Categories
বিবিধ

মাটি ও রঙে দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তুলল ১২ বছরের দেবজিৎ, প্রশংসায় পরিবার ও প্রতিবেশীরা।

আলিপুরদুয়ার, নিজস্ব সংবাদদাতা :- পড়াশোনার পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতার চর্চা, মাত্র ১২ বছরেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে নজর কাড়ল খুদে শিল্পী দেবজিৎ।পড়াশোনার পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতার চর্চা। আর সেই চর্চার মধ্য দিয়েই মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিল জটেশ্বর সাহা পাড়ার খুদে শিল্পী দেবজিৎ রায়। মাটি, রং ও তুলি ব্যবহার করে নিজের হাতে এক অপূর্ব দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে।দেবজিৎ জটেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা এবং হাতের কাজের প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক। তবে শুধু ছবি আঁকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তার সৃষ্টিশীলতা। এবার নিজের হাতে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে এক অনন্য নজির গড়েছে এই খুদে শিল্পী।জানা গিয়েছে, প্রায় দু’মাস ধরে ধৈর্য, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে প্রতিমাটি তৈরি করেছে দেবজিৎ। প্রতিমার কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে সাজসজ্জা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের শিল্পীসত্তার ছাপ রেখেছে সে। সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় মাটি ও রঙের ব্যবহারে ফুটিয়ে তুলেছে দেবী দুর্গার অপরূপ রূপ।এর আগেও মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিমা তৈরি করেছে দেবজিৎ। তবে এবার দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে তার সৃষ্টিশীল প্রতিভা আরও একবার প্রকাশ্যে এল। বয়সে ছোট হলেও শিল্পের প্রতি তার আগ্রহ, ধৈর্য এবং কাজের প্রতি একাগ্রতা ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে।দেবজিতের এই কৃতিত্বে খুশি তার পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিবেশীরাও। পড়াশোনার পাশাপাশি এমন সৃষ্টিশীল কাজ আগামী দিনে তাকে আরও বড় সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই আশাবাদী সকলে।

Share This
Categories
বিবিধ

বন্ধুবিয়োগে শোকাহত মিঠুন চক্রবর্তী, নানা পটেকরের সমাজসেবার কথা স্মরণ।

আলিপুরদুয়ার, নিজস্ব সংবাদদাতা:- অভিনেতা নানা পটেকরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করলেন আরেক অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। এদিন মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, নানা পটেকর আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলেন। ওঁর মৃত্যুতে আমি মর্মাহত। খুব দুঃখ পেয়েছি। একজন সাধারণ মানুষের মতোই উনি জীবনযাপন করতেন। বহু মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করতেন।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে মানুষটি ছায়া বিক্রি করতেন।

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি বিশাল বাজার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে মানুষ বাজার করত, রিকশা চালাত, দোকান সামলাত। কিন্তু বাজারের এক কোণে এমন একটি দোকান ছিল, যার কোনও চাল ছিল না, দেওয়াল ছিল না, এমনকি কোনও সাইনবোর্ডও ছিল না।

সেই দোকানে বসতেন এক বৃদ্ধ মানুষ। তাঁর নাম ছিল মাধব। প্রতিদিন দুপুরে তিনি একটি বড় গাছের নিচে বসে থাকতেন। তাঁর সামনে রাখা থাকত একটি কাঠের বাক্স। বাক্সের ওপর সাদা কাগজে লেখা—‘ছায়া বিক্রি হয়’।

প্রথম দিন লেখাটি দেখে সবাই হেসেছিল।

একজন সবজিবিক্রেতা বলেছিল, “মাধব কাকা, ছায়াও আবার কেউ বিক্রি করে নাকি?”

মাধব হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “কেন নয়? যার প্রয়োজন, সে তো ছায়ার মূল্য বোঝে।”

লোকজন কথাটিকে মজা ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ তাঁকে পাগল বলেও ঠাট্টা করত।

কিন্তু মাধবের কাছে প্রতিদিন দুপুরে কয়েকজন মানুষ আসত। একজন বৃদ্ধ রিকশাচালক, একজন পথশিশু, কখনও কোনও ক্লান্ত ফেরিওয়ালা। তারা গাছের নিচে বসত, জল খেত, একটু বিশ্রাম নিত। যাওয়ার সময় কেউ টাকা দিতে চাইলে মাধব বলতেন, “যখন পারবে, অন্য কাউকে একটু স্বস্তি দিও। আমার দাম মিটে যাবে।”

একদিন বাজারে এল এক তরুণ ব্যবসায়ী, নাম বিক্রম। শহরে তার একাধিক দোকান ছিল। সে বাজারের ওই জমিতে একটি বড় বাণিজ্যিক ভবন তৈরি করতে চাইছিল। জমির মালিকের সঙ্গে কথাও প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল মাধবের গাছটি।

বিক্রম গাছের নিচে এসে বলল, “কাকা, এই গাছটা কেটে ফেলতে হবে। এখানে ভবন তৈরি হবে। আপনাকে অন্য কোথাও বসার ব্যবস্থা করে দেব।”

মাধব শান্ত গলায় বললেন, “গাছটা শুধু আমার বসার জায়গা নয়। অনেক মানুষের একটু বিশ্রামের জায়গা।”

বিক্রম হেসে বলল, “বিশ্রামের জন্য বাজারে আরও অনেক জায়গা আছে। উন্নয়নের পথে আবেগ দিয়ে বাধা দেওয়া যায় না।”

মাধব আর তর্ক করলেন না।

পরের কয়েক দিন বাজারে নানা আলোচনা চলল। কেউ বলল, ভবন তৈরি হলে ব্যবসা বাড়বে। কেউ বলল, গাছটি থাকলে বাজারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। আবার কেউ কেউ মাধবের পক্ষে কথা বলল, কিন্তু বিক্রমের প্রভাবের সামনে তাদের কথা খুব জোর পেল না।

অবশেষে গাছ কাটার দিন ঠিক হল।

সেদিন সকালে মাধব যথারীতি গাছের নিচে বসেছিলেন। তাঁর পাশে বসেছিল এক ছোট্ট মেয়ে, নাম পিউ। সে প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে এখানে একটু বিশ্রাম নিত। পিউয়ের বাবা বাজারে মাল বহনের কাজ করতেন।

পিউ মাধবকে জিজ্ঞাসা করল, “কাকা, গাছটা কেটে দিলে আপনি কোথায় বসবেন?”

মাধব মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি অন্য কোথাও বসব মা। কিন্তু তোমরা কোথায় বসবে, সেটাই ভাবছি।”

পিউ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সে নিজের স্কুলব্যাগ থেকে একটি খাতা বের করল। সেখানে সে বাজারের গাছটির ছবি এঁকেছিল। ছবির নিচে লেখা—‘আমাদের বিশ্রামের বাড়ি’।

পিউ ছবিটি নিয়ে বাজারের দোকানিদের কাছে গেল। সে সবাইকে দেখিয়ে বলল, “এই গাছটা শুধু মাধব কাকার নয়। এখানে কত মানুষ বিশ্রাম নেয়। আমরা কি সবাই মিলে গাছটাকে বাঁচাতে পারি না?”

শিশুটির সরল প্রশ্নে অনেকেই থমকে গেলেন।

একজন দোকানি বললেন, “ঠিকই তো। আমরা প্রতিদিন এখানে বসি, অথচ গাছটার কথা কখনও ভাবিনি।”

আরেকজন বললেন, “ভবন তৈরি হলে লাভ হবে, কিন্তু এমন ছায়া তৈরি হতে কত বছর লাগে?”

কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে বিক্রমের সঙ্গে কথা বলতে গেলেন। তাঁরা প্রস্তাব দিলেন, জমির নকশা সামান্য বদলে গাছটিকে রেখে ভবন তৈরি করা যায় কি না।

প্রথমে বিক্রম রাজি হল না। কিন্তু যখন সে দেখল, বাজারের অধিকাংশ মানুষ গাছটি বাঁচানোর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তখন সে নতুন করে পরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত নিল। স্থপতির সঙ্গে আলোচনা করে ভবনের নকশা এমনভাবে বদলানো হল, যাতে গাছটি অক্ষত থাকে এবং তার চারপাশে বসার জায়গা তৈরি হয়।

কয়েক মাস পর ভবন তৈরি হল। তার সামনের খোলা অংশে গাছটিকে ঘিরে বেঞ্চ বসানো হল। একটি ছোট পানীয় জলের ব্যবস্থাও করা হল। সেখানে কোনও প্রবেশমূল্য ছিল না।

উদ্বোধনের দিন বিক্রম নিজে মাধবের কাছে এসে বলল, “কাকা, এত দিন ভেবেছিলাম, জমির মূল্য শুধু টাকায় মাপা যায়। এখন বুঝছি, মানুষের উপকারে লাগলে একটি জায়গার মূল্য আরও অনেক বেড়ে যায়।”

মাধব মৃদু হেসে বললেন, “আপনি গাছটা বাঁচিয়েছেন, এটাই বড় কথা। তবে মনে রাখবেন, ছায়া কখনও একজনের সম্পত্তি হতে পারে না।”

সেদিন বিকেলে পিউ আবার গাছের নিচে বসেছিল। তার পাশে এক ক্লান্ত রিকশাচালক এসে বসলেন। পিউ একটু সরে তাঁকে জায়গা করে দিল।

মাধব দূর থেকে দৃশ্যটি দেখলেন। তাঁর মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।

তিনি জানতেন, তাঁর কাঠের বাক্সে কোনও ছায়া ছিল না। ছায়া ছিল গাছের পাতায়, আর তার চেয়েও বেশি ছিল মানুষের মনে—যখন তারা নিজের সুবিধার বাইরে গিয়ে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে শেখে।

শিক্ষা: প্রকৃতি রক্ষা করা শুধু পরিবেশের দায়িত্ব নয়, মানুষের প্রতি দায়িত্বও। যে সম্পদ সবার উপকারে আসে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়ও সবার।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

হারিয়ে যাওয়া শব্দের দোকান।

শহরের এক পুরোনো গলিতে ছিল অদ্ভুত একটি দোকান। দোকানের সামনে কোনও সাইনবোর্ড ছিল না, জানালায় কোনও বিজ্ঞাপনও ঝুলত না। শুধু কাঠের দরজার ওপর ছোট্ট করে লেখা ছিল—‘শব্দ পাওয়া যায়’।

দোকানটির মালিক ছিলেন এক বৃদ্ধ, নাম নীরদবাবু। তাঁর দোকানে চাল-ডাল, জামাকাপড় কিংবা খেলনা বিক্রি হত না। সেখানে পাওয়া যেত এমন সব শব্দ, যেগুলো মানুষ ধীরে ধীরে ব্যবহার করতে ভুলে যাচ্ছিল।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে অয়ন দোকানটির সামনে দাঁড়াল। দরজার লেখাটি দেখে তার ভীষণ কৌতূহল হল। সে ভেতরে ঢুকে দেখল, চারদিকে অসংখ্য কাচের শিশি সাজানো। প্রতিটি শিশির গায়ে আলাদা আলাদা নাম লেখা।

একটির গায়ে লেখা ‘ক্ষমা’, অন্যটিতে ‘কৃতজ্ঞতা’, আরেকটিতে ‘বিশ্বাস’। একটি ছোট শিশিতে লেখা ‘আমি ভুল করেছি’।

অয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো কি সত্যিই বিক্রি হয়?”

নীরদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “শব্দ তো সবাই জানে। কিন্তু সব শব্দ ব্যবহার করতে পারে না। আমার দোকানে শব্দ কিনতে টাকা লাগে না। লাগে শুধু তার অর্থ বোঝার ইচ্ছা।”

অয়ন একটি শিশি তুলে নিল। তাতে লেখা ‘ধন্যবাদ’।

সে বলল, “এই শব্দটা তো আমি প্রতিদিন বলি।”

“কাকে বলো?” বৃদ্ধ জানতে চাইলেন।

অয়ন একটু ভেবে বলল, “যখন কেউ আমাকে সাহায্য করে।”

“আর বাড়িতে মা তোমার জন্য খাবার তৈরি করলে? বাবা তোমার পড়াশোনার খরচ জোগালে? স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী তোমার শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করলে?”

অয়ন চুপ করে গেল। এই মানুষগুলোর জন্য সে খুব কমই ধন্যবাদ বলেছে।

নীরদবাবু বললেন, “শব্দ শুধু মুখ দিয়ে বললেই হয় না। তার অর্থ আচরণে প্রকাশ পেতে হয়।”

পরদিন অয়ন স্কুলে গিয়ে একটি ছোট পরীক্ষা করল। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাকু শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করছিলেন। অয়ন তাঁর কাছে গিয়ে বলল, “কাকু, আমাদের ঘরটা প্রতিদিন পরিষ্কার রাখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”

লোকটি প্রথমে অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর তাঁর মুখে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যা অয়ন আগে কখনও দেখেনি।

বাড়ি ফিরে সে মাকেও ধন্যবাদ জানাল। মা হেসে বললেন, “আজ হঠাৎ কী হল তোর?”

অয়ন শুধু বলল, “একটা নতুন দোকান খুঁজে পেয়েছি।”

এরপর থেকে সে প্রায়ই নীরদবাবুর দোকানে যেত। প্রতিবার একটি করে নতুন শব্দ বেছে নিত। কখনও ‘সহমর্মিতা’, কখনও ‘ধৈর্য’, কখনও ‘দায়িত্ব’।

একদিন সে দোকানে এসে দেখল, কয়েকটি শিশি খালি পড়ে আছে। তাদের গায়ে লেখা—‘সত্য’, ‘বিশ্বাস’ এবং ‘ক্ষমা’।

অয়ন উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এই শব্দগুলো কোথায় গেল?”

নীরদবাবু বললেন, “মানুষ যখন কোনও শব্দের অর্থ ভুলে যায়, তখন সেই শব্দের শিশি খালি হয়ে যায়। আবার কেউ যখন কথার বদলে কাজে তার অর্থ ফিরিয়ে আনে, তখন শিশিটি পূর্ণ হয়।”

অয়ন বুঝতে পারল না, কথাটা সত্যি কি না। তবে সে দেখল, বৃদ্ধের চোখে গভীর বিষণ্ণতা।

কয়েক দিন পর অয়নের সঙ্গে তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু রাহুলের ঝগড়া হল। রাগের মাথায় অয়ন এমন কিছু কথা বলে ফেলল, যা রাহুলকে খুব কষ্ট দিল। পরদিন রাহুল তার সঙ্গে কথা বলল না।

অয়ন দোকানে গিয়ে ‘ক্ষমা’ লেখা শিশিটি খুঁজল। শিশিটি প্রায় খালি।

সে বৃদ্ধকে বলল, “আমি বন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইতে চাই। কিন্তু কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না।”

নীরদবাবু উত্তর দিলেন, “ক্ষমা চাওয়ার জন্য সুন্দর বাক্য দরকার নেই। দরকার নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস।”

পরদিন অয়ন রাহুলের কাছে গিয়ে বলল, “আমি রাগের মাথায় তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমার ভুল হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করবি?”

রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমিও রাগ করে তোর সঙ্গে কথা বলিনি। চল, আবার বন্ধু হই।”

সেদিন বিকেলে অয়ন যখন দোকানে ফিরল, দেখল ‘ক্ষমা’ লেখা শিশিটি আবার ভরে উঠেছে।

কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর দোকানটি বন্ধ হয়ে গেল। দরজায় তালা ঝুলছিল। প্রতিবেশীরা জানালেন, নীরদবাবু অন্য শহরে চলে গেছেন।

অয়ন মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তখনই সে দরজার নিচে গোঁজা একটি কাগজ পেল।

তাতে লেখা ছিল—

“শব্দের দোকান বন্ধ হলেই শব্দ হারিয়ে যায় না। যতদিন মানুষ সত্যি করে ক্ষমা চাইবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, অন্যের কথা শুনবে এবং নিজের ভুল স্বীকার করবে, ততদিন এই দোকান প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে খোলা থাকবে।”

অয়ন কাগজটি যত্ন করে নিজের পড়ার টেবিলে রেখে দিল।

তারপর থেকে সে আর শুধু সুন্দর শব্দ শেখেনি। সে চেষ্টা করেছিল শব্দগুলোর অর্থ নিজের কাজে প্রমাণ করতে।

কারণ সে বুঝেছিল, পৃথিবীতে অনেক শব্দ আছে, কিন্তু তাদের সত্যিকারের মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ সেগুলোকে নিজের জীবনে জায়গা দেয়।

শিক্ষা: ভালো কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই কথার অর্থ আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করাই প্রকৃত শিক্ষা।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

একটি বেঞ্চের বিচার।

শহরের এক সরকারি আদালতের সামনে ছিল বিশাল এক বটগাছ। তার ছায়ায় রাখা কাঠের বেঞ্চটিতে প্রতিদিন নানা মানুষ এসে বসতেন। কেউ মামলার তারিখের অপেক্ষায়, কেউ আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে, আবার কেউ নিছক একটু বিশ্রাম নিতে।

বেঞ্চটির পাশেই ছোট্ট একটি চায়ের দোকান ছিল। দোকান চালাতেন শম্ভুনাথ। তিনি বহু বছর ধরে আদালতের মানুষের আসা-যাওয়া দেখেছেন। কে ধনী, কে গরিব, কে অপরাধী বলে অভিযুক্ত, আর কে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে মরিয়া—সবই তাঁর চোখের সামনে ঘটত।

একদিন সকালে বেঞ্চটিতে এসে বসলেন এক বৃদ্ধ। পরনে সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ। তাঁর মুখে গভীর উদ্বেগের ছাপ।

কিছুক্ষণ পর দামি পোশাক পরা এক ব্যক্তি এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন। তিনি ফোনে কথা বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে বললেন, “এই বেঞ্চে এত লোক বসে থাকে কেন? আদালতের সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বলে কিছু নেই!”

বৃদ্ধটি একটু সরে বসলেন। কিন্তু লোকটি তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না।

“আপনার মতো লোকেদের জন্যই সব জায়গার পরিবেশ নষ্ট হয়,” তিনি বললেন।

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে নিজের ব্যাগটি আঁকড়ে ধরলেন।

দূর থেকে দৃশ্যটি দেখছিলেন শম্ভুনাথ। তাঁর মনে হল, লোকটির কথায় বৃদ্ধের চেয়ে তাঁর নিজের অহংকারই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর আদালতের কর্মচারী এসে বৃদ্ধকে ডাকলেন। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাগ থেকে একটি কাগজ বের করতে গিয়ে কয়েকটি পুরোনো ছবি মাটিতে পড়ে গেল।

শম্ভুনাথ দৌড়ে গিয়ে ছবিগুলো তুলে দিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল এক তরুণী, এক যুবক এবং ছোট্ট একটি শিশু। ছবির কোণগুলো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

বৃদ্ধ কৃতজ্ঞ চোখে বললেন, “এগুলো আমার পরিবারের ছবি। আজ বহু বছর পর ছেলেকে দেখতে এসেছি।”

শম্ভুনাথ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার ছেলে এখানে?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। “একটি মামলায় তার বিচার চলছে। অনেক বছর আগে সে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। এখন সে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না, সে আমার সঙ্গে দেখা করবে কি না। তবু একবার দেখতে এসেছি।”

শম্ভুনাথ আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না।

ঠিক তখনই সেই দামি পোশাক পরা ব্যক্তিটি আবার বেঞ্চের কাছে এলেন। তিনি বৃদ্ধের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আপনি কি আপনার ছেলের নাম বলবেন?”

বৃদ্ধ নামটি বলতেই লোকটির মুখ বদলে গেল।

তিনি ছিলেন অভিযুক্ত ছেলেটির আইনজীবী।

“আপনি কি তাঁর বাবা?” তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

আইনজীবী কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, “আপনার ছেলে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় কখনও পরিবারের কথা বলেনি। শুধু একবার বলেছিল, জীবনে এমন কিছু ভুল করেছে যার জন্য সে নিজের বাবার সামনে দাঁড়াতে পারে না।”

বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল। “আমি ওকে শাস্তি দিতে আসিনি। শুধু বলতে চাই, ভুল করলে তার দায় নিতে হয়। কিন্তু ভুলের জন্য মানুষকে সারাজীবন একা থাকতে হবে, এমন নয়।”

আইনজীবী কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি আদালতের ভেতরে চলে গেলেন।

দুপুরের দিকে তিনি ফিরে এসে জানালেন, ছেলেটি বাবার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছে।

বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। তিনি একবার বেঞ্চটির দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে আদালতের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

সেদিন বিকেলে শম্ভুনাথ দেখলেন, সেই আইনজীবী আবার বেঞ্চে এসে বসেছেন। তাঁর দামি পোশাক আগের মতোই ছিল, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেছে।

তিনি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, “শম্ভুদা, আজ একটা কথা বুঝলাম। আমরা মানুষের পোশাক দেখে তার সম্মান নির্ধারণ করি, অথচ তার জীবনের গল্পটা জানার চেষ্টা করি না।”

শম্ভুনাথ হেসে বললেন, “বেঞ্চে বসলে সবাই সমান জায়গা পায় বাবু। বিচার করার আগে মানুষকে একটু সময় দেওয়া দরকার।”

এরপর থেকে আইনজীবীটি আদালতের সামনে কাউকে ছোট করে কথা বলতেন না। আর সেই বেঞ্চটি তাঁর কাছে শুধু বসার জায়গা রইল না—হয়ে উঠল নিজের ভুল চিনে নেওয়ার একটি নীরব স্মারক।

বটগাছের নিচে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বসতেন। তাঁদের সবার বিচার আদালতে হত না। কখনও কখনও নিজের মনের আদালতে দাঁড়িয়েও মানুষকে নিজের আচরণের জবাব দিতে হয়।

শিক্ষা: মানুষের বাহ্যিক পরিচয় দেখে তাকে বিচার করা উচিত নয়। প্রত্যেকের জীবনের পেছনে এমন একটি গল্প থাকে, যা না জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্যায় হতে পারে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

এক টুকরো আকাশ।

শহরের এক ব্যস্ত হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসত। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ প্রিয়জনের পাশে দাঁড়াতে, আবার কেউ জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের সঙ্গে লড়াই করতে। সেই হাসপাতালেরই একটি ছোট ঘরে কাজ করতেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মালতী।

মালতীর কাজ ছিল মেঝে পরিষ্কার রাখা, বিছানার চারপাশ গোছানো এবং হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা। কাজের চাপ ছিল প্রচুর, তবু তিনি কখনও কাউকে বিরক্ত মুখে উত্তর দিতেন না। বিশেষ করে শিশুদের দেখলে তাঁর মুখে অদ্ভুত এক মায়া ফুটে উঠত।

একদিন শিশু বিভাগে ভর্তি হল আট বছরের ছেলে অর্ক। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তাকে অনেকটা সময় হাসপাতালেই থাকতে হচ্ছিল। অন্য বাচ্চাদের মতো বাইরে দৌড়ে খেলা, স্কুলে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তার ছিল না।

অর্কের বাবা প্রতিদিন অফিস থেকে এসে ছেলের পাশে বসতেন। মা হাসপাতালেই থাকতেন। তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন ছেলেকে আনন্দে রাখতে, কিন্তু অর্কের মন ক্রমশ বিষণ্ণ হয়ে উঠছিল।

এক সকালে মালতী ঘর পরিষ্কার করতে এসে দেখলেন, অর্ক জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কী দেখছিস বাবা?”

অর্ক বলল, “আকাশটা।”

মালতী জানালার বাইরে তাকালেন। হাসপাতালের পাশের উঁচু বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে সামান্য আকাশ দেখা যাচ্ছিল।

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে অনেক বড় আকাশ দেখা যায়। এখানে আকাশটাও যেন ছোট হয়ে গেছে।”

মালতী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর কাজ শেষ করে চলে গেলেন।

পরদিন সকালে তিনি ফিরে এলেন একটি ছোট বাক্স নিয়ে। বাক্সের মধ্যে ছিল রঙিন কাগজ, পেনসিল, কয়েকটি পুরোনো পত্রিকা আর আঠা।

অর্ক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো কী?”

মালতী বললেন, “আজ আমরা নিজেরাই একটা আকাশ বানাব।”

তিনি অর্ককে সঙ্গে নিয়ে কাগজ কেটে নীল মেঘ, সাদা তুলোর মতো মেঘ আর নানা রঙের পাখি তৈরি করতে শুরু করলেন। অর্ক প্রথমে অনিচ্ছা নিয়ে বসেছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখে আনন্দ ফিরে এল।

দুজন মিলে একটি বড় কাগজে নীল রং লাগাল। তার ওপর আঁকল সূর্য, মেঘ, পাখি আর দূরে উড়ে যাওয়া একটি ঘুড়ি।

কাজ শেষ হলে মালতী ছবিটি অর্কের বিছানার সামনে দেয়ালে লাগিয়ে দিলেন।

অর্ক ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা তো আমার নিজের আকাশ!”

সেদিন থেকে প্রতিদিন নতুন কিছু তৈরি করা তাদের অভ্যাস হয়ে গেল। কখনও কাগজের নৌকা, কখনও রঙিন মাছ, কখনও আবার কল্পনার বাগান। মালতী কাজের ফাঁকে সময় পেলেই অর্কের ঘরে এসে বসতেন।

ধীরে ধীরে পাশের বিছানার শিশুরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। কেউ ছবি আঁকল, কেউ কাগজ ভাঁজ করে পাখি বানাল। শিশু বিভাগের একটি কোণ যেন ছোট্ট সৃজনশীল জগতে পরিণত হল।

একদিন হাসপাতালের এক চিকিৎসক সেই ঘরে এসে দৃশ্যটি দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি দেখলেন, যে শিশুরা কয়েক দিন আগেও চুপচাপ শুয়ে থাকত, তারা আজ নিজেদের তৈরি জিনিস নিয়ে গল্প করছে।

চিকিৎসক মালতীকে বললেন, “আপনি তো ওদের জন্য অনেক বড় কাজ করছেন।”

মালতী লজ্জা পেয়ে বললেন, “আমি তো শুধু ওদের মন ভালো রাখার চেষ্টা করি।”

চিকিৎসক জানালেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুদের জন্য একটি ছোট সৃজনশীল কার্যক্রম শুরু করতে চায়। মালতীর অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের কথা শুনে তাঁকে সেই কাজে সাহায্য করার অনুরোধ করা হল।

মালতী প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন। তিনি তো কোনও শিল্পী নন, কোনও প্রশিক্ষণও নেই। কিন্তু অর্কের মা তাঁকে সাহস দিয়ে বললেন, “শিশুরা আপনার সঙ্গে আনন্দ পায়। সেটাই তো সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।”

কিছুদিন পর হাসপাতালের শিশু বিভাগে নিয়মিত ছবি আঁকা, কাগজের কাজ এবং গল্প বলার সময় নির্ধারিত হল। স্বেচ্ছাসেবীরাও এগিয়ে এলেন।

অর্ক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার দিন মালতীর হাতে একটি ছবি তুলে দিল। ছবিতে ছিল একটি বড় নীল আকাশ। আকাশের মাঝখানে লেখা—‘মালতী মাসি, তুমি আমাকে আকাশ দেখিয়েছ।’

মালতী ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখে জল এসে গেল।

তিনি জানতেন, অর্ক আবার নিজের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে বিশাল আকাশ দেখতে পাবে। কিন্তু হাসপাতালের সেই ছোট ঘরে তৈরি হওয়া আকাশটি হয়তো তার মনে অনেক দিন থেকে যাবে।

আর মালতীর কাছে সেই দিন থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল—মানুষের কাজের মূল্য শুধু তার পদবি কিংবা বেতনে মাপা যায় না। কখনও কখনও একটি ছোট উদ্যোগ, সামান্য সময় আর একটু ভালোবাসা কারও কঠিন দিনকে সহনীয় করে তুলতে পারে।

শিক্ষা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সব সমস্যা দূর করা সম্ভব না হলেও, ভালোবাসা ও সৃজনশীলতার সাহায্যে মানুষের মনে আনন্দ ও আশার জায়গা তৈরি করা যায়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ প্রদর্শনীর দিন।

শহরের পুরোনো জাদুঘরটির নাম ছিল ‘স্মৃতির ঘর’। সেখানে রাজাদের অস্ত্র, পুরোনো মুদ্রা, মাটির বাসন, হাতে লেখা দলিল থেকে শুরু করে বহু বছরের পুরোনো নানা জিনিস সাজানো ছিল। প্রতিদিন অল্প কিছু মানুষ আসতেন। কেউ ইতিহাস জানতে, কেউ স্কুলের প্রকল্প করতে, আবার কেউ নিছক সময় কাটাতে।

জাদুঘরের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন অমলবাবু। বয়স প্রায় ষাট। জীবনের তিরিশটি বছর তিনি এই জাদুঘরেই কাটিয়েছেন। কোন জিনিসটি কোথা থেকে এসেছে, কোনটির সঙ্গে কোন ইতিহাস জড়িয়ে আছে—সব তাঁর নখদর্পণে।

কিন্তু একদিন সকালে একটি বিজ্ঞপ্তি এল। আর্থিক সমস্যার কারণে জাদুঘরটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। পরের মাস থেকে সমস্ত সংগ্রহ অন্য শহরের বড় জাদুঘরে পাঠানো হবে।

খবরটা শুনে অমলবাবুর বুকটা কেমন খালি হয়ে গেল। তাঁর কাছে জাদুঘরটি কেবল একটি চাকরির জায়গা ছিল না। এই ঘরগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর জীবনের অসংখ্য স্মৃতি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল, জিনিসপত্র সরানোর আগে শেষবারের মতো একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। সেই প্রদর্শনীর নাম রাখা হল—‘যে ইতিহাস আমাদের ঘরে’।

প্রস্তুতি শুরু হল। কর্মীরা কাচের বাক্স পরিষ্কার করলেন, জিনিসগুলোর তালিকা তৈরি করলেন, দেয়ালে নতুন পরিচিতি লেখা হল। অমলবাবু প্রতিটি প্রদর্শনীর পাশে দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের কথা মনে করতে লাগলেন।

প্রদর্শনীর আগের দিন এক কিশোর এল। নাম তার ঋজু। সে স্কুলের ইতিহাসের প্রকল্পের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছিল।

ঋজু একটি পুরোনো কাঠের লাঙলের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? এখন তো কেউ এমন লাঙল ব্যবহার করে না।”

অমলবাবু হেসে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। এখন যন্ত্রের সাহায্যে অনেক কাজ হয়। কিন্তু একসময় এই লাঙলই ছিল কৃষকের জীবিকার অন্যতম ভরসা। এর প্রতিটি দাগে লেগে আছে মানুষের পরিশ্রমের ইতিহাস।”

ঋজু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কিন্তু এসব জিনিস তো এখন আর কেউ ব্যবহার করে না। এগুলো দেখে আমাদের কী লাভ?”

