Categories
গল্প

গল্প : ভুল নামের নোটবুক।

অনিকের অফিসে নতুন ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিল তির্থা। প্রথম দিনেই সে ভুল করে অনিকের ডেস্কে নিজের নোটবুক রেখে চলে যায়। নোটবুকের ওপরে বড় করে লেখা—“তির্থার ডায়েরি – কেউ খুলবে না।”
অনিক প্রথমে ফেরত দিতে চাইছিল, কিন্তু কৌতূহলে একটু উঁকি মারতেই দেখল প্রথম পাতায় লেখা—

“নিজের মনের কথা কারও কাছে বলতে পারি না…
তাই ডায়েরির কাছে বলি।
যদি কখনো কেউ এই ডায়েরি পড়ে…
জেনে নিও—আমি খুব একাকী।”

এটা পড়ার পর থেকেই তির্থাকে আর সাধারণ ইন্টার্ন মনে হলো না তার কাছে।
পরের দিন নোটবুক ফেরত দিতে গিয়ে সে দেখল তির্থা একটু অগোছালো, একটু চঞ্চল, একটু মিষ্টি।

ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে কথা বাড়ল।
তির্থা ধীরে ধীরে নিজের মন খুলতে লাগল—তার একজন ছিল, যে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে হঠাৎ হারিয়ে গেছে।
অনিক মন দিয়ে শুনত, শুধু বলত—“সব হারানো মনে রেখে বসে থাকলে নতুন আলো তো আসবে না।”

একদিন লাঞ্চ ব্রেকে তির্থা বলল—
“তুমি জানো, তুমি প্রথম যে মানুষ—যার সাথে কথা বললে আমার ভয় লাগে না।”

অনিক হেসে বলল—“তাহলে ভয়হীন থাকার অনুশীলনটা আমার সঙ্গেই করে যাও।”

তির্থা চুপ করে অনিকের দিকে তাকালো। যেন বুঝে গেল—একাকীত্ব থেকে বের হওয়ার পথ হয়তো এ মানুষটাই।

মাসখানেক পরে, অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে তির্থা বলল—
“অনিক, তুমি যদি সত্যি মনে করো… আমরা একসঙ্গে হাঁটতে পারি… তাহলে আমি রাজি।”

অনিক বলল—
“আমি তো প্রথম দিনই নোটবুক খুলেই বুঝেছিলাম—আমি তোমাকে সামলাবো।”

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : হারিয়ে পাওয়া কণিকা।

অরূপ ট্রেনে বসে ছিল। তাকে বিপরীতে বসা মেয়েটির চোখ বারবার কিছু বলতে চাইছিল।
নাম—কণিকা।
দু’জনের কথাবার্তা মিলল, গল্প জমল, হাসি থামছিল না।

স্টেশন এলে কণিকা নেমে গেল। কিন্তু তার ব্যাগে ভুল করে অরূপের দেওয়া বইটা থেকে গেল।
বইয়ের ভিতরে অরূপের নম্বর।

দু’দিন পর অরূপের ফোনে একটি মিষ্টি কণ্ঠস্বর—
“আমি কণিকা… আপনার বইটা আছে আমার কাছে।”

এভাবেই শুরু তাদের নিয়মিত কথা…
একদিন কণিকা বলল—“এবার দেখা হবে?”

সেই দেখা-টাকেই তারা দু’জনই আজীবন মনে রাখল।
মনে হল—যেন একে অপরকে তারা আগেই চিনত… শুধু সময়ই তাদের মিলিয়ে দিল।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : ফুলওয়ালার প্রেম।

রাজীব শহরের একটি ফুলের দোকানে কাজ করত। প্রতিদিন সকালে সে ফুল সাজাতে ব্যস্ত থাকত।
একদিন দেখল—একটা মেয়ে প্রতিদিন একই সময় একটা গোলাপ কিনে নিয়ে যায়।
মেয়েটির নাম—মেঘলা।

রাজীবের মনে প্রশ্ন—কার জন্য এত গোলাপ?

একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল—“আপনি কি কারো জন্য ফুল নেন?”
মেঘলা একটু দুঃখ নিয়ে বলল—“না। আমার মা গোলাপ খুব ভালোবাসতেন… তাই তাঁর স্মৃতিতে রাখি।”

রাজীব বুঝল—মেঘলার চোখের হাসির পিছনে লুকানো বিষাদ।
পরের দিন সে তাকে একটা সাদা গোলাপ উপহার দিল।
মেঘলা অবাক—“এর দাম?”
রাজীব বলল—“কখনো কখনো কিছু জিনিস দামের নয়—অনুভূতির।”

সেই দিন থেকে তাদের আলাপ বাড়ল, আর ধীরে ধীরে মেঘলার চোখের দুঃখটা একটু একটু করে কমতে থাকল।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প নারী কথা

গল্প : নীল শাড়ির মেয়ে।

অভি প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার পথে বাসস্ট্যান্ডে একই মেয়েটিকে দেখত—নীল শাড়ি, কপালে ছোট টিপ, আর শান্ত দু’টো চোখ।
মেয়েটির নাম ছিল—ঋদ্ধিমা।

অভি সাহস করে কোনও দিন কথা বলেনি, শুধু দূর থেকে দেখেই যেত।
একদিন কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অভি গান গাইছিল। গান শেষে কেউ একজন বলল—
“তুমি খুব সুন্দর গাও।”
অভি তাকিয়ে দেখল—ঋদ্ধিমা!

তারপর থেকেই দু’জনের মধ্যে ছোট ছোট কথা, হাসি…
একদিন ঋদ্ধিমা বাসে উঠতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যাচ্ছিল। অভি ধরল তাকে।
ঋদ্ধিমা হেসে বলল—“তুমি না থাকলে আজ হাড্ডি ভেঙে যেত।”

অভি সাহস সঞ্চয় করে বলল—“দূর থেকে দেখতাম… কিন্তু বলতে পারিনি—তোমাকে ভালো লাগে।”

ঋদ্ধিমা প্রথমে অবাক, তারপর মুখটা লজ্জায় লাল।
সে বলল—“আমি ভেবেছিলাম শুধু আমিই দেখি তোমাকে।”

সেইদিন প্রথমবার দু’জন একসঙ্গে হাঁটল—ফুটপাতের পাশে কাঁচের দোকানে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখে দু’জনই হেসে ফেলল।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : বৃষ্টিভেজা দুপুরে।

মেঘভাঙা বৃষ্টির দুপুরে অফিস ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ঝর্ণা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল—ভিজে যাওয়ার ভয় নেই, কিন্তু একা থাকার ভয় ছিল। বৃষ্টি সবসময়ই তাকে অতীতের কোনো অদ্ভুত স্মৃতিতে ফিরিয়ে দিত।

হঠাৎ একটা ছাতা মাথার উপরে থামল।
তপন—ওদের অফিসের নতুন ছেলেটা।
সে হাসলো—“এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে তো পুরোপুরি ভিজে যাবে।”

ঝর্ণা একটু অপ্রস্তুত হলেও ছাতার নিচে দাঁড়াল। বৃষ্টির শব্দে কথাগুলো ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো দুই জনের মাঝে।

বাস এল না। রাস্তায় জল জমে গিয়েছে।
তপন বলল—“চলো, ওখানে চায়ের দোকান আছে। বৃষ্টি থামা পর্যন্ত বসি।”

চায়ের কাপে গরম ধোঁয়া। বাইরে মেঘের গর্জন।
ঝর্ণা আস্তে বলল—“বৃষ্টি আমার ভালো লাগে না।”
তপন জিজ্ঞেস করল—“তবে এতক্ষণ ভিজে দাঁড়িয়ে ছিলে?”
ঝর্ণা উত্তর দিল—“কারো জন্য অপেক্ষা করছিলাম… কিন্তু সে আর আসে না।”

তপন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
“কখনো কখনো যারা আসে না, তাদের জন্য অপেক্ষা করাটাই ভুল। বরং যারা পাশে দাঁড়ায়—তাদের চিনতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

ঝর্ণা তাকাল তপনের দিকে।
এ প্রথম অনুভব করল—কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করছে।

বৃষ্টি থামার পর দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরল।
সেদিনের বৃষ্টিটা ঝর্ণার আর খারাপ লাগল না।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প: “শেষ বিকেলের চিঠি”

