Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার ওপারে (তৃতীয় পর্ব)।

তৃতীয় পর্ব — কুয়াশা কেটে গেলে

দরজার হাতলটা ধীরে ধীরে নড়ছিল।

অর্ক নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে।

মেঘলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল, বাইরে ঘন কুয়াশা।

তারপর সে ফিসফিস করে বলল,

— পিছনের জানলা দিয়ে বেরোতে হবে।

অর্ক মাথা নাড়ল।

কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল—

— অর্কবাবু, আমি জানি আপনার কাছে সুব্রতবাবুর নোটবুক আছে।

অর্ক থমকে গেল।

লোকটা জানল কীভাবে?

মেঘলা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পিছনের ঘরে।

জানলার কাঠের পাল্লা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল।

দুজনেই বাইরে বেরিয়ে পড়ল।

কিন্তু মেঘলা নামার আগেই নিচ থেকে একটা হাত তার কবজি ধরে ফেলল।

সে চিৎকার করতে যাচ্ছিল।

অর্ক ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটাকে সরিয়ে দিল।

কুয়াশার মধ্যে লোকটা পিছিয়ে গেল।

তার মুখ দেখা গেল না।

অর্ক শুধু দেখল—

তার হাতে কালো ডায়ালের সেই ঘড়ি।

ঠিক ছবির মতো।

লোকটা দৌড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

মেঘলা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— এবার বুঝতে পারছ?

অর্ক বলল,

— রণজিৎ নয়।

— না।

— তাহলে কে?

মেঘলা বলল,

— যে মানুষটা এত বছর ধরে রণজিৎকে ব্যবহার করেছে।


১

পরদিন সকাল।

শিলাবতীপুর থানার সামনে অর্ক আর মেঘলা দাঁড়িয়ে।

তারা আগের রাতের ঘটনা জানাল।

থানার অফিসার অনিরুদ্ধ পাল প্রথমে সন্দেহের চোখে তাকালেন।

— আপনারা বলছেন রণজিৎ পাল মারা গেছে?

মেঘলা বলল,

— হ্যাঁ।

অনিরুদ্ধ একটা ফাইল খুললেন।

— মৃত্যুর রিপোর্ট অনুযায়ী, রণজিৎ পাল তিন দিন আগে পাহাড়ের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

অর্ক বলল,

— তাহলে গতরাতে আমাদের কাছে কে এসেছিল?

অফিসার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

— সম্ভবত এমন কেউ, যে চায় আপনারা ভাবুন রণজিৎ এখনও বেঁচে আছে।

অর্ক নোটবুকটা টেবিলে রাখল।

— আমার বাবার মৃত্যুর তদন্ত নতুন করে শুরু করতে চাই।

অনিরুদ্ধ নোটবুকটা দেখেই চমকে উঠলেন।

— এটা কোথায় পেলেন?

— পুরনো রেলগুদামে।

অফিসার নোটবুকের মলাট ছুঁয়ে বললেন,

— আপনার বাবা এই খাতার কথা আমাকে একবার বলেছিলেন।

অর্ক অবাক।

— আপনি বাবাকে চিনতেন?

— খুব ভালোভাবে নয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগের সপ্তাহে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

— তখন আপনি কী জানতেন?

অনিরুদ্ধ ধীরে বললেন,

— আমি জানতাম তিনি বড় একটা বিষয় নিয়ে তদন্ত করছেন।

— আর আপনি সাহায্য করেননি?

অফিসারের চোখ নিচু হয়ে গেল।

— আমি তখন নতুন অফিসার। আমার ওপরের লোকেরা আমাকে চুপ থাকতে বলেছিল।

— কারা?

অনিরুদ্ধ একটা নাম লিখে দিলেন।

অমল সরকার।

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

নোটবুকেও এই নাম ছিল।


২

অমল সরকারকে খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না।

তিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত।

শিলাবতীপুরের কাছেই একটি ছোট বাড়িতে থাকেন।

অর্ক, মেঘলা ও অনিরুদ্ধ তাঁর বাড়িতে পৌঁছতেই বৃদ্ধ দরজা খুলে বললেন,

— অবশেষে তুমি এলে।

অর্ক থেমে গেল।

— আপনি আমাকে চিনতেন?

অমল মৃদু হাসলেন।

— তুমি ছোট ছিলে। তোমার বাবা তোমার ছবি দেখিয়েছিলেন।

— আমার বাবা কী জানতে পেরেছিলেন?

অমল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— অনেক কিছু।

— তারপর তাঁকে মেরে ফেলা হল?

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।

অর্ক টেবিলের ওপর নোটবুকটা রাখল।

অমল সেটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— এই খাতা এখনও তোমার কাছে আছে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে ওরা তোমাকে থামানোর চেষ্টা করবে।

মেঘলা বলল,

— “ওরা” কারা?

অমল জানলার দিকে তাকালেন।

— একজন মৃত মানুষের নাম দিয়ে শুরু হয়েছিল এই গল্প। কিন্তু আসল মানুষটি এখনও বেঁচে আছে।

অর্ক বলল,

— কে?

অমল বললেন,

— দেবাশিস মল্লিক।

অর্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— কিন্তু তিনি তো এখন কলকাতায়!

— থাকেন।

— তাহলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়নি কেন?

— কারণ প্রমাণ সবসময় সত্যির সঙ্গে থাকে না।

অমল একটা পুরনো খাম বের করলেন।

— তোমার বাবা এটা আমাকে দিয়েছিলেন।

অর্ক খাম খুলল।

ভেতরে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ।

অ্যাকাউন্টটি দেবাশিস মল্লিকের নামে নয়।

একটি ভুয়ো প্রতিষ্ঠানের নামে।

কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানে টাকা পাঠিয়েছিল সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি সংস্থা।

সুশান্ত ধরের কোম্পানিও সেখানে ছিল।

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

— তাহলে সুশান্তও জড়িত?

অমল বললেন,

— শুরুতে ছিল।

মেঘলা বলল,

— পরে?

— পরে তোমার বাবা ওকে রাজি করান সত্যিটা প্রকাশ করতে।

অর্কের মনে পড়ল সুশান্তের কথা—

“আমি কাপুরুষ ছিলাম।”

এবার কথাটার অর্থ পরিষ্কার হল।


৩

কলকাতায় ফিরে অর্ক সরাসরি দেবাশিস মল্লিকের বাড়িতে গেল।

বড় বাড়ি।

উঁচু গেট।

নিরাপত্তারক্ষী।

অর্ক নিজের পরিচয় দেওয়ার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল।

তারপর দেবাশিস নিজেই এসে দরজা খুললেন।

বয়স সত্তরের কাছাকাছি।

চোখে চশমা।

মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব।

তিনি অর্ককে দেখে বললেন,

— সুব্রতর ছেলে।

অর্ক অবাক হল।

— আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?

— চিনতাম।

— তাহলে জানেন তিনি কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?

দেবাশিস ধীরে বললেন,

— দুর্ঘটনা।

অর্ক ব্যাগ থেকে নোটবুক বের করল।

দেবাশিসের মুখের শান্ত ভাব মুহূর্তে বদলে গেল।

— এটা কোথায় পেলে?

অর্ক বুঝল।

এটাই ছিল আসল প্রমাণ।

সে বলল,

— আপনি ভয় পাচ্ছেন?

দেবাশিস চুপ।

অর্ক আরও কাছে এগিয়ে গেল।

— আমার বাবাকে কেন মরতে হল?

দেবাশিস বললেন,

— তোমার বাবা এমন একটা সত্যি জানতে পেরেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন নষ্ট হত।

অর্ক রাগে বলল,

— তাই তাঁকে মেরে ফেললেন?

— আমি মারিনি।

— তাহলে কে?

দেবাশিস উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ।

অনিরুদ্ধ পাল নেমে এলেন।

তার হাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা।

দেবাশিস মল্লিকের মুখের রং বদলে গেল।


৪

তদন্তের পর আসল সত্যি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।

আঠারো বছর আগে পাহাড়ি অঞ্চলের জমি দখল করে একটি বড় রিয়েল-এস্টেট প্রকল্প করার পরিকল্পনা হয়েছিল।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করে জমির মালিকানা বদলানো হচ্ছিল।

অমল সরকার কাগজপত্রে অনিয়ম লক্ষ্য করেছিলেন।

সুব্রত সেন সেই অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।

রণজিৎ পাল তখন পরিবহণ সংস্থায় কাজ করত।

সে দুর্ঘটনার রাতে ট্রাকটি দেখেছিল।

বিপ্লব রায় হিসাবের নথি জাল করেছিল।

নির্মাণ ব্যবসায়ী ও কয়েকজন সরকারি কর্মচারী মিলে পুরো চক্রটি চালাচ্ছিল।

কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী ছিল দেবাশিস মল্লিক।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—

সুব্রতর মৃত্যুর রাতে গাড়ি চালানো ব্যক্তি ছিল দেবাশিসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

পরে সেই ব্যক্তি বিদেশে পালিয়ে যায়।

তাকে বহু বছর পর খুঁজে বের করা হয়।

আদালতে পুরনো নথি, ব্যাংক লেনদেন, সাক্ষ্য এবং সুব্রতর নোটবুক একসঙ্গে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হল।

মামলা দীর্ঘদিন চলল।

কিন্তু এবার সত্যি আর চাপা পড়ল না।


৫

সবচেয়ে কঠিন ছিল অর্কের জন্য অন্য একটা সত্যি মেনে নেওয়া।

তার মা সব জানতেন।

পুরোটা নয়।

কিন্তু অনেকটাই।

বাবার মৃত্যুর পর মা তাকে ইচ্ছে করেই সবকিছু থেকে দূরে রেখেছিলেন।

কারণ তিনি জানতেন, অর্ক সত্যিটা জানতে চাইলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে।

মায়ের পুরনো আলমারি থেকে অর্ক একটি চিঠি পেল।

চিঠির শুরু—

“অর্ক, তুই যদি কোনোদিন এই সত্যিটা জানতে পারিস, আমাকে ক্ষমা করিস।”

চিঠিতে লেখা ছিল—

“আমি তোকে মিথ্যে বলেছি। কিন্তু সেই মিথ্যেটা ছিল তোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। তোর বাবা সত্যি খুঁজতে গিয়ে অনেক শত্রু তৈরি করেছিল। আমি চাইনি তুই তাঁর পথ অনুসরণ করিস। আমি শুধু চেয়েছিলাম তুই বেঁচে থাকিস।”

চিঠির শেষে—

“কখনও যদি ফিরে যাস, ভয় নিয়ে ফিরিস না।”

অর্ক চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তার মনে হল—

বাবা তাকে সত্যির কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন।

মা তাকে সত্যি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।

দুজনের উদ্দেশ্য আলাদা ছিল।

কিন্তু ভালোবাসা একই।


৬

কয়েক মাস পর শিলাবতীপুরে আবার কুয়াশা নামল।

অর্ক পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে।

মেঘলা পাশে।

মেঘলা বলল,

— এবার কি ফিরে যাবে?

অর্ক হাসল।

— হ্যাঁ।

— আবার আসবে?

— জানি না।

মেঘলা কিছু বলল না।

অর্ক বলল,

— তবে একটা কথা বুঝেছি।

— কী?

— মানুষ অনেক সময় সত্যির খোঁজে বাড়ি ছেড়ে যায়।

মেঘলা তাকাল।

— তারপর?

— সত্যি খুঁজে পাওয়ার পর বুঝতে পারে, সে আসলে নিজের কাছেই ফিরছিল।

মেঘলা মৃদু হাসল।

— তোমার বাবা এই কথাটা বলতেন।

অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।

— বাবা?

— হ্যাঁ।

— কী বলতেন?

মেঘলা দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “কুয়াশা কখনও পথ হারায় না। কুয়াশা শুধু পথটাকে কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করে রাখে।”

অর্ক চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে হাসল।

শহরের দিকে নামার রাস্তা কুয়াশায় ঢাকা।

কিন্তু এবার সে পথ চিনতে পারছিল।


৭

এক বছর পর সুব্রত সেনের নামে একটি ছোট গবেষণা ও নথি সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হল।

নাম—

“সুব্রত সেন স্মৃতি কেন্দ্র।”

উদ্বোধনের দিন অর্ক বাবার পুরনো ছবিটা দেয়ালে টাঙাল।

ছবিতে চারজন মানুষ ছিল।

কিন্তু এবার সেই ছবির ইতিহাস আর রহস্য নয়।

সবাই জানে, সেখানে কারা ছিল।

কেউ আর মুখ লুকিয়ে রাখতে পারে না।

সুশান্ত নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচার মেনে নিয়ে পরে তদন্তে সহযোগিতা করেছিল।

নির্মল সাক্ষ্য দিয়েছিল।

রণজিৎ মারা যাওয়ার আগে যে নথি রেখে গিয়েছিল, সেটিও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়েছিল।

আর মেঘলা?

