। তাতেও খুব বেশি কাজ হলো না।

রাগে সে মোটরটি নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিল, তখন তার ছোট বোন পিউ বলল, —দাদা, তুই তো বলেছিলি বাতাসে বিদ্যুৎ তৈরি হবে। তোর পাখাটা ঘুরছে না কেন?

অর্ক একটু হেসে বলল, —কারণ শুধু বানালেই হয় না। কীভাবে বানাতে হয়, সেটাও শিখতে হয়।

পিউ বলল, —তাহলে আবার বানিয়ে দেখ।

ছোট বোনের কথায় অর্ক নতুন করে কাজে বসে গেল।

৪. ব্যর্থতার খাতা

পরের কয়েক দিন অর্কের বাড়ির উঠোন ছোট্ট পরীক্ষাগারে পরিণত হলো। কখনও ব্লেড বেশি ভারী হয়ে যাচ্ছিল, কখনও মোটরের সঙ্গে সংযোগ ঠিক থাকছিল না। কখনও বাতাস যথেষ্ট জোরে বইছিল না।

প্রতিবার ব্যর্থ হলে সে খাতায় লিখে রাখত কী ঘটেছে।

একদিন সে লিখল, ‘ব্লেডের ওজন বেশি। ঘুরতে অসুবিধা হচ্ছে।’

অন্য দিন লিখল, ‘মোটরের অক্ষ ঠিকভাবে বসানো হয়নি।’

আরেক দিন লিখল, ‘বাতাসের গতি কম থাকায় ঘূর্ণন হচ্ছে না।’

অনিরুদ্ধবাবু তার খাতা দেখে বললেন, —তুমি শুধু মডেল তৈরি করছ না, পরীক্ষার ফলও নথিবদ্ধ করছ। বিজ্ঞান শেখার জন্য এই অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অর্ক জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, আমি কি সত্যিই এটা দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারব?

শিক্ষক বললেন, —ছোট পরিসরে সম্ভব। কিন্তু মনে রেখো, একটি মডেল ঘুরলেই তা কার্যকর বিদ্যুৎব্যবস্থা হয়ে যায় না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কতটা স্থিতিশীল, কী কাজে লাগবে এবং কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করা যাবে, সেগুলোও দেখতে হবে।

অর্ক এবার আরও মন দিয়ে কাজ করতে লাগল।

সে বুঝতে শুরু করল, ব্যর্থতা মানে কাজ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ব্যর্থতা অনেক সময় পরের চেষ্টার জন্য দরকারি তথ্য দেয়।

৫. গ্রামের লোকের হাসি

অর্কের পরীক্ষা গ্রামের মানুষের চোখ এড়াল না।

একদিন পুকুরপাড়ে কয়েকজন লোক তাকে ছোট যন্ত্রটি হাতে নিয়ে যেতে দেখে হাসতে লাগলেন।

একজন বললেন, —এই ছেলেটা নাকি বাতাস দিয়ে বিদ্যুৎ বানাবে!

আরেকজন মজা করে বললেন, —তাহলে তো আমাদের আর বিদ্যুতের বিল দিতে হবে না!

কথাগুলো শুনে অর্কের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে বাড়ি ফিরে মডেলটি এক পাশে রেখে দিল।

মা বুঝতে পারলেন, ছেলের মন খারাপ।

—কী হয়েছে?

অর্ক বলল, —সবাই হাসছে। আমি কি সত্যিই পারব না?

মা সেলাইয়ের কাজ থামিয়ে তার পাশে বসলেন।

—মানুষ নতুন কিছু দেখলে অনেক সময় বুঝতে পারে না। তাই বলে তুই চেষ্টা বন্ধ করে দিবি? তবে একটা কথা মনে রাখিস—শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না, শিখতে হবে, ভুল হলে ঠিক করতে হবে।

বাবাও কাজে থেকে ফিরে ছেলের কথা শুনলেন।

তিনি বললেন, —আমি তোকে দামি যন্ত্র কিনে দিতে পারব না। কিন্তু তুই যদি পড়াশোনা করে, শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে কাজটা করতে চাস, আমি যতটা পারি সাহায্য করব।

সেদিন রাতে অর্ক আবার খাতাটি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা কথাগুলো পড়ে তার মনে সাহস ফিরে এল।

৬. প্রথম আলো

স্কুলের বিজ্ঞান মেলা এগিয়ে আসছিল। অর্ক ঠিক করল, তার প্রকল্পটি সেখানে প্রদর্শন করবে।

এবার সে অনিরুদ্ধবাবুর তত্ত্বাবধানে মডেলটি নতুন করে তৈরি করল। ব্লেডের ভারসাম্য ঠিক করা হলো, মোটরটি সঠিকভাবে বসানো হলো এবং তার সংযোগ পরীক্ষা করা হলো।

বাতাসে ব্লেড ঘুরলে ছোট মোটরটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরীক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করা যাবে—এই ছিল তার পরিকল্পনা।

বিজ্ঞান মেলার আগের দিন সন্ধ্যায় অর্ক উঠোনে মডেলটি বসাল। সেদিন বাতাস ছিল বেশ ভালো।

প্রথমে ব্লেডগুলো ধীরে ঘুরল। তারপর গতি বাড়ল। শিক্ষক আগে যে ছোট পরীক্ষামূলক বৈদ্যুতিক অংশটি দেখিয়েছিলেন, তার সাহায্যে একটি ক্ষুদ্র আলো জ্বলে উঠল।

আলোটি খুব উজ্জ্বল ছিল না। মাত্র কয়েক মুহূর্ত স্থিরভাবে জ্বলল, তারপর বাতাস কমে আসায় ম্লান হয়ে গেল।

কিন্তু অর্কের কাছে সেই ছোট্ট আলো যেন বিশাল এক সাফল্য।

সে চিৎকার করে উঠল, —মা! দেখো! আলো জ্বলেছে!

পিউ দৌড়ে এল। মা হাতের কাজ ফেলে বাইরে এলেন। বাবা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।

মা বললেন, —এত ছোট্ট আলো, অথচ তোর মুখে এত আনন্দ!

অর্ক হাসতে হাসতে বলল, —এটা শুধু আলো নয়, মা। এটা প্রমাণ যে আমার ধারণাটা পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব।

বাবা ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

সেদিন তাঁদের বাড়িতে কোনো বড় উৎসব হয়নি। তবু ছোট্ট উঠোনে যেন আনন্দের বাতাস বয়ে গেল।

৭. বিজ্ঞান মেলার দিন

বিজ্ঞান মেলার দিন স্কুলের মাঠে অনেক ছাত্রছাত্রী নিজেদের প্রকল্প নিয়ে হাজির হলো। কেউ জল পরিশোধনের মডেল বানিয়েছে, কেউ সৌরশক্তি দিয়ে চলা ছোট গাড়ি তৈরি করেছে, কেউ আবার বৃষ্টির জল সংরক্ষণের পদ্ধতি দেখাচ্ছে।

অর্ক নিজের মডেলটি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখল। পাশে একটি চার্টে লিখল—‘বাতাস থেকে শক্তি: একটি ক্ষুদ্র পরীক্ষামূলক মডেল’।

বিচারকেরা তার কাছে এলেন।

একজন জিজ্ঞাসা করলেন, —তোমার মডেল কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে?

অর্ক সৎভাবে উত্তর দিল, —স্যার, আমি নির্ভরযোগ্য পরিমাপ করার মতো যথেষ্ট যন্ত্র পাইনি। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ বলতে পারছি না। আমার মডেলটি মূলত দেখায়, বাতাসের সাহায্যে মোটর ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা পরীক্ষা করা যায়।

অন্য একজন জানতে চাইলেন, —এটি কি একটি বাড়ির সমস্ত বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারবে?

