Categories
গল্প

গল্প : মধ্যরাতের লিফট।।

রাত তখন ১২টা ৪৫।

অফিসের শেষ কর্মী হিসেবে নীহারিকা সতেরো তলা থেকে লিফটে উঠল। পুরো বিল্ডিং প্রায় ফাঁকা। নিচের নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া আর কাউকে সে দেখতে পাচ্ছিল না।

লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক দৌড়ে এসে ভেতরে ঢুকলেন।

— একটু দাঁড়াবেন মা?

নীহারিকা দরজা আটকে দিল।

বৃদ্ধ লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,

— নিচতলা।

লিফট নামতে শুরু করল।

দুই তলা…

এক তলা…

হঠাৎ লিফট থেমে গেল।

আলো নিভে গেল।

নীহারিকা আতঙ্কিত হয়ে বলল,

— কী হলো?

বৃদ্ধ লোকটি শান্ত গলায় বললেন,

— ভয় পাবেন না।

কয়েক সেকেন্ড পর জরুরি আলো জ্বলে উঠল।

নীহারিকা ইন্টারকম চাপল।

কোনো উত্তর নেই।

বৃদ্ধ লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো ঘড়ি বের করে দেখলেন।

— আর দশ মিনিট।

— কীসের দশ মিনিট?

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।

নীহারিকা আবার ইন্টারকম চাপল।

এবার ওপাশ থেকে নিরাপত্তারক্ষীর কণ্ঠ ভেসে এল,

— ম্যাডাম, লিফটটা মাঝপথে আটকে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার আসছে।

নীহারিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু হঠাৎ বৃদ্ধ লোকটি বললেন,

— আপনি কি জানেন, এই লিফটে আগে একজন মারা গিয়েছিল?

নীহারিকার মুখ শুকিয়ে গেল।

— কী বলছেন?

— প্রায় কুড়ি বছর আগে। রাতের শিফটের একজন কর্মচারী। লিফটের দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়ায় সে নিচে পড়ে যায়।

— আপনি সেটা জানেন কীভাবে?

বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— কারণ সেদিন আমি তার সঙ্গে ছিলাম।

নীহারিকা চুপ করে গেল।

তারপর বৃদ্ধ বললেন,

— তার নাম ছিল নীলয়।

লিফটের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইল।

নীহারিকা নিজের হাত জড়িয়ে ধরল।

— আপনি কি নীলয়কে চিনতেন?

— খুব ভালোভাবে।

— তাহলে আপনি…?

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

— আমি তার বাবা।

ঠিক তখন লিফটের আলো আবার নিভে গেল।

অন্ধকারে বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল,

— আজ তার মৃত্যুর কুড়ি বছর পূর্ণ হলো।

নীহারিকা আতঙ্কে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।

হঠাৎ লিফটের ভেতর থেকে আরেকটি শব্দ ভেসে এল।

টুপ…

টুপ…

যেন কারও জুতোর শব্দ।

কিন্তু সেখানে তো দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই!

নীহারিকা কাঁপা গলায় বলল,

— আপনি শুনছেন?

বৃদ্ধ বললেন,

— হ্যাঁ।

শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল।

তারপর লিফটের মেঝেতে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র পড়ে গেল।

নীহারিকা টর্চ জ্বালিয়ে দেখল—

“নীলয় দত্ত — রাত্রিকালীন কর্মী।”

কার্ডটির তারিখ কুড়ি বছর আগের।

বৃদ্ধ সেটি হাতে তুলে নিলেন।

তার চোখে জল।

— আমি প্রতিটি বছর এই দিনে এখানে আসি। কিন্তু আজ প্রথমবার লিফটে আটকে গেলাম।

হঠাৎ ইন্টারকম বেজে উঠল।

নিরাপত্তারক্ষী বললেন,

— লিফট ঠিক হয়ে গেছে। দরজা খুলছে।

দরজা খুলতেই নিচে কেউ ছিল না।

শুধু নিরাপত্তারক্ষী দৌড়ে এসে বলল,

— ম্যাডাম, আপনি একাই ছিলেন?

নীহারিকা অবাক হয়ে বলল,

— না! এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক…

সে পিছনে তাকাল।

লিফটের ভেতর কেউ নেই।

শুধু মেঝেতে পড়ে আছে সেই পুরোনো পরিচয়পত্র।

নীহারিকার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে নিরাপত্তারক্ষীকে সব বলল।

লোকটি পরিচয়পত্র দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।

— এটা নীলয় দত্তের।

— আপনি তাকে চিনতেন?

— আমার বাবা তাকে চিনতেন। শুনেছি, নীলয়বাবুর বাবা প্রতি বছর এই দিনে এখানে আসতেন।

নীহারিকা চারদিকে তাকাল।

— উনি কোথায় গেলেন?

নিরাপত্তারক্ষী ধীরে বলল,

— ম্যাডাম… নীলয়বাবুর বাবা তো বারো বছর আগেই মারা গেছেন।

নীহারিকা কোনো কথা বলতে পারল না।

পরদিন সকালে বিল্ডিংয়ের পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে গিয়ে সে একটি ছবি পেল।

ছবিতে তরুণ নীলয় দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার পাশে।

ছবির পেছনে লেখা—

“ছেলের সঙ্গে শেষ রাতের ডিউটি।”

নীহারিকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝল, আগের রাতের বৃদ্ধটি হয়তো সত্যিই এসেছিলেন।

ছেলেকে শেষবার দেখতে।

কুড়ি বছর আগে যে লিফট তাকে ছেলের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই লিফটেই ফিরে এসে তিনি যেন নিজের অপেক্ষাটুকু শেষ করেছিলেন।

সেদিন থেকে নীহারিকা আর কখনো মধ্যরাতে লিফটে একা ওঠেনি।

তবে বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তারক্ষীরা এখনও বলে—

কুড়ি বছর ধরে বন্ধ থাকা পুরোনো লিফটটি মাঝরাতে কখনো কখনো নিজে থেকেই এক তলায় থামে।

দরজা খুলে যায়।

ভেতরে কেউ থাকে না।

শুধু মেঝেতে পড়ে থাকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র।

নীলয় দত্ত।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : শেষ ছবিটার মানুষটি।

শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি ফটোগ্রাফির দোকান ছিল—‘আলোকচিত্র’। দোকানটির মালিক অর্ক। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ছোটবেলা থেকেই ছবি তুলতে ভালোবাসত সে। মানুষের মুখ, রাস্তার দৃশ্য, উৎসব, বৃষ্টি—সবকিছুর মধ্যেই সে গল্প খুঁজে পেত।

এক বর্ষার বিকেলে দোকানে বসে পুরোনো ক্যামেরার মেমোরি কার্ড গোছাচ্ছিল অর্ক। হঠাৎ একটি পুরোনো ফোল্ডার চোখে পড়ল।

ফোল্ডারের নাম—‘২০১২’।

অর্ক অবাক হল। সে তো ২০১২ সালে স্কুলে পড়ত। তখন নিজের ক্যামেরা ছিল না। ছবিগুলো এল কোথা থেকে?

ফোল্ডার খুলতেই একের পর এক ছবি সামনে আসতে লাগল।

বাজার। নদীর ঘাট। স্কুলের মাঠ। পুজোর ভিড়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।

সবশেষে একটি ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি ছোট ছেলে ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে লাল রঙের খেলনা গাড়ি।

অর্ক ছবিটা বড় করে দেখল।

ছেলেটির মুখ অদ্ভুতভাবে পরিচিত।

তারপরই বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা লাগল।

ছেলেটি আসলে অর্ক নিজেই।

কিন্তু ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কে?

একজন যুবক। হাতে ক্যামেরা। মুখে হালকা হাসি।

অর্ক কাউকে চিনতে পারল না।

ছবির তারিখ—১৭ জুলাই ২০১২।

অর্কের মনে পড়ল, সেই দিনটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত দিনগুলোর একটি। ছোটবেলায় সে মেলার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর এক অচেনা মানুষ তাকে পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

কিন্তু সেই মানুষটির মুখ সে কোনোদিন মনে করতে পারেনি।

অর্ক ছবিটা নিয়ে বাড়ি গেল।

রাতে মাকে ছবিটি দেখাতেই মা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“এই ছবিটা কোথায় পেলি?”