সে শিলাবতীপুরেই থেকে গেল।

অর্ক কলকাতা থেকে মাঝেমধ্যে সেখানে যেত।

তাদের সম্পর্কের কোনো নাম দেওয়া হয়নি।

প্রয়োজনও হয়নি।

কিছু সম্পর্কের জন্য নামের চেয়ে বিশ্বাস বড়।

এক সন্ধ্যায় অর্ক মেঘলাকে বলল,

— জানো, আমি প্রথম দিন এখানে এসেছিলাম বাবার মৃত্যুর সত্যি জানতে।

— আর এখন?

অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— এখন মনে হয়, সত্যি জানার থেকেও বড় ছিল একটা জিনিস।

— কী?

— বাবাকে নতুন করে চিনতে শেখা।

মেঘলা হাসল।

— আর নিজেকে?

অর্কও হাসল।

— সেটাও।


সেদিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের ওপর কুয়াশা নেমেছিল।

কিন্তু অর্ক আর ভয় পেল না।

কারণ সে জানত—

কুয়াশার ওপারে পথ আছে।

অতীতকে মুছে ফেলা যায় না।

মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না।

হারানো বছরগুলোও ফিরে আসে না।

কিন্তু সত্যি কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

কখনও একটা পুরনো ছবি হয়ে ফিরে আসে।

কখনও একটা নোটবুক হয়ে।

কখনও কোনো অপরিচিত মানুষের কণ্ঠে।

আর কখনও—

একজন ছেলের কাছে তার মৃত বাবার অসমাপ্ত কথার মতো ফিরে আসে।

অর্ক শেষবারের মতো পাহাড়ের দিকে তাকাল।

তারপর মেঘলার পাশে হাঁটতে শুরু করল।

কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছিল।

কিন্তু এবার সামনে যাওয়ার জন্য আলো দরকার ছিল না।

কারণ পথটা সে চিনে ফেলেছে।

কুয়াশার ওপারে নয়—

পথটা আসলে তার নিজের ভেতরেই ছিল।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার ওপারে (দ্বিতীয় পর্ব)।।

দ্বিতীয় পর্ব — যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিল

দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল।

ঠক।

অর্কের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি ঠোঁটে আঙুল রাখল।

— চুপ।

বাইরে থেকে এবার একটা পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।

— দরজা খুলুন। আমি থানার লোক।

মহিলাটি মাথা নাড়ল।

— বিশ্বাস করবেন না।

অর্ক ফিসফিস করে বলল,

— কিন্তু যদি সত্যিই পুলিশ হয়?

— তাহলে পরিচয়পত্র দেখাতে বলুন।

অর্ক দরজার কাছে গিয়ে বলল,

— আপনার নাম?

বাইরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর উত্তর এল—

— সাব-ইন্সপেক্টর অমিত ঘোষ।

মহিলাটি অর্কের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

— মিথ্যে।

— আপনি কীভাবে জানলেন?

— কারণ এই শহরের থানায় অমিত ঘোষ নামে কোনো অফিসার নেই।

অর্কের শরীর শিউরে উঠল।

বাইরের লোকটি এবার জোরে দরজা ধাক্কাতে শুরু করল।

— দরজা খুলুন!

মহিলাটি অর্কের হাত ধরে টেনে পিছনের দিকে নিয়ে গেল।

— আমাদের এখনই বেরোতে হবে।

— কোথা দিয়ে?

— রান্নাঘরের পেছনে একটা দরজা আছে।

দুজনেই অন্ধকার ঘর পেরিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন ঘন কুয়াশা।

দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না।

মহিলাটি অর্ককে নিয়ে দ্রুত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে লাগল।

অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— আপনি কে?

— মেঘলা।

— আমার বাবাকে চিনতেন?

মেঘলা থেমে গেল।

— শুধু চিনতাম না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— তোমার বাবার শেষ কয়েকটা দিন আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম।

অর্ক স্তব্ধ।

— তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন?

মেঘলা উত্তর দিল না।


১

ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে তারা একটি ছোট্ট কাঠের বাড়িতে পৌঁছল।

মেঘলা দরজা খুলে বলল,

— ভেতরে আসুন।

ঘরের মধ্যে খুব বেশি আসবাব নেই।

একটা কাঠের টেবিল।

দুটি চেয়ার।

একটা পুরনো আলমারি।

আর দেওয়ালে ঝোলানো বেশ কিছু ছবি।

অর্ক ছবি দেখতে গিয়ে থেমে গেল।

সুব্রত সেনের ছবি।

তার বাবার।

একটা নয়।

অনেকগুলো।

বিভিন্ন সময়ের।

বিভিন্ন জায়গায়।

একটা ছবিতে তার বাবা পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে।

আর পাশে মেঘলা।

অর্ক ছবিটা হাতে তুলে নিল।

— এটা কবে?

— তোমার বাবার মৃত্যুর তিন মাস আগে।

— তাহলে তিনি এখানে এসেছিলেন?

— বারবার।

— কেন?

মেঘলা জানলার বাইরে তাকাল।

— একটা পুরনো দুর্ঘটনার তদন্ত করতে।

অর্ক অবাক।

— কোন দুর্ঘটনা?

মেঘলা বলল,

— আঠারো বছর আগে তোমার বাবার যে দুর্ঘটনা হয়েছিল, সেটা একমাত্র দুর্ঘটনা ছিল না।

অর্ক কিছু বলল না।

মেঘলা ধীরে ধীরে একটা ফাইল খুলল।

তার মধ্যে ছিল পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং।

শিরোনাম—

“পাহাড়ি রাস্তায় বাস খাদে, মৃত্যু ১১।”

তারিখ আঠারো বছর আগের।

অর্ক পড়তে পড়তে বলল,

— এই বাস দুর্ঘটনার সঙ্গে বাবার কী সম্পর্ক?

— তোমার বাবা দুর্ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

অর্ক তাকাল।

— কী?

— বাসটা খাদে পড়ার আগে তোমার বাবা ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, বাসের সামনে একটা ট্রাক ইচ্ছাকৃতভাবে দাঁড় করানো হয়েছিল।

— কিন্তু সংবাদে তো লেখা ছিল ব্রেক ফেল।

— সেটাই সরকারি রিপোর্ট।

অর্ক ধীরে বসে পড়ল।

— বাবা তাহলে কী দেখেছিলেন?

মেঘলা বলল,

— ট্রাকের চালককে।

— কে?

মেঘলা উত্তর দিল না।

শুধু একটা ছবি এগিয়ে দিল।

ছবিতে এক যুবক।

অর্ক ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ বলল,

— এই মানুষটাকে আমি চিনি।

মেঘলা চমকে উঠল।

— কোথায় দেখেছ?

অর্কের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— আমার বাবার শেষকৃত্যের দিন।


২

স্মৃতিটা অর্কের মাথায় হঠাৎ ফিরে এল।

শ্মশানের ভিড়।

মায়ের কান্না।

আত্মীয়স্বজন।

আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা লোক।

কালো শার্ট।

হাতে সেই কালো ডায়ালের ঘড়ি।

তখন অর্ক ভেবেছিল, হয়তো বাবার কোনো অফিস-সহকর্মী।

কিন্তু লোকটা সেদিন তার দিকে একবার তাকিয়ে ছিল।

সেই দৃষ্টি আজও অর্কের মনে ছিল।

মেঘলা বলল,

— লোকটার নাম রণজিৎ পাল।

— সে এখন কোথায়?

— জানি না।

— আপনি কি জানেন সে বেঁচে আছে?

— হ্যাঁ।

অর্ক উঠে দাঁড়াল।

— কোথায়?

মেঘলা বলল,

— শিলাবতীপুরেই।

ঠিক তখনই বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

মেঘলা জানলার কাছে ছুটে গেল।

— ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।

অর্ক বলল,

— কারা?

মেঘলা উত্তর দিল,

— যারা চায় তোমার বাবার ফাইলটা আর কখনও বাইরে না আসুক।


৩

দুজনেই বাড়ির পেছনের সরু রাস্তা ধরে বেরিয়ে গেল।

মেঘলা অর্ককে নিয়ে পৌঁছল একটি পুরনো কাঠের সেতুর কাছে।

নিচে নদী।

কুয়াশায় নদীর জল দেখা যাচ্ছে না।

মেঘলা বলল,

— এখান থেকে আমরা আলাদা হব।

অর্ক অবাক।

— কেন?

— তুমি একা গেলে ওরা তোমাকে অনুসরণ করবে। আমি অন্যদিকে যাব।

— না। এতদূর এসে আমি আর একা যাব না।

মেঘলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— তোমার বাবার কাছে একটা জিনিস ছিল।

— কী?

— একটা ছোট্ট নোটবুক।

অর্ক বলল,

— বাবার ডায়েরি আমার কাছে আছে।

— সেটা নয়।

— তাহলে?

— আসল নোটবুকটা কখনও তোমার বাড়িতে ছিল না।

মেঘলা পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।

— এটা নাও।

— কীসের চাবি?

— শিলাবতীপুর পুরনো রেলগুদামের।

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

— এখানে রেলগুদাম আছে?

— এখন নেই। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।

— সেখানে কী আছে?

মেঘলা বলল,

— তোমার বাবার সত্যি।


৪

পুরনো রেলগুদামটা শহরের প্রান্তে।

জং ধরা লোহার গেট।

ভাঙা দেওয়াল।

ঘাসে ঢাকা লাইন।

অর্ক আর মেঘলা সন্ধ্যার আগে সেখানে পৌঁছল।

চাবিটা তালায় ঢুকতেই অর্কের হাত থেমে গেল।

— আপনি আগে কখনও এটা খুলেছেন?

— না।

— তাহলে চাবি আপনার কাছে কীভাবে?

মেঘলা বলল,

— তোমার বাবা দিয়েছিলেন।

দরজা খুলল।

ভেতরে পুরনো কাঠের বাক্স।

লোহার তাক।

ধুলো।

অন্ধকার।

অর্ক টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে লাগল।

একটা বাক্সের গায়ে লেখা—

S.S.

অর্কের বুক ধক করে উঠল।

সুব্রত সেন।

বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এল একটা নোটবুক।

কালো মলাট।

প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা।

“যদি অর্ক এই খাতা পড়ে, তবে ধরে নেব আমি আর বেঁচে নেই।”

অর্কের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে পড়তে লাগল।

“আমি যে বাস দুর্ঘটনার তদন্ত করছি, তার সঙ্গে শুধু দুর্নীতি নয়, মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে। দুর্ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল। কারণ বাসে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি পাহাড়ি অঞ্চলের জমি দখলের একটি বড় চক্রের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”

পরের পাতায় নাম।

রণজিৎ পাল।

তার নিচে—

দেবাশিস মল্লিক।

আরও একটি নাম—

অমল সরকার।

অর্ক থেমে গেল।

— অমল সরকার?

মেঘলা বলল,

— নামটা গুরুত্বপূর্ণ।

— কে?

— সেই সময়ের পরিবহণ দফতরের কর্মকর্তা।

অর্ক আবার পড়তে লাগল।

“আমি বুঝতে পারছি, আমাকে নজরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল একজনকে বিশ্বাস করা।”

পরের পাতাটা ছিঁড়ে নেওয়া।

তার পরের পাতায় শুধু একটা বাক্য—

“বিশ্বাসঘাতক আমার খুব কাছেই।”

অর্ক মাথা তুলল।

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে।

— তোমার বাবা কাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন?