অর্ক মাথা নেড়ে বলল, —না স্যার, এই ছোট মডেল দিয়ে তা সম্ভব নয়। বাস্তবে ব্যবহার করতে হলে অনেক বেশি পরিকল্পনা, উপযুক্ত যন্ত্র, নিরাপত্তা এবং ব্যয়ের হিসাব দরকার।

বিচারকেরা তার উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হলেন।

তাঁদের একজন বললেন, —তুমি নিজের প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা জানো, এটা ভালো লক্ষণ। বিজ্ঞান শুধু কী সম্ভব তা দেখায় না, কী এখনও সম্ভব হয়নি, সেটাও বুঝতে শেখায়।

অর্কের প্রকল্পটি পুরস্কার পেল। তবে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল, একজন শিক্ষক তাকে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে আরও পড়াশোনা করার পরামর্শ দিলেন।

৮. বাতাসকে নতুনভাবে দেখা

বিজ্ঞান মেলার পরে অর্কের প্রতি গ্রামের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বদলে গেল। যারা আগে হাসতেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন তার মডেল দেখতে এলেন।

রঘুনাথ কাকু একদিন বললেন, —বুঝলি অর্ক, আমি তো ভাবতাম এসব শুধু বড় বড় কারখানায় হয়। তুই দেখিয়ে দিলি, ছোট করে শেখাও যায়।

অর্ক বলল, —কাকু, আমি কিন্তু এখনও অনেক কিছু জানি না। বড় যন্ত্র তৈরি করতে হলে আরও পড়াশোনা করতে হবে।

রঘুনাথ কাকু হেসে বললেন, —সেটাই তো ভালো। সব জেনে গেছিস ভাবলে আর শেখা হবে না।

অর্কের স্কুলে একটি ছোট বিজ্ঞানচর্চার দল গড়ে উঠল। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী মিলে নিরাপদ পরীক্ষামূলক প্রকল্প তৈরি করতে লাগল। তারা কখনও বাতাসের গতি মাপার উপায় নিয়ে পড়াশোনা করত, কখনও সৌরশক্তি সম্পর্কে জানত, আবার কখনও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করত।

অর্ক বুঝল, বিজ্ঞান একা একা এগোনোর বিষয় নয়। প্রশ্ন করা, অন্যের কথা শোনা, পরীক্ষা করা এবং ফলাফল ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই জ্ঞান বাড়ে।

৯. স্বপ্নের আসল অর্থ

সময়ের সঙ্গে অর্ক আরও বড় ক্লাসে উঠল। পড়াশোনার চাপ বাড়ল, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হলো। তবু সে বিজ্ঞানচর্চা ছাড়ল না।

তার ছোট্ট বায়ুকলটি এখনো বাড়ির এক কোণে রাখা আছে। সেটি দিয়ে গ্রামের বিদ্যুতের সমস্যা মেটানো যায় না। অর্ক নিজেও জানে, তার তৈরি মডেলটি কেবল একটি প্রাথমিক পরীক্ষা।

কিন্তু সেই মডেল তাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—সমস্যা দেখলে শুধু অভিযোগ না করে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করা যায়।

একদিন বাবা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, —বড় হয়ে কী হতে চাস?

অর্ক কিছুক্ষণ ভেবে বলল, —আমি শক্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে চাই। এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাই, যা মানুষের কাজে লাগবে এবং পরিবেশের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করবে।

বাবা বললেন, —তাহলে মন দিয়ে পড়। স্বপ্নটা বড় রাখ, কিন্তু কাজ শুরু কর ছোট ছোট পদক্ষেপে।

অর্ক জানালার বাইরে তাকাল। মাঠের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দূরের গাছের পাতাগুলো দুলছে। সেই একই বাতাস, যা এক রাতে তাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল।

এখন বাতাসকে দেখলে সে শুধু গাছের দোলা দেখে না। সে সম্ভাবনা দেখে, বিজ্ঞানের প্রশ্ন দেখে, নতুন কিছু শেখার সুযোগ দেখে।

আর তার মনে পড়ে যায়, একদিন একটি ছোট্ট আলো জ্বলে উঠেছিল তাদের উঠোনে। সেই আলো পুরো গ্রামকে আলোকিত করেনি, কিন্তু অর্কের ভবিষ্যতের পথটুকু উজ্জ্বল করে দিয়েছিল।

শিক্ষা: বড় আবিষ্কারের শুরু অনেক সময় একটি ছোট প্রশ্ন থেকে হয়। কৌতূহল, অধ্যবসায়, নিরাপদ পরীক্ষা এবং ভুল থেকে শেখার মানসিকতা থাকলে ছোট প্রচেষ্টাও ভবিষ্যতের বড় স্বপ্নের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

যে মেয়েটি গ্রামের মঞ্চে নতুন স্বপ্ন দেখেছিল।

১. পরিত্যক্ত মঞ্চ

পশ্চিম মেদিনীপুরের ছোট্ট একটি গ্রাম শালবনিতে একসময় প্রতি বছর শীতকালে নাটকের আসর বসত। গ্রামের মানুষ নিজেরাই নাটক লিখতেন, অভিনয় করতেন, মঞ্চ সাজাতেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সেই নাটক দেখতে আসত। কারও হাতে থাকত মুড়ি, কারও হাতে বাদাম, আর ছোটদের চোখে থাকত আনন্দের ঝিলিক।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উৎসব হারিয়ে গেল। গ্রামের পুরোনো ক্লাবঘরের পাশের কাঠের মঞ্চটি ভেঙে পড়তে শুরু করল। রঙ উঠে যাওয়া পর্দা ছিঁড়ে গেল, মঞ্চের এক কোণে জমল শুকনো পাতা। একসময় যেখানে সন্ধ্যা হলেই মহড়ার শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

সেই গ্রামেই থাকত পনেরো বছরের মেয়ে মেঘলা। সে নবম শ্রেণিতে পড়ত। পড়াশোনার পাশাপাশি গল্প পড়তে এবং মানুষের অভিনয় দেখতে তার খুব ভালো লাগত।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে পুরোনো মঞ্চটির সামনে দাঁড়াল। কাঠের ফাঁক দিয়ে আগাছা গজিয়েছে। ছাদের টিনের কয়েকটি অংশও খুলে পড়েছে।

মেঘলা দীর্ঘক্ষণ মঞ্চটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, এই মঞ্চটি যেন অনেক দিন ধরে কাউকে কিছু বলতে চাইছে।

বাড়ি ফিরে সে দিদাকে জিজ্ঞাসা করল, —দিদা, আমাদের গ্রামের এখানে আগে কি সত্যিই নাটক হতো?

দিদা হেসে বললেন, —হতো না মানে! তোর দাদু একসময় নাটকের দলেই ছিলেন। দুর্গাপুজোর পরে সবাই মিলে নাটক করত। কত মানুষ যে আসত! নাটক শেষ হলে রাত হয়ে যেত, তবু কেউ বাড়ি ফিরতে চাইত না।

মেঘলা অবাক হয়ে শুনল।

—এখন আর হয় না কেন?

দিদার মুখ একটু ম্লান হয়ে গেল।

—সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ শহরে চলে গেল, কেউ চাকরি পেল, কেউ সংসারের দায়িত্বে আটকে গেল। ধীরে ধীরে মঞ্চটাও হারিয়ে গেল।

সেদিন রাতে মেঘলার ঘুম এল না। তার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—যে কাজ একসময় গোটা গ্রামকে এক করেছিল, সেটি আবার শুরু করা যায় না কেন?

২. স্বপ্নের কথা

পরের দিন স্কুলে টিফিনের সময় মেঘলা তার বন্ধু তৃষা, অয়ন এবং রাহুলকে নিজের পরিকল্পনার কথা বলল।

—আমরা যদি আবার নাটক করি, কেমন হয়?

অয়ন হেসে উঠল।

—আমরা নাটক করব? আমাদের মধ্যে কেউ ঠিকমতো সংলাপ বলতেই পারে না!

তৃষা অবশ্য আগ্রহ দেখাল।

—নাটক করতে গেলে আগে একটা গল্প দরকার। আর মঞ্চটাও তো ভাঙা।

মেঘলা বলল, —সব এক দিনে করতে হবে না। আগে একটা ছোট নাটক লিখব। তারপর মহড়া দেব। গ্রামের বড়দের সাহায্য চাইব।

রাহুল একটু ভেবে বলল, —কিন্তু নাটক দেখতে লোক আসবে তো?

মেঘলা উত্তর দিল, —আমরা যদি এমন গল্প বলি, যেখানে গ্রামের মানুষের নিজের জীবনের কথা থাকবে, তাহলে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ দেখতে আসবে।

চার বন্ধু ঠিক করল, তারা চেষ্টা করবে।

তবে তাদের সামনে প্রথম বাধা ছিল বাড়ির অনুমতি। মেঘলার বাবা সুশান্তবাবু একটি ছোট দোকান চালাতেন। মেয়ের কথা শুনে তিনি প্রথমে বললেন, —পড়াশোনার সময় নষ্ট করিস না। নাটক করে কি ভবিষ্যৎ তৈরি হবে?

মেঘলা শান্তভাবে বলল, —পড়াশোনা ছাড়ব না বাবা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়ব। নাটকের মহড়াও সেই সময়ের বাইরে করব।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—পরীক্ষার ফল খারাপ হলে কিন্তু নাটকের দোহাই দিতে পারবি না।

মেঘলা হেসে বলল, —দেব না।

মায়ের সাহায্যে সে বাড়ির কাজের জন্যও একটি সময়সূচি তৈরি করল। ধীরে ধীরে বাবা বুঝলেন, মেয়েটি শুধু আবেগের বশে কিছু বলতে চাইছে না; সে সত্যিই পরিকল্পনা করে এগোতে চাইছে।

৩. গল্প খোঁজার অভিযান

নাটকের জন্য গল্প লিখতে বসে মেঘলা বুঝল, কাজটি সহজ নয়। প্রথমে সে রাজা-রানির গল্প লিখল। কিন্তু বন্ধুরা পড়ে বলল, গল্পটি তাদের কাছে খুব চেনা লাগছে।

দ্বিতীয় গল্পে ছিল এক ধনী ব্যবসায়ী ও এক দরিদ্র কৃষকের বিরোধ। সেটিও তাদের পছন্দ হলো না।

একদিন দিদা তাকে বললেন, —গল্প খুঁজতে দূরে যেতে হয় না রে। চারপাশে তাকিয়ে দেখ। মানুষের জীবনেই কত গল্প আছে!