“আমার দোকানের পুরোনো মেমোরি কার্ডে।”

মা ছবির পেছনের মানুষটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“লোকটাকে আমি দেখেছি।”

অর্ক চমকে উঠল।

“কোথায়?”

“সেই দিন। তোর হারিয়ে যাওয়ার পর সবাই যখন তোকে খুঁজছিল, এই লোকটাই প্রথম এসে বলেছিল—একটা ছেলে নদীর দিকের মেলার কাছে একা দাঁড়িয়ে আছে।”

অর্ক স্তব্ধ।

“তাহলে উনি কে?”

মা মাথা নাড়লেন।

“জানি না। তুই ফিরে আসার পর অনেকবার খুঁজেছি। আর পাইনি।”

পরদিন অর্ক ছবিটি নিয়ে পুরোনো মেলার মাঠে গেল। এখন সেখানে বহুতল বাড়ি তৈরি হয়েছে। তবে পাশেই একটি ছোট চায়ের দোকান এখনও আছে।

দোকানের বৃদ্ধ মালিক অর্কের হাতে ছবি দেখে বললেন,

“এই লোকটাকে আমি চিনি।”

“নাম জানেন?”

“সুব্রত। ছবি তুলত। খুব ভালো মানুষ ছিল।”

“এখন কোথায়?”

বৃদ্ধের মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।

“অনেক বছর হলো নেই।”

অর্ক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

“কী হয়েছিল?”

“একদিন পাহাড়ে ছবি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা হয়েছিল।”

অর্ক ছবির দিকে তাকাল।

সুব্রতর ক্যামেরাটি ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

“ওঁর কোনো পরিবার ছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

“একজন ছোট ভাই ছিল। নাম অনিক। শহরের বাইরে থাকে।”

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অর্ক অনিকের সন্ধান পেল।

অনিক প্রথমে দেখা করতে চাইছিল না। কিন্তু অর্ক ছবিটি দেখানোর পর তার চোখে জল চলে এল।

“দাদা এই ছবিটা তুলেছিল?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনি জানেন না, দাদা কেন ছবি তুলত?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

অনিক বলল,

“দাদা বলত, মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে যেগুলো মানুষ ভুলে যায়। ছবি সেই মুহূর্তগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে।”

তারপর অনিক একটি পুরোনো ক্যামেরা অর্কের হাতে দিল।

“দাদা মারা যাওয়ার আগে এটা আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, একদিন এমন কাউকে খুঁজে বের করতে, যার একটা ছবি তার কাছে রয়ে গেছে।”

অর্ক অবাক হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রইল।

“মানে?”

“দাদা জানত না তুমি কে। কিন্তু সেই দিন তোমার ছবি তোলার পর সে বলেছিল—এই ছেলেটার পরিবার নিশ্চয়ই ওকে খুঁজছে।”

অর্কের চোখ ভিজে গেল।

একজন অচেনা মানুষ শুধু তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেয়নি, তার একটি ছবি তুলে সেই মুহূর্তটাকেও ধরে রেখেছিল।

অনিক আরও একটি কথা বলল।

“দাদার ক্যামেরায় একটা শেষ ছবি ছিল। আমরা কখনও খুলিনি।”

অর্ক ক্যামেরাটি নিয়ে কম্পিউটারে সংযোগ করল।

একটি মাত্র ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—ছোট্ট অর্ক মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরছে। দূরে দাঁড়িয়ে সুব্রত ক্যামেরা হাতে তাকিয়ে আছে।

ছবির নিচে একটি ছোট লেখা ছিল—

“যাকে তার মানুষদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, তার মুখটাই আজ আমার সবচেয়ে সুন্দর ছবি।”

অর্ক অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না।

কয়েকদিন পর সে নিজের দোকানের দেওয়ালে ছবিটি বাঁধিয়ে রাখল।

নিচে লিখল—

“সুব্রত—একজন অচেনা মানুষ, যিনি একদিন একটি শিশুকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।”

তারপর থেকে অর্কের দোকানে একটি নিয়ম চালু হল।

কোনো দরিদ্র মানুষ ছবি তুলতে এলে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে না।

কারণ অর্ক বুঝেছিল—

কিছু ছবি শুধু মুখ ধরে রাখে না।

কিছু ছবি একজন মানুষের ভালোবাসা, দায়িত্ব আর অচেনা মানবিকতার ইতিহাস ধরে রাখে।

আর কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য।

তারপর তিনি চলে যান।

কিন্তু রেখে যান এমন একটি মুহূর্ত, যা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : গ্রামের নাম শালবেড়িয়া।

গ্রামের নাম শালবেড়িয়া। একসময় গ্রামটির চারপাশে ছিল ধানখেত, তালগাছ আর বড় বড় পুকুর। এখন অনেক কিছু বদলে গেছে। তবে গ্রামের মাঝখানে একটি জিনিস এখনও আগের মতোই আছে—একটি পুরোনো শুকনো কুয়ো।

কুয়োটির চারপাশে ইটের পাঁচিল। বহু বছর ধরে কেউ সেখানে যায় না।

গ্রামের লোকেরা বলে, মাঝরাতে সেই কুয়োর ভেতর থেকে গান শোনা যায়।

কেউ বলে, সেটা মৃত মানুষের গলা।

কেউ বলে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক মেয়ের আত্মা গান গায়।

তবে এসব কথায় বিশ্বাস করত না অয়ন।

শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে সে ঠিক করল, বিষয়টির সত্যতা নিজেই দেখবে।

এক রাতে মোবাইলের টর্চ আর একটি ছোট রেকর্ডার নিয়ে সে কুয়োর কাছে পৌঁছল।

রাত তখন প্রায় একটা।

চারপাশে নিস্তব্ধতা।

দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

অয়ন কুয়োর পাশে বসে রেকর্ডার চালু করল।

প্রথম আধঘণ্টায় কিছুই ঘটল না।

তারপর হঠাৎ—

খুব নিচু স্বরে একটি গান ভেসে এল।

“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি…”

অয়নের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

গানটি যেন কুয়োর গভীর থেকে আসছে।

সে সাহস করে কুয়োর মুখের দিকে ঝুঁকল।

গানটি আবার শোনা গেল।

এবার একটু স্পষ্ট।

অয়ন তাড়াতাড়ি রেকর্ডার বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এল।

পরদিন সকালে রেকর্ডিংটি গ্রামের বৃদ্ধ শিক্ষক হরিপদবাবুকে শোনাল।

তিনি গান শুনে চুপ করে গেলেন।

“এই গানটা কে গাইত জানেন?”

“কে?”

“মালতী।”

অয়ন নামটি আগে শোনেনি।

হরিপদবাবু বললেন,

“প্রায় চল্লিশ বছর আগে এই গ্রামে মালতী নামে একটি মেয়ে ছিল। খুব ভালো গান গাইত। বিশেষ করে ছোটদের ঘুম পাড়ানোর গান।”

“তারপর?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এক বর্ষার রাতে সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”

“কীভাবে?”

“কেউ জানে না।”

অয়ন কুয়োর দিকে তাকাল।

“তাহলে সবাই ধরে নিল সে মারা গেছে?”

“হ্যাঁ।”

কিন্তু অয়নের সন্দেহ হল।

সেদিন রাতে সে আবার কুয়োর কাছে গেল।

এবার সঙ্গে নিল দড়ি, টর্চ আর ক্যামেরা।

রাত বারোটার পর আবার গান শুরু হল।

কিন্তু এবার অয়ন লক্ষ্য করল—গানের সঙ্গে খুব ক্ষীণ ধাতব শব্দও হচ্ছে।

টং… টং…

যেন নিচে কোনো লোহার জিনিসে বাতাস লাগছে।

পরদিন কয়েকজন গ্রামবাসীকে নিয়ে কুয়োর মুখ পরিষ্কার করা হল।

কুয়োটি শুকনো ছিল। অনেক নিচে মাটি জমে শক্ত হয়ে গেছে।

দড়ি বেয়ে অয়ন নিচে নামল।

প্রায় দশ ফুট নিচে একটি পুরোনো লোহার বাক্স দেখতে পেল।

বাক্সটি মাটির মধ্যে অর্ধেক ঢুকে ছিল।

উপরে তুলে আনা হল সেটি।

ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো কাগজ, একটি ভাঙা হারমোনিয়ামের অংশ এবং একটি ছোট ডায়েরি।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

“মালতী।”

গ্রামের সবাই নিঃশব্দ।

ডায়েরির পাতাগুলো থেকে জানা গেল, মালতী আসলে সেদিন নিখোঁজ হয়নি।

সে গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের বিরুদ্ধে কিছু তথ্য জানতে পেরেছিল। গ্রামের দরিদ্র মানুষের জমি জোর করে দখল করার পরিকল্পনা চলছিল।

মালতী সেই তথ্য লিখে রেখেছিল।

কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ করার আগেই তাকে ভয় দেখানো হয়।

এক রাতে সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

তারপর?