অর্ক বলল,

— জানি না।

ঠিক তখনই গুদামের বাইরে পায়ের শব্দ হল।

মেঘলা বাতি নিভিয়ে দিল।

দুজনেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে দুজন লোক কথা বলছে।

— বাক্সটা এখানেই আছে।

অন্যজন বলল,

— ওরা ভেতরে ঢুকেছে।

অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল।

মেঘলা ঠোঁট নাড়ল—

পেছনের দরজা।


৫

তারা পেছনের ভাঙা দেওয়াল টপকে বেরিয়ে এল।

কিন্তু অর্কের হাতে নোটবুকটা রয়ে গেল।

পাহাড়ি রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে মেঘলা বলল,

— এবার তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।

— কী?

— তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগের রাতে আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম।

অর্ক থেমে গেল।

— কী বলছেন?

— তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদি তাঁর কিছু হয়, তাহলে যেন তোমাকে শিলাবতীপুরে নিয়ে আসি।

— কিন্তু আপনি এতদিন আমাকে ডাকেননি কেন?

মেঘলার চোখে অপরাধবোধ।

— কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।

— কিসের?

— তোমাকে হারানোর।

অর্ক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

মেঘলা বলল,

— তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর যারা তদন্ত করছিল, তাদের মধ্যে একজন আমাকে বলেছিল—আমি যদি মুখ খুলি, তোমাকেও মেরে ফেলবে।

অর্ক ধীরে বলল,

— আপনি কে ছিলেন বাবার?

মেঘলা উত্তর দিল,

— তাঁর সহকারী।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আর শেষ দিকে তাঁর সবচেয়ে কাছের সাক্ষী।


৬

রাতের দিকে তারা একটা ছোট্ট অতিথিশালায় আশ্রয় নিল।

অর্ক নোটবুকটা আবার খুলল।

একটা পাতায় লেখা ছিল—

“অর্ককে সত্যিটা জানাতে হলে প্রথমে ওকে রণজিতের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রণজিৎ নিজে অপরাধী নয়। সে শুধু জানে কে আসল মানুষটি।”

অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল।

— রণজিৎ যদি অপরাধী না হয়, তাহলে এতদিন আমরা তাকে কেন সন্দেহ করছিলাম?

মেঘলা বলল,

— কারণ সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

— কেন?

— কারণ সে সাক্ষী।

— কিসের সাক্ষী?

মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।

দুজনেই চুপ।

আবার কড়া নাড়া।

তারপর একটি কণ্ঠ—

— অর্কবাবু?

অর্ক দরজার কাছে গেল।

— কে?

বাইরে থেকে উত্তর এল—

— আমি রণজিৎ পাল।

অর্কের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল,

— দরজা খুলো না।

অর্ক তাকাল।

— কেন?

মেঘলা ধীরে বলল,

— কারণ রণজিৎ পাল গতকাল রাতে মারা গেছে।

অর্কের মুখ সাদা হয়ে গেল।

বাইরে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল—

— অর্কবাবু, দরজা খুলুন। আপনার বাবার মৃত্যুর সত্যিটা আমি জানি।

অর্ক দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নোটবুকের শেষ পাতাটা খুলল।

সেখানে বাবার হাতের লেখায় মাত্র একটি লাইন—

“যদি রণজিৎ তোমার সামনে আসে, তার কথা বিশ্বাস কোরো না। কারণ সে একা আসবে না।”

বাইরে তখন ধীরে ধীরে দরজার হাতল নড়তে শুরু করেছে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : কুয়াশার ওপারে (প্রথম পর্ব)।

প্রথম পর্ব — অচেনা শহরের ডাক

ভোরের ঠিক পাঁচটা।

শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তার বাতিগুলো একে একে নিভে যাচ্ছিল। ফুটপাথের চায়ের দোকানগুলোতে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও একটা ট্রামের ঘণ্টা শোনা গেল।

অর্ক সেন জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে একটা পুরনো খাম।

খামের ওপর শুধু লেখা—

“অর্ক সেনের জন্য। নিজে হাতে দিতে হবে।”

প্রেরকের নাম নেই।

ঠিকানা নেই।

শুধু তার নিজের নাম।

গতকাল সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় বাড়ির দরজার নিচে খামটা পড়ে থাকতে দেখেছিল অর্ক।

প্রথমে ভেবেছিল কোনো ভুল চিঠি।

কিন্তু খাম খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি পুরনো সাদা-কালো ছবি।

ছবিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

তিনজনকে অর্ক চিনত না।

চতুর্থ মানুষটিকে চিনতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল।

তারপর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল।

লোকটি তার বাবা।

সুব্রত সেন।

অর্কের বাবা মারা গিয়েছিলেন আঠারো বছর আগে।

তখন অর্কের বয়স মাত্র ষোলো।

বাবার মৃত্যুর ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল।

একটি পাহাড়ি রাস্তা।

ব্রেক ফেল করা গাড়ি।

খাদে পড়ে মৃত্যু।

সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল একদিনেই।

অন্তত সবাই তাই ভেবেছিল।

কিন্তু ছবিটার পেছনে লেখা ছিল—

“তোমার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।”

অর্ক সারা রাত ঘুমোতে পারেনি।

আর ভোর হওয়ার আগেই খামের ভেতরের দ্বিতীয় কাগজটা পড়েছিল।

সেখানে মাত্র একটি বাক্য—

“কুয়াশা কাটার আগে শিলাবতীপুরে পৌঁছোও।”

তার নিচে একটা তারিখ।

আজকের তারিখ।


অর্ক জানত না শিলাবতীপুর কোথায়।

গুগলে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছিল।

ছোট্ট একটা পাহাড়ি শহর।

রাজ্যের একেবারে উত্তর প্রান্তে।

শহর থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরে।

আর আশ্চর্যের বিষয়—

ছবিতে বাবার পেছনে যে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, সেটার সঙ্গে শিলাবতীপুরের পুরনো একটি পর্যটন ছবির অদ্ভুত মিল ছিল।

অর্ক আর দেরি করল না।

সকাল ছ’টার ট্রেন ধরল।


ট্রেন ছাড়ার পরেও তার মাথায় একই প্রশ্ন ঘুরছিল—

কে তাকে সেখানে ডাকছে?

বাবার মৃত্যুর সত্যিই কি কোনো সম্পর্ক আছে?

আর যদি থাকে, তাহলে এত বছর পর?

ট্রেনের জানলার বাইরে শহর পিছিয়ে যাচ্ছিল।

অর্ক ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করল।

চারজন মানুষ।

বাবা।

একজন বৃদ্ধ।

একজন তরুণী।

আর একজন লোক, যার মুখ ছবিতে অস্বাভাবিকভাবে ছায়ায় ঢাকা।

অর্ক ছবিটা বড় করে দেখল।

লোকটির হাতে একটা ঘড়ি।

কালো ডায়াল।

রূপোর চেন।

অর্ক হঠাৎ থেমে গেল।

এই ঘড়িটা সে চেনে।

তার বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের কাছে একটি ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল।

মা বলেছিলেন—

“এটা তোমার বাবার।”

কিন্তু অর্ক কখনও বাবাকে ওই ঘড়ি পরতে দেখেনি।

মা ঘড়িটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন, সেটাও বলেননি।

আর আজ ছবিতে একই ঘড়ি।

অর্কের বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়তে লাগল।


বিকেলের দিকে ট্রেন পাহাড়ি অঞ্চলে ঢুকল।

জানলার বাইরে কুয়াশা।

গাছের সারি।

দূরে পাহাড়।

অর্ক ফোন বের করে শিলাবতীপুরের ঠিকানা আবার দেখল।

কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই।

স্টেশনে নামার পর সে অবাক হয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা।

একটা পুরনো বোর্ডে লেখা—

শিলাবতীপুর।

স্টেশনের বাইরে মাত্র একটি চায়ের দোকান খোলা।

অর্ক এগিয়ে গিয়ে বলল,

— এখানে “নন্দন লজ” কোথায়?

চায়ের দোকানের বৃদ্ধ লোকটি তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর জিজ্ঞেস করল,

— আপনি অর্ক?

অর্কের শরীরের ভেতর যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।

— আপনি আমার নাম জানেন?

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

— আপনাকে আসতেই বলেছিলাম।

অর্ক ধীরে ধীরে বলল,

— কে বলেছিল?

বৃদ্ধ চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল।

— আপনার বাবা।

অর্কের মুখ শুকিয়ে গেল।

— আমার বাবা তো আঠারো বছর আগে মারা গেছেন।

বৃদ্ধ মৃদু হাসল।

— আমি জানি।

তারপর দোকানের পেছনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কিন্তু কিছু কথা মানুষ মারা যাওয়ার পরও রেখে যায়।

অর্ক আর কিছু বলল না।

বৃদ্ধ একটা কাগজ এগিয়ে দিল।

কাগজে লেখা—

“পুরনো ডাকবাংলো। রাত ন’টা।”

অর্ক বলল,

— সেখানে কে থাকবে?

বৃদ্ধ এবার তার চোখের দিকে তাকাল।

— যে মানুষটা আঠারো বছর ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।


রাত ন’টার কিছু আগে অর্ক পুরনো ডাকবাংলোয় পৌঁছল।

বাড়িটা পাহাড়ের ঢালে।

চারপাশে ঘন কুয়াশা।

দরজায় তালা ছিল না।

অর্ক ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরের মধ্যে একটা টেবিল।

টেবিলের ওপর জ্বলছে কেরোসিনের বাতি।

আর তার পাশে রাখা একটি টেপ রেকর্ডার।

অর্ক এগিয়ে গেল।

রেকর্ডারের পাশে ছোট্ট কাগজ—

“অর্ক, যদি তুমি এখানে এসে থাকো, তাহলে বুঝব সত্যিটা জানার মতো বড় হয়েছ।”

অর্কের হাত কেঁপে উঠল।

এটা তার বাবার হাতের লেখা।

সে রেকর্ডারের প্লে বোতাম চাপল।

কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর—

একটি পরিচিত কণ্ঠ।

আঠারো বছর পর।

তার বাবা বলছেন—

“অর্ক, আমার মৃত্যু যদি দুর্ঘটনা বলে তোমাকে জানানো হয়ে থাকে, সেটা বিশ্বাস কোরো না।”

অর্কের চোখ ভিজে উঠল।

কণ্ঠটা আবার শোনা গেল—

“আমি এমন একটা জিনিস দেখেছি, যেটা আমার দেখা উচিত ছিল না।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর—

“কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুল আমি তখনই করেছি, যখন ভেবেছিলাম আমি যাকে বিশ্বাস করি, সে আমাকে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।”

হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক বারবার বোতাম চাপল।

কিছুই হল না।

ঠিক তখনই বাইরে একটা শব্দ হল।

কেউ যেন কাঠের বারান্দায় হাঁটছে।

অর্ক দরজার দিকে তাকাল।

কুয়াশার মধ্যে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে।

অর্ক বলল,

— কে?

কোনো উত্তর নেই।

ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

তারপর দরজার সামনে এসে থামল।

একজন মহিলা।

বয়স প্রায় চল্লিশ।

ভেজা চুল।

হাতে কালো ছাতা।

অর্ক দরজা খুলতে যাচ্ছিল।

মহিলাটি বলল,

— দরজা খুলবেন না।

অর্ক থেমে গেল।

— কেন?