অমলবাবু উত্তর দিলেন, “যে মানুষ নিজের অতীতকে জানে না, সে নিজের বর্তমানকেও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। আজ আমরা যে সুবিধাগুলো পাচ্ছি, তার পেছনে কত মানুষের শ্রম আর সংগ্রাম আছে, তা ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়।”

কথাগুলো ঋজুর মনে দাগ কাটল।

পরদিন প্রদর্শনী শুরু হল। প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এলেন। কেউ পুরোনো মুদ্রার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দাদুর কথা বললেন, কেউ কৃষিকাজের সরঞ্জাম দেখে নিজের গ্রামের স্মৃতি মনে করলেন। একটি পুরোনো সেলাইয়ের যন্ত্র দেখে এক বৃদ্ধা বললেন, তাঁর মা এমন যন্ত্রেই সংসারের খরচ চালাতেন।

অমলবাবু লক্ষ করলেন, মানুষ শুধু জিনিস দেখতে আসেনি। প্রত্যেকটি জিনিস যেন তাদের নিজের জীবনের কোনও না কোনও অধ্যায় খুলে দিচ্ছে।

ঋজুও সেদিন আবার এল। তার সঙ্গে ছিল কয়েকজন সহপাঠী। তারা নিজেদের উদ্যোগে প্রদর্শনীর নানা অংশের ছবি তুলেছিল এবং প্রতিটি জিনিসের ইতিহাস সহজ ভাষায় লিখে রাখছিল। তাদের পরিকল্পনা, স্কুলের দেওয়ালপত্রে এই ইতিহাস প্রকাশ করবে।

প্রদর্শনী শেষ হওয়ার আগে ঋজু অমলবাবুর কাছে এসে বলল, “জাদুঘর বন্ধ হয়ে গেলেও আমরা যদি এগুলোর গল্প মানুষকে জানাতে থাকি, তাহলে কি ইতিহাস বেঁচে থাকবে?”

অমলবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “অবশ্যই। কোনও ঘর বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের মনে কৌতূহল বেঁচে থাকলে ইতিহাসকে পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না।”

কয়েক সপ্তাহ পরে জাদুঘরটির দরজা সত্যিই বন্ধ হয়ে গেল। সংগ্রহের বেশির ভাগ জিনিস অন্যত্র চলে গেল। অমলবাবু অবসর নিলেন।

কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হল না।

ঋজু ও তার সহপাঠীরা স্কুলে একটি ছোট ইতিহাসের ক্লাব গড়ে তুলল। তারা গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করল, পুরোনো পেশার কথা লিখে রাখল, হারিয়ে যেতে বসা ব্যবহার্য জিনিসের ছবি সংগ্রহ করল। তাদের কাজ দেখে অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও আগ্রহী হল।

একদিন ঋজু অমলবাবুর বাড়িতে এসে একটি খাতা তাঁর হাতে দিল। খাতাটির প্রথম পাতায় লেখা—‘আমাদের চারপাশের ইতিহাস’।

অমলবাবু পাতাগুলো উল্টে দেখলেন। সেখানে কৃষকের কথা, তাঁতির কথা, মৃৎশিল্পীর কথা, পুরোনো বাজারের ইতিহাস—কত কিছু লেখা!

তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি বুঝলেন, যে প্রদর্শনীকে তিনি শেষ বলে ভেবেছিলেন, সেটিই আসলে নতুন একটি যাত্রার শুরু।

শিক্ষা: অতীতকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু পুরোনো জিনিসকে আগলে রাখা নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : তেরো নম্বর ঘরের রহস্য (তৃতীয় পর্ব: শেষ স্মৃতির দরজা)।

১. যে মানুষটি নিজের নাম লুকিয়েছিল

“ঋদ্ধি সেন, আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে।”

বাইরের গম্ভীর কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

শান্তিনিকেতন লজের তিনতলার ছোট ঘরে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধি বুঝতে পারছিল, সময় খুব কম। তার হাতে পেনড্রাইভ, কম্পিউটারের পর্দায় কয়েক মুহূর্ত আগেও যে বার্তাটি দেখা গিয়েছিল, সেটি এখন অদৃশ্য। মায়া দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। হরিপদ ভয়ে কাঁপছেন।

“ওরা কারা?” ঋদ্ধি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল।

মায়া বলল, “কয়েকজনকে আমি চিনি। তারা একসময় ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করত। এখন তারা নিজেদের একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু এই বাড়ির পুরোনো নথি তারা বহু বছর ধরে সরিয়ে ফেলছে।”

“পুলিশও কি তাদের সঙ্গে আছে?”

“বাইরে সত্যিই পুলিশ আছে কি না, আমি জানি না। এই লোকেরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে মিথ্যা বলতে পারে।”

ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি পকেটে রাখল।

“আমরা পালাব না। এত দিন পরে প্রমাণ পেয়েছি। এবার সব প্রকাশ করতে হবে।”

মায়া মাথা নাড়ল।

“প্রমাণ প্রকাশ করতে হলে আগে নিশ্চিত হতে হবে, সেগুলো অক্ষত আছে। আর তোমার দাদুর ভিডিওতে যা বলা হয়েছে, তার অর্থও বুঝতে হবে।”

“তিনি বললেন, দিদি নিজেকে আড়াল করেছিলেন আমাকে বাঁচানোর জন্য। কেন?”

মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজায় ধাক্কা পড়ল।

“দরজা খুলুন!”

হরিপদ কাঁপা হাতে দরজার কাছে এগোলেন। কিন্তু ঋদ্ধি তাঁকে থামিয়ে দিল।

“আপনি খুলবেন না।”

সে ঘরের পিছনের দিকে তাকাল। আয়নার পাশের গোপন পথটি এখনও খোলা ছিল। তিনজন দ্রুত তার মধ্যে ঢুকে পড়ল। মায়া তাকটি টেনে বন্ধ করতেই বাইরে দরজা ভাঙার শব্দ শোনা গেল।

সুড়ঙ্গের মধ্যে নেমে আসার সময় ঋদ্ধি পিছন ফিরে তাকাল।

“হরিপদ কাকু?”

বৃদ্ধ বললেন, “তোমরা যাও। এই বাড়িতে এত বছর কাটিয়েছি। এবার অন্তত একটা সত্যের পাশে দাঁড়াতে চাই।”

ঋদ্ধি তাঁর হাত ধরল।

“আপনাকে একা ফেলে যাব না।”

হরিপদ মৃদু হাসলেন।

“আমি বৃদ্ধ মানুষ। তোমাদের মতো দৌড়তে পারব না। কিন্তু কিছুক্ষণ তাদের ব্যস্ত রাখতে পারব। তোমরা পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাও।”

বাধ্য হয়ে ঋদ্ধি ও মায়া এগিয়ে গেল। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা একটি লোহার দরজার সামনে পৌঁছল। দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। মায়া কোমর থেকে ছোট একটি চাবি বের করে তালা খুলল।

দরজার ওপারে একটি পরিত্যক্ত গ্যারাজ। সেখানে ধুলো জমা একটি পুরোনো মোটরসাইকেল এবং কয়েকটি ভাঙা বাক্স পড়ে আছে।

তারা গ্যারাজের পাশের সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন সকাল সাড়ে সাতটা।

শহর জেগে উঠেছে। দোকান খুলছে, বাস চলছে, মানুষ কাজে যাচ্ছে। কেউ জানে না, কয়েক গজ দূরের একটি পুরোনো বাড়িতে কী ঘটছে।

ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার আমাদের গন্তব্য কোথায়?”

মায়া উত্তর দিল, “তোমার দাদুর কাছে।”

“তিনি কোথায় আছেন?”

“যে জায়গায় তোমার দিদি বারো বছর আগে প্রথমবার গিয়েছিলেন।”

“কোথায়?”

মায়া ধীরে বলল, “একটি পুরোনো শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। নাম—নির্ভয় আশ্রয়।”

২. নির্ভয় আশ্রয়ের নথি

নির্ভয় আশ্রয় ছিল শহরের উপকণ্ঠে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। একসময় সেখানে অসুস্থ ও বিপর্যস্ত শিশুদের সাময়িকভাবে রাখা হতো। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে, দেওয়ালের রং উঠে গেছে, বাগানে আগাছা জন্মেছে।

ঋদ্ধি ও মায়া পাশের একটি দোকান থেকে বাড়িটির পুরোনো কর্মচারী সম্পর্কে খোঁজ নিল। দোকানদার জানালেন, প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন হিসাবরক্ষক এখনও কাছেই থাকেন। তাঁর নাম নির্মল দত্ত।

এক ঘণ্টা পরে তাঁরা নির্মলবাবুর বাড়িতে পৌঁছল।

বৃদ্ধ মানুষটি প্রথমে দরজা খুলতে চাননি। কিন্তু ঋদ্ধি যখন নিজের পরিচয় দিল এবং অরুণাভ সেনের নাম বলল, তখন তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।

“তুমি অরুণাভবাবুর নাতি?”

“হ্যাঁ। আপনি তাঁকে চিনতেন?”

নির্মলবাবু তাঁদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন।

“চিনতাম। তিনি নির্ভয় আশ্রয়ের জন্য অর্থ সাহায্য করতেন। বাইরে থেকে তাঁকে খুব দয়ালু মানুষ বলে মনে হতো। অনেকে ভাবত, তিনি অনাথ শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান। কিন্তু পরে বুঝলাম, তাঁর সাহায্যের আড়ালে অন্য উদ্দেশ্যও ছিল।”

ঋদ্ধি বলল, “কী উদ্দেশ্য?”

“যেসব শিশুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কম, যাদের অতীতের নথি অসম্পূর্ণ, তাদের নিয়ে তিনি বিশেষ গবেষণা করতেন। তাঁর ধারণা ছিল, শৈশবের স্মৃতি মানুষের পরিচয় গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্মৃতিতে আঘাত লাগলে বা স্মৃতি অসম্পূর্ণ হলে, অন্যের প্রভাব সহজে পড়তে পারে।”

মায়া বলল, “তিনি কি শিশুদের ওপর পরীক্ষা করতেন?”

নির্মলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি সরাসরি কোনও পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলাম না। কিন্তু কিছু শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। ফিরে আসার পর তাদের আচরণ বদলে যেত। কেউ কোনও পুরোনো ঘটনা মনে করতে পারত না, কেউ আবার এমন কিছু বলত, যা তার জানার কথা নয়।”

ঋদ্ধি পকেট থেকে ছবিটি বের করল। হাসপাতালে শুয়ে থাকা তার ছবি।

“আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?”

নির্মলবাবু ছবিটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

“তোমাকে আমি এখানে দেখেছি।”

ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।

“কবে?”

“তুমি যখন বারো বছরের। তোমার মাথায় ব্যান্ডেজ ছিল। তোমার সঙ্গে একজন মহিলা এসেছিলেন। তিনি তোমার দিদি কি না, আমি তখন জানতাম না।”

“রূপসা?”

“সম্ভবত। তিনি তোমাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরে বাইরে এসে আমাকে বলেছিলেন, যদি কখনও কোনও লোক তোমার খোঁজে আসে, তাহলে যেন তোমার নাম কোনও নথিতে না দেখাই।”

“কেন?”

“তিনি বলেছিলেন, তোমার জীবন বিপদের মধ্যে রয়েছে।”

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“তারপর কী হয়েছিল?”

নির্মলবাবু বললেন, “সেই দিন রাতেই অরুণাভবাবু এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ড. সায়ন রায় ছিলেন। তাঁরা একটি ফাইল নিয়ে চলে যান। পরদিন শুনলাম, রূপসা নিখোঁজ।”

“আপনি পুলিশকে জানাননি?”

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, আমার নিজের নামেও কিছু নথি তৈরি হয়েছে। সেখানে লেখা, আমি নাকি অর্থ আত্মসাৎ করেছি। সেই অভিযোগে চাকরি চলে যায়। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি।”

ঋদ্ধি শান্ত গলায় বলল, “আপনি যা জানেন, সব আমাদের বলতে হবে। অন্য অনেক মানুষের জীবনও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে।”

নির্মলবাবু মাথা নাড়লেন।

“আমি বলব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা জিনিস দিতে চাই।”

তিনি আলমারি খুলে একটি ছোট বাক্স বের করলেন। বাক্সের মধ্যে একটি পুরোনো ডায়েরি, কয়েকটি চিঠি এবং একটি ফটোগ্রাফ।

ফটোগ্রাফে তিনজন মানুষ—অরুণাভ সেন, রূপসা এবং আরেকজন অচেনা যুবক।

ছবির পিছনে লেখা—‘প্রকল্প ১৩-এর শেষ বৈঠক, ২০০৪’।

ঋদ্ধি যুবকটির মুখ দেখে চমকে উঠল।

এটি সেই মানুষ, যাকে সে বহুবার নিজের শৈশবের স্মৃতিতে দেখেছে—হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষটি।

“এই লোকটি কে?”

নির্মলবাবু বললেন, “তার নাম অমিতাভ পাল। তিনি ড. বসুর গবেষণাকেন্দ্রে প্রযুক্তিগত কাজ করতেন। কিন্তু তিনিই প্রথম বুঝেছিলেন, স্মৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করার নামে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নষ্ট করা হচ্ছে।”

“তিনি এখন কোথায়?”

“শেষ খবর অনুযায়ী, তিনি উত্তরবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি অরুণাভবাবুর বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”

ঋদ্ধি ডায়েরিটি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘যে মানুষ নিজের স্মৃতি হারায়, তাকে শুধু অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না। তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই সত্যকে চিকিৎসার নামে ব্যবহার করা অপরাধ।’

ডায়েরির শেষ পাতায় একটি ঠিকানা।

শিলিগুড়ি, হাকিমপাড়া, বাড়ি নম্বর ২১।

ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকাল।

“আমাদের উত্তরবঙ্গে যেতে হবে।”

৩. অরুণাভ সেনের স্বীকারোক্তি

শিলিগুড়ি যাওয়ার আগে ঋদ্ধি একটি কাজ করল। সে পেনড্রাইভের সমস্ত নথির অনুলিপি তৈরি করে তিনটি আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করল। একটি বিশ্বস্ত সহকর্মীর কাছে, একটি আইনজীবীর কাছে এবং একটি নিরাপদ অনলাইন সংরক্ষণস্থলে।

তারপর সে নির্ভয় আশ্রয়ের নথি ও ছবি নিয়ে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করল। প্রতিবেদনে কোনও অপ্রমাণিত অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে লেখা হলো না। বরং উল্লেখ করা হলো, কিছু পুরোনো নথিতে অনৈতিক গবেষণা, অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগের ইঙ্গিত রয়েছে।

কিন্তু প্রকাশের আগে সে সিদ্ধান্ত নিল, অমিতাভ পালের সঙ্গে কথা বলবে।

শিলিগুড়ি পৌঁছতে তাদের প্রায় আট ঘণ্টা লাগল। হাকিমপাড়ার বাড়ি নম্বর ২১ একটি ছোট দোতলা বাড়ি। দরজায় ঘণ্টা বাজাতেই এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন।

ঋদ্ধি নিজের পরিচয় দিতেই লোকটির মুখের রং বদলে গেল।

“তোমাকে এখানে আসতে কে বলেছে?”

“নির্মল দত্ত। আমি অরুণাভ সেনের নাতি।”

লোকটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজা খুলে দিলেন।

“ভেতরে এসো।”

তিনি নিজেকে অমিতাভ পাল বলে পরিচয় দিলেন। বয়স প্রায় পঞ্চাশ। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু চোখে এখনও সতর্কতা।

ঋদ্ধি তাঁর সামনে ছবিটি রাখল।

“এই ছবিতে আপনি আছেন।”

অমিতাভ ছবিটি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“হ্যাঁ। সেই সময় আমি অনেক ভুল করেছি।”

“আমার দিদি কোথায়?”

“আমি জানি না।”

“আপনি কি জানেন, তাঁকে কেন নিখোঁজ হতে হয়েছিল?”

অমিতাভ বললেন, “রূপসা এমন কিছু নথি পেয়েছিল, যা প্রমাণ করতে পারত, অরুণাভ নিজের গবেষণার ফলাফল নিয়ে মিথ্যা দাবি করেছেন। তিনি মানুষের স্মৃতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আবিষ্কার করেননি। কিন্তু মানুষের স্মৃতির দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে তাদের বক্তব্য, আত্মবিশ্বাস এবং পরিচয়বোধকে প্রভাবিত করার একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন।”

“এটা কি চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেত না?”