ডায়েরির শেষ কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা।

কেউ জানত না, এরপর কী হয়েছিল।

অয়ন কুয়োর দেয়ালের একটি অংশ পরীক্ষা করতে গিয়ে অদ্ভুত শব্দ পেল।

দেয়ালের পেছনে ফাঁপা জায়গা।

ইট সরাতেই একটি ছোট গোপন ঘর পাওয়া গেল।

সেখানে ছিল পুরোনো নথি।

জমির কাগজ।

নাম।

স্বাক্ষর।

সবই প্রমাণ করছিল, বহু বছর আগে গ্রামের কিছু মানুষের জমি জোর করে দখল করা হয়েছিল।

মালতী সম্ভবত সেই প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু গান?

রহস্যের উত্তর পাওয়া গেল কয়েকদিন পর।

অয়ন রাতে আবার রেকর্ডার নিয়ে বসে রইল।

গান শুরু হল।

এবার সে কুয়োর ভেতরে একটি ছোট যন্ত্র দেখতে পেল।

একটি পুরোনো ব্যাটারি চালিত অডিও ডিভাইস।

কেউ সেটি সেখানে রেখে দিয়েছিল।

অর্থাৎ ভূতের গান নয়।

কেউ ইচ্ছা করেই গান বাজাচ্ছিল।

কিন্তু কে?

অয়ন তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারল, গ্রামেরই এক বৃদ্ধা—সুবর্ণা দেবী—প্রতিদিন রাতে গোপনে সেখানে এসে যন্ত্রটি চালিয়ে যেতেন।

তিনি ছিলেন মালতীর ছোট বোন।

“আপনি এত বছর ধরে এটা করতেন কেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“সবাই মালতীকে ভূত বানিয়ে ফেলেছিল। আমি চেয়েছিলাম, একদিন কেউ যেন ভয় না পেয়ে সত্যিটা খুঁজতে আসে।”

“আপনি জানতেন নথিগুলো এখানে আছে?”

“হ্যাঁ। দিদি যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিল, সত্যি যেন কোনোদিন মাটির নিচে চাপা না থাকে।”

অয়ন অবাক হয়ে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে রইল।

সুবর্ণা দেবী ধীরে বললেন,

“মানুষ ভূতকে ভয় পায়। কিন্তু অন্যায়কে ভয় পাওয়া উচিত ছিল।”

কয়েক মাস পরে সেই পুরোনো জমির নথি নিয়ে তদন্ত শুরু হল।

অনেক পরিবার তাদের হারানো জমির ইতিহাস জানতে পারল।

আর কুয়োর পাশে একটি ছোট ফলক বসানো হল—

“মালতীর স্মৃতিতে—যে সত্যকে মাটির নিচে চাপা পড়তে দেয়নি।”

সেদিনের পর থেকে কুয়োর ভেতর আর কোনো গান শোনা যায়নি।

তবে গ্রামের মানুষ এখনও বলে—

কখনও কখনও গভীর রাতে বাতাসে ভেসে আসে খুব ক্ষীণ একটি সুর।

ভূতের গান নয়।

একটি অসমাপ্ত সত্যের স্মৃতি।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে নামটি কেউ উচ্চারণ করত না।

নন্দনপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট পাঠাগার ছিল। নাম—‘জ্ঞানদীপ’। পাঠাগারটি খুব বড় নয়। কয়েকটি কাঠের তাক, পুরোনো বই, একটি টেবিল আর জানালার পাশে রাখা দুটো চেয়ার।

পাঠাগারের দায়িত্বে ছিল ঋত্বিক।

শহরে ভালো চাকরি পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে গ্রামে ফিরে এসেছিল। বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল ছোটবেলা থেকেই।

একদিন বিকেলে বই গোছাতে গিয়ে ঋত্বিক একটি পুরোনো খাতা পেল।

খাতাটির মলাটে কোনো নাম নেই।

প্রথম পাতায় শুধু একটি বাক্য লেখা—

“যদি কখনও কেউ আমার নাম জানতে চায়, তাকে বলবে—আমি অপেক্ষা করিনি।”

ঋত্বিকের কৌতূহল হল।

পরের পাতাগুলোতে লেখা ছিল ছোট ছোট ঘটনা।

“আজও সে এল না।”

“আজও চিঠি লিখলাম, পাঠালাম না।”

“মানুষ কখনও কখনও ভালোবাসে, কিন্তু সাহস করে বলতে পারে না।”

শেষ পাতায় একটি নাম লেখা ছিল—

মৃণালিনী।

ঋত্বিক গ্রামের বৃদ্ধ পাঠাগারকর্মী হরেকৃষ্ণবাবুকে খাতাটি দেখাল।

নামটি পড়েই বৃদ্ধের মুখ বদলে গেল।

“এই নামটা তুমি কোথায় পেলে?”

“এই খাতায়।”

“খাতাটা রেখে দাও। বেশি জানতে যেও না।”

“কেন?”

হরেকৃষ্ণবাবু কোনো উত্তর দিলেন না।

ঋত্বিকের কৌতূহল আরও বাড়ল।

পরদিন সে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছে মৃণালিনীর কথা জানতে চাইল।

অদ্ভুত ব্যাপার—প্রায় সবাই নামটি শুনে চুপ করে গেল।

কেউ বলল, “পুরোনো কথা।”

কেউ বলল, “ওসব এখন মনে করে কী হবে?”

কেউ আবার সরাসরি বলল,

“এই নামটা উচ্চারণ না করাই ভালো।”

কিন্তু কেন?

উত্তর পেল না ঋত্বিক।

এক বিকেলে পাঠাগারে এক বৃদ্ধা এলেন। হাতে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।

তিনি ঋত্বিককে জিজ্ঞেস করলেন,

“তুমি কি মৃণালিনীর খাতা পেয়েছ?”

ঋত্বিক চমকে উঠল।

“আপনি জানেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“আমি ওর বান্ধবী ছিলাম।”

বৃদ্ধার নাম সরলা।

তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

চল্লিশ বছর আগে মৃণালিনী এই গ্রামের স্কুলে পড়াতেন। গান গাইতেন, বই পড়তেন এবং গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনা শেখাতেন।

একই সময়ে গ্রামেরই এক যুবক—অমিতাভ—শহরে পড়াশোনা করত।

দুজনের মধ্যে গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়।

কিন্তু অমিতাভের পরিবার সেই সম্পর্ক মেনে নেয়নি।

কারণ মৃণালিনী ছিল দরিদ্র পরিবারের মেয়ে।

অমিতাভকে শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মৃণালিনী অপেক্ষা করেছিল।

এক বছর।

দুই বছর।

তারপর একদিন খবর এল—অমিতাভ বিদেশে চলে গেছে।

মৃণালিনী আর কোনোদিন তার কথা বলেনি।

তবে সে বিয়েও করেনি।

“তারপর?” ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল।

সরলা বললেন,

“তারপর সে গ্রামের মেয়েদের জন্য একটা ছোট স্কুল তৈরি করেছিল।”

“কিন্তু সবাই তার নাম বলতে চায় না কেন?”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

“কারণ অমিতাভের পরিবার ছিল প্রভাবশালী। তারা চেয়েছিল, মৃণালিনীর গল্প কেউ জানুক না।”

ঋত্বিক খাতাটির দিকে তাকাল।

“মৃণালিনী এখন কোথায়?”

সরলা ধীরে বললেন,

“এই গ্রামেই আছে।”

ঋত্বিক অবাক।

“কোথায়?”

বৃদ্ধা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

“ওই যে, নদীর ধারে যে ছোট স্কুলটা দেখছ?”

ঋত্বিকের চোখ বড় হয়ে গেল।

“ওটা মৃণালিনীর তৈরি?”