সন্ধ্যার শেষে রং মাখা আকাশের নিচে রুদ্রর হাতে কাঁপছিল একটি পুরনো খাম। গ্রামের স্কুলের শেষ বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করা দুই বন্ধু—রুদ্র আর মহুয়া। তাদের বন্ধুত্বটা ছিল খুব স্বাভাবিক, কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য একটা অনুভূতি ভিড় জমিয়েছিল দু’জনের হৃদয়ে।

মহুয়া কলকাতায় নার্সিং পড়তে যাবে—এই খবরটা শোনার পর থেকেই রুদ্রর ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। বহুদিন ধরে বলতে চেয়েছিল, কিন্তু সাহস পাইনি। তাই লিখে ফেলেছিল একটা চিঠি—কিন্তু সেই চিঠি কখনোই দেওয়া হয়নি।

যেদিন বিদায় নেবে মহুয়া, সেদিন রুদ্র তাকে নিয়ে গেল তাদের প্রিয় নদীর ধারে। চারদিক নরম বাতাসে ভরে আছে। তার হাত কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে চিঠিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
“তুই চলে যাওয়ার আগেই এটা তোকে দিতে চাই।”

মহুয়া চিঠি খুলে দেখল—মাত্র তিনটি শব্দ: “আমি তোকে ভালবাসি।”
নীরবতা তৈরি হল। বাতাসের শব্দও যেন থেমে গেল।

মহুয়া রুদ্রর দিকে তাকিয়ে চোখের জল আটকাতে পারল না।
“এতদিন বলতে পারলি না?”
রুদ্র মাথা নিচু করে বলল, “হারানোর ভয় ছিল।”
মহুয়া তার হাত ধরল—“তুই আমাকে হারাবি না, রুদ্র। আমি ফিরব। আমার পড়াশোনা শেষ হলে এ নদীর ধারে আবার দাঁড়াব—তোর পাশে।”

রুদ্র কিছু বলল না। কিন্তু সে জানল—এ অপেক্ষাই হবে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রতীক্ষা।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

“শেষ বিকেলের আলো” — একটি প্রেমের গল্প।

শহরের ব্যস্ত রাস্তাটা প্রতিদিনের মতোই শব্দে ভরা। কিন্তু সেই দিনের শেষ বিকেলটা অদ্ভুত নরম ছিল। রোদটা যেন একটু বেশি কোমল, আর বাতাসে ছিল কেমন যেন অজানা এক টান।

নীলা কলেজ থেকে ফিরছিল। হাতে আঁকা খাতাটা বুকে জড়িয়ে হাঁটছিল ধীর পায়ে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল অয়ন—তার পুরোনো স্কুল বন্ধু। বহুদিন পর দেখা হওয়ায় তারা দু’জনেই একটু অবাক, একটু অস্বস্তি।

“এতদিন কোথায় ছিলে?” নীলা হেসে জিজ্ঞেস করল।

অয়নও হেসে বলল, “ছিলাম তো… এখানেই। তুমি-ই ব্যস্ত হয়ে পড়লে।”

তাদের কথাবার্তা ধীরে ধীরে নরম হতে লাগল। পুরোনো দিনের স্মৃতি, ছোটখাটো দুষ্টুমি, ক্লাস ফাঁকি—সব ফিরে আসতে লাগল। অয়ন বুঝতে পারছিল, এত বছর পরও নীলার চোখের সেই কোমল হাসিটা তাকে ঠিক একইভাবে নাড়া দেয়।

কথা বলতে বলতে তারা হাঁটতে লাগল। হঠাৎ করে নীলা থেমে গেল।

“ওই রোদের আলোটা দেখো না… কত সুন্দর, তাই না?”
অয়ন তাকাল। রোদের আলো নীলার চুলে পড়ে যেন সোনালি হয়ে উঠেছে।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জমতে লাগল।
কথা না ভেবে বলে ফেলল—
“নীলা, তুমি জানো… তুমি হাসলে মনে হয় পুরো দিনটাই সুন্দর হয়ে গেল।”

নীলা অবাক হয়ে তাকাল। চোখে একফোঁটা লাজুক ঝিলিক।

“এতদিন পর আজ এটা বললে?”
“হ্যাঁ… কারণ আজ বুঝলাম, কথা না বললে বোধহয় ভুল হয়ে যাবে।”

