Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: খালি খাতার প্রথম পাতা।।।

শহরের পুরনো বইয়ের বাজারে একটি ছোট দোকান ছিল—“পাতা ও পেন্সিল”। দোকানটির মালিক ছিলেন নিরঞ্জনবাবু। বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলেও প্রতিদিন সকালেই তিনি দোকান খুলতেন।

একদিন দুপুরে দোকানে এল বারো বছরের একটি ছেলে। নাম অর্ণ।

ছেলেটি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা সুন্দর নীল মলাটের খাতা হাতে নিল।

নিরঞ্জনবাবু বললেন, —“নেবে?”

অর্ণ মাথা নিচু করে বলল, —“খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই।”

নিরঞ্জনবাবু খাতাটা তার হাতেই রেখে বললেন, —“টাকা না থাকলে কী হয়েছে? খাতা তো আর পালিয়ে যাবে না।”

অর্ণ অবাক হয়ে তাকাল।

—“সত্যি দেবেন?”

—“একটা শর্তে।”

—“কী শর্ত?”

—“প্রথম পাতাটা আজই ভরবে।”

অর্ণ খাতা নিয়ে চলে গেল।

পরদিন সে আবার এল।

খাতাটা খুলে প্রথম পাতায় লেখা—

“আমি বড় হয়ে এমন একটা কাজ করতে চাই, যাতে কেউ আমাকে চিনুক না চিনুক, আমার কাজটা মানুষকে সাহায্য করে।”

নিরঞ্জনবাবু লেখাটা পড়ে মৃদু হাসলেন।

—“বাহ! তারপর?”

অর্ণ বলল, —“আরও লিখব।”

সেই থেকে অর্ণ প্রায় প্রতিদিন দোকানে আসত। কখনও বই পড়ত, কখনও খাতায় লিখত। নিরঞ্জনবাবু তাকে পুরনো বই পড়তে দিতেন।

কয়েক বছর পর অর্ণ আর আসত না।

নিরঞ্জনবাবু ভেবেছিলেন, হয়তো পড়াশোনার চাপে ছেলেটা দূরে চলে গেছে।

সময় কেটে গেল।

এক বর্ষার সন্ধ্যায় দোকানের সামনে একটি গাড়ি এসে থামল।

একজন যুবক নেমে দোকানে ঢুকল।

—“নিরঞ্জন কাকু?”

নিরঞ্জনবাবু তাকিয়ে বললেন, —“কে?”

যুবক হেসে বলল, —“প্রথম পাতাটা মনে আছে?”

নিরঞ্জনবাবু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিনতে পারলেন।

—“অর্ণ!”

অর্ণ তাঁর সামনে একটি বড় বাক্স রাখল।

ভেতরে ছিল অনেকগুলো নতুন খাতা, পেন, বই।

—“এগুলো কী?”

—“আপনার দোকান থেকে আমি যে খাতা পেয়েছিলাম, তার ঋণ শোধ করতে এসেছি।”

নিরঞ্জনবাবু হেসে বললেন, —“একটা খাতার দাম শোধ করতে এত কিছু?”

অর্ণ মাথা নাড়ল।

—“খাতার দাম নয়, কাকু। বিশ্বাসের দাম।”

তারপর সে জানাল, এখন সে একটি স্কুলে পড়ায়। শহরের দরিদ্র শিশুদের জন্য সে একটি ছোট পাঠাগারও করেছে।

নিরঞ্জনবাবু চুপ করে শুনছিলেন।

অর্ণ বলল, —“আমার প্রথম খাতার প্রথম পাতায় একটা কথা লিখেছিলাম। সেটা ভুলিনি।”

—“কী লিখেছিলে?”