মহিলা ফিসফিস করে বলল,

— কারণ বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আমি নই।

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে পেছনে তাকাল।

তারপর আবার দরজার দিকে।

বাইরে দাঁড়ানো ছায়াটা এবার দরজায় তিনবার ধাক্কা দিল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মহিলা অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল,

— এবার আপনার বাবার মৃত্যুর আসল গল্প শুরু হবে।

কুয়াশার মধ্যে কোথাও একটা গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হল।

আর অর্ক বুঝল—

শিলাবতীপুরে তাকে শুধু সত্যি জানাতে ডাকা হয়নি।

কেউ চায় সে যেন সত্যিটা খুঁজে বের করে।

আর কেউ একজন চায়—

সে যেন কোনোভাবেই সেই সত্যির কাছে পৌঁছতে না পারে।

চলবে…

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

জুতো: মানুষের পথচলার নীরব সঙ্গী।।

মানুষ প্রতিদিন হাঁটে। বাড়ি থেকে স্কুল, অফিস থেকে বাজার, স্টেশন থেকে কর্মস্থল—জীবনের প্রায় প্রতিটি পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি সাধারণ জিনিস—জুতো।

আমরা সাধারণত জুতোর কথা আলাদা করে ভাবি না। পায়ে পরি, কাজ শেষ হলে খুলে রাখি। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পায়ের সুরক্ষা এবং আরাম নিশ্চিত করার জন্য মানুষ বহু যুগ ধরে নানা ধরনের পাদুকা তৈরি করেছে।

জুতো শুধু পায়ের সুরক্ষার উপকরণ নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রা, পেশা, পরিবেশ, সামাজিক রীতি এবং রুচিরও প্রতিফলন। একজন শ্রমিকের জুতো যেমন তার কাজের সঙ্গে মানানসই, তেমনই একজন খেলোয়াড়ের জুতো তৈরি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রয়োজন অনুযায়ী।

অর্থাৎ জুতো আমাদের পথচলার নীরব সঙ্গী, যা প্রতিদিন আমাদের সঙ্গে থাকে কিন্তু খুব কমই আমাদের মনোযোগ পায়।

পা রক্ষার প্রয়োজন থেকেই শুরু

মানুষ যখন খালি পায়ে প্রকৃতির মধ্যে চলাফেরা করত, তখন পাথর, কাঁটা, গরম মাটি কিংবা ঠান্ডা পরিবেশ পায়ের জন্য সমস্যা তৈরি করত।

এই সমস্যা থেকেই পা ঢেকে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে পাদুকা তৈরি করতে শুরু করে।

কোথাও পশুর চামড়া, কোথাও গাছের ছাল, কোথাও বোনা তন্তু—পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পাদুকার ধরন বদলেছে।

সময়ের সঙ্গে সেই সাধারণ পাদুকাই নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক জুতোর রূপ পেয়েছে।

পরিবেশের সঙ্গে জুতোর সম্পর্ক

জুতোর নকশা অনেক সময় নির্ভর করে মানুষ কোন পরিবেশে বাস করছে তার ওপর।

অত্যন্ত ঠান্ডা অঞ্চলে পা গরম রাখার জন্য মোটা ও উষ্ণ জুতো দরকার। বরফাচ্ছন্ন এলাকায় আবার বিশেষ ধরনের জুতো প্রয়োজন।

অন্যদিকে গরম ও শুষ্ক অঞ্চলে হালকা পাদুকা বেশি আরামদায়ক হতে পারে। বর্ষাপ্রধান অঞ্চলে জল থেকে পা রক্ষার জন্য জলরোধী জুতোর প্রয়োজন হয়।

অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রা ও প্রকৃতির সঙ্গে জুতোর নকশার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

পেশাভেদে জুতোর পরিবর্তন

একজন মানুষের পেশা তার জুতোর ধরনকেও প্রভাবিত করে।

কৃষকের জন্য এমন জুতো দরকার যা কাদা-মাটি ও ভেজা পরিবেশে ব্যবহার করা যায়। নির্মাণশ্রমিকের জুতো হতে হয় শক্ত ও নিরাপদ, যাতে পায়ে আঘাতের ঝুঁকি কমে।

একজন পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মীর জুতোর প্রয়োজনীয়তা আবার আলাদা। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার জন্য আরাম গুরুত্বপূর্ণ।

খেলোয়াড়দের জুতো আরও বিশেষায়িত। দৌড়বিদ, ফুটবলার, ক্রিকেটার বা পর্বতারোহী—প্রত্যেকের জুতোর নকশায় আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে।

এতে বোঝা যায়, জুতো শুধু পোশাকের অংশ নয়; অনেক পেশায় এটি কাজের নিরাপত্তার অংশ।

স্কুলের জুতো

শিশুর জীবনে জুতোর সঙ্গে একটি বিশেষ স্মৃতি জড়িয়ে থাকে—স্কুলের জুতো।

প্রতিদিন সকালে স্কুলের পোশাকের সঙ্গে জুতো পরা, জুতোর ফিতে বাঁধা, বর্ষার দিনে জুতো ভিজে যাওয়া কিংবা পরীক্ষার সকালে নতুন জুতো পরা—এসব ছোট ঘটনা পরে বড় হয়ে স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

স্কুলের জুতো শিশুকে শুধু বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে না; এটি তার নিয়মিত জীবনেরও একটি অংশ।

জুতো ও আত্মবিশ্বাস

পরিপাটি পোশাকের সঙ্গে পরিষ্কার জুতো মানুষের আত্মবিশ্বাসও বাড়াতে পারে।

চাকরির সাক্ষাৎকার, গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান কিংবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষ নিজের পোশাকের দিকে যেমন নজর দেয়, তেমনই জুতোর দিকেও নজর দেয়।

জুতো মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি ছোট অংশ প্রকাশ করতে পারে। কেউ সরল ও আরামদায়ক জুতো পছন্দ করেন, কেউ আবার নকশাদার বা আধুনিক জুতো বেছে নেন।

তবে জুতোর দাম বা ব্র্যান্ড মানুষের ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি নয়। আরাম, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক জুতো বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রম ও জুতোর সম্পর্ক

একটি জুতো তৈরি হওয়ার পেছনে বহু মানুষের শ্রম থাকে।

নকশা তৈরি থেকে শুরু করে উপকরণ প্রস্তুত করা, কাটা, সেলাই, জোড়া লাগানো, পালিশ, পরীক্ষা এবং প্যাকেটজাত করা—বিভিন্ন ধাপে অনেক শ্রমিক কাজ করেন।

আমরা দোকান থেকে একটি জুতো কিনে শুধু তার দাম দেখি। কিন্তু তার পেছনে থাকা মানুষের শ্রমকে অনেক সময় ভুলে যাই।

প্রতিটি ব্যবহার্য জিনিসের পেছনে মানুষের শ্রম রয়েছে—জুতো তার একটি ভালো উদাহরণ।

জুতোর যত্ন

ভালো জুতো দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে হলে তার যত্ন নেওয়া দরকার।

ব্যবহারের পরে জুতো পরিষ্কার করে রাখা, ভেজা জুতো শুকিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পালিশ করা তার স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে।

ভেজা জুতো দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ বা অন্যান্য সমস্যা হতে পারে। তাই জুতোর পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতারও অংশ।

জুতো যত্ন করে ব্যবহার করলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘন ঘন নতুন জুতো কেনার প্রয়োজন কমে।

জুতো এবং পরিবেশ

জুতোর উৎপাদনেও পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিভিন্ন উপকরণ, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং পুরনো জুতো ফেলে দেওয়ার কারণে বর্জ্য তৈরি হয়।

তাই বর্তমানে টেকসই উপকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান এবং দীর্ঘস্থায়ী পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।

একটি জিনিস যতদিন ব্যবহার করা যায়, ততবার নতুন জিনিস উৎপাদনের প্রয়োজন কমে। ফলে অপচয়ও কম হয়।

সচেতনভাবে জুতো কেনা এবং পুরনো জিনিসের যথাসম্ভব ব্যবহার করা পরিবেশবান্ধব অভ্যাসের অংশ হতে পারে।

জুতো ও খেলাধুলা

আধুনিক খেলাধুলায় জুতোর গুরুত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

দৌড়ের সময় পায়ে চাপ পড়ে। ফুটবলে দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে হয়। বাস্কেটবলে লাফানো ও হঠাৎ থামার প্রয়োজন হয়। পাহাড়ে হাঁটার সময় পাথুরে ও অসমান পথে ভারসাম্য রাখতে হয়।

এই কারণে বিভিন্ন খেলার জন্য বিশেষ ধরনের জুতো তৈরি হয়।

এখানে জুতো শুধু আরামের বিষয় নয়; খেলোয়াড়ের দক্ষতা ও নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

পথের স্মৃতি

মানুষের জীবনে কিছু জুতো বিশেষ স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

প্রথম স্কুলে যাওয়ার জুতো, প্রথম চাকরির সময় কেনা জুতো, কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে পরা জুতো কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণে ব্যবহৃত জুতো—বছর পেরিয়ে গেলেও এগুলো অনেক সময় স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

জুতো নিজে কোনো গল্প বলে না। কিন্তু তার ওপর জমে থাকা ধুলো, দাগ ও ক্ষয় যেন মানুষের পথচলার ইতিহাস বহন করে।

এক জোড়া পুরনো জুতো তাই কখনও কখনও একটি পুরনো দিনের অ্যালবামের মতো হয়ে ওঠে।

জুতোর মূল্য নয়, পথচলাই আসল

আধুনিক বাজারে নানা দামের জুতো পাওয়া যায়। দামি জুতো সুন্দর হতে পারে, আবার সাধারণ জুতোটিও অত্যন্ত আরামদায়ক হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত জুতোর আসল মূল্য নির্ভর করে তার ব্যবহারিক উপযোগিতার ওপর।

মানুষ কত দামি জুতো পরেছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে সেই জুতো পরে কোথায় হেঁটেছে।

কেউ জীবিকার জন্য প্রতিদিন বহু কিলোমিটার হাঁটেন। কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে যান। কেউ শিক্ষার সন্ধানে পথে বের হন। কারও পথ আনন্দের, কারও পথ সংগ্রামের।

জুতো সেই সব পথের নীরব সাক্ষী।

উপসংহার

জুতো আমাদের জীবনের অত্যন্ত সাধারণ একটি বস্তু। প্রতিদিন পায়ে পরি, পথ চলি, তারপর খুলে রাখি। কিন্তু এই সাধারণ জিনিসটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের ইতিহাস, শ্রম, প্রযুক্তি, পেশা, পরিবেশ ও অসংখ্য স্মৃতি।

একজন মানুষ কত দূর পথ পাড়ি দিয়েছেন, তা হয়তো তার জুতো দেখে বোঝা যায় না। কিন্তু জুতোর ক্ষয়, ধুলো কিংবা পুরনো দাগ অনেক সময় সেই পথচলার সাক্ষ্য বহন করে।

জীবন আসলে একটি দীর্ঘ পথ। সেই পথে কখনও মসৃণ রাস্তা আসে, কখনও কাঁকর, কখনও কাদা, কখনও উঁচুনিচু পথ। মানুষ তবু এগিয়ে চলে।

আর সেই পথচলায় পায়ের নিচে থাকা জুতো নীরবে বলে যায়—

পথ যত কঠিনই হোক, চলার ইচ্ছা থাকলে মানুষ সামনে এগিয়ে যেতে পারে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

রাস্তার বাতি: রাতের শহরের নীরব প্রহরী।।।

দিনের আলোয় শহর, মফস্বল কিংবা গ্রামের রাস্তা আমাদের কাছে খুব পরিচিত। সূর্য উঠলে চারপাশের সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ কাজে বের হয়, দোকান খোলে, যানবাহন চলতে শুরু করে। কিন্তু সূর্য ডুবে যাওয়ার পর একই রাস্তার চেহারা বদলে যায়। অন্ধকার নেমে আসে, মানুষের চলাচল কমে যায় এবং নিরাপত্তার গুরুত্ব বেড়ে যায়।

এই অন্ধকারের মধ্যে রাস্তার পাশে জ্বলে ওঠে ছোট ছোট আলো। রাস্তার বাতি হয়তো আমাদের প্রতিদিনের জীবনে খুব সাধারণ একটি বিষয়, কিন্তু রাতের নাগরিক জীবনে তার গুরুত্ব অসাধারণ।

রাস্তার বাতি শুধু পথ আলোকিত করে না; এটি মানুষের চলাচলকে নিরাপদ করে, শহরের সৌন্দর্য বাড়ায় এবং রাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে সাহায্য করে। আলো তাই আধুনিক নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

অন্ধকার থেকে আলোর পথে

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে আলো পাওয়ার চেষ্টা খুব পুরনো। আগুন আবিষ্কারের পর মানুষ রাতের অন্ধকারকে কিছুটা জয় করতে পেরেছিল। পরে প্রদীপ, মশাল, কেরোসিনের বাতি এবং গ্যাসের আলো ব্যবহার করা হয়েছে।

বিদ্যুতের প্রসারের সঙ্গে মানুষের রাতের জীবন আরও বদলে যায়। রাস্তাঘাটেও আলো স্থাপনের ব্যবস্থা তৈরি হয়।

আজ শহরের প্রধান রাস্তা থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকা, সেতু, বাজার, স্টেশনসংলগ্ন রাস্তা কিংবা বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় রাস্তার বাতি সাধারণ দৃশ্য।