নীলা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
তারপর খুব নরম স্বরে বলল—
“তুমি দেরি করেছ, অয়ন… কিন্তু তবুও… আমি অপেক্ষা করছিলাম।”

শেষ বিকেলে দু’জনের ছায়া লম্বা হয়ে একসাথে মিশে গেল।
রাস্তা একই রইল, শহরও একই। কিন্তু তাদের জন্য পৃথিবীটা ঠিক তখনই একটু বদলে গেল।

Share This
Categories
গল্প

পুজোর আলোয় বাঁধা স্মৃতি।

কলকাতার সরু গলির এক প্রান্তে, ছোট্ট একটি আবাসিক এলাকা। সেপ্টেম্বরের শেষের দিনগুলো ছিল, আর বাতাসে যেন পুজোর ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছিল। এই বাঙালি মহল্লার প্রতিটি কোণায় হালকা আলো, আর ফুলের সাজ। সকলের মুখে যেন অপেক্ষার আনন্দ; কারোর চোখে উৎসাহ, কারোর চোখে নস্টালজিয়া।

রেখা, এক চাকুরিজীবী মহিলা, দীর্ঘদিন ধরে শহরে একা থাকলেও পুজোর সময় তাঁর মন যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে মা ও দিদিমার সঙ্গে যে দূর্গা পুজোতে আনন্দ করত, সেই স্মৃতি এখনও জীবন্ত। এবার সে ঠিক করেছিল—নিজেই ছোট্ট হলেও পুজোর মেজাজ ঘরে তৈরি করবে।

সপ্তাহব্যাপী পরিকল্পনা, বাজার ঘুরে সামগ্রী সংগ্রহ, ফুল, আলো, বেলুন—সবকিছু। এক সন্ধ্যায়, প্রতিটি দীপ আর বাতির আলো মিলিয়ে রুমটি যেন সোনালি হয়ে উঠল। রেখা দেখল, সে যতই ব্যস্ত থাকে, এই ছোট্ট পুজোই তার মনকে শান্তি দিচ্ছে।

পরদিন, মহল্লার বাচ্চারা এবং প্রতিবেশীরা তার ঘরে আসতে শুরু করল। সবাই মিলে ঠাকুরমার পূজা—ছোট্ট মণ্ডপ, হাতে মালা, আর ঠাকুরমার সামনে লাল চন্দন আর ফুল। শিশুরা খুশিতে উল্লসিত, কেউ কেউ মুখে মিষ্টি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে।

রেখা দেখল, পুজো শুধুই রীতি নয়, এটি মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করার একটি সেতু। প্রত্যেকের হাসি, প্রতিটি আলোর ঝলক—সবকিছু যেন বলছে, “এটাই বাঙালির পুজোর আসল রূপ।” সেই সন্ধ্যায়, যখন ঢাকের ঢাকনা বাজছিল এবং বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল ধূপের গন্ধ, রেখার মনে হল, এই ছোট্ট পুজোও বড় আনন্দ দিতে পারে।

পুজো শেষ হলে, সবাই বিদায় নিলো। কিন্তু রেখা জানে, এই স্মৃতিগুলো তার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে—প্রতিটি আলোর ঝলক, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি ধূপের গন্ধ। পুজো হয়তো শেষ, কিন্তু তার আনন্দ চিরস্থায়ী।


নিশ্চয়ই! এখানে আমি একটি পূর্ণাঙ্গ, সংক্ষিপ্ত কিন্তু আবেগময় “দূর্গা পুজোর গল্প” তৈরি করলাম:

 

 

 

শিরোনাম: পুজোর আলোয় বাঁধা স্মৃতি

 

কলকাতার সরু গলির এক প্রান্তে, ছোট্ট একটি আবাসিক এলাকা। সেপ্টেম্বরের শেষের দিনগুলো ছিল, আর বাতাসে যেন পুজোর ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছিল। এই বাঙালি মহল্লার প্রতিটি কোণায় হালকা আলো, আর ফুলের সাজ। সকলের মুখে যেন অপেক্ষার আনন্দ; কারোর চোখে উৎসাহ, কারোর চোখে নস্টালজিয়া।

 