“হ্যাঁ।”

পরদিন ঋত্বিক স্কুলটিতে গেল।

সেখানে সাদা চুলের এক বৃদ্ধা শিশুদের পড়াচ্ছিলেন।

ঋত্বিক তাকে দেখেই বুঝতে পারল।

“আপনি মৃণালিনী?”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হাসলেন।

“এত বছর পর কেউ আমার নামটা আবার বলল।”

ঋত্বিক খাতাটি এগিয়ে দিল।

“এটা আপনার?”

মৃণালিনীর চোখ ভিজে উঠল।

“ভেবেছিলাম এটা হারিয়ে গেছে।”

“আপনি কি অমিতাভের জন্য অপেক্ষা করেননি?”

মৃণালিনী জানালার বাইরে তাকালেন।

“করেছিলাম। অনেক বছর।”

“তাহলে খাতায় লিখেছিলেন—অপেক্ষা করিনি?”

“কারণ মানুষকে কখনও কখনও নিজের কাছেও শক্ত হতে হয়।”

তিনি একটু থেমে বললেন,

“অমিতাভকে আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু তার ফিরে আসার অপেক্ষায় নিজের জীবন থামিয়ে রাখিনি।”

“আপনি কি এখনও তাকে ভালোবাসেন?”

মৃণালিনী মৃদু হেসে বললেন,

“ভালোবাসা সবসময় মানুষকে পাওয়ার নাম নয়। কখনও কখনও কারও ভালো থাকাটাও ভালোবাসার অংশ।”

ঠিক তখনই স্কুলের এক ছোট মেয়ে এসে বলল,

“মৃণালিনী দিদিমণি, আজ নতুন বই এসেছে!”

বৃদ্ধার মুখ আনন্দে ভরে উঠল।

ঋত্বিক বুঝতে পারল—এই মানুষটির জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেম হয়তো কোনো একজন মানুষ নয়।

শিক্ষা।

মানুষকে গড়ে তোলা।

আর নিজের কষ্টকে অন্যের ভবিষ্যতের আলোয় বদলে দেওয়া।

কয়েকদিন পর পাঠাগারের দেওয়ালে ঋত্বিক একটি নতুন ফলক লাগাল—

“মৃণালিনী পাঠকক্ষ—যাঁর জীবনের অসমাপ্ত ভালোবাসা বহু শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ করেছে।”

ফলকটি দেখে মৃণালিনী অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“এবার আর আমার নাম লুকিয়ে রাখতে হবে না।”

সেদিন থেকে নন্দনপুরে মৃণালিনী নামটি আর কেউ নিচু গলায় উচ্চারণ করত না।

বরং গ্রামের শিশুরা প্রতিদিন স্কুলে ঢোকার আগে জোরে বলত—

“মৃণালিনী দিদিমণি, আমরা এসেছি!”

আর বৃদ্ধা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হাসতেন।

কখনও কখনও একটি ভালোবাসা মানুষের জীবনে ফিরে আসে না।

কিন্তু তার রেখে যাওয়া আলো অনেক মানুষের জীবনে থেকে যায়।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।

প্রতিদিন ভোরে নদীর ওপর দিয়ে মাছ ধরার নৌকা যেত। কিন্তু গত এক মাস ধরে জেলেদের মধ্যে অদ্ভুত একটি কথা ছড়িয়ে পড়েছিল।

নদীর মাঝখানে নাকি একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।

দূর থেকে দেখা যায়, সে সাদা জামা পরে আছে। নৌকা কাছে গেলেই তাকে আর দেখা যায় না।

জেলেরা তাই ওই অংশটা এড়িয়ে চলত।

কিন্তু রুদ্র এসব কথায় বিশ্বাস করত না।

সে স্থানীয় একটি পত্রিকার জন্য ছবি তুলত। একদিন খবরের সন্ধানে নদীর ঘাটে গিয়ে কয়েকজন জেলের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিল, বিষয়টি নিজেই দেখবে।

পরদিন ভোরে সে মাঝি গণেশকে নিয়ে নৌকায় উঠল।

সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি।

নদীর জল ছিল অস্বাভাবিক শান্ত।

নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছতেই গণেশ হঠাৎ দাঁড় থামিয়ে দিল।

“ওই দেখুন!”

রুদ্র সামনে তাকাল।

সত্যিই একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে!

নদীর বুকের মাঝখানে!

সাদা জামা। মাথা নিচু।

রুদ্র ক্যামেরা তুলল।

একটা ছবি।

দুটো ছবি।

তিনটে ছবি।

তারপর সে চিৎকার করে উঠল,

“নৌকা ওদিকে নিন!”

গণেশ ভয়ে বলল,

“না বাবু, ওদিকে যাব না।”

কিন্তু রুদ্র শুনল না।

নৌকা যত এগোতে লাগল, মানুষটিও যেন তত দূরে সরে যেতে লাগল।

হঠাৎ কুয়াশার একটা পর্দা নেমে এল।

আর মানুষটি অদৃশ্য।

রুদ্র চারদিকে তাকিয়ে রইল।

“কোথায় গেল?”

কোনো উত্তর নেই।

ঘাটে ফিরে এসে রুদ্র ক্যামেরার ছবি কম্পিউটারে তুলল।

প্রথম ছবিতে মানুষটি দূরে।

দ্বিতীয় ছবিতে একটু কাছে।

তৃতীয় ছবিতে আরও কাছে।

কিন্তু চতুর্থ ছবিটি দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।

মানুষটি এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।

মুখ স্পষ্ট নয়।

তবে তার হাতে একটি ছোট ধাতব বাক্স।

রুদ্র ছবিটি বড় করল।

বাক্সটির গায়ে লেখা—

“৭ নম্বর নৌকা।”

রুদ্র বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করল।

পুরোনো নৌকার রেজিস্টার ঘেঁটে সে জানতে পারল, সাত বছর আগে ৭ নম্বর নৌকাটি নদীতে ডুবে গিয়েছিল।

মাঝি ছিলেন অরুণ।

সঙ্গে ছিল আরও দুজন জেলে।

তিনজনের কাউকেই পাওয়া যায়নি।

রুদ্র অরুণের বাড়িতে গেল।

সেখানে তার বৃদ্ধ মা এখনও থাকেন।

অরুণের ছবি দেখাতেই বৃদ্ধা বললেন,

“আমার ছেলে নদীকে খুব ভালোবাসত।”

রুদ্র জিজ্ঞেস করল,

“তার সঙ্গে কোনো ধাতব বাক্স ছিল?”

বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকালেন।

“ছিল। ওর বাবার পুরোনো বাক্স। তাতে কিছু কাগজ রাখত।”

“কী কাগজ?”

“নদীর মাছ ধরার এলাকার হিসাব। আর কিছু লোকের নাম।”

রুদ্রের সন্দেহ হল।

সে পুরোনো দুর্ঘটনার খবর খুঁজতে শুরু করল।

তখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল।

নৌকাটি দুর্ঘটনায় ডোবেনি।

তার নিচে বিস্ফোরণের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল।

কিন্তু তদন্তের পর রিপোর্টটি বন্ধ হয়ে যায়।

রুদ্র আরও খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, অরুণ নদীতে বেআইনি বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার বিষয়টি আবিষ্কার করেছিলেন।

তিনি কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম লিখে রেখেছিলেন।

সম্ভবত সেই কারণেই তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বাক্সটি কোথায়?

রুদ্র আবার নদীতে গেল।

এবার একা নয়। কয়েকজন স্থানীয় জেলে সঙ্গে ছিল।

ছবিতে দেখা জায়গাটি চিহ্নিত করে নদীর তলায় অনুসন্ধান শুরু হল।

কয়েক ঘণ্টা পর একটি মরচেধরা বাক্স পাওয়া গেল।

বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এল পুরোনো কাগজ।

নদীর জল দূষণের প্রমাণ।

কিছু ছবিও ছিল।

আর একটি ছোট কাগজ।

তাতে লেখা—

“যদি আমি ফিরতে না পারি, নদীকে যেন কেউ মেরে ফেলতে না পারে।”

প্রমাণগুলো প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হল।

তদন্ত আবার শুরু হল।

বেআইনি বর্জ্য ফেলার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল।

কিন্তু রুদ্রের মনে তখনও একটি প্রশ্ন।

সে ছবিতে যে মানুষটিকে দেখেছিল, সে কে?