এই ছোট্ট আলো আসলে মানুষের দীর্ঘ প্রযুক্তিগত যাত্রার ফল।

পথচারীর নিরাপত্তা

রাতে একজন পথচারীর জন্য আলোকিত রাস্তা অনেক বেশি নিরাপদ।

অন্ধকার রাস্তায় গর্ত, নালা, পাথর কিংবা অন্য কোনো বাধা চোখে পড়তে নাও পারে। আবার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ বা অন্য যানবাহনও সহজে দেখা যায় না।

আলো থাকলে পথচারী নিজের চারপাশ দেখতে পারেন। গাড়ির চালকরাও রাস্তার পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝতে পারেন।

বিশেষ করে ব্যস্ত শহরে রাতের সময় পথচারী ও যানবাহনের নিরাপদ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত আলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যানবাহন চলাচলে গুরুত্ব

রাস্তার বাতির সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তারও সম্পর্ক রয়েছে।

রাতে চালকদের সামনে রাস্তা পরিষ্কারভাবে দেখা দরকার। বাঁক, মোড়, রাস্তার বিভাজন, পথচারী পারাপারের স্থান বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ অন্ধকারে থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সঠিকভাবে স্থাপন করা রাস্তার আলো চালকদের দৃশ্যমানতা বাড়াতে সাহায্য করে।

তবে শুধু আলো থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা, গাড়ির আলো ঠিক রাখা এবং চালকের সতর্কতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শহরের রাতের জীবন

আধুনিক শহর অনেক সময় সূর্যাস্তের পরও থেমে থাকে না।

রেস্তোরাঁ, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল, পরিবহণ ব্যবস্থা, জরুরি পরিষেবা, বিভিন্ন ব্যবসা—অনেক কিছুই রাত পর্যন্ত চলে।

রাস্তার আলো এই রাতের অর্থনীতির জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।

একটি আলোকিত রাস্তা মানুষকে রাতেও প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়ার সাহস দেয়। শহরের কিছু অংশ তাই রাতের পরেও সচল থাকে।

দোকান ও ছোট ব্যবসা

অনেক ছোট ব্যবসা সন্ধ্যার পর বেশি জমে ওঠে। চায়ের দোকান, খাবারের স্টল, মিষ্টির দোকান, ওষুধের দোকান কিংবা বিভিন্ন পরিষেবার ছোট প্রতিষ্ঠান রাত পর্যন্ত খোলা থাকতে পারে।

রাস্তার আলো থাকলে ক্রেতারা দোকানের সামনে সহজে চলাচল করতে পারেন।

এর ফলে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও পরোক্ষভাবে উপকার হয়।

একটি আলো তাই শুধু রাস্তার জন্য নয়; রাস্তার পাশে থাকা বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গেও যুক্ত।

গ্রামের রাস্তার আলো

রাস্তার বাতির গুরুত্ব শুধু বড় শহরে সীমাবদ্ধ নয়।

গ্রামের রাস্তা রাতের অন্ধকারে অনেক বেশি নির্জন হয়ে যেতে পারে। সেখানে রাস্তার আলো থাকলে মানুষ সন্ধ্যার পরও প্রয়োজনীয় কাজে বের হতে পারেন।

কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, দোকানদার কিংবা জরুরি কাজে যাওয়া মানুষ—অনেকেই এর সুবিধা পান।

বিশেষ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড বা গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলের আশপাশে আলো থাকা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে।

নারী ও প্রবীণদের চলাচল

রাতে বাইরে বেরোনোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলোকিত রাস্তা পথচারীদের চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে নারী, প্রবীণ ব্যক্তি বা একা চলাচলকারী মানুষের কাছে আলোকিত পরিবেশ বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, রাস্তার আলো একা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। প্রয়োজনে পুলিশি নজরদারি, সিসিটিভি, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ গণপরিবহণও দরকার।

আলো ও শহরের সৌন্দর্য

রাস্তার বাতি শুধু ব্যবহারিক কাজ করে না; শহরের সৌন্দর্যও বাড়ায়।

সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো রাস্তার আলো একটি শহরের রাতের দৃশ্যকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, উদ্যান, সেতু বা ঐতিহাসিক স্থাপনার চারপাশে পরিকল্পিত আলো শহরের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

অনেক শহরের রাতের পরিচিত দৃশ্যের একটি অংশ হয়ে উঠেছে রাস্তার আলো।

আলো নষ্ট হলে কী হয়?

একটি রাস্তার বাতি নষ্ট হওয়া হয়তো ছোট সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকলে তার প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।

পথচারীদের অসুবিধা হয়। চালকদের দৃশ্যমানতা কমে। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।

তাই রাস্তার বাতি স্থাপন করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি।

স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ থাকলে নষ্ট বাতির সমস্যা দ্রুত জানানো ও সমাধান করা সম্ভব।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রয়োজন

রাস্তার আলো প্রয়োজনীয় হলেও বিদ্যুতের অপচয় করা উচিত নয়।

আধুনিক প্রযুক্তিতে কম বিদ্যুৎ খরচ করে বেশি আলো দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। নির্দিষ্ট সময়ে আলো জ্বালানো ও নেভানো, আলোয়ের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্মার্ট ব্যবস্থাপনা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সাহায্য করতে পারে।

কিছু এলাকায় সৌরশক্তিচালিত রাস্তার বাতিও ব্যবহার করা হয়।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করলে নিরাপত্তা ও পরিবেশ—দুই দিকই বিবেচনা করা সম্ভব।

রাস্তার বাতি ও নাগরিক দায়িত্ব

সরকার বা প্রশাসনের দায়িত্ব রাস্তার আলো স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। কিন্তু নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে।

বাতির খুঁটি নষ্ট করা, তার চুরি করা, অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়া কিংবা আলোর সামনে এমনভাবে পোস্টার বা বিজ্ঞাপন লাগানো যাতে আলো বাধাগ্রস্ত হয়—এসব থেকে বিরত থাকা দরকার।

সরকারি সম্পদ আসলে জনগণের সম্পদ। তাই তার সুরক্ষা সবার দায়িত্ব।

অন্ধকারে একটি ছোট আলো

জীবনের সঙ্গে রাস্তার বাতির একটি সুন্দর প্রতীকী সম্পর্কও রয়েছে।

অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি ছোট আলোও মানুষের পথ দেখাতে পারে। আলো হয়তো পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করে না, কিন্তু সামনে কয়েকটি ধাপ পরিষ্কার করে দেয়।

মানুষের জীবনেও এমন অনেক ছোট আলো থাকে—একটি ভালো কথা, একজন সহায়ক মানুষ, একটি সুযোগ, একটি সৎ সিদ্ধান্ত কিংবা একটি আশাবাদী চিন্তা।

সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে না হলেও সামনে এগোনোর জন্য কখনও কখনও সামান্য আলোরই প্রয়োজন হয়।

ভবিষ্যতের আলোকিত শহর

ভবিষ্যতের শহর আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। স্মার্ট রাস্তার বাতি, সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি শহরের আলোকব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে পারে।

রাস্তার আলো তখন শুধু আলো দেওয়ার কাজ করবে না; যানবাহনের চলাচল, পরিবেশ এবং শক্তি ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মূল উদ্দেশ্য থাকবে মানুষের জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করা।

উপসংহার

রাস্তার বাতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এমন একটি অংশ, যার গুরুত্ব আমরা অনেক সময় আলাদা করে ভাবি না। অথচ রাতের অন্ধকারে তার উপস্থিতি আমাদের পথ দেখায়, চলাচল সহজ করে এবং নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে।

একটি রাস্তার বাতি হয়তো খুব ছোট। তার আলোও সীমিত। কিন্তু সেই সীমিত আলোতেই একজন পথচারী নিজের পথ দেখতে পান, একজন চালক রাস্তার পরিস্থিতি বুঝতে পারেন, একজন দোকানদার ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন।

তাই রাস্তার বাতি নিছক একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র নয়। এটি আধুনিক জনজীবনের নীরব প্রহরী—যে নিজে কোনো কথা বলে না, কিন্তু রাতের অন্ধকারে মানুষের পথকে দৃশ্যমান করে রাখে।

আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্ধকারকে পুরোপুরি দূর করা সবসময় সম্ভব না হলেও, পথ চলার জন্য একটি আলো জ্বালানো সম্ভব।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

সেতু: দুই তীরের সংযোগ থেকে মানুষের অগ্রযাত্রার প্রতীক।।।

মানুষ যখন কোনো বাধার মুখোমুখি হয়েছে, তখন সেই বাধাকে অতিক্রম করার পথও খুঁজে নিয়েছে। পাহাড়ের সামনে রাস্তা তৈরি করেছে, মরুভূমির মধ্যে পথ বানিয়েছে, সমুদ্রের ওপর জাহাজ চালিয়েছে। আর নদী, খাল বা গভীর খাদ যখন মানুষের চলার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মানুষ তৈরি করেছে সেতু।

সেতু শুধু ইট, পাথর, লোহা বা কংক্রিটের তৈরি কোনো স্থাপনা নয়। সেতু আসলে সংযোগের প্রতীক। দুটি বিচ্ছিন্ন স্থানকে কাছাকাছি নিয়ে আসে সেতু। একটি গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রাম, একটি শহরের সঙ্গে অন্য শহর কিংবা একটি অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করে দেয়।

সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে তাই সেতুর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাধা পেরোনোর মানুষের ইচ্ছা

প্রকৃতি মানুষের সামনে নানা বাধা সৃষ্টি করেছে। নদী তার মধ্যে অন্যতম। নদী যেমন জীবন দেয়, তেমনই অনেক সময় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে।

আগের দিনে নদী পার হতে মানুষ নৌকা ব্যবহার করত। নৌকার ওপর নির্ভর করতে হতো আবহাওয়া, জলস্তর এবং মাঝির দক্ষতার ওপর। বড় নদী হলে পারাপারে আরও বেশি সময় লাগত।

সেতু সেই পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে।

একটি সেতু তৈরি হওয়ার পর মানুষ অনেক দ্রুত এক তীর থেকে অন্য তীরে যেতে পারে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছতে সুবিধা হয়, ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে যেতে পারে, রোগী দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে পারে এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগও সহজ হয়।

অর্থাৎ একটি সেতু তৈরি হওয়া মানে শুধু একটি রাস্তা তৈরি হওয়া নয়; একটি অঞ্চলের জীবনযাত্রার পরিবর্তন।

গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ

একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কথা ভাবা যাক। গ্রামের পাশে নদী রয়েছে। বর্ষাকালে নদীর জল বেড়ে গেলে পারাপার কঠিন হয়ে পড়ে। শহরে যেতে মানুষের অনেক সময় লাগে।

সেখানে একটি সেতু তৈরি হলে পরিস্থিতি বদলে যায়।

কৃষক নিজের উৎপাদিত সবজি বা ধান সহজে বাজারে নিয়ে যেতে পারেন। গ্রামের মানুষ শহরের হাসপাতাল, কলেজ, বাজার বা প্রশাসনিক দপ্তরে সহজে যেতে পারেন।

শহরের মানুষও গ্রামে আসতে পারেন। ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়ে।

একটি সেতু কখনও কখনও একটি সম্পূর্ণ এলাকার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

শিক্ষার পথ সহজ হয়

যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে শিক্ষার সুযোগও বাড়ে।

অনেক সময় গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের কাছাকাছি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকে না। দূরের স্কুল বা কলেজে যেতে হয়। মাঝখানে নদী বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বাধা থাকলে যাতায়াত কঠিন হয়ে ওঠে।

সেতু সেই দূরত্ব কমিয়ে দেয়।

একজন ছাত্র সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সহজে কলেজে পৌঁছতে পারে। একজন ছাত্রী নিরাপদ ও নিয়মিতভাবে স্কুলে যেতে পারে। শিক্ষকেরাও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছতে পারেন।

ফলে একটি সেতু পরোক্ষভাবে শিক্ষার প্রসারেও ভূমিকা রাখে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেতুর গুরুত্ব

জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত মূল্যবান। দুর্ঘটনা, প্রসবকালীন জটিলতা, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো প্রয়োজন।

কোনো অঞ্চলে যোগাযোগের সমস্যা থাকলে চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।

সেতু সেই সময়ের ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত চলাচল করতে পারে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে পৌঁছতে পারেন এবং রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

তাই একটি সেতুর গুরুত্ব শুধু অর্থনীতি বা যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