অর্ণ হেসে বলল, —“এমন কাজ করব, যাতে কাজটা মানুষকে সাহায্য করে।”

নিরঞ্জনবাবু ধীরে ধীরে তাক থেকে সেই পুরনো খাতাটা নামালেন।

শেষ পাতা পর্যন্ত লেখা হয়ে গেছে।

কিন্তু প্রথম পাতার নিচে অর্ণের বহু বছর আগের লেখার পাশে নিরঞ্জনবাবু ছোট করে একটি বাক্য লিখলেন—

“স্বপ্নের প্রথম পাতাটা কখনও ছোট হয় না।”

অর্ণ সেই বাক্যটি পড়ে খাতাটা বুকে চেপে ধরল।

দোকানের বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে।

আর ভেতরে, একটি পুরনো খাতার প্রথম পাতায় লেখা স্বপ্নটি অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: মাটির ঘোড়ার চোখ।।।

গ্রামের শেষ প্রান্তে কুমোরপাড়ায় থাকতেন হরিপদ পাল। তাঁর হাতের মাটির কাজ একসময় দূরদূরান্তে বিখ্যাত ছিল। এখন অবশ্য প্লাস্টিক আর কারখানায় তৈরি খেলনার দাপটে তাঁর দোকানে ক্রেতা খুব কম।

তবু প্রতিদিন ভোরে তিনি উঠতেন। পুকুরের পাড় থেকে নরম মাটি এনে বসতেন চাকার সামনে।

একদিন বিকেলে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল আট বছরের মেয়ে মিঠি।

তার হাতে ছিল কয়েকটা মুদ্রা।

—“কাকু, একটা মাটির ঘোড়া হবে?”

হরিপদ তাকিয়ে দেখলেন, টাকাটা খুবই কম।

—“এই টাকায় ছোট ঘোড়া হবে।”

মিঠি মাথা নাড়ল।

হরিপদ মাটি দিয়ে একটা ছোট ঘোড়া বানিয়ে তার হাতে দিলেন। কিন্তু মিঠি ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কাকু, এর চোখ নেই কেন?”

হরিপদ হেসে বললেন, —“চোখ তো আঁকা হয়নি।”

মিঠি বলল, —“চোখ না থাকলে ও কী করে আমাকে দেখবে?”

কথাটা শুনে হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর তিনি সূক্ষ্ম কাঠি দিয়ে ঘোড়াটার মুখে দুটো ছোট চোখ আঁকলেন।

মিঠি খুশি হয়ে চলে গেল।

পরদিন সে আবার এল।

তার হাতে ঘোড়াটা।

—“কাকু, ওর একটা পা ভেঙে গেছে।”

হরিপদ ঘোড়াটা নিয়ে যত্ন করে পা জুড়ে দিলেন।

—“এবার ঠিক আছে।”

মিঠি চলে যাওয়ার সময় বলল, —“আপনি জিনিস ঠিক করতে পারেন?”

হরিপদ বললেন, —“যতটা পারি।”

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“তাহলে আমার মাকেও একটু ঠিক করে দেবেন?”

হরিপদ অবাক।

মিঠি বলল, তার মা অনেকদিন ধরে অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। বাড়িতে টাকা নেই।

হরিপদ কিছু বললেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মিঠির বাড়িতে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন কিছু চাল, ওষুধ আর নিজের জমানো সামান্য টাকা।

মিঠির মা অবাক হয়ে বললেন, —“আপনি এত কিছু করছেন কেন?”

হরিপদ শুধু বললেন, —“আপনার মেয়েটা আমার একটা ঘোড়ার চোখ এঁকে দিয়েছে। তাই ভাবলাম, আমিও একটু চোখ খুলে দেখি।”

কয়েক মাস পর মিঠির মা সুস্থ হয়ে উঠলেন।

মিঠি স্কুলে পড়তে শুরু করল।

বছর কেটে গেল।

হরিপদের দোকান একদিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দিল না।

অনেক বছর পরে এক সকালে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ল এক তরুণী।

হাতে একটি মাটির ঘোড়া।

ঘোড়াটার দুটো চোখ খুব যত্ন করে আঁকা।

—“কাকু, চিনতে পারছেন?”

হরিপদ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললেন,

—“মিঠি?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

—“আমি এখন মৃৎশিল্প শেখাই। আপনার কাছ থেকেই শুরু করেছিলাম।”

হরিপদের চোখ ভিজে উঠল।

মিঠি ঘোড়াটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,

—“এটা আপনার জন্য। তবে একটা কথা মনে আছে?”

—“কী?”