কয়েকদিন পর ভোরে রুদ্র আবার নদীর ঘাটে দাঁড়িয়েছিল।

নদী শান্ত।

কুয়াশা নেই।

হঠাৎ মাঝনদীতে তার চোখ আটকে গেল।

সাদা জামা পরা সেই মানুষটি আবার দাঁড়িয়ে আছে।

রুদ্র ক্যামেরা তুলল।

কিন্তু এবার ছবি তুলল না।

শুধু দাঁড়িয়ে রইল।

মানুষটি ধীরে ধীরে হাত তুলল।

তারপর নদীর দিকে ইশারা করল।

পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল।

রুদ্র সেদিন বুঝতে পারল না, সে সত্যিই কাউকে দেখেছিল, নাকি কুয়াশা আর স্মৃতির খেলা ছিল।

তবে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তার মনে হল—

কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের অসমাপ্ত দায়িত্ব থেকে যায়।

আর কখনও কখনও সেই দায়িত্বই মানুষের চোখে একটি ছায়া হয়ে ফিরে আসে।

নদী তখনও বয়ে চলেছে।

আর তার বুকের জলের নিচে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের গল্প।

কিছু গল্প উদ্ধার হয়।

কিছু গল্প চিরকাল রহস্য হয়েই থেকে যায়।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : তিন নম্বর ঘরের বাতি।

শহরের পুরোনো বাজারের পাশে একটি ছোট আবাসিক হোটেল ছিল—‘নিরালা নিবাস’। হোটেলটি খুব বেশি পুরোনো নয়, কিন্তু অদ্ভুত কারণে সন্ধ্যার পর সেখানে অতিথি কম থাকত।

হোটেলের তৃতীয় তলায় তিন নম্বর ঘরটি বছরের পর বছর বন্ধ।

কেউ ঘরটি ভাড়া নিত না।

কারণ রাত হলেই নাকি ঘরটির আলো জ্বলে উঠত।

হোটেলের নতুন ম্যানেজার অমিত এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করত না।

এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সে মোমবাতি হাতে তৃতীয় তলায় উঠল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছতেই দেখল—

তিন নম্বর ঘরের দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।

অমিত থমকে দাঁড়াল।

“ভেতরে কেউ আছে?”

কোনো উত্তর নেই।

সে দরজায় হাত রাখল।

দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ঘরের ভেতর কেউ নেই।

কিন্তু টেবিলের ওপর একটি বাতি জ্বলছে।

অমিত এগিয়ে গিয়ে বাতিটি বন্ধ করল।

ঠিক তখনই তার পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সে দ্রুত ফিরে তাকাল।

দরজার পাশে দেওয়ালে একটি পুরোনো ক্যালেন্ডার।

তারিখটি দেখে অমিতের বুক কেঁপে উঠল।

১৭ নভেম্বর ২০০৪।

কেন এত বছর আগের ক্যালেন্ডার এখানে?

সে ঘর থেকে বেরিয়ে ম্যানেজারের অফিসে ফিরে এল।

পরদিন পুরোনো কর্মচারী নিতাইকে বিষয়টি বলতেই লোকটি মুখ নিচু করল।

“ওই ঘরের কথা জিজ্ঞেস করবেন না স্যার।”

“কেন?”

“সতেরো নভেম্বর ২০০৪-এ এখানে একজন মেয়ে মারা গিয়েছিল।”

“কীভাবে?”

“আত্মহত্যা বলা হয়েছিল।”

অমিতের সন্দেহ হল।

“মেয়েটির নাম?”

“সুচরিতা।”

“কেউ তাকে চিনত?”

“একজন সাংবাদিক ছিল। কয়েকদিন এখানে ছিল। কিছু একটা তদন্ত করছিল।”

অমিত পুরোনো রেজিস্টার বের করল।

সুচরিতার নামের পাশে লেখা ছিল—

Room 3.

তারপর একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ল।

চেক-আউটের তারিখের ঘরটি ফাঁকা।

অর্থাৎ হোটেলের নথি অনুযায়ী, সুচরিতা কখনও ঘর ছাড়েনি।

অমিত পুরোনো কাগজপত্র খুঁজতে শুরু করল।

একটি খবরের কাগজে ছোট্ট প্রতিবেদন পেল।

“স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির অর্থ সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান করতে এসে এক তরুণ সাংবাদিকের মৃত্যু।”

আরও খুঁজে সে একটি পুরোনো পেনড্রাইভ পেল।

সেটি চালু করতেই একটি অডিও ফাইল।

সুচরিতার কণ্ঠ।

“যদি আমার কিছু হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমি যে নথিগুলো পেয়েছি, সেগুলো সত্যি।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

“হোটেলের তৃতীয় তলার তিন নম্বর ঘরে আমি সব প্রমাণ রেখে যাচ্ছি।”

অমিতের হাত কেঁপে উঠল।

সে সেই রাতেই ঘরে ফিরে গেল।

এবার টেবিল, বিছানা, আলমারি—সব খুঁজতে শুরু করল।

শেষে দেওয়ালের একটি কাঠের প্যানেল একটু নড়তে দেখল।

প্যানেল সরাতেই একটি ছোট খোপ।

ভেতরে কয়েকটি ফাইল।

ব্যাংকের হিসাব।

জাল নথি।

টাকার লেনদেনের তালিকা।

সবকিছু সুচরিতার তদন্তের সঙ্গে মিলে গেল।

কিন্তু অমিতের চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে।

ছবিতে হোটেলের তৎকালীন মালিকের সঙ্গে কয়েকজন ব্যবসায়ী দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের মধ্যে একজনকে অমিত চিনতে পারল।

বর্তমানে তিনি শহরের অত্যন্ত পরিচিত একজন ব্যবসায়ী।

অমিত বুঝতে পারল, এত বছর ধরে সত্যিটা চাপা পড়ে ছিল।

পরদিন সে সমস্ত নথি পুলিশের হাতে তুলে দিল।

পুরোনো মামলাটি আবার তদন্ত শুরু হল।

তদন্তে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল, সুচরিতার মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল না। তার অনুসন্ধানের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

মামলায় নতুন করে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল।

হোটেলের পুরোনো মালিকও সত্য গোপন করার অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়লেন।

কয়েক সপ্তাহ পর তিন নম্বর ঘরটি সিল করে দেওয়া হল।

সেদিন রাতে অমিত হোটেলের নিচে বসে হিসাব করছিল।

হঠাৎ নিতাই দৌড়ে এল।

“স্যার!”

“কী হয়েছে?”

“তিন নম্বর ঘরের আলো জ্বলছে।”

অমিত চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে তৃতীয় তলায় উঠল।

দরজা বন্ধ।

সে দরজা খুলল না।

শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে বলল,

“সুচরিতা, আপনার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ভেতরের বাতি নিভে গেল।

চিরদিনের জন্য।

পরদিন সকালে ঘরের দরজা খুলে দেখা গেল, টেবিলের ওপর একটি কাগজ রাখা।

কাগজটি একেবারে সাদা।

শুধু নিচে একটি বাক্য—

“সত্যকে আলোয় আনলেই অন্ধকারের কাজ শেষ হয়।”

তারপর থেকে তিন নম্বর ঘরের বাতি আর কোনোদিন জ্বলেনি।

তবে ‘নিরালা নিবাস’-এর কর্মচারীরা আজও বলেন—

সত্য প্রকাশের আগের রাতগুলোতেই শুধু ওই ঘরে আলো জ্বলত।

যেন কেউ অন্ধকার ঘরের ভেতর বসে অপেক্ষা করছিল—

কেউ একজন এসে তার গল্পটা শেষ করবে বলে।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : বাবার পুরোনো জুতোর জোড়া।

বাবার মৃত্যুর পর বাড়ির ঘর গোছাতে গিয়ে অনির্বাণ একটি পুরোনো জুতোর জোড়া পেল।

কালো চামড়ার জুতো। বহু বছরের পুরোনো। সামনের অংশ ঘষে সাদা হয়ে গেছে। তবু অদ্ভুতভাবে যত্ন করে রাখা।

মা বললেন,

“ওগুলো ফেলে দিস না।”

অনির্বাণ হেসে বলল,

“এত পুরোনো জুতো রেখে কী হবে?”