মেঘলা কথাটা মনে রাখল।

সে গ্রামের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। বাজারের সবজি বিক্রেতা, মাঠের কৃষক, স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পঞ্চায়েতের কর্মী, এমনকি গ্রামের বৃদ্ধ মানুষদের কাছ থেকেও নানা অভিজ্ঞতা শুনল।

একদিন সে দেখল, গ্রামের একটি পরিবারে ছোট ছেলেটি পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সাহায্য করে। অন্যদিকে গ্রামেরই আরেকটি মেয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও আত্মবিশ্বাসের অভাবে স্কুলের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চায় না।

মেঘলার মনে হলো, তাদের নাটকে এমন একটি গল্প থাকা উচিত, যেখানে মানুষ বুঝতে পারবে—প্রত্যেকের জীবনে বাধা থাকে, কিন্তু সবাইকে সুযোগ দেওয়া হলে অনেক অজানা প্রতিভা সামনে আসতে পারে।

সে লিখতে শুরু করল একটি নাটক। নাম দিল—‘আমাদের সবার মঞ্চ’।

নাটকের গল্পে একটি গ্রামের মানুষ প্রথমে নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। কেউ মনে করে, শুধু বড়লোকের সন্তানরাই ভালো অভিনয় করতে পারে। কেউ মনে করে, মেয়েদের মঞ্চে ওঠা উচিত নয়। আবার কেউ ভাবে, পড়াশোনায় ভালো না হলে অন্য কোনো কাজেও সাফল্য পাওয়া যায় না।

শেষ পর্যন্ত গ্রামের এক কিশোরী সবাইকে বোঝায়, মঞ্চে দাঁড়ানোর অধিকার সবার আছে। প্রতিভা প্রকাশের জন্য দরকার সুযোগ, অনুশীলন এবং একে অপরের প্রতি সম্মান।

গল্পটি পড়ে তৃষা বলল, —এটা তো আমাদের গ্রামের কথাই!

মেঘলা হেসে উত্তর দিল, —সেই জন্যই তো লিখেছি।

৪. প্রথম মহড়া, প্রথম বিপত্তি

গ্রামের পুরোনো ক্লাবঘরে মহড়া শুরু হলো। প্রথম দিন এল মাত্র পাঁচজন। দ্বিতীয় দিন এল সাতজন। তৃতীয় দিন অয়ন জানাল, বাড়িতে অতিথি এসেছে বলে সে আর আসতে পারবে না।

রাহুল সংলাপ ভুলে যাচ্ছিল। তৃষা মঞ্চে উঠলেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলছিল। মেঘলা নিজে নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেও তার সংলাপ বলতে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছিল।

একদিন বিরক্ত হয়ে অয়ন বলল, —আমাদের দিয়ে হবে না। এত ঝামেলা করে লাভ কী?

মেঘলারও মন খারাপ হচ্ছিল। সে বলল, —ভুল তো হবেই। প্রথম দিনেই সবাই ভালো অভিনয় করতে পারলে মহড়ার দরকার হতো না।

তবু সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না।

তখন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হরিপদবাবু তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। তিনি একসময় গ্রামের নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মহড়া দেখে তিনি বললেন, —তোমরা সংলাপ মুখস্থ করার চেষ্টা করছ, কিন্তু চরিত্রটা বোঝার চেষ্টা করছ না। আগে ভাবো, তোমরা যে মানুষটির অভিনয় করছ, সে কেন এই কথাটি বলছে। তারপরে সংলাপ বলো।

তিনি তাদের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং মঞ্চে দাঁড়ানোর সহজ কিছু কৌশল শেখালেন।

মেঘলা বুঝল, শুধু উৎসাহ থাকলেই হয় না। কাজকে ভালোভাবে করতে হলে অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শেখাও জরুরি।

৫. গ্রামের মানুষের কাছে আবেদন

মঞ্চটি সংস্কার না করলে নাটক করা সম্ভব ছিল না। ছাদ থেকে জল পড়ত, কাঠের কয়েকটি তক্তা ভাঙা ছিল, আর পেছনের দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছিল।

মেঘলা ও তার বন্ধুরা গ্রামের মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে শুরু করল। তারা কাউকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে বলল না। কেউ বাঁশ দিতে পারলে বাঁশ, কেউ রং দিতে পারলে রং, কেউ শ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারলে শ্রম—এই ছিল তাদের আবেদন।

প্রথম দিকে অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন না।

একজন বললেন, —এখনকার ছেলেমেয়েরা দুদিন উৎসাহ দেখায়, তারপর সব বন্ধ হয়ে যায়।

আরেকজন বললেন, —নাটক করে কী হবে? তার চেয়ে পড়াশোনায় মন দাও।

মেঘলা কারও সঙ্গে তর্ক করল না। সে শুধু বলল, —আমরা চেষ্টা করতে চাই। কাজটা শেষ করতে পারলে আপনারা নিজেরাই বিচার করবেন।

হরিপদবাবু গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চটি পরীক্ষা করলেন। কোথায় মেরামত দরকার, কোন কাজ অভিজ্ঞ কারিগরের সাহায্যে করতে হবে—সেগুলি ঠিক করা হলো। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে বড়দের তত্ত্বাবধানে সংস্কারের কাজ শুরু হলো।

দোকানদার নিবারণবাবু কিছু রং দিলেন। কাঠের মিস্ত্রি অল্প পারিশ্রমিকে কয়েকটি তক্তা মেরামত করতে রাজি হলেন। কয়েকজন যুবক পরিষ্কারের কাজে হাত লাগালেন।

সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা ঘটল যখন রঘুনাথ কাকু, যিনি প্রথমে মেঘলার পরিকল্পনায় হাসাহাসি করেছিলেন, তিনি নিজের হাতে কিছু বাঁশ এনে দিলেন।

তিনি বললেন, —ছোটবেলায় আমিও এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলাম। আবার যদি নাটক হয়, আমিও দেখতে আসব।

মেঘলার মনে হলো, তাদের নাটক শুরু হওয়ার আগেই গ্রামের মানুষের মধ্যে এক অদৃশ্য পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে।

৬. যে মেয়েটি কথা বলতে ভয় পেত

নাটকের একটি চরিত্র ছিল গ্রামের এমন এক মেয়ে, যে ভালো গান গাইতে পারে, কিন্তু মানুষের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। এই চরিত্রটির জন্য তারা খুঁজছিল একজন উপযুক্ত অভিনেত্রী।

তখন তৃষা গ্রামের এক কিশোরীর নাম প্রস্তাব করল। তার নাম পিয়ালি। পিয়ালি পড়াশোনায় ভালো ছিল, ছবি আঁকত, গানও গাইত। কিন্তু মানুষের সামনে কথা বলতে গেলে সে ভয় পেত।

প্রথমে পিয়ালি রাজি হলো না।

—আমি পারব না। সবাই হাসবে।

মেঘলা বলল, —ভুল করলে আমরা একসঙ্গে ঠিক করে নেব। কেউ কাউকে নিয়ে হাসব না।

পিয়ালি মহড়ায় আসতে শুরু করল। প্রথম দিন সে একটি সংলাপ বলতেই থেমে গেল। দ্বিতীয় দিনও খুব বেশি বলতে পারল না। কিন্তু কেউ তাকে তাড়া দিল না।

হরিপদবাবু বললেন, —মঞ্চে ওঠা মানেই প্রথম দিন থেকে নিখুঁত হওয়া নয়। নিজের ভয়কে একটু একটু করে চিনতে শেখাই প্রথম কাজ।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পিয়ালির পরিবর্তন দেখা গেল। সে শুধু নিজের সংলাপই ভালোভাবে বলতে শিখল না, অন্যদের ভুলও ধরিয়ে দিতে লাগল।

একদিন মহড়া শেষে সে মেঘলাকে বলল, —জানিস, আগে ভাবতাম আমি কিছুই পারি না। এখন বুঝছি, আমি চেষ্টা করার সুযোগটাই নিইনি।

মেঘলা তার হাত ধরে বলল, —আমাদের মঞ্চে সবাই নতুন করে শুরু করতে পারে।

৭. নাটকের দিন

অবশেষে নাটকের দিন এসে গেল। শীতের সন্ধ্যা। মঞ্চের সামনে গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছেন। কেউ চেয়ারে বসেছেন, কেউ মাদুর পেতে। শিশুরা সামনের দিকে বসে অপেক্ষা করছে।

মেঘলার বুক ধুকপুক করছিল। সে বারবার নিজের সংলাপ মনে করার চেষ্টা করছিল।

ঠিক তখনই খবর এল, নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল যে ছেলেটির, সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে আসতে পারবে না।

দলের সবাই চিন্তায় পড়ে গেল।

অয়ন বলল, —এখন কী হবে? ওই চরিত্র বাদ দিলে গল্পটাই বদলে যাবে!

মেঘলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, —আমরা সংলাপগুলো ভাগ করে নেব। যে যতটা পারি, সাহায্য করব। গল্পের মূল কথাটা যেন ঠিক থাকে।

সবাই দ্রুত আলোচনা করে ব্যবস্থা করল। একজনের সংলাপ অন্য দুজন ভাগ করে নিল। কিছু দৃশ্য ছোট করা হলো। তবু নাটকের মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ণ রইল।

পর্দা উঠল।

প্রথম দৃশ্যে কয়েকজনের সংলাপ একটু এলোমেলো হলো। দর্শকদের মধ্যে সামান্য হাসির শব্দ উঠল। কিন্তু কেউ কাউকে থামিয়ে দিল না। অভিনয় এগিয়ে চলল।

পিয়ালির দৃশ্য আসতেই মঞ্চে নীরবতা নেমে এল। সে ধীরে ধীরে নিজের সংলাপ বলল। তার কণ্ঠ প্রথমে কাঁপছিল, কিন্তু শেষের দিকে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

তারপর এল মেঘলার দৃশ্য।

সে বলল, —একটি মঞ্চ শুধু অভিনয়ের জায়গা নয়। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে আমরা অন্যের কথা শুনতে শিখি, নিজের ভুল বুঝতে শিখি, আর বুঝতে পারি—আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আছে।

দর্শকদের মধ্যে করতালি শুরু হলো।

নাটকের শেষ দৃশ্যে গ্রামের সব চরিত্র একসঙ্গে মঞ্চে দাঁড়াল। কেউ বলল, মানুষকে সুযোগ দিতে হবে। কেউ বলল, অন্যের প্রতিভাকে সম্মান করতে হবে। কেউ বলল, গ্রামের উন্নতি শুধু একজনের কাজ নয়, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

নাটক শেষ হলে করতালিতে ভরে উঠল চারপাশ।

মেঘলা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার বাবা-মা সামনের সারিতে বসে হাসছেন। দিদার চোখে জল চিকচিক করছে। হরিপদবাবু সন্তুষ্ট মুখে মাথা নাড়ছেন।

মেঘলার মনে হলো, এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

৮. সাফল্যের পরেও কাজ বাকি

পরদিন সকালে মেঘলা স্কুলে যাওয়ার পথে মঞ্চটির সামনে দাঁড়াল। আগের সেই ভাঙাচোরা জায়গাটি এখন পরিষ্কার। দেয়ালে নতুন রং, সামনে ছোট্ট বাগান, আর পাশে একটি বোর্ডে লেখা—‘আমাদের সবার মঞ্চ’।

কিন্তু মেঘলা জানত, একটি সফল অনুষ্ঠানই শেষ কথা নয়।

সে বন্ধুদের নিয়ে ঠিক করল, মাসে অন্তত একবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। শুধু নাটক নয়, কবিতা পাঠ, গল্প বলা, লোকসংগীত, ছোটদের আবৃত্তি—সব কিছুর জন্য মঞ্চটি খোলা থাকবে।

তারা আরও সিদ্ধান্ত নিল, মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে এবং অর্থের অভাবে কেউ যাতে বাদ না পড়ে, তার চেষ্টা করা হবে। পোশাক বা সাজসজ্জার জন্য অতিরিক্ত খরচ না করে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হবে।

কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের মানুষ মঞ্চটিকে নিজেদের জায়গা হিসেবে ভাবতে শুরু করলেন। কেউ নিজের লেখা কবিতা নিয়ে এলেন, কেউ পুরোনো লোকগান শেখাতে চাইলেন, কেউ শিশুদের গল্প বলার আসর আয়োজন করলেন।

একদিন সন্ধ্যায় দিদা মেঘলাকে বললেন, —তুই শুধু একটা নাটক করিসনি রে। তুই গ্রামের মানুষকে আবার একসঙ্গে বসার একটা কারণ দিয়েছিস।

মেঘলা হেসে বলল, —আমি একা কিছুই করতে পারতাম না দিদা। সবাই সাহায্য করেছে বলেই সম্ভব হয়েছে।

দিদা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, —সেই তো আসল শিক্ষা। যে স্বপ্ন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা যায়, সেই স্বপ্নের শিকড় অনেক গভীরে যায়।

৯. নতুন প্রজন্মের আলো

এক বছর পরে গ্রামের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেঘলাকে ছোটদের উদ্দেশে কিছু বলতে বলা হলো।

মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে সে দেখল, প্রথম সারিতে বসে আছে কয়েকটি ছোট মেয়ে। তাদের চোখে সেই একই কৌতূহল, যা একসময় তার নিজের চোখে ছিল।

মেঘলা বলল, —তোমরা কেউ ভাববে না যে মঞ্চে দাঁড়ানোর অধিকার শুধু সাহসী বা খুব ভালো অভিনয় করতে পারা মানুষের। কেউ গান গাইতে পারো, কেউ গল্প বলতে পারো, কেউ সাজসজ্জা করতে পারো, কেউ আলো বা শব্দের কাজে সাহায্য করতে পারো। প্রত্যেকের কাজের মূল্য আছে।

সে আরও বলল, —কোনো কাজ শুরু করার আগে সবকিছু নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষা করলে অনেক স্বপ্নই শুরু হবে না। ছোট করে শুরু করো, ভুল থেকে শেখো, আর অন্যের সাহায্য নিতে লজ্জা পেয়ো না।

সেদিন অনুষ্ঠান শেষে একটি ছোট মেয়ে মেঘলার কাছে এসে বলল, —দিদি, আমিও নাটক করতে চাই। কিন্তু আমার খুব ভয় করে।

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

—তাহলে পরের মহড়ায় চলে এসো। আমরা একসঙ্গে চেষ্টা করব।

মঞ্চের ওপর তখনও আলো জ্বলছিল। চারপাশে মানুষের কথাবার্তা, শিশুদের হাসি আর গুছিয়ে নেওয়ার শব্দ।

মেঘলা বুঝল, তার স্বপ্ন কোনো একদিনের করতালিতে শেষ হয়নি। সেই স্বপ্ন এখন অন্য মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

একটি পরিত্যক্ত মঞ্চ আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে, কারণ একজন কিশোরী বিশ্বাস করেছিল—পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় ক্ষমতা বা অনেক টাকা লাগে না। কখনও কখনও লাগে একটি সৎ ইচ্ছা, কয়েকজন সহযাত্রী এবং প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস।

শিক্ষা: নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার পাশাপাশি অন্যকে সুযোগ করে দেওয়াও বড় সাফল্য। সম্মিলিত উদ্যোগে একটি ছোট স্বপ্নও গোটা সমাজের আনন্দ ও আত্মবিশ্বাসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

এক মুঠো মাটির জন্য।

১. যে জমিতে আর ফসল হতো না

পূর্ব মেদিনীপুরের এক গ্রাম, নাম উত্তর কাশীপুর। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় ধান, শীতকালে সবজি আর গরমকালে তিল কিংবা ডাল চাষ করেই বহু পরিবারের সংসার চলত।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে গ্রামের কৃষকদের মুখে হাসি কমে আসছিল। কোথাও জমিতে আগের মতো ফসল হচ্ছিল না, কোথাও গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছিল, আবার কোথাও সামান্য সার দিলেও ফলন বাড়ছিল না। কৃষকেরা বুঝতে পারছিলেন, জমির মধ্যে কোথাও একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা ঠিক কী, তা তাঁরা জানতেন না।

সেই গ্রামেই থাকত সতেরো বছরের মেয়ে ইলা। তার বাবা নিতাই মণ্ডল ছিলেন কৃষক। তাঁদের অল্প কয়েক বিঘা জমি ছিল। সেই জমির ফসল বিক্রি করেই সংসারের বেশিরভাগ খরচ চলত।

ইলা ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে যেত। কখনও বীজ বাছতে সাহায্য করত, কখনও ধানের চারা রোপণের সময় মায়ের পাশে বসে থাকত। মাঠের মাটি তার কাছে শুধু ধুলোবালি ছিল না; সে জানত, এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের পরিবারের প্রতিটি দিনের হিসাব।

একদিন সকালে বাবা মাঠ থেকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —এবারও জমির এক অংশে ধান ভালো হলো না। এত সার দিয়েও লাভ হলো না।

মা চিন্তিত হয়ে বললেন, —তাহলে এ বছর ঋণের টাকা শোধ হবে কী করে?

বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।

দরজার পাশে বসে ইলা সব শুনছিল। তার মনে প্রশ্ন জাগল, এত পরিশ্রমের পরও জমি কেন আগের মতো ফসল দিচ্ছে না?

সেদিন থেকেই সে সমস্যার উত্তর খুঁজতে শুরু করল।

২. বিজ্ঞানের ক্লাসে নতুন প্রশ্ন

ইলা তখন উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল। তাদের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক প্রশান্তবাবু একদিন মাটির গঠন, উদ্ভিদের পুষ্টি এবং কৃষির ওপর পরিবেশের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

ইলা হাত তুলে জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, একই জমিতে বারবার চাষ করলে কি মাটির গুণাগুণ বদলে যেতে পারে?