রেখা, এক চাকুরিজীবী মহিলা, দীর্ঘদিন ধরে শহরে একা থাকলেও পুজোর সময় তাঁর মন যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে মা ও দিদিমার সঙ্গে যে দূর্গা পুজোতে আনন্দ করত, সেই স্মৃতি এখনও জীবন্ত। এবার সে ঠিক করেছিল—নিজেই ছোট্ট হলেও পুজোর মেজাজ ঘরে তৈরি করবে।

 

সপ্তাহব্যাপী পরিকল্পনা, বাজার ঘুরে সামগ্রী সংগ্রহ, ফুল, আলো, বেলুন—সবকিছু। এক সন্ধ্যায়, প্রতিটি দীপ আর বাতির আলো মিলিয়ে রুমটি যেন সোনালি হয়ে উঠল। রেখা দেখল, সে যতই ব্যস্ত থাকে, এই ছোট্ট পুজোই তার মনকে শান্তি দিচ্ছে।

 

পরদিন, মহল্লার বাচ্চারা এবং প্রতিবেশীরা তার ঘরে আসতে শুরু করল। সবাই মিলে ঠাকুরমার পূজা—ছোট্ট মণ্ডপ, হাতে মালা, আর ঠাকুরমার সামনে লাল চন্দন আর ফুল। শিশুরা খুশিতে উল্লসিত, কেউ কেউ মুখে মিষ্টি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে।

 

রেখা দেখল, পুজো শুধুই রীতি নয়, এটি মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করার একটি সেতু। প্রত্যেকের হাসি, প্রতিটি আলোর ঝলক—সবকিছু যেন বলছে, “এটাই বাঙালির পুজোর আসল রূপ।” সেই সন্ধ্যায়, যখন ঢাকের ঢাকনা বাজছিল এবং বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল ধূপের গন্ধ, রেখার মনে হল, এই ছোট্ট পুজোও বড় আনন্দ দিতে পারে।

 

পুজো শেষ হলে, সবাই বিদায় নিলো। কিন্তু রেখা জানে, এই স্মৃতিগুলো তার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে—প্রতিটি আলোর ঝলক, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি ধূপের গন্ধ। পুজো হয়তো শেষ, কিন্তু তার আনন্দ চিরস্থায়ী।

Share This
Categories
গল্প

শেষ চিঠির অপেক্ষা।

একটি দীর্ঘ, আবেগঘন ও রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প লিখছি। গল্পে থাকবে সম্পর্কের গভীরতা, আবেগ, দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি, বিচ্ছেদ এবং পুনর্মিলনের স্বাদ—যাতে এটি পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে রাখে।


❤️ “শেষ চিঠির অপেক্ষা”

(একটি ৫০০০ শব্দের ভালোবাসার গল্প)


অধ্যায় ১: প্রথম দেখা

শীতের এক বিকেল। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ভিড় জমজমাট রাস্তা।
অর্পিতা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে ফিরছিল। বইয়ের গন্ধ, গলির চায়ের দোকান, আর পাশের বইয়ের দোকানের ডাকাডাকি—সব মিলে এক অন্যরকম পরিবেশ।

হঠাৎ করেই এক ধাক্কা। তার হাত থেকে বইগুলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল।
“সরি, আমি দেখিনি!”—একটা কণ্ঠস্বর।

অর্পিতা তাকিয়ে দেখল, লম্বা, হাসিখুশি এক যুবক। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গায়ে সোয়েটার।
সে তাড়াতাড়ি বইগুলো তুলে দিয়ে বলল—
“আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। আমি সমীর।”

অর্পিতা কিছুটা রেগে ছিল, কিন্তু ছেলেটির আন্তরিক হাসি দেখে রাগ গলে গেল।

সেদিনের দেখা যেন তাদের জীবনের গল্পের প্রথম পৃষ্ঠা।


অধ্যায় ২: বন্ধুত্বের শুরু

সমীর ও অর্পিতার দেখা হতে লাগল বারবার। কখনও কলেজ স্ট্রিটে, কখনও কফি হাউসে।
তাদের আলোচনার বিষয় বই, সিনেমা, সঙ্গীত, স্বপ্ন।