“নৈতিক নিয়ম মেনে, রোগীর সম্মতি নিয়ে, সীমিত ক্ষেত্রে মানসিক পুনর্বাসনের কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু অরুণাভের প্রকল্পে সম্মতি ছিল না। রোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। কখনও তাঁদের বারবার ভুল তথ্য দেখানো হতো, কখনও পুরোনো নথি লুকিয়ে রাখা হতো, আবার কখনও তাঁদের পরিবারের মানুষদের সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা হতো।”

ঋদ্ধি বলল, “আমার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল?”

অমিতাভ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“তোমার দুর্ঘটনার পরে তোমার কিছু স্মৃতি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তোমাকে সাহায্য করার বদলে অরুণাভ তোমাকে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, একজন শিশুর স্মৃতি ও পরিচয়বোধে প্রভাব ফেললে সে কীভাবে নিজের অতীত সম্পর্কে নতুন বিশ্বাস তৈরি করে।”

“তাহলে আমার দিদি আমাকে বাঁচানোর জন্য তাঁকে বাধা দিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। রূপসা তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। সে তোমার চিকিৎসার নথি সংগ্রহ করে। কিন্তু অরুণাভ তখন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর গবেষণা প্রকাশ পেলে তাঁর সুনাম, অর্থ এবং স্বাধীনতা সব নষ্ট হবে।”

ঋদ্ধি কঠিন গলায় বলল, “তাহলে আমার দাদু অপরাধী।”

অমিতাভ চোখ নামিয়ে বললেন, “তিনি গুরুতর ভুল করেছিলেন। কিন্তু সব দায় শুধু তাঁর নয়। আমি নিজেও অনেকদিন চুপ ছিলাম।”

“রূপসা কোথায়?”

অমিতাভ একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

“রূপসা নিখোঁজ হওয়ার আগে আমাকে এটি দিয়েছিল। বলেছিল, তুমি একদিন সত্য জানতে চাইলে যেন তোমাকে দিই।”

খামের ভিতরে একটি ছোট চিঠি।

‘অমিতাভদা,

আমি যদি ফিরে আসতে না পারি, তাহলে ঋদ্ধিকে বলবেন, আমি তাকে কখনও ছেড়ে যাইনি। আমি তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাকে সত্য বলার সময় এখনও আসেনি।

অরুণাভের কাছে এমন কিছু নথি আছে, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষ নিজের অতীতের সত্য জানতে পারবে। আবার সেই নথি ভুল হাতে পড়লে আরও মানুষের ক্ষতি হতে পারে।

আমাকে খুঁজতে হলে পুরোনো পাহাড়ি স্যানেটোরিয়ামের রেকর্ড দেখবেন।

— রূপসা।’

চিঠির সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল—‘পাইন হিল পুনর্বাসন কেন্দ্র’।

অমিতাভ বললেন, “এই কেন্দ্রটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে কিছু রোগীকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। রূপসা হয়তো সেখানেই ছিল।”

ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।

“আমি সেখানে যাব।”

অমিতাভ মাথা নাড়লেন।

“যাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। তোমার দাদু হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন। তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তার অর্থ তিনি জানতেন তুমি সত্য খুঁজতে শুরু করবে।”

“তিনি কোথায়?”

অমিতাভ জানালেন, পাইন হিলের পুরোনো রেকর্ডে অরুণাভ সেনের নাম শেষবার দেখা গিয়েছিল।

৪. পাহাড়ের পুরোনো স্যানেটোরিয়াম

দার্জিলিংয়ের দিকে যাওয়া পাহাড়ি রাস্তায় দুপুরের পর কুয়াশা নেমে এসেছিল। ঋদ্ধি ও মায়া একটি গাড়ি ভাড়া করে পাইন হিল পুনর্বাসন কেন্দ্রের দিকে এগোল।

কেন্দ্রটি পাহাড়ের এক নির্জন অংশে অবস্থিত। বহু বছর আগে মানসিক আঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। পরে অর্থের অভাব ও প্রশাসনিক সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়।

প্রধান ফটক ভাঙা। বাগানের গাছপালা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। ভবনের জানলায় কাঠের পাটাতন লাগানো।

ঋদ্ধি গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকাল।

“এখানে কেউ থাকে?”

মায়া বলল, “আমি জানি না। কিন্তু পুরোনো রেকর্ডে এই জায়গার নাম রয়েছে।”

তারা পাশের একটি ছোট বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিল। সেখানে এক বৃদ্ধা থাকতেন, নাম সরলা দে। তিনি একসময় স্যানেটোরিয়ামের রান্নাঘরে কাজ করতেন।

রূপসার নাম শুনে তিনি চমকে উঠলেন।

“তোমরা রূপসাকে খুঁজছ?”

ঋদ্ধি দ্রুত বলল, “আপনি তাঁকে চিনতেন?”

“চিনতাম। মেয়েটি খুব সাহসী ছিল। অন্য রোগীদের সাহায্য করত। কিন্তু নিজের কথা খুব কম বলত।”

“তিনি কি এখনও এখানে আছেন?”

সরলা মাথা নাড়লেন।

“না। তিনি বহু বছর আগে চলে গেছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে একটি চিঠি রেখে গিয়েছিলেন।”

বৃদ্ধা ঘরের ভিতর থেকে একটি টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের মধ্যে কয়েকটি পুরোনো কাগজ, রোগীদের তালিকা এবং একটি চিঠি।

চিঠিতে লেখা—

‘আমি রূপসা সেন। আমার এখানে থাকার কারণ চিকিৎসা নয়, নিরাপত্তা। আমি জানি, আমার ভাই একদিন আমাকে খুঁজতে আসবে। সে যেন জানতে পারে, আমি বেঁচে আছি এবং নিজের ইচ্ছায় এই জায়গা ছেড়েছি।

আমি আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাই না। আমি চাই, আমার ভাই নিজের জীবন নিয়ে বাঁচুক। সে যেন আমার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে নিজের অপরাধ বলে মনে না করে।

যদি সে এখানে আসে, তাকে বলবেন—আমাকে খুঁজে পাওয়ার আগে তাকে নিজের অতীত সম্পর্কে সত্য জানতে হবে।’

চিঠির শেষে একটি ঠিকানা লেখা ছিল। পাহাড়ের অন্য প্রান্তে একটি ছোট গ্রাম—লেপচাঝোরা।

সরলা বললেন, “রূপসা চলে যাওয়ার সময় বলেছিল, সে এমন জায়গায় যাবে, যেখানে কেউ তাকে তার পুরোনো পরিচয় দিয়ে চিনবে না। আমি আর তার খবর পাইনি।”

ঋদ্ধি চিঠিটি হাতে নিয়ে বসে পড়ল।

বারো বছর ধরে সে দিদিকে খুঁজেছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, রূপসা শুধু নিখোঁজ হননি; তিনি নিজেকে এমন একটি জগৎ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর জীবন অন্যের হাতে চলে যাচ্ছিল।

তবু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি।

কেন তিনি ঋদ্ধিকে নিজের কাছে রাখেননি?

৫. লেপচাঝোরার বাড়ি

লেপচাঝোরা ছোট একটি পাহাড়ি গ্রাম। সেখানে পৌঁছতে গাড়ি ছেড়ে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়। পাইনগাছের সারি, সরু পথ, দূরে পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি বাড়ি।

গ্রামের এক বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁদের রূপসার ঠিকানাটি চিনিয়ে দিলেন। একটি ছোট কাঠের বাড়ি। সামনের উঠোনে ফুলের গাছ, পাশে সবজি বাগান।

ঋদ্ধি দরজায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টা বাজাল।

কিছুক্ষণ পরে দরজা খুললেন এক নারী।

চুলে পাক ধরেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু চোখ দুটি একই রকম—যে চোখ ঋদ্ধি শৈশব থেকে চেনে।

রূপসা।

দু’জনেই কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না।

ঋদ্ধির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“দিদি…”

রূপসা ধীরে এগিয়ে এলেন।

“ঋদ্ধি।”

ঋদ্ধি তাঁকে জড়িয়ে ধরল। বারো বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এল।

“তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে কত খুঁজেছি! তুমি একবারও খবর দিলে না কেন?”

রূপসা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“আমি জানি। তোমাকে এত কষ্ট দিতে চাইনি।”

ঋদ্ধি তাঁকে ছেড়ে বলল, “তাহলে কেন চলে গিয়েছিলে? তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারতে না?”

রূপসা চোখ মুছলেন।

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু তখন তোমার বয়স কম ছিল। তুমি অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছিলে। তোমার স্মৃতির মধ্যে কী সত্যি আর কী ভুল, তা নিয়ে তুমি নিজেই বিভ্রান্ত ছিলে। অরুণাভ তোমাকে তাঁর গবেষণার অংশ করতে চেয়েছিলেন। আমি যদি তোমাকে নিয়ে পালাতাম, তাহলে তোমার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যেত। আর আমি যদি তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতাম, তিনি তোমার চিকিৎসার নথি ব্যবহার করে তোমাকে অস্থিতিশীল বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন।”

“তাহলে তুমি একাই পালালে?”

“আমি প্রথমে তোমাকে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করেছিলাম। পরে বুঝলাম, তোমার বাবা-মায়ের কাছেও সব সত্য বলা নিরাপদ নয়। তাঁরা তোমাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু অরুণাভকে বিশ্বাস করতেন। তিনি পরিবারের বড় মানুষ ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও ছিল না।”

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল, “মা তো আট বছর আগে মারা গেছেন। বাবা কোথায়, তুমি জানো?”

রূপসার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“বাবা আমাকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অরুণাভ ভুল করেছেন। কিন্তু তাঁর কাছে এমন কিছু নথি ছিল, যা প্রকাশ পেলে পরিবারের সুনাম নষ্ট হতো। তিনি সব প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তারপর একদিন তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না।”

“তুমি কি মনে করো, দাদু বাবার নিখোঁজ হওয়ার জন্য দায়ী?”

রূপসা মাথা নাড়লেন।

“আমি নিশ্চিত নই। অরুণাভ অনেক কিছু গোপন করেছেন, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা যায় না।”

ঋদ্ধি বলল, “আমি তাঁর ভিডিও দেখেছি। তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি ভুল করেছেন।”

রূপসা চোখ বন্ধ করলেন।

“তাহলে অবশেষে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পেরেছেন।”

“দিদি, আমি জানতে চাই, আমার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।”

রূপসা তাকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। কাঠের টেবিলে বসিয়ে একটি পুরোনো খাতা খুললেন।

“তোমার দুর্ঘটনার পর তুমি কয়েকটি স্মৃতি হারিয়েছিলে। কিন্তু তুমি নিজেকে চিনতে, পরিবারকে চিনতে এবং নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে পারতে। অরুণাভ বলেছিলেন, তোমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ চিকিৎসা দরকার। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিলাম।”

“তারপর?”

“তিনি তোমাকে বারবার কিছু ছবি দেখাতেন, কিছু গল্প শোনাতেন এবং তোমাকে একই প্রশ্ন করতেন। প্রথমে মনে হতো, এটা স্মৃতি ফিরে পাওয়ার চিকিৎসা। পরে বুঝলাম, তিনি তোমাকে নির্দিষ্ট উত্তর দিতে অভ্যস্ত করে তুলছেন। তুমি যখন নিজের স্মৃতির কথা বলতে, তিনি বলতেন তুমি ভুল বলছ। ধীরে ধীরে তুমি নিজের মনে থাকা ঘটনাগুলোকেও সন্দেহ করতে শুরু করেছিলে।”

ঋদ্ধি নীরবে শুনছিল।

“একদিন তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে, আমি সত্যিই তোমার দিদি কি না। সেই দিন আমি বুঝেছিলাম, এই গবেষণা তোমার ক্ষতি করছে। আমি তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অরুণাভ আমাকে বাধা দেন।”

“তুমি তখন কী করলে?”

“আমি গবেষণার নথি সংগ্রহ করি। কিছু প্রমাণ অমিতাভের কাছে রাখি। তারপর তোমাকে নিরাপদ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজেকে আড়াল করি। আমি ভেবেছিলাম, কিছুদিন পরে ফিরে আসব। কিন্তু অরুণাভের লোকেরা আমাকে খুঁজছিল। আমি যেখানে যেতাম, সেখানে কেউ না কেউ এসে হাজির হতো।”

“তুমি কি কখনও আমার কাছে ফিরে আসতে চাওনি?”

রূপসার চোখ ভিজে উঠল।

“প্রতিদিন চেয়েছি। তোমার জন্মদিনে, দুর্গাপুজোয়, মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার দিন—প্রতিটি মুহূর্তে তোমার কাছে ফিরতে চেয়েছি। কিন্তু আমার ফিরে আসা যদি তোমাকে আবার বিপদের মুখে ঠেলে দিত, তাহলে আমি কীভাবে ফিরতাম?”

ঋদ্ধি দিদির হাত ধরল।

“এবার আর পালাতে হবে না। প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। আমরা সত্য প্রকাশ করব।”

রূপসা কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“তুমি বড় হয়ে গেছ, ঋদ্ধি।”

ঋদ্ধি মৃদু হাসল।

“বারো বছর তো কম সময় নয়।”

৬. দাদুর শেষ চিঠি

সেদিন সন্ধ্যায় রূপসা একটি কাঠের বাক্স খুললেন। বাক্সের মধ্যে বেশ কিছু চিঠি, পুরোনো ছবি এবং একটি খাম ছিল। খামের ওপর লেখা—‘ঋদ্ধির জন্য’।

“এটা অরুণাভ আমাকে দিয়েছিলেন,” রূপসা বললেন। “তখন আমি তাঁকে বিশ্বাস করতাম না। তাই চিঠিটি খুলি নি। তিনি বলেছিলেন, একদিন তুমি নিজের ইচ্ছায় সত্য খুঁজতে শুরু করলে, তখনই এটি পড়বে।”

ঋদ্ধি চিঠিটি খুলল।

‘ঋদ্ধি,

তুমি আমাকে হয়তো ক্ষমা করবে না। তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকারও আমার আছে কি না, জানি না।

আমি একসময় বিশ্বাস করতাম, মানুষের স্মৃতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিলে তার যন্ত্রণা কমানো সম্ভব। আমার গবেষণার শুরু ছিল মানুষের মানসিক আঘাত থেকে মুক্তির পথ খোঁজা। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি নিজের ধারণার প্রতি এতটাই অন্ধ হয়ে পড়ি যে, মানুষের সম্মতি, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার গুরুত্ব ভুলে যাই।

তোমার দুর্ঘটনা আমাকে একটি সুযোগ দিয়েছিল—আমি ভেবেছিলাম, তোমার স্মৃতির ফাঁক পূরণ করে তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু তোমার ইচ্ছা না জেনে তোমার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে আমি তোমার বিশ্বাস নষ্ট করেছি।

তোমার দিদি আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল। আমি তাকে বাধা দিয়েছি। তোমার বাবাও প্রতিবাদ করেছিলেন। আমি তাঁদের কথা শুনিনি।

আমি তোমার কাছে যা করেছি, তার কোনও যুক্তি নেই।

আমি জানি না, তুমি কখনও আমাকে দাদু বলে ডাকবে কি না। আমি শুধু চাই, তুমি সত্যিটা জানো। তোমার স্মৃতিতে কিছু ফাঁক আছে বলে তুমি অসম্পূর্ণ মানুষ নও। তোমার অতীতের প্রতিটি ঘটনা মনে না থাকলেও তোমার বর্তমান জীবন সত্যি।

আমি এখন এমন একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে আছি, যেখানে নিজের মানসিক অবস্থার চিকিৎসা নিচ্ছি। আমার শরীর দুর্বল। হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা হবে না।

যদি কখনও আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমাকে ক্ষমা করার জন্য নিজেকে বাধ্য কোরো না।

তুমি নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচবে।

— অরুণাভ সেন।’

চিঠি পড়ে ঋদ্ধি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে রাগ ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে একটি অদ্ভুত শূন্যতাও তৈরি হলো। যে মানুষটিকে সে দাদু বলে চিনত, সেই মানুষই তার শৈশবের একটি অংশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলেন।

রূপসা বললেন, “তুমি কি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাও?”