—“আপনি বলেছিলেন, যতটা পারি জিনিস ঠিক করি।”

হরিপদ হেসে বললেন, —“হ্যাঁ।”

মিঠি উত্তর দিল,

—“আপনি শুধু একটা মাটির ঘোড়া ঠিক করেননি, কাকু। আপনি আমার পুরো জীবনটার দিকটাই বদলে দিয়েছিলেন।”

হরিপদ ঘোড়াটার চোখের দিকে তাকালেন।

সেদিন তিনি বুঝলেন—

কখনও কখনও আমরা কারও জীবনে কতটা আলো জ্বালিয়েছি, তা জানতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: পুরনো ক্যামেরার শেষ ছবি।।।

শহরের এক পুরনো গলির শেষ মাথায় ছোট্ট একটা ফটোস্টুডিও ছিল। নাম— “স্মৃতি ফটো”।

দোকানটা চালাতেন ষাটোর্ধ্ব অমলবাবু। আধুনিক মোবাইল ক্যামেরার যুগে তাঁর ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি প্রতিদিন সকালবেলা দোকানের শাটার তুলতেন, পুরনো ক্যামেরাগুলো পরিষ্কার করতেন আর দেওয়ালে ঝোলানো সাদা-কালো ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

একদিন দোকানে এল কলেজপড়ুয়া এক ছেলে। নাম ঋত্বিক।

সে বলল, —“কাকু, আপনার কাছে পুরনো ফিল্ম ক্যামেরা আছে?”

অমলবাবু একটু অবাক হয়ে তাকালেন।

—“আছে। কিন্তু ওগুলো এখন আর কেউ ব্যবহার করে না।”

—“আমি একটা প্রজেক্ট করছি। একটা ক্যামেরা দরকার।”

অমলবাবু কাঠের আলমারি খুলে একটা পুরনো ক্যামেরা বের করলেন। ক্যামেরাটার গায়ে ধুলো জমেছিল। কিন্তু লেন্সটা এখনও চকচক করছিল।

—“এটা নিয়ে যাও। তবে সাবধানে রেখো।”

ঋত্বিক ক্যামেরাটা নিয়ে চলে গেল।

দুদিন পর সে আবার এল।

তার হাতে ক্যামেরাটা।

—“কাকু, এর ভেতরে একটা ফিল্ম ছিল।”

অমলবাবু থমকে গেলেন।

তিনি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বললেন, —“আমি তো বহু বছর আগে ফিল্মটা বের করতে ভুলে গিয়েছিলাম!”

ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল, —“ডেভেলপ করা যাবে?”

অমলবাবু মৃদু হেসে বললেন, —“চেষ্টা করা যায়।”

পুরনো রাসায়নিক, অন্ধকার ঘর আর অনেক যত্নের পর ফিল্মটা তৈরি হল।

ছবিগুলো একে একে ফুটে উঠতে লাগল।

একটা নদীর ধারে কয়েকজন মানুষ।

একটা মেলার দৃশ্য।

একটি ছোট মেয়ে হাতে কাগজের ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আর শেষ ছবিটা দেখে অমলবাবুর হাত কেঁপে উঠল।

ছবিতে ছিলেন তাঁর বাবা।

বহু বছর আগের সেই মানুষটি, যাঁর সঙ্গে অমলবাবুর শেষ দেখা হয়েছিল রাগ করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দিন।

ছবির পেছনে ছোট্ট করে লেখা ছিল—

“ছেলেটা রাগ করে চলে গেল। তবু মনে হয়, একদিন ফিরে আসবে।”

অমলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

ঋত্বিক ধীরে বলল, —“কাকু, আপনি কি উনাকে খুব মিস করেন?”

অমলবাবু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, —“মানুষ চলে গেলে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকে না। কিন্তু কিছু ছবি থেকে যায়। তারা চুপ করে থেকেও অনেক কথা বলে।”

সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে অমলবাবু বাবার ছবিটা বড় করে ছাপালেন।

দোকানের সবচেয়ে সামনে সেটাই টাঙিয়ে দিলেন।

তার নিচে লিখলেন—

“কিছু ছবি অতীত দেখায় না, ফিরে যাওয়ার পথ দেখায়।”

পরদিন সকালে ঋত্বিক দোকানে এসে দেখল, অমলবাবু তাঁর পুরনো ক্যামেরাগুলো আবার সাজিয়ে রাখছেন।

—“আবার ব্যবসা শুরু করবেন?”