শিক্ষক বললেন, —অবশ্যই। ফসলের ধরন, সারের ব্যবহার, জল নিষ্কাশন, মাটির অম্লত্ব কিংবা ক্ষারত্ব—অনেক বিষয়ই জমির উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। তবে কোনো জমিতে সমস্যা হলে অনুমান করে ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক নয়। মাটির পরীক্ষা করানো দরকার।

ইলা মন দিয়ে কথাগুলো শুনল।

ক্লাসের পরে সে শিক্ষকের কাছে গিয়ে নিজের গ্রামের সমস্যার কথা জানাল।

প্রশান্তবাবু বললেন, —তুমি চাইলে স্কুলের বিজ্ঞান প্রকল্প হিসেবে বিষয়টা নিয়ে কাজ করতে পারো। প্রথমে কৃষকদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করো। তারপর কৃষি দপ্তর বা মাটি পরীক্ষার উপযুক্ত কেন্দ্রের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করো।

ইলার চোখে নতুন স্বপ্ন জ্বলে উঠল।

সে ঠিক করল, শুধু বাবার জমি নয়, গ্রামের অন্য কৃষকদের জমির সমস্যাও বোঝার চেষ্টা করবে।

৩. গ্রামের মানুষের অবিশ্বাস

পরের কয়েক দিন ইলা গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কেউ বললেন, আগের মতো বৃষ্টি হয় না। কেউ বললেন, সার নকল হতে পারে। কেউ আবার বিশ্বাস করতেন, জমির ওপর কোনো অশুভ প্রভাব পড়েছে।

ইলা প্রত্যেকের কথা মন দিয়ে শুনত এবং খাতায় লিখে রাখত।

একদিন সে গ্রামের প্রবীণ কৃষক রঘুনাথ কাকুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, —কাকু, আপনার জমিতে কোন ফসল ভালো হয় আর কোনটা হয় না, সেটা কি লিখে রাখেন?

রঘুনাথ কাকু হেসে বললেন, —এত দিন ধরে চাষ করছি, সব মুখস্থ আছে। আবার লিখে রাখব কেন?

ইলা বলল, —লিখে রাখলে হয়তো বোঝা যাবে, কোন বছরে কী পরিবর্তন হয়েছে।

তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, —তুই এখনও ছোট। বই পড়ে চাষ শেখা যায় না। মাঠে নামলে বুঝবি।

কথাটা শুনে ইলার খারাপ লাগল। কিন্তু সে জানত, কৃষকদের অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে শুধু বইয়ের কথা বললে চলবে না।

সে বাবাকে বলল, —আমি কারও অভিজ্ঞতাকে ভুল বলতে চাই না। শুধু জানতে চাই, আমাদের জমিতে ঠিক কী সমস্যা হয়েছে।

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, —তাহলে খুঁজে দেখ। তবে মনে রাখিস, মাঠের কাজে সময় আর টাকা দুটোই লাগে।

ইলা মাথা নাড়ল।

৪. এক মুঠো মাটির পরীক্ষা

প্রশান্তবাবুর সাহায্যে ইলা জানতে পারল, কাছাকাছি কৃষি সহায়তা কেন্দ্রে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে মাটির নমুনা সংগ্রহের নিয়মও শেখানো হয়।

সে কয়েকজন কৃষককে নিয়ে কেন্দ্রে গেল। কর্মীরা তাদের বোঝালেন, জমির বিভিন্ন অংশ থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে মাটি সংগ্রহ করতে হয়। শুধু এক জায়গা থেকে এক মুঠো মাটি তুলে পরীক্ষা করলে সব সময় পুরো জমির অবস্থা বোঝা যায় না।

ইলা মন দিয়ে নিয়মগুলো লিখে নিল।

তারপর বাবার জমির নির্দিষ্ট অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হলো। অন্য কয়েকজন কৃষকও তাঁদের জমির নমুনা পরীক্ষার জন্য দিলেন।

ফলাফল পেতে কিছুটা সময় লাগল। সেই সময়টায় ইলা জমির ইতিহাস লিখে রাখল—কোন বছরে কী ফসল হয়েছে, কী ধরনের সার ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় জল জমে থাকে এবং কোন অংশে গাছ বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরে সে বুঝল, সব জমির সমস্যা এক নয়। কোনো জমিতে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ইঙ্গিত রয়েছে, কোথাও মাটির অম্লত্ব পরীক্ষা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন, আবার কোথাও জল নিষ্কাশনের সমস্যাও থাকতে পারে।

কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীরা রিপোর্ট অনুযায়ী পরামর্শ দিলেন। তাঁরা জানালেন, মাটির পরীক্ষার ফল বুঝে তবেই সার ব্যবহার করতে হবে। নিজের ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত সার দিলে খরচ বাড়তে পারে, মাটির ক্ষতিও হতে পারে।

ইলা রিপোর্টটি বাবার হাতে দিয়ে বলল, —দেখো বাবা, সব জমিতে একই ব্যবস্থা নিলে হবে না। জমি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিতাইবাবু রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

৫. প্রথম পরিবর্তন

কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে নিতাইবাবু জমির সমস্যাযুক্ত অংশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনলেন। সারের ব্যবহার ঠিক করা হলো, জমির জল নিষ্কাশনের দিকে নজর দেওয়া হলো এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নতুন কিছু পদ্ধতি শেখা হলো।

ইলা বাবাকে বলল, —আমরা এবার ফলন কত হবে, সেটা আগে থেকে ধরে নেব না। বরং কী কী পরিবর্তন করলাম, সেটা লিখে রাখব।

বাবা হেসে বললেন, —তোর এই খাতাটা এখন আমার জমির নতুন হিসাবের বই হয়ে গেছে!

ইলা প্রতিদিন মাঠে গিয়ে গাছের অবস্থা লক্ষ করত। পাতার রং, গাছের বৃদ্ধি, জমিতে জল জমছে কি না—সব নোট করত। সে বুঝতে পারছিল, কৃষিকাজে একবার ব্যবস্থা নিলেই সঙ্গে সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান হয় না।

কিছুদিন পরে গাছের বৃদ্ধি আগের তুলনায় ভালো দেখা গেল। তবে সব অংশে সমান পরিবর্তন হয়নি। কোথাও আরও পরীক্ষা ও পরামর্শের প্রয়োজন ছিল।

ইলা বিষয়টি লুকোল না। সে প্রশান্তবাবুকে বলল, —স্যার, কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সব সমস্যা মেটেনি।

শিক্ষক বললেন, —এটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞান মানে একবার পরীক্ষা করে সব উত্তর পেয়ে যাওয়া নয়। ফলাফল দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করাও বিজ্ঞানের অংশ।

৬. কৃষকদের সভা

ইলার কাজের কথা ধীরে ধীরে গ্রামের অন্য কৃষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। একদিন রঘুনাথ কাকু নিজেই তার কাছে এসে বললেন, —শুনলাম, তোর বাবার জমিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আমার জমিতেও কয়েক বছর ধরে সমস্যা হচ্ছে। কী করা যায় বল তো?

ইলা বলল, —প্রথমে মাটি পরীক্ষা করানো ভালো। আপনার জমির সমস্যাটা বাবার জমির মতো নাও হতে পারে।

রঘুনাথ কাকু এবার আর আপত্তি করলেন না।

প্রশান্তবাবুর উদ্যোগে গ্রামের কৃষকদের নিয়ে একটি আলোচনা সভা হলো। সেখানে কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের একজন কর্মী মাটির স্বাস্থ্য, সারের সঠিক ব্যবহার, ফসলের পর্যায়ক্রম এবং জল সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা করলেন।

ইলা তার খাতায় লেখা পর্যবেক্ষণগুলো দেখাল। সে স্পষ্ট করে বলল, তার কাজ কোনো বিশেষজ্ঞের বিকল্প নয়। বরং কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে সুবিধা হবে।

একজন কৃষক প্রশ্ন করলেন, —মাটি পরীক্ষা করালে কি প্রতি বছরই একই রকম ফল পাওয়া যায়?

কর্মী বুঝিয়ে বললেন, —মাটির অবস্থা সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কত ঘন ঘন পরীক্ষা করা দরকার, তা জমির অবস্থা ও স্থানীয় পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করতে হয়।

সভা শেষে কয়েকজন কৃষক একসঙ্গে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে যোগাযোগ ও যাতায়াতের খরচও কিছুটা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হলো।

ইলার মনে হলো, তার ছোট্ট খাতাটি এবার অনেকের কাজে লাগতে শুরু করেছে।

৭. ঝড়ের মতো নতুন বিপদ

সবকিছু যখন একটু একটু করে ঠিক হচ্ছে, তখন এক বছর অনিয়মিত বৃষ্টিতে গ্রামের কৃষকেরা নতুন সমস্যায় পড়লেন। কখনও অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টি, কখনও আবার দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। কিছু জমিতে জল জমে গাছের ক্ষতি হলো, অন্য জমিতে মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ল।

ইলার বাবাও চিন্তায় পড়লেন।

—মাটি পরীক্ষা করিয়ে কিছুটা বুঝতে পারলাম, কিন্তু আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেব?