ব্যবসা ও অর্থনীতিতে সেতু

অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো যোগাযোগ। উৎপাদিত পণ্য যদি বাজারে পৌঁছতে না পারে, তাহলে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সেতু পরিবহণের পথ সহজ করে। পণ্যবাহী গাড়ি দ্রুত চলাচল করতে পারে। দূরের বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে। ব্যবসার পরিধি বিস্তৃত হয়।

একজন ছোট কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও এর সুফল পেতে পারেন।

আগে যে বাজারে পণ্য পাঠাতে অনেক সময় লাগত, সেতু তৈরি হওয়ার পর সেখানে কম সময়ে পণ্য পৌঁছতে পারে। পরিবহণের খরচ কমতে পারে এবং নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পর্যটনের প্রসার

সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ, পাহাড়, নদী কিংবা ঐতিহাসিক স্থানে পর্যটন গড়ে উঠতে যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কোনো পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা সহজ হলে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে। পর্যটকদের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসারও প্রসার ঘটে।

হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহণ, হস্তশিল্প ও ছোট দোকান—বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ উপকৃত হন।

অর্থাৎ একটি সেতু একটি এলাকার পর্যটন সম্ভাবনাকেও নতুনভাবে তুলে ধরতে পারে।

সেতু নির্মাণে প্রকৌশলের বিস্ময়

আধুনিক সেতু প্রকৌশল মানুষের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অসাধারণ উদাহরণ।

ছোট সেতু থেকে শুরু করে দীর্ঘ সেতু—প্রতিটির নকশা তৈরি করতে ভূপ্রকৃতি, মাটির গঠন, নদীর স্রোত, বাতাস, যানবাহনের চাপ এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

বড় সেতু নির্মাণের জন্য প্রকৌশলী, শ্রমিক, স্থপতি, প্রযুক্তিবিদ এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে কাজ করেন।

একটি সেতু দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে থাকে বহু মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও পরিকল্পনা।

সেতু ও মানুষের নিরাপত্তা

শুধু সেতু তৈরি করলেই কাজ শেষ হয় না। সেটির রক্ষণাবেক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত পরিদর্শন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত, যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পুরনো সেতুর ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর ক্ষয় হতে পারে।

সেতু মানুষের চলাচলের পথ, তাই তার নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা উচিত নয়।

পুরনো সেতুর স্মৃতি

কিছু সেতু শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; সময়ের সাক্ষীও হয়ে ওঠে।

একটি পুরনো সেতুর ওপর দিয়ে হয়তো বহু প্রজন্ম হেঁটেছে। কেউ স্কুলে গেছে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ বাজারে, কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে।

সেই সেতু হয়তো দেখেছে বর্ষার বন্যা, উৎসবের ভিড়, মানুষের আনন্দ ও দুঃখ।

সময়ের সঙ্গে নতুন সেতু তৈরি হলেও পুরনো সেতুর সঙ্গে মানুষের আবেগ থেকে যায়।

সেতু শুধু নদীর ওপর হয় না

সেতু শব্দটির অর্থকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখা যায়।

মানুষের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকলেও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করা যায়। দুটি প্রজন্মের মধ্যে চিন্তার দূরত্ব থাকলেও আলোচনা সেই দূরত্ব কমাতে পারে।

একটি ভাষা থেকে অন্য ভাষায় ভাবের অনুবাদও এক ধরনের সেতু। দুটি সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা তৈরি করাও এক ধরনের সেতুবন্ধন।

অর্থাৎ সেতু শুধু প্রকৌশলের বিষয় নয়; এটি মানুষের সম্পর্কেরও একটি শক্তিশালী প্রতীক।

ভাঙনের চেয়ে সংযোগের মূল্য বেশি

মানুষের জীবনে অনেক ধরনের বিভাজন রয়েছে—অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক কিংবা মানসিক।

বিভাজন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। সংযোগ মানুষকে কাছে আনে।

একটি সেতু আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—দুটি প্রান্ত আলাদা হলেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব।

এই ধারণাটি সমাজজীবনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে মানুষ একে অপরের কাছে আসতে পারে।

ভবিষ্যতের সেতু

ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেতু নির্মাণ হবে। দ্রুতগামী যানবাহন, নগরায়ণ এবং বাণিজ্যের প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগব্যবস্থাও আরও আধুনিক হবে।

কিন্তু প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, সেতুর মূল উদ্দেশ্য বদলাবে না—এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করা।

নতুন সেতু তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুযোগও বাড়বে। দূরত্ব কমবে, সময় বাঁচবে এবং যোগাযোগ আরও সহজ হবে।

উপসংহার

সেতু মানুষের সৃষ্টিশীলতা, সাহস ও অগ্রগতির একটি অনন্য প্রতীক। যেখানে একসময় বাধা ছিল, সেখানে মানুষ পথ তৈরি করেছে। যেখানে দুটি তীর বিচ্ছিন্ন ছিল, সেখানে মানুষ সংযোগ তৈরি করেছে।

একটি সেতু দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কেউ জীবিকার সন্ধানে যাচ্ছে, কেউ শিক্ষার পথে, কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ প্রিয়জনের কাছে।

তাই সেতুর ওপর দিয়ে শুধু যানবাহন চলে না—চলে মানুষের স্বপ্ন, আশা, প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের যাত্রা।

প্রকৃত অর্থে সেতু আমাদের শেখায়, দূরত্ব যত বড়ই হোক, সংযোগের ইচ্ছা থাকলে তার ওপর দিয়ে পথ তৈরি করা যায়।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

পোস্ট অফিস: চিঠির যুগ থেকে ডিজিটাল সময়ের পথে।।।

একসময় মানুষের দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমগুলোর একটি ছিল চিঠি। প্রিয়জনের খবর জানতে, নিজের কথা জানাতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠাতে মানুষ পোস্ট অফিসের ওপর নির্ভর করত। একটি খাম হাতে পাওয়ার মধ্যে যে অপেক্ষা, কৌতূহল ও আবেগ ছিল, তা আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে অনেকটাই বিরল।

পোস্ট অফিস তাই শুধু চিঠি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, অপেক্ষা, অর্থনৈতিক লেনদেন, সরকারি পরিষেবা এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের দীর্ঘ ইতিহাস।

সময়ের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতি বদলেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ই-মেলের যুগে চিঠির ব্যবহার কমেছে। কিন্তু পোস্ট অফিসের গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং নতুন পরিষেবা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পোস্ট অফিস এখনও মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

চিঠির অপেক্ষা

একসময় একটি চিঠির জন্য মানুষ দিনের পর দিন অপেক্ষা করতেন। দূরের শহরে থাকা ছেলে কবে চিঠি পাঠাবে, কর্মস্থলে থাকা স্বামী কবে খবর পাঠাবেন, বিদেশে থাকা প্রিয়জনের চিঠি কবে আসবে—এই অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত গভীর আবেগ।

ডাকপিয়ন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে অনেকের হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ উঠত। খামটি হাতে নিয়ে মানুষ প্রথমে প্রেরকের নাম দেখতেন। তারপর যত্ন করে চিঠি খুলে পড়তেন।

আজ একটি বার্তা কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই দ্রুততার সঙ্গে অপেক্ষার যে আবেগ ছিল, তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

ডাকপিয়নের ভূমিকা

ডাকপিয়ন ছিলেন মানুষের জীবনের পরিচিত মুখ। গ্রাম বা শহরের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় তিনি নিয়মিত ঘুরে বেড়াতেন। কার বাড়িতে চিঠি এসেছে, কোথায় মানি অর্ডার, কোথায় সরকারি কাগজ—সবই তার পরিচিত।

অনেক ডাকপিয়ন শুধু চিঠি পৌঁছে দিতেন না; তারা এলাকার মানুষের বিশ্বাসের অংশ হয়ে উঠতেন।

কোনো বৃদ্ধ মানুষ চিঠি পড়তে না পারলে ডাকপিয়ন কখনও সেটি পড়ে শোনাতেন। কারও প্রিয়জনের খবর নিয়ে চিঠি এলে সেই খবর পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে তিনিও যেন আনন্দের অংশীদার হয়ে উঠতেন।

তাদের কাজ ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু মানুষের জীবনে তার প্রভাব ছিল গভীর।

পোস্ট অফিস ও গ্রামের জীবন

গ্রামীণ ভারতের সঙ্গে পোস্ট অফিসের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বহু প্রত্যন্ত এলাকায় একসময় পোস্ট অফিস ছিল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

চিঠি, সরকারি নথি, টাকা পাঠানো, সঞ্চয়—বিভিন্ন কাজে মানুষ পোস্ট অফিসে যেতেন।

গ্রামের একজন সাধারণ মানুষের কাছে পোস্ট অফিস ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে গিয়ে তিনি শহরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারতেন।

আজ মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রসার গ্রামীণ যোগাযোগকে অনেক বদলে দিয়েছে। তবুও আর্থিক পরিষেবা, ডাক পরিষেবা এবং বিভিন্ন সরকারি সুবিধার ক্ষেত্রে পোস্ট অফিস এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্চয়ের সঙ্গে পোস্ট অফিস

পোস্ট অফিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো সঞ্চয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক। বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পোস্ট অফিসের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা জমিয়েছে।

বিশেষ করে ছোট সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে পোস্ট অফিস সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিষ্ঠান।

একজন অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছেন। কোনো পরিবার ভবিষ্যতের প্রয়োজনের কথা ভেবে সঞ্চয় করেছে। কারও কাছে সেই সঞ্চয় ছিল অবসর জীবনের নিরাপত্তার অংশ।

সঞ্চয়ের অভ্যাস মানুষকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন করে। আয়ের একটি অংশ নিয়মিতভাবে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

মানি অর্ডারের স্মৃতি

একসময় দূরে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে টাকা পাঠানোর একটি পরিচিত মাধ্যম ছিল মানি অর্ডার।

শহরে কাজ করা একজন শ্রমিক গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা পেয়ে পরিবার সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ চালাত।

মানি অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার সময় ডাকপিয়নের হাতে শুধু টাকা থাকত না; অনেক পরিবারের কাছে সেটি ছিল প্রিয়জনের পাঠানো আশ্বাস।

আজ ডিজিটাল অর্থ স্থানান্তর কয়েক মুহূর্তে হয়ে যায়। কিন্তু মানি অর্ডারের সঙ্গে জড়িত সেই অপেক্ষা ও আবেগ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

প্রযুক্তির আগমন

প্রযুক্তি পোস্ট অফিসের কাজের ধরনও বদলে দিয়েছে। কম্পিউটার, ডিজিটাল রেকর্ড, অনলাইন পরিষেবা এবং আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থার ফলে ডাকব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে।

আগে চিঠির ঠিকানা দেখে, রেজিস্টারে লিখে এবং হাতে হাতে অনেক কাজ করতে হতো। এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ দ্রুত করা সম্ভব।

এর ফলে পোস্ট অফিস পুরনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ধরে রেখেও আধুনিক পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

চিঠির ভাষা ও অনুভূতি

চিঠির একটি বিশেষ সৌন্দর্য ছিল তার ব্যক্তিগত ভাষা। একজন মানুষ নিজের হাতে বসে লিখতেন—কখনও ধীরে, কখনও আবেগ নিয়ে।

হাতের লেখার মধ্যেও মানুষের ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠত। কোনো চিঠির অক্ষর দেখে প্রিয়জনের মুখ মনে পড়ত।

চিঠিতে ভুল থাকতে পারত, বাক্য অসম্পূর্ণ হতে পারত, কালি ছড়িয়ে যেতে পারত। তবু সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই থাকত ব্যক্তিগত অনুভূতি।

ডিজিটাল বার্তায় যোগাযোগ দ্রুত হয়েছে, কিন্তু হাতে লেখা চিঠির সেই ব্যক্তিগত স্পর্শ অনেকটাই আলাদা।

পোস্টকার্ডের দিন

পোস্টকার্ড ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও কম খরচের যোগাযোগ মাধ্যম। অল্প কথায় খবর জানানো যেত।

একটি ছোট পোস্টকার্ডে হয়তো লেখা থাকত—

“আমি ভালো আছি। তোমরা সবাই ভালো থেকো। আগামী মাসে বাড়ি আসব।”

কয়েকটি সাধারণ বাক্যের মধ্যেই কত আবেগ লুকিয়ে থাকতে পারত!