অমলবাবু হেসে বললেন,

—“না। মানুষকে ছবি তুলতে শেখাব। তবে শুধু মুখের ছবি নয়—যে মুহূর্তগুলো পরে মনে পড়বে, সেগুলো ধরে রাখতে।”

ঋত্বিক বুঝতে পারল, পুরনো ক্যামেরাটা আসলে শুধু একটা ছবি ফিরিয়ে দেয়নি।

একজন মানুষকে তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা — কৃষ্ণচূড়ার নিচে।।।।

কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো
ঝরে পড়ে পথে,
গ্রীষ্ম যেন রঙিন হয়ে
হাসে আপন মতে।

গাছের নিচে বসে থাকে
একটি নীরব দুপুর,
হাওয়া এসে পাতার ফাঁকে
গায় অচেনা সুর।

লাল পাপড়ির বিছানাতে
শৈশব ফিরে আসে,
কত বিকেল বন্ধুদের সঙ্গে
হাসি ছিল পাশে।

কেউ বলেছিল—“বড় হলে
সবকিছু বদলে যাবে,”
সত্যিই আজ সেই পথগুলো
অচেনা হয়ে রবে।

তবু কৃষ্ণচূড়া ফুটলে মনে
পুরনো দিন জাগে,
হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো সব
ফিরে আসে অনুরাগে।

সময় নদীর মতো বয়ে
নিয়ে গেছে কত,
তবু কিছু স্মৃতি হৃদয়জুড়ে
থাকে অক্ষয় যত।

একদিন আমরাও হয়তো
হয়ে যাব স্মৃতি,
কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ির মতো
ঝরে যাবে পরিচিতি।

তবু কোনো এক বসন্ত দিনে
কেউ যদি পথ দিয়ে যায়,
লাল ফুলের নিচে দাঁড়িয়ে
হয়তো আমাদের মনে পড়ে যায়।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা  — জোনাকির আলো।।

গভীর রাতে মাঠের ধারে
জ্বলে ছোট্ট আলো,
জোনাকিরা অন্ধকারে
লিখছে কত ভালো।

চাঁদ নেই আজ আকাশজুড়ে,
তারাও যেন দূর,
তবু তারা হার মানেনি,
জ্বালছে আলোর সুর।

একটি জোনাকি উড়ে এসে
বসে আমার হাতে,
মনে হলো—আশা বুঝি
থাকে ক্ষুদ্র প্রভাতে।

বড় আলো সবসময় যে
পথ দেখাবে, তা নয়,
কখনও ছোট্ট প্রদীপটুকুই
ভয়ের অন্ধকার ক্ষয়।

জীবন যখন কালো মেঘে
ঢেকে ফেলে মন,
একটি ছোট্ট আশার আলো
বদলে দিতে পারে ক্ষণ।

তাই অন্ধকারকে ভয় কোরো না,
জ্বেলে রেখো প্রাণ,
তোমার ভেতর লুকিয়ে আছে
নিজের সূর্য-জ্ঞান।

জোনাকিরা শেখায় শুধু—
আলো হতে বড় কিছু লাগে না,
একটু সাহস থাকলেই মানুষ
অন্ধকারে হারায় না।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা — একটি চিঠি নিজের কাছে।।।

প্রিয় আমি, কেমন আছো?
অনেকদিন কথা হয় না,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখা
কষ্টগুলো দেখা হয় না।

সবাইকে তুমি সময় দাও,
নিজের জন্য কতটুকু?
অন্যের চোখের জল মুছতে গিয়ে
ভুলে যাও নিজের দুঃখটুকু।

মনে রেখো, সব পথ সোজা
হয় না কোনোদিন,
কিছু ভুলও শেখায় মানুষকে
নতুন করে প্রতিদিন।

যারা চলে গেছে জীবন থেকে,
তাদের পেছনে থেকো না,
বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেকে আর রেখো না।

যে স্বপ্নগুলো ভয়ে থেমেছে,
আবার তাদের ডাকো,
হেরে গিয়েও মাথা তুলে
নিজের হাতটা রাখো।

সব উত্তর আজই পেতে হবে—
এমন কোনো কথা নেই,
ধীরে ধীরে জীবন বুঝবে,
তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই।