ঋদ্ধি জানলার বাইরে তাকাল।

“হ্যাঁ। কিন্তু ক্ষমা করার জন্য নয়। সত্যিটা নিজের মুখে শুনতে চাই।”

রূপসা মাথা নাড়লেন।

“তাহলে কাল সকালে আমরা যাব।”

৭. শেষ সাক্ষাৎ

পরদিন সকালে তাঁরা পাহাড়ের একটি ছোট চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছলেন। অরুণাভ সেন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বয়স আশির কাছাকাছি। শরীর দুর্বল, চলাফেরায় অসুবিধা। কিন্তু চেতনা পরিষ্কার।

ঋদ্ধিকে দেখে তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“তুমি এসেছ।”

ঋদ্ধি বলল, “আমি এসেছি কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে।”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“প্রশ্ন করো।”

“আপনি কি আমাকে সত্যিই সাহায্য করতে চেয়েছিলেন?”

“শুরুতে হ্যাঁ। কিন্তু পরে আমি নিজের গবেষণাকে তোমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করি। আমি নিজেকে বোঝাতাম, তোমার ভালোর জন্যই সব করছি। আসলে আমি নিজের ভুল স্বীকার করতে চাইনি।”

“আপনি কি জানতেন, আমার দিদি আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন?”

“জানতাম।”

“তবু তাঁকে থামিয়েছিলেন?”

অরুণাভ চোখ বন্ধ করলেন।

“হ্যাঁ।”

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমার বাবা কোথায়?”

অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার বাবা আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি সেগুলো প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করিনি, কিন্তু তাঁকে যথেষ্ট সাহায্যও করিনি। তিনি একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে জানতে পারি, তিনি অন্য শহরে চলে গেছেন। এরপর তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।”

“আপনি জানতেন না তিনি কোথায়?”

“না। আমি খোঁজ করেছিলাম। কিন্তু পাইনি।”

“আপনি কি তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?”

অরুণাভ দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন।

“না। আমি তোমার বাবাকে থামাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাঁর ক্ষতি করিনি। আমার ভুলের দায় আমি নেব, কিন্তু যে অপরাধ করিনি, তার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেব না।”

ঋদ্ধি তাঁর চোখের দিকে তাকাল।

সে বুঝতে পারছিল না, কতটা বিশ্বাস করবে। কিন্তু এবার সে জানত, শুধু স্মৃতি বা আবেগের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

“আপনি যে গবেষণা করেছেন, তার সব নথি কি এখনও আছে?”

“সব নয়। কিছু নথি রূপসা নিয়ে গিয়েছিল, কিছু অমিতাভের কাছে। কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কাছে একটি তালিকা আছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের নাম ও তারিখ লেখা।”

“সেটা কোথায়?”

অরুণাভ বালিশের নীচ থেকে একটি ছোট খাম বের করলেন।

“এখানে।”

ঋদ্ধি খামটি নিল।

“আপনি কি চান, আমি সব প্রকাশ করি?”

অরুণাভ বললেন, “আমি চাই, সত্য প্রকাশ হোক। কিন্তু যাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসার তথ্য রয়েছে, তাদের পরিচয় রক্ষা করতে হবে। অপরাধ প্রকাশ করতে গিয়ে আর কারও ক্ষতি কোরো না।”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমি সেটাই করব।”

বিদায় নেওয়ার আগে অরুণাভ ধীরে বললেন, “ঋদ্ধি, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”

ঋদ্ধি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি জানি না। হয়তো কোনও দিন পারব, হয়তো পারব না। কিন্তু আমি আপনার ভুলের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করব না।”

অরুণাভের চোখে জল এসে গেল।

“এটাই আমার প্রাপ্য উত্তর।”

ঋদ্ধি ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রূপসা তার পাশে হাঁটছিলেন।

“তুমি ঠিক আছ?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমি প্রথমবার বুঝলাম, কাউকে ক্ষমা করা আর তার কাজকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া এক জিনিস নয়।”

রূপসা ভাইয়ের হাত ধরলেন।

“তুমি অবশেষে নিজের স্মৃতির বাইরে গিয়ে সত্যকে দেখতে শিখেছ।”

৮. তেরো নম্বর ঘরের শেষ দরজা

কলকাতায় ফিরে ঋদ্ধি সমস্ত প্রমাণ আইনজীবী ও বিশ্বস্ত সাংবাদিকদের সঙ্গে ভাগ করে নিল। পুরোনো নথি যাচাই করা হলো। হাসপাতালের রেকর্ড, পুনর্বাসন কেন্দ্রের কাগজ, অমিতাভ পালের সাক্ষ্য এবং অরুণাভের স্বীকারোক্তি মিলিয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন তৈরি হলো।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত শুরু হয়। কয়েকজন প্রাক্তন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যাঁরা গবেষণার নামে মানুষের সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়। তবে প্রত্যেক অভিযোগের জন্য পৃথক প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়; কেবল পুরোনো নথির ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়নি।

শান্তিনিকেতন লজের তেরো নম্বর ঘরটি সিল করে দেওয়া হলো। ঘরের কম্পিউটার, ভিডিও ক্যাসেট এবং নথি তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

হরিপদ মণ্ডলও নিজের সাক্ষ্য দিলেন। তিনি স্বীকার করলেন, বহু বছর আগে তিনি ভয়ে কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন। তদন্তে সহযোগিতা করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা পুরোনো অভিযোগগুলিও পুনর্বিবেচনা করা হলো।

মায়া প্রথমবারের মতো নিজের জীবনের কথা প্রকাশ্যে বলতে রাজি হলো। সে জানাল, কীভাবে ছোটবেলায় তাকে কিছু ঘটনা ভুলে যেতে বলা হয়েছিল, কীভাবে নিজের স্মৃতির ওপর তার বিশ্বাস কমে গিয়েছিল, এবং কীভাবে রূপসা তাকে সাহায্য করেছিলেন।

কিন্তু সে এটাও বলল, সব স্মৃতির ফাঁককে কোনও গোপন পরীক্ষার ফল বলে ধরে নেওয়া যায় না। কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়, কিছু মানসিক আঘাতে হারিয়ে যায়, আবার কিছু ঘটনা মানুষ ভুলভাবে মনে রাখে। সত্য খুঁজতে হলে সাক্ষ্য, নথি এবং নিরপেক্ষ যাচাই—সবই দরকার।

ঋদ্ধি তার প্রতিবেদনের শেষে লিখল—

‘মানুষের স্মৃতি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু স্মৃতির সীমাবদ্ধতা কাউকে অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দেয় না। চিকিৎসা, গবেষণা বা পুনর্বাসনের নামে কোনও মানুষের সম্মতি ও মর্যাদা উপেক্ষা করা যায় না। অতীতের সত্য খোঁজার উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; উদ্দেশ্য হলো অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে তেরো নম্বর ঘরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ঘরের আয়না সরানোর সময় তার পিছনে একটি ছোট ধাতব বাক্স পাওয়া গেল।

বাক্সের মধ্যে কোনও যন্ত্র ছিল না। ছিল একটি মাত্র ছবি।

ছবিতে ছোট্ট ঋদ্ধি, তার দিদি রূপসা এবং তাদের মা-বাবা। সবাই একসঙ্গে বসে হাসছে। ছবিটি সম্ভবত ঋদ্ধির দুর্ঘটনার আগের।

পিছনে মায়ের হাতের লেখায় লেখা—

‘স্মৃতি ভুল হতে পারে। ভালোবাসা যেন কখনও মিথ্যা না হয়।’

ঋদ্ধি ছবিটি নিজের কাছে রেখে দিল।

৯. যে জীবন আবার শুরু হলো

ছয় মাস পরে রূপসা কলকাতায় ফিরে এলেন। তিনি আর আগের চাকরিতে যোগ দেননি। বরং মানসিক আঘাতের শিকার মানুষদের সহায়তা করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন, কারও কষ্টের কথা শোনা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া।

মায়াও ধীরে ধীরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিল। সে চিকিৎসা ও পরামর্শের সাহায্য নিল, পুরোনো স্মৃতি ফিরে পাওয়ার জন্য নিজেকে বাধ্য করল না। যে স্মৃতিগুলো স্পষ্ট ছিল, সেগুলো লিখে রাখল; যেগুলো অস্পষ্ট, সেগুলোকে প্রশ্ন হিসেবেই রেখে দিল।

ঋদ্ধি আবার সাংবাদিকতার কাজে ফিরে গেল। তবে এবার সে রহস্যের খবর লিখতে গিয়ে আরও সতর্ক হলো। কোনও অদ্ভুত ঘটনা দেখলেই সেটিকে অতিপ্রাকৃত বলে ঘোষণা করত না। আবার ক্ষমতাবান কেউ ব্যাখ্যা দিতে না পারলে ঘটনাটিকে মিথ্যা বলেও উড়িয়ে দিত না।

তার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রমাণ, মানুষের সাক্ষ্য এবং নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতন থাকা।

একদিন সন্ধ্যায় রূপসা তাদের পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে ছিলেন। ঋদ্ধি দু’কাপ চা নিয়ে এল।

রূপসা হাসলেন।

“মনে আছে, ছোটবেলায় তুমি চা খেতে চাইতে না?”

ঋদ্ধি হেসে বলল, “মনে আছে। তুমি জোর করে দুধ খাওয়াতে।”

“তুমি তখন খুব জেদি ছিলে।”

“এখনও আছি।”

দু’জনেই হেসে উঠল।

কিছুক্ষণ পরে রূপসা বললেন, “তুমি কি এখনও দাদুর কথা ভাবো?”

ঋদ্ধি চায়ের কাপে তাকিয়ে রইল।

“হ্যাঁ। তাঁর কাজের জন্য রাগ হয়। আবার তাঁর শেষ কথাগুলোও মনে পড়ে। আমি তাঁকে পুরোপুরি ক্ষমা করেছি কি না, জানি না।”

“তোমাকে করতেই হবে না।”

ঋদ্ধি দিদির দিকে তাকাল।

“তুমি কি তাঁকে ক্ষমা করেছ?”

রূপসা একটু ভেবে বললেন, “আমি তাঁর কাজকে ক্ষমা করতে পারি না। কিন্তু তাঁর ভুল স্বীকার করার ক্ষমতাকে অস্বীকারও করতে পারি না। মানুষকে তার কাজের জন্য দায় নিতে হবে। আর আমাদের নিজেদের জীবনকে সেই অপরাধের মধ্যে চিরকাল আটকে রাখা চলবে না।”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমার মনে হয়, আমি এত দিন দিদিকে খুঁজছিলাম। কিন্তু আসলে নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনটাকেও খুঁজছিলাম।”

রূপসা তার হাত ধরলেন।

“এবার তুমি দুটোই ফিরে পেয়েছ।”

১০. শেষ স্মৃতির দরজা

এক বছর পরে শান্তিনিকেতন লজের ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ভবনটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল এবং তার কাঠামো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ভাঙার আগে তদন্তকারীরা সমস্ত নথি, যন্ত্র এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী সরিয়ে নেন।

ঋদ্ধি শেষবারের মতো বাড়িটির সামনে দাঁড়াল। তার পাশে রূপসা ও মায়া।

তিনতলার জানলাগুলি ফাঁকা। দেওয়ালের রং উঠে গেছে। ফটকের ওপরের ফলকটি খুলে রাখা হয়েছে।

রূপসা বললেন, “তুমি কি শেষবারের মতো তেরো নম্বর ঘরটি দেখতে চাও?”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“না। সেখানে আমার জীবনের একটা অন্ধকার অধ্যায় ছিল। কিন্তু আমার জীবন শুধু সেই অধ্যায় নয়।”

মায়া মৃদু হাসল।

“তাহলে এবার কোথায় যাবে?”

ঋদ্ধি আকাশের দিকে তাকাল।

“বাড়ি। তারপর কাজে। এখনও অনেক মানুষের গল্প লেখা বাকি।”

তারা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

হঠাৎ ঋদ্ধির ফোনে একটি বার্তা এল। অচেনা নম্বর থেকে।

‘তেরো নম্বর ঘরের রহস্য শেষ হয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, মানুষের স্মৃতি সব সময় নিখুঁত নয়। নিজের স্মৃতিকে ভালোবাসবে, কিন্তু প্রশ্ন করতেও ভয় পাবে না।’

বার্তার নীচে কোনও নাম নেই।

ঋদ্ধি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর নম্বরটি পরীক্ষা করল। সেটি বন্ধ।

মায়া জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”

ঋদ্ধি ফোনটি পকেটে রেখে বলল, “কিছু নয়। হয়তো কেউ একটা কথা মনে করিয়ে দিল।”

“কী কথা?”

ঋদ্ধি হাসল।

“যে সত্য খুঁজতে হলে প্রশ্ন করতে হয়। কিন্তু প্রতিটি অজানা জিনিসের পিছনে নতুন ষড়যন্ত্র আছে—এমন ভাবার দরকার নেই।”

গাড়ি চলতে শুরু করল।

পিছনে পড়ে রইল শান্তিনিকেতন লজ, তার বন্ধ জানলা, অন্ধকার করিডর আর তেরো নম্বর ঘরের সেই আয়না।

ঋদ্ধি জানত, তার জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি। বাবার নিখোঁজ হওয়ার রহস্যও এখনও পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা আর তাকে আগের মতো ভয় দেখায় না।

কারণ সে শিখেছে, সব উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। কিছু সত্য প্রমাণের অপেক্ষায় থাকে, কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ফিরে আসে, আর কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেলেও জীবন থেমে থাকে না।

সে দিদির দিকে তাকাল।

রূপসা জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন। তাঁর মুখে বহু বছরের ক্লান্তি, কিন্তু চোখে নতুন জীবনের আলো।

ঋদ্ধি মনে মনে বলল, ‘এবার আর কাউকে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে হারাব না।’

গাড়ি শহরের ভিড়ে মিশে গেল।

তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ হয়েছে।

কিন্তু ঋদ্ধির জীবনের দরজা এবার সত্যিই খুলেছে—অতীতের দিকে নয়, ভবিষ্যতের দিকে।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : তেরো নম্বর ঘরের রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের স্মৃতি)।

১. যে দরজা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল না

“ওরা তোমাকে ছোটবেলাতেই মেরে ফেলেছিল, ঋদ্ধি।”

আয়নার ওপারে রূপসার ঠোঁট থেকে কথাগুলো বেরোনোর পর ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল। এক মুহূর্তের জন্য ঋদ্ধির মনে হলো, তার পায়ের নীচের মেঝেটা সরে যাচ্ছে। সে হাত বাড়িয়ে কিছু ধরতে চাইল, কিন্তু চারপাশে শুধু অন্ধকার।

“মায়া!”

কোনও উত্তর নেই।

“মায়া, তুমি কোথায়?”

দূরে কোথাও ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তারপর করিডরে একসঙ্গে কয়েকটি পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।

ঋদ্ধি পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বালাল। আলো পড়তেই সে দেখল, মায়া ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে আতঙ্ক, হাতে সেই ফাইলটি।

“দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে বেরোতে হবে,” মায়া বলল।

“আয়নার মধ্যে আমার দিদি ছিল। উনি বললেন, আমাকে ছোটবেলায় মেরে ফেলা হয়েছিল। এর মানে কী?”

“এখন সব বলার সময় নেই।”

“বারো বছর ধরে আমি দিদিকে খুঁজছি। এখন তাঁকে চোখের সামনে দেখেও চলে যাব?”

মায়া তার হাত চেপে ধরল।

“তুমি যদি এখানেই থাকো, তাহলে তোমাকে আবার সেই পরীক্ষার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। তুমি জানো না, এই ঘর কীভাবে কাজ করে।”

“তুমি জানো?”