একদিন সমীর হেসে বলল—
“তুমি জানো, তুমি একদম সত্যজিৎ রায়ের ছবির নায়িকা মতো।”
অর্পিতা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হল। তারা একসাথে অনেক স্বপ্ন দেখতে শুরু করল—ছোট্ট একটা বাড়ি, অনেক বই, রবিবার সকালে একসাথে চা খাওয়া।


অধ্যায় ৩: প্রেমের প্রথম স্বাদ

ফেব্রুয়ারির এক বিকেলে গঙ্গার ধারে তারা দুজনে হাঁটছিল।
হাওয়া ঠাণ্ডা, সূর্যাস্তের আলো গঙ্গার জলে লেগে সোনালি রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সমীর হঠাৎ অর্পিতার হাত ধরল।
“অর্পিতা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

অর্পিতার চোখে জল চলে এলো।
“আমিও সমীর। আমি অনেকদিন ধরে বলতে চেয়েছিলাম।”

সেই মুহূর্তে মনে হল, পৃথিবী থমকে গেছে। শুধু তারা দুজন, আর চারপাশে গঙ্গার ঢেউ।


অধ্যায় ৪: জীবনের বাস্তবতা

কিন্তু ভালোবাসা যত সুন্দর, জীবনের বাস্তবতা তত কঠিন।
সমীর মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অর্পিতার বাবা-মা চায় সে বিদেশে উচ্চশিক্ষা করুক।

অর্পিতা দ্বিধায় পড়ল—
সে কি প্রেম বেছে নেবে, নাকি স্বপ্ন?
সে কি সমীরকে অপেক্ষা করাবে, নাকি একসাথে ভবিষ্যত গড়বে?


অধ্যায় ৫: দূরত্বের সূচনা

অর্পিতা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
এয়ারপোর্টে বিদায়ের সময় সমীর চিঠি দিয়ে বলল—
“যখন একা লাগবে, পড়বে। আমি অপেক্ষা করব।”

অর্পিতা কান্না আটকাতে পারল না।
বিমানের জানালা দিয়ে সমীরকে ছোট হতে হতে হারিয়ে যেতে দেখল।


অধ্যায় ৬: অপেক্ষার দিনগুলো

সমীর প্রতিদিন অর্পিতাকে চিঠি লিখত।
প্রথম কয়েক মাস অর্পিতা নিয়মিত উত্তর দিত।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উত্তর কমতে লাগল।

অর্পিতা নতুন শহর, নতুন জীবন, নতুন বন্ধুদের মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সমীর একা শহরে তার চিঠির অপেক্ষা করত।


অধ্যায় ৭: ভুল বোঝাবুঝি

একদিন সমীর শুনল অর্পিতা একজন সহপাঠীর সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছে।
তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল।

সে একটি রাগী চিঠি লিখে ফেলল—
“তুমি যদি আমাকে ভুলে গিয়ে থাকো, তাহলে বলো। আমি তোমাকে বিরক্ত করব না।”

অর্পিতা চিঠি পেয়ে কষ্ট পেল।
সে কিছুদিন চুপ করে রইল। এই নীরবতা তাদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।


অধ্যায় ৮: বিচ্ছেদ

অবশেষে অর্পিতা লিখল—
“সমীর, হয়তো আমাদের সময় শেষ। আমি এখন পড়াশোনায় ব্যস্ত। তুমি তোমার জীবনে এগিয়ে যাও।”

সমীর ভেঙে পড়ল। তার পৃথিবী যেন থেমে গেল।
সে লেখা বন্ধ করে দিল।


অধ্যায় ৯: সময়ের নিরাময়

বছর কেটে গেল।
সমীর চাকরি পেল, শহর বদলাল।
অর্পিতা বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরল।

একদিন কলেজ স্ট্রিটের সেই পুরোনো বইয়ের দোকানে তারা হঠাৎ মুখোমুখি হল।
চোখে চোখ পড়তেই যেন পুরোনো সব স্মৃতি ফিরে এল।


অধ্যায় ১০: শেষ চিঠির অপেক্ষা

অর্পিতা ধীরে ধীরে বলল—
“সমীর, আমি তোমার লেখা চিঠিগুলো সব রেখেছি।”
সমীর তাকাল—”তাহলে তুমি কখনও আমাকে ভুলোনি?”
অর্পিতা চোখের জল মুছল—
“না সমীর। আমি শুধু সময় চেয়েছিলাম। আজ আমি প্রস্তুত। তুমি কি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ?”