ইলা এবার কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীদের কাছে জানতে চাইল, স্থানীয় পরিস্থিতিতে কোন ব্যবস্থা উপযোগী হতে পারে।

তাঁরা জমির ধরন অনুযায়ী জল নিষ্কাশন, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার পদ্ধতি, ফসলের সময় নির্বাচন এবং উপযুক্ত জাত সম্পর্কে পরামর্শ দিলেন। সব ব্যবস্থা সব জমিতে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়—সেটাও তাঁরা স্পষ্ট করে জানালেন।

গ্রামের কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন। যাঁদের জমিতে জল বেশি জমে, তাঁরা নিষ্কাশনের সমস্যার কথা বললেন। যাঁদের জমিতে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, তাঁরা আর্দ্রতা ধরে রাখার অভিজ্ঞতা জানালেন।

ইলা বুঝল, কৃষির সমস্যা শুধু এক মুঠো মাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবহাওয়া, জল, ফসলের ধরন, অর্থনৈতিক সামর্থ্য—সবকিছুর সঙ্গে মাটির সম্পর্ক রয়েছে।

৮. স্কুলের বিজ্ঞান মেলায়

সেই বছর স্কুলে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হলো। ইলা তার প্রকল্পের নাম দিল—‘আমাদের মাটি, আমাদের ভবিষ্যৎ’।

তার টেবিলে রাখা হলো মাটির নমুনা, পর্যবেক্ষণের খাতা, কৃষি সহায়তা কেন্দ্রের রিপোর্টের ব্যাখ্যা এবং জমির পরিবর্তনের নথি। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করে সে দেখাল, কীভাবে পরীক্ষা ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কৃষির সমস্যাকে ভালোভাবে বোঝা যায়।

বিচারকদের একজন প্রশ্ন করলেন, —তোমার প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?

ইলা বলল, —আমি এমন কোনো আবিষ্কার করিনি, যা সব কৃষকের সমস্যার সমাধান করবে। আমি শিখেছি, একই সমস্যা মনে হলেও জমির প্রকৃত অবস্থা আলাদা হতে পারে। তাই অনুমানের বদলে পরীক্ষা, তথ্য আর বিশেষজ্ঞের পরামর্শের ওপর নির্ভর করা জরুরি।

আরেকজন বিচারক জানতে চাইলেন, —তোমার এই কাজ ভবিষ্যতে কীভাবে এগোতে পারে?

ইলা বলল, —আমরা গ্রামের কৃষকদের জমির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য লিখে রাখতে পারি। কোন ফসল হয়েছে, কী সমস্যা দেখা দিয়েছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব নথি থাকলে পরের বার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। তবে প্রতিটি জমির জন্য উপযুক্ত পরামর্শ কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেই নিতে হবে।

তার প্রকল্পটি বিশেষ প্রশংসা পেল। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় বিষয় ছিল, কয়েকজন শিক্ষক এবং কৃষি বিশেষজ্ঞ তার কাজকে আরও উন্নত করার জন্য পরামর্শ দিতে রাজি হলেন।

৯. মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক

সময়ের সঙ্গে ইলা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। তার ইচ্ছে কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা। সে জানত, পথটা সহজ হবে না। পড়াশোনার খরচ, পরিবারের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সবই তাকে ভাবাত।

তবু সে নিজের খাতা গুছিয়ে রাখত। সেখানে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, কৃষকদের অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন এবং পরবর্তী সময়ে কী পরীক্ষা করা দরকার, তার তালিকাও থাকত।

একদিন বিকেলে বাবা তাকে মাঠে ডাকলেন। ধানের চারা বাতাসে দুলছিল। নিতাইবাবু এক মুঠো মাটি তুলে মেয়ের হাতে দিলেন।

—বল তো, এই মাটির মধ্যে কী আছে?

ইলা মাটি হাতে নিয়ে বলল, —অনেক কিছু। খনিজ, জৈব পদার্থ, জল, বাতাস, অসংখ্য ক্ষুদ্র জীব। আর আমাদের মতো কৃষকদের জীবিকাও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বাবা মৃদু হেসে বললেন, —তুই আগে মাটিকে শুধু আমাদের জমি বলে চিনতিস। এখন দেখছি, তুই মাটির মধ্যে একটা গোটা পৃথিবী দেখতে শিখেছিস।

ইলা বলল, —মাটি ভালো রাখার দায়িত্বও আমাদের। শুধু বেশি ফসল হলেই চলবে না, জমির স্বাস্থ্যও বুঝতে হবে।

বাবা মাথা নাড়লেন।

সন্ধ্যা নেমে আসছিল। দূরে কয়েকজন কৃষক নিজেদের জমির দিকে যাচ্ছিলেন। কেউ সেচের ব্যবস্থা দেখবেন, কেউ পরদিনের কাজের পরিকল্পনা করবেন।

ইলা জানত, তার গ্রামের সব সমস্যা এখনও মেটেনি। কোনো কোনো জমিতে আরও পরীক্ষা দরকার, কোনো পরিবার আর্থিক সমস্যায় রয়েছে, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। কিন্তু একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে—মানুষ এখন প্রশ্ন করছে, তথ্য সংগ্রহ করছে, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছে এবং একে অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছে।

সে মুঠোয় ধরা মাটিটুকু ধীরে ধীরে জমিতে ফিরিয়ে দিল।

তার মনে হলো, এই এক মুঠো মাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে শুধু ফসলের সম্ভাবনা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্বও।

কারণ, মাটিকে বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু জমিকে উর্বর রাখা নয়; মানুষের পরিশ্রম, কৃষকের সম্মান এবং আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তাকে রক্ষা করা।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

যে মানুষটি ভাঙা খেলনায় প্রাণ ফিরিয়ে দিত।

১. পুরোনো বাজারের ছোট্ট দোকান

পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট শহরের নাম আনন্দপুর। শহরের মাঝখানে সপ্তাহে দুদিন বসত বড় বাজার। সেখানে সবজি, মাছ, কাপড়, বাসনপত্র থেকে শুরু করে নানা রকম জিনিস বিক্রি হতো। বাজারের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট্ট দোকান। দোকানটির সামনে কাঠের একটি বোর্ডে লেখা ছিল—‘খেলনা মেরামত করা হয়’।

দোকানের মালিক ছিলেন ষাট পেরোনো এক বৃদ্ধ। তাঁর নাম নিবারণ পাল। বহু বছর আগে তিনি কাঠের খেলনা তৈরি করতেন। পরে প্লাস্টিকের তৈরি সস্তা খেলনার বাজার বেড়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যবসা কমে যায়। নতুন খেলনা তৈরির কাজ প্রায় বন্ধ করে দিতে হলেও পুরোনো খেলনা সারানোর কাজ তিনি ছাড়েননি।

প্রতিদিন সকালে তিনি দোকান খুলতেন, ছোট্ট টেবিলের ওপর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখতেন, তারপর অপেক্ষা করতেন কোনো শিশু কিংবা অভিভাবক ভাঙা খেলনা নিয়ে আসবেন।

কেউ নিয়ে আসত চাকা খুলে যাওয়া গাড়ি, কেউ নিয়ে আসত হাত ভেঙে যাওয়া পুতুল, আবার কেউ নিয়ে আসত এমন একটি খেলনা, যার শব্দ আর হচ্ছিল না।

নিবারণবাবু প্রতিটি খেলনাকে খুব যত্ন করে দেখতেন। তাঁর কাছে ভাঙা খেলনা মানে বাতিল জিনিস নয়। বরং এমন একটি জিনিস, যার মধ্যে কারও স্মৃতি, আনন্দ কিংবা ভালোবাসা জড়িয়ে রয়েছে।

একদিন তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দশ বছরের একটি ছেলে প্রশ্ন করল, —কাকু, ভাঙা খেলনা সারিয়ে কী হবে? নতুন একটা কিনে নিলেই তো হয়!

নিবারণবাবু মৃদু হেসে বললেন, —নতুন খেলনা কিনলে খেলতে পারবি। কিন্তু পুরোনো খেলনাটার সঙ্গে যে গল্প জড়িয়ে আছে, সেটা কোথা থেকে কিনবি?