মা শুধু বললেন,

“তোর বাবা ওগুলো খুব যত্ন করে রাখত।”

অনির্বাণ জানত, তার বাবা রমেশবাবু ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। সারা জীবন সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। নিজের জন্য কখনও দামি জিনিস কেনেননি।

কিন্তু জুতোর সঙ্গে এমন কী স্মৃতি?

উত্তর পেল কয়েকদিন পর।

জুতোর ভেতরে হাত ঢোকাতে গিয়ে অনির্বাণ একটি ছোট কাগজ পেল।

তাতে লেখা—

“প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে কেনা।”

অনির্বাণ অবাক হল।

বাবার প্রথম বেতন দিয়ে কেনা জুতো!

কাগজের নিচে আরেকটি লাইন—

“এই জুতো পরে প্রথমবার স্কুলে গিয়েছিলাম।”

অনির্বাণ জুতোর দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন সে বাবার পুরোনো স্কুলে গেল।

প্রধান শিক্ষককে জুতোর কথা বলতেই তিনি হেসে ফেললেন।

“ওই জুতো?”

“আপনি জানেন?”

“তোর বাবা যখন চাকরিতে যোগ দিয়েছিল, তখন তার কাছে ভালো জুতো কেনার টাকাও ছিল না।”

“তাহলে?”

“স্কুলের এক ছাত্রের বাবা তাকে জুতো কিনে দিয়েছিল।”

অনির্বাণ অবাক।

“কেন?”

প্রধান শিক্ষক বললেন,

“তোর বাবা গ্রামের দরিদ্র ছাত্রদের নিজের পকেট থেকে খাতা-কলম কিনে দিত। একদিন এক ছাত্রের বাবা সেটা দেখে বলেছিল, ‘স্যার, আপনি আমাদের ছেলেকে মানুষ করছেন। আপনাকে একটা জুতো না দিলে আমার লজ্জা হবে।’”

অনির্বাণ চুপ করে গেল।

প্রধান শিক্ষক আরও বললেন,

“তোর বাবা সেই জুতো প্রায় বিশ বছর পরেও ফেলে দেয়নি।”

বাড়ি ফিরে অনির্বাণ মাকে সব বলল।

মা মৃদু হেসে বললেন,

“তুই কি জানিস, তোর বাবার একটা অভ্যাস ছিল?”

“কী?”

“প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে একটা নির্দিষ্ট টাকা আলাদা করে রাখত।”

“কেন?”

“কিছু ছাত্রের বই, জামাকাপড় আর জুতোর জন্য।”

অনির্বাণের বুক ভারী হয়ে এল।

সে বাবাকে মনে মনে নতুন করে চিনতে শুরু করল।

কয়েকদিন পর বাড়ির পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি খাতা পাওয়া গেল।

পাতায় পাতায় নাম।

রাহুল—জুতো।

সেলিম—স্কুলব্যাগ।

মৌসুমি—বই।

বিপ্লব—পরীক্ষার ফি।

প্রতিটি নামের পাশে তারিখ এবং টাকার হিসাব।

শেষ পাতায় লেখা—

“আমার পরে যদি কেউ এই খাতা পায়, তাহলে যেন এই কাজটা বন্ধ না হয়।”

অনির্বাণ অনেকক্ষণ খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারল, বাবার আসল সম্পত্তি ব্যাংকে নেই।

কোনো জমির দলিলেও নেই।

তার আসল সম্পদ ছিল মানুষের বিশ্বাস।

কয়েক মাস পর অনির্বাণ নিজের বেতনের একটি অংশ আলাদা করে রাখতে শুরু করল।

প্রথমে তিনজন ছাত্র।

তারপর পাঁচজন।

তারপর দশজন।

একদিন গ্রামের এক স্কুলে সে এক কিশোরকে নতুন জুতো দিল।

ছেলেটি জুতো হাতে নিয়ে বলল,

“কাকু, আমি কি আপনার টাকা পরে ফিরিয়ে দেব?”

অনির্বাণ হেসে বলল,

“না। তুমি বড় হয়ে অন্য কাউকে দেবে।”

ছেলেটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

“কাকে?”

“যার প্রয়োজন হবে।”

সেদিন রাতে অনির্বাণ বাবার পুরোনো জুতোর জোড়াটি পরিষ্কার করে কাঠের আলমারির ওপর রাখল।

মা পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“ফেলে দিলি না?”

অনির্বাণ মাথা নাড়ল।

“না। এগুলো আর জুতো নয় মা।”

“তাহলে?”

অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল,

“এগুলো আমাদের পরিবারের পথ দেখাবে।”

জানালার বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি।

অনির্বাণ বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

“তুমি যে পথটা শুরু করে গিয়েছিলে, বাবা, আমি চেষ্টা করব সেটা থামতে না দিতে।”

পুরোনো জুতোর জোড়া নীরবে পড়ে রইল।

কিন্তু সেই জোড়া জুতোর পথ ধরে একের পর এক শিশুর জীবনে নতুন রাস্তা তৈরি হতে লাগল।

কারণ কিছু মানুষের রেখে যাওয়া জিনিস শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে না—

সেগুলো অন্য মানুষের ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে থাকা শব্দ।

রাত তখন সাড়ে এগারোটা। অনিক নিজের নতুন ফ্ল্যাটে বসে কাজ করছিল। শহরের একটি বহুতলের দশতলায় তার ফ্ল্যাট। বাড়িটি আধুনিক, নিরাপদ এবং সারাক্ষণ মানুষের আনাগোনা।

তবু তিন দিন ধরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল।

রাত ঠিক এগারোটা সতেরো মিনিটে তার শোবার ঘরের দেওয়াল থেকে ক্ষীণ শব্দ আসত।

টক… টক… টক…

প্রথম রাতে সে ভেবেছিল পাইপের শব্দ।

দ্বিতীয় রাতে ভেবেছিল পাশের ফ্ল্যাটের কোনো কাজ।

তৃতীয় রাতে শব্দটা আরও পরিষ্কার হল।

টক… টক… টক…

তারপর খুব নিচু স্বরে যেন কেউ বলল—

“শুনতে পাচ্ছেন?”

অনিকের শরীর কেঁপে উঠল।

সে দেওয়ালের কাছে কান রাখল।

কিছু নেই।

পরদিন সকালে মিস্ত্রিকে ডেকে দেওয়াল পরীক্ষা করাল।

মিস্ত্রি বলল,

“দেওয়ালের মধ্যে পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন আছে। শব্দ হতে পারে।”

অনিক কথাটা মেনে নিল।

কিন্তু সেই রাতেই আবার শব্দ হল।

এবার শব্দের পর একটি বাক্য পরিষ্কার শোনা গেল—

“ওরা আমাকে খুঁজছে।”

অনিক সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

পরদিন সে বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তারক্ষী হরিকে জিজ্ঞেস করল,

“এই ফ্ল্যাটে আগে কে থাকত?”

হরি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“একজন ব্যাংককর্মী। নাম অমিত।”

“কতদিন আগে?”

“প্রায় দুই বছর।”

“তারপর?”

“একদিন হঠাৎ ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যায়।”

“কোথায়?”

হরি মাথা নাড়ল।

“জানি না।”

অনিকের কৌতূহল বাড়ল।

সে বাড়ির পুরোনো রক্ষণাবেক্ষণের নথি দেখতে চাইল।

সেখানে একটি তথ্য পেল—

দুই বছর আগে দশতলার ওই অংশের দেওয়াল ভেঙে নতুন করে বানানো হয়েছিল।

কেন?

নথিতে লেখা—“বিশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণে।”

অনিক এবার পুলিশের এক পরিচিত অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করল।

তদন্তে জানা গেল, অমিত যে ব্যাংকে কাজ করত সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ তছরুপের একটি ঘটনা ঘটেছিল।

অমিত নিখোঁজ হওয়ার আগে কয়েকজন সন্দেহজনক ব্যক্তির নাম জানিয়েছিল।

কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অনিকের মনে হল, দেওয়ালের শব্দের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক আছে।

একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে দেওয়ালের অংশ পরীক্ষা করা হল।

দেওয়ালের ভেতর থেকে একটি সরু পাইপের মতো ফাঁপা অংশ পাওয়া গেল।

তার মধ্যে একটি ছোট রেকর্ডিং ডিভাইস।

ডিভাইসটি চালু করতেই অমিতের কণ্ঠ শোনা গেল।

“যদি কেউ এটা পায়, তাহলে বুঝবেন আমি বিপদে আছি।”

তারপর কয়েকজন মানুষের কথোপকথন।

টাকার হিসাব।

ব্যাংকের নথি।

আর একটি নাম।

একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর।

অনিক বুঝল, অমিত দেওয়ালের ভেতর প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হল, অমিত কোথায়?