সমীর মুচকি হাসল—
“আমি আজও সেই শেষ চিঠির অপেক্ষায় ছিলাম।”

তারা আবার একসাথে হাঁটল।
গঙ্গার ধারে সূর্যাস্তের আলোতে যেন তাদের প্রেম আবার নতুন করে জন্ম নিল।


সমাপ্তি

গল্পটি আমাদের শেখায়—ভালোবাসা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারে, যদি দুজনেই একে অপরকে সময় দেয় এবং অপেক্ষা করতে জানে।

 

Share This
Categories
গল্প

অন্ধকারে লুকানো সত্য (রহস্য গল্প)।

(একটি পূর্ণাঙ্গ রহস্য গল্প)

১. প্রথম সতর্কবার্তা

পার্থ মুখার্জি কলকাতার এক পুরোনো বাড়িতে একা থাকে। বাড়িটা তার ঠাকুরদার সময়ের, প্রায় একশো বছরের পুরোনো। সেদিন সকালে ডাকবাক্স খুলতেই সে দেখতে পেল একটি হলুদ খামের চিঠি। খামের উপর কাঁপা হাতের লেখা —
“আজ রাত বারোটার আগে বাড়ির ঘড়ি থামিয়ে দিও। না হলে বিপদ আসবে।”

চিঠি পড়ে পার্থর শরীরে কাঁটা দিল। কে লিখল এই চিঠি? কেন লিখল? সে জানে তার বাড়ির দোতলায় ঝোলানো ঘড়িটা অনেক বছর ধরে বন্ধ।

দিনভর তার মাথায় এই রহস্য ঘুরপাক খেতে লাগল। সন্ধ্যা নামতেই বাড়ির ভিতর অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। পার্থ বারবার সেই চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়ছে।

২. অদ্ভুত শব্দ

রাত বাড়তে থাকল। ঠিক ১১টা নাগাদ হঠাৎ দোতলার দিক থেকে টিক-টিক শব্দ শোনা গেল।
পার্থ থমকে দাঁড়াল।
— “অসম্ভব! ওই ঘড়ি তো নষ্ট…”

টর্চ হাতে নিয়ে দোতলায় উঠতেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। পুরোনো পেন্ডুলাম ঘড়ির কাঁটা চলতে শুরু করেছে।

ঘড়ির কাচের ভেতরে তার নিজের মুখ দেখল, কিন্তু মনে হল আরেকটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। টর্চের আলো ফেলতেই ছায়া মিলিয়ে গেল।

৩. দেয়ালের পেছনের ঘর

ঠিক তখনই দেয়ালের পেছন থেকে ফাঁপা শব্দ এল। পার্থ টর্চ দিয়ে পরীক্ষা করতে করতে দেয়ালের একটা অংশ ঠুকল। হঠাৎ একটা গোপন দরজা খুলে গেল। ভেতরে ছোট্ট একটা ঘর, ধুলো জমে আছে, কিন্তু সেখানে রাখা একটি টেবিলের উপর পুরোনো ডায়েরি আর কিছু দলিল।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা —
“আমি এই বাড়ির আগের মালিক অমরেশ মুখার্জি। আমাকে আমার আপন ভাই খুন করেছে এই বাড়ির সম্পত্তির জন্য। আমার দেহ এই ঘরের মেঝের তলায় লুকানো আছে। আমার আত্মা মুক্তি চাই।”

পার্থর গলা শুকিয়ে গেল। সে সাথে সাথে পুলিশের খবর দিল।

৪. তদন্ত শুরু

পরের দিন সকালেই ইন্সপেক্টর সুদীপ সরকার এলেন। অভিজ্ঞ অফিসার, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
— “আপনি বলছেন ঘড়ি নিজে থেকে চলতে শুরু করেছে?”
পার্থ মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ স্যার, আর এই ডায়েরিটা পেয়েছি।”

দলিল আর ডায়েরি দেখে সুদীপ গম্ভীর হলেন।
— “আমরা ঘরের মেঝে খুঁড়ব। যদি হাড়গোড় পাওয়া যায় তবে এটা খুনের মামলা।”