ছেলেটি কথাটার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না। কিন্তু বৃদ্ধের মুখের হাসিটা তার মনে থেকে গেল।

২. ছোট্ট অর্কের লাল গাড়ি

সেই শহরেই থাকত অর্ক নামে একটি ছেলে। অর্কের বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা কয়েকটি বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন। সংসারে খুব বেশি টাকা না থাকলেও তাঁরা ছেলের ছোট ছোট আনন্দের দিকে খেয়াল রাখতেন।

অর্কের সবচেয়ে প্রিয় খেলনা ছিল একটি লাল রঙের ছোট্ট গাড়ি। গাড়িটি তাকে কিনে দিয়েছিলেন তার বাবা, যখন অর্ক প্রথমবার স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল।

সেদিন বাবা কাজ থেকে ফিরে ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, —তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করেছিস। আমার পক্ষে বড় কিছু কেনা সম্ভব নয়। তবে এটা তোর জন্য।

লাল গাড়িটি হাতে পেয়ে অর্কের আনন্দের সীমা ছিল না। সে গাড়িটিকে কখনও বিছানার পাশে, কখনও পড়ার টেবিলের নিচে, আবার কখনও নিজের বালিশের কাছে রাখত।

একদিন বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে গাড়িটির সামনের চাকা ভেঙে গেল। অর্ক অনেক চেষ্টা করেও সেটি ঠিক করতে পারল না।

সে গাড়িটিকে বুকে চেপে বাড়ি ফিরল। মা বললেন, —কী হয়েছে?

অর্ক কাঁদতে কাঁদতে বলল, —গাড়িটা ভেঙে গেছে। বাবা অনেক কষ্ট করে কিনে দিয়েছিল।

মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, —দেখি, কোথাও সারানো যায় কি না।

পরদিন মা অর্ককে নিয়ে নিবারণবাবুর দোকানে গেলেন।

বৃদ্ধ গাড়িটি হাতে নিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, —চাকাটা ভেঙেছে, কিন্তু গাড়িটা একেবারে নষ্ট হয়নি। চেষ্টা করলে ঠিক করা যাবে।

অর্ক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, —সত্যি পারবেন?

—চেষ্টা না করলে বুঝব কী করে?

নিবারণবাবু গাড়িটি সারাতে শুরু করলেন। প্রয়োজনীয় ছোট্ট একটি অংশ বদলে, চাকার সংযোগ ঠিক করে এবং গাড়ির নিচের অংশ পরিষ্কার করে তিনি সেটিকে আবার চলার উপযোগী করে তুললেন।

গাড়িটি টেবিলের ওপর ছেড়ে দিতেই সেটি গড়িয়ে গেল।

অর্ক আনন্দে চিৎকার করে উঠল, —গাড়িটা আবার চলছে!

নিবারণবাবু হেসে বললেন, —মনে রাখিস, ভেঙে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

৩. দোকানের ভেতরের রহস্য

অর্ক এরপর থেকে মাঝেমধ্যে নিবারণবাবুর দোকানে যেতে শুরু করল। কখনও সে ভাঙা খেলনা নিয়ে আসত, কখনও শুধু বসে বসে বৃদ্ধের কাজ দেখত।

দোকানের ভেতরে ছিল নানা রকম সরঞ্জাম—ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার, প্লায়ার্স, কাঠ ঘষার কাগজ, রং করার তুলি, আঠা এবং ছোট ছোট বাক্সে সাজানো যন্ত্রাংশ।

একদিন অর্ক দেখল, নিবারণবাবু একটি পুরোনো কাঠের ঘোড়া মেরামত করছেন। ঘোড়াটির একটি পা ভেঙে গিয়েছিল, গায়ের রংও উঠে গিয়েছিল।

অর্ক বলল, —কাকু, এত পুরোনো খেলনা সারাতে এত সময় দিচ্ছেন কেন? নতুন একটা কাঠের ঘোড়া বানিয়ে দিলেই তো পারেন।

বৃদ্ধ বললেন, —এই ঘোড়াটা একসময় একজন ছেলের খুব প্রিয় ছিল। তার মা খেলনাটা নিয়ে এসেছেন। ছেলেটি এখন অনেক বড় হয়েছে, কিন্তু খেলনাটা ফেলে দিতে পারেনি। বুঝলি, কোনো জিনিসের দাম শুধু তার বাজারদর দিয়ে মাপা যায় না।

অর্ক মাথা নাড়ল।

নিবারণবাবু তাকে ছোট একটি স্ক্রু-ড্রাইভার দেখিয়ে বললেন, —যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে শিখবি?

অর্কের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। —শিখব!

—তাহলে প্রথমে একটা কথা মনে রাখবি। কিছু মেরামত করার আগে বুঝতে হবে জিনিসটা কীভাবে কাজ করে। না বুঝে জোর করলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।

সেদিন থেকে অর্ক দোকানে বসে কাজ দেখা শুরু করল। বৃদ্ধ তাকে নিরাপদে সরঞ্জাম ধরতে শেখালেন। ধারালো যন্ত্র কিংবা বৈদ্যুতিক অংশ নিয়ে কাজ করার সময় বড়দের সাহায্য নেওয়ার নিয়মও বুঝিয়ে দিলেন।

অর্ক ধীরে ধীরে শিখল, ধৈর্য ছাড়া কোনো জিনিস ভালোভাবে মেরামত করা যায় না।

৪. যখন দোকান বন্ধ হওয়ার কথা উঠল

সময় যত এগোতে লাগল, বাজারের চেহারাও তত বদলাতে লাগল। বড় বড় দোকানে রঙিন খেলনা বিক্রি হতে শুরু করল। অনলাইনে অর্ডার করলেও খেলনা বাড়িতে পৌঁছে যেত।

অনেকেই আর পুরোনো খেলনা সারাতে চাইতেন না। সামান্য সমস্যা হলেই নতুন খেলনা কিনে নিতেন।

নিবারণবাবুর দোকানে ক্রেতা কমে গেল। একদিন বাজারের এক ব্যবসায়ী তাঁকে বললেন, —নিবারণদা, এই দোকান রেখে আর কত দিন চলবে? জায়গাটা ভাড়া দিলে ভালো টাকা পাবেন।

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, —দেখি, আর কিছুদিন চেষ্টা করি।

কিন্তু বাস্তবতা কঠিন ছিল। দোকানের ভাড়া, বিদ্যুতের খরচ আর নিজের ওষুধের খরচ জোগাড় করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল।

এক সন্ধ্যায় অর্ক দোকানে এসে দেখল, নিবারণবাবু পুরোনো সরঞ্জামগুলো বাক্সে ভরে রাখছেন।

—কাকু, আজ দোকান বন্ধ করছেন?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, —হয়তো আর বেশিদিন চালাতে পারব না রে। কাজ কমে গেছে। শরীরও আগের মতো নেই।

অর্কের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

—তাহলে ভাঙা খেলনাগুলো সারাবে কে?

নিবারণবাবু মৃদু হাসলেন। —মানুষ নতুন জিনিস কিনতে শিখেছে। পুরোনো জিনিস আগলে রাখার অভ্যাস হয়তো একদিন আবার ফিরবে।

কিন্তু অর্কের মনে প্রশ্ন জাগল—দোকানটা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একজন বৃদ্ধের কাজই হারিয়ে যাবে, নাকি আরও কিছু হারিয়ে যাবে?

৫. অর্কের নতুন ভাবনা

সেদিন বাড়ি ফিরে অর্ক অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তার লাল গাড়িটি টেবিলের ওপর রাখা ছিল। গাড়িটিকে দেখে তার মনে পড়ল, নিবারণবাবু না থাকলে হয়তো সেটি অনেক আগেই ফেলে দিতে হতো।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে তার শিক্ষিকা মধুমিতা দেবীর সঙ্গে কথা বলল। সব শুনে শিক্ষিকা বললেন, —তোমার ভাবনাটা ভালো। তবে শুধু আবেগ দিয়ে দোকান বাঁচানো যাবে না। এমন কিছু করতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে খেলনা মেরামতের উপকারিতা কী।

অর্ক জিজ্ঞাসা করল, —আমি কী করতে পারি, ম্যাডাম?

শিক্ষিকা বললেন, —স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করা যায়। সেখানে দেখানো হবে, কোন ধরনের খেলনা নিরাপদে মেরামত করা যায়, কোনগুলো পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য কমাতে মেরামত কীভাবে সাহায্য করে। নিবারণকাকুকে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।

অর্কের মাথায় নতুন পরিকল্পনা এল।

সে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে স্কুলে একটি উদ্যোগ শুরু করল—‘আবার ব্যবহার করি’।

প্রথমে তারা বাড়িতে থাকা অচল খেলনাগুলোর তালিকা তৈরি করল। তারপর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে নিরাপদ ও মেরামতযোগ্য খেলনাগুলো স্কুলে নিয়ে এল। ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত খেলনার মধ্যে কোনগুলো সারানো সম্ভব, তা নিবারণবাবু পরীক্ষা করে দেখবেন।

শিশুরা নিজেরা ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবে না। মেরামতের কাজ করবেন নিবারণবাবু কিংবা উপযুক্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তি।

অর্ক ও তার বন্ধুরা পোস্টার তৈরি করল। তাতে লেখা হলো—

‘ফেলে দেওয়ার আগে ভাবুন—মেরামত করা যায় কি না।’

৬. স্কুলের প্রদর্শনী

শনিবার স্কুলের হলঘরে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। টেবিলের ওপর রাখা হলো কিছু ভাঙা খেলনা, কিছু মেরামত করা খেলনা এবং কয়েকটি কাঠের খেলনা তৈরির নমুনা।

নিবারণবাবু প্রথমে আসতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, কয়েকজন শিশুর উদ্যোগে আর কী-ই বা হবে!