তদন্তকারী দল পুরোনো নথি খুঁজে জানতে পারল, অমিতকে শেষবার একটি গাড়িতে উঠতে দেখা গিয়েছিল।

গাড়িটির মালিক সেই ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।

মামলা নতুন মোড় নিল।

কয়েকদিন পর অমিতের সন্ধান পাওয়া গেল অন্য শহরে।

সে জীবিত।

ভয়ে পরিচয় গোপন করে ছিল।

অমিত পুলিশকে বলল,

“আমি জানতাম, আমার কাছে প্রমাণ আছে সেটা ওরা বুঝে গেছে। তাই ডিভাইসটা দেওয়ালের ভেতর রেখে পালিয়ে যাই।”

অনিক জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু রাতে যে শব্দ শুনতাম?”

অমিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি একটা সময় ডিভাইসটায় টাইমার সেট করেছিলাম। প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময়ে কয়েক সেকেন্ডের রেকর্ডিং চালু হওয়ার কথা ছিল।”

“কিন্তু আপনি তো চলে গিয়েছিলেন!”

অমিত বলল,

“আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বাড়ি ভাঙার সময় ডিভাইসটা নষ্ট হয়ে গেছে।”

অনিক জানালার বাইরে তাকাল।

“আপনি কি জানতেন, কেউ নতুন করে এই ফ্ল্যাটে থাকবে?”

অমিত মাথা নাড়ল।

“না।”

মামলার তদন্ত এগোল।

রেকর্ডিংয়ের সূত্র ধরে বড় আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ সামনে এল।

অনেকদিনের রহস্যের সমাধান হল।

কয়েক সপ্তাহ পর অনিক নিজের ঘরের সেই দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

দেওয়ালটি পুরোপুরি মেরামত করা হয়েছে।

আর কোনো শব্দ নেই।

তবু সেদিন রাত এগারোটা সতেরো মিনিটে অনিক হঠাৎ থেমে গেল।

টক… টক…

সে চমকে দেওয়ালের দিকে তাকাল।

আবার—

টক… টক… টক…

তারপর খুব ক্ষীণ একটি শব্দ।

“ধন্যবাদ।”

অনিক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সে জানত, প্রযুক্তির ব্যাখ্যা হয়তো এর পেছনে আছে।

তবু মানুষের মন সবকিছুর ব্যাখ্যা মানতে চায় না।

সে দেওয়ালে হাত রেখে ধীরে বলল,

“আপনার সত্যিটা এবার আর দেয়ালের মধ্যে আটকে নেই।”

তারপর ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

সেই রাতের পর আর কোনো শব্দ শোনা যায়নি।

কখনও কখনও সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায়।

কিন্তু চিরদিনের জন্য নয়।

কারণ সত্যের নিজেরও এক ধরনের শব্দ আছে—

যে শব্দ কোনো না কোনোদিন দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসবেই।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : কাঁসার থালায় লেখা নাম।

কৃষ্ণপুর গ্রামের মাটির রাস্তার ধারে ছোট্ট একটি খাবারের দোকান ছিল রতনের। দোকানে ভাত, ডাল, শাক, মাছ আর সন্ধ্যায় গরম চা—এই ছিল তার সম্বল।

বছর দশেক আগে শহরে কাজ করতে যাওয়ার আগে রতনের সঙ্গে মাধবীর গভীর বন্ধুত্ব ছিল।

বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি।

কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলেনি।

একদিন হঠাৎ মাধবীর বিয়ে হয়ে গেল।

রতন শহরে চলে গেল।

দশ বছর কেটে গেল।

এক বর্ষার দুপুরে দোকানে বসে থালা ধুচ্ছিল রতন। হঠাৎ এক বৃদ্ধা এসে বললেন,

“বাবা, এই দোকানটা কি রতনের?”

রতন সামনে এল।

“আমি রতন।”

বৃদ্ধা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো কাঁসার থালা বের করলেন।

থালার নিচে খোদাই করা—

“মাধবী”

রতনের হাত থেমে গেল।

“এটা কোথায় পেলেন?”

“পুরোনো বাসন বিক্রি করতে এসেছিল এক লোক। আমি নামটা দেখে কিনে নিয়েছিলাম। ভাবলাম, তোমার কাছে পৌঁছে দেব।”

রতন থালাটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

“মাধবী কোথায়?”

বৃদ্ধা বললেন,

“এখনও এই গ্রামেই আছে।”

রতনের বুক ধক করে উঠল।

“ওর বিয়ে?”

“হয়েছিল। স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে।”

রতন কোনো কথা বলল না।

সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে সে মাধবীর বাড়ির সামনে গেল।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সাহস সঞ্চয় করল।

শেষে কড়া নাড়ল।

একজন কিশোরী দরজা খুলল।

“কাকে চাই?”

“মাধবীকে।”

ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল,

“কে?”

রতন বলল,

“আমি।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মাধবী বাইরে এল।

দুজনের চোখাচোখি হল।

দশ বছর যেন এক মুহূর্তে ফিরে এল।

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

“তুই সত্যিই রতন?”

রতনও হাসল।

“তুইও তো বদলে গেছিস।”

“বদলাতেই হয়।”

দুজন উঠোনে বসে অনেকক্ষণ কথা বলল।

পুরোনো দিনের কথা।

স্কুলের কথা।

বর্ষার দুপুর।

পুকুরঘাট।

আর সেইসব কথা, যেগুলো তারা কোনোদিন মুখে বলেনি।

হঠাৎ মাধবী জিজ্ঞেস করল,

“তুই আমাকে কোনোদিন খুঁজিসনি?”

রতন মাথা নিচু করল।

“খুঁজেছিলাম।”

“তাহলে আসিসনি কেন?”

“ভেবেছিলাম, তুই সুখে আছিস।”

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

“আর আমি ভেবেছিলাম, তুই আমাকে ভুলে গেছিস।”

দুজনেই চুপ।

কিছুক্ষণ পর রতন কাঁসার থালাটি বের করল।

“এটা তোর?”

মাধবীর চোখ বড় হয়ে গেল।

“এটা!”

সে থালাটি হাতে নিল।

“এটা আমার মায়ের।”

“তোর নাম কেন লেখা?”

মাধবী হাসল।

“আমার বিয়ের সময় মা আমার জন্য বানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সংসারে যত ঝড়ই আসুক, নিজের নামটা যেন কখনও হারিয়ে না ফেলি।”

রতন থালাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

“তাহলে এটা পুরোনো বাসনের সঙ্গে গেল কীভাবে?”

মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অনেক জিনিস বিক্রি করতে হয়েছিল।”

রতন কিছু বলল না।

মাধবী থালাটি ফেরত দিতে গেলে রতন বলল,

“এটা রাখ।”

“কেন?”

“তোর মায়ের স্মৃতি।”

মাধবী মাথা নাড়ল।

“তুই রাখ।”

“আমি?”

“হ্যাঁ। এত বছর পরও তুই নামটা চিনতে পেরেছিস। তাই মনে হয়, থালাটা তোর কাছেই থাকা উচিত।”

রতন থালাটি নিল না।

“না। নামটা যার, থালাটাও তার।”

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

“তুই এখনও আগের মতোই জেদি।”

পরদিন মাধবী তার মেয়েকে নিয়ে রতনের দোকানে এল।

মেয়েটি বলল,

“মা বলেছে, এখানকার মাছ নাকি খুব ভালো।”

রতন হেসে বলল,

“আজ মাছের সঙ্গে মিষ্টিও থাকবে।”

মাধবী তাকিয়ে বলল,

“মিষ্টি কেন?”