আজকের দীর্ঘ মেসেজের যুগে সেই ছোট্ট পোস্টকার্ডের সরলতা যেন অন্য এক সময়ের স্মৃতি।

উৎসব ও ডাক

উৎসবের সময় পোস্ট অফিসের ব্যস্ততাও বেড়ে যেত। শুভেচ্ছা কার্ড, উপহার, চিঠি—সবকিছু পাঠানোর জন্য মানুষ ডাকব্যবহার করতেন।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের শুভেচ্ছা পাঠানো যায়। ছবি, ভিডিও ও নানা ধরনের ডিজিটাল বার্তা ব্যবহার করা হয়।

তবুও হাতে লেখা শুভেচ্ছা কার্ড বা ডাকযোগে পাঠানো কোনো উপহারের মধ্যে একটি বিশেষ ব্যক্তিগত অনুভূতি রয়েছে।

পোস্ট অফিস ও বিশ্বাস

একটি ডাকব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো মানুষের বিশ্বাস। মানুষ যখন একটি চিঠি বা পার্সেল পোস্ট করেন, তখন তিনি আশা করেন সেটি সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছবে।

বহু বছর ধরে ডাকব্যবস্থা মানুষের এই বিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।

বিশ্বাস কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি হয় না; দীর্ঘদিনের কাজের মাধ্যমে তৈরি হয়। পোস্ট অফিসের ক্ষেত্রেও সেই বিশ্বাস বহু প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে।

নতুন সময়ে পোস্ট অফিস

আজ পোস্ট অফিসকে শুধু চিঠি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আধুনিক ডাকব্যবস্থা পার্সেল, লজিস্টিক, আর্থিক পরিষেবা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধার সঙ্গেও যুক্ত।

অনলাইন কেনাকাটার প্রসারের ফলে পণ্য পরিবহন ও ডেলিভারি ব্যবস্থার গুরুত্বও বেড়েছে। দেশের এক প্রান্তের ছোট ব্যবসায়ী তার পণ্য অন্য প্রান্তের ক্রেতার কাছে পাঠাতে পারেন।

অর্থাৎ চিঠির ব্যবহার কমলেও ডাকব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অন্য রূপে টিকে আছে।

চিঠির মূল্য কেন এখনও আছে?

আজ কেউ চাইলে কয়েক সেকেন্ডে ভিডিও কল করতে পারেন। তাহলে চিঠির প্রয়োজন কী?

চিঠির মূল্য তার ধীরগতিতে। এটি মানুষকে কিছুটা সময় নিয়ে নিজের কথা ভাবতে শেখায়। কী লিখব, কীভাবে লিখব—এই ভাবনার মধ্যেই অনুভূতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়।

একটি পুরনো চিঠি বহু বছর পরও পড়া যায়। তখন সেই কাগজটি শুধু লেখা নয়; একটি সময়ের স্মৃতি হয়ে ওঠে।

এই কারণেই চিঠি পুরোপুরি হারিয়ে গেলেও তার আবেগ কখনও হারাবে না।

উপসংহার

পোস্ট অফিস আমাদের যোগাযোগব্যবস্থার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চিঠি, পোস্টকার্ড, মানি অর্ডার ও ডাকপিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি।

প্রযুক্তি যোগাযোগকে দ্রুত করেছে, জীবনকে সহজ করেছে। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি পুরনো ব্যবস্থার মানবিক মূল্যও মনে রাখা দরকার।

একটি চিঠি পৌঁছতে কয়েক দিন লাগত, কখনও আরও বেশি। সেই অপেক্ষার মধ্যেই ছিল আবেগ। খাম খুলে প্রিয়জনের হাতের লেখা দেখার মধ্যে ছিল এক ধরনের আনন্দ, যা একটি তাত্ক্ষণিক ডিজিটাল বার্তা সবসময় দিতে পারে না।

সময় বদলেছে, যোগাযোগের ভাষা বদলেছে, পোস্ট অফিসের কাজের ধরনও বদলেছে। তবু মানুষের খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে মৌলিক কাজ, তা আজও একই রয়ে গেছে।

তাই পোস্ট অফিস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়। এটি অতীতের আবেগকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমানের প্রযুক্তির পথে এগিয়ে চলা একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

পথের ধারের গাছতলা: বিশ্রাম, অপেক্ষা ও গ্রামীণ জীবনের এক নীরব ঠিকানা।।।

গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যদি পথের ধারে একটি বড় গাছ চোখে পড়ে, তার নিচে একটু দাঁড়ানোর ইচ্ছে অনেকেরই হয়। গ্রীষ্মের দুপুরে সেই গাছের ছায়া পথিককে স্বস্তি দেয়, বর্ষায় কখনও সাময়িক আশ্রয় দেয়, আবার শীতের সকালে তার নিচে বসে কয়েকজন মানুষ গল্পও করতে পারেন।

একটি গাছতলা দেখতে যতই সাধারণ হোক, গ্রামের সামাজিক জীবনে তার গুরুত্ব অনেক। সেখানে কখনও কৃষক বিশ্রাম নেন, কখনও পথিক অপেক্ষা করেন, কখনও গ্রামের প্রবীণরা বসে কথা বলেন। কোনো কোনো গাছতলা আবার স্থানীয় মানুষের কাছে বহু পুরনো স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

তাই পথের ধারের গাছতলা শুধু প্রকৃতির অংশ নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও একটি নীরব সাক্ষী।

পথিকের সাময়িক আশ্রয়

দীর্ঘ পথ হাঁটার সময় শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গরমের দিনে খোলা রাস্তায় হাঁটা বেশ কষ্টকর হতে পারে। তখন একটি বড় গাছের নিচে কয়েক মিনিট দাঁড়ানো বা বসা যেন হঠাৎ পাওয়া স্বস্তির মতো।

পথিক সেখানে ব্যাগ নামিয়ে রাখেন, একটু জল খান, শ্বাস নেন এবং আবার পথ চলার জন্য প্রস্তুত হন।

এই বিশ্রাম দীর্ঘ নয়। তবু অল্প সময়ের বিশ্রামই শরীরকে নতুন শক্তি দিতে পারে।

জীবনেও অনেক সময় এমন ছোট বিরতির প্রয়োজন হয়। সবসময় দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন কিছুক্ষণ থেমে নিজের দিকে তাকানোও জরুরি।

গ্রামের মানুষের মিলনস্থল

আগের দিনে গ্রামের অনেক গাছতলাই ছিল মানুষের স্বাভাবিক মিলনস্থল। সকাল বা বিকেলে গ্রামের প্রবীণরা সেখানে বসতেন। কেউ কৃষির খবর নিতেন, কেউ পরিবারের কথা বলতেন, কেউ গ্রামের কোনো সমস্যার আলোচনা করতেন।

কোনো আনুষ্ঠানিক সভা নয়, কোনো বড় আয়োজনও নয়—তবু এই ছোট্ট জমায়েতের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হতো।

আজ মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা আধুনিক মাধ্যম মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। তবুও সরাসরি মুখোমুখি বসে কথা বলার যে আন্তরিকতা, তা সম্পূর্ণভাবে কোনো প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।

অপেক্ষার স্থান

গাছতলা অনেক সময় অপেক্ষারও জায়গা। বাস আসবে, কেউ সাইকেলে করে আসবেন, বাজার থেকে পরিচিত মানুষ ফিরবেন—এই অপেক্ষায় কেউ গাছের নিচে বসে থাকতে পারেন।

গ্রামের রাস্তার পাশে এমন অপেক্ষার দৃশ্য খুব পরিচিত।

অপেক্ষা মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। কখনও অপেক্ষা আনন্দের, কখনও উদ্বেগের, আবার কখনও শুধুই সময় কাটানোর।

গাছতলা সেই অপেক্ষার নীরব সঙ্গী হয়ে থাকে।

কৃষকের বিশ্রাম

মাঠে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর কৃষকের শরীর ক্লান্ত হয়। কাছেই যদি বড় কোনো গাছ থাকে, তার নিচে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া সহজ হয়।

কেউ সঙ্গে আনা জল পান করেন, কেউ খাবার খান, কেউ সহকর্মীর সঙ্গে দু-একটি কথা বলেন।

মাটির সঙ্গে যাদের জীবন গভীরভাবে যুক্ত, তাদের কাছে প্রকৃতির এই ছোট ছোট আশ্রয়গুলোর গুরুত্ব অনেক।

একটি গাছের ছায়া তাদের দিনের শ্রমের মাঝে কয়েক মুহূর্তের স্বস্তি এনে দেয়।

পথের ধারের মানুষের গল্প

গাছতলার পাশ দিয়ে প্রতিদিন কত মানুষ যাতায়াত করেন, তার কোনো হিসাব নেই। কেউ স্কুলে যাচ্ছেন, কেউ বাজারে, কেউ কাজের সন্ধানে, কেউ বাড়ি ফিরছেন।

তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা। কিন্তু গাছতলা তাদের চলার পথে একই জায়গা হয়ে থাকে।

কেউ হয়তো সেখানে প্রতিদিন কয়েক মিনিট দাঁড়ান। কেউ হয়তো জীবনে একবারই সেখানে বিশ্রাম নেন।

তবু সেই স্থানটি মানুষের চলাচলের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

গাছতলা ও স্মৃতি

কিছু গাছের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। কোনো গাছের নিচে বসে কেউ পড়াশোনা করেছেন, কোনো গাছের পাশে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কোনো গাছতলায় গ্রামের পুরনো কোনো ঘটনা ঘটেছে।

সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলে যায়, রাস্তার চেহারা বদলে যায়, নতুন বাড়ি তৈরি হয়। কিন্তু পুরনো গাছটি অনেক সময় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

তখন সেটি শুধু একটি গাছ নয়; অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি জীবন্ত সংযোগ হয়ে ওঠে।

প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান

একটি গাছতলা মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সহাবস্থানের সুন্দর উদাহরণ। মানুষ তার কাছ থেকে ছায়া পায়, পাখি পায় আশ্রয়, মাটিতে পড়ে পাতা জৈব উপাদান যোগ করে এবং আশপাশের পরিবেশে সবুজের উপস্থিতি বজায় থাকে।

প্রকৃতির কোনো উপাদানকে শুধুমাত্র মানুষের সুবিধার দিক দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রতিটি গাছের নিজস্ব পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে।

তাই রাস্তা সম্প্রসারণ বা উন্নয়নের সময় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করে পুরনো গাছ সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা উচিত।

উন্নয়ন ও পুরনো গাছ

রাস্তা চওড়া করা, নতুন ভবন তৈরি করা কিংবা আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য অনেক সময় পুরনো গাছ কেটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব কি না, সেটিও ভাবা জরুরি।

একটি পুরনো গাছ কেটে ফেলার আগে বিকল্প পরিকল্পনা করা গেলে সেটি আরও ভালো। রাস্তার নকশায় গাছকে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রয়োজন হলে স্থানান্তর করা কিংবা অন্য জায়গায় নতুন গাছ লাগানো—এসব উদ্যোগ পরিবেশের ক্ষতি কমাতে পারে।

আধুনিক জীবনে গাছতলার শিক্ষা

আধুনিক জীবন আমাদের দ্রুত চলতে শিখিয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে হবে, দ্রুত উত্তর দিতে হবে।

কিন্তু প্রকৃতি দ্রুত চলে না। গাছ ধীরে ধীরে বড় হয়। ছায়া তৈরি হতে সময় লাগে। একটি শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে উঠতেও সময় লাগে।

গাছতলা তাই আমাদের ধৈর্যের শিক্ষা দেয়।

যে গাছ আজ বড় হয়ে পথিককে ছায়া দিচ্ছে, সেটিও একদিন ছোট চারা ছিল। কেউ হয়তো তাকে লাগিয়েছিলেন, জল দিয়েছিলেন, রক্ষা করেছিলেন। বহু বছরের পরিশ্রমের ফলেই আজ সে অন্যের আশ্রয়।

জীবনের অনেক ভালো জিনিসও ঠিক এমনভাবেই সময় নিয়ে তৈরি হয়।

সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তন

আগে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে একে অপরের সঙ্গে দেখা করতেন। মাঠ, রাস্তা, পুকুরপাড় বা গাছতলা ছিল কথাবার্তার স্বাভাবিক জায়গা।