কিন্তু অর্ক নিজে তাঁর দোকানে গিয়ে বলল, —কাকু, আপনি না এলে প্রদর্শনীটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আপনি আমাদের শেখাবেন কীভাবে একটা খেলনা পরীক্ষা করতে হয়।

অবশেষে বৃদ্ধ রাজি হলেন।

প্রদর্শনীতে তিনি একটি খেলনা গাড়ি খুলে দেখালেন, কীভাবে চাকা ও অক্ষের সংযোগ কাজ করে। তারপর একটি কাঠের পুতুলের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করার পদ্ধতি বোঝালেন।

তিনি আরও বললেন, সব খেলনা মেরামত করা নিরাপদ নয়। ভাঙা ব্যাটারি, ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক তার, ধারালো অংশ বা ছোট হয়ে যাওয়া বিপজ্জনক যন্ত্রাংশ থাকলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কিছু খেলনা ফেলে দেওয়াই নিরাপদ হতে পারে।

শিশুরা মন দিয়ে শুনল।

একজন অভিভাবক প্রশ্ন করলেন, —নতুন খেলনা কেনার চেয়ে পুরোনো খেলনা সারালে কি সত্যিই লাভ হয়?

নিবারণবাবু উত্তর দিলেন, —যদি খেলনাটি নিরাপদে মেরামত করা যায়, তাহলে অল্প খরচে আবার ব্যবহার করা সম্ভব। এতে টাকা বাঁচে, অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যও কমে। তবে প্রতিটি খেলনা সারানো সম্ভব নয়—সেটা আগে বুঝতে হবে।

প্রদর্শনী শেষে কয়েকজন অভিভাবক তাঁদের পুরোনো খেলনা মেরামতের জন্য দিতে চাইলেন। স্কুলের শিক্ষকরা নিবারণবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিলেন।

বৃদ্ধের মুখে অনেকদিন পর স্বস্তির হাসি দেখা গেল।

৭. শুধু দোকান নয়, একটি কর্মশালা

প্রদর্শনী সফল হওয়ার পর অর্ক ও তার বন্ধুরা নতুন প্রস্তাব দিল। প্রতি মাসে একদিন স্কুলে ‘মেরামত শেখার কর্মশালা’ হবে। সেখানে নিবারণবাবু শিশুদের দেখাবেন কীভাবে সাধারণ খেলনার সমস্যা চেনা যায়, কাঠের খেলনা যত্নে রাখা যায় এবং জিনিসপত্র অকারণে নষ্ট না করে ব্যবহার করা যায়।

স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিল। তবে নিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার সিদ্ধান্ত হলো।

কর্মশালার প্রথম দিনে অর্ক একটি ছোট কাঠের ট্রেন নিয়ে এল। ট্রেনটির একটি চাকা ঢিলে হয়ে গিয়েছিল।

নিবারণবাবু তাকে বললেন, —আগে ভালো করে দেখ। কোথায় সমস্যা হয়েছে, সেটা বোঝার চেষ্টা কর।

অর্ক ট্রেনটি ঘুরিয়ে দেখল। তারপর বলল, —চাকাটার সংযোগটা ঢিলে হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

—ঠিক বলেছিস। এবার আমি দেখাচ্ছি কীভাবে নিরাপদে সেটা ঠিক করা যায়।

নিবারণবাবুর সাহায্যে ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

অর্কের মনে হলো, সে যেন শুধু একটি খেলনা সারায়নি; একটি নতুন দক্ষতা শিখেছে।

কর্মশালায় গ্রামের কয়েকজন তরুণও যোগ দিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কাঠের কাজ জানতেন, কেউ ছোটখাটো যন্ত্র মেরামত করতে পারতেন। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে লাগলেন।

ধীরে ধীরে নিবারণবাবুর দোকানে কাজের পরিমাণও বাড়তে শুরু করল। তিনি আবার নতুন করে কাঠের কয়েকটি খেলনা তৈরি করার সাহস পেলেন।

৮. যে উপহারটি নতুন ছিল না

কয়েক মাস পরে অর্কের জন্মদিন এল। বাবা-মা তাকে নতুন খেলনা কিনে দিতে চাইলেন। কিন্তু অর্ক বলল, —এবার আমি একটা নতুন খেলনা চাই না। আমার পুরোনো লাল গাড়িটাকে একটু সাজিয়ে দিতে চাই।

বাবা অবাক হয়ে বললেন, —সেটা তো আগেই সারানো হয়েছে!

অর্ক বলল, —হ্যাঁ, কিন্তু এখন গাড়িটার গায়ের রং উঠে গেছে। নিবারণকাকুর সাহায্যে নতুন করে রং করব। আর নিচে একটা ছোট্ট লেখা লাগাব।

—কী লেখা?

অর্ক হাসল। —‘বাবার প্রথম উপহার’।

জন্মদিনের দিন নিবারণবাবু গাড়িটির গায়ে নতুন রং করলেন। চাকার সংযোগ পরীক্ষা করলেন এবং নিরাপদভাবে ছোট্ট একটি ফলক লাগিয়ে দিলেন।

অর্ক গাড়িটি বাবার হাতে দিয়ে বলল, —এটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে। আমি চাই, এটা আরও অনেক দিন আমার কাছে থাকুক।

বাবার চোখ ভিজে উঠল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

নিবারণবাবু একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন। তাঁর মনে হলো, এতদিন ধরে তিনি যে কাজ করে এসেছেন, তার প্রকৃত মূল্য হয়তো এই মুহূর্তেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

তিনি শুধু খেলনা মেরামত করেননি; মানুষের স্মৃতিকে যত্ন করে রাখার সুযোগ তৈরি করেছেন।

৯. নতুন প্রজন্মের হাতে পুরোনো দক্ষতা

এক বছর পরে আনন্দপুরের বাজারে নিবারণবাবুর দোকানটি আর আগের মতো নির্জন থাকত না। দোকানের বাইরে একটি নতুন বোর্ড লাগানো হয়েছিল—

‘নিবারণ পালের খেলনা মেরামত ও কাঠের কাজের কর্মশালা’

দোকানটি আগের মতো বিশাল ব্যবসা হয়ে ওঠেনি। তবু নিয়মিত কিছু কাজ আসত। স্কুলের কর্মশালার সুবাদে কয়েকজন তরুণ তাঁর কাছ থেকে কাজ শিখছিলেন।

অর্কও পড়াশোনার পাশাপাশি মাঝে মাঝে সেখানে যেত। সে জানত, সবকিছু নিজে মেরামত করতে শেখা সম্ভব নয়, কিন্তু জিনিসের যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনে দক্ষ মানুষের সাহায্য চাওয়া শেখা যায়।

একদিন এক ছোট্ট মেয়ে একটি ভাঙা পুতুল নিয়ে দোকানে এল। পুতুলটির চুল এলোমেলো, একটি হাত ঢিলে হয়ে গিয়েছিল।

মেয়েটি বলল, —কাকু, আমার দিদি আমাকে পুতুলটা দিয়েছে। এটা কি ঠিক করা যাবে?

নিবারণবাবু পুতুলটি পরীক্ষা করে বললেন, —দেখি, চেষ্টা করি।

অর্ক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে মেয়েটিকে বলল, —পুতুলটা ঠিক হয়ে গেলে যত্ন করে রাখিস। খেলতে গিয়ে আবার নষ্ট হলে দুঃখ পাবি না। তখন দেখা যাবে, কী করা যায়।

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে নিবারণবাবু অর্ককে বললেন, —জানিস, তুই আমাকে শুধু দোকানটা চালিয়ে যেতে সাহায্য করিসনি। তুই আমাকে বুঝিয়েছিস, আমার শেখা কাজের এখনও মূল্য আছে।

অর্ক বলল, —আমি তো শুধু চেয়েছিলাম, আপনার কাজটা হারিয়ে না যাক।

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, —সেই চাওয়াটাই অনেক বড় কথা। পৃথিবীতে নতুন জিনিস তৈরি হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুনের জন্য পুরোনো সবকিছুকে মূল্যহীন ভাবলে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলব।

অর্ক বাড়ি ফেরার পথে ভাবল, একটি খেলনা ভাঙলে সেটি আবার জোড়া লাগানো যায় কি না, তা দেখা দরকার। আর কোনো মানুষের অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা হারিয়ে যাওয়ার আগে তাকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়াও জরুরি।

তার মনে হলো, পৃথিবীকে সুন্দর করার জন্য সব সময় বড় কোনো আবিষ্কার করতে হয় না। কখনও কখনও একটি ভাঙা খেলনাকে আবার চলতে শেখানোই যথেষ্ট।

কারণ, যত্ন করে রক্ষা করা প্রতিটি জিনিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যা পুরোনো হয়েছে, তা সব সময় মূল্যহীন নয়; আর যা ভেঙে গেছে, তার সবকিছুরই শেষ হয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

সমাপ্ত।

Share This