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি এই ঘরের প্রথম বন্দিদের একজন।”

দরজার বাইরে থেকে চাবি ঘোরানোর শব্দ এল।

মায়া তাড়াতাড়ি টেবিলের নীচে হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট সুইচ টিপল। দেওয়ালের বইয়ের তাকটি ধীরে ধীরে সরে গেল। তার পিছনে একটি সরু পথ।

“এই পথ কোথায় যায়?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।

“বাড়ির পুরোনো বেসমেন্টে। ড. অনিরুদ্ধ বসু এই পথ বানিয়েছিলেন। তেরো নম্বর ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে গেলে যাতে মূল করিডরে দেখা না যায়, তার ব্যবস্থা ছিল।”

“তাহলে তিনি নিজেই পালানোর রাস্তা তৈরি করেছিলেন?”

“তিনি পালানোর রাস্তা তৈরি করেননি। তৈরি করেছিলেন গোপন যাতায়াতের ব্যবস্থা। পার্থক্যটা মনে রেখো।”

ঋদ্ধি মায়ার পিছনে সরু পথ দিয়ে ঢুকে পড়ল। মায়া তাকটি আবার বন্ধ করে দিল।

পরক্ষণেই বাইরে থেকে দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল।

কেউ ঘরে ঢুকে চিৎকার করে উঠল, “এরা কোথায় গেল?”

ঋদ্ধি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে মায়ার হাত তার হাতের ওপর শক্ত হয়ে ছিল।

কিছুক্ষণ পরে মায়া ফিসফিস করে বলল, “তুমি যে সত্য খুঁজতে এসেছ, তা শুধু তোমার দিদির নিখোঁজ হওয়ার রহস্য নয়। এই বাড়িতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য বহু মানুষ নিজেদের অতীত হারিয়েছে।”

“আর আমি?”

“তুমিও তাদের একজন।”

২. বারো বছর আগের হাসপাতাল

সুড়ঙ্গটি শেষ হয়েছিল একটি ছোট ঘরে। ঘরের দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ, মেঝেতে ভাঙা ইট। একটি পুরোনো কাঠের দরজা ঠেলে তারা অন্য করিডরে বেরিয়ে এল।

মায়া জানাল, বাড়িটির নীচে একসময় একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। সেখানে ড. অনিরুদ্ধ বসু তাঁর গবেষণার জন্য কিছু ঘর ব্যবহার করতেন। সরকারি নথিতে সেটিকে পরামর্শকেন্দ্র হিসেবে দেখানো হলেও, আসলে সেখানে মানুষের স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হতো।

“এই গবেষণার সঙ্গে আমার দিদির কী সম্পর্ক?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।

“তোমার দিদি প্রথমে অনুবাদের কাজ করতেন। বিদেশি গবেষণাপত্র বাংলায় অনুবাদ করা, সাক্ষাৎকারের নথি তৈরি করা—এসব ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, কিছু রোগীকে তাদের সম্মতি ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।”

“তিনি কি সেই প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে তিনি একটি ঘটনা জানতে পারেন।”

মায়া থামল। তারপর বলল, “বারো বছর আগে তোমার একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল।”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমার মনে আছে। ছোটবেলায় সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। মাথায় আঘাত লেগেছিল। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

“সেটাই পুরো ঘটনা নয়।”

“তাহলে?”

“হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, তুমি কয়েক ঘণ্টা অচেতন ছিলে। কিন্তু ড. বসুর ব্যক্তিগত নথিতে লেখা আছে, তোমাকে পরে এই বাড়িতে আনা হয়েছিল। তোমার মস্তিষ্কে আঘাতের পর স্মৃতির কিছু অংশ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমার পরিবার আমাকে এখানে এনেছিল?”

“তোমার মা-বাবাকে বলা হয়েছিল, তোমাকে একটি বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচিতে রাখা হবে। তাঁরা জানতেন না, সেই কর্মসূচির আড়ালে কী করা হচ্ছিল।”

“আমার মা-বাবা কি এখনও বেঁচে আছেন?”

মায়া চোখ নামিয়ে বলল, “তোমার মা মারা গেছেন আট বছর আগে। তোমার বাবা—”

“বাবার কী হয়েছে?”

“তিনি নিখোঁজ।”

ঋদ্ধি দেওয়ালে হাত রাখল। মাথার মধ্যে পুরোনো স্মৃতিগুলো ভাঙা কাচের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। হাসপাতালের সাদা বিছানা, মাথায় ব্যান্ডেজ, মায়ের কান্না, বাবার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অচেনা মানুষ।

তারপর শূন্যতা।

“আমি কি মারা গিয়েছিলাম?” সে ফিসফিস করে বলল।

“আমি জানি না,” মায়া উত্তর দিল। “তোমার শারীরিক মৃত্যু হয়েছিল, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমি দেখিনি। কিন্তু ড. বসুর একটি নথিতে লেখা আছে—‘বিষয় ১৩/০৭-এর মূল স্মৃতিচিত্র স্থগিত। পরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু।’”

ঋদ্ধি রাগে ফেটে পড়ল।

“আমি কোনও বিষয় নই! আমার নাম ঋদ্ধি সেন!”

“আমি জানি।”

“তাহলে আমার জীবন নিয়ে ওরা কী করেছে?”

মায়া উত্তর দিল না।

সে ব্যাগ থেকে একটি ছোট পেনড্রাইভ বের করল।

“তোমার দিদি এই নথিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি সব পড়তে পারিনি। কিন্তু এখানে তোমার নাম আছে।”

ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি হাতে নিল।

“এটা কোথায় চালাব?”

মায়া বলল, “এখানে নয়। বাড়ির বাইরে যেতে হবে। তবে তার আগে তোমাকে এমন একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে, যিনি তোমার দুর্ঘটনার দিন হাসপাতালে ছিলেন।”

“কে তিনি?”

“ডাক্তার সায়ন রায়।”

৩. যে ডাক্তার নিজের সাক্ষ্য বদলেছিলেন

ভোর হওয়ার কিছু আগে তারা শান্তিনিকেতন লজের পিছনের একটি ছোট দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গলির মুখে একটি চায়ের দোকান খুলছিল। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।

ঋদ্ধি একটি ট্যাক্সি ডেকে মায়াকে নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার একটি পুরোনো আবাসনের সামনে পৌঁছল।

ডাক্তার সায়ন রায় এখন অবসরপ্রাপ্ত। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর। একসময় তিনি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন। এখন খুব কম মানুষের সঙ্গে দেখা করেন।

দরজায় ঘণ্টা বাজাতেই এক বৃদ্ধা দরজা খুললেন। মায়ার পরিচয় শুনে তিনি তাঁদের ভেতরে নিয়ে গেলেন।

সায়ন রায় বসার ঘরে বসে পুরোনো বই পড়ছিলেন। ঋদ্ধিকে দেখে তাঁর হাত থেকে বইটি পড়ে গেল।

“তুমি?”

ঋদ্ধি সামনে এগিয়ে গেল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

বৃদ্ধের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“তোমার এখানে আসার কথা ছিল না।”

“কেন? আপনি কি আমাকে ছোটবেলায় চিকিৎসা করেছিলেন?”

সায়ন রায় দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “হ্যাঁ।”

“আমার দুর্ঘটনার দিন কী ঘটেছিল?”

বৃদ্ধ চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।

“তোমার মাথায় আঘাত লেগেছিল। হাসপাতালে আনার সময় তোমার শ্বাসপ্রশ্বাস অত্যন্ত দুর্বল ছিল। চিকিৎসার পর তোমার অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছিল। কিন্তু তুমি কয়েক দিন কথা বলতে পারোনি।”

“তারপর আমাকে শান্তিনিকেতন লজে নিয়ে যাওয়া হয়?”

“তোমার বাবা-মাকে বলা হয়েছিল, একটি বিশেষ পুনর্বাসন কেন্দ্রে তোমাকে রাখা হবে। আমি তখন ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমি জানতাম, সেখানে স্মৃতি পুনরুদ্ধারের কিছু পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।”

“আপনি জানতেন, আমার ওপর পরীক্ষা হবে?”

“আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে সাহায্য করা হবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, পরীক্ষার সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে।”

ঋদ্ধি কঠিন গলায় বলল, “আমি কি মারা গিয়েছিলাম?”

সায়ন রায় মাথা নাড়লেন।

“না। তুমি মারা যাওনি। তোমার হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের জন্য। চিকিৎসায় তোমাকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।”

“তাহলে দিদি কেন বললেন, আমাকে মেরে ফেলা হয়েছিল?”

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগে মায়ার দিকে তাকালেন।

“সম্ভবত তিনি বলতে চেয়েছেন, তোমার পুরোনো পরিচয়কে মুছে ফেলা হয়েছিল। তোমার কিছু স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছিল, কিছু স্মৃতি তোমার মনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তোমার স্বাভাবিক স্মৃতির সঙ্গে অন্য মানুষের গল্প, ছবি ও নথি মিশে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল।”

ঋদ্ধি বলল, “আমার স্মৃতির মধ্যে কি অন্য মানুষের স্মৃতি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল?”

“সরাসরি অন্যের স্মৃতি মাথায় বসিয়ে দেওয়া যায়—এমন প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু বারবার একই ছবি দেখানো, একই গল্প শোনানো, প্রশ্নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উত্তর তৈরি করা এবং রোগীকে তার স্মৃতি সম্পর্কে সন্দেহে ফেলা—এসবের ফলে মানুষ নিজের অতীত সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারে।”

“আপনি তাহলে সব জানতেন!”

সায়ন রায় মাথা নিচু করলেন।

“সব জানতাম না। কিন্তু সন্দেহ হওয়ার পরও আমি প্রতিবাদ করিনি। সেটাই আমার অপরাধ।”

তিনি আলমারি থেকে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

“তোমার দিদি নিখোঁজ হওয়ার আগে এটি আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একদিন তুমি সত্য খুঁজতে আসবে।”

খামের ভেতরে একটি ছবি।

ছবিতে বারো বছরের ঋদ্ধি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে রূপসা দাঁড়িয়ে। তাঁদের পিছনে ড. অনিরুদ্ধ বসু এবং সায়ন রায়।

ছবির পিছনে লেখা—

‘প্রথম পর্যায় শেষ। বিষয় ১৩/০৭-এর স্মৃতি পুনর্গঠনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।’

তার নীচে রূপসার হাতের লেখায় আরও একটি বাক্য—

‘ওকে ওর নিজের জীবন ফিরিয়ে দাও।’

ঋদ্ধি ছবিটি বুকে চেপে ধরল।

তারপর সে সায়ন রায়কে জিজ্ঞাসা করল, “ড. অনিরুদ্ধ বসু কোথায়?”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “আমি জানি না। কিন্তু তোমার দিদি একবার বলেছিলেন, বসু নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন এমন একটি জায়গায়, যেখানে কেউ তাঁর পুরোনো পরিচয় জানে না।”

“কোথায়?”

সায়ন রায় মাথা নাড়লেন।

“সেটা তিনি বলেননি।”

৪. মায়ার আসল পরিচয়

সায়ন রায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঋদ্ধি কাছের একটি নির্জন পার্কে বসে পড়ল। আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে। তার সামনে এত তথ্য, অথচ কোনও তথ্যই পুরো সত্যকে প্রকাশ করছে না।

সে মায়ার দিকে তাকাল।

“তুমি কীভাবে এই সব জানো?”

মায়া চুপ করে রইল।

“তুমি বলেছিলে, তুমি তেরো নম্বর ঘরের প্রথম বন্দিদের একজন। তুমি কি সেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলে?”

“না।”

“তাহলে?”

মায়া ধীরে বলল, “আমার মা সেখানে কাজ করতেন। তিনি ড. বসুর গবেষণাকেন্দ্রে সহকারী ছিলেন। ছোটবেলায় আমি মায়ের সঙ্গে ওই বাড়িতে যেতাম। একদিন আমি এমন কিছু নথি দেখে ফেলি, যা আমার দেখার কথা ছিল না।”

“তারপর?”

“আমাকে বলা হয়, আমি যা দেখেছি, তা ভুলে যেতে হবে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা খারাপ স্বপ্ন। পরে বুঝতে পারি, আমার মনে যা ঘটেছিল, তার অনেক কিছুই আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি না।”

“তুমি কি তখন থেকেই তেরো নম্বর ঘরে বন্দি?”

“সব সময় নয়। আমাকে মাঝে মাঝে বাইরে যেতে দেওয়া হতো। কিন্তু আমার ওপর নজর রাখা হতো। আমি বড় হওয়ার পর বুঝতে পারি, আমার স্মৃতির ফাঁকগুলো কোনও স্বাভাবিক কারণে তৈরি হয়নি।”

ঋদ্ধি বলল, “তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য করছ কেন?”

মায়া ব্যাগ থেকে আরেকটি ছবি বের করল।

ছবিতে একটি ছোট মেয়ে, তার পাশে কিশোরী রূপসা। মেয়েটির বয়স আট-নয় বছর হবে। ছবির পিছনে লেখা—‘মায়া, ২০০৪’।

“তোমার দিদি আমাকে একবার পালাতে সাহায্য করেছিলেন,” মায়া বলল। “তারপর তিনি নিজেই নিখোঁজ হয়ে যান। আমি এত বছর ধরে তাঁর খোঁজ করেছি। যখন জানতে পারি, তুমি সাংবাদিক হয়েছ এবং পুরোনো নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করছ, তখন তোমাকে খুঁজে বের করি।”

ঋদ্ধি ছবিটি ভালো করে দেখল।

“তুমি আমার দিদির কাছে ছিলে?”

“হ্যাঁ। রূপসা আমাকে বলেছিলেন, একদিন তাঁর ভাই আসবে। তাকে যেন সাহায্য করি। কিন্তু তিনি এটাও বলেছিলেন, তোমার কাছে সব সত্য একবারে বলা যাবে না।”

“কেন?”

“কারণ তোমার স্মৃতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তুমি নিজেও জানো না। আর সেই স্মৃতির সূত্রেই ড. বসুর গবেষণার আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ পেতে পারে।”

ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।

“আমি আর কোনও অর্ধসত্য শুনতে চাই না। আমরা এখনই আবার ওই বাড়িতে ফিরব।”

মায়া মাথা নাড়ল।

“ফিরতে হবে। কিন্তু এবার প্রস্তুতি নিয়ে।”

“কী প্রস্তুতি?”

মায়া বলল, “আমাদের জানতে হবে, তেরো নম্বর ঘরের আয়নাটি আসলে কী। আর তোমার দিদি কেন ওই আয়নার মধ্যে দেখা যাচ্ছেন।”

৫. আয়নার ওপারের ঘর

দুপুরের আগে তারা শান্তিনিকেতন লজে ফিরে এল। হরিপদ তাঁদের দেখে অবাক হলেন, কিন্তু কোনও প্রশ্ন করলেন না।

মায়া জানাল, তেরো নম্বর ঘরের আয়নাটি সাধারণ আয়না নয়। তার পিছনে একটি গোপন কক্ষ রয়েছে, যেখানে পুরোনো ভিডিও রেকর্ডিং, অডিও নথি এবং পর্যবেক্ষণের যন্ত্র রাখা হতো।

“তাহলে আমরা আয়নায় রূপসাকে দেখেছিলাম কীভাবে?” ঋদ্ধি জিজ্ঞাসা করল।

“সম্ভবত আয়নার পিছনের ঘরে ক্যামেরা ও প্রদর্শনযন্ত্র ছিল। তবে যন্ত্রগুলো এখনও কাজ করছে কি না, তা জানি না।”

“তাহলে দিদি ওই ঘরেই বন্দি?”