এখন মানুষের হাতে স্মার্টফোন। দূরের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে যোগাযোগ করা সম্ভব। এটি নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা।

কিন্তু একই সঙ্গে অনেক সময় দেখা যায়, পাশাপাশি বসে থাকা মানুষও নিজেদের ফোনে ব্যস্ত। সরাসরি কথাবার্তা কমে যাচ্ছে।

প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোকেও সময় দেওয়া জরুরি।

শিশুদের জন্য গাছতলা

গ্রামের শিশুরাও গাছতলার সঙ্গে নানা স্মৃতি তৈরি করে। তারা সেখানে খেলতে পারে, গল্প করতে পারে কিংবা গরমের দিনে কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারে।

তবে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার পাশে শিশুদের খেলাধুলা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই গাছতলার মতো জায়গাকে নিরাপদ সামাজিক স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাস্তার যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত ব্যবস্থার প্রয়োজন।

গাছতলা থেকে বৃহত্তর শিক্ষা

একটি গাছ নিজে কোথাও যায় না, কিন্তু তার ছায়ায় বহু মানুষ এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। সে কাউকে জিজ্ঞেস করে না—তুমি কে, কোথা থেকে এসেছ, তোমার পরিচয় কী।

এই নিঃশর্ত আশ্রয়ের মধ্যে মানবিকতার একটি সুন্দর শিক্ষা রয়েছে।

আমরাও যদি সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের জন্য কিছু করতে পারি, তাহলে তার বিনিময়ে সবসময় কিছু প্রত্যাশা না করেও করা সম্ভব।

কখনও একটি ভালো কথা, কখনও একটি ছোট সাহায্য, কখনও কারও কথা মন দিয়ে শোনা—এসবই অন্য মানুষের জীবনে সামান্য স্বস্তির জায়গা তৈরি করতে পারে।

উপসংহার

পথের ধারের গাছতলা আমাদের চোখে হয়তো খুব সাধারণ একটি দৃশ্য। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এর সঙ্গে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, স্মৃতি, শ্রম, অপেক্ষা ও সম্পর্কের অনেক গল্প জড়িয়ে আছে।

একজন ক্লান্ত পথিক সেখানে বিশ্রাম পান, একজন কৃষক শ্রমের পর একটু বসেন, কয়েকজন মানুষ সেখানে গল্প করেন, কেউ অপেক্ষা করেন, আবার কোনো শিশু হয়তো সেই গাছটিকে তার শৈশবের অংশ হিসেবে মনে রাখে।

সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও মানুষের বিশ্রামের প্রয়োজন, প্রকৃতির আশ্রয় এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের প্রয়োজন বদলায় না।

তাই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এমন ছোট ছোট মানবিক ও প্রাকৃতিক আশ্রয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

পথের ধারের একটি গাছ হয়তো কোনো বড় শহর তৈরি করে না, কোনো বিশাল স্থাপত্যও নির্মাণ করে না। কিন্তু সে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে বহু পথিককে স্বস্তি দেয়।

আর কখনও কখনও পৃথিবীকে সুন্দর রাখার জন্য এমন নীরব অবদানই সবচেয়ে মূল্যবান।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: আয়নার সামনে দাঁড়ানো মানুষটি।।।

শহরের ব্যস্ত বাজারের এক কোণে ছোট্ট একটি নাপিতের দোকান ছিল। দোকানের মালিক মধুসূদন—সবাই তাঁকে মধুদা বলে ডাকত।

দোকানটি খুব সাধারণ। একটি পুরনো চেয়ার, একটা কাঠের তাক, কয়েকটি কাঁচি আর দেওয়ালজোড়া বড় আয়না।

মধুদা বলতেন,

—“চুল কাটা আমার কাজ, কিন্তু মানুষকে একটু ভালো লাগানো আমার আসল কাজ।”

একদিন বিকেলে দোকানে এল এক কিশোর। নাম অর্ক।

সে চুপচাপ চেয়ারে বসে বলল,

—“কাকু, খুব ছোট করে চুল কেটে দিন।”

মধুদা জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেন?”

অর্ক কিছু বলল না।

চুল কাটতে কাটতে মধুদা আয়নায় ছেলেটার মুখ দেখছিলেন। ছেলেটি বারবার নিজের মুখটা নিচু করে ফেলছিল।

শেষে মধুদা বললেন,

—“নিজের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না?”

অর্ক চমকে উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—“স্কুলে সবাই আমার চেহারা নিয়ে হাসে।”

মধুদা কাঁচি থামিয়ে বললেন,

—“মানুষের মুখ নিয়ে হাসে যারা, তারা নিজের মনটা আয়নায় দেখেনি।”

অর্ক প্রথমবার মাথা তুলল।

মধুদা চুল কেটে সুন্দর করে দিলেন। শেষে আয়নাটা একটু কাছে এনে বললেন,

—“এবার নিজের দিকে তাকাও।”

অর্ক তাকাল।

মধুদা বললেন,

—“দেখলে? এই ছেলেটা খারাপ দেখতে নয়। শুধু একটু দুঃখী।”

অর্ক হেসে ফেলল।

সেদিন টাকা দিতে গেলে মধুদা বললেন,

—“আজ লাগবে না।”

—“কেন?”

—“কারণ আজ তুমি হাসলে। সেটাই আমার পারিশ্রমিক।”

এরপর অর্ক প্রায়ই দোকানে আসত। কখনও চুল কাটাতে, কখনও শুধু কথা বলতে।

মধুদা বুঝতে পারলেন, ছেলেটির সমস্যা শুধু স্কুলের ঠাট্টা নয়। পড়াশোনায়ও সে পিছিয়ে পড়ছে।

তিনি নিজের পরিচিত এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাছে অর্ককে পড়তে পাঠালেন।

ধীরে ধীরে অর্ক বদলে গেল।

সে পড়াশোনায় ভালো করতে শুরু করল। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল।

বছর পাঁচেক পর একদিন মধুদা দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হঠাৎ একজন তরুণ এসে দাঁড়াল।

পরনে সুন্দর শার্ট, হাতে একটি ব্যাগ।

—“মধুদা, আমাকে চিনতে পারছেন?”

মধুদা তাকিয়ে রইলেন।

—“অর্ক?”

ছেলেটি হেসে বলল,

—“হ্যাঁ।”

সে ব্যাগ থেকে একটি নতুন আয়না বের করল।

—“আপনার দোকানের পুরনো আয়নাটা বদলে দিন।”

মধুদা অবাক হয়ে বললেন,

—“কেন?”

অর্ক বলল,

—“এই আয়নায় আমি শুধু নিজের মুখ দেখিনি। নিজের সম্পর্কে আমার ধারণাটাও বদলেছিল।”

মধুদার চোখে জল এসে গেল।

অর্ক আরও বলল,

—“আমি এখন কাউন্সেলিং নিয়ে কাজ করি। স্কুলে যেসব ছেলেমেয়েরা নিজেদের নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে, তাদের সঙ্গে কথা বলি।”

মধুদা চুপ করে শুনলেন।

অর্ক নতুন আয়নাটা দোকানের দেওয়ালে লাগিয়ে দিল।

তারপর পুরনো আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—“এটা ফেলে দেবেন না।”

—“কেন?”

অর্ক মৃদু হেসে বলল,

—“এটার মধ্যে আমার একটা পুরনো মানুষ এখনও দাঁড়িয়ে আছে।”

মধুদা কিছু বলতে পারলেন না।

শুধু ছেলেটার কাঁধে হাত রাখলেন।

দোকানের আয়নায় তখন পাশাপাশি দেখা যাচ্ছিল দুজন মানুষকে—

একজন বৃদ্ধ নাপিত,

আর একজন বড় হয়ে ওঠা সেই কিশোর।

কখনও কখনও কাউকে সুন্দর করে তুলতে কাঁচির দরকার হয় না; দরকার হয় এমন একজন মানুষের, যে তার ভেতরের সৌন্দর্যটা তাকে দেখতে শেখায়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: দরজার সামনে রাখা জুতো।।।

শহরের এক পুরনো আবাসনের চারতলায় থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাক বিভাগের কর্মী শশাঙ্কবাবু। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একাই থাকতেন তিনি।

প্রতিদিন সকালে দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকানো ছিল তাঁর অভ্যাস।

একদিন সকালে দরজা খুলেই তিনি দেখলেন—দরজার সামনে একজোড়া ছোট্ট জুতো।

কালো স্কুলের জুতো। ধুলোয় মাখা।

শশাঙ্কবাবু চারপাশে তাকালেন। করিডোরে কেউ নেই।

জুতো দুটো তুলে দরজার পাশে রেখে দিলেন।

পরদিন আবার একই জায়গায় জুতো।

এবার জুতোর পাশে একটা ছোট কাগজ।

তাতে লেখা—

“কাকু, একটু রেখে দেবেন?”

শশাঙ্কবাবু অবাক হলেন।

পরপর কয়েকদিন একই ঘটনা ঘটতে লাগল।

প্রতিদিন সকালে নতুন কিছু—কখনও জুতো, কখনও স্কুলব্যাগ, কখনও ছাতা।

শশাঙ্কবাবু সবকিছু দরজার পাশে যত্ন করে রেখে দিতেন।

একদিন তিনি করিডোরে অপেক্ষা করলেন।

দুপুরের দিকে দশ-এগারো বছরের একটি ছেলে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল।

শশাঙ্কবাবুকে দেখে থমকে গেল।

—“তুমিই রাখো এগুলো?”

ছেলেটি মাথা নিচু করল।

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

ছেলেটি বলল, —“আমাদের ঘরটা ছোট। মা কাজ করতে যায়। আমি স্কুল থেকে ফিরে একটু এখানে বসি। কিন্তু কাউকে বিরক্ত করতে চাই না।”

শশাঙ্কবাবু বললেন, —“তোমার নাম কী?”

—“রাহুল।”

—“বাড়ি কোথায়?”

ছেলেটি নিচতলার একটি ঘরের দিকে দেখাল।

শশাঙ্কবাবু বুঝলেন, একই বাড়িতেই থাকে।

তিনি বললেন, —“জুতো দরজার সামনে রেখে যাওয়ার দরকার নেই। চাইলে আমার বারান্দায় বসে পড়াশোনা করতে পারো।”

রাহুল অবাক হয়ে তাকাল।

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত।”

—“কী?”

—“আমাকে পড়া শোনাতে হবে।”

সেদিন থেকে শশাঙ্কবাবুর একাকিত্ব একটু একটু করে কমতে লাগল।

রাহুল প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে তাঁর কাছে বসত।

শশাঙ্কবাবু অঙ্ক শেখাতেন, বাংলা পড়াতেন, পুরনো দিনের গল্প বলতেন।

কয়েক মাস পর রাহুলের পরীক্ষার ফল বেরোল।

সে ক্লাসে প্রথম হয়েছে।

খবরটা দিতে সে দৌড়ে শশাঙ্কবাবুর বাড়িতে এল।

কিন্তু দরজা বন্ধ।

রাহুল অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল।

পরদিন জানতে পারল, শশাঙ্কবাবুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সে মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে গেল।

শশাঙ্কবাবু দুর্বল গলায় বললেন,

—“রাহুল, এবার তো আমাকে পড়া শোনাতে হবে।”

রাহুল চোখ মুছে বলল, —“আমি প্রথম হয়েছি।”

শশাঙ্কবাবুর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

কয়েকদিন পর তিনি বাড়ি ফিরলেন।

দরজার সামনে এসে দেখলেন, সেখানে একটি জোড়া নতুন জুতো রাখা।

তার পাশে একটি কাগজ।

“এবার আপনার জন্য। আপনি অনেকদিন আমার জুতো পাহারা দিয়েছেন।”

শশাঙ্কবাবু জুতোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে বারান্দায় দুটি চেয়ার পাশাপাশি রাখলেন।

একটি নিজের জন্য।

আরেকটি রাহুলের জন্য।

সেদিন থেকে দরজার সামনে আর কোনও জুতো পড়ে থাকত না।

কারণ রাহুল বুঝে গিয়েছিল—

কিছু দরজা শুধু ঘরে ঢোকার জন্য নয়, কারও জীবনে জায়গা করে দেওয়ার জন্যও খোলা থাকে।

Share This