“দশ বছর পর পুরোনো বন্ধুকে পেয়েছি।”

মাধবী কিছু বলল না।

তবে তার মুখের হাসিটা অনেক কিছু বলছিল।

তারপর থেকে মাধবী প্রায়ই দোকানে আসতে লাগল।

কখনও মেয়েকে নিয়ে।

কখনও একা।

তাদের সম্পর্কের নাম কী—সেটা কেউ জানত না।

হয়তো বন্ধুত্ব।

হয়তো পুরোনো ভালোবাসা।

হয়তো দুটোর মাঝখানে এমন একটি জায়গা, যার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই।

একদিন রতন দোকানের দেওয়ালে সেই কাঁসার থালাটি ঝুলিয়ে দিল।

মাধবী দেখে বলল,

“আমার নামটা এত বড় করে কেন রেখেছিস?”

রতন হেসে বলল,

“যে নাম দশ বছর ধরে মনে ছিল, তাকে ছোট করে লিখব কেন?”

মাধবী কিছু বলল না।

শুধু থালাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

বাইরে তখন বৃষ্টি নামছিল।

দোকানের টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ।

মাধবী ধীরে বলল,

“কিছু মানুষকে হারানো যায় না, রতন।”

রতন তাকাল।

“কীভাবে?”

“সময় তাদের দূরে নিয়ে যায়। কিন্তু মনে একটা জায়গা রেখে যায়।”

রতন মৃদু হেসে বলল,

“সেই জায়গাটা কি এখনও খালি আছে?”

মাধবী উত্তর দিল না।

শুধু কাঁসার থালায় আঙুল বুলিয়ে নিজের নামটার দিকে তাকিয়ে রইল।

কখনও কখনও ভালোবাসার জন্য বড় কোনো প্রতিশ্রুতি লাগে না।

একটি নামই যথেষ্ট।

যদি সেই নামটি দশ বছর পরেও কারও হৃদয়ে একইভাবে লেখা থাকে।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : মাটির নিচে চাপা পড়া ঘণ্টাধ্বনি।

বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতি বছর বর্ষার পর অদ্ভুত একটা শব্দ শোনা যেত।

সন্ধ্যার দিকে মাটির নিচ থেকে ভেসে আসত—

ঢং… ঢং… ঢং…

গ্রামের লোকেরা বলত, ওটা নাকি মাটির নিচে চাপা পড়া মন্দিরের ঘণ্টা।

কিন্তু কেউ কখনও সেই ঘণ্টা দেখেনি।

গ্রামের স্কুলশিক্ষক সৌরভ এসব গল্পে বিশ্বাস করতেন না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তিনিও সেই শব্দ শুনলেন।

কিন্তু শব্দটা এবার অন্যরকম।

যেন খুব গভীর মাটি থেকে আসছে।

পরদিন সৌরভ স্কুলের কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে জায়গাটা পরীক্ষা করতে গেলেন।

এক ছাত্র রাকেশ বলল,

“স্যার, এখানে মাটি অন্য জায়গার থেকে নরম।”

সৌরভ লাঠি দিয়ে মাটি খুঁচিয়ে দেখলেন।

সত্যিই নিচে ফাঁপা শব্দ।

কয়েকজন গ্রামবাসীকে ডেকে মাটি সরানোর কাজ শুরু হল।

প্রায় চার ফুট নিচে একটি পাথরের কাঠামো বেরিয়ে এল।

আর তার মধ্যে একটি লোহার দরজা।

দরজা খুলতেই সবাই অবাক।

নিচে নামার জন্য সরু সিঁড়ি।

সৌরভ টর্চ জ্বালিয়ে নামলেন।

সিঁড়ির শেষে একটি ছোট ঘর।

ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল পুরোনো ঘণ্টা।

কিন্তু ঘণ্টাটি নড়ার কোনো সুযোগ নেই।

তাহলে শব্দ আসে কীভাবে?

সৌরভ চারপাশ পরীক্ষা করতে লাগলেন।

দেয়ালে খোদাই করা কিছু লেখা দেখতে পেলেন।

বাংলা অক্ষরে লেখা—

“বিপদের দিনে এই ঘণ্টা বাজবে।”

আরেক পাশে একটি সাল—

১৮৯৮।

সৌরভ বুঝলেন, এটি কোনো সাধারণ মন্দির নয়।

এটি ছিল গ্রামের পুরোনো সতর্কবার্তা কেন্দ্র।

ঠিক তখন রাকেশ চিৎকার করে বলল,

“স্যার! এখানে আরেকটা দরজা!”

দরজার ওপারে আরও একটি সরু পথ।

পথটি মাটির নিচ দিয়ে গ্রামের পুরোনো বাঁধের দিকে গিয়েছে।

হঠাৎ সৌরভের মনে পড়ল, গত কয়েকদিন ধরে গ্রামের নদীর জল অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।

সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এসে বাঁধ পরীক্ষা করতে গেল।

বাঁধের একটি অংশে বড় ফাটল।

যদি রাতের বৃষ্টিতে নদীর জল আরও বাড়ে, তাহলে বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।

সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চায়েত ও প্রশাসনকে খবর দিলেন।

কিন্তু গ্রামের মানুষ প্রথমে গুরুত্ব দিল না।

তখন সৌরভ তাদের ভূগর্ভস্থ ঘণ্টাটি দেখালেন।

এক বৃদ্ধ বললেন,

“আমার ঠাকুরদা বলতেন, এই ঘণ্টা একবার বাজলে গ্রামের সবাইকে উঁচু জায়গায় চলে যেতে হতো।”

“কিন্তু এখন তো ঘণ্টা বাজে না।”

বৃদ্ধ বললেন,

“হয়তো আমরা ভুলে গেছি কীভাবে বাজাতে হয়।”

সৌরভ ঘণ্টাটির কাঠামো পরীক্ষা করলেন।

দেখলেন, মাটির নিচে একটি পুরোনো লোহার দড়ি চলে গেছে বাঁধের কাছে।

সম্ভবত নদীর জল নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠলে জলচাপের কারণে দড়িটি টানত এবং ঘণ্টা বাজত।

কিন্তু বহু বছর ধরে ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে।

সৌরভ সেই পুরোনো ব্যবস্থাটি মেরামত করার চেষ্টা করলেন।

সেই রাতেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হল।

নদীর জল দ্রুত বাড়তে লাগল।

মাঝরাতে হঠাৎ—

ঢং!

তারপর—

ঢং!

ঢং!

পুরো গ্রাম কেঁপে উঠল।

মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বৃদ্ধরা বুঝে গেলেন—এটি সতর্কবার্তা।

সৌরভ মাইক নিয়ে সবাইকে উঁচু জায়গায় চলে যেতে বললেন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাঁধের সেই অংশ ভেঙে গেল।

জল গ্রামে ঢুকল।

কিন্তু ততক্ষণে প্রায় সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।

সকাল হলে দেখা গেল, গ্রামের নিচু এলাকার অনেক বাড়ি জলে ডুবে গেছে।

কিন্তু প্রাণহানি হয়নি।

প্রশাসনের লোকেরা এসে পুরোনো ভূগর্ভস্থ ঘরটি দেখতে চাইল।

সৌরভ তাদের সব দেখালেন।

একজন ইতিহাসবিদ বললেন,

“এটি শুধু ঘণ্টাঘর নয়। এটি একশো বছরেরও বেশি পুরোনো একটি স্থানীয় দুর্যোগ-সতর্কতা ব্যবস্থা।”

গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিল, জায়গাটি আর মাটির নিচে চাপা থাকবে না।

ঘণ্টাটি তুলে এনে গ্রামের উঁচু জায়গায় স্থাপন করা হল।

তার পাশে একটি ফলক লাগানো হল—

“যে ঘণ্টা একদিন মানুষকে বাঁচাত, তাকে ভুলে গেলে বিপদও একদিন আমাদের ভুলে যায়।”

রাকেশ একদিন সৌরভকে জিজ্ঞেস করল,

“স্যার, ঘণ্টাটা কি সত্যিই নিজে নিজে বাজে?”

সৌরভ হাসলেন।

“না। ঘণ্টা নিজে কাউকে বাঁচাতে পারে না।”

“তাহলে?”

“মানুষকে সতর্ক করে। বাঁচায় মানুষই।”

রাকেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তাহলে আমরা ঘণ্টাটাকে মনে রাখব।”

সৌরভ মাথা নাড়লেন।

দূরে তখন পুরোনো ঘণ্টাটি ঝুলছে।

হাওয়ায় সামান্য দুলছে।

কিন্তু এবার তার শব্দ শুধু ভয়ের নয়।

এটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, সতর্কতা আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার প্রতীক।।

Share This