“আমি নিশ্চিত নই।”

তারা তেরো নম্বর ঘরে ঢুকল। এবার দরজা খোলা ছিল। টেবিলের ওপর ফাইলটি এখনও পড়ে আছে। দেওয়ালের আয়নাটি আগের মতোই স্থির।

ঋদ্ধি আয়নার ফ্রেম পরীক্ষা করতে লাগল। নীচের দিকে একটি ছোট ধাতব বোতাম দেখতে পেল। বোতামটি চাপতেই ফ্রেমের এক পাশ থেকে মৃদু শব্দ হলো।

আয়নাটি সামান্য সরে গেল।

পিছনে একটি সরু দরজা।

দরজা খুলে তারা ছোট একটি কক্ষে ঢুকল। ঘরের দেওয়ালজুড়ে পুরোনো মনিটর, তারের জট, ভিডিও ক্যাসেটের তাক। এক কোণে একটি কম্পিউটার। আশ্চর্যজনকভাবে কম্পিউটারটি চালু ছিল।

মনিটরে একটি ফোল্ডার খোলা।

নাম—‘১৩/০৭—শেষ সাক্ষ্য’।

ঋদ্ধি ফাইলটি চালু করল।

স্ক্রিনে রূপসার মুখ ভেসে উঠল। রেকর্ডিংটি বহু পুরোনো। তাঁর চুল এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কণ্ঠ দৃঢ়।

“যদি কেউ এই রেকর্ডিং দেখো, তাহলে জেনে রেখো, আমার নাম রূপসা সেন। আমি এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি। আমি এমন কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, যা প্রকাশ পেলে ড. অনিরুদ্ধ বসুর গবেষণার আড়ালে চলা অনৈতিক কাজগুলো সামনে আসবে।”

তিনি একটু থামলেন।

“এই গবেষণায় মানুষের স্মৃতি সরাসরি বদলে দেওয়ার কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তার পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করা যায়। কোনও ব্যক্তিকে বারবার বলা হলে যে সে একটি ঘটনা ভুল মনে করছে, তার নিজের স্মৃতির ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ছবি, নথি এবং সাজানো সাক্ষ্য ব্যবহার করে তার অতীত সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা তৈরি করা যায়।”

ঋদ্ধি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।

রূপসা বললেন, “ড. বসু এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন এমন মানুষদের ওপর, যাদের অতীত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি কম। তাঁর দাবি ছিল, মানসিক আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে নতুন পরিচয় দিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতি মানুষকে নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে না শেখিয়ে বরং গবেষকের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছিল।”

মায়া ফিসফিস করে বলল, “এটাই ছিল তাঁর আসল পরীক্ষা।”

রূপসার রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“আমার ভাই ঋদ্ধি দুর্ঘটনার পর কিছু স্মৃতি হারিয়েছিল। আমি চাইনি, তার দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হোক। কিন্তু আমার অনুমতি ছাড়াই তাকে এই গবেষণার মধ্যে আনা হয়েছিল। আমি যখন প্রতিবাদ করি, তখন আমাকে বলা হয়, ঋদ্ধির চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে।”

ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।

“আমি প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এই বাড়িতে এমন কিছু নথি আছে, যা শুধু গবেষণার অপরাধ নয়, আরও একটি অপরাধের প্রমাণ। ড. বসু এমন কয়েকজন মানুষের পরিচয় বদলে দিতে চেয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারতেন।”

রূপসা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকালেন।

“ঋদ্ধি, যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে আমাকে খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন কোরো না। তুমি আমার ভাই। তোমার স্মৃতিতে কিছু ফাঁক থাকলেও, তোমার জীবন মিথ্যা নয়। তুমি যা অনুভব করেছ, যা শিখেছ, যাদের ভালোবেসেছ—সেগুলো তোমারই।”

ভিডিওর শেষে তিনি একটি নাম বললেন।

“অনিরুদ্ধ বসুর আসল নাম—অরুণাভ সেন।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“সেন? আমাদের পদবিও সেন!”

মায়া তার দিকে তাকাল।

“তোমার পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল?”

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

“আমি জানি না।”

রেকর্ডিংয়ের শেষ অংশে রূপসা বললেন—

“এই নামটি মনে রেখো। অরুণাভ সেন শুধু গবেষক ছিলেন না। তিনি আমাদের পরিবারের একজন ছিলেন। আর তিনি যে অপরাধ করেছেন, তার সাক্ষী শুধু আমি নই।”

ভিডিও বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

ঋদ্ধি ধীরে বলল, “অরুণাভ সেন আমাদের কে?”

মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই কম্পিউটারের পর্দায় নতুন একটি ফাইল খুলে গেল।

ফাইলটি নিজে থেকেই চালু হয়েছে।

স্ক্রিনে এক বৃদ্ধ মানুষের মুখ দেখা গেল। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“ঋদ্ধি, তুমি যদি এই বার্তা দেখে থাকো, তাহলে বুঝব, রূপসা তার শেষ কাজটি সম্পূর্ণ করেছে।”

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।

“আমি তোমার দাদু, অরুণাভ সেন। আর তোমার জন্মের আগেই আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার ফল তোমাদের পরিবারকে বারো বছর ধরে ভোগ করতে হয়েছে।”

ঋদ্ধির বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

বৃদ্ধের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।

“তোমার দিদি এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে তোমাকে জানতে হবে, বারো বছর আগে সে কেন নিজের নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”

ঋদ্ধি বিস্ময়ে বলে উঠল, “নিজের নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত?”

বৃদ্ধের মুখে বিষণ্ণ হাসি ফুটল।

“হ্যাঁ, ঋদ্ধি। তোমার দিদি নিখোঁজ হয়নি। সে নিজেকে আড়াল করেছিল—তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”

স্ক্রিনের আলো নিভে গেল।

ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

হরিপদ দৌড়ে ঘরে ঢুকে বললেন, “পুলিশ এসেছে! তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন লোক রয়েছে। তাঁরা বলছেন, এই বাড়িতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা হয়েছে।”

মায়া দ্রুত কম্পিউটার থেকে পেনড্রাইভটি খুলে ঋদ্ধির হাতে দিল।

“এটা লুকিয়ে রাখো।”

“ওরা কারা?”

মায়া দরজার দিকে তাকাল।

“যারা চায়, তেরো নম্বর ঘরের রহস্য কোনও দিন প্রকাশ না পাক।”

বাইরে থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—

“ঋদ্ধি সেন, আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে।”

ঋদ্ধি পেনড্রাইভটি মুঠোয় চেপে ধরল।

তারপর কম্পিউটারের কালো পর্দায় হঠাৎ একটি নতুন বাক্য ফুটে উঠল—

‘বিষয় ১৩/০৭: স্মৃতি পুনরুদ্ধারের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু।’

ঋদ্ধি বুঝতে পারল, এতক্ষণ যে রহস্যের দরজা সে খুলেছে, তার পিছনে আরও একটি দরজা রয়েছে।

আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে এমন এক সত্য, যা তার পরিবারকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে চিনতে বাধ্য করবে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : তেরো নম্বর ঘরের রহস্য (প্রথম পর্ব: যে ঘরে কেউ থাকে না)।

১. মধ্যরাতের ফোন

রাত তখন ১টা ১৩ মিনিট।

কলকাতার উত্তর শহরতলির পুরোনো বাড়ি ‘শান্তিনিকেতন লজ’-এর তিনতলার করিডরে দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল ঋদ্ধি সেন। বাড়িটির নাম শান্তিনিকেতন লজ হলেও সেখানে কোনও অতিথি থাকতেন না। একসময় এটি ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাসভবন। পরে বাড়ির মালিকেরা শহর ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে বাড়িটির দেখাশোনা করেন এক বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক, হরিপদ মণ্ডল।

ঋদ্ধি পেশায় সাংবাদিক। একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে অপরাধ ও রহস্যসংক্রান্ত খবর লেখে। শহরের পুরোনো বাড়ি, পরিত্যক্ত কারখানা, নিখোঁজ মানুষ এবং বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অপরাধ—এই ধরনের বিষয় নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ।

সেদিন রাতে তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এসেছিল।

‘আপনি যদি সত্যিই হারিয়ে যাওয়া মানুষের খবর খুঁজে বের করতে চান, তাহলে শান্তিনিকেতন লজে আসুন। তেরো নম্বর ঘরটি খুলবেন না। দরজার ওপারে যে মেয়েটি আছে, সে আপনার নাম জানে।’

বার্তাটির নীচে আরও একটি লাইন ছিল।

‘আপনার দিদি এখনও বেঁচে আছেন।’

লাইনটি পড়ে ঋদ্ধির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

তার দিদি রূপসা সেন নিখোঁজ হয়েছিলেন বারো বছর আগে। তখন ঋদ্ধির বয়স মাত্র ষোলো। রূপসার বয়স ছিল চব্বিশ। এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি উধাও হয়ে যান। পুলিশ তদন্ত করেছিল, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল—কিন্তু কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কিছুদিন পরে পুলিশ ধরে নিয়েছিল, রূপসা স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছেন। পরিবার সেই সিদ্ধান্ত কখনও মেনে নিতে পারেনি।

ঋদ্ধি বড় হয়ে সাংবাদিক হওয়ার পরও দিদিকে খোঁজা বন্ধ করেনি। কিন্তু বারো বছরে সে এমন কোনও সূত্র পায়নি, যা তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

আর আজ, মাঝরাতে, অচেনা কেউ তাকে জানাচ্ছে—রূপসা বেঁচে আছেন।

ঋদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে নম্বরে ফোন করল।

ফোন বেজে উঠল একবার।

দু’বার।

তৃতীয়বারে ওপার থেকে এক নারীকণ্ঠ শোনা গেল।

“আপনি কি ঋদ্ধি সেন?”

“হ্যাঁ। আপনি কে? আমার দিদির কথা জানেন?”

“আপনার দিদি সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে আজ রাতেই এখানে আসতে হবে।”

“কোথায়?”

“শান্তিনিকেতন লজ। তেরো নম্বর ঘরের সামনে।”

“আপনি কি আমার দিদি?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর নারীকণ্ঠটি বলল, “আমি আপনার দিদি নই। কিন্তু আপনার দিদি আমাকে চেনেন।”

“তিনি কোথায়?”

“যে প্রশ্নের উত্তর আপনি বারো বছর ধরে খুঁজছেন, তার উত্তর এই বাড়িতেই আছে।”

ফোন কেটে গেল।

ঋদ্ধি আর অপেক্ষা করল না। জ্যাকেট, টর্চ, নোটবুক আর ক্যামেরা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

বাইরে তখন শীতের রাত। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কুয়াশার মধ্যে দূরের বাতিগুলি ঝাপসা দেখাচ্ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, বারো বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজা যেন হঠাৎ খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু সে জানত না, দরজার ওপারে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

২. শান্তিনিকেতন লজ

বাড়িটি শহরের এক পুরোনো গলির শেষে দাঁড়িয়ে ছিল। উঁচু লোহার ফটকে মরচে পড়েছে। ফটকের গায়ে পাথরের ফলকে লেখা—‘শান্তিনিকেতন লজ, প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬’।

ঋদ্ধি কলিং বেল চাপল।

কোনও সাড়া এল না।

দ্বিতীয়বার চাপতেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কিছুক্ষণ পরে ফটক খুলে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।

মাথায় সাদা চুল, গায়ে ধূসর সোয়েটার, হাতে একটি পুরোনো লণ্ঠন।

“কাকে চাই?”

“আমি ঋদ্ধি সেন। আপনার সঙ্গে আগে কথা হয়নি। আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছে।”

বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।

“কে বলেছে?”

“জানি না। একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“আপনি কি রূপসা দেবীর ভাই?”

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে যেন কেউ ধাক্কা দিল।

“আপনি আমার দিদিকে চিনতেন?”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর না দিয়ে ফটক পুরো খুলে দিলেন।

“ভেতরে আসুন।”

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ঋদ্ধি বুঝল, এই জায়গায় বহু বছর ধরে কেউ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করেনি। দেওয়ালে পুরোনো ছবি, কাঠের সিঁড়িতে ধুলো, করিডরের কোণে ভাঙা ফুলদানি। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

বৃদ্ধ নিজেকে পরিচয় দিলেন।

“আমার নাম হরিপদ মণ্ডল। এই বাড়ির দেখাশোনা করি।”

“আমার দিদি এখানে এসেছিলেন?”

“এসেছিলেন।”

“কবে?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগে একবার সিঁড়ির দিকে তাকালেন।

“বারো বছর আগে।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“কিন্তু তিনি তো অফিস থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন!”

“মানুষকে শেষবার যেখানে দেখা যায়, সে সব সময় সেখানেই হারিয়ে যায় না।”

“আপনি কী বলতে চাইছেন?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আপনার দিদি এই বাড়িতে এসেছিলেন এক বর্ষার রাতে। তাঁর সঙ্গে আরও দু’জন মানুষ ছিল। পরদিন সকালে তাঁরা চলে যান। কিন্তু রূপসা দেবী আর বেরিয়ে যাননি।”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে তিনি এখনও এই বাড়িতে আছেন?”

“আমি জানি না।”

“জানেন না, না বলতে চাইছেন না?”

হরিপদ চোখ নামিয়ে বললেন, “কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস আমার নেই।”

ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে উঠল।

“একজন মানুষ বারো বছর ধরে নিখোঁজ। আপনি জানেন তিনি এখানে এসেছিলেন, অথচ পুলিশকে জানাননি?”

“জানিয়েছিলাম।”

“কী বলছেন?”

“সেই সময় থানায় খবর দিয়েছিলাম। পুলিশ এসেছিল। কিন্তু বাড়িতে তল্লাশি করে কিছুই পায়নি। তারপর আমাকে বলা হয়, এ বিষয়ে আর কাউকে কিছু না বলতে।”

“কেন?”

“সেটা আমি জানি না।”

ঋদ্ধি নিজের ফোন বের করে হরিপদর কথা রেকর্ড করতে শুরু করল।

বৃদ্ধ তা দেখে বললেন, “রেকর্ড করছেন? করুন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—এই বাড়িতে সব দরজা মানুষের জন্য তৈরি হয়নি।”

ঋদ্ধি ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি ভূতপ্রেত বিশ্বাস করি না।”

“আমিও করতাম না।”

“তাহলে?”

হরিপদ লণ্ঠন তুলে সিঁড়ির দিকে এগোলেন।

“তাহলে চলুন, তেরো নম্বর ঘরটি দেখে আসুন।”

৩. তেরো নম্বর দরজা

তিনতলার করিডরটি অন্য দুই তলার চেয়ে অনেক সরু। দু’পাশে পুরোনো কাঠের দরজা। প্রতিটি দরজার ওপর পিতলের নম্বর লাগানো।

এক নম্বর।

তিন নম্বর।

পাঁচ নম্বর।

তারপর সাত, নয়, এগারো।

করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি কালো দরজা। দরজার ওপর পিতলের ফলকে লেখা—১৩।

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল, “এখানে তো বিজোড় নম্বরের ঘর। মাঝের ঘরগুলো কোথায়?”

হরিপদ বললেন, “বাড়ির পুরোনো নকশায় এই তলায় ছয়টি ঘর ছিল। কিন্তু সংস্কারের সময় কয়েকটি ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

“তাহলে তেরো নম্বর ঘরটি?”

“এটা সব সময় ছিল।”

“আপনি বললেন, বাড়ির নকশায় ছয়টি ঘর। তা হলে তেরো নম্বর এল কোথা থেকে?”

হরিপদ উত্তর দিলেন না।

দরজার সামনে এসে ঋদ্ধি থামল।

দরজার নীচ দিয়ে সরু আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।

ঘরের ভেতরে কেউ আছে।

ঋদ্ধি দরজায় কান পাতল।

প্রথমে কোনও শব্দ শোনা গেল না। তারপর খুব মৃদু কণ্ঠে একটি মেয়ে বলল—

“ঋদ্ধি, তুমি এসেছ?”

ঋদ্ধির শরীর শিউরে উঠল।

এই কণ্ঠস্বর সে চেনে।

ছোটবেলায় রূপসা তাকে ঘুম পাড়ানোর সময় এমন করেই ডাকতেন।

“দিদি?”

ভেতর থেকে উত্তর এল, “দরজাটা খুলো না।”

ঋদ্ধি দরজার হাতলে হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেল।

“তুমি কোথায়? তুমি কি সত্যিই আমার দিদি?”