মেঝে খুঁড়তেই সত্যিই একটি কঙ্কাল পাওয়া গেল। বাড়ি হইচই পড়ে গেল। খবর ছড়িয়ে পড়ল পাড়ায়।

৫. অতিপ্রাকৃত ইঙ্গিত

সেই রাতে পার্থ আবার সেই ছায়া দেখল। এবার ছায়াটি তাকে হাতের ইশারায় অন্য ঘরের দিকে ডাকল। পার্থ ভয় পেলেও সাহস করে গেল। সেখানে একটি ছোট কাঠের বাক্স পেল। বাক্সের ভিতরে পুরোনো নথি আর একটি রুপোর চেইন।

পরদিন ইন্সপেক্টরকে বাক্সটি দেখানো হল। নথির মধ্যে ছিল বাড়ির পুরোনো দলিল, যেখানে দেখা গেল অমরেশ মুখার্জির মৃত্যুর পর সম্পত্তি বেআইনি ভাবে তার ভাই অর্জুন মুখার্জির নামে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সুদীপ বললেন,
— “এখন স্পষ্ট, অর্জুন খুন করেছে। কিন্তু সে তো বহু বছর আগে মারা গেছে। খুনের পেছনে আর কেউ ছিল কি?”

৬. নতুন সন্দেহভাজন

তদন্তে জানা গেল অর্জুনের নাতি রাজীব মুখার্জি সম্প্রতি বাড়ির দখল নিতে চেয়েছিল। পার্থর কাছে চিঠি লিখে বাড়ি ছাড়ার হুমকিও দিয়েছিল।

পার্থ মনে পড়ল— সেই চিঠির হাতের লেখা! চিঠি আর রাজীবের পুরোনো স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখতেই বোঝা গেল দুটোই এক।

সুদীপ পুলিশ টিম নিয়ে রাজীবকে গ্রেপ্তার করল। রাজীব স্বীকার করল যে সে জানত তার দাদু অমরেশকে খুন করেছে। সে এই সত্যিটা চিরতরে গোপন রাখতে চেয়েছিল, তাই পার্থকে ভয় দেখাতে চিঠি লিখেছিল।

৭. চূড়ান্ত মুখোমুখি

রাজীবকে নিয়ে বাড়িতে পুনর্নির্মাণ চলছিল। ঠিক তখনই ঘড়ি আবার বাজতে শুরু করল। হঠাৎ জানলা বন্ধ হয়ে গেল, ঘর অন্ধকার। সবাই দেখল এক ফ্যাকাশে ছায়ামূর্তি রাজীবের সামনে এসে দাঁড়াল। রাজীব চিৎকার করে উঠল,
— “আমার দোষ নেই! আমি খুন করিনি!”

ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ঠিক বারোটায় থেমে গেল। যেন আত্মা শান্তি পেল।

৮. ন্যায়বিচার

রাজীবকে আদালতে তোলা হল। ডায়েরি, দলিল আর পার্থর সাক্ষ্য মিলে মামলায় প্রমাণ হল অমরেশকে খুন করেছিল অর্জুন। আদালত পার্থর নামে বাড়ির সম্পত্তির অধিকার ফিরিয়ে দিল।

ইন্সপেক্টর সুদীপ পার্থকে বললেন,
— “আপনি কেবল বাড়ির মালিক নন, আপনি ইতিহাসের সাক্ষী। আপনি যদি সাহস না করতেন, অমরেশ মুখার্জির আত্মা আজও শান্তি পেত না।”

৯. সমাপ্তি

রাতের আকাশে পূর্ণিমার আলো ঝলমল করছে। পার্থ দোতলায় দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ি থেমে আছে, কিন্তু বাড়ি আর অদ্ভুত নয়। যেন শান্তি ফিরে এসেছে।

পার্থ ভাবল,
— “এই বাড়ি শুধু আমার নয়। এখানে এক ইতিহাস আছে, এক রক্তাক্ত অতীত আছে। এখন আমি সেই অতীতের রক্ষক।”

সে টেবিলে ডায়েরিটা রাখল, যেন ভবিষ্যতের জন্য প্রমাণ হয়ে থাকে। বাইরে হাওয়ায় যেন একটুখানি ধন্যবাদসূচক ফিসফিসানি শুনল।

 

Share This