আর যদি কোনোদিন মনে হয়
তুমি একেবারে একা,
আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে বলো—
“আমি আছি, এটাই তো দেখা।”

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা — মাটির গন্ধ।।।

প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে
শুকনো মাটির বুকে,
মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে
চারদিকের সুখে।

কৃষকের চোখে স্বপ্ন জাগে,
সবুজ হবে মাঠ,
বীজের ভেতর লুকিয়ে থাকে
আগামীরই ভাত।

কাদামাখা সেই পথ ধরে
শিশুরা ছুটে যায়,
বৃষ্টির জলে কাগজ নৌকা
স্বপ্ন হয়ে ভাসায়।

গাছের পাতায় জলের মুক্তো,
পুকুর ভরে ওঠে,
ব্যাঙের ডাকে সন্ধ্যা নামে
গ্রামের নরম ঠোঁটে।

শহরের ব্যস্ত জানালাতেও
বৃষ্টি এসে বলে—
“ফিরে চলো সেই মাটির কাছে,
যেখানে মনটা চলে।”

মাটির গন্ধ মনে করায়
আমরা মাটিরই মানুষ,
অহংকারের উঁচু প্রাসাদ
একদিন হবে নিঃশব্দ।

তাই যত দূরেই যাই না কেন,
যতই বদলাক দিন,
মাটির টানে ফিরে আসে
মানুষের আপন ঋণ।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা — বইয়ের পাতায় পৃথিবী।

পুরনো বই খুলে বসি,
পাতায় পাতায় দেশ,
শব্দগুলো হাত ধরে আজ
নিয়ে যায় অবশেষ।

কখনও দেখি পাহাড় চূড়া,
কখনও গভীর সাগর,
কখনও আবার অচেনা শহর
ডাকে আপন করে।

একটি পাতায় ইতিহাস,
অন্য পাতায় গান,
কোথাও লেখা মানুষের কথা,
কোথাও অভিমান।

বই তো শুধু কাগজ নয়,
একটি খোলা দ্বার,
তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে
হাজার জীবনের ভার।

ক্লান্ত দিনে বইয়ের কাছে
ফিরে আসে মন,
নিঃশব্দ ঘরে শব্দ হয়ে
জেগে ওঠে জীবন।

যে মানুষ বইকে ভালোবাসে,
সে একা থাকে না,
হাজার চরিত্র পাশে এসে
নিঃসঙ্গতা রাখে না।

তাই বইয়ের পাতায় রাখো
স্বপ্নের কিছু বীজ,
একদিন সেখান থেকেই হয়তো
ফুটবে নতুন দিগন্তের রঙিন বীথি।

Share This
Categories
গল্প

সেলাই মেশিনের শব্দ।

মধুবন গ্রামের বাজারের শেষ মাথায় একটা ছোট্ট দোকান ছিল।

দোকানের সামনে টিনের চাল।

ভেতরে কাঠের একটা টেবিল।

আর টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো কালো রঙের সেলাই মেশিন।

সকাল হলেই দোকান থেকে ভেসে আসত—

ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…

সেলাই মেশিনের শব্দ।

দোকানের মালিক ছিলেন কমলা দেবী।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।

স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের হাতে সেলাই শিখে তিনি এই দোকানটি দাঁড় করিয়েছিলেন।

প্রথম দিকে গ্রামের মানুষ তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত।

কেউ বলত,

—“মহিলা হয়ে দোকান চালাবে?”

কেউ বলত,

—“এতে আবার সংসার চলে নাকি?”

কমলা কোনো উত্তর দিতেন না।

দিনের পর দিন কাপড় সেলাই করতেন।

ব্লাউজ।

পেটিকোট।

স্কুলের পোশাক।

শিশুদের জামা।

ধীরে ধীরে তাঁর দোকানের পরিচিতি বাড়তে লাগল।

তবে কমলার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল তাঁর মেয়ে রিনাকে পড়াশোনা করানো।

রিনা তখন কলেজে পড়ে।

সে মায়ের দোকানে বসতে চাইত না।

একদিন বলল,

—“মা, আমি অন্য কাজ করতে চাই।”

কমলা হেসে বললেন,

—“তুই যা করতে ভালোবাসিস, সেটাই কর।”

রিনা বলল,

—“তুমি কি আমার জন্য এত কষ্ট করছ?”

কমলা সেলাই করতে করতে বললেন,

—“মা হওয়ার কষ্টের হিসাব রাখা হয় না।”

একদিন গ্রামের স্কুল থেকে বড় অর্ডার এল।

প্রায় দুশোটি স্কুল ইউনিফর্ম।

কাজটা কমলার একার পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন।

সেই সময় রিনা বলল,

—“আমি সাহায্য করব।”

কমলা অবাক হয়ে তাকালেন।

—“তুই তো বলেছিলি এই কাজ পছন্দ করিস না।”

রিনা বলল,

—“কাজটা পছন্দ করি না বলিনি। শুধু ভাবতাম, এটা আমার ভবিষ্যৎ নয়।”

—“এখন?”

রিনা মেশিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“এখন বুঝছি, ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কাজের ধরন নয়, কাজের প্রতি মনটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

সেদিন থেকে মা-মেয়ে একসঙ্গে কাজ শুরু করল।

রিনা মাপ নিত।

কমলা কাটিং করতেন।

তারপর দুজনে মিলে সেলাই।

দিনের পর দিন।

সকাল থেকে রাত।

অর্ডার সময়মতো তৈরি হল।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক এসে বললেন,

—“কমলাদেবী, আপনারা অসাধারণ কাজ করেছেন।”

কমলা বললেন,

—“আমরা শুধু আমাদের কাজ করেছি।”

কিন্তু সেই অর্ডারের পর গ্রামের আরও কয়েকজন মহিলা কমলার কাছে এলেন।

তাঁরা বললেন,

—“আমরাও সেলাই শিখতে চাই।”

কমলা বললেন,

—“শিখবে?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে কাল থেকে এসো।”

পরদিন এলেন তিনজন।

তারপর পাঁচজন।

তারপর দশজন।

কমলার দোকানের পাশে একটা ছোট ঘর ভাড়া নেওয়া হল।

সেখানে শুরু হল সেলাই শেখানোর ক্লাস।

কেউ আগে কখনও মেশিন ধরেনি।

কেউ সূচে সুতো পরাতেও পারত না।

কমলা ধৈর্য ধরে শেখাতে লাগলেন।

তিনি বলতেন,

—“সেলাই শুধু কাপড় জোড়ে না। মানুষের আত্মবিশ্বাসও জোড়ে।”

মহিলারা ধীরে ধীরে কাজ শিখতে লাগলেন।

কেউ নিজের জন্য পোশাক বানালেন।

কেউ প্রতিবেশীর অর্ডার নিলেন।

কেউ বাড়িতে বসে কাজ শুরু করলেন।

কয়েক মাসের মধ্যে মধুবন গ্রামের দশটি পরিবারে অতিরিক্ত আয় শুরু হল।

গ্রামের মানুষ এবার কমলার দোকানকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল।

একদিন সেই লোকটিই, যে প্রথম দিকে বলেছিল “মহিলা হয়ে দোকান চালাবে?”, সে এসে বলল,

—“কমলাদেবী, আমার মেয়ের বিয়ের পোশাকটা আপনারাই বানাবেন।”

কমলা হেসে বললেন,

—“অবশ্যই।”

রিনা মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

কিন্তু কিছুদিন পর কমলার পুরোনো সেলাই মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেল।

মেশিনটা ছিল তাঁর জীবনের সঙ্গী।

মেরামত করতে অনেক টাকা লাগবে।

কমলা বললেন,

—“নতুন মেশিন কিনতে পারব না।”

রিনা বলল,

—“আমি কিনব।”

কমলা অবাক।

—“তুই?”

রিনা বলল,

—“আমি একটা কাজ পেয়েছি।”

সে শহরের একটি পোশাক সংস্থায় ডিজাইনের কাজ শুরু করেছে।

প্রথম মাসের বেতন দিয়ে সে মায়ের জন্য একটি নতুন সেলাই মেশিন কিনল।

মেশিনটি দোকানে এনে রাখার পর কমলা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তুই আমার মেশিন কিনলি?”

রিনা হেসে বলল,

—“না মা। তুমি যে স্বপ্নটা আমাকে দিয়ে বড় করেছ, তার জন্য একটা মেশিন কিনলাম।”

কমলার চোখে জল এসে গেল।

তিনি পুরোনো মেশিনটার ওপর হাত রাখলেন।

বললেন,

—“এটা ফেলে দিস না।”

—“কেন?”

—“এটার শব্দে তোর শৈশব আছে।”

রিনা পুরোনো মেশিনটি যত্ন করে দোকানের এক কোণে রেখে দিল।

নতুন মেশিনে কাজ শুরু হল।

কাজ বাড়তে লাগল।

কমলা আর রিনা মিলে গ্রামের মহিলাদের নিয়ে ছোট একটি পোশাক তৈরির দল গড়ে তুলল।

তাদের তৈরি জামাকাপড় শহরের দোকানেও যেতে শুরু করল।

একদিন রিনা মাকে বলল,

—“আমরা কি আমাদের কাজের একটা নাম দিতে পারি?”

কমলা বললেন,

—“দে।”

রিনা নাম রাখল—

“সেলাইয়ে স্বপ্ন”।

দোকানের সামনে নতুন বোর্ড লাগল।

তার নিচে ছোট করে লেখা—

“নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ।”

বছর কয়েক পর মধুবন গ্রামের চেহারা বদলে গেল।

অনেক মেয়ে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই শিখছে।

অনেক মহিলা বাড়িতে বসেই কাজ করছেন।

কেউ সংসারের খরচে সাহায্য করছেন।

কেউ নিজের সন্তানকে পড়াচ্ছেন।

আর কমলা?

তিনি এখনও প্রতিদিন দোকানে বসেন।

তবে এখন আর একা নন।

চারপাশে দশ-পনেরোজন মহিলা কাজ করেন।

একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে রিনা পুরোনো মেশিনটার কাছে গেল।

মেশিনটি বহুদিন ব্যবহার হয়নি।

সে হাত দিয়ে মেশিনটির ওপর জমে থাকা ধুলো মুছে দিল।

কমলা বললেন,

—“কী করছিস?”

রিনা বলল,

—“একবার চালাব।”

সে পুরোনো মেশিনে সুতো লাগাল।

পা দিয়ে প্যাডেল চাপল।

ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…

পুরোনো শব্দটা আবার দোকানের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।

কমলা চুপ করে শুনলেন।

তার চোখে জল।

রিনা বলল,

—“মা, শব্দটা এখনও বদলায়নি।”

কমলা মৃদু হেসে বললেন,

—“শব্দ বদলায়নি। শুধু তার গল্পটা বড় হয়েছে।”

বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো।

দোকানের দরজার সামনে নতুন প্রজন্মের কয়েকজন মেয়ে দাঁড়িয়ে।

তারা আগামী দিনের সেলাই শিখতে এসেছে।

কমলা তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“চলো, আজ থেকে তোমাদেরও একটা স্বপ্ন সেলাই করতে শেখাই।”

মেয়েরা হেসে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

আর দোকানের ভেতর আবার শোনা গেল—

ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…

সেই শব্দ যেন বলছিল—

সুঁইয়ের ছোট্ট ফোঁড়ে যেমন কাপড় জোড়া লাগে, তেমনই ছোট ছোট চেষ্টায় একদিন মানুষের জীবনও জোড়া লাগে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

মাঠের শেষ দৌড়।।

গোপালপুর গ্রামের স্কুলের পেছনে একটা বড় মাঠ ছিল।

মাঠটার চারপাশে কোনো পাঁচিল নেই।

একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে কাঁঠালগাছের সারি। বর্ষায় মাঠের অর্ধেকটা জলে ভরে যেত, শীতে শুকিয়ে ফেটে যেত মাটি।

তবু গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে এই মাঠটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।

সেখানেই প্রতিদিন বিকেলে দৌড়াত মেঘলা।

মেঘলার বয়স ষোলো।

বাবা দিনমজুর।

মা অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন।

সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু মেঘলার চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্বপ্ন।

সে দৌড়াতে চাইত।

শুধু গ্রামের মাঠে নয়।

জেলা পর্যায়ে।

তারপর রাজ্য পর্যায়ে।

একদিন বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইত।

কিন্তু গ্রামের অনেকেই হাসত।

কেউ বলত,

—“মেয়েমানুষ আবার দৌড় প্রতিযোগিতা করবে?”

কেউ বলত,

—“এসব করে পেট চলে?”

মেঘলা কোনো উত্তর দিত না।

প্রতিদিন ভোরে উঠে মাঠে যেত।

জুতো ছিল না।

খালি পায়েই দৌড়াত।

তার স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক অরুণবাবু একদিন বললেন,

—“তুই খালি পায়ে এত দৌড়াস কেন?”

মেঘলা বলল,

—“জুতো নেই স্যার।”

অরুণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

পরদিন তিনি নিজের পুরোনো স্পোর্টস জুতো নিয়ে এলেন।

বললেন,

—“এগুলো আমার ছেলে ব্যবহার করত। এখন ছোট হয়ে গেছে। তুই পর।”

মেঘলা জুতো দুটো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে জল।

—“স্যার, আমি এটা নষ্ট করব না।”

অরুণবাবু হেসে বললেন,

—“দৌড়ে নষ্ট করবি। সেটাই চাই।”

সেদিন থেকে মেঘলার দৌড় আরও দ্রুত হল।

কিন্তু একদিন বিপদ এল।

বাবা কাজে গিয়ে পায়ে চোট পেলেন।

কয়েক সপ্তাহ কাজ করতে পারবেন না।

সংসারে টাকা নেই।

মেঘলা স্কুল থেকে ফিরে মায়ের পাশে বসে বলল,

—“মা, আমি কি কিছু কাজ করতে পারি?”

মা বললেন,

—“তুই পড়াশোনা কর। তোর বাবার কষ্ট যেন তোর পড়া বন্ধ না করে।”

মেঘলা বলল,

—“কিন্তু সংসার?”

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“তুই দৌড়। তোর দৌড় যদি একদিন আমাদের এই কষ্টের বাইরে নিয়ে যায়, তাহলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় সাহায্য।”

মেঘলা সেদিন আরও জোরে দৌড়াল।

তারপর এল জেলার প্রতিযোগিতার খবর।

মেয়েদের ৮০০ মিটার দৌড়।

প্রথম হলে রাজ্য পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ।

মেঘলা নাম দিল।

কিন্তু যাওয়ার জন্য ভাড়া লাগবে।

বাবার কাছে টাকা নেই।

মেঘলা সিদ্ধান্ত নিল, সে যাবে না।

অরুণবাবু খবর পেয়ে বললেন,

—“কেন যাবি না?”

—“টাকা নেই স্যার।”

—“টাকার জন্য দৌড় থামাবি?”

মেঘলা চুপ।

পরদিন স্কুলের শিক্ষকরা মিলে টাকা জোগাড় করলেন।

কেউ একশো টাকা দিলেন।

কেউ পঞ্চাশ।

কেউ বাসভাড়া দিলেন।

অরুণবাবু বললেন,

—“তুই শুধু দৌড়টা ভালো করে দে।”

প্রতিযোগিতার দিন মেঘলা মাঠে দাঁড়িয়ে দেখল, অন্য মেয়েদের পায়ে দামি জুতো।

তাদের সঙ্গে কোচ আছে।

কারও হাতে পানীয়ের বোতল।

মেঘলার সঙ্গে শুধু অরুণবাবু।

তিনি বললেন,

—“ওদের দিকে তাকাস না। নিজের লাইনের দিকে তাকিয়ে থাক।”

বাঁশি বাজল।

দৌড় শুরু।

প্রথম একশো মিটার মেঘলা মাঝামাঝি ছিল।

দুশো মিটার পর কয়েকজন সামনে চলে গেল।

অরুণবাবু দূর থেকে চিৎকার করলেন,

—“ছন্দ ঠিক রাখ!”

মেঘলা শুনল।

তিনশো মিটার।

চারশো।

পাঁচশো।

তার পা ভারী হয়ে আসছে।

ফুসফুস জ্বলছে।

তবু সে দৌড়াচ্ছে।

শেষ একশো মিটার।

একজন প্রতিযোগী সামনে।

আরেকজন তার পাশে।

মেঘলা মনে মনে বলল,

“মা বল

Share This