“আমি তোমার দিদিকে চিনি।”

“এটা কী ধরনের কথা? তুমি কে?”

“তোমার কাছে একটা ছবি আছে। ছবির পিছনে কী লেখা আছে, মনে আছে?”

ঋদ্ধি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার মধ্যে একটি পুরোনো ছবি রয়েছে। ছবিতে সে, রূপসা এবং তাদের মা-বাবা। রূপসার নিখোঁজ হওয়ার পর ছবিটি ঋদ্ধি সব সময় সঙ্গে রাখে।

ছবির পিছনে মায়ের হাতের লেখায় লেখা—‘আমরা একে অপরকে হারাব না।’

ঋদ্ধি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “লেখাটা কীভাবে জানলে?”

ভেতর থেকে মেয়েটি বলল, “কারণ তোমার দিদি ছবিটা আমাকে দিয়েছিল।”

“কবে?”

“যেদিন সে এই ঘরে ঢুকেছিল।”

ঋদ্ধি দরজার হাতল ঘুরিয়ে দেখল। দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ নয়। তবু হাতল নড়ল না।

সে জোরে ধাক্কা দিল।

দরজাটি একচুলও খুলল না।

“দরজা খুলছে না কেন?”

“কারণ তুমি এখনও সেই প্রশ্নের উত্তর জানো না।”

“কোন প্রশ্ন?”

“বারো বছর আগে তোমার দিদি কেন এই বাড়িতে এসেছিল?”

ঋদ্ধি বলল, “আমি জানি না। তুমি জানো?”

“জানি। কিন্তু তুমি যদি এখন দরজা খোলো, তাহলে যে মানুষটিকে খুঁজছ, তাকে হয়তো আর কখনও খুঁজে পাবে না।”

“এ কেমন ধাঁধা?”

“এই বাড়িতে সবাই কাউকে না কাউকে খুঁজতে আসে। কেউ তার অতীতকে, কেউ তার ভবিষ্যৎকে, আর কেউ এমন একজনকে, যে কোনও দিন এই পৃথিবীতে ছিলই না।”

ঋদ্ধি রাগে দরজায় ঘুষি মারল।

“আমি ধাঁধা শুনতে আসিনি! আমার দিদি কোথায়, সেটা বলো!”

হঠাৎ ভেতর থেকে একটি কাগজ দরজার নীচ দিয়ে বেরিয়ে এল।

ঋদ্ধি কাগজটি তুলে নিল।

তাতে লেখা—

‘ঘড়ির কাঁটা যখন থেমে যাবে, তখন দরজা খুলবে। কিন্তু দরজা খোলার আগে নিজের নামটি মনে রাখবেন।’

কাগজের নীচে একটি সময় লেখা—রাত ২টা ১৭ মিনিট।

ঋদ্ধি ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত ১টা ৪৮ মিনিট।

তার হাতে প্রায় আধঘণ্টা সময় আছে।

৪. যে বাড়ির নকশায় তেরো নেই

ঋদ্ধি হরিপদকে নিয়ে নিচে নেমে এল। তার মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন।

“এই বাড়ির পুরোনো নকশা কোথায়?”

হরিপদ বললেন, “দোতলার স্টোররুমে কিছু কাগজ আছে।”

“আমাকে দেখান।”

স্টোররুমের দরজা খুলতেই ধুলো উড়ে উঠল। একপাশে কাঠের আলমারি, অন্য পাশে ভাঙা চেয়ার এবং পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ।

হরিপদ একটি লোহার বাক্স খুলে কয়েকটি নকশা বের করলেন।

ঋদ্ধি সেগুলি মেঝেতে বিছিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল।

প্রথম নকশাটি ১৯৩৬ সালের। দ্বিতীয়টি ১৯৫২ সালের। তৃতীয়টি ১৯৮১ সালের।

তিনটি নকশাতেই তিনতলায় ছয়টি ঘর দেখানো হয়েছে। কোনওটিতেই তেরো নম্বর ঘর নেই।

কিন্তু ১৯৯৮ সালের একটি হাতে আঁকা নকশায় তিনতলার করিডরের শেষে একটি অতিরিক্ত ঘর দেখা গেল। তার পাশে লেখা—‘বিশেষ কক্ষ—প্রবেশ নিষেধ’।

নকশাটির নীচে একটি স্বাক্ষর।

ড. অনিরুদ্ধ বসু।

ঋদ্ধি নামটি আগে কোথাও পড়েছে বলে মনে করল।

সে ফোনে নামটি খুঁজে দেখল। পুরোনো সংবাদপত্রের একটি ডিজিটাল আর্কাইভে একটি প্রতিবেদন পাওয়া গেল।

‘মনস্তাত্ত্বিক গবেষক ড. অনিরুদ্ধ বসু রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০১ সালে। অনিরুদ্ধ বসু মানুষের স্মৃতি, পরিচয় এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত নিয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রাক্তন সহকারী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি অনুমতি ছাড়া মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন।

তদন্ত শুরু হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনও মামলা শেষ পর্যন্ত আদালতে পৌঁছয়নি। কারণ অভিযোগের প্রধান সাক্ষীসহ কয়েকজন হঠাৎ বক্তব্য বদলে ফেলেছিলেন।

ঋদ্ধি আরও খুঁজতে লাগল।

২০০৪ সালে ড. বসুর বাড়ি থেকে কিছু গবেষণার নথি উদ্ধার হয়েছিল। সেই নথিতে ‘ঘর ১৩’ নামে একটি প্রকল্পের উল্লেখ ছিল।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনও বিস্তারিত তথ্য ছিল না।

ঋদ্ধি হরিপদকে জিজ্ঞাসা করল, “ড. অনিরুদ্ধ বসু কে ছিলেন?”

বৃদ্ধের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“এই বাড়ির আগের মালিকের চিকিৎসক। তিনি কিছুদিন এখানে থাকতেন।”

“কী ধরনের চিকিৎসক?”

“মানুষের মন নিয়ে কাজ করতেন।”

“তিনি কি তেরো নম্বর ঘর তৈরি করেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তিনি বলতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার তার নিজের স্মৃতি। কোনও মানুষ যদি নিজের অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে যায়, তাহলে সে নতুন করে বাঁচতে পারে। আবার যদি কেউ অন্যের স্মৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে সে সেই মানুষটির জীবনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”

ঋদ্ধি ধীরে বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, তিনি মানুষের স্মৃতি মুছে দিতেন?”

“আমি জানি না তিনি ঠিক কী করতেন। তবে তাঁর কাছে আসা কয়েকজন মানুষ পরে নিজেদের অতীত সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতে শুরু করেছিল।”

“আর আমার দিদি?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“রূপসা দেবী তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”

ঋদ্ধি হতবাক হয়ে গেল।

“আমার দিদি তো একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন!”

“সেটা ঠিক। কিন্তু তিনি অনিরুদ্ধবাবুর গবেষণার নথি অনুবাদ করতেন। একসময় তিনি জানতে পারেন, গবেষণার নামে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এবং স্মৃতি নিয়ে অনৈতিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।”

“তাহলে দিদি সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তিনি তার আগেই নিখোঁজ হয়ে যান।”

ঋদ্ধির মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।

বারো বছর ধরে সে ভেবেছে, দিদি হয়তো কোনও ব্যক্তিগত কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। অথচ তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে ছিল এমন এক গোপন গবেষণা, যার কথা পরিবার কিছুই জানত না।

“ড. অনিরুদ্ধ বসু এখন কোথায়?”

হরিপদ বললেন, “কেউ জানে না।”

“তাহলে তেরো নম্বর ঘরের চাবি কার কাছে?”

বৃদ্ধের চোখ করিডরের দিকে চলে গেল।

“চাবি কোনও দিন আমার কাছে ছিল না।”

“তাহলে দরজা খুলবে কীভাবে?”

হরিপদ ধীরে বললেন, “সময় হলে দরজা নিজেই খুলবে।”

৫. বন্ধ ঘড়ির শব্দ

রাত ২টা ৫ মিনিট।

ঋদ্ধি আবার তিনতলায় উঠে এল। হরিপদ তার সঙ্গে ছিলেন। করিডরের বাতিগুলি একটির পর একটি জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে।

তেরো নম্বর দরজার সামনে এসে ঋদ্ধি দেখল, দরজার পাশে একটি পুরোনো দেয়ালঘড়ি ঝুলছে। ঘড়িটি এতক্ষণ বন্ধ ছিল। এখন তার কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

২টা ১০।

২টা ১১।

২টা ১২।

ঋদ্ধি ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ঘড়ি এতক্ষণ বন্ধ ছিল। হঠাৎ চলছে কেন?”

হরিপদ কোনও উত্তর দিলেন না।

ঘড়ির কাঁটা ২টা ১৬ মিনিটে পৌঁছতেই করিডরের সব আলো নিভে গেল।

সম্পূর্ণ অন্ধকার।

তারপর ঘড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।

টিক।

টিক।

টিক।

২টা ১৭ মিনিট।

ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল।

এক মুহূর্ত পরে তেরো নম্বর ঘরের দরজায় ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

দরজার হাতল নিজে থেকেই ঘুরে গেল।

দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ঋদ্ধি টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে আলো ফেলল।

ঘরটি অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার। কোনও ধুলো নেই, কোনও ভাঙা আসবাব নেই। মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল, দু’পাশে দুটি চেয়ার। দেওয়ালে সারি সারি ফাইল। ঘরের এক কোণে একটি পুরোনো টেলিফোন।

আর টেবিলের সামনে বসে আছে একটি মেয়ে।

তার বয়স আনুমানিক পঁচিশ। পরনে সাদা পোশাক। চুল কাঁধ পর্যন্ত। মুখটি ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।

ঋদ্ধি টর্চের আলো তার মুখে ফেলতেই মেয়েটি বলল, “তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ।”

ঋদ্ধি কয়েক পা এগিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।

“আমার নাম মায়া।”

“তুমি কি আমার দিদিকে চেনো?”

“চিনি।”

“তিনি কোথায়?”

মায়া টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইল তুলে ধরল।

“এই ফাইলের মধ্যে তোমার দিদির শেষ সাক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”

ঋদ্ধি বিরক্ত হয়ে বলল, “আবার প্রশ্ন?”

“তোমার দিদি যখন নিখোঁজ হন, তখন তুমি কোথায় ছিলে?”

ঋদ্ধি থমকে গেল।

“বাড়িতে।”

“কোন বাড়িতে?”

“আমাদের বাড়িতে।”

“তোমাদের বাড়ির ঠিকানা কী ছিল?”

ঋদ্ধি উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।

তার মাথার মধ্যে যেন কুয়াশা জমে উঠল। সে জানে তাদের বাড়ি কোথায় ছিল। সে প্রতিদিন সেই বাড়ির কথা ভাবে। কিন্তু হঠাৎ করে রাস্তার নামটি মনে পড়ছে না।

সে চোখ বন্ধ করল।

পুরোনো বাড়ির বারান্দা, মায়ের গানের শব্দ, বাবার পড়ার ঘর—সব মনে পড়ছে। অথচ ঠিকানাটি মনে পড়ছে না।

মায়া বলল, “ভয় পেয়ো না। কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায় না। শুধু তাদের কাছে পৌঁছনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।”

ঋদ্ধি রাগে বলল, “আমার স্মৃতি নিয়ে খেলা বন্ধ করো!”

মায়া শান্ত গলায় বলল, “আমি তোমার স্মৃতি নিয়ে কিছু করছি না। তুমি এখানে আসার আগেই কিছু স্মৃতি তোমার কাছে বন্ধ ছিল।”

“কেন?”

মায়া ফাইলটি টেবিলে রাখল।

“কারণ তোমার দিদি শুধু নিজের জন্য নয়, তোমার জন্যও কিছু লুকিয়ে রেখেছিলেন।”

ঋদ্ধি ফাইলটি খুলল।

প্রথম পাতায় তার নিজের ছবি।

ছবির নীচে লেখা—

বিষয়: ঋদ্ধি সেন।

পরীক্ষা নম্বর: ১৩/০৭।

স্মৃতিগত বিচ্ছিন্নতার প্রাথমিক লক্ষণ: নিশ্চিত।

ঋদ্ধির হাত থেকে ফাইলটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“এটা কী?”

মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার দিদি নিখোঁজ হওয়ার বারো বছর আগে, তোমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা তুমি ভুলে গেছ।”

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল, “কী ঘটনা?”

মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।

একবার।

দু’বার।

তিনবার।

মায়া ফোন তুলল।

ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“মায়া, ছেলেটিকে ঘর থেকে বের করে দাও। এখনই।”

মায়ার মুখের রং বদলে গেল।

“কিন্তু সে সত্যিটা জেনে গেছে।”

পুরুষকণ্ঠ বলল, “তাহলে তাকে আর বেরোতে দেওয়া যাবে না।”

ফোন কেটে গেল।

মায়া ধীরে ধীরে ঋদ্ধির দিকে ফিরল।

“তোমাকে এখনই এখান থেকে যেতে হবে।”

ঋদ্ধি বলল, “আমি কোথাও যাব না। আমার দিদির কী হয়েছে, সেটা না জেনে আমি যাব না।”

মায়া তার হাত শক্ত করে ধরল।

“তাহলে শোনো। তোমার দিদি এই ঘরে বন্দি নন।”

“তাহলে কোথায়?”

মায়া দরজার পিছনের দেওয়ালের দিকে তাকাল।

দেওয়ালে একটি বড় আয়না ঝুলছে। এতক্ষণ ঋদ্ধি সেটিকে সাধারণ আয়না বলেই ভেবেছিল। কিন্তু এখন তার মধ্যে ঘরের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে না।

দেখা যাচ্ছে একটি ছোট ঘর।

সেই ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ারে বসে আছে এক নারী।

চুল লম্বা। মুখ ক্লান্ত। চোখ দুটি বন্ধ।

ঋদ্ধি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

সে মুখটি চিনতে পারে।

বারো বছর ধরে প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি জন্মদিন, প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাতে সে এই মুখটিই মনে করেছে।

“দিদি!”

আয়নার ওপারের নারী ধীরে চোখ খুললেন।

তার ঠোঁট নড়ল।

শব্দ শোনা গেল না।

ঋদ্ধি আয়নার দিকে ছুটে গেল।

নারীটি এবার স্পষ্ট করে বললেন—

“ঋদ্ধি, তুমি এখানে কেন এসেছ?”

তারপর আয়নার ওপারের ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে ভেসে এল আরেকটি কণ্ঠ।

“রূপসাকে ফিরিয়ে আনতে হলে, তোমাকে নিজের হারিয়ে যাওয়া বারো বছর ফিরে পেতে হবে।”

ঋদ্ধি পিছিয়ে এল।

মায়া ফিসফিস করে বলল, “এবার থেকে তোমার কোনও স্মৃতিকে বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ খুঁজবে। কারণ এই বাড়িতে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস কোনও ভূত নয়, কোনও অদৃশ্য শক্তিও নয়।”

সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটির দিকে তাকাল।

“সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হলো—যে সত্যকে তুমি নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করো, অথচ সেটি কখনও তোমার ছিল না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে করিডরের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন নয়।

অনেকজন।

দরজার সামনে এসে শব্দ থেমে গেল।

তারপর বাইরে থেকে কেউ বলল—

“তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ করো। বিষয় নম্বর ১৩/০৭ জেগে উঠেছে।”

ঋদ্ধি মায়ার দিকে তাকাল।

মায়া তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—

“দৌড়াও!”

কিন্তু ঘর থেকে বেরোনোর একমাত্র দরজাটি তখন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

আর আয়নার ওপারে, অন্ধকার ঘরে, রূপসা সেন আবার চোখ খুললেন।

তিনি এবার সরাসরি ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়লেন।

“ওরা তোমাকে ছোটবেলাতেই মেরে ফেলেছিল, ঋদ্ধি।”

তারপর সব আলো নিভে গেল।

চলবে